মুখবন্ধ
ডক্টর মোহাম্মদ গোলাম রসুল বাংলাদেশের ইতিহাস একাডেমিতে পরিচিত নাম। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৎকালীন রিডার ডক্টর কামরুদ্দীনের অধীনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর থিসিসের শিরোনাম: Chisti-Nizami Sufi Order of Bengal. ডিগ্রী অর্জনের বহুদিন পর তাঁর থিসিসটি গ্রন্থাকারে দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। এই বইয়ের ষষ্ঠ অধ্যায়: Sufi Orders and Khanqahs—Their Social and Religious Role— বর্তমান রচনাটি এই অধ্যায়ের বাংলা অনুবাদ। ডক্টর রসুলের থিসিসটি বাংলায় চিশতিয়া-নিজামিয়া সিলসিলার ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য বুঝতে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
সুফিরা কীভাবে একসময় মুসলমানদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে নেতৃত্ব প্রদান করতেন তার হালহকিকত বুঝতে হলে প্রি-কলোনিয়াল সময়ে খানকার বৈশিষ্ট্য বোঝা অপরিহার্য। ডক্টর রসুলের থিসিস থেকে অনুদিত বর্তমান অধ্যায়টি প্রি-কলোনিয়াল ভারতবর্ষের খানকা ও মুসলমান সমাজের উপর তার প্রভাবকে উপস্থাপন করেছে। অনুবাদের ভাষা যথাসম্ভব সাবলীল রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। তাসাউফের সঙ্গে অতিপরিচিত পরিভাষা আক্ষরিক অনুবাদ না করে হুবহু রাখা হয়েছে। সাধারণ পাঠক তো বটেই, গবেষকদের জন্যও এই অনুবাদ গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব ও তথ্য সরবরাহ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
***
ইসলামে আধ্যাত্মিক পর্যায় বা তাসাউফের উৎপত্তি মূলত দুনিয়াবিমুখতা থেকে। এর প্রাথমিক পর্যায়ে এমন কিছু পুরুষ ও নারী ব্যক্তিত্ব দেখা যায়, যারা নিজেদের একমাত্র এবং একান্তভাবে আল্লাহর সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন। প্রাথমিক যুগের পর এমন একটি সময় আসে যখন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার পাশাপাশি ব্যবহারিক চর্চাও গুরুত্ব পায় এবং খ্যাতনামা শায়খগণ এককভাবে বা দলবদ্ধভাবে শিষ্যদের তাসাউফের শিক্ষা দিতে শুরু করেন।[1] শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর এই সম্পর্ক—যা অন্যান্য শাস্ত্রের ক্ষেত্রেও পরিচিত—সুফিদের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ রূপ লাভ করে। তা হলো শায়খ (বা পীর বা মুরশিদ) এবং শিষ্য বা মুরিদের মধ্যকার সম্পর্ক। এছাড়া খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে কোনো প্রখ্যাত সাধক তার অনুসারীদের নিয়ে বসবাস করতেন এবং অনুসারীরা তার অধীনে পড়াশোনা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতেন।
তরিকাসমূহের ভিত্তিমূল হলো গুরু ও শিষ্যের মধ্যকার পদ্ধতি ও সম্পর্ক। সুফি পথের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করেছেন এমন ব্যক্তিদের কর্তৃত্ব ও দিকনির্দেশনা মেনে নেয়া সাধারণ মুরিদদের জন্য স্বাভাবিক ছিল। প্রতিটি মানুষেরই অহংকার বিসর্জন দিয়ে আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার সহজাত সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু দিকনির্দেশনা ছাড়া এই সুপ্ত ও নিষ্ক্রিয় ক্ষমতাকে জাগিয়ে তোলা বা কার্যকর করা সম্ভব নয়। সুফি শিক্ষা ও চর্চা ধর্মীয় তরিকার মাধ্যমে পুরো মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রাথমিক যুগের মুর্শিদ বা শায়খরা শিক্ষা দেয়ার চেয়ে দিকনির্দেশনা দিতে বেশি আগ্রহী ছিলেন। তারা নবীন সাধককে এমন সব ধ্যানের উপায় বাতলে দিতেন, যার মাধ্যমে সে নিজেই আধ্যাত্মিক সত্যের অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারে। প্র্যাক্টিস বা অনুশীলনের দিক থেকে সুফিজম হলো অনুভূতি এবং উন্মোচন (কাশফ), কারণ মারিফা বা দিব্যজ্ঞান অর্জিত হয় উন্মত্ত বা আধ্যাত্মিক ভাবের (ওয়াজদ) মধ্য দিয়ে। সুফিদের বিশেষ এই বিষয়গুলো কেবল পড়ালেখার মাধ্যমে শেখা যায় না, বরং তা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা, পরমানন্দ এবং অভ্যন্তরীণ রূপান্তরের মাধ্যমেই কেবল অর্জন করা সম্ভব।[2] তরিকা এমন একটি ব্যবহারিক পদ্ধতি, যা কোনো সত্যসন্ধানীকে চিন্তা, অনুভূতি এবং কর্মের একটি নির্দিষ্ট ধারার মধ্য দিয়ে পরিচালিত করে। এটি বিভিন্ন ‘মাকাম’ (স্তর) এবং ‘আহওয়াল’ (অবস্থা)-এর ধারাবাহিকতা অতিক্রম করে ব্যক্তিকে পরম সত্য বা ‘হাকিকত’র অনুভবে পৌঁছে দেয়।[3]
ষষ্ঠ হিজরি বা দ্বাদশ শতাব্দীতে সাধারণ শৃঙ্খলা ও আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুফি-সাধকদের দিকনির্দেশনায় তরিকাগুলোর ভিত্তি স্থাপিত হয়।[4] কুরআন ও সুন্নাহর কঠোর অনুসরণের ওপর এ-সময় বিশেষ জোর দেয়া হয়। সুফি তরিকাগুলোর সাফল্যের অন্যতম একটি নির্ধারক/ফ্যাক্টর ছিল, ধর্মীয় অনুশাসন এবং সুন্নি বা মূলধারার রীতি-রেওয়াজের প্রতি তাঁদের আনুগত্য। যে তরিকাসমূহ তাসাউফের বিকাশে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- সোহরাওয়ার্দীয়া তরিকা: এর ভিত্তি জিয়াউদ্দীন আবু নজিব সোহরাওয়ার্দীর (ই. ১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দ) নামে হলেও এর প্রকৃত বিকাশ ঘটান তাঁর ভাতিজা (ভাইয়ের ছেলে) শিহাব উদ্দীন আবু হাফস উমর সোহরাওয়ার্দী (ই. ১২৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)।
