বাংলার কৃষক ও সুফি সমাজ: বাংলা সনের চর্চায় ঐতিহ্যের সুলুকসন্ধান

বাংলায় ইসলাম প্রচার ও প্রসারে একক নেতৃত্ব দিয়েছেন সুফি সমাজ। ইসলাম প্রচার-প্রসারে বাংলার সুফি সমাজ উপমহাদেশে সবচেয়ে সফলতা কেন ও কিভাবে অর্জন করলেন তা নিয়ে গত প্রায় দেড়শ বছর ধরে আলাপ আলোচনা চলছে। বাংলায় ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্যের ফলে সামাজিক বর্ণপ্রথা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সুফি সাধকদের সহজাত আচরণ ও সাংস্কৃতিক মিশ্রণ, জঙ্গল কেটে বসবাস উপযোগী করায় মুসলমানদের নেতৃত্ব, সুলতানী ও মুঘল আমলে সরকারি, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি বহুবিধ কারণ গবেষক ও ইতিহাসবিদরা খুঁজে পেয়েছেন। প্রকৃত কারণ যাই হোক না কেন, সুফি সাধকগণ যে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে আপন করে নিতে পারতেন, বিশেষত বাংলার কৃষক সমাজকে তাঁরা কাছে টানতে পেরেছেন ও তাঁদের সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে পেরেছেন। বাংলায় ইসলাম প্রচার-প্রসারে সুফি সাধকদের আশ্চর্যরকম সফলতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে এটি ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

 

সুফি সাধকরা যে বাংলার প্রকৃতি, সমাজ ও বিশেষত কৃষক সমাজকে আপন করে নিতে পেরেছেন তার একটি সূক্ষ্ম কিন্তু উল্লেখযোগ্য নিদর্শন হলো, বাংলা সনের সঙ্গে সুফি সাধকদের নিবিড় সম্পর্ক। এই সম্পর্ক স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় সুফি সাধকদের ওফাত দিবস উপলক্ষে পালিত উরসের তারিখ থেকে। বাংলাদেশের মাজার, দরগাহ, দরবারে যত উরস উদযাপিত হয় বেশিরভাগ উরসের তারিখ বাংলা সন অনুযায়ী নির্দিষ্ট। উরস মূলত কেন হয়, কী উপলক্ষে হয়? যে পীর সাহেবের মাজার, দরগাহ, দরবার তাঁর ইন্তেকাল বা ওফাত দিবসকে কেন্দ্র করে যে আয়োজন হয় তাকেই বলা হয় উরস। তুলনামূলক বড় দরগাহ, দরবারে পীরের সংখ্যা অনুপাতে উরসের সংখ্যাও বাড়তে থাকে। পীরের আধ্যাত্মিক প্রভাব ও খ্যাতি অনুসারে অনেক সময় জন্মবার্ষিকী উপলক্ষেও উরস উদযাপিত হয়, তবে এর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। উরস মূলত পীরের ইন্তেকাল বা ওফাত দিবসের আয়োজনকেই বলা হয়ে থাকে।

অর্থাৎ, পীরের ইন্তেকাল দিবসকে বাংলা সনের তারিখ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট করা ও উদযাপন করা বাংলার সুফি সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী দরবার মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের প্রধান ৩টি উরস— সৈয়দ আহমদউল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর বার্ষিক উরস ৮, ৯, ১০ মাঘ, সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারীর বার্ষিক উরস ২২ চৈত্র ও সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর বার্ষিক উরস ২৬ আশ্বিন। ঢাকার অন্যতম প্রাচীন দরবার মশুরিখোলা দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা হযরত কেবলা‌ শাহ্ আহসান‌উল্লাহ’র বার্ষিক উরস ৩ ফাল্গুন। বাংলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী দরবার ফুরফুরা দরবার শরীফের বার্ষিক উরস ২১, ২২ ও ২৩ ফাল্গুন (দরবার থেকে ‘ইসালে সওয়াব’ হিসেবে চিহ্নিত)।  চট্টগ্রামের বিখ্যাত আমির ভাণ্ডার দরবার শরীফের বার্ষিক উরস ১ মাঘ। চাইলে এভাবে একটি লম্বা তালিকা তৈরি করা যাবে। প্রশ্ন হলো, কেন আরবি ও ঈসায়ী সনে উরস সুনির্দিষ্ট না করে বাংলা সনে সুনির্দিষ্ট করা হয়? কারণগুলো কী কী? আরো গভীরে গিয়ে চিন্তা করলে, দরবার হিসেবে ধর্মীয় দিক থেকে আরবি সন গণনাই অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা, জনপ্রিয়তার দিক থেকে ঈসায়ী সন‌ও অগ্রাধিকার পেতে পারে, তবুও কেন বাংলা সনের অগ্রাধিকার দরবার, দরগাহে?

সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাণ্ডারীর বার্ষিক উরসের একটি পোস্টার

 

প্রথমে জানা দরকার বাংলা সনের উৎপত্তি সম্পর্কে। সুলতানী আমলে কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করা হতো হিজরী অর্থাৎ চন্দ্রবর্ষ অনুসারে। কিন্তু মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে যখন প্রথম বাংলা সামরিকভাবে মুঘলের অধীনে আসে তখন খাজনা আদায় সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়। দেখা যায়, হিজরী বর্ষ অনুসারে খাজনা আদায়ের সময় চলে আসে কিন্তু কৃষকের ফসল ঠিকমতো ঘরে উঠে না। এমন জটিল পরিস্থিতির ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও কৃষক কেউই যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এজন্য সম্রাট আকবর তার সভাসদের সৈয়দ মীর ফতহুল্লাহ শিরাজীকে চন্দ্র ও সৌর বর্ষের সমন্বয়ে, অর্থাৎ হিজরী সনের সঙ্গে ফসলের ঋতুকে মিলিয়ে একটি বর্ষ পঞ্জিকা প্রবর্তনের নির্দেশ দেন। সহজ কথায়, হিজরী চন্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। মীর ফতহুল্লাহ শিরাজী ছিলেন একাধারে সুফি, বিজ্ঞানী, গাণিতিক, দার্শনিক, জ্যোতির্বিদ— এককথায় বহুবিদ্যাবিশারদ। আকবরের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি হিজরী সনকে কেন্দ্রে রেখে, পারস্যে প্রচলিত সৌর বর্ষের অনুকরণে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। সম্রাট আকবর তার মসনদে আরোহনের বছরকে স্মরণীয় করে রাখতে ১৫৫৬ ঈসায়ী মোতাবেক ৯৬৩ হিজরী থেকে বাংলা সন গণনার প্রবর্তন করেন। ৯৬৩ হিজরী সালের মুহররম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে, কৃষকের ফসল উৎপাদন ও খাজনা প্রদানের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি হয়। এই সনের প্রবর্তনের ফলে বাংলার কৃষক সমাজ বহুলাংশে উপকৃত হয়।

এবার তালাশ করা যাক আমাদের মূল প্রশ্নের উত্তর। কেন আরবি ও ঈসায়ী সনে উরস সুনির্দিষ্ট না করে বাংলা সনে সুনির্দিষ্ট করা হয়? প্রথমত, একসময় বাংলার সর্বত্র কম-বেশি প্রচলিত হলেও বাংলা সন সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় কৃষক সমাজে। বাংলা সনের সঙ্গে কৃষক সমাজের সম্পর্ক‌ই সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও নিবিড়। সুফি সাধকদের দরবার, দরগাহে সবচেয়ে বেশি যাতায়াত, উপস্থিতি ছিল কৃষকদের। খানকার কার্যক্রম ও লঙ্গরখানা পরিচালনায় কৃষকরা সশ্রম অংশগ্রহণ করতেন। কৃষকদের সঙ্গে পীর, মুর্শিদের এমন নিবিড় সংযোগের ফলে, দরবার, দরগাহে বাংলা সন গণনার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল।

 

দ্বিতীয়ত, বাংলায় কেবল কৃষক নয়, মুসলমান সমাজের প্রায় সকল স্তরের বা পেশার মানুষের একটা কমন প্রবণতা ছিল। প্রবণতাটা এমন যে, জমির প্রথম ফসল, বাগানের প্রথম ফল, ক্ষেতের প্রথম সবজিটা মাজার, দরগাহ, দরবারে সদকা হিসেবে দিয়ে আসা। অনেক সময় মানত করা হয়, যদি ফসল ভালো হয়, ফলন আশানুরূপ হয় তাহলে প্রথম ফসল/ফল/সবজিটা মাজার, দরগাহ, দরবারে দিয়ে আসা হবে। অনেক সময় ঝড় তুফান, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষা করার জন্য এমন মানত, নিয়ত করা হতো। কেবল মানত, নিয়ত‌ই হয়, বেশিরভাগ পরিবারে গাছের প্রথম ফল, মুরগির প্রথম ডিম মাজার, দরগাহ, দরবারে দিয়ে আমার রেওয়াজ ছিল। যাই হোক, ফসলের প্রথম অংশ, বাগানের/গাছের প্রথম ফল দরবারে গেলে তা লঙ্গরখানা পরিচালনায় ব্যয় হতো বা উপস্থিত ভক্ত মুরিদের মধ্যে সমভাবে বণ্টন হতো। কৃষকদের এই বাৎসরিক সদকা, নজর নেয়াজ‌ও দরগাহ, দরবারে বাংলা সন গণনার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

 

