মুখবন্ধ
ডক্টর মোহাম্মদ গোলাম রসুল বাংলাদেশের ইতিহাস একাডেমিতে পরিচিত নাম। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের তৎকালীন রিডার ডক্টর কামরুদ্দীনের অধীনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর থিসিসের শিরোনাম: Chisti-Nizami Sufi Order of Bengal. ডিগ্রী অর্জনের বহুদিন পর তাঁর থিসিসটি গ্রন্থাকারে দিল্লি থেকে প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। এই বইয়ের সপ্তম অধ্যায়: Chishti Attitude to Government and Politics— বর্তমান রচনাটি এই অধ্যায়ের বাংলা অনুবাদ। ডক্টর রসুলের থিসিসটি বাংলায় চিশতিয়া-নিজামিয়া সিলসিলার ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য বুঝতে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
ক্ষমতা ও রাজনীতির প্রতি চিশতিয়া তরিকার সুফিদের একটি বিচ্ছিন্নতা, কখনো কখনো বৈরীভাব ঐতিহাসিকভাবে সত্য। এই সত্যের একটি তুলনামূলক সুনির্দিষ্ট ও তথ্যবহুল আলোচনা উঠে এসেছে ডক্টর রসুলের বর্তমান লেখায়। আবার ক্ষমতা ও রাজনীতির প্রতি চিশতিয়া তরিকার সুফিদের দৃষ্টিভঙ্গি যে সবসময় একইরকম ছিল না তারও একাধিক নজির হাজির করা হয়েছে। ফলে, লেখাটি কেবল ঐতিহাসিক সত্যকে সুনির্দিষ্ট তথ্যের মোড়কে প্রতিষ্ঠিত করেনি, বরং তাকে চ্যালেঞ্জও করেছে। গবেষকদের জন্য তো বটেই, সুফি-সমাজের প্রতি আগ্রহী পাঠকদের জন্যও লেখাটি উপাদেয় হতে পারে।
***
চিশতিয়া তরিকার সুফিগণ রাজনৈতিক বিষয় ও কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনযাপন করতে পছন্দ করতেন এবং ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত— রাজকুমার/শাহজাদা ও অভিজাতদের সঙ্গে যে-কোনো ধরনের যোগাযোগ এড়িয়ে চলতেন। কারণ তারা মনে করতেন যে, ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত অভিজাতদের সঙ্গে মেলামেশা তাঁদের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য ক্ষতিকর। তাঁরা কখনো সুলতান ও অভিজাতদের কাছে কোনো ধরনের অনুগ্রহ চাননি এবং তাঁদের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সহায়তা বা জায়গির গ্রহণের প্রস্তাবও কখনো গ্রহণ করেননি।
খাজা আবু মুহাম্মদ চিশতি এক শাহজাদার উপঢৌকন গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মন্তব্য করেছিলেন:
از خواجگان ما از پنہاں کسی قبول نه کرده است
আমাদের পূর্বসূরী সুফিগণ এমন প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।[1]
খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতীর প্রখ্যাত খলিফা খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকী সুলতান ইলতুৎমিশের কাছ থেকে জায়গির গ্রহণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।[2]
খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতীর আরেক খলিফা শায়খ হামিদুদ্দীনও একইরকম দারিদ্র্য ও সংযমের জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর আত্মসংযম ও দারিদ্র্যে মুগ্ধ হয়ে নাগোরের প্রশাসক তাঁকে এক টুকরো জমি ও কিছু নগদ অর্থ উপহার দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সুলতান ইলতুৎমিশ যখন বিষয়টি জানতে পারলেন, তখন তিনি ৫০০ টাকা এবং একটি গ্রামের মালিকানা কনফার্ম করে একটি ফরমান পাঠান। কিন্তু শায়খ ও তাঁর স্ত্রী সুলতানের সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এবং রাজকীয় অনুগ্রহের মাধ্যমে আরাম-আয়েশের জীবনের চেয়ে দারিদ্র্য ও সংযমের জীবন বেছে নেন।[3]