- কাদরিয়া তরিকা: আবদুল কাদির আল-জিলানির (ই. ১১৬৬ খ্রিষ্টাব্দ) তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত।
- রিফাইয়া তরিকা: আহমদ ইবনে রিফাই (ই. ১১৮২ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে উদ্ভূত।
- ইয়াদাসভিয়া তরিকা: আহমদ আল-ইয়াসাভি (ই. ১১৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)।
- কুবরাভিয়া তরিকা: নাজমুদ্দিন কুবরা (ই. ১২২১ খ্রিষ্টাব্দ)।
- চিশতিয়া তরিকা: মঈন উদ্দীন চিশতি (ই. ১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দ)।
- শাদিলিয়া তরিকা: আবু মাদইয়ান শুয়াইব (ই. ১১৯৭ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে উদ্ভূত।
- বাদাভিয়া তরিকা: মিসরভিত্তিক আহমদ আল-বাদাবি (ই. ১২৭৬ খ্রিষ্টাব্দ)।
- মৌলভিয়া তরিকা: প্রধানত আনাতোলিয়াভিত্তিক মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমি (ই. ১২৭৩ খ্রিষ্টাব্দ)।
- নাজমাবন্দিয়া তরিকা: মধ্য এশিয়ার ইউসুফ আল-হামাদানির সাথে যুক্ত হলেও পরবর্তীতে এটি মুহাম্মদ বাহাউদ্দীন নাকশবন্দির (ই. ১৩৮৯ খ্রিষ্টাব্দ) সাথে বিশেষভাবে সম্পৃক্ত হয়।
সময়ের পরিক্রমায় প্রায় প্রতিটি তরিকারই শাখা বা উপ-তরিকা গড়ে ওঠে। এছাড়াও আরও দুটি তরিকার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে: একটি হলো বদিউদ্দীন শাহ মাদার (ই. ১৪৩৩)-এর নামানুসারে মাদারী তরিকা এবং অন্যটি শাহ নিয়ামতউল্লাহর (ই. ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দ) নামানুসারে নিয়ামতউল্লাহী[5] তরিকা।
এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ইসলাম-এর তথ্য অনুযায়ী, বহু শাখা-প্রশাখাসহ মোট একশো পঁচাত্তরটি প্রধান তরিকার একটি তালিকা রয়েছে।[6]
উপরোক্ত তরিকাগুলোর সাথে আরও কিছু তরিকা যুক্ত হতে পারে, যেমন— ইব্রাহিম বিন আদহামের (ই. ৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দ) নামানুসারে আদহামী; বায়েজিদ বোস্তামীর (নবম শতাব্দীর কাছাকাছি সময়) নামানুসারে বোস্তামী; সিররি সাকতির নামানুসারে সাকতিয়া; জুনায়েদ বাগদাদীর নামানুসারে জুনায়েদিয়া এবং উমর খিলওয়াতির (প্রায় ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দ) নামানুসারে খিলওয়াতিয়া।[7]
গবেষক ডোহসন (D’ohsson) উপরোক্ত তরিকাগুলোসহ মোট বত্রিশটি প্রধান তরিকার তালিকা দিয়েছেন।[8]
শায়খ আলী বিন উসমান হুজবিরি তথা দাতাগঞ্জে বখশ লাহোরী একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত তাঁর সময়কার এগারোটি তরিকার তালিকা দিয়েছেন। তরিকাগুলো হলো: (১) মুহাসিবি, (২) কাস্সারি, (৩) তাইফুরি বা বোস্তামী, (৪) জুনায়েদি, (৫) নুরি, (৬) সাহলি, (৭) হাকিমি, (৮) খরাজ্জি, (৯) খাফিফি, (১০) সাইয়্যারি, (১১) মুলুলি।[9]
খানকাহ ও বিভিন্ন আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান
সুফি স্থাপত্য বা প্রতিষ্ঠান—যেগুলোকে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো যেমন—zawiyah (যাবিয়া), khanqah (খানকাহ), tekke (তেক্কে), rabita (রাবিতা), ribat (রিবাত) এবং jam’aat khana (জামায়াতখানা)—আধ্যাত্মিক উন্নতির পাশাপাশি সামাজিক বিকাশের বড় কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। একপর্যায়ে এই প্রতিষ্ঠানগুলো মুসলিম সমাজের অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সংহতি বা সম্প্রীতিকে সহজতর করে তুলেছিল।
‘যাবিয়া’ (Zawiyah) শব্দের সঠিক অর্থ হলো কোনো ভবনের কোণ। কিছু গবেষক এর প্রাক-ইসলামিক উৎস খুঁজে পান এবং মনে করেন, শব্দটি প্রথমে কোনো খ্রিস্টান সন্ন্যাসীর প্রকোষ্ঠ এবং পরবর্তীতে ছোট মসজিদ বা ইবাদতখানার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো।[10] ইমাম গাজ্জালি বছরের পর বছর দামেস্ক মসজিদের একটি কোণায় নিজের ধ্যানের জন্য কাটিয়েছিলেন—এই ঘটনার কারণে শব্দটি দারুণ পবিত্রতা লাভ করে এবং পরবর্তীতে ‘যাবিয়াতুল গাজ্জালি’ নামটি অমর খ্যাতি অর্জন করে। ইবনে বতুতার রিহলা থেকেও আমরা জানতে পারি যে, সুফি প্রতিষ্ঠান বোঝাতেও এই শব্দটি ব্যবহার করা হতো।[11] প্রাচ্যের দেশগুলোতে—যেমন ইন্ডিয়ায়—যে-সকল ছোট জায়গায় সুফিগণ বসবাস করতেন ও ইবাদত করতেন, সেগুলোকে যাবিয়া বলা হতো। শব্দটি ‘জাওয়া’ (Zawa) মূল ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘কোনো গোপন বিষয় লুকিয়ে রাখা’ কিংবা ‘কোনো কোণায় আত্মগোপন বা নির্জনতা অবলম্বন করা’।[12]