তৃতীয়ত, দরগাহ, দরবারের পীর সাহেবের ভক্ত মুরিদের সংখ্যা কৃষক সমাজেই যেহেতু সবচেয়ে বেশি সেহেতু উরস শরীফে তাঁদের উপস্থিতি সহজ করার জন্য বাংলা সন অনুযায়ী উরস শরীফ সুনির্দিষ্ট করা। একজন কৃষক যিনি সুফি অনুরাগী বা কোনো দরবারের ভক্ত মুরিদ তার কাছে ফসল উৎপাদন ও জীবিকা নির্বাহের তাগিদে যেমন বাংলা সন, মাস সর্বদা স্মরণে থাকে তদ্রূপ তাঁর দরবারের, পীর সাহেবের উরস শরীফের উরস‌ও স্মরণে থাকে। এটাও গুরুত্বপূর্ণ যে, উরস শরীফে যোগদানের সময় ভক্ত মুরিদরা কিছু না কিছু নজর, নেয়াজ‌ নিয়ে যান। বেশিরভাগ নজর, নেয়াজ‌‌ই নিজস্ব উৎপাদিত ফসল, ফলফলাদি; কিছু খরিদ করে নজর, নেয়াজ দেয়ার নজির বাংলার মুসলমানদের মাঝে বিরল। ফলে, উরস শরীফে কৃষক সমাজের উপস্থিতি, তাঁদের নজর নেয়াজ ইত্যাদির জন্য বাংলা সন অনুযায়ী উরসের তারিখ সুনির্দিষ্ট করা জরুরী। সুফি সমাজ এই বিষয়ে সতর্ক ছিল যে, একজন কৃষক যখন উরসে অংশ নিবে, তার জন্য অন্তত পথখরচ ও পরিবারের স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করে আসা অতীব জরুরী। আর একজন কৃষকের জন্য জীবিকা নির্বাহ, টাকা-পয়সা ইত্যাদি হিসাবের প্রধান বাহন বাংলা সন। বাংলা সন ব্যতীত একজন কৃষকের জন্য সাধারণ হিসাব নিকাশ করাও কেবল মুশকিলই নয়, প্রায় অসম্ভব।

চতুর্থত, যার ইন্তেকাল বার্ষিকী উপলক্ষে উরস অনুষ্ঠিত হয় তিনি নিজেই বাংলা সন গণনা করতেন, বাংলা সন অনুযায়ী দিন তারিখ ঠিক করতেন। একজন সুফি সাধকের বাংলা সনের চর্চার পেছনেও ছিল বহুমাত্রিক কারণ। বাংলার মানুষ হিসেবেই, সাধারণ জীবনযাপন করতেন। যে সন তাঁর দরগাহ, দরবারের অধিকাংশ মানুষ চর্চা করছেন তিনিও সেভাবেই করতেন। চাপিয়ে না দিয়ে বরং মেনে নেয়ার অভ্যাস‌ই সুফি সাধকদের সহজাত প্রবৃত্তি। একজন কৃষক, সমাজের চোখে নিম্নস্তরের কোনো পেশায় জড়িত মানুষ বা সদ্য মুসলমান হ‌ওয়া ব্যক্তি যখন দেখে তার পীর সাহেব এত বড় দরগাহ, দরবারের একচ্ছত্র অধিপতি হয়েও তার মতোই বাংলা সন গণনা করেন, বাংলা মাসের তারিখ অনুযায়ী দিন তারিখ নির্ধারণ করেন, তখন ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্যের সঙ্গে সঙ্গে ঐ পীর সাহেবের সাধারণ জীবনযাপনের প্রতি তিনি অধিকতর দুর্বল হয়ে পড়েন, মুগ্ধ হয়ে যান। ঐ পীরকে তিনি আরো নিকটে অনুভব করেন, আত্মীয় হিসেবে চিন্তা করতে শুরু করেন এবং দরবারকে নিজের বাড়ির মতো একান্ত আপন মনে করেন। তিনি পীর সাহেবের কাছে যান, সমস্যার কথা বলেন, আপন মানুষ ভেবে মনের কথা শেয়ার করেন।

পীর সাহেব তার কাছে আর অদৃশ্য অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী কোনো দূরবর্তী ব্যক্তি নয়, বরং তার কাছের মানুষ, আপন মানুষ, যার সাথে সবকিছু শেয়ার করা যায় একান্তে, যিনি তার মতোই বাংলা সন গণনা করেন, তার মতো ফসল তোলার দিনক্ষণ নির্ধারণে চৈত্র মাসের কোনো একটা দিনকেই মিলাদের জন্য ধার্য করেন। এভাবে বাংলা সন চর্চার মধ্য দিয়ে একজন পীর সাহেব বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আপন মানুষ হয়ে উঠেন।

 

বেশিরভাগ উরস শরীফ উপলক্ষে মেলার আয়োজন হয়। মেলা মানেই কেনাকাটা,  লেনদেন, উৎসব, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বড় উপলক্ষ। মেলা যখন বাংলা সন, তারিখ অনুযায়ী আয়োজন করা হয় তখন কৃষকরা ফসল উৎপাদন করে বিক্রি করে টাকা-পয়সা প্রস্তুত রাখতে পারেন মেলায় খরচ করার জন্য বা পুঁজি হিসেবে বিনিয়োগের জন্য। মেলায় বিনিয়োগ করে একটি নিম্নবিত্ত পরিবার সহজেই স্বাবলম্বী হতে পারে। মেলাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এতে বেশিরভাগই উপকৃত হয় বাংলার‌ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। চা, আচার, কাপড়, বাঁশি, সবজি যে যেভাবে পারেন মেলায় বসে পড়েন বিক্রি করার জন্য। মেলায় আগত মানুষ প্রয়োজন অনুসারে ক্রয় করেন, বিক্রেতাদের মুখে হাসি ফুটে। পীর, দরবেশ, আউলিয়ার উরস উপলক্ষে আয়োজিত মেলাকে কেন্দ্র করে কত লক্ষ লক্ষ মানুষ যে স্বাবলম্বী হয়েছেন তার সংখ্যা নিরূপণ অসম্ভব। যেমন: জামালপুরে ইসলাম প্রচারের জন্য যিনি বিখ্যাত, হযরত শাহ জামালের উরস শরীফ উপলক্ষে আয়োজিত মেলা প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু হয়। পহেলা বৈশাখের আনন্দের সঙ্গে পীর সাহেবের উরস মিলেমিশে এক অন্যরকম উৎসবমুখর আবহ তৈরি হয়।

বৈশাখ উপলক্ষে মেলায় যাওয়ার পাশাপাশি পীর সাহেবের মাজার জেয়ারত করা হচ্ছে, নজর নেয়াজ প্রদান করা হচ্ছে এবং বড় বিষয়, স্থানীয়ভাবে ইসলাম প্রচার করা একজন ব্যক্তিকে মহানুভবতার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে। ঐতিহ্য, সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে এই যে আধ্যাত্মিক বোঝাপড়া, এটি বাংলার সুফি সমাজের একক বিশেষত্ব।

 

বাংলার সুফি সমাজ এভাবেই বাংলার প্রকৃতি, সমাজ ও মানুষকে আপন করে নিতে পেরেছেন। বাংলার মানুষ ভাবতে পেরেছে, তিনিও আমাদের একজন। কেরামতের অলৌকিকতা, ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য, হুকুম না মানার শাস্তির আশঙ্কা— কোনোটাই বাংলায় ইসলাম প্রচার ও সুফি সমাজের জনপ্রিয়তার মূলমন্ত্র নয়, বরং মূলমন্ত্র ছিল বাংলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সর্বোতভাবে কাছে টেনে নেয়া, আপন করে নেয়া।

 

আটরশী দরবারের বার্ষিক উরসের একটি পোস্টার

খেয়াল করলেই দেখা যাবে, বাংলাদেশে যত উরস উদযাপিত হয়, প্রচারের অংশ হিসেবে যত পোস্টার ছাপানো হয়, এমন কোনো উরসের পোস্টার পাওয়া বিরল ব্যাপার হবে যেখানে বড় বড় হরফে বাংলা সন লেখা থাকে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাংলা সন, তারিখ মোতাবেক লেখা হয় ঈসায়ী ও হিজরী সন, তারিখ। দরগাহ, দরবারের বহুবিধ কার্যক্রমের নানাবিধ সমালোচনা রয়েছে, কিন্তু বাংলা সন চর্চার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। যেখানে ইসলামের নানামুখী ব্যাখ্যা ও তৎপরতার মাধ্যমে দিনদিনই কঠিন, কঠোর ও জনবিচ্ছিন্ন করে তোলার প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দিকে লক্ষ্য রেখে বাংলা সন গণনার রেওয়াজ অব্যাহত রেখে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সুফি সমাজের নিবিড় সম্পর্ককে নিরবচ্ছিন্ন রাখা অত্যন্ত জরুরী।

এটিকে কেবল একজন পীরের জীবনী ভেবে অগ্রাহ্য করা, ‘আধুনিকায়নের’ খপ্পরে পড়ে নাক ছিটকানোর সুযোগ নেই। বরং এই পীরের জীবনীই বাংলার মুসলমান সমাজের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক দলিল। …
মধ্যযুগের বঙ্গীয় বদ্বীপ নামচিহ্ন সহ যে মানচিত্র ও ভাবার্থ আমি ইশারা করছি, তার গোড়ায় রয়েছেন বিভিন্ন সম্প্রদায়, ভাবের ও ভাষার মানুষজন। তারা কখনো একক পরিচয়, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।…