ইয়াকিন শাহের দরগা

মুখবন্ধ

লোকসাহিত্যের সংগ্রাহক ও গবেষক হিসেবে খ্যাতিমান ডক্টর আশরাফ সিদ্দিকী। লোক‌ঐতিহ্যের সন্ধানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। তাঁর বাড়ি টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী উপজেলায়। এই উপজেলাতেই আছে সুফি-সাধক ইয়াকিন শাহের মাজার/দরগাহ। এই মাজারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ডক্টর সিদ্দিকীর শৈশব। কৈশোরে গিয়েছিলেন ওরসে। পরিণত বয়সে এই মাজারে গিয়ে ইয়াকিন শাহের এখানে আসার ও বসত গড়ার ইতিহাস জেনেছেন। খাদেম ও আশপাশের মানুষের কাছ থেকে শুনেছেন মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা লোককাহিনী। এসব নিয়ে সরল ভাষায় লিখেছেন তিনি; প্রকাশিত হয়েছে বাংলা ১৩৮২ (১৯৭৫) সালে প্রকাশিত ব‌ই— কিংবদন্তির বাংলা-তে। খান ব্রাদার্স এ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা থেকে প্রকাশিত উক্ত ব‌ই থেকে রচনাটি সংগ্রহ করা হয়েছে।
লক্ষণীয় বিষয়, ইয়াকিন শাহের এখানে আসার ও বসত গড়ার যে কাহিনী তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর সঙ্গে মিল আছে আমেরিকান ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম ইটন প্রচারিত তত্ত্বের। তিনি The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760 নামক গবেষণাগ্রন্থে বাংলায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে সুফিদের নেতৃত্বে জঙ্গল পরিষ্কার করে বসত গড়ার যে তত্ত্ব হাজির করেছেন, বর্তমান রচনায় বর্ণিত ইয়াকিন শাহের ইতিহাস‌ও ঠিক তাই। গবেষকদের জন্য‌ ডক্টর সিদ্দিকীর এই রচনা ‘প্রাইমারি সোর্স’ হিসেবে কাজে লাগতে পারে।

***

 

ইয়াকিন শাহের দরগায় যখন পৌঁছালাম তখন বেলা এগারোটা। চৈত্র মাসের দিন। চৈত্রের নিদারুণ তাপে জ্বলে যাচ্ছে চারদিক। আর সাইকেল চালিয়ে যেতে যেতে সমস্ত শরীরে ঘামের স্রোত। ঘামে যেন একদম নেয়ে উঠলাম। চাই বিশ্রাম। চাই ছায়া-বৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় বিশ্রাম। আর একগ্লাস ঠাণ্ডা জীবন। মানে জীবন-দায়িনী পানি। সবই মিললো।

ভারী ঠাণ্ডা ইয়াকিন শাহের নিরিবিলি আস্তানা। ঠিক যেন আশ্রম। বিরাট বিরাট পত্র-সুনিবিড় রসালতরু। গজারী বৃক্ষ। আরও অনেক অনেক গাছ। কাছেই একটি প্রাচীন বিরাট পুকুর। তখনো পানিতে টইটম্বুর। আর পূর্ব দিগন্ত একদম ফাঁকা-ধান-কাউন-রবি ফসলের সবুজ সমুদ্র। পাশে সুবিস্তৃত সীমাহীন তল্লাই বিল। অসংখ্য পাখ-পাখালীর কল-কলরব। উত্তরে কস্তুরী পাড়ার বিল। আরও উত্তরে জোয়ানশাহীর গভীর গজারীর অরণ্য। সামনে—মানে পশ্চিম দিকে বিসর্পিল বংশাই নদী। প্রবাহিত হচ্ছে সাপের মত এঁকে-বেঁকে। যেন কোন দরবেশের নামাজান্তে ফেলে রাখা একখণ্ড জপমালা—তসবিহ। তার পাশদিয়ে জেলা বোর্ডের বাধানো সড়ক-নদীর মতই বিসর্পিল। উহ্—কী যে বাতাস! হু-হু—উতল বাতাস। বাতাস যে এতো প্রয়োজনীয় আর এতো প্রাণতোষিণী তা বুঝি আগে এমন উপলব্ধি করিনি।

