রুম শহরের বাদশাহ
তুমি বাবা শাহ সুলতান
মদনপুর আইসা উড়াইলা
ইসলামের নিশান।।[1]
রোম সাম্রাজ্যের অধীন তৎকালীন আনাতোলিয়া বা এশিয়া মাইনর অঞ্চল (মতান্তরে বলখ রাজ্য) থেকে বর্তমান ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলায় আগত একাদশ শতাব্দীর প্রখ্যাত হলেন, হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি।[2] মতপার্থক্য বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ঐতিহাসিকদের অনুমান, তিনি বাংলায় আগত প্রথম সুফি।[3] ১০৮২ হিজরিতে (১৬৭১ খ্রিস্টাব্দ) ফারসি ভাষায় লিখিত বাংলার তদানীন্তন সুবেদার সম্রাট শাহজাহান-পুত্র সুলতান সুজার এক সনদ বা হুকুমনামা মারফত জানা যায়[4], “হজরত শাহ সুলতান রুমি বলখ রাজ্য থেকে ৪৪৫ হিজরিতে (১০৫৩ খ্রি.) বাংলায় আগমন করেন। এসময় তাঁর মাতুল ও মুর্শিদ সৈয়দ শাহ সূর্খখুল আন্তীয়হ্ (সৈয়দ মহী উদ্দীন সুরখুল আম্বিয়া সুরতনী) -সহ ১২০ জন শিষ্য তাঁর এ যাত্রার সঙ্গী ছিলেন।” বর্তমানে মুর্শিদ শাহ সূর্খখুল আন্তীয়হ্’র মাজার নেত্রকোনায় শাহ সুলতান রুমির মাজারের পাশেই অবস্থিত। তাঁর মূল নাম, মুহাম্মদ কমর উদ্দীন। তৎকালীন তুরস্কের একটি প্রদেশে শাসনকর্তা বা সুলতান ছিলেন বিধায় তাঁকে অভিহিত করা হতো ‘শাহ সুলতান’ নামে।[5] তুরস্কের সে-সব অঞ্চল রোম সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল বিধায় অঞ্চলগুলোর শাসনকর্তাদের উপাধি ছিল ‘রুমি’। ফলে পুরো নাম দাঁড়ায়, হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি। কিংবদন্তি অনুসারে, শাহ সুলতান রুমি তুরস্কের শাসনকর্তা থাকাকালীন অত্যন্ত বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু একদা রাজদরবারের এক দাসীর আলাপচারিতা তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। একদিন রাজপরিবারের এক দাসী সুলতানের শয়নকক্ষ পরিষ্কার করার পর একটু বিশ্রাম নিতে তাঁর বিছানায় শুয়ে পড়েন। একসময় তিনি ঘুমিয়ে যান। সুলতান কক্ষে ফিরে দাসীকে নিজের বিছানায় ঘুমাতে দেখে রেগে যান এবং তাঁকে সাতটি বেত্রাঘাত করেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আঘাতে রক্তাক্ত হয়েও দাসী হাসতে থাকেন। তাঁর হাসির কারণ জানতে চাইলে দাসী বলেন, “আমি অল্প সময়ের জন্য একটু আরাম করতে গিয়ে অন্যায় করেছি বলে আপনি আমাকে সাতটি বেত্রাঘাত করলেন। অথচ আপনি জীবনের এতগুলো বছর ধরে আরাম-আয়েশে কাটিয়ে দিচ্ছেন। তাহলে আপনার এই দীর্ঘ বিলাসী জীবনের জন্য কত বেত্রাঘাত প্রাপ্য?” দাসীর এই কথায় শাহ সুলতান গভীরভাবে আলোড়িত হন। তাঁর উপলব্ধি হয়, নিজের সামান্য অপরাধের জন্য অন্যকে শাস্তি দিলেও তিনি নিজে দীর্ঘদিন ধরে ভোগবিলাসে জীবন কাটিয়েছেন। দাসীর প্রশ্নটি তাঁর বিবেককে প্রবলভাবে নাড়া দেয়।[6] ঘটনাটি-সহ নানা কারণ-অকারণেই শাহ সুলতান রুমির রাজকীয় বিলাস-ব্যসনের মোহ ভেঙ্গে গেলে এবং আত্মোপলব্ধি জেগে উঠলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াস্বরূপ তিনি দরবারি যাপন-জীবন ত্যাগ করেন। যদিও পূর্ব থেকে রুমি রাজনৈতিক ও সামরিক জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন, কিন্তু নবযাপন পদ্ধতির এ পর্যায়ে তিনি মনোনিবেশ করেন আধ্যাত্মিক ধ্যান-জ্ঞান ও বিকাশের দিকে। সংকল্পবদ্ধ হন খোদায়ী রহস্য ভেদ করার ও ইলমে মারিফাতে পুঙ্খানুপুঙ্খ জ্ঞান অর্জন করার। এতে তিনি শরণাপন্ন হন তাঁর প্রিয়তম মাতুল ও মুর্শিদ সৈয়দ শাহ সূর্খখুল আন্তীয়হ্’র নিকট।[7] সূর্খখুল আন্তীয়হ্’র সান্নিধ্যে রুমি দীর্ঘকাল সাধনা ও খেদমতের মধ্য দিয়ে মাফিরাতের গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তবে রুমিকে দরবারি যাপনজীবন ত্যাগ ও মরমী জীবন গ্রহণ করার পরীক্ষা দিতে হচ্ছিল নানাভাবে। পূর্বের রাজকীয় চৈতন্য ফিরিয়ে আনা ও সংসারমুখী করার লক্ষ্যে তাঁর পরিবার-পরিজন সোয়া বিবি নামের জনৈক রূপসী রাজকন্যার সাথে রুমির বাগদান সম্পন্ন করেন। অনিচ্ছায় বাগদান সম্পন্ন করলেও হবু স্ত্রীর সাথে রুমির সাক্ষাৎ পর্যন্ত হয়নি। এহেন পীড়াপীড়িতে তিনি জন্মভূমি ত্যাগ করতে উদ্যত হন। উল্লেখ্য যে, বাংলা আগমনপূ্র্ব রুমির জীবনেতিহাস ও বাংলায় বিচরণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনাবলীর অনেকাংশ নিতান্তই কিংবদন্তি-নির্ভর এবং সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, প্রকৃত ঘটন-বর্ণনা ইতিহাসে অনুপস্থিত। পরবর্তীতে ঐশীবাণী মারফত বাংলায় আগমনের জন্য রুমি নির্দেশিত হলে মুর্শিদ ও ১২০জন সঙ্গী নিয়ে রাজশাহী হয়ে বাংলায় প্রবেশ করেন।[8] ১২০জন সঙ্গী-শিষ্যদের মধ্যে ৪০ জনের মাজার মদনপুরে রয়েছে।[9] গঙ্গানদী পেরিয়ে পূর্বদিকের তৎকালীন কামরূপের মদনপুরে স্থানীয় কোচ রাজার সমোঝোতায় ও অনেকটা বিনা বাধায় এখানে বসতি স্থান করেন এবং ধর্মের প্রচার-প্রসার করেন।[10] শাহ সুলতান রুমির বাংলায় আগমন বা অভিযান নিয়ে ঐতিহাসিকদের আরেকটি অনুমান হলো, “তাঁর দলের সেনাপতি ও সঙ্গী ছিলেন শাহ সুলতান বলখী মাহিসওয়ার। তিনি চট্টগ্রাম, বগুড়ার মহাস্থানগড়, ব্রহ্মপুত্র নদ তীর ঘেঁষে কামরূপ হয়ে মদনপুর পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করেন।”[11]
শাহ সুলতান রুমির জীবনেতিহাস সম্পর্কে ঐতিহাসিক ও কিংবদন্তিমূলক সূত্রে অল্প কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। এসব বিবরণে নানা মতপার্থক্য রয়েছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্যান্য সুফি সাধকের জীবনবৃত্তান্তের সঙ্গে সাদৃশ্য ও সাংঘর্ষিক উপাদানও লক্ষ করা যায়। ফলে তাঁর জীবনের কালানুক্রমিক বিবরণ ও ঐতিহাসিক পরিচয় পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থেকেই যায়। তবে লিখিত ঐতিহাসিক তথ্যের এই স্বল্পতা সত্ত্বেও নেত্রকোণা জেলার মদনপুরে অবস্থিত তাঁর মাজার-দরগাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ও সামাজিক আচার-অনুশীলন তাঁর স্মৃতি ও উপস্থিতির দীর্ঘস্থায়িত্বের সাক্ষ্য বহন করে। মাসিক ও বার্ষিক ওরস-ফাতেহা, ভক্তদের নিয়মিত জিয়ারত, খাদেম-পরম্পরা এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় আচার ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে তাঁর স্মৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। প্রায় হাজার বছর ধরে চলমান