শেখ ফরীদের চশমা

ভূমিকা

চট্টগ্রামে আধ্যাত্মিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ও বহুল পরিচিত এক কিংবদন্তি— শেখ ফরিদের চশমা। চট্টগ্রামের বর্তমান প্রজন্মের নিকট কতটুকু পরিচিত তা তর্কসাপেক্ষ হলেও, গত শতাব্দীতেও সকলের কাছেই ছিল অতিপরিচিত এক নাম। চট্টগ্রামের ষোলশহরে অবস্থিত উক্ত জায়গায় বর্তমানে একটি নান্দনিক সৌন্দর্যের মসজিদ আছে। একসময় এই জায়গায় ছিল পাহাড়। পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পড়া ঝর্ণা নিয়েই শেখ ফরিদের চশমার কিংবদন্তি। এই কিংবদন্তির সত্যাসত্য যাচাই করতে বর্তমান নিবন্ধ রচনা করেছেন ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক। সমাজ ও সংস্কৃতির ভারসাম্য রক্ষায় ঐতিহ্যের লালন-পালন গুরুত্বপূর্ণ, সাথে সাথে ঐতিহ্যের ইতিহাস জানা ও সত্যাসত্য যাচাই করাও একান্ত কর্তব্য।
১৯৯৫ সালে বাংলা একাডেমি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী (চতুর্থ খণ্ড) থেকে রচনাটি সংগৃহীত। এনামুল হকের লেখার সঙ্গে যারা পরিচিত তারা নিশ্চয়ই জানেন, ব্যাকরণ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাঁর নিজস্ব লেখ্যরীতি ও প্রতিবর্ণায়নকেই তিনি স্বরচনায় প্রাধান্য দিতেন। এ লেখায় তার উপস্থিতি ভালোভাবেই টের পাওয়া যাবে। যেমন: প্রচলিত ‘তাজকিরাতুল আউলিয়া’ কিতাবকে তিনি লিখেছেন ‘তধ্‌কিরহ্-ই-ঔলিয়া’। এখানে তাঁর লেখ্যরীতি ও প্রতিবর্ণায়নকে পরিবর্তন করা হয়নি; যেভাবে রচনাবলীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সেভাবেই রাখা হয়েছে।

***

চট্টগ্রাম সদর হইতে কিঞ্চিন্যূন এক মাইল উত্তরে একটি আঁকাবাঁকা পার্বত্য পথের ধারে কোনো নাত্যুচ্চ পাহাড়ের সানুদেশে স্বনামখ্যাত “শেখ ফরীদের চশ্‌মা” বিদ্যমান রহিয়াছে। ইহা একটি স্বচ্ছতোয়া শীতল সলিলা নির্ঝরিণী। এই নির্ঝরিণীর স্বতঃউৎসারিত জলরাশি, চট্টগ্রাম এবং তৎপার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলার হিন্দু-মুসলমানের নিকট পবিত্র বলিয়া গণ্য হয় এবং সম্ভবতঃ সেই সূত্র ধরিয়াই কোনো রোগমুক্তি ও কামনাসিদ্ধির ঔষধ ও উপায়রূপে ব্যবহৃত হইতে দেখা যায়। এই জল মৃন্ময় পাত্র পূর্ণিত হইয়া চট্টগ্রামের নানাস্থানে এবং তৎপার্শ্ববর্তী জেলায় চালান হইতেও দেখিয়াছি। নির্ঝরিণীটিকে বর্তমানে পাকা করিয়া দিয়া সর্বসাধারণের জন্য জল সরবরাহ করিবার পক্ষে সুবিধা করিয়া দেওয়া হইয়াছে।

