মহররম বা আশুরা উদযাপনকে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর বা সম্প্রদায়ের বলে ভাবাটা খুব সাম্প্রতিক ধারণা। বাংলার দীর্ঘ ইতিহাস অন্য কথা বলে। সেই ইতিহাসে কারবালার স্মৃতি শুধু ইমামবাড়ার চৌহদ্দিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ছিল সুফি দরবারের মজলিসে, সুন্নি নবাব পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায়, জারিগানের আসরে, পুঁথিপাঠের সন্ধ্যায়, গ্রাম ও নগরের মানতে, দরগাহের লঙ্গরে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষাতেও।
আজকের মিডিয়া, টেলিভিশন আর সোশ্যাল মিডিয়ায় মহররমকে যেভাবে দেখানো হয়, তাতে অনেকের কাছেই এটা প্রায় একচেটিয়াভাবে শিয়া সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠান বলে মনে হয়। পর্দায় আমরা সাধারণত যে ছবিগুলো দেখি, সেগুলোও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শিয়া সমাজের আচার ও শোকানুষ্ঠানকেই সামনে আনে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই মহররম উদযাপন মানেই যেন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আচার। কিন্তু এটাকে শুধু ভুল বোঝাবুঝি বললে পুরো সত্য বলা হয় না। অনেক সময় ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়, অনেক সময় মিসকোট করা হয়, আবার অনেক সময় ইতিহাসের এমন সব অধ্যায় নীরবে বাদ পড়ে যায়, যেগুলো এই ভূখণ্ডে মহররমের বহুস্তরীয় ও যৌথ চরিত্রের কথা বলে। ফলত, বাংলার সুফি দরবার, সুন্নি পরিবার, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসে মহররমের দীর্ঘ উপস্থিতি ধীরে ধীরে জনস্মৃতি থেকে আড়াল হয়ে গেছে। যে ঐতিহ্য একসময় বাঙলার গ্রাম, মহল্লা, খানকাহ, দরবার, পুঁথি আর জারিগানের ভেতর বেঁচে ছিল, আজ তার বড় একটা অংশ বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে।
১.
ইতিহাসের দিকে তাকালে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ছবি দেখা যায়। কারবালার স্মৃতি মুসলিম সভ্যতার সঙ্গে প্রায় চৌদ্দশো বছর ধরে পথ চলেছে। বাংলায়ও এই স্মৃতির ইতিহাস প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো। এই দীর্ঘ সময়ে কারবালার কাহিনি কখনো সুফি দরবারের মজলিসে, কখনো দরগাহের লঙ্গরে, কখনো জারিগানের সুরে, কখনো পুঁথির পাতায়, কখনো নবাববাড়ির পৃষ্ঠপোষকতায়, কখনো স্থানীয় আচারে, কখনো আবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদের ভাষায় বেঁচে থেকেছে। সুফি দরবার, খানকাহ, নবাববাড়ি, জারিগানের আসর, পুঁথিপাঠ, স্থানীয় আচার, এমনকি উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত বাংলার মুসলমান সমাজের নানা স্তরে কারবালার স্মৃতি নানাভাবে প্রবাহিত হয়েছে। সেই বিস্মৃত ইতিহাসের কথাই আজ বলা হবে।
কেন রাজশাহীর শাহ মখদুম রূপোশের দরগায় সাতশো বছরেরও বেশি সময় ধরে ১০ মহররমে তাজিয়া বের হয়? কেন সিলেটে শাহজালালের দরগার সুন্নি পীরজাদারা ১৭৮২ সালে আশুরার তাজিয়া মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে শহিদ হয়েছিলেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একটাই। মহররম উদযাপন বাঙলার মুসলমান সমাজে কখনো ‘শুধু শিয়াদের’ ছিল না। এটা মূলত শিয়া সুন্নী উভয় সম্প্রদায়ের যৌথ স্মৃতি, যৌথ উত্তরাধিকার। এককথায়, একটি সিভিলাইজেশনাল মেমোরি। এই মেমোরির শিকড় বোঝার জন্য প্রথমে বুঝতে হবে সুফি তরিকার কাঠামো।
প্রতিটি সুফি তরিকার একটি সিলসিলা আছে। সিলসিলা বলতে বোঝায় একটি আধ্যাত্মিক বংশানুক্রম। বর্তমান মুরিদ থেকে তাঁর পীর, পীরের পীর, এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম অতিক্রম করে এই ধারা শেষ পর্যন্ত নবিজির কাছে গিয়ে পৌঁছায়। উপমহাদেশের প্রধান সুফি তরিকাগুলো, যেমন কাদেরিয়া, চিশতিয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া, সাত্তারিয়া, মাদারিয়া ও রিফাইয়া, প্রায় সবই হজরত আলী রা. এর মাধ্যমে নবিজির সঙ্গে যুক্ত। নকশবন্দিয়া তরিকার সিলসিলা আবু বকর রা. এর মাধ্যমে প্রবাহিত হলেও এই সিলসিলায় ইমাম জাফর সাদিক রা. আছেন, যিনি ইমাম হুসাইন রা. এর প্রপৌত্র। উদাহরণস্বরূপ দু’টি তরিকার শাজারা শরীফ দিচ্ছি।
শাজরায়ে কাদেরিয়া
আহমাদে মুজতাবা মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম
আমীরুল মুমিনিন শাহে মারদা আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীম
ইমাম হুসাইন শাহীদে দাশতে কারবালা আলাইহিস সালাম
ইমাম যাইনুল আবিদীন আলাইহিস সালাম
ইমাম মুহাম্মাদ বাকির আলাইহিস সালাম
ইমাম জাফার সাদিক (আলাইহিস সালাম)
ইমাম মূসা কাজিম (আলাইহিস সালাম)
ইমাম আলী মূসা রিযা আলাইহিস সালাম
খাজা মা’রুফ কারখী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা সারী সাকাতী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা জুনাইদ বাগদাদী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা আবু বাকার আব্দুল্লাহ শিবলী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শাইখ আবুল কাসিম আহমাদ (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শাইখ আহমাদ আব্দুল আযীয ইয়ামানী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শাইখ আবুল ফাহ্ ইউসুফ ইবনে তারতুসী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শাইখ আবুল হাসান আলী কুরাঈশী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
