বাংলা পর্ব

আয়নায়ে হিন্দুস্তান: শায়খ আঁখি সিরাজুদ্দীন উসমান

পূর্বপ্রকাশিত ‘দিল্লি পর্ব’র ধারাবাহিকতায়…

 

দিল্লি থেকে স্থায়ীভাবে বাংলায় প্রত্যাবর্তন

আঁখি সিরাজ যখন লখনৌতিতে প্রত্যাবর্তন করলেন, সময়কাল ছিল ১৩২৭/২৮ খ্রিস্টাব্দ। তখন দিল্লির সুলতান ছিলেন মুহাম্মদ বিন তুঘলক (রাজত্ব ১৩২৫-৫১ খ্রি.)। দাবি করা হয়, মধ্যযুগের সবচেয়ে যোগ্য ও দক্ষ সুলতান ছিলেন তিনি। আবার অনেকে ‘পাগল সুলতান/খামখেয়ালি রাজপুত্র’ বলেও অভিহিত করেন। পিতা গিয়াসউদ্দিন তুগলক (রাজত্ব ১৩২০-২৫ খ্রি.) মৃত্যুবরণ করলে মুহাম্মদ বিন তুঘলক শাসনভার গ্রহণ করেন। ইবনে বতুতাও তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে সুলতান মুহাম্মদ দ্বিতীয়ের সাম্রাজ্যের বিবরণ দেন। মুহাম্মদ বিন তুঘলক, তাঁর শাসনামলের তৃতীয় বছরে তথা ১৩২৭ সালে  সাম্রাজ্যের রাজধানী দিল্লি থেকে মহারাষ্ট্রের দেবগিরিতে স্থানান্তরের ঘোষণা করেন এবং দেবগিরির নাম পরিবর্তন করে ‘দৌলতাবাদ’ রাখেন। রাজধানী স্থানান্তরেও অবশ্য সুনির্দিষ্ট কিছু কারণ ছিল: সুলতান মুহাম্মদ দ্বিতীয়ের সুবিশাল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল দেবগিরি হওয়ায় সেখান থেকে উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের শাসনকাজ পরিচালনা করা অধিক সুবিধাজনক ছিল। এছাড়াও উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে মঙ্গোল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দিল্লির চেয়ে দেবগিরিই অধিক সুরক্ষিত ও নিরাপদ ছিল। এজন্যই মুহাম্মদ বিন তুঘলক তাৎক্ষণিকভাবে রাজধানী স্থানান্তরে তৎপর হয়ে উঠল। আলেম-সুফি, অভিজাত, সাধারণ মানুষসহ সকল দিল্লিবাসীদের দৌলতবাদে স্থানান্তর হবার জন্য জোরপূর্বক নির্দেশ দিলেন। সময় নির্ধারণ করা হলো মাত্র তিন দিন। অন্যথায়, আদেশ অমান্যকারীদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। যদিও তাঁর পরিকল্পনা পরবর্তীতে ব্যর্থ হয় এবং ১৩৩৪/৩৫ সালে দিল্লিতে রাজনীতি ফিরিয়ে আনেন। জোরপূর্বক এই স্থানান্তরের ফলে দিল্লি জনশূন্য হয়ে পড়ে, অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয় এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায়। এই প্রেক্ষাপটে আঁখি সিরাজ সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়ার দোয়া ও শায়খ চিরাগ-ই দিল্লি থেকে দ্বিতীয় খেলাফতনামা নিয়ে দৌলতাবাদের পরিবর্তে বাংলার লখনৌতির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।[1]

 

সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক যদিও খুবই বুদ্ধিদীপ্ত ও প্রখর মেধাবী ছিলেন। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন ভীষণ জেদি ও একরোখা। সর্বদা আলেম-সুফিদের অপমান ও হয়রানি করতেন। ইবনে বতুতা তাঁর সফরনামায় বলেন, “সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক ক্ষমতায় আসার পর এক অদ্ভুত নিয়ম চালু করেন। তিনি সুফি ও আলেমদের নিম্নস্তরের কাজে নিয়োগ করতেন। যুক্তি ছিল, ন্যায়পরায়ণ শাসক শুধু জ্ঞানী ও সৎ ব্যক্তিদেরই দায়িত্ব দেন। এই অজুহাতে তিনি শায়েখ নাসিরুদ্দিন দেহলভিকে নিজের পোশাক পরিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিতে বাধ্য করছিলেন। শায়েখ অস্বীকার করলে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। বন্দি অবস্থায় শায়েখের মনে পড়ে মুরশিদের উপদেশ: “দিল্লিতে থেকে জনগণের অত্যাচার সহ্য করতে হবে।” এই স্মৃতি থেকে তিনি সুলতানের আদেশ মেনে নেন।[2] পূর্বোক্ত রাজনৈতিক কারণ ছাড়াও আঁখি সিরাজের বাংলায় পুনরায় আগমনের প্রেক্ষাপটে অন্য কিছু কারণও ঐতিহাসিকগণ উপস্থাপন করেন। বিশেষত সৈয়দ মুহাম্মদ আশরাফি কিসওয়াসভি বলেন, “গৌড়-শাসক ও রাজদরবারিদের আমন্ত্রণ এবং মুরিদ শায়খ পাণ্ডভীর জোরালো অনুরোধে তিনি পুনরায় বাংলায় আগমন করেন।”[3] খেলাফতনামার পাশাপাশি খানেকায়ে নিজামিয়া থেকে বাংলায় আসার সময় নিজামুদ্দীন আউলিয়ার গ্রন্থাগার থেকে কিছু বই, তাঁর ব্যবহৃত জামা (জামাটি নিজামুদ্দীন আউলিয়া বসন্তকালে পরতেন) ও লাঠি নিয়ে আসেন।[4] ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের লাঠিটি বর্তমানে আঁখি সিরাজ মাজারের অভ্যন্তরে দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে সংরক্ষিত রয়েছে।

 

দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা স্বীয় শিষ্য শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভীর অনুরোধ, যেই কারণে হোক না কেন আঁখি সিরাজ যখন দিল্লি থেকে বাংলায় প্রত্যাবর্তন করলেন, তখন বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন ছিল? তা অল্পবিস্তর খতিয়ে প্রয়োজন, খোদ আঁখি সিরাজের গতিপথকে বেহতরভাবে বোঝার জন্য।

সুলতান মুহাম্মদ শাহ তুঘলক যখন সিংহাসনে আরোহণ করলেন, তখন তাঁরই বিশ্বস্ত মন্ত্রী মালিক বেদার খলজিকে ‘কদর খান’ উপাধি দিয়ে বাংলার গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ১৪ বছর শাসন করেন। আঁখি সিরাজ এই কদর খানের আমলে বাংলায় স্থায়ীভাবে বসতি গড়েন। এরপর তাঁরই সেনাপতি মালিক ফখরুদ্দিন ১৩৩৮ সালে বিদ্রোহ করে কদর খানকে হত্যা করেন এবং নিজেকে বাংলার স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি ২ বছর ৫ মাস বাংলা শাসন করেন। এরপর আরেক সেনাপতি আলাউদ্দিন আলি মুবারক ফখরুদ্দিনকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করেন। তাঁর শাসনও স্বল্পস্থায়ী হয় (প্রায় ১ বছর ৫ মাস)। অবশেষে হাজি ইলিয়াস (উপাধি শামসুদ্দিন বঙ্গরাহ) আলি মুবারককে হত্যা করে বাংলার নিয়ন্ত্রণ নেন। তিনি ১৬ বছর শান্তিপূর্ণভাবে শাসন করেন। দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ একবার আক্রমণ করলেও বর্ষার কারণে ফিরে যেতে বাধ্য হন।[5] কদর খান থেকে হাজী ইলিয়াছ পর্যন্ত বাংলার এই চারজন শাসকের শাসনামল আঁখি সিরাজ পেয়েছিলেন। বাংলায় প্রত্যাবর্তনের পর, তিনি সুলতান শামসুদ্দিন হাজী ইলিয়াস শাহের দরবারের প্রধান আলেম হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

