বাংলা সাহিত্যের অন্যতম বৃহৎ নবী-জীবনী সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ: নির্বাচিত পাঠ

প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে বাংলা সাহিত্যকে যিনি অধিক গণমুখী ও পণ্ডিতদের ব্যবহার উপযোগী করে তোলার কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন তিনি কবি সৈয়দ সুলতান। কবির প্রকৃত জীবনকাল ও সন নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও তিনি যে ষোলো শতকের ব্যক্তিত্ব এ নিয়ে তেমন মতভেদ নেই। সন্দেহ নেই, কবির সর্বোচ্চ জনপ্রিয় রচনা ‘নবীবংশ’। নবীবংশ রচনার সন-তারিখ নিয়ে পণ্ডিতদের মতপার্থক্যের চিত্রটি গবেষকদের জন্য আকর্ষণীয়। সৈয়দ সুলতান তাঁর ‘নবীবংশ’ কাব্যের প্রস্তাবনায় লিখেছেন:

লস্কর পরাগল খান আজ্ঞা শিরে ধরি।
কবীন্দ্র ভারতকথা কহিল বিচারি॥
হিন্দু মুসলমান তা-এ ঘরে ঘরে পড়ে।
খোদা রসুলের কথা কেহ না সোঙরে॥
গ্রহ শত রস যুগে অব্দ গোঞাইল।
দেশী ভাষে এহি কথা কেহ না কহিল॥

এবার দেখা যাক, ‘গ্রহ শত রস যুগ’— কবির এই উক্তিটির ব্যাখ্যা কোন্ পণ্ডিত কিভাবে দিয়েছেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, ‘রস=৯ ধরিলে ৯৯৪ হিজরি হইতে পারে।’ মৌলভী আদমউদ্দীনের মতে ‘গ্রহ=৯, রস=৬ এবং যুগ=৪’ অর্থাৎ ৯৬৪ হিজরী বা ১৫৬৭ খ্রীস্টাব্দে। অধ্যাপক আলী আহমদের মতে ‘৯৬২ হিজরী সন।’ ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক মনে করেন, ‘গ্রহশত=৯০০; রস শব্দে ৬ এবং ৯ দুই-ই হয়। বৃহত্তর সখ্যাটি গ্রহণই বাঞ্ছনীয়; যুগ=৪ এবং সেই সূত্রে তিনি ‘৯৯৪ হিজরী—১৫৮৫ অথবা ১৫৮৬ খ্রীষ্টাব্দে’ মনে করেন। ডক্টর সুকুমার সেন বলেন, ‘নবীবংশের উপসংহার শবে মেরাজ, লেখা হইয়াছিল ১০৬৪ (দশশত রস যুগে অব্দ গোঙাইল) হিজরীতে অর্থাৎ ১৬৫৪-৫৫ খ্রীষ্টাব্দে।’ বলাবাহুল্য, ‘গ্রহশত রস’ স্থলে ডক্টর সেন সংশোধন করে বলেছেন ‘দশ শত রস যুগে’। সেই সূত্রে সৈয়দ সুলতানের কালটি হয় সপ্তদশ শতকের শেষার্ধে, যা অসম্ভব এই কারণে যে কবি মুহম্মদ খান যাঁর কাল ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে ‘১৫৯০ হইতে ১৬৭০’র মধ্যে, তাঁর দীক্ষাগুরু সৈয়দ সুলতান তাঁর পরবর্তী কালের লোক হতে পারেন না। পরিশেষে ডক্টর আহমদ শরীফের অভিমতটি উদ্ধৃত করছি, ‘পূর্বালোচিত পরোক্ষ তথ্যপ্রমাণের উপর আস্থা রেখে আমরা সৈয়দ সুলতান ১৫৮৪-৮৬ খ্রীস্টাব্দে (৯৯২ হিজরি) নবীবংশ রচনায় হাত দেন বলে বিশ্বাস করি।’ (মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবি: আজহার ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ৬১)
নবীবংশ’র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক বলেছেন, “কবি সয়্যিদ সুলতানের গ্রন্থগুলির মধ্যে নবীবংশ কাব্যটিকে ‘ন্যাগনাম্ ওপাস্’ (Magnum opus) বা কবির শ্রেষ্ঠ ও বৃহত্তম গ্রন্থ বলিতে পারা যায়। ইহা বিষয়-বৈচিত্র্য ও আকারে সপ্তকাণ্ড ‘রামায়ণ’-কেও হার মানাইয়াছে। এই কাব্যটিকে বাংলা মহাকাব্যের একটি মহান আদর্শ বলা চলে। কবির ‘নবীবংশ’ সম্বন্ধে আমরা যে-মতই আজ পোষণ করি না কেন, ইহা যে ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য প্রকাশ ও প্রচার করিবার উদ্দেশ্যেই লিখিত হইয়াছিল, তাহাতে কোন সন্দেহ নাই।” (মুহম্মদ এনামুল হক রচনাবলী প্রথম খণ্ড: মনসুর মুসা সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯১, ২৯৮ (মুসলিম বাংলা সাহিত্য)
সৈয়দ সুলতানের কাব্য-উৎস সম্পর্কে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ লিখেছেন, “আরবীতে সালাবী রচিত “কিসাসুল আম্বিয়া” (নবীগণের কেচ্ছা) পুস্তক আছে। কিন্তু সৈয়িদ সুলতান তাহার আক্ষরিক অনুবাদ করেন নাই। বাস্তবিক মধ্যযুগে ভাষানুবাদই প্রচলিত ছিল। অধিকন্তু তিনি অন্যান্য আরবী ফারসী গ্রন্থ হইতেও কিছু কিছু গ্রহণ করিয়াছেন। এমন কি হিন্দু শাস্ত্রও তিনি বাদ দেন নাই। তিনি বলেন যে, আদমের পূর্বে নিরঞ্জন ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর ও হরির উপর যথাক্রমে ঋক্, সাম, যজুঃ এবং অথর্ববেদ অবতীর্ণ করেন। কিন্তু কালক্রমে শ্রুতি ব্যর্থ হইয়া যাওয়ায় তাহারা সমুদ্র জলে নিক্ষিপ্ত হয়।” (শহীদুল্লাহ্ রচনাবলী দ্বিতীয় খণ্ড: আনিসুজ্জামান সম্পাদিত, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৫, ৩৬৮ (বাংলা সাহিত্যের কথা দ্বিতীয় খণ্ড)
নবীবংশ রচনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ডক্টর আহমদ শরীফ লিখেছেন, “কবি ভারতবর্ষীয় প্রতিবেশ স্মরণে রেখে ‘নবীবংশ’ রচনা শুরু করেন। হিন্দুর সুরাসুর, বেদ, অবতার প্রভৃতি সব কিছুর সত্যতা তিনি সৃষ্টি ও শাস্ত্রের আনুক্রমিক ধারায় স্বীকার করেন। কিন্তু ইব্লিসের প্রভাবে সুরাসুর বিভ্রান্ত, বেদ বিকৃত, অবতার বিপথগামী, কাজেই একালের সর্বশেষ শাস্ত্র ইসলামই হচ্ছে সর্বজনগ্রাহ্য ও বরেণ্য ধর্ম। অর্থাৎ সৈয়দ সুলতান ইসলামের সত্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বিকৃতিজাত অসারতা ও পরিহার্যতা যুক্তি-প্রমাণ যোগে প্রতিপন্ন করতে প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর প্রত্যাশা ছিল, এতে দেশজ মুসলিম হবে ইসলামনিষ্ঠ আর হিন্দুও হবে ইসলামের সত্যতায় আকৃষ্ট। মুসলিম মনে ঐতিহ্য চেতনা, আত্মপ্রত্যয় ও স্বধর্ম-গৌরব জাগ্রত করাই ছিল সৈয়দ সুলতানের মুখ্য লক্ষ্য। তাঁর অভীষ্ট সিদ্ধ হয়েছিল। হিন্দুর জীবনে সমাজে সংস্কৃতিতে রামায়ণ-মহাভারত-ভাগবতের যে ভূমিকা, গুরুত্ব ও প্রভাব, তেমনি ভূমিকা, গুরুত্ব ও প্রভাব ছিল সৈয়দ সুলতান রচিত নবীবংশ নামের এই কিসাসুল আম্বিয়ার চট্টগ্রামের মুসলিমদের উপর। এ প্রভাব অবশ্য চট্টগ্রামেই ছিল সীমিত। কেননা মধ্যযুগের সাধারণ মানুষের স্থানিক বিচ্ছিন্নতার ও স্বাতন্ত্র্যের প্রতিবেশে হস্তলিখিত গ্রন্থের অঞ্চলান্তরে প্রচার সহজ ও স্বাভাবিক ছিল না।” (সৈয়দ সুলতান বিরচিত নবীবংশ দ্বিতীয় খণ্ড: আহমদ শরীফ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৭৮, ভূমিকা অংশ)