যাবিয়া হলো দেয়াল দিয়ে ঘেরা একটি বহুমুখী স্থাপনা। ভবনের কেন্দ্রস্থলে থাকে গম্বুজযুক্ত মাজার, যেখানে তার উত্তরসূরিদের অথবা স্বয়ং শায়খের কবর থাকতে পারে। সেখানে একটি ছোট মসজিদ, একটি কুরআন শিক্ষালয় এবং মজলিসের জন্য একটি কক্ষ থাকে। একজন বা একাধিক শিক্ষক সেখানে শিশুদের কুরআন তিলাওয়াত শেখান এবং শিষ্যদের যাবিয়ার ভেতরে ফিকহ (ইসলামী আইনশাস্ত্র), হাদিস বা আধ্যাত্মিকতার মূলনীতি শিক্ষা দিতে পারেন। বর্তমান শায়খ, তাঁর বংশের অন্যান্য সদস্য, তাঁদের স্ত্রী, সন্তান, ভৃত্য এবং কিছু মুসাফিরের থাকার জন্য আরও কিছু কক্ষ থাকে। সবমিলিয়ে এটি চাষাবাদ ও পশুপালনের ব্যবস্থা সংবলিত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠান।[13]
প্রাচ্যের দেশগুলোতে যাবিয়া শব্দটি আরও সাধারণ প্রার্থনা ও দরবেশদের কুটিরের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো। মধ্য এশিয়ায় মাজারকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের সমার্থক শব্দ হলো ‘খানকাহ’ এবং উসমানীয় তুর্কি এলাকায় এগুলোকে ‘তেক্কে’ বা ‘দরগাহ’ বলা হতো। ইন্ডিয়ায় ‘জামায়াতখানা’ ও ‘দরগাহ’ শব্দ দুটিও প্রচলিত ছিল।[14]
সুফি প্রতিষ্ঠান অর্থে ‘খানকাহ’ শব্দটি ভারতীয় উপমহাদেশে অধিক জনপ্রিয়। ফারসি শব্দ ‘খান’ ও ‘গাহ’ যথাক্রমে খাবার টেবিল (দস্তরখান) এবং স্থান অর্থ প্রকাশ করে। খানকাহ ছিল এমন একটি বিশেষ ভবন যেখানে প্রতিটি আগন্তুক ও ঘনিষ্ঠ অনুসারীর জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করত। পক্ষান্তরে, জামায়াতখানা ছিল একটি বিশাল কক্ষ যেখানে সকল মুরিদ একসঙ্গে ফ্লোরে ঘুমাতেন, এবাদত করতেন এবং পড়াশোনা করতেন। চিশতি সাধকরা জামায়াতখানা নির্মাণ করতেন, আর সোহরাওয়ার্দী সাধকরা খানকাহ নির্মাণ করতেন। তবে জনপ্রিয়ভাবে উভয় শব্দই সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর বিপরীতে, যাবিয়াগুলো ছিল তুলনামূলক ছোট জায়গা, যেখানে মরমী সাধকরা একাই বসবাস ও ইবাদত করতেন; তবে খানকাহ বা জামায়াতখানার বাসিন্দাদের মতো তারা বহির্বিশ্বের সাথে কোনো যোগাযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্য রাখতেন না। ১৭ ও ১৮ শতকে ‘দায়েরা’ নামে অন্য এক ধরনের খানকার প্রচলন হয়। এই দায়েরাগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিল সাধনা/ধ্যান/মোরাকাবার জন্য নির্দিষ্ট জায়গা প্রদান করা এবং এগুলো আকারে যাবিয়ার চেয়েও ছোট হতো।[15]
‘তেক্কে’ শব্দটি আরবি শব্দ ‘ইত্তিকা’ থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়।[16] একটি তেক্কে প্রায় বিশ থেকে চল্লিশজন দরবেশকে আশ্রয় দিত, যাদের খাবার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হতো। বিবাহিতদের নিজস্ব সন্তান রাখার অধিকার ছিল, তবে সপ্তাহে এক বা দু’বার তাদের তেক্কেতে এসে ঘুমাতে হতো। এর ব্যতিক্রম ছিল মৌলভিদের খানকাহ, যেখানে কোনো বিবাহিত দরবেশকে রাত কাটানোর অনুমতি দেয়া হতো না।[17]
‘রাবাত’ (Ribat) বা ‘রাবিতা’ শব্দটি এসেছে ‘রাবাটা’ (বন্ধন বা যুক্ত করা) ধাতু থেকে। কুরআনেও এই শব্দটির ব্যবহার রয়েছে, যেমন— ‘মিন রিবাতির খাইলি’।[18] রাবাত সম্ভবত এমন একটি প্রতিষ্ঠান যার উৎপত্তি পারস্যে এবং যা মূলত সামরিক প্রকৃতির।[19]
সুফি তরিকাগুলোর ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে অধ্যাপক গিব (Gibb) এই মত পোষণ করেন যে, ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে মুসলিম বিশ্বে তাসাউফের প্রভাব ও কার্যকলাপ আধ্যাত্মিক, নৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং এমনকি রাজনৈতিকভাবেও যথেষ্ট অগ্রসর হয়েছিল।[20]
সিরিয়া, পারস্য এবং ইরাকে ‘খাওয়ানিক’ (একবচনে খানকাহ)-এর মতো কিছু রাবাত ওয়াকফ (endowments) দ্বারা সমৃদ্ধ ছিল।[21] কাররামিয়া সম্প্রদায়ের (আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে কাররামের নামানুসারে প্রবর্তিত একটি গোষ্ঠী, ই. ৮৭১ খ্রিষ্টাব্দ) খানকাহ ব্যবস্থার অনুকরণ করে সুফিদের মধ্যে এসবের প্রচলন হয়েছিল।[22] তারও আগে পারস্য উপসাগরের আবাদান দ্বীপে একটি রাবাত পাওয়া যায়, যা আব্দুল ওয়াহিদ ইবনে যায়েদ (ই. ১৭৭ হিজরি/৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) নামক এক আবেদ বা সাধকের কেন্দ্র ঘিরে গড়ে উঠেছিল এবং তাঁর ইন্তেকালের পরেও সেটি টিকে ছিল।[23] আল-মাকদিসির মতে, আর্মেনিয়ার রাজধানী দাবিলের এমন একটি প্রতিষ্ঠান ছিল যেখানে সুফিরা সাধনা করতেন।[24] বাইজেন্টাইন ও উত্তর আফ্রিকার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও এধরনের সুফি-কেন্দ্রের অস্তিত্ব ছিল। অন্যান্য কেন্দ্রগুলোর মধ্যে প্রায় ১৫০ হিজরি/৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে দামেস্কে, ৮০০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে ফিলিস্তিনের রাজধানী রামলায় একজন খ্রিস্টান আমিরের প্রতিষ্ঠিত রাবাত, একই সময়ে খোরাসানে এবং ২০০ হিজরিতে আলেকজান্দ্রিয়ায় ‘সুফিয়া’ নামে একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে।[25]
