ভূমিকা:
বারো আউলিয়ার জন্য বিখ্যাত চট্টগ্রামে এমন কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে, যিনি হযরত শাহ মোহসেন আউলিয়ার নাম শোনেননি। বারো আউলিয়ার অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে চট্টগ্রামের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে এই সুফি সাধকের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। কেবল চট্টগ্রাম নয়, পুরো বাংলার মুসলমানদের ঐতিহ্য অনুসন্ধান ও লালনকারী ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের রচনাবলীতে বাদ যায়নি এই সুফি সাধকের নাম। সাহিত্য পত্রিকার চৈত্র ১৩১৩ সংখ্যায়, অর্থাৎ ১৯০৭ সালে তাঁর এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের জানামতে, হযরত শাহ মোহসেন আউলিয়া সম্পর্কে বাংলা গদ্যে লেখা এটিই প্রথম রচনা। লেখাটির ঐতিহাসিক মূল্যের পাশাপাশি মোহসেন আউলিয়ার জীবনকাহিনী ও তৎকালে প্রচলিত কিংবদন্তির উল্লেখে এর সাহিত্য ও গবেষণা মূল্যও নিছক কম নয়। কেবল সাধকের জীবনীতেই এই লেখার বৈশিষ্ট্য সীমাবদ্ধ নয়, বরং চট্টগ্রামের আনোয়ারার ইতিহাস রচনা ও পর্যালোচনাতেও এই লেখার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। স্থানীয় ভূমি মালিকানা ও দরগাহ সংশ্লিষ্ট পরিবারবর্গের ইতিহাস বিষয়ে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এতে সন্নিবেশিত হয়েছে, যা ইতিহাস গবেষকদের গতিপথ নির্ধারণ করতে সক্ষম।
সার্বিক বিবেচনায় লেখাটি আগ্রহী পাঠক ও গবেষকদের জন্য প্রকাশ করা হলো। বানানরীতি হুবহু রাখা হয়েছে; কোনো পরিবর্তন করা হয়নি। প্রথম পর্যায়ে কেবল লেখাটি প্রকাশ করা হলো। পরবর্তীতে প্রয়োজন অনুসারে আমাদের মত, বক্তব্য, টীকাসহ প্রকাশ করা হবে। বাংলা একাডেমি, ঢাকা থেকে এপ্রিল, ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ রচনাবলী, ১ম খণ্ড’র ৬২১-২৩ পৃষ্ঠা থেকে লেখাটি সংগ্রহ করা হয়েছে; রচনাবলীর সংকলক, সম্পাদক ও প্রকাশনা কর্তৃপক্ষের নিকট আমরা কৃতজ্ঞ।
***
হজরত শাহ মোছন আউলিয়া
পুণ্যভূমি চট্টগ্রাম বহু ধার্মিক ও পুণ্যাত্মা মহাপুরুষের লীলাক্ষেত্র। চট্টগ্রামের নানা স্থানে তাঁহাদের পূত লীলা-স্থান বিরাজিত। হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে ঐ সকল পুণ্যক্ষেত্রের সমাদর করিয়া থাকেন। ভূধর-সাগর-পরিবেষ্টিত প্রকৃতির লীলা-কানন চট্টগ্রাম সাধকের যোগসাধনের উপযুক্ত ভূমি। প্রাচীন কাল হইতে এই জন্যই চট্টগ্রাম সাধু, সন্ন্যাসী ও তাপসদিগের প্রিয় বাসস্থান। চট্টগ্রাম মুসলমান-প্রধান দেশ। এ জন্য এখানে মুসলমান-কীর্তির প্রাচুর্য। হিন্দু ও বৌদ্ধ কীর্তিও যে বিরল, তাহা নহে। প্রথমতঃ ইহা মুসলমান কর্তৃকই আবাদ হয়, এইরূপ জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। ইসলাম-সন্তানেরা আবাদ করেন বলিয়া, চট্টলের অন্যতর নাম ‘ইসলামাবাদ’। প্রবাদ এই, ঐ স্থান পরীগণের আবাস ছিল। হজরত শাহ বদর নামধেয় স্বনামখ্যাত মহাপুরুষ দৈবপ্রভাবে ‘চাটি’ বা প্রদীপের সাহায্যে পরীগণকে বিতাড়িত করিয়া, এই স্থান লোকাবাসে পরিণত করেন। এই জন্য উহা ‘চাটি-গা’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। চট্টগ্রাম সদরে মহাপুরুষ শাহ বদর সাহেবের দরগাহ আছে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন অংশে তাঁহার সহযোগী অন্যান্য অনেক মহাত্মার সমাধি বা দরগাহ আবহমান কাল হইতে লোকের ভক্তি ও প্রীতির পুষ্পাঞ্জলি অর্জন করিতেছে।
প্রবন্ধের শিরোনামে যে মহাত্মার নাম উল্লিখিত, তিনিও শাহ বদর সাহেবের মত একজন মহাপ্রভাবসম্পন্ন দরবেশ ছিলেন। তাঁহার সমাধি অধুনা চট্টগ্রাম আনোয়ারা থানার অন্তর্গত ‘বটতলী’ নামক গ্রামে বিরাজমান। তিনিও চট্টগ্রামের একজন অতি বিখ্যাত আউলিয়া। হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধদিগের নিকট তিনি সমভাবে সমাদৃত। তাঁহার নাম চট্টগ্রামের সর্বত্র প্রখ্যাত থাকিলেও, তাঁহার সম্বন্ধে বিশেষ বিবরণ সাধারণের অজ্ঞাত বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। এই জন্য আমরা তাঁহার বৃত্তান্ত প্রচারিত করিতেছি। অন্যান্য মহাপুরুষদের ন্যায় তাঁহার কাহিনীও নানা অলৌকিক ঘটনাবলীতে পূর্ণ।
কথিত আছে, হজরত শাহ বদর, হজরত শাহ কাতাল ও হজরত শাহ মোছন—এই দরদেশত্রয় একত্রে এক সময়ে পাণিপথ হইতে গৌড়ে আগমন করেন। তথা হইতে শাহ বদর সাহেব সর্বাগ্রে চট্টগ্রামে পদার্পণ করেন। এখানে আসিয়া তিনি রাঙ্গুনিয়া থানার অন্তর্গত ‘কুড়াল্যা মুড়া’ নামক পর্বতে আশ্রম প্রতিষ্ঠিত করেন। তথায় থাকিয়া তিনি ‘হিয়াই’ নামক জনৈক নরসুন্দরকে মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত করেন। উক্ত ‘হিয়াই’র আত্মারাম ও মহেশচন্দ্র নামক দুই পুত্রও মুসলমান ধর্মে দীক্ষিত হন। মুসলমান হইবার পর আত্মারাম আতিকউল্লা ও মহেশচন্দ্র মোহাম্মদ সরিফ নাম প্রাপ্ত হন। এই দুই জনও নানা গুণে ও তপঃপ্রভাবে বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেন। কথিত আছে, সম্রাট শাহ আলমগীর বাদশাহ তাঁহাদের সাধন প্রভাবে মুগ্ধ হইয়া, তাঁহাদিগকে বিস্তর ভূসম্পত্তি ‘খয়রাত’ করিয়াছিলেন। সেই সমস্ত সম্পত্তি অদ্যাপি জিম্মে আতিকউল্লা ও জিম্মে মোহাম্মদ সরিফ নামে অভিহিত হইতেছে। রাঙ্গুনিয়া থানার অন্তর্গত নয়াপাড়া, স্বরূপভাটা প্রভৃতি গ্রামে ঐ সকল ভূমি অবস্থিত।