নবীবংশ দুই খণ্ডে বিভক্ত; প্রথম খণ্ডে সৃষ্টির আদি থেকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন পর্যন্ত এবং দ্বিতীয় খণ্ডে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণাঙ্গ জীবনী। দ্বিতীয় খণ্ড তথা নবীজীর জীবনী থেকে নির্বাচিত দশটি অংশ পাঠ করা যেতে পারে।

১.
নূরে মোহাম্মদীর বর্ণনা

তবে এক কন্দিল সৃজিয়া করতার
নূর মুহম্মদ খুইলা তাহার মাঝার।
রত্তনের কন্দিল অধিক জুতির্মএ
তথা নূর মুহম্মদ রহিল নিশ্চএ।
কন্দিল অন্তরে হৈল নূরের বসতি
দশদিশ দীপ্তিময় হৈল তার জুতি!
কন্দিলের জুতি যথ নানা বর্ণ হৈল
নূরের অঙ্গের জুতি সব বেয়াপিল
তবে প্রভু আজ্ঞা দিলা যথ জীবগণে
দর্শন করিতে নূর মুহম্মদ সনে।
আজ্ঞা পাই জীব সব বৃক্ষ তলে গিয়া
কন্দিল অন্তরে নূর রহিল হেরিয়া।
যে সবে সে নূর দেখি কৈলা পরণাম
জগতে জন্মিল সেই মুমীন উপাম।
প্রণমিলা নূররে যে সবে তিনবার
জগতে জন্মিল সেই ভাল ব্যবহার।
যে সবে নূররে দেখি প্রণাম না কৈলা
কাফির হৈয়া সেই জগতে জন্মিলা।
আগে না প্রণমিয়া যে’ পশ্চাতে প্রণমিলা
হিন্দুকুলে জন্মি পুনি মুসলমান হৈলা।
যে আগে প্রণাম করি পাছে না করিল
মুসলমানকুলে জন্মি কাফির হইল।
আগে পাছে করি মধ্যে না কৈলা সালাম
মুনাফিক হই পাপী জন্মিল ধরা ধাম।
কাফিরতু মুনাফিক অধিক দুষ্কর
কোন কুলে না জন্মিল সেই পাপী বর।
যে সবে সমাপ্ত রূপ নূরের দেখিল
সে সকল জগতেত রসুল জন্মিল।
যে দেখিল নূর মুহম্মদের বদন
জগতেত আউলিয়া হৈল সেই জন।
যে সকলে নূরের ললাট দেখা পাইলা
মুমীন হইয়া সেই জগতে জন্মিলা।
যে দেখিল পুনি মুহম্মদের লোচন
জগতেত পণ্ডিত হইল সেই জন।
পৃষ্ঠ ভাগ নূরের দেখিল যেই সবে
কাফির হইয়া সেই জন্মিলেক তবে।
যে সকলে দেখিল নূরের পদতল
মুনাফিক হইয়া জন্মিল সে-সকল।
এহি রূপে যেই অঙ্গ যে সবে দেখিল
পৃথিবীত যথকর্ম করিতে শিখিল।
সে সব কহিলে হএ পুস্তক বিশাল
কিতাবেত লিখিয়াছে সে সকল হাল।
যেই মতে নিরঞ্জন সৃজিল সংসার
প্রথমে কহিএ আছি সে সব প্রকার।
পুনরপি সে সব কহিতে কার্য নাই
এক কথা ফিরিয়া কহিমু কথ ঠাঁই।
প্রথমে অসুর সুর সৃজি করতার
পাপের কারণে সবে করিল সংহার।
তবে যদি আদম সৃজিতে কৈলা মন,
আদমেত নিজ অংশ করিলা স্থাপন।
সখা নুর মুহম্মদ হোন্তে নূর লৈলা
নিরঞ্জন আদমের ঘটে স্থাব্য থুইলা।
নূর মুহম্মদ হোন্তে কিছু এক অংশু
আমাদের ললাটেত হৈল অবতংস।
জগতের প্রচারিতে নূর মুহম্মদ
আদমেত দিলা প্রভু এ সব সম্পদ।
নূর মুহম্মদ হোন্তে সেই অংশু আসি
আদমের পৃষ্ঠেত উদএ পূর্ণ শশী।
পৃষ্ঠ হোন্তে আদমের ললাটেত আইল
অতি দীপ্তি ললাট উপরে প্রচারিল।
ফিরিস্তা সকল যদি সে জুতি দেখিল
আদমক লক্ষ্য করি সালাম করিল।
এথ দেখি আদমের মনে হৈল ভীত
ফিরিস্তার প্রণামে বহুল চমকিত।
অনাদি নিধান প্রভু নৈরাকার স্থান
পুছিলা আদম সফি সচকিত মন।
মুঞি পাপী ক্ষুদ্রক এ সব ফিরিস্তাএ
কোন্ হেতু করিলেক প্রণাম আহ্মাএ।
লজ্জিত আদমের কথা জেনে নিরঞ্জন
সান্ত্বাইয়া আদমক কহিলা বচন।
নূর মুহম্মদ এক শুদ্ধ সখাবর
তান অংশু দেখি তোহ্মা ললাট উপর।
তেকারণে প্রণামিল যথা ফিরিস্তাএ
তুহ্মি কেনে আপনে মনেত বাস ভএ।
মৃত্তিকার ভাণ্ডে যেন রহিয়াছে জল
তাত দিবাকর যেন উদিত নির্মল।
তেন মতে নূর মুহম্মদের আকার
তোহ্মার ললাটে হৈল উদএ প্রচার।
তা শুনিয়া আদম সফি দণ্ডবৎ হৈলা
দেখিবারে সেই নূর প্রভুতি মাগিলা।
তবে প্রভু আদমের ললাটের জুতি
আজ্ঞা কৈলা দুই নখে করিবারে দীপ্তি।
আদমের বৃদ্ধাঙ্গল যুগলেত আসি
উদএ হইল নূর যেন পূর্ণ শশী।
আদমে দেখিয়া নূর হরষিত অতি
আপনা নয়নে দিলা যে নখের জুতি।

২.
নবীজীর জন্মলগ্নের বিবরণ

মাতৃগর্ভ হোন্তে নবী জন্মিল যেখন
স্বর্গ হোন্তে আইলা স্বর্গের নারীগণ।
স্বর্গ হোন্তে সুগন্ধি আনিলা সঙ্গে করি
প্রবেশ করিলা আসি আমিনার পুরী।
আইলা আদম সফি হাওয়া বিবি সনে
আমিনা দেবীর ঘরে হরষিত মনে।
শিশ পয়গাম্বর আইলা মনে মায়া ধরি।
ইব্রাহিম নবী আইলা সঙ্গে দুই নারী
এক সারা দেবী আর হাজেরা সুন্দরী।
এম্রানের নন্দিনী সতী মুসার জননী
আয়েশার সহিত আইলা সুবদনী।
শোএব নবীর সুতা সফুরা যুবতী
মুসা পয়গাম্বরের ঘরিনী রূপবতী।
ইসা পয়গাম্বরের জননী মরিয়াম
ত্বরিত গমনে আইলা আমিনার ঠাম।
সত্বর গমনে আসি আমিনার পাশ
রসুল জন্মিতে আইলা অধিক উল্লাস।
আর যথ পয়গাম্বর নিজ নারী সনে
আমিনার ঘরে আইলা হরষিত মনে।
স্বর্গ হোন্তে আসিয়া এ সব তুরমান
নিভৃতে রহিল গিয়া আমিনার স্থান।
প্রসবিতে আমিনাএ এ সব রহিয়া
চতুর্দিকে আমিনাএ আছিল বেড়িয়া।
আমিনার শরীরেত অসুখ জন্মিতে
এ সকলে ধরিয়া আছিল চারি ভিতে।
মাএর উদর হোন্তে যেখানে জন্মিলা
ভিহিস্তের হুর সবে শিশু পাখালিলা।
শুদ্ধ সুবর্ণের থালে রত্তনের ঝারি
হাউজ কওসরের জলে পূর্ণ ঘট ভরি।
হুরসবে রসুলক পাখলিল যবে
হাওয়া দেবী আসিয়া কোলে লৈল তবে।
রসুলক শুকল বসনে বেড়াইলা
নবীক দেখিয়া সবে দরূদ পড়িলা।
স্নেহ ভাবে আসিয়া আদম পয়গাম্বর
রসুলক লইলেন্ত কোলের উপর।
আপনা বংশের সুত দেখি মহামতি
ললাটে দিলেন্ত চুম্ব করিয়া পিরীতি।
প্রশংসিতে লাগিলেন্ত যথ পয়গাম্বর
দেখি মুহম্মদ নবী হরিষ অন্তর।
সবে বোলে এহি আদি-অন্তের রসুল
নিরঞ্জনে তান ’পরে গৌরব বহুল।