ইবনে তাইমিয়ার মতে, সুফি-সাধকদের জন্য প্রথম আবাসস্থল বসরায় নির্মিত হয়েছিল, তবে খানকাহ ও রাবাতের জনপ্রিয়তা সেলজুক আমল থেকেই শুরু হয়।[26] জামির মতে, মরমী বা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের জন্য প্রথম প্রতিষ্ঠান সিরিয়ার এক খ্রিস্টান রাজপুত্র নির্মাণ করেছিলেন। হেনরি মাসের (Henri Masse) মতে, সপ্তম শতাব্দী থেকে মরমী সাধকরা একটি সুনির্দিষ্ট স্থানে একত্রিত হতে শুরু করেন এবং ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীতে সিরিয়া ও মিশরে নারীদের জন্যও এমন জায়গা ছিল।[27] এমনকি তারও আগে, ১১৫০ থেকে ১২৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে শুধু আলেপ্পোতেই নারীদের জন্য সাতটি কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল। কায়রো এবং বাগদাদেও বেশ কিছু কেন্দ্র ছিল, যার মধ্যে ফাতিমা রাজিয়া (ই. ৫২১ হিজরি/১১২৭ খ্রিষ্টাব্দ)-এর রাবাতটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিল। মাঁসিওঁর (Massignon) মতে, সুফিদের প্রথম দলটি সপ্তম ও অষ্টম শতাব্দীতে কুফায় এবং অষ্টম শতাব্দীতে বসরায় সংগঠিত হয়। নবম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাগদাদ এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।[28]
দশম শতাব্দীর শেষ দশকে খোরাসানে কিছু কেন্দ্রের অস্তিত্ব ছিল। এ ধরনের প্রতিটি কেন্দ্র একজন শায়খ ও তাঁর মুরিদদের আনাগোনায় গড়ে উঠেছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের এই সুফি কেন্দ্রগুলোতে সমাবেশের জন্য এবং এবাদতের জন্য কক্ষ থাকা অসম্ভব ছিল না। প্রাথমিক যুগের সুফি-কেন্দ্র স্থাপনার জন্য আরেকটি নাম উল্লেখযোগ্য- তিনি পারস্যের সুফি-সাধক আবু সাঈদ বিন আবিল খায়ের (৯৬৭-১০৪৯ খ্রিষ্টাব্দ)।[29] নিশাপুরে আবু আলী দাক্কাক (ই. ১০১৬ খ্রিষ্টাব্দ)—যিনি আবু সাঈদ ও আল-কুশায়রির উস্তাদ ছিলেন—আরেকটি খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। একই শহরে আবু আলী তারসুসি (ই. ৩৬৪ হিজরি/৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দ)-এর আরেকটি খানকাহ ছিল, যা ৫৪৮ হিজরি/১১৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ঘুজ তুর্কিদের দ্বারা ধ্বংস হবার আগ পর্যন্ত টিকে ছিল।
দ্বিতীয় পর্যায়ে, সম্ভবত প্রাথমিক যুগের শায়খদের মাজারগুলো সুফি-কেন্দ্রের কাছাকাছি সংরক্ষণ করা হতো, যাতে তাঁর মুরিদ ও ভক্তরা তাদের মুর্শিদের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারেন।
মাজারের উপস্থিতির কারণে একটি সুফি-কেন্দ্র বা খানকাহ মাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে। এই খানকাহগুলো এমন সব সুফি-সাধকদের বাসস্থান ও আশ্রয় দিত যাদের নিজস্ব কোনো বাড়ি ছিল না। দ্বিতীয়ত, এটি সুফিদের একে অপরের সাথে আলাপ-আলোচনা করার এবং তাদের জীবন ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ করে দিত। তৃতীয়ত, তারা পারস্পরিক সমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ পেত।
‘আহল-ই-খানকাহ’ বা খানকাহরবাসীরা দুই ভাগে বিভক্ত ছিলেন— স্থায়ী বা মুকিম এবং ভ্রমণকারী বা মুসাফির। মুসাফিরদের জন্য একটি খানকায় একাধারে তিনদিন থাকার অনুমতি ছিল। এরচেয়ে বেশি থাকলে খানকার দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করতে হতো। খানকার বাসিন্দাদের তাদের পদমর্যাদা এবং অর্পিত দায়িত্বের প্রকৃতি অনুযায়ী তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হতো: ‘আহল-ই-খিদমত’, ‘আহল-ই-সুবত’ এবং ‘আহল-ই-খলওয়াত’।[30]
মালিক শাহের বিখ্যাত উজির নিজামুল মুলক পুণ্যবান ও দরিদ্রদের জন্য আবাসস্থল নির্মাণ এবং ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন।[31] সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর আমলেও খানকাহ প্রতিষ্ঠিত ও বসবাসকারীদের জন্য অনুদান বরাদ্দ হয়েছিল। মামলুক আমলেও এই ধারা অব্যাহত থাকে।[32]
বুখারা, আনাতোলিয়া, ইরান, তুরস্ক, ভারত এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও খানকাহ বিদ্যমান ছিল। সামা (আধ্যাত্মিক সঙ্গীতের মজলিস) এবং রোজা রাখা ছিল চিশতি খানকাগুলোর—যেগুলোকে ‘জামায়াতখানা’ বলা হতো—বিশেষ বৈশিষ্ট্য, যা সেগুলোকে সোহরাওয়ার্দী খানকাগুলো থেকে স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, সোহরাওয়ার্দীদের বিপরীতে চিশতিরা শায়খরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন এবং রাজকীয় অনুদান বা হাদিয়া গ্রহণ করতে অস্বীকার করতেন।[33] তারা ‘ফুতুহ’ (অনিয়মিত ও অনিশ্চিত উৎস থেকে আগত হাদিয়া বা দান) এর ওপর নির্ভর করতেন। তৃতীয়ত, সোহরাওয়ার্দী খানকালোতে নিয়মিত বসবাসকারী ও দর্শনার্থী উভয়ের জন্যই সুসজ্জিত এবং পৃথক বাসস্থানের ব্যবস্থা থাকত, অথচ চিশতি খানকাগুলো মূলত ‘জামায়াতখানা’ নামক একটি বড় হলের সমন্বয়ে গঠিত ছিল, যেখানে কোনো ধরনের বিলাসিতার সুযোগ ছিল না। সোহরাওয়ার্দীদের বিপরীতে চিশতিরা তাদের লঙ্গরখানা (রান্নাঘর) সর্বদা উন্মুক্ত রাখতেন, যাতে দরিদ্র ও ভিক্ষুকদের খাবার পরিবেশন করা যায়।[34] তাছাড়া, চিশতি খানকাগুলো আধ্যাত্মিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। খানকাগুলো বিশেষ অর্থে মুসলিম সমাজের ফোকাল পয়েন্ট বা কেন্দ্রবিন্দুর ভূমিকায় ছিল।
