কিছু কণ্ঠ আছে, যাদের শুনতে হয়। কিছু কণ্ঠ আছে, যাদের অনুভব করতে হয়। আর কিছু কণ্ঠ আছে, যাদের সামনে দাঁড়ালে শ্রোতা নিজের অনুভবের ভাষাটাই নতুন করে আবিষ্কার করেন। নুসরাত ফাতেহ আলি খান তৃতীয়জন। তাঁকে কেবল একজন কাওয়াল, একজন সুফি সংগীতশিল্পী কিংবা অসাধারণ কণ্ঠের অধিকারী গায়ক বললে তাঁর শিল্পের ব্যাপ্তিকে ছোট করে দেখা হয়। তাঁর কণ্ঠের বিশেষত্ব শুধু এই নয় যে, তিনি উঁচুতে উঠতে পারেন, দীর্ঘক্ষণ সুর ধরে রাখতে পারেন কিংবা অবিশ্বাস্য দ্রুততায় তান বিস্তার করতে পারেন। তাঁর প্রকৃত মহত্ত্ব হলো, তিনি সংগীতের কারিগরি উপাদানগুলোকে এমন এক আবেগীয় ভাষায় রূপান্তরিত করতে পারতেন, যেখানে প্রেম, বিরহ, আত্মসমর্পণ, উন্মাদনা ও আধ্যাত্মিক বাসনা পরস্পরের সীমানা হারিয়ে ফেলে। তাঁকে শুনতে বসার অর্থ হলো, মানুষের কণ্ঠ কতদূর পর্যন্ত অনুভূতির বাহন হতে পারে, তার একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাওয়া।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে জন্ম নেয়া নুসরাত এসেছিলেন এমন একটি সংগীত-পরম্পরা থেকে, যার শিকড় দক্ষিণ এশিয়ার সুফি সাধনা, ফারসি-উর্দু কাব্য এবং পারস্য থেকে ভারতীয় উপমহাদেশে বিকশিত আধ্যাত্মিক সংগীতের দীর্ঘ ইতিহাসে প্রোথিত। তাঁর পরিবার ছিল কাওয়ালি পরিবেশনের ঐতিহ্যের ধারক। পিতা ফতেহ আলি খান ছিলেন প্রতিষ্ঠিত কাওয়াল। চাচা মুবারক আলি খান ও সালামত আলি খানও এই সংগীত জগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। ফলে নুসরাতের সংগীত জীবন কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিভার আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়। তবে উত্তরাধিকার প্রতিভার সম্ভাবনা তৈরি করে, মহত্ত্ব নিশ্চিত করে না। সেই উত্তরাধিকারকে নিজের কণ্ঠে পরিণত করার ক্ষমতাই তাঁকে স্বতন্ত্র করেছে।
কাওয়ালি কী, তা বোঝার জন্য প্রথমেই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। কাওয়ালি শুধু সুফি কাব্যে সুর বসানো নয়, আবার শুধু তাল-লয়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একদল গায়কের সম্মিলিত পরিবেশনাও নয়। এটি এমন এক সংগীতরীতি, যেখানে প্রধান কণ্ঠ, সমবেত কণ্ঠ, হাততালি, হারমোনিয়াম, পারকাশন, কাব্যিক পুনরাবৃত্তি এবং শ্রোতার প্রতিক্রিয়া মিলে একটি ক্রমবর্ধমান সংগীত-অভিজ্ঞতা নির্মাণ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এর পরিবেশনা সুফি দরবার ও খানকাহের সামা-অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে সংগীত আধ্যাত্মিক অনুভব জাগানোর একটি মাধ্যম। এখানে কবিতার শব্দ কেবল অর্থ বহন করে না। পুনরাবৃত্তি, সুরের বিস্তার এবং ছন্দের তীব্রতার মধ্য দিয়ে সেই শব্দই হয়ে ওঠে অনুভূতির অনুঘটক।
নুসরাতের শ্রেষ্ঠত্বের একটি জায়গা হলো এই সম্মিলিত সংগীতভাষার মধ্যে ব্যক্তিগত কণ্ঠকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠা করা, যাতে তা কখনো দলগত কাঠামোকে গ্রাস না করে, আবার সেই কাঠামোর ভেতর হারিয়েও না যায়। তাঁর পরিবেশনায় প্রধান কণ্ঠ যেন একটি কেন্দ্র, যার চারদিকে সমবেত কণ্ঠ ও বাদ্যযন্ত্র ক্রমাগত শক্তি সঞ্চার করছে। তিনি একটি পঙ্ক্তি গেয়ে থামেন, কোরাস সেটিকে ফিরিয়ে আনে; তিনি আবার ফিরে আসেন, এবার শব্দের অর্থ অপরিবর্তিত থাকলেও সুরের মূর্ছনা বদলে যায়। একই বিশেষ পঙক্তির পুনরাবৃত্তি একঘেয়েমি তৈরি করে না, কারণ প্রতিবার উচ্চারণের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন অলংকার, ভাব ও তীব্রতা। একই পঙ্ক্তি প্রথমবার নিবেদন, দ্বিতীয়বার আকুতি, তৃতীয়বার অভিযোগ এবং শেষ পর্যন্ত আত্মবিস্মৃতি কিংবা আত্মসমর্পণের ভাষা হয়ে উঠতে পারে।
এই জায়গাই তাঁর সংগীতকে বুঝতে কাজে আসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। প্রথমত, মেলিসমা: একটি মাত্র শব্দাংশের ওপর একাধিক স্বর বিস্তার করা। নুসরাতের কণ্ঠে কোনো দীর্ঘ স্বরধ্বনি কখনো সরল রেখায় এগোয় না; সেটি বাঁক নেয়, ঘুরে আসে, ওপরে ওঠে, নিচে নামে, আবার মূল সুরে ফিরে যায়। দ্বিতীয়ত, তান: দ্রুত স্বরবিস্তার, যার মাধ্যমে গায়ক রাগসংগীতের সঙ্গে সম্পর্কিত সুরের সম্ভাবনাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রসারিত করেন। তৃতীয়ত, মীড় ও গমক: স্বরের মধ্যবর্তী ব্যবধান অতিক্রম করে সুরকে প্রবাহিত করা এবং স্বরের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত কম্পন বা বাঁক সৃষ্টি করা। নুসরাতের গায়নে এই অলংকারগুলো কেবল কণ্ঠের কসরত নয়, এগুলো আবেগের ব্যাকরণ। কোনো স্বরকে তিনি যখন দীর্ঘ করেন, তখন সময় যেন স্থির হয়ে আসে; যখন দ্রুত তানের মধ্য দিয়ে সুর ছুটিয়ে দেন, তখন মনে হয় আবেগ আর নিজের ভার বহন করতে পারছে না।
তাঁর কণ্ঠের প্রকৃতি নিয়েও একটু মনোযোগ দেয়া দরকার। নুসরাতের গায়নে ছিল শক্তিশালী প্রক্ষেপণ, বিস্তৃত স্বরপরিসর, উচ্চস্বরে নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠপ্রয়োগ এবং দীর্ঘ ফ্রেজ ধরে রাখার অসাধারণ সামর্থ্য। তাঁর উচ্চারণে একধরনের ধাতব দীপ্তি শোনা যায়, কিন্তু সেই দীপ্তি কখনো সম্পূর্ণ কঠিন হয়ে ওঠে না; স্বরের মধ্যে থাকে নমনীয়তা, কম্পন এবং আবেগের সূক্ষ্ম পরিবর্তন। তাঁর কণ্ঠকে শুধু ‘উঁচু গলা’ বলে ব্যাখ্যা করা চলে না। উচ্চস্বরে পৌঁছানো এক জিনিস, সেখানে সুরের নিয়ন্ত্রণ, স্বরের স্থায়িত্ব, শব্দের স্পষ্টতা এবং আবেগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। নুসরাতের বিশেষত্ব এই উপাদানগুলোকে একই পরিবেশনায় একত্রিত করতে পারার মধ্যে।
তাঁর সংগীতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো তাৎক্ষণিক সৃষ্টিশীলতা বা ইম্প্রোভাইজেশন। কাওয়ালির পরিবেশনায় একটি নির্দিষ্ট কাঠামো থাকে, কিন্তু সেই কাঠামোর ভেতরে গায়কের স্বাধীনতা বিপুল। নুসরাত একই গান বিভিন্ন পরিবেশনায় ভিন্নভাবে বিস্তার করতে পারতেন। কোথাও তিনি একটি পঙ্ক্তিকে দীর্ঘ আলাপের মতো মেলে ধরেছেন, কোথাও দ্রুত তানের ঝড় তুলেছেন, কোথাও আবার প্রায় কথনের কাছাকাছি এসে আবেগকে সংযত করেছেন। এই স্বাধীনতা অবশ্য সম্পূর্ণ শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে নয়। বরং রাগভিত্তিক সুরচিন্তা, তালবোধ, কাব্যের ছন্দ এবং দলগত সংগীতের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ থাকার ক্ষমতার ওপরই এর সাফল্য নির্ভর করে। দক্ষ ইম্প্রোভাইজেশন হলো নিয়ম ভেঙে ফেলা নয়; নিয়মের ভেতরে এমন সম্ভাবনা আবিষ্কার করা, যা পূর্বনির্ধারিত ছিল না।
নুসরাতের কণ্ঠে এই সৃষ্টিশীলতা সবচেয়ে তীব্র হয়ে ওঠে যখন তিনি প্রেমের কবিতা পরিবেশন করেন। তাঁর গাওয়া ‘তুমহে দিল্লাগি ভুল যানি পড়েগি’, ‘ইয়ে জো হালকা হালকা সুরুর হ্যায়’ কিংবা ‘আফরিন আফরিন’-এর মতো গান শুনলে বোঝা যায়, তিনি কীভাবে রোমান্টিক প্রেমের ভাষাকে প্রায় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করেন। এখানে প্রেমিকের আকুলতা কেবল কোনো নির্দিষ্ট মানুষের প্রতি আকর্ষণ নয়; তা কখনো মাশুকের জন্য কাতরতা, কখনো আত্মসমর্পণ, কখনো প্রিয়ের সামনে নিজের অসহায়ত্বের স্বীকারোক্তি। সুফি কাব্যে মানবপ্রেম ও ঐশী প্রেমের সম্পর্ক বহু শতাব্দী ধরে জটিল ও বহুমাত্রিক আলোচনার বিষয়। নুসরাতের পরিবেশনা সেই দ্ব্যর্থতাকে ব্যাখ্যা করে শেষ করে দেয় না; বরং সংগীতের মাধ্যমে তাকে অনুভবযোগ্য করে তোলে। শ্রোতা চাইলে গানটিকে প্রেমিক-প্রেমিকার সংলাপ হিসেবে শুনতে পারেন, চাইলে তা আত্মার পরম আকাঙ্ক্ষার রূপক হিসেবেও গ্রহণ করতে পারেন। তাঁর শিল্পের সৌন্দর্য হলো, তিনি বা তাঁর গায়কি কোনো একটি ব্যাখ্যাকে বাধ্যতামূলক করে তোলে না।
এখানে তাঁর সংগীতের সঙ্গে সুফি দর্শনের একটি গভীর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়। সুফি ঐতিহ্যে প্রেম প্রায়ই আত্মকেন্দ্রিক সত্তার সীমা অতিক্রম করার একটি ভাষা। আশেক নিজের ইচ্ছা, অহংকার ও আত্মপরিচয়ের নিশ্চয়তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়; মাশুকের অনুপস্থিতিও তখন উপস্থিতির মতোই জীবন্ত হয়ে ওঠে। নুসরাত যখন একটি শব্দকে দীর্ঘ স্বরে টেনে নিয়ে যান, তখন সেই শব্দের অভিধানগত অর্থের চেয়ে তার উচ্চারণের সময়কাল, ভঙ্গি এবং পুনরাবৃত্তি বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ভাষা তখন অর্থ প্রকাশের মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি অর্থের অতিরিক্ত কিছু হয়ে ওঠে। এ কারণেই তাঁর গায়নে এমন শ্রোতাও আবেগাপ্লুত হতে পারেন, যিনি উর্দু/ফার্সি বোঝেন না। অবশ্য ভাষা জানা থাকলে অভিজ্ঞতা আরও গভীর হয়, কারণ তখন কাব্যের রূপক, শব্দচয়ন এবং অন্তর্নিহিত দ্ব্যর্থতাও ধরা পড়ে।
তবে নুসরাতকে কেবল আধ্যাত্মিকতার রহস্যময় আবরণে মুড়ে রাখলে তাঁর শিল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়াল হয়ে যায়। তিনি ছিলেন একজন অসাধারণ সংগীত-কারিগর। তাঁর সংগীতে আবেগ আছে, কিন্তু সেই আবেগের একটি কাঠামোও আছে। কোথায় কণ্ঠকে সংযত রাখতে হবে, কোথায় পুনরাবৃত্তি বাড়াতে হবে, কখন তালের গতি ও সমবেত কণ্ঠের শক্তিকে সামনে আনতে হবে, কখন একটি দীর্ঘ স্বর দিয়ে পুরো পরিবেশনার উত্তেজনা ধরে রাখতে হবে, এসব সিদ্ধান্তের পেছনে সংগীতবোধ ও অভিজ্ঞতার ভূমিকা অপরিসীম। শ্রোতা হয়তো এই কৌশলগুলো সচেতনভাবে শনাক্ত করেন না, কিন্তু তাঁর শরীর ও মন সেগুলোর প্রতিক্রিয়া জানায়। উত্তেজনা বাড়ে, প্রত্যাশা তৈরি হয়, তারপর একটি পরিচিত পঙ্ক্তির প্রত্যাবর্তনে সেই প্রত্যাশা পূর্ণ হয় অথবা আরও দীর্ঘায়িত হয়। সংগীতের এই আবেগমথিত স্থাপত্যই নুসরাতের পরিবেশনাকে এত জীবন্ত ও আকর্ষণীয় করে তোলে।
বিশ্বসংগীতের পরিসরে তাঁর অবস্থানও এই কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ। নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমা শ্রোতাদের বৃহত্তর অংশের কাছে তাঁর পরিচিতি বিস্তৃত হয়। পিটার গ্যাব্রিয়েলের সঙ্গে তাঁর কাজ এবং ‘দ্য লাস্ট টেম্পটেশন অব ক্রাইস্ট’-এর সংগীতজগতের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা এই যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে ‘ডেড ম্যান ওয়াকিং’ সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ও সংগীতপ্রকল্পে তাঁর কণ্ঠ ব্যবহৃত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি দক্ষিণ এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক সংগীতরীতিকে এমনভাবে বিশ্বসংগীতের আলোচনায় নিয়ে এসেছিলেন, যাতে তার স্বাতন্ত্র্য পুরোপুরি বিলীন না হয়।
১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট, মাত্র ৪৮ বছর বয়সে নুসরাত ফাতেহ আলি খান মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জীবনের দৈর্ঘ্য সীমিত ছিল, কিন্তু তাঁর সাংস্কৃতিক জীবন এখনো প্রবহমান। তাঁর গান আজও নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছায়, নতুন সংগীতশিল্পীকে প্রভাবিত করে এবং পুরোনো শ্রোতার কাছে নতুন অর্থ নিয়ে হাজির হয়। এই স্থায়িত্বের কারণ শুধু তাঁর কণ্ঠের অসাধারণত্ব নয়; তাঁর সংগীত এমন কিছু মানবিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত, যেগুলো কোনো একটি যুগ, ভাষা কিংবা সংস্কৃতির একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। প্রেমে অসহায় হওয়া, অনুপস্থিত কাউকে অনুভব করা, নিজের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে চাওয়া, কিংবা কোনো অজ্ঞাত আকাঙ্ক্ষার সামনে আত্মসমর্পণ করা, এসব অভিজ্ঞতা মানুষের ইতিহাসের মতোই পুরোনো।
নুসরাতকে শোনার জন্য কোনো বিশেষ প্রস্তুতি বাধ্যতামূলক নয়। তবে তাঁকে আবিষ্কারের একটি পথ বাতলে দিতে পারি। প্রথমে ‘আফরিন আফরিন’ শুনুন, যাতে তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য, বাক্যবিন্যাস এবং আবেগের নিয়ন্ত্রিত বিস্তার বোঝা যায়। তারপর ‘ইয়ে জো হালকা হালকা সুরুর হ্যায়’-এ মনোযোগ দিন, যেখানে পুনরাবৃত্তি কীভাবে একটি সাধারণ পঙ্ক্তিকে ক্রমশ গভীরতর অনুভূতিতে পরিণত করে, তা লক্ষ করা যায়। এরপর ‘তুমহে দিল্লাগি ভুল যানি পড়েগি’ শুনুন, বিশেষ করে কণ্ঠের ওঠানামা, দীর্ঘ স্বর এবং আবেগের ক্রমবিকাশ অনুসরণ করে। সবশেষে তাঁর কোনো দীর্ঘ লাইভ কাওয়ালি পরিবেশনা শুনুন। স্টুডিও রেকর্ডিংয়ে যে শিল্পীকে নিখুঁতভাবে শোনা যায়, লাইভ পরিবেশনায় তাঁকে অনেক সময় নতুনভাবে আবিষ্কার করা যায়, কারণ সেখানে কণ্ঠ, কোরাস, তবলা, হারমোনিয়াম, হাততালি এবং শ্রোতার প্রতিক্রিয়া মিলে সংগীতের একটি জীবন্ত পরিসর তৈরি করে।
শোনার সময় একটি ছোট পরীক্ষা করা যেতে পারে। প্রথমবার শুধু কণ্ঠের আবেগ অনুসরণ করুন। দ্বিতীয়বার লক্ষ করুন, তিনি কীভাবে একটি শব্দ থেকে আরেকটি শব্দে যাচ্ছেন, কোথায় স্বর দীর্ঘ করছেন, কোথায় তান নিচ্ছেন এবং কোথায় মূল সুরে ফিরে আসছেন। তৃতীয়বার প্রধান কণ্ঠের দিকে মনোযোগ না দিয়ে কোরাস ও পারকাশন শুনুন। দেখবেন, যে সংগীতকে প্রথমে একক প্রতিভার বিস্ফোরণ বলে মনে হয়েছিল, তার পেছনে রয়েছে একটি সুসংবদ্ধ সম্মিলিত শিল্পভাষা। এই তিনবার শোনার পর গানটি আবার শুনলে সেটি আর আগের মতো শোনাবে না।
নুসরাতের কণ্ঠ থেমে যাওয়ার পরও তাঁর গান শেষ হয়ে যায় না। শেষ স্বরটি বাতাসে মিলিয়ে যায়, তবলার আঘাত থামে, কোরাস স্তব্ধ হয়। কিন্তু শ্রোতার ভেতরে যেন কোনো অসমাপ্ত বাক্য থেকে যায়। সংগীতের সবচেয়ে বড় সাফল্য এটাই, সে আমাদের এমন কিছু অনুভব করায়, যা ব্যাখ্যা করতে গেলে ভাষা ছোট হয়ে আসে। নুসরাত ফাতেহ আলি খান সেই বিরল শিল্পীদের একজন, যাঁর কাছে ফিরে আসার জন্য শ্রোতাকে নতুন গান খুঁজতে হয় না। পুরোনো গানটিই যথেষ্ট। তাঁকে একবার শুনুন। তারপর হয়তো বুঝবেন, কেন কোনো কোনো কণ্ঠ শুধু কানে পৌঁছায় না, মানুষের ভেতরে একটি স্থায়ী অনুরণন তৈরি করে।