 

৩.
নবীজীর সৌন্দর্যের বিবরণ

চিকুর চাচর মুণ্ডে শোভাকার
বরণ পিঙ্গল বেশ
কস্তুরী আগর নহে সমসর
শিরে আমোদিত কেশ।
প্রসিদ্ধ ললাট অধিক শোভে পাট
উদএ হইছে দিবাকর
বদন নির্মল জিনিয়া কমল
উদএ যেন শশোদর।
কুরঙ্গ নয়ান খঞ্জন বিনি ঠান
রঞ্জিত অঞ্জন বিনি
শোভিত যুগ ভুরু দুই দিকে বঙ্ক সরু
মধ্য ভাগে অতি ক্ষীণি।
নয়ান ভুরুর ঠান যেহেন ধনুর বাণ
যে দেখে সেই মনে মানে
চঞ্চল অঞ্চলে যেহেন কমলে
রহিছে মকরন্দ পানে।
নাসিকা উত্তম গরুড় না হএ সম
উঞ্চ চঞ্চ সুগঠন।
সুগন্ধি নিশ্বাস সৌরভ চারি পাশ
আমোদ করে সর্বক্ষণ।
অধর যুগল বরণ প্রবাল
বিম্বফল জিনি অতি
দসন মুতিজোত চমকে বিদ্যুত
দোছড়ি মূর্তির পাঁতি।
সে দুই কপোল অধিক নির্মল
অরুণ উদিত জিত
ঘর্মজল তথি গুন্থিত যেন মুতি
যেহেনও ঝলকে নিত।
দুই বাহুলতা দীর্ঘল শোভিতা
রত্তন লাল দুই কর
সেই দুই করতল রত্তন নির্মল
অঙ্গ অতি শোভাকার।
করের অঙ্গল লম্বিত বহুল
অর্ধ গুরু অর্ধ সরু
হীরার জোত জিতি সে নখর পাঁতি
যেহেন পুষ্পিত তরু।
কনক কান্তি জিত শরীর সুবলিত
খর্ব দীর্ঘ-নহে অতি।
‘মোহর নবুয়ত’ অঙ্গে শোভে জোত
উদিত সর্বক্ষণ জুতি।
গম্ভীর নাভিদেশ সুগন্ধি বিশেষ
কস্তুরী কুঙ্কুম জিনি
সুরেখ রোমাবলী কুণ্ড নাভি স্থলী
যেহেন ফণা ধরে ফণী
উরু সুবলিত কদলী জিনি রীত
জঙ্ঘা সুললিত অতি
সে পদ যুগল অধিক নির্মল
কদম্ব স্থলপদ্ম জিতি।
সে পদ নখ জুতি ঝলকে রূপে নিতি
জিনিয়া নির্মল চান্দ
দেখিতে উত্তম দর্পণ নহে সম
অধিক পদ নখ চান্দ।
নবীর শির ‘পর মেঘের ছত্তর
সদাএ করে আছাদন
চলিতে চলএ রহিতে রহএ
সঙ্গে রহে সর্বক্ষণ।
যদি সে জল খাইতে তিরাস লাগে চিতে
সেইক্ষণে বরিষএ জল
সর্বক্ষণ ছায়া থাকে না ছাড়এ কোন পাকে
দেখিতে অধিক উজ্জ্বল।
অঙ্গ জুতির্ময় কিরণ অতিশএ
কায়ার ছায়া নাহি তান
মাক্ষি অঙ্গের ’পরে পড়িতে নাহি পারে
পরশে দেখি নানা স্থান।
মেদনী ’পরে পাএ যথাত হাঁটি যাএ
কস্তুরী হএ সেই মাটি
সুগন্ধি গন্ধ চিন থাকএ অনুদিন
যথাত নবী যাএ হাটি।
নবীর দর্শনে যথেক বৃক্ষগণে
প্রণামে লুলি ভুগত
বৃক্ষ ছাড়ি পত্তরে আসিয়া সত্বরে
পদে পড়ে দাস মত।
বজ্র ইট গণে নবী দরশনে
প্রণাম করএ অনুদিন
পরশে নবী পদ মানএ সম্পদ
পাই রসুলের চিন।
নবীর চরণে কহে সুলতানে
কাকুতি মিনতি সার
তোহ্মার নাম জপি উদ্ধার হএ পাপী
মুঞি পাপী করহ নিস্তার।

৪.
বিবি খাদিজার সঙ্গে নবীজীর বিয়ের বিবরণ

নারীর বচন আবু তালিবে শুনিয়া
জিজ্ঞাসিতে রসুলক আনিলা ডাকিয়া।
খদিজারে সাঁচানি করিতে পরিণএ
তোহ্মার মনেত শ্রধা বিশেষ আছএ।
রসুলে বুলিলা যদি আজ্ঞা কর তুহ্মি
খদিজারে পরিণয় করিবাম আমি।
হইল সন্তোষ আবু তালিবের মন
আজ্ঞা দিলা খদিজারে করিতে গ্রহণ।
আজ্ঞা দিলা হেন বার্তা খদিজাএ পাই
জিজ্ঞাসিতে লাগিলেন্ত রসুলের ঠাঁই।
সাঁচানি খুড়াএ আজ্ঞা দিলেক তোহ্মারে
শুভ দিনে পরিণয় করিতে আহ্মারে।
কি আছে তোহ্মার মনে মোহোর বিদিত
যুক্তিসঙ্গত বাণী বোলহ তুরিত।
খদিজার বচন শুনিয়া নবীবর
ঈষৎ হাসিয়া নবী দিলা পদুত্তর।
বুলিলা তোহ্মারে পরিণএ করিবার
মনেত বহুল শ্রধা আছএ আহ্মার।
তবে কি আহ্মার বোল ধর যদি তুহ্মি
সর্বথাএ পরিণয় করিবাম আহ্মি।
এথ শুনি জিজ্ঞাসিতে লাগিলা যুবতী
বোল দেখি কি আজ্ঞা করিবা মহামতি।
রসুলে বুলিলা যথ দাসদাসীগণ
দাস হোন্তে সে সকল করিবা মোচন।
আপনার ধনে কিনিয়াছ যথ দাস
একজন না রাখিবা আপনা সম্পাশ।
সকল এড়িবা তুহ্মি পুণ্যের কারণ
বহু পুণ্য পাইবা দাস করিলে মোচন।
যথ ধন করিয়াছ এক না রাখিবা
ভিক্ষুক দরিদ্র আনি সকল বিলাইবা।
তুহ্মি আহ্মি গাএ মাত্র না রাখিব ধন
আপনার পরিচর্যা করিবা আপন।
এহি কর্ম তুহ্মি যদি করিলা নিশ্চএ
তবে সে তোহ্মারে আমি করি পরিণএ।
তা শুনিয়া খদিজাএ যথেক ভাণ্ডার
অনুক্রমে লাগিলেন্ত দান করিবার।
দাস কর্ম হোন্তে দাস করিলা মোচন
একসর রহিলা তেজিয়া ধন জন।
তবে মুহম্মদ নবী বুলিলা বচন
ইষ্ট মিত্র আসিবেক তোহ্মার ভবন।
তবে নবী চলি গেলা আপনা ভবন
খুড়াখুড়ি সব চল কার্যের কারণ।
আবু তালিবের নারী আব্বাস-সুন্দরী
মেহের নিগার বিবি চলে সঙ্গে করি।
ইষ্ট মিত্র যথ লোক সকলে বেড়িয়া
খদিজার পুরী মধ্যে আইল চলিয়া।
খদিজার মন্দিরে যদি সব চলি গেলা
নানারূপে পরিচর্যা করিতে লাগিলা।
সুজনি চাদর দিলা বসিতে বিবিগণ
হীরা জড়ি চান্দোয়া যে মাণিক্য পেখন
চিনি আদি সর্করা আঙ্গুর খোরমান
ঘৃত মধু দধি দুগ্ধ অমৃত সমান।
খাসী বকরী দুম্বা আর উষ্ট্র যে প্রধান
মেজোয়ানী করিলেন্ত এবাজ [?] সমান।
অল্পধনে বহু মূল্য ব্যবসা কারণ
খুড়ি সব প্রতি দিলা করিতে ভূষণ।
রসুলক নিকাহা পড়াই সর্বজন
চলি গেলা যথলোক যার যে ভবন।
তবে আসি রসুলে করিলা পরিণএ
যুবতীক লই গেলা খুড়ার আলএ।
খুড়ার নিকটে এক উত্তম উয়ারী
রাখিলেন্ত তথা নিয়া খদিজা সুন্দরী।
রসুলের সহিতে খদিজা গুণবতী
অন্যে অন্যে দোহানের অধিক পিরীতি।