এই ধারাবাহিকতা বরাবরের মতোই আমাদের ওই ভূখণ্ডের ধর্মীয় ইতিহাস ও স্থানীয় সমাজের আচার-অনুশীলন-সংস্কৃতির সঙ্গে ঘনিষ্টতর সম্পর্কিত একজন সুফি সাধক হিসেবে বিবেচনার সুযোগ করে দেয়। একইসঙ্গে তাঁর মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ভক্তি, আচার ও জনসাধারণের সাথে সামাজিক সম্পর্কের বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, কীভাবে কোনো সাধককে ঘিরে একটি স্থানের পবিত্রতা বা শুদ্ধতার পরিচয় নির্মিত, সংরক্ষিত ও পুনর্নির্মিত হয় এবং কালক্রমে তা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। বর্তমান প্রবন্ধে নেত্রকোনা ও বৃহত্তর পরিসরে ময়মনসিংহ অঞ্চলে শাহ সুলতান রুমির এসব অবস্থানকে ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ ধারণার আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এখানে এই ভূখণ্ডের সাথে তাঁর ঐতিহাসিক সম্পর্ক, মাজারের আচার-সংস্কৃতি, সুরক্ষামূলক বা মধ্যস্থতামূলক লোকবিশ্বাস এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির মধ্যেও তাঁর স্মৃতির স্থায়িত্ব কতটা প্রতিষ্ঠিত, তা বোঝার জন্য ধারণাটিকে একটি বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
প্রথমত, প্রবন্ধে ভৌগোলিক পরিসর হিসেবে ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোণা জেলার মদনপুর অঞ্চলকে গ্রহন করা হয়েছে। ময়মনসিংহ একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল হলেও মোগল আমলের পূর্ববর্তী সময়ের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় ইতিহাস সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত।[12] এ অবস্থায় মদনপুরের সঙ্গে শাহ সুলতান রুমির সম্পর্ক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একদিকে প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ ও কিংবদন্তি, অন্যদিকে মাজারকেন্দ্রিক ধর্মীয় চর্চা ও স্থানীয় স্মৃতির ধারাবাহিকতা বিবেচনা করা হয়েছে। আলোচনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে তাঁর স্মৃতি ও প্রভাবের বিস্তারও প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মদনপুরের সঙ্গে শাহ সুলতান রুমির ঐতিহাসিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে মুঘল আমলে জারি করা দরগাহ-সংশ্লিষ্ট লাখেরাজ সম্পত্তির সনদ, তাঁর জীবনবৃত্তান্ত এবং স্থানীয় কিংবদন্তি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব সূত্রে তাঁর বাংলায় আগমন, স্থানীয় শাসকের সঙ্গে সম্পর্ক, ধর্মপ্রচার এবং মদনপুরে স্থায়ীভাবে অবস্থান গ্রহণের বিভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। শাহ সুলতান রুমির জীবন সম্পর্কে প্রচলিত বিবরণের সবচেয়ে প্রাচীন উৎস হলো ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দে লিখিত একটি ফারসি দলিল। আলোচনার প্রারম্ভে এর সারসংক্ষেপ আলোচিত হয়েছে। তবে দলিলটি প্রকৃতপক্ষে ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দের হয়ে থাকলেও তা শাহ সুলতান রুমির আগমনের প্রায় ছয়শ বছর পরের রচনা। দলিলটি মূলত রুমিকে ঘিরে গড়ে ওঠা জনসাধারণের পরম্পরাগত স্মৃতি, দরগাহের ইতিহাস এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর ধর্মীয় অবস্থানের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির নিদর্শন। ১৮২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার এই লাখেরাজ সম্পত্তি বাতিল করতে চাইলে উক্ত ফরমানের কল্যাণে এবং জায়গীরদার সাইয়ীদ জালাল উদ্দীন মাহমুদের সহায়তায় তা পুর্নবহাল হয়।[13] পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ জেলার গেজেটের মদনপুরের একটি রিপোর্টের সূত্র ধরে আধুনিক ঐতিহাসিকগণ শাহ সুলতান রুমির ঐতিহাসিক স্বীকৃতি প্রদান করেন।[14] শাহ সুলতান রুমির জীবনকাহিনির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মদনপুরের স্থানীয় শাসকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক। কিংবদন্তী অনুসারে, তিনি যখন মদনপুরে বসতি স্থাপন করেন, তখন অঞ্চলটি একজন কোচ রাজার অধীন ছিল। শাহ সুলতান রূমি বাংলায় প্রবশের সময় প্রথমে দামছাপুর (নন্দিপুর) গ্রামে এবং পরে কংসারঘটি নামক স্থানে আস্তানা স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি কোচ রাজ্যের রাজধানীর পশ্চিমে ঝিটাই নদীর দক্ষিণ তীরে নামাজ আদায় করেন। তিনি নামাজ শেষে তাঁর অনুগত রূপস মল্লিকের মাধ্যমে রাজা মদনকোচের কাছে নামাজ আদায়ের স্থানটুকু বিনাশর্তে দানের প্রস্তাব পাঠান। প্রথমে রাজা তা প্রত্যাখ্যান করলেও পরে একটি জায়নামাজের সমপরিমাণ জমি দান করতে সম্মত হন। কিন্তু পরক্ষণে গুপ্তধনের সন্দেহে তিনি সৈন্যসহ সেখানে উপস্থিত হয়ে জমিটি খননের নির্দেশ দেন। কোনো গুপ্তধন না পেয়ে তিনি শাহ সুলতান রূমীর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেন। বর্ণনা অনুসারে, শাহ সুলতান জায়নামাজটি শূন্যে নিক্ষেপ করলে তা অলৌকিকভাবে সম্প্রসারিত হয়ে রাজার রাজ্য আচ্ছাদিত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে ফেলে। ভীতসন্ত্রস্ত রাজা মদনকোচ প্রায় জ্ঞানশূণ্য হয়ে রুমির নিকট বাঁচার আকুতি জানায়। প্রত্যুত্তরে রুমি রাজা মদনকোচর কাছে তিনটি প্রস্তাবের মধ্য থেকে একটি নির্বাচন সুযোগ দেন। ইসলাম গ্রহণ, বশ্যতা স্বীকার, নয়তো যুদ্ধ। এমতাবস্থায় রাজা ইসলাম গ্রহণে সম্মতি জানান এবং পরদিন রাজপ্রাসাদে ভোজের আয়োজন করেন। তবে এখানেও রাজা ভোজের খাবারে বিষ মেশানো বা সরাসরি বিষপান করতে দেয়ার মাধ্যমে পুনরায় শাহ সুলতান রুমির আধ্যাত্মিক ক্ষমতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেন। রুমি বিসমিল্লাহ বলে সেই বিষ পান করেন, কিন্তু তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি। এই ঘটনায় বিস্মিত হয়ে রাজা তাঁর প্রতি অনুকূল হন এবং স্থানীয় মানুষকে তাঁর সেবায় নিয়োজিত করার নির্দেশ দেন।[15] রাজা ও পরিষদবর্গের সবাই ইসলামগ্রহণপূর্বক গোটা মদনপুর গ্রামটি রুমিকে পীরোত্তর সম্পত্তিরূপে দান করেন।[16] এখানে বিষপানের ঘটনা, রাজার মনোভাবের পরিবর্তন কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ধর্মান্তরের মতো আখ্যানসমূহের মধ্য দিয়ে সাধকের অলৌকিক ক্ষমতা, নৈতিক মর্যাদা ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের একটি বিশেষ ধারণা জনমানসে নির্মিত হয়েছে। স্থানীয় শাসকের স্বীকৃতি, পীরোত্তর সম্পত্তি প্রদান এবং মোঘল শাসক প্রদত্ত লাখেরাজ সম্পত্তির বর্ণনাও পাওয়া যায়। এসব খণ্ড খণ্ড বর্ণনা ও সূত্রের জেরে নিম্নের আলোচনায় শাহ সুলতান রুমির জীবনবৃত্তান্তের প্রতিটি ঘটনাকে প্রমাণ করার পরিবর্তে মদনপুরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কীভাবে জনপরিসরের স্মৃতি, ধর্মীয় আচার-সংস্কৃতি ও আঞ্চলিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ধারণার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত ও সংরক্ষিত হয়েছে, তা বিশ্লেষণের ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
