ইসলামী আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে সুফি ঐতিহ্য এমন এক ধারা, যা সমাজের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক রূপান্তরের এক সুগভীর প্রক্রিয়াও বটে। সময়ের ধারাবাহিকতায় নির্দিষ্ট পথ, তরিকা ও তত্ত্ব উৎপাদনের মাধ্যমে এই ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এ ঐতিহ্য ফাতিমা নিশাপুরি, উম্ম আলী, ইমাম গাজালি, ইবনুল আরাবি, রুমি ও আইশা বাউনিয়ার মতো অসংখ্য মনীষীর জন্ম দিয়েছে। ইজমা, কিয়াস ও ফিকাহশাস্ত্রীয় নানা বিষয়সহ এটি সমসাময়িক ধর্মতত্ত্বের বাহাস বা আলোচনায় অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি, সুফি ধারাটি সমকালীন শাসনকাঠামোর যেমন সহযোগী হয়েছে, তেমনই আবার কখনো তাদের বিরাগভাজনও হয়েছে। এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞের ধারাবাহিকতায় সুফিদের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ‘খানকা’, যেখানে তারা আধ্যাত্মিকতা চর্চার পাশাপাশি ধর্মীয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নানা কাজে অংশ নিতেন। এসব কেন্দ্রে মুসাফির দরবেশরা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেতেন; অন্যদিকে দরিদ্র ও গৃহহীন সাধারণ মানুষ সেখানে পেতেন আপাত আশ্রয় ও দিকনির্দেশনা। খানকা ও সুফিদের আশ্রয়স্থল নিয়ে গবেষণাকারী ব্লেয়ারের মতে, “এসব জায়গা প্রাথমিক রিবাতের মতো ছিল না—যেখানে দরিদ্র, অভাবী বা আধ্যাত্মিক মানুষ দুনিয়া থেকে নিভৃত আশ্রয় খুঁজত; বরং এগুলো ছিল সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে জীবিত ব্যক্তিদের শ্রদ্ধার মাধ্যমে মৃতদের স্মরণ করা হতো।”[1]
‘রিবাত’ কি? এক কথায় বলা যায়, এ হলো সুফিদের আবাসস্থল। ঐতিহাসিকভাবে সুফিদের আবাসস্থল নিয়ে খুব স্পষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। তবে এর সূচনা নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ঐতিহাসিকদেরকে সাধারণত অষ্টম শতকের দুয়াইরা (দ্বার-এর ক্ষুদ্ররূপ, অর্থাৎ ঘর) বা রিবাত থেকে শুরু করতে হয় হয়। প্রথম যে রিবাতের কথা জানা যায় তা হলো, পারস্য উপসাগরের আব্বাদান (আধুনিক আবাদান) দ্বীপে অবস্থিত একটি সুরক্ষিত আশ্রম। এই রিবাত ইরাকি জাহিদদের (আরেফ বা সুফি) প্রধান প্রশিক্ষণকেন্দ্রে পরিণত হয়, এদের নেতৃত্বে ছিলেন আব্দুল ওয়াহেদ ইবনে জায়েদ (মৃ-৭৬৭ খ্রি)। এরা ছিলেন মূলত হাসান বসরীর (মৃ-৭২৮ খ্রি) শিষ্য।[2] আবাদানের আশ্রমটি ছিলো একটি সামরিক ঘাঁটি যেখান থেকে জলদস্যুদের বিরুদ্ধে বিবিধ অভিযান চালানো হতো। কিন্তু পরবর্তীতে এটি পরিচালিত হতে থাকে ধর্মপরায়ণ স্বেচ্ছাসেবীদের দ্বারা, যারা সামরিক সেবার পাশাপাশি ইবাদত তথা আপাত দুনিয়া থেকে নিজেদের সরিয়ে নির্জনভাবে আধ্যাত্মিকতা চর্চায় নিযুক্ত ছিলেন।
অষ্টম শতকে যে সকল জাহিদ/সুফি ব্যাক্তিরা দুনিয়া–বিমুখতা তথা জুহদের চর্চা করতেন তারা জিহাদকেও ইবাদতের একটি বড় অংশ বলে মনে করতেন। সমকালীন এধরনের চর্চার অনুসারী মুসলিমরা মূলত এই রিবাতগুলোতে বসবাস করতেন। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, ইসলামের প্রথম শতকে আরব-বাইজেন্টাইন সীমান্তে এ ধরনের বেশ কিছু রিবাত গড়ে ওঠে। বিখ্যাত সুফি ইবরাহিম ইবনে আদহামকে (মৃ- ৭৭৭) উপরে উল্লেখিত চর্চার একজন প্রসিদ্ধ সুফি ও যোদ্ধার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তিনিও এধরনের রিবাতে বসবাস করতেন। পরবর্তী সময়ে সুফিদের আবাসস্থল হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন হয় সেগুলোও সীমান্ত অঞ্চলের রিবাতগুলোর সঙ্গে একই নামে পরিচিত হতে থাকে। সুফি, পীর-মুরিদ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া এবং নতুন উৎপন্ন হওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলোও ‘রিবাত’ নাম ধারণ করে। তবে ঐতিহাসিকভাবে সীমান্তে তৈরি হওয়া রিবাত এবং পরবর্তীতে তৈরি হওয়া রিবাতের মধ্যে নিশ্চিতভাবে কোন সংযোগ প্রমাণ করা কঠিন।[3] ইসলামের প্রথম শতকের পরে উৎপন্ন হওয়া রিবাতের সাথে পরবর্তী শতকগুলোতে উৎপন্ন হওয়া রিবাতের মধ্যে সংযোগ না পাওয়া গেলেও উপরের আলাপ থেকে এটুকু বোঝা যায় যে, নতুন প্রতিষ্ঠা পাওয়া আবাসস্থলের সাথে শুধু সুফি আধ্যাত্মিকতার সংযোগ ছিলো না বরং তদানীন্তন শাসন ব্যাবস্থারও যোগাযোগ ছিলো। নতুন উৎপন্ন হওয়া রিবাতগুলোই ধীরে-ধীরে, বিশেষ করে খোরাসান অঞ্চলে খানকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।[4]
খানকার গড়ে ওঠার ইতিহাসে নারী সুফিদের অবদান এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়, যা প্রায়শই মূলধারার ইতিহাসে উপেক্ষিত হয়েছে। অথচ তাঁরা ছিলেন খানকার খলিফা, আধ্যাত্মিক সাধনার ধারক-বাহক এবং দরবেশদের মা—যাঁদের স্নেহ, দয়া ও আধ্যাত্মিক শক্তি দরবেশদের জীবন ও সাধনাকে সমৃদ্ধ করেছে। মধ্যযুগীয় ইসলামী সমাজে নারীরা নানা সামাজিক ও ধর্মীয় সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও সুফি সাধনায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন মুর্শিদের কন্যা বা স্ত্রী, কেউ ছিলেন স্বতন্ত্র সাধিকা, আবার কেউ ছিলেন দরবেশদের আশ্রয়দাত্রী। তাঁরা খানকার পরিচালনা, দরবেশদের লালন-পালন, অতিথি ও পথিকদের সেবা এবং আধ্যাত্মিক সাধনার পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। নারী সুফিদের এই অবদান শুধু আধ্যাত্মিক সাধনায় সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁরা খানকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করেছিলেন। এখানে নারী সুফিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হবে, দেখানো হবে—কীভাবে তাঁরা খানকার উৎপত্তি ও বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন, খলিফা হিসেবে আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার রক্ষা করেছেন।
খানকার ইতিহাস
প্রাথমিক জমানার সুফি ঐতিহ্য স্বতন্ত্র ইবাদত-বন্দেগী এবং খোঁদার নিকট আত্মসমর্পণের নির্দিষ্ট কোন ধারা উৎপাদন করেনি। এ-সময়ে মসজিদই ছিল সুফিদের চিন্তাচর্চা ও সাধনার একমাত্র আশ্রয়স্থল। এমনকি হিজরি দ্বিতীয়/খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকে ধারাটি ধীরেধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও স্বাধীন সুফি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল না। তাদের জন্য মসজিদই ছিলো যথেষ্ট, কারণ সেসময়ে এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গতিশীল সামাজিক উন্নয়নের কেন্দ্র। গবেষক আহমেত টি কারা মুস্তফার মতে, ঐতিহ্যটিকে তখন নতুন ধরনের ধার্মিকতা বা ইবাদতের পথ হিসেবে দেখা হচ্ছিল বটে কিন্তু পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যে পরিণত হয়নি।[5] প্রথম যুগের সুফি মুর্শিদরা মসজিদেই শিক্ষা দিতেন, যেমন অন্যান্য আলেমরা ফিকহ, কুরআনের তাফসির, হাদিসের সুন্নাহ এবং কালাম শিক্ষা দিতেন। প্রকৃতপক্ষে, সুফিরা ইসলামী মূলধারার জ্ঞানচর্চার অংশ হিসেবে গণ্য হতেন এবং তাঁদের শিক্ষা ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বের বিকাশে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক সুফি তত্ত্বায়নের কারণে তাঁদের মতামত ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল এবং অন্যান্য ধর্মতত্ত্বেও তাঁদের দক্ষতা স্বীকৃত ছিল। যে-কারনে হাসান আল বসরি, সুফিয়ান সাওরির মতো অনেক সুফি একইসঙ্গে ফিকহ, তাফসির, সুন্নাহ ও কালামের আলেম হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।
এসকল সুফিরা মসজিদে খুতবা প্রদানে দক্ষ ছিলেন, তাঁরা সক্রিয়ভাবে ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ’‑এ অংশগ্রহণ করতেন। এর ফলে তাঁদের অনুসারী ও অনুরাগীর সংখ্যা ছিল বিপুল। অনেক সুফি প্রায় স্থায়ীভাবে মসজিদে বসবাস করতেন, যেমন আবদুল্লাহ আল-মুরতাআশ (মৃ.৯৪০ খ্রি.)। ইমাম কুশাইরীর মতে, কিছু কিছু সুফি প্রতিদিন রাতে কোনো না কোনো মসজিদের অতিথি হওয়ার জন্য পরামর্শ দিতেন। দারিদ্রতার মধ্যে প্রকৃত ধন রয়েছে বলে মনে করা সুফি মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল আল-ফারঘানির নিজস্ব কোনো ঘর বা বাড়ি ছিল না—তিনি মসজিদেই বসবাস করতেন। ইবরাহিম ইবনে আদহামের জীবনীতেও নিয়মিত মসজিদে রাত যাপনের নজির রয়েছে।[6]