৫.
চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার বিবরণ

দূতমুখে শুনি বাণী রসুল মনেত গুনি
কহিলেন্ত আবু জেহেলেরে
আল্লার হুকুম হৈলে শশী দুই খণ্ড কৈলে
তুহ্মি বোল মানিবা নি মোরে।
আবু জেহেলে হাসি মনে অপ্রত্যয় বাসি
কহিতে লাগিলা দুরাচার
এমত যদি সে পার মানিব তোহ্মারে দৃঢ়
কহিবাম কলেমা তোহ্মার।
আবু জেহেলের বাণী তখনে রসুলে শুনি
প্রণামিলা প্রভু নিরঞ্জন
দিয়া আঙ্গুলের সান শশী কৈলা দুইখান
আকাশে দেখন্ত সর্বজন।
পুনি সান দিয়া শশী ডাইন আস্তিনেত আসি
সে বাম আস্তিনে নিকলিল
আর শশী অর্ধ খান আসিয়া গিরির স্থান
রামেতু ডাইনে প্রবেশিল।
ধরণীত আইল শশী অন্ধকার হৈল নিশি
চতুর্দশী অমাবস্যা হৈল
সর্বদেশে সর্বজন অতি ধন্ধ বাসি মন
সবে বোলে বিযোগ জন্মিল।
পুনি শশী দুই খণ্ড দীপ্তি অতি প্রচণ্ড
চলি যাএ আকাশ উপর
হৈল চতুর্দশী শশী আকাশে উদয় আসি
দশদিক হইল পসর।
আকাশে যুগল শশী উলিলেক সেই নিশি
পুনি দোহ হৈল একত্তর
দেখিয়া অশক্য কাজ দুষ্ট সবে পাইল লাজ
মৃতবত সে সব বর্বর।
রসুলের আজ্ঞা ধরি চন্দ্রিমা আকাশ ছাড়ি
মর্ত্যেত যদি সে নামি গেল
দেখি যত নরগণ অপূর্ব বাসিয়া মন
নবীরে প্রত্যএ অতি ভেল।

সভানের বিদ্যমান শশী কৈলা দুইখান
দেখি আবু জেহেল দুঃখিত
বোলে বান্ধিল আঁখি তেকারণে হেন দেখি
সাঁচা না হএ এ সব চরিত।
এ বুলিয়া পাপমতি দুঃখিত হইল অতি
সভা তেজি পলাইল সত্বর
মনেত হইল দুখ কালি বর্ণ হৈল মুখ
মৃতবত হৈল কলেবর।
পণ্ডিত সকল দেখি অধিক হৈল সুখী
প্রত্যএত বাড়িল প্রত্যএ
রসুলক প্রণামিয়া স্তুতি ভক্তি আচরিয়া
দেশে গেলা সানন্দ হৃদএ।
নজাশী নৃপতি স্থানে কহিল পণ্ডিতগণে
সত্য সত্য দেখিল রসুল
রসুলের রূপ রেখ দেখিলাম পরতেক
দেখিলাম মহিমা অতুল।
সভানের বিদ্যমান শশী কৈল দুই খান‌
আকাশতু নামিল ভূমিত
নবীর আস্তিনে পশি আকাশে উলিল শশী
দেখিলাম সভান বিদিত।
বুলিলা নৃপতি মুঞি দেখিলু চন্দ্র দুই
বসি নিজ টঙ্গির উপর
তাহার পশ্চাতে অতি অন্ধকার হৈল রাতি
গগনে না ছিল শশধর।
দৃঢ় আকাশের শশী রসুলের পদে আসি
পুনি হৈল আকাশে উদএ
যে সবে কহিলা তুমি টঙ্গিত বসিয়া আহ্মি
দেখিলাম নয়ানে নিশ্চএ।
এ বুলিয়া নরপতি সন্তোষ হৈল অতি
রসুলের কলেমা কহিলা
স্বরূপ রসুল জানি বিবিধ মহিমা শুনি
প্রত্যএত প্রত্যএ জন্মিলা।
কহে সৈয়দ সুলতান কর নবী অবধান
পাপ হোস্তে করহ উদ্ধার
তোহ্মার চরণ বিনে নিস্তারিতে আন জনে
সহাএ না দেখি আহ্মি আর।