সুফিগণ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত ছিলেন: একদল খানকার সাথে জড়িত এবং অন্যদল মুসাফির।[35] খাজা নিজাম উদ্দীনের জামায়াতখানা দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে তাসাউফের কেন্দ্র এবং স্বীকৃত অ্যাকাডেমি হিসেবে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল।[36]
খানকাগুলোতে সুফি, সাধারণ মানুষ এবং এমনকি অমুসলিমরাও যাতায়াত করত। বিশেষ করে চিশতি জামায়াতখানা এবং সাত্তারিসহ কিছু খানকাহে অমুসলিমদের অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল। খানকার বাসিন্দারা অত্যন্ত সরল ও সংযত জীবনযাপন করতেন। খানকার প্রধান বা শায়খ যেভাবে খোদাভীতি ও জীবন পরিচালনা করতেন, অন্যরা তা অনুসরণ করতেন। তবে শায়খ সৈয়দ গেসুদারাজ (ই. ১৪২২ খ্রিষ্টাব্দ) এবং পরবর্তী চিশতি শায়খরা এই আদর্শ কঠোরভাবে মেনে চলেননি।
সোহরাওয়ার্দীরা খানকার বাসিন্দাদের সুযোগ-সুবিধা দিত এবং তাদের আবাসনও ছিল প্রশস্ত। মুলতানের শায়খ বাহাউদ্দীন সোহরাওয়ার্দী সচ্ছল জীবনযাপন করতেন। সোহরাওয়ার্দী খানকাহে পরিবেশিত খাবার ছিল বেশ সুস্বাদু। বলা হয়ে থাকে যে, শায়খ বাহাউদ্দীন সাত লক্ষ টাকা জমা করেছিলেন যা তিনি তার সাত পুত্রের জন্য রেখে গেছেন।[37] চিশতি আদর্শ ছিল এর ঠিক বিপরীত। (মুলতানের) সোহরাওয়ার্দী খানকাগুলো চিশতিদের থেকে একেবারে ভিন্ন একটি মডেলে সংগঠিত হয়েছিল। এই পার্থক্যের মূল কারণ ছিল, সোহরাওয়ার্দীগণ রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন না। ইন্ডিয়ায় সোহরাওয়ার্দী সিলসিলার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা শায়খ বাহাউদ্দীন জাকারিয়া সুলতানদের সাথে অবাধে মিশতেন, রাজনৈতিক বিষয়ে অংশ নিতেন, সম্পদ জমা করতেন এবং সরকারের সম্মাননা গ্রহণ করতেন। যে-কারণে তাঁর খানকাগুলোতে প্রচুর ফুতুহ (দাতব্য অনুদান) আসত।[38]
চিশতি সাধকদের প্রথার বিপরীতে, এই অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে অভাবী ও গরিবদের মধ্যে বিতরণ করা হতো না। তিনি সোনার মুদ্রায় ভরা বাক্স সমেত একটি রাজকোষ বা ‘খাজানা’-তে তার সম্পদ জমা করে রাখতেন। একবার ৫০০০ স্বর্ণমুদ্রার একটি বাক্স নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেই ক্ষতিকে তিনি খুব একটা আমলে নেননি।[39]
সোহরাওয়ার্দী খানকার শস্যাগারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে শস্যের মজুদ থাকত ও কোষাগারগুলো সোনা ও রূপার মুদ্রায় ভরপুর থাকত।[40] চিশতি জামায়াতখানায় এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। চিশতিরা অনিশ্চিত ও অনিয়মিত ফুতুহের আয়ের ওপর নির্ভর করতেন; আর সোহরাওয়ার্দী খানকাগুলো সুলতান প্রদত্ত জায়গিরের আয়ের ওপর নির্ভরশীল থাকত। তাছাড়া, সোহরাওয়ার্দী খানকাগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। শায়খ বাহাউদ্দীন প্রায়ই বলতেন, “মানুষ দুই প্রকার—সাধারণ জনতা এবং অভিজাত বা বিশিষ্ট শ্রেণি। সাধারণ জনতার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই এবং তাদের ওপর কোনো ভরসা করা যায় না। তবে বিশিষ্টজনদের ক্ষেত্রে, তারা তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী আমার কাছ থেকে আধ্যাত্মিক আশীর্বাদ ও কল্যাণ লাভ করে।”[41] সাক্ষাতের জন্য তার নির্দিষ্ট সময় নির্ধারিত ছিল।[42] দর্শনার্থীরা যাতে অসময়ে এসে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে তিনি কঠোর ছিলেন। চিশতি আদর্শ এর সম্পূর্ণ বিপরীত। চিশতি খানকার দরজা গরিব ও অভাবীদের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত থাকত এবং সেখানে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করা হতো না।
খানকাগুলো কেবল পথপ্রদর্শনের কেন্দ্র ছিল না, বরং এগুলো ছিল শৃঙ্খলার অধীনে একত্রে জীবনযাপন করতে প্রস্তুত এমন মানুষের একটি সংঘ। কায়রোতে সুলতান বাইবার্সের খানকাহ এবং মাজারে (অষ্টম/চতুর্দশ শতাব্দীতে নির্মিত) ৪০০ সুফির বসবাসের ব্যবস্থা ছিল, আর সিরিয়াকুসের খানকাহে স্বতন্ত্র সুফিদের জন্য ১০০টি ঘর ছিল।[43]
১৩২৬ খ্রিষ্টাব্দে কায়রোর খানকাহ সম্পর্কে ইবনে বতুতা লিখেছেন যে, প্রতিটি খানকাতে একজন শায়খ এবং একজন সুপারিনটেনডেন্ট বা তত্ত্বাবধায়ক (হারিস) থাকেন যিনি তাদের কার্যক্রম অত্যন্ত চমৎকারভাবে পরিচালনা করেন। এখানকার পুরুষরা ব্রহ্মচারী হন, আর বিবাহিতদের জন্য আলাদা খানকাহ থাকে। তাদের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে উপস্থিতি, খানকাতে রাত কাটানো এবং হলে (কুব্বা) আয়োজিত জিকিরের মজলিসে অংশ নেয়া। প্রত্যেকের নিজস্ব জায়নামাজ থাকাটা সেখানে একটি সাধারণ নিয়ম ছিল।[44]
কখনো কখনো কিছু খানকাহ ফিকহের চারটি মাযহাব, হাদিস এবং কুরআনের সাতটি কেরাতের ওপর কোর্স অফার করত। এই নির্দিষ্ট খানকাটিকে অনেকটা মাদ্রাসার মতো মনে হলেও এটি ছিল অস্বাভাবিক, এবং স্বাভাবিকভাবেই সুফি ভাবটাই ছিল প্রধান।[45]