আর পানি!
স্থানীয় ইউনিয়ন-বোর্ড বসিয়ে দিয়েছে একটি নলকূপ। অতি শীতল তার পানি। নিজেই টিপে আঁজলা ভরে খেলাম। মুখে চোখে দিলাম। তারপর বসে পড়লাম সবচে বড় রসাল বৃক্ষটির নিচে দুর্বা ঘাসের আসনে। জীবনে বড়ো ব্যস্ততা-বড়ো হেনস্থা-দৌড় ঝাঁপ-কাজিয়া-ফেসাদ-বিবাদ-বিসংবাদ-খোরবড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর। কিন্তু চৈত্রমাসের কোন এক দ্বিপ্রহরে প্রজ্বলন্ত নিদাঘ-বাড়বানলের মরুভূমিতে মরুদ্যানের শান্তি পেলাম যেন। শান্তি শান্তি কি শান্তি! ওম-শান্তি!!

ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিলাম কি? ধ্যান ভেঙে গেলো ইয়াকিন শাহের দরগার জনৈক খাদেমের আহ্বানে।
– সাহেবের দৌলতখানা?
– নাগবাড়ী।
-‌ কোন বাড়ী?
– ডাক্তার সাহেবের।
– কি হন, তিনি?
– বাবা!

ছুটলো খাদেম সাহেব বাড়ী। কাছেই। আসলো শীতল পাটি। জগ, বোঝাই পানি। আর বাতাসা-কদমা। কি প্রয়োজন ছিল! এই তো বেশ ছিলাম। আপনার গুরু-মুরশিদ দেখুন না কেমন ছোট্ট একটি ছনের ঘরে শুয়ে আছেন-যুগ-যুগান্ত কাল-কালান্ত ধরে।

গ্রামের নাম তয়কা। জেলা একদা ময়মনসিং—এখন টাংগাইল। ঘুমিয়ে আছেন শাহ্ ইয়াকিন—গ্রামের লোক বলে ‘একিন শাহ্’। একটি দোচালা ছনের ঘর। চারদিকে খোলা বারান্দা। পাটসোলার বেড়া ঘরে। বেড়া দিয়েই করা হয়েছে ছোট্ট দরজা। প্রায় নিচু হয়ে ঢুকতে হবে। ঘরের ভেতর আবার ছোট্ট একটি বারান্দা। আরও একটি ছোট্ট দরজা। নিচু হয়ে যেতে হবে। সাবধান— বেদ্দপী (বেয়াদবী) যেন হয় না। তারপর—কবর। অতি সুন্দর করে নিকানো। গ্রামের মেয়েরা গোসল করে সেই ভিজে কাপড়েই নিকিয়ে দিয়ে যায় সকালে। খাদেমও গোসল শেষে সেই ভিজে কাপড়েই নিকিয়ে দেয় কোন কোন দিন।

কোথাও একটি কুটো নেই। পরিষ্কার। পরিচ্ছন্ন। চৈত্রে-বৈশাখে আকাশ কালো করে ঝড় আসে—কাল-বৈশাখীতে মত্ত হাতী লাফালাফি করে আসমানে—উড়ে যায় কতো ঘরের চাল কিন্তু খাদেম সাহেব আপনাকে ‘নিরলে’—গলার স্বর নামিয়ে—যেন কেউ শুনতে না পায় চুপে—অতি চুপে বলবে—‘একিন শাহের দরগায়—বাবার দরগায়—সে ঝড় লাগে না—একটি কুটোও খসে না।’

কখন তিনি এখানে এসেছিলেন—কোথা থেকে এসেছিলেন তা আজও রহস্যে আবৃত। তবে একশ দেড়শ বছর পূর্বে যারা এখানে বেঁচে ছিলেন তারা হয়তো বলতে পারতেন।
এ অঞ্চল নাকি তখন ছিল গভীর জঙ্গল। বাঘের আনা-গোনা ছিল চারদিকে। জোয়ানশাহী গড়ের শেষ চিহ্ন গজারী বন—এখনো দেখা যাবে দু’একটা। আর মাটিও লালচে।