হজরত শাহ বদর সাহেবের আগমনের কিছুদিন পরে হজরত শাহ মোছন আউলিয়া ও শাহ কাতাল পীর চট্টগ্রামে আগমন করেন। প্রবাদ এই, তাঁহারা সমুদ্রপথে বাঁশের ‘ভেরুয়া’য় (ভেলা) এখানে আগমন করেন। তাঁহাদের সঙ্গে একখানি বৃহৎ প্রস্তর-খণ্ড ছিল। তাহা কিরূপে আনীত হইয়াছিল, তাহা আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধির অগোচর। এই প্রস্তরখণ্ড আজও বটতলী গ্রামে শাহ মোছনের দরগাহ মন্দিরে রক্ষিত আছে। উহার কথা আমরা পরে বিবৃত করিব।
শাহ মোছনের সঙ্গে তদীয় কন্যা নির্ধন বিবি, নির্ধন বিবির পুত্র কুতুব উদ্দীন ও শাহ সাহেবের ভ্রাতুষ্পুত্র শাহ সেকেন্দরও আসিয়াছিলেন। তাঁহারা প্রথমে আনোয়ারার অদূরবর্তী ঝিয়রি নামক গ্রামে অবস্থিতি করিতে থাকেন। কিছু দিন পর সেই গ্রামেই শাহ মোছনের ইহলীলার অবসান হয়। যে তাবুৎ-এ (coffin বিশেষ) হজরত ইউসুফ নবী সমাহিত হন, শাহ মোছন সাহেবকেও সেইরূপ তাবুৎ-এ ঝিয়রি গ্রামে সমাহিত করা হইয়াছিল। শঙ্খনদীর নিকটে তাঁহার কবর ছিল। দুই তিন বৎসরের মধ্যে শঙ্খনদী কবরের নিকটবর্তী হইয়া উহাকে আপন কুক্ষিগত করিবার উপক্রম করে। ফলে কবর ভাঙ্গিয়া যাইবার উপক্রম হয়। এমন কি, তাবুৎ দেখা যাইতে লাগিল। শুনা যায়, শাহ মোছন আউলিয়া সাহেব ইহাতে স্থানীয় (বেলচূড়ার) জমীদার জবরদস্ত খাঁকে স্বপ্নে দর্শন দিয়া উপদেশ দেন—“নিকটবর্তী কোনও সমুদ্র-চরে (তীরভূমিতে) উলুবন-যুক্ত স্থানে শাখাত্রয়-সমন্বিত একটি বটবৃক্ষ দেখিতে পাইবে, উহার উপরে আপনা হইতেই প্রদীপ জ্বলে। সেই বটগাছের তলায় আমাকে পুনরায় সমাহিত কর।” খাঁ সাহেব এই স্বপ্নে বিশ্বাস করিতে না পারিয়া নিশ্চেষ্ট রহিলেন। তাহা দেখিয়া শাহ সেকেন্দর স্থান নির্দেশ করিয়া দিলেন, এবং উক্ত বেলচূড়া গ্রামের জমীদার রহমৎ খাঁ ও হোসেন খাঁ সাহেবদ্বয়কে কবর স্থানান্তর-করণের কথা বিদিত করিলেন। তাঁহারা পূর্বেই স্বপ্নে অভিজ্ঞাত হইয়াছিলেন, সুতরাং আর দ্বিরুক্তি না করিয়া ঝিয়রি হইতে অনতিবিলম্বে তাবুৎ আনিয়া বর্তমান বটতলী গ্রামে স্থাপিত করিলেন।
হোসেন খাঁর চেষ্টায় শাহ সেকেন্দর নির্ঘন বিবির সহিত পরিণয়-সূত্রে আবদ্ধ হন। তাঁহাদের মনসুর, কুতুব ও ইব্রাহিম নামক তিনটি সন্তান হয়। সম্রাট শাহ আলম ইহাদিগকে ১৪ দ্রোণ (শাহী) জমী খয়রাত দেন। সেই জমী ঝিয়রি ও বটতলা মৌজায় অবস্থিত,—আজ পর্যন্ত নিষ্কর। ঝিয়রি গ্রামে ৩ দ্রোণ ও বটতলী গ্রামে ৭ কালি জমী আছে। অবশিষ্ট জমী রাজসরকারে বাজেয়াপ্ত হইয়া গিয়াছে। ১২০০ মঘী সনের জরিপে এই সমস্ত জমী জিম্মে মনসুর, কুতুব ও ইব্রাহিম বলিয়া পরিমিত হইয়াছে। বর্তমান দরগাহটি শাহ সাহেবের বংশধর মুন্সী নুরুদ্দীন আহমদ কাজী সাহেব পাকা করিয়া দেন; কিন্তু চাল পূর্ববৎ বংশনির্মিতই আছে। তৎপূর্বে উহা বাঁশের ঘর ছিল। হজরত সাহেবের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না। এই বংশ আজও সম্পন্ন আছেন। তন্মধ্যে শ্রীযুক্ত দেরাজত উল্লা দারোগা, মুন্সী আকিউদ্দীন ও মিঞা অহিদউল্লা সাহেবগণ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁহারা জাতিতে আরব শেখ; কিন্তু এ দেশে ইহারা খোন্দকার শ্রেণীতে পরিণত হইয়া গিয়াছেন। শাহ সাহেবের বংশধর বলিয়া এ দেশের সর্বত্র তাঁহাদের বিশেষ প্রতিপত্তি।
