রাবেয়া বসরিকে নিয়ে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম ব‌ই— সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘তাপসী রাবেয়া’

 

মানবজীবনের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছে, যাঁদের পরিচয় কেবল তাঁদের সময়, সমাজ কিংবা দুনিয়াবি অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁদের জীবনদর্শন, উপলব্ধি, আত্মনিবেদন ও আদর্শ পরবর্তী প্রজন্মের কাছেও সমান গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে। তাঁদের জীবন ও কর্ম মানুষের চিন্তার জগতে নতুন ভাবনার জন্ম দেয়। এমনই এক ব্যক্তিত্বের নাম রাবেয়া বসরী। বাংলার মুসলমান সমাজে অত্যন্ত পরিচিত এই নাম। আদর্শবান, সচ্চরিত্রবান, সতী-সাধ্বী ও আল্লাহর একজন ওলি হিসেবে তিনি জগদ্বিখ্যাত। বাংলায় ঠিক কবে, কীভাবে রাবেয়া বসরী এতটা পরিচিত হয়ে উঠেছেন, তার হদিস খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে ঔপনিবেশিক আমলে তাঁকে নিয়ে রচিত একটি গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়। এটিই বাংলা ভাষায় রাবেয়া বসরিকে নিয়ে রচিত প্রথম গ্রন্থ।

সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘তাপসী রাবেয়া’ প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১৭ সালে, খিলগাঁও পশ্চিমপাড়া ঢাকা থেকে। প্রকাশক ছিলেন, আবুল খায়ের সায়েফ‌উদ্দিন আহমদ। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় কলকাতার ইসলামিয়া আর্ট প্রেস থেকে। প্রকাশক ছিলেন, মোহাম্মদ সামসুদ্দিন। প্রথম সংস্করণে পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৬৫; দ্বিতীয় সংস্করণে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫। কারণ হিসেবে লেখা রয়েছে: “দ্বিতীয় সংস্করণে এই বহির বহুল অংশ নতুন করিয়া লেখা হইয়াছে।” অর্থাৎ প্রথম সংস্করণে তৃপ্তি না পেয়ে পরিবর্ধন ও পরিমার্জনা করে নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেছেন আলী সাহেব। নতুন সংস্করণ প্রকাশের পর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সম্পাদিত স‌ওগাত পত্রিকার ১৩৩২ সালের ফাল্গুন সংখ্যায় এর ‘ব‌ই পরিচিতি’ প্রকাশিত হয়।

ব‌ইটি বিষয় ও ভাষায় এত বেশি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছিল যে, ১৯৩৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য বই হিসেবে নির্বাচিত হয়। বিশিষ্ট লোকসাহিত্য সংগ্রাহক ও গবেষক মুহম্মদ মনসুর‌উদ্দীন লিখেছেন:

“তাপসী রাবেয়া তাঁহার শেষ গ্রন্থ। বিখ্যাত তপস্বিনী রাবেয়া বসরীর জীবনী এই গ্রন্থে বিধৃত হ‌ইয়াছে। এই গ্রন্থখানা সত্য‌ই তাঁহার সার্থক রচনা। কী ভাষার দিক দিয়া কি ইতিহাসের দিক দিয়া বিচার করিলে তাঁহার চমৎকার এই গ্রন্থখানার প্রশংসা করিতে হয়।”

সুফিসাধিকা রাবেয়া বসরীর জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘তাপসী রাবেয়া’। এই গ্রন্থে রাবেয়া বসরী কেবল একজন ধর্মনিষ্ঠ নারী নন; তিনি আত্মনিবেদন, নিষ্কাম প্রেম, ত্যাগ ও আধ্যাত্মিক দৃঢ়তার প্রতীক। তাঁর জীবনকাহিনি বর্ণনার মধ্য দিয়ে লেখক ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি নারীসত্তার মর্যাদা ও মানুষের অন্তর্গত মহত্ত্বের প্রশ্নও সামনে এনেছেন।

গ্রন্থটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে। এর ভাষা ও বর্ণনাভঙ্গিতে সেই সময়ের সাধু গদ্যরীতির পরিচয় পাওয়া যায়। প্রথম পরিচ্ছেদেই লেখক রাবেয়াকে বসরার এক দরিদ্র কুটিরের গোলাপের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম হলো, বাইরের দারিদ্র্য কোনো মানুষের ভেতরের মহত্ত্বকে আড়াল করে রাখতে পারে না। গোলাপের সৌরভ যেমন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি রাবেয়ার সাধনাজীবনের প্রভাবও সময় ও স্থানের সীমা অতিক্রম করে মানুষের মনে স্থায়ী হয়ে থাকে। সেই প্রভাব আজও বিদ্যমান।

