ভূমিকা
শায়খ আঁখি সিরাজের বিস্তারিত জীবনীমূলক পাঠের পূর্বে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, হালআমল তথা আধুনিক থেকে চূড়ান্ত আধুনিকতার দিকে গমনরত এমন একটা সময়ে এসে শায়খ আঁখি সিরাজকে পাঠ করা কেন জরুরী?
প্রথমত, আজ থেকে প্রায় ৭০০ বছর আগের বাংলায় শায়খ আঁখি সিরাজ অত্যন্ত প্রভাবশালী সুফি সাধক হওয়া স্বত্ত্বেও, তাঁকে এখনো পর্যন্ত যথাযথভাবে পাঠ করা হয়নি। বিশেষত বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় তাঁর উপর তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়নি। ফলে চিশতিয়া তরিকার প্রাথমিক যুগের এই সুফিদের জানতে এখনও উর্দু ও ফারসির উপর নির্ভর করতে হয়।
দ্বিতীয়ত, বাংলায় ইসলামের প্রচার এবং এ অঞ্চলে একটি স্বকীয় মুসলিম সংস্কৃতি গঠনে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর হাত ধরেই বাংলায় চিশতিয়া তরিকার আগমন হয় এবং স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যাঁরা চিশতিয়া সিলসিলাকে গভীরভাবে বুঝতে চান, তাঁদের জন্য আঁখি সিরাজ অপরিহার্য।
তৃতীয়ত, বাংলা অঞ্চলে হযরত নিজামুদ্দীন আউলিয়া ও আমির খসরুর প্রতি যে বিশেষ আগ্রহ ও ভালোবাসা রয়েছে, তার সঙ্গে আঁখি সিরাজ সরাসরি যুক্ত। তিনি নিজামুদ্দীন আউলিয়ার প্রিয়তম ও প্রধান খলিফা এবং আমির খসরুরও ছাত্র ছিলেন। ফলে, চিশতিয়া তরিকার প্রাথমিক দিকের ইতিহাস শায়খ আঁখি সিরাজ ব্যতীত অসম্পূর্ণ।
চতুর্থত ও সবচেয়ে বড় কারণ হলো, সমকালীন ‘প্রগতিশীল’ সুফিবাদী চিন্তা। হালআমলে, উপমহাদেশে অল্পবিস্তর ‘প্রগতিশীল’ সুফিবাদী যে শ্রেণীটি রয়েছে, তাঁরা একটা মাজার বা পীরের সমাধিসৌধ নিয়ে কিভাবে চিন্তা করেন? এখানকার মাজারের সাথে বাই ডিফল্ট মসজিদ তো থাকেই। কিন্তু এর বাইরে তাঁরা চান মাজার বা সমাধিটা হোক সমকালের সবচেয়ে জীবন্ত জায়গা। মাজারকে দেখতে চান বহুমাত্রিক কেন্দ্র (Multidimensional Center) হিসেবে। তাঁদের কাঙ্ক্ষিত মাজারে থাকবে:
• বিশ্বমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা কেন্দ্র
• সমৃদ্ধ লাইব্রেরি
• সর্বসাধারণের জন্য লঙ্গরখানা
• প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধার হাসপাতাল
• সাংস্কৃতিক উৎসবমুখর পরিবেশ
আশ্চর্যের বিষয়, এই আধুনিক স্বপ্নের প্রায় পূর্ণ রূপ ৭০০ বছর আগেই গৌড় অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। সোনারগাঁয়ে হযরত শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার মাদ্রাসার পর আঁখি সিরাজের খানকায় ছিল তৎকালীন বাংলার সর্ববৃহৎ ও প্রধান মাদ্রাসা। এখানে ছিল উন্নতমানের গ্রন্থাগার, লঙ্গরখানা ও শাফাখানা (চিকিৎসালয়)। ৫০০-৭০০ আলেম নিয়মিতই তাঁর খানকায় ভিড় জমাতেন। এবং এসবের তত্ত্বাবধানে ছিলেন দিল্লির জ্ঞানপীঠ থেকে আসা নিজামুদ্দীন আউলিয়ার হাতে গড়া কষ্টিপাথরের মতো পরীক্ষিত এক সুফি শায়খ আঁখি সিরাজুদ্দিন ওসমান।
তাই বর্তমান সময়ে আঁখি সিরাজকে পাঠ করা নিছক ইতিহাস অনুসন্ধানের জায়গা থেকে নয়; বরং আমাদের সাংস্কৃতিক-আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে বেহতরভাবে উপলব্ধির জন্য এবং সমকালীন সংকট ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার শুদ্ধতর পন্থা অনুসন্ধানের এক ঐকান্তিক প্রয়াস।
***
বাংলার ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন এই ভূখণ্ডের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনে রূহানিয়াতের এক গভীর জাগরণ দেখা দিয়েছিল। বাংলার জনগণ মেতে উঠেছিল রূহানিয়াত চর্চায়। দ্বাদশ শতকের পরবর্তী সময়কার কথা। এর একটি ধারা শুরু হয় দিল্লির আধ্যাত্মিক অলিন্দে, সুলতান নিজামুদ্দিন আউলিয়া (১২৩৮- ১৩২৫ খ্রি.) এর ছায়ায়। সেই সিলসিলার প্রথম খলিফা শায়খ আঁখি সিরাজুদ্দীন উসমান (১২৫৮- ১৩৫৭ খ্রি.) এর মাধ্যমে। যিনি দিল্লির আধ্যাত্মিক শিকড় তথা সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়ার দারসগাহ-খানকা থেকে বাংলায় এসে এখানকার জনমানসে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আল্লাহর একত্ববাদ, মানবতা ও সংযমের শিক্ষা। বলে রাখা জরুরী যে, বাংলার জনমানসে রূহানিয়তের বীজ বপনের এটিই একমাত্র মাধ্যম নয়। অন্য একটি পথ ছিল নদিয়ার গৌড়ীয় বাঙাল পল্লিতে একজন বাঙালি বৈষ্ণব সন্ন্যাসীর আবির্ভাবের মধ্যে দিয়ে। এই নদিয়ায় শ্রীচৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৪ খ্রি.) আবির্ভূত হয়েছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর সংস্কারক রূপে, হিন্দু ধর্মের নবজাগরণকে নেতৃত্ব দিতে।