১. মদনপুরের সঙ্গে শাহ সুলতান রুমির ঐতিহাসিক সম্পর্ক:
‘প্যাট্রন সেইন্ট’ ধারণার প্রথম মানদণ্ডে বিবেচনা করা হয়, কোনো সাধকের নাম নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ইতিহাস, স্থানীয় পরিচয় ও জনস্মৃতির সঙ্গে কতটা গভীরভাবে যুক্ত হয়েছে। এক্ষেত্রে শুধু তাঁর আগমন বা বসবাসের ঐতিহাসিক প্রমাণ যথেষ্ট নয়, বরং অঞ্চলের ইতিহাসচর্চা, স্থাননামের ব্যাখ্যা, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক পরিচয় নির্মাণে তাঁর নাম কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমির ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক মূল্যায়নের জন্য তিনটি দিক বিবেচনা করা যায়: আঞ্চলিক ইতিহাসে তাঁর অবস্থান, মদনপুরের স্থাননাম ও আঞ্চলিক-সামাজিক স্মৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং আধুনিক সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ে তাঁর নামের ব্যবহার। প্রথমত, নেত্রকোণা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিবরণে শাহ সুলতান রুমিকে আঞ্চলিক বা স্বদেশী ধর্মীয় ইতিহাসের সূচনাবিন্দু হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। উদাহরণস্বরূপ অধ্যক্ষ সরফুদ্দীন এক বর্ণনায় বলেন, “মুসলিম বিজয়ের পূর্বে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে যে সব সূফী দরবেশ এদেশে আসেন, তাঁদের মধ্য শাহ সুলতান কমর উদ্দীন রূমীই সবচেয়ে প্রাচীন বলে মনে হয়।”[17] নানা স্বীকৃত ঐতিহাসিকদের বরাত দিয়ে মোঃ আবদুল করিম প্রমাণ করেন, “হজরত শাহ সুলতান রুমি সর্বপ্রথম মোমেনশাহী (বর্তমানে ময়মনসিংহ) জেলায় ইসলামের বীজ রোপণ করে গিয়েছেন এবং পরবর্তী মুসলিম শাসকগণ তাকে লালন করে প্রসারিত করেছেন।”[18] এছাড়া আবদুল মান্নান তালিবও শাহ সুলতান রুমি বিষয়ক আলোচনার সমাপ্তিতে রুমিকে ময়মনসিংহের প্রাচীনতম ইসলাম প্রচারক হিসেবে আখ্যা দেন।[19] দ্বিতীয়ত, প্রচলিত কিংবদন্তি সূত্রে মদনপুরের স্থাননামের সঙ্গে শাহ সুলতান রুমির একটি পরোক্ষ সংযুক্তি লক্ষ করা যায়। দরগাহের হুকুমনামার পাঠে লক্ষ্য করা যায়, রুমির আগমনের সময় স্থানীয় শাসকের নাম ছিল ‘মদনা/ মদনকোচ’।[20] হিন্দু সামন্ত রাজাদের মধ্যে তুলনামূলক উদার, বিনয়ী ও নওমুসলিম মদনকোচের উদারতা ও বিচক্ষণতার স্বীকৃতিস্বরূপ এলাকার নাম মদনপুর এবং একটি পুকুরকে ‘মদনলাল পুকুর’ নামে নামকরণ করা হয়।[21] তৃতীয়ত, আধুনিক সময়ে মদনপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ে শাহ সুলতান রুমির নামের ব্যবহার তাঁর ভূখণ্ডগত সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। খন্দকার তাঁর গ্রন্থে দরগাহ-সংলগ্ন এলাকায় শাহ সুলতান উচ্চ বিদ্যালয়, সুলতানিয়া আলিয়া মাদ্রাসা, সুলতানিয়া দাতব্য চিকিৎসালয় ও রেস্ট হাউসের এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ পরিসরে তাঁর নামে নামকরিত হওয়া স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান-স্থাপনার কথা উল্লেখ করেছেন।[22] এসব প্রতিষ্ঠানের নামকরণ ও অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তাঁর স্মৃতি মাজার, আধ্যাত্মিকতা বা ধর্মীয় বলয়ের বাইরেও সার্বিক শিক্ষা, চিকিৎসা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে।[23] মদনপুরের আঞ্চলিক আত্মপরিচয় নির্মাণের ক্ষেত্রে খন্দকারের গ্রন্থের ভাষাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে কমবেশী ৬৮ হাজার গ্রাম আছে। মদনপুর গ্রামের মত ঐতিহাসিক গৌরবোজ্জল গ্রাম হয়তো আর একটিও নেই। এ সাধারণ পল্লীতে এত অলী আউলিয়ার সমাবেশ সমাধি বা স্থায়ী কর্মকেন্দ্র বাংলা-দেশের আর কোথাও বা কোন গ্রামে আছে কিনা আমাদের জানা নেই। বিশেষ করে বাংলাদেশকে ইসলামের আলোতে উদ্ভাসিত করার মূল কর্মকেন্দ্র-স্থল মদনপুর, এরূপে গৌরবময় ইতিহাসের অধিকারী কোন গ্রাম দূরে থাকুক, শহরই বা কয়টি আছে? বাঙালীকে মুসলমান করার জন্য যিনি সর্বাধিনায়ক, স্বয়ং তিনিই মদনপুরে আস্তানা ও মাযার স্থাপন করে, মদনপুরকে চিরধন্য ও চির গর্বে গর্বিত করে রেখে গেছেন। হযরত শাহ সুলতানের বংশধরত নেই-ই, সন্তান তাঁর প্রয়োজনও ছিল না; বাংলার কোটি কোটি মানুষই তাঁর পরম সন্তান।”[24] যদিও বক্তব্যটি লেখকের নিজস্ব মূল্যায়ন। তবু আপাতদৃষ্টিতে এটুকু অনুধাবন করা যায় যে, এ অঞ্চলে শাহ সুলতান রুমির আগমন-বিচরণ ও হাজার বছর তাঁর স্মৃতির উপস্থিতি মদনপুরের আঞ্চলিক গৌরব ও ধর্মীয় পরিচয়কে নিবিড়ভাবে প্রভাবিত ও সংজ্ঞায়িত করেছে। এছাড়া হযরত শাহ সুলতানের নির্দেশে তাঁর সঙ্গী হিসেবে আগত সুফি-অলিদের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে এ ঘটনার স্বীকৃতিস্বরূপ মদনপুরকে ৪০ আউলিয়ার গ্রামও বলা হয়।[25]
২. মাজার-সংস্কৃতি ও পবিত্র ভূগোল ধারণা
ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্যাট্রন সেইন্ট হিসেবে শাহ সুলতান রুমিকে মূল্যায়নের দ্বিতীয় মানদণ্ড হলো, তাঁর সমাধি কীভাবে একটি সাধারণ কবরের সীমা-পরিধি অতিক্রম করে জিয়ারত, ওরস, দোয়া, মানত, আতিথেয়তা ও অন্যান্য ধর্মীয়-আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইসঙ্গে অনুসন্ধান জরুরি, মাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা আচার-সংস্কৃতি, খাদেমদের ব্যবস্থাপনা বা রীতি-রেওয়াজ এবং দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত আচারগুলো কীভাবে স্থানীয় জনসাধারণের জীবন-যাপনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মদনপুরের পবিত্রতা বা শুদ্ধতা বুঝতে শাহ সুলতান রুমির সমাধির পাশাপাশি তাঁর সঙ্গী অন্যান্য সুফি-অলিদের মাজারগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হয়। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, মদনপুরে এখন পর্যন্ত রুমির গুরু সৈয়দ সুরখুল, দশজন খাদেম এবং আরও নয়জন সফর-সঙ্গীর মাজার রয়েছে। খন্দকারসহ নানা বর্ণনায় সবমিলিয়ে ২০টি চিহ্নিত মাজারের উল্লেখ পাওয়া যায়।[26] এছাড়া সফর-সঙ্গীদের মধ্যে ৯জন চিহ্নিত করা গেলেও ঐতিহাসিকদের অনুমান, মোট ৪০ জন সফর-সঙ্গী সাধকের মাজার মদনপুরে রয়েছে। বুড়া পীর সাহেবের মাজার (সৈয়দ সুরখুল) রুমির মাজার থেকে প্রায় আড়াই মাইল দূরে অবস্থিত। তাঁর কাছে একটি পুরোনো মসজিদও রয়েছে। অন্যদিকে, মদনলাল বা মদনাল পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে বিবি বা সোয়া বিবি সাহেবার মাজার অবস্থিত।[27] ফলে এখানে সাধকের নিজের মাজারের পাশাপাশি তাঁর গুরু, সহচর এবং সুফি-ঐতিহ্যে আরো অনেক সাধকের সমাধিও আঞ্চলিক পবিত্রতা বা শুদ্ধতার ধারণাকে বিস্তৃত করেছে।
শাহ সুলতান রুমির ওফাতের পর তাঁর দশজন বিশ্বস্ত খাদেম মাজারের রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁদের ওয়ারিশরা বংশপরম্পরায় এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন। শুরুরদিকে মাজার দেখভালের তরিকা ছিল- প্রত্যেক খাদেম একমাস করে পালাক্রমে মাজারের যাবতীয় রক্ষণাবেক্ষণ, তদারকি করতেন। যে মাসে যে খাদেম দায়িত্ব পালন করতেন, সেই মাসকে তাঁরই নামানুসারে ডাকা হতো। প্রায় হাজার বছর ধরে চলমান এই রীতি মাজারের খাদেম-ভক্তবৃন্দের জন্য মাসগুলোর স্থায়ী নামকরণ হয়ে গিয়েছে। ফলে এখানে দশমাসেই এক বছর ধরা হয়। খন্দকারের বর্ণনায়, “১০জন খাদেমের বংশধর এখন প্রায় ২শত পরিবারে রূপ নিয়েছে, যা পূর্বের তুলনায় জটিল। পূর্বে যেমন প্রতিমাসে একজন খাদেমই আয়-ব্যয়ের যাবতীয় হিসাব রাখার দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে পালন করতেন, এখনও তদানুরূপ ওয়ারিশ-খাদেমের নিজ নিজ পালার প্রাপ্য সময়সীমার আয়-ব্যয় হিসাব করে খরচ বাদ দিয়ে লাভটুকু তাঁকে ভাগ করে নিতে হয়। সবার সমানভাগ নিশ্চিত করার জন্য একটি মাসকে ৩২টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, যার প্রতিটিকে ‘ঘড়ি’ বলা হয়। আট ঘড়িতে এক প্রহর এবং দিনে চার প্রহর হিসেবে সময় নির্ধারণ করা হয়। পরিবারগুলোর মাসিক পালার কমবেশী হিস্যা অনুসারে সারাদিনে যে কয়জন অংশীদার পাওনাদার হয়, মাযার শরীফের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত মানত, শিন্নী, নেয়াজ-নজর ইত্যাদি টাকা, জিনিসপত্র, গরুছাগল প্রভৃতি যা কিছু হয়, দিনের শেষে খরচ বাদে যা থাকে, হিস্যানুযায়ী ঐ দিনের অংশীদার সবাই যার যার পাওনা নিয়ে যান। এই মাজার-জগতে সূর্যোদয় ও অস্ত সম্বন্ধে ডঙ্কা পিটায়ে সময়সীমা ঘোষণা করে হয়। এজন্য কাগজে-পত্রে নিয়ম শৃঙ্খলা সংরক্ষণের জন্য একখানি রেকর্ড রেজিস্টার বহি আছে। খাদেম কমিটির নেতৃত্বে পরিচালিত এই রেকর্ড বইটি হল মূল দলিল। এই বই-এর মারফত যাবতীয় হিসাব-নিকাশের শৃংখলা রক্ষা করা হয়। খাদেমদের অবস্থার পরিবর্তনের কারণে এসব হিস্যা স্বত্ত্বের ক্রয়-বিক্রয়ও হয়ে থাকে। এজন্য কোনো পৃথক দলিল করতে হয় না। রেকর্ড বই-এ বিক্রেতার নামের স্থলে ক্রেতার নাম লিখে রাখলেই হয়। বইটিকে খাদেমদের মূল গঠনতন্ত্র বলা যেতে পারে। তাঁদের অংশস্বত্ত্বের যাবতীয় খুটিনাটির হিসাব নিকাশ, নিয়ম-শৃংখলা খাদেম কমিটির মারফত সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা হয়।”[28] এখনো মাজারে একটি অতিথিশালা রয়েছে, যার নাম ‘তোষাখানা’। দূরবর্তী স্থান থেকে আগত অতিথিদের জন্য সকাল ও সন্ধ্যায় খাদেমদের বাড়ি থেকে খাবার এনে পরিবেশনের রীতি রয়েছে। কার পালায় কোন অতিথির খাবারের দায়িত্ব পড়বে, তা নির্ধারণের জন্য খাদেমদের মধ্যে স্বতন্ত্র পদ্ধতি রয়েছে। খাবার প্রস্তুত, পরিবেশন, থালাবাসন ফিরিয়ে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কাজগুলো যাঁরা করেন, তাঁদের ‘ঝাড়ু ফরাস’ বলা হয়। মদনপুরের মাজারগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো ডঙ্কা (ঢোল) বাজানোর প্রচলন। স্বয়ং শাহ সুলতান রুমিই তুর্কি রাজপরিবারের রীতির অনুসরণে ডঙ্কা বাজিয়ে সংকেত দেয়ার ব্যবস্থা চালু করেছিলেন। রাজপরিবারের পরিচয় ও আভিজাত্যের সঙ্গে যুক্ত এই বাদ্যযন্ত্র পরবর্তী সময়ে মাজারের দৈনন্দিন কার্যক্রম এবং বিভিন্ন বিশেষ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে। পূর্বে তোষাখানায় উপস্থিত অতিথিদের সংখ্যা জানানোর জন্য অতিথির সংখ্যার চেয়ে একটি বেশি আঘাত দেয়া হতো।[29] এ ছাড়া ঈদের চাঁদ দেখা, ঈদের গোসল ও জামাতের সময়, জুমার নামাজ, জানাজা, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত এবং জরুরি পরিস্থিতিতে খাদেমদের একত্র করার ক্ষেত্রেও ডঙ্কা ব্যবহারের রীতি রয়েছে।
এছাড়া শাহ সুলতান রুমির মাজারে ফাল্গুন/ চৈত্র মাসের পূর্ণিমায় বাৎসরিক তিনদিন ব্যাপী ওরস ও মেলার আয়োজন করা হয়। নির্দিষ্ট তারিখের কয়েক দিন আগে থেকেই ভক্তদের আগমন শুরু হয় এবং উরসের দিন বিপুল জনসমাগম ঘটে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, গারোসহ বিভিন্ন সম্প্রদায় ও শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ওরস সম্পন্ন হয়। এখানে ধর্মীয় আলোচনা (মাহফিল ও নসিয়ত), কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, মুর্শিদি গানসহ নানা ধরনের আচার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লক্ষাধিক ভক্ত কাফেলা নিয়ে এই আয়োজনে অংশ নেন। জনশ্রুতি ও ভক্তদের বিশ্বাস, শাহ সুলতান জীবদ্দশায় মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় সান্ত্বনা দিতেন এবং ইন্তেকালের পরও তাঁর মাজার মানুষের কাছে আশা-আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক আশ্রয়ের কেন্দ্র হয়ে রয়েছে। তাঁর প্রতি এই বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়েছে। খন্দকার এ মাজারকে আখ্যা দিয়েছেন ‘সর্বদলের ঊর্ধ্বে সকল শ্রেণীর মানবাত্মার মিলন তীর্থকেন্দ্র’ হিসেবে।[30] আলোচনার পরিশেষে বলা যায়, মদনপুরের শাহ সুলতান রুমির মাজার সাধকদের সাধারণ মাজারের সীমা অতিক্রম করে একটি বিস্তৃত ধর্মীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে পরিণত হয়েছে। মাজারের আশেপাশে অন্যান্য সাধকদের মাজারের উপস্থিতি, ধর্মীয় আচার, বার্ষিক ওরস, খাদেমদের উত্তরাধিকারভিত্তিক সংগঠন, তোষাখানার আতিথেয়তা এবং ডঙ্কা বাজানোর প্রচলন এই পরিসরকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দাতব্য চিকিৎসালয় ও অন্যান্য স্থাপনার উপস্থিতি মাজারের কার্যক্রমকে ধর্মীয় উপাসনার বাইরের পরিসরেও বিস্তৃত করেছে।