সুফিদের উল্লেখিত চর্চার পাশাপাশি সুফি তত্ত্বগুলো ধীরে ধীরে স্বতন্ত্র রূপ নিতে শুরু করল এবং এগুলো অনুশীলন ও শিক্ষা দেওয়ার নানা পদ্ধতি ও কৌশল বিকশিত হলো। একইসঙ্গে সুফিদের অনুসারী ও শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বাড়তে থাকল। ফলে মসজিদের বাইরে সুফি কার্যক্রমের জন্য স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল, যদিও মসজিদের ভূমিকা ও গুরুত্ব কখনোই কমে যায়নি বা পরিত্যক্ত হয়নি। তাই প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক সুফি মুর্শিদ তাঁদের নিজস্ব ঘর কিংবা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। কেউ কেউ আবার লোকালয় ছেড়ে নির্জন স্থানকে বেছে নিতেন।
উদাহরণস্বরূপ, দাউদ ইবনে নাসির আত-তাঈ (মৃ. ৭৮১ খ্রি.) সুফি ঐতিহ্যে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁর বাড়িতে নির্জনে অবস্থান করতেন এবং সেখানে কঠোর জুহদ চর্চা করতেন। একইভাবে জুনায়েদ আল-বাগদাদীর সমসাময়িক আলী ইবনে সাহল আল-আসবাহানি (মৃ.৮৬৭ খ্রি.), শুধু জুমার নামাজ ও পাঁচ ওয়াক্ত জামাতে নামাজ আদায়ের জন্যই বাড়ি থেকে বের হতেন। তিনি বলেছিলেন, এই নামাজগুলো যদি মসজিদে আদায় করতে না হতো, তবে তিনি স্থায়ীভাবে নিজেকে বাড়ির ভেতরে আবদ্ধ করে রাখতেন। আবার কেউ-কেউ জুহদ চর্চার অংশ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সফরকে, যেমন- জুননুন মিশরি এবং ফাতিমা নিশাপুরী। একইভাবে আল-জুনায়দ আল-বাগদাদি (মৃ. ৯১০ খ্রি.) প্রতিদিন তাঁর দোকানে যেতেন, দরজা বন্ধ করতেন এবং চারশো রাকাত নামাজ আদায় করতেন। তারপর তিনি বাড়িতে ফিরে যেতেন। কুশায়রির বর্ণনা মতে, আরেকটি উদাহরণ হলো বাগদাদের সুফি আহমদ মুহাম্মদ আল-নুরি (মৃ.৯০৮ খ্রি.), তিনি আল-জুনায়দের সমসাময়িক ছিলেন। বলা হয়, তিনি প্রতিদিন বাড়ি থেকে বের হতেন কিছু রুটি নিয়ে এবং পথে পথে তা দান করতেন। এরপর তিনি মসজিদে প্রবেশ করে দুপুর পর্যন্ত নামাজ আদায় করতেন। তারপর মসজিদ থেকে বের হয়ে দোকান খুলতেন এবং রোজা রাখতেন। তাঁর পরিবার মনে করত, তিনি বাজারে খাবার খান, আর বাজারের লোকেরা মনে করত তিনি বাড়িতে খাবার খান। তিনি এভাবে বিশ বছর ধরে জীবনযাপন করেছিলেন।[7]
উপরের আলোচনার থেকে স্পষ্ট হয় যে, সুফিরা সমসাময়িক সমাজ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার চেয়ে বরং একে অপরের সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সাধারণ সামাজিকতায় ঘনিষ্ঠ ও অন্তরঙ্গতা অনুভব করতে শুরু করেছিলেন। এর ফলে স্বাধীন সুফি প্রতিষ্ঠানগুলোর জরুরি প্রয়োজন দেখা দেয়—প্রথমে আংশিক সময়ের ভিত্তিতে এবং পরে পূর্ণকালীনভাবে। মূলত সুফি ইতিহাসের প্রথম শতকে শিক্ষা গ্রহণের রূপ ছিল এরকম- একজন শায়খ তাসাউফের জ্ঞান প্রদান করতেন কোনো একক মুরিদকে, নয়তো একদল মুরিদ ও আগ্রহী শ্রোতাদেরকে। শিক্ষাদানের এই প্রক্রিয়াটি ছিলো কখনো অনিয়মিত, কখনো নিয়মিত বৈঠকে—শায়খের বাড়িতে অথবা সাধারণত মসজিদে। এ ধরনের শিক্ষা মুরিদদের জন্য অপরিহার্য বলে বিবেচিত হতো এবং তাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান ছিলো। মুরিদদের প্রত্যাশা থাকতো শায়খদের আদর্শ অনুসরণ করা। শিক্ষাদানের পাশাপাশি সুফিরা আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা ও ‘সিস্টেমেটিক’ প্রশিক্ষণ দিতেন, একারণে সুফিদেরকে চিকিৎসক রূপেও গণ্য করা হয়েছে। গবেষক কারা মোস্তফার মতে, ‘প্রথম পর্যায়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ছিল অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। সুফি শায়খরা শিক্ষা দিয়ে প্রশিক্ষণ দিতেন এবং প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষা দিতেন। তবে চতুর্থ/দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে প্রশিক্ষণ ধীরে ধীরে বাড়তি গুরুত্ব পেতে শুরু করে এবং পরবর্তী শতকে এটি বিস্তারিত তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে’।[8] সুফিদের এই ‘শিক্ষা’ ও ‘প্রশিক্ষণ’ দেয়ার নিয়ত-ই পরবর্তীতে স্বাধীন সুফি প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠার কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। যেখানে তারা নিজেদেরকে তরিকাহ ভিত্তিক ওস্তাদ-শিষ্য পম্পরায় সংগঠিত করতে শুরু করেন, যা নির্দিষ্ট কোনো সুফি’র নামেই সংগঠিত হতো। সুফি শায়খের নামে সংঘটিত হওয়া শেষ ধাপটি সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা সুফিপথের ধারাবাহিকতায় ৬ষ্ঠ হিজরি/১২শ শতাব্দী থেকে শুরু হয়। এই পথপরিক্রমায় তরিকাভিত্তিক সিলসিলাগুলো নির্দিষ্ট খানকাকেন্দ্রিক চর্চার দিকে মনোযোগী হয়।
কিন্তু শুরুতেই সুপরিসর খানকা প্রতিষ্ঠা পায়নি বরং ছোট পরিসরের ঘর বা দুয়ারিয়া-তে সুফিদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চলতো, যার নমুনা রাবেয়া বসরীর (মৃ-৮০১খ্রি) জীবনীতেও পাওয়া যায়। ফরিদউদ্দিন আত্তারের বর্ণনা মতে, তাঁর নিজস্ব একটি ছোট আশ্রম ছিল যেখানে তিনি নির্জনতায় ও শান্তির মধ্যে আল্লাহর এবাদত করতেন। আশ্রম ছাড়াও তিনি তাঁর বাড়ি এবং মরুভূমির বিস্তৃত প্রান্তরকে এ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতেন। বাড়ি ও আশ্রম উভয় জায়গাতেই মানুষ তাঁকে দেখতে যেত। রাবেয়ার সমসাময়িক আরেক সুফি হাবিব আল-আজামীরও একটি ব্যক্তিগত আশ্রম ছিল বলে আত্তার বর্ণনা করেছেন, যেখানে তাঁর শিক্ষক আল-হাসান আল-বাসরী তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন। এধরনের ছোট পরিসরের ঘর নির্মাণ করে সেখানে এবাদত বন্দেগী ও গরীব-দুস্থ মানুষসহ সফরকারীদের সেবা দেয়ার ইতিহাস তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমানের শাসনামলেও দেখা যায়। যায়দ ইবন সাওহান ইবন সাবরাহ মসজিদের বাইরে এরকম একটি ঘর নির্মাণ করেছিলেন। বসরাতে নির্মিত এই ঘরটি ছিলো দরিদ্র ও সম্ভবত গৃহহীন আধ্যাত্মিক সাধকদের জন্য। এদের কোনরূপ আয়-রোজগারের ব্যাবস্থা ছিলো না।[9] তাসাউফ চর্চার ইতিহাসে মসজিদের বাইরে ‘দুয়ারিয়া’র পাশাপাশি আরেকটি নাম পরিচিত, তা হলো ‘রিবাত’।
রিবাত শব্দটি মূলত আরবি ধাতু ‘রা-বা-তা’ থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘বেঁধে রাখা’। প্রাথমিকভাবে এটি যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য ঘোড়াকে বেঁধে রাখা তথা প্রস্তুত রাখা ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কুরআনে এই শব্দটি এসেছে যুদ্ধের প্রস্তুতির নির্দেশক হিসেবে (৮:৬০; ৩:২০০)। ফলে রিবাত ধারণা শুরু থেকেই ধর্মীয় ভক্তি ও আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। দ্বিতীয়/অষ্টম শতকের শেষ নাগাদ রিবাত শুধু আধ্যাত্মিক সাধনা নয় বরং সীমান্তে ইসলাম রক্ষার জন্য নির্মিত বাস্তব চৌকি ও পথিকদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতে থাকে। অনেক রিবাত বাইজেন্টাইন ও পারস্যের পূর্ববর্তী স্থাপত্য থেকে গড়ে ওঠে, বিশেষত উত্তর সিরিয়া ও মধ্য এশিয়ার সীমান্তে। তৃতীয়/নবম শতকে সুফি ঐতিহ্য যখন ইরাক তথা বসরায় আবির্ভূত হয় তখন সেখানে রিবাতগুলো সুফি ও ভক্তদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠে। এ সময় মুসলমানরা ‘মুজাহিদ’ চরিত্রকে জুহদের (আল-জুহদ ফি আল-দুনিয়া) আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করতে শুরু করে। আবদুল্লাহ ইবন আল-মুবারকের ছাত্রদের দ্বারা প্রচারিত বিখ্যাত হাদিস— ‘আমার উম্মতের আধ্যাত্মিকতা হলো জিহাদ’—এই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করে।[10] ফলে রিবাত হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক সাধনা ও সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষা উভয়ের কেন্দ্র।