দুইটি ভিন্ন ভিন্ন পথ। ভিন্ন ভিন্ন জগৎদর্শন। একটি আহ্বান করে ‘তাওহীদ’র পথে– আত্মশুদ্ধি ও ত্যাগের মাধ্যমে পরমাত্মা এক আল্লাহর সান্নিধ্যে। অন্যটি ডাকে প্রেম, রস, আবেগ ও ভক্তির মাধ্যমে ভগবানের অনন্ত সাগরে বিলীন হতে। যদিও উভয়ের মধ্যকার সময়ের ব্যবধান প্রায় দেড়শত বছরের। তবু আজও ইতিহাস ও ঐতিহাসিকদের বয়ানে এই দর্শনদ্বয়ের প্রভাব ও পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক বিদ্যমান। দাবি করা হয়ে থাকে, বাংলায় আঁখি সিরাজুদ্দিনের শিক্ষা ও কার্যক্রমের মাধ্যমে শ্রীচৈতন্যের ভক্তিবাদের তথা হিন্দুধর্মের পুনর্জাগরণের সূচনা ঘটে।[1] ঋজু ভাষায়, শ্রীচৈতন্যের ভক্তিবাদ ও বৈষ্ণব আন্দোলনের অনানুষ্ঠানিক সূচনা ঘটে শায়খ আঁখি সিরাজের মাধ্যমে।[2]
তবে এই বিতর্কের আবর্তে জড়িয়ে পড়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। বরং আমাদের লক্ষ্য হলো একজন মহাপুরুষকে তাঁর নিজস্ব আলোয় দেখা, নিজস্ব ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক পরিসরে তাঁকে অনুধাবন করা। যাঁকে একদল বানাতে চায় চৈতন্য ভাবধারার পূর্বসূরি হিসেবে, অন্যপক্ষ দেখেন ইসলামি মরমী ধারার এক নির্মল আলোকবর্তিকা হিসেবে। এই দুই বিপরীত বয়ানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে শায়খ আঁখি সিরাজকে দেখার প্রয়োজন রয়েছে তাঁর নিজস্ব চিন্তা-চেতনা, ইতিহাস, ও রূহানিয়াত চর্চার উত্তরাধিকার অনুসারে।
বাংলার সুফি ইতিহাসে চিশতিয়া তরিকাই ছিল সবচেয়ে সুসংগঠিত ও প্রভাব-বিস্তারকারী। বাঙালি সুফিদের অধিকাংশই এই তরিকার সাধক ছিলেন, যারা বাংলার প্রান্তিক অঞ্চলে ইসলামের প্রচার প্রসার করেছেন। চিশতিয়া তরিকার প্রথম খলিফা হিসেবে বাংলায় আবির্ভূত হন শায়খ আঁখি সিরাজুদ্দীন উসমান। দিল্লির সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়া থেকে খেলাফতপ্রাপ্ত হয়ে তিনি বাংলার পাণ্ডুয়ায় আগমন করেন।
নাম, বংশ ও জন্মস্থান
শায়খ আঁখি সিরাজের প্রকৃত নাম- উসমান। বাবা-মায়ের দেয়া ডাকনাম সিরাজুদ্দীন। উভয়ের সমন্বয়ে তাঁকে ডাকা হয়- সিরাজুদ্দীন উসমান নামে। সৈয়দ নিজামুদ্দীন আউলিয়া কর্তৃক প্রাপ্ত, আঁখি (أخي তথা আমার ভাই) এবং আয়নায়ে হিন্দুস্তান (آینه هندوستان তথা ভারতবর্ষের দর্পণ) হলো উপাধি। এভাবে তাঁর নাম দাঁড়ায়, আয়নায়ে হিন্দ আঁখি সিরাজুদ্দীন উসমান। ইতিহাস ও সাহিত্যে “আঁখি সিরাজ” নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত। তাঁর মাজারের সদর দরজায় লেখা সম্পূর্ণ নাম- খলিফা হজরত সুলতানুল মাশায়িখ হজরত শায়েখ আঁখি সিরাজুল হক উদ্দিন ইবনে শায়েখ উসমান আওধি।[3] অযোধ্যা অঞ্চলে জন্মগ্রহণের ফলে অন্যান্যদের মতো তিনিও আওধি উপাধিতে ভূষিত হন। কতিপয় ইতিহাসবিদ তাঁকে বাদায়ুন অঞ্চলের অধিবাসী দাবি করে “বাদায়ুনী” বলেও সম্বোধন করেন। স্থানীয় লোকেরা তাঁকে ‘পিরানে পির’ বলেও সম্বোধন করতেন।[4]
ঐতিহাসিক প্রমাণ বিস্মৃত হবার কারণে বংশ পরিচয়, জন্মস্থান, প্রাথমিক জীবনসহ বর্ণনায় প্রতিটি পর্বে পর্বে মতপার্থক্য বিদ্যমান। স্বতন্ত্রভাবে ঐতিহাসিকগণ অনুমান ও সম্ভাব্য ধারণার উপর আঁখি সিরাজের জন্মস্থান – বাদায়ুন/ মাকনপুর/ লখনৌতি/ অযোধ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন।[5] তবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী- তিনি ৬৫৬ হিজরী/১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যা উপকণ্ঠে জন্মগ্রহণ করেন।[6] নির্ভরযোগ্য মতানুসারে তাঁর পিতার নাম, সাদুল্লাহ উসমান আওধি। মালদার ‘সাদুল্লাপুর’ অঞ্চলে নামটি আঁখি সিরাজের পিতার নামানুসারে রাখা। পিতা সাদুল্লাহ উসমান সুলতান আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহ (রাজত্ব ১৩০১-১৩২২) এর রাজ-দরবারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। মাতার নাম জানা যায়নি। শৈশবকালে বাবার সাথে তিনি জন্মস্থান অযোধ্যায় অতিবাহিত করে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে মায়ের সান্নিধ্যে বাংলার লখনৌতিতে আসেন।[7]
শায়খ আঁখি সিরাজের আধ্যাত্মিক জীবন