 

সকল ঐতিহাসিকগণ একমত যে, তিনি বাংলায় আগমনের পর শায়খ পাণ্ডভী, আঁখি সিরাজের হাতে বায়াত গ্রহণ করলে ধীরে ধীরে বাংলা অঞ্চলের রাজা, বাদশাহ, শাসকরাও তাঁর মুরিদ বনে গেলেন। নানাসময় রাজা বাদশাহরা আঁখি সিরাজের পরামর্শেই তাদের শাসন কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।

বাংলার স্থানীয় শাসকবর্গের আঁখি সিরাজের অনুগত হওয়া নিয়ে দুটি বক্তব্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ড. আবদুল লতিফ তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভে উল্লেখ করেছেন, “Shaikh Akhi Siraj, the first important saint of the chishti relations with his order in Bengal, established cordial contemporary sultan and the nobles and admitted them into his disciples.”[6] এবং ড. মুহাম্মদ ইসমাইল Development of sufism in Bengal শিরোনামে লিখিত গবেষণাপত্র বর্ণনা করেছেন, “After the death of his teacher in the year 1325 A.D. he came to Bengal and began preaching in Gour and Pandua and soon many Sultans of Gour became his disciples. Shaykh Ala al Haqq was his chief disciple. Shamsu’d- Din Ilyas Shah (1339-1358) who was contemporary with Akhi Siraju’d Din. Ala’u’d Din Ali Shah (1339-1345) too was his another contemporary.”[7]

 

বাংলায় চিশতিয়া তরিকার আবির্ভাব

খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (১১৪২-১২৩৬ খ্রি.) আনুমানিক ১১৯২ সালে রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের শাসনামলে ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং এখানে চিশতিয়া তরিকার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর খলিফা খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী ও প্রশিষ্য শায়খ ফরিদুদ্দিন গঞ্জেশকরের মাধ্যমে তরিকাটি ব্যাপকতা লাভ করে। এবং হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মাধ্যমে এ তরিকা চরম শিখরে পৌঁছে। উপমহাদেশের এমন কোনো অঞ্চল নেই যেখানে চিশতিয়া তরিকার পদচিহ্ন নেই। পূর্বে বলা হয়েছে,  নিজামুদ্দিন আউলিয়ার ৭০০ খলিফার কথা। মূলত তাঁদের মাধ্যমেই চিশতিয়া তরিকা উপমহাদেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়েছিল। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার জীবদ্দশায় তরিকার সমস্ত কার্যক্রম দিল্লির খানকায়ে নিজামিয়া থেকে পরিচালিত হত। কিন্তু তাঁর ওফাতের পর প্রত্যেক খলিফা স্বতন্ত্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে খানকাহ স্থাপন করে ধর্ম প্রচার ও তরিকার প্রসারে নিয়োজিত হন। এ তরিকার প্রসারে যে দুই মহান ব্যক্তিত্ব সর্বাধিক অবদান রেখেছেন, তাঁরা হলেন: সৈয়দ নাসিরুদ্দিন মাহমুদ চিরাগ-ই-দিল্লি ও শায়খ আঁখি সিরাজুদ্দীন উসমান। শায়েখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভি উল্লেখ করেন, ভারতবর্ষে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার মুরিদদের মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ দুটি ধারা হলো আঁখি সিরাজ ও নাসিরুদ্দিন মাহমুদের ধারা।[8] এ মতকে সমর্থন করে ‘তাজকেরায়ে মাশায়েখে চিশত’ গ্রন্থেও আঁখি সিরাজকে “হিন্দুস্তানের আয়না” বলা হয়েছে।

 

প্রকৃতপক্ষে, আঁখি সিরাজই বাংলায় চিশতিয়া নিজামিয়া তরিকার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তিনি নিরলস মেহনত ও একাগ্রচিত্তে এ অঞ্চলে তরিকাটি সম্প্রসারিত করেন। প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও তিনি সকল শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছে যান—শাসক, আলেম, অভিজাত ও সাধারণ জনগণ সবাই তাঁর দরবারে আশ্রয় নেন। আঁখি সিরাজের সাথে  চিশতিয়া তরিকা সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে ড. আবদুল লতিফ বলেন, “The Chishti traditions which grew and developed in the North were introduced in Bengal by Shaikh Akhi Siraj, outstanding disciple of Shaikh Nizamuddin Auliya. Mir Khurd’s remark that he illumined the whole region of Bengal with his spiritual radiance” casts aside the doubt about his popularity.”[9] তাঁর প্রচেষ্টায় চিশতিয়া তরিকা বাংলা থেকে বিহার, আসাম, জৌনপুর ও উত্তরপ্রদেশ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে তাঁর খলিফাদের মাধ্যমে নিজামিয়া সিরাজিয়া খানকাহ সারাবিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়। খাজা হাসান নিজামি দেহলভি উল্লেখ করেন যে, বাংলার বাদশাহও আঁখি সিরাজের হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। বিহার, বাংলা ও আসামে তাঁর অসংখ্য খানকাহ ছিল। ফুলওয়ারি শরিফ, কাহলা মানিকপুর, সামারাম, রায়বেরেলি (সালোনে) প্রভৃতি স্থানে এ তরিকার প্রসার ঘটেছে। বিশেষত রায়বেরেলি জেলার সালোনে একটি বৃহৎ খানকা স্থাপন করা হয়েছিল। এটি স্থাপনের জন্য তৎকালীন এক লক্ষ রূপি মূল্যের জমিও দান করা হয়েছিল।[10] খাজা সালাইন (বা খাজা সালার-হানাইন) নামে আঁখি সিরাজের এক খলিফা চীনে বসবাস করতেন। তাঁর মাধ্যমে চীনে এ তরিকার প্রসার ঘটে এবং বেশ কয়েকটি খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। একসময় চীনে প্রায় ১৫০টি খানকাহ ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

বাংলাসহ সমগ্র ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে তাঁর কয়েক লক্ষ মুরিদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও তাঁর খলিফার সংখ্যা কত তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তাঁর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ও প্রধান খলিফা হলেন, শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভী। শায়খ পাণ্ডভী, আঁখি সিরাজের শিষ্যত্ব গ্রহণের পর নিজের বিলাসী ও আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপন সম্পূর্ণতর ত্যাগ করেছিলেন। ঘোষণা দিয়েছিলেন সম্পদ ত্যাগের।

