সুফি সংগীত সিরিজ: পর্ব ০৩

বিশ্বব্যাপী সুফি সংগীতের বৈচিত্র্য, ধরণ ও প্রকরণ

নানাভাবেই সংগীতকে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়। যেমন: নান্দনিক/শৈল্পিক (Aesthetic/Artistic) দৃষ্টিকোণ থেকে– শিল্প/শাস্ত্রীয় (Art/Classical), লোক (Folk), আধুনিক (Modern)। পরিবেশনার দৃষ্টিকোণ থেকে– যন্ত্র (Instrument) ও কন্ঠ (Vocal)। ভৌগোলিক/সাংস্কৃতিক (Geographical/Cultural) দৃষ্টিকোণ থেকে– প্রাচ্য (East) ও পাশ্চাত্য/জনপ্রিয় (Western/Modern)। জমহুর গবেষকগণের অনুমান, সংগীতের প্রসারের দরুন শুধুমাত্র বিংশ শতাব্দীতেই ১,২০০ টিরও বেশি সংগীতের ধারা-উপধারার প্রবর্তন, চিহ্নায়ন ও সংজ্ঞায়ন হয়েছে। একটি সংগীত ধারা বা উপধারাকে তার সংগীত কৌশল, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এবং বিষয়বস্তুর ভাব ও মূলভাব দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে । ভৌগোলিক উৎস কখনও কখনও একটি সংগীত ধারা শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। তবে একটি একক ভৌগোলিক বিভাগের মধ্যে বিভিন্ন ধরণের সংগীত উপধারা মওজুদ থাকতে পারে। সংগীত ধারাকে সংজ্ঞায়নের ক্ষেত্রে টিমোথি লরি দেখান, পূর্বে ধারা (genre) ধারণাটি মূলত জনপ্রিয় সংগীত (যেমন রক, পপ, জ্যাজ) শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু ১৯৮০-এর দশক থেকে এটি সমগ্র সঙ্গীত গবেষণায় একটি মৌলিক বিশ্লেষণী কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। তিনি বলেন– “Genre has graduated from being a subset of popular music studies to being an almost ubiquitous framework for constituting and evaluating musical research objects.”[1]

এবার আসি, সুফি সংগীত ধারার চিহ্নায়নের ক্ষেত্রে। সুফি সংগীতকে সাধারণত আঞ্চলিক/ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ (যেমন– দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা) থেকে চিহ্নায়ন ও সংজ্ঞায়ন করা হয়। অনেক গবেষক একে কার্যকারিতার দৃষ্টিকোণ (ধর্মীয়, আধ্যাত্মবাদ বা লোকঐতিহ্য) থেকেও শ্রেণিবদ্ধ করে থাকেন। খুবই কম ঐতিহাসিক ও গবেষক রয়েছে, যারা সুফি সংগীতকে একক ও মৌলিক ধারা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একে লোকসংগীত (Folk)-এর একটি উপধারা হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে। আংশিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ মত সত্য বটে। তবে সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে শাস্ত্রীয়-লোক ধারার মতো সুফি সংগীত একটি মূলধারার ধারা (Genre)। দাবির প্রথম যুক্তি, সুফি সংগীত ধারা হলো শাস্ত্রীয় ও লোক উভয় সংগীত ধারার সংমিশ্রণে উদ্ভূত নতুন ধারা। এটি নিয়ে সুফি সংগীত বিকাশের সিলসিলা অংশে আংশিক আলোচিত হয়েছে। পাঠক এসব সংগীতের স্থান-কাল-পর্যায়-শাস্ত্র-বৃত্তান্ত ইত্যাদি বিবেচনা করে পাঠ করলে এই দাবির সত্যতা আবিষ্কার করতে পারবেন বলে আমার বিশ্বাস। দাবির দ্বিতীয় যুক্তি, কেমব্রিউ ম্যাকলিউডসহ একাধিক সংগীতজ্ঞ ও গবেষক সংগীতকে শ্রেণীবদ্ধ করার জন্য কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছেন। যেমন– শৈল্পিক স্বাতন্ত্র্য, সময়ের ব্যাপ্তি, জাতিগত স্বাতন্ত্র্য, পদ্ধতি ও সংগীতের উপকরণ, সংগীতের সূত্রপাত, সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবসহ ইত্যাদি।[2] যদিও সুফি সংগীতের মাঝে এসব মানদণ্ডের উপস্থিতি আছে কিনা তা এখনো গভীর অনুসন্ধান ও গবেষণার বিষয়। তবে সুফি সংগীতের বিকাশের সিলসিলা অংশে আমরা সুফি সংগীতের সূত্রপাত কিভাবে হলো, প্রাচীন থেকে আধুনিক পর্যন্ত এর বিবর্তনের ইতিহাস, পরিবেশনের পদ্ধতি ও উপকরণ এবং  আংশিকভাবে শৈল্পিক-জাতিগত স্বাতন্ত্র্যের বিষয়টি আলোচনা করেছি। সুফি সংগীতের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের আলোচনাকালে কিভাবে অন্যান্য সংগীত ধারা থেকে স্বতন্ত্র হলো তা চিহ্নিত করেছি। এই অংশে বিভিন্ন সুফি সংগীত পরিবেশনের পদ্ধতি ও উপকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো। ভবিষ্যতে সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। বিশেষত কাওয়ালী, গ্নাওয়া, কাহিনীমূলক কাসিদা, তুরস্কের সামা, জারি, বাংলার বাউল ও মারফতিগানে সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উপাদান নিয়ে পাঠ করা যেতে পারে। দাবির এই প্রধান যুক্তিদ্বয় ছাড়াও অসংখ্য সাংস্কৃতিক ও সাংগীতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ও এর ভাব-আবেদন-দর্শন ইত্যাদি অনুসন্ধান ও পর্যালোচনা করে সুফি সংগীতকে মূলধারা (Genre) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার বহু কারণ উদ্ধার করা সম্ভব।

 

সম্ভবত সুফি সংগীতই একমাত্র ধারা, যেটি সমগ্র মানবসমাজের আধ্যাত্মিক উত্তরণ ঘটানোর লক্ষ্যে রহস্যময় ও ঐতিহ্যপূর্ণ কাব্যসাহিত্য, স্থানীয় লোকধারার সংগীত ও কয়েক সহস্রাব্দের দীর্ঘপরম্পরা বহনকারী শাস্ত্রীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়-সংমিশ্রণ-অনুরণনে নিজ মাকসাদ ও সত্তাকে অক্ষুন্ন রেখে একটি একক, সমৃদ্ধশালী ও মৌলিক সংগীত ধারা হিসেবে উদ্ভব ও সহস্রাব্দী পেরিয়ে প্রাচীন থেকে আধুনিক পর্যন্ত বিকাশ হয়েছে। মূল ধারার বৈশিষ্ট্য ধারণ করে একটি সংগীতধারা দুই বা ততোধিক উপধারার সংযোগস্থল হতে পারে।[3] ক্ষেত্রভেদে সুফি সংগীতেরও বহু উপধারা রয়েছে। সাধারণত চারটি প্রধান ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক শাখায় উপধারাসমূহকে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়।[4] যেমন– ক. ইরান ও মধ্য এশিয়া (প্রাচীন আরব ও পারস্য), খ. আনাতোলিয়া, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্য, গ. মরক্কো, উত্তর আফ্রিকা ও মাগরেব এবং ঘ. দক্ষিণ এশিয়া (ভারতীয় উপমহাদেশ)। তবে আমরা প্রথাগত ও সেকেলে এই শ্রেণীবিভাগ উপেক্ষা করে প্রতিটি উপধারাকে তার উৎপত্তিস্থল স্বীকার করে একক ও স্বতন্ত্র হিসেবে পাঠ করার কৌশিশ করবো। কেননা, বিশ্বায়নের যুগে প্রযুক্তির কল্যাণে বিংশ শতাব্দী থেকে উপধারার অধিকাংশ সংগীত বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে জনপ্রিয়তা ও স্বতন্ত্র রূপ লাভ করেছে। নিজস্ব আঞ্চলিক সীমানা ও সীমাবদ্ধতাকে জয় করে এসব সংগীত চর্চিত বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রাম্তে। কখনো সুফিসাধক, দরবেশ, সংগীতজ্ঞ ও বণিকদের ভ্রমণের মাধ্যমে। কখনো মুসলিম শাসক, রাজা-সুলতান ও প্রশাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায়। আবার হাল আমলে গণমাধ্যম, রেকর্ড শিল্প, চলচ্চিত্র, ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের ফলে এ সংগীত বৈশ্বিক শ্রোতামহলে নতুন জীবন লাভ করেছে। ফলে বর্তমানে কোনো সুফি সংগীতধারাকে স্রেফ তার উৎপত্তিস্থল বা আঞ্চলিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে মূল্যায়ন করা যথার্থ নয়। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ এশীয় কাওয়ালি আজ ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপকভাবে পরিবেশিত ও সমাদৃত। একইভাবে আরব বিশ্বের কাসিদা, হামদ, নাত ও মানকাবাত দক্ষিণ এশিয়ার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সুপ্রতিষ্ঠিত। তদ্রূপ তুরস্কের ইলাহি ও মেভলেভি সংগীত, ইরানের নাওহা ও মুনাজাত, কিংবা উত্তর আফ্রিকার গ্নাওয়া, মাদিহ ও সামা-সংগীতও নিজ নিজ অঞ্চলের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পরিবেশিত হচ্ছে। বিভিন্ন ভাষা, সুর, বাদ্যযন্ত্র ও পরিবেশনাশৈলীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন রূপে বিকশিত হচ্ছে।

 

নিম্নে বিশ্ব পরিমণ্ডলে সুফি সংগীতের বহুল প্রচলিত প্রধান কিছু উপধারার পরিচয়, ইতিহাস ও গতিবিধিকে সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করা হলো। এসব বাংলা অঞ্চলের সুফি সংগীতসমূহকে বুঝতে, এর গতিবিধি-বিবর্তনকে ট্র্যাক করতে ও এর মূল উদ্ধার করতে অধিক সহায়তা করবে।

 

১. কাসিদাহ

কাসিদাহ’র বাংলা অর্থ ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘অভিপ্রায়’। কাসিদা ইসলামপূর্ব আরবি ও ফার্সি সাহিত্যের এমন এক প্রাচীন ও দীর্ঘ কাব্যধারা, যেখানে কোনো পৃষ্ঠপোষক, রাজা,  প্রিয় ব্যক্তি বা নবী-রাসুলের উদ্দেশ্যে নিবেদন, প্রশংসা বা গুণকীর্তন করা হয়। কাসিদা হলো কাব্যকলার সর্বোচ্চ রূপ। প্রাক-ইসলামী আরবি কবিদের চূড়ান্ত সাহিত্যিক দক্ষতার প্রদশর্নীর জন্য এটি ব্যবহৃত হতো। ধ্রুপদী ধারার কবিরা এর সীমাবদ্ধ কিছু নিয়মকানুনসহ কাসিদা রচনা করতেন ও এ ধারা অনবদ্য করে তুলেছেন। এদের রচনার মধ্যে ‘সাবায়ে মুয়াল্লাকাত (সপ্ত ঝুলন্ত কাব্য)’ সবচেয়ে বিখ্যাত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আরব কবিরা কাসিদার মৌলিকত্বকে বিসর্জন দিয়ে কৃত্রিমতার আশ্রয় নেন। ফলে অষ্টম শতাব্দীর শেষ নাগাদ কাসিদার জনপ্রিয়তা কমতে শুরু করে। দশম শতাব্দীতে আল-মুতানাব্বি স্বল্প সময়ের জন্য এটিকে সফলভাবে পুনরুদ্ধার করেন এবং এরপর থেকে বেদুইন ও বিশ্বের নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে সুফিসাধকগণ এর চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ফারসি, তুর্কি, উর্দু, সোয়াহিলি, ইংরেজি ভাষাতেও কাসিদা রচিত হতো। কাসিদাই আরবি সাহিত্যের কাব্যিক নন্দনতত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছে এবং কাব্যিক ভাষা ও চিত্রকল্পকে প্রভাবিত করেছে। কাসিদা কবিতা হলেও এসবকে সুরারোপ করে পড়া হতো। রজয (Rajaz) ছন্দ ছাড়া কাসিদার জন্য কার্যত যে-কোনো ছন্দই গ্রহণযোগ্য, কারণ রজয ছন্দের পঙক্তিগুলো অন্য ছন্দের পঙক্তিগুলোর অর্ধেক দৈর্ঘ্যের হয়।

 

নবম শতকের আরব সাহিত্যিক ইবন কুতাইবা তাঁর কিতাব আল-শি‘র ওয়া আল-শু‘আরা গ্রন্থে আরবি কাসিদার গঠনকে তিনটি অংশে ভাগ করেন–

১. নাসীব: এটি দিয়েই কাসিদার শোকগাথাঁধর্মী ও আবেগঘন সূচনা হয়। এখানে কবি অতীতের স্মৃতি, পরিত্যক্ত বাসস্থান, হারিয়ে যাওয়া প্রেম কিংবা বিচ্ছেদের বেদনা স্মরণ করেন। নাসিবে একটি প্রচলিত চিত্র হলো– কবি এক পরিত্যক্ত মরুশিবিরের ধ্বংসাবশেষের কাছে থামেন, যেখানে একসময় তাঁর প্রেমিকার গোত্র বাস করত। ছাই শীতল, তাঁবুর খুঁটিগুলো উধাও, এবং বাতাস যা অর্ধেক মুছে দিয়েছে, তার জন্য কবি কাঁদেন। ইমরুল কায়েস সর্বপ্রথম নাসিব রচনা করেন। তাঁর পরবর্তী সময়ে প্রায় সকল কাসিদা রচয়িতা তাঁকে অনুকরণ করেন।

২. তাখাল্লুস: এটি প্রথম অংশ থেকে দ্বিতীয় অংশে উত্তরণের পর্যায়। এখানে কবি নাসীবের আবেগময় স্মৃতি থেকে বেরিয়ে এসে রাহীল বা ভ্রমণপর্বে প্রবেশ করেন। এ অংশে কবি একটি দুর্গম ভূখণ্ড অতিক্রম করার বর্ণনা দেন এবং প্রায়শই উট বা মরুভূমির পশুদের বর্ণনা, মরুভূমির ঘটনাপ্রবাহ, বেদুইনদের জীবন ও যুদ্ধবিগ্রহের দৃশ্য তুলে ধরেন।

৩. মূল বক্তব্য বা উদ্দেশ্য: কাসিদার শেষ অংশে কবি তাঁর কাঙ্ক্ষিত অভিব্যক্তি ও প্রকৃত বক্তব্য উপস্থাপন করেন। এটি বিভিন্ন রূপ নিতে পারে, যেমন- ক. ফাখর/মাদিহ: নিজের বা নিজের গোত্রের গৌরব বর্ণনা। খ. হিজা: প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তি বা গোত্রের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ। গ. হিকাম: নৈতিক উপদেশ বা জীবনদর্শন।

কাসিদার সবচেয়ে কঠিন নিয়ম হলো একাক্ষর ছন্দ। এটি যতো বড়োই হোক, প্রতিটি পঙক্তি একই অন্ত্যমিলযুক্ত ব্যঞ্জনবর্ণে শেষ হয়, যাকে বলা হয় রায়ি। এছাড়াও কাসিদা সংক্রান্ত কঠোর নিয়মাবলিগুলো অষ্টম শতাব্দীতে পণ্ডিত আল-খলিল প্রথম বিধিবদ্ধ করেন।

ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত কাসিদা হলো ইমাম শারাফুদ্দিন আল-বুসিরী (মৃ. ১২৯৪ খ্রি.) এর কাসিদাতুল বুরদাহ। মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশসহ আজও বিশ্বের অসংখ্য দেশে এটি সুর করে পাঠ করা হয়। কাসিদাতুল হামযিয়্যা (قصيدة الهمزية) ইমাম আল-বুসিরির আরেকটি বিখ্যাত নাতকাব্য। ‘কাসিদাতুল বুরদা’ রচনার প্রায় বিশ বছর পর তিনি এটি রচনা করেন। কা’ব ইবন জুহাইরের বানাত সু’আদ ও ইবনে আরাবির বিখ্যাত কাসিদা তারজুমান-আল-আশওয়াক উল্লেখযোগ্য। এছাড়া হাসসান বিন সাবিত, হাম্মাম ইবনে গালিব আল ফারাজদাক, জারির ইবনে আতিয়্যাহ, খাকানী শিরভানী, মুহাম্মদ বিন সুলেমান ফুযুলি, আয়িশাহ আল-বাউনিয়াহ, শাহ নিয়ামাতুল্লাহ, মাদওয়ার্দ আল-ফরিদ, হাকিম সানাই ও নাসের খসরু-সহ অসংখ্য সুফি সাধক ও মুসলিম কবি বিভিন্ন ভাষায় কাসিদা রচনা করেছেন। বিস্তারিত পাঠের জন্য পল স্মিথের “The Qasida in Sufi Poetry: An Anthology” বইটি পড়া যেতে পারে।[5] কাসিদাকে চার ভাগে ভাগ করা হয়[6]:

 

১. ক. হামদ

“হামদ” (الحمد) অর্থ প্রশংসা করা। ইসলামী সংগীতে আল্লাহ তাআলার গুণাবলি, মহিমা, দয়া, সৃষ্টিশক্তি ও সার্বভৌমত্বের প্রশংসায় রচিত সংগীতকে হামদ বলা হয়। প্রাক-ইসলামী আরবি কবিতা ও সংগীতে গোত্রীয় বীর, উট এবং দেব-দেবীর প্রশংসা করে রচিত হলে হামদ বলা হতো। এসব ছাড়াও সেযুগে কবি লাবিদ বিন রাবিয়্যাহ, উমাইয়া বিন আবিস সালত, কুস বিন সাইদা আল ইয়াদির মতো একেশ্বরবাদী ও দ্বীনে হানিফের অনুসারিগণ এক খোদার প্রশংসামূলক হামদ রচনা করতেন। পরবর্তীতে ইসলাম আগমনের পরপরই মুসলিম কবিদের রচনায় হামদ মুসলমানদের মূলধারার সংগীত হিসেবে জনপ্রিয়তা লাভ করে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে অনেক সাহাবি হামদ রচনা ও পরিবেশনা করতেন। বিখ্যাত কিছু হামদ রচিয়তা হলেন–হযরত হাসসান ইবন সাবিত, কা’ব ইবন জুহাইর, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা, আলী ইবন আবি তালিব। উমাইয়া যুগে ছিলেন– আল-ফারাজদাক, জারির ইবন আতিয়্যাহ, আল-আখতাল। আব্বাসীয় যুগে আবু নুয়াস, আবু আল-আতাহিয়া, আল-মুতানাব্বি, আল-বুসিরি, আবু ফিরাস আল-হামদানি। পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, আব্বাসিয়া যুগে পারস্য ও মধ্য এশিয়ায় ফারসি ও তুর্কি ভাষায় সুফি সংগীত ধারা বিকশিত হয়। হামদ রচিয়তাদের মধ্যে এসময়ের জনপ্রিয় সুফিগণ হলেন– হাকিম সানাঈ, শেখ ফরিদউদ্দিন আত্তার, জালালুদ্দিন রুমি, সাদী শিরাজি, হাফিজ শিরাজি, আবদুর রহমান জামি, নিজামী গঞ্জবী, খাকানী শিরওয়ানী, আলী শির নওয়াঈসহ অনেকেই। এরা কেবল হামদ রচনা করেছিলেন এমনটা নয়, বরং সেসময়কার অন্যান্য সংগীত ধারায়ও তাদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। এভাবে গত ১৪ শতাব্দী ধরে আরবি, ফারসি, তুর্কি, উর্দু, বাংলা, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পশতু, কাশ্মিরি, মালয়, সোয়াহিলি, ইংরেজিসহ অসংখ্য ভাষায় অজস্র কবি হামদ রচনা করেছেন। উপমহাদেশে আমির খসরু, পীর নাসিরুদ্দিন নাসির, শাহ আকবর দানাপুরী, আমজাদ হায়দ্রাবাদী, মুজাফফর ওয়ারসি, বেদম শাহ ওয়ারেসী, আবদুল কাদের সিদ্দিকী, আল্লামা ইকবাল, আকবর ওয়ারেসী মিরাটীসহ অসংখ্য সুফি কবির হামদ রচনা এখনো ব্যাপক চর্চিত হয়। হাল আমলে ইন্দোনেশিয়া থেকে মরক্কো পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম বিশ্বে হামদ আবৃত্তি ও গীত হয়ে থাকে। একটি কাওয়ালি পরিবেশনা সাধারণত হামদের মাধ্যমে শুরু হয় এবং ঐতিহ্যগতভাবে এটিই পরিবেশনার প্রথম পরিবেশিত রচনা।