শায়খ ফরিদুদ্দীন গঞ্জেশকর (যিনি বাবা ফরিদ নামেও পরিচিত) সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবনের (১২৪৬-১২৬৬ খ্রিষ্টাব্দ) পক্ষ থেকে কয়েকটি গ্রামের মালিকানা উপহার হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।[4]
শায়খ নিজামুদ্দীন আউলিয়া ইমামতের পদ গ্রহণ করেননি। বিনীতভাবে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে শায়খ বলেছিলেন: “নামাজই আমার একমাত্র মূল্যবান সম্পদ, আর সুলতান আমাকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ করে আমার কাছ থেকে সেটিও কেড়ে নিতে চান।”[5]
এই প্রত্যাখ্যানের পরেও সুলতান বলবন শায়খকে প্রধান কাজি বা কাজি আল-কুজাতের পদের আরেকটি প্রস্তাব দিয়ে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছিলেন। এই প্রস্তাবটিও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।[6]
শায়খ নিজামুদ্দীন আউলিয়া ছয়জন সুলতানের রাজত্বকাল পার করেছেন, কিন্তু কখনোই তাদের অনুগ্রহ বা অসন্তোষের পরোয়া করেননি। সুলতান আলাউদ্দীন খিলজি একবার কোনো এক রাজনৈতিক বিষয়ে পরামর্শ নেয়ার জন্য তাঁর পুত্র খিজির খানকে শায়খের কাছে পাঠিয়েছিলেন।[7] শায়খকে রাজনীতিতে টেনে আনার জন্য সুলতানের এই প্রচেষ্টায় তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। শায়খ তাঁর আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক শায়খ ফরিদুদ্দীনের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন, যিনি উপদেশ দিয়েছিলেন যে, কোনো ফকিরের রাজা ও অভিজাতদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ রাখা উচিত নয়; যদি কেউ তা করে, তবে তার পরিণতি অত্যন্ত শোচনীয় হবে।[8]
প্রাথমিক দিনগুলোতে শায়খ নিজামুদ্দীন অত্যন্ত দরিদ্র ও সংযত জীবনযাপন করেছিলেন। শায়খ এক টাকা দরে একটি তরমুজ কিংবা দুই সের রুটিও কিনতে পারতেন না এবং সেগুলো ছাড়াই তাঁকে দিন কাটাতে হতো।[9]
সুলতান জালালুদ্দীন খিলজি শায়খকে কয়েকটি গ্রাম উপহার দিতে চেয়েছিলেন। তাঁর মুরিদ ও খলিফাগণ—যারা দীর্ঘদিন ধরে অভাব ও কষ্ট সহ্য করে আসছিলেন—শায়খকে প্রস্তাবটি গ্রহণ করার জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তিনি তাঁর শিষ্যদের বলেছিলেন, প্রস্তাবটি ভালো লাগলে তারা যেন খানকাহ ছেড়ে চলে যায়, তবুও শায়খ তাদের অনুরোধ বা প্ররোচনার কাছে মাথা নত করবেন না। শায়খ আমীর খুরদের দাদার প্রশংসা করেছিলেন, যিনি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পেরেছিলেন।[10]
সুলতান আলাউদ্দীন খিলজিও শায়খের নিকট কয়েকটি গ্রাম ও বাগান জায়গির হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু তিনি তা পুনরায় প্রত্যাখ্যান করেন।[11]
খাজা মঈনুদ্দীন চিশতির খলিফা শায়খ হামিদুদ্দীন সুফি এবং শায়খ হামিদুদ্দীন নাগৌরি সুলতানের কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করার চেয়ে দারিদ্র্যের মধ্যে জীবনযাপন করা পছন্দ করেছিলেন।
একসময় সুলতান মুহাম্মদ তুঘলক এবং সমকালীন কিছু সুফির মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য হয়ে ওঠে। কারণ সুলতান বলেছিলেন, রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে সুফিদের আনুগত্য পাওয়ার অধিকার তাঁর আছে এবং তিনি সুফিদের প্রতি এমন নির্দেশও জারি করতে পারেন যা তাদের পীর-মুর্শিদের নির্দেশের চেয়েও উচ্চতর মর্যাদাসম্পন্ন হতে পারে।[12] এমতাবস্থায় শায়খ নাসিরুদ্দীন চেরাগ-ই দেহলভী তাঁর স্বাধীনচেতা মনোভাব বজায় রেখেছিলেন। সরকারের দাবির কারণে এক ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে—এমন খবর শুনে চেরাগ-ই দেহলভী মন্তব্য করেছিলেন, “আজকালকার দিনে সরকারি চাকরির এই রকমই ফল।”