আঁখি সিরাজ যখন অধিকাংশ সময় গ্রাম থেকে গ্রামে ভ্রমণ করতেন এবং তাঁর সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ভক্ত ও মুরিদ থাকত, শায়খ পাণ্ডভী পীরের এসকল সফরের সঙ্গী হতেন। আঁখি সিরাজ গরম খাবার গ্রহণ করতে পছন্দ করতেন। তাই সফরের সময় শিষ্যরা মাথায় করে বহনযোগ্য চুলা বা খাবার গরম রাখার পাত্র সঙ্গে নিয়ে চলতেন। শায়খ আলাউল হক শিষ্যত্ব গ্রহণের পর স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। এমনও বহুবার ঘটেছে যে, নগ্ন পায়ে হেঁটে মাথায় সেই গরম পাত্র বহন করে তাঁকে নিজ পরিবারের রাজপ্রাসাদের সামনের পথ অতিক্রম করতে হয়েছে।‌ আত্মীয়স্বজন তাঁর এ ফকিরি জীবনযাপন দেখে বিস্মিত হলেও তাঁর চেহারায় কখনো সংকোচ, লজ্জা বা অনুতাপের কোনো ছাপ দেখা যায়নি। বরং পরিবারের সদস্যরা বারবার তাঁকে এই জীবন ত্যাগ করে পূর্বের ঐশ্বর্যময় জীবনে ফিরে যেতে অনুরোধ করলেও তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন। দীর্ঘদিন ধরে মাথায় গরম পাত্র বহনের ফলে তাঁর মাথার চুল পর্যন্ত ঝরে গিয়েছিল। প্রায়শই আঁখি সিরাজ পালকি চড়ে ভ্রমণে বের হলে শায়খ পাণ্ডভী তাঁকে নিজ কাঁধে বহন করতেন।[11]

 

আঁখি সিরাজ ও তাঁর প্রিয় শিষ্য আলাউল হক একাধিকবার পদব্রজে হজযাত্রা করেন। দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য সেই সফরে তাঁরা স্রেফ ইবাদতেই নিমগ্ন থাকেননি, বরং পথিমধ্যে অসংখ্য পথিক ও মুসাফিরের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রেখেছিলেন। মুরশিদের একনিষ্ঠ খেদমতের ফলে শায়খ আলাউল হক পরবর্তী সময়ে কুতুবে ওয়াক্ত/ কুতুবে জামান তথা যুগের কুতুব হয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভীর বিপুল সংখ্যক খলিফা ছিল। কেননা ভারত ও ভারতবর্ষের বাইরের খানকাসমূহে তাঁর নিকট একসাথে ৫০০-৭০০ জন আলেম নিয়মিত দীক্ষা গ্রহণ করতেন। তবে তাঁর খলিফাদের বিস্তারিত তথ্য এখনো উদ্ধার করা যায়নি। মুফতি আব্দুল খবির আশরাফী মিসবাহী তাঁর ‘আয়নায়ে হিন্দুস্তান’ গ্রন্থে আটজন খলিফার নাম উল্লেখ করেছেন। শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভীর খলিফাদের মধ্যে বিশেষত সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী কিসওয়াসভি ও শায়খ নুর কুতুবুল আলমের মাধ্যমে ভারত-বাংলায় চিশতিয়া নিজামিয়া সিলসিলা ব্যাপক প্রসারিত হয়েছে। শায়খ পাণ্ডভী ছাড়াও সৈয়দ মোবারক হুসাইন চিশতি নামে আঁখি সিরাজের আরেকজন খলিফা ছিলেন। যিনি ৭৪৫ হিজরিতে পাটনার দানাপুরে চিশতিয়া নিজামিয়া সিলসিলার একটি খানকাহ স্থাপন করেছিলেন।[12]

 

নিম্নে কিছু খানকার নাম উপস্থাপন করা হলো, সেগুলোর সাথে শায়খ আঁখি সিরাজের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ছিল[13]:

১. খানকায়ে সিরাজিয়া নিজামিয়া চিশতিয়া, মালদা। এটি আঁখি সিরাজের নিজস্ব খানকাহ।

২. খানকায়ে সিরাজিয়া আশরাফিয়া। মাজার প্রাঙ্গণে অবস্থিত।

৩. খানকায়ে আলিয়া নিজামিয়া চিশতিয়া, পাণ্ডুয়া। ৭২০ হিজরীতে প্রতিষ্ঠিত। আঁখি সিরাজের ইন্তেকালের পর শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভী ও শায়খ নূর কুতুবুল আলম এই খানকা থেকেই তরিকার কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। ঐতিহাসিকদের মতে, এটিই চিশতিয়া নিজামিয়া সিলসিলার ভারতবর্ষের সর্ববৃহৎ প্রতিনিধিত্বশীল খানকাহ।

৪. খানকায়ে সিরাজিয়া নিজামিয়া, দানাপুর। সৈয়দ মোবারক হুসাইন চিশতি ৭৪৫ হিজরীতে এ খানকাটি প্রতিষ্ঠা করেন।

৫. খানকায়ে আশরাফিয়া সিরাজিয়া চিশতিয়া, কুছওয়াছা শরিফ।

 

ভক্তিবাদের প্রতিষ্ঠাতা বিতর্কের খণ্ডন

এবার আসি, ভূমিকায় উত্থাপিত বিতর্কের বিষয়ে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি বিভাগের পরিচিত গবেষক আলিম আশরাফ খান আঁখি সিরাজের তরিকার শিক্ষা ও আদর্শকে বিকৃত করে একটি নিবন্ধ লিখেছিলেন। নিবন্ধের শিরোনামই ছিল, “আঁখি সিরাজ: বাংলায় চিশতিয়া তরিকা ও চৈতন্য ভক্তিবাদের প্রতিষ্ঠাতা”। তিনি লিখেছেন যে, নূর কুতুবুল আলমের চিন্তাধারা চৈতন্য, রূপা, সনাতন ও জীব গোস্বামীর সঙ্গে তুলনা করলে বাংলার ভক্তিবাদের প্রকৃত রূপ উন্মোচিত হয়। তাঁর মতে, চিশতিয়া সুফি শিক্ষা পরোক্ষভাবে চৈতন্যের ভক্তিবাদ গঠনে প্রভাব ফেলেছে। তিনি আরও বলেন, বাংলার সুফিরা ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি ভক্তিবাদও শিক্ষা দিয়েছেন এবং আঁখি সিরাজের আদর্শেই চিশতিয়া তরিকা ভক্তিবাদের সঙ্গে বিকশিত হয়েছে। শুধু আলিম আশরাফ খানের ক্ষেত্রে এই ঘটনা নয়, বাংলার ইতিহাসবিদদের একাংশ চৈতন্যের বৈষ্ণববাদ আলোচনার সময় এমন বয়ানের দ্বারস্থ হন।