৩. সুরক্ষামূলক বা মধ্যস্থতামূলক লোকবিশ্বাস
এ স্তরে দুটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, কোনো সাধককে নির্দিষ্ট পেশাজীবী জনগোষ্ঠী, সামাজিক গোষ্ঠী বা প্রাকৃতিক পরিবেশের অভিভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয় কি-না। দ্বিতীয়ত, রোগ, বিপদ, সংকট কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তাঁর মাজারে মানত করা, হাদিয়া/নজর/নেয়াজ পেশ করা অথবা তাঁর আধ্যাত্মিক মধ্যস্থতার ওপর নির্ভর করার প্রচলন রয়েছে কি-না। এই দুই দিকের পাশাপাশি সাধককে ঘিরে প্রচলিত অলৌকিক কাহিনিগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। উল্লেখ্যে যে, কোনো সাধকের অলৌকিক ক্ষমতা সম্পর্কে ভক্তদের বিশ্বাস এবং সেই ক্ষমতার ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত অস্তিত্ব এক বিষয় নয়। যদিও শাহ সুলতান রুমির শ্রেণি, পেশা ও প্রাকৃতিক পরিবেশভিত্তিক অভিভাবকত্বের বর্ণনা খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে তাঁর মাজারকে ঘিরে মানত-নিবেদন ও শিরনি প্রদানের রেওয়াজ ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। খন্দকার বলেন, “আল্লাহর ওয়াস্তে শাহ সুলতান রুমির মাজার শরীফে মানুষ বিভিন্ন নিয়ত-উদ্দেশ্যে যেসব মানত ও শিল্পীর অর্থ, দ্রব্য, গরু-ছাগল, মোরগ প্রভৃতি যা প্রদান করে, তা রাখবার জন্য পূর্ব হতেই পূর্বতন খাদেমগণ একটি নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে গিয়েছিলেন, উক্ত স্থানটি ‘সিড়ি’ নামে প্রসিদ্ধ। যত মানত ও শিন্নী, ‘সিড়ি’তে রাখা হয়। দরগা শরীফের সম্মানার্থে উক্ত স্থানটি একটু পৃথকভাবে রাখা হয়েছে।”[31] মানত ও মধ্যস্থতামূলক কার্যক্রমের বাইরেও শাহ সুলতান রুমিকে ঘিরে প্রচলিত অলৌকিক কাহিনিগুলো তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও ক্ষমতা সম্পর্কে জনমানসে কল্পনা-জল্পনা বা লোকবিশ্বাস তৈরি করে। এসব কাহিনির মধ্যে রয়েছে বিষপানের ঘটনা, জরিপের সময় শিকল ছিঁড়ে যাওয়া বা জরিপকারীর অস্বাভাবিক আচরণ, প্রাণীদের মাজারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বিবরণ, মানত ভঙ্গকারীর শাস্তি, রোগমুক্তি এবং বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে সাহায্য করার কাহিনি।[32] খন্দকারের গ্রন্থে এসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এগুলোকে ঐতিহাসিক সত্যতা বা নিরেট ধর্মীয় যৌক্তিকতার বিপরীতে সাধককে ঘিরে গড়ে ওঠা ভক্তিমূলক বয়ান এবং তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পর্কে প্রচলিত লোকবিশ্বাসের সাক্ষ্য হিসেবে বিশ্লেষণ করা অধিক যুক্তিসংগত।
মাজারের সুরক্ষামূলক ক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত লোককাহিনির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, মাজারের সীমানা জরিপের সময় শিকল ব্যবহারের ঘটনা। খন্দকারের বর্ণনা, “১৯১২-১৭ খৃস্টাব্দে জরিপ কার্যে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিকল ফেললে, তা ছিড়ে খানখান হয়ে যেত। এসবকে মিথ্যা ও বাজে কুসংস্কার মনে করে তখন সুশিক্ষিত ফিল্ড কানুনগো (ভূমি ব্যবস্থাপনা ও রাজস্ব বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ), স্বয়ং স্বহস্তে শিকল ধরে মাপতে শুরু করলেন। তখন তিনিও যেন হঠাৎ ভয়ংকর ত্রিভুজের মধ্যে প্রবেশ করে গেলেন। তৎক্ষণাৎ তাঁর স্মরণশক্তি সব লোপ পেয়ে গেল। তিনি শিকল ছেড়ে দিয়ে মাথার হ্যাট দিয়ে বল খেলা শুরু করে দিলেন। এই অবাক কাণ্ড দেখে চতুর্দিকস্থ মানুষ বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গেল। এরপর জনৈক ধার্মিক কানুনগো বহু দোয়া-দরুদের আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থার পর, হযরতে আলার রুহানী ইজাজত নিতে সক্ষম হন। তবু তার নিজস্ব এলাকায় আর কেউ শিকল ফেলতে সাহস পায়নি। তাঁর আস্তানাস্থিত ১ একর স্থানের সীমানা নির্ধারণ করে, অবশিষ্ট সমগ্র অঞ্চলে জরিপাকারে তারা সাফল্য লাভ করেন।” এই কাহিনির মধ্য দিয়ে প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত লোকবিশ্বাসে মাজারটি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ও পবিত্র স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। একইভাবে, খন্দকারের গ্রন্থে পাখি, সাপ ও বন্য প্রাণীসমূহের মাজারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আচরণের কাহিনি রয়েছে। খন্দকার বলেন, “পাখীরাও কেন যে তাঁর মাজার শরীফের উপর দিয়ে উড়ে যায় না, এ শিক্ষা আমাদের নিজের জীবনে গ্রহণ করি না। দেখা যায়, পাখীরা আকাশ পথে ঝাঁক বেঁধে উড়ন্ত অবস্থায় মাজার এলাকায় এলেই, গতি পরিবর্তন করে অথবা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে দুদিকে দুদল উড়ে যায়, তবু মাজার শরীফের উপর দিয়ে যায় না। বনের হিংস্র বাঘকেও মাজার শরীফের সম্মুখস্থ সিড়িতে স্থিরভাবে অবনত মস্তকে যিয়ারতের অনুরূপ অবস্থায় থাকতে দেখা গেছে। এরূপ ঘটনা বহু লোকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ১৯৭৫ খৃস্টাব্দে নেত্রকোণার প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শিক্ষক জনাব নূর মুহাম্মদ সাহেব আরও একজন সঙ্গীসহ দরগা শরীফ যিয়ারতের উদ্দেশ্যে বেলা বারটার দিকে দুনম্বর গেট পার হয়ে, হঠাৎ একটি প্রকাণ্ড সাদা সাপকে ডান দিকে চলে যেতে দেখেন এবং মাজার শরীফের পশ্চিম পার্শ্বে যিয়ারতরত অনুরূপ অবস্থায় আরও দুটি সাপ দেখতে পান। তারাও সন্তস্ত্র অবস্থার সংক্ষিপ্ত যিয়ারত সম্পন্ন করেন এবং সর্প দুটিও তাঁদের সাড়া পেয়ে সরে যায়। ফিরে এসে ওরা মদনপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব জামাল উদ্দীন ফকির সাহেবের নিকট উক্ত ঘটনা বর্ণনা করেন।”