পারিবারিক বংশ-ইতিহাস ও তাঁর পূর্বসূরীদের নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্র না থাকলেও ঐতিহাসিকগণ একমত ছিলেন যে, তিনি এমন এক পরিবারে জন্মেছিলেন যারা সদা জ্ঞান-সাধনায় মগ্ন ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় লিপ্ত। ফলে পারিবারিক সূত্রে কম বয়সেই তাঁর মধ্যে রূহানিয়্যতের চেতনা পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু গৌড়ের তৎকালীন পরিবেশ তাঁর আত্মিক পরিপূর্ণতার জন্য যথেষ্ট ছিল না। অপরদিকে ১৩শ শতকের শেষভাগে দিল্লি হয়ে ওঠেছিল ভারতবর্ষের ইসলামী আধ্যাত্মিক চিন্তা-চর্চার প্রাণকেন্দ্র। বিশেষত, খাজা মইনুদ্দীন চিশতি’র (১১৪২- ১২৩৬ খ্রি.) আগমনের মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশে সর্বপ্রথম চিশতিয়া তরিকার সূচনা ঘটে। পরবর্তীতে তাঁর প্রধান খলিফা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকি (১১৭৩- ১২৩৫ খ্রি.) ও শেখ ফরিদউদ্দীন গঞ্জেশকর (১১৮৮- ১২৬৫ খ্রি.) এর মাধ্যমে সমগ্র উপমহাদেশে চিশতিয়া তরিকার ব্যাপক প্রসার ঘটে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ও আত্মিক পরিপক্বতার সন্ধানে মাত্র ১৪ বছর বয়সে আঁখি সিরাজ মায়ের অনুমতিক্রমে দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী তার ‘লাতায়েফে আশরাফি’ গ্রন্থে বলেন, দিল্লি যাত্রার সময় আঁখি সিরাজ তখন এতটা ছোট ছিলেন যে, তাঁর মুখে দাঁড়ি-গোঁফ কিছুই ছিল না।[8]
দিল্লিতে এসে তিনি শেখ ফরিদউদ্দীন গঞ্জেশকরের প্রধান খলিফা খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়ার নিকট বায়আত গ্রহণ করেন। এই বায়আত গ্রহণ প্রসঙ্গে ‘সিরুল আউলিয়া’ গ্রন্থের লেখক সৈয়দ মুহাম্মদ ইবনে মোবারক কিরমানি বলেন, “অযোধ্যা ও হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে যাঁরা সুলতানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে আঁখি সিরাজই ছিলেন সর্বপ্রথম।”[9] তিনি দিনরাত সর্বদা সুলতানের সান্নিধ্যে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। অধিকাংশ সময় তিনি নিঃসঙ্গ, দুনিয়াবিমুখ, একান্তে দরবারে বসে থাকতেন। তিনি বছরে একবার মাকে দেখতে লখনৌতি যেতেন, পুনরায় দিল্লি ফিরে এসে সুলতানের সেবায় নিয়োজিত হতেন। তিনি দরগাহের ‘জামাআতখানা’র এক কোণে রাত্রিযাপন করতেন এবং বাকি অংশটা জমায়েত ও মজলিসের জন্য নির্ধারিত ছিল। তাঁর নিকট ভোগবিলাসের বা বস্তুগত সম্পদ বলতে শুধু কিছু কাগজ ও বই থাকত। তাঁর সেই বইগুলো কিতাবখানা বা জামাআতখানাতেই সংরক্ষিত থাকত।[10]
এভাবেই কাটছিল দিন। একমাত্র মাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা ছাড়া পার্থিব বিষয়াদি থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। একসময় সুলতানুল মাশায়িখ বিভিন্ন অঞ্চলে খলিফা পাঠানোর জন্য যোগ্য শিষ্যদের মনোনয়ন করলেন। আঁখি সিরাজের নামও উক্ত তালিকায় ছিল। কিন্তু তাঁর নাম সুলতানের সামনে উপস্থাপন করা হলে তিনি বলেন,
“খেলাফতের প্রথম শর্ত- জ্ঞানের পূর্ণতা। আঁখি সিরাজের জ্ঞানের স্তরে কিছুটা কমতি রয়েছে।… অজ্ঞ পীর শয়তানের খেলনা স্বরূপ।”[11]
কিশোর বয়স থেকে দীর্ঘদিন সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়ার খেদমত করার পরও এই কথায় উপস্থিত সবাই হতবাক। কিন্তু আঁখি সিরাজ এই সিদ্ধান্ত নতশিরে মেনে নিলেন। এই প্রসঙ্গে সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী বলেন, “আঁখি সিরাজুদ্দীন’র মধ্যে জ্ঞানের অলংকারের ঘাটতি ছিল না, এরপরও জ্ঞানের ঘাটতিকে তিনি কখনোই লজ্জাজনক মনে করেননি। আধ্যাত্মিক দীক্ষায় আঁখি সিরাজ ইলমে লাদুন্নি বা আভ্যন্তরীণ জ্ঞানে সিদ্ধ হলেও বাহ্যিক, ধর্মীয় বিদ্যায় (প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা পুঁথিগত জ্ঞান) অপূর্ণতা ছিল।”[12] অন্যদিকে মুফতি গোলাম সরওয়ার লাহোরী বলেন, “আঁখি সিরাজ এতো অল্প বয়সে সুলতানের দরবারে এসেছিলেন যে, তখন তাঁর জন্য বাহ্যিক (জাহেরি) ইলমের পথ বন্ধ ছিল।”[13]
মুরশিদের এমন উপদেশ আঁখি সিরাজের জীবনের গতানুগতিক গতিবিধি ভেঙ্গে দেয়। প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন পুঁথিগত বিদ্যার। বাহ্যিক জ্ঞানের কমতির কারণে খেলাফতের মর্যাদা না দেয়ার বার্তা সবাইকে বেশ হতবাক করে। বিষয়টি সভায় উপস্থিত থাকা মাওলানা ফখরুদ্দিন জাররাদিকে (যিনি নিজামুদ্দীন আউলিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন ও তৎকালীন বিখ্যাত পণ্ডিত) আশ্চর্য করে। তাৎক্ষণিক খানিকটা গর্বের সাথে তিনি খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়ার নিকট আবদার করে বসেন, “আখিঁ সিরাজ অত্যন্ত গুণসম্পন্ন। বাহ্যিক জ্ঞান অধ্যয়নে সে পরিপূর্ণ ও জগৎ-বিখ্যাত হয়ে উঠবে। অনুমতি প্রদান করলে, আমি তাঁকে ছয় মাসেই পরিপূর্ণ জ্ঞানী হিসেবে গড়ে তুলবো।”[14] মাওলানা ফখরুদ্দিন জারদারির এমন আবদারে সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়া বলেন, এটি তো চমৎকার কথা! “ے در کار خیر حاجت هیچ استخاره نیست” (ভালো কাজে ইস্তিখারার করার দরকার পড়ে না!)