এসব দাবি ভিত্তিহীন ও ঐতিহাসিকভাবে অযৌক্তিক। এর প্রধানতম যুক্তি হলো- সময়ের ব্যবধান। আঁখি সিরাজ ইন্তেকাল করেন ১৩৫৭/৮ সালে। পক্ষান্তরে চৈতন্য মহাপ্রভুর জন্ম হয় ১৪৮৬ সালে। প্রায় ১২৯ বছর পর। এত বড় সময়ের ব্যবধানে দুজনের মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগসূত্র স্থাপন করা ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব। এছাড়া আদর্শগত দিক থেকেও দুটি ধারা সম্পূর্ণ বিপরীত। একদিকে একত্ববাদের উপর প্রতিষ্ঠিত বিশুদ্ধ সুফিবাদ। অন্যদিকে হিন্দু ধর্মের বৈষ্ণবীয় ভাবধারা, যেখানে মূর্তিপূজা ও বহুশ্বরবাদের স্থান রয়েছে। এই মৌলিক পার্থক্যকে উপেক্ষা করে দুজনকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা পা দিয়ে পাহাড় ঠেলার মতোই অযৌক্তিক।

মুফতি আব্দুল খবির আশরাফী মিসবাহী এই বিতর্কের সমাধা করতে গিয়ে বলেন, চৈতন্যের বৈষ্ণববাদ ছিল হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনমূলক আন্দোলন। নদীয়ায় জন্ম নেয়া শ্রীচৈতন্য হিন্দুধর্ম ও ইসলাম উভয়ই গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছিলেন। তাঁর প্রধান শিষ্য রূপ ও সনাতন গোস্বামী আরবি-ফারসি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। সলগাঁওয়ের তৎকালীন বিখ্যাত মাওলানা ফখরুদ্দিনের কাছ থেকে তারা আরবি ও ফারসি ভাষা শিখেছিলেন। চৈতন্য ও তাঁর অনুসারীরাই হিন্দুধর্মের পুনরুজ্জীবনের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। তাঁরা উপলব্ধি করেন যে, নিম্নবর্গের মানুষকে কাছে না আনলে বা হিন্দু সমাজের মধ্যে সম্মানজনক অবস্থান না দিলে বাংলার জনগণ সুফি শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে যাবে। তাই তাঁরা বৈষ্ণব মতবাদ প্রচার করেন এবং সামাজিক বিভেদ দূর করার চেষ্টা করেন। ঐতিহাসিক শায়েখ মুহাম্মদ ইকরামের মতে, বৈষ্ণব আন্দোলন শুধু প্রতিরক্ষামূলক ছিল না, বরং আক্রমণাত্মকও ছিল। এর ফলে বাংলায় ইসলামের প্রসার অনেকাংশে থেমে যায়। অনেক মুসলমানও বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন এবং হিন্দু প্রথা মুসলমান সমাজে অনুপ্রবেশ করে। এ আন্দোলন হিন্দুধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করতে সফল হয়।[14]

 

সেবামূলক কার্যক্রম

পূর্বেই বলা হয়েছে, শায়খ আঁখি সিরাজ বাংলায় চিশতিয়া নিজামিয়া তরিকার প্রথম প্রচারক ও প্রাণপুরুষ ছিলেন। তিনি বাংলা, বিহার ও আসামে ধর্ম ও তরিকার  প্রচার-প্রসারে অসামান্য অবদান রেখেছেন। বিশেষত এখানকার মানুষদের ব্যক্তিগত সাহচর্য, হৃদয়স্পর্শী বক্তৃতা এবং কালজয়ী রচনার মাধ্যমে তাওহীদ, ইনসাফ ও ইহসানের বীজ বপন করেছিলেন। যা পরবর্তীতে ফুলে-ফলে চমৎকারভাবে বিকশিত হয়েছিল। তিনি লক্ষাধিক হিন্দু-বৌদ্ধকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করেছিলেন। পাপাসক্ত হৃদয়কে ফিরিয়েছিলেন তওবার পথে। আদব, ইলম,  হিলম ও হিকমাহর আলোয় উদ্ভাসিত করেছিলেন গোটা সমাজকে। বাংলায় পদার্পণ করে আঁখি সিরাজ দেখতে পান সমাজের চরমতর অন্যায় ও  বৈষম্যের দৃশ্য । নিচু জাতের অস্পৃশ্য হিন্দুদের সাথে উঁচু জাতের ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়দের মধ্যকার বৈষম্য। রাজদরবারি অভিজাতদের সাথে প্রান্তিক বর্ণের মানুষদের বৈষম্য। উঁচু-নিচু জাতের উভয়েই একই উপাসনালয় প্রার্থনা করত না। একই থালায় খাবার খেতো না। এমনকি একই কাতারে নামাজ পড়ত না। সাথে ছিল নব্য ধর্মান্তরিত মুসলমানদের করুণ দৃশ্য। তিনি আরো উপলব্ধি করেন, এখানকার মানুষদের যতই না উদরের খিদে, তারচেয়ে অধিকতর হলো আত্মার খিদা,  চিত্তের খিদা। ফলে এখানকার মাটি ও মানুষের ক্ষুধা নিবারণের কর্মযজ্ঞে তিনি তৎপর হয়ে উঠলেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি খেদমত-ই-খালক তথা সৃষ্টির প্রকৃতির ও মানবসেবাকে পরিণত করেন ইবাদত হিসেবে। কোনো প্রকার দরবারি সাহায্যের উপর তোয়াক্কা না করে একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা রেখে তিনি দু’টি যুগান্তকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

 

১. সিরাজি লঙ্গরখানা: সিরুল আউলিয়া ও অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্রে বর্ণিত, এই লঙ্গরখানায় গরিব-মিসকিন, শিক্ষার্থী ও খানকার আগন্তুকদের জন্য দিনে দু’বেলা বিনামূল্যে খাবার বিতরণ করা হতো। এই লঙ্গরখানা নিয়ে ড. গোলাম রাসুল তাঁর ‘Chisti-Nizami Sufi Order in Bengal’ গ্রন্থে বলেন, “The Shaikh also started a free kitchen where the beggars and mendicants used to get food at all times”.[15] এটি স্রেফ অন্নদানের ব্যবস্থা ছিল না; তৎকালীন প্রেক্ষাপটে এটি হয়ে উঠেছিল সামাজিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক।

শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভির বরাতে জানা যায়, শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভিও স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি নিজেও মুরশিদের এই বিশাল ব্যয়ের দশভাগের একভাগও বহন করতে অক্ষম।[16] আজও তাঁর মাজার শরিফে, বিশেষ করে বৃহস্পতি ও রবিবারে, পশু কুরবানি ও অন্নদানের ধারা অব্যাহত রয়েছে। এখনো কোনো মুসাফির খালি হাতে ফিরে যান না।

২. সিরাজি শাফাখানা বা চিকিৎসালয়: ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত যে, এখানে শারীরিক রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক চিকিৎসাও চলত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল রোগী সেবা পেতেন। অনেক হিন্দু-বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ের রূপান্তর ঘটিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতেন। এভাবে তিনি ইসলামের সেবাধর্মী চেতনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন। আঁখি সিরাজের শাফাখানা নিয়ে ড. গোলাম রাসুল বলেন, “It also served the purposed of a hospital, where the sick and the distressed were attended to.”[17]

 

জ্ঞানসাধনায় আঁখি সিরাজের খানকাহ “খানকাহে সিরাজিয়া নিজামিয়া”