বাল্যকাল হইতেই শুনিয়া আসিতেছি, চট্টগ্রামের পবিত্র দ্রষ্টব্য স্থানগুলির মধ্যে “শেখ ফরীদের চশমা”ও অন্যতম। ইহার পবিত্রতা অর্জন সম্বন্ধে আশৈশব অনেকের মুখেই অনেক কথা শুনিয়াছি; শুনিয়া চিন্তা করিয়া দেখিয়াছি, একই গল্পের নানা রং নানাভাবে নানা মুখে প্রকাশ পাইয়াছে মাত্র। যে গল্পটি এত মুখে শুনিয়াছি, তাহার ঐতিহাসিকতাটুকুকেই বাদ দিয়া শুধু পুণ্যস্মৃতির ব্যাখ্যাটুকুই আমার কানে আসিয়াছিল। আমার অনুসন্ধানী মন এই ব্যাখ্যাটুকুর মধ্যে যে তত্ত্বের সন্ধান করিয়াছে, তাহার প্রকৃত খবর দিবার মত কোনো চট্টলবাসীর সহিত এ পর্যন্ত আমার আলাপ হইবার সুযোগ ঘটে নাই। তাই বাধ্য হইয়াই আজ নিজের পথ নিজেই খুঁজিয়া লইলাম।

এই অনুসন্ধানের পূর্ব পর্যন্ত স্বতঃই আমার মনে এই নির্ঝরিণী সম্বন্ধে একটি প্রশ্ন জাগরিত হইত—“কিরূপে ‘শেখ ফরীদের’ নাম এই পার্বত্য নির্ঝরিণীর সহিত সংযুক্ত হইল? এবং এই শেখ ফরীদই বা কে?” পর্বতের সানুদেশে স্বাভাবিক কারণে যে নির্ঝরিণীটির উৎপত্তি হইয়াছিল, সে বিষয়ে আমার কোনই সন্দেহ নাই। যতই না কেন অলৌকিকত্বের আরোপ করা হউক পার্বত্য নির্ঝরিণীকে ভিন্ন চক্ষে দেখিবার কোনো কারণ নাই। তবে, এই ফোয়ারাটির সহিত ‘শেখ ফরীদের’ নাম জুড়িয়া যাওয়ার পক্ষে কি কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ নাই? চট্টগ্রাম সদরের বুকের উপর এবং আশেপাশে অনেকগুলি স্বাভাবিক উৎস-ধারা অদ্যাপি বর্তমান রহিয়াছে। এই ঝর্ণাগুলিকে চট্টলবাসীরা শুধু দৈনন্দিন জীবনের সাথী করিয়া লইয়াছে মাত্র, পবিত্রতা বা অলৌকিকভাবে জন্মলাভ কাহিনীর আরোপে ইহাদের কোনোটিও মহিময় হইয়া উঠে নাই। তাই, অরণ্য পরিবেষ্টিত আলোচ্য উৎসটির মাহাত্ম্যের তথ্য উদঘাটন করিতে চেষ্টা করা আবশ্যক বলিয়া মনে করি।

“শেখ ফরীদের চশ্‌মা”র মাহাত্ম্য-তথ্য উদ্ধার করিতে হইলে আমরা বাল্যকাল হইতে এই নির্ঝরিণী সম্বন্ধে যে উপাখ্যানটি শুনিয়া আসিতেছি, তাহাকে লিপিবদ্ধ করিয়া বৈজ্ঞানিক উপায়ে নানাভাবে ব্যবচ্ছেদ করিয়া দেখিতে হইবে, ইহার মধ্যে কোনো সত্য গুপ্তভাবে নিহিত রহিয়াছে কিনা। যদি থাকে, তাহাকে নিষ্কাসিত করিয়া ইতিহাসের কষ্টিপাথরে ঘষিয়া যাচাই করিয়া লওয়া আবশ্যক। তাই, সর্বপ্রথমে এই উপাখ্যানটি লিপিবদ্ধ করিলাম।