রিবাতের সঙ্গে সুফি আধ্যাত্মিকতার সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি ক্ষমতা কাঠামোরও সম্পর্ক রয়েছে। কারণ রিবাতগুলো সাধারণত সাম্রাজ্যের সীমান্তে থাকত এবং এখানে সাধনা করা সুফিরা সাম্রাজ্যের অনুকূলে জিহাদেও অংশ নিতেন। এভাবে রিবাত হয়ে ওঠে দ্বৈত চরিত্রের প্রতিষ্ঠান—একদিকে আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র, অন্যদিকে সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অংশ। এর ফলে রিবাতের ইতিহাসে আধ্যাত্মিকতা ও ক্ষমতার সমন্বয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। যার প্রমাণ নাথান হোফারের লেখা প্রবন্ধ ‘Sufi Outpost(ribat)’-এ দেখা যায়। তিনি দেখান যে, খোরাসান থেকে আগত সুফিরাই প্রথম শহুরে ক্ষমতা–কাঠামো–নির্ভর রিবাত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাগদাদের আস্তানাগুলোতে আবু নযীব আল-সুহরাওয়ার্দী (মৃ ১১৬৮ খ্রি) এবং তাঁর ভাতিজা আবু হাফস আল-সুহরাওয়ার্দী (মৃ ১২৩৪ খ্রি) ‘রিবাত-ভিত্তিক সুফি চর্চা’র ধারা প্রতিষ্ঠিত করেন, যা আগের নিয়মভিত্তিক সুফি ঐতিহ্যের তুলনায় সামাজিক ও ধারণাগতভাবে অনেক বেশি সংগঠিত ছিল। এই প্রাবন্ধিকের মতে, বাগদাদের এই রিবাত-ভিত্তিক সুফি ঐতিহ্য সিরিয়া ও মিশরের সুফিদের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
ষষ্ঠ/দ্বাদশ শতকের শুরু থেকে মুসলিম বিশ্বে রিবাত-ভিত্তিক সুফিচর্চার দ্রুত বিস্তার ঘটে মূলত ধনী ও শাসক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতার কারণে। এই এলিট শ্রেণী বৃহৎ পরিসরে মাদরাসা, খানকাহ ও রিবাত নির্মাণ ও দান করেছিল, যেখানে বিভিন্ন সুফিরা থাকার ও খাওয়ার সুযোগ পেতেন।[11]
কিন্তু রিবাতের বিপরীতে দুয়ারিয়া ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির প্রতিষ্ঠান। এ ছিলো ছোট আকারের সুফি আশ্রম যা মূলত ব্যক্তিগত সাধনা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের জন্য গড়ে ওঠে। এগুলোতে ক্ষমতা কাঠামোর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল না। দুয়ারিয়ায় সুফিরা নিঃসঙ্গতায় ইবাদত করতেন, শিষ্যদের শিক্ষা দিতেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় নিয়োজিত থাকতেন। এখানে সাম্রাজ্যের প্রতিরক্ষা বা রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। দুয়ারিয়া ছিল কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার আশ্রম, যেখানে সুফিরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিজেদের নিয়োজিত করতেন। বলা যায়, রিবাত ও দুয়ারিয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে—রিবাত আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি ক্ষমতা কাঠামোর অংশ ছিল, আর দুয়ারিয়া ছিল কেবল আধ্যাত্মিকতা চর্চার কেন্দ্র। এই পার্থক্যই সুফি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিবর্তনে দুয়ারিয়াকে একটি স্বতন্ত্র ধারা হিসেবে চিহ্নিত করে, যেখানে আধ্যাত্মিকতা ছিল একমাত্র লক্ষ্য।
কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক এই পার্থক্যকে খুব একটা আমলে নেননি, তারা দুয়ারিয়া ও রিবাতকে একই ধরনের সুফি আশ্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যেমন- গবেষক কারা মুস্তাফা এই শব্দগুলোকে ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করে সমধর্মী মনে করেছেন। তার মতে, ‘আরব অঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে রিবাত শব্দটি বেশি প্রচলিত ছিল। খোরাসানে ব্যবহৃত হতো ফারসি শব্দ খানকা। এছাড়া সর্বত্র দুয়ারিয়া (ছোটঘর বা আশ্রম) বুকআ (স্থান), জাওইয়া (কোণ) এমনকি মাদরাসা শব্দও ব্যবহৃত হতো’।[12] প্রায় একইরকম ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে দাফনা এফরাত ও পল জি পিন্টোর গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ ‘Sufi Places and Dwellings’-এ। এদের ধারণা মতেও দুয়ারিয়া এবং রিবাত একই ভাবনা উৎপাদনকারী শব্দ।[13] দ্বিতীয়/অষ্টম শতকের দিকে দুয়ারিয়া এবং রিবাতের মাধ্যমে সুফিদের আধ্যাত্মিকতার এই চর্চা শুরু হলেও চতুর্থ/দশম শতকের প্রথমার্ধে সুফি প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে-ধীরে স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। কুশায়রী ৪৩৭ হিজরি/১০৪৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর রিসালা রচনা করেন এবং সেখানে তিনি ‘প্রশিক্ষণের গুরু’ ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তখন থকে খানকাহ শব্দটি সুফি শায়খদের আধ্যাত্মিক ক্ষমতার দৃশ্যমান প্রকাশের সামাজিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।[14]
খানকা নির্মাণ ও পৃষ্ঠপোষকতায় নারী
খানকা নির্মাণ, সেখানে আগত ভক্ত আশেকানদের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি এবং আধ্যাত্মিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজে নারীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের ভূমিকা কেবলমাত্র খানকার গৃহস্থালি বা সেবামূলক কাজেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং তারা অর্থনৈতিক অনুদান, হিসাব-নিকাশসহ সুফি সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কাঠামোকে দৃঢ় করতে সহায়তা করেছেন এবং কখনও কখনও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছেন। এরকম নেতৃত্বদানকারী অনেক নারী সুফি ছিলেন শায়খদের শিষ্য, আবার কেউ কেউ নিজেই আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক তথা খলিফা হয়ে উঠেছেন। তাঁদের মাধ্যমে খানকা শুধু ধর্মচর্চার কেন্দ্র নয় বরং সামাজিক সংহতি ও মানবিক সেবার কেন্দ্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, যেমন- গুরজি খাতুন।
আনাতোলিয়ার সুলতান দ্বিতীয় কায়খসরু’র (১২১৫-১২৪৬ খ্রি) আর্মেনিয়ান বংশোদ্ভূত স্ত্রী গুরজি খাতুন (১২২০-১২৮৬ খ্রি), যার পূর্ব নাম ছিলো তামারা। তিনি পূর্বেকার ধর্মবিশ্বাস কৃশ্চিয়ানিটি পরিত্যাগ করেছিলেন কিনা জানা যায় না। কিন্তু এই নারী মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির (১২০৭-১২৭৩ খ্রি) একজন একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন। মাওলানা সাহেবের একটি পত্রে দেখা যায়, এই নারীকে তিনি ‘নারীদের গৌরব’ হিসেবে সম্মোধন করেছেন। রুমির সকল নারী মুরিদদের দেখাশোনা করার দায়িত্বেও ছিলেন গুরজি খাতুন।[15] রুমির ইন্তেকালের পর তাঁর প্রবর্তিত মৌলভিয়া তরিকায় এই নারী একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠেন। তার তদারকি ও অনুদানে মৌলানা সাহেবের কবরের উপর কুববাত ই-খাদরা বা সবুজ গম্বুজ নামের একটি দালান তৈরী হয়, যা এখনও বহাল তবিয়তে সেখানে রয়েছে। মৌলভিয়া তরিকার একজন শুরা সদস্য ছিলেন তিনি, প্রতি বৃহস্পতিবার পবিত্র ঘূর্ণিনাচ ও সামা গানের আয়োজন করতেন, যেখানে আনাতোলিয়ার গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গেরও আগমন ঘটতো।[16] মূলত মৌলভিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠায় গুরজি খাতুনের অসামান্য ভূমিকা রয়েছে।
রুমির আরেকটি চিঠির বয়ান থেকে আবেদা খাতুন নামের এক নারী সুফির নাম জানা যায়। এই নারী কোনিয়ার অদূরে দরবেশ ও মুসাফির সুফিদের জন্য একটি খানকা নির্মান করেছিলেন কিন্তু শহরের কিছু লোক তাকে বিরক্ত করতো, যা মওলানার কানে আসে। লোকগুলো যেন আবেদা খাতুন ও তার খানকায় বিরক্ত না করে- এই অনুরোধ করে তিনি আনাতোলিয়ার তদানীন্তন উজির মাইনুদ্দীন পারাভানিকে পত্র লেখেন:
”মজলুম ও দরবেশদের সহায়তা ও পৃষ্টপোষকতায় আমিরকুল শিরোমণির সদাচরণ ও নির্মল আন্তরিকতা সূর্যের চেয়ে উজ্জ্বল। বিশেষ করে ঐসব আল্লাহওয়ালা দরবেশদের প্রতি জনাবের আন্তরিকতা অধিক, যারা কোরানের এই আয়াতের– ‘এমন কিছু মানুষ আছে যাদেরকে ব্যাবসা ও বাণিজ্য আল্লাহর জিকির থেকে বিমুখ করতে পারে না।’[17]–এর প্রতিচ্ছবি। আপনার অগোচরে আপনার পরিচিত কিছু লোকের একটি দলকে প্রিয় বোন, খোদাপ্রেমী দুনিয়াবিরাগী আবেদা খাতুনের খানকায় নিয়োজিত করা হয়েছে। এই লোকগুলো খোদাপ্রেমীদের মনোযোগে বিঘ্ন ও বিক্ষিপ্ততা সৃষ্টি করছে।… আপনার কাছে আর্জি, এই লোকেরা দরবেশদের যেন উত্যক্ত না করে তার ব্যবস্থা করা।”[18]