আঁখি সিরাজ ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানসাধক। অল্প সময়ে বহুমুখী জ্ঞান অর্জন করে তিনি নিজ জ্ঞানের প্রচার-প্রসারকে জীবনের ব্রত করে নিয়েছিলেন। এর উজ্জ্বলতম নিদর্শন হলো, ‘খানকাহ সিরাজিয়া নিজামিয়া’। লাখনৌতির সাদুল্লাপুরে স্থাপিত খানকাটি বাংলার প্রথম চিশতিয়া তরিকার খানকাহ। এটিকে স্রেফ আধ্যাত্মিক সাধনকেন্দ্র বললে ভুল হবে, এটি একাধারে ছিল তৎকালীন বাংলার ইসলামি জ্ঞানের বিদ্যাপীঠ। দূর-দূরান্ত থেকে জ্ঞানপিপাসু ছাত্ররা এখানে আসতেন। শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভি এই খানকাহেরই উজ্জ্বল ছাত্র। ড. গোলাম রাসুল খানকাটির ব্যাপারে এভাবে বর্ণনা করেন যে, “Not only Ala’al Haq, but people, high and low, flocked to his Khanqah for light and guidance. He disseminated the mystic lore and attracted a large number of admirers and adherents. His Khanqah became the resort of the scholars and saints and the asylum for the distressed and forlorn.”[18]

আব্দুল খবির আশরাফি মিসবাহীও তাঁর গ্রন্থে খানেকাটির ইলমি খেদমতের দিক নিয়ে আলোচনাটির পরিসমাপ্তি করেন এ বলে যে, “حقیقت بھی یہی ہے کہ آئینہ ہندوستان اخی سراج الدین عثمان رحمۃ اللہ علیہ کی خانقاہ اس دور میں بنگال کی واحد خانقاہ تھی جو ہر قسم کے لوگوں کی مذہبی و سماجی ضرورتیں پوری کر رہی تھی ۔ امیر و غریب، عالم و جاہل مسلم و غیر مسلم بھی اس خانقاه کی طرف رجوع کرتے تہے۔ ” অর্থাৎ বস্তুত, শায়খ আঁখি সিরাজের খানকাহটিই ছিল বাংলার একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে সব শ্রেণির মানুষের ধর্মীয় ও সামাজিক সকল প্রয়োজন পূরণ করা হত। ধনী-গরিব, পণ্ডিত-সাধারণ, মুসলিম-অমুসলিম সকলেই নানা প্রয়োজনে এই খানকার শরণাপন্ন হতেন।

আঁখি সিরাজ হাদিস শাস্ত্রেরও অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। নিজামুদ্দিন আউলিয়ার খানকাহে ‘মাশারিকুল আনওয়ার’ গ্রন্থের হাফিজ হন এবং বাংলায় এসে নিয়মিত হাদিসের পাঠদান করতেন। ধারণা করা হয়, আঁখি সিরাজই বাংলার প্রথম মুহাদ্দিস।

তিনি খানকাহে সিরাজিয়া নিজামিয়াতে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন। দিল্লি থেকে আনা গ্রন্থসমূহ দিয়ে এটি শুরু হয়েছিল এবং পরবর্তীতে আরও সমৃদ্ধ হয়।

 

রচনাবলী

শায়খ আঁখি সিরাজ আলেম ও সুফি হওয়ার পাশাপাশি তিনি একজন প্রতিভাবান লেখকও ছিলেন। তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ আজও উপমহাদেশের মাদ্রাসা কারিকুলাম ও দরসে নিজামির পাঠ্যক্রমে রয়েছে:

১. هداية النحو (হিদায়াতুন নাহু): আরবি নাহু (ব্যাকরণ) শাস্ত্রের সংক্ষিপ্ত, সারগর্ভ ও অত্যন্ত উপকারী গ্রন্থ। মাদ্রাসার মাধ্যমিক স্তরে এটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২ ও ৩. ميزان الصرف (মিযানুস সরফ) ও پنج گنج (পাঞ্জেগঞ্জ): উভয়ই ফারসি ভাষায় রচিত সরফ (আরবী ভাষার ক্রিয়ারূপ) শাস্ত্রের মৌলিক গ্রন্থ।

তবে এ গ্রন্থগুলোর রচয়িতা নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে। কেননা এসব গ্রন্থের ভূমিকায় কোনো লেখকের নাম উল্লেখ ছিল না। উপমহাদেশের মাদরাসা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত বহু প্রাচীন গ্রন্থের লেখকের পরিচয় আজও অনির্দিষ্ট। এর অন্যতম কারণ হলো, তৎকালীন আলেমরা ব্যক্তিগত খ্যাতির চেয়ে জ্ঞান প্রচারকে অধিক গুরুত্ব দিতেন এবং নিজেদের পরিচয় আড়ালেই রাখতে পছন্দ করতেন। আঁখি সিরাজের এসব রচনা নিয়ে মুফতি আব্দুল খবির আশরাফী মিসবাহী দীর্ঘ পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত মত দিয়েছেন যে, হেদায়াতুন্নাহু গ্রন্থটি শক্তিশালীভাবে শায়খ আঁখি সিরাজুদ্দিন উসমানের রচনা বলে গ্রহণযোগ্য। কারণ, এ গ্রন্থের অন্য কোনো রচয়িতার নাম কোথাও পাওয়া যায় না। তবে মিজানুস সরফ ও পাঞ্জেগাঞ্জ গ্রন্থদ্বয়ের ক্ষেত্রে একাধিক লেখকের নাম প্রচলিত থাকায় সেগুলোর বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন।[19]

 

ভাষাগত দক্ষতা

আঁখি সিরাজ আরবি, ফারসি, উর্দু (হিন্দভি) এবং বাংলা— চারটি ভাষায়ই পারদর্শী ছিলেন। আরবিতে ব্যাকরণগ্রন্থ ‘হিদায়াতুন নাহু’ রচনা করে তিনি যুগান্তকারী অবদান রেখেছেন। ফারসিতেও তাঁর দক্ষতা ছিল অসাধারণ। তৎকালীন সময় ভারতবর্ষের রাজ-দরবারের ও পাঠ্যপুস্তকের ভাষা ছিল ফারসি। তাঁর রচিত মিজানুর সরফ ও পাঞ্জেগঞ্জ গ্রন্থদ্বয়ও ফারসি ভাষায় রচিত। উর্দু সাহিত্যের প্রাথমিক বিকাশে তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য বলে ড. মাওলানা আবদুল হকের মতো গবেষকরা স্বীকার করেছেন।[20] বাংলায় ইসলাম প্রচারের জন্য তাঁকে নির্বাচনের অন্যতম কারণও ছিল তাঁর স্থানীয় ভাষায় দক্ষতা। তিনি বাংলা ভাষা ও বাক্য গঠনে খুবই দক্ষ ছিলেন। এখন সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলে তিনি হৃদয় জয় করেছিলেন। তাঁর বাংলা ভাষার দক্ষতা নিয়ে ড. জাভেদ নিহাল বলেন, “اخی سیراج بنگلہ جانتے تھے اور پراکرت سے پیدا ہونے والے مختلف ہندوستانی بولیوں سے بھی آشنا تھے” অর্থাৎ আঁখি সিরাজ বাংলা জানতেন। প্রাকৃত ভাষা থেকে আগত বিভিন্ন ভারতীয় উপভাষা সম্পর্কেও তিনি অবহিত ছিলেন।[21]