কুতুবুল আকতাব গাউসুল ইসলাম সুলতান আবু সাঈদ মুবারাক আবুল খাইর মাখযুমী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
কুতুবুল আকতাব গাউসুল ইসলাম সাইয়্যিদ মীরা মুহীউদ্দিন আব্দুল ক্বাদির জীলানি (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শাজরায়ে চিশতীয়া
আহমাদে মুজতাবা মুহাম্মাদ মুস্তাফা সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম
আমীরুল মুমিনিন শাহে মারদা আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীম)
হযরত হাসান বসরী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
হযরত আব্দুল ওয়াহেদ বিন যায়দ (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শায়েখ ফুজাইল বিন আয়াজ (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শায়েখ ইব্রাহীম বিন আদহাম (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা শাদীদ উদ্দীন (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শায়েখ আমীন উদ্দীন বাসরী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শায়েখ মুমশাদ আলী দাইনূরী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শায়েখ আবু ইসহাক চিশতী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শায়েখ নাসিরুদ্দীন আবু ইউসুফ চিশতী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শায়েখ কুতুব উদ্দীন মাওদুদ চিশতী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শায়েখ খাজা হাজী শরীফ উদ্দীন চিশতী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
শায়েখ খাজা উসমান হারুনী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা মুইন উদ্দীন চিশতী আজমেরী সাজেরী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা কুতুব উদ্দীন বাখতীয়ার কাকী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা ফারীদ গাঞ্জে শাকার (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা নিজাম উদ্দীন আউলিয়া (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা সিরাজ উদ্দীন উসমান আওদহী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা আলাউল হক লাহোরী (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
খাজা নূর কুতুবে আলম (কুদ্দিসাল্লাহু সিররুহুল আযীয)
কাদেরিয়া তরিকার শাজরাহ শরীফ হজরত আব্দুল কাদের জিলানী রা. পর্যন্ত উল্লেখ করলেও, চিশতিয়া তরিকার ক্ষেত্রে খাজা নূর কুতুবে আলম পর্যন্ত উল্লেখ করা হলো। কারণ, হজরত নূর কুতুবুল আলম বাংলার অন্যতম প্রধান প্রভাবশালী সুফি ছিলেন। সুলতানী আমলে তাঁর হস্তক্ষেপের কারণে সুলতানী আমলের মেয়াদ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
এই সিলসিলাগুলোর বাইরেও আরও গভীর একটি সংযোগ আছে। সুফি ধারায় একজন মুরিদের আদবের অন্যতম শর্ত হলো আহলে বাইত তথা নবী পরিবারের প্রতি ভালোবাসা। কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশেবন্দীয়া, সোহরাওয়ার্দিয়া, মুজাদ্দেদীয়, সাত্তারিয়া, রিফাইয়া, শাজিলিয়া, মাওলাভিয়া, বেকতাশিয়া, মাদারিয়া, নূরবখশিয়া সহ প্রায় প্রতিটি সুফি তরিকাতেই আহলে বাইতের ফজিলত ও মর্যাদা নিয়ে আলাদা শিক্ষা রয়েছে। অধিকাংশ সুফি খানকাহে দুরুদের সঙ্গে আহলে বাইতের উপর সালাম পাঠের রেওয়াজ ছিল। বহু তরিকায় খিরকা প্রদানের সময়ও আহলে বাইতের স্মরণ করা হতো। এই কারণেই সুফি ঐতিহ্যে আহলে বাইত-প্রেম একেবারে মৌলিক অনুষঙ্গ। এটি সুফি আদবের অংশ, সিলসিলার ধারাবাহিকতার অংশ এবং আধ্যাত্মিক পরিচয়েরও অংশ। ফলে ইমাম হুসাইন রা. এর শাহাদতের প্রতি গভীর আবেগ, কারবালার স্মৃতির প্রতি বিশেষ অনুভূতি এবং মহররমকে গুরুত্ব দেয়া সুফি সমাজে স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠেছে। বহু সুফির কাছে কারবালার স্মরণ ছিল তাঁদের আধ্যাত্মিক জীবনেরই একটি স্বাভাবিক প্রকাশ।
কাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হজরত আবদুল কাদের জিলানীর নামেই লেখা আছে তাঁর পরিচয়। আল-হাসানি ওয়াল-হুসাইনি। পিতার দিক থেকে ইমাম হাসান রা. এর বংশধর, মাতার দিক থেকে ইমাম হুসাইন রা. এর বংশধর। তাঁর ‘গুনিয়াতুত তালিবিন’-এ আশুরার দিন নিয়ে আলোচনায় কারবালার স্মৃতিতে স্বাভাবিক শোক প্রকাশ করার কথা বলেননি। বলেছেন, মনোযোগের সাথে, সচেতনভাবে শোক প্রকাশের কথা।
চিশতিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী লিখেছিলেন:
শাহ আস্ত হুসাইন, বাদশাহ আস্ত হুসাইন
দ্বীন আস্ত হুসাইন, দ্বীন পানাহ আস্ত হুসাইন
সার দাদ, না দাদ দাস্ত দার দাস্ত-ই ইয়াজিদ
হাক্কা কে বিনা-ই লা-ইলাহা আস্ত হুসাইন।
হুসাইনই প্রকৃত শাহ, হুসাইনই সম্রাট।
হুসাইনই দ্বীন, হুসাইনই দ্বীনের আশ্রয় ও রক্ষাকবচ।
তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, কিন্তু ইয়াযিদের হাতে নিজের হাত দেননি।
নিশ্চয়ই, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর ভিত্তি ও সারসত্তা ইমাম হুসাইন।
২.
উপমহাদেশের সুফি ঐতিহ্যে কারবালার স্মৃতি কতটা গভীরভাবে প্রোথিত ছিল, তা বোঝার জন্য চিশতিয়া তরিকার আরো কয়েকজন মহান সাধকদের জীবনের দিকে তাকালেই যথেষ্ট। চিশতি খানকাহগুলোতে মহররম, মজলিস, মার্সিয়া এবং কারবালার বয়ান বহু শতাব্দী ধরে আধ্যাত্মিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে উপস্থিত রয়েছে।
চিশতিয়া তরিকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক বাবা ফরিদ উদ্দিন গঞ্জে শকরের জীবনেও এই আহলে বাইত-প্রেমের অসংখ্য নিদর্শন পাওয়া যায়। পাঞ্জাব, সিন্ধ এবং উত্তর ভারতের স্থানীয় স্মৃতি, তাজকিরা এবং খানকাহি বর্ণনাগুলোতে উল্লেখ আছে, কারবালার ঘটনা বর্ণনা করা হলে তিনি গভীরভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন। অনেক বর্ণনায় বলা হয়েছে, কারবালার মক্তল পাঠ বা শহিদদের বর্ণনা শুনতে শুনতে তিনি কখনো কখনো সংজ্ঞাহীন হয়ে যেতেন। চিশতি তাজকিরাগুলোতে তাঁর কান্না, দীর্ঘ মুরাকাবা এবং মহররমে বিশেষ ইবাদতের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ঐতিহ্যে আরও বলা হয়, তিনি ৫ মহররম ইন্তেকাল করেন এবং মৃত্যুর সময়ও কারবালার শোক ও আহলে বাইতের স্মরণে নিমগ্ন ছিলেন। যদিও এ সংক্রান্ত বিভিন্ন বর্ণনার ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা আছে, তবুও উপমহাদেশের চিশতি সমাজে এই স্মৃতি আজও সজীব। বাবা ফরিদের দরগাহ পাকপত্তনে এখনও মহররম উপলক্ষে বিশেষ কোরআনখানি, ফাতেহা এবং স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বাবা ফরিদের সর্বশ্রেষ্ঠ খলিফা হজরত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার খানকাহেও আহলে বাইতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তাঁর মালফুজাত গ্রন্থ ‘ফাওয়ায়েদুল ফুয়াদ’-এ দেখা যায়, তিনি নিয়মিতভাবে নবিজির পরিবার, বিশেষত হজরত আলী রা., ইমাম হাসান রা. এবং ইমাম হুসাইন রা. এর ফজিলত আলোচনা করতেন। দিল্লির গিয়াসপুরে তাঁর খানকাহে যে মজলিস বসত, সেখানে কোরআন তিলাওয়াত, আধ্যাত্মিক আলোচনা এবং কারবালার স্মরণ ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক বিষয়। তাঁর শিষ্যদের স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, কারবালার ঘটনা আলোচিত হলে তিনি গভীর আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তেন এবং উপস্থিত মুরিদদেরও আহলে বাইতের প্রতি মুহাব্বত পোষণের উপদেশ দিতেন।
নিজামউদ্দিন আউলিয়ার কাছে আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা ছিল সুফি আদবের মৌলিক অংশ। তাঁর ভাষায়, যে হৃদয়ে নবিজির পরিবারের প্রতি ভালোবাসা নেই, সেই হৃদয়ের আধ্যাত্মিক পূর্ণতা অর্জন কঠিন।
চিশতি সিলসিলার আরেক মহান সাধক সৈয়দ মুহাম্মদ হুসাইনি বন্দানওয়াজ গেসুদারাজ রা. এর দরগাহও এই ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দক্ষিণ ভারতের গুলবার্গায় অবস্থিত তাঁর দরগাহে মহররম পালনের শতাব্দী প্রাচীন রেওয়াজ আজও বিদ্যমান। দাক্ষিণাত্যের সুফি সংস্কৃতিতে গেসুদারাজের দরগাহ দীর্ঘদিন ধরে মহররম উদযাপনের একটি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মহররম মাসে সেখানে বিশেষ মজলিস, কোরআনখানি, ফাতেহা, মার্সিয়া পাঠ এবং নিয়াজ বিতরণের আয়োজন করা হয়। গুলবার্গার স্থানীয় মুসলিম সমাজ, বিশেষ করে সুন্নি সুফি পরিবারগুলো, বহু প্রজন্ম ধরে এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে আসছে। দক্ষিণ ভারতের ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন যে, দাক্ষিণাত্যের বহু সুন্নি খানকাহে মহররমের এই স্মরণানুষ্ঠানগুলো চিশতি, কাদেরি এবং সাত্তারি ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই বিকশিত হয়েছিল।
আসলে বাবা ফরিদ, নিজামউদ্দিন আউলিয়া এবং বন্দানওয়াজ গেসুদারাজের উদাহরণ আমাদের একটি বড় ঐতিহাসিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়। উপমহাদেশের সুফি খানকাহগুলোতে মহররম কখনো বাইরের কোনো সংযোজন ছিল না। আহলে বাইতের প্রতি মুহাব্বত, কারবালার স্মৃতি, মজলিস, মার্সিয়া এবং শোকচর্চা সুফি আধ্যাত্মিকতার ভেতরেই বহু শতাব্দী ধরে প্রবাহিত হয়েছে। এই ঐতিহ্যই পরে বাংলা, পাঞ্জাব, দাক্ষিণাত্য, সিন্ধ এবং সমগ্র উপমহাদেশের মুসলিম সমাজে মহররমকে একটি বহুমাত্রিক সামাজিক ও আধ্যাত্মিক স্মৃতিতে পরিণত করে।
সাত্তারিয়া তরিকার মধ্যে আহলে বাইতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। উপমহাদেশে এই তরিকার প্রধান প্রচারক শায়খ মুহাম্মদ গাওস গোয়ালিয়ারি রা. এর রচনাবলি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষায় আহলে বাইতের প্রতি বিশেষ সম্মান লক্ষ্য করা যায়। উপমহাদেশের সাত্তারি খানকাহগুলোতেও আহলে বাইতের মুহাব্বত সুফি আদবের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো।
নকশেবন্দিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা খাজা বাহাউদ্দিন নকশেবন্দ বুখারি রহ. নিজেও আহলে বাইতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। নকশেবন্দি সাহিত্য ও আচার-অনুষ্ঠানে আহলে বাইতের স্মরণ, তাঁদের প্রতি সালাম ও মুহাব্বত দীর্ঘদিন ধরেই সুফি আদবের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। মুজাদ্দিদ আলফে সানি তাঁর মকতুবাতে লিখেছেন, বেলায়েতের পথ অতিক্রম করা সম্ভব নয় হজরত আলী, ফাতিমা, হাসান, হুসাইন এবং বাকি বারো ইমামের মধ্যস্থতা ছাড়া।