খন্দকারের বর্ণনায় মানত ও মাজারের প্রতি আচরণকে ঘিরে কয়েকটি কাহিনি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। একটি কাহিনীতে তিনি বলেন, “১৯৫৬ খৃস্টাব্দে চলৎশক্তি রহিত জনৈক বৃদ্ধা জনৈক লোভী যুবককে দিয়ে মাজার শরীফে সিন্নি প্রদানোদ্দেশে একটি পাকা কাঁঠাল প্রদান করেন। যুবকটি পথের মধ্যে অর্ধেক কাঁঠাল খেয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে। বাকী অর্ধেকটি দরগা শরীফের সিড়িতে অর্পণের সময় তৎসময়কার খাদেম সাহেব প্রকৃতাবস্থা জানতে পেরে সিন্নি গ্রহণ না করায় বাকী অংশটুকুও যুবক খেয়ে ফেলে এবং রাত্রিযাপনের জন্য হযরত আলার অতিথিশালায় আশ্রয় গ্রহণ করে। সকালে কেউ তাকে দেখতে না পেয়ে খুঁজতে গিয়ে দেখে যে, নিকটবর্তী বেতকাঁটার কণ্টকাকীর্ণ ঝোপ জঙ্গলের ভেতর অতি উচুঁ একটি ঝাউ গাছের আগায় সে বসে আছে! তার জবান বন্ধ। কোন মানুষের পক্ষে এখানে কিছুতেই গাছে উঠা সম্ভব নয়। কারণ বিশ-পঁচিশ হাত ঝাউ গাছের কোন ডাল থাকে না। কাজেই সুপারী গাছের মত উচ্চ ও ডালপালাহীন এবং তার চেয়ে আরও অনেক মোটাসোটা ঝাউ গাছে উঠার কোন উপায় নেই। জঙ্গল কেটে পরিস্কার করে, বহু কলা-কৌশল করে, অতি কষ্টে তাকে নামিয়ে কারণ জিজ্ঞাসা করা হয়। জবান বন্ধ থাকায় সে কিছুই বলতে পারে না এবং তার পিঠে অনেকগুলো চাবুকের দাগ দেখা যায়। চক্ষু রক্তবর্ণ। তখন বহু লোবের ভিড় জমে যায়। সর্বসিদ্ধান্তমতে তার বেয়াদবী মাপের জন্য বিশেষ মুনাজাতের পর তার জবান খুলে যায়। সে বলে, তার নিদ্রা উপক্রম সময়ে পাঁচজন পাগড়িধারী লোক তাকে চাবুক মারতে শুরু করে। জবান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেউ তার ডাকাডাকি বা যন্ত্রণাকাতর ধ্বনি শোনে নি। চারজন তাকে মেরে ফেলতে চাইলেও পঞ্চম ব্যক্তির অনুরোধ তা প্রত্যাহৃত হয়। ভয়ে সে ঘর থেকে দৌঁড়াতে গিয়ে কি করে যে ঝাউ গাছের আগায় উঠে গেল, বলতে পারে না। ওরা তাকে নড়াচড়া না করতে সাবধান করে দিয়ে চলে চান। সভয়ে সে কাঁদতে কাঁদতে আবার তার এরূপ ভয়াবহ অবস্থার পুনরাবৃত্তি হবে কি না সকলের নিকট জানতে চায়। সকলই তাকে এই অভয়-আশ্বাস দেন যে, জবান খোলা দ্বারা তাকে মাফ করা হয়েছে বুঝায়। আর ভয় নেই। সাত দিন সে দরগা শরীফে অবস্থানের পর, সুস্থ হয়ে চলে যায়।” অনুরূপ আরেকটি কাহিনি, “কয়েক বৎসর পূর্বে জনৈক মাদ্রাসার ছাত্র কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। সে ছিল ধনী পিতার একমাত্র সন্তান। ছাত্রটির দূরারোগ্য ব্যাধির সকল চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়ার পর তার পিতা নিরুপায় হয়ে ছেলে আরোগ্য লাভ করলে হযরত শাহ সুলতানের মাজার শরীফে একটি ষাঁড় আল্লাহর ওয়াস্তে দান করবে বলে নিয়ত করে। এরপর ছাত্রটি আরোগ্য লাভ করে। এই সংবাদ জানতে পেরে সেই মাদ্রাসার সুপারেন্টেনডেন্ট ছাত্রটির পিতাকে ডেকে এনে অনেক প্রবোধ দিয়ে যাঁড়ের টাকা মাজার শরীফে না দিয়ে মাদ্রাসা দরিদ্র তহবিলে জমা দিলে সওয়াব বেশী হবে, একথা মানাতে সক্ষম হন। যাঁড়ের টাকা মাদ্রাসায় জমা দেয়ার পর ছেলেটি পাগল হয়ে যায়। তখন সে নিরুপায় হয়ে দরগা শরীফের খাদেমদের সংগে পরামর্শ করে, আর একটি ষাঁড় কিনে দরগা শরীফে দান করার পর ছেলেটি পাগলামী থেকে অব্যাহতি লাভ করে।” এ ধরনের কাহিনিগুলো মাজারের ভক্তিমূলক সংস্কৃতিতে মানত রক্ষা ও ধর্মীয় অঙ্গীকারের গুরুত্ব তুলে ধরে। এখানে সাধকের মর্যাদার পাশাপাশি মানতকারীর নৈতিক দায়িত্বও সামনে আসে। খন্দকারের গ্রন্থে মানতের নিবেদন নিয়ে আরও একটি কাহিনি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, “বহু বৎসর পূর্বে এক পতিতা রমণী প্রচুর মিষ্টান্ন সিন্নি নিয়ে মাজার শরীফে হাজির হয়। খাদেমগণ পরিচয় জানতে পেরে এসব গ্রহণ করতে ঘৃণা বোধ করে, গরীবদেরকে বিতরণ করে দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু একজন খাদেম এই মিঠাই ঘৃণা না করে বাড়ী নিয়ে গিয়ে বেশ করে খেয়ে-দেয়ে সন্ধ্যার পর মাজার শরীফের ভিতর প্রবেশ করা মাত্রই কোন্ অদৃশ্য হস্ত তাকে শূন্যে তুলে দেয়ালের বাইরে নিক্ষেপ করে। সঙ্গে সঙ্গেই তার নাক মুখ দিয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। বাড়ীতে নেয়ার কয়েকদিন পরই তার মৃত্যু হয়। পতিতা যে সিন্নি তার পাপ ব্যবসা উন্নতির জন্য মানত করেছিল, সেই অন্যায় নিয়তে অর্পিত সিন্নি নিজস্ব খাদেমও গ্রহণ-ভক্ষণ করলে হযরত শাহ সুলতান ক্ষমা করেন না।”[33]
খন্দকারসহ প্রায় সকল ঐতিহাসিক ও জনসাধারণের দাবি, শাহ সুলতান রুমির ওফাতের পরও তাঁর রুহানি ক্ষমতা সক্রিয় রয়েছে এবং তিনি দূরবর্তী স্থানের ঘটনা বা মানুষের অবস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। লেখক এই ধারণার সমর্থনে আত্মার অবিনশ্বরতা, বিজ্ঞান ও মহাবিশ্বের অজানা শক্তি সম্পর্কে নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর আলোচনায় বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, আত্মার দেহমুক্ত অস্তিত্ব এবং প্রকৃতির অজানা বিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে। এই যুক্তির মাধ্যমে তিনি মূলত অলিদের ওফাত-পরবর্তী আধ্যাত্মিক কার্যকারিতার সম্ভাবনা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।[34] আলোচনার এ স্তরে মানত ও শিরনি প্রদানের লিখিত বিবরণ, মাজারের সীমানা রক্ষার অলৌকিক কাহিনি, মানত ভঙ্গের শাস্তি, প্রাণীদের আচরণ এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের সাহায্য লাভের বয়ান থেকে বোঝা যায় যে, মাজারকে ঘিরে সাধকের আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে একটি সমৃদ্ধ ভক্তিমূলক আখ্যান গড়ে উঠেছে। বিশেষত মানত, রোগমুক্তি ও বিপদ থেকে উদ্ধারের কাহিনিগুলো মাজারের সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত প্রত্যাশা এবং ধর্মীয় অভিজ্ঞতার সম্পর্ক বোঝার সুযোগ দেয়।
৪. পটপরিবর্তনের মধ্যে টিকে থাকা সামাজিক স্মৃতি