কোথা থেকে ঘুরতে ঘুরতে এলেন এক দেওয়ানা ফকির—ভাবের পাগল ‘একিন শাহ্’। গড়-গজারীর সুনির্জন দীর্ঘ প্রলম্বিত সুশীতল ছায়ায় বসলেন—এমনি এক দ্বিপ্রহরে। বড় তেষ্টা! তল্লাই বিল থেকে আঁজলা ভরে পানি খেলেন। এখানেই হবে আমার সাধন-পিঠস্থল! রয়ে গেলেন এখানে। ঐ যে ঘরটি দেখছেন—তাঁর দরগা—কবরস্থল—ঐখানে অপর্যাপ্ত ‘আপন জালা’ মানে আপনিতে জন্মানো ছন দিয়ে নিজেই বানালেন অমনি একটি দোচালা ঘর—ঠিক অতোখানি—দীঘে-পাশে—বসলেন ধ্যানে।

আর তাঁর সাধনা হল সক্কাল বেলা একছটাক আখের গুড় মুখে দেবেন—আর সন্ধ্যাবেলা সেই গুড় না খেয়েই আবার নামিয়ে রাখবেন। একছটাক—ঠিক একছটাক। কমতেও পারবেনা—বাড়তেও পারবে না মুখের লালা লেগে। আর সমস্ত দিন পর জঙ্গলের ‘আনাই গোটা’ ‘বেহুর গোটা’ নামক এক প্রকার মিষ্টি ফল খাবেন। ঐ একবার। মাত্র একবার।

আর জঙ্গলের বাঘগুলি সব ঘরের আরদিকে মাটিতে মাথা রেখে আরামে ঘুমিয়ে থাকতো। মাঝে মাঝে নখ দিয়ে শরীর চুলকাতো। আড়মোড়া ভাঙতো। বাবা সাহেব কখনো বের হলে হাত তালি দিতেন—এ-ই-এ-ই রাস্তা ছোড়—রাস্তা ছোড়। আর রাস্তার বাঘটি শরীরে আড়মোড়া দিয়ে উঠে আবার অন্যত্র গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো।

দিন যায়।
রাত্রি আসে।
মাস যায়।
বর্ষ আসে।
একশ বছর।
অথবা তারও বেশী।

বাবা সাহেব বললেন—বাঘদের বললেন—তোরা এখন জঙ্গলে যা, এখানে আদম (মানুষ) বসাবো। তারপর জন-মানুষ—যারা তাঁর ভক্ত ছিল দূরে দূরে—তাদের ডেকে আনলেন—বললেন চাষ করো বাস করো—জঙ্গল কাটো—জঙ্গল কেটে বসত করো। আর এলো মানুষ। আরও মানুষ। আরও মানুষ। মাটি বড় ভালো। দোয়াশ মাটি। তুলোর মত নরোম একটু বৃষ্টি হলেই। আর ফসল হয় পর্যাপ্ত—এখনও। দেখুন না, কেমন এই চৈত্র মাসেও মাঠ কেমন সবুজ। এমন ফসল আর কোথাও হয় না। কাটালেন দীঘি! বিরাট দীঘি। লোকজনই ভালোবেসে কেটে দিল—‘মাগনা কামলা’ খাটলো। নিজের হাতে বুনলেন গাছ। ঐ যে গুটি আম যার ছায়ায় বসে আছেন—সেটি নাকি উনার হাতে বোনা! উনি এ গাছের আম খেয়ে গেছেন। এখন আর আম হয় না। তবে গাছের ডাল কেউ কাটে না। কাটলে ক্ষতি হয়। গাছটি সত্যি বৃদ্ধ। কত বছরের বৃদ্ধ বলতে পারবো না—আমি উদ্ভিদ-বিজ্ঞানী নই। আর এখন? এখন এখানে একটি পাকা মসজিদ হয়েছে। একটি মক্তব। একটি পাঠশালা।