রিফাইয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা হজরত আহমদ আল-রিফাই রহ. নিজে আহলে বাইতের প্রতি গভীর মুহাব্বতের জন্য পরিচিত ছিলেন। ইরাক ও মিসরে রিফাইয়া তরিকার বিভিন্ন শাখায় আহলে বাইত-প্রেমকে সুন্নি ইসলামের একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে দেখা হতো। গবেষকরা দেখিয়েছেন, ইরাকের রিফাইয়া ও কাদেরিয়া তরিকার বহু শায়খ তাঁদের শিক্ষা, কবিতা ও আচার-অনুষ্ঠানে আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
শাজিলিয়া তরিকার মধ্যেও আহলে বাইতের প্রতি গভীর ভক্তির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। মিসরে ইমাম হুসাইনের মাওলিদ উদযাপনে শাজিলিয়া তরিকার সক্রিয় অংশগ্রহণ আজও দেখা যায়। সমসাময়িক গবেষণায় দেখা গেছে, শাজিলি সুফিদের কাছে ইমাম হুসাইনের স্মরণ একইসাথে ঐতিহাসিক আবেগ এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলনেরও অংশ।
বেকতাশিয়া তরিকার ক্ষেত্রে আহলে বাইত-প্রেম আরও স্পষ্ট। বেকতাশি আচার ও শিক্ষায় হজরত আলী, বারো ইমাম এবং কারবালার স্মৃতি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। আশুরা স্মরণ, বারো ইমামের প্রতি ভক্তি এবং কারবালার শাহাদতকে আধ্যাত্মিক শিক্ষার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা বেকতাশি ঐতিহ্যের দীর্ঘদিনের রীতি।
মাওলাভিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা জালালউদ্দিন রুমি তাঁর মসনবী ও অন্যান্য রচনায় কারবালাকে প্রেম, আত্মসমর্পণ এবং হকের পথে অবিচল থাকার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। রুমির কাছে ইমাম হুসাইন ছিলেন এমন একজন, যিনি পার্থিব ক্ষমতার কাছে মাথা নত না করে আধ্যাত্মিক বিজয়ের পথ দেখিয়েছেন।
নূরবখশিয়া তরিকা, যার শিকড় পারস্য ও মধ্য এশিয়ায়, আহলে বাইতের প্রতি বিশেষ ভক্তির জন্য পরিচিত। এই তরিকার ধর্মীয় সাহিত্য ও আচার-অনুষ্ঠানে ইমামদের স্মরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে উপস্থিত।
প্রায় প্রতিটি বড় সুফি তরিকাতেই আহলে বাইত-প্রেম এবং কারবালার স্মৃতি কোনো না কোনো রূপে কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। এই দার্শনিক ভিত্তিটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটাই ব্যাখ্যা করে কেন বিশ্বজুড়ে সুফি তরিকাগুলো মহররমকে ধারণ করে এসেছে।
তুরস্কে অটোমান সুফি তরিকাগুলো, মেভলভিয়া, বেকতাশিয়া, রিফাইয়া, হালভেতিয়া, প্রতিবছর মহররম উপলক্ষে মজলিস করত। ইস্তাম্বুলে ‘আশুরে’ রান্না আজও সুফি সংস্কৃতির অংশ। ইরাকে আবদুল কাদের জিলানীর দরগাহে আজও আশুরা পালন হয়। মরক্কোতে শাজিলি ও তিজানি খানকাহগুলোতে আশুরা বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইন্দোনেশিয়ার আচেহ ও মিনাংকাবাউ অঞ্চলের সুফি সমাজে ‘তাবুত’ অনুষ্ঠান শতাব্দী প্রাচীন।
সুফি কবিরাও এই সাক্ষ্য দেন। রুমি কারবালাকে দেখেছেন প্রেমের ভাষায়, আত্তার দেখেছেন আত্মসমর্পণের ভাষায়, সুলতান বাহু দেখেছেন বেলায়েতের পরিপূর্ণ প্রকাশ হিসেবে, বুল্লে শাহ দেখেছেন জালিমের সামনে ‘না’ বলার শিক্ষা হিসেবে, শাহ আবদুল লতিফ ভাট্টাইয়ের সিন্ধি কাব্যে ইমাম হুসাইন প্রেমের প্রতীক। এই কবিরা কেউ আক্ষরিক অর্থে শিয়া ছিলেন না।
সুফি তত্ত্বে কারবালা কেন এত কেন্দ্রীয়? একটি উত্তর হলো, কারবালা সুফি আধ্যাত্মিকতার মূল প্রশ্নের উত্তর দেয়। ফানা মানে নিজেকে সত্যের পথে বিলিয়ে দেয়া। ইশক মানে এমন প্রেম যেখানে ক্ষতির হিসাব থাকে না। বেলায়েত মানে আল্লাহর সঙ্গে এমন নৈকট্য যেখানে মৃত্যুও বাধা নয়। ইমাম হুসাইন এই তিনটিরই সর্বোচ্চ উদাহরণ। তিনি সংখ্যার হিসাব করেননি, শক্তির ভারসাম্য বিবেচনা করেননি, সত্যকে আঁকড়ে ধরে জীবন দিয়েছেন। কারবালা সুফিদের কাছে আধ্যাত্মিক সত্যের জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
৩.
এবার মূল প্রসঙ্গ তথা বাংলার সুফি-সমাজের সঙ্গে আশুরা উদযাপনের ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা করা যাক।
বাংলায় হযরত শাহজালাল রা. এসেছিলেন সিলেটে, শাহ মখদুম রূপোশ রা. এসেছিলেন রাজশাহীতে, জালালউদ্দিন তাবরিজি রা. এসেছিলেন পান্ডুয়ায়, আঁখি সিরাজউদ্দিন রা. এসেছিলেন গৌড়ে। তাঁদের প্রত্যেকে তাঁদের সিলসিলায় আহলে বাইতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা যখন বাংলায় ইসলাম ছড়িয়েছেন পূর্ণ আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির মাধ্যমে। যার মধ্যে ইমাম হুসাইনের প্রতি ভালোবাসা এবং কারবালার স্মৃতিও অন্তর্ভুক্ত।
এই ঐতিহ্য বাংলার মাটিতে কীভাবে প্রকাশ পেয়েছে, সেটা বোঝার জন্য কয়েকটি অঞ্চলের দিকে তাকানো দরকার।
রাজশাহীতে শাহ মখদুম রূপোশ। যিনি ছিলেন আবদুল কাদের জিলানীর পৌত্র। ১২৮৬ সালে বাগদাদ থেকে এসেছেন। পদ্মার পাশে থিতু হয়েছেন। তাঁর দরগায় প্রতি বছর ১০ মহররম মেলা বসে, তাজিয়া বের হয়, লাঠিখেলা হয় ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে।
শাহ মখদুম রূপোশ রহ. এর দরগাকে ঘিরে মহররম পালনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর প্রাচীন লিখিত ঐতিহ্য। মুঘল আমলে রচিত একটি ফারসি পাণ্ডুলিপিতে এই দরগাহে মহররম পালনের বিবরণ সংরক্ষিত আছে। জানা যায়, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে শাহ মখদুমের দরগার মোতাওয়াল্লি ও খাদেমরা দরগার ইতিহাস, শাজরা, আচার-অনুষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহ্য লিপিবদ্ধ করার উদ্যোগ নেন। সেই পাণ্ডুলিপিতে মহররম উদযাপনের কথাও উল্লেখ করা হয়। গবেষকদের মতে, এটি বাঙলায় মহররম পালনের সবচেয়ে প্রাচীন লিখিত দলিলগুলোর একটি।