এই মানদণ্ডে বিচার করা হয়, শাহ সুলতান রুমির প্রতি মানুষের ভক্তি ও শ্রদ্ধা কোনো নির্দিষ্ট শাসক বা রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল, নাকি রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়েও তা টিকে থেকেছে। তবে দীর্ঘকাল ধরে কোনো মাজার বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান টিকে থাকা এবং সাধকের প্রতি জনসাধারণের ভক্তি অব্যাহত থাকার মধ্যকার পার্থক্য ব্যাপক। প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতার অনুৃমান-প্রমাণ পাওয়া গেলেও তা থেকে প্রতিটি সময়পর্বে জনভক্তির মাত্রা বা ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তাই শাহ সুলতান রুমির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক দলিল, পরবর্তী সময়ের বিবরণ, লোককথা, লোকসংগীত এবং সমকালীন ধর্মীয় চর্চাকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শাহ সুলতান রুমির সঙ্গে মদনপুরের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা পূর্বে বর্ণিত হলেও মোঘল আমলের পূর্বে এর ঐতিহাসিক কোনো প্রমাণ হাজির করা যায় না। তাঁর আগমনকাল নিয়ে গবেষকদের মধ্যেও মতপার্থক্য রয়েছে। মুহম্মদ এনামুল হক ১৯১৭ সালের Bengal District Gazetteers: Mymensingh-এ সংরক্ষিত লোকগাঁথা এবং ১৮২৯ সালের ভূমিস্বত্ব-সংক্রান্ত বিরোধে উপস্থাপিত ফারসি দলিলের ভিত্তিতে রুমির আগমনকাল ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দ বলে গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, আবদুল করিম কোচ রাজার সঙ্গে রুমির সংঘাতের কাহিনিকে ত্রয়োদশ শতাব্দীর ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, মোমেনশাহী অঞ্চলে কোচদের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিস্তার রুমির প্রচলিত জীবনকাহিনির কালনির্ণয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ফলে রুমির আগমনকাল এবং বাংলায় তাঁর কার্যক্রমের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এখনো বিতর্কিত। পূর্বে বলা হয়েছে, শাহ সুলতান রুমির দরগাহের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হলো, ১০৮২ হিজরি বা ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দের একটি ফারসি দলিল। এতে তৎকালীন সুলতান, জায়গিরদার সৈয়দ জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ দরগাহের জন্য লাখেরাজ ভূমি প্রদান করেছিলেন- দলিলে এর সংক্ষিপ্ত বর্ণনা রয়েছে। দলিলটির বিবরণে ভূমির নিষ্কর মর্যাদা এবং দরগাহ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের পরিচয় পাওয়া যায়। এটি মদনপুরের দরগাহের ভূমিস্বত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য। ঔপনিবেশিক আমলেও এই দলিলের গুরুত্ব বজায় ছিল। ১৮২৯ সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সরকার দরগাহের নিষ্কর এস্টেট অধিগ্রহণের চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্ট খাদেমগণ আদালতে ১০৮২ হিজরির ফারসি দলিল উপস্থাপন করেন। এর ফলে খাদেমদের কাছে এস্টেটের ভোগদখল বহাল থাকে। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও দরগাহের ভূমিস্বত্ব রক্ষায় মুঘল আমলের দলিল ব্যবহার করা হয়। এখানে পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার অধীনে স্বীকৃত অধিকার পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যেও দরগাহের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব রক্ষার উপায় হয়ে ওঠে। এসব ছাড়াও খন্দকারসহ প্রায় সকল লেখক তাঁদের বিবরণে ১৯১৭ সালের একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করেছেন। ওই প্রতিবেদনে মদনপুরে ইসলাম প্রচারকেন্দ্র স্থাপনের সময় শাহ সুলতান রুমির সঙ্গে তাঁর দশজন বিশ্বস্ত সহচর আমৃত্যু ছিলেন। তাঁদের ‘খাদেম’ বলা হতো এবং পরবর্তী সময়ে ওই খাদেমদের বংশধরেরা দরগাহ ও লাখেরাজ সম্পত্তির আয় ভোগ করতেন। অন্যদিকে, খন্দকারের গ্রন্থে ১৯১৭ সালের ডংকা-সংক্রান্ত বিবরণের পাশাপাশি ১৯৮৭ সালে খাদেমদের কাঠামো, পালাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন এবং রেজিস্টার সংরক্ষণের যে তথ্য পাওয়া যায় তা দরগাহ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সারসংক্ষেপ হিসেবে বিবেচ্য।
প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসের পাশাপাশি শাহ সুলতান রুমিকে ঘিরে প্রচলিত লোককথা ও অলৌকিক ঘটনাবলিও তাঁর সামাজিক স্মৃতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। খন্দকারের গ্রন্থে ভূমি জরিপের সময় শিকল ছিঁড়ে যাওয়া, মাজারে নিবেদিত শিরনি আত্মসাৎ করার পর এক যুবকের শাস্তি পাওয়া এবং মানতের প্রতিশ্রুতি পূরণের সঙ্গে অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতার কয়েকটি কাহিনি পূর্বে বর্ণিত হয়েছে। এসব লোককাহিনিতে সাধকের প্রতি শ্রদ্ধা, দরগাহের মর্যাদা এবং মানত পূরণের নৈতিক বাধ্যবাধকতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সামাজিক স্মৃতির ধারাবাহিকতা কেবল লিখিত দলিল বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং লোকসংগীত ও বার্ষিক ধর্মীয় আয়োজনেও তা প্রকাশিত হয়। মদনপুরের শাহ সুলতান রুমিকে কেন্দ্র করে প্রচলিত ওরসের গানগুলোতে তাঁকে ইসলামের প্রচারক, আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক, ভক্তের আশ্রয় এবং প্রেমের সাধক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেমন সমকালীন রচনায় ঝুমা সরকারের কণ্ঠে গাওয়া ‘যাব আমি মদনপুরে’[35] গান, খুশি নূরীর কণ্ঠে প্রচলিত ‘রুম শহরের বাদশাহ’ এবং খাদিজা ভাণ্ডারীর কন্ঠে ‘আয় কে যাবি মদনপুরে’[36] গানটির উল্লেখ পাওয়া যায়। গানগুলোর সুরে পূর্বপ্রচলিত জনপ্রিয় গানের প্রভাব থাকলেও শাহ সুলতান রুমিকে ঘিরে তাদের বক্তব্যে ভাবগত ধারাবাহিকতা লক্ষ করা যায়। এসব গানে তাঁর আগমন, ধর্মপ্রচার, আধ্যাত্মিক ক্ষমতা এবং ভক্তদের সঙ্গে সম্পর্কের ধারণা স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। গানগুলো মূলত বর্তমান সময়ে তাঁর স্মৃতি কীভাবে প্রকাশিত ও পুনর্ণির্মিত হচ্ছে, তার সাক্ষ্য বহন করে। প্রতি বছর ফাল্গুনের পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত ওরসও এই সামাজিক স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। ওরসকে কেন্দ্র করে ভক্তদের সমাগম, মানত, দান এবং ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, বাউল ও অন্যান্য লোকসংগীতের আসর বসার বিবরণ পাওয়া যায়। এসব কার্যক্রমে ধর্মীয় ভক্তির পাশাপাশি