আবেদা খাতুনের ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, নারী সুফিরা শুধু আধ্যাত্মিক সাধনায় নয় বরং খানকা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষণাবেক্ষণের মতো বাস্তব দায়িত্বেও সক্রিয় ছিলেন। রুমির পত্রে খানকা প্রতিষ্ঠার উল্লেখ নারীদের আধ্যাত্মিক নেতৃত্বের একটি ঝলক তুলে ধরে। যদিও লিখিত ইতিহাসে এ ধরনের উদাহরণ খুব বেশি পাওয়া যায় না, তবুও এটি প্রমাণ করে যে নারী সুফিদের অবদান আড়ালে থাকলেও তা ছিল বাস্তব ও কার্যকর। এই সূত্র ধরে মুঘল রাজকন্যা জাহানারা বেগমের (১৬১৪-১৬৮১খ্রি) দিকে নজর দেয়া যেতে পারে। আবেদা খাতুন ছিলেন অপেক্ষাকৃত অজানা এক নারী সুফি, কিন্তু জাহানারা ছিলেন মুঘল রাজপরিবারের কন্যা—শাহজাহানের জ্যোষ্ঠ সন্তান এবং একজন নারী সুফি। তাঁর অবস্থান ও ক্ষমতার কারণে তিনি খানকা, দরগা ও মসজিদ নির্মাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছিলেন। আবেদা খাতুনের মতোই তিনি দরবেশ ও ভক্তদের আশ্রয় দিয়েছেন, তবে তাঁর অবদান ছিল আরও বৃহৎ পরিসরে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর পিতা শাহজাহান, ভাই দারাশুকো ছিলেন চিশতিয়া তরিকার অনুসারী। তাঁর রচিত রিসালা-ই-সাহিবিয়া গ্রন্থ মতে, তিনি নিজেও কাদেরিয়া তরিকার সুফি মুল্লাহ শাহ বাদাখশীর (মৃ-১৬৪৫ খ্রি) একজন অনুগত শিষ্য। মুঘল রাজ পরিবারে মুল্লাহ শাহ’র সুতীব্র প্রভাব ছিলো। জাহানারাকে ‘দ্বিতীয় মরিয়ম’ বলা হতো। কালিম কাশানী নামে পরিচিত পারসিক কবি আবু তালিম ক্বালিম (মৃ-১৬৫১খ্রি) তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেন-
‘তিনি সর্বদা পবিত্রতার মেঘের আড়ালে আচ্ছাদিত থাকেন। দ্বিতীয় মরিয়ম যেন সর্বদা জগতের রাজাধিরাজের মহিমা সহ্য করতে পারেন। সূর্য যতদিন আলোকিত থাকবে, ততদিন আল্লাহর ছায়া যেন তাঁর মাথার উপর বিরাজ করে’।[19]
জাহানারা তৈমুরি (১৩৭০–১৫০৭) রাজবংশের উত্তরাধিকারী। তৈমুর যুগের আরো কয়েকজন নারীও সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁদের অবস্থানকে দৃশ্যমান করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তৈমুরের স্ত্রী ও কাজান খানের (মৃ-১৩৪৬-৪৭খ্রি) কন্যা সম্রাজ্ঞী সারাহ খানম (মৃ-১৪০৬ খ্রি) সাম্রাজ্য ট্রেজারির দায়িত্ব পান, যে-কারণে মাদ্রাসা, খানকা, কবরস্থান এমনকি নিজের সমাধি নির্মাণ করতে পেরেছিলেন।[20] শায়খ দ্বিতীয় উমর মির্জা ছিলেন তৈমুরের পুত্র ও কুতলুঘ তারকান আগলা (মৃ- ১৫০৫ খ্রি) ছিলেন উমরের স্ত্রী এবং এদের সন্তান হলেন বাবর এবং খানজাদা বেগম (মৃ-১৫৪৫ খ্রি)। এই বেগমের প্রভাবের ফলে অনেক মসজিদ ও খানকা তৈরি হয়।[21] এ-সকল নারীদের ভূমিকা উল্লেখ করে স্টিফেন ব্লেক একটি প্রবন্ধে বলেন, ‘রাজকীয় নারীরা তাদের বিপুল সম্পদ ও উদার পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে যে অবদান রেখেছিলেন, তা দেখায় যে রাজকীয় নারী-পুরুষের মধ্যে বাস্তবে অনেক বেশি সমতা ছিল—যা ইসলামী আদর্শে প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যের [প্রতিষ্ঠিত ও বর্তমান] ধারণাকে ছাপিয়ে যায়’।[22]
খানকা, দরগা, সরাইখানা তৈরিতে বেগম জাহানারার ভূমিকা অসামান্য। বিশেষ করে কাশ্মীরের শ্রীনগরে ১৬৫০ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত খানকাসহ মসজিদ কমপ্লেক্স ছিলো তাঁর ওস্তাদের প্রতি সম্মানের এক নিদর্শন। মুল্লাহ শাহ বাদাকসির নামে মসজিদটির নামকরণ থেকেই জাহানারার মনোভাব বোঝা যায়। তার পৃষ্টপোষকতায় নির্মিত আগ্রার মসজিদের মতোই শ্রীনগরের মুল্লাহ শাহ বাদাখশী কমপ্লেক্সও এই নারীর আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করে। শাহজাহান নামা-তে সম্রাট শাহজাহানের কমপ্লেক্সটি পরিদর্শনের বর্ণনা উল্লেখ আছে। জাহানারা এখানে সুফি শায়খ ও তাঁর ভক্তদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। গভীর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তাঁর পৃষ্ঠপোষকতার মধ্যে কোনভাবেই রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নয় বরং পীর-মুরিদি সম্পর্কের প্রতিফলন ছিল।[23]
জাহানারা সরাসরি একজন সুফির মুরিদ, তিনি ব্যক্তিগতভাবে পীর-মুরিদি চর্চা করতেন, তরিকার অনুসারী ছিলেন। জাহানারার ভাতিজি, আওরঙ্গজেব কন্যা জেবুন্নেসা সরাসরি কোন তরিকা অনুসরণ না করলেও তার লিখিত গজলগুলো ভিন্ন ভাবনার এক সুফি কবিকে হাজির করে। তার গজলকে বিশ্লেষণ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা সাবিহা হক বলেন, ‘জেবুন্নেসার সর্বশেষ আবাস সুফি ভাবনা’।[24] এই গবেষক তার সুফি-ভাবনা নিয়ে আরো বলেন, ‘ধর্ম সম্পর্কে সাহসী ও প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কবিতায় গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কবিতায় আল্লাহই প্রিয়তম; আর প্রেমিক ও প্রিয়তমের মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। এই দৃঢ় অস্বীকৃতি হয়তো তাঁর সুফি স্বভাবের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য’।[25] জেবুন্নেসা ‘সুফি জীবনে গভীর বিশ্বাস রাখেন, যা তাঁর কাছে রাজতন্ত্রের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সম্পদের সঞ্চয় ও সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, কারণ দীর্ঘমেয়াদে তা সম্রাটকে নিঃসঙ্গ করে তোলে’।[26] সুফি জীবনের প্রতি আগ্রহের বদৌলতে তিনি মসজিদ, খানকা, দরগা নির্মানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। শুধু তাই নয়, হজ্ব যাত্রার জন্য মুল্লাহ সফিউদ্দীন কাজৌনিকে ৭০০০০.০০ রুপি দান করেছেন।[27] ধর্মীয় কাজে এধরনের সহযোগিতা সম্রাজ্যের পুরুষদের চেয়ে নারীদের মধ্যে বেশী ছিলো। এসব ঘটনা পর্যবেক্ষণ শেষে গবেষক কোজলস্কি বলেন,
‘ভারতীয় তৈমুরিদদের ধর্মীয় খ্যাতিতে নারীরা এমনভাবে অবদান রেখেছিলেন যা পুরুষরা কখনও করতে পারেননি। নারীরা এমনভাবে ধার্মিক ছিলেন যা সম্রাটরা কখনোই ছিলেন না। ‘খিলাফতের আশ্রয়স্থল’ হিসেবে, ভালো মুসলিম শাসক হওয়ার গর্বকে শক্তভাবে টিকিয়ে রেখেছিলেন নারীরা। এই নারীরা তাঁদের ব্যক্তিগত ধন-সম্পদ ও সম্রাটদের ধন-সম্পদকে এমনভাবে মিশিয়ে রাখতেন, যাতে ধর্মীয় শিক্ষক এবং সুফিদের জীবিকা, প্রয়োজনীয় খরচ ও বস্তুগত চাহিদা পূরণ হয়’।[28]
ভারতীয় তৈমুরিদ বংশীয় নারীদের মতো প্রায় একই রকম ভূমিকা রেখেছিলেন আব্বাসীয় রাজবংশের অনেক নারী। আব্বাসীয় খলিফা আল-মুস্তাজিদের (১০৯৪-১১১৮ খ্রি) স্ত্রী ইসমত খাতুন (মৃ-১১৪১ খ্রি) এবং খলিফা আল মুসতাদি’র (১১৭০-১১৮০ খ্রি) স্ত্রী ও খলিফা আল-নাসিরের মা জুম্মুরুদ খাতুন মসজিদ, মাদ্রাসা, লাইব্রেরী ও খানকা নির্মাণে আর্থিক সহযোগিতা করেন। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে খ্যাতিমান ছিলেন খলিফা মুস্তাদির উপপত্নী বানাফসা (মৃ-১২০১ খ্রি)। এই ধার্মিক ও বিদুষী নারী মসজিদ, খানকা ও ব্রীজ নির্মাণে দেদারসে অনুদান করেছেন। ইবনে আল জাওজী লিখেছেন- ‘উলেমা ও দরবেশদের জন্য তার হাত ছিলো খোলা। তিনি এদের জন্য খরচ করতেন দেদারসে। তিনি শুক-আল মাদ্রাসার পাশে নারী সুফিদের জন্য একটি খানকা প্রতিষ্ঠা করেন এবং একজন নারী সুফিকে সেই খানকার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন’।[29] নারীদের এরকম অসামান্য অবদান সত্ত্বেও খানকা, দরগা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে গ্রহণ করা হয়নি। তাঁরা অর্থনৈতিক অনুদান, স্থাপত্য নির্মাণ ও সুফি সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক কাঠামোকে দৃঢ় করলেও, বাস্তবে এই স্থানগুলোতে নারীদের প্রবেশ ও নেতৃত্ব সীমিত রাখা হয়েছে। সুফি শায়খদের অনেকেই নারীদের আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার অস্বীকার করেছেন, ফলে তাঁদের অবদান আড়ালে থেকে গেছে। রাজপরিবারের নারীরা দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারলেও সাধারণ নারী সুফিদের নাম ইতিহাসে খুব কমই এসেছে। এভাবে নারীরা পৃষ্ঠপোষকতা ও নেতৃত্বে সক্রিয় থাকলেও, খানকা ও দরগার ভেতরে তাদের স্বাগত জানানোর রেওয়াজ এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
খানকায় নারী
গবেষকগণ খানকার উদ্ভব, বিকাশ এবং এর ভূমিকা ও কার্যাবলী নিয়ে পুস্তকাদি লিখেছেন, আলোচনা করেছেন। সে-সকল গবেষণা এবং বর্তমান সময়কালের অভিজ্ঞতার আলোকে বোঝা যায় যে, মুসাফির সুফি, মজ্জুব কলন্দর, উলামা, আশ্রয়হীন মানুষ এবং এমনকি সাধারণ পথিকরাও এখানে অস্থায়ী আশ্রয় পেয়ে থাকেন। এ-সকল বর্ণনা পাঠ শেষে তাহেরা আফতাব কয়েকটি প্রশ্ন করেছেন। যেমন, খানকাগুলো কি আধ্যাত্মিকতা ও জ্ঞানের কেন্দ্র ছিল? এগুলো কি সুফিদের ওলায়া (আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব) ও সুলতানের উলায়াত (রাজনৈতিক কর্তৃত্ব)-এর মধ্যে দ্বন্দ্বের প্রতীক ছিল? এগুলো কি রাজকীয় দরবারের মতোই পুরুষদের কর্মকাণ্ডের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ছিল, যেখানে নারীদের ভূমিকা ছিল নগণ্য? আজ কি এই স্থাপনাগুলো ইসলামের অতীত মহিমার স্মারক ও গৌরবময় নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে?[30] তাহেরা এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন, নানাধরনের একাডেমিক ও ননএকাডেমিক বিবরণ গভীরভাবে অনুসন্ধান করে বলেছেন, ‘খানকাগুলো নারীদেরকে পবিত্র জগত থেকে দূরে সরিয়ে আরও বেশি করে জাগতিকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাই নারী ও খানকার সম্পর্ক একটি বৈধ আলোচনার বিষয়, কারণ এর ভেতরে ম্যাসকুলিনিটির উপস্থিতি প্রবল এবং এর ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ পুরুষদের নিয়ন্ত্রণে।[31]