“শেখ ফরীদ একজন মস্ত বড় দরবেশ ছিলেন। অতি শৈশবেই পিতৃহীন হইয়া পুণ্যশীলা মাতার যত্নেই তিনি প্রতিপালিত হইতেছিলেন এবং তাঁহারই চেষ্টায় শিক্ষালাভ করিতে থাকেন। দ্বাদশ বৎসর পর্যন্ত বিদ্যাভ্যাস করিয়া ফরীদ নানা শাস্ত্রে পারদর্শী হইয়া উঠিলে একদা তাঁহার পুণ্যবতী জননী পুত্রকে বলিলেন, বাবা, ব্যবহারিক শাস্ত্রে মহাজ্ঞানী হইয়াছ বটে, এ পর্যন্ত পরমার্থ জ্ঞান দেখিলে না; পরকালে তোমার কি গতি হইবে? এই কথা শুনিয়া আবার শেখ ফরীদের মনে ভাবান্তর উপস্থিত হইল। তিনি ক্রমেই পরমার্থ জ্ঞান শিক্ষার প্রতি আকৃষ্ট হইতে লাগিলেন। অতঃপর একদা ফরীদ মাতার অনুমতিক্রমে পরমার্থ-জ্ঞান লাভ করিবার জন্য বনে চলিয়া গেলেন এবং দ্বাদশ বৎসর তথায় সাধনা করিবার পর গৃহে ফিরিয়া মাতাকে দ্বার খুলিয়া দিতে অনুরোধ করেন। মাতা দ্বার খুলিয়া পুত্রকে দেখামাত্র তিরস্কার করিতে করিতে বলিলেন, লক্ষ্মীছাড়া, এখনও তোমাকে দ্বার খুলিয়াই ঘরে আনিতে হয়; তুমি আমার পুত্র নও; এখনও তোমার কামেলিয়ৎ (সিদ্ধত্ব) লাভ হয় নাই; ভাল চাও ত গৃহে ফিরিও না। মাতার নিকট হইতে এহেন কঠোর তিরস্কার লাভ করিয়া ফরীদ আর গৃহে ফিরিলেন না; তিনি আবার বনে চলিয়া গেলেন এবং আরও দ্বাদশ বৎসর সাধনা করিয়া গৃহে ফিরিলেন। এইবারও দ্বার স্বতঃই উন্মুক্ত হইল না। তিনি মাতার নিকট হইতে পূর্ববৎ কঠোর তিরস্কার লাভ করিলেন। তাঁহার দুঃখের অবধি রহিল না। তিনি স্থির করিলেন, হয় মাতৃ-ইচ্ছা অনুরূপ সিদ্ধত্ব লাভ করিবেন, নতুবা জীবন বিসর্জন দিয়া ভবলীলা সাঙ্গ করিবেন।
ফরীদ তৃতীয়বার গৃহ পরিত্যাগ করিলেন এবং বনে গিয়া জগৎ ভুলিয়া কঠোর তপশ্চারণে প্রবৃত্ত হইলেন। কথিত আছে, চট্টগ্রামের যেই স্থানে বর্তমান ‘শেখ ফরীদের চশমা’ বর্তমান রহিয়াছে, সেই স্থানেই পর্বত হতে লম্বমান একটি বৃক্ষের ডালে পা দুইটি বাঁধিয়া নীচের দিকে মস্তক স্থাপন পূর্বক শেখ ফরীদ আল্লার পবিত্র নাম ধ্যান করিতে লাগিলেন। আহার নাই, নিদ্রা নাই, বিরাম নাই, বিশ্রাম নাই তিনি কেবল অহোরাত্র ধ্যানে নিমগ্ন। দুঃখে তাঁহার বুক ভাঙ্গিয়াছে, বেদনায় তাঁহার শরীর জর্জরিত হইয়াছে, অকৃতকার্যতার বেদনায় তাঁহার হৃদয় ভাঙ্গিয়া উঠিয়াছে, তবু তিনি এ কঠোর তপশ্চারণ পরিত্যাগ করিলেন না। এই সময়ে তাঁহার নয়ন-যুগল হইতে শুধু নীরবে অবিরল ধারে অশ্রু ও রক্তপাত হইতেছিল। এইরূপে তিনি আরও দ্বাদশ বৎসর অতিবাহিত করিলেন। তাঁহার সমস্ত শরীর শুষ্ক কাষ্ঠবৎ কঠিন হইয়া গেল, কিন্তু তাঁহার সাধনা টলিল না, নয়ন হইতে অশ্রু ও রক্তধারাপাতের অবসান হইল না। সুদীর্ঘ বার বৎসর পর তাঁহার শরীরের কোথাও একবিন্দু রস ও একটুকু মাংস অবশিষ্ট রহিল না।
ঠিক এমন সময়, এক ক্ষুধার্ত কাক ঐ বৃক্ষের ডালে বসিয়া তাহার নিকট আহার্য প্রার্থনা করিল। ফরীদ তাঁহার সমস্ত শরীর এই অপ্রত্যাশিত অতিথিকে দান করিলেন। কাক তাঁহার শরীরের যাবতীয় অংশে একে একে চঞ্চু বিদ্ধ করিতে চেষ্টা করিয়া বিফলমনোরথ হওয়ায়, ফরীদ তাহার সহিত প্রবঞ্চনা করিয়াছে বলিয়া অনুযোগ জানাইল। ফরীদ অনন্যোপায় হইয়া পরিশেষে তাঁহার বাম চক্ষুটি আহার করিতে কাককে অনুরোধ করিলেন। কাক তাহা আহার করিয়া সন্তুষ্ট হইয়া উড়িয়া গেল। ফরীদ এক চক্ষু হারাইয়া আবার আল্লার আরাধনায় নিমগ্ন হইলেন। কিছুক্ষণ পর, আবার একটি কাক আসিয়া পূর্ববৎ আহার্য প্রার্থনা করিল। ফরীদ এইবার প্রথমেই বলিলেন, ‘আমার নিকট আহারের উপযোগী আর কিছুই নাই; দয়া করিয়া দক্ষিণ চক্ষুটি আহার করিয়া যাও।’ কাক তাহাই করিল। চক্ষু দুইটি সমুৎপাটিত হইবামাত্র ফরীদ দেখিতে পাইলেন, তাঁহার দিব্য জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হইয়াছে; তিনি সপ্ততল আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত বস্তু পরিষ্কারভাবে দেখিতে পাইতেছেন।
অতঃপর ফরীদ বুঝিতে পারিলেন যে, তিনি সিদ্ধত্ব লাভ করিয়াছেন; সুতরাং গৃহে প্রত্যাগমন করা সঙ্গত বিবেচনা করিলেন। তিনি বাড়ি ফিরিয়া দেখিলেন, গৃহদ্বার আপনিই খুলিয়া গেল। তাঁহার মাতা বুঝিতে পারিলেন, সত্যই তাঁহার পুত্র এইবার সিদ্ধত্ব লাভ করিয়াছেন। তিনি পুত্রকে সাদর সম্ভাষণ করিয়া গৃহে আনিলেন। বহুদিন পর মাতাপুত্রের পুনর্মিলন হইল।
আনন্দে মাতাপুত্র কয়েকদিন অতিবাহিত করিলেন। একদা কথাপ্রসঙ্গে তাঁহার জননী ফরীদকে বলিলেন, বাবা! এখন কোন সিদ্ধ পীরের হাতে দীক্ষাগ্রহণ করিয়া তাঁহার নিকট হইতে আধ্যাত্ম-উত্তরাধিকারীর নিদর্শন (খিরকাহ্-ই-খেলাফৎ) লাভ করা উচিত। ফরীদও কয়েকদিন হইতে সে বিষয় চিন্তা করিতেছিলেন। তিনি বলিলেন, মা! কাহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করিব? মাতা বু-আলী-কালন্দরের নাম করিলেন। ফরীদ বু-আলী-কালন্দরের নিকট উপস্থিত হইয়া তাঁহাকে পীরের উপযুক্ত লোক বলিয়া মনে করিলেন না। তাই তিনি বু-আলীর নিকট হইতে কুতবু-দ-দীনের নিকট গমন করেন এবং অনেক দিন যাবৎ তাঁহার পদসেবা ও তাহাজ্জুদ নমাজের (শেষরাত্রে পালনীয় নমাজ বিশেষ) অজুর (নমাজের পূর্বে এই উদ্দেশ্যে হস্তপদাদির প্রক্ষালন ক্রিয়া) জল গরম করিয়া তাঁহার নিকট হইতে আধ্যাত্ম-উত্তরাধিকারীর নিদর্শন লাভ করেন এবং পরে মাতার নিকট ফিরিবার পথে ভীষণ দস্যু ও নর-পিশাচ নিজামু-দ্‌-দীনকে সৎপথে আনয়ন করেন। নিজামু-দ-দীন তাঁহারই উপদেশে উত্তর কালে একজন মহাসাধুর মধ্যে পরিগণিত হন। অতঃপর ফরীদ বাড়ি পৌঁছিয়া মাতার সেবা ও ধর্ম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।”