শায়খ বুরহানুদ্দীন গরীব এবং অন্যান্যদের মতো কিছু চিশতি সুফি সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বের আগেও ভারতের দাক্ষিণ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। যদিও সেখানে সুফিদের সংখ্যা পাঞ্জাব ও দোয়াবের তুলনায় কম ছিল। এই কারণে সুলতান দাক্ষিণ্যে আরও সুফি পাঠাতে চেয়েছিলেন, যাতে তারা সেই ভূখণ্ডে ইসলামের প্রসারকে ত্বরান্বিত করতে পারেন।
এই কারণ ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল, যার ফলে সুলতানকে সুফিদের সঙ্গে শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্ক গড়ে তুলতে প্ররোচিত করে।
সুলতান তখন ইবনে তাইমিয়ার তাসাউফ-বিরোধী মতবাদ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন, যে মতবাদ তাঁর কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন ইবনে তাইমিয়ার শিষ্য আবদুল আজিজ আরদাবিলি।[13] এই আবদুল আজিজ ভারতে এসে সুলতানের সাথে দেখা করেছিলেন। এই প্রভাব সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের ধর্ম ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, বিশেষত সুফি-সাধকদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়।
এই দুটি কারণ সুলতান ও সুফিদেরকে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামের দিকে পরিচালিত করে। সুলতান শেষ পর্যন্ত সুফিদের একটি দলকে তাঁর সেবা/প্রস্তাব গ্রহণ করার জন্য রাজি করতে পেরেছিলেন। মাওলানা ইবনে আল-দীন এবং শায়খ ফরিদুদ্দীনের কিছু বংশধর শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। শায়খ নিজামুদ্দীনের খলিফা শায়খ কুতুবুদ্দীন মুনাওয়ারকে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে হারিয়ানার হানসি শহর থেকে দিল্লিতে সুলতানের দরবারে আসতে বাধ্য করা হয়েছিল। দরবারে উপস্থিত হবার পর সুলতানের পক্ষ থেকে প্রদত্ত দুই লক্ষ টাকা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁকে প্রায় ২,০০০ টাকার মতো গ্রহণ করতে রাজি করানো হয়েছিল, যা শায়খ সঙ্গে সঙ্গে গরিব ও অভাবীদের মধ্যে বিতরণ করে দেন।
শায়খ নিজামুদ্দীনের শিষ্য মাওলানা শামসুদ্দীন ইয়াহিয়াকে ইসলাম প্রচারের জন্য কাশ্মীরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সফরের প্রস্তুতির অজুহাতে শায়খ বাড়ি ফিরে আসেন। পরবর্তীতে জানা যায়, শায়খ মন্তব্য করেছিলেন যে, কারও পক্ষে কাশ্মীরে যাওয়ার কথা বলা অর্থহীন, কারণ তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন শায়খ নিজামুদ্দীন তাঁকে নিজের কাছে ডাকছেন, যার ইঙ্গিত ছিল তাঁর অন্তিমলগ্ন—মৃত্যুর দিন—খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। পরদিন তাঁর বুকে একটি ক্ষত বা ফোঁড়া দেখা দেয় যা মারাত্মক আকার ধারণ করে। কয়েকদিন পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
শায়খ নিজামুদ্দীনের সুপরিচিত শিষ্য মাওলানা ফখরুদ্দীন যাররাদীকে দিল্লি থেকে দৌলতাবাদে নির্বাসনে বাধ্য করা হয়েছিল। কিন্তু একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগদানের অজুহাতে তিনি দৌলতাবাদ ত্যাগ করে সমুদ্র উপকূলে পালিয়ে যান। হজ পালন শেষে আরব থেকে ফেরার পথে তিনি সমুদ্রে ডুবে মারা যান। শায়খ নাসিরুদ্দীন চেরাগ-ই দেহলভীর সঙ্গেও তাঁর দ্বন্দ্ব হয়েছিল।