কোরআন, হাদিস ও ফিকহের জ্ঞান প্রচার এবং আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে খানকাগুলোর বিকাশ ঘটেছিলো। আবার দ্রুতই এগুলো পথিক ও মুসাফিরদের আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে যা প্রশংসার দাবীদার কিন্তু একথাও সত্য যে, প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে সুফি সিলসিলার আধ্যাত্মিক বরকতের চেয়ে জাগতিক কর্তৃত্বের প্রতিফলক হয়ে ওঠে। সমসাময়িক শাসক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বয়ান উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করতে শুরু করে। ক্রমবর্ধমান জাগতিকতার প্রভাবে অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, খানকাগুলো ‘ইসলামের বাইরের’[32] জীবনধারাও প্রচার শুরু করে। যেখানে মুর্শিদ বা পীরের প্রতি অতিরিক্ত প্রশংসা, এমনকি প্রায় পূজার মতো আচরণকে উৎসাহিত ও চর্চা করা শুরু হয়। ফলে খানকার বিরুদ্ধে দ্রুতই নিন্দাসূচক বয়ান উৎপাদিত হতে থাকে যা আজও বিদ্যমান।
হাম্বলি ঘরানার আলেম ইবনে আল-জাওজী (মৃ ১২০০ খ্রি) খানকার জীবনকে ইসলামী ঐতিহ্যের বিপরীত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ এটি সন্ন্যাস জীবনকে উৎসাহিত করে এবং অত্যাচারী শাসকদের অবৈধ সম্পদ দ্বারা সমর্থিত বিলাসী জীবনযাপনকে প্রচার করে।
সুফি ঐতিহ্য ও আচার-আচরণ বিষয়ে অন্যতম নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ আওয়ারিফুল-মাআরিফ এর রচয়িতা শিহাবুদ্দীন আবু হাফস উমর সুহরাওয়ার্দী (মৃ. ১২৩৪)। তিনিও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খানকা নির্মাণকে সমর্থন করেননি। তিনি সেই সুফি শায়খদের সমালোচনা করেছেন যারা শাসক ও ধনী ব্যক্তিদের দেয়া অর্থে খানকা নির্মাণ ও পরিচালনা করতেন।[33]
সুফি সোহরাওয়ার্দীসহ আরো অসংখ্য ইসলামী গবেষক ও চিন্তকদের সমালোচনা সত্ত্বেও মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাক্তিগত ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চমৎকার সব খানকা গড়ে ওঠে। মোটাদাগে বারো শতক থেকে পুরুষ ও নারীদের জন্য সুফি আশ্রম প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো ছিল ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিকতা অনুশীলনের স্থান, একইসঙ্গে অভাবী নারীদের জন্য আশ্রয়স্থল—যেমন বিধবা শ্রেণী, যাদের বসবাসের জন্য নিজের কোন ঘর ছিলো না এমনকি যারা আত্মীয়স্বজনের সহায়তাও পেত না। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বাগদাদ, দামেস্ক, কায়রো ও মক্কায় পাওয়া যেত এবং কিছু নারী এগুলো নির্মাণ করেছিলেন।[34] জীবনীগ্রন্থগুলোতে প্রায় এক ডজন নারীর নাম উল্লেখ আছে যারা এ ধরনের খানকার প্রধান ছিলেন, তাঁদেরকে শাইখা বলা হতো। তাঁরা ছিলেন ধার্মিক ও শিক্ষিত নারী, নামাজ পরিচালনা করতেন, কোরআন তেলাওয়াত ও জিকিরের আসর আয়োজন করতেন এবং বাসিন্দাদের শিক্ষা ও উপদেশ দিতেন। খাদ্য ও আশ্রয় প্রদানের মতো ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব তাঁদের ছিল কি-না তা স্পষ্ট নয়। এসব খানকার কিছু প্রধান নারী অবিবাহিত ছিলেন, আবার কেউ-কেউ বিবাহিতও ছিলেন। ঐতিহাসিক বয়ানে দেখা যায়, পঞ্চদশ শতকে মক্কার জাহিরিয়া খানকাতে তিনজন নারী প্রধান ছিলেন। এদের মধ্যে শেষেরজন দানশীলতা, জ্ঞান ও প্রচারের কারণে এতটাই খ্যাতিমান ছিলেন যে, তাঁর ছেলেকে পরিচয় দেয়া হতো তাঁর নামের মাধ্যমে এবং তিনি ইবনে আল-শায়খা নামে পরিচিত হন।[35] এর পূর্বেও ১২৮৫ খ্রিস্টাব্দে কায়রোতে প্রতিষ্ঠিত রিবাত আল-বাগদাদিয়া নামে আরেকটি খানকার খোঁজ পাওয়া যায়, যার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সুলতান বেহবারের কন্যা তিথকার-বে খাতুন।[36] এছাড়া সুলতান আয়নালের (১৪৫৩-৬১ খ্রি) স্ত্রী উম্মে জয়নাব (মৃ-১৩১৫ খ্রি) শুধু বিধবাদের জন্য নির্মাণ করেন রিবাত-এ জাওজাত আয়নাল এবং হুসনা বেগম (মৃ-১৪৮৩ খ্রি) নামের এক নারীকে খানকাটির দায়িত্ব দেয়া হয়।[37]
তবে খানকাগুলোতে নারীদের এই উপস্থিতিকে অনেক ধর্মতাত্ত্বিক পণ্ডিতেরা খুব বেশী ভালো দৃষ্টিতে দেখেননি, যেমন– ইমাম আল গাজালী। কারা মুস্তাফা গাজালীর (মৃ. ১১১১) দুটি ফতোয়ার উল্লেখ করেছেন যার একটি আরবি ভাষায় এবং অন্যটি ফারসি ভাষায়। যেখানে খানকার জীবনযাপনের প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও শিষ্টাচার নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই ফতোয়া দুটিতে গাজালী ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, কোন কোন বড় ও ছোট পাপ একজন সুফিকে ওয়াকফ বা দানকৃত অর্থ গ্রহণ করা থেকে অযোগ্য করে তোলে। গাজালীর মতে, ছোট পাপগুলোর মধ্যে একটি ছিল নারীদের সঙ্গে একা বসা, এমনকি তা যদি মাঝে মাঝেও ঘটে থাকে তবুও।[38] এমনকি সুহরাওয়ার্দীর আওয়ারিফুল-মাআরিফ গ্রন্থেও খানকাতে অবস্থানকারী বা সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে কোথাও নারীদের ভূমিকা বা উপস্থিতির উল্লেখ নেই। তাহেরা আফতাবের ভাষ্যে, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, খানকা কেবল পুরুষদের জন্য নির্ধারিত একটি স্থান।[39]
মসজিদগুলিতে নারীদের প্রবেশাধিকার সীমিত, প্রায় একই অবস্থা বর্তমান সময়ের খানকা ও দরগাগুলোতেও। প্রবেশাধিকারের এই ‘সীমিত’ অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন অনেক নারী। যেমন, পাকিস্তানের প্রসিদ্ধ সুফি গায়িকা আবিদা পারভিন। তিনি দিল্লীস্থিত নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগা জেয়ারতে যান প্রতিবছর, কিন্তু অদ্ভুতভাবে কোন নারীকে সেখানে প্রবেশাধিকার দেয়া হয় না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
‘দিল্লী গেলেই আমি নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগায় নামাজ পড়ি। প্রতি বছরই একই ঘটনা। অদৃশ্য এক টান এবং গভীর ভালোবাসায় আমি নিজামউদ্দিনের দরগায় প্রবেশ করি, কিন্তু নির্দিষ্ট দূরত্বের পর তার কবরের আগে একটি ব্যারিকেট দেয়া থাকে। এরপরে নারীদের প্রবেশাধিকার থাকে না’।[40]
একইরকম পরিস্থিতি বিদ্যমান বাংলাদেশের বাগেরহাটস্থিত হযরত খানজাহান আলীর মাজারেও। মূল কবরের চারদিকে দুইস্তর বিশিষ্ট বেষ্টনী দেয়া। প্রথম বেষ্টনী পার হয়ে নারী-পুরুষ সবাই যেতে পারে কিন্তু দ্বিতীয় বেষ্টনীর মধ্যে শুধু পুরুষের প্রবেশাধিকার আছে। নারীরা এই মহান সুফির দরগায় মানত করে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মোনাজাত করে। প্রথম ও দ্বিতীয় বেষ্টনীর মাঝের ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলে কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না।
জনপরিসরে নৈতিকতা শিক্ষা দেয়ার অন্যতম উন্মুক্ত স্থান ছিল খানকা। তত্ত্বগতভাবে নারী-পুরুষ সবারই প্রবেশাধিকার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে পিতৃতান্ত্রিক আধিপত্য ও পুরুষদের অবাধ কর্তৃত্বের কারণে নারীরা বঞ্চিত হয়েছেন। এর ফলে তারা শুধু পবিত্র স্থান থেকেই নয়, জনপরিসর থেকেও দূরে সরে গেছেন। এই ইতিহাসের সূচনা ঠিক কবে থেকে তা স্পষ্ট নয়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব নারীদের উপর গভীরভাবে পড়েছে। তাদেরকে জনপরিসরে জ্ঞানচর্চা, প্রচার এবং একইসাথে আধ্যত্ম্য চর্চা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন ওঠে, নারীদের কি এসব আধ্যাত্মিক আশ্রমে প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, যা নৈতিক আলোচনার জন্য উন্মুক্ত সমাবেশ হিসেবেও কাজ করত? তাঁদের প্রবেশে কি কোনো বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল এই আশ্রমগুলোতে, যেগুলো মূলত সুফিদের মধ্যে সম্প্রীতি ও সম্প্রদায়বোধ জাগ্রত করতে এবং জনগণের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি বিকাশের জন্য নির্মিত হয়েছিল?