বলা হইয়া থাকে, শেখ ফরীদ যখন পা দুইটি বৃক্ষের ডালে বাঁধিয়া কঠোর তপশ্চারণে প্রবৃত্ত ছিলেন, তখন তাঁহার নয়নযুগল হইতে অবিরলধারে যে অশ্রু ও শোণিতপাত হইত তাহা হইতেই আধুনিক “শেখ ফরীদের চশমার” উৎপত্তি হইয়াছে। এখানে জিজ্ঞাসা করি, এই কথা কি সত্য? কে আজ এ প্রশ্নের উত্তর দিবে? অশ্রুপাতে ঝর্ণার উৎপত্তির কথা একান্তই আজগুবি ও অদ্ভুত। কোনো বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন মন একথা স্বীকার করিবে না। অধিকন্তু শেখ ফরীদের যে কঠোর তপশ্চারণের দীর্ঘ বর্ণনা প্রদত্ত হইয়াছে, তাহা অতিরঞ্জন ও কাল্পনিকতার গুরুভারে এমনই নিপীড়িত যে ইহার অন্তস্থ আসল সত্য আবর্জনায় তলাইয়া গিয়াছে। যেরূপই হউক, উপাখ্যানটুকুকে পাঠ করিয়া একটু অভিনিবেশ সহকারে চিন্তা করিলে স্বতঃই মনে হয়, “শেখ ফরীদ” নামক কোনো সাধু পুরুষের জীবনের সহিত এই ঝর্ণাটি কোনো না কোনো কারণে সংশ্লিষ্ট ছিল।