৬.
মেরাজে আল্লাহর সঙ্গে নবীজীর দিদারের বিবরণ

তবে প্রভু নিরঞ্জন অনাদি নিধান
রসুলের প্রতি পুনি বুলিলা বচন।
আজ্ঞ দিলু মুসারে গিরিত হাঁটি যাইতে
সেই গিরির মাটি তার পদেত লাগিতে
সেই পুণ্য মাটি যার অঙ্গে লাগি যাএ
করিছে যথেক পাপ সব খণ্ডি যাএ।
তেকারণে মুসা পয়গাম্বর হাঁটি যাইতে
কহিল পদেত পাদুকা নহি দিতে।
তুমি মোর প্রেম সখা অপাপ শরীর
তোহ্মার প্রসাদে হউক সিংহাসন স্থির।
তোহ্মার পাদুকার রেণু পড়উক সিংহাসনে
পাএত পাদুকা দিয়া আইসহ এখনে।
আজ্ঞ পাই রসুল আর্শেত চড়ি গেলা
আর্শের উপরে উঠি সে ডাক শুনিলা।
আইস আইস মুহম্মদ আইস মোর পাশ
তোহ্মার দর্শনে মোর অধিক উল্লাস।
তোহ্মার পরম সখা তোহ্মার সমুখে
ভএ না বাসিঅ মনে আইস মন সুখে।
তোহ্মার পরম বন্ধু সমুখে তোহ্মার
লজ্জা না বাসিঅ সুখে আইস আপনার।
তোহ্মার পরম মিত্র সমুখে রহিছে
সন্দেহ না কর তুমি আইস মোর কাছে।
আইস আইস মুহম্মদ নিকটে আইস তুহ্মি
এক ঠাঁই নির্জনে বসিব তুমি আহ্মি।
তা শুনিয়া এক কাঞিক আগে বাড়াইলা
পুনি প্রভু করতারে ডাকিয়া কহিলা।
আইস আইস মুহম্মদ মোহোর নিকট
ভএ ভীত মনে তুহ্মি না ভাব সঙ্কট।
তা শুনি রসুল হৈলা লজ্জাগত অতি
আর এক কাঞিক বাড়াইলা শীঘ্রগতি।
এক কাঞিক পঞ্চশত বৎসরের পন্থ
রসুলের দুই কাঞিক তথা রহিছন্ত।
তবে প্রভু ডাকিয়া কহিলা রসুলরে
আপনা অংশতী আহ্মি সৃজিছি
তোহ্মারে তুহ্মি আহ্মি একত্রে আছিল অনুদিন
আহ্মা হোন্তে কথ দিন হইয়াছ ভিন।
চিরকাল বিচ্ছেদ হইছে মোর সনে
দেখ আসি তুহ্মি মোর বেকত নয়ানে।
গোপ্ত আঁখি ধ্যানেত ধেয়াই পাইছ দেখা
ব্যক্ত আঁখি দেখ আসি আপনার সখা।
আইস আইস মুহম্মদ বৈস মোর সঙ্গে
কৃপার সাগর হউক প্রেমের তরঙ্গে।
আইস আইস মুহম্মদ না বাসিও লাজ
দেখ আসি নিজ সখা না কর বেয়াজ।
তবে যদি মুহম্মদ নিকটেত গেলা
অতি মহা জুতির্মএ সাক্ষাতে দেখিলা।
আল্লার জোতেত জোত অতি জুতির্মএ
রসুলের আঁখিত লাগিলা অতিশএ।
রসুলে আপনা আঁখি ঢাকি দুই করে
সঙ্কোচিত হই রহে প্রভুর গোচরে।
পুনর্বার আল্লার আদেশ হৈল অতি
নিকটেত আইসহ রসুল মহামতি।
তুমি মোর প্রেম-সখা এক কলেবর
মোহোর নিকটে বৈস না হইঅ অন্তর।
অন্যে অন্যে নয়ানে নয়ানে দেখা করি
অন্যে অন্যে কথা কহি আপনা পাসরি।
এ বুলিয়া রসুলক নিলা নিজ পাশ
রবির কোলেত যেন চন্দ্রের প্রকাশ।
দুইখান দর্পণ রহিল মুখামুখি
জোতেত মিলিল জোত আকার উপেক্ষি।
যদি সে হইল দুই জোত একত্তর
দুই জোত মিলি হৈল এক কলেবর।
দুই ভুরু মধ্যে যেন ললাট উদএ
এক কুণ্ডলিত দুই ধানুকী বৈসএ।
ভাবক ভাবিনী ভাবে হৈল এক খণ্ড
দুই ধনু মধ্যেত রহিল গুণ দণ্ড।
অলেখা লিখন বেশ নিরূপ নিরেখ
রসুলের রূপেত দেখিলা পরতেক।
বল বুদ্ধি রূপ নহে সূক্ষ্ম নিউপামা
পুরান পুরুষ অতি তরুণ মহিমা।
আদি অন্ত এক নাহি নাহি রোগ শোক
নানা রূপ ধরিয়া করিতে আছে ভোগ।
প্রভুর অঙ্গের জোত দশদিক ভরি
রসুলে রহিলা হেরি আপনা পাসরি।
নিরঞ্জন আপনার যথরূপ রেখ
রসুলের রূপেত দেখিয়া পরতেক।
অন্যে অন্যে দৃষ্টি ভাব রহিল দেখিয়া
অন্যে অন্যে প্রীতিরসে রহিল মজিয়া।
রসুলে প্রভুর স্থানে করিয়া ভকতি
অদ্ভুত করিলা অতি করিয়া কাকুতি।
তুহ্মি প্রভু নিরঞ্জন সংসারের সার
তুমি বিনে পাতকীর গতি নাহি আর।
রসুলের প্রতি প্রভু হইল সদএ
আশীর্বাদ করিতে লাগিলা অতিশএ।
তার পাছে রসুল ভাবিয়া মনে মন
আপনা উম্মত সব করিলা স্মরণ।
মোহোর উম্মত ‘পরে প্রভু নিরঞ্জন
তোহ্মার কৃপার দৃষ্টি হউক সঘন।
তা শুনিয়া সকল ফিরিস্তা উল্লসিতে
সকরুণ হইয়া সবে লাগিলা কহিতে।
আহ্মি সবে সাক্ষি দিএ প্রভু করতার
এক প্রভু ছাড়িয়া দোসর নাহি আর।।
আর সাক্ষি দিএ মুহম্মদ মহাশএ
আল্লার রসুল তত্ত্ব জানিলাম নিশ্চএ।
সংসার পালন হেতু প্রভু করতার
পৃথিবীত পাঠাইছে রসুল আল্লার।
রসুলক সম্বোধিয়া প্রভু নিরঞ্জন
অধিক গৌরব করি বুলিল’ বচন।
তোহ্মারে কহিএ আহ্মি শুন মুহম্মদ
পৃথিবীত যথ আছে এ সুখ সম্পদ।
মোহোত যদি মাগ দিবাম তোহ্মারে
যেই ইচ্ছা সেই মাগ আহ্মার গোচরে।
কি মাগিবা মোর ঠাঁই মাগ মহাশএ
যেই মাগ সেই আহ্মি দিবাম নিশ্চএ।
ত্রিভুবন মধ্যে যথ সৃজিছি সকল
সে সব জানিঅ মিত্র তোহ্মা পদতল।
মোর খাট সিংহাসন যদি চাহ নিতে
সর্বথাএ এই দুই বিলম্ব নহে দিতে।
আহ্মাত ভিহিস্ত সব যদি মাগ তুহ্মি
সর্বথাএ তোহ্মারে দিবাম জান আহ্মি।
তা শুনিয়া মুহম্মদ রসুল আল্লার
ভক্তি ভাব করিয়া লাগিলা কহিবার।
মুঞি ক্ষুদ্রে কি কহিমু তোহ্মার মহিমা
মোর শক্তি তোহ্মার দিবারে নাহি সীমা।
তুহ্মি বিনে তোহ্মাত না মাগি কিছু আর
তুহ্মি যদি মোর হৈলা সকল আহ্মার।
এসুখ সম্পদে মোর কিছু নাহি ফল।
দাস হেন রাখিবা আপনা পদতল।
তবে কিএ মাগি আহ্মি চরণে তোহ্মার
পাপ হোন্তে নিস্তারিবা উম্মত আহ্মার।
মোহোর উম্মত প্রতি ক্ষেম যথ দোষ
খণ্ডাও যথেক পাপ হই পরিতোষ।
রসুলের নিবেদন শুনি নিরঞ্জন
সদএ হইয়া প্রভু বুলিলা বচন।
যথ পাপ করিয়াছে উম্মত তোহ্মার
সে সকল পাপ কিছু পারি ক্ষেমিবার।
তিন ভাগ হোন্তে এক ভাগ ক্ষেমা দিল
তোহ্মারে চাহিতে আহ্মি সব উপেক্ষিল।
রসুলে বুলিলা প্রভু দয়া কর মোরে
আর কিছু উপেক্ষিবা উম্মত সবেরে।
রসুলের বাক্যে প্রভু সদএ হইল
তিন অংশ হোন্তে দুই অংশ উপেক্ষিল।
পুনর্বার রসুলে করিলা নিবেদন
উম্মতের যথ পাপ খণ্ডাইতে কারণ।
তবে প্রভু নিরঞ্জন করুণা সাগর
রসুলের প্রতি কৃপা কৈলা বহুতর।
বুলিলা যে সব নরে কহিছে কলেমা
তাহার যথেক পাপ দিল আহ্মি ক্ষেমা।
রসুলের সনে প্রভু করিয়া আলাপ
খণ্ডাইল রসুলের মনের সন্তাপ।
নব্বই হাজার কথা রসুলের সনে
একে একে কহিলেন্ত প্রভু নিরঞ্জনে।
নব্বই হাজার কথা শুনিয়া রসুল
হৃদএ তরঙ্গ হৈল সমুদ্রের তুল।
তিরিশ হাজার কথা শাস্ত্রে যথ আছে
দ্বিতীয় তিরিশ হাজার ব্রহ্মজ্ঞান রাখিয়াছে।
তৃতীয় তিরিশ যথ বেকত গোপত
করিতে উচিত নহে সে সব বেকত।
তবে প্রভু করতার অনাদি নিধান
রসুলক প্রবোধিয়া বুলিলা বচন।
আহ্মার এথাত তুহ্মি রহ কিবা যাইবা
স্বরূপ করিয়া তুহ্মি আহ্মাত কহিবা।

