আধ্যাত্মিক স্মৃতিচারণ: সুফিপন্থা বনাম আধুনিক বিশ্ববীক্ষা

সম্পাদকীয় নোট:

কেবল বাংলাদেশেই নয়, গোটা সাউথ এশিয়ায় ‘আধুনিকতা’ এসেছে ঔপনিবেশিক আমলে। উপনিবেশী আমলা, বুদ্ধিজীবী ও নীতিনির্ধারকরা ঠিক সেভাবেই এখানে আধুনিকতা আমদানি করেছেন যেভাবে করলে তার উপনিবেশ মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়। ঔপনিবেশিক শাসকদের আমদানি করা আধুনিকতার প্রধান সমস্যা হলো, সরাসরি ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া। যে-কারণে আধুনিকতাকে নির্বিচারে গ্রহণ করা লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের ব্যাপারে ধর্মবিরোধী লেখালেখির অভিযোগ আসে। গত একশো বছর ধরে দুনিয়াজুড়ে অন্যতম প্রধান বিতর্ক আধুনিকতা বনাম ধর্ম। যে যেই ফর্মে ধর্মীয় চর্চা করুক না কেন, সেখানেই আধুনিকতা প্রশ্নে তৈরি হয়েছে সংকট ও বিরোধ।

আমেরিকার উইসকনসিন স্টেটে বসবাসরত নৃবিজ্ঞান লেখক ও গবেষক সায়েমা খাতুন পারিবারিক স্মৃতি উপস্থাপনের মাধ্যমে দেখিয়েছেন, কীভাবে আধুনিকতাকে নির্বিচারে আত্মস্থ করার ফলে পারিবারিক ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করার মাধ্যমে একটি পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে তিনি অনুধাবন করেছেন, এই ঐতিহ্য ও সুফি সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার প্রয়োজনীয়তা। তাঁর এই স্মৃতিচারণ ও উপলব্ধি চলমান সংকটপূর্ণ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই, পাশাপাশি সমাজতাত্ত্বিক সুফি গবেষকদের জন্য‌ও অত্যন্ত জরুরী। আধুনিকতা ও সুফি-সমাজের সংকট বুঝতে ও নিরসন করতে এই স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধ প্রাথমিক উপাদান হিসেবে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

***

 

বিস্মৃতির প্রথম পৃষ্ঠা

দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, পুরানো ঢাকার টিকাটুলীর অভয় দাশ লেন থেকে এলিফ্যান্ট রোডের গাছপালা ঘেরা একটি দোতলা বাড়িতে আব্বা আমাকে নিয়ে এলেন। অনেকটা ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের (Alliance française) পুরনো ভবনটির ধাঁচের গোলাকৃতির ঘেরা একটা বারান্দা ছিল। সেই সময়ের ঢাকার দালানকোঠার চারপাশে প্রশস্ত বারান্দা থাকতো। এই বারান্দাগুলো নানারকম সামাজিকতার পরিসর হিসাবে ব্যবহৃত হত। গাছপালায় ঘেরা একটি আধুনিক আবাস ভবন। এর আশেপাশে বেশ কিছু ভালো জুতার দোকান ছিল। সম্ভবত সময়টা আশির দশকের গোড়ার দিকে, ঢাকা শহর তখনও বড় বড় সবুজ গাছপালায় ঘেরা, ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা এক মোহন রূপসী নগরী। আমার বয়স সম্ভবত ছিল সাত কি আট, সন-তারিখ মনে নেই, কিন্তু আব্বার তর্জনী ধরে হেঁটে হেঁটে একটা ঢালের দিকে নেমে গিয়ে বাড়িটিতে ঢোকার দৃশ্য-শব্দ-গন্ধ স্পষ্ট মনে পড়ে। আমরা এসেছি আব্বার পীর সাহেবের কাছে, তাঁর মুর্শিদ হযরত কোতুবুল আলম শাহ সুফি সৈয়দ গোলাম মাওলানা হোছাইনী চিশতী শামপুরী (রা.) এর বাসভবন ও দরবারে। ইনি আমার এবং আমাদের সব ভাইবোনদের নামকরণ করেন। বড় হলে আব্বা আমাকে তাঁর হাতে মুরিদ হিসাবে বায়াত গ্রহণ করিয়েছিলেন, পরবর্তীতে ধীরে ধীরে আমাকে চিশতিয়া তরিকতে দীক্ষিত করেছিলেন। হজরত খাজা মইনুদ্দীন চিশতী (রা.) এর ভক্ত-অনুরাগী পীরভাই ও পীর বোনদের বৃহৎ একটি আধ্যাত্মিক সম্প্রদায়ের একজন সদস্য হিসাবে তিনি আমাকে গড়ে তুলেছিলেন। আমি নিজেকে চিশতীয়া তরীকার একজন মুরিদ হিসাবে ভেবে বড় হচ্ছিলাম।

 

প্রতি বৃহস্পতিবার আব্বা এখানে মাহফিলে আসতেন, হাজার মুশকিলেও কোনভাবেই এটা মিস করতেন না। আশির দশকের গোড়াতে টিকাটুলীর ভাড়া বাসা থেকে উত্তরায় নিজ বাড়িতে উঠে যাওয়ার পরেও কোন বৃহস্পতিবারের মাহফিলই আব্বা বাদ দিতেন না। সেদিন দোতলা বাড়ির বাইরের দিকের একটা আলাদা ঘরে আগরবাতি আর ফুলে সাজানো ছিল, দেয়ালে সুন্দর সাজানো ফ্রেমে আরবিতে কিছু লেখা ছিল, হয়তো পবিত্র কোরআনেরই কিছু আয়াত বাঁধানো ছিল। আমরা সেই কক্ষে বসে কিছু দোয়া-দরূদ পাঠ করি। আব্বা যেভাবে উচ্চারণ করেন, আমি ঠিক সেভাবেই সেভাবে আব্বাকে অনুসরণ করে উচ্চারণ করে পড়েছি। একপাশে বিরাট রান্না ঘরে অনেক খাদেম-খাদেমারা উত্তপ্ত লাল আগুনের লাকড়ির চুলায় তবারক রান্না করছিলেন। মনে পড়ে বড় বড় চুলায় বিরাট বিরাট ডেকচিতে বড় বড় হাতা নেড়ে রান্না হচ্ছে, ধোঁয়ায় উড়ে সুস্বাদু তবারকের বাসনা ছড়িয়ে পড়ছিল, মোমবাতি, আগরবাতি, কাঁচা ফুলের সুবাস আর মাহফিল শুরুর মন্দ্রধ্বনিতে সন্ধ্যা থেকে এক ধরনের ঐশ্বরিক ভাবাবেগপূর্ণ পরিবেশ রচিত হচ্ছিল, যা সেই বাল্য বয়সে আমার পক্ষে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব ছিল না। সন্ধ্যা থেকে মাহফিল জমে উঠতে শুরু করে, পুরুষেরা সাদা বা সাদার কাছাকাছি রঙের টুপী-পাঞ্জাবী-পায়জামা বা জোব্বা পরিহিত হয়ে আতর, মেশক ও নানারকম সুগন্ধি মেখে সুসজ্জিত হয়ে বড় হল ঘরটিতে জমায়েত হয়েছেন, নারীরাও শাড়ী পড়ে মাথায় ঘোমটা টেনে পাশের আরেকটি ঘরে সমবেত হয়েছেন, সে সময় হিজাব বলে কিছু দেখেছি বলে মনে পড়ে না। আব্বা আমাকে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, এই যে ইনি দাদাভাই, এই আমার পীরভাই, ইনি আমার পীরবোন। মেয়েদের ঘরে কয়েকজন পীরবোনের জিম্মায় আমাকে রেখে আব্বা মূল দরবার কক্ষে মাহফিলে যোগ দেন। উপস্থিত জমায়েতের মাথার উপর থেকে থেকে গোলাপজল ছিটানো হচ্ছে। চারপাশের একটা সমাহিত পবিত্র সুগন্ধি হাওয়া। হয়তো হাস্নাহেনা, গন্ধরাজ, বেলীর মত কিছু ফুলের মিশ্র সুবাস ছড়িয়ে ছিল। আব্বা আসবার সময় নারিন্দার খ্রিস্টান সেমেটারি পেরিয়ে বলধা গার্ডেন থেকে হলুদ-শাদা কাঠ গোলাপের তোড়া বানিয়ে নিয়ে এসেছেন। সম্ভবত একটা ফুলের মালাও ছিল। শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসাবে মালা এবং তোড়াটি পীর সাহেবকে উপহার দিয়ে ছেলেরা এবং মেয়েরা পৃথক পৃথক কক্ষে মেঝেতে বিছানো চাদরের উপর বসে যোগ দেই অনুষ্ঠানে। সিমের বীচি দিয়ে শত থেকে হাজার গণনা করে দোয়া-দরূদ, মিলাদ পাঠ, হামদ-নাত পরিবেশন, সবশেষে জিকির চলতে থাকে গভীর রাত পর্যন্ত। এরই মধ্যে পীর সাহেব আধ্যাত্মিক বয়ান করেন, আব্বা সেগুলো ফিতাওয়ালা ক্যাসেটে রেকর্ড করে রাখতেন। পরে বাড়ি এসে গভীর মন দিয়ে শুনতেন। তাঁর লেখা গ্রন্থও গভীর ভক্তির সঙ্গে পাঠ করতেন। সেখানে ভারতীয় উপমহাদেশে ওয়াহাবীদের ইতিহাস এবং অবস্থানের সমস্যা থেকে মুসলমানের বর্তমান অবস্থা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ছিল। তখন সবকিছু বোঝার ক্ষমতা আমার হয়নি। কিন্তু মনের ভেতর গেঁথে গিয়েছিল যে, কিভাবে মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীণ ফেরকা ও বিভক্তি আমাদের উম্মাহ ও কওম হিসাবে বহুরকম ফিৎনা সৃষ্টি  করে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং কিভাবে আমরা এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতেও পরম সত্যকে আঁকড়ে ধরে ন্যায় এবং ইনসাফের পথে চলতে পারব। কবি নজরুলের মত “আল্লাহ্‌তে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান?”- এরকম আক্ষেপ যেন আব্বারও ছিল।

 

বাবা শামপুরীর পরিবারে রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য চর্চা ছিল বলে জানতাম। ঢাকার দরবারে এবং শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার পণ্ডিতসারের চিশতী নগরে বাংলা মাস ধরে সাংবাৎসরিক ধর্মীয় সকল আচার-অনুষ্ঠানে আব্বা গভীর নিষ্ঠার সাথে যোগ দিতেন এবং সেই সব অনুষ্ঠান আমাদের পারিবারিক জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। যেমন: এই সময়ে আব্বা সুরেশ্বর যাবেন, ওই সময় পণ্ডিতসারে ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হবে ইত্যাদি। আমি নিজে বহুবার আব্বার সাথে এইসব অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি, সদরঘাট থেকে লঞ্চে করে শরীয়তপুরের সুরেশ্বর ঘাটে নেমে পণ্ডিতসার পর্যন্ত হেঁটে ওরসে যোগদান করেছি, সেখানে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভক্তি ও তাজিম সহকারে অংশগ্রহণ করেছি, তবারক খেয়েছি। মা-বাবা, ভাইবোন, ফুপুসহ অনেক আত্মীয়-স্বজনও সেইসব অনুষ্ঠানে গিয়েছে। এই অনুষ্ঠানগুলো চলতো কয়েকদিন ধরে। আমাদের বাড়িতে একটা কৌটা ছিল যেখানে ‘নজর’ বা ‘নজরানা’ রাখা হত, আমরা আমাদের যার যার ‘তৌফিক’ অনুসারে যে যখন যা দিতে চাইতাম, সেই অর্থ জমা করা হত, সেই অর্থ আব্বা দরবারে পৌঁছে দিতেন। এই নজর দেয়াকে আমরা খুব সম্মানের চোখে দেখতাম, আমরা ভালোবেসে দান করতাম। সারা বছরের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, ওরসের গণভোজ, দরবার শরীফের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজগুলো বিপুল বড় একটা ব্যাবস্থাপনার বিষয় ছিল, যাতে আব্বা তাঁর পীরভাই-বোনদের সাথে সাধ্যমত শ্রম এবং সময় দিতেন। এখন বয়স আশি পেরিয়ে যাওয়ার পর আব্বা আর কোথাও একা একা চলাচল করতে পারেন না। কয়েক বছর আগে শেষবারের মত আব্বাকে আমিই এই বৃহস্পতিবারের মাহফিলে নিয়ে গিয়েছিলাম। সংসার জীবনটাকে আব্বা ধর্ম হিসাবেই পালন করেছেন।

 

পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসাবে সম্ভবত আব্বা আমাকে গড়ে তোলার কাজটি নিজের হাতে নিয়েছিলেন, যার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আওলাদদেরকে একটি আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে দীক্ষিত করা, তরিকতের শিক্ষা দেয়া এবং গোটা পরিবারে সেই জীবনাচরণ, অভ্যাস ও চর্চা গড়ে তোলা। বাকি সন্তানেরা যেন ধীরে ধীরে শিখে নেবে বলে তিনি আশা করতেন এবং একটা পরম্পরা গড়ে তোলার আশা রাখতেন। আমাদের সকাল শুরু হত ফজরের পর থেকে আব্বার দৈনিক ঘণ্টাখানেক দোয়া-দরূদ, কালাম-কিতাব পাঠের মধ্য দিয়ে। অনেক সময় বিকেলে বা সন্ধ্যায় নবী ও অলি-আউলিয়া ও মনীষীদের জীবনকাহিনী শোনাতেন, নজরুল-রবীন্দ্রনাথের ভক্তিমূলক গানগুলো শোনাতেন। নিজে জিকির-আজকার করতেন, ধ্যানাভাস করতেন, মৌনব্রত, ইতেকাফ ও মোরাকাবা করতেন। পরম ভক্তি ও নিষ্ঠার সাথে আমাদের কোরআন-হাদিসের তালিম দেয়া হয়েছিল। পরিবারে বাচ্চাদের ১২ বছর বয়সে কোরআন খতম করবার রেওয়াজ ছিল। আমিও সেটা করেছিলাম। এটা অনেকটা গ্রাজুয়েশনের মত ছিল, ধর্মীয় দায়-দায়িত্বে সাবালকত্বের দিকে উন্নীত হওয়া। বিশ্বাস ছিল, ১২ বছরের পর থেকে যার যার পাপ-পুণ্যের ভাগীদার প্রত্যেক বান্দা নিজে। আমাদের বাড়িতে অনেক পুরনো ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের বাংলা অনুবাদের কোরআন শরীফও ছিল। বাড়িতে নিয়মিত মিলাদ-মাহফিল হত। সেইসব রঙ-রূপ-রস-স্বাদ-গন্ধ-দৃশ্যের ভেতর আমাদের শৈশব-কৈশোর কেটে গেছে।

 

স্কুল শেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে যেতে তাসাউফপন্থী এই তরিকত ও মারেফতের ইলম ও জ্ঞান-ঐতিহ্যের চর্চার সাথে আমাদের স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটে যায়। খাঁটি ইবাদত, আধ্যাত্মিক সাধনা, আল্লাহ্‌র নৈকট্যের মাধ্যমে ইলমে লাদুনী বা খোদাপ্রদত্ত জ্ঞানপ্রাপ্ত হওয়ার পথ সম্পূর্ণ ছেড়ে দিয়ে  আধুনিক সেকুলার জ্ঞানকাণ্ডের জগতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রী ও ক্যারিয়ারের সাফল্যের পথে আমরা কমবেশী সবাই পরিচালিত হয়েছি। দুনিয়াবি সাফল্য, সমাজে বড় হওয়া, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য চেষ্টা করেছি। আমাদের প্রজন্মের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত আধুনিক পেশাদার জীবনের সাথে সুফিবাদী তরিকতপন্থী জীবনাচরণ শেষ পর্যন্ত কিভাবে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়েছিল, সেই পারিবারিক ইতিহাসকে চব্বিশের অভ্যুত্থান-উত্তরকালের এই সময়ে ফিরে দেখবার তাগিদ বোধ করি। সকলের ক্ষেত্রে হয়তো এমনটি হয়নি – আধুনিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত অনেক সুফিপন্থী পণ্ডিত ও বিদগ্ধ মানুষ রয়েছেন। কিন্তু এই দুইয়ের মধ্যে একটা পরস্পরবিরোধী বিশ্ববীক্ষা কখনও হয়তো সমান্তরাল, কখনও সাংঘর্ষিক হয়ে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় প্রকটিত হতে দেখেছি। এই সামাজিক অভিজ্ঞতাগুলো কখনও কোথাও আধুনিক সাহিত্য বা সমাজবিজ্ঞানে আলোচিত হতে দেখিনি। এই অপর্যাপ্ততার বোধ থেকে, নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রজন্মের ইতিহাসের আয়নায় আমি আপনাদের কাছে জাতীয় জীবনে ধর্ম, শিক্ষা ও রাজনীতির এক ঐতিহাসিক রূপান্তরকে পেশ করবার চেষ্টা করছি। এর মধ্যে আধ্যাত্মিক স্মৃতিচারণে বাংলার মুসলমানদের যাপিত জীবনে বহু মত ও পথের ইসলামের আকিদা ও আমলের অভ্যন্তরীণ সংঘাতগুলোর বিবর্তনের সামান্য একটি ঝলক দেখাবার চেষ্টা করবো।

 

 

 

তুমি জান না, তুমি কে

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বৃহত্তর নোয়াখালীর রামগঞ্জ ও রায়পুর থেকে আমার দাদা-নানার বসতবাড়ি ছেড়ে যখন আমাদের আদি বংশের শাখা-প্রশাখা শিক্ষা, চাকুরী ও ব্যবসার প্রয়োজনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে আবাস গড়ে তুলতে থাকে, নতুন প্রজন্মের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা রূপান্তর ঘটে। পরিবারের সন্তানদের ‘মানুষ করা’ বা ‘সুশিক্ষিত’ করবার জন্য, রোজগার করবার জন্য, আধুনিক পেশা ও ক্যারিয়ার তৈরি করবার জন্য, উন্নতি করবার, প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য ভালো ভালো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো শুরু হয়। কিন্তু রয়ে যায় এই প্রশ্ন যে, ধর্ম শিক্ষার কী হবে? কিভাবে তুমি মুমিন মুসলমান হয়ে উঠবে? আল্লাহ্‌র খাঁটি বান্দা হবে? এর মধ্যে আপোষ রফা হিসাবে, কমপক্ষে একটি সন্তানকে মাদ্রাসায় ‘ধর্মীয় লাইনে’ প্রশিক্ষিত করবার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে, আমার বৃহত্তর যৌথ পরিবারে বেশিরভাগ বাচ্চাদের স্কুল-কলেজে পাঠানো হলেও কমপক্ষে একজনকে নির্বাচন করা হতো ইসলামিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলার চর্চা হয়। আমাদের পরিবারগুলোতে কাজিনদের মধ্যে অন্তত একজন করে মাদ্রাসা শিক্ষিত, বা হাফেজ বা মাওলানা হবেন, শরীয়তী ও মারেফতি শিক্ষা গ্রহণ করবেন, এমনটি প্রত্যাশিত ছিল। ফলে, নোয়াখালী থেকে আসা ঢাকা নগরে স্থানান্তরিত পরিবারগুলোর গ্রামের সাথে এক শেকড়ের বন্ধনে জড়িয়ে থাকা সদস্যদের মধ্যে সন্তানদের মানুষ করার জন্য কয়েক ধরনের ‘আপব্রিঙ্গিং’ দেখা দেয়। একই পরিবারের সন্তানেরা যেমন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-অধ্যাপক-ব্যবস্থাপক-আমলা-উদ্যোক্তা ইত্যাদি হচ্ছে, তেমন আবার মাদ্রাসায় গিয়ে হাফিজি লাইনে মুফতি-মৌলভী-মাওলানা-ইসলামিক স্কলার হচ্ছে, আবার একটা অংশ তরিকত-মারেফতের পন্থায়ও পীরের দরবারে আধ্যাত্মিক সাধনার পথ বেছে নিচ্ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলটি অনেক সময় আধুনিক জীবনযাপন তথা ক্যারিয়ারকে ত্যাগ করে ভিন্নভাবে জীবিকা নির্বাহ করে। অনেক সময় এর অর্থ ছিল, ইহজাগতিক ও বৈষয়িক উন্নতিকে ছাড় দিয়ে পরলৌকিক উন্নতিকে বেছে নেয়া, যাকে সম্মানের চোখে দেখা হত।

 

একটি পরিবারেই নানা মত ও পন্থার মুসলমান ছিল। যে যে পথেই যাক না কেন, সবই ছিল মুমিন মুসলমান হওয়ারই নানা মত ও পথ। সকলেই ঈমান ও আকিদাকে ঊর্ধ্বে রেখে পার্থিব জীবনকে পরিচালনা করবার চেষ্টা করতেন। নিশ্চয়ই, প্রতিনিয়তই এর ব্যত্যয় বা বরখেলাফ ঘটতো, কিন্তু সেটাই ছিল আদর্শ, কাঙ্ক্ষিত বা প্রত্যাশিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা ও লক্ষ্য। অন্তত তিন ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে অভিসরণ ও অপসরণে, সংযোজন ও বিয়োজনে আমাদের প্রজন্মে  নিজেদের মধ্যে ধর্মীয়, সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে একটা নিরন্তর তর্ক-বিতর্ক ও বাহাসের মধ্যেই বেড়ে উঠেছি। বহু তর্কেরই কোনদিন কোন মীমাংসা হয়নি। আপন ভাইয়ের মধ্যেই কেউ তবলীগে গেছেন, চিল্লায় গেছেন, কেউ গেছেন পীরের দরগায়, ওরসে যোগ দিয়েছেন, কেউবা আবার নামাজ-কালাম পড়াই বাদ দিয়ে দিয়েছেন। টঙ্গীর ইজতেমায় যোগ দিতে আমাদের বাড়িতে আত্মীয়রা এসে থেকেছেন, আমরা সসম্মানে তাঁদের আতিথেয়তা করেছি, অথচ ইজতেমায় যোগ দেইনি। একে অপরকে আকিদা ও পন্থার সমালোচনা করেছেন, নিজের বিশ্বাসের পক্ষে, জীবনাচরণের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন, কিন্তু কেউ কাউকে মেরে-পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দিতে চান নাই, রক্ত ঝরানোর চিন্তা কল্পনাতেও ছিল না। অমীমাংসিত তর্কের শেষে একটা কথা আমরা হাজারবার শুনেছি, ‘আল্লাহ্‌ তোমাকে হেদায়েত করুন’। এই বলে যে যার দুনিয়াবি কাজকর্মে ঢুকে গেছেন। এভাবে তাঁরা দুনিয়া ও আখেরাত – দো-জাহানের কঠিন দায়-দায়িত্ব যার যার বুঝ-বুদ্ধি অনুসারে পালন করে গেছেন। বে-নামাজি, বেরোজদার ভাইয়ের ব্যবসা দাঁড় করানো, ছেলের চাকরী কিম্বা মেয়ের বিয়ের জন্য নামাজি ভাইটাও চেষ্টার অন্ত রাখেন নাই। গ্রাম-শহরে বাস করা পরিবারের টুকরোগুলোর মধ্যে আসা-যাওয়া, মিল-মহব্বত যেমন ছিল আবার ঝগড়া-বিবাদও কম ছিল না। গ্রামের মধ্যেও দিনশেষে একটা ভাই-বেরেদারি সম্পর্ক বজায় থাকতে দেখেছি, আকিদার পার্থক্যের জন্য, ভিন্ন তরীকা বা ফেরকায় বিশ্বাসের জন্য কেউ কারো জান-মাল-সম্পদের উপর হামলা করবে – এ কথা অবিশ্বাস্য ছিল। তাঁরা ঊর্ধ্বে রাখতেন ইনসানিয়াত তথা মানবিক মূল্যবোধের আদর্শকে।

 

এমনধারা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আবহাওয়ায় কঠোর অনুশীলনকারী মুসলমান পরিবারে বড় হতে গিয়ে আমি গ্রাম থেকে নগরে উঠে আসা মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী মুসলমান সমাজের ভেতরের ধর্মীয় অন্তঃকলহ, অন্তর্ঘাত, আকিদার সংঘাতকে নিবিড় ও ঘনিষ্ঠভাবে জানা-বোঝার সুযোগ পেয়েছি। নদীতে বাস করা মাছের মত জলস্রোতের সাথে বহিঃস্থ শক্তির সম্পর্ককে জানা-বোঝার ক্ষমতা সে সময় আমার ছিল না। যে জিনিসটি সে সময় কখনোই বুঝে উঠতে পারিনি, সেটা হচ্ছে, এই সংঘাতগুলো কীভাবে মোটেই অভ্যন্তরীণ নয় বা কখনোই ছিল না, বরং একটা দীর্ঘ ঔপনিবেশিক রূপান্তরের সাথে, আধুনিক জ্ঞানকাণ্ড ও শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে অভিযোজনের ফলাফল, এবং ইসলামের সাথে পশ্চিমের ঐতিহাসিক মোকাবেলার ফসল। এটা আজকের আধুনিক ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের চরিত্রের সাথে জাতির গঠনসময়কালীন সংঘাত ও সমন্বয়ের ফলাফলকে একটা বিন্দুতে দেখার মত। এই প্রেক্ষিতটাকে বোঝার জন্য আমাকে জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হয়েছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ-সংস্কৃতিকে পদ্ধতিগতভাবে পাঠ করতে শিখতে হয়েছে।

 

যেমনটি বলেছি, আমাদের দীক্ষা-শিক্ষার প্রতি আব্বা বিশেষভাবে খেয়াল রাখতেন, যেখানে তিনি শিশু-কিশোরদের আধ্যাত্মিক বিকাশকে চারা গাছের মত যত্ন নিতেন। আব্বার কাছ থেকে আমি ইসলামের ইতিহাসের জ্ঞান লাভ করি, নবী-রসুলদের কাহিনী, ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক শাসনের সময় ফকির-সুফি-সন্ন্যাসীদের লড়াইয়ের গল্প, ১৮৫৭ সালের সিপাহীদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, মুঘলদের ইতিহাস, ঈসা খাঁর গল্প, শাহ জালাল-শাহ পরান-শাহ্‌ মখদুম-খান জাহান আলী-মাইজভাণ্ডারীদের ইতিহাস এবং অনুশীলন সম্পর্কে জানতে পারি, তিনি বাংলা-ইংরেজি-উর্দু-ফার্সি কবিতার সাথে আমাকে পরিচয় করে দিয়েছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদিনের সময় থেকে আব্বাসীয়, অটোম্যান, মুঘল, এবং সুলতানী শাসকদের সময়কালকে শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে আব্বা খুব মনযোগী ছিলেন। ভারতীয় উপমহাদেশের অলি-আউলিয়া-সুফি-দরবেশের আগমন ও জীবনবৃত্তান্ত এবং ব্রিটিশদের সাথে তাঁদের সশস্ত্র সংগ্রাম এবং আধ্যাত্মিক লড়াইকে জানা-বোঝার উপর গুরুত্ব দিতেন। ফলে একটা সেক্রেড জিওমেট্রি আমার মানসপটে আঁকা হয়ে গিয়েছিল।

 

একটা বিপুল ইসলামী জ্ঞানকাণ্ডের সাথে আমার অপ্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় ঘটে যেখানে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, সঙ্গীত ও নন্দনতত্ত্বের এক মহাসমুদ্রে সামান্য অবগাহনের সুযোগ ঘটে। আমাদের ও জ্যাঠাদের বাড়িতে আলমারি ভর্তি ইসলামী গ্রন্থের একটা সংগ্রহ ছিল, তাঁদের ভাইয়ে ভাইয়ে বিভিন্ন ফয়সালা নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চরম উত্তেজনাকর ধর্মীয় বাহাস চলতো।

 

আব্বা আমাকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিক্ষার জন্য উত্তরায় সত্য সাহার বাড়িতে রমলা সাহার প্রতিষ্ঠিত গীতায়ন সঙ্গীত বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন, যেখানে আমি আমার শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ সতীন্দ্রনাথ হালদারের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের হাতেখড়ি লাভ করি এবং অঞ্জলী রায়ের কাছে নজরুল-রবীন্দ্র-অতুলপ্রসাদ-দ্বিজেন্দ্রগীতি শিক্ষা লাভ করি। আব্বার ইচ্ছা ছিল আমি হামদ-নাত-মুর্শিদি-মারেফতি-ভক্তিগীতি-কাওয়ালী পরিবেশনের জন্য প্রস্তুত হই এবং মাহফিলে পরিবেশন করি। আমাকে তালিম দেয়ার জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশনের একজন পল্লীগীতি শিল্পীকে আব্বা একদিন আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। আমার জন্য হারমোনিয়াম-তবলা কিনে দেন। তিনি হজরত দাউদ (আ.) সুমিষ্ট কণ্ঠের গল্প শোনাতেন এবং সঙ্গীতকে আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের একটা বাহন হিসাবে কল্পনা করতেন। সাথে সাথে দুই ভ্রূ এর মাঝখানে আল্লাহ্‌র নূরকে কল্পনা করে চোখ বন্ধ করে ধ্যানাভ্যাস করাতেন। কীভাবে নিজের রুহের সাথে, খোদার নূরের তৈরি সত্তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়, সেই আধ্যাত্মিক অনুশীলন শেখাতেন।

 

স্কুলে আমি পড়াশুনায় খুবই একাগ্রচিত্ত ও পরিশ্রমী ছিলাম বলে দ্রুত অ্যাকাডেমিক পরীক্ষায় ভালো করতে শুরু করি, তবে কেবল স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে আব্বা আমাকে সীমাবদ্ধ থাকতে দেননি। আমার স্কুল-কলেজের শিক্ষায় আমি যতই ভালো করতে থাকি, আধুনিক বিজ্ঞান, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভেতরে যতই মগ্ন হই, ততই আমি আমার শৈশব-কিশোরের আদি দীক্ষা-শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। সেই ভিন্নতর জ্ঞানমার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকুলার জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়েছিল। স্কুল-কলেজের ভালো ফলাফল আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জন্য স্বাধীন চাকুরী ও জীবিকা লাভের একমাত্র উপায় ছিল, বিশেষ করে মেয়ে হিসাবে এর সাথে কোন আপোষ করাই সম্ভব ছিল না। দুটোকে পাশাপাশি রাখা সম্ভব ছিল কিনা পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। শেষ পর্যন্ত উচ্চতর জ্ঞান লাভের পন্থা হিসাবে একে আর আঁকড়ে ধরে রাখতে পারিনি। বরং, সুফিবাদী  সেই জ্ঞানমার্গকে বাস্তব জীবন-সংগ্রামে, প্রতিষ্ঠিত হবার পথে বরং অন্তরায় মনে করেছি। পূর্বতন ধাঁচের নৈতিক জীবনের অবসান ঘটিয়ে নতুন যৌক্তিক একটি নৈতিক জীবনকে আলিঙ্গন করে নিয়েছি। এতে পুরাতন ‘সেলফ’ বা আত্ম’র সাথে মৌলিক বিচ্ছেদ ঘটিয়ে একটি নতুন আত্ম’র জন্ম হয়, বদলে যায় আত্মপরিচয় এবং আত্মজ্ঞান।

 

এভাবে ধীরে ধীরে গোটা পরিবারই তরিকতপন্থাকে ছেড়ে দিয়ে মডার্ন মিডেল ক্লাস হিসাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে উঠে। এই প্রক্রিয়া আমাকে ধীরে-ধীরে একটা আধুনিক সেকুলার উচ্চশিক্ষিত স্বাবলম্বী উপার্জনক্ষম নারীতে পরিণত করে সত্যি, কিন্তু অন্যদিকে আধ্যাত্মিক জীবনের সাথে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দেয়। এই শিক্ষা ব্যবস্থার ভেতরে পশ্চিমা জ্ঞানের বাইরে সকল রকম ইলম বা জ্ঞানব্যবস্থাকেই নিকৃষ্ট, রহস্যময়, অযৌক্তিক, অবিকশিত কিম্বা কুসংস্কারের বিষয় বলে বাতিল করে দেয়া হয়, অশ্রদ্ধা ও তাচ্ছিল্যের জায়গায় নিয়ে যায়। বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের এক ধরনের সবজান্তা অহং জ্ঞানার্থী এবং জ্ঞাতব্যের সাথে সম্পর্ককে, অন্বেষু এবং অনিষ্ঠের সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ধীরে-ধীরে আমি এবং আমার প্রজন্মের ভাই-বোনের অধিকাংশই তরিকত-মারেফতের পথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বহু দূরে চলে আসি। আমাদের পরিবারের চিশতিয়া সিলসিলা প্রায় হারিয়ে যায়। আমাদের পুরনো পরিচয় মুছে আধুনিক রাষ্ট্রের করদাতা নাগরিক এবং বাজার অর্থনীতির যুক্তিশীল ভোক্তা হয়ে উঠি। আমাদের প্রজন্ম একটি নতুন শুদ্ধ নাগরিক বাংলা ভাষায় কথা বলতে শুরু করে, যেখানে তরিকতপন্থীদের যে আদাব-ভক্তি-তাজিম, যে পরিভাষা, প্রকাশভঙ্গী, পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন, ভাই-ব্রাদারি, লাইফস্টাইল – সবকিছু পরিত্যাগ করা হয়েছে। আব্বাকে আমরা কিছুটা স্নেহের চোখে দেখা শুরু করি, যিনি এই পার্থিব জগতে, এই টাকার কঠিন দুনিয়াতে একজন বেমানান ব্যক্তি; যদিও তিনি নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সারাজীবন স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে সরকারী অফিসার ছিলেন, এবং বৈষয়িক জীবনে সন্তানদেরও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

 

আব্বা বিমর্ষ হয়ে শুধু এই কথাই বলতেন যে, ‘তুমি জান না, তুমি কে, তুমি শিক্ষিত হয়েছো, কিন্তু নিজের ইতিহাস জান না।’ একপর্যায়ে আব্বার মারেফতি চিন্তার সাথে সাথে আমার পশ্চিমা বৈজ্ঞানিক ও সেকুলার মতাদর্শিক বিরোধ এতটাই তীব্র ও তিক্ত হয়ে ওঠে যে, একবার আব্বা ক্রুদ্ধ হয়ে আমার বইপত্রও ছিঁড়ে ফেলেন। আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। বইয়ের উপর আব্বার এত রাগ কেমন করে হল – যে বইকে আব্বাই ভালোবাসতে শিখিয়েছিলেন, কলম ধরতে শিখিয়েছিলেন, হাতের লেখা শিখিয়েছিলেন! আব্বা বুঝতে পারছিলেন যে, আমি সেকুলার শিক্ষার দিকে ঝুঁকে বিজ্ঞানমনস্ক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গীকে আত্মীকৃত করে ফেলছিলাম, মনেপ্রাণে একজন পশ্চিমা সেকুলার উদারবাদী ও প্রগতিপন্থী মানুষ হয়ে গিয়েছিলাম, যা আমাকে তরিকতের সিলসিলা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। আব্বা হয়তো সন্তান হারানোর চাইতেও বেশী দুঃখ পেয়েছিলেন। আব্বা বলেছিলেন, তুমি আমাকে যে দুঃখ দিয়েছ, তা আর কেউ কখনও দিতে পারেনি। আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম, আমাদের সমাজে বাবা-মায়েরা সন্তান সফল হলে যেমন সুখী হয়, কেন তিনি আমাকে নিয়ে সুখী হতে পারেননি। আমার সাফল্য আব্বার ব্যর্থতা হয়ে গিয়েছিল। আমরা তাঁর আওলাদরা পুরোপুরি তরিকত ও মারেফতের পথচ্যুত হয়ে গেলাম।

 

এই গভীর ফাটল আর কোনদিনই জোড়া লাগেনি। কোনদিন এই ক্ষতের নিরাময় হয়নি। চিরস্থায়ী এই বিচ্ছেদের মধ্যেই আমাদের বেঁচে থাকতে হয়েছে।

 

পীর-বিদ্বেষ ও মাজার ভাঙ্গা এবং স্মৃতির পুনঃজাগরণ

চব্বিশের অভ্যুত্থানের কালটি কেবল রাজনৈতিকই নয়, একটি আধ্যাত্মিক পুনঃজাগরণেরও সময়, একটি আত্মিক অনুসন্ধানের সময়। এই ফিরে দেখার তাগিদ হয়তো আমি কখনোই বোধ করতাম না, যদি না চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের প্রথমদিন থেকেই দেশজুড়ে মাজার ভাঙ্গার মচ্ছব না দেখতাম। তৌহিদ বা ‘আল্লাহ্‌র একত্বে বিশ্বাস’ এর নাম ভাঙ্গিয়ে বাংলার মাটি থেকে ইসলামের হাজার বছরের জৈব ইতিহাসকে মুছে দেয়ার চেষ্টা না দেখতাম। যে-সকল সুফি-দরবেশ আরব, ইয়েমেন, তুরস্ক, সিরিয়া, ইরাক, ইরান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দী থেকে শুরু করে বাংলার দুর্গম বদ্বীপ অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপক প্রসার করে হাজার বছর প্রাচীন একটি লাঙ্গল কৃষিভিত্তিক সভ্যতা গড়ে তুলেছেন, তাঁদের অসংখ্য পুণ্যস্মৃতির পবিত্র স্থানসমূহে, আচার-আনুষ্ঠানিকতার জীবন্ত ইতিহাসের উপর, এবং ইসলামী জ্ঞানমার্গের বিপুল সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের উপর নজীরবিহীন সহিংস আক্রমণ আমাদের চোখ খুলতে বাধ্য করে। এক হৃদয়-চক্ষু উন্মোচনের মুহূর্ত এখন।

 

এ-সকল পীর-আউলিয়া, সুফি-দরবেশের মাজার-দরবার-খানকাহকে কখনও রাষ্ট্রের দেয়া নিরাপত্তা নিয়ে চলতে হয়নি, বরং ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্রীয় শক্তিকেই এঁরা নৈতিক, আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিভাবকত্ব ও নিরাপত্তা দিয়েছেন। আমরা যে মুসলমান হিসেবে জন্মের সৌভাগ্য অর্জন করেছি, তা এ-সকল মহামানবদেরই কল্যাণে। পরধর্ম-নিপীড়ক অসহিষ্ণু স্বঘোষিত ‘তৌহিদী’দের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার দেমাগ সম্ভব হয়েছে পীর-আউলিয়াদেরই ইসলাম প্রচারের সাফল্যে। বাংলায় ইসলামের বৈষম্যবিরোধী প্রেমময় ভাবধারার ব্যাপক প্রচারের ফলেই আজ এদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হতে পেরেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তিকে ভারত ছাড়া করবার জন্যে সমাজের গভীর তলদেশ থেকে আসা দর্শন, ধর্মচিন্তা, নৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক পুনর্গঠন, সংস্কার, আন্দোলন, বাহাসে এই মহাপুরুষেরা এক অবশ্যম্ভাবী আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

 

হাল জমানায় ওয়াহাবি-সালাফিপন্থীদের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ক্ষমতার ভাগীদার হওয়া, রাষ্ট্রযন্ত্রের দখল নেয়া, এবং মসজিদ-মাদ্রাসা, ব্যাংক ও বাজার অর্থনীতিকে কুক্ষিগত করবার ভয়ানক কুফল চাক্ষুষ করে আমাদের হারিয়ে যাওয়া জ্ঞানমার্গের প্রত্নতাত্ত্বিক খননের তাগিদ সৃষ্টি হয়। শতাধিক মাজারের উপর উন্মত্ত আক্রমণ এবং এক নতুন ধরনের ইসলামোফ্যাসিবাদী জালেমদের উত্থান বাংলার ইসলামের ইতিহাসের মোড় ঘুরানো একটি কালপর্ব। এই সময়টিকে জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে এবং আমলের দিক থেকে মোকাবেলা জরুরী। পীর-সুফি-আউলিয়া-দরবেশভক্ত মুরিদানের যে বিপুল জনসমাজ, সেই পীর-ভাইবোনের জাগ্রত হবার সময়। শুধু তাই নয়, উপনিবেশ-বিরোধী সংগ্রামের মত রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার জন্যও সংগঠিত হবার কোন বিকল্প নাই। রাষ্ট্র ও রাজনীতির সাথে বাংলার সুফি-সমাজের সম্পর্ককে পুনরায় বোঝাপড়া, সমঝোতা ও  পুনর্গঠনেরও সময় এসেছে।

 

অভ্যুত্থান-উত্তর এই ধ্বংসযজ্ঞকালে রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তাকে না দেখলে এই ফিরে দেখা সম্ভব হত না। তরিকত-মারেফতপন্থী ভাইবোনের ধন-মান-প্রাণ বিপন্ন হতে না দেখলে হয়তো ইসলামের একটিমাত্র ব্যাখ্যাকে জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দেয়ার সুদূরপ্রসারী নকশাকে বিদ্যাজাগতিকভাবে অনুধাবন ও অনুসন্ধানের কথা ভাবাই ওঠা হত না। দেশজুড়ে একের পর এক সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা-ভক্তির পবিত্র স্থানের উপর নির্মম, নৃশংস, সশস্ত্র হামলা, হত্যা, অগ্নিসংযোগের চরম বিভীষিকার কালে আমাদের হারিয়ে ফেলা তাসাউফ চর্চার স্মৃতির এক পুনঃজাগরণ ঘটে। আমি নিজের গোটা জীবনকে, পরিবারের গোটা ইতিহাসকে এই সময় মানসচক্ষে রিপ্লে হতে দেখতে থাকি। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের আঠারো মাসে, নতুন নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে মিরপুরের মাজারে শেষ হামলা পর্যন্ত সময়টি আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনকে পুনঃভাবনার মধ্যে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। যে জীবনকে আমি কেবলই অতীতের স্মৃতি হিসাবে গণ্য করে এসেছি, আমার গোটা সাবালক জীবনে যে জীবনকে আমি ফেলে এসেছি, আর কখনোই সেই জীবনে ফিরে যাবার কোন পরিকল্পনা করিনি, সেই জীবনকে আমি বিস্মৃতকালের ইতিহাসের মধ্যে নতুন করে আবাহন করেছি। আমার বিস্মৃত হয়ে যাওয়া পিতার শিক্ষা মনে পড়ে। আমি হঠাৎ যেন বুঝতে শুরু করি যে – আমি জানি না, আমি কে? সেই জানার পথ ও পন্থা আমি ছেড়ে এসেছি।

 

তথ্যপঞ্জী ও অতিরিক্ত পাঠসূত্র:

চিশতী, আল-হাজ্ব মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চিশতী, জগতে ইসলাম প্রতিষ্ঠাকারীদের পথ, চিশতী নগর, খানকায়ে চিশতীয়া, শরীয়তপুর, ২০১৪

এশিয়া বানী (২৬ ডিসেম্বর, ২০২২ )

https://dailyasiabani.com/details.php?id=30510

Lambek, M. (2013), The continuous and discontinuous person. J R Anthropol Inst, 19: 837-858. https://doi.org/10.1111/1467-9655.12073

Robbins, J. (2013). Beyond the suffering subject: toward an anthropology of the good. The Journal of the Royal Anthropological Institute, 19(3), 447–462. http://www.jstor.org/stable/42001631

Fabian, J. (1986). Language and colonial power: The appropriation of Swahili in the former Belgian Congo, 1880–1938. Cambridge University Press.