সুলতানের অনুমতিক্রমে শুরু হলো তীব্র পড়াশোনা। এ-সময় আঁখি সিরাজের সহপাঠী ছিলেন সিরুল আউলিয়ার লেখক শায়েখ সৈয়দ মুহাম্মদ কিরমানি। তাঁর সিরুল আউলিয়া গ্রন্থে বর্ণনা করেন, “শিক্ষার সূচনালগ্নে আমি ও সিরাজুদ্দিন একইসাথে মিজান, তসরিফ, ক্বাওয়াইদ ও মোকাদ্দিমায়ে তাহকিক অধ্যয়ন করি। শায়েখ ফখরুদ্দিন তাঁর জন্য ‘তসরিফ’ গ্রন্থটি রচনা করেন। গ্রন্থের নাম দেয়া হয় উসমানি। পাশাপাশি শায়েখ রুকনুদ্দিন ইন্দরপাতির কাছে কাফিয়ায়ে মুফাসসাল (কবিতা ও বাক্য গঠনের উচ্চতর নাহু), কুদুরি (ফিকাহ) ও মাজমাউল বাহরাইন (ফিকাহ ও কালাম সংমিশ্রিত গ্রন্থ) অধ্যয়ন করেন। এরপর স্বয়ং আঁখি সিরাজই পাঠদানে পারদর্শী হয়ে উঠেন।”[15] আঁখি সিরাজ এতটাই পারদর্শী হয়ে উঠেন যে, পরবর্তীতে খোদ তাঁর নিকটই শিক্ষার্থীরা ভিড় জমাতে লাগলেন। এছাড়াও তিনি কিছুদিন তুতিয়ে হিন্দ আমির খসরু (১২৫৩- ১৩২৫ খ্রি.) এর নিকট থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেন।[16]
ফখরুদ্দিন জাররাদির ওয়াদা মোতাবেক, উপযুক্ত শিক্ষকদের সান্নিধ্যে আঁখি সিরাজ ছয়মাসের মধ্যেই আরবি ভাষাজ্ঞান এবং ধর্মীয় জ্ঞানে মাধ্যমিক স্তরের সকল কিতাবাদি আয়ত্ত করেন। অল্প সময়ে এতো বেশি ও গভীর জ্ঞানার্জনের ঘটনা সহপাঠী ও উস্তাদদের হতবাক করে। পাঠদান শেষে ফখরুদ্দিন জাররাদি, আঁখি সিরাজকে সুলতানের দরবারে উপস্থিত করেন। তখন সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়া, আঁখি সিরাজকে পঠিত কিতাবাদিসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা থেকে নানা প্রশ্ন করেন। তিনি সকল প্রশ্নের যথাযথ ও প্রত্যাশিত উত্তর প্রদান করলে, সুলতান অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন।[17] তখনই নিজামুদ্দীন আউলিয়া তাঁকে খেলাফত প্রদান করেন এবং একইসাথে তাঁকে ‘আয়নায়ে হিন্দ’ তথা হিন্দুস্তানের দর্পণ উপাধিতে ভূষিত করেন। খেলাফত প্রদানপূর্বক তাঁকে সম্মানসূচক দরবেশি টুপি ও ‘খিলআত’ (উত্তরীয় বা পাগড়ি) প্রদান করা হয়। পরবর্তী জীবনে আঁখি সিরাজ এই খিলআত অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে সবর্দা সাথেই রাখতেন।
খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া তাঁকে অতিশয় স্নেহ করতেন এবং সবর্দা “আঁখি” (আমার ভাই) বলে সম্বোধন করতেন। তিনিই ভারতবর্ষের সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি নিজামুদ্দীন আউলিয়ার কাছ থেকে ইরাদত ও খেলাফতের শিরোপায় ভূষিত হন।[18] উপাধিদ্বয় ছাড়াও সুলতান তাঁকে কখনো কখনো “খাদেমে খাস” বলেও সম্বোধন করতেন।
এমতাবস্থায় সুলতানের মোহর সংবলিত খিলাফতনামা শায়খ নাসিরুদ্দীন মাহমুদের মাধ্যমে মাতৃভূমি অযোধ্যায় পাঠিয়ে পুনরায় নিজামুদ্দীন আউলিয়ার দরবারে শিক্ষা দীক্ষায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।[19] ধর্মজ্ঞানের প্রতি তাঁর ছিল নিখাদ আন্তরিকতা। সুলতানের ওফাতের পরও তিনি আরও তিন বছর জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার কাজে দিল্লিতে নিয়োজিত ছিলেন। এই সময়ে তিনি সর্বদা সুলতানুল মাশায়িখের রওজার গম্বুজের নিচে অবস্থান করতেন। তাঁর জ্ঞানলাভের এই অনবদ্য অগ্রগতি সম্পর্কে সহপাঠি মুফতি আবদুল খবির, তার সিরুল আউলিয়া গ্রন্থে সৈয়দ মুহাম্মাদ আশরাফি কিসওয়াসাভির বরাতে বলেন, “তাঁর জ্ঞানপরিধি বোঝার জন্য দেখতে হবে– যুগের প্রথম দিক অতিবাহিত হওয়ার পর, শায়েখের নির্দেশ পেয়েই আঁখি সিরাজ কীভাবে জ্ঞান সাধনায় নিয়োজিত হন। আর কীভাবে শায়েখের দোয়ায় নিজেকে কোন স্তরে নিয়ে গেলেন।”[20]