৭.
মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের বিবরণ

মদিনা দেশেত গিয়া অতি দিব্য স্থান পাইয়া
পুরী এক করহ নির্মাণ
যেন এহি মক্কার ঠাম সেই দেশ অনুপাম
নাম যশ হইব প্রধান।
দূত মুখে শুনি বাণী প্রভুর আদেশ জানি
রসুল যাওন্ত দেশ ছাড়ি
আবু বকর সনে হরিষ বিষাদ মনে
চলিলেন্ত তেজি নিজ পুরী।
সে ঘরেত আলি আসি রহিলেন্ত সেই নিশি
আসি দেখে আরব সকল
রসুলের দরশন না পাই আরবগণ
মনে দুঃখ ভাবিয়া বিকল।
শেখের মূরতি ধরি ইব্লিসাএ মায়া ধরি
উদ্দেশ করিতে পাপী আইলা
বোলে মুহম্মদ যাএ দেশেতু নিকলি ধাএ
মদিনাত যাইতে ইচ্ছিলা।
তুহ্মি সবে লড় দিয়া তাহারে ধরহ গিয়া
যাবত না যাএ বহুদূর
পন্থে তারে লাগ পাই ধরিয়া আনহ যাই
স্বরূপ বচন শুন মোর।
তা শুনি আরবগণে লড় দিল ততক্ষণে
রসুলক ধরিতে চলিলা
গিরি তলহা নাম পন্থ এক অনুপাম
রসুলক তথাত দেখিলা।
লড় দিয়া গিরি ‘পরে রসুলক ধরিবারে
আরব সকল যদি গেলা
গিরিত সুরঙ্গ এক দেখি নবী পরতেক
তথা গিয়া ছাপাই রহিলা।
আরব সকলে বেড়ি সে গিরি বিচার করি
রসুলক চাহে ধরিবার
সে পদের খোস যথ দেখি সব পন্থ পন্থ
উদ্দেশন্ত গিরির মাঝার।
সেই সুড়ঙ্গের মুখে মর্কটে আপনা সুখে
জাল পাতি রহিলা বিশেষ
নিরোধি সুড়ঙ্গ পন্থ নাহি যেন গতাগত
কেহ যেন না পাএ উদ্দেশ।
একজোড় কবুতরে আসিয়া সুড়ঙ্গ দ্বারে
ডিম্ব পাড়ি উম দি রহিল
আসিয়া আরব যথ নিরোধি সুড়ঙ্গ পথ
গতাগত এক না পাইল।
ইব্লিসাএ মহাবেগে আরব সবের আগে
উদ্দেশ করিতে ধাই আইল
জিবরিলে তাক ধরি পাখ ছাট মুখে মারি
পাপিষ্ঠেরে সমুদ্রে পেলিল।
রসুলের লাগ যবে না পাই আরব সবে
পুনি চলিল নিজ দেশ
মনেত ভাবিয়া দুঃখ কালি বর্ণ হই মুখ
চিন্তাযুক্ত হইল বিশেষ।
এক বীর অনুপাম সরাক তাহার নাম
জাশীমের তনয় প্রধান
সকল আরবগণ পত্র লেখি তার স্থান
পাঠাইল অতি তুরমান।
পন্থেত তোহ্মার পুরী মুহম্মদ যাইতে ধরি
দিবা তুমি নিশএ আহ্মারে
তোহ্মার আহ্মার বৈরী না দিবা তাহারে ছুড়ি
বহু ধন দিবাম তোহ্মারে।
এ লেখি আরবগণ পাঠাইলা ততক্ষণ
তবে নিজ দেশে চলি আইলা
সরাকে লিখন পাই পন্থ আবরিলা যাই
রসুলক ধরিতে ইচ্ছিলা।
তিন দিন নিশিদিশি সুড়ঙ্গে রসুল পশি
আবু বকরের সনে ছিলা
হেন কালে সর্প তথা গাতেথু নিকলি মাথা
নবী পদে আসিতে চাহিলা।
সিদ্দিকের সুতে দেখি শত্রু ভাব মনে রাখি
গাড়া হোন্তে সর্প নিকলিতে
সে গাতের মুখ চাপি রাখিলেন্ত পদে ঝাপি
না দিলেন্ত সে সর্প আসিতে।
রসুলের দেখা যবে না পাইলা সর্পে তবে
মনেত নৈরাশ উপজিলা
অধিক ভাবিয়া দুঃখ হই অতি ক্রোধ মুখ
সেই পদে খোটাই ডংসিলা।
তবে সেই সর্পে বোলে রসুলের পদ তলে
না দিলা করিতে পরণাম
ডংসিলু তেকারণে দুঃখ অতি ভাবি মনে
মুঞি পাপী করিলু অকাম।
সর্পের বচন শুনি শুদ্ধ কহে হেন জানি
গাত হোন্তে পদ কৈল দূর
রসুলে মুখের ছেপ সেই ঘাএ দিল লেপ
যথ বিষ খণ্ডিল প্রচুর।
তবে সেই সর্পে আসি রসুলের পদে পশি
বিনয় করিল বহুতর
রসুল নিশ্চএ জানি কায়মনে ইমা আনি
অস্তুত করিলা নিরন্তর।
রসুল সেই গাত হোন্তে নিকলি যাইতে পন্থে
দেখা হইল সরাকের সনে
অশ্বে আরোহণ হৈয়া রসুলের লাগ পাইয়া
ধরিবারে চাহিলা তখনে।
কহে সৈদ সুলতানে সে যে প্রভু নিরঞ্জনে
অধিক প্রতিষ্ঠা হইবার
মদিনাত দিতে ঠাম বাড়িতে সখার নাম
এথ সব করিল প্রকার।

৮.
মক্কা বিজয়ের বিবরণ

বহু সৈন্য একত্র করিয়া পয়গাম্বর
মক্কা দেশ লইবারে চলিলা সত্বর।
বাছি বাছি মহা যোদ্ধা দ্বাদশ হাজার
আজ্ঞা দিলা চারি সেনাপতি করিবার।
সমুখের সেনাপতি সিদ্দিক দুর্জএ
তান প্রতি রসুলের মান অতিশএ।
জ্ঞানবন্ত বহু আবু বকর সিদ্দিক
মহাবীর যুদ্ধবিদ্যা জানন্ত অধিক।
এই দুই হাজার সৈন্য তান সঙ্গে দিলা
সমুখের সেনাপতি তাহানে করিলা।
খত্তাবের তনয় উমর মহাবীর
রণে অকাতর বীর নির্ভএ শরীর।
এই দুই হাজার সৈন্য তান সঙ্গে দিলা
পৃষ্ঠে রক্ষা সেনাপতি তাহারে করিলা।
আলি মহাবীর ডাইনের সেনাপতি
এই দুই হাজার সৈন্য তাহান সঙ্গতি।
খলিদ অলিদ বীর মহা ধনুর্ধর
নির্ভএ শরীর ধীর রণে অকাতর।
তান সঙ্গে দিলা সৈন্য এ দুই হাজার
বুলিলা বামের সেনাপতি হইবার।
এ চারি হাজার সৈন্য লই পয়গাম্বর
রহিলেন্ত মধ্য ভাগে করিতে সমর।
রসুল যদি সে গেলা মক্কার নিকট
শুনিয়া আরব সবে ভাবিলা সঙ্কট।
না জানি কি হেতু মুহম্মদ আইসে এথা
এথ ভাবি আরব সব হৈল বুদ্ধিহতা।
না জানি কথাত যাএ বুঝিতে উচিত
যুক্তি করিলা আবু সুফিয়ান সহিত।
আহ্মি যদি আগে গিয়া না নিরোধিএ বাট
নিশঙ্কাএ মক্কাত আসিব সৈন্য ঠাট।
এ বুলি আরব যাই নিরোধে বাহাল
বুঝিবারে লাগিলেন্ত কিবা মন্দ ভাল।
তবে আবু সুফিয়ান প্রভাত সমএ
অশ্ব আরোহণে নিকলিল পাপাশএ।
তাজি তুরঙ্গের পৃষ্ঠে হই আরোহণ
অঙ্গেত বিবিধ বেশ বিচিত্র শোভন।
রসুলের সৈন্য সব চলিয়া যাইতে
একসর দূরেত রহিল সমাহিতে।
রসুলের সৈন্য যদি তুরঙ্গ দেখিলা
সেই মুখ দিয়া নিরক্ষি রহিলা।
দুই কর্ণ তুরঙ্গের হইল অতি উভা
পুচ্ছ খাড়া করিলা দেখিতে লাগে শোভা।
লড় দিয়া তুরঙ্গ চলিলা বাউর গতি
চলি যাএ যথাত রসুল মহামতি।
বহু চেষ্টা করিলা সে অশ্ব রাখিবার
ফিরাইতে না পারিলা চলিল সত্বর।
যেই দিকে আমীর উমর রহিছিলা
সেই দিকে অশ্ববর আসিয়া মিলিলা।
তা দেখিয়া উমর খত্তাব মহাবীর
গাএত কবচ দিয়া হইলা বাহির।
যথ সৈন্য আছিল কবচ দিল গাএ
আবু সুফিয়ানেরে সবে ধরিবারে ধাএ।
অশ্ববর সে দিকেতু মুখ ফিরাইলা
যথাত রসুল ছিল তথাত চলিলা।
পয়গাম্বরে আপনার তাম্বুর বাহির
বসিছন্ত রসুল সমাজে হই স্থির।
হেনকালে অশ্ববরে মিলিল আসিয়া
রসুলের সমুখেত রহিল লুড়িয়া।
তুরঙ্গে উদর রাখি ভূমির উপর
চারি পদ গাড়িয়া রহিল ভূমি পর।
আবু সুফিয়ানের সঙ্কট হৈল অতি
কোন দিকে যাইতে না পারে পাপমতি।
রসুলের মুখ দেখি আবু সুফিয়ান
অশ্ব হোন্তে নামিলেন্ত বিরস বয়ান।
রসুলের সাক্ষাতে যদি চলি গেলা
পয়গাম্বরে উঠি তানে বহু আলিঙ্গিলা।
বহুল মান্যতা করি ডাকি পয়গাম্বর
বসিতে বিছাই দিলা অঙ্গের চাদর।
বুলিলা চাদর ‘পরে বৈস মহাশএ
মাটিতে বসিতে তুহ্মি উচিত না হএ।
এথ শুনি আবু সুফিয়ান মহাবীর
বসন রাখিলা তুলি মাথার উপর।
চুম্ব দিয়া বসন আঁখিত বুলাইলা
মান্য করি বসন রাখি মাটিতে বসিলা।