ফাওয়ায়েদুল ফুয়াদ-এর রচয়িতা আমীর হাসান সিজভীকে মারার উদ্দেশ্যেই দৌলতাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। আরেক চিশতি সাধক মাওলানা শরফুদ্দীন ফিরুজগরী দৌলতাবাদে পৌঁছানোর পর মারা যান।
খাজা করিমুদ্দীন সমরকন্দী বাংলার সাতগাঁওয়ে শায়খুল ইসলামের দায়িত্ব পালন করতে সম্মত হন এবং বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাঁর দায়িত্ব পালন করেন।
যদিও এই রাষ্ট্রীয় পদগুলো গ্রহণ করা শায়খ ফরিদুদ্দীন ও শায়খ নিজামুদ্দীনের উপদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না, তবুও অল্প কয়েকজন চিশতি সুফি কাজি ও শায়খুল ইসলামের দায়িত্বে নিয়োজিত হয়ে রাষ্ট্রের সেবা করেছিলেন।
তবে এটি লক্ষ্যণীয় যে, সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক তাঁর সময়ের সকল সুফিদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন না। তিনি কখনোই খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়াকে অসম্মান করেননি, বরং তাঁর প্রতি একটি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব বজায় রেখেছিলেন। একইভাবে, সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক বিহার প্রদেশের মানেরের শামসুদ্দীন ইয়াহিয়ার খলিফা মোজাফফর শামস বলখীর খ্যাতির কথা শুনে তাঁর জন্য একটি বুলগেরীয় জায়নামাজ পাঠিয়েছিলেন। একই ধারাবাহিকতায় বিহারের জৈনুদ্দীন মাজেদুল মুলককে খানকাহ নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি জায়নামাজ ও জায়গির হিসেবে জমি বরাদ্দের নির্দেশ দিয়ে ফরমান পাঠিয়েছিলেন। জায়গিরের ফরমান প্রত্যাখ্যান করা হলেও জায়নামাজটি গ্রহণ করা হয়েছিল।[14]
সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সঙ্গে সুফিদের সম্পর্কে ভাঙন দেখা দেয় তখনই, যখন সুলতান দিল্লির বাসিন্দাদের দাক্ষিণ্যের নতুন রাজধানী দৌলতাবাদে স্থানান্তরিত করার রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে সকল সুফিদের তাদের খানকাহ/আস্তানা ছেড়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়ার এবং হিজরত করার নির্দেশ দেন। গবেষক নিজামীর মতে, “সুলতানের নির্দেশের পর দিল্লিতে খানকাহ জীবন ও সংস্কৃতি এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে, কুতুব উদ্দীন বখতিয়ার কাকী এবং শায়খ নিজামুদ্দীন আউলিয়ার মাজার ব্যতীত দিল্লির অন্য কোনো মাজার বা খানকায় একটি মোমবাতিও জ্বলত না।”[15]
সুলতানের দাক্ষিণ্য নীতি এবং চিশতি সুফিদের অনমনীয়, আপসহীন মনোভাব উভয়ের মধ্যে একটি তীব্র বিবাদের জন্ম দেয়। উত্তর ভারতে কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রাথমিক দিকের সকল চিশতি সুফি রাজদরবার ও দরবারী বিষয়াদি এড়িয়ে চলার চিশতি ঐতিহ্য বজায় রেখেছিলেন। এই ঐতিহ্য বিজাপুরের চিশতি সুফিগণও বজায় রেখেছিলেন।[16] তবে শায়খ নাসিরুদ্দীন চেরাগ-ই দেহলভীর খলিফা সৈয়দ মুহাম্মদ গেসুদরাজ (ই. ১৪২২ খ্রিষ্টাব্দ) এবং দাক্ষিণ্যের অন্যান্য চিশতি সুফিগণ এই ঐতিহ্য বজায় রাখেননি।[17] সৈয়দ গেসুদরাজ দাক্ষিণ্যের সুলতান ফিরুজ বাহমানী এবং সুলতান আহমদের কাছ থেকে ইনাম (পুরস্কার) হিসেবে বেশ কয়েকটি গ্রাম লাখেরাজ সম্পত্তি (করমুক্ত জমি) লাভ করেছিলেন।[18]
অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে এ বিষয়ে চিশতি আদর্শ এতটাই আপসহীন ছিল যে, সুলতান আলাউদ্দীন খিলজি যখন শায়খ নিজামুদ্দীন আউলিয়ার খানকাহ পরিদর্শন করতে চেয়েছিলেন তখন তিনি বলেছিলেন, “সুলতান যদি এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন, তবে আমি অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাব।”[19] এই মনোভাব চিশতিয়া তরিকার আপসহীন নীতির সাক্ষ্য বহন করে। উল্লেখ্য যে, প্রাথমিক পর্যায়ে চিশতিয়া তরিকার খেলাফতপ্রাপ্ত বা উত্তরাধিকার সনদপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দরবার/সরকার থেকে অনুদান হিসেবে লাখেরাজ সম্পত্তি গ্রহণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছিল।[20]
রাজনৈতিক বিষয় থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার এই নীতির একটি আনুষঙ্গিক ফলাফল ছিল চিশতিয়া সুফিদের দারিদ্র্য ও সংযমের জীবন যাপনের আদর্শ। যে আদর্শে অটল থাকার ব্যাপারে তরিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সময় প্রতিটি মুরিদ শপথ নিতেন।
তবে বলা হয়ে থাকে যে, নাসিরুদ্দীন চেরাগ-ই দেহলভী এই মন্তব্য করেছিলেন যে, যে ব্যক্তি সবসময় আল্লাহকে স্মরণ করেন এবং একইসাথে ইসলামের বিধিবিধান পালন করেন, এমতাবস্থায় তিনি যদি কোনো চাকরিতেও নিয়োজিত থাকেন, তবুও তাঁকে একজন সুফি হিসেবে গণ্য করা উচিত। এ প্রসঙ্গে তিনি শেখ সাদীর একটি শের উদ্ধৃত করেন:
مراد اہل طریقت لباس ظاہر نیست
کمر بخدمت سلطان به بند و صوفی باش
তাসাউফের অনুসারীদের উদ্দেশ্য বাহ্যিক পোশাক পরিধান নয়;
সুলতানের সেবায় নিজের কোমর বাঁধো এবং সুফি হও।[21]
এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে চেরাগ-ই দেহলভী সুলতান ফিরুজ শাহ তুঘলককে তাঁর খানকাহ পরিদর্শনের অনুমতি দিয়েছিলেন।
বাংলার চিশতি-নিজামী সুফিগণ—শায়খ আঁখি সিরাজুদ্দীন উসমান, শায়খ আলাউল হক এবং শায়খ নূর কুতুবুল আলম—সুলতান ও রাজদরবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার চিশতি নীতি অনুসরণ করেননি। তাঁরা তাঁদের সমকালীন সুলতানদের সঙ্গে সুস্থ ও হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। শায়খ আলাউল হক এবং তাঁর পুত্র শায়খ নূর কুতুবুল আলম যথাক্রমে সুলতান সিকান্দার শাহ এবং গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন মনোভাব বজায় রেখেছিলেন। রাজ্য ও জনগণের প্রভূত কল্যাণের জন্য তাঁরা সুলতানদের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। শায়খ নূর কুতুবুল আলম তাঁর অনুসারীদের রাজা ও অভিজাতদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবার মনোভাব পোষণ করার তাগিদ দিয়েছিলেন।[22]
এটি একটি সুপরিচিত ঐতিহাসিক সত্য যে, কুতুবুল আলমের হস্তক্ষপের কারণেই বাংলার সিংহাসন ও সাম্রাজ্য রাজা গণেশের জবরদখল ও আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেয়েছিল। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের পুত্র ও উত্তরাধিকারী সাইফুল ইসলাম হামজা শাহকে হত্যা করে বাংলার সিংহাসন দখলকারী রাজা গণেশের নিপীড়ন থেকে মুসলমান ও বাংলার মুসলিম রাজ্যকে উদ্ধার করার জন্য কুতুবুল আলম জৈনপুরের সুলতানের কাছে সামরিক সাহায্য চেয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন। কুতুবুল আলমের অনুরোধপত্র এবং শায়খ আলাউল হকের খলিফা ও শায়খ মুজাফফর শামস বলখীর অনুরোধগুলো জৈনপুরের ইব্রাহিম শাহ শারকীকে সেনাবাহিনী নিয়ে আসতে এবং রাজা গণেশের কবল থেকে বাংলার মানুষ ও রাজ্যকে রক্ষা করতে প্ররোচিত করেছিল। এভাবেই বাংলার মুসলিম শাসন পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল।
শায়খ কুতুবুল আলম ও তাঁর পিতা শায়খ আলাউল হক বাংলার সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রভূত কল্যাণে রাজনৈতিক বিষয়ে সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ ও সুলতান সিকান্দার শাহকে সাহায্য ও পরামর্শ প্রদান করেছিলেন।