উল্লেখ্য যে, চিশতিয়া নিজামিয়া সিলসিলার শায়েখ সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়া তাঁর জীবদ্দশায় সাতশত সুফি-সাধকদের খেলাফত প্রদান করে ইন্ডিয়াসহ বর্তমান এশিয়া মহাদেশের নানা প্রান্তে একত্ববাদের আহ্বান ও তরিকার প্রচার প্রসারে নিয়োজিত করেন। এখনো পর্যন্ত সাতশত খলিফার পূর্ণ তালিকা একত্রিত করা সম্ভব হয়নি। গোলাম সরওয়ার লাহোরির ‘খাজিনাতুল আসফিয়া’ গ্রন্থে ৫৮ জন খলিফার নাম সংবলিত একটি তালিকা পাওয়া যায়।[21] তবে সুলতানের খলিফাদের মধ্য সর্বপ্রথম ও প্রধান খলিফা কে?– তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী, মুহাম্মাদ আশরাফি কিসওয়াসাভি, আব্দুল খবির আশরাফি মিসবাহী-সহ প্রমুখ ঐতিহাসিকের মতে, আঁখি সিরাজই হলেন পূর্ব ভারত ও অযোধ্যা প্রদেশের প্রথম মুরিদ ও খলিফা। শায়খ নাসিরুদ্দীন মাহমুদ চিরাগ-ই দিল্লি হলেন চিশতিয়া নিজামিয়া সিলসিলার প্রধান খলিফা।[22] সুলতানের ওফাতের পর আঁখি সিরাজ শায়খ চিরাগ-ই দিল্লির নিকট বায়াত গ্রহণ ও খেলাফত অর্জন করেছিলেন। তবে প্রথম ও প্রধান খলিফা উদ্ধারের বির্তককে এড়িয়ে শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভীর অবস্থানই আমাদের নিকট গ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন,
“খাজা নাসিরুদ্দীন মাহমুদ চিরাগ-ই দিল্লি ও শায়খ আঁখি সিরাজ উভয়েই চিশতিয়া নিজামিয়া সিলসিলার মূল বুনিয়াদ।”[23]
দিল্লি থেকে পাণ্ডুয়া গমন ও শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভীকে শিষ্যত্ব প্রদান[24]
১৩২৫ খ্রিস্টাব্দ তথা সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়ার ওফাতের পূর্বের পাণ্ডুয়া। পাণ্ডুয়াকে তখনো বাংলা সালতানাতের রাজধানী করা হয়নি।[25] তথাপি এটি ছিল মধ্যযুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। তৎকালীন সময়ে ধর্মজ্ঞান ও যুক্তিবিদ্যায় পারদর্শী একজন আলেম পণ্ডিত ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এখানে বসবাস করতেন। নাম শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভি (১৩০১- ১৩৮৪/৯৮ খ্রি.)। বহুমুখী জ্ঞানের গভীরতায় তিনি ছিলেন সমৃদ্ধ। ধর্মজ্ঞানের বিতর্কে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁর পিতা আসআদ খালিদী লাহোর থেকে বাংলায় এসেছিলেন এবং গৌড় সালতানাতের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। শায়খ আলাউল হক নিজেও সুলতানি দরবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি বহুমুখী জ্ঞানের গভীরতা, সুলতানি মর্যাদা, পারিবারিক প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অঢেল সম্পদ নিয়ে খানিকটা গর্বিত ও দর্পিত ছিলেন। নিজেকে নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল, সময়কালের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিতরূপে। যদিও তিনি কোনো সুফি-তরিকা ও আধ্যাত্মিক ধ্যান সাধনায় জড়িত ছিলেন না। তথাপি সমগ্র বঙ্গদেশের নানা প্রান্ত থেকে আগত বহু আলেম, পণ্ডিত তাঁদের প্রয়োজন, প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা, সমস্যা নিয়ে শায়খ পাণ্ডভীর দরবারে আসতেন। ফলে পাণ্ডুয়াই হয়ে উঠেছিল তৎকালীন বাংলার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রস্থল।
একদা দূরদেশ থেকে আগত এক ভক্ত আলাউল হক পাণ্ডভির মজলিসে উপস্থিত হন। আলাপচারিতায় যখন ফরিদুদ্দিন মাসউদ গঞ্জে শকরের নাম ওঠে, শায়েখ পাণ্ডভী বলেন, “وہ گنج شکر ہیں اور میں گنج نبات ہوں”। شکر (শকর) ফার্সি শব্দ, যার অর্থ চিনি, ফার্সিতে نبات (নাবাত) অর্থ Candy বা মিছরি/মিষ্টি। আবার আরবিতে নাবাত অর্থ তৃণ বা ঘাস। আর ফার্সি শব্দ گنج (গঞ্জ) অর্থ ভাণ্ডার। ফলে এর বাংলা দাঁড়ায়, “শায়খ ফরিদুদ্দিন মাসউদ যদি ‘গঞ্জেশকর’ তথা চিনির ভাণ্ডার হয়, তাহলে আমি ‘গঞ্জেনবাৎ’ তথা মিষ্টির ভাণ্ডার।” আগন্তুক এ কথার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বুঝতে না পেরে মনে সংশয় নিয়েই দিল্লিতে যান এবং নিজামুদ্দিন আউলিয়ার খানকায় পৌঁছে পুরো ঘটনার বর্ণনা করেন। [উল্লেখ্য যে, শায়খ ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জেশকর ছিলেন সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়ার আপন পীর ও মুরশিদ। যার শাজরা বা আধ্যাত্মিক পরম্পরা খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী হয়ে খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।] আপন পীর ও মুর্শিদ সম্পর্কে এহেন বাক্য আধ্যাত্মিক নম্রতা ও সৌজন্যের পরিপন্থী, খানিকটা ‘অপমানসূচক’ হিসেবে সুলতানের নিকট বিবেচিত হয়েছে। ফলে সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়া অভিমানে বলে উঠলেন, “میرا پیر گنج شکر اور یہ گنج نبات! اس کی زبان گنگ ہو جائے!” অর্থাৎ “আমার পীর গঞ্জে শকর আর তিনি গঞ্জেনবাৎ! নির্বাক হোক তার জিহ্বা!” অতঃপর সুলতানের অসন্তুষ্টি ও আধ্যাত্মিক প্রভাবে শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভী বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন।
অকস্মাৎ এহেন ঘটনায় বাকরুদ্ধ আলাউল হক পাণ্ডভী বেশ বিচলিত ও অস্থির হয়ে পড়েন। শুরু হয় আত্মশুদ্ধির এক কঠোর পরীক্ষা। ধীরে ধীরে উপলব্ধি করেন, আদব ভঙ্গের অনিবার্য পরিণাম। এভাবে অনুতাপ ও আত্মসমালোচনায় নিমগ্ন হয়ে অশ্রু ঝরাতে থাকেন। খোদ শায়খ ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জেশকরের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকতেন। এমতাবস্থায় কত বছর অতিক্রম হয়, তার হিসাব কষা কঠিন। কয়েকবছর পর একদা স্বপ্নযোগে সুসংবাদ পেলেন যে, ‘এক মহান দরবেশ পাণ্ডুয়ায় আসবেন। তাঁর দোয়ার বদৌলতেই শায়েখ পাণ্ডভীর বিপদের অবসান ঘটবে। তবে এই দরবেশকে চিনার একমাত্র লক্ষণ হলো- তিনি ফুটন্ত পানি দিয়েও ওজু করতে সক্ষম।’ জ্ঞানের শিখর যিনি একসময় হাজারো মানুষের ভাগ্য বদলে দিতেন, আজ তিনি নিজেই এক অজানা মাসিহার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষা। কখন আসবেন সেই আধ্যাত্মিক চিকিৎসক? কোন বেশে আসবেন? কীভাবে চিনবেন তাঁকে? এই উদ্বেগ তাঁকে রাতদিন অস্থির করে রেখেছিল।
অপেক্ষমাণ শায়েখ পাণ্ডভি তখন তাঁর পুরো দরবারের নিয়মই বদলে ফেললেন। যে-কোনো অপরিচিত দরবেশ বা মুসাফির এলে তিনি গোপনে তাঁদের পরীক্ষা করতেন। আধ্যাত্মিক শক্তির যাচাইয়ের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হত। সৈয়দ মুহাম্মদ আশরাফি কিসওয়াসভি লিখেছেন, “শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভির এক অদ্ভুত রীতি ছিল। কোনো আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি এলে তিনি তাঁকে অত্যন্ত গরম পানি দিয়ে ওজু করতে বলতেন। পানি এতটাই উত্তপ্ত থাকত যে সাধারণ মানুষের পক্ষে স্পর্শ করাই দুঃসাধ্য। যদি আগন্তুক হাত সরিয়ে নিতেন, তবে শায়েখ তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি কেড়ে নিতেন। এই কারণে অনেক উচ্চস্তরের অলি-আউলিয়া পাণ্ডুয়ার সীমানা এড়িয়ে চলতেন। একসময় স্থানীয়রা তাঁকে “বাঙালি ডাকাত” নামেও ডাকতে শুরু করল।”[26] তাঁর বংশীয় মর্যাদার জন্য কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলার সাহস করতো না। দরিদ্র ও অসহায় মেহমানদের তিনি পরম যত্নে আপ্যায়ন করতেন। কিন্তু যারা জ্ঞান ও মর্যাদার দম্ভ দেখাত, তাদের জন্য ছিল না কোনো নিরাপত্তা। ধনীরা যেমন ডাকাতের ভয়ে কাঁপে, তেমনি অনেক আউলিয়া শায়েখ পাণ্ডভির নাম শুনলেই আতঙ্কিত হতেন। এই “আধ্যাত্মিক ডাকাতি”র খবর উপমহাদেশের পূর্ব-পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন দেশের সাধক ও পর্যটকরা পাণ্ডুয়া এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিতেন।