 

দুঃখ, দাসত্ব ও আত্মিক জাগরণ
বইটিতে রাবেয়া বসরীর জন্মের সঙ্গে দারিদ্র্যের একটি বিস্তৃত চিত্র যুক্ত হয়েছে। তাঁর পিতা ইসমাইল ছিলেন দরিদ্র, কিন্তু ধর্মপ্রাণ ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মানুষ। অভাবের কারণে তাঁদের পরিবারকে বহু কষ্ট সহ্য করতে হতো। রাবেয়ার জন্মের সময় ঘরে তেলের অভাব পর্যন্ত ছিল। এমন এক অনাড়ম্বর পরিবেশে জন্ম নেওয়া শিশুটি পরবর্তী জীবনে আধ্যাত্মিক মহিমায় স্মরণীয় হয়ে উঠবেন—লেখক শুরুতেই সেই বৈপরীত্যের দিকে পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

রাবেয়ার জন্মকে ঘিরে পিতার স্বপ্নের ঘটনাটিও লেখক বর্ণনা করেছেন। স্বপ্নে হজরত মুহাম্মদ (দ.)-এর আবির্ভাব এবং কন্যার ভবিষ্যৎ মহিমার সংবাদ রাবেয়ার জীবনকে ধর্মীয় তাৎপর্যে চিহ্নিত করে। এই ঘটনা বইটির কাহিনিতে এক অলৌকিক আবহ তৈরি করেছে। তবে এটিকে লেখকের উপস্থাপিত ধর্মীয় কাহিনি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত; স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে নয়।

পরবর্তী জীবনে রাবেয়ার দুঃখ আরও গভীর হয়। মা-বাবার মৃত্যুর পর বসরায় দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, বোনদের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ ঘটে এবং তিনি দাসত্বের শিকার হন। নতুন প্রভুর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে এক রাতে পালানোর সময় পড়ে গিয়ে তাঁর হাত ভেঙে যায়। এই বিপর্যয়ের মুহূর্তে তাঁর মুখে উচ্চারিত প্রার্থনা বইটির অন্যতম আবেগঘন অংশ। তিনি নিজেকে এক অসহায় নারী হিসেবে তুলে ধরে আল্লাহর কাছেই আশ্রয় চান। তাঁর আকুতির মর্ম হলো, দুনিয়াতে আপনজন কেউ না থাকলেও সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁকে পরিত্যাগ না করেন, ছেড়ে না যান।

এই দৃশ্যে রাবেয়ার অসহায়ত্ব যেমন প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি প্রকাশ পেয়েছে তাঁর বিশ্বাসের দৃঢ়তাও। লেখকের বর্ণনায় দেখা যায়, প্রতিকূলতা তাঁকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং দুঃখের মধ্য দিয়েই তাঁর সাধনাজীবনের ভিত্তি আরও শক্ত হয়েছে।

রাবেয়ার মালিক এক রাতে তাঁর ইবাদত ও আলোকোজ্জ্বল উপস্থিতির এক অলৌকিক দৃশ্য দেখে অনুতপ্ত হন এবং তাঁকে স্বাধীনতা দেন—এমন কাহিনিও বইটিতে রয়েছে। এরপর রাবেয়া নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সাধনার পথে নিয়োজিত করেন। দিনভর কাজ এবং রাতভর ইবাদতের বিবরণে লেখক তাঁর আত্মসংযম ও একাগ্রতার একটি বেদনাবিধুর চিত্র এঁকেছেন।

 

নিষ্কাম খোদাপ্রেমের দর্শন
রাবেয়ার জীবনদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেম। তিনি ইবাদত করেন না পার্থিব পুরস্কারের আশায়, আবার শাস্তির ভয়কেও তাঁর সাধনার প্রধান প্রেরণা হিসেবে দেখানো হয়নি। তাঁর একমাত্র আকাঙ্ক্ষা আল্লাহর নৈকট্য লাভ। বইটির বিভিন্ন ঘটনা থেকে এই দর্শনটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে। পাঠক একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে বুঝতে পারবেন, রাবেয়া বসরীর এই প্রেমে তিনটি বিষয়ের কোনো স্থান নেই—ব্যক্তিগত স্বার্থ, সম্পদের মোহ এবং আত্মপ্রচার বা আমিত্ব। তাঁর কাছে একমাত্র প্রধান বিষয় হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ।