এই তথ্যটির গুরুত্ব বহুবিধ। কারণ এটি দেখায় যে সপ্তদশ শতকেই রাজশাহীর এই কাদেরিয়া ঘরানার সুফি দরবারে মহররম ছিল একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশীলন। অর্থাৎ, মহররম এখানে কোনো সাম্প্রতিক সংযোজন ছিল না, কিংবা কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের সীমাবদ্ধ অনুশীলনও ছিল না। এটি দরগাহকেন্দ্রিক সুফি জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পালিত হয়ে এসেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, শাহ মখদুম রূপোশ রহ. নিজে ছিলেন কাদেরিয়া সিলসিলার একজন সুফি এবং হজরত আবদুল কাদের জিলানির বংশধর। ফলে তাঁর দরগায় মহররম পালনের এই দীর্ঘ ঐতিহ্যকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি সেই বৃহত্তর সুফি ঐতিহ্যেরই অংশ, যেখানে আহলে বাইতের প্রতি মুহাব্বত, কারবালার স্মৃতি এবং আশুরার তাৎপর্য আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
কাদেরিয়া তরিকার এই দরবারে মহররম পালন মানে আবদুল কাদের জিলানী থেকে আসা একটি ধারা, যেটা রাজশাহীর মাটিতে শিকড় গেড়েছে। এটাকে ‘শিয়া প্রভাব’ বলার কোনো সুযোগ নেই। কারণ যে তরিকা থেকে এই দরবার, সেই তরিকার প্রতিষ্ঠাতারই রক্তে ইমাম হুসাইন।
সিলেটের শাহজালাল রহ. এর দরগাহের ইতিহাসও একই সাক্ষ্য দেয়। শাহজালাল রহ. ছিলেন বাংলার সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফিদের একজন। ১৩০৩ সালে সিলেট বিজয়ের পর তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা এই অঞ্চলে যে আধ্যাত্মিক ধারা প্রতিষ্ঠা করেন, পরবর্তী কয়েক শতাব্দী ধরে সেটিই উত্তর-পূর্ব বাংলার মুসলিম সমাজের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তাঁর ইন্তেকালের পর দরগাহটি সিলেটের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক সৈয়দ মুর্তজা আলী শাহজালালকে ‘সিলেটের অভিভাবক সাধক’ বলে উল্লেখ করেছেন।
শাহজালালের দরগাহকে ঘিরে একটি শক্তিশালী খাদেম পরিবার গড়ে ওঠে, যাদের প্রভাব সিলেটের বাইরে ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা, কাছাড় এবং আসামের বিভিন্ন অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। মহররম মাসে বাঙলা ও আসামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ সিলেটে আসতেন। ঝরনারপাড়ের সৈয়দ পরিবার, যারা শাহজালালের অন্যতম সফরসঙ্গী সৈয়দ হামজা শেরসোয়ারির বংশধর বলে পরিচিত, এই মহররম-অনুষ্ঠানগুলোর নেতৃত্ব দিতেন। ব্রিটিশ আমলের বিবরণ থেকে জানা যায়, মহররম উপলক্ষে শাহজালালের দরগাহকে কেন্দ্র করে বিশাল অনুষ্ঠান হতো, যা সিলেটের জনজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৭৮২ সালের আশুরাকে কেন্দ্র করে একটি বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহ কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। শাহজালাল রা. এর দরগাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা দীর্ঘ সুফি ঐতিহ্য, আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা এবং মহররমের গণসমাবেশই পরবর্তীকালে ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধের একটি শক্তিশালী অংশে পরিণত হয়েছিল।
পলাশীর যুদ্ধের মাত্র পঁচিশ বছর পর। বাঙলার বহু অঞ্চলের মতো সিলেটেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমতে শুরু করেছে। ১৭৭৮ সালে রবার্ট লিন্ডসে সিলেটের কালেক্টর বা সুপারভাইজার নিযুক্ত হন। সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি চুনাপাথর, বেত, সুপারি ও হাতির ব্যবসায় ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে পড়েন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। স্থানীয় মানুষের চোখে তিনি ধীরে ধীরে শোষণ ও কোম্পানি শাসনের প্রতীকে পরিণত হন।
১৭৮১ সালে সিলেটে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। ফসল নষ্ট হয়, দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ে। উইলিয়াম উইলসন হান্টারের বর্ণনা অনুযায়ী, দুর্ভিক্ষ ও মহামারিতে অঞ্চলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রাণ হারায়। কিন্তু এত বড় বিপর্যয়ের মধ্যেও কোম্পানির খাজনা আদায় বন্ধ হয়নি। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক ক্ষোভ সঞ্চারিত হয়; বিস্ফোরণ ছিল সময়ের ব্যাপার।
সিলেটের শাহজালাল রহ. এর দরগার পাশে কুমারপাড়ার ঝরনারপাড়ে বাস করতেন একটি প্রভাবশালী সৈয়দ পরিবার। তাঁরা ছিলেন হযরত শাহজালালের সফরসঙ্গী সৈয়দ হামজা শেরসোয়ারির বংশধর এবং দরগার প্রথম খাদিম হাজি সারেকওম মুহাম্মদ ইউসুফের উত্তরসূরি বলে পরিচিত। এই পরিবারের দুই সদস্য, সৈয়দ মুহাম্মদ হাদি ও সৈয়দ মুহাম্মদ মাহদি, সিলেটবাসীর কাছে যথাক্রমে হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া নামে পরিচিত ছিলেন। সিলেট ছাড়াও ময়মনসিংহ, ত্রিপুরা, কাছাড় এবং আসামের বিভিন্ন অঞ্চল পর্যন্ত তাঁদের প্রভাব বিস্তৃত ছিল। মহররম মাসে বাঙলা ও আসামের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ শাহজালালের দরগায় সমবেত হতো এবং এই পীরজাদা পরিবার সেই সমাবেশের নেতৃত্ব দিত।
শাহসহ বিভিন্ন ফকির নেতার ভাষণে শাহাদাত, জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং কারবালার স্মৃতি ফিরে এসেছে। সমসাময়িক ব্রিটিশ নথিপত্রেও ফকিরদের ধর্মীয় সমাবেশ ও চলাচল নিয়ে প্রশাসনিক উদ্বেগের কথা পাওয়া যায়।