ছোট-বড় নির্বিশেষে সাধকদের মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘খানকাহ’ বা মাজারকেন্দ্রিক খানকাগুলো মুসাফির এবং সুফি উভয়ের প্রতিই ছিল অতিথিপরায়ণ। শীতকালে একসাথে বসবাস করাটা ছিল একটি রেওয়াজ, আর বসন্তের আগমন ঘটার সাথে সাথেই দরবেশরা আবার তাদের যাত্রায় বেরিয়ে পড়তেন। ইবনে বতুতা বোস্তামের আবু ইয়াযিদ আল-বোস্তামীর মাজারসংলগ্ন খানকাতে অবস্থান করেছিলেন এবং সেখানে তিনি আবুল হাসান আল-খারাকানির মাজারও পরিদর্শন করেছিলেন।[46] তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ১৮৮০-র দশকে ৫২টি নকশবন্দিয়া খানকাহ ছিল, যেগুলোকে ‘তেক্কে’ বলা হতো।[47]
বলকান এবং এশিয়া মাইনরে বেকতাশি তরিকার প্রাধান্য রয়েছে। হাজি বেকতাশের বংশধর বলে দাবি করা একজন চেলেবিকে কিছু বেকতাশি এই তরিকার প্রধান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং তিনি সারা দেশের কিজিলবাশ উপজাতিদের বিশেষভাবে স্বীকৃত নেতা ছিলেন। কিজিলবাশ গ্রামগুলোতে নির্দেশনা দেওয়া এবং অনুদান সংগ্রহের জন্য চেলেবির পক্ষ থেকে নিয়মিত বিরতিতে একজন প্রতিনিধি পাঠানো হতো। বলা হয় যে, একসময়ে তেক্কেটির অধীনে ৩৬২টি গ্রাম ছিল এবং এর বার্ষিক রাজস্ব ৬০,০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড পর্যন্ত পৌঁছেছিল। এই আয় দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান—দেদে এবং চেলেবির মধ্যে ভাগ করা হতো। খরচের অতিরিক্ত উদ্বৃত্ত অর্থ হাজি বেকতাশ গ্রামের প্রতিটি তেক্কেতে জমা হতো। এই অর্থ সাধারণ তহবিলে চলে যেত যেখান থেকে যেসব তেক্কেতে ঘাটতি থাকত তাদের প্রয়োজনের জন্য তহবিল বরাদ্দ করা হতো। তুরস্কে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বেকতাশি তরিকা আলবেনিয়াতে এখনও বেশ শক্তিশালী। দেশটির সরকার কর্তৃক স্বীকৃত অন্যতম প্রধান তরিকা হিসেবে প্রায় ১৫০,০০০ থেকে ২০০,০০০ অনুসারী নিয়ে বেকতাশি তরিকা সরকারের অনুমোদিত মুদ্রিত বিধিমালা অনুসারে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।[48]
সুফি প্রতিষ্ঠানগুলো—তা খানকাহ হোক, তুর্কি তেক্কে হোক কিংবা মাগরিবী যাবিয়াই হোক—অবারিত দ্বার উন্মুক্ত রাখা, দরিদ্র ও মুসাফিরদের স্বাগত জানানোর পাশাপাশি আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা প্রদান করত এবং অলৌকিক জগতের সাথে ব্যক্তির সংযোগ স্থাপন করত।[49] এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখতেন। এগুলো ছিল পারস্পরিক সহায়তার একেকটি সংগঠন, এবং একজন সম্মানিত শায়খ জনগণের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরতে পারতেন এবং যে-কোনো ধরনের অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানাতে পারতেন। তারা গরিবদের সহায়তা করতেন এবং অসুস্থ ও ভ্রমণকারীদের সেবা করতেন।
স্পষ্টতই, একজন সুফি নেতার—অর্থাৎ শায়খের—নেতৃত্বে খানকাহ পরিচালিত হওয়া উচিত। পদমর্যাদার শীর্ষে থাকা শায়খ যে-ই হোন না কেন, তাঁর বিশেষ কিছু গুণ ও ক্ষমতা থাকত, যা তাঁর উত্তরসূরি বা আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারীর কাছে হস্তান্তরিত হতো যদি সেই উত্তরাধিকারী তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষকের শেখানো গুণ ও ধর্মীয় বিষয়াদি পালনের মাধ্যমে নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করতে পারতেন। আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী বা উত্তরসূরিকে ফারসি ভাষায় ‘সাজ্জাদীনশীন’ বলা হয়। আধ্যাত্মিক পদমর্যাদার সর্বোচ্চ স্তর ছিল ‘গাউস’। গাউসের পরেই যার অবস্থান তাকে বলা হয় ‘কুতুব’। তাঁর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ছিল অপরিহার্য, যার একটি চমৎকার উদাহরণ স্থাপন করেছিলেন শায়খ বদর উদ্দীন ইসহাক। যখন তাঁর উস্তাদ বাবা ফরিদ শাকরগঞ্জ তাঁকে নামাজের মাঝেই ডেকেছিলেন, তখন তিনি নামাজ ভেঙে জবাব দিয়েছিলেন, “আমি উপস্থিত আছি।”[50]
শায়খের সাথে বসবাসকারী খলিফা ছিলেন শায়খের প্রতিনিধি বা ডান হাত এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে তিনিই ছিলেন শায়খ। সোহরাওয়ার্দীয়া-সংক্রান্ত সুদূরপ্রসারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শহর, জেলা বা আঞ্চলিক পর্যায়ে অন্যান্য খলিফারাও থাকতে পারতেন। খানকার স্থায়ী সদস্যরা হলেন শায়খ এবং তাঁর সহকারীগণ, এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির অধীনস্থ নেতৃবৃন্দ—যাদের মধ্যে বণিক, সরকারি কর্মকর্তা, পণ্ডিত প্রমুখ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।[51] শায়খের সেবা করা থেকে শুরু করে খানকার যাবতীয় বিষয়াদি পরিচালনার জন্য ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা পর্যন্ত বিভিন্ন নির্দিষ্ট দায়িত্ব তাদের ওপর অর্পণ করা হতো।
শায়খের অধস্তন ছিলেন ‘মুকাদ্দাম’গণ, যারা তাঁর আদেশে কাজ করতেন এবং নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পালন করতেন। তারা তরিকার প্রধানের আস্থাভাজন ছিলেন। মুকাদ্দামের সহকারী ছিলেন ‘উকিল’, যিনি যাবিয়ার সম্পত্তি ও তহবিলের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতেন।[52]