একবার রাবেয়ার কাছে দুজন অতিথি এলে দেখা যায়, তাঁর কাছে মাত্র দুটি রুটি রয়েছে। এমন সময় একজন ক্ষুধার্ত ভিক্ষুক সাহায্য চাইলে তিনি রুটি দুটি তাকে দিয়ে দেন। অতিথিরা এতে অসন্তুষ্ট হলেও পরে আরও রুটি এসে পৌঁছানোর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এই কাহিনির মাধ্যমে লেখক অভাবের মধ্যেও দানশীলতা এবং আল্লাহর ওপর নির্ভরতার আদর্শ তুলে ধরেছেন।

আরেকটি ঘটনায় এক ধনবান ব্যক্তি রাবেয়ার জন্য অর্থ নিয়ে আসেন। কিন্তু রাবেয়া তা গ্রহণ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যের মূল তাৎপর্য হলো, যিনি নিজের জীবন ও হৃদয় আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছেন, তাঁর কাছে পার্থিব সম্পদ কখনোই পরম আশ্রয় হতে পারে না। তিনি বিশ্বাস করেন, যিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের পালনকর্তা, তাঁর ওপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে অভাবের ধারণাটিও ভিন্ন।

এই অবস্থানকে নিছক সম্পদবিরোধিতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। রাবেয়ার বৈরাগ্যের মূল কথা হলো, সম্পদ যেন মানুষের হৃদয় ও সাধনার লক্ষ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। তাঁর কাছে আত্মিক স্বাধীনতা পার্থিব প্রাপ্তির চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই দারিদ্র্য তাঁকে হীন করতে পারেনি, আবার ধনসম্পদও তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি।

 

নারীসত্তার মর্যাদা ও আত্মশক্তি
‘তাপসী রাবেয়া’ গ্রন্থের বিশেষ তাৎপর্য নিহিত রয়েছে নারী সম্পর্কে লেখকের বক্তব্যে। রাবেয়ার জীবনকে সামনে রেখে সৈয়দ এমদাদ আলী এমন একটি ধারণাকে প্রশ্ন করেছেন, যেখানে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ ও মহত্ত্বকে পুরুষের একচেটিয়া অর্জন বলে মনে করা হয়।

গ্রন্থে কয়েকজন ব্যক্তি রাবেয়ার কাছে এসে বলেন, পৃথিবীর গুণ ও অলৌকিক ক্ষমতা নাকি পুরুষেরাই অর্জন করেছেন; নারীরা তেমন কিছু করতে পারেননি। জবাবে রাবেয়া পুরুষের অহংকারকে প্রশ্ন করেন। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য হলো, আত্মম্ভরিতা ও নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করার প্রবণতা কোনো মহত্ত্বের প্রমাণ নয়। এই সংলাপের মধ্য দিয়ে রাবেয়া নারী হিসেবে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন এবং সমাজে প্রচলিত শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানান।

এখানে লেখক শুধু একজন নারীর ব্যক্তিগত সাফল্য তুলে ধরেননি; বরং নারীকে বৃহত্তর মানবসমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেছেন। মাতৃত্ব, স্নেহ, ত্যাগ ও ধর্মসেবায় নারীর অবদানের কথাও তাঁর বর্ণনায় এসেছে। নারীকে অবহেলা করার প্রবণতার বিপরীতে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, মানবজীবনের সূচনা থেকেই মানুষ নারীর স্নেহ ও যত্নের ওপর নির্ভরশীল।

অবশ্য লেখকের নারীভাবনাকে আধুনিক নারীবাদের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যায় না। তাঁর যুক্তির ভিত্তি প্রধানত ধর্মীয় মহত্ত্ব, নৈতিকতা ও আত্মত্যাগ। তবু তাঁর সময়ের প্রেক্ষাপটে রাবেয়াকে একজন স্বতন্ত্র সাধিকা এবং পুরুষসাধকদের সমপর্যায়ের ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। রাবেয়ার মধ্য দিয়ে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, আত্মিক যোগ্যতার বিচার লিঙ্গপরিচয় দিয়ে করা যায় না। বিশ শতকের শুরুতে একজন বাঙালি মুসলমানের পক্ষে ‘নারী’ নিয়ে এমন চিন্তা ও লেখনী সহজ ব্যাপার ছিল না। যখন বেগম রোকেয়া ও সুফিয়া কামালের মতো নারীদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা নানামুখী বাধার মুখে পড়ছে, তখন সৈয়দ এমদাদ আলী রাবেয়া বসরীর চরিত্র চিত্রণের মাধ্যমে বাঙালি মুসলমান সমাজের নারী-চিন্তাকেই সংস্কার করতে চেয়েছেন। তাঁর এই চাওয়া কতটুকু কার্যকর হয়েছে তারচেয়ে বড় বিষয়, তিনি সামগ্রিক সামাজিক চাপকে উপেক্ষা করে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নারীর অবস্থান ও মর্যাদাকে স্বীকার করার সাহস দেখিয়েছেন।