এই দরগাহে হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ, সকলেই কামনা করিয়া সিন্নি ইত্যাদি প্রদান করিয়া থাকেন। ইহার মাহাত্ম্য সম্বন্ধে নানা কিংবদন্তী শ্রুতিগোচর হইয়া থাকে। বাহুল্যভয়ে তাহার উল্লেখ করিলাম না।
ঝিয়রি গ্রামের সাত ঘর হিন্দু ভিন্ন অপর কেহ এই দরগাহ ছায় না। অপর কেহ ভয়ে সে কার্যে এ পর্যন্ত ব্রতী হয় নাই। তাহারা ঘর ছাইতে আসিয়া বটতলী গ্রামে যথেচ্ছ ব্যবহার করিতে পায়। যে কোনও গৃহস্থের যে কোনও জিনিস তাহারা বিনা বাধায় গ্রহণ করিতে পারে। আশ্চর্যের কথা এই যে, এই দরগাহ ছাওয়া হইবার পূর্বে বটতলী গ্রামে পর্জন্যদেব বারিবর্ষণ করেন না!
দরগাহে প্রতি সন্ধ্যায় নিয়মিত বাতি দেওয়া হয়। কত লোকে কত তৈল-বাতি প্রদান করেন, তাহার ইয়ত্তা করা যায় না। আধ পোয়া তৈলের কমে উহাতে বাতি দেওয়া চলে না। তাহা হইলে বাতি জ্বলে না। কেহ কোনও মন্দ ‘নিয়তে’ (বাসনায়) বাতি দিলে, তাহা দুই তিন দিন পর্যন্ত অনবরত জ্বলিতে থাকে; অথচ তাহাতে তৈলের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে না।
বর্তমান দরগাহে পাশাপাশি ভাবে অবস্থিত তিনটি পাকা কবরে তিন মহাযোগী অনন্ত নিদ্রায় নিমগ্ন। পশ্চিম ভাগে হজরত শাহ মোছনের কবর, মধ্যভাগে তদীয় জামাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র শাহ সেকেন্দরের কবর ও পূর্বভাগে তাঁহার কন্যা নির্ধন বিবির কবর। শাহ সাহেবের কবরটি বৃহৎ; অপর দুইটি ক্ষুদ্র। দক্ষিণমুখী দরজা। সম্মুখে ফটক ও তাহার সম্মুখে বিস্তৃত শম্পাবৃত প্রাঙ্গণ। স্থানটি যেমন মনোরম, তেমনই শান্তিময়। গৃহের দক্ষিণভাগে দরজার অংশ সহ একটি ক্ষুদ্র বারাণ্ডা। শাহ সাহেব গৌড় হইতে আগমনকালে যে বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড সঙ্গে আনিয়াছিলেন, এই বারাণ্ডার নিম্নবর্তী প্রাচীরের উপর তাহা রক্ষিত হইয়াছে। প্রস্তরখণ্ড প্রায় ২.৪/৩ (পৌনে তিন) হাত হইবে। উহা কৃষ্ণ মর্মরপ্রস্তর বলিয়া বোধ হয়। উহাতে আরবী অক্ষরের মত এক প্রকার অক্ষরে কি লিখিত আছে। এ অঞ্চলের কেহ তাহার পাঠোদ্ধার করিতে পারেন নাই। শুনা যায়, জনৈক ইংরেজ রাজকর্মচারী উহার পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করিয়াছিলেন, কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। কথিত আছে, এই প্রস্তরখণ্ডে বসিয়া শাহ সাহেব ভগবদারাধনায় নিমগ্ন হইতেন। এই ঐতিহাসিক তত্ত্বোদ্ধারের যুগে এই প্রস্তর-লিপি অদ্যাপি অপরিজ্ঞাত ও অপরিচিত রহিয়াছে, ইহা নিতান্ত ক্ষোভের কথা।
সাহিত্য, চৈত্র ১৩১৩