এমন এক পটভূমিতে আসে ১০ মহররম, ১১৯৭ হিজরি। খ্রিস্টীয় ১৬ ডিসেম্বর ১৭৮২। আশুরার দিন। হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া প্রায় তিনশো অনুসারীকে নিয়ে একটি তাজিয়া মিছিলের নেতৃত্ব দেন। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় শোভাযাত্রার ভেতরে লুকিয়ে ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধের পরিকল্পনা। রবার্ট লিন্ডসে তাঁর গুপ্তচরদের মাধ্যমে আগেই এই সংবাদ পেয়ে যান। তিনি স্থানীয় কানুনগো মাসুদ বখত এবং দেওয়ান মানিক চাঁদের সহায়তায় সশস্ত্র সিপাহি নিয়ে শাহি ঈদগাহের দিকে অগ্রসর হন।
লিন্ডসে তাঁর স্মৃতিকথা ‘অ্যানেকডোটস অব অ্যান ইন্ডিয়ান লাইফ’-এ লিখেছেন, তিনি বিদ্রোহীদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেন। কিন্তু পীরজাদারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। জনশ্রুতি অনুযায়ী, হাদা মিয়া তখন ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমরা কি ফিরিঙ্গিদের কুকুর যে তাদের হুকুম তামিল করব? আজ মারবার অথবা মরবার দিন। ইংরেজ রাজত্ব আজ খতম।’ এরপর বিদ্রোহীরা শাহি ঈদগাহের আশপাশের টিলায় অবস্থান নেন এবং সংঘর্ষ শুরু হয়।
লিন্ডসের নিজের বর্ণনা অনুযায়ী, একপর্যায়ে তাঁর সঙ্গে পীরজাদার সরাসরি তরবারির লড়াই হয়। হাদা মিয়ার আঘাতে লিন্ডসের তরবারি ভেঙে যায়। তখন তাঁর সঙ্গে থাকা এক জমাদার তাঁকে একটি পিস্তল দেন। সেই পিস্তল দিয়েই লিন্ডসে হাদা মিয়াকে গুলি করেন। কিছুক্ষণ পর মাদা মিয়াও শহিদ হন। লিন্ডসে লিখেছেন, তাঁর একজন সিপাহি নিহত হয়েছিল এবং কয়েকজন আহত হয়েছিল। বিদ্রোহীদেরও কয়েকজন নিহত ও অনেকে আহত হন।
সন্ধ্যার পর শহরের বিভিন্ন স্থানে মশাল জ্বলে উঠতে দেখে লিন্ডসে দ্বিতীয় দফা আক্রমণের আশঙ্কা করেছিলেন। পরে জানা যায়, সেগুলো ছিল শহিদদের দাফনের প্রস্তুতি। হাদা মিয়া ও মাদা মিয়াকে শাহি ঈদগাহের কাছেই দাফন করা হয়। আজও ঈদগাহের উত্তর দিকের টিলা ‘হাদা মাদা টিলা’ নামে পরিচিত।
ভাবনার খোরাক আছে। শাহজালাল রহ. ছিলেন সুন্নি সুফি। তাঁর দরগার পীরজাদারাও ছিলেন সুন্নি সৈয়দ পরিবার। কিন্তু তাঁরা আশুরার তাজিয়া মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, কারবালার ভাষায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে শহিদ হচ্ছেন। আঠারো শতকের বাঙলায় মহররম যে শোকের পাশাপাশি প্রতিরোধেরও ভাষা ছিল, এই ঘটনা তার অন্যতম শক্তিশালী প্রমাণ।
এই একটি ঘটনা অনেক কিছু প্রমাণ করে। হযরত শাহজালালের দরগার সুন্নি পীরজাদারা আশুরার মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এটা তাঁদের নিজেদের ঐতিহ্য ছিল এবং সেই ঐতিহ্যকে তাঁরা প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন, ‘কুল্লু ইয়াউমিন আশুরা, কুল্লু আরদিন কারবালা’ অর্থাৎ প্রতিটি দিন আশুরা, প্রতিটি স্থান কারবালা।
ঐতিহাসিকভাবে, ঢাকার সবচেয়ে প্রাচীন দরবার, আজিমপুর দায়রা শরীফে বেশ ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হতো। ছোট দায়রা শরীফের ৬ষ্ঠ সাজ্জাদানশীন, হযরত সাইয়্যিদ শাহ সুফি দায়েমউল্লাহ রা. প্রতি বৎসর ১লা মহররম হইতে ১০ই মহররম পর্যন্ত তিনি প্রতিদিন বাদ এশা ছোট দায়রা শরীফ মসজিদে কারবালার ঘটনাবলী নিয়ে ধারাবাহিক বয়ান প্রদান করতেন। ১০ই মহররম তিনি বিকাল পর্যন্ত খাবার গ্রহণ করতেন না। এটাকে বলে ফাঁকা থাকা। রোজা না। কিন্তু খাবার স্পর্শ করাও না। এটা সুফিদের নিয়মিত চর্চা। বাদ যোহর তিনি এমন হৃদয়স্পর্শী ও মর্মস্পর্শী ভাষায় কারবালার ঘটনাবলী বর্ণনা করতেন যে, উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলী আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন। আশুরার দিনে তিনি কালো পোশাক পরিধান করতেন।
হুসাইনি দালান ইমামবাড়া হতে সকাল ১০টার আশুরার শোকমিছিল যখন প্রায় ১২টার সময় ছোট দায়রা শরীফ অতিক্রম করত, তখন তিনি তাঁর দাদা হযরত সুফি আজমতউল্লাহ রা. এর মাজার শরীফ থেকে বের হয়ে ছোট দায়রা শরীফের প্রধান ফটক পর্যন্ত দুলদুল ঘোড়ার রশি ধরে অগ্রসর হতেন।আশুরার দিনে ছোট দায়রা শরীফে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম ঘটত। অনেকে হযরতের হৃদয়গ্রাহী কারবালার বয়ান শোনার জন্য, অনেকে মহররমের শোকমিছিল দেখার জন্য এবং অনেকেই তবারকস্বরূপ খিচুড়ি গ্রহণের উদ্দেশ্যে উপস্থিত হতেন।
বাঙলায় সুন্নি দরবার ও খানকাহগুলোতে মহররম পালনের ঐতিহ্য ছিল শক্তিশালী। আশরাফিয়া দরবারের মতো বড় সুন্নি প্রতিষ্ঠানে মহররমের প্রথম দশ দিন বিশেষ ব্যবস্থা থাকত। তবে সব সুন্নীরা যে তা করতো বা গ্রহণ করতো, এমন না। এ নিয়ে একটি বিখ্যাত ঘটনা আছে।
ষোড়শ শতাব্দীর ঘটনা। আশরাফিয়া দরবার প্রতি বছর মহররমের তাজিয়া মিছিল নিয়ে বের হয়। তখন বিখ্যাত সুফি মাওলানা মোহাম্মদ শাহবাজ রা. ছিলেন ভাগলপুরের পীর সাহেব এবং তৎকালীন জামানার বিখ্যাত আলেম। তিনি তাজিয়া মিছিল মানতেন না। একবার আশুরার ঘটনা। আশরাফিয়া দরবার থেকে তাজিয়া নিয়ে বের হয়েছেন দরবারের মানুষজন। তখন মাওলানা মোহাম্মদ শাহবাজ রা. সামনে দাঁড়ালেন বাধা প্রদান করার জন্য। কিন্তু পরক্ষণেই সেখান থেকে চলে আসলেন। তারপর, যখন জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি তো বাধা দেয়ার জন্য গিয়েছিলেন, ফিরে এলেন যে? তিনি তখন বললেন, ‘আমি দেখলাম, তাজিয়ার উপরে ইমাম হুসাইন বসে আছেন। তখন আর কীসের বিরোধিতা করবো?’ তার পরবর্তী প্রজন্ম ছিলেন ঢাকার নবাব বাড়ির পীর সাহেব।
কেন বাঙলার প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে মহররম টিকে ছিল?