দক্ষিণ এশীয় সুফি পাঠের ঘনিষ্ঠ পর্যালোচনায় দেখা যায়, বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে নারীরা খানকার দৈনন্দিন জীবনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন। সুফি গবেষক ও ঐতিহাসিক খালিক আহমেদ নিজামী উত্তর ভারতের সুফিদের প্রায় সব উৎসগুলো অধ্যয়ন করেছেন। তিনি লিখেছেন, শায়খ নিজামুদ্দীন আউলিয়ার খানকার দরজা নারীদের জন্যও খোলা ছিল এবং তাঁর বাইত-ই আম (সাধারণ মানুষের ঘর)-এ নারীদের প্রবেশাধিকার ছিল। হামিদ বিন ফাজলুল্লাহ জামালির লেখা বই সিয়ারুল আরেফিন-এ এক দরিদ্র নারীর ঘটনা উল্লেখ আছে, যিনি নিজামউদ্দিন আউলিয়ার ঘিয়াসপুর খানকার আশেপাশে সুতা কেটে সামান্য উপার্জন করতেন। গল্পটি ঘিয়াসপুরের প্রাথমিক সময়ের, যখন খানকার সম্পদ ছিলো খুবই অপ্রতুল। গল্পটির শেষে দেখা যায় এই নারীর বদৌলতে, তার কেনা একমুঠো আটার কারণে খানকার দান ও উপহারের (ফুতুহ) দরজা খুলে যায়।[41] শায়খ ফারিদুদ্দীন মাসউদ গঞ্জেশকরের (মৃ. ১২৬৫) জামায়াতখানায় বিবি রানি নামের এক নারী থাকতেন। তিনি ফরিদুদ্দিনের বায়াত নেয়া একজন মুরিদ এবং সিয়ারুল আউলিয়া-এর লেখক আমীর খুরদ-এর দাদী। তিনি এই খানকায় আসা ভক্ত আশেকানদের সেবা করতেন।[42]
হযরত শাহ বিহারি চিশতি বুরহানপুরির (মৃ. ৯০৭/১৫০১) একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন আবদুল জব্বার খান মুলকাপুরী। ঘটনাটি থেকে বোঝা যায় যে, খানকা প্রাঙ্গণে নারীরা শুধুমাত্র উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো ব্যাপারটা এমন না বরং তাদেরকে খানকার তত্ত্বাবধান ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বও দেয়া হতো। অযোদ্ধা থেকে আগত এই সুফি ফরিদুদ্দিন গঞ্জেশকর পরিবারের সাথে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি ফরিদুদ্দিনের খানকার তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন তার ধার্মিক বড় বোনকে। এছাড়া খাদিজা বিবি নামে সপ্তদশ শতকে চিশতিয়া সিলসিলার এক নারীর নাম জানা যায় যিনি মান্ডুতে একটি দরগার ব্যাবস্থাপকের দায়িত্ব পালন করতেন। গুজরাটের পাতনের আরেকটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ঘৌসি সাত্তারি। তার বিবরণে ১৫৯৬–৯৭ খ্রিস্টাব্দে মখদুম জাহানিয়া জাহাঙ্গশতের বংশধর শায়খ হাঞ্জা বুখারির মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ আছে। মৃত্যুর পর তাঁকে বাড়ির উঠোনের পাশেই সমাহিত করা হয় এবং তাঁর বোন বুজুর্গ সেই দরগাহের মুজাওয়ার বা পরিচর্যাকারী হন। তিনি ছিলেন গভীর ধ্যান ও আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন এক ধার্মিক নারী। ঘৌসি সাত্তারি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন, তিনি লিখেছেন যে, তাঁর মধ্যে আধ্যাত্মিক মহত্ত্ব (ওলায়াত) স্পষ্টভাবে প্রকাশিত ছিল।[43]
অষ্টাদশ শতক পর্যন্তও শাহ কালিমুল্লাহ জাহানাবাদি (মৃ. ১৭২৯) দিল্লিতে তাঁর খানকায় নারীদের প্রবেশের অনুমতি দিতেন। দারিদ্র্যতা ও ঋণের কারণে এই সুফির আলাদা কোন খানকা ছিল না; তিনি নিজের বাড়িকেই খানকা হিসেবে ব্যবহার করতেন। এসবের বাইরেও আরেক শ্রেণির নারী ছিলেন যাদের উপস্থিতি সুফি ঐতিহ্যিক গবেষণায় একদমই নেই। এই শ্রেণীর নারীরা খানকার কাজের জন্য নিযুক্ত কর্মী। খানকা বা দরগা ঝাড়ু দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, রান্না করা এবং মেঝে মুছে দেয়া ইত্যাদি কাজগুলোই এই নারীরা করে থাকেন। এধরনের নারীদের উপস্থিতি ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া এমনকি মিশর ও সেন্ট্রাল এশিয়াতে গড়ে ওঠা খানকাতে বিদ্যমান আছে। লেখকের সাথে খানজাহান আলী মাজারের বাইরে সাধারণ দর্শনার্থীদের জুতো সংগ্রহে রাখা এক নারীর সাথে কথা হয়েছিলো। তার মতে, তিনি জুতোগুলোকে নিরাপদে রাখেন ও হাদিয়া নেন ঠিকই কিন্তু তিনি এই কাজকে ইবাদতের শামিল বলে মনে করেন। ইতিহাসে নারীরা খানকার ভেতরে নানা কাজ করেছেন, যেমন রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সেবা, এমনকি আধ্যাত্মিক সাধনায় অংশগ্রহণও করেছেন। তাঁদের এধরনের শারীরিক উপস্থিতি নিয়ে আসলেই বড় কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু নারীরা নেতৃত্ব বা সমান মর্যাদা কিংবা যখন-ই খলিফার দাবি করতেন অথবা এসকল নেতৃত্ব বিষয়ক পদমর্যাদার যোগ্য হতেন তখনই সমস্যা তৈরি হতো। অর্থাৎ তাঁরা যদি শুধু অধীনস্থ ভূমিকা পালন করতেন—যেমন সেবা বা কাজের দায়িত্ব—তাহলে সমাজ তা মেনে নিত। কিন্তু তারা যদি আধ্যাত্মিক গুরু বা পুরুষ সুফিদের সমান মর্যাদা দাবি করতেন, তখনই বিরোধ তৈরি হতো।
নারী ‘খলিফা’
আধুনিক সুফি ঐতিহ্যিক চর্চার ধরণ, সমসাময়িক ক্ষমতা কাঠামোর সাথে তার সম্পর্ক, ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করেছেন রবার্ট রোজেনহাল। তার গবেষণার একটি অংশ ছিলো পাকিস্তান কেন্দ্রিক চিশতি-সাবেরী ধারা। ধারাটির গুরুত্বপূর্ণ শায়খদের মধ্যে ছিলেন রাজনৈতিক কর্মী এবং দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা হাজি ইমদাদুল্লাহ ও রশিদ আহমদ গাঙ্গোহীর মতো আলেমরা। এই আলেমরা সাধারণ জনগণের কণ্ঠস্বরও ছিলেন। যেকারণে চিশতি সাবেরি ধারাটি শুরু থেকেই বিশ্বাস করে যে, একজন সুফি শায়খকে হতে হবে নৈতিক গুণাবলীর আদর্শ এবং একইসঙ্গে তার সম্প্রদায়ের গণমুখী মুখপাত্র।[44] পাকিস্তানে, এমনকি বাংলাদেশে চর্চিত সমসাময়িক সুফি ঐতিহ্যকে মোটা দাগে দুটি দিক সামাল দিতে হয়, প্রথমত চিরায়ত আধ্যাত্ম চর্চা, যা সুফি ঐতিহ্যের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদী শক্তি ও সালাফি-ওয়াহাবি ভাবনার প্রভাব ও উত্থান মোকাবেলা। দ্বিতীয় ভাবনাকে কেলি পেম্বারটন সুফি ঐতিহ্যের ‘বিতর্কিত প্রকৃতি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি রোজেনহালের বক্তব্যের আলোকে তথা পাকিস্তানে বলবৎ বর্তমান সুফি চর্চার ধারা সম্পর্কে বলেন, ‘এই ধারা সমকালীন সুফি ঐতিহ্যকে মুসলিম রক্ষণশীল (তালিবান ও ওয়াহাবি) এবং ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদীদের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। যে-কারণে সুফিরা মর্ডানিটির কিছু প্রতীককে নিজেদের মতো ব্যবহার করেছেন [যেমন- গণতন্ত্র, ভোট, জাতীয়তাবাদ, পাকিস্তানবাদ ইত্যাদি]। অভিযোজনের এই প্রক্রিয়াটির মাধ্যমে সুফি ঐতিহ্য ইসলামী মূলধারা হিসেবে উপস্থাপিত হতে সক্ষম হয়েছে’।[45]
গবেষক রোজেনহালের মতে একজন সুফি শায়খের প্রকৃতি দ্বিমুখী এবং পরিবর্তনশীল। অর্থাৎ অতীতের একজন সুফি বা আরেফ-আরেফার জীবন বর্তমানের সুফি-ওলীদের নৈতিক আচরণের ধারা কিংবা আদর্শ হতে পারে। আবার অতীতের সুফি-আরেফ-আরেফাদের বলা বক্তব্য, আচরণ ইত্যাদি সামাজিকভাবে এবং জনসাধারণের চাহিদা অনুযায়ী অভিযোজিতও হতে পারে।[46] এর বড় উদাহরণ ওয়ায়েল হাল্লাকের বর্ণনায় ইমাম গাজালির শরীয়া সম্পর্কিত ধারণা। শরীয়াকে সুফি ঐতিহ্যে খানিক নেতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা আছে এবং সাধারণ মুসলিম জনমানসে শরীয়াকে খানিক ইতিবাচকভাবে দেখার নজিরও লক্ষ্যণীয়। যে-কারণে আধুনিক ক্ষমতা কাঠামো, রাষ্ট্রীয় ধরন-প্রকৃতি, গণমানুষের অভিপ্রায় ইত্যাদির সাথে গাজালির মতামতকে অভিযোজন করে হাল্লাক দেখান, ‘শরীয়া হলো একটি মনো-আধ্যাত্মিক প্রকল্প। এটি যদি ইসলামী শাসনের অবিসংবাদিত আইন প্রয়োগকারী ক্ষমতা হয় তাহলে এই ‘শাসন’ কেবল আইন, নৈতিকতা ও তাদের জৈব-সম্মিলন ছিল না; তা একইসাথে ছিলো জগত সম্পর্কে এক মরমী উপলব্ধি। এই উপলব্ধি এমন এক সমাজে গভীরভাবে প্রথিত ছিলো, যার প্রতিনিধিত্ব করতো সুফি-ফকিহদের একটি শ্রেণী। এই শ্রেণী জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আইনী, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের মধ্যে কোন পার্থক্য করত না’।[47]