 

হাসান বসরী ও অন্যান্য সুফির সঙ্গে সম্পর্ক
রাবেয়ার সাধনাজীবনকে বুঝতে হাসান বসরীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গ্রন্থে হাসান বসরীকে রাবেয়ার সমসাময়িক একজন বিশিষ্ট সাধক হিসেবে পরিচয় করানো হয়েছে। কোথাও কোথাও তাঁকে রাবেয়ার মুর্শিদ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে; তবে লেখক এ বিষয়ে প্রচলিত মতভেদের কথাও জানিয়েছেন।

হাসান বসরী রাবেয়াকে গভীর শ্রদ্ধা করতেন। তাঁর মজলিসের আসরে একদিন রাবেয়া অনুপস্থিত থাকলে একজন ব্যক্তি মন্তব্য করেন, সেখানে বহু জ্ঞানী ও সম্মানিত ব্যক্তি উপস্থিত থাকায় একজন নারী না থাকলে কী আসে যায়। এই মন্তব্যের প্রেক্ষিতে হাসান বসরীর তাৎক্ষণিক প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়ায় রাবেয়ার বিশেষ মর্যাদা প্রকাশ পায়। তিনি বোঝান, রাবেয়ার অন্তর্দৃষ্টি ও উপলব্ধির মূল্য সাধারণ উপস্থিতির সঙ্গে তুলনীয় নয়। এই ঘটনা থেকে বোঝা যায়, লেখকের দৃষ্টিতে রাবেয়া শুধু ধর্মীয় আলোচনার একজন শ্রোতা নন; তিনি সেই আলোচনার গভীর অর্থ উপলব্ধি করতে সক্ষম একজন সাধিকা।

বিবাহ সম্পর্কে হাসান বসরীর প্রশ্নের উত্তরে রাবেয়ার বক্তব্যও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি জানান, তাঁর দেহ ও মন আল্লাহর উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এই কথার মধ্য দিয়ে লেখক রাবেয়ার বৈরাগ্য ও সাধনার একাগ্রতাকে তুলে ধরেছেন। তাঁর কাছে ব্যক্তিগত ও সামাজিক সংসারজীবনের চেয়ে আধ্যাত্মিক সাধনাই প্রাধান্য পেয়েছে।

গ্রন্থের দশম পরিচ্ছেদে হাসান বসরী, শাফিক বলখী ও মালেক দীনারের সঙ্গে রাবেয়ার পরমার্থবিষয়ক আলোচনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে ধৈর্য, কষ্ট সহ্য করা এবং প্রেমের সত্যতা নিয়ে আলোচনা হয়। রাবেয়ার বক্তব্যের সারকথা হলো, প্রকৃত প্রেম এমন এক আত্মনিবেদন, যেখানে প্রিয় সত্তার নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিগত দুঃখবোধকেও অতিক্রম করে। এই আলোচনায় তাঁর নিষ্কাম প্রেমের দর্শন সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

 

সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘তাপসী রাবেয়া’ রাবেয়া বসরীর জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত এক আধ্যাত্মিক ও আদর্শনির্ভর সাহিত্যকর্ম। এতে দুঃখের মধ্যেও বিশ্বাস ধরে রাখা, সম্পদের মোহ অতিক্রম করা, নিঃস্বার্থভাবে সেবা করা এবং নারীসত্তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

গ্রন্থটির স্থায়ী তাৎপর্য কেবল একজন সাধিকার প্রশস্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। রাবেয়ার জীবন দেখায়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার সামাজিক অবস্থান, সম্পদ কিংবা লিঙ্গপরিচয় দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং তার বিশ্বাস, আত্মসংযম, নৈতিক দৃঢ়তা ও অন্তর্গত মহত্ত্বের মধ্য দিয়েই তা প্রকাশিত হয়। পুরোনো সাধুভাষা ও আবেগঘন বর্ণনায় নির্মিত এই আখ্যান আজও পাঠককে আত্মিক প্রেম, মানবিক মর্যাদা এবং নারী-পুরুষের সমান আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।