প্রথম কারণ হলো সিলসিলাগত। প্রতিটি সুফি তরিকার সিলসিলা আহলে বাইতের সঙ্গে যুক্ত। এই সংযোগ আহলে বাইত-প্রেম স্বাভাবিক করে দেয়, এবং সেই প্রেম থেকে কারবালার স্মৃতি আসে।
দ্বিতীয় কারণ হলো সামাজিক। মহররম ছিল দরিদ্রের লঙ্গর, কৃষকের মানত, কারিগরের কাজ, নবাবের পৃষ্ঠপোষকতা, সুফির আধ্যাত্মিক সাধনা। এতগুলো সামাজিক স্তর একসঙ্গে জড়িত থাকলে কোনো কিছু সহজে মরে যায় না।
তৃতীয় কারণ হলো নৃতাত্ত্বিক। কারবালার আখ্যান বাঙলার মানুষের জীবনের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল পুঁথিতে, জারিগানে, মার্সিয়ায়। এটা বাঙলার সংস্কৃতির অংশ হয়ে গিয়েছিল।
চতুর্থ কারণ হলো রাজনৈতিক। কারবালা ছিল প্রতিবাদের ভাষা। যখনই অন্যায় হয়েছে, কারবালার রূপক ব্যবহৃত হয়েছে। ১৭৮২ সালে সিলেটে, ফকির আন্দোলনে, ১৮৫৭ সালে, খিলাফত আন্দোলনে, ভাসানীর কৃষক সংগ্রামে। এই রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতাই মহররমকে জীবন্ত রেখেছে।
ফকির সন্ন্যাসী আন্দোলনের বহু ফকির, বিশেষত মাদারিয়া তরিকার ফকিররা, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের সামনের সারিতে ছিলেন। মাদারিয়া তরিকায় পঞ্জাতনে পাকের প্রতি ভক্তি এবং আহলে বাইতের স্মরণ দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। মজনু শাহ, মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহসহ বিভিন্ন ফকির নেতার ভাষণে শাহাদত, জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং কারবালার স্মৃতি ফিরে এসেছে। সমসাময়িক ব্রিটিশ নথিপত্রেও ফকিরদের ধর্মীয় সমাবেশ ও চলাচল নিয়ে প্রশাসনিক উদ্বেগের কথা পাওয়া যায়।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় মহররমের সমাবেশগুলোকে ব্রিটিশ প্রশাসন বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করত। উত্তর ভারতের বহু অঞ্চলে তাজিয়া, মজলিস এবং আশুরার জনসমাগমকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্র বলে মনে করা হতো। বিদ্রোহের পর ধর্মীয় শোভাযাত্রা ও জনসমাবেশের ওপর নজরদারি আরও বাড়ানো হয়। মহররমও সেই পর্যবেক্ষণের আওতায় আসে।
উনিশ শতক জুড়ে ব্রিটিশ প্রশাসনিক প্রতিবেদন, পুলিশি নথি এবং ভ্রমণবৃত্তান্তে মহররমকে ক্রমশ আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে উপস্থাপন করা হতে থাকে। মিছিলের রুট নির্ধারণ, লাইসেন্স ব্যবস্থা, পুলিশি নিয়ন্ত্রণ এবং নজরদারি চালু করা হয়। বহু ঔপনিবেশিক লেখক মহররমকে সংঘর্ষ ও অশান্তির সঙ্গে যুক্ত করে বর্ণনা করেছেন। সাম্প্রতিক গবেষকরা মনে করেন, এই দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও শাসনকৌশল কাজ করেছিল। এর ফলে মহররমের জারিগান, মার্সিয়া, মজলিস, লঙ্গর, নিয়াজ, পুঁথিপাঠ এবং বহুসাম্প্রদায়িক অংশগ্রহণের দীর্ঘ ঐতিহ্য ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে আড়ালে পড়ে যায়।
বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম রহস্যময় ও প্রতিবাদী ব্যক্তিত্ব মাওলানা ভাসানী ছিলেন কাদেরিয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দিয়া— তিন তরিকারই মুরিদ ও খলিফা। তাঁর পীর ও মুর্শিদ ছিলেন মাওলানা নাসিরুদ্দিন বাগদাদী।
মাওলানা ভাসানীর কাছে কারবালা কেবল অতীতের শোকগাঁথা ছিল না। তিনি কারবালাকে দেখতেন জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে। তাঁর রাজনৈতিক ভাষায় তাই ইয়াজিদি শক্তি, ফেরাউনি শক্তি, সাম্রাজ্যবাদ এবং মজলুমের মুক্তির প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে। টাঙ্গাইলের সন্তোষে তাঁর নেতৃত্বে মহররম পালনও এই রাজনৈতিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ ছিল।
৪.
প্রশ্ন হলো, এই দীর্ঘ ঐতিহ্য কীভাবে ভেঙে গেল?