 

ব্যক্তিগত গুণাবলি

আঁখি সিরাজের জিন্দেগী ছিল সৌন্দর্য, সংযম, ঔদার্য ও আধ্যাত্মিক নিষ্ঠার এক উজ্জ্বলতর উপমা। তিনি শিক্ষকদের প্রতি পরম ভক্তি ও মমতায় পরিপূর্ণ ছিলেন। তাঁদের মর্যাদা,  সুখ-সুবিধার প্রতি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। একবার শায়খ ফখরুদ্দিন জারাদি বানসালা সংলগ্ন নির্জন বাঁধের এক মসজিদে কঠোর তপস্যা ও ইবাদতে নিমগ্ন ছিলেন। স্থানটি হিংস্র প্রাণী,  সিংহ, নেকড়ে, বিষধর সাপে পরিপূর্ণ ছিল। এদিকসেদিক এদের মৃতদেহ ছড়িয়ে থাকত। এতটা নির্জন যে, খাদ্য-পানি ছিটেফোঁটাও কয়েক মাইল জুড়ে পাওয়া যেত না। তখন তাঁর কষ্টের খবর পেয়ে আঁখি সিরাজ অস্থির হয়ে পড়তেন। সৈয়দ মুহাম্মদ কিরমানির বর্ণনায়, “একদা শায়খ জারাদি সেখানে টানা আট রোজা রেখে ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। তিনি খাদ্যসামগ্রী ও সঙ্গীসহ সেখানে উপস্থিত হয়ে শায়খের সেবা করেছিলেন।” জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি শিক্ষক মওলানা রুকনুদ্দিন আন্দারপাতির প্রতি উপহার ও আর্থিক সাহায্য পাঠাতেন। তাঁদের পাওনা যথাযথভাবে আদায় করতেন। দিল্লিতে থাকাকালীন শিক্ষকদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা এবং লখনৌতিতে আসার পরও তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা অটুট রাখা, নিয়মিত চিঠি আদান-প্রদান মারফত খোঁজখবর রাখা তাঁর অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল।

 

আঁখি সিরাজ ছিলেন শারীরিক ও চারিত্রিক সৌন্দর্যের প্রতীক। মিরাতুল আসরার গ্রন্থকার তাঁকে “آینیہ جمال ذات مطلق তথা পরম সৌন্দর্যের আয়না” বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর স্বপ্রকৃতি ছিল অত্যন্ত কোমল ও নমনীয়। বেশ আকর্ষণীয়ও বটে। হাসিমুখে সাক্ষাৎ, নম্রতা, ক্ষমা, আতিথেয়তা ও সহনশীলতা তাঁর প্রতিটি আচরণে ফুটে উঠত। সান্নিধ্য পাওয়া ব্যক্তিরা পারতপক্ষে তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করতে চাইতেন না। ধরার সাজ-সজ্জা, কামনা-বাসনা ও লোভ তিনি সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করেছিলেন। শরিয়তের অনুমোদিত বিষয় গ্রহণ এবং নিষিদ্ধ বিষয় বর্জন ছিল তাঁর নিত্যনৈমিত্তিক নীতি। ছিলেন গভীর তাকওয়ার অধিকারী। প্রতিটি কাজ করতেন স্রষ্টার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে। শায়েখ আবদুল হক দেহলভি উল্লেখ করেছেন, আঁখি সিরাজ এশার অজু দিয়েই ফজরের নামাজ পড়তেন। চিশতিয়া তরিকার কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নফসে আম্মারাকে নফসে মুতমাইন্নায় (পরিতৃপ্ত আত্মা) রূপান্তরিত করেছিলেন। পূর্বেই আলোচিত হয়েছে যে, তাঁর খানকাহ ছিল গরিব-মিসকিন, মুসাফির ও জ্ঞানপিপাসুদের জন্য সর্বদা উন্মুক্ত। তিনি অকাতরে দান করতেন। তাঁর খলিফা শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভি বলতেন, “মুরশিদ যত ব্যয় করতেন, আমি তার দশ ভাগের এক ভাগও করতে পারি না।” তিনি ছিলেন অত্যন্ত নম্র ও অসাধারণ বিনয়ের অধিকারী। যদিও তিনি রাজ-মজলিসের প্রধান আলেম ছিলেন, কিন্তু কখনো নিজের পদমর্যাদা প্রকাশ করতে চাইতেন না।[22]

 

বৈবাহিক জীবন

শায়খ আঁখি সিরাজের বৈবাহিক জীবন নিয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। তবে এটা নিশ্চিত যে, আঁখি সিরাজ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং তাঁর সন্তান-সন্ততি ছিল। স্রেফ এতটুকু তথ্যই পাওয়া যায় যে, আঁখি সিরাজের এক কন্যাকে শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভী বিবাহ করেছিলেন। ফলে গুরু-শিষ্য পরবর্তীতে শ্বশুর-জামাতার সম্পর্কে পরিণত হয়।

 

ইন্তেকাল

জন্মসালের মতো তাঁর মৃত্যুসাল নিয়েও মতপার্থক্য বিদ্যমান। তবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মতানুসারে, ৭৫৮ হিজরি বা ১৩৩৭/৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আঁখি সিরাজের ইন্তেকাল হয়।[23] তিনি ধরণিতে প্রায় ১০০ বছরের দীর্ঘজীবন অতিবাহিত করেছিলেন। ওফাতের পর তাঁর ওসিয়ত অনুসারে, মুরশিদ নিজামুদ্দীন আউলিয়া থেকে প্রাপ্ত খিরকাটি গৌড়ের সাগর দীঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে সমাহিত করা হয়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার মোল্লাপাড়া-সাদুল্লাহপুর নামক এলাকায় তাঁর মাজার অবস্থিত। মালদা শহর থেকে মাত্র আট কিলোমিটার দূরে। প্রতি বছর ২৩ রজব মাজারে উরস অনুষ্ঠিত হয়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার কেন্দ্র করে তাঁর মাজারের লাগোয়া স্থানে বিরাট মেলা বসে। ওফাতের পর তাঁর কবরের উপর একটি সমাধিসৌধ নির্মাণ করা হয়। সমাধিসৌধটির মূল নির্মাণকাল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে এর প্রবেশদ্বারে সংযোজিত দুটি উৎকীর্ণ শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, ফটকদ্বয় যথাক্রমে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এবং সুলতান নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহের পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত হয়েছিল। এছাড়া সুলতান হোসেন শাহ এই সুফি-সাধকের দরগাহ প্রাঙ্গণে আগত দর্শনার্থীদের পানীয় জলের সুবিধার্থে একটি সিকায়া (পানীয় জল বিতরণের ছাউনি বা জলসত্র) নির্মাণেরও উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।[24]

 