একদিন এক মুসাফির নিজামুদ্দিন আউলিয়ার দরগায় গিয়ে অভিযোগ করলেন যে, বাংলার মাটিতে ফকির-দরবেশদের চলাফেরা দুষ্কর হয়ে উঠেছে। আলেমরা বাড়ি থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দিয়েছেন। অন্যদিকে শায়েখ ফখরুদ্দিন জাররাদি ও শায়েখ রুকনুদ্দিন ইন্দরপতির তত্ত্বাবধানে আঁখি সিরাজকে জ্ঞানের আগুনে পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় রূপান্তরিত করা হচ্ছিল। তিনি তখন শিক্ষাদান ও ফতোয়া প্রদানের যোগ্য হয়ে উঠেছেন। একদিন নিজামুদ্দিন আউলিয়া তাঁর উপস্থিত খলিফাদের উদ্দেশ্যে বললেন, “তোমাদের মধ্যে কে এই ডাকাতকে দমন করতে পারবে?” সবাই নীরব। শুধু আঁখি সিরাজ সাহস করে বললেন, “আদেশ করলে আমি এ দায়িত্ব নিতে পারি।” নিজামুদ্দিন আউলিয়া খুশি হয়ে বললেন, “এ কাজ তোমার জন্যই নির্ধারিত।” আঁখি সিরাজ মুরশিদের কাছ থেকে খেলাফত লাভ করে বাংলায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি চাইলেন। যদিও পাণ্ডভীর শ্রেষ্ঠত্বের মোকাবিলার জন্য সর্বাধিক প্রস্তুত ছিলেন। তথাপি তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করলেন, “হুজুর, পাণ্ডুয়ার এই অত্যন্ত প্রভাবশালী ও জ্ঞানী ব্যক্তিকে একা কীভাবে মোকাবিলা করবেন? তাঁর সামনেইবা আমার ক্ষমতা কতটুকু?” মুরশিদ আশ্বাস দিলেন, “চিন্তা করো না, সে তোমার অনুগত হয়ে যাবে।”
সুলতানের এমন আশ্বাসে আঁখি সিরাজ খানিকটা স্বস্তি পেলেন। মুরশিদের নির্দেশই চূড়ান্ত বিধান। অতঃপর মুরশিদ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বিদায় নিয়ে লখনৌতির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন আঁখি সিরাজ। তবে মুরশিদ তাঁকে একাকী পাঠাননি। সঙ্গে দিয়েছিলেন ধর্মীয় পণ্ডিতদের একটি কাফেলা। এ দলে ছিলেন নিজামুদ্দিন আউলিয়ার আপন ভাতিজা সৈয়দ মুহাম্মদ ইব্রাহিম চিশতিও। আপন ভাই সৈয়দ আমালুদ্দিন বাদায়ুনির ইন্তেকালের পর তাঁর নাবালক পুত্র সৈয়দ ইব্রাহিমকে দিল্লিতে নিয়ে আসেন নিজামুদ্দিন আউলিয়া। দীর্ঘকাল চাচার সেবায় থেকে ইলম ও তাসাউফের শিক্ষা অর্জন করেন সৈয়দ ইব্রাহিম। পরবর্তীতে পাণ্ডুয়ায় তাঁর বিয়ে হয় শায়েখ বদরুদ্দিনের বোনের সঙ্গে। ফলে শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভির সাথে তিনি সম্পর্কে ভায়রা-ভাই হয়ে যান। যাই হোক, প্রিয় শিষ্য আঁখি সিরাজকে লখনৌতিতে পাঠানোর সময় নিজামুদ্দিন আউলিয়া তাঁকে শুধু পারিবারিক সদস্য ও সহচরই দেননি, বরঞ্চ দিয়েছিলেন অনেক তবারুক ও খিরকা। উদ্দেশ্য ছিল– শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভির প্রতাপ যদি চাঁদের আলোর মতো হয়, তবে আঁখি সিরাজের প্রতাপ হবে সূর্যের আলোর মতো। যেন শায়েখ পাণ্ডভি নিজের আমল ও দীপ্তিকে আরও উজ্জ্বল করতে আঁখি সিরাজের আধ্যাত্মিক সান্নিধ্য কামনা করেন। দিল্লি থেকে বাংলা পর্যন্ত এ সফর কত মাস বা বছরে সম্পন্ন হয়েছিল, স্পষ্ট জানা যায় না। পথে কোন্ কো্ স্থান অতিক্রম করেছিলেন এবং কাদের সাথে সাক্ষাৎ হয়েছিল, তাও বিস্তারিত অজানা। তবে সৈয়দ মুহাম্মদ আশরাফি কিসওয়াসভি সংক্ষেপে বলেন, এ ভ্রমণে বেশি সময় লাগেনি। মুরশিদের দেয়া দায়িত্ব পূর্ণ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। পথে অপ্রয়োজনীয় কোথাও থামেননি তাঁরা।
আঁখি সিরাজ আগেও বহুবার বাংলায় এসেছিলেন। মায়ের জীবদ্দশায় প্রতি বছর আসতেন। কিন্তু এবারের সফর ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। স্বেচ্ছায় আসেননি, এসেছেন পীরের নির্দেশে। এ ছিল এক মহান গুরুদায়িত্ব। ইতিহাসবেত্তাগণ তাঁর জীবনীতে বাংলায় আগমনের ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। পাণ্ডুয়ায় পৌঁছানোর পর স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভি আগন্তুকের জন্য ফুটন্ত পানি দিয়ে ওজু করার ব্যবস্থা করলেন। আঁখি সিরাজ বললেন, “দূরদেশ থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। শুধু ওজু করে সফরের ক্লান্তি দূর হবে না।” এ কথা বলে তিনি ফুটন্ত পানির পাত্র তুলে মাথায় উপুড় করে ঢেলে দিলেন। পানি এতই গরম ছিল যে খালি হাতে পাত্র স্পর্শ করাই কঠিন। চামড়া পুড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আঁখি সিরাজের গায়ের একটি লোমও পুড়ল না। শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভির জীবনে এ দৃশ্য ছিল একেবারে নতুন, অভূতপূর্ব। তিনি নির্বাক তো ছিলেনই, এবার হয়ে গেলেন সম্পূর্ণ হতবাক। মনের অজান্তেই আঁখি সিরাজের পায়ে মাথা রেখে বললেন, “আমার পূর্বের কাজকর্মের জন্যই আপনি এসেছেন। আপনার পদধূলি এখানে পৌঁছেছে। আমার সংশোধনের জন্যই আপনার আগমন। এখন থেকে এসব কাজ চিরতরে ত্যাগ করলাম। আপনার পদধূলি আমার অতীতের কৃতকর্মের সুপারিশকারী এবং ভবিষ্যতের জামিনদার। আজ থেকে আপনার হাতে বায়াত গ্রহণ করছি।” অতঃপর আনুগত্যের শপথ নিলেন তিনি। এরপর আঁখি সিরাজ চিশতিয়া তরিকার নিয়ম অনুসারে শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভিকে সিলসিলায় অন্তর্ভুক্ত করলেন।[27]