তুহ্মি যারে করতার বোল মুহম্মদ
সেই প্রভু সেবিলে পাইমু মুক্তিপদ।
আহ্মারারে আহ্মার মৃতি রাখিতে নারিল
তোহ্মার আল্লাএ তাক নিশ্চএ পরাজিল।
এবে আমি ভাবিব তোহ্মার করতার
রাখহ আহ্মার জীবন না কর সংহার।
গৃহের উপরে উঠি যথ নারীগণ
কহিবারে লাগিলেন্ত বিনয় বচন।
কেহ নারী ডাক ছাড়ে তুহ্মি শিশুকালে
পালিছি তোহ্মারে আহ্মি করি নিজ কোলে।
কেহ নারী বোলে দুগ্ধ খাবাইছি তোহ্মারে
শুজিতে উচিত পুনি সেই দুগ্ধের ধারে।
কেহ বোলে তোহ্মার খুড়ার নারী আহ্মি
উচিত মোহোরে গৌরব করিবারে তুমি।
কেহ বোলে শিশুকালে কান্দিতে তোহ্মারে
নানা খেলা দিয়াছম খেলা খেলিবারে।
কেহ নারী বোলে আহ্মি তোহ্মার পিসাই
আহ্মা প্রতি তোহ্মার গৌরব কিছু নাই।
কেহ বোলে তোহ্মার খুড়ার নারী আহ্মি
মর্যাদা মোহোর ভঙ্গ না করিবা তুহ্মি।
কেহ বোলে আহ্মি হই ভগিনী তোহ্মার
আহ্মা প্রতি উচিত গৌরব রাখিবার।
এহি মতে কথ নারী কহে ডাক ছাড়ি
বিলাপ কর এ সবে আপনা পাসরি।
রসুলে এথেক শুনি করুণা হইলা
মনেত গৌরব ধরিল বহুল কান্দিলা।
বুলিলা তোহ্মারা সব একত্র হইয়া
আবু সুফিয়ানের পুরীত রহ গিয়া।
আবু সুফিয়ানের পুরীত যেই যাএ
সে সবেরে বন্দী না করিমু সর্বথাএ।
নর সব নির্ভএ বচন যদি পাইলা
আবু সুফিয়ানের পুরীত প্রবেশিলা।
রহিলা মনুষ্য সব সেই পুরীত যাই
তবে আর মনুষ্য রহিতে তাহি ঠাঁই।
আবু সুফিয়ান যাই রসুলের আগে
বহুল বিনয় করি পরিহার মাগে।
ভরিল মোহোর পুরী যথ নর যাই
আর যথ নর রহিবারে নাহি ঠাঁই।
মনুতে প্রতি আর কি আজ্ঞা করিব
যে সব মিলএ আসি কথাত রাখিব।
পয়গাম্বরে কহিলেন্ত যে আসিয়া মিলে
হৃদেমুখে কলিমা কহএ যে সকলে।
আল্লার গৃহের চারিদিকে আছে ঘর
রহুক মনুষ্য গিয়া তাহার ভিতর।
আল্লার ঘরেত গিয়া রহে যে সকল
বুলিলা তাহারে কেহ না করুক বল।
রসুলের আজ্ঞা পাই যথ নর গণ
আল্লার গৃহেত সবে করিলা গমন।
তবে যদি আল্লার গৃহেত চলি গেলা
বহুল মনুষ্য সব ভরিয়া রহিলা।
মক্কার গৃহেত যদি না রহিল ঠাঁই
রসুলের নর সবে কহিলেন্ত যাই।
মক্কার গৃহেত আর মনুষ্য না আটে
ঠাঁই নাই মনুষ্য রহিতে কোন বটে।
আজ্ঞা দিলা পয়গাম্বরে সে সকল নরে
পেলাও হাতের অস্ত্র ভূমির উপরে।
মোর কেহ লোকে তারে না করুক দ্বন্দ্ব’
সর্বথাএ সে সবেরে না করউক কন্ধ।
নর সবে রসুলের বচন শুনিয়া
আপনা করের অস্ত্র আইল বজিয়া।
যথেক আরব ছিল সকল মিলিল
কহিল কলিমা সবে ইমান আনিল।
এ দুই হাজার সৈন্য বন্দীত আছিলা
পয়গাম্বর সে সব বন্দী এড়ি দিলা।

৯.
বিদায় হজের বিবরণ

যথা হোন্তে মক্কাদেশে যদি সে চলিলা
রথ হোন্তে নামি সব পদরথী হৈলা।
পন্থে পন্থে তকবীর কহিয়া উঞ্চস্বরে
প্রবেশিল পয়গাম্বর মক্কার ভিতরে।
মক্কাত যদি সে চলি গেলা পয়গাম্বর
যথ সব নর আইলা নবীর গোচর।
একে একে পয়গাম্বর সম্ভাষা করিলা
হজ্বের প্রকার সভানরে জানাইলা।
যেমত প্রকার নীতি হজ্ব গুজারিতে
সভানরে পয়গাম্বর লাগিলা কহিতে।
তবে পয়গাম্বর গেলা মক্কার ভিতর
রসুলের সঙ্গে গেল যথেক লস্কর।
মহিষী সকল গেলা নারীগণ মেলে
হজ্বের প্রকার নীতি জানিল সকলে।
পুরুষ তকবীর কহে অতি শব্দ করি
শব্দ না করিয়া কহে যথ সব নারী।
যথেক পুরুষ নারী ভরিয়া সমাজ
আল্লার ঘরেত গিয়া করিল নামাজ।
সপ্তবার প্রদক্ষিণ কৈলা সেই ঘর
ইলাহির অস্তুত কহিলা বহুতর।
তকবীর কহিতে শব্দ উঠিল বহুল
আকাশে লাগিল গিয়া এ সকল রোল।
কাল বর্ণ’ শিলা এক আসোয়াদ নাম
ইব্রাহিম নবী যে আছিল সেই ঠাম।
ইব্রাহিম নবী তথা নামাজ করিল
সর্বজন গিয়া তথা শিলাত চুম্বিল।
সবে তথা দোগুনা নামাজ গুজারিলা
বহুল অস্তুত করি আল্লাত মাগিলা।
ডাইনের চাদর তুলিয়া বাম কান্দে
রাখিলেন্ত সর্বজনে অধিক সুছন্দে।

সপ্তবার পুনি মক্কা প্রদক্ষিণ কৈলা
সপ্তবার সেই শিলাত আসি চুম্ব দিলা।
গোসল দিবার লাগি ইলাহির ঘর
জল নিকলিতে আছে নালী যে সুন্দর।
মালীর মুখেত এক আছিল পাষাণ
হাতিম তাহার নাম অতি দিব্যমান।
সেই নালী হোন্তে জল পড়িতে কারণ
ইলাহিএ এহি মতে করিছে সৃজন।
হাতিম শিলার ‘পরে সর্বলোক যাই
আল্লার অস্তুত বহু করিলা দাণ্ডাই।
তিনবার প্রদক্ষিণ কৈল লড় দিয়া
চারিবার প্রদক্ষিণ কৈল স্বস্থ হৈয়া।
এহিমতে সর্বজনে করিলেক রৈয়া
আল্লার অস্তুত বহু সকলে করিয়া।
তবে সফা মারোয়া-ত গেলা সর্বজন
সপ্তবার করিলেন্ত গমনাগমন।
কর জোড়ে মারোয়াত প্রদক্ষিণ করি
মক্কাত আল্লার ঘরে আইলেন্ত ফিরি।
সপ্ত দিন জিলহজ্ব চান্দের হৈল যবে
খোতবা পড়িয়া খতিবে কহে তবে।
কালুকা অষ্টম দিন চান্দের হইব
মিনা বাজারেত আহ্মি প্রভাতে যাইব।
অষ্টমী দিবসে মিনা বাজারেত যাই
সর্বলোকে কিনা বেচা হৈল সেই ঠাঁই।
আরফাতে গেলা নবী নবমী দিবসে
নামাজ করিলা তথা দিবা অবশেষে।
উটের পৃষ্ঠেত চড়ি খোতবা পড়িল
যথ নর সব মিলি খোতবা শুনিল।
পাপ পুণ্য যথ সব লোকেরে জানাই
একে একে ভাল মন্দ কহিল বুঝাই।
আরাফাত মুজদা লেফা গ্রামেত আসিয়া
গিরি কারা পন্থে গিয়া রহিল বসিয়া।
যদি মুজাফালে ফাএ আইলা পয়গাম্বর
নামাজ মগরিব এশা কৈলা একত্তর।
তবে মিনা বাজারেত পুনি চলি আইলা
অন্তরের কোপে শিলা মারিতে ইচ্ছিলা।
সপ্ত গোটা শিলা সবে লইয়া হাতে
কোপে মেলি মারিলেও ইরিসের মাথে
সর্বলোকে কলেমা কহিল উঞ্চ স্বরে
গালি দিতে লাগিলেও সবে ইব্লিসেরে
নখ ছোর কাটিয়া সকলে দূর কৈল
দোগুণা নামাজ করি কোরান পড়িল।
দশমীত সবে মিনা বাজারেত যাই
সর্বলোকে ঈদ গুজারিলা সেই ঠাঁই।
দোগুণা নামাজ করি করিলা কোরবানী
তিন দিন করিলা আল্লার মেহমানি।
রসুলের মনে হৈল এ দেশথু যাইমু পুনি
মুঞি এ দেশে আসিতে নারিমু।
এথ ভাবি পুনর্বার রসুল চলিল
একে একে মক্কাদেশ চাহিতে লাগিল।
সফা মারোয়াত যাই কান্দিলা বহুল
পুণ্য স্থল সব দেখি হইলা আকুল।
একে একে সেই দেশ নিরক্ষি চাহিলা
যথ পুণ্য স্থানে নবী মেলানি মাগিলা।
বুলিলেন্ত যদি মোর থাকে পরমাই
পুনরপি আসিব তোহ্মার এহি ঠাঁই।
যদি সে পরমাই না থাকএ আহ্মার
তোহ্মার আহ্মার মধ্যে এহি দেখা সার।
সভানক সজল নয়নে বোলাইলা
মধুর বচনে তুষি মেলানি মাগিলা।
আল্লার ঘরেত গিয়া করিল সালাম
মেলানি মাগিলা প্রভু করিয়া প্রণাম।
বুলিলা যদি সে পুনি না পারি আসিতে
অবশেষে আসিয়াছি মেলানি মাগিতে।
সমুদিত সৈন্য সমে যথেক লস্কর
আরফা গিরিত পুনি গেলা পয়গাম্বর।
মক্কা মদিনার লোক যথ হাজিগণ
উঞ্চ স্বরে কলেমা কহিল সর্বজন।
মহিষী সকল আর যথ সব নারী
চলিলেক সর্বজন উষ্ট পিষ্ঠে চড়ি।

১০.
নবীজীর ইন্তেকালের বয়ান

জিবরিলের বচন শুনিয়া পয়গাম্বর
আশীর্বাদ করিলেন্ত হরিষ অন্তর।
খেনে খেনে রসুলের গাএর বরণ
হইয়া বিবিধ রূপ করএ শোভন।
তবে রসুলের গাএ ঘর্ম উপজিল
ঘর্মজল বিন্দু বিন্দু বদনে উলিল।
শরীরে লাগিল যার সে ঘর্মের জল
হইল তাহার অঙ্গ সুগন্ধি শীতল।
কস্তুরী কাফুর নহে সে ঘর্মের সম
চিরদিন অঙ্গে ছিল সুগন্ধি উত্তম।
আমীর হাসনে লই রসুলের শির
কোলে করি বসিছিল শিয়রে নবীর।
আমীর হোসনে তবে পৈথানে বসিয়া
রসুলের দুইপদ লইল তুলিয়া।
রসুলের দক্ষিণে আয়েশা গুণবতী
আপনাকে পাসরিল দেখি নিজপতি।
বাম পাশে রসুলের ফাতেমা দুহিতা
বাপের চরিত্র দেখি হৈল বিষাদিতা।
চারিপাশে রসুলের যথ নারীগণ
পতির বিচ্ছেদ ভাবি করেন্ত রোদন।
মোহ হৈয়া পয়গাম্বর যদি সে রহিল
সর্বলোকে হায় হায় করিতে লাগিল।
তাহা শুনি পয়গাম্বরে মেলি দুই আঁখি
কহিবারে লাগিলেন্ত সভানেক লখি।
ডাইন পাশে যদি সে কৈলা নিরীক্ষণ
দেখিলেন্ত পয়গাম্বরে যথ নারীগণ।
বুলিলা তোহ্মারা মোর প্রাণের দুর্লভ
তোহ্মা হোন্তে ‘ধিক মোর নাইক বল্লভ।
সভানকে সমদৃষ্টি কৈলা নিরীক্ষণ
একে একে বোলাইলা মধুর বচন।
বুলিলা তোহ্মারা মোরে দেয়ত মেলানি
অবিনাশ পুরে আজি যাইমু একাকিনী।
বিবি হাফসা, মায়মুনা, জয়নব, সয়দা এ
যথ পত্নী সবে দেঅ মেলানি আহ্মাএ।
তোহ্মরার মনোভঙ্গ করি থাকি যবে
সে সকল দোষ মোরে ক্ষেম তুহ্মি সবে।
কহিল মহিষী সবে শুন পয়গাম্বর
দয়াল হৃদয় তুহ্মি করুণা সাগর।
কোন দিন কার মন ভঙ্গ না করিছ
সমান গৌরবে সভানকে রাখিয়াহু।
একেত আনের টুটা আদর না কৈলা
আহ্মি সভানেরে তুহ্মি অনাথ করিলা।
আমি সবে মেলানি দিলাম যাইবার
দয়া না ছাড়িঅ তুহ্মি আহ্মরা সভার।
বামপাশে যদি সে চাইলা পয়গাম্বর
ফাতেমাক দেখিয়া লাগিলা কহিবার।
জীবের জীবন তুহ্মি আঁখির আঞ্জন
হৃদয়-বৃক্ষের ফল গায়ের চন্দন।
খদিজার নন্দিনী মোর প্রিয় সুতা
আত্তমার সুগন্ধি সৌরভ সুচরিতা।
অবিনাশ পুরে যাই দেয়ত মেলানি
শোক তাপ ক্ষেমা দিবা মনে অনুমানি।
হাসন হোসন দুই দেখিয়া গোচর
মেলানি মাগিলা নিজ স্থানে যাইবার।
একে একে আসব্বা সবেরে বোলাই
বিদায় হইল নবী সভানের ঠাঁই।
তবে আজ্রাইলেরে কহিলা পয়গাম্বর
এবে মোর আত্তমা উচিত কাড়িবার।
যথেক তোহ্মার শক্তি থাকে বল দিয়া
লৈয়া যাঅ মোর তুহ্মি পরাণ কাড়িয়া।
মোহোর উম্মতেরে দুঃখ বহুল না দিবা
উম্মতের লাগি মোরে দুঃখ দিয়া নিবা।
আজ্রাইলে বুলিলেন্ত তোহ্মার পরাণ
হরিমু যেহেন শিশু করে দুগ্ধ পান।
রসুলে শুনিয়া মৃত্যু পতির বচন
হৃদয়েত ডান হস্ত রাখিল তখন।
রাম উরু ‘পরে রাখিল বাম কর
ঊর্ধ্ব মুখী হইয়া রহিল পয়গাম্বর।
মাগিলা আল্লার ঠাঁই করি পরিহার
বিনে শ্রমে যাইতে আত্তমা আপনার।
আজ্রাইলে ইলাহির নাম লেখি করে
রাখিলা আপনা কর নবীর গোচরে।
আহার দর্শনে যেন উড়িল বহরী
নিকলিল আত্তমা নবীর দেহ ছাড়ি।
বিকচ কুসুম্ব দেখি মত্ত মধুকর
উড়িয়া উড়িল যেন কুসুম্ব উপর।
তিরষিত জনে জল দেখি বিদ্যমান
জল খাইবারে যেন করএ পয়াণ।
রসুলের আত্তমা তেহেন গেল ছাড়ি
আজ্রাইল করে আইলা নিজ দেহ এড়ি।
রসুলের দেহতু আত্তমা নিকলিতে
দুই ওষ্ঠ রসুলের লাগিল কম্পিতে।
দেহতু আত্তমা নিকলিতে পয়গাম্বর
লাগিলেন্ত উম্মত উম্মত কহিবার।
মোর উম্মতের প্রভু হরিতে জীবন
এথ দুঃখ দিয়া যেন না কর নিধন।
কাতর হইয়া কহে সৈদ সুলতান
প্রভু বিনে সহায় আহ্মি না দেখিএ আন।