আঁখি সিরাজের মাজারের প্রবেশদ্বারে প্রাপ্ত দুইটি শিলালিপি

গৌড়ের সাগর দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণে অবস্থিত পুরানা পীর বা পীরান-ই-পীর নামে পরিচিত শাহ আঁখি সিরাজুদ্দিনের মাজারটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মাজারের চারপাশের প্রাচীর ও তোরণ বা প্রবেশদ্বার অত্যন্ত সুন্দর। পূর্ব ও পশ্চিমের দুটি খিলান ৭.২ ফুট এবং উত্তরের খিলানটি ৬ ফুট গভীর। পূর্বদিকের খিলানপথটি বন্ধকারী ছিদ্রযুক্ত ও অলঙ্কৃত ইটের গাঁথুনি এখন বিলীন হয়ে গেছে এবং পশ্চিমদিকেরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ছিল। কেবল উত্তরদিকের ইটের গাঁথুনিই অনেকটা আসল অবস্থায় ছিল। প্রায় ১৯০০ সালের দিকে প্রাচীর, তোরণ ও মাজার ভবন সংস্কার করা হয়েছে। মাজারের প্রবেশদ্বারের ডান-বাম উভয় পাশে দুটি করে চারটি শিলালিপি রয়েছে। উভয় পাশের দু’টিতে কুরআনের আয়াতসংবলিত। অন্য দুটি হলো:

 

বাম পাশের শিলালিপি:

قد بنى هذا الباب المررضة مخدوم شیخ اخى سراج الدين السلطان المعظم المكرم علاؤ الدنيا و الدين ابو المظفر حسين شاه السلطان بن سيد اشرف الحسيني خلد الله ملکه و سلطانه سنة ست عشر و تسعمائة.

অনুবাদ: “এই পবিত্র সমাধিসৌধের প্রবেশদ্বারটি মহামান্য, মহানুভব সুলতান আলাউদ্দুনিয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুজাফ্ফর হুসাইন শাহ, সৈয়্যিদ আশরাফ আল-হুসাইনীর পুত্র, সম্মানিত মখদুম শায়খ আঁখি সিরাজউদ্দীনের (রহ.) উদ্দেশ্যে নির্মাণ করেন। আল্লাহ তাঁর রাজত্ব ও সুলতানত চিরস্থায়ী করুন। নির্মাণকাল: ৯১৬ হিজরি বা ১৫১০ খ্রিস্টাব্দ।”

 

ডান পাশের শিলালিপি:

بنى هذا الباب للروضة بامر السلطان المعظم الكرم سلطان بن السلطان ناصر الدنيا و الدین ابو المظفر نصر تشاه السلطان بن حسین شاه السلطان خلد الله ملكه في سنة احدى و ثلثين وتسعمائة.

অনুবাদ: “এই পবিত্র সমাধিসৌধের প্রবেশদ্বারটি মহামান্য ও মহানুভব সুলতান, সুলতানের পুত্র, নাসিরুদ্দুনিয়া ওয়াদ্দীন আবুল মুজাফ্ফর নুসরত শাহ, হুসাইন শাহ সুলতানের পুত্রের আদেশক্রমে নির্মিত হয়। আল্লাহ তাঁর রাজত্ব চিরস্থায়ী করুন। এই নির্মাণ সম্পন্ন হয় ৯৩১ হিজরি (১৫২৪-২৫ খ্রিস্টাব্দ) সালে।”[25]

 

এছাড়া জেনারেল কানিংহামের (Major-General Sir Alexander Cunningham: 1814- 1893) আলোচনায় ৯১৬ হিজরির তৃতীয় একটি শিলালিপির উল্লেখ রয়েছে, যেখানে প্রবেশদ্বার নির্মাণের কথা লিপিবদ্ধ ছিল। তবে শিলালিপিটি এখন আর পাওয়া যায় না। সেখানে চতুর্থ আরেকটি শিলালিপির বর্ণনা পাওয়া যায়, যেটিতে পানীয় জল সরবরাহের জন্য একটি চালাঘর নির্মাণের কথা লিপিবদ্ধ আছে। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মালদার ইংলিশ বাজার বা ইংরেজ বাজারের একটি মসজিদের প্রবেশদ্বার স্থাপন করা হয়েছে। হেনরি আর্নেস্ট স্টেপলটনের (Henry Ernest Stapleton: 1878- 1962) একটি টীকায় উল্লেখ আছে যে, ভারতের জাদুঘরে রক্ষিত একটি ইটের শিলালিপিতে “শহর মুহাম্মদাবাদ” নামটি পাওয়া যায়, যা সম্ভবত আঁখি সিরাজের মাজারের তোরণের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এটি গৌড়ের এই অঞ্চলের প্রাচীন নাম নির্দেশ করে।

 

নির্দেশিত গ্রন্থাবলী:

১. আব্দুল খবির আশরাফি মিসবাহী, আয়নায়ে হিন্দুস্তান আঁখি সিরাজুদ্দীন উসমান: আহওয়াল ও‌ আসার, আশরাফিয়া ইসলামীয়া প্রকাশনী, হায়দ্রাবাদ, ২০১৮

২. সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী, লাতায়েফে আশরাফি ফি বয়ানি তাওয়াইফি সুফি: ১ম খণ্ড, মাকতাবায়ে সিমনানি, করাচি-পাকিস্তান, ১৯৮৪

৩. সৈয়দ মুহাম্মদ ইবনে মোবারক কিরমানি, সিরুল আউলিয়া, গোলাম আহমদ কর্তৃক উর্দুতে অনুদিত, লাহোর-পাকিস্তান, ১৯৭৮

৪. মুফতি গোলাম সরওয়ার লাহোরি,‌ খাজিনাতুল আসফিয়া, লাহোর-পাকিস্তান, ২য় খণ্ড, ১৯৯৪

৫. সৈয়দ মুহাম্মাদ আশরাফি কিসওয়াসাভি, মাহনামায়ে আশরাফি, নভেম্বর সংখ্যা, ১৯২৪

৬. মুহাম্মদ কাসিম, তারিখে ফারিশতা, ৪র্থ খণ্ড, ২০০৮

৭. সৈয়দ সেলিম মিয়া আলভী, তাযকেরাতুল আউলিয়া (হিন্দি), বেলখাড়া দরবার শরীফ, বারাবাঙ্কী, ২০২১

৮. সৈয়দ মুহাম্মদ আশরাফি কুচ্ছোভি, শায়খুল আলম আলাউল হক গঞ্জেনবাত, আশরাফিয়া ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হায়দ্রাবাদ, ২০১৭

৯. ড. আসিম আজমী, মাহবুবে ইলাহী, ফরিদ বুক স্টল, লাহোর, ২০০২

১০. ড. আবদুল লতিফ, The muslim mystic movements in Bengal from the Fourteenth to the Middle of the Sixteenth Century A.D, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৪

১১. মুহাম্মদ ইসমাইল, Development of sufism in Bengal, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮৯

১২. খাজা সৈয়দ হাসান নিজামি দেহলভি, নিজামি বানসারি, দিল্লি, ১৯৮৪

১৩. Md. Golam Rasool, Chisti-Nizami Sufi Order of Bengal (Till 15th mid century) and its socio-religious contribution, Qasimjan Street, Delhi, 1991