তাহা হইলে এই “শেখ ফরীদ” কে? শিক্ষিত অনেক চট্টলবাসীকেই জিজ্ঞাসা করিয়াছি “এই শেখ ফরীদ কে?” চট্টলার শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত কেহই সঠিক উত্তর দিতে পারেন নাই। বিখ্যাত সাধক বাবা শয়খ ফরীদু-দ-দীন গঞ্জ-ই-শকর (১১৭৭-১২৭১ বা ১২৬৯ খ্রিঃ) ব্যতীত আর কে? ইতিহাস হইতে (যথা তারীখ-ই-ফিরিশতহ, দ্বাদশ অধ্যায়, আইন-ই-আকবরী; তধ্‌কিরহ্-ই-ঔলিয়া-ই-হিন্দ) জানিতে পারা যায়, বাবা শয়খ ফরীদ, কাকীর শিষ্য ও নিজামের গুরু ছিলেন। ইহা হইতে আর সন্দেহ থাকিতে পারে না যে, চট্টগ্রামের প্রবাদোক্ত “শেখ ফরীদ” উত্তর ভারতীয় মহাসাধক বাবা শয়খ ফরীদ।

এখন প্রশ্ন উঠে, বাবা শয়খ ফরীদু-দ্-দীন-গঞ্জ-ই-শকর (১১৭৭-১২৭১ বা ১২৬৯ খ্রি.) কি কখনও বঙ্গে আগমন করিয়াছিলেন? এই পর্যন্ত পশ্চিম ও উত্তর ভারতের তরফ হইতে এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাইতে পারি নাই। এক্ষেত্রে শুধু উত্তর ভারতীয় প্রমাণকেই কি একমাত্র প্রমাণ বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে? তাহা করিতে যাওয়া ঠিক নহে বলিয়াই মনে হয়; কেননা ভারতীয় সাধকদের কোন আত্মচরিত নাই। তাঁহাদের মৃত্যুর অনেক পরে শুধু উত্তর ভারতীয় লৌকিক স্মৃতি ও শ্রুতির উপর নির্ভর করিয়াই তাঁহাদের জীবনী রচিত হইয়াছিল। এমতাবস্থায় ভারতের সুদূর পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত বাঙ্গালার প্রবাদ বা ঐতিহাসিক ঘটনাটি উত্তর ভারতের সংগৃহীত পুস্তকে স্থান না পাওয়া বা তথা হইতে বাদ পড়িয়া যাওয়া কি স্বাভাবিক নয়?

