মিলাদুন্নবী উদযাপনের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

 

সংস্কৃতি

মানুষ সামাজিক জীব। আর সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ সংস্কৃতি। একটি সমাজ যেমন রাতারাতি গড়ে উঠে না, তেমনি সংস্কৃতিও হুট করে তৈরি হয় না। একটি সমাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যখন কোনো কিছুকে লালন করে, পালন করে, ধারাবাহিকতা বজায় রাখে তখন তা পরিণত হয় সংস্কৃতিতে। মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতির সঙ্গে সমাজের মূল্যবোধ জড়িত। মানুষ এমন কিছু ধারাবাহিকভাবে পালন করে না যা তার সমাজের মূল্যবোধের বিরোধী; যে কারণে কোনো সমাজে এমন কোনো সংস্কৃতি তৈরি হয় না যা উক্ত সমাজের মূল্যবোধবিরোধী। অর্থাৎ সংস্কৃতি এমন একটি বিষয় যা সামাজিকভাবে স্বীকৃত ও পালনযোগ্য। প্রশ্ন হলো, তাহলে সংস্কৃতি নিয়ে কেন বিতর্ক হয় সমাজে? উত্তরটি সহজ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের মূল্যবোধের পরিবর্তন হয় এবং মূল্যবোধ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। সংস্কৃতি নিয়ে যত প্রশ্ন ওঠে তার প্রধান সূত্র মূল্যবোধের সঙ্গে জড়িত। আবার এও মনে রাখতে হবে, সংস্কৃতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও কোনো সংস্কৃতিকেই চাইলেই হুট করে ফেলে দেয়া বা বাতিল করা যায় না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কোনো বিষয়কে আঁকড়ে ধরলে যেমন সংস্কৃতিতে পরিণত হয় তেমনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম কোনো বিষয়কে আমলে না নিলে তা সংস্কৃতি থেকে অটোমেটিক খারিজ হয়ে যায়। অর্থাৎ সংস্কৃতি নদীর মতো প্রবহমান; কোনো আবদ্ধ ডোবা বা জলাশয় নয়। যাই হোক, সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ সংস্কৃতি। প্রতিটি সমাজের সংস্কৃতি আছে। সমাজ ও সংস্কৃতি একে অপরের পরিপূরক।

বাংলার মুসলমান সমাজের‌ও রয়েছে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। বাংলায় হাজার বছর ধরে বসবাস মুসলমানদের। সমাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বাংলার মুসলমান শত শত বছর ধরে গড়ে তোলেছে নিজস্ব সংস্কৃতি। ভাষা থেকে শুরু করে খাবার, পোশাক, আচরণ, উৎসব, উদযাপন সবকিছুতেই স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলার মুসলমান। যে কারণে ঔপনিবেশিক আমলের শেষে নিজেদের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী দাবি করে স্বতন্ত্র ভূখণ্ড আদায় করতে পেরেছে। সাংস্কৃতিকভাবে যে-সকল উৎসব, উদযাপন বাংলার মুসলমানদের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তন্মধ্যে অন্যতম ঈদে মিলাদুন্নবী। কীভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী বাংলার মুসলমানদের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে তার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

 

মিলাদুন্নবীর সাংস্কৃতিক ইতিহাস

বাংলায় ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় ‘বাহারিস্তান-এ গায়বি’তে। বাহারিস্তান-এ গায়বি লিখেছেন বাংলার মুগল সেনাপতি আলাউদ্দীন ইসফাহান ওরফে মির্জা নাথান। মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ইসলাম খান চিশতীর আমলে তিনি ঢাকায় আসেন এবং বাংলায় বসবাসকালে (১৬০৮-১৬৪২ খ্রিস্টাব্দ) তিনি নিজে যা দেখেছেন, পর্যবেক্ষণ করেছেন তার‌ই লিখিত রূপ বাহারিস্তান-এ গায়বি। অর্থাৎ কেবল লিখিত দলিলকে আমলে নিলেও বাংলায় ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের অন্তত ৪০০ বছরের ইতিহাস রয়েছে। ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে নবাবী আমলে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। কলকাতার ঐতিহাসিক কে. পি. সেন লিখেছেন, “নবাব এই দিনটি একটি বিরাট উৎসব আনন্দের দিনে পরিণত করতেন। তিনি রবিউল আউয়াল মাসের প্রথম বারো দিন লোকদেররে আদর অভ্যর্থনা করতেন এবং ব্যক্তিগতভাবে আতিথেয়তায় উপস্থিত হতেন। বিশেষ করে তিনি গরিবদেরকে অভ্যর্থনা করতে ভালোবাসতেন। এই উপলক্ষে সমস্ত মুর্শিদাবাদ শহর ভাগিরথী নদীর তীর পর্যন্ত আলোকমালায় সজ্জিত করে রাখতেন। বারো দিনব্যাপী এই উৎসব ও আলোকসজ্জা অব্যাহত থাকত। আলোকসজ্জার স্থানগুলোতে কুরআন শরিফের আয়াতসমূহ এবং মসজিদ, বৃক্ষ, লাতাপাতা ও ফলসমূহ প্রদর্শিত হতো। সেনাপতি নাজির আহমদের অধীনে এক লক্ষ লোক আলোক সজ্জার কাজে নিয়োজিত হতো। কামান গর্জনের সঙ্গে সঙ্গে সড়ক ও নদী তীরের সমস্ত আলোক জ্বলে উঠত এবং সারা শহর ও ভাগিরথী এক আনন্দময় রূপ ধারণ করত। মুসলমানদের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে খুশির মুহূর্ত ঘোষণা করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কামানগুলো গর্জন করে উঠত।”[1] এই বর্ণনায় স্পষ্ট, নবাবী আমলে কতটা ব্যাপক ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে রাষ্ট্রীয়ভাবে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপিত হতো। রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের ফলে এর প্রভাব আশরাফ তথা উচ্চবিত্ত মহলে তো বটেই, শহুরে মধ্যবিত্ত মুসলমানদের উপর‌ও পড়েছে। যার চিত্র পুরান ঢাকার ইতিহাসে পাওয়া যায়। হেকিম হাবিবুর রহমানের উত্তরসূরী সাদ উর রহমান লিখেছেন, “১৭৯০ সালের দিকে আরমানিটোলা তারা মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা গোলাম পিরের পিতামহ আবু সাঈদ প্রতিবছর ঈদে মিলাদুন্নবী উৎসবে নিজ ব্যয়ে তবারক হিসেবে পোলাও বিতরণ করতেন।”[2] আরমানিটোলার তারা মসজিদ সবার পরিচিত; ১০০ টাকার নোটের মাধ্যমে যে মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় স্থাপত্যে পরিণত হয়েছে। এই মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৮৬০ সালে; প্রতিষ্ঠাতা মির্জা গোলাম পীরের পিতামহ অর্থাৎ দাদা প্রতি বছর মিলাদুন্নবী উদযাপন করতেন। ১৭৯০ অর্থাৎ যখন‌ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে উপমহাদেশের মুসলমানদের সামাজিক-অর্থনৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করেনি। আবু সাঈদ নিশ্চয়ই উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্য ছিলেন; কিন্তু তিনি একাই পালন করতেন? তাঁর উত্তরসূরী বিখ্যাত বলে তাঁর উদযাপনের তথ্যটি আমাদের কাছে পৌঁছেছে। বিপরীতে কত কত উদযাপনের ইতিহাস যে কখনো ছাপার অক্ষরে উঠে আসেনি তার হিসাব নেই। ঔপনিবেশিক আমলে ঢাকা শহরে যখন মুসলমান সমাজ ‘আধুনিকতা’র সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নিজেদের পুনর্গঠন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তখন‌ও উদযাপিত হয়েছে মিলাদুন্নবী। নবাব সলিমুল্লাহর আমলে মিলাদুন্নবী উদযাপনের বর্ণনা পাওয়া যায়। যেমন: “গত শতকের শেষ দশকে নবাব সলিমুল্লাহ মুসলমানদের মুসলমানদের আরেকটি উৎসব হিসেবে ফাতেহা-ইয়াজদমকে তুলে ধরেন। এ উপলক্ষে ঢাকা শহরের প্রতিটি পঞ্চায়েতকে তিনি টাকা দিতেন। এই টাকা ব্যয় করা হতো দুটি খাতে। প্রথম মহল্লা সাজানো, দ্বিতীয় মিলাদ পড়ানো। এ মিলাদেরও বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল- এটি পরিচিত ছিল ‘ভাটিয়ালী মৌলুদ’ নামে। হয়ত ভাটিয়ালী সুরে পড়ানো হতো বলেই এই নাম। নাছির আহমেদ, সলিমুল্লাহর সময়ে এক ‘স্পেশাল মিলাদের’ কথা উল্লেখ করেছেন। মনে হয় এই স্পেশাল মিলাদই ছিল ‘ভাটিয়ালী মৌলুদ’ বা মিলাদ। তিনি জানিয়েছেন, সলিমুল্লাহ নিজে বিভিন্ন মহল্লায় এই মিলাদ পড়াতেন। মিলাদ পড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি মহল্লায় মুসলমানদের সংগঠিত করতেন, অনুসারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতেন। এছাড়াও ফাতেহা-ইয়াজদমের সময়, পঞ্চায়েতসমূহ চকের মসজিদ সুন্দরভাবে সাজিয়ে উচ্চস্বরে সেখানে মিলাদ পড়াবার বন্দোবস্ত করতো।”[3] জেনে রাখা ভালো যে, মিলাদুন্নবী ফাতেহা-ই ইয়াজদহম, দোয়াজদহম, নবী দিবস ইত্যাদি নামেও পরিচিত ছিল। কেবল যে নবাব সলিমুল্লাহ মিলাদুন্নবীর আয়োজনে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন তা নয়, বরং নবাব পরিবারের প্রায় সকল দায়িত্বশীল নবাবের সময়েই বর্ণাঢ্য আয়োজনে মিলাদুন্নবী পালিত হয়েছে। নবাবী আমলে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন এবং পূর্ববঙ্গের প্রধান শহর ঢাকায় আশরাফদের চর্চায় ও নবাবদের পৃষ্ঠপোষকতায় মিলাদুন্নবী উদযাপনের ধারাবাহিকতা লক্ষ্যণীয়। অর্থাৎ ততদিনে মিলাদুন্নবী উদযাপন বাংলার মুসলমান সমাজের গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।

 

রাষ্ট্রীয়ভাবে নবাব, আশরাফদের আনুষ্ঠানিক চর্চার পাশাপাশি গ্রাম বাংলার মুসলমানদের মাঝেও ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের চর্চা ছিল। ১৯০০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সময়ে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে মিলাদুন্নবী উদযাপনের বেশ কিছু চিত্র উল্লেখযোগ্য। সিলেটে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সৈয়দ মুর্তাজা আলী (১৯০২-১৯৮১) স্মৃতিচারণে লিখেছেন: “আমরা যখন সিলেট গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে পড়তাম তখন স্কুলে খুব আড়ম্বরের সংগে মিলাদ উৎসব হত। এই উপলক্ষে আমরা স্কুল বাড়িটাকে সুন্দররূপে সাজাতাম। সভা করে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় পয়গম্বরের ভাবধারা ও জীবনী সম্বন্ধে আলোচনা করতাম।”[4] ১৯২০ সালের এই স্মৃতিচারণ থেকে সিলেটে মিলাদুন্নবী উদযাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়। কুষ্টিয়ায় মিলাদুন্নবী উদযাপনের সাক্ষ্য দিয়েছেন এডভোকেট সা’দ আহমদ: “১৯৪২ সালের কোন এক সময় কুষ্টিয়া মহকুমা মুসলিম ছাত্রলীগ-এর সভাপতি ও সম্পাদক ভেড়ামারা হাইস্কুলে এসে মুসলিম ছাত্রলীগ-এর সংগঠন গড়েন এবং স্থানীয় সভাপতির দায়িত্ব আমার উপর অর্পণ হয়। হাইস্কুলে পূর্বের চাইতে মুসলিম ছাত্রসংখ্যা বেশ কিছু বৃদ্ধি পেল। ভেড়ামারা বাজারে মুসলিম বসতি ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং মুসলিম সরকারি কর্মচারী বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের সন্তানদের নিয়ে মুসলিম ছাত্রলীগ-এর দল ভারী হতে লাগল। বড়দের সাহায্য নিয়ে কলকাতা থেকে কবি, সাহিত্যিক ও গায়ক এনে আমরাও একমাত্র হাইস্কুলের ময়দানে জমকালোভাবে নবী (সা.) দিবস উদযাপন করতে শুরু করে দিলাম।”[5] বেগম সুফিয়া কামালের জবানে শোনা যায় বরিশালে ঘরোয়া পরিবেশে মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিবরণি: “আমাদের নবী করিমের জন্মদিন বারে ওফাতে ঈদ-ই মিলাদুন্নবী বড়‌ই সমারোহের সাথে সম্পন্ন হতো; আলোকে জেয়াফতে ধনী-দরিদ্র্য বারো দিন ধরে মিলাদ-মাহফিলে সমবেত হতো। বারো দিনের জেয়াফত খাওয়ানো হতো সকলকে একসাথে করে। ধার্মিক ও বিদ্বান ব্যক্তিদেরকে উপহার প্রদান এবং রোজা রাখা ও মুসলমানদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য‌ও মহানবীর জন্মোৎসব একটা বিশেষ উপলক্ষ ছিল।”[6] চল্লিশের দশকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মিলাদুন্নবী উদযাপনের স্মৃতি শেয়ার করেছেন কবি, সাহিত্যিক ও গবেষক মোহাম্মদ মাহ্‌ফুজ‌উল্লাহ: “সে-সময়ে আমাদের তালশহর হাই স্কুলে বার্ষিক মিলাদ মাহফিল হতো, আর সে উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হতো মহানবীর (সাঃ) জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে রচনা প্রতিযোগিতা। বার্ষিক মিলাদ উপলক্ষে ও নবী দিবসে স্থানীয় মওলবী-মাওলানারা ছাড়াও, বাইরে থেকে আমন্ত্রিত অতিথিরাও আসতেন। মনে পড়ে, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী আবদুল করিম, বিখ্যাত আলেম মওলানা ফজলুল করিমও আমাদের স্কুলে গিয়েছিলেন। ‘ফখরে বাঙাল’ নামে খ্যাত মরহুম মাওলানা তাজুল ইসলাম, মরহুম মাওলানা ইমামউদ্দিন নূরী প্রমুখরা ছিলেন বিখ্যাত আলেম ও ওয়াজী। ইমামউদ্দিন নূরীর বাগ্মিতা ও ওয়াজ-নসিহতের স্টাইল ছিল মনোমুগ্ধকর, তার বক্তৃতায় ছিল সম্মোহণী-শক্তি। এঁদের বক্তৃতা শোনার জন্যই মিলাদ-মাহফিলে, ওয়াজের আসরে শরীক হতাম। কিন্তু সেই কিশোর-বয়সে সবচেয়ে বেশী আনন্দ পেলাম, যেদিন শুনলাম আমাদের স্কুলের বার্ষিক মিলাদে ও নবী দিবসের ফাংশনে প্রধান অতিথি হয়ে আসছেন মহা-পন্ডিত ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্।”[7] উপরে উদ্ধৃত সাক্ষ্যগুলো থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের চর্চা কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বা শহুরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলে মুসলমান সমাজে এর চর্চা বিদ্যমান ছিল। উপরন্তু কেবল ব্যক্তি বা পরিবার পর্যায়েও সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং স্কুল, কলেজে তথা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উদযাপিত হতো। অর্থাৎ ঔপনিবেশিক আমলেই মিলাদুন্নবীর উদযাপন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে।

সাংস্কৃতিকভাবে যে ঈদে মিলাদুন্নবী বাংলার মুসলমানদের মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছিল তার প্রধান নিদর্শন হিসেবে পেশ করা যায় সাহিত্যে মিলাদুন্নবীর উপস্থিতি। প্রাক-ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যে নবীজীর জীবনী নিয়ে রচিত হয়েছে বহু কাব্য, পুঁথি, গীতিকা ইত্যাদি। সরাসরি ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ‘আধুনিক’ বাংলা সাহিত্যে প্রথম কাব্য রচনা করেছেন কবি দাদ আলী। তিনি ১৯১৫-৬ সালে লিখেছেন ‘রবিউল আউওল’ নামে ১২ স্তবকের কবিতা। ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্’ (আবির্ভাব) কবিতা প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। এখনো পর্যন্ত মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বাংলায় রচিত কবিতার মধ্যে এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ। ১৯২৬ সালে কবি গোলাম মোস্তফা লিখেছেন ‘ফাতেহা-ই-দোআজদহম’ (আবির্ভাবে) শীর্ষক কবিতা। ঔপনিবেশিক আমলে মুসলমান কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রধান কবি শাহাদাৎ হোসেন ১৯২৭ সালে প্রকাশ করেছেন ‘মহাপয়গাম’ শীর্ষক কবিতা। মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ লিখেছেন ‘সিরাজাম মুনীরা’। তালিকা করতে থাকলে শেষ হবে না সহসা। গদ্যে নবী-জীবনী ছাড়াও স্বতন্ত্রভাবে মিলাদুন্নবী নিয়ে লিখেছেন কাজী আবদুল ওদুদ (১৯২৪), মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ (১৯৩৫), এস. ওয়াজেদ আলী (১৯৪৪) সহ অনেকেই।

 

মিলাদুন্নবীর সাংস্কৃতিক তাৎপর্য

বাংলার মুসলমান সমাজের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে মিলাদুন্নবীর এই অবস্থানের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য কী? এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাসে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সূচনালগ্ন থেকেই ঈদে মিলাদুন্নবী রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপিত হচ্ছে। এই উপলক্ষে রয়েছে সরকারি ছুটি। আশির দশকে হযরত তৈয়ব শাহ রহ. কর্তৃক চট্টগ্রামে ও পরবর্তীতে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে জশনে জুলুছ চালু হবার পর থেকে ঈদে মিলাদুন্নবীর সাংস্কৃতিক আবেদন বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মিলাদুন্নবী উপলক্ষে জুলুস, মিছিল কেবল আর ঢাকা, চট্রগ্রামে সীমাবদ্ধ নেই, প্রায় প্রতিটি জেলায় কোনো না কোনো ফর্ম্যাটে আয়োজিত হচ্ছে। মিলাদ, মাহফিল, জিকির-আজকারের বাহিরেও এই উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, ব্লাড ডোনেশন ক্যাম্পেইন, ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্প, পাড়ায় মহল্লায় খাবারের আয়োজন ইত্যাদি। প্রতি বছরই মিলাদুন্নবী উদযাপনের পরিসর বাড়ছে, শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে মিলাদুন্নবীর খোশবু। ছোট্ট ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বাবারা সুন্দর জামাকাপড় পরে, আতর খোশবু মেখে বেরিয়ে পড়েন মিলাদুন্নবীর মিছিলে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ঈদের আমেজ। এখানেই শেষ নয়!

বাংলাদেশে পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসন নিয়ে গত এক যুগ ধরে তুমুল আলোচনা চলছে। বিশেষত, থার্টিফার্স্ট নাইট, স্কুল, কলেজের রেগ ডে, হ্যালোউইন, ক্রিসমাস ইত্যাদি যখন আসে তখন আলোচনা তুঙ্গে উঠে। আলোচনায় একটি প্রশ্ন কমন, পশ্চিমা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবেলা করবো কীভাবে? বিকল্প সাংস্কৃতিক প্রস্তাবনা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরে আসে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনের কথা। যারা বেদাত ফতোয়ার দোহাই দিয়ে মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিরোধী ছিল দীর্ঘকাল, তারাও পশ্চিমা সংস্কৃতির আগ্রাসনের মোকাবেলায় মিলাদুন্নবীর বিকল্প খুঁজে পাননি। ফলে, গত কয়েক বছর ধরে দেখা যাচ্ছে গতানুগতিক বেদাত ফতোয়ার প্রচারকারী গোষ্ঠী, সংগঠন নিজেদের মতো করে মিলাদুন্নবী উদযাপন করছেন। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলায় নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তা টিকিয়ে রাখতে মিলাদুন্নবীর আশ্রয় নিচ্ছেন। এটি মিলাদুন্নবীর সাংস্কৃতিক শক্তিমত্তার পরিচায়ক। ধর্মীয়ভাবে সে যতই বেদাত বলুক না কেন সাংস্কৃতিকভাবে খারিজ করতে পারছে না। মিলাদুন্নবী উদযাপনের সুদীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলার মুসলমানদের সঙ্গে মিলাদুন্নবীর যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক তাকে অগ্রাহ্য করার সামর্থ্য কারো নেই। যে কারণে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যারা মিলাদুন্নবী উদযাপনের সমালোচনা করেছেন, করতেন তারাও আজ দেরিতে হলেও বুঝতে পারছেন যে, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলায় নিজেদের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা বজায় রাখতে মিলাদুন্নবী উদযাপনের বিকল্প নেই।

সংস্কৃতি একটি জাতির, জনগোষ্ঠীর পরিচয় বহন করে। বাংলার মুসলমানদের স্বতন্ত্র সত্তার পরিচয় বহন করে ঈদে মিলাদুন্নবী। ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার মুসলমান সমাজ সাংস্কৃতিকভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সংগ্রামে যেমন মিলাদুন্নবীর আশ্রয় নিয়েছে, তেমনি আজ সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলায় স্বকীয়তা বজায় রাখার সংগ্রামেও মিলাদুন্নবীর আশ্রয় নিতে হচ্ছে, হবে। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে মিলাদুন্নবী উদযাপনের মাধ্যমে বেদাত ফতোয়া দাফন না করে উপায় নেই। মিলাদুন্নবীর উদযাপন এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গোত্র, গোষ্ঠীর মাঝে সীমাবদ্ধ নেই; মুসলমান সমাজের বৃহত্তর স্বার্থের পরিচায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মিলাদুন্নবীর উদযাপন যত ব্যাপক, বর্ণাঢ্য, বর্ণিল আর বৈচিত্র্যময় হবে বাংলার মুসলমান সমাজ সার্বিকভাবে তত‌ই শক্তিশালী হবে।

[1]. বাংলার ইতিহাস: কে. পি. সেন, কলিকাতা, ১৩০৮ বঙ্গাব্দ, ৭০ পৃষ্ঠা

[2] . উৎসবের ঢাকা: সাদ উর রহমান, ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০১৮, ৯৩ পৃষ্ঠা

[3] . ঢাকা সমগ্র ১: মুনতাসীর মামুন, সাহিত্য লোক, কলিকাতা, ১৯৯৫, ১১১ পৃষ্ঠা

[4] . আমাদের কালের কথা: সৈয়দ মুর্তাজা আলী, ব‌ইঘর, চট্টগ্রাম, কার্ত্তিক ১৩৭৫, ৯১ পৃষ্ঠা

[5] . আমার দেখা সমাজ ও রাজনীতির তিনকাল : সা’দ আহমদ, রিজিয়া সা’দ ইসলামিক সেন্টার প্রকাশনী, ২০০২, ২০ পৃষ্ঠা

[6] . একালে আমাদের কাল : সুফিয়া কামাল, সুফিয়া কামাল রচনা সংগ্রহ, বাংলা একাডেমি, ২০১৬, ৫৭৭ পৃষ্ঠা

[7] . কৈশোরকালের কথা ও সাহিত্য-জীবনের সূচনা-পর্ব: মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ্, বুক ক্লাব, ১৯৯৯, ৩৩ পৃষ্ঠা