 

হযরত আলী (রা:)-এর রচিত হামদ (দিওয়ানে আলী থেকে),

الله حَيٌّ قَديمٌ قادِرٌ صَمَدُ

 فَلَيسَ يَشركهُ في مُلكِهِ أَحَدُ

 هُوَ الَّذي عَرَّفَ الكُفّارَ مَنزِلَهُم

 وَالمُؤمِنونَ سيَجزيهِم بِما وُعِدوا

وَمُصعَبٌ كانَ لَيثاً دونَهُ حَرَداً

 حَتّى تَزَمَّلَ مِنهُ ثَعلَبٌ جَسَدُ

 لَيسوا كَقَتلى مِنَ الكُفّارِ أَدخَلَهُم

 نارَ الجَحيمِ عَلى أَبوابِها الرُصُدُ

এ হামদে হযরত আলী যেমন আল্লাহর মহিমা ও একত্বের বর্ণনা দিয়েছেন, এর পরবর্তী পঙক্তিগুলোতে তিনি মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, মহাপরাক্রমশালী পরম খোদার নিকট আখিরাতে তাঁর জীবনকর্মের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কথা। আরো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন সেসব দিনগুলোর কথা, যখন ইসলামের প্রথম যুগের সাহাবিরা দ্বীনের প্রয়োজনে চরম আত্মত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং বীরত্ব প্রদর্শন করেছিলেন।

 

১. খ. নাত / মাদীহ নববী

না’ত হলো রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর প্রশংসায় রচিত কবিতা বা সংগীত। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই এই ধারার প্রচলন ছিল।  কবি হাসসান বিন সাবিত,  কা’ব বিন যুহাইরসহ মদিনার সংগীতজ্ঞ আনসারগণ আরবি ভাষায় না’ত পরিবেশনা করতেন।  পরবর্তী সময়ে প্রখ্যাত সব মুসলিম ও সুফি কবিগণ রাসুলুল্লাহর শানে না’ত পাঠ ও রচনা করেছেন। কাসিদার প্রকরণের মধ্যে না’তই সর্বাধিক চর্চিত একটি সংগীত ধারা। সুফি ঐতিহ্যে নাতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর প্রতি ভালোবাসাকে আল্লাহর ভালোবাসার নিয়ামক হিসেবে দেখা হয়। রাসুল (দ.)-এর চরিত্র, রহমাতুল্লিল আলামিন, শাফাআত, মিরাজ, মদিনার প্রতি ভালোবাসা ইত্যাদি নাতের বিষয়বস্তু। নাত রচনার ক্ষেত্রে খুবই উচ্চমানের কাব্যিক ভাষায় ছন্দ বুনার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যাঁরা নাত আবৃত্তি বা পরিবেশন করেন, তাঁদের নাত-খাঁ বা সানা-খাঁ বলা হয়। এই ধারাটি দক্ষিণ এশিয়ায় (বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারত) সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। অধিকাংশ নাতই সাধারণত বাংলা, পাঞ্জাবি বা উর্দু ভাষায় রচিত । উপমহাদেশীয় ভাষায় যেটিকে না’ত বলা হয়, এটিকে আরবীয় প্রেক্ষাপটে মাদীহ নববী নামে সাহিত্যিক ও শাস্ত্রীয়গণ চিহ্নিত করেছেন। অনুমান করা হয়, রাসুল (দ.) এর ইন্তেকালের পর ৬৩২ সালে এর উদ্ভব। এটি বিশেষত মিশর, মরক্কো, সিরিয়া, আলজেরিয়া ও সুদানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। মাদীহ সাধারণত সমবেত কণ্ঠে পরিবেশিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দফ ব্যবহার করা হয়। সবচেয়ে প্রাচীন নাত হলো-

طَلَعَ الْبَدْرُ عَلَيْنَا  مِنَ ثَنِيَّاتِ الْوَدَاع

وَجَبَ الشُّكْرُ عَلَيْنَا  مَا دَعَى لِلَّهِ دَاع

أَيُّهَا المَبْعُوثُ فِيْنَا    جِئتَ بِالْاَمْرِ الْمُطَاع

جِئتَ شَرَّفْتَ الْمَدِيْنَه  مَرْحَبًا يَا خَيْرَ دَاع

নবী মুহাম্মদ (দ.) যখন মক্কা থেকে মদিনায় আগমন করেছিলেন, তখন প্রথম এটি পরিবেশন করা হয়। ধারণা করা হয়, মদিনার আনসারাই এ নাতের রচিয়তা। এখানে রাসুলুল্লাহকে তাঁরা পূর্ণিমার চাঁদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। আরবি কাব্যে পূর্ণিমার চাঁদ ছিল সৌন্দর্য, পরিপূর্ণতা, শান্তি এবং অন্ধকার দূরীকরণের প্রতীক। নবীজীর আগমনের আগে আরব সমাজ ছিল জাহেলিয়াতের অন্ধকারে নিমজ্জিত। গোত্রগত সংঘর্ষ, সামাজিক বৈষম্য ও মূর্তিপূজা ছিল জীবনযাপন ও আচার-ব্যবহারের অংশ। তাঁর আগমনের মাধ্যমে সেই অন্ধকার ভেদ করে সত্য, ন্যায় ও একত্ববাদের আলো ছড়িয়ে পড়ে। তাই মদিনার আনসাররা বলেন, যেন রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উদিত হয়েছে। এই নাতে ‘সানিয়্যাতুল ওয়া’দা’ নামক  একটি মদিনার উপকণ্ঠের গিরিপথের উল্লেখ রয়েছে । ধারণা করা হয়, ওই গিরিপথ দিয়েই তিনি মদিনায় প্রবেশ করেছিলেন।

 

নবীযুগ ও সাহাবী যুগের সবচেয়ে জনপ্রিয় নাত খাঁ ছিলেন হাসসান বিন সাবিত। তাঁকে বলা হতো, শায়ের-এ দরবার-এ-রিসালাত বা নবিজীর কবি। তাঁর রচিত একটি বিখ্যাত নাত, যেটি সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে এখন পর্যন্ত সমগ্র মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়।

وَأَحْسَنُ مِنْكَ لَوْ تَرَقَتْ عَيْنِي

 اجْمَلُ مِنْكَ لَمْ تَلِدِ النِّسَاءُ

 خُلِقْتَ مُبَزَءٌ مِنْ كُلِّ عَيْبٍ

 كَانَكَ قَدْ خُلِقْتَ كَمَا تَشَاءُ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (দ.)-এর ব্যক্তিত্ব এতটাই পরিপূর্ণ, এতটাই ভারসাম্যপূর্ণ এবং বাহ্যিক কিংবা আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যের দিক থেকে এতটাই সৌন্দর্যমণ্ডিত যে মনে হয়, তিনি নিজেই নিজের ইচ্ছানুরূপভাবে সৃষ্টি হয়েছেন। তার মাঝে কোনো অপূর্ণতার অবকাশ নেই। সৃষ্টিতে এমন নিখুঁত সামঞ্জস্য রয়েছে, যা কল্পনারও অতীত। সাধারণ মুসলমানদের পাশাপাশি সুফি সাধকগণ এটিকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আবৃত্তি ও গীত করে  আসছেন এবং প্রকৃতপক্ষে তাঁরা রাসুলুল্লাহকে এমনটাই নিখুঁত হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন।

 

আরবীয়দের এই মাদীহ বা কাসিদা পারস্য ও মধ্যএশীয় সুফিসাধকদের প্রভাবিত করে। ফারসি সাহিত্যেও শতাধিক সুফি নাত রচনা করেছেন। যেমন শেখ সাদির একটি জনপ্রিয় নাত, যেটি এখনো সামা কাওয়ালিতে পাঠ করা হয়–

يا صاحب الجمال و يا سيد البشر

من وجهك المنير لقد نور القمر

لا يمكن الثناء كما كان حقه

بعد از خدا بزرگ توئی قصه منحصر

নাতে শেখ সাদী প্রথমে নবী (দ.)-কে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ নেতা ও সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর মুখমণ্ডলের জ্যোতিকে চাঁদের চেয়েও উজ্জ্বল বলে সম্বোধিত করেন এবং স্বীকার করেন যে, মানুষের ভাষা তাঁর যথার্থ প্রশংসা করতে অক্ষম। সবশেষে তিনি ঘোষণা করেন, আল্লাহর পরে সৃষ্টিজগতের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (দ.)-এর মর্যাদাই সর্বোচ্চ।

 

পারস্য থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে আগত সুফিসাধকদের মাধ্যমে নাত রচনার সিলসিলা উপমহাদেশেও প্রচলিত হয়। উপমহাদেশে এসে নাত সাহিত্য সবচেয়ে বেশি বিকশিত হয়। এখানকার সহস্রাধিক কবি ও সংগীতজ্ঞগণ না’ত রচনা করেছেন। এই ধারা এখনো বহমান। উপমহাদেশে চিশতিয়া তরিকার প্রবর্তক খাজা মঈন উদ্দীন চিশতী থেকে শুরু করে তরিকার পরবর্তী সাধকদের অনেকেই না’ত রচনা করেছেন। খাজা চিশতীর রচিত নাত–

 در جاں چو کرد منزل جانان ما محمد

صد در کشاد در دل از جان ما محمد

 ما بلبلیم نالاں در گلستان احمد

ما لولوئیم و مرجاں عمان ما محمد

 مستغرق گناہیم ہر چند عذر خواہیم

پژمرده چوں گیاهیم باران ما محمد

 ما طالب خداییم بر دین مصطفیٰ ایم

بر درگهش گدائیم سلطان ما محمد

 در باغ‌ و بوستانم دگر مخواں معینؔ

با غم بس است قرآں بوستان ما محمد

খাজা চিশতী বলেন, রাসূলুল্লাহ-এর প্রেম মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে। তাঁর শিক্ষা হৃদয়ের মৃত ভূমিতেও রহমতের বৃষ্টি বর্ষণ করে। মানুষ যতই দুর্বল ও পাপী হোক, নবীর আদর্শ অনুসরণ করে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে। তাঁর কাছে দুনিয়ার সৌন্দর্যের চেয়েও বড় সৌন্দর্য হলো কুরআন ও রাসূলের জীবন। কবি নাতে উপমা দিতে গিয়ে বিভিন্ন রূপক শব্দের আশ্রয় নেন, যেমন- জা’নান (প্রিয়তম), বুলবুল, গুলিস্তান, বা’রান (বৃষ্টি), বা’গ (বাগান), বুস্তাঁ (উদ্যান)।

 

উপমহাদেশে না’ত সাহিত্য বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে বেরেলির ইমাম আহমদ রেজার রচনা ছিল অত্যাধিক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রায় সহস্রাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে ‘হাদায়েকে বখশিশ’ অন্যতম। তাঁর রচিত একটি না’ত উপমহাদেশে খুবই জনপ্রিয়, মাদ্রাসা এসেম্বলি ও বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়মিত পরিবেশন করা হয়।

 

১. গ. মানকাবাত / মাদীহ শায়খ

 মানকাবাতের বাংলা অর্থ- গুণ, কৃতিত্ব বা প্রশংসনীয় কর্ম। এটি এমন এক ভক্তিমূলক সংগীত ধারা, যেখানে হযরত আলী (রা.), আহলে বাইত (নবী পরিবারের সদস্যগণ) কিংবা কোনো মহান সুফি সাধকের গুণকীর্তন ও প্রশংসা করা হয়। মানকাবাত বিভিন্ন কাব্যিক রীতিতে রচিত হতে পারে। এটি কখনো গজলের আঙ্গিকে লেখা হয়, যেখানে মাতলা, রাদিফ, কাফিয়া এবং একটি স্বতন্ত্র মাকতা (কবির নামযুক্ত শেষ শের) থাকে। আবার এটি কাসিদা রূপেও রচিত হতে পারে, যেটি আরবি ও ফারসি রাজদরবারের ঐতিহ্য থেকে আগত দীর্ঘ প্রশংসামূলক কাব্য। এছাড়াও মানকাবাত কখনো স্তবকভিত্তিক পদ্যরূপে প্রকাশিত হয়, যেখানে ধারাবাহিক স্তবকের মাধ্যমে কোনো মহান ব্যক্তি বা আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের গুণগান করা হয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে এটি কাসিদা নামেই পরিচিত ছিল। কিন্ত পারস্য কবিদের বদৌলতে ‘মানকাবাত’ নামে স্বতন্ত্র পরিচয় ধারণ করে। অনেক গবেষকগণ এই ধরনের রচনাকে ‘মাদীহ শায়খ (Madih Shaikh)’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। উপমহাদেশে আমির খসরুর সময়কাল থেকে এটি পরিবেশিত হয়ে আসছে। এটি এখনো সুফি সংগীত ধারার অবিচ্ছেদ্য অংশ। চিশতিয়া তরিকার প্রাণকেন্দ্র দিল্লি থেকে এই ঐতিহ্য সুফিদের বদৌলতে দাক্ষিণাত্যের সালতানাত, অযোধ্যা, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও বাংলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। কবিরা হজরত আলীর মতো একইভাবে আজমীরের খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী ও নিজামউদ্দিনের মতো মহান সাধকদের জন্য মানকাবাত রচনা করতেন। মূলত হামদ ও নাত পরিবেশনের পর সামা বা কাওয়ালীতে মানকাবাতকে সুরারোপ করে পরিবেশন করা হয়। বিংশ শতাব্দীতে এসে উপমহাদেশে মানকাবাত রচনা ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়। যার ধারা এখনো বহমান। কাওয়ালি ধারার সবচেয়ে বিখ্যাত মানকাবাতগুলোর একটি হলো–

من کنت مولیٰ فھٰذا فعلی مولیٰ

دا را دل دا را دل در دانی

ہم تم تنا نا نا نا نا رے

یلالی یلالی یلالی یلالی یلالی

من کنت مولیٰ فھٰذا علی مولیٰ

এটি আমির খসরু হযরত আলীর প্রশংসায় রচনা করেন। এটি নুসরাত ফতেহ আলী খান, সাবরি ব্রাদার্স, আজিজ মিয়াঁ, আবিদা পারভীন, ফরিদ আয়াজ এবং কাওয়াল বাহাউদ্দীনসহ বহু খ্যাতিমান শিল্পী পরিবেশন করেছেন।

 

উপমহাদেশে চিশতিয়া তরিকার প্রবর্তক খাজা মঈন উদ্দীন চিশতীর শানে পীর নাসিরুদ্দিন নাসিরের মানকাবাত–

امیر کشور ہندوستاں غریب نواز

فروغ انجمن چشتیاں غریب نواز

لئے فلک نے کڑے امتحاں غریب نواز

ہوں آج اس لئے محو فغاں غریب نواز

….

تری ثنا میں ہیں لفظوں کی جھولیاں خالی

قبول ہو مرا عجز بیاں غریب نواز

یہ کم ہے کیا کہ وہ پہنچا ہے ان کی چوکھٹ تک

کہاں نصیرؔ سا عاصی کہاں غریب نواز

তিনি পীরকে ‘গরিব নওয়াজ’ (غریب نواز) অর্থাৎ ‘গরিবদের প্রতি দয়া ও অনুগ্রহকারী’ উপাধিতে স্মরণ করেছেন। এই উপাধি খাজা মঈনুদ্দীন চিশতীর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ পরিচয়। এই মানকাবাতে পীর নাসির খাজা মঈনুদ্দীন চিশতীকে ভারতের আধ্যাত্মিক জগতের মহান ব্যক্তিত্ব, চিশতিয়া তরিকার প্রাণপুরুষ এবং গরিব-দুঃখীর আশ্রয়দাতা হিসেবে প্রশংসা করেছেন। কবিতায় তাঁর মানবপ্রেম, আধ্যাত্মিক মহত্ত্ব, বিনয়, সেবা ও আল্লাহর নৈকট্যের বিশেষ মাহাত্ম্যের সাথে বর্ণনা করেন। সুফিদর্শনে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের জীবনকে পরীক্ষায় পূর্ণ বলা হয়। পীর নিজের দুর্বলতা, দুঃখ ও কষ্টের কথা জানিয়ে খাজার দরবারে আশ্রয় প্রার্থনা করছেন। চিশতিয়া সুফি ঐতিহ্যের অনেকেই খাজাকে নিয়ে বিরচিত মানকাবাতকে ‘মাদীহে খাজা’ (খাজার প্রশংসা) সংগীত ধারা হিসেবে চিহ্নিত করেন।

 

১. ঘ. মাদাহ

মাদাহ- এর বাংলা অর্থ ‘প্রশংসা করা’। এটি সাধারণত পরম সৃষ্টিকর্তা, নবী ও পীর-আউলিয়াগণের প্রশংসামূলক ও রহস্যবাদী কবিতা গেয়ে পরিবেশন করা হয়। কিন্তু আধুনিক কালে সংগীতজ্ঞ নবীজির প্রশংসায় রচিত মাদাহ সংগীতকে ‘না’ত বা মাদীহ নববী’ ও পীর আউলিয়ার প্রশংসায় রচিত সংগীতকে ‘মানকাবাত বা মাদীহ শায়খ’ ধারায় অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে পূর্বে যেসব মাদাহ সংগীত হিসেবে বিবেচিত হতো, তা বর্তমানে না’ত ও মানকাবাতের অধীনে শ্রেণীভুক্ত। তবে বর্তমানে মধ্য এশিয়ার বাদাখশান অঞ্চলে (তাজিকিস্তান ও আফগানিস্তানের পামির পর্বতমালা) এক ধরণের আধ্যাত্মিক ও ভক্তিমূলক সংগীতের সন্ধান পাওয়া যায়, যা মাদাহ সংগীত নামে পরিচিত। এই মাদাহ সংগীতকে বোঝার জন্য ইসমাইলিবাদ/ইসমাইলি  নামে শিয়া ইসলামের একটি প্রধান শাখা নিয়ে প্রাথমিক পরিচয় থাকা জরুরি। একটি ইমামতের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে ইসমাইলিবাদের উৎপত্তি। ইমাম জাফর আস-সাদিক-এর ইন্তেকালের পর তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন, এই মতভেদের ফলে শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়। অধিকাংশ শিয়ারা তাঁর পুত্র মুসা আল-কাযিমকে ইমাম হিসেবে গ্রহণ করেন, যাঁরা পরে ইসনা আশারিয়া (বারো ইমাম) নামে পরিচিত হন। অন্যদিকে আরেকটি দল জাফর আস-সাদিকের জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাইল ইবনে জাফর অথবা তাঁর বংশধারাকে বৈধ ইমাম হিসেবে স্বীকার করে। মূলত বিদ্রোহী এই দলই পরবর্তীতে ‘ইসমাইলি’  ঘরানা নামে পরিচিত হয়। ইসমাইলিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো জীবিত ইমামের ধারণা। ইসমাইলিদের মতে, প্রত্যেক যুগে একজন বৈধ ইমাম বিদ্যমান থাকেন, যিনি কুরআনের বাহ্যিক (জাহের) অর্থের পাশাপাশি অন্তর্নিহিত (বাতেন) অর্থেরও ব্যাখ্যাকারী। এই কারণে ইসমাইলি চিন্তায় আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা, দর্শন এবং প্রতীকী অর্থের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। দশম শতকে উত্তর আফ্রিকায় প্রতিষ্ঠিত ফাতিমি খেলাফত (৯০৯–১১৭১ খ্রি.) ইসমাইলি ইমামদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। ফাতিমি যুগে কায়রো নগরী প্রতিষ্ঠিত হয় এবং আল-আজহার মসজিদ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাঁদের জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য বিকাশ লাভ করে। সময়ের সঙ্গে ইসমাইলি সম্প্রদায় আবার বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়। এর মধ্যে ‘নিজারি ইসমাইলি’ এবং ‘তাইয়্যিবি মুস্তাআলি ইসমাইলি’ সবচেয়ে পরিচিত।[7] ধর্মতাত্ত্বিকভাবে ইসমাইলিবাদে কুরআনের বাতেনি (অন্তর্নিহিত) ব্যাখ্যা, ইমামের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব এবং জ্ঞানভিত্তিক ধর্মীয় অনুধাবনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তারা ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস যেমন আল্লাহ, নবুওয়াত এবং কিয়ামতের প্রতি ঈমান পোষণ করে, যদিও এসব বিষয়ে তাদের কিছু ব্যাখ্যা অন্যান্য মুসলিম ধারার থেকে ভিন্ন হয়ে থাকে। বর্তমানে ইসমাইলি সম্প্রদায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করে। দক্ষিণ এশিয়া (ভারত, পাকিস্তান), মধ্য এশিয়া (বিশেষত তাজিকিস্তানের কিছু অঞ্চল), পূর্ব আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকায় তাদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্যও এসব অঞ্চলে ব্যাপক পরিচিত।[8]