আরেকটি বর্ণনায় আছে, শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতে থাকা শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভি জীবনভিক্ষা চাইতে আঁখি সিরাজের খানকায় গিয়েছিলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন আঁখি সিরাজের কপালে নূরের জ্যোতি, চেহারায় ফকিরি ও ইরফানের দীপ্তি। শায়েখের চোখ ভরে গেল অশ্রুতে। পীরপ্রেমের পেয়ালা পান করতে করতে তিনি মাতোয়ারা হয়ে গেলেন। ইশকের আগুন মুহূর্তে ভস্ম করে দিল দুনিয়ার সব লোভ-লালসা, ক্ষণস্থায়ী সম্মান ও প্রতাপের প্রাসাদ। সমগ্র সৃষ্টিতে ঘটে গেল এক মহাবিপ্লব। যে কপাল মন্ত্রীত্বের মহিমায় সালাম পেত, আজ নত হয়েছে এক নিঃস্ব ফকিরের পায়ের কাছে।
বায়াতের পর আঁখি সিরাজ শায়েখ আলাউল হক পাণ্ডভিকে ‘গঞ্জেনাবাত’ উপাধির কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি পূর্বের উক্তির ব্যাখ্যা দিলেন। আঁখি সিরাজ বলেন, “وہ مرید میری مراد کو نہ سمجھا سکا! نبات کی اصل شکر ہی ہے، بابا صاحب گنج شکر تھے اور میں انھیں سے بنا ہوا گنج نبات ہوں” অর্থাৎ “আমি যা বলেছিলাম, মুরিদ এর প্রকৃত অর্থ বুঝতে পারেননি। নাবাৎ (মিছরি/মিষ্টি)-এর মূল উপাদান হলো শকর (চিনি)। যিনি শায়খ ফরিদউদ্দিন মাসউদ গঞ্জেশকর। আমি তাঁর থেকে উৎপন্ন গঞ্জেনবাৎ।” উত্তরটি আঁখি সিরাজের মনঃপূত হলো এবং গঞ্জেনবাৎ উপাধি প্রসিদ্ধ হয়ে উঠল।
সুলতানের নির্দেশ অনুযায়ী শায়খ আলাউল হক পাণ্ডভীকে আত্ম-অহংকার থেকে মুক্ত করা ও তাঁকে চিশতিয়া তরিকায় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্যে আঁখি সিরাজ যখন বাংলার পাণ্ডুয়ায় অবস্থান করছিলেন, সে-সময় তাঁর মুরশিদ হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া ইন্তেকাল করেন। মুর্শিদপ্রেমে উদ্বেল আঁখি সিরাজ তৎক্ষণাৎ দিল্লি ফিরে যান। এবং তাঁর মুরশিদের দরগাহ শরিফেই দিনের পুরোটা সময় অবস্থান করতে থাকেন। পাণ্ডুয়া থেকে আঁখি সিরাজের পুনরায় দিল্লি গমন নিয়ে অন্য এক বর্ণনায় পাওয়া যায়, “সুলতানের পাণ্ডুয়া প্রেরণের উদ্দেশ্য সফল হলে অর্থাৎ শায়খ আলাউল হক অনুগত হলে শায়খ আঁখি সিরাজ পুনরায় তীব্রভাবে সুলতান ও আপন মুরশিদের সাহচর্যের অভাব উপলব্ধি করতে লাগলেন। পাশাপাশি জ্ঞানার্জনের প্রতিও ছিল তাঁর অগাধ আকর্ষণ। তাই তিনি পুনরায় দিল্লি গমনের জন্য মনঃস্থির করেন। ইত্যবসরে শায়েখ পাণ্ডভীকে প্রয়োজনীয় দীক্ষাদান ও স্থানীয়দের মাঝে দ্বীন প্রচারের প্রাথমিক কার্যকলাপ সম্পন্ন করা পর্যন্ত পাণ্ডুয়ায় অবস্থান করেছিলেন। এরপর দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। পথিমধ্যে সুলতানের ওফাতের বিষয়ে অবগত হলেন।”[28]
মুরশিদের ইন্তেকালের পর আরো তিন বছর তিনি দিল্লির খানকায়ে নিজামিয়াতে অবস্থান করেন এবং নিজামুদ্দিন আউলিয়ার খলিফা চিরাগ-ই-দিল্লি শায়েখ নাসিরুদ্দিন মাহমুদ-এর নিকট আরও দ্বীনের গভীর জ্ঞানার্জন ও আধ্যাত্মিক সাধনায় মনোনিবেশ করেন। এই সময়ে তিনি শিক্ষা-দীক্ষায় ও খেলাফতের আরও গভীর স্তরে উপনীত হন। সুলতান নিজামুদ্দিন আউলিয়া ৭২৫ হিজরীর ১৮ই রবিউল আউয়াল বা ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩ এপ্রিল নিজ খানকায় ইন্তেকাল করেন। সে হিসেবে বলা যায়, আঁখি সিরাজ ১৩২৭ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে বা ১৩২৮ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় জন্মভূমি লাখনৌতিতে চলে আসেন এবং এখানেই ধর্ম ও তরিকার প্রচারে রত হন।[29]