বছরে একবার বা দু’বার মুকাদ্দামরা সম্মেলনে মিলিত হতেন এবং তরিকার কল্যাণসংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা করতেন। এই সভাকে ‘হজরত’ বলা হতো, যার অর্থ উপস্থিতি। নিজ বাড়িতে ফেরার পর প্রতিটি মুকাদ্দাম তাঁর যাবিয়ার ভাইদের নিয়ে একটি সিনোড বা পরিষদ আহ্বান করতেন। এই সিনোডকে বলা হয় ‘জালাল’ বা মহিমান্বিত।
‘আওতাদ’ (ওয়াদ বা মেরুদণ্ড/স্তম্ভের বহুবচন) হলো চারজন সাধককে দেওয়া নাম। এরপর আসে ‘খাইয়ার’, যা ‘খাইর’ (মঙ্গল) শব্দ থেকে উদ্ভূত যা একজন উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে নির্দেশ করে। এরা সংখ্যায় সাতজন। আরেকটি শ্রেণী গঠিত হয় ‘আবদাল’ নিয়ে। এরা সংখ্যায় সত্তরজন, যাদের মধ্যে চল্লিশজন সিরিয়ায় এবং ত্রিশজন অন্যত্র বসবাস করেন। যখন একজনের মৃত্যু হয়, আল্লাহ তাঁর স্থলাভিষিক্ত বা উত্তরসূরি নিয়োগ করেন। এরপর আসেন ‘নাজিব’, যিনি মুকাদ্দামের সহকারী, এবং প্রধান ওয়ালি বা সাধক ‘নাকিবরা’ সকলের কাছেই অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। পবিত্র কুরআনে সুফি-সাধকদের এমন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছে যাদের কোনো ভয় ও উদ্বেগ নেই (১০: ৬২)।
বেকতাশীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, একজন মানুষকে দু’বার জন্মগ্রহণ করতে হয়। তাকে প্রথমে তার মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিতে হবে, এবং পরবর্তীতে তার মুরশিদের কাছ থেকেও জন্ম নিতে হবে। মায়ের কাছ থেকে যা জন্ম নেয় তা হলো কেবল মাংস; বাস্তব কোনো কিছুর নিছক একটি অনুলিপি মাত্র। মুরশিদের প্রভাবের মাধ্যমেই কেবল একজন বাস্তবতার জগতে জন্মলাভ করে। মায়ের কাছ থেকে যা জন্ম নেয় তা হলো ‘অন্ধকারের আলো’ বা জুলমাতুন নুর; আর আধ্যাত্মিক নেতার কাছ থেকে যা জন্ম নেয় তা হলো ‘সঠিক পথের আলো’ বা নুর-ই হেদায়াত।[53]
যিনি আধ্যাত্মিক নেতার সান্নিধ্য লাভ করেছেন তিনি সেই আলোতে পরিণত হয়েছেন এবং যিনি মুরশিদের সান্নিধ্য পাননি তিনি আল্লাহকে জানতে পারবেন না। আপনার যদি একজন মুরশিদ থাকে তবে আপনি একজন প্রকৃত মানুষ হতে পারবেন, আর যদি আপনার কোনো মুরশিদ না থাকে তবে আপনি সাধারণ প্রাণী হিসেবেই থেকে যাবেন।
অধ্যাপক গিবের ভাষায়, “সুফিজম ক্রমবর্ধমানভাবে সমাজের সৃজনশীল, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তিগুলোকে আকৃষ্ট করেছিল এবং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বাহক বা হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।”[54] হিন্দু সমাজে প্রচলিত কঠোর জাতিভেদ প্রথার কারণে সমাজ এমন এক সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল যা তাকে সংকটের দিনে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন পরিস্থিতি ও চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করার গতিশীল শক্তি থেকে বঞ্চিত করেছিল। সুফি সাধকদের অনাড়ম্বর জীবনযাপন, তাদের মানবীয় সহানুভূতি এবং খানকার বৈষম্যমুক্ত পরিবেশ ভারতীয় সমাজের এই নিপীড়িত অংশগুলোকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করেছিল। এখানে তারা তাদের নিজস্ব সমাজ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামাজিক ব্যবস্থার সন্ধান পায়। সবাই একত্রে বসবাস করত, একসাথে ঘুমাত এবং খাবার খেত। পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআন সবার জন্য উন্মুক্ত ও সহজলভ্য ছিল। এভাবেই সামাজিক জীবনে তাওহীদের ধারণাকে একটি কর্মক্ষম নীতি হিসেবে প্রদর্শন করে মধ্যযুগীয় খানকাগুলো মুসলিম সংস্কৃতির অগ্রদূত হয়ে উঠেছিল।
ভারতীয় সমাজে সুফি-সাধকদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অবদান উল্লেখযোগ্য। মধ্যযুগীয় সমাজের নৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় খানকাগুলো একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী কাউন্টার ব্যালেন্স হিসেবে কাজ করেছিল, যা সংস্কৃতি প্রসারের একটি অবশ্যম্ভাবী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে উদ্ভূত নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক অপরাধ দ্বারা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়েছিল।[55] অন্য কথায়, মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন বিকাশ এবং তাদের ধর্মীয় ও নৈতিক জীবন উন্নত করার ক্ষেত্রে খানকাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। সর্বোপরি, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তাসাউফ শিক্ষার সারমর্ম ছিল, আল্লাহর একত্ব এবং মানবজাতির ভ্রাতৃত্ব। ধর্মীয় ও নৈতিকতার মতো সামাজিক ক্ষেত্রেও খানকার ভূমিকা কম দৃশ্যমান ছিল না।