 

এই ইসমাইলি সম্প্রদায় ও ওই অঞ্চলের সাধকের সংগীত হলো ‘মাদাহ’। ফার্সি সুফি কবিতার মতোই ইসমাইলি কবিতা ও সংগীতেরও প্রধান বিষয়বস্তু হলো- প্রেম। কবিতায় প্রেমিক-প্রেমিকা, মদ, সাকি ও পানশালার মতো প্রতীকী চিত্রকল্পের মাধ্যমে ঈশ্বরপ্রেম ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রকাশ ঘটে। এছাড়া ইমাম আলী (রা.) এবং সমকালীন ইসমাইলি ইমামদের প্রশংসায় বহু মাদাহ রচিত হয়েছে। পামির অঞ্চলের কাব্যিক ঐতিহ্যে ইসমাইলি দার্শনিক ও কবি নাসির খুসরো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একইসঙ্গে জালালুদ্দীন রুমি ও তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু শামস তাবরিজকেও ইসমাইলিরা এই ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন। ইসমাইলি মাদাহ সংগীতের উদ্দেশ্য হলো সমগ্র সম্প্রদায়ের লোকজনকে সুফিদের ধর্মীয় ভাবাবেশ (ওয়াজদ)-এর মতো একপ্রকার আধ্যাত্মিক উত্তরণের অবস্থায় নিয়ে যাওয়া । সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বাদাখশানে ধর্মীয় পুনর্জাগরণের সঙ্গে সঙ্গে মাদাহ সংগীতেরও পুনরুত্থান ঘটে। পূর্বের দীর্ঘ প্রায় সত্তর বছরের কমিউনিস্ট দমন-পীড়নের পরও এই সংগীতধারা প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে সংরক্ষিত ছিল। বর্তমানে বাদাখশানের ইসমাইলিদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান বাহক হিসেবে ‘মাদাহ’ বিবেচিত হয়। সম্প্রতি এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য মাদাহ রচনার পাণ্ডুলিপি, সামগ্রী ও ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র সংগ্রহ এবং জাদুঘর নির্মাণসহ বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।[9]

সংগীতের দৃষ্টিকোণ থেকে, মাদাহ মূলত একটি কণ্ঠসঙ্গীত। পামিরি সঙ্গীতের প্রকৃত অর্থ প্রকাশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো মানব কণ্ঠস্বর, যার বৈশিষ্ট্য হলো এক ভারী ও নাসিক্য ধ্বনিতে এটি পরিবেশন করা হয় । তবে এর সঙ্গে এক বা দুটি রুবাব এবং/অথবা তানবুর থাকে এবং এক থেকে দুটি দফ ব্যবহার করা হয়। মাদাহের মূল অংশটি একক কণ্ঠে গাওয়া হয় এবং ধ্রুবপদ বা মিসরার শেষ চরণটি গায়কদলের সাথে সমবেত কন্ঠে। এ সংগীতে বাদ্যযন্ত্রগুলি মূলত সূচনা, অন্তর্বর্তী এবং উপসংহারের জন্যও ব্যবহৃত হয়। মাদাহ সংগীতের সাথে বেলুচিস্তানের কলন্দর এবং কুর্দিস্তানের কাদেরি তরিকার অনুসারীদের সুফি সংগীতের বেশ কিছু মিল রয়েছে।

 

২. নাশিদ

নাশিদ বলতে ‘স্তবগান’-কে বোঝানো হয়, যা সম্পূর্ণ যন্ত্রানুষঙ্গ ছাড়াই পরিবেশিত হয়। মূলত নাশিদে ইসলামী বিশ্বাস, ইতিহাস, ধর্ম, সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিক কাহিনী এবং বর্তমান ঘটনাবলীর উল্লেখ থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে, নাশিদ শুধু কণ্ঠ দিয়ে অথবা দফ (ফ্রেম ড্রাম)-এর মতো ন্যূনতম বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে পরিবেশিত হতো। এতে বাদ্যযন্ত্রের তাল-লয়-সুরের চেয়ে অর্থপূর্ণ কথার ওপরই সর্বদা জোর দেওয়া হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কাসিদা ও নাশিদ অনেকাংশে সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। হাসসান বিন সাবিতও বেশ কিছু নাশিদ রচনা করেছিলেন। অনেক গবেষক তাঁকে সর্বপ্রথম নাশিদ রচিয়তা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ।  তাঁর রচিত নাশিদ–

الصُّبْحُ بَدَا مِنْ طَلْعَتِهِ * وَاللَّيْلُ دَجَا مِنْ وَفْرَتِهِ

 فَاقَ الرُّسُلَ فَضْلًا وَعَلَا • وَهَدَى سُبُلًا بِدِلَالَتِهِ

 كَنْزُ الْكَرَمِ مُوْلَى النِّعَمِ • هَادِي الْأُمَمِ بِشَرِيْعَتِهِ

 أَزْكَى النَّسَبِ أَعْلَى الْحَسَبِ • كُلَّ الْعَرَبِ فِي خِدْمَتِهِ

 سَعْتِ الشَّجَرُ نَطَقَ الْحَجَرُ . شَقَّ الْقَمَرُ بِإِشَارَتِهِ

 جِبْرِيلُ أَتَى لَيْلَ الْإِسْرَاءِ • وَالرَّبُّ دَعَاهُ لِحَضْرَتِهِ

 نَالَ الشَّرَفَ وَاللَّهُ عَفَا • عَمَّا سَلَفَا مِنْ أُمَّتِهِ

 فَوَسِيْلَتُنَا هُوَ سَيِّدُنَا . وَالْعِزُّ لَنَا بِإِجَابَتِهِ

 صَلَوَاتُ اللهِ عَلَى احْمَدْ * خَيْرِ الرُّسُلِ وَقَرَابَتِهِ

অনেকেই একে মাদীহে নববী হিসেবে বিবেচনা করলেও উপমহাদেশে নাশিদ হিসেবে প্রচলিত রয়েছে এবং এটিকে শুধু কন্ঠ দিয়েই বাদ্যযন্ত্রবিহীন গাওয়া হয়। এই নাশিদে কবি প্রথমে নবীজির সৌন্দর্যকে প্রভাতের আলো ও রাত্রির স্নিগ্ধতার সঙ্গে তুলনা করেই শুরু করেছেন। এরপর তাঁর নবুওয়াত, সর্বজনীন হিদায়াত, দানশীলতা, উচ্চ বংশমর্যাদা এবং বিভিন্ন মু’জিযার উল্লেখ করেছেন। ইসরা ও মিরাজের ঘটনায় তাঁর বিশেষ সম্মানকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আর উম্মতের জন্য তাঁর রহমত ও সুপারিশের আশাবাদও কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে। শেষাংশে কবি নবীজী ও তাঁর পরিবারবর্গের ওপর দরুদ প্রেরণের মাধ্যমে তাঁর গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

ইসলামের পরবর্তী সময়ে সুফি সংগীত ধারার বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের সাথে সমন্বয় করা শুরু করলে শুদ্ধবাদী আক্ষরিকপ্রথার মুসলমান ও মুসলিম ফকিহগণের সংগীত বিরোধিতা বাদ্যযন্ত্রবিহীন এই নাশিদকে স্বতন্ত্র একটি রূপ দান করে। এসব আক্ষরিকপ্রথার মুসলমান কবিদের রচনায় নাশিদ বেশি পরিলক্ষিত হয়। তবে স্বীকার করতে হয় যে, নাশিদ রচনায় কাদেরিয়া, মুজাদ্দেদীয়া তরিকার অনুসারী কবিগণেরও অবদান রয়েছে। কেননা এসব তরিকার সাধনপদ্ধতিতে কোনো বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার নেই, কখনো কখনো তাঁরা  বাদ্যযন্ত্রের ঘোর বিরোধী। পূর্বে এটি শুধু ধ্রুপদী আরবী ভাষায় গাওয়া হতো। তবে আধুনিককালে উর্দু, পাঞ্জাবি, আরবি, ফারসি, ইংরেজি, মালয়সহ বিভিন্ন ভাষায় জনপ্রিয়তা লাভ করে। নাশিদ এমন এক ধরনের সঙ্গীত, অনেক রক্ষণশীল মুসলমানও যেটি শুনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। জাগতিক বিষয়ের উপর আলোকপাত না করে, নাশিদ ঈমান, চরিত্র, সহানুভূতি, নম্রতা, কৃতজ্ঞতা, আধ্যাত্মিক উন্নতি পারলৌকিক ও ধর্মীয় নানা বিষয়াবলির উপর জোরারোপ করে। বিবাহ অনুষ্ঠান ও মাওলিদেও এটি পরিবেশিত হয়। ইমাম বুসরির রচিত কাসিদাতুল বুরদাসহ বহু কাসিদাকে নাশিদ রূপে সুরারোপ করে পরিবেশন করে থাকেন।

 

বিখ্যাত সুফি সাধিকা রাবেয়া বসরীর রচিত নাশিদ[10], যেটি আধুনিক সময়ে সামি ইউসুফসহ একাধিক জনপ্রিয় শিল্পীদের দ্বারা পরিবেশিত হয়েছে–

أحبك حبين؛ حب الهوى

وحباََ لأنك أهل لذاك

فأما الذي هو حب الهوى

فشغلي بذكرك عمن سواك

وأما الذي أنت، أنت أهلٌ له

فلست أرى الكون حتى أراك

 

এছাড়া জালালুদ্দিন রুমির দিওয়ান-এ-শামসে তিবরীজি ও হাফিজ শিরাজীর দিওয়ান-এ হাফিজের কিছু অংশ নাশিদ রূপে পাঠ করা হয়।

 

ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে বেশ কিছু সংগীতকার ও দলের পরিচয় পাওয়া যায় যাঁরা ‘নাশিদে’র পরিবেশনায় প্রথম বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ করেন। পূর্বে কেবল নাশিদ পরিবেশনে দফ ব্যবহার হলেও বর্তমানে আধুনিক শিল্পীদের কল্যাণে পিয়ানো, গিটার, বেহালা, ইলেকট্রনিক বিটস, অর্কেস্ট্রার মতো বাদ্যযন্ত্র নাশিদ পরিবেশনে ব্যবহার হয় । নাশিদের এই বিবর্তনের জন্য সামি ইউসুফ, হ্যারিস জে, মাহের জাইন, জাইন ভিখার মতো শিল্পীদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পপ, আর অ্যান্ড বি, হিপ হপসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সংগীতের সঙ্গে  এটি সমম্বয় সাধন করছে। একসময় এই বিশিষ্ট সাংগীতিক ধারাটি পৃথিবীর বহু আক্ষরিকপ্রথার মুসলমান সমাজে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীকালে এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই ‘নাশিদ’র প্রচলন সর্বত্র ছড়ায় এবং জনপ্রিয় হয়। অনেক প্রথাগত মুসলমান এখনো ‘নাশিদ’ ব্যতীত বাকিসব ইসলামিক, অনৈসলামিক সংগীতকে অসম্পূর্ণ ও ভ্রান্ত মনে করে থাকেন। মেহের জাইনের গাওয়া একটি জনপ্রিয় নাশিদ-

رقت عيناي شوقاً .. ولطيبة ذرفت عشقاً

فأتيت إلى حبيبي .. فاهدأ يا قلب ، ورفقاً

صل على محمد

السلام عليك يا رسول الله .. السلام عليك يا حبيبي يا نبي الله

السلام عليك يا رسول الله .. السلام عليك يا حبيبي يا نبي الله

يا رسول الله

এই নাশিদে মহানবীর প্রতি গভীর ভালোবাসা, আকুলতা, মদিনা জিয়ারতের আকাঙ্ক্ষা ও নবির প্রতি দরুদ ও সালাম প্রকাশ পেয়েছে। মেহের জাইনের আরো নাশিদ পাঠের জন্য ‘Enjoying Islam with zain and Dawud’ সিরিজের বইগুলো সহায়তা করবে।[11]

 

৩. মুনাজাত

মুনাজাত হলো পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে বিনয়পূর্ণ প্রার্থনা। এটি একদিকে যেমন উচ্চস্তরের সাহিত্য, অন্যদিকে তা আধ্যাত্মিক সংগীত। স্রষ্টার নিকট ক্ষমাপ্রার্থনা, তওবা, রোগ বা দারিদ্র্য থেকে মুক্তি, আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা, আত্মসমর্পণ হলো মুনাজাতের বিষয়বস্তু। ইসলামের প্রথম হিজরি থেকে এর প্রচলন। প্রায় সকল মুসলমান ও সুফি কবিগণ নিজ আত্মিক আকাঙ্খাগুলো মুনাজাতের সুরে প্রকাশ করেছেন। নবীযুগে হজরত আলী থেকে হাল আমলের পীর নাসিরুদ্দিন নাসিরসহ প্রায় সবাই মুনাজাত রচনা করেছিলেন। এসব মুনাজাত কখনো হামদ-নাত-নাশিদ বা কখনো রুবাইসহ বিভিন্ন সংগীতধারার সমন্বয় ও সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে। ফলে দেখা যায়, অনেক সংগীত নাত-হামদ-রুবাই রূপে রচিত হলেও তা পরবর্তীতে মুনাজাত হিসেবেই জনপ্রিয় হয়েছে। যেমন উপমহাদেশসহ সমগ্র মুসলিম বিশ্বে জনপ্রিয় ও হজরত আলীর রচিত মুনাজাত হলো–

لك الحمد يا ذا الجود و المجد والعلا  *  تباركت تعطي من تشاء و تمنع

إلهي وخلاقي وحرزي و موئلي  *  إليك لدى الإعسار واليسر أفزع

…..

إلهي ذنوبي جَازَتِ الطَوْدَ واعْتَلَتْ  *  وَصَفْحُكَ عَنْ ذَنِبي أَجَلُّ وأَرْفَعُ

إلهي ذنوبي جازت الطود و اعتلت  *  وصفحك عن ذنبي أجل وأرفع

 

বিখ্যাত সুফি কবি আবদুর রহমান জামির একটি রুবাই যা মুনাজাতে সুরাকারে পঠিত হয়–

১.

یارب دل و پاک و جان آگاہم دہ

آہ شب و گریۂ سحر گاہم دہ

در راہ خود اول ز خودم بے خود کن

انگہ بے خود ز خود به خود راهم دیہہ

জামি আল্লাহর কাছে এমন একটি নির্মল হৃদয় এবং জাগ্রত আত্মা প্রার্থনা করেন, যেটি সত্যকে উপলব্ধি করতে সক্ষম। তিনি চান রাতের নির্জনে দীর্ঘ সাধনা, তাহাজ্জুদের কান্না এবং ভোরের আগে একাগ্রতার সহিত ইবাদত করার তাওফিক। সুফি সাধনায় রাতের নির্জন ইবাদতকে আত্মার পরিশুদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। এরপর তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমাকে আমার অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে মুক্ত করে দিন।’ এখানে ‘বেখুদ’ (بے خود) অর্থ নিজের অহং, আত্মগর্ব ও নফসের আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়া। এরপর আল্লাহ যেন নিজেই তাঁকে তাঁর পথে পরিচালিত করেন। অর্থাৎ মানুষের আধ্যাত্মিক যাত্রা শুরু হয় নিজের অহংকে অতিক্রম করার মাধ্যমে, আর তার পরবর্তী পথপ্রদর্শক একমাত্র আল্লাহ।

 

উর্দুতে রচিত আল্লামা ইকবালেরও একটি বিখ্যাত মুনাজাত রয়েছে। এটি শিশুদের জন্য রচিত দোয়া হলেও এখনো উপমহাদেশে বিভিন্ন দরবার, মসজিদ ও মাদ্রাসায় পরিবেশিত হয়। মুনাজাতটি বাঙ্গে দারা কাব্যগ্রন্থে প্রথম প্রকাশিত হয়।

لب پہ آتی ہے دعا بن کے تمنا ميری

زندگی شمع کی صورت ہو خدايا ميری

دُور دنيا کا مرے دم سے اندھيرا ہو جائے

ہر جگہ ميرے چمکنے سے اُجالا ہو جائے

ہو مرے دم سے يونہی ميرے وطن کی زينت

جس طرح پھول سے ہوتی ہے چمن کی زينت

 زندگی ہو مری پروانے کی صورت يا رب

علم کی شمع سے ہو مجھ کو محبت يا رب

 ہو مرا کام غريبوں کی حمايت کرنا

دردمندوں سے ضعيفوں سے محبت کرنا

مرے اللہ! برائی سے بچانا مُجھ کو

نيک جو راہ ہو اسی رہ پہ چلانا مجھ کو

 

এই মুনাজাতটি কোনো ব্যক্তিগত কল্যাণের দোয়া নয়। আল্লামা ইকবাল এখানে এমন একটি আর্দশ চরিত্রকে চিত্রিত করেছেন, যিনি হবেন একাধারে জ্ঞানপ্রেমী, আত্মত্যাগী, দেশপ্রেমিক, মানবদরদী এবং নৈতিকভাবে দৃঢ়। তাঁর দৃষ্টিতে মানুষের প্রকৃত সফলতা নিজের জন্য বেঁচে থাকার মধ্যে নয়; বরং জ্ঞানার্জন, সমাজকে আলোকিত করা, দরিদ্র ও দুর্বল মানুষের সেবা করা এবং আল্লাহর নির্দেশিত সৎপথে অবিচল থাকার মধ্যেই নিহিত। তিনি এখানে শামা (প্রদীপ) ও পরওয়ানা (প্রজাপতি বা পতঙ্গ)-র মতো প্রতীকী শব্দ ব্যবহার করে তাঁর আকাঙ্খার ভাষাকে অধিকতর মজবুত করেছেন।

 

পাকিস্তানের বিখ্যাত সুফি কবি পীর নাসিরুদ্দিন নাসিরের রচিত রুবাইও মুনাজাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়–

یا رب مرے دل کو شاد کامی دے دے

شوریدگی رومی و جامی دے دے

رکھ آل نبی کے نام لیواؤں میں

اصحاب رسول کی غلامی دے دے

নাসির এখানে বলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমার হৃদয়কে প্রকৃত সফলতা ও প্রশান্তি দান করুন। আমাকে এমন আধ্যাত্মিক উন্মাদনা দিন, যেমনটি জালালুদ্দিন রুমি ও আবদুর রহমান জামির মধ্যে ছিল।’ এখানে ‘শৌরিদগী’ (شوریدگی) বলতে এমন উন্মাদনাকে বোঝানো হয়, যেখানে প্রেমিক পরম সত্তার প্রেমে আত্মহারা হয়ে যান, জাগতিক-ইহলৌকিক আসক্তি অতিক্রম করে ইলাহী প্রেমে নিমগ্ন হন। এরপর কবি নিজেকে আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নিবেদন করেন এবং রাসুলের সাহাবীদের গোলামী করার তাওফিক অর্জনের জন্য প্রার্থনা করেন। গোলামী বলতে এখানে আক্ষরিক দাসত্ব নয়; বরং তাঁদের আদর্শকে বিনয়ের সঙ্গে অনুসরণ করার রূপক প্রকাশ।

মুনাজাত অত্যন্ত ধীর লয়ে দু হাত উপরে তুলে বিনয় ও আবেগের সাথে মুনাজাত পরিবেশন করা হয়। কুরআন শরীফের বহু আয়াত, হাদীস থেকে রাসুল (দ.) এর শিখিয়ে দেওয়া দোয়া, বহু নবী অলী সুফিদের আরবি দোয়াকে মুনাজাত আকারে গাওয়া হয়। রাসুলুল্লাহ কিভাবে মুনাজাত করতেন, তাঁর পরবর্তী সাহাবী-তাবেয়ী ও সুফি সাধকগণ কিভাবে মুনাজাত করতেন– তা নিয়ে বাংলা, আরবী, উর্দু ও ফারসিতে অসংখ্য গ্রন্থ পাওয়া যায়। এসব গ্রন্থ পাশাপাশি রেখে পর্যালোচনা করলে সংগীত ও মুনাজাত কিভাবে প্যারালালি বিকশিত হয়েছে তা আরো গভীরভাবে বোঝা সম্ভব।

 

৪. রুবাই

রুবাই চার পংক্তির একটি স্বতন্ত্র ফারসি কাব্যরীতি। সুফি কবিরা এই সংক্ষিপ্ত কাঠামোর মধ্যে নিজের গভীর আধ্যাত্মিক সত্য, আত্মজিজ্ঞাসা ও খোদাপ্রেম প্রকাশ করে থাকেন। মহাকবি আবুল কাসেম ফেরদৌসী প্রথম রুবাই রচনা করেছিলেন। বর্তমান অর্থে যে রুবাইরীতির সাথে আমরা পরিচিত, তার সঙ্গে ফেরদৌসীর প্রাথমিক রূপের যথেষ্ট পার্থক্য আছে। পরবর্তীকালে এই কাব্যধারা ক্রমে পরিণতি লাভ করে এবং ফারসি সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র শিল্পরূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মাওলানা জালাল উদ্দীন রুমী ও শেখ মুসলেহউদ্দীন সাদীও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রুবাই রচনা করেছেন। রুমীর আধ্যাত্মিক গুরু বাবা ফরিদও চার পঙক্তির কবিতার একটি সংকলন রচনা করেন। অপরদিকে দরবেশ কবি বাবা তাহির-এর চার পঙক্তির কবিতাগুলো দুবাইতি (Do-baytī) নামে পরিচিত। দুবাইতি ও রুবাই উভয়ই চার পঙক্তির হলেও, তাদের ছন্দ ও মাত্রাবিন্যাসে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পারস্য কবি ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ওমর খৈয়াম (১০৪৮–১১৩১ খ্রি.)-কে রুবাই সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর রুবাইসমূহ দর্শন, জীবনবোধ, সংশয়, মানবজীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের এক অনন্য সমন্বয়। এ কারণেই তাঁকে রুবাই জগতের ‘কুতুব মিনার’ বলে অভিহিত করা হয়। এছাড়া আবু সাঈদ আবুল খায়ের, আবদুর রহমান জামির রুবাই রচনাও সমানভাবে সমৃদ্ধ। প্রায় এক হাজার বছর আগে এসকল মহাকবির হাতে রুবাই কাব্যরীতি শিল্পগুণ ও ভাবগভীরতার এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

 

বিষয়বস্তুর দিক থেকে রুবাই মূলত জীবনদর্শন, মানবঅস্তিত্ব, প্রেম, আধ্যাত্মিকতা ও নৈতিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও, গবেষকরা বিশেষত ওমর খৈয়ামের রুবাইকে বিষয়ভিত্তিক ছয়টি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন।[12]

১. শিকায়াত-ই-রোজগার (অদৃষ্ট বা ভাগ্যের প্রতি অনুযোগ),

২. হজও (ভণ্ডামি ও কপটতার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ),

৩. ফিরাকিয়া ও ওয়াসালিয়া (বিরহ ও মিলনকেন্দ্রিক রুবাই),

৪. বাহারিয়া (বসন্ত, প্রকৃতি ও তার অনুষঙ্গ),

৫. কুফরিয়া (প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও গোঁড়ামির সমালোচনামূলক রুবাই) এবং

৬. মুনাজাত (আল্লাহর উদ্দেশ্যে প্রার্থনামূলক রুবাই)।

বাংলা ভাষায় শতাধিক গুণীজন ওমর খৈয়ামের রুবাইগুলো অনুবাদ করেছেন। ফলে বাংলাভাষী মানুষ কমবেশ খৈয়ামের রুবাই সম্পর্কে পরিচিত। খৈয়াম ব্যতীত আমরা তৎকালীন সুফি কবিদের রচিত দুয়েকটি রুবাইয়ের সাথে পরিচিত হই।

 

সুফি আবদুর রহমান জামির রুবাই–

توحید به بعرف صوفی صاحب سیر

تخلیص‌‌ دل از توجۂ اوست بغیر

رمزی ز نہایات مقامات طیور

گفتم به تو گر فہم کنی منطق طیر

জামির মতে, তাওহীদ কেবল একটি বিশ্বাসগত বা আকিদাগত  ঘোষণা নয়। তাওহীদ এমন এক অন্তরজাগরণ, যেখানে মানবাত্মা পরমাত্মা ব্যতীত জাগতিক সবকিছুর আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণভাবে তাঁর দিকে নিবদ্ধ হয়। এই অবস্থায় পৌঁছাতে আত্মশুদ্ধি, নফসের পরিশোধন এবং দীর্ঘ আধ্যাত্মিক সাধনার প্রয়োজন। সুফি দর্শনে ‘তাখলিসুল ক্বালব’ (হৃদয়ের পরিশুদ্ধি) মূল লক্ষ্য বিবেচনা করা হয়। রুবাইয়ের শেষাংশে তিনি ইঙ্গিত দেন, এই সত্য অনুবাধন করতে শাস্ত্রীয়/বাহ্যিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়। পাখিদের ভাষা অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে এর প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করা সম্ভব। পাখিদের ভাষা তিনি শেখ ফরিদুদ্দিন আত্তারের রচিত ‘منطق الطیر’ (মানতিকুত-তায়র বা পাখিদের ভাষা) গ্রন্থকে নির্দেশ করেছেন।

 

হাফিজ শিরাজীর রচিত রুবাই–

روزی کہ فلک از تو بریدہ است مرا

کس با لب پر خنده ندیده است مرا

چنداں غم ہجر تو بر دل دارم

من دانم و آنکه آفریده است مرا

এই রুবাইয়ে হাফিজ শিরাজী ইলাহী প্রেমের বিচ্ছেদবেদনা এবং আল্লাহর প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষাকে কাব্যিক রূপ দিয়েছেন। কবি অনুভব করেন, পরম প্রিয় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তাঁর অন্তরের হাসি ও প্রশান্তি হারিয়ে গেছে। এই বেদনা এতটাই গভীর যে তা অন্য কারও পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। কেবল তিনি নিজে এবং তাঁর পরম সৃষ্টিকর্তাই এর প্রকৃত গভীরতা জানেন। সুফি সাহিত্যে আত্মার এই আকুলতা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। সুফিরা তার চিরন্তন উৎসের দিকে ফিরে যেতে চায় এবং পরম সান্নিধ্য লাভ না করা পর্যন্ত প্রকৃত শান্তি খুঁজে পায় না।

 

বাবা ফরিদ উদ্দীন গঞ্জেশকরের রূবাই–

خوشا آنانکہ اللہ یار شاں است

بحمد و قل ہواللہ کارشاں است

خوشا آنانکہ دائم در نمازاند

بہشت جاوداں بازار شاں است

এই রুবাইয়ে বাবা ফরিদ একজন আদর্শ মুমিনের তিনটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। প্রথমত, তিনি একমাত্র আল্লাহকেই নিজের প্রকৃত বন্ধু, আশ্রয় ও অভিভাবক মনে করে। দ্বিতীয়ত, তাঁর জীবন আল্লাহর যিকির, প্রশংসা এবং নিয়মিত ইবাদতের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তৃতীয়ত, দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী লাভের পরিবর্তে আখিরাতের চিরস্থায়ী সফলতাকে জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এখানে ‘দায়িম দর নামাজ’ বলতে সারাক্ষণ নামাজ পড়া বোঝানো হয়নি; বরং এমন জীবন পরিচালনা করার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেটি সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক বজায় রাখে। ‘বেহেশ্ত জাওয়েদান বাজার শাঁন অস্ত’ পংক্তিতে ‘বাজার’ শব্দটি রূপকার্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ, জান্নাতই তাঁদের/মুমিনদের জন্য চূড়ান্ত লাভ, প্রকৃত সম্পদ ও স্থায়ী গন্তব্য।

 

উপমহাদেশে পীর নাসিরুদ্দিন নাসিরই বিভিন্ন বিষয়বস্তুর উপর সর্বাধিক রুবাই রচনা করেছিলেন। হজরত আবু বকর, ওমর, ওসমান, আলী, ইমাম হাসান-হোসাইন, আবদুল কাদের জিলানী, খাজা মুঈন উদ্দীন চিশতীসহ অসংখ্য সুফিদের প্রশংসায় রুবাই রচনা করেছেন। ইমাম হোসাইনের কারবালার আত্মত্যাগ নিয়ে তাঁর রুবাই–

جس کے نام پہ نبض حیات چلتی ہے

زمیں کا ذکر ہی کیا کائنات چلتی ہے

یہ بات ذہن میں رکھیے کہ جبر کے آگے

حسین بات چلائے تو بات چلتی ہے

এই রুবাইয়ে পীর নাসির কারবালার ঘটনাকে শুধু ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে না দেখে, সত্য ও মিথ্যার চিরন্তন সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আত্মত্যাগ মানবজাতিকে শিক্ষা দেয় যে, অন্যায়, স্বৈরাচার ও জবরদস্তির সামনে নীরব না থেকে সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে। কারণ সাময়িকভাবে শক্তির প্রাধান্য দেখা গেলেও, ইতিহাসের বিচারে ন্যায়, সত্য এবং নৈতিক সাহসই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়। হজরত আবদুল কাদের জিলানীর প্রশংসায় পীর নাসিরের রচিত রুবাই–

محمود صفات شیخ عبدالقادر

ہم عارفِ ذات شیخ عبدالقادر

مخدوم الاؤلیا و تاج الفقرا

سرخیلِ هدایت شیخ عبدالقادر

এখানে তিনি শায়খ আবদুল কাদির জিলানীকে একজন আদর্শ আলেম, আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক এবং আত্মশুদ্ধির শিক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে শায়খ আবদুল কাদিরের প্রকৃত মর্যাদা তাঁর জ্ঞান, তাকওয়া, বিনয়, আল্লাহর প্রতি গভীর আনুগত্য এবং মানুষের হিদায়াতের জন্য নিরলস প্রচেষ্টায় নিহিত। এখানে তিনি শায়খের জন্য তাজুল ফুকারা (ফকিরদের মুকুট), মাখদুমে আউলিয়া (আউলিয়াদের খাদিম ও শ্রদ্ধেয় নেতা), সারজিলে হিদায়াত (হিদায়াতের অগ্রদূত বা পথপ্রদর্শক) উপাধিগুলো ব্যবহার করেছেন।

 

রুবাই সাধারণত AABA প্যাটার্ন অনুসরণ করে, যেখানে প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ পঙক্তিগুলোর অন্ত্যমিল থাকে।[13]  ইংরেজি কাব্যে এই AABA প্যাটার্নকে ‘Rubaiyat Quatrain’ বলা হয়। Edward FitzGerald, খৈয়ামের Rubaiyat of Omar Khayyam (১৮৫৯) অনুবাদ করার সময়ও এই ছন্দরীতি ব্যবহার করেন।

Tis all a Chequer-board of Nights and Days

Where Destiny with Men for Pieces plays:

Hither and thither moves, and mates, and slays,

And one by one back in the Closet lays.

 

পরবর্তীকালে এই রীতি ইংরেজি সাহিত্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং Robert Frost-এর বিখ্যাত কবিতা ‘Stopping by Woods on a Snowy Evening (1922)’-সহ বহু ইংরেজি কবিতায় রুবাই ব্যবহৃত হয়। এটি বাংলাদেশের জাতীয় কারিকুলামের নবম-দশম শ্রেণির ইংরেজি প্রথম পত্র বইয়ে এখনো পাঠ্য কবিতা হিসেবে পড়ানো হয়। কাজী নজরুলও মূল ফারসি থেকে অনুবাদ করার সময় এই মূল অন্ত্যমিল বজায় রেখেছেন:

আমরা দাবার খেলার ঘুঁটি, নাইরে এতে সন্দ নাই!

আসমানী সেই রাজ-দাবাড়ে চালায় যেমন চলছি তাই।

এই জীবনের দাবার ছকে সামনে পিছে ছুটছি সব

খেলা শেষে তুলে মোদের রাখবে মৃত্যু-বাক্সে ভাই!

 

অনেক গুণী কবি বাংলায় মৌলিক রুবাই লিখেছেন। যেমন ড. সৈয়দ আজিজ লিখেছেন-

‘দুইয়ে দুইয়ে চলছে খেলা নিরবধি

দুইয়ের স্রোতে একই ধারায় বইছে নদী

দেহের ভিটা উথলে উঠে ভাঙছে শুধু

মুক্তি হবে যুক্তি এসে কাঁদায় যদি।’

 

৫. গজল (Ghazal)

আক্ষরিক অর্থে গজল প্রেমিক ও প্রেমিকার মধ্যকার আলাপচারিতাকে বোঝানো হয় । মানবীয় প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, আনন্দ ও বেদনাকে দ্বিপদী ছন্দে গজলে প্রকাশ করা হয়। গজল মূলত প্রেমের কাব্যধারা হলেও এতে পার্থিব প্রেমের পাশাপাশি স্রষ্টার প্রতি আত্মার আকুল নিবেদন, ভক্তি ও মোক্ষলাভের আকাঙ্ক্ষা এক অনন্য রূপে প্রকাশ পায়।[14] ফলে মানবিক প্রেম ও আধ্যাত্মিক সাধনার অপূর্ব সমন্বয়ই গজলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আমির খসরুর একটি বিখ্যাত গজল এই বৈশিষ্ট্যের যথোপযুক্ত উদাহারণ। ফার্সি ও ব্রজভাষা মিশ্রিত গজলটি লতা মঙ্গেশকর ও শাব্বির কুমারের কণ্ঠে ১৯৮৫ সালে ‘গুলামি’ সিনেমায় পরিবেশিত হয়েছিল। এবং সম্প্রতি ২০২৩ সালে বিশাল মিশ্র ও শ্রেয়া ঘোষালের কন্ঠে পুনরায় জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

زحال مسکیں مکن تغافل دورائے نیناں بنائے بتیاں

کہ تاب ہجراں ندارم اے جاں نہ لیہو کاہے لگائے چھتیاں

شبان ہجراں دراز چوں زلف و روز وصلت چوں عمر کوتاه

سکھی پیا کو جو میں نہ دیکھوں تو کیسے کاٹوں اندهیری رتیاں

এই গজলের প্রতিটি পঙক্তিতে আমির খসরু প্রেমিক-প্রেমিকার গভীর প্রেম, বিরহ, আকুলতা ও মিলনের বাসনার ভাষায় মানবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যে সম্পর্ক তাকে প্রকাশ করেছেন। ইশক-এ-মাজাজি (মানবিক প্রেম) এবং ইশক-এ-হাকিকি (ঐশ্বরিক প্রেম) দুটি স্তরেই এ গজলে উপস্থিত। এখানে প্রেমিক তার অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে বলছেন, বাহ্যিক সান্ত্বনা তার কষ্ট লাঘব করতে পারে না, সে চায় প্রকৃত মিলন। সুফিতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়, বাহ্যিক ধর্মাচরণ বা আনুষ্ঠানিক ধর্মপালন করে স্বর্গ কামনা নয় বরং মানবাত্মা পরমাত্মার সান্নিধ্যই কামনা করছে। পরম সত্তার প্রকৃত নৈকট্যই মানবাত্মার আকাঙ্ক্ষা। “বিচ্ছেদের প্রতিটি মুহূর্ত দীর্ঘ ও ভারী মনে হয়, আর মিলনের সময় যেন মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়।”– এটি দ্বারা আমির খসরু বোঝাতে চান, আল্লাহর স্মরণহীন জীবন যেন অমাবস্যার অন্ধকার রাত। আর তাঁর সান্নিধ্যই প্রকৃত আলোক ও শান্তি।

 

গজল পারস্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী কাব্যধারা ও সুফি সংগীতের অন্যতম স্বতন্ত্র ধারা। প্রাক-ইসলামী আরবি কাব্যরূপ কাসিদা থেকে ৭ম শতকে আরবি সাহিত্যের গজলের উৎপত্তি।[15] ‘নসিব’ নামে একধরনের স্মৃতিচারণ বা রোমান্টিক কথাবার্তা দিয়ে কাসিদা শুরু হতো। এই নসিব থেকেই পরবর্তীতে গজলের উৎপত্তি। তৎকালীন সময়ে আধ্যাত্মিক বা মানবীয় রোমান্টিক প্রেম, প্রিয়জন হারানোর বেদনা, প্রেমিকার সৌন্দর্য বর্ণনায় গজল রচিত হতো। উমাইয়া যুগে (৬৬১-৭৫০) গজল একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে বিকশিত হয়েছিল। ইসলামের বিস্তারের সাথে সাথে, আরবি গজল পশ্চিমে আফ্রিকা এবং আন্দালুসে এবং পূর্বে পারস্যে ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যযুগীয় স্পেনে, একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই আরবি এবং হিব্রু উভয় ভাষাতেই গজল লেখা হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার সাহিত্যিক ভাষা হাউসা এবং ফুলফুলদেকেও গজল প্রভাবিত করে। দশম শতাব্দীতে গজল প্রথম ফারসি সাহিত্যের সংস্পর্শে আসে এবং রুদাকি (৯৪১ খ্রি.), রুমি, হাফিজ, ফরিদ উদ্দীন আত্তার, হাকীম শানাঈ ও সাদী, শিরাজী-সহ অপরাপর আরো পারস্য কবিদের মাধ্যমে দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে এর চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে।[16]

 

এই সময়ে আরব ও পারস্য থেকে আগত সুফি সাধক এবং মুঘল সাধকদের মাধ্যমে উপমহাদেশে গজলের বিস্তার হয়।[17] ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, আমির হাসান সিজ্জি ও আমির খসরুর রচনায়ও গজলের উপস্থিতি পাওয়া যায়।[18] জানা যায়, আমির খসরু সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজিকে প্রতিরাতে একটি করে গজল শোনাতেন। পরবর্তীতে উনবিংশ/বিংশ শতকে দক্ষিণ এশিয়ায় (বিশেষত  ভারত ও পাকিস্তানে) উর্দু ভাষায় জনপ্রিয় ও বিকশিত হয়। এই সময়কালকে উপমহাদেশের উর্দু গজলের ‘সোনালী যুগ’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়। আরবি, ফার্সি ও উর্দুর পাশাপাশি তুর্কি, জার্মান, ইংরেজি, পশতু, মারাঠিসহ ইত্যাদি ভাষায় গজল রচনা হতো। উর্দু গজলের বিকাশের ক্ষেত্রে যাদের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য: সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, মীর তকী মীর, ইব্রাহীম জক, মির্জা গালিব, মেহেদি হাসান, বেগম আখতার, গুলাম আলী, নুসরাত ফতেহ আলী, দাগ দেলবী মুহাম্মদ ইকবাল, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, ফিরাক গোরখপুরী এবং পীর নাসিরুদ্দিন নাসির। বাংলাদেশে কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেকেই গজল রচনা করেছেন। তবে বাংলাদেশে অনেক সময় গজল বলতে পরম আল্লাহ ও রাসূলের (দ.) শানে গাওয়া ইসলামী সঙ্গীত বা নাতকে বোঝানো হয়। গজল মূলত জোড়া লাইনের (দ্বিপদী) স্তবকে লেখা হয়, যেখানে প্রতিটি স্তবককে ‘শের’ বলা হয়। এগুলোর একটি নির্দিষ্ট ছন্দ, অন্ত্যমিল (কাফিয়া) এবং পুনরাবৃত্তিমূলক শব্দগুচ্ছ (রদীফ) থাকে। গজলের প্রথম শের স্থায়ী ও বারবার আবৃত্তি করা হয় এবং অন্যসব শেরকে ‘অন্তরা’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একটি কবিতাকে প্রকৃত গজল হিসেবে গণ্য করার জন্য, তাতে কমপক্ষে পাঁচটি দ্বিপদী শ্লোক থাকতে হবে। প্রায় সকল গজল পনেরোটির কম দ্বিপদী শ্লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

উর্দু ফারসি ভাষায় রচিত গজলে ঐতিহ্যগতভাবে ঐশী প্রেম, আত্মবিসর্জন, ফানা ও বাক্বা, বিরহ, মিলনের আকাঙ্ক্ষা, মুর্শিদের প্রতি ভালোবাসা হলো মূল বিষয়বস্তু। গজলে প্রেমিক ও প্রিয়তমার সম্পর্কের মাধ্যমে মানুষ ও আল্লাহর সম্পর্ককে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করা হয়। গজলে প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কবিতার দ্ব্যর্থকতা এবং অর্থের যুগপৎ উপস্থিতি।[19] গজল বোঝার জন্য এর সাধারণ রূপকগুলি জানা অপরিহার্য। যেমন ‘সাকি বা প্রিয়তম’ স্রষ্টা বা আধ্যাত্মিক গুরুর রূপক হিসেবে কাজ করে এবং ‘শরাব/ মদ’ বলতে আধ্যাত্মিক পরমানন্দের প্রতীক। পীর নাসিরের গজলেও এই রূপক শব্দের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

کبھی ان کا نام لینا کبھی ان کی بات کرنا

مرا ذوق ان کی چاہت مرا شوق ان پہ مرنا

وہ کسی کی جھیل آنکھیں وہ مری جنوں مزاجی

کبھی ڈوبنا ابهر کر کبھی ڈوب کر ابهر نا

….

چلے لاکھ چال دنیا ہو زمانہ لاکھ دشمن

جو تری پناہ میں ہو اسے کیا کسی سے ڈرنا

وہ کریں گے نا خدائی تو لگے گی پار کشتی

ہے نصیرؔ ورنہ مشکل، ترا پار یوں اترنا

 

পীর নাসিরের এই গজলে প্রেমিকের গভীর অনুরাগ, বিরহের কষ্ট এবং প্রিয়তমের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। কবির কাছে প্রিয়জনের নাম স্মরণ করা, তাঁর কথা বলা এবং তাঁর প্রেমে নিজেকে বিলিয়ে দেয়াই জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ। প্রেমিক এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে জাগতিক বিষয়, মানুষের কথা ও সামাজিক সম্পর্ক তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। গজলে প্রেমিকের বিরহ-যন্ত্রণাও অত্যন্ত আবেগময়ভাবে ফুটে উঠেছে। প্রিয়জনের বিচ্ছেদে তার রাত কাটে দীর্ঘশ্বাস, অস্থিরতা ও অপেক্ষার মধ্যে। প্রিয়তমের এক ঝলক দেখার জন্য সে নানা অজুহাত খোঁজে, কিন্তু নিজের সীমাবদ্ধতা ও প্রিয়জনের অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান অনুভব করে। পীর নাসিরের গজলের বিশেষত্ব হলো, মানবিক প্রেমের আবেগকে রূপকার্থে ব্যবহার করে তিনি মানবাত্মার পরম স্রষ্টার প্রতি আকর্ষণ, নির্ভরতা ও বিলয়ের অনুভূতিকে প্রকাশ করেছেন। প্রিয়তম হলো এখানে স্রষ্টার প্রতীক, আর প্রেমিক হলো সেই আত্মা, যে স্রষ্টার নৈকট্য লাভের জন্য ব্যাকুল। দুনিয়ার বাধা ও শত্রুতা তাকে ভীত করতে পারে না, কারণ সে প্রিয়তমের আশ্রয়ে নিরাপত্তা অনুভব করে। শেষ পর্যন্ত কবি স্বীকার করেন, একমাত্র প্রিয়তমের অনুগ্রহ ও দিকনির্দেশনাই তাকে জীবনের কঠিন পথ পার করে দিতে পারে। এই গজলে পীর নাসির বেশ কিছু রূপক শব্দ ব্যবহার করেছেন, যেমন: নৌকা (মানুষের জীবনযাত্রা), মাঝি (পথপ্রদর্শক বা প্রিয়তম), জীল চোখ (হৃদ বা স্রষ্টার সৌন্দর্য ও অপরূপ মহিমা), শবে গম (মানবাত্মা থেকে পরমাত্মার বিচ্ছেদের মূহুর্ত), প্রিয়তমের গলি (পরমাত্মার দিকে যাওয়ার আধ্যাত্মিক পথ) ইত্যাদি।

 

দাগ দেহলভীর একটি গজল উপস্থাপন করা যায়। যেখানে তিনি ময়/শরাব-খানা, কাবা, শমা (প্রদীপ), পরওয়ানা (পতঙ্গ), তীর, বৃক্ষসহ ইত্যাদি রূপক শব্দ ব্যবহার করেছেন।[20]

مجھے اے اہل کعبہ یاد کیا مے خانہ آتا ہے

ادھر دیوانہ جاتا ہے ادھر مستانہ آتا ہے

مری مژگاں سے آنسو پوچھتا ہے کس لئے ناصح

ٹپک پڑتا ہے خود جو اس شجر میں دانہ آتا ہے

…..

جگر تک آتے آتے سو جگہ گرتا ہوا آیا

ترا تیر نظر آتا ہے یا مستانہ آتا ہے

وہی جھگڑا ہے فرقت کا وہی قصہ ہے الفت کا

تجھے اے داغؔ کوئی اور بھی افسانہ آتا ہے

এই গজলে দাগ দেহলভী প্রেমের বিভিন্ন রূপ তুলে ধরেছেন। প্রেমিকের উন্মাদনা, অশ্রু, অপেক্ষা, প্রিয়জনের রহস্যময় আচরণ এবং বিচ্ছেদের যন্ত্রণা ইত্যাদি। প্রথম পঙক্তিতে দেহলভী বলেন, “হে কাবার অধিবাসীরা! আমাকে স্মরণ করিয়ে দিও না, কারণ মদের ঘরের কথাই মনে পড়ে যায়। একদিকে যায় পাগল প্রেমিক, অন্যদিকে আসে মত্ত প্রেমিক।” এখানে কাবা ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতীক, আর শরাবখানা হলো প্রেমের উন্মাদনা ও আত্মবিস্মৃতির প্রতীক। কবি বলতে চান, প্রেমের এমন এক অবস্থা আছে যেখানে মানুষ বাহ্যিক নিয়মের সীমা অতিক্রম করে গভীর অনুভূতির জগতে প্রবেশ করে। গজলে ব্যবহৃত আরো রূপক শব্দগুলো হলো- দেওয়ানা (প্রিয়তমের পাগল), মাস্তানা (প্রেমে মত্ত), অশ্রু (স্রষ্টার নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষার আকুলতা), শমা (প্রদীপ/ পরম সত্যের আলো), পরওয়ানা (পতঙ্গ/ প্রেমিক, যে শমার আলোতে নিজেকে উৎসর্গ করে), দৃষ্টির তীর (প্রেমের আকস্মিক আঘাত) ইত্যাদি।

 

অ্যানমারি শিমেল তাঁর বিশ্লেষণে গজলের শ্লোকে সাধারণত তিনটি ব্যাখ্যাগত স্তরকে চিহ্নিত করেছেন।[21] প্রথমত, ইশক-এ-মাজাজি, যা মানব-মানবীর পার্থিব প্রেমকে নির্দেশ করে। দ্বিতীয়ত, ইশক-এ-হাকিকি, যা স্রষ্টার প্রতি আত্মার আধ্যাত্মিক ও ঐশ্বরিক প্রেমের প্রতীক। তৃতীয়ত, দ্ব্যর্থক স্তর, যেখানে একই শ্লোককে পার্থিব কিংবা আধ্যাত্মিক, উভয় অর্থেই ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এই বহুমাত্রিকতা ধ্রুপদী ফারসি ও উর্দু গজলের অন্যতম স্বাতন্ত্র্য। যেমন আহমদ মিনাঈ-এর গজলে এই দ্ব্যর্থকতা–

سرکتی جائے ہے رخ سے نقاب آہستہ آہستہ

نکلتا آ رہا ہے آفتاب آہستہ آہستہ

جواں ہونے لگے جب وہ تو ہم سے کر لیا پردہ

حیا یک لخت آئی اور شباب آہستہ آہستہ

شب فرقت کا جاگا ہوں فرشتو اب تو سونے دو

کبھی فرصت میں کر لینا حساب آہستہ آہستہ

سوال وصل پر ان کو عدو کا خوف ہے اتنا

دبے ہونٹوں سے دیتے ہیں جواب آہستہ آہستہ

وہ بے دردی سے سر کاٹیں امیرؔ اور میں کہوں ان سے

حضور آہستہ آہستہ جناب آہستہ آہستہ

 

“আহিস্তা আহিস্তা” (ধীরে ধীরে) শব্দের পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে মিনাঈ বলছেন, সত্যিকারের প্রেম তাড়াহুড়োর বিষয় নয়। এটি ধীরে ধীরে হৃদয়ে প্রকাশ পায় এবং শেষ পর্যন্ত প্রেমিককে আত্মসমর্পণের অবস্থায় নিয়ে যায়। সুফিদর্শনে, এটি মানবাত্মার স্রষ্টার নৈকট্য লাভের ধীর ও অন্তর্গত যাত্রার প্রতীক। প্রথম পঙক্তি “মুখ থেকে ধীরে ধীরে পর্দা সরে যাচ্ছে, আর ধীরে ধীরে যেন সূর্য উদিত হচ্ছে” এর ব্যাখ্যায় সুফিরা বলেন, এটি পরম স্রষ্টার নূর বা পরম সত্যের ধীরে ধীরে প্রকাশ পাওয়ার প্রতীক। সাধকের হৃদয়ে জ্ঞানের আলো ধীরে ধীরে উদিত হয়। পরবর্তী প্রেমের সংযম, আকর্ষণ, সামাজিক বাধা ও প্রেমিকার গোপন আকাঙ্খা নিয়ে কথা বলেছেন। শেষ পঙক্তিটি খুব আকর্ষণীয়। মিনাঈ বলেন, “সে যদি নির্মমভাবে আমার মাথা কেটেও ফেলে, তবুও আমি বলব, হুজুর, একটু ধীরে, একটু আস্তে।” এটি মূলত প্রেমের চরম আত্মসমর্পণের চিত্র। প্রেমিক প্রিয়জনের নিষ্ঠুরতাকেও ভালোবাসার অংশ হিসেবে গ্রহণ করছে। মানবাত্মা পরমাত্মার নিকট নিজের সর্বাঙ্গের অস্তিত্ব পর্যন্ত উৎসর্গ করতে প্রস্তুত।

 

৬. তাওশীহ (Tawshih)

তাওশীহ (توشيح) আরবি সংগীত ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠসংগীতধারা। এটি মূলত ধ্রুপদী আরবি কবিতা, সুফি ভাবধারা এবং মাকামভিত্তিক সুরের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। অনেকেই একে ‘মাদীহ নববী’র উপধারা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর উৎপত্তি আন্দালুসে হলেও পরবর্তীকালে সিরিয়া, মিশর, জর্ডান, লেবানন এবং সমগ্র আরব বিশ্বে এটি বিশেষভাবে বিকশিত হয়। বিশেষত সুফি মজলিস, মাওলিদ, ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং সামা (Samaʿ)-এর আসরে এখনো তাওশীহ পরিবেশনা করা হয়। তাওশীহ সাধারণত একক শিল্পী ও সহযোগী কণ্ঠদলের (বিতানা) প্রশ্নোত্তরমূলক পরিবেশনায় গাওয়া হয়। এতে নির্ধারিত সুরের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক অলঙ্করণ/সংযোজন (তাফরিদ) করারও সুযোগ থাকে। এই কারণে একই তাওশীহ বিভিন্ন শিল্পীর পরিবেশনায় ভিন্ন ভিন্ন আবহ ও ব্যাখ্যা লাভ করে। “মা শামামতু আল-ওয়ার্দ” (ما شممتُ الورد) আরবি তাওশীহ ধারার একটি সুপরিচিত রচনা। এর কবি হলেন হাসান ইবন আবদুস সামাদ আল-জুবাই, যিনি ষোড়শ শতকের একজন সুফি কবি। পরবর্তীকালে বিখ্যাত মিশরীয় সুরকার শেখ জাকারিয়া আহমদ এই কবিতায় সুরারোপ করেন। সর্বপ্রথম ১৯২০-এর দশকের শেষভাগে শেখ ইব্রাহিম আল-ফাররান এটি রেকর্ড করেন। পরবর্তীতে শেখ তাহা আল-ফাশনী ও ওয়াদি আল-সাফিসহ বহু শিল্পী নিজস্ব ভঙ্গিতে এটি পরিবেশন করেছেন।

ما شممت الورد إلا

زادني شوقا إليك

و إذا ما مال غصن

خِلتُه يحنو عليك

لستَ تدري ما الذي قد

حل بي من مقلتيك

إِن يكن جسمي تناءى

فالحشا باقٍ لديك

كل حسنٍ في البرايا

هو منسوب إليك

رُشِقَ القلب بسهم

قوسه من حاجبيك

إن ذاتي  و ذواتي

يا مُنائي في يديك

آه لو أسقى لأشفى

خمرة من شفتيك

এই তাওশীহে গোলাপের সুবাস, বৃক্ষের ডাল, প্রিয়জনের দৃষ্টি, হৃদয়ের ক্ষত এবং বিরহের মতো বহু রূপক ব্যবহৃত হয়েছে। তবে এর সৌন্দর্য এখানেই যে, একই গীতিকবিতা বিভিন্ন অর্থে ব্যাখ্যা করা যায়। একে আক্ষরিক অর্থে সাধারণ প্রেমের গান হিসেবে বোঝা সম্ভব, আবার সুফিতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি মানবাত্মার সঙ্গে পরম সত্তা আল্লাহর মিলনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বলেও ধরা যায়। অনেক মুনশিদ এটিকে নবী মুহাম্মদ (দ.)-এর প্রতি ভালোবাসার কাসিদা হিসেবেও পরিবেশন করেছেন। অর্থাৎ, তাওশীহের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বহুস্তরীয় অর্থবোধ। এই তাওশীহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাফরিদ। তাফরিদ বলতে বোঝায়, মূল সুরের কাঠামো বজায় রেখে শিল্পীর তাৎক্ষণিক সুরবিস্তার ও অলঙ্করণ। শেখ ইব্রাহিম আল-ফাররানের তাফরিদ অপেক্ষাকৃত মুক্ত ও বিস্তৃত, যেখানে তিনি দীর্ঘ সুরবিন্যাসের মাধ্যমে নিজের দক্ষতা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে শেখ তাহা আল-ফাশনী একই তাওশীহকে ধর্মীয় অনুভূতিতে রঞ্জিত করেন এবং কখনও কখনও নতুন পঙক্তিও সংযোজন করেন। ওয়াদি আল-সাফির পরিবেশনায় আবার এটি প্রেমের গানের আবহ লাভ করে। অর্থাৎ একই তাওশীহ শিল্পীভেদে ভিন্ন ভিন্ন রস ও অর্থ ধারণ করতে পারে। তাফরিদের তিনটি প্রধান রূপ রয়েছে। প্রথমত, তারান্নুমভিত্তিক তাফরিদ, যেখানে কোনো শব্দ ছাড়াই কেবল কণ্ঠের অলংকারের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সুর সৃষ্টি করা হয়। দ্বিতীয়ত, মূল তাওশীহের পঙক্তি ব্যবহার করে তাফরিদ, যেখানে শিল্পী একই কবিতার শব্দকে নতুনভাবে সুরায়িত করেন। তৃতীয়ত, অন্য কবিতা বা ধর্মীয় পাঠ সংযোজন করে তাফরিদ, যেখানে শিল্পী মূল গানের বাইরে নতুন কবিতা, হামদ, দোয়া বা ইবতিহাল যুক্ত করেন। বিশেষ করে রমজান, মাওলিদ বা নির্দিষ্ট ধর্মীয় উপলক্ষে এই ধরনের সংযোজন প্রচলিত ছিল। তাওশীহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মাকামভিত্তিক সুরায়ন। প্রতিটি তাওশীহ একটি নির্দিষ্ট মাকামের ওপর নির্মিত হলেও পরিবেশনার সময় শিল্পী একাধিক উপ-মাকাম বা যৌগিক মাকামে (Compound Maqam) বিচরণ করতে পারেন। উদাহরণস্বরূপ, ‘মা শামামতু আল-ওয়ার্দ’ তাওশীহটি মূলত সিকাহ মাকামে রচিত হলেও এর পরিবেশনায় উশশাক, বায়্যাতী এবং রাস্ত মাকামের দিকে সুরবদলের (Modulation) অপূর্ব নিদর্শন দেখা যায়। এই সুরপরিবর্তনই তাওশীহকে প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময় করে তোলে। তালের ক্ষেত্রেও তাওশীহের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অধিকাংশ তাওশীহ ওয়াহদা ছন্দে রচিত হলেও দারিজ, আরাজ এবং অন্যান্য অসমমাত্রিক ছন্দও ব্যবহৃত হয়েছে। কখনও কখনও শিল্পী তাৎক্ষণিক পরিবেশনার সময় মূল ছন্দ থেকে সাময়িকভাবে বেরিয়ে যান এবং পরে আবার মূল ছন্দে ফিরে আসেন। এই স্বাধীনতা তাওশীহের নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। তাওশীহের পরিবেশনায় সাধারণত মুনশিদ (প্রধান গায়ক), বিতানা (সহযোগী কণ্ঠদল) এবং তাখত (ঐতিহ্যবাহী আরবি বাদ্যযন্ত্রের দল) অংশগ্রহণ করে। বিতানা মূল সুর বা ধুয়া পুনরাবৃত্তি করে এবং মুনশিদের তাৎক্ষণিক তাফরিদের জবাব দেয়। এর ফলে একধরনের সংলাপধর্মী সঙ্গীতরূপ সৃষ্টি হয়, যা সুফি দর্শনের সামা (আধ্যাত্মিক শ্রবণ)-এর পরিবেশকে গভীর করে তোলে।

 

৭. মসনভি

মসনভি মূলত একটি দীর্ঘ বর্ণনামূলক কাব্যরীতি। প্রতিটি দ্বিপদী স্বতন্ত্র অন্ত্যমিলে এটি রচিত হয় এবং পরবর্তী দ্বিপদীর সঙ্গে নতুন অন্ত্যমিল গঠনের জন্য সাধারণত AA/BB/CC প্যাটার্ন অনুসরণ করে। এই ছন্দরীতি কবিকে দীর্ঘ আখ্যান, আধ্যাত্মিক শিক্ষা, প্রেম, নৈতিকতা ও রূপক কাহিনী অবাধে প্রকাশের সুযোগ দেয়। আরবি ভাষায় এর প্রাথমিক রূপ মুযদাওয়িজ নামে পরিচিত হলেও, পারস্যে এসে এটি মসনভী নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যিক রূপ লাভ করে এবং পরবর্তীকালে তুর্কি, কুর্দি ও উর্দু সাহিত্যেও ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। সুফি শায়খরা সাধনার জটিল তত্ত্ব, তাওহিদ, প্রেম, আত্মবিলোপ (ফানা), আত্মপ্রতিষ্ঠা (বাকা), নফসের পরিশুদ্ধি এবং মুর্শিদ-মুরিদের সম্পর্কের মতো গভীর বিষয়গুলোকে মসনভির মাধ্যমে উপস্থাপন করে থাকেন। সুফি সংগীতের ক্ষেত্রে মসনভি পাঠ করা ব্যতীত কখনও কখনও এটি সুরারোপ করে পরিবেশনের জন্যও ব্যবহৃত হতো। বিশেষ করে পারস্য, আনাতোলিয়া, মধ্য এশিয়া এবং ভারতীয় উপমহাদেশের খানকাহগুলোতে সামা বা কাওয়ালীর অংশ হিসেবে মসনভির নির্বাচিত অংশ ধীর, ধ্যানমগ্ন সুরে আবৃত্তি বা গীত হতো। সুফি সাধকদের বিশ্বাস, অর্থপূর্ণ কাব্য যখন সুরের মাধ্যমে হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন তা মানুষের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণ, আত্মসমালোচনা এবং আধ্যাত্মিক জাগরণের দিকে পরিচালিত করে। ফলে মসনভি একদিকে যেমন কাব্য, অন্যদিকে তেমনি জিকির, উপদেশ এবং আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যম। যেমন- সুলাইমান চেলেবির তুর্কি ভাষায় রচিত Vesîletü’n-Necât (ওয়াসীলাতুন নাজাত)-এর সূচনা অংশ। গ্রন্থটি ১৪০৯ সালে রচিত হয় এবং ওসমানীয় তুর্কি সাহিত্যের সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মাওলিদ (Mevlid)। এখনো মাওলিদ শরীফ পাঠের সূচনা হিসেবে এই অংশটি পাঠ করা হয়।

Allah adın zikredelim evvela

Vâcib oldur cümle işte her kula

Kim ki Allah adın evvel ana

Her işi âsân eder Allah ana

Allah adı olsa her işin önü

Asla ebter olmaz o işin sonu

Bir kez Allah dese şevk ile lisânın

Kalmayıp dökülür bütün günâhın

Zikri tekrar eyle mütemadiyen

Her murâda erişir Allah diyen

 

কবিতাটি ওসমানীয় তুর্কি (Ottoman Turkish) ভাষায় রচিত। এখানে তুর্কির পাশাপাশি আরবি ও ফারসি শব্দভাণ্ডারের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মূল ওসমানীয় তুর্কি ভাষা আরবি-ফারসি লিপিতে লেখা হতো। চেলেবির মূল রচনাও ফারসি হরফে। কিন্তু এখানে যে পাঠটি দেওয়া হয়েছে তা আধুনিক তুর্কি বর্ণমালা (Latin alphabet)-এ লেখা। মসনভীর এই সূচনা অংশে চেলেবি আল্লাহর স্মরণকে মানুষের সকল কাজের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করত চেয়েছেন। তিনি বলেন, প্রতিটি কাজের শুরু আল্লাহর নামে হওয়া উচিত, কারণ আল্লাহর নাম মানুষকে তাঁর সৃষ্টিকর্তার প্রতি নির্ভরশীলতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং কর্মকে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অর্থ প্রদান করে। আল্লাহর নামে শুরু হওয়া কাজ বরকতপূর্ণ হয় এবং তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও মূল্য অক্ষুণ্ণ থাকে। পরবর্তী অংশে তিনি যিকিরের আধ্যাত্মিক শক্তির কথা বলেছেন। তাঁর মতে, আন্তরিক ভালোবাসা নিয়ে একবারও আল্লাহর নাম উচ্চারণ করলে মানুষের অন্তর পাপমুক্তির দিকে ধাবিত হয়। এখানে ‘গুনাহ ঝরে পড়া’ বলতে অন্তরের পরিশুদ্ধি, তাওবা এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি প্রত্যাবর্তন বোঝানো হয়েছে। শেষে তিনি নিরবচ্ছিন্ন যিকিরের আহ্বান জানান। তাঁর দৃষ্টিতে যিকির কেবল মুখের উচ্চারণ নয়; এটি এমন এক আধ্যাত্মিক অনুশীলন, যা মানুষের চরিত্রকে শুদ্ধ করে, ঈমানকে দৃঢ় করে এবং তাকে প্রকৃত কল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করে।

 

মসনভী রচনার ক্ষেত্রে জালালুদ্দিন রুমির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর মসনভি-ই মানভি (Masnavi-yi Maʿnawi) ছয় খণ্ডে প্রায় পঁচিশ হাজার পঙক্তির এক বিশাল আধ্যাত্মিক কাব্যগ্রন্থ। বহু গবেষকের মতে ‘মসনভি হলো ফারসি ভাষায় রচিত আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বিশ্বকোষ’। রুমির রচিত মসনভী নিয়ে প্রায় দুইশত বছর পর বিখ্যাত পারসিক মোল্লা আবদুর রহমান জামি বলেন,

مثنوی مولوی معنوی

هست قرآن در زبان پهلوی

(মওলানার মসনভি-ই মানভি

পহলভী (পারসিক) ভাষায় কুরআন)

 

সুফিগণও মসনভীকে “কুরআনের পারসিক রূপ” হিসেবে বিবেচনা করেন। মসনভীকে বোঝার স্বয়ং রুমির একটি উক্তির দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। তিনি বলেন,

من از قرآن مغزها برداشتم

استخوان بهر سگان انداختم

(আমি কুরআন থেকে মজ্জা (সার বা মূল সত্য) বের করে নিয়েছি,

আর হাড়গুলো কুকুরদের জন্য ফেলে দিয়েছি)

কুকুর বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে, যারা কেবল বাহ্যিক জিনিস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকে এবং গভীর অর্থের খোঁজ করে না। তিনি কুরআনের বাহ্যিক শব্দ ও আনুষ্ঠানিক দিকগুলো বাদ দিয়ে তার গভীর সারবস্তু, আধ্যাত্মিক অর্থ ও সুফিতাত্ত্বিক পরম সত্যকে গ্রহণ করেছেন। আর যেসব লোক কেবল বাহ্যিক রূপ, আচার-অনুষ্ঠান বা শাব্দিক অর্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, তাদের জন্য তিনি সেই “হাড়” ফেলে রেখেছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মেভলভি তরিকার খানকাহে এই গ্রন্থের অংশ বিশেষ সুর করে পাঠ করা হতো এবং আজও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সেই ঐতিহ্য অব্যাহত রয়েছে। রুমীর মসনভী ছাড়াও পারসিক, উর্দু, তুর্কি সাহিত্যে যুগে যুগে বহু মসনভি রচিত হয়েছে। পারসিক সাহিত্যে নিজামী গঞ্জভীর খামসা (মাখযানুল আসরার, খসরু ও শিরীন, লাইলী ও মজনুঁ, হাফ্ত পয়করইস্কান্দারনামা); ফরিদুদ্দিন আত্তার নিশাপুরীর ইলাহীনামা, আসরারনামা, মানাতিকুত তাইর, ও মুসীবতনামা; হাকিম সানায়ী গজনভীর হাদীকাতুল হাকীকাহ; আবদুর রহমান জামীর হাফতে আওরং বা সাতটি মসনভির সংকলন (সিলসিলাতুয যাহাব, তুহফাতুল আহরার, সুবহাতুল আবারার, খিরদ নামায়ে ইস্কান্দারি, ইউসুফ ও জুলায়খা, লায়লী ও মজনুঁ এবং সালামান ও আবসাল); আমীর খুসরো দেহলভীর মতলাউল আনওয়ার, শিরীন ও খসরু, লায়লী ও মজনুঁ, আইনা-ই-সিকান্দারীহাশ্ত বিহিশ্ত; এবং আবদুর রহমান হাতিফীর তিমুরনামা; সাম্প্রতিক সময়ে আহমদ নিক তালিব (১৯৩৪- ২০২০ খ্রি.)-এর Masnavi soroud farda (Tomorrow’s Anthem) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তুর্কি সাহিত্যে সুলেমান চেলেবির ওয়াসিলাতুন নাজাত (মাওলিদ), শেখ গালিবের হুসন উ আশ্ক এবং ফুযুলির লায়লী ও মজনুঁ এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে। অন্যান্য সংগীত ধারার মতো মসনভীও সুফিদের মাধ্যমে দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। সে সময়কার চিশতিয়া খানকাহগুলোতে ফারসি মসনভির পাঠ, ব্যাখ্যা এবং কখনও সুরারোপ করে পরিবেশনের মাধ্যমে মুরিদদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দেওয়া হতো। পরবর্তীকালে উর্দু ভাষায় মসনভি রচনার প্রসার ঘটলে একই ধারা নতুন ভাষায়ও বিকশিত হয়। যেমন মীর হাসানের সিহরুল বয়ান, দয়া শঙ্কর নসীমের গুলযার-এ-নসীম এবং মির্জা শওক লখনভীর জহর-এ-ইশক-সহ অন্যতম। ফলে মসনভি শুধু কাব্যধারা পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সুফি সংগীত, খানকাহভিত্তিক শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

 

৮. সামা এবং ঘূর্ণায়মান দরবেশ

এটি ‘সুফি সংগীত বিকাশের সিলসিলা’ অংশে আলোচিত সামা’র সবচেয়ে পরিচিত সংস্করণ। সামা বলতে সুফিদের এমন এক আধ্যাত্মিক মজলিসকে বোঝানো হয়, যেখানে আল্লাহর যিকির, হামদ, নাত, কাওয়ালি, আধ্যাত্মিক কবিতা, সংগীত এবং কখনও প্রতীকী নৃত্যের মাধ্যমে সাধকগণ আল্লাহর স্মরণে আত্মনিবিষ্ট হন।[22] Jean During তাঁর Musique et extase গ্রন্থে সামার পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, “Sama, which literally means ‘audition’, denotes, in the Sufi tradition, spiritual listening, and more particularly listening to music with the aim of reaching a state of grace or ecstasy, or more simply with the aim of meditating, of plunging into oneself, or as the Sufis say, to ‘nourish the soul’. It thus oper-ates in a mystical concert, of spiritual listening to music and songs, in a more or less ritualised form.”[23] সামার সংজ্ঞায়নে জালালুদ্দিন রুমি বলেন,

پس غذای عاشقان آمد سماع که

 درو باشد خیال اجتماع

قوتی گیرد خیالات ضمیر

 بلکه صورت گردد از بانگ و صفیر

রুমি বলেন, সামা তখনই অর্থবহ, যখন তা মানবাত্মায় সুপ্ত পরমাত্মার প্রেম পুষ্ট করে। পরম সত্তার সান্নিধ্যের আকাঙ্খাকে তীব্র করে। দেহ যেমন খাদ্য-পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না, তেমনি সামা হলো প্রকৃত সাধকদের জন্য খাদ্য বা পুষ্টিস্বরূপ। প্রায় একই ধারণা ইমাম গাজ্জালী তাঁর কিমিয়ায়ে সাদাত কিতাবেও ব্যক্ত করেন। দশম শতাব্দী থেকেই বিভিন্ন সুফি তরিকায় এটি যিকিরের একটি বিশেষ রূপ হিসেবে প্রচলিত ছিল। বিশেষত ইরানের সুফি সাধক আবু সাঈদ আবুল খায়েরের খানকাহে সমবেত সংগীত-সাধনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে ভারতীয় উপমহাদেশের চিশতিয়া তরিকা, আনাতোলিয়ার মেভলভী তরিকা এবং অন্যান্য সুফি ধারায় সামা আরও বিকশিত হয় এবং ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করে। সামা নিয়ে জালালুদ্দিন রুমির একটি ঘটনা সাধকদের মুখে প্রায়শ শোনা যায়। একদিন বাজারে স্বর্ণকারদের হাতুড়ির ছন্দময় আঘাতের শব্দ শুনে তিনি সেই ছন্দে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ যিকিরের ধ্বনি অনুভব করেন। গভীর আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাস ও উন্মত্ততায় তিনি দুই হাত প্রসারিত করে ঘুরতে শুরু করেন। এই ঘটনাকেই মেভলভী তরিকার ঘূর্ণায়মান দরবেশদের সামা অনুষ্ঠানের সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও ঐতিহাসিকভাবে সামা রুমির পূর্বেও বিদ্যমান ছিল, তাঁর মাধ্যমে ঘূর্ণায়মাম নৃত্যটি সর্বাধিক পরিচিতি লাভ করে। নৃত্যে সাধকগণ বাম পাকে কেন্দ্র করে ডান পায়ের সাহায্যে আবর্তিত হন। তাঁর ডান হাত আকাশের দিকে এবং বাম হাত পৃথিবীর দিকে প্রসারিত থাকে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়, তিনি আল্লাহর রহমত গ্রহণ করে তা সমগ্র মানবজাতির মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এই ঘূর্ণন সূর্যকে কেন্দ্র করে গ্রহগুলোর আবর্তন এবং সমগ্র মহাবিশ্বের সুশৃঙ্খল গতিরও প্রতীক।  এই ঘূর্ণন নৃত্যের সাথে থাকে ‘নেয় বাঁশির সঙ্গীত‌[24]’। এই নেয় বাঁশিকে রুমির মসনভীতে বাসনাশূন্য এবং খোদার কাছে ফিরে যাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ আত্মার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

 

সুফিদের বিশ্বাস, সামার মাধ্যমে একজন সাধক ধীরে ধীরে আত্মবিলোপের অবস্থায় পৌঁছাতে পারেন, যাকে ফানা বলা হয়। এই অবস্থায় ব্যক্তি নিজের অহংকে অতিক্রম করে আল্লাহর সান্নিধ্য অনুভব করেন। সামার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো ওয়াজদ, অর্থাৎ এমন এক আধ্যাত্মিক উন্মত্ততা বা পরমানন্দ, যেখানে হৃদয় আল্লাহর স্মরণে সম্পূর্ণ নিমগ্ন হয়ে যায় এবং বাহ্যিক জগতের প্রতি মনোযোগ ক্ষীণ হয়ে আসে। ফানা ও ওয়াজদকে বোঝার জন্য আমির খসরুর একটি বিখ্যাত রচনার দিকে চোখ বুলানো যেতে পারে। যেটি সামা ও কাওয়ালিতে পরিবেশন করা হয়।[25]

نمی دانم چہ منزل بود شب جائے کہ من بودم

بہ ہر سو رقص بسمل بود شب جائے کہ من بودم

پری پیکر نگارے سرو قدے لالہ رخسارے

سراپا آفت دل بود شب جائے کہ من بودم

رقیباں گوش بر آواز او در ناز و من ترساں

سخن گفتن چہ مشکل بود شب جائے کہ من بودم

خدا خود میر مجلس بود اندر لا مکاں خسروؔ

محمدؐ شمع محفل بود شب جائے کہ من بودم

مرا از آتش عشق تو دامن سوخت اے خسروؔ

محمدؐ شمع محفل بود شب جائے کہ من بودم

 

খসরু প্রথম পঙক্তিতে বলেন, “আমি জানি না, সেদিন রাতে আমি কোন আধ্যাত্মিক স্তরে ছিলাম। চারদিকে যেন জবাইকৃত প্রাণীর মতো আত্মবিস্মৃত প্রেমিকদের নৃত্য চলছিল।” এখানে ‘রক্‌স-ই-বাসমল’ হলো– জবাই করা পাখি বা প্রাণী মৃত্যুর আগে যেমন শেষবারের মতো ছটফট করে, তেমনি আল্লাহর প্রেমে আত্মসমর্পণকারী সাধকের অহংকার মৃত্যুযন্ত্রণার মতো ভেঙে পড়ে এবং তিনি পরম সত্তার প্রেমে উন্মত্ত হয়ে ওঠেন। খসরু সংগীতে খোদার ঐশী সৌন্দর্যের (জামাল) একটি অপরূপ চিত্র আঁকেন। হুর পরীর মতো অবয়ব, সাইপ্রাস বৃক্ষের মতো দীর্ঘ দেহ, টিউলিপ ফুলের মতো লাল মুখমণ্ডল। সেই সৌন্দর্য এতটাই অপরূপ ও মনোরম যে, এটি মুহূর্তেই খসরুর হৃদয়কে কেড়ে নেয় এবং জাগতিক জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে শুধু সেই পরম সৌন্দর্যের দিকে আকৃষ্ট করে। সবাই সেই প্রিয়তম ও পরম সৌন্দর্যকে দেখতে পেয়েছিল এবং পরম সত্তার কণ্ঠস্বর শুনেছিল। সুর-স্বর এতটাই মধুর ছিল যে খসরু ভয় ও শ্রদ্ধায় বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। অর্থাৎ খসরু সেই পরম সত্তার সান্নিধ্য ও ঐশী উপস্থিতি অনুভব করতে পেরেছিলেন। কিন্ত এই সান্নিধ্যের কথা বা ঐশী অনুভূতিকে জাগতিক ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। একদম শেষ পঙক্তিতে ফানা বা আত্মবিলোপের চূড়ান্ত রূপ ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “তোমার প্রেমের অনলে আমার সমগ্র সত্তা নিমিষেই দগ্ধ হয়েছে।” এখানে প্রেমের অনলে দগ্ধ হওয়া বলতে, নফস বা অহংকারের বিলোপ এবং পরম সত্তা আল্লাহর প্রেমে আত্মসমর্পণের আধ্যাত্মিক অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ সামার মাধ্যমে জাগ্রত ওয়াজদ ধীরে ধীরে সাধককে ফানার দিকে পরিচালিত করে, যেখানে ব্যক্তিসত্তা বিলীন হয়ে একমাত্র আল্লাহর স্মরণ ও প্রেমই তার অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।

বর্তমানে তুরস্কের মেভলভী দরবেশদের সামা বিশ্বব্যাপী সর্বাধিক পরিচিত। এছাড়া তুরস্কের আলেভি ও বেকতাশি সম্প্রদায়, ভারতীয় উপমহাদেশের চিশতিয়া সুফি তরিকা এবং মিসরের তান্নুরা নৃত্যেও সামার বিভিন্ন রূপ দেখা যায়। ২০০৮ সালে ইউনেস্কো মানবজাতির প্রতিনিধিত্বমূলক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় তুরস্কের মেভলভী সামা অনুষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত করে। এর ফলে সামা বিশ্বমানবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে।

 

৯. কাওয়ালি ও ভারতীয় উপমহাদেশের সুফি সংগীত ধারা

প্রাচীন ভারতীয় সংগীত, গ্রিক সংস্কৃতি ও সংগীত দ্বারা প্রভাবিত। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের ভারত বিজয়ের সময় থেকে এর প্রভাব শুরু হয়। অন্যদিকে ভারতীয় মুসলমানদের সংগীত, ইরান এবং আরবদের সংগীত দ্বারা প্রভাবিত ছিল। আমির খসরু একইসাথে ভারতীয় এবং আরব্য-পারস্য কবিতা ও সংগীতে পারদর্শী ছিলেন। পারস্য সংগীতের ‘১২ পরদা’ এবং প্রাচীন ভারতীয় ‘রাগ’ সম্পর্কে তার গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি ভারতীয় এবং পারস্য সংগীতের সমন্বয়ে নতুন একটি সংগীত প্রকরণের সৃষ্টি করেন। আমির খসরুর এ সংগীত ধারাদ্বয়ের সমন্বয় ও নতুন প্রকরণ সৃজন নিয়ে প্রাচীন ফার্সি গ্রন্থ Chishtia Bihishtia (1655)-এ উদ্ধৃত আছে, “Just as by the combination of of yellow and blue colours, a new colour-the green-is created; similarly Amir Khusrau by harmonizing, with the grace of God and his inborn genius, distinct musical forms, created something which was new and beautiful.”[26] সংগীতের এই প্রকরণকে বলা হতো– ‘কাওয়ালি’। এই শব্দটি আরবি কওল থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘উচ্চারণ’ বা ‘উক্তি’। প্রাথমিকভাবে রাসুলুল্লাহ (দ.), সাহাবি, সুফি শায়খ বা আধ্যাত্মিক শিক্ষকদের বাণী সুর করে পরিবেশন করাকে কওল বলা হতো। পরবর্তীকালে এই ধারাই বিকশিত হয়ে কাওয়ালি নামে পরিচিত হয়। দ্বাদশ শতকে চিশতিয়া ধারার সাধক হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া দিল্লিতে তাঁর মজলিসে ‘সামা’ জাতীয় সংগীত ব্যবহার করতেন। পরবর্তীতে আমির খসরু তুরস্ক, পারস্য, আরব এবং ভারতের সঙ্গীত উপাদান ও কথার মিশ্রণে এক নতুন শিল্পধারার সৃষ্টি করেন। চিশতিয়া তরিকার অনুসারীরা এ‌ সঙ্গিত পরিবেশন করেন। চিশতিয়া তরিকার খানকাহগুলোতে পরিবেশিত সামার একটি বিশেষ রূপ হিসেবে কাওয়ালির বিকাশ ঘটে। এই বিকাশের রয়েছে এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা। পারস্যের সামা, ভারতীয় রাগসংগীত, স্থানীয় লোকসুর এবং সুফি কাব্যের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংমিশ্রণের ফল হলো বর্তমান কাওয়ালী ।[27]

 

শুরুর দিকে কাওয়ালি মূলত কণ্ঠনির্ভর ছিল। পরবর্তীকালে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র যুক্ত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে: দফ, ঢোলক, সেতার, তানপুরা, পরবর্তী যুগে তবলা, হারমোনিয়াম ইত্যাদি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বর্তমানের কাওয়ালির অপরিহার্য বাদ্যযন্ত্র হারমোনিয়াম আমীর খুসরোর যুগে ছিল না। ঊনবিংশ শতকে ইউরোপীয় সংগীত অঙ্গন থেকে ভারতে এসে কাওয়ালিতে জনপ্রিয় হয়। তাই ঐতিহাসিক আলোচনায় এই বিষয়টি পরিষ্কার রাখা জরুরি। আমির খসরু বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে সেতার, তবলা, রবতাব ও দোলকের আবিষ্কারক ছিলেন। তবে তবলা, রবতাব ও দোলকের প্রাথমিক একটি ভার্সন আরবেও প্রচলন ছিল, আমির খসরু চূড়ান্ত রূপ দেন। তাঁর সময়ের প্রচলিত ‘বীণা’ ও ‘মৃদঙ্গ/পাখোয়াজ’-এর মতো বাদ্যযন্ত্রগুলোর সমন্বয় ও পরিমার্জন করে তিনি এগুলোর প্রচলন করেছিলেন।[28]

কাওয়ালি পরিবেশনের সময় একটি বিশেষ ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যায়। যেখানে প্রথমে হামদ (আল্লাহর গুণগান), তারপর নাত (নবীর প্রশংসা), পরে আধ্যাত্মিক প্রেম-সাধনা ও ঐশ্বরিক মিলন ও বিচ্ছেদের গান পরিবেশিত হয়। এই সংগীতের মধ্য দিয়ে সাধকরা কয়েকটি সাধনার স্তর অতিক্রম করেন। যেমন: সম্মোহন (Transcendence), তাবাসসুম (আত্ম-উন্মোচন), ফানা (নৈর্ব্যক্তিকতা), বাক্বা (ঈশ্বর-স্থায়ী অবস্থা)। সুফি কাওয়ালির সংগীতে যে রহস্যালাপ চলে, তা বহুমাত্রিক। যেমন: আল্লাহ ও বান্দার মধ্যকার আলাপ (প্রেমিক ও প্রেয়সীর ভাষায়) আত্মা ও রূহের মধ্যকার গূঢ় সংলাপ রূপক অর্থে মেহবুব (প্রেমিক) দ্বারা খোদার সংকেত শরাব বা মদ দ্বারা খোদায়ী প্রেমের উন্মাদনা অর্থাৎ ফানার অবস্থা। কাওয়ালি প্রথমদিকে খানকাহকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে ধীরে ধীরে এটি দরগাহ, ওরস, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, সামাজিক অনুষ্ঠান, রাজদরবার এবং পরে সাধারণ জনগণের সাংস্কৃতিক জীবনে প্রবেশ করে। কাওয়ালী পূর্বে সাধনপদ্ধতির অংশ থাকলেও বিগত বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে উস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান, বাহাউদ্দীন কাওয়াল, বদর আলী খান মিয়াঁদাদ, আজিজ মিয়ান কাওয়াল, সাবরি ব্রাদার্স, ওয়াদালি ব্রাদার্স, ওয়ারসি ব্রাদার্স, কুতবি ব্রাদার্স, হাবিব প্যাইন্টার, আবিদা পারভিন, রাহাত ফতেহ আলী খান প্রমুখের বদৌলতে এটি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম সংস্কৃতির অন্যতম পরিচয়বাহী সংগীতধারায় পরিণত হয়েছে।[29]

দিল্লিতে চিশতিয়া তরিকার বিস্তারের পর এর শিষ্য ও খলিফারা উত্তর ভারত, বিহার, বাংলা এবং আসাম অঞ্চলে আগমন করেন। তাঁদের মাধ্যমে সামা, সুফি-কাব্য এবং কাওয়ালির প্রাথমিক রূপ বাংলায় পরিচিত হতে শুরু করে। তবে বাংলায় এসে এই সংগীত আর দিল্লির অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বাংলা ভাষা, লোকসংগীত, আঞ্চলিক সুর এবং স্থানীয় আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে এটি নতুন রূপ লাভ করে। এই রূপান্তরই পরবর্তীকালে মুর্শিদি, মারিফতি, ফকিরি, মাইজভাণ্ডারী এবং অন্যান্য বাংলা সুফি সংগীতধারার ভিত্তি নির্মাণ করে। একটি ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালি পরিবেশনায় সাধারণত হামদ (আল্লাহর প্রশংসা), নাত (রাসুলুল্লাহ (দ.)-এর প্রশংসা), মানক্বাবাত (আওলিয়াদের প্রশংসা), গজল, সুফি-কাব্য ও তাৎক্ষণিক কাব্যিক বিন্যাস (Improvisation) দেখা যায়। পরিবেশনার সময় প্রধান কণ্ঠশিল্পীর সঙ্গে সহশিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে নির্দিষ্ট পংক্তি পুনরাবৃত্তি করেন। হাততালি, ছন্দ এবং ধীরে ধীরে তীব্রতর সুর পরিবেশনাকে অন্যরকম মাতোয়ারা আবহে পরিণত করে। কাওয়ালীর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো বহুভাষিকতা। এখানে আরবি, ফারসি, হিন্দবি, উর্দু, পাঞ্জাবি, ব্রজভাষা ব্যবহার হয়ে থাকে। পরে বাংলা, সিন্ধি ও কাশ্মীরিও এতে যুক্ত হয়। এই ভাষাগত বৈচিত্র্য সুফি সংগীতকে বহু জনগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় করে তোলে।

 

হিন্দি সিনেমার সঙ্গে উপমহাদেশীয় সুফি সংগীত কাওয়ালীর প্রথম পরিচয় ঘটে ১৯৪০-এর দশক। পরবর্তী ১৯৬০-৮০ দশক ছিল হিন্দি সিনেমা ও ভারতীয় সুফি সংগীতের সংমিশ্রণের স্বর্ণযুগ। এ সময় সাবরী ব্রাদার্স, নওশাদ, মদনমোহন, আবিদা পারভিন, নুসরাত ফতেহ আলী খানের মতো কিংবদন্তী শিল্পীরা তবলা ও হারমোনিয়ামের মতো দক্ষিণ এশীয় বাদ্যযন্ত্রকে পশ্চিমা পপ এবং ইলেকট্রনিক বিটের সাথে মিশ্রণের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সাবরী ব্রাদার্সের ১৯৫৬ থেকে টানা ৬০ বছরেরও বেশি সময়ের কাওয়ালি সংগীত ক্যারিয়ারে ষাটের অধিক অ্যালবাম প্রকাশ পেয়েছে। নুসরাত ফতেহ আলী খান প্রায় তিন যুগের সংগীত ক্যারিয়ারে ৪০টি দেশে দেড়শতাধিক অডিও অ্যালবাম ও দেড় সহস্রাধিক গান পরিবেশনা করেছেন। পরবর্তীতে আবিদা পারভীন, আজিজ মিঁয়ান কাওয়াল, নাহিদ আখতার, মেহনাজ বেগম, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, রাহাত ফতেহ আলী খান, কৈলাশ খের, এ আর রহমানসহ অসংখ্য শিল্পী এ ধারাকে আরো সমৃদ্ধ করে তুলে। বলিউডে পরিবেশিত জনপ্রিয় কিছু সুফি সংগীত– ‘তেরি মেহফিল মে কিসমত’ (মুঘল-এ-আজম, ১৯৬০), পরদা হ্যায় পরদা (আমার আকবর এন্টনি, ১৯৭৭), ‘মওলা মেরে মওলা’ (আনোয়ার, ২০০৭), ‘ছাপ তিলক’, দমা দম মাস্ত কালান্দর (জাবরু), ‘খাজা মেরে খাজা’ (যোধা আকবর , ২০০৮), কুন ফায়া কুন’ (রকস্টার, ২০১১), পিয়া হাজী আলী (ফিজা ২০০০), ভর দো ঝোলি (বজরঙ্গি ভাইজান, ২০১৫), ‘তাজদার-এ-হারাম’ (সুলতান ২০১৬)।

 

১০. সালাম (Salam)

সালাম হলো রাসুলুল্লাহ (দ.), আহলে বাইত অথবা ধর্মীয় আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রকাশকারী গীতিকবিতা। অনেকাংশে এটি না’ত বা মানকাবাতের মতো। দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের সুফি মজলিস ও ধর্মীয় মাহফিলে সালাম পাঠের প্রচলন রয়েছে। দাঁড়িয়ে, বসে বিভিন্নভাবে এটি পাঠ করা যায়। যেমন- উপমহাদেশের যে-কোনো মাহফিল ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আবশ্যিকভাবে দাঁড়িয়ে মিলাদ-কিয়ামে একটি সালাম পেশ করা হয়। যেটি সাম্প্রতিক সময়ে মেহের জাইন স্টুডিও ভার্সনে পরিবেশন করেছিলেন।

انت نور الله فجراً

جئت بعد العسر يسراً

ربنا أعلاك قدرا

يا إمام الانبياء

انت فى الوجدان حياً

انت للعينين ضي ا

أنت عند الحوض ريـاً

انت هادى وصافيـاً

يا حبيبى يا محمد

يا نبي سلام عليك

يا رسول سلام عليك

يا حبيب سلام عليك

صلاوت الله عليك

يا نبي سلام عليك

يا رسول سلام عليك

يا حبيب سلام عليك

صلاوت الله عليك

يرتوى بالحب قلبى

حب خير رسلٍ ربى

من به أبصرت دربي

يا شفيعى يا رسول الله

أيها المختار فينا

زادنا الحبُ حنينا

جئتنا بالخير دينا

ياختام المرسلين

يا حبيبى يا محمد

‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’ নামের এই সালামের মধ্যে নবীজিকে সালাম দেওয়ার পাশাপাশি নবীপ্রেম, নবীর নূর, হিদায়াত, শাফাআত এবং উম্মতের সঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিক সম্পর্ক ইত্যাদি বর্ণনা করেন। এটি পরিবেশনের পর প্রখ্যাত উর্দু কবি ইমাম আহমদ রেজার একটি বিখ্যাত দীর্ঘ রচনা পাঠ করা হয়।

مصطفی جانِ رحمت پہ لاکھوں سلام

شمعِ بزمِ ہدایت پہ لاکھوں سلام

۔مِہرِ چرخِ نبوت پہ روشن دُرود

گلِ باغِ رسالت پہ لاکھوں سلام

 

‘মোস্তফা জানে রহমত’ নামের এই দীর্ঘ রচনায় নবীজীকে মানবজাতির জন্য আল্লাহর রহমত, হিদায়াতের আলো, নবুওয়তের সূর্য এবং রিসালাতের সর্বোত্তম সৌন্দর্য্য ইত্যাদি বিভিন্ন রূপক বা প্রতীকী শব্দ ব্যবহার করে বর্ণনা করেছেন। তিনি একের পর এক নান্দনিক রূপকের মাধ্যমে নবীপ্রেম, তাঁর প্রতি সীমাহীন শ্রদ্ধা ও দরুদ নিবেদন করেছেন। নবীজি ছাড়াও তাঁর পরিবার (আহলে বায়ত) নিয়েও সালাম রচনা করা হয়। যেমন কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর ঈমান, তাওহিদ এবং আত্মত্যাগের মাহাত্ম্য তুলে ঊরতে গিয়ে পীর নাসিরুদ্দিন নাসির এক সালামে বলেন–

طاری ہے اہل جبر پہ ہیبت حسین کی

اللہ رے یہ شان جلالت حسین کی

کٹوا کے سر گواہی توحید دے گئے

بے مثل ہے جہاں میں شہادت حسین ک

পীর নাসির এখানে বলেন, ইমাম হুসাইন (রা.)-এর ব্যক্তিত্ব, সাহস ও মর্যাদা এমন যে, অত্যাচারী ও জালিম শক্তিও তাঁর মহিমায় ভীত ও স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। এখানে “اہلِ جبر” বলতে অত্যাচার, স্বৈরাচার ও অন্যায়ের প্রতিনিধিদের বোঝানো হয়েছে। “هیبت” ও “جلالت” শব্দদ্বয় ইঙ্গিত করে যে, সত্য, ন্যায় ও ঈমানের শক্তি বাহ্যিক ক্ষমতার চেয়েও অধিক প্রভাবশালী। তাই কারবালার প্রান্তরে বাহ্যিকভাবে ইমাম হুসাইন (রা.) শহীদ হলেও নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার দিক থেকে প্রকৃতপক্ষে তাঁরই বিজয় হয়েছে। এভাবে করে বেহজাদ লখনভী, আসলাম সেনদেলভী, মুজাফফর ওয়ার্সি, হাফিজ তালিব ও ওয়াইস রেজা কাদেরীসহ অসংখ্য শিল্পীগণ সালাম রচনা করেছিলেন। অত্যন্ত সুরেলা কণ্ঠে, ধীর বা আবেগপূর্ণ সুরে সালাম আবৃত্তি করা হয়। কখনো শুধু কণ্ঠে, কখনো হারমোনিয়াম বা অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে পরিবেশিত হয়।

 

১১. গ্নাওয়া (Gnawa)

গ্নাওয়া উত্তর আফ্রিকা ও মরক্কোর ধর্মীয় আধ্যাত্মিক সংগীত। এটি মরক্কোর গ্নাওয়া নামক একটি জাতিগোষ্ঠীর সংগীত। তাদের পূর্বপুরুষরা মূলত পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কৃষ্ণাঙ্গ দাস। ১৫৯১ সালে মরক্কোর সুলতান আহমেদ আল-মনসুর সাব-সাহারান আফ্রিকার সংহাই সাম্রাজ্য জয় করার পর বহু দাসকে উত্তর আফ্রিকায় নিয়ে আসা হয়। নির্বাসিত থাকাকালীন সময়ে ধীরে ধীরে তাদের মাঝে ‘গ্নাওয়া’ নামে একটি আধ্যাত্মিক ধারার উদ্ভব ঘটে এবং এর আধ্যাত্মিক চর্চার মধ্যে সংগীত ও নৃত্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।[30] তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, সংগীত, ছন্দ, নৃত্য ও সম্মিলিত আচার মানুষের অন্তর্গত অস্থিরতা দূর করে আধ্যাত্মিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। গ্নাওয়া সংগীত তাদের আদি আফ্রিকান ঐতিহ্য ও ইতিহাসকে সংরক্ষণ করে। প্রাক্তন কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান দাস হিসেবে, তারা ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বিলালের সাথেও একটি সংযোগ খুঁজে পায়। কারণ তিনি ছিলেন মহানবীর দ্বারা মুক্ত হওয়া একজন আবিসিনীয় দাস, যিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহাবী হয়েছিলেন এবং প্রথম মুয়াজ্জিন হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে স্বীকৃত। গ্নাওয়া সংস্কৃতিতে আফ্রিকান সর্বপ্রাণবাদ বিশ্বাসের কিছু দিক বজায় রয়েছে। তারা বিশ্বাস করে যে, আত্মিক জগতে পূর্বপুরুষদের আত্মা বাস করে, যারা জীবিতদের এবং ঈশ্বরের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করে।[31] তাদের সংগীত ও নৃত্য এই আধ্যাত্মিক সাধনার প্রধান মাধ্যম। গ্নাওয়া সুফি সাধনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো- ‘লিলা’ বা ‘দেরদেবা’ নামের রাতব্যাপী আচার।[32] এই আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানে সম্মিলিতভাবে সংগীত, নৃত্য, প্রার্থনা পরিবেশনা করা হয়। অনুষ্ঠানটি নেতৃত্ব দেন ‘মা’আলেম’ নামে পরিচিত প্রধান সংগীতজ্ঞ। যিনি গেমব্রি নামক তিনতারের বাদ্য বাজান এবং পুরো সংগীত আয়োজন পরিচালনা করেন। ক্রাকেব নামের ধাতব করতাল, ড্রাম, সম্মিলিত কণ্ঠসঙ্গীত এবং নৃত্যের মাধ্যমে ধীরে ধীরে একটি উন্মত্ত আধ্যাত্মিক পরিবেশ তৈরি হয়।[33] অংশগ্রহণকারীরা  সংগীত ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে এক ধরনের ভাবাবেশ বা আধ্যাত্মিক উন্মেষের অভিজ্ঞতা লাভ করে। অশুভ আত্মা তাড়ানো, অসুস্থতা, দুর্ভাগ্য ও মানসিক বিষাদ দূর করার জন্য এই অনুষ্ঠানগুলো আয়োজিত হয়। গ্নাওয়া সংগীতেও পুনরাবৃত্তিমূলক ছন্দ ও মন্ত্রধর্মী গীতের প্রচলন রয়েছে । এতে একটি নির্দিষ্ট বাক্য বা পঙক্তি দীর্ঘ সময় ধরে বারবার উচ্চারিত হতে পারে। এই পুনরাবৃত্তিটি অনেকাংশে জিকির বা ধ্যানের মতোই। দীর্ঘক্ষণ ধরে পরিবেশি ছন্দ/জিকির ও সম্মোহনী কণ্ঠ মানুষের মনকে ধীরে ধীরে দৈনন্দিন চিন্তা থেকে সরিয়ে একটি আধ্যাত্মিক অনুভূতির দিকে নিয়ে যায়।

গ্নাওয়া সম্প্রদায়ের নিজস্ব কোনো কথ্য ভাষা নেই। মরক্কোয় বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীর প্রথাগত সংগীত ও আচার-অনুষ্ঠানে মরোক্কান আরবি এবং প্রাচীন পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন ভাষা যেমন বামবারা (Bambara), হাউসা (Hausa), ফুলা (Fula) ও ইওরুবা (Yoruba) ভাষার মিশ্রিত শব্দ ও পংক্তি ব্যবহার হয়। দৈনন্দিন জীবনে তারা মরক্কোর প্রধান ভাষাগুলো ব্যবহার করে থাকেন। ১৯৭০-এর দশক থেকে গ্নাওয়া সঙ্গীত মূলধারায় উঠে আসে। এটি মরক্কীয় পপ সঙ্গীতকে সমৃদ্ধ করেছে এবং জ্যাজ, ব্লুজ, রক, ফাঙ্ক, হিপ-হপ ও ড্রাম’ন’বেসের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে গেছে। র‍্যান্ডি ওয়েস্টন, ফারাও স্যান্ডার্, ইতালীয় পাওলো ফ্রেসু, বায়রন ওয়ালেন, ও অরনেট কোলম্যানের মতো পশ্চিমা সঙ্গীতশিল্পীদের আকৃষ্ট করেছে।

 

গ্নাওয়া সংগীত নিয়ে বিস্তারিত পাঠ করার জন্য Cythia J. Becker এর “Blackness in Morocco: Gnawa Identity through Music and Visual Culture” বইটি পড়া যেতে পারে।[34] বেকার এখানে গ্নাওয়া জাতিগোষ্ঠিকে দাসত্ব, প্রবাস, জাতিগত পরিচয় এবং সুফি আধ্যাত্মিকতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সমাজ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। লেখক এখানে দেখান, দাসত্বের কঠিন অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও তারা তাদের আফ্রিকান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সংগীত, নৃত্য এবং আচারকে সংরক্ষণ করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব ঐতিহ্য ইসলামী আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে মিশে গ্নাওয়া নামে একটি নতুন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্ম দেয়। লেখক মরক্কোর এসাওইরা শহরের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা হওয়ায় গ্নাওয়াদের সংস্কৃতি তাঁর কাছে সুপরিচিত ছিল এবং এই গ্রন্থে তিনি গ্নাওয়া অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর মাঠ-গবেষণা উপস্থাপন করেন।

 

গ্নাওয়া সংগীতের একটি বহুল চর্চিত সংগীত হলো, Gnawa Sandhya, এর রচিয়তা নিয়ে বিস্তারিত জানা যায় না, তবে আফ্রিকান ও পশ্চিমার বহু নামকরা শিল্পী সংগীতটি পরিবেশন করেছেন–

اه يا ربّي مولاي

الله ياربّي حنّان

وايا سانديا الكَناويـا

هيي، أسند يـا الله يرحم الوالدين

شريفة الكَناويــا

الله ياربي مولاي

خدمي سيدك بالنِيـة

ياويي

ولي ضربك بالكمِّيــا

الله ياربي مولاي

الشتاء والبرد عليا

الله ياربي مولاي

لعجاج عمى عينيــا

الله ياربي مولاي

الشتاء والبرد عليا، وياي

لعجاج عمى عينيــا

الله يا ربّي العفـو

ياسند يـا الله يرحم الوالدين

এটি মরোক্কান আরবি ভাষায় রচিত। তবে এটি সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ দারিজা নয়। গ্নাওয়া সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কিছু শব্দভাণ্ডারও এই সংগীতে মিশে আছে। এটি একটি আধ্যাত্মিক প্রার্থনামূলক সংগীত, যেখানে আল্লাহর স্মরণ, নেককারদের জন্য দোয়া, পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা, নবী (দ.)-এর প্রতি দরুদ, সুফি তরিকার স্মরণ এবং গ্নাওয়া সম্প্রদায়ের ঐক্য নিয়ে বর্ণনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে এতে গ্নাওয়া জনগোষ্ঠীর দাসত্ব, নির্বাসন, বিচ্ছেদ ও মুক্তির ঐতিহাসিক স্মৃতিও প্রতীকীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। গানটি শুরু হয় “الله ياربي مولاي” (আল্লাহ, হে আমার রব, হে আমার প্রভু) উচ্চারণের মাধ্যমে। এরপর বারবার “اسنديا” (হে সানদিয়া) সম্বোধন এসেছে। গ্নাওয়া ধারায় সানদিয়া একটি প্রতীকী আহবান, এটি মূলত আশ্রয় বা পীর-মুরশিদের সান্নিধ্যের ইঙ্গিত বহন করে। কবি সংগীতে জীবনের কষ্টকে রূপকার্থে ব্যবহার করেছেন। যেমন- “الشتاء والبرد عليا” (শীত ও শৈত্য আমাকে ঘিরে ধরেছে) এবং ‘لعجاج عمى عينيــا’ (ধুলিঝড় আমার চোখ অন্ধ করে দিয়েছে)। এসব স্রেফ প্রকৃতির বর্ণনা নয়, বরং এগুলো জীবনের দুঃখ, নিঃসঙ্গতা, বিভ্রান্তি ও আধ্যাত্মিক পরীক্ষার প্রতীক। এই কঠিন সময়েও মানুষ আল্লাহর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করে। পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, “اتهلا فالوالدين” অর্থাৎ পিতা-মাতার যত্ন নাও। এরপর “أيا المِّيمـا ولبُـو لحنيـن… راه يكونُو ليك عوين” বাক্যে মমতাময়ী মা ও স্নেহশীল বাবার কথা স্মরণ করিয়ে বলা হয়েছে, তাঁদের সেবাই পরবর্তী জীবনের আশীর্বাদ ও সহায়তার কারণ হবে। পুনরাবৃত্তি (repetition), প্রতীক (symbolism) এবং আহবানধর্মী ভাষা (invocation) হলো এই সংগীতের প্রধান অলংকার। গ্নাওয়া গানগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মৌখিক ঐতিহ্যে সংরক্ষিত থাকার কারণে একটি সংগীতের একাধিক সংস্করণ পাওয়া যায়।

সুফি গ্নাওয়া সংগীত উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা (মাগরেব) ও সংলগ্ন অঞ্চলের অনেক সংগীতধারাকে প্রভাবিত করেছে। যেমন মরক্কোর ইসাওয়া (Issawa) ও হামাদশা (Hamadsha) ভাইয়েরা, আলজেরিয়ার বিলালি/দিওয়ান, তিউনিসিয়ার স্তাম্বুলি (Stambouli) এবং লিবিয়ার সাম্বানি (Sambani)। এছাড়া এটি মরক্কোর আধুনিক জনপ্রিয় সংগীত (যেমন নাস আল-গিওয়ান)-কেও অনুপ্রাণিত করেছে। সামগ্রিকভাবে সুফি সংগীত কীভাবে অন্যান্য ধারাকে প্রভাবিত করতে পারে, তা ভালোভাবে বোঝার জন্য আলজেরিয়ার রাই (Raï) সংগীতে গ্নাওয়ার প্রভাব নিয়ে তত্ত্ব অনুসন্ধান করা যেতে পারে।

 

১১.ক. রাই

রাই মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিকশিত আলজেরিয়ার ওরান অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় সংগীতধারা। এটি সরাসরি সুফি সংগীত নয়, তবে এর বিকাশে সুফি সংস্কৃতি, বেদুইন লোকসংগীত, আন্দালুসীয় সঙ্গীত এবং উত্তর আফ্রিকার সুফি ঐতিহ্যের গভীর প্রভাব রয়েছে। রাইয়ের প্রাথমিক শিল্পীরা বেদুইন সঙ্গীত, মালহুন কাব্য এবং সুফি ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের গানে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য ও প্রতিবাদের ভাষা উঠে এসেছে, অন্যদিকে তেমনি আল্লাহ, পীর-আউলিয়া এবং আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের প্রতিও আবেদন প্রকাশ পেয়েছে। রাই সংগীতে প্রায়ই সিদি (Sidi), মৌলায় (Moulay), ইয়া রাব্বি (Ya Rabbi) ইত্যাদি সম্বোধন ব্যবহৃত হয়, যা উত্তর আফ্রিকার সুফি সংস্কৃতির পরিচিত আধ্যাত্মিক শব্দভাণ্ডারের অংশ। যেমন: জনপ্রিয় শিল্পী Cheb Bilal (شاب بلال)-এর আলজেরিয়ান দারিজা ভাষার একটি জনপ্রিয় গান–

Sidi, sidi sidi

Sidi, sidi sidi

Nejjina menhom, a sidi

Tefedna Menhom, a sidi

  • Anaya sidi mazal neya

Walli dakli ndirah khoya

Ndir lkhir narba mada beya

Saa khiri fi la fin ydour leya

  • Rani ngoul sahl lyam addour

Dayrilhoum chan ma sabrine

Ma nlachi nafchal manich d’accord

Jamais nati l’occasion lghayyarin

  • Ma nkhoun ma nasad ma ngoul andi

L’essentiel ana nargad hani

Natacha w nalbas ala addi

Ghir gallil sidi w gharou manni

  • Lli makhlou yaba dima makhlou

Loukan yaksab khouya ga mal danya

Hsan awneh lli kaber faljou

Fi oumrah w madarchi mziyya

 

এখানে Sidi শব্দটি আক্ষরিক অর্থে ‘আমার প্রভু’, ‘হে সম্মানিতজন’ বা ‘হে পীর/ওলী’ বোঝায়। উত্তর আফ্রিকার সুফি সংস্কৃতিতে এটি প্রায়ই কোনো ওলী, পীর বা আল্লাহর নিকট প্রার্থনার সম্বোধন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গানটির মূল বিষয়বস্তু হলো আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা, নৈতিক জীবন, ঈর্ষা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকা এবং সৎ চরিত্র গঠন। এটি আলজেরিয়ান দারিজা ভাষায় রচিত।

এসব শব্দ কখনও আল্লাহর প্রতি প্রার্থনা, কখনও কোনো সম্মানিত সুফি সাধক বা ওলির প্রতি শ্রদ্ধা এবং কখনও আত্মিক আশ্রয়ের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে রাইয়ের ভাষা ও কাব্যিক প্রকাশে সুফি ঐতিহ্যের ছাপ সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। একই সঙ্গে রাই সংগীত উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য সংগীতধারা, বিশেষত গ্নাওয়া (Gnawa), আন্দালুসীয় সঙ্গীত এবং বেদুইন সুর থেকে সুর, তাল ও পরিবেশনাশৈলী গ্রহণ করেছে। পরবর্তীকালে যদিও এটি পশ্চিমা পপ, রক, জ্যাজ, রেগে ও ইলেকট্রনিক সংগীতের সঙ্গে সংমিশ্রিত হয়ে একটি আধুনিক আন্তর্জাতিক ধারায় পরিণত হয়। তবুও উত্তর আফ্রিকার সুফি ও লোকঐতিহ্যের প্রভাব এখনো পরিলক্ষিত হয়।

এই আলোচনায় বিশ্বব্যাপী প্রচলিত সুফি সংগীতের মাত্র কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ধারার পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। বাস্তবে সুফি সংগীতের পরিসর অনেক বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। তুরস্ক ও আনাতোলিয়ার ইলাহি (İlahi), নেফেস (Nefes), দুরাক (Durak), তেভশীহ (Tevşih) এবং মিরাজিয়্যে (Mi’râciyye); ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধি কাফিদোহা; কাশ্মীরের সুফিয়ানা মুসিকী (Sufiyana Mousiqi)চক্রি; উত্তর আফ্রিকার মালহুন (Malhun), আইসাওয়া (Aissawa), হাম্মাদুশা (Hamadsha) এবং তিউনিসিয়ার স্তাম্বেলি (Stambeli); পশ্চিম আফ্রিকার খাসাইদ (Khassaides); ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেই অঞ্চলের বারজানজি পাঠ, হাদরাহ, জাপিন (Zapin) ও গাম্বুস; ইরানের নওবা বা নওবতসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক স্বতন্ত্র সুফি সংগীতধারা বিকশিত হয়েছে। এসব ধারার প্রত্যেকটির নিজস্ব ইতিহাস, আধ্যাত্মিক দর্শন, সুররীতি, ভাষা এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। সুতরাং, সুফি সংগীতের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ও বৈচিত্র্য একটি স্বল্প পরিসরের আলোচনায় উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে পৃথক কোনো গবেষণা বা আলোচনায় এসব অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সুফি সংগীতধারার উৎপত্তি, বিকাশ, বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করার সুযোগ হবে।

[1] Timothy Laurie, Music Genre as Method. Cultural Studies Review, 2014, p-20.

[2] Kembrew McLeod, “Genres, Sub-Genres, Sub-Sub-Genres, etc.: Sub-Genre Naming In Electronic/Dance Music”, Journal Of Popular Music Studies (Vol. 13) p- 59-75.

[3] Franco Fabbri, A Theory of Musical Genres: Two Applications (PDF), 1982, p-1.

[4] Sufism, Music And Society: In Turkey And The Middle East, Edited by Anders Hammarlund, Tord Olsson, Elisabeth Ozdalga. Papers Read at a Conference Held at the Swedish Research Institute in Istanbul, November 27–29, 1997,

[5] Paul Smith, The Qasida in Sufi Poetry: An Anthology, CreateSpace Independent Publishing Platform, 2015.

[6] Suzanne P. Stetkevych, The Poetics of Islamic legitimacy, Indiana UP, 2002, p. 86

[7] বর্তমানে নিজারি ইসমাইলিদের আধ্যাত্মিক নেতা হলেন আগা খান, আর তাইয়্যিবি ধারার অনুসারীদের মধ্যে দাউদি বোহরা, সুলাইমানি বোহরা এবং আলাভি বোহরা উল্লেখযোগ্য।

[8] Jan van Belle, The Music of Tajik Badakhshan, The Ismaili United Kingdom, No. 33, December 1998, pp. 18-19.

[9] For Details:- Gabrielle Rachel van den Berg, Minstrel Poetry from the Pamir Mountains: A Study of the Songs and Poems of the Ismailis of Tajik Badakhshan, PhD thesis, State University of Leiden, 1997.

[10] Abd al-Munim al-Hifni. Al-Mawsu’ah al-Sufiyyah: A’lam al-Tasawwuf wa al-Munkirin ‘Alayhi wa al-Turuq al-Sufiyyah. Cairo: Dar al-Rushd, 1992.

[11] ‘Enjoying Islam with zain and Dawud’, Al Hidayaah publications.

[12] Introduction to The Rubaiyat of Omar Khayyam, translated by Peter Avery and John Heath-Stubbs, Penguin Classics, 1981, p. 9।

[13] L.P. Elwell-Sutton, The Foundations of Persian Prosody and Metrics, Iran, Vol.13, 1975, p. 92। Robin Skelton, The Shapes of Our Singing: A Comprehensive Guide to Verse Forms and Metres from Around the World, Spokane, WA: Eastern Washington University Press, 2002, pp. 106।

[14] Michael Sells, Early Islamic Mysticism. Paulist Press, 1996, pp. 56–61.

[15] K.C. Kanda (Editor), Masterpieces of the Urdu Ghazal: From the 17th to the 20th Century, Sterling Pub Private Ltd, 1991. p. 2

[16] E. G.Browne, A Literary History of Persia, Vol. 1, T. Fisher Unwin, 1902, pp. 445-446। A. J. Arberry, Classical Persian Literature. George Allen & Unwin. 1958, p. 30.

[17] Annemarie Schimmel, Classical Urdu Literature from the Beginning to Ghalib. Otto Harrassowitz Verlag, 1975, pp. 126-127.

[18] Madhu Trivedi, The Making of the Indo-Islamic World: The Delhi Sultanate. Oxford University Press, 2010, pp. 210-215.

[19] Safdar Ahmed, Literary Romanticism and Islamic Modernity: The Case of Urdu Poetry, South Asia: Journal of South Asian Studies. Vol. 35 (2), June 2012, pp. 434–455.

[20] Farhat Ehsas, Ghazal Usne Chhedi, Rekhta Books, 2017, Pg. 233

[21] Annemarie Schimmel, As Through a Veil: Mystical Poetry in Islam. Columbia University Press, 1982, p. 54.

[22] Kenneth S. Avery, A Psychology Of Early Sufi Sama Listening and altered states, Routledge Curzon, London, 2004.

[23] Jean During (French ethnomusicologist), Musique et extase: L’audition mystique dans la tradition soufie (Eng- Music and Ecstasy: Mystical Audition in the Sufi Tradition), Paris: Albin Michel, 1988, p.13.

[24] Ney flute: মধ্যপ্রাচ্যের একটি প্রাচীন এন্ড-ব্লোন রিড ফ্লুট। এটি ফাঁপা নলখাগড়া (reed) দিয়ে তৈরি হয় এবং পৃথিবীর প্রাচীনতম বাদ্যযন্ত্রগুলোর একটি। এর ইতিহাস অন্তত ৪,৫০০ বছর পুরোনো, প্রাচীন মিশর পর্যন্ত পৌঁছে। বাঁশির মতো হলেও এটি উপরের প্রান্তে ফুঁ দিয়ে বাজানো হয়।

[25] নূরুল হাসান মওদূদী সাবরি (نورالحسن مودودی صابری), নগমাত-এ সামা‘ (نغمات سماع), ১৯৩৫, পৃ- ২২৮

[26] S.M. Ikram, Ibid, 1955, pp. 46.

[27] বিস্তারিত পড়ুন: Regula Burckhardt Qureshi, Sufi Music of India and Pakistan: Sound, Context and Meaning in Qawwali. New York: Oxford University Press, 2006.

[28] Ranade, Ashok D. Music Contexts: A Concise Dictionary of Hindustani Music. New Delhi: Bibliophile South Asia, 2006.

[29] Peter pannke, Saint and singers: sufi music in the Indus valley, English Translation, Oxford University Press, Karachi, 2014, (German Edition, 1999).

[30] Chouki El. Hamel, Constructing A Diasporic Identity: Tracing The Origins Of The Gnawa Spiritual Group In Morocco. The Journal Of African History, 2008, P. 255 ।। Silvia Montenegro, Music for healing: Black Gnawas and the ‘professional’ practice of dealing with spirits in southeastern Morocco, Social Compass, Vol 69 (4), 2022, pg.  498–514.

[31] Alessandra Ciucci, The Voice of the Rural: Music, Poetry, and Masculinity among Migrant Moroccan

Men in Umbria, Chicago: University of Chicago Press, 2022

[32] Maisie Sum, Music of the Gnawa of Morocco: Evolving Spaces and Times. PhD dissertation, University of British Columbia, 2011.

[33] Christopher Witulski, The Gnawa Lions: Authenticity and Opportunity in Moroccan Ritual Music, Indiana University Press, 2018, pp. 27–30

[34] Cythia J. Becker, Blackness in Morocco: Gnawa Identity through Music and Visual Culture, University Of Minnesota press, London, 2020.