সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সম্পাদনা:
মোহাম্মদ আবু সাঈদ
প্রতিবেদন তৈরি:
মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম
সারাংশ
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে (১ই জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত) অন্তত ছয়টি (৬) মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর পাশাপাশি একটি (১) মাজারের ওরস পালনে পুলিশি বাধা, একটি (১) ওরসে হামলার চেষ্টা এবং একটি (১) হামলার গুজব শনাক্ত করা হয়েছে।
মাজারে প্রমাণিত হামলার ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে ১১ এপ্রিল, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম বাবার দরবারে। কোরআন অবমাননার অভিযোগে উচ্ছৃঙ্খল জনতা দরবারে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পীর শামীমকে পিটিয়ে-কুপিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় তার দুই অনুসারী গুরুতর আহত হন এবং প্রায় ২০ লক্ষ টাকার ক্ষয়-ক্ষতি হয়, যার মধ্যে ১০ লক্ষ টাকা নগদ ও ৪ ভরি স্বর্ণ লুট হয়। উক্ত ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও খেলাফত মজলিসের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা উঠে এসেছে।
সিলেটের বিশ্বনাথে হযরত ইব্রাহিম শাহ মাজারের বাউলগানের আসরে শতাধিক লোকের হামলায় তিনজন আহত হন এবং মসজিদও ভাঙচুর হয়। ঢাকার মিরপুরে শাহ আলী বাগদাদী মাজারে রাতের অন্ধকারে মাস্কপরা ১০০-১৫০ জনের দল ভক্তদের (বিশেষ করে নারীদের) লাঠিপেটা করে, মাজারের পবিত্র বস্তু ভাঙচুর করে এবং প্রায় ৯৬ হাজার টাকা ছিনতাই করে। এখানেও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে হযরত শাহ রউফ দরগাহের খাদেম ও তার বোনের ওপর দুই দফা হামলায় দুজন আহত হন এবং স্বর্ণের হার লুট হয়। বরিশালে হাবিব শাহের দরবারে মৃত্যুর পর কবর দেওয়াকে কেন্দ্র করে তৌহিদী জনতার হামলায় বাদ্যযন্ত্র ভাঙচুর ও দরবার তালাবদ্ধ করা হয়। চট্টগ্রামের রাউজানে হযরত লাল মিয়া শাহ মাজারে জুতা ও গরুর মল নিক্ষেপ করে পবিত্র স্থান অপবিত্র করা হয়। চাঁদপুরের লেংটা বাবার মাজারে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খাদেম আহত হন, যা প্রথমে বাইরের হামলার গুজব হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। হাইকোর্ট সংলগ্ন শাহ খাজা শরফুদ্দিন চিশতীর মাজারে পুলিশি বাধায় ভক্তদের ওরস পালন বাদাগ্রস্থ হয়। সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলায় ২৯ই জুন ঘটে যাওয়া একটি ঘটনায় হযরত কলিমুদ্দীন শাহের মাজারে ওরসে বাধাপ্রদান করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু উপস্থিত ভক্তবৃন্দ তৌহিদী জনতা পরিচয়ধারী আগত উগ্রপন্থীদের প্রতিহত করে।
প্রমাণিত ৬টি হামলার সর্বোচ্চ ২টি ঘটেছে কুষ্টিয়ায়। মাজারে হামলার জেরে ১টি মসজিদেও হামলা করা হয়েছে। হামলার পর অদ্যাবধি অন্তত ২টি দরবারে ওরসসহ অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এ-সকল হামলায় ১জন নিহত এবং নারীসহ অন্তত ১০+ জন আহত হয়েছেন। হামলার পেছনে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সংঘাত, স্থানীয় কোন্দল, মাদক-জুয়া নিয়ন্ত্রণের অজুহাত এবং মাজারের বিপুল সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণের লড়াই প্রধান ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির অন্তত দুটি বড় ঘটনায় সরাসরি যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া একটি হামলার ঘটনায় খেলাফত মজলিসের সম্পৃক্ততা পাওয়া গিয়েছে। প্রমাণিত হামলাসমূহের মধ্যে মাত্র দুইটি ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে- পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম হত্যায় এবং শাহ আলী বাগদাদীর মাজার হামলার ঘটনায়। দায়ের করা মামলা দুটির তদন্ত চলাকালীন সময়ে ভিডিও ফুটেজসহ উপযুক্ত প্রমাণের ভিত্তিতে কুষ্টিয়ার ঘটনায় ৪ জন এবং শাহ আলী বাগদাদীর মাজার হামলার ঘটনায় ৩ জন, মোট ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ও তার অঙ্গসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির অন্তত দুটি বড় ঘটনায় সরাসরি যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া খেলাফত মজলিসের স্থানীয় সদস্যের একটি হামলার ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। অন্তত ৩টি ঘটনায় হামলাকারীরা ‘নারায়ে তকবির/লিল্লাহি তাকবির – আল্লাহু আকবর’ স্লোগান দিয়েছে।
প্রায় সবকটি ঘটনায় প্রশাসন হামলা চলাকালীন সময়ে ঘটনাস্থলে বা নিকটবর্তী স্থানে থাকলেও তারা নিষ্ক্রিয় ছিল। তবে কিছু কিছু ঘটনায় হামলা পরবর্তী সময়ে তাদের সক্রিয় হতে দেখা গিয়েছে। প্রশাসন একটি মাজারের ওরস পালনে বাধাদানকারীর ভূমিকায় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাগুলোতে স্থিরচিত্র, ভিডিও ও কিছু সোশ্যাল একাউন্ট প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
লিঙ্কে ক্লিক করে সম্পূর্ণ প্রতিবেদনের পিডিএফ ডাউনলোড করতে পারেন।