ভূমিকা: বাঙালি জনগোষ্ঠী ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রধান ভিত্তি বাংলা ভাষা। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পার হয়ে আধুনিক যুগের অদ্যাবধি বাংলা ভাষার বহুমাত্রিক বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন অনেকেই। বর্তমান সময়ে বাংলা ভাষার যে সর্বব্যাপি চর্চা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তা সবসময় ছিল না। বাংলা ভাষার প্রাচীনকাল থেকে প্রাক-ঔপনিবেশিক শাসনের আগ পর্যন্ত বাংলা ভাষা বহু বন্ধুর, কণ্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করেছে। সে সময়ে যারা বাংলা ভাষার স্বাভাবিক বিকাশ ও অগ্রগতি অক্ষুণ্ন রাখতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে সুফি সমাজ অন্যতম প্রধান। আলাওল, দৌলত উজির, হাজী মুহম্মদ, শেখ চান্দ, আলী রজা, আবদুল হাকিম, হেয়াত মামুদের মতো সমৃদ্ধ রচনাবলীর জনপ্রিয় সুফি কবিরা তো আছেই; পাশাপাশি এমন অনেক সুফি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছেন যার যথাযোগ্য আলোচনা ও স্বীকৃতি অদ্যাবধি মেলেনি। সাক্ষ্য হিসেবে চতুর্দশ শতকের প্রভাবশালী সুফি নূর কুতুবুল আলম এবং ষোলো শতকের সুফি সাধক কুতুবুল আউলিয়ার দুটি কাব্য বর্তমান নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়।
হযরত নূর কুতুবুল আলম
সুলতানী আমলের শাসনব্যবস্থায় সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি ছিলেন হযরত নূর কুতুবুল আলম। বাংলার সুলতান প্রথম আলাউদ্দিন ফিরোজ শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাজা গণেশ যখন বাংলার সালতানাত দখল করে তখন নূর কুতুবুল আলম রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন। তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও দূরদর্শিতার ফলেই বাংলার সালতানাত পুনরায় মুসলমানদের অধিকারে আসে। রাজনৈতিক সক্রিয়তা বাদেও একজন সুফি ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি অনন্য, কিন্তু এই সক্রিয়তার মাধ্যমে একজন সুফি হিসেবে তিনি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক কর্তব্য পালন করেছেন এবং একজন সুফির রাজনৈতিক আদর্শ/দর্শন কেমন হওয়া উচিত তার একটি নজির স্থাপন করেছেন।
দৈনন্দিন জীবনে সুফি সাধনা, এবাদত বন্দেগী, মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, লঙ্গরখানা পরিচালনার পাশাপাশি তিনি লেখালেখিও করতেন। তাঁর পিতাও ছিলেন বিখ্যাত সুফি, শায়খ আলাওল হক। তিনি ছিলেন শায়খ আঁখি সিরাজের মুরিদ ও খলিফা। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের আমলে রাজধানী পাণ্ডুয়ায় তিনি একটি মাদ্রাসা পরিচালনা করতেন। সেই মাদ্রাসা ছিল এশিয়ার বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হযরত আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী এই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। নূর কুতুবুল আলম পিতার প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসাতেই লেখাপড়া করেছেন এবং পিতার কাছ থেকেই আধ্যাত্মিক সাধনার দিকনির্দেশনা লাভ করেছেন। ফলে, পিতার তত্ত্বাবধানে সুফিসাধনার পাশাপাশি তিনি ইলম অর্জন করেছেন। ইলম অর্জনের ফলে তিনি আজীবন বিভিন্ন বিষয়ে, বিভিন্ন ভাষায় লেখালেখি করেছেন, জ্ঞানচর্চা অব্যাহত রেখেছেন।
বলা হয়ে থাকে, তিনি ১২১টি কিতাব রচনা করেছেন। যেখানে মাত্র ২টি কিতাব বাদে আর কোনোটিরই নাম জানা যায় না। মুগিসুল ফুকারা নামক গ্রন্থের একটি কপি সংরক্ষিত আছে ইন্ডিয়ার ভাগলপুরের খলিফাবাগ একটি প্রাইভেট লাইব্রেরিতে এবং আনিসুল গুরাবা নামক গ্রন্থের একটি কপি সংরক্ষিত আছে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল কলকাতার লাইব্রেরিতে। তাঁর অন্য কোনো গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তবে, তাঁর একটি কবিতার সন্ধান মিলেছে। আবিষ্কারক মূলত, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। মুর্শিদাবাদের বিখ্যাত দেওয়ান, বাংলায় ইসলাম প্রচার ও মুসলমান জনগোষ্ঠী নিয়ে যিনি সর্বপ্রথম বই লিখেছেন ‘হাকিকতে মুসলমানানে বাঙ্গালাহ’ (পরবর্তীতে নিজেই ইংরেজি অনুবাদ করেছেন: The Origin of the Musalmans of Bengal), তাঁর পুত্র খোন্দকার আলী আফযলের কাছ থেকে ডক্টর শহীদুল্লাহ্ কবিতাটি সংগ্রহ করেছেন।
কবিতাটি উপস্থাপনের পূর্বে শহীদুল্লাহ্ লিখেছেন: “কবিতাটি প্রত্যেক চরণের প্রথম অর্ধেক ফার্সী ও অপর অর্ধেক মধ্যযুগের বাংলায় ফার্সী অক্ষরে লেখা। আমীর খসরুও এইরূপ ফার্সী ও হিন্দি মিশ্রিত কবিতা তাঁর পূর্বে রচনা করেছিলেন। বোধ হয় তাঁরই অনুসরণে হযরত নূর কুতুবুল আলম এইরূপ মিশ্রিত কবিতা (রেখ্তাহ্) রচনা করেন।”[1]
যখন নূর কুতুবুল আলম লিখেছেন এই কবিতা তখন পর্যন্ত কেবল আমীর খসরুরই এই ধরনের কবিতা (ফার্সি ও হিন্দি মিশ্রিত) লেখার একক কৃতিত্ব ছিল। প্রশ্ন হলো, ডক্টর শহীদুল্লাহ্’র ধারণা অনুযায়ী যদি তিনি আমীর খসরুর কাব্য অনুসরণ করেই এই কবিতা লিখে থাকেন, তাহলে কিভাবে তিনি আমীর খসরুর এধরনের কাব্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন? মাধ্যমটা কী? আমীর খসরুর ইন্তেকাল ১৩২৫ খ্রি. এবং নূর কুতুবুল আলমের ইন্তেকