ভূমিকা:
শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার আফগানিস্তানের বলখ থেকে আগত একাদশ শতকের মহাস্থানগড়ের প্রখ্যাত সুফিসাধক।[1] তাঁর মাজার বর্তমান বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানে, প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের নিকটে অবস্থিত। মীর সুলতান মাহমুদ তাঁর মূল নাম হলেও ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় ও লোকমুখে প্রচলিত ঐতিহ্য অনুসারে, তাঁকে শাহ সুলতান, বলখী ও মাহিসওয়ার নামেও উল্লেখ করা হয়। তিনি বলখ রাজ্যের সুলতান শাহ আলী আসগরের পুত্র ছিলেন, পিতার ইন্তেকালের পর বলখের সিংহাসনে আরোহণ করেন।[2] রাজ্যশাসনে তিনি বিলাসিতা ও ভোগে ডুবে গিয়ে প্রজাদের প্রতি অবহেলা ও জুলুম শুরু করেন। এক ক্রীতদাসীর সাথে আলাপচারিতায় তাঁর আত্মবোধ জাগ্রত হলে তিনি সিংহাসন ত্যাগ করে দামেস্কে যান এবং শায়খ তওফীকের মুরিদ হন। প্রায় ৩৬ বছর সাধনা ও পীরের খিদমতের পর তিনি তৎকালীন বরেন্দ্র ভূমিতে (প্রথমে সন্দ্বীপ, পরে পুন্ড্রবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড়ে) ইসলামধর্ম প্রচারের জন্য প্রেরিত হন।[3] জন্মস্থান বলখের নিসবত তাঁর উপাধি হয় ‘বলখী’। তৎকালীন পুন্ড্রবর্ধনের শেষ রাজা পরশুরাম (নরসিংহ দাস) ও রাজকন্যা শিলাদেবীকে যুদ্ধে পরাজিত করে ধর্মের প্রচার-প্রসার ঘটান।[4] শায়খের নির্দেশে শাহ সুলতান বলখী মাছ আকৃতির নৌকায় বা মাছের পিটে চড়ে বাংলায় আগমন করেছিলেন বিধায়, তাঁর উপাধি হয় ‘মাহিসওয়ার’।[5] তাঁর জীবনকাল, আগমন ও বিভিন্ন ঘটনার সত্যতা বা ঐতিহাসিক গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে উৎসগুলোর মধ্যে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। তাঁর ঐতিহাসিক পরিচয় ও ঘটনাবলীর মতপার্থক্য-অনিশ্চয়তার বিপরীতে মহাস্থানে তাঁর মাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক চর্চা বর্তমানেও বেশ সক্রিয় ও দৃশ্যমান। ভক্তবৃন্দের নিয়মিত জেয়ারত, বার্ষিক ওরস পালন, বৈশাখী মেলা, দান-মানত-নজরানার মতো নানান ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তাঁর চর্চা ও ঐতিহ্য এখনও সেখানকার স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় জীবন ও সাংস্কৃতিক চর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ঔপনিবেশিক ইতিহাসবিদ হেনরি বেভারিজও উল্লেখ করেন যে, মাহিসওয়ারের সমাধি প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ পরিদর্শন করত এবং তাঁর সমাধিটি সংরক্ষিত ছিল। এমনকি সেখানে প্রতি রাতে আলো জ্বালানোর কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এসব প্রেক্ষাপটের দরুন শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ারকে একজন ঐতিহাসিক বা কিংবদন্তির সাধক হিসেবে বিবেচনার পাশাপাশি মহাস্থানগড়ের ভূগোল, সামাজিক স্মৃতি ও স্থানীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবেও বিবেচনা করা যায়।
বর্তমান প্রবন্ধে মাহিসওয়ারের ক্ষেত্রে ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ ধারণাটি মূলত মহাস্থানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক বোঝার একটি তুলনামূলক কাঠামো। এক্ষেত্রে তাঁর ভূখণ্ডগত সম্পর্ক, মাজার আচার-সংস্কৃতি, তাঁকে ঘিরে লোকবিশ্বাস এবং দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক স্মৃতি– এই চারটি দিক বিশেষভাবে বিবেচনা করা হবে। প্রথমত, প্রবন্ধে ভৌগোলিক পরিসর হিসেবে বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার মহাস্থানকে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের অবস্থান হিসেবে মহাস্থানের গুরুত্ব স্রেফ প্রত্নতাত্ত্বিকভাবেই নয়, বরং মাহিসওয়ারের মাজারকে কেন্দ্র করেও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে উঠেছে। মহাস্থান বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। তবে আলোচনায় মহাস্থানের সঙ্গে বলখীর সম্পর্কের পাশাপাশি বৃহত্তর বগুড়া ও বরেন্দ্র অঞ্চলে তাঁর স্মৃতি-ঐতিহ্য-প্রভাবের বিস্তারও প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে বিবেচনা করা হয়েছে। মাহিসওয়ারের ইতিহাস অনুসন্ধানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সমস্যা হলো, নির্ভরযোগ্য সমকালীন ও নিকটবর্তী উৎসের স্বল্পতা। ইতিহাসবিদ আবদুল করিম, এনামুল হক, প্রভাস চন্দ্র সেন-সহ প্রায় সকলেই তাঁর ইতিহাসকে মূলত জনশ্রুতি-ঐতিহ্যনির্ভর ও অনেকাংশে অস্পষ্ট বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে তাঁর জীবনকাল, আগমন, পরিচয় ও বিভিন্ন ঘটনার ঐতিহাসিকতা নির্ধারণে সতর্কতা জরুরি। এই প্রবন্ধে তাই উৎসের প্রকৃতি ও প্রমাণের সত্যতা-নির্ভরযোগ্যতা বিবেচনা করে তথ্যগুলোকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ব্যবহৃত উৎসগুলোকে মোটামুটি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, দলিল ও শিলালিপি। উদাহরণস্বরূপ ১৬৮৫ সালের সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলের সনদ এবং মহাস্থানের মসজিদের ফারসি শিলালিপি। এগুলো মাজার, সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত, প্রত্নতাত্ত্বিক, প্রশাসনিক তথ্য ও হ্যাজিওগ্রাফিক বা জীবনীমূলক সাহিত্য। আওরঙ্গজেবের সনদের পরে ঔপনিবেশিক আমলে মাহিসওয়ার নিয়ে সবচেয়ে পুরাতন নথিগুলোর একটি হলো, হেনরি বেভারিজ (Henry Beveridge)র “The Antiquities of Bagura (Bogra)” প্রবন্ধ, এটি ১৮৭৮ সালে Journal of the Asiatic Society of Bengal-এ প্রকাশিত হয়েছিল।[6] এখানে বেভারিজ মহাস্থান ও মুহাম্মদ শাহ সুলতানের ঐতিহাসিক সম্পর্ক, তাঁর মাজারে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন, মাজারের সংরক্ষণ, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং মাহিসওয়ারকে ঘিরে প্রচলিত বিভিন্ন কাহিনি লিপিবদ্ধ করেন। এছাড়া প্রভাস চন্দ্র সেনের “Mahasthan and Its Environs” বইয়ে[7] ‘সুলতান বলখী’ নামে ফার্সি ভাষায় রচিত একটি গীতিকা বা ব্যাল্যাডের সন্ধান পাওয়া যায়। যেটি আবদুল মজিদ খোন্দকার নামের একজন বাংলায় অনুবাদ করেন। গোলাম মাওলা কর্তৃক হাবিবি প্রেস থেকে সেই গীতিকা প্রথমে ১২৮৮ বঙ্গাব্দে (১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে) এবং পরে ১৩০৩ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল।[8] তৃতীয়ত, স্থানীয় কিংবদন্তি ও লোকচর্চা, মাজার-সংস্কৃতি, ওরস ও মেলা এবং মাহিসওয়ার ও মহাস্থান নিয়ে আধুনিক গবেষণা-নিবন্ধ। উল্লেখ্য যে, রাজা পরশুরামের সঙ্গে মাহিসওয়ারের যুদ্ধ, তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা কিংবা বংশপরিচয়ের মতো আখ্যানগুলোর ঐতিহাসিক সত্যতা প্রমাণ বা খণ্ডন এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। বরং এসব আখ্যান স্থানীয় সমাজে কীভাবে স্মৃতি, পবিত্র স্থান ও ধর্মীয় পরিচয় নির্মাণ করে, সেটিই এখানে মুখ্য উদ্দেশ্য।
১. মহাস্থানগড়ের সঙ্গে মাহিসওয়ার’র ঐতিহাসিক সম্পর্ক
মহাস্থানের সঙ্গে মাহিসওয়ারের সম্পর্ক বিচার করতে হলে প্রথমেই দেখতে হয়, এই ভূখণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কতটা ঐতিহাসিক, কতটা স্থানীয় স্মৃতি ও লোকঐতিহ্যনির্ভর। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, মহাস্থান নামটির উৎপত্তি আদৌ মাহিসওয়ারের সঙ্গে কোনোরূপ সম্পর্কিত কি-না। মহাস্থান বাংলাদেশের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম প্রত্নস্থলগুলোর অন্যতম এবং এটি প্রাচীন পুণ্ড্রনগরের ধ্বংসাবশেষ।[9] এ অঞ্চলের নামানুসারে বাংলাদেশের পূর্ব নাম ছিল– পৌন্ড্রবর্ধন।[10] খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর একটি খণ্ডিত ব্রাহ্মী শিলালিপিতে ‘পুদনগল (পূণ্ড্রনগর)’ নামের সন্ধান পাওয়া যাওয়ায় ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনুমান, নগরটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল মৌর্যআমলে। তৃতীয় খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মৌর্যআমল থেকে পঞ্চদশ খ্রিষ্টাব্দের হিন্দুরাজা পর্যন্ত এই পৌন্ড্রবর্ধনের রাজধানী ছিল ‘মহাস্থানগড়’।[11] অন্যদিকে ‘মহাস্থান’ নামটিরও মাহিসওয়ারের পূর্ববর্তী সময়কালের। ত্রয়োদশ শতকের বল্লালচরিতে, দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের করতোয়া নদীর মাহাত্ম্য বর্ণনায় এবং চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙয়ের বিবরণে[12], ‘মহাস্থান’ নামের উল্লেখ রয়েছে।[13] ফলে নামটির উৎপত্তি মাহিসওয়ারের বাংলায় আগমনের বহু আগের। তবে পরবর্তী সময়ে স্থানটির নামের সঙ্গে সুফি-ঐতিহ্যের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। মাহিসওয়ার কর্তৃক পুণ্ড্রবর্ধন বিজয় হলে স্থানীয় মুসলমানগণ এই নগরকে ‘মস্তানগড় বা মস্তানের গড়’ নামে অভিহিত করে।[14] ১৬৮৫ সালের সম্রাট আওরঙ্গজেবের একটি প্রশাসনিক ফরমানেও ‘মস্তানগড়’ নামটি পাওয়া যায়।[15] মস্তানগড় শব্দের অর্থ ‘পুণ্যাত্মা/দরবেশদের দুর্গ’। আর মহাস্থান বলতে মহাপবিত্র স্থান। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে, এখানে ‘পুণ্যাত্মা/দরবেশ’ বলতে নির্দিষ্টভাবে মাহিসওয়ারকেই বোঝানো হয়েছিল। যদিও উক্ত ফরমানে স্পষ্টত কারো নাম উল্লেখ ছিল না। তুরস্কের আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ভাহিত গোকতাশ ও সৈয়দ রাশেদ হাসান চৌধুরী তাদের এক গবেষণায় দাবি করেন, মাহিসওয়ার ও পরবর্তী সাধকদের মাজারের কারণে স্থানটি পুণ্ড্রবর্ধনের পরিবর্তে ‘মস্তানগর’ বা ‘মহাস্থান’ নামে নামকরণ হয়েছিল।[16]
উৎস সংকটের কারণে মাহিসওয়ারের সঙ্গে মহাস্থানের সম্পর্ক অনেকাংশে স্থানীয় আখ্যান, জনস্মৃতি ও লোককাহিনিনির্ভর। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা ও জনশ্রুতি অনুসারে, বাংলায় আগমনের পর শাহ সুলতান মাহিসওয়ার প্রথমে সন্দ্বীপে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকে বরেন্দ্রভূমি বা উত্তরবঙ্গের দিকে অগ্রসর হন। পথে ঢাকার হরিরামনগরে অবস্থানকালে স্থানীয় রাজা বলরামের সঙ্গে তাঁর সংঘাত বাঁধে।[17] বলরাম ছিলেন কালী দেবীর গোঁড়া উপাসক ও ঘোর মুসলিম বিদ্বেষী। হরিরামনগরে অবস্থানকালে মাহিসওয়ারের শিষ্যত্বে এসে অনেক নিম্নজাতের হিন্দু সম্প্রদায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে বলরাম অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন। ক্ষিপ্ত বলরাম মাহিসওয়ারকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য তাঁর মন্ত্রী ভীম’কে নির্দেশ দেন এবং নব মুসলমানদের উপর অকথ্য জুলুম নির্যাতন চালাতে শুরু করেন। তারই প্রতিক্রিয়াই এ সংঘাত।[18] যুদ্ধে হিন্দুরাজা বলরামের পরাজয় ও মৃত্যুর পর মাহিসওয়ার কিছুদিন সেখানে ইসলাম প্রচার করে বরেন্দ্রভূমির দিকে অগ্রসর হন। হরিরামনগরে থাকাকালীন তিনি যে স্থানে অবস্থান করেছিলেন, সেটি পরবর্তীকালে ‘সুলতানের ধাপ’ নামে নামকরণ হয়।[19] সেখানে একটি বেদীর ওপর দাঁড়িয়ে তিনি ইসলাম প্রচার করতেন। সেই ‘সুলতানের বেদী’ থেকেই স্থানটির নামকরণ হয় ‘ধাপ সুলতানগঞ্জ (সংক্ষেপে ধাপের হাট)’।[20] কাছাকাছি কাহালু থানার দরগারহাটে তাঁর বসার আসন বা বিচরণের কারণে ওই অঞ্চলের নামকরণ হয় ‘সুলতান সাহেবের হাট বা দরগার হাট’।[21] এই সুলতানের ধাপেই মাহিসওয়ার রাজা পরশুরামের নির্যাতনের ঘটনা ও মীর বোরহান উদ্দীনের সাথে ঘটা যাওয়া মর্মান্তিক কাহিনি জানতে পারেন। কথিত আছে[22], বোরহান উদ্দীন ছিলেন স্থানীয় মুসলিম তাঁতী। তিনি বা তার পূর্বপুরুষ আরব থেকে আগত। দীর্ঘসময় তিনি নিঃসন্তান থাকলে একদা একজন পুত্র সন্তান দানের বিনিময়ে একটি গরু কুরবানীর মানত করেন। পুত্রসন্তান লাভের পর মানত পূরণের উদ্দেশ্যে তিনি গোপনে একটি গরু কোরবানি করলে ঘটনাটি প্রকাশ পায়। হিন্দু রাজ্যে গরু বা গো-দেবতা জবাইয়ের শাস্তিস্বরূপ স্থানীয় হিন্দুরাজা পরশুরামের আদেশে তাঁর হাত কেটে দেওয়া হয় এবং তাঁর শিশুপুত্রকেও হত্যা করা হয়। বোরহান উদ্দীন পরবর্তীতে মাহিসওয়ারের কাছে গিয়ে এই নির্যাতনের বিবরণ দিলে তিনি তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে মহাস্থানের দিকে অগ্রসর হন।[23] পরশুরাম নিজেই অত্যন্ত অত্যাচারী ও ধর্মান্ধ শাসক ছিলেন। এ অঞ্চলের মুসলমান ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালাতেন। মাহিসওয়ার মহাস্থানে আগমনের পর নির্যাতিত অনেক হিন্দু ও মুসলমান তাঁর শিষ্যত্ব বরণ করেন। এমনকি যুদ্ধের ময়দানে পরশুরামের সৈন্যবাহিনীর কিছু অংশ পরবর্তীতে মুসলমানদের হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। অবশ্যম্ভাবী পরাজয়ের মুখেও বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বেভারিজের বর্ণনা মতে, যে-সকল প্রজা পরশুরামের নির্দেশে আগের দিন মুসলমান হত্যার তৃপ্তিতে মজেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই প্রজাদের হাতে পরশুরাম নিহত হন।[24] মহাস্থানে পৌঁছে মাহিসওয়ার রাজার কালীমন্দিরের সম্মুখে নামাজ পড়তে চাইলে প্রথমে মন্দিরের দ্বাররক্ষক বা ঝাড়ুদার হরগোপাল/হরপাল তাঁকে বাধা দেন। পরবর্তীতে মাহিসওয়ারের অলৌকিক ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে হরগোপাল ইসলাম গ্রহণ করেন এবং শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।[25] শিষ্যত্ব গ্রহণের পর হরগোপাল রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে কী ঘটছে সে সম্পর্কে নিয়মিতই মাহিসওয়ারকে তথ্য সরবরাহ করতেন।[26] মহাস্থানের মাজার-টিলায় এখনো ‘হরগোপালের সমাধি’ অবস্থিত রয়েছে। এরপর মাহিসওয়ার ও রাজা পরশুরামের মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষের কাহিনি পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকসূত্রে, মহাস্থানে পৌঁছালে পরশুরামের বোন শীলাদেবী তান্ত্রিক সাধনা ও বিভিন্ন অলৌকিক শক্তির মাধ্যমে মাহিসওয়ারকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। তাঁর সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তৎকালীন মহাস্থানে রাজকন্যার নিয়ন্ত্রণে ‘জীয়তকুণ্ড’ নামক একটি যাদুর কূপ ছিল।[27] জনশ্রুতি অনুসারে, ওই কূপের পানির সংস্পর্শে মৃত সৈন্য পুনরায় জীবিত হয়ে উঠত। বেভারিজও মহাস্থানে এই ‘জীবনের কূপ’ বা Jiyat-kung-এর ঐতিহ্য উল্লেখ করেছেন। তাঁর বর্ণনায় বলা হয়, পরশুরাম নিহত হিন্দু সৈন্যদের এই কূপের পানি দিয়ে পুনর্জীবিত করতে পারতেন। মাহিসওয়ার এই রহস্য উদঘাটনের পর কূপটির কার্যকারিতা নষ্ট করে দেন এবং শেষ পর্যন্ত পরশুরামের বাহিনী পরাজিত হয়। যুদ্ধের পর আপন সৈন্যবাহিনীর হাতেই রাজা পরশুরাম নিহত হন এবং ধারণা করা হয়, তাঁর বোন বা কন্যা শীলাদেবী পালিয়ে করতোয়া নদীতে আত্মবিসর্জন দেন। করতোয়ার যে স্থানে তিনি আত্মবিসর্জন দিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, সেটিই পরবর্তীকালে ‘শীলাদেবীর ঘাট’[28] নামে পরিচিত হয়।[29] স্থানটি এখনও স্থানীয় হিন্দু-ধর্মীয় ঐতিহ্য ও বারুণী স্নান (পূণ্যলাভের আশায় প্রতিবছর শত শত হিন্দু তীর্থযাত্রীর স্নান)-সহ বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ শীলাদেবীর ঘাটের স্থাননামটিও মাহিসওয়ার-পরশুরাম সংঘাতের জনস্মৃতি বা ঐতিহাসিক বর্ণনাকে স্থানীয় ভূদৃশ্যের সঙ্গে সংযুক্ত। এ যাত্রায় পরশুরামের সেনাপতি সুরখাব (সোহরাব)-সহ বহু হিন্দু ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন।[30]
পরশুরামের বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের এই দিকটি মাহিসওয়ারের উপস্থিতিকে একটি বিশেষ সামাজিক মাত্রা দেয়। বিশেষত, পরশুরামের নিপীড়নের শিকার বা তাঁর শাসনব্যবস্থার বাইরে থাকা নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের একটি অংশ মাহিসওয়ারের পক্ষে যোগ দিয়েছিল। এটি কেবলমাত্র তাঁর ধর্মপ্রচার ও সামরিক বিজয়ের ফল নয়, বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা, সকল শ্রেণীর মানুষের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও ধর্মীয় রূপান্তরের একটি প্রক্রিয়া হিসেবেও উপস্থাপন করে।
এইভাবে মহাস্থানের সঙ্গে মাহিসওয়ারের সম্পর্ক শুধু তাঁর নামে কোনো প্রাচীন স্থাননামের অস্তিত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং বিস্তৃত স্থানীয় স্মৃতিভূগোল (Broad Local Memory Geography)-র মধ্য দিয়ে তা নির্মিত হয়েছে। ‘মস্তানগড়’, ‘ধাপ সুলতানগঞ্জ’, ‘হরগোপালের সমাধি’ এবং ‘শীলাদেবীর ঘাট’-এর মতো স্থাননাম ও স্থাপনা মাহিসওয়ার, পরশুরাম এবং তাঁদের সংঘাতের কাহিনি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সংযুক্ত।
২. মাহিসওয়ারের মাজার-সংস্কৃতি ও ‘পবিত্র ভূগোল’ ধারণা
মহাস্থান অঞ্চলে শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ারের মাজারের অবস্থান ও তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মীয়-সামাজিক স্মৃতি-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা এই অংশের মূল আলোচ্য বিষয়। প্রাচীরবেষ্টিত প্রাচীন পুণ্ড্রনগর (মহাস্থানগড়) এলাকার দক্ষিণ-পূর্ব কোণের সর্বোচ্চ স্থানে মাজারটি অবস্থিত। ভক্তবৃন্দের মাজার জিয়ারতের সময় ‘বুড়ির দরজা’ (বা বুড়ি কা দরওয়াজা / বুড়ির ফাটক) দিয়ে একটি সিঁড়ি বেয়ে উঁচু টিলায় উঠতে হয়। সেখানে মাজার, মোগল আমলের মসজিদ এবং কয়েকটি কবর রয়েছে। নানা স্থাপনাসহ মাজারস্থলটি মহাস্থানের ধর্মীয় ভূদৃশ্য (Religious Landscape)-র সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেননা, মাজারের আশপাশে প্রাচীন পাল-সেন যুগের ও মধ্যযুগীয় ধর্মীয় স্থাপত্যের নিদর্শন পাওয়ায় স্থানটির পূর্ববর্তী নানা ধর্মীয় গুরুত্বেরও ইঙ্গিত মেলে। মাজার-চত্বরের পাশাপাশি অবস্থিত মসজিদের প্রবেশপথে কালো পাথরের ফারসি ফলক অনুযায়ী, খোদাদিল নামের এক ব্যক্তি সম্রাট ফররুখসিয়ারের আমলে ১১৩০ হিজরি (১৭১৮/১৭১৯ খ্রিষ্টাব্দ) সালে এটি নির্মাণ করেন। মূল মসজিদটি ছিল একটি ছোট একগম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকার স্থাপনা।
মাজারের সাথে মোগল শাসকদের সম্পর্কের ও পৃষ্ঠপোষকতার আরেকটি নিদর্শন হলো, ১৬৮৫ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে জারি করা সনদ। যাতে সৈয়দ মুহাম্মদ তাহির, সৈয়দ আবদুর রহমান ও সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাকে মাজারের লাখেরাজ (খাজনামুক্ত) জমির অধিকার নিশ্চিত করা হয়।[31] তবে পরবর্তীতে শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ারের মাজারের জন্য দানকৃত প্রায় ৬৩০ একর পীরপাল জমি ১৮৩৬ সালে ব্রিটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। পরে তা মোকাদ্দমায় গড়ালে পূর্ববর্তী সনদের প্রাচীনত্ব প্রমাণিত হওয়ায় ১৮৪৪ সালে পির পালের স্বত্ব মেনে মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছিল।[32]
লোকমুখে চাওড় আছে, মাহিসওয়ারের মাজারের প্রবেশমুখে ‘বুড়ির দরজা’টি আওরঙ্গজেবের আমলে নির্মিত।
মাহিসওয়ারের মাজারটি এখনও ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক-আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। সরেজমিনে প্রাপ্ত বর্ণনা অনুসারে, এখনো প্রতিদিন শতশত নারী-পুরুষ মাজারে জিয়ারত করেন, সাধু-ফকিরদের সঙ্গে সাধারণ দর্শনার্থীদের মেলামেশা বা সোহবত, নফল নামাজ ও দোয়া-দরুদ পড়েন এবং মনোবাঞ্ছা পূরণের আশায় দান করেন। মাজার সংলগ্ন মহাস্থানের ‘খোদার পাথর’ নামে পরিচিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক পাথরখণ্ডের সন্ধান পাওয়া যায়।[33] মানত পূরণের আশায় এর ওপর দুধ, ফুল ও অন্যান্য ফলমূলাদি অর্পন করা হয়। জনশ্রুতি ও লোকবিশ্বাস অনুসারে, মাজারের ভক্তবৃন্দসহ হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ সেখানে মানত করেন। সাপ্তাহিক জুমার দিনে মুসল্লি ও ভক্তবৃন্দের সংখ্যা সংখ্যা ছাড়িয়ে যায়। অনেকে সন্তানের মুখে ভাত দেয়ার মতো পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য রান্না করা খাবার নিয়ে আসেন এবং তা দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করেন। মাহিসওয়ারের মাজার-সংস্কৃতি সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, ওরস হিজরি তারিখের পরিবর্তে বাংলা বৈশাখ মাসের শেষ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয় এবং এই ওরসকে কেন্দ্র করে মহাস্থান এলাকায় বৃহৎ জনসমাগম ও বৈশাখী মেলার আয়োজন হয়। বৈশাখের মেলায় খোলা আকাশের নিচে হাজারো সাধক-ভক্ত-মুরিদ-ফকিররা দিনভর গান-বাজনা ও ধ্যান-সাধনায় অংশ নেন। আধ্যাত্মিক ধ্যান-সাধনা বা ওয়াজ-নছিহতের পাশাপাশি এ মেলা স্থানীয় বাণিজ্য ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে তার সংযোগ তৈরি করে। এতে সাধু-সন্ন্যাসী, বাউল ও সাধারণ পুণ্যার্থীদের উপস্থিতিও দেখা যায়। খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের পৃষ্ঠপোষক সাধু (Patron Saint)-র স্মরণ-দিবস বা feast day-এর সঙ্গে ওরসের একটি কার্যগত তুলনা করা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই কোনো একজন সাধক পুরুষের ওরস বা স্মরণ-কে ঘিরে বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে জমায়েত ও হরেকরকম স্থানীয় সামাজিক কার্যক্রম গড়ে উঠতে পারে। উল্লেখ্য যে, উভয়ের ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো অভিন্ন নয়।
৩. সুরক্ষামূলক বা মধ্যস্থতামূলক লোকবিশ্বাস
শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ারের ক্ষেত্রে লোকআখ্যান ও বর্তমান মাজার-সংস্কৃতিতে সুরক্ষা ও মধ্যস্থতার দুটি দিক দেখা যায়। প্রথমত, পূর্বে বর্ণিত মীর বোরহান উদ্দীনের গরু জবাইকে কেন্দ্র করে মাহিসওয়ার ও পরশুরামের সংঘাতের যে ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে বর্ণিত ও জনমুখে প্রচলিত, তা মূলত মহাস্থান-সহ সমগ্র ভারত-বাংলার অধ্যাত্মবাদী মহলের নিকট ক্ষমতাবান শাসকের বিপরীতে নিপীড়িত মুসলমানের ত্রাণকর্তার আগমনের প্রতীকী স্বরূপ। এখানে বেভারিজের বিবরণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বেভারিজ বলেন, মাহিসওয়ার কোনো সামরিক বিজেতা, গাজী/যোদ্ধা ছিলেন না। বরং পরশুরামের শাসনে অসন্তুষ্ট স্থানীয় মানুষের জনসমর্থন, নিপীড়িত শ্রেণির ইসলাম গ্রহণ এবং মাহিসওয়ারের নেতৃত্বে তাদের মুক্তির অন্বেষণের মধ্য দিয়ে এটি মহাস্থানগড়ের জনসাধারণের সামাজিক স্মৃতির অংশ হয়ে উঠে।[34] ফলে ‘একজন মুসলিম সাধকের হাতে হিন্দু রাজার পরাজয়’ এই সরল দ্বৈততার বাইরে স্থানীয় জনগোষ্ঠী, নেতৃত্ব, ধর্মান্তর ও সামাজিক পরিবর্তনের একটি অপেক্ষাকৃত জটিল সামাজিক স্মৃতি সৃজিত হয়। দ্বিতীয়ত, বাংলার অন্যান্য মাজারের মতো এখানকার মাজার-সংস্কৃতিতেও মধ্যস্থতামূলক বিশ্বাসের উপস্থিতি দেখা যায়। নানা জাত-পাত-ধর্ম-বর্ণের মানুষ তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যা নিয়ে, মনোবাঞ্ছা ও মানতের উদ্দেশ্যে মাজারে আসে এবং দান করে। এছাড়া যেহেতু মাহিসওয়ারে মাছের পিটে চড়ে বাংলায় আগমন করেছিলেন বলে ভক্তবৃন্দরা বিশ্বাস করেন, ফলে তাঁকে জেলে, মাঝি বা নৌযাত্রীর রক্ষাকর্তা হিসেবেও বিশেষ ভক্তি করা হয়। এই বিশ্বাসও তাঁর লোকায়ত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
জীবনীমূলক সাহিত্যে হোক বা লোকবিশ্বাস, উভয় স্তরে মাহিসওয়ারকে অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন সাধক এবং অত্যাচারী শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ী হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব আখ্যানের বাইরেও মাহিসওয়ারকে ঘিরে স্থানীয় সামাজিক চর্চা ও জনবিশ্বাসে তাঁর একটি স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে।
তবে এসব বিশ্বাসের উৎপত্তি, বিকাশ ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে এখনো পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক ও নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়ে ওঠেনি।
৪. পটপরিবর্তনের মধ্যে টিকে থাকা সামাজিক স্মৃতি
এই অংশের মূল প্রশ্ন হলো, রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেও শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ারকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্মৃতি ও মাজার-দরগা কতটা টিকে রয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ১৬৮৫ সালের আগে মাজারটির অস্তিত্বের সুনির্দিষ্ট দলিলাদি আবিষ্কৃত হয় নি। সেই সময়কার যেসব ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে, তা মূলত ঐতিহ্য ও লোকস্মৃতিনির্ভর। প্রথম নির্ভরযোগ্য দলিল পাওয়া যায় ১৬৮৫ সালে, আওরঙ্গজেবের আমলে। সৈয়দ মুহাম্মদ তাহির, সৈয়দ আবদুর রহমান ও সৈয়দ মুহাম্মদ রেজার নামে কুকুলতাশ মুজাফফর জঙের সিলমোহর অঙ্কিত একটি সনদ জারি করা হয়। এই সনদের মাধ্যমে তাঁরা দরগাহ-সংলগ্ন লাখেরাজ জমির ভোগ-দখলের অধিকার লাভ করেন। এছাড়া সে সময়ের আরেকটি প্রশাসনিক নথিতে ‘মস্তানগড়’ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়, যদিও দুটি নথির মধ্যকার কোনো পারস্পরিক সম্পর্ক নেই। পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো– ১১৩০ হিজরি বা ১৭১৮–১৯ সালের মসজিদ-নির্মাণের শিলালিপি। ফররুখসিয়ারের আমলে খোদাদিলের নির্মিত মসজিদ প্রমাণ করে যে, অষ্টাদশ শতকের শুরুতেও স্থানটি মুসলমানদের একটি সক্রিয় ধর্মীয়-সামাজিক-সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল। এছাড়া তাঁর মাজারের আশপাশের আরো একাধিক পীর-আউলিয়ার সমাধির সহাবস্থানের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে মহাস্থানে শনাক্ত মুসলিম পর্যায়ের সব স্থাপনাগুলোর সাথে মাহিসওয়ারের দূরদূরান্ত কোনো সম্পর্ক নেই। পরবর্তীতে ঔপনিবেশিক সময়ে মহাস্থান প্রধানত প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে ওঠে। ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিলটন (১৮০৮), সি. জে. ও’ডনেল, ওয়েস্টম্যাকট, বেভারিজ এবং পরে আলেকজান্ডার কানিংহাম (১৮৭৯)-র মতো জরিপকারী ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা স্থানটি নিয়ে কাজ করেন। তবে তাঁদের প্রতিবেদন ও বিবরণে মাজারের সামাজিক স্মৃতি উল্লেখযোগ্য কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় নি। অন্যদিকে আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণা ধীরে ধীরে মহাস্থানকে একটি বহুস্তরীয় ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে পুনর্গঠন করেছে। বিংশ শতকের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে মাজারের অস্তিত্ব স্পষ্টত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়।
১৯২৮-২৯ সালে ভারতীয় কে. এন. দীক্ষিতের নেতৃত্বে পুণরায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হলে ষাটের দশকে মাজার-এলাকাও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের আওতায় আসে। যেমন, বিংশ শতকের শেষের দিকে (১৯৯৩- ১৯৯৯ খ্রি.) বাংলাদেশ-ফ্রান্স যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত খননের প্রথম ইন্টেরিম প্রতিবেদনে মাহিসওয়ারের জীবনী ও মাজারে ইতিহাস বিবেচনায় নিয়েই তৎকালীন সমাজকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।[35]
খন্ডিত খন্ডিত ন্যূনতম কিছু তথ্যের ভিত্তিতে ‘পটপরিবর্তনের মধ্যে টিকে থাকা সামাজিক স্মৃতি’ অংশের বর্ণনা করা নিতান্তই অসম্ভব।
মহাস্থানের সামাজিক স্মৃতি কখনোই একরৈখিক নয়। মুসলিম ঐতিহ্যে পৌন্ড্রবর্ধনের শেষ রাজা পরশুরামের মাহিসওয়ারের নিকট পরাজিত হওয়া, হিন্দু ঐতিহ্যে শীলাদেবীর ঘাট একটি তীর্থস্থান; আর প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে মহাস্থান একটি বহুস্তরীয় প্রাচীন নগর। ফলে একই ভূখণ্ডে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্মৃতি ও বর্ণনার উপস্থিতি সত্ত্বেও আজো তা পাশাপাশি টিকে রয়েছে। এখানে কালেকটিভ মেমোরির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই এসব স্মৃতি ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যেও তাদের টিকে থাকা। ফলে মাহিসওয়ারের স্মৃতি শুধু মুসলিম ঐতিহ্যের একটি বিচ্ছিন্ন স্মৃতি নয়, বরং বৃহত্তর মহাস্থান-পরিসরের বহুস্তরীয় স্মৃতি-সংস্কৃতির একটি অংশ। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন আচরণ, মানত, মাজার-জিয়ারত, মেলা এবং আখ্যানের মাধ্যমে এসব স্মৃতি পুনরাবৃত্ত ও পুনর্গঠিত হয়। এই ধারাবাহিকতায় মাহিসওয়ারের মাজার ও ঐতিহ্যটি আধুনিক সময়েও একটি জীবন্ত ধর্মীয় স্থান হিসেবে রয়ে গেছে। অন্যদিকে বর্তমানেও তাঁর স্মৃতি প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক নানা মাধ্যমে পুনরুৎপাদিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, বগুড়া অঞ্চলের বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-মাদরাসা তাঁর নামে নামকরণ করা হয়েছে এবং নানা ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, স্থাপনাও তাঁর নামে উৎসর্গিত। এটিও মাহিসওয়ারের স্মৃতির সামাজিক বিস্তারের উল্লেখযোগ্য দিক। সুতরাং, মাহিসওয়ারের ক্ষেত্রে ‘পটপরিবর্তনের মধ্যে টিকে থাকা সামাজিক স্মৃতি’ বলতে কোনো একটানা, অপরিবর্তিত ঐতিহ্যকে বর্ণনা বা প্রমাণ করা না গেলেও বরং বিভিন্ন দলিল, লোকআখ্যান, প্রত্নতত্ত্ব, মাজার-সংস্কৃতি, মানত, মেলা, আন্তঃসম্প্রদায়িক অংশগ্রহণ এবং আধুনিক ঐতিহ্য-সংরক্ষণ– এসবের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে একটি পরিবর্তনশীল স্মৃতির ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। মহাস্থানের মাহাত্ম্যও এই অর্থে একক ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি বহু সময়ে, বহু স্থানে এবং বহু আখ্যানের মধ্য দিয়ে গঠিত, পুনর্গঠিত ও ব্যবহৃত হয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন ও সীমাবদ্ধতা
উপরের আলোচনা থেকে দেখা যায়, শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার ও মহাস্থানগড়ের সম্পর্ককে শুধু সুফি-সাধকের মাজার বা ধর্মীয় স্থানের ইতিহাস হিসেবে দেখলে বিষয়টির পূর্ণতা ধরা পড়ে না। এই সম্পর্কের মধ্যে ইতিহাস, লোকস্মৃতি, পবিত্র ভূগোল, মাজার-সংস্কৃতি, স্থানীয় আচার এবং সামাজিক পরিচয়ের বিভিন্ন স্তর একসঙ্গে কাজ করেছে। মাহিসওয়ারের জীবনের সব ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও মহাস্থানের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে দীর্ঘকাল ধরে একটি শক্তিশালী সামাজিক ও ধর্মীয় স্মৃতির অংশ হয়ে আছে, তার বেশ কিছু দৃশ্যমান প্রমাণ রয়েছে। মাজারের সামাজিক পরিসর, ওরস, বৈশাখীমেলা, মানত, জিয়ারত, দান এবং তাঁকে ঘিরে জনমুখে প্রচলিত বিভিন্ন আখ্যানই এই স্মৃতিকে বর্তমান সময়েও সক্রিয় রেখেছে। এই অর্থে মাহিসওয়ারকে মহাস্থানের একজন ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষক সাধক হিসেবে বোঝার ক্ষেত্রে ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ ধারণাটি একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে কার্যকর হতে পারে। তাঁর স্মরণকে কেন্দ্র করে যে সামাজিক সমাবেশ, ধর্মীয় আচার, মানত, মেলা এবং স্থানীয় সংস্কৃতির চর্চা গড়ে উঠেছে, তার সঙ্গে খ্রিস্টীয় ঐতিহ্যের প্যাট্রন সেইন্টদের স্মরণকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিছু সামাজিক কার্যক্রমের তুলনা করা যায়। মাহিসওয়ারের ক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাঁর সঙ্গে মহাস্থানের সম্পর্কের প্রকৃতি। ‘মহাস্থান’ নামটির ব্যবহার তাঁর আগমন-পূর্বের হলেও পরবর্তী সময়ে মাহিসওয়ারের স্মৃতি এই প্রাচীন ভূখণ্ডের ওপর একটি নতুন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অর্থ আরোপ করেছে। ‘মস্তানগড়’, ‘ধাপ সুলতানগঞ্জ’, ‘হরগোপালের সমাধি’ ও ‘শীলাদেবীর ঘাট’-এর মতো স্থাননাম এবং স্থানীয় আখ্যান এই স্মৃতিভূগোলের বিভিন্ন স্তরকে দৃশ্যমান করে। মাজারের ইতিহাসও এই সম্পর্কের স্থায়িত্ব বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ১৬৮৫ সালের আওরঙ্গজেবের ফরমান এবং ১৭১৮–১৯ সালের মসজিদের শিলালিপি দেখায় যে, অন্তত মুঘল আমলে মাহিসওয়ারের দরগাহ ও সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একটি প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান লাভ করেছিল। ফরমানটিতে মাহিসওয়ারের দরগাহের খাদেমদের জন্য লাখেরাজ জমি ও সম্পত্তি ব্যবহারের অধিকার এবং দরগাহ, খানকাহ ও আগত মানুষের জন্য ব্যয়ের কথা উল্লেখ আছে। একইসঙ্গে মাহিসওয়ারের ইতিহাস ও আচারকে কখনো একরৈখিক মুসলিম ঐতিহ্য হিসেবে দেখাও যথাযথ হবে না। মহাস্থান এমন একটি ঐতিহাসিক ভূখণ্ড যেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং লোকঐতিহ্যের বিভিন্ন স্মৃতি পাশাপাশি অবস্থান করছে।
মাহিসওয়ারের সঙ্গে পরশুরামের সংঘাত মুসলিম ঐতিহ্যে বহুল চর্চিত আখ্যান হলেও শীলাদেবীর ঘাট এখনো হিন্দু ধর্মীয় আচার ও তীর্থচর্চার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে মহাস্থান তার আরও প্রাচীন নগরসভ্যতার পরিচয় বহন করে। ফলে মাহিসওয়ারের স্মৃতিকে বৃহত্তর মহাস্থানের বহুস্তরীয় স্মৃতি-সংস্কৃতির একটি অংশ হিসেবে দেখাই বেশি ফলপ্রসূ।
তবে এই আলোচনার প্রথম এবং প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, সমকালীন ও নিকটবর্তী ঐতিহাসিক উৎসের স্বল্পতা। মাহিসওয়ারের জীবনকাল, বাংলায় আগমন, বংশপরিচয় এবং পরশুরামের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক দলিল খুব সীমিত। ১৬৮৫ সালের আগে মাজারটির অস্তিত্বেরও সুনির্দিষ্ট দলিল এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে একাদশ শতকের মাহিসওয়ার এবং পরবর্তী শতকের মাজার-ঐতিহ্যের মধ্যে একটি সরাসরি ও নিরবচ্ছিন্ন ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। দ্বিতীয় সীমাবদ্ধতা হলো, মাহিসওয়ারের জীবনী সম্পর্কিত বহু তথ্য তাজকিরা, লোককাহিনি ও পরবর্তী হ্যাজিওগ্রাফিক সাহিত্যের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর রাজা হওয়া, সিংহাসন ত্যাগ, শায়খ তওফীকের কাছে দীর্ঘ সাধনা, মাছের পিঠে বা মাছ-আকৃতির নৌকায় বাংলায় আগমন এবং পরশুরামের সঙ্গে যুদ্ধের মতো আখ্যানগুলো স্থানীয় ধর্মীয় স্মৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এগুলোর প্রত্যেকটিকে একই মাত্রার প্রমাণিত ইতিহাস হিসেবে ব্যবহার করা যায় না। প্রবন্ধটির আলোচনাও মূলত এসব আখ্যানের সত্যতা নির্ধারণের পরিবর্তে এগুলো কীভাবে স্থানীয় স্মৃতি ও ধর্মীয় পরিচয় নির্মাণ করেছে, সেই প্রশ্নকে গুরুত্ব দিয়েছে। তৃতীয়ত, বর্তমান মাজার-সংস্কৃতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত নৃবৈজ্ঞানিক ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণার অভাব রয়েছে। কারা নিয়মিত মাজারে আসেন, তাঁদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিচয় কী, মানত বা দানের পেছনে কী ধরনের বিশ্বাস কাজ করে, হিন্দু ও মুসলমান ভক্তদের অংশগ্রহণের প্রকৃতি কী এবং সময়ের সঙ্গে এসব আচার কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, এসব প্রশ্নের বিস্তারিত মাঠভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন। প্রবন্ধে এসব চর্চার উপস্থিতি ও কিছু বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা গেলেও তাদের সামাজিক প্রভাবের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়নি। সবশেষে, ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ ধারণাটির ব্যবহার নিজেই একটি তুলনামূলক সীমাবদ্ধতা বহন করে। ধারণাটি মূলত খ্রিস্টীয় ধর্মীয় ইতিহাস ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো থেকে এসেছে। তাই মাহিসওয়ার সরাসরি খ্রিস্টীয় অর্থে ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ নয়। বরং এই পরিভাষাটি এখানে তুলনামূলক বিশ্লেষণী ধারণা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। যার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট সুফি-সাধকের সঙ্গে একটি ভূখণ্ড ও জনপরিসরের দীর্ঘস্থায়ী ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের খতিয়ান করা যায়।
***
লাখেরাজ ভূমি: সম্রাট আওরঙ্গজেবের ফরমান (১০৯৬ হিজরি/ ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দ)[36]
میر سید سلطان محمود ماهي سوار
مقرر شد که متصدیان مهمات حال و استقبال و چودهریان و قانون گویان پرگنه سیلبرس سرکار بازوها بدانند چون بعرض رسید که بموجب فرمان والاشان و اسناد حکام سابق خادمئ آستانۀ مقدسۀ سلطان العارفین حضرت …. وخارج جمع مستان گره و زمین در پیچ ندی مشموله پرگنه مذکور بسید محمد طاهر و سید عبد الرحمان و سید محمد رضا با فرزندان بالا مشارکت غیرے مقرر است می باید که مشار الیهم را خادم روضۀ منوره دانسته مستان گره و اراضي مسطور را بمومى اليهم وا گذارند که در ورثۀ خود ها رسیده نزر و نیاز آستانۀ مقدسه و واصلات آذرا خرچ خانقاه واردان و صادران و صرف معشیت خود ها نمودۀ بدعاگوئئ دوام دولت اشتغال میداشته باشند درین باب قدغن دانند • تحرير بتاريخ ۷ شهر جمادي • الاول سنه ۳۰ جلوس مطابق سنه ۱۰۹۶ هجري قلمي شد فقط .
پادشاه
عالم گیر غازي
کو کلتاس
مظفر جنگ بهادر
মীর সৈয়দ সুলতান মাহমুদ মাহিসওয়ার
সিলেট পরগনার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রাজস্ব-সংক্রান্ত কর্মচারী, চৌধুরী এবং কানুনগোদের জানানো যাচ্ছে যে, দরবারে এই মর্মে আবেদন করা হয়েছে, সম্রাটের জারি করা পূর্ববর্তী ফরমান এবং সাবেক শাসকদের দলিল অনুযায়ী, সুলতানুল আরেফিন হযরত সৈয়দ সুলতান মাহিসওয়ার-এর পবিত্র দরগাহের খাদেমদের জন্য সিলেট পরগনার অন্তর্ভুক্ত মস্তানগড় ও সংশ্লিষ্ট জমি সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের, সৈয়দ আবদুর রহমান এবং সৈয়দ মুহাম্মদ রেজা ও তাঁদের সন্তানদের যৌথভাবে নির্ধারিত হয়েছে। অতএব, উল্লিখিত ব্যক্তিগণ পবিত্র দরগাহের খাদেম হিসেবে গণ্য হবে এবং মস্তানগড় ও উল্লেখিত জমি তাঁদের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। তাঁরা যেন এসব সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে ভোগ করেন এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত আয় পবিত্র দরগাহে নজর-নিয়াজ প্রদান, খানকাহে আগত ও প্রস্থানকারী লোকদের ব্যয়ভার, নিজেদের জীবিকা নির্বাহ ইত্যাদিতে ব্যয় করেন। একই সঙ্গে তাঁরা যেন সম্রাটের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের জন্য দোয়া করার কাজে নিয়োজিত থাকেন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যথাযথ নির্দেশ হিসেবে গণ্য করে কার্যকর করতে হবে।
তারিখ: ৭ জমাদিউল আউয়াল, সম্রাটের রাজত্বের ৩০তম বছর, হিজরি ১০৯৬।
সম্রাট: আলমগীর গাজী
স্বাক্ষর: কুকুলতাশ মুজাফ্ফর জং বাহাদুর