সেই বাঘের ব্যাপারটি কি?
হ্যাঁ—হ্যাঁ—আমরা দেখি নাই তবে শুনেছি বাবা সাহেব যতদিন ছিলেন একটি বুড়ো বাঘ—তার নাকি পশম নাই—রীতিমত নাকি রাত্রে এসে ঐ যে দরগার আস্তানা—ওখানে শুয়ে থাকতো। আর ঐ বাঘের পিঠে চড়ে বাবা সাহেব নাকি কত দূর দূর জায়গায় তাঁর পীর বাবাদের দেখতে যেতেন। মাজার জেয়ারৎ করতে যেতেন সেই ‘ছিরিহট্ট’ (শ্রীহট্ট) জেলায় হজরত শাহ্ জালাল, ‘রাজশাই’ (রাজশাহী) হজরত শাহ্ মখদুম, টাংগাইল আটিয়ার শাহান শাহ্, নেত্রকোনা শাহ্ মদন-এর—এইসব দূর দুর জায়গায়। বাঘের পিঠে উঠতেন আর এক পলকে উপস্থিত।

– সে কেমন? সে কেমন?
– আসলে ওটি কি বাঘ ছিল? ছিল অন্য কিছু।
– অন্য কিছু কি?
– মানে (মানুষে) বলে জ্বীন। বাবা সাহেবের শিষ্য। ঐ ‘হরবোলা’ মূর্তি ধরে থাকতো আর কি! বুঝলেন না?
– বাঘটা কি এখনো আসে?
– হাঁ—আসে ঐ ওরসের সময়। শেষ দিন। গভীর রাত্রে।কেউ কেউ নাকি দেখেছে।

প্রতি বছর পৌষ মাসে সপ্তাহব্যাপী ওরস বা মেলা বসে এখানে। দূর দূর স্থান থেকে আসে ভক্তের দল। শিষ্যের দল। তারা এখানে খরচ করে—খিচুড়ি পাকায়—জবাই হয় বকরী-খাসী-মুরগী। বিস্তৃত স্থানে স্থানে—আম-জামের গাছের নীচে পুকুর পাড়ে গড়ে উঠে অস্থায়ী আস্তানা। সারারাত চলে জিকির:

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্
হক্ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্…

পুরানা সব কাঁথা গায়ে আসে ফকির-সন্ন্যাসীর দল। মারফতী মুরশিদী গান হয় সারারাত। পান-বিড়ি তামাক। গঞ্জিকা-তাও হয়। লোক অসুখে-বিসুখে মানত করে। মোমবাতি। কদমা-বাতাসা। খাসী। দুধ। বা নিদেনপক্ষে ‘সোয়া-পাঁচ আনার’ পয়সা। সে মানত আদায় করে। আমার নিজের একবার শৈশবে নাকি শক্ত ‘শান্নিপাতিক’ জ্বর হয়। জ্বর ছাড়ে না। শুনেছি আমার মা-ও মানত করেছিলেন।

আমাকে নাকি সেখানে একবার নিয়েও গিয়েছিলেন—আমার মা বলেন। শৈশবে-বাল্যে—আমি কি দেখেছি—তখন গ্রামের রতনগঞ্জ স্কুলে পড়ি। সম্ভবতঃ চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণীতে। আমাদের বন্ধু-বান্ধবেরা যাবে মেলায়। বায়না ধরলাম। মেলায় মানে ওরসে যেতে চাইলে মানা করাও মুশকিল—গ্রাম্য বিশ্বাস। বাবা নিষেধ করলেও মায়ের হাইকোর্টে একদম মঞ্জুর। সংস্কারের ভীতি মায়েদের একটু বেশী কিনা। বাড়ীর বুড়ো কামলাকে সঙ্গে দেওয়া হল। মেলার বুড়ো খাদেম আমার বাবাকে সমীহ করতেন খুব। খাদেম সাহেব যথেষ্ট খাতির করে একদম আসরে নিয়ে বসিয়ে দিলেন। আর খাওয়া-দাওয়ার সে-কি আদর যত্ন। খাঁটি দুধের ক্ষীর। মর্তমান কদলি। গোস্ত-খিচুড়ি।

সারারাত চললো গান। মারফতী। মুর্শিদী। বাউল। দেহতত্ত্ব। সারিন্দা বাজিয়ে মাথা দুলিয়ে সে-কি গানরে বাবা! সমগ্র দরগাস্থল যেন কাঁপছে। আর লম্বাচুল-জটাচুল-বুড়ো থুরথুরে সব ফকিরদের জিকির মধ্যে মধ্যে:

লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্…

সেই ফকিরদের কারো কারো সঙ্গে আমি জটাধারিণী মেয়েদেরও দেখেছি। ওরা বলতো ‘সাধন-সঙ্গিনী’। তাদের কেউ কেউ নাকি পূর্বে বাজারের রূপজীবিনী ‘বেশ্যা’ ছিল। সেই বয়সে অতো-সব কঠিন কঠিন কথা বুঝতামনা। পরবর্তী সময়ে শুনেছি মেয়েদের নাকি আর মেলায় আসতে দেওয়া হত না। গঞ্জিকার ব্যাপারটিও প্রকাশ্যে আর চলতে দেয় নাই—গ্রামের শেরেক-বেদাত বিরোধী দল।
হাঁ—এখনো পৌষ মাসে মেলা বসে সপ্তাহ ব্যাপী। খানাপিনাও হয়। এখনো কেউ কেউ বিশ্বাস করে মেলার শেষ রাতে ‘পশম উঠা’ সেই বাঘটি আসে। আগে নাকি কেউ কেউ দেখেছে। কিন্তু চোখের ‘পলক’ ফেলে ফেলে উধাও।

শাহ্ ইয়াকিন কে ছিলেন? কখন আসেন?
খুব স্পষ্ট করে বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে দরগার খাদেমদের কাছে ফারসী ভাষায় লেখা অতিজীর্ণ—প্রাচীন দেবোত্তর লাখেরাজ সম্পত্তির দলিল আছে। যা নবাবী আমল থেকে চলে আসছে—দরগার তয়-তদবির এবং সেবার জন্য। আটিয়ার জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ওরফে ‘চাঁদ মিয়া’ সাহেবও সে হুকুম বহাল রেখেছেন। তিনি নাকি একবার দরগাটি পাকা করবার ইচ্ছা প্রকাশ করে অনেক কাঠ এনে জড়ো করেছিলেন। কিংবদন্তি বলে, স্বপ্নের নাকি নির্দেশ: পাকা করা চলবে না। গরীব ইয়াকিন শাহ্-র কবর গরীবই থাকবে। যদি মনে লয় এসো—বসো—জেয়ারৎ করো। দোয়া করো।

ইয়াকিন শাহ নাকি ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন—সেই দীর্ঘদিন পূর্বে—ফটিকজানি এসে বংশাইতে মিশবে। হ্যাঁ—কালিহাতীর ফটিকজানি খাল আজ বংশাইতে এসে মিশেছে। ‘বিন্না-ছোবার’ জঙ্গলে হাঁট বসবে। হ্যাঁ—আগে যেখানে ছিল বিন্না-ছোবার বিস্তৃত জঙ্গল—সেখানে আজ হাট বসেছে—হাট ভণ্ডেশ্বর। শনিবার বিরাট জনসমাগম হয়। আর মানুষ আঁকশি দিয়ে বেগুন পাড়বে। অর্থাৎ মানুষ আগের মত উচা-লম্বা হবে না—স্বাস্থ্যবান হবে না।

এছাড়াও আরও অনেক অনেক কাহিনী আছে—আমি হয়তো সব সংগ্রহ করতে পারি নাই। আপনি মেলার সময় একবার গিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের লোকের সঙ্গে যদি ‘নিরলে’ বসে আলাপ করেন তবে আরও অনেক তত্ত্ব ও তথ্য হয়তো দিতে পারবেন।

আসুন না একবার!
ফাল্গুন-চৈত্র মাসে আমের মুকুলে ভরে যায় দরগার আস্তানা। ঘি মউ মউ ভারী মিষ্টি গন্ধ! ঝরে পড়ে শিমুল আর পলাশের ফুল। বংশাই-এর উত্তাল স্রোত কল-কল্লোলে প্রবাহিত হয় তল্লাই বিলে—শব্দ হয় সর্‌সর্‌— ঝন্ ঝন্—যেন কে এক মহাবিরাট তসবিহ-মালা জপছে!

জালালী কপোতগুলি কোথা থেকে দলে দলে উড়ে এসে আস্তানায় ছড়ানো ছিটানো খাবার খায়—শব্দ আসে বক্ বক্ বকম্… বকম্ বকম্… দূর থেকে শুনলে মনে হবে কে যেন জিকির করছে…