বাংলার সুলতান জালালউদ্দীন (পূর্বে রাজা গণেশের পুত্র জাদু এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণকারী) মুসলিম ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন এবং তিনি নিজে একজন ধর্মপরায়ণ শাসক ছিলেন।
মানিকপুরের শায়খ হুসামুদ্দীন বর্ণনা করেছেন যে, একবার বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দীন শায়খ কুতুবুল আলমের কাছে এক থালা খাবার পাঠিয়েছিলেন। শায়খ অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে নিজের হাতে তা গ্রহণ করেন। শিষ্য শায়খ হুসামুদ্দীন যখন এটি লক্ষ করলেন, তখন দ্বীনের রাজার পক্ষ থেকে দুনিয়ার রাজার প্রতি এমন আচরণ তাঁর কাছে একটি অদ্ভুত বিষয় বলে মনে হলো। শায়খ কুতুবুল আলম সম্ভবত তাঁর শিষ্যের চিন্তা বুঝতে পেরে মিশকাতুল মাসাবীহ কিতাবের পাতা খুলে এই হাদিসটি উদ্ধৃত করলেন: “যে কেউ তাঁর নেতাকে সম্মান করল সে যেন তাঁকেই সম্মান করল…” এরপর তিনি যোগ করেন, “আমরা সুলতানদের ও অভিজাতদের সম্মান করি, যাতে আমাদের সন্তানেরাও তাদের প্রাপ্য সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আমাদেরকে অনুসরণ করে।”[23]
মুলতানের সোহরাওয়ার্দী তরিকার সাধক শায়খ বাহাউদ্দীন জাকারিয়া এবং তাঁর নাতি শায়খ রুকনুদ্দীন রাজদরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ট যোগাযোগ বজায় রেখেছিলেন[24], যদিও দিল্লিতে তাঁর সমকালীন চিশতি সাধক খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া (মৃত্যু ১৩২৫ খ্রিষ্টাব্দ) রাজদরবারের সঙ্গে যে-কোনো ধরনের যোগাযোগ থেকে বিরত ছিলেন। একই তরিকার সৈয়দ জালাল উদ্দীন বুখারী রাজকীয় কর্তৃত্বের অমান্য করাকে গুনাহ বলে মনে করতেন এবং এই হাদিস উদ্ধৃত করেছিলেন যে, “যে সুলতানের আনুগত্য করল সে আল্লাহর আনুগত্য করল।”
সোহরাওয়ার্দী তরিকার একমাত্র শায়খ সদরুদ্দীন আরিফ (মৃত্যু ১২৮৫ খ্রিষ্টাব্দ)—যিনি শায়খ বাহাউদ্দীন জাকারিয়ার পুত্র—ছিলেন এর ব্যতিক্রম; তিনি চিশতিদের মতো দারিদ্র্য ও সংযমী এবং রাজদরবার থেকে বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন পছন্দ করতেন।[25]
কিন্তু রাজদরবারের সঙ্গে ঘন ঘন যোগাযোগের ফলে—যা সোহরাওয়ার্দী সুফিগণ রাজদরবারের নৈতিক মান উন্নত করা এবং মজলুমদের কষ্টের প্রতিকার করার যুক্তিতে ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করতেন—এই তরিকার স্বাধীন চেতনা হ্রাস পায়। গবেষক নিজামীর মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সুফি সাধকদের ব্যবহার করার তুঘলকী নীতির কারণে এই তরিকাটি বেশ কিছুটা রাষ্ট্রীয় প্রভাবের অধীনে চলে যায়।[26]
শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব ও নীতির অধিকারী সুফিগণ তাঁদের নীতি ও আদর্শ অক্ষুণ্ণ রেখে মজলুমদের কল্যাণের লক্ষ্যে দরবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে পারলেও, তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে আসা দুর্বল ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিটি ভালো ফল বয়ে আনেনি। পরবর্তী সময়ে শাসকদের সঙ্গে সুফি তরিকাগুলোর নেতৃবৃন্দের একটি ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে, যাদের বেশিরভাগই বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা যায়। এই ঘনিষ্ঠতা শাসকদের সঠিক পথে পরিচালিত করেনি এবং সুফিগণ ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এভাবেই রাষ্ট্র থেকে প্রাপ্ত পেনশন ও লাখেরাজ সম্পত্তি অনুদান হিসেবে গ্রহণের মাধ্যমে পুষ্ট হয়ে সুফিদের বিরাট একটি অংশ একটি স্বার্থান্বেষী মহলে পরিণত হয়, যার প্রধান কর্তাদের ইশারায় চলতে বাধ্য হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।[27]