উনিশ শতকের সংস্কারবাদী আন্দোলন, ফরায়েজি, তরিকা-ই-মুহাম্মদিয়া, বিভিন্নভাবে মহররম পালনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করেছিল। সৈয়দ আহমদ বেরলভি ও শাহ ইসমাইল দেহলভী ১৮১৮–১৮২০ সালে উত্তর ভারতে আশুরা, মহররম উদযাপন বন্ধ করার জন্য প্রচার চালিয়েছিলেন। বাঙলায়ও এর ঢেউ এসেছিল।
একটি প্রাচীন তুর্কি প্রবাদ আছে। একটি ব্রিটিশ বিমান যদি সাগরের উপর দিয়েও উড়ে যায়, তাহলে সাগরের তলদেশের মাছেরা পর্যন্ত দুই ভাগ হয়ে যায়।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন শিয়া ও সুন্নির আলাদা তালিকা বানিয়ে মুসলমান সমাজকে শ্রেণীবিভক্ত করে দিল, যেটা আগে এতটা প্রকট ছিল না। এই শ্রেণীবিভাগ সামাজিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে শুরু করল। বিশ শতকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সংস্কারবাদী মতাদর্শ, বিশেষত আশি-নব্বইয়ের দশকে রেমিট্যান্সের সঙ্গে আসা ওয়াহাবি-সালাফি প্রভাব, মসজিদ তৈরিতে সৌদি অর্থ, মাদ্রাসায় সৌদি পাঠ্যক্রম, টেলিভিশনে সৌদি ফতোয়া, এই প্রভাবে বাঙলার ধর্মীয় পরিবেশ বদলাতে শুরু করল। এভাবেই বাংলার অন্যতম প্রাচীন যৌথ ঐতিহ্যকে ‘ওটা তাদের’ বলে আলাদা করে দেখা শুরু হলো।
কিন্তু ইতিহাস মনে রাখে। পুরান ঢাকার অনেক পরিবারের বাড়ির পুরনো সিন্দুকে এখনও হয়তো আছে, একটা পুরনো আলম, ধুলো জমা মার্সিয়ার খাতা, হাতে লেখা ফারসি নওহার পঙক্তি, একটা ছোট রুপার পাঞ্জা। এগুলো কী, কেন রাখা আছে, উত্তরসূরিরা অনেক সময় জানেন না। অনেক বাড়িতে মহররমের প্রথম দশ দিন স্বাভাবিক রান্না হয় না, মাছ, মাংস তথা আমিষ রান্না হয় না।
যদি মহররম সত্যিই কেবল শিয়াদের বিষয় হতো, তাহলে উপমহাদেশের কোটি কোটি সুন্নি মুসলমান তাঁদের সন্তানদের নাম হাসান, হুসাইন, জয়নাল, কাসেম, আব্বাস, আকবর, আসগর, সাকিনা, এসব নাম এত ব্যাপকভাবে কেন রেখেছেন? বাঙলার মুসলমান পরিবারে এই নামগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম বহন করে চলেছে। এটি বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক।
আজও বাঙলার বহু সুন্নি পরিবার, সুফি খানকাহ এবং দরবারে মহররম উপলক্ষে নানা ধরনের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। যদিও অঞ্চলভেদে এবং প্রতিষ্ঠানভেদে এর ধরন ভিন্ন, তবুও কয়েকটি অনুশীলন এখনও ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মজলিস, মার্সিয়া পাঠ, কারবালার বয়ান, মিলাদ, কোরআনখানি, ফাতেহা এবং শিরনি বিতরণ।
মহররমের প্রথম দশ দিন অনেক সুন্নি খানকাহ, দরবার এবং ধর্মীয় পরিবারে বিশেষ মজলিসের আয়োজন করা হয়। এসব মজলিসে কারবালার ঘটনা, ইমাম হুসাইন রা. ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদত, আহলে বাইতের মর্যাদা এবং আশুরার শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করা হয়। কোথাও এটি নিয়মিত ওয়াজ মাহফিলের অংশ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়, কোথাও আবার আলাদা মজলিসের আকারে আয়োজন করা হয়। অনেক সুফি দরবারে আজও মহররমের দিনগুলোতে প্রতিদিন বা নির্দিষ্ট কয়েকদিন কারবালার ঘটনাপ্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করার রেওয়াজ রয়েছে। সুফি ধারার বহু খানকাহে মহররম উপলক্ষে বিশেষ মজলিস বসে।
মার্সিয়া পাঠের ঐতিহ্য এখনও সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি। পুরান ঢাকার কিছু পরিবার, বিভিন্ন সুফি দরবার এবং উত্তর ভারতীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ধর্মীয় পরিবারে আজও মার্সিয়া পাঠ করা হয়। কোথাও উর্দু মার্সিয়া আবৃত্তি করা হয়, কোথাও বাঙলা ভাষায় কারবালার কাহিনি পাঠ করা হয়। মীর আনিস, মীর্জা দাবির এবং অন্যান্য মার্সিয়াকারদের রচনা এখনও অনেক ধর্মীয় ও সাহিত্যিক মহলে সমাদৃত। অনেক স্থানে মাহফিল বা মজলিসের অংশ হিসেবেও মার্সিয়া পাঠ করা হয়।
কারবালা বিষয়ক বয়ানও এখন সুন্নি সমাজে অত্যন্ত জনপ্রিয়। চট্টগ্রামে ১০ দিন ব্যপী ‘শোয়াদায়ে কারবালা কনফারেন্স’ যুগের পর যুগ ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশেষত আশুরার আগে ও পরে বিভিন্ন মসজিদ, খানকাহ এবং মাহফিলে আলেমরা ইমাম হুসাইনের শাহাদত, কারবালার শিক্ষা, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার আদর্শ এবং জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন। বাঙলার বহু অঞ্চলে মহররম উপলক্ষে বিশেষ ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়, যেখানে কারবালার ঘটনাই মূল আলোচ্য বিষয়।
মিলাদ ও কোরআনখানিও আজ সুন্নি সমাজে মহররম পালনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। অনেক পরিবার, পীরবাড়ি ও খানকাহে মহররমের প্রথম দশদিন বা আশুরার দিন বিশেষ মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। কোরআন তিলাওয়াত, দুরুদ শরীফ পাঠ এবং আহলে বাইত ও কারবালার শহিদদের রূহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়। অনেক স্থানে পুরো কোরআন খতমের আয়োজনও করা হয়।
এসব চর্চার ধরন একেক জায়গায় একেক রকম হলেও একটি বিষয় অভিন্ন। বাংলার বহু সুন্নি পরিবার ও সুফি দরবারে আজও মহররম এলে পরিবেশ বদলে যায়। কোথাও দশদিন আমিষ বর্জন। কোথাও মজলিস বসে, কারবালার বয়ান হয়, মিলাদ ও ফাতেহার আয়োজন করা হয়। সময় পাল্টেছে, অনেক রীতি হারিয়েও গেছে, কিন্তু আহলে বাইতের প্রতি মহব্বত এবং কারবালার স্মৃতি এখনও বহু মানুষের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।