১৪. Md. Qamaruddin, Journal: Proceedings of the Indian History Congress, Vol. 56, 1995

১৫. Khan Sahib M. Abid Ali Khan, Memoirs of Gaur and Pandua, Bengal Secretariat Book depot, Calcutta, 1930

[1] মুহাম্মদ কাসিম, প্রাগুক্ত, ২০০৮, পৃ- ৭৭৬

[2] ড. আসিম আজমী, মাহবুবে ইলাহী, ফরিদ বুক স্টল, লাহোর, ২০০২, পৃ- ৩২৫-২৬

[3] কিসওয়াসাভি, সৈয়দ মুহাম্মাদ আশরাফি, মাহনামায়ে আশরাফি, নভেম্বর সংখ্যা, ১৯২৪, পৃ- ৩৪৩

[4] আশরাফী মিসবাহী, প্রাগুক্ত, ১৯৭৮, পৃ-

[5] এই সময়কার বাংলার ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত জানার জন্য পড়ুন:- ড. আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস (সুলতানি আমল), জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা ২০১৩। গোলাম মুহাম্মদ সেলিম, রিয়াজুস সালাতিন, কলকাতা, ১৮৯০, Internet Archive। তারিখে ফিরিশতা, মুহাম্মদ কাসিম, ৪র্থ খন্ড, ২০০৮।

[6] ড. আবদুল লতিফ, The muslim mystic movements in Bengal from the Fourteenth to the Middle of the Sixteenth Century A.D, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৭৪, পৃ- ১০৭।

[7] মুহাম্মদ ইসমাইল, Development of sufism in Bengal, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮৯, পৃ-১০৮।

[8] শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভি, প্রাগুক্ত, ২০০৯, পৃ- ৮২।

[9] ড. আবদুল লতিফ, প্রাগুক্ত, ১৯৭৪, পৃ- ৩।

[10] খাজা হাসান নিজামি দেহলভির মূল বর্ণনায়, “بنگال کے بادشاہ نے ان کی بیعت کی اور ان کے ذریعہ تمام بنگال آور آسام کے لوگ ان کے حلقہ بگوش ہو گئے ۔”।  ভিন্ন এক বর্ণনায়, حضرت مخدوم اخی سراج کا مزار مالدہ بنگال میں ہے۔ ان کے سلسلے کی پو۔ پی اور بہار اور بنگال اور آسام میں بہت سی خانقا ہیں ہیں۔ مگر سلسلے کی اشاعت سب سے زیادہ پھلواری شریف کے سجادہ نشیں حضرت مولانا محی الدین صاحب کے ذریعہ ہو رہی ہے۔ کڑہ مانک پور اور سہسرام وغیرہ مقامات میں بھی نظامیہ سراجیہ سلسلے کے مشایخ سلسلے کی اشاعت کر رہے ہیں۔ سلون ضلع رائے بریلی یو۔ پی میں بھی ایک بڑی خانقاہ نظامیہ سراجیہ سلسلے کی ہے، جہاں ایک لاکھ روپے کے قریب جا گیر ہے اور وہاں بھی اس جا گیر نے غفلت اور بے حسی پیدا کر دی ہے ۔ (খাজা সৈয়দ হাসান নিজামি দেহলভি, নিজামি বানসারি, দিল্লি, ১৯৮৪, পৃ- ২১৩-১৪। আশরাফী মিসবাহী, প্রাগুক্ত, ১৯৭৮, পৃ- ২৪২-৪৩)

[11] লাহোরী, প্রাগুক্ত, ১৯৯৪,‌ পৃ- ২৪৭। সিমনানী: প্রাগুক্ত, ১৯৮৪, পৃ- ২৫১।  এ ব্যাপারে মুহাম্মদ কামারুদ্দিন বলেন, “..In Lakhnauti, often the procession headed by Hazrat Akhi Siraj passed through the parental house of Shaikh Alauddin. Shaikh Alauddin showed no sign of embarrassment when he passed through his house with the lighted oven of his master on his head. His relatives, however, felt much humiliated when they saw him in this fashion. Many times, he was requested by them to return to their fold. But he turned a deaf ear to their pleadings. As a result of the heat of the oven, Shai. Alauddin went bald, but he was not sorry.” Proceedings of the Indian History Congress, Md. Qamaruddin, Vol. 56, 1995, Page 473

[12] আশরাফী মিসবাহী, প্রাগুক্ত, ১৯৭৮, পৃ- ২৭৪-৭৫

[13] খানেকাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন, আশরাফী মিসবাহী, প্রাগুক্ত, ১৯৭৮, পৃ- ২৮০-৯০

[14]‌ আশরাফী মিসবাহী, প্রাগুক্ত, ১৯৭৮, পৃ- ২৪৮-৫০

[15] Md. Golam Rasool, Chisti-Nizami Sufi Order of Bengal (Till 15th mid century) and its socio-religious contribution, Qasimjan Street, Delhi, 1991, p- 83.

[16] শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভি, আখবারুল আখিয়ার, লাহোর, ২০০৯, পৃ- ১৪৩।

[17] Rasool, Ibid, 1991, p- 83.

[18] Md. Golam Rasool, Ibid, 1991, p- 83.

[19] আশরাফী মিসবাহী, প্রাগুক্ত, ১৯৭৮, পৃ- ২১৯-৩২

[20] ড. মাওলানা আবদুল হককে বলা হয় উর্দু সাহিত্যের জনক। তিনি اردو کی ابتدائی نشونما میں صوفیاء کرام کا کام (উর্দু কে ইবতিদাই নোশ ও নুমা মে সুফিয়ায়ে কেরাম কা কাম) গ্রন্থে তিনি আঁখি সিরাজের কথা উল্লেখ করেন। নিজামুদ্দীন আউলিয়া ও আঁখি সিরাজের মধ্যকার একটি কথোপকথনের উপর ভিত্তি করে এ দাবি করা হয়। আঁখি সিরাজ সেখানে প্রাথমিক পর্যায়ের উর্দু ভাষা বা হিন্দভী ভাষা ব্যবহার করেছেন।

[21] ড. জাভেদ নিহাল, নকশে জাভেদ, কলকাতা, ১৯৯৯, পৃ- ২৭

[22] বিস্তারিত জানতে পড়ুন, আশরাফী মিসবাহী, প্রাগুক্ত, ১৯৭৮, পৃ- ১৯০-২০০।

[23] লাহোরী, প্রাগুক্ত, ১৯৯৪, পৃ- ২২৬। বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা প্রফেসর হেনরিখ ব্লকম্যান (Henry Ferdinand Blochmann: ১৮২৮-৭৮ খ্রি.), যিনি প্রথম ‘আইনে আকবরি’র প্রথম ইংরেজি অনুবাদক হিসেবে খ্যাত। তিনিও ৭৫৮ হিজরিকে আঁখি সিরাজের মৃত্যুবর্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি ছাড়া ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিকগণ আর যে কয়টা সাল আঁখি সিরাজের মৃত্যুবছর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, তা হলো:- ৭৪৩ হিজরী/১৩৪২ খ্রিস্টাব্দ, ৭৩০ হিজরী/১৩৩০ খ্রিস্টাব্দ,

[24] Khan Sahib M. Abid Ali Khan, Memoirs of Gaur and Pandua, Bengal Secretariat Book depot, Calcutta, 1930, p- 90-92

[25] Khan Sahib M. Abid Ali Khan, Memoirs of Gaur and Pandua, Bengal Secretariat Book depot, Calcutta, 1930, p- 90-92