বিজাপুরের প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিগণ দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন এবং সুলতানরা নিজেদের আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে এবং এর মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতাকে সুসংহত করার জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তার কারণে তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করতেন। এভাবেই বিজাপুরের সুলতান ও সুফিদের মধ্যে একটি পারস্পরিক হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।[28] সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের কাছ থেকে লাখেরাজ সম্পত্তি পাওয়া দাক্ষিণ্যের প্রথম সুফি ছিলেন শায়খ সিরাজুদ্দীন জুনায়েদী (মৃত্যু ১৩৮০), যিনি সুলতানের সঙ্গে দাক্ষিণ্যে গিয়ে ১৩৩০ খ্রিষ্টাব্দে বিজাপুর শহরে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সুলতান আলাউদ্দীনের উত্তরসূরি মুহাম্মদ শাহ বাহমানী তাঁর রাজত্বের প্রায় সকল সুফিদের কাছ থেকে আনুগত্যের ঘোষণা আদায় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। উত্তর ভারতের চিশতি সুফিদের অনুসৃত নীতির প্রকাশ্য লঙ্ঘন ছিল এই প্রথা।
কিন্তু ১৬ ও ১৭ শতকের বিজাপুরের পরবর্তী সুফিরা রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে একটি নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছিলেন। ধর্মীয় কঠোরতা, শহুরে সংস্কৃতি এবং একটি স্বতন্ত্র আরব পরিচয়—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য বিজাপুরের কাদেরিয়া তরিকার সুফিদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছিল।
আমরা যেমনটি দেখেছি, প্রাথমিক পর্যায়ের চিশতি সুফিরা সুলতান ও দরবারগুলোর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখার একটি কঠোর মনোভাব বজায় রেখেছিলেন। অন্য কথায়, তাঁরা কখনোই রাজনৈতিক বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেননি। তবে অন্যান্য চিশতি সুফিদের মধ্যেও, যেমনটি দেখানো হয়েছে, খাজা নাসির উল-দীন অন্যদের মতো অতটা কঠোর ছিলেন না; কারণ তিনি তাঁর শিষ্যদের সরকারি চাকরি গ্রহণের অনুশীলনকে বিরোধিতা করেননি, যদি তারা আন্তরিকভাবে তাসাউফের রীতিনীতি ও আদর্শ মেনে চলতেন। খাজা নিজামুদ্দীন আউলিয়া হযরত আমীর খসরু ব্যতীত তাঁর কোনো খলিফাকেই এই বিশেষাধিকার দেননি, যিনি দিল্লির দরবারে চাকরি করার অনুমতি পেয়েছিলেন। কারণ তিনি কেবল একজন মুরিদ ছিলেন, কোনো খলিফা ছিলেন না। পরবর্তী চিশতি সুফি-সাধকরা—বিশেষ করে বাংলার—এই নীতি উল্টে দেন এবং সম্প্রদায়ের বৃহৎ কল্যাণের প্রয়োজনে রাজনৈতিক মহলে অংশগ্রহণ করেন। বাংলার চিশতিয়া-নিজামিয়া তরিকার হযরত নূর কুতুবুল আলম এবং ফেরদৌসি তরিকার মোজাফফর শামস বলখী রাষ্ট্রের কল্যাণে বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের ওপর শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করেছিলেন এবং অনেকাংশে তাঁর রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি ঠিক করে দিয়েছিলেন।
[1] K.A. Nizami, Religion and Politics in India in the Thirteenth Century, Delhi: Idarah-i Adabiyat-i Delli, 1974, Rep., p. 244.