খানকাহ, জামায়াতখানা, তেক্কে এবং এজাতীয় অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ধর্মীয় কার্যক্রমের আরও কিছু কেন্দ্র ছিল, যেমন— মসজিদ, মাদ্রাসা এবং মাকবারা। শায়খ হামিদউদ্দীন নাগৌরীর মতে, খানকাহ, মসজিদ বা হুজরা নির্মাণের উদ্দেশ্য হলো মানুষের অভ্যন্তরীণ জীবনকে সুশৃঙ্খল করা। এটি নিঃসন্দেহে সত্য, তবে এই স্থানগুলোর একটি সামাজিক তাৎপর্যও ছিল এবং মুসলমানদের সামাজিক জীবনে এগুলো কেন্দ্রীয় স্থান দখল করেছিল।
মসজিদগুলো কেবল জামাতে নামাজ আদায়ের জন্যই ব্যবহৃত হতো না; সেখানে তযকিরা (ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা) অনুষ্ঠিত হতো। এছাড়া ‘সিয়াম’ (ইন্তেকালের তৃতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় বলে এই নামকরণ) অনুষ্ঠান—যা কুরআন তিলাওয়াত এবং মাগফিরাতের জন্য দোয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়—সাধারণত মসজিদেই অনুষ্ঠিত হতো। বিভিন্ন ক্যাটাগরি ও মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
একটি মসজিদের চরিত্র নির্ধারিত হতো সেটি যে এলাকায় অবস্থিত তার ওপর ভিত্তি করে। রাজধানী শহরের প্রধান মসজিদটি সাধারণত শিক্ষার একটি বড় কেন্দ্র ছিল। কসবা ও গ্রামের মসজিদগুলো এর আশেপাশে বসবাসকারী মুসলিম জনগণের ধর্মীয় চাহিদা মোতাবেক সেবা দিত। গ্রামের মসজিদের সাথে যুক্ত মাদ্রাসাগুলো কেবল শিশুদের কুরআন শিক্ষাদানের মধ্যেই এর কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখত। জনমানবহীন বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত মসজিদগুলো কখনো কখনো সুফি-সাধকরা তাদের কিছু আধ্যাত্মিক ও তরিকার অজিফা পালনের জন্য ব্যবহার করতেন।[56] যেহেতু মসজিদে অবস্থানের ক্ষেত্রে কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না, তাই মাথা গোঁজার ঠাঁইহীন যে কেউ সেখানে আশ্রয় খুঁজে পেত।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মাদ্রাসাগুলোতে সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের পরিবেশ বিরাজ করত, তবে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পরিচালিত হতো। সম্ভবত এই শায়খরা তাদের ছাত্রদের কাছ থেকে কোনো নিয়মিত ফি নিতেন না এবং বিক্ষিপ্ত ফুতুহের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করতেন। মাদ্রাসাগুলো কুরআন, হাদিস, তাফসির ইত্যাদি সহ বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনার জন্য নিবেদিত ছিল।
মাজারভিত্তিক কেন্দ্রগুলোও বেশ সক্রিয় ছিল। পাশাপাশি, কিছু কবরস্থান সুফি-সাধকরা তাদের আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য বেছে নিতেন যার জন্য একটি নির্জন কোণ প্রয়োজন হতো। কবরস্থানের নির্জন পরিবেশ তাদের মেজাজের সাথে খাপ খেয়ে যেত এবং তারা সেখানে সময় কাটাতে পছন্দ করতেন। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে যে, খাজা মঈন উদ্দীন চিশতি ইরান থেকে ইন্ডিয়ায় আসার পথে লাহোরে যাত্রাবিরতি করেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় মশগুল হয়ে একটি মাকবারায় (হযরত দাতাগঞ্জ বখশ লাহোরীর মাজারে) ৪০ দিন (যাকে চিল্লা বলা হয়) অবস্থান করেছিলেন। আবার কিছু মাজারের সাথে স্মারক মসজিদও যুক্ত ছিল।
ইতোমধ্যেই যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, খানকাগুলো ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। খানকাগুলোতে নিঃসন্দেহে কিতাব বা গ্রন্থ পড়ানো হতো তবে সেগুলো হয় তাফসির অথবা তাসাউফের।
এখানে জটিল বুদ্ধিবৃত্তিক কূটতর্কের মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রগতির চেয়ে ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে অভ্যন্তরীণ জীবনের শৃঙ্খলা এবং মানসিক ধর্মীয়-আবেগ, ইশকের সংহতির ওপর বেশি জোর দেয়া হতো।
তবে তরিকাগুলোর প্রতি, তাদের শায়খদের প্রতি, এবং তাদের বিশ্বাস ও অনুশীলনের প্রতি বিরোধিতা ছিল ধারাবাহিক ও জোরালো। সমাজের আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন ধর্মীয় কর্তৃত্বের কেন্দ্রের অস্তিত্বকে কখনোই মেনে নেয়নি, যত ধরনের সমঝোতাই করা হোক না কেন। হাম্বলী মাযহাবের এই শত্রুতার ইতিহাস এই মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতার আমল থেকেই আল-মুহাসিবি, সিররি সাকতি এবং তাদের অনুসারীদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে চলে আসছে। হাম্বলী পন্ডিত ইবনুল জাওযী (ই. ৫৯৭ হিজরি/১২০০ খ্রিষ্টাব্দ) তাঁর ‘তালবিস ইবলিস’ বইটির প্রায় অর্ধেকটাই সুফিদের বিরুদ্ধে উৎসর্গ করেছেন, যেখানে শরিয়তের বিধান থেকে সুফিদের কথিত বিচ্যুতির নিন্দা জানানো হয়েছে।[57] সিরীয়ার শায়খ ইবনে তাইমিয়া (ই. ৭২৮ হিজরি/১৩২৮ খ্রিষ্টাব্দ) সংগীত ও নৃত্যের মাধ্যমে পরমানন্দ বা আধ্যাত্মিক ভাব অর্জনের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট সুফিদের এবং মাজারে মানত বা উপহার নিয়ে সাধারণ মানুষের যাতায়াতের মতো বিষয়গুলোকে শরিয়তের পরিপন্থী বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন। তবে এই ব্যক্তিরা সরাসরি সুফিজমকে অস্বীকার করার পর্যায়ে যাননি, বরং তারা যেগুলোকে বেআইনি বা শরিয়তবহির্ভূত মনে করতেন সেগুলোর নিন্দা জানিয়েছেন।