চূড়ান্তরূপে গতিশীল হাল জমানার রাষ্ট্রীয়-ধর্মীয় বোঝাপড়ার প্রেক্ষাপটে নারীরা আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব অর্জন ও প্রতিনিধিত্বকারী সত্ত্বা হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা চাইতে পারে। মূলত প্রতিনিধিত্বকারী নারী সুফিদের শায়খ, পীর বা খলিফা হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া ইসলামী তুরাস ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব-অভিযোজনের ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে। তাঁদেরকে প্রথমে নিজেদের তরিকার মৌখিক ও লিখিত বর্ণনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে হয় এবং ইসলামি মূলধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ থাকতে হয়। অনেক সময় কার্যত পীর হিসেবে কাজ করলেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেতে শায়খের অনুমোদন জরুরি হয়। আবার অনেক সময় একজন পীর চাইলেও তার নারী মুরিদকে খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারেন না। এক্ষেত্রে যতটা না ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা তারচেয়ে বেশী ক্রিয়াশীল প্রচলিত সামাজিক ক্ষমতার বিন্যাস। যেমন, মূল্লাহ শাহ তার অন্যতম প্রধান মুরিদ এবং পৃষ্ঠপোষক জাহানারার ব্যাপারে দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘যদি বেগম সাহেব পুরুষ হতেন, তবে তিনি আমার উত্তরসূরি হতেন’।[48] এ-সকল নানা দিক বিবেচনা করে কেলি পেম্বারটনের প্রস্তাবনা দেন যে, নারীরা সুফি মহল ও জনপরিসরে শায়খ, পীর বা খলিফা শব্দগুলোর অস্পষ্ট অর্থকে কাজে লাগিয়ে আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।[49] এই গবেষক বিহার ও আজমীরের নারী সুফিদের উপর পর্যালোচনা করে আরো বলেন, ‘নারীদের জন্য শায়খ নয় বরং খলিফার ভূমিকায় থাকা অধিকতর যুক্তিযুক্ত’।[50]
বিভিন্ন সুফি তরিকা ভেদে শায়খের কর্তৃত্বের ধরণ ও অর্থ ভিন্নভিন্ন। রাজনৈতিক খলিফার সাথে নবীজীর সম্পর্ক এবং সুফি খলিফার শায়খের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে। সুফি সাহিত্যে খলিফা হলো শায়খের মনোনীত উত্তরসূরি, তরিকার ঐতিহ্যের রক্ষক এবং তরিকা প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত। খলিফা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবেও কাজ করেন। যেমন- তিনি মুরিদদেরকে শায়খের অনুসারী হিসেবে দীক্ষা দিতে পারেন এবং তাঁদের আধ্যাত্মিক উন্নয়নে সহায়তা করতে পারেন। তবে তিনি শায়খের সমান আধ্যাত্মিক স্তরে নন; বরং শায়খের কর্তৃত্বাধীন থেকে কাজ করেন। খলিফা অন্য মুরিদদের তরিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন, হয় শায়খের মুরিদ হিসেবে, নয়তো নিজের মুরিদ হিসেবে। তবে সবই শায়খের অধীন ‘faith community’র মধ্যে। সাধারণ অর্থে খলিফা সর্বদা শায়খের অধীনস্থ এবং তার নির্দেশের অধীন। শায়খ যদি ইন্তেকাল করেন, তবুও তাঁর উপস্থিতি ও কর্তৃত্ব বজায় থাকে, যা তিনি আংশিকভাবে স্বপ্নের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তাই বলা যায় যে, খলিফাকে শায়খের কর্তৃত্বাধীন থাকতে হবে, তা সুফি মহাজাগতিক ও আধ্যাত্মিক ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং যেখানে পরিপূর্ণ খলিফা মানুষের উপলব্ধির পর্দা ভেদ করতে সক্ষম হন।[51]
কিন্তু বাস্তবে উদাহরণগুলো অন্যরকম যেখানে দেখা যায়, পুরুষ খলিফারা তাদের শায়খের অনুমোদনের সীমা ছাড়িয়ে কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেন। নিজেরাই শায়খের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে একই কাজ করার প্রমাণ তুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট। কোন কোন নারী সুফির ক্ষেত্রে বলা হয়, তারা নিজেদের মুরিদ তৈরি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে নিজেদের শিক্ষা প্রচার করেছিলেন। কিছু নারী খলিফা পুরুষ ও নারী উভয়কেই আল্লাহর পথে দাওয়াত দিয়েছেন আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁদেরকে শুধু নারী মুরিদদেরকে দিকনির্দেশনা দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। সুফি ঐতিহ্যের তাবাকাত ও মাকতুবাত সাহিত্যে যেসব নারীকে ইসলামের শায়খদের মধ্যে গণনা করা হয়েছে, তাদেরকে প্রায়ই তাদের শায়খদের খলিফা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অবশ্য প্রসিদ্ধ কয়েকজন পুরুষ শায়খদের জীবনীতে তাঁদের নারী খলিফাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন: খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির কন্যা বিবি হাফিজ জামাল। রাজপুত বংশোদ্ভূত মায়ের এই সন্তানকে মঈনুদ্দীন চিশতী খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।[52] চতুর্দশ শতকের জীবনীগ্রন্থ দলিল আল-আরিফিন, এলাহি দিয়া চিশতি উসমানীর সাইর আল-আকতাব (১৬৪৭) এবং সাম্প্রতিক সময়ের বাজম-ই সুফিয়া (১৯৭০)- এই তিনটি গ্রন্থেই বিবি হাফিজ জামালকে তাঁর পিতার চল্লিশ জন খলিফার মধ্যে একমাত্র নারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাঁকে আরও দুটি গ্রন্থেও খলিফা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন, শতেরো শতকের সুফি লেখক আব্দুর রহমান চিশতীর মিরাত আল-ইসরার (১৬৫৪) এবং মুফতি গোলাম সারোয়ার লাহোরির (১৮৩৭-১৮৯০খ্রি) খাজানাত আল-আসফিয়া (১৮৬৫)। কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, বিবি হাফিজ জামাল ছিলেন অল্প কয়েকজন সুফি নারীর একজন যিনি মুরিদ তৈরি করার অনুমোদন পেয়েছিলেন, তবে এই অনুমোদন কেবল নারীদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল কি-না তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েছে। কেলি পেম্বারটনের মতে, হাফিজ জামালের মতো অন্য নারীদেরকে মুরিদ তৈরি করার অনুমতি দেয়া হলেও তাঁদেরকে স্বাধীনভাবে শায়খ হিসেবে আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে দেয়া হয়নি, যদিও তাঁদের যোগ্যতা ‘খলিফা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার মতো ছিল।[53] উদাহরণস্বরূপ, পঞ্চদশ শতকের চিশতি শায়খ হযরত আবদুল কুদ্দুস গঙ্গোহী তার নারী শিষ্যা বড় বোন ইসলাম খাতুনকে একটি চিঠি প্রেরণ করেন। সেখানে বলা বক্তব্যে বোঝা যায় যে, সুফি তরিকার প্রধান আগ্রহী হলেও নারীদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে শায়খ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সমস্যাজনক ছিল। তিনি লিখেছেন,