[2] Rahat al-Qulub; Nizami, p. 244.
[3] A Comprehensive History of India, Vol. V, editors: Muhammad Habib & K.A. Nizami, New Delhi: Peoples Publishing House, 1970, p. 142.
[4] Muhammad Salim, ‘The Attitude of the Chishti Saints Towards Political Power’, The Proceedings of the History Conference, 1952, p. 227.
[5] R.N. Das, ‘Shaikh Nizam al-Din Auliya’, Islamic Culture, Hyderabad: The Islamic Culture Board, April, 1974, p. 95.
[6] Zia al-Din Barani, Tarikh-i-Firuz Shahi, p. 96.
[7] Abdul Haq Muhaddith, Akhbar al-Akhyar, pp. 54-55.
[8] Zia al-Din Barani, Tarikh-i-Firuz Shahi, p. 209.
[9] Amir Khurd, Siyar al-Auliya, pp. 120-121.
[10] Amir Hasan Sijzi, Fawaid al-Fuad, p. 99.
[11] Siyar al-Auliya, p. 295.
[12] Muhammad Habib, ‘Muhammad Tughlaq’, Journal of the Punjab University Historical Society, January 1964.
[13] Encyclopaedia of Islam (Leiden: E.J. Brill), Vol. III, p. 429; Ibn Battuta, Rihla, Tr. Agha Mahdi Husain, Baroda Oriental Institute, 1953, p. 40.
[14] S.H. Askari, ‘The correspondence of two 14th century Sufi saints of Bihar with the contemporary sovereigns of Delhi and Bengal’, Bengal Past and Present, Calcutta, 1948.
[15] K.A. Nizami, Studies in Medieval Indian History and Culture, Allahabad: Kitab Mahal, 1966, p. 96.
[16] Muhammad Salim, ‘The Attitude of the Chishti Saints towards political power’, Proceedings, Pakistan Historical Conference, II, 1952, pp. 225
[17] M. Mujeeb, The Indian Muslims, London: George Allen & Unwin, 1967, p. 290.
[18] Firishta, Tarikh-i-Firishta, p. 319; Sabah al-Din Abdur Rahman, Bazm-i-Sufiya, Daral Musannefin, Azamgarh, 1947.
[19] Aziz Ahmad, The Sufi and Sultan, p. 143.
[20] R.M. Eaton, Sufis of Bijapur, Princeton University Press, 1978, p. 46.
[21] Sabah al-Din Abdur Rahman, Bazm-i-Sufiya, p. 326.
[22] Maktubat-i-Qutb Alam; S.A. Rashid, ‘Some Chishti Saints of Bengal’, Proceedings of Pakistan History Conference, Lahore, 1952, p. 212; Husam al-Din, Rafiq al-Arefin; Hasan Askari, ‘Husam al-Din’, Journal of the Pakistan Historical Society, Karachi, 1953, Vol. I, Part IV, p. 384.
[23] Hasan Askari, ‘Hadrat Husam al-Din of Manikpur’, The Proceedings of the History Conference, Karachi: Pakistan Historical Society, 1953.
[24] Ibn Battuta reports that Rukn al-Din Suhrawardy of Multan accepted a jagir of 100 villages from Muhammad bin Tughlaq for the upkeep of his khanqah.
[25] K.A. Nizami, ‘Aspects of Muslim Political Thought in India During the 14th century’, Islamic Culture, Hyderabad-India, October, 1978, Vol. LII.
[26] Barani, Tarikh-i-Firuz Shahi, p. 514; Jamali, Siyar al-Arefin, Delhi, 1893; Aziz Ahmad, Intellectual History of Islam in India, Edinburgh, 1969, p. 39.
[27] Mohd. Salim, ‘The Attitude of the Chishti Saints Towards Political Power’, The Proceeding of the Pakistan History Conference, Karachi: Pakistan Historical Society, 1952, p. 229.
[28] Sherwani and Joshi, History of Medieval Deccan, II, 182.