স্থানীয় সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক মেলাবন্ধনের সুযোগ তৈরি হয়। দরগাহে মানত, নিবেদন এবং সাধককে ঘিরে প্রচলিত গান ও কাহিনি বিভিন্ন প্রজন্মের মধ্যে তাঁর স্মৃতি বহন করে চলেছে বলে গ্রহণ করা যায়। সামগ্রিকভাবে, শাহ সুলতান রুমিকে ঘিরে সামাজিক স্মৃতির ধারাবাহিকতা কয়েকটি ভিন্ন ধরনের সাক্ষ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। ১৬৭১ সালের দলিল ও ১৮২৯ সালের ভূমিস্বত্ব-সংক্রান্ত ঘটনা দরগাহের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের সাক্ষ্য দেয়। ১৯১৭ সালের প্রতিবেদন ও ১৯৮৭ সালের খন্দকারের বিবরণে খাদেম-প্রথা এবং ব্যবস্থাপনার কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। আর লোককথা, ওরসের গান ও সমকালীন ধর্মীয় আয়োজন তাঁর স্মৃতির সাংস্কৃতিক ও ভক্তিমূলক প্রকাশ বোঝার সুযোগ দেয়। তবে এসব সাক্ষ্যকে একত্র করে নিরবচ্ছিন্ন জনভক্তির ইতিহাস হিসেবে উপস্থাপন করা যথার্থ নয়। বিশেষত রুমির আগমনকাল থেকে ১৬৭১ সাল পর্যন্ত সময়ের সমসাময়িক প্রমাণ এবং বিভিন্ন সময়পর্বে জনসাধারণের ভক্তির স্বতন্ত্র বিবরণ অনুপস্থিত। প্রাপ্ত তথ্য থেকে বলা যায়, তাঁর স্মৃতি, ভূমিস্বত্ব, খাদেম-প্রথা, লোককথা, লোকসংগীত এবং সমকালীন ধর্মীয় চর্চার মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে পুনরুৎপাদিত হয়েছে। তবে এই ধারাবাহিকতার কতটা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর স্থায়িত্বের ফল এবং কতটা বৃহত্তর জনভক্তির প্রতিফলন, তা নির্ধারণের জন্য মূল দলিলের পাঠ-পরীক্ষা, স্থানীয় মৌখিক ইতিহাস সংগ্রহ এবং বিভিন্ন প্রজন্মের ভক্তদের অভিজ্ঞতাভিত্তিক মাঠ পর্যায়ের গবেষণা প্রয়োজন।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
নেত্রকোণা-মদনপুর অঞ্চলের প্যাট্রন সেইন্ট হিসেবে হযরত শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমির অবস্থান মূল্যায়নে তাঁর ঐতিহাসিক পরিচয়, মাজার-সংস্কৃতি, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক আচার, সুরক্ষামূলক ও মধ্যস্থতামূলক লোকবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক সামাজিক স্মৃতির পারস্পরিক সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মদনপুরের সঙ্গে শাহ সুলতান রুমির সম্পর্কের সবচেয়ে সুস্পষ্ট দিক হলো আঞ্চলিক ইতিহাস ও পরিচয় নির্মাণে তাঁর নামের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি। স্থানীয় ইতিহাসচর্চা, মদনপুরের প্রচলিত কিংবদন্তি, তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে তাঁর স্মৃতির ব্যবহার তাঁকে একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করেছে। একইভাবে, মতভেদ সত্ত্বেও তাঁকে বাংলায় আগত প্রথম সুফি হিসেবে চিহ্নিত করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয়ত, শাহ সুলতান রুমির মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আচার-সংস্কৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মদনপুরের পবিত্র ভূগোল বা আঞ্চলিক শুদ্ধতার ধারণা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তাঁর মাজারের পাশাপাশি গুরু, সহচর ও অন্যান্য সাধকের সমাধি, খাদেম-পরম্পরা, পালাভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন, রেকর্ড সংরক্ষণ, তোষাখানার আতিথেয়তা, ডঙ্কা বাজানোর রীতি এবং বার্ষিক ওরস এই পরিসরের স্বাতন্ত্র্য নির্দেশ করে। এসব চর্চার মধ্য দিয়ে মাজারটি কেবল জিয়ারতের স্থান হিসেবে নয়, বরং ধর্মীয় আচার, সামাজিক মেলামেশা, আতিথেয়তা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের একটি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তৃতীয়ত, শাহ সুলতান রুমিকে ঘিরে প্রচলিত মানত, শিরনি নিবেদন, রোগমুক্তি, বিপদ থেকে উদ্ধার এবং মাজারের মর্যাদা রক্ষার অলৌকিক কাহিনিগুলো তাঁর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা সম্পর্কে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসের পরিচয় বহন করে। এসব বয়ানে সাধকের প্রতি শ্রদ্ধা, ধর্মীয় অঙ্গীকার রক্ষা এবং মাজারের পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রাখার ধারণা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রাপ্ত উপাদান থেকে যেহেতু শাহ সুলতান রুমিকে কোনো নির্দিষ্ট পেশাজীবী গোষ্ঠী বা প্রাকৃতিক পরিবেশের অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পর্যাপ্ত প্রমাণ বা বর্ণনা পাওয়া যায় না, ফলে তাঁর সুরক্ষামূলক বা মধ্যস্থতামূলক ভূমিকার মূল্যায়ন প্রধানত মাজারকেন্দ্রিক মানত, ভক্তিমূলক আখ্যান এবং ব্যক্তিগত সংকটে তাঁর আধ্যাত্মিক সহায়তা লাভের প্রত্যাশার (ওসিলা অর্থে) মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা যুক্তিযুক্ত। চতুর্থত, রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও শাহ সুলতান রুমির স্মৃতির স্থায়িত্বের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস ও সামাজিক স্মৃতির পৃথক তাৎপর্য রয়েছে। ১৬৭১ সালের ফারসি দলিল, ১৮২৯ সালের ভূমিস্বত্ব-সংক্রান্ত বিরোধে দলিলটির ব্যবহার এবং ১৯১৭ সালের গেজেটিয়ার প্রতিবেদন দরগাহের ভূমিস্বত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেয়। পরবর্তী সময়ের বিবরণে খাদেম-প্রথা, মাজার ব্যবস্থাপনা এবং উত্তরাধিকারভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টনের পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যদিকে, লোককথা, ওরসের গান, বার্ষিক ধর্মীয় আয়োজন ও সমকালীন ভক্তিমূলক চর্চা তাঁর স্মৃতির সাংস্কৃতিক পুনর্ণির্মাণের দিকটি তুলে ধরে। সামগ্রিকভাবে, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমিকে নেত্রকোণা-মদনপুর অঞ্চলের একজন প্যাট্রন সেইন্ট হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট ভিত্তি রয়েছে। তাঁর অবস্থানের প্রধান ভিত্তি কেবল কথিত ধর্মপ্রচার, যুদ্ধাভিযান বা অলৌকিক ক্ষমতার বিবরণ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সঙ্গে তাঁর স্মৃতির সংযোগ, তাঁর মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ভক্তিমূলক আচার-অনুশীলন এবং লোককাহিনি ও লোকসংগীতের মাধ্যমে তাঁর স্মৃতির পুনরুৎপাদন।