এস্থলে বলা আবশ্যক, বঙ্গের নানাস্থানে চট্টলার “শেখ ফরীদ” উপাখ্যানের বা তদনুরূপ প্রচলন আছে। কথিত আছে, ফরিদপুর জেলার নামকরণ করা হইয়াছিল, “শেখ ফরীদ” নামক দরবেশের নামে। এখনও ফরিদপুর সদরের উপর “শেখ ফরীদের” কবর (নকল?) নির্দেশ করা হয়। এ জেলায় তিনিই নাকি সর্বপ্রথম ইসলাম প্রচার করিয়াছিলেন। পূর্বে এ জেলার নানা স্থানে “শেখ ফরীদের” নকল দরগাহ্ বিদ্যমান ছিল বলিয়া জানা যায়। তাহাতে হিন্দু মুসলমান সকলেই পীরের নামে শীর্ণী দিত। ফরিদপুরের প্রসিদ্ধ “ওহাবী” আন্দোলনের ফলে এখন “শেখ ফরীদ” প্রমুখ পীরদের মর্যাদা কমিয়া গিয়াছে; সুতরাং অনেক দরগাহ্ লুপ্ত ও অনেক দরগাহ্ লুপ্তপ্রায় হইয়া গিয়েছে।

পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গে শেখ ফরীদের প্রভাব একটু অন্যরূপ। শেখ ফরীদের নামে শীর্ণী দিবার প্রথা বাঙ্গালার নানাস্থানে প্রচলিত আছে। শেখ ফরীদের নামে খেজুরে গুড়ের প্রথম কতকটা উৎসর্গ করিবার নিয়ম এখনও পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গের কোনো কোনো স্থানে রহিয়াছে বলিয়া জানিতে পারিয়াছি।

ময়মনসিংহ জেলার কোনো কোনো স্থানে অবিকল চট্টল প্রবাদের অনুরূপ একটি প্রবাদ “শেখ ফরীদের” সম্পর্কে প্রচলিত আছে। এ জেলার জনৈক লিখক “শেখ ফরীদের পুঁথি” নামে দোভাষী বাঙ্গালায় একটি পুঁথি লিখিয়া বটতলার ছাপাখানা হইতে প্রকাশ করিয়াছেন। এই পুঁথিতে তিনি শেখ ফরীদ সম্বন্ধে যে সকল কথা লিপিবদ্ধ করিয়াছেন, তাহা যে প্রবাদমূলক, পুঁথিখানি পাঠ করিলেই বুঝিতে পারা যায়। ময়মনসিংহের প্রচলিত প্রবাদ গ্রহণ করিয়া পুঁথিখানি যে লিখিত হইয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই। এই পুঁথিতে লিপিবদ্ধ প্রবাদের সহিত চট্টলার প্রচলিত প্রবাদটি হুবহু মিলিয়া যাইতেছে; ইহার কারণ কি? বটতলার অধুনা মুদ্রিত পুঁথিখানি এযাবৎ চট্টগ্রামের কোথাও দেখি নাই। তাই, ময়মনসিংহের প্রবাদটি ছাপান পুঁথির মধ্যস্থতায় চট্টগ্রামে গিয়া পৌঁছিয়াছিল বলিয়া বলিতে সাহস করি না, বিশ্বাসও হয় না। মুসলমানদের বিশ্বাস, ইনি পারস্যের প্রখ্যাতনামা সাধক শয়খ ফরীদু-দ্-দীন অত্বত্বার (মৃত্যু: ১২৩০ খ্রিঃ) ব্যতীত আর কেহ নহেন। তাঁহারা এই বিশ্বাসকে অনুমোদন করিতে গিয়া বলিয়া থাকেন, চট্টগ্রাম অতি প্রাচীন কাল হইতে আরব ও পারস্যবাসী বণিকদিগের একটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল; সুতরাং শয়খ ফরীদু-দ্‌-দীন অত্বত্বারের চট্টল আগমনের সম্ভাবনা মিথ্যা নহে। চট্টগ্রামের অশিক্ষিত বা অর্ধ শিক্ষিত মুসলমানদের কাছে, “শেখ ফরীদ কে?” এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা শুধু একটি বাক্যে তাহার উত্তর দিতে গিয়া বলিয়া থাকে—”শেখ ফরীদ একজন মহাসাধক ও দরবেশ ছিলেন।” ইত্যধিক কিছু জিজ্ঞাসা করিলে তাহারা আমাদের উপরোক্ত উপাখ্যানটুকুই বলিয়া দেয়; সুতরাং এদিক হইতে হঠাৎ কোনো সন্ধান লাভ করা যায় না। তাহা হইলে, চট্টগ্রামের “শেখ ফরীদ” কি শয়খ ফরীদু-দ্‌-দীন আত্বত্বার? “তধ্‌কিরহ্-ই-ঔলিয়া” এবং তজ্জাতীয় আরও অনেক ফারসী তাপস-কাহিনী আমরা দেখিয়াছি; কিন্তু কোথাও এযাবৎ শয়খ ফরীদু-দ-দীন অত্বত্বারের ভারত বা চট্টল বা বঙ্গাগমনের কোনো ইঙ্গিত লাভ করি নাই; সুতরাং এ ধারণা যে ভ্রান্ত তাহাতে সন্দেহ নাই।

চট্টগ্রামের “শেখ ফরীদ” যে পারস্যের শয়খ ফরীদু-দ্‌-দীন অত্বত্বার (মৃঃ ১২৩০ খ্রিঃ) নহেন, তাঁহার দ্বিতীয় প্রমাণ উপরোক্ত উপাখ্যান। যে সকল নিরক্ষর ব্যক্তির মুখে মুখে উপরোক্ত উপাখ্যানটুকু রূপকথার ন্যায় যুগ-যুগান্তর ধরিয়া চলিয়া আসিয়াছে, তাহারা তাহার ঐতিহাসিক মূল্য নিরূপণের উদ্দেশ্যে রক্ষা করে নাই। বলা বাহুল্য শিক্ষিত ব্যক্তিদের মুখে এই উপাখ্যানের যে বিকৃত সংস্করণ শুনিতে পাওয়া যায়, তাহা অশিক্ষিত ব্যক্তিদের উপরোদ্ধৃত উপাখ্যান হইতে নানা বিষয়ে পৃথক এই পার্থক্যের কারণ তাঁহাদের শিক্ষা, দীক্ষা ও সচেতন বুদ্ধি। সুতরাং শিক্ষিত ব্যক্তিদের বিকৃত সংস্করণকে অনায়াসেই বাদ দেওয়া চলে।

আমাদের উল্লিখিত প্রবাদটিকে বিশ্লেষণ করিয়া দেখিলে দেখা যায়, চট্টগ্রামের “শেখ ফরীদের চশমার” – শেখ ফরীদ নামক ব্যক্তি কুতবু-দ-দীনের শিষ্য; নিজামু-দ-দীনের গুরু, এবং বু-আলী কালন্দরের বয়োজ্যেষ্ঠ সমসাময়িক ব্যক্তি ছিলেন। এই শেখ ফরীদ যে নিজামু-দ-দীনের গুরু ছিলেন, তাহা পূর্ববঙ্গ গীতিকার “নূরন্নেহা ও কবরের কথা” নামক গীতিকায়ও বলা হইয়াছে।

এই গীতিকার পংক্তি দুইটি এইরূপ:

“তার পাছে মানি আমি ফকীর শেখ ফরীদ,
নিজাম ঔলিয়া মানম তান সাহারিদ্।”

এই দুই পংক্তি হইতে স্পষ্টভাবে দেখা যাইতেছে, শেখ ফরীদের শিষ্য নিজামু-দ-দীনের পূর্ণ নাম নিজামু-দ-দীন ঔলিয়া। প্রবাদটির মধ্য হইতে এই যে কয়টি নাম পাওয়া গেল, ইহারা প্রত্যেকেই এক একজন ভারত-বিখ্যাত দরবেশ বা সাধক ছিলেন। প্রবাদের কুরু-দ-দীন উত্তর ভারতীয় মহাসাধক খাজহ কুত্ববু-দ-দীন বখতিয়ার্ কাকী (১১৪২-১২৩৬ খ্রি.; দিল্লীতে সমাহিত), নিজামু-দ-দীন দিল্লীর সুপ্রসিদ্ধ নিজামু-দ-দীন ঔলিয়া (১২৩৬-১৩২৫ খ্রি.), বু-অলী-কালন্দর পানিপথের স্বনামখ্যাত সাধক শরফু-দ-দীন বু-আলী শাহ্ কলন্দর (পানিপথে মৃত্যু ১৩২৪ খ্রি.) ব্যতীত আর কেহ নহেন।