”আমার প্রিয়, পবিত্র ও পর্দানশীন বোন। তুমি সেজদায় গিয়ে ফানা হও এবং সর্বদা নামাজে রত থাকো, তুমি দুই জগতের নারীদের গৌরব। …তুমি! আমার বোন! আল্লাহর বন্ধু, ওলীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করার সাহস দেখিয়েছো এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শনের ধারা চালানোর জন্য তুমি পরিপূর্ণ যোগ্য। কিন্তু যেহেতু এটি একটি দাওয়াতি কাজ এবং নারীরা তা করেন না, তাই ‘পীরদের জামা’ তোমার কাছে পাঠানো হয়নি। শায়খদের বিশেষ পোশাক খিরকা তোমাকে দেওয়া হয়নি এবং তোমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে দাওয়াত (দীক্ষা) দেয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়নি। তবে যদি কোনো আন্তরিক নারী বা পুরুষ তোমার দাওয়াতি পথের প্রতি আগ্রহ দেখায় তবে তুমি নারীদেরকে সামনাসামনি বা অনুপস্থিতিতে টুপি ও দামান দিতে পারো এবং পুরুষদেরকে তাদের অনুপস্থিতিতে দাওয়াত দিবে। তুমি শাজরানামা (সুফিদের বংশতালিকা) লিখে দিতে পারো এবং আগ্রহী নারীপুরুষকে প্রদান করে তোমার পীরের মুরিদ বানাতে পারো।”[54]
এই চিঠিতে আবদুল কুদ্দুস গঙ্গোহী সরাসরি ‘খলিফা’, ‘খিলাফত’ শব্দগুলো ব্যবহার করেননি। তবে ইসলাম খাতুনকে সীমিত ধরনের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব দেয়ার ইঙ্গিত এখানে রয়েছে। নারী ও পুরুষ উভয়কেই মুরিদ হিসেবে দীক্ষা দেয়ার অনুমতি তাঁকে দেয়া হয়েছে। তবে পুরুষদেরকে তাদের ‘অনুপস্থিতিতে’ দাওয়াত দিতে বলেছেন, বিষয়টিকে গাংগোহীর দিক থেকে একজন নারীর জন্য পর্দা হেতু ‘শারীরিক বিচ্ছিন্নতা’[55] হিসেবে চিহ্নিত করেছেন কেরি পেম্বারটন। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, পীরের পরামর্শে ইসলাম খাতুন পুরুষদেরকে আড়ালে থেকে দীক্ষা দিতেন অথবা অন্য কাউকে (হতে পারে কোনো পুরুষ আত্মীয়) নিযুক্ত করতে হতো, যিনি ইসলাম খাতুনের ‘প্রতীকী’ খলিফা হয়ে দাওয়াত দিতে পারতেন। চিশতিয়া তরিকার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় সিয়ার-ই মুহাম্মদী গ্রন্থে, যা পরে তারীখ-ই হাবীবী’তে অন্তর্ভুক্ত হয়। গ্রন্থটিতে খাজা গিসু দ্বারাজ বিবৃতি দেন যে, শায়খ নাসিরুদ্দিন চেরাগ-ই দিল্লী (মৃ- ১৩৫৬ খ্রি) ইন্তেকালের সময় চারজন ব্যক্তিকে খিলাফত দান করে গিয়েছিলেন, তন্মধ্যে একজন ছিলেন নারী।[56] এ তরিকায় নারীদের খলিফা হয়ে আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব দেয়ার উদাহরণ খুবই কম কিন্তু নকশাবন্দীয়া তরিকায় অনেক নজির দেখা যায়।
তরিকাটির একজন প্রসিদ্ধ শায়খ মির্জা মাজহার জান-ই জানান (মৃ-১৭৮১খ্রি), অন্তত দুইজন নারীকে তাঁর খলিফা হিসেবে মনোনীত করেছিলেন এবং তাঁদেরকে নিজেদের মুরিদ তৈরি করার অনুমোদন দিয়েছিলেন।[57] একজন হলেন তাঁর স্ত্রী এবং আরেকজন বিবি আজিবা। বিবি আজিবা ছিলেন মির্জা মাজহারের ঘনিষ্ঠ শিষ্য ও খলিফা কাজি সানাউল্লাহ পানিপথির স্ত্রী।
মূলত ভারতীয় অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বেশ কিছু ধারায় নারীদের খলিফা হয়ে ওঠার নজির রয়েছে। তবে আরো কিছু ধারায়ও নারীদেরকে নেতৃত্বের আসনে দেখা যায়। যেমন- তুরস্কে উৎপন্ন হওয়া মৌলভিয়া তরিকা। মৌলানা জালালুদ্দিন রুমির ভক্ত, তার স্ত্রী কেরা খাতুনের ঘনিষ্ঠজন এবং সুলতান ওয়ালাদের স্ত্রী ফাতিমার প্রায় সমবয়সী নারী খুশলেখা কোনাভি। রুমির ওফাতের পর কোনিয়ার তাওকাত শহরে একটি খানকা গড়ে ওঠে, এই খানকার প্রধান খলিফা ছিলেন এই নারী সুফি। যদিও সুলতান ওয়ালাদ পুত্র আরিফ চেলেবির এক শিষ্যের কারণে এই নারী সুফি খুব বেশিদিন খলিফা হিসেবে খানকার দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।[58] সুলতান বায়েজীদের স্ত্রী দেভরেত খাতুন, তিনি ছিলেন রুমির একজন ভক্ত এবং খুবই ধার্মিক একজন নারী। তার কবর বসরাতে। ধীরে-ধীরে এই করবরটি একটি তীর্থস্থানে রূপ নেয় এবং এখানে একটি খানকা গড়ে ওঠে এবং খানকাটির প্রধান খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন দস্তিনা খাতুন নামক এক নারী। দস্তিনা খাতুনের ওফাতের পর এই খানকার খলিফা হিসেবে দায়িত্ব পান গুনেস খাতুন। তিনি দীর্ঘ জোব্বা পরতেন, কয়েকস্তর বিশিষ্ঠ দরবারী টুপি পরে মজলিসে এসে ভক্তদের শিক্ষা দিতেন। এই নারী সুফির কাছে পুরুষ-নারী, জাত-ধর্মের কোন ভেদাভেদ ছিলো না, সবাইকে একত্রে শিক্ষা দিতেন। এমনকি মৌলভিয়া তরিকার বিশেষ ঘূর্ণিনাচকে তিনি নিজে পরিচালনা করতেন। আবার ‘মুকাবালা’ নামে এই তরিকার আরেকটি বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা ছিলো। যেখানে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সামা গান গাওয়া হতো, সেটিও তিনি নিজে পরিচালনা করতেন।[59] এছাড়া সমসাময়িক কালে আরো কিছু তরিকার খোঁজ পাওয়া যায় যেখানে নারীদের খলিফার দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। যেমন: রিফায়ি তরিকা, নিয়ামাতুল্লাহি তরিকা, ইত্যাদি। কানাডা ও দক্ষিণ আমেরিকায় প্রভাববিস্তারকারী উল্লেখিত তরিকা দুটিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী খলিফার উপস্থিতি আছে।[60]
একথা অস্বীকারের কোন সুযোগ নেই যে, সুফি ঐতিহ্যে নারীদের খলিফা হয়ে ওঠার প্রসঙ্গ খুবই সীমিত এবং বিরলভাবে আলোচিত। অধিকাংশ সুফি সিলসিলায় নেতৃত্ব ও খিলাফত পুরুষদের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। ফলে নারীদের ভূমিকা মূলত আধ্যাত্মিক সাধনা, শিক্ষা ও খানকার ভেতরে সীমাবদ্ধ থেকেছে। তবুও ইতিহাসে কিছু ব্যতিক্রমী উদাহরণ পাওয়া যায়, যা উপরে বর্ণনা করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের চট্টগ্রামস্থিত মাইজভাণ্ডারী তরিকার একটি খণ্ডিত অংশে নারীদের খলিফা হয়ে ওঠার উদাহরণ পাওয়া যায়। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, নারীরা সম্পূর্ণভাবে বাদ পড়েননি বরং তাঁদের আধ্যাত্মিক সাধনা ও প্রভাব সুফি সমাজে স্বীকৃত ছিল। তবে সামাজিক কাঠামো, পর্দার বিধি এবং নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁদের খিলাফত প্রাপ্তির ঘটনা খুব বেশি বিস্তৃত হয়নি। আধুনিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হয়তো অবাক করার মতো মনে হতে পারে, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে সুফি ঐতিহ্যে নারীদের নেতৃত্বের প্রসঙ্গ একটি ব্যতিক্রমী আলোচনার বিষয় হিসেবেই থেকে গেছে, যে-কারণে নারী সুফি গবেষক তাহেরা আফতাব বিষয়টিকে ‘মানব অভিজ্ঞতার ব্যাতিক্রম অংশ’[61] হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
নারীদের খলিফা হয়ে ওঠার প্রসঙ্গ সুফি ঐতিহ্যে ব্যতিক্রমী আলোচনার বিষয় হিসেবেই থেকে গেছে। তবে নারীদের আধ্যাত্মিক উপস্থিতি কেবল নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা কিংবা খানকাকেন্দ্রিক ‘সহযোগী’ হিসেবে আবদ্ধ ছিল না। বরং তাঁদের ভূমিকা খানকার সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে বহুবিধভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সুফি দরবেশদের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক, পরিচর্যা এবং খানকার পরিবেশে তাঁদের অবদান সুফি সমাজে এক অনন্য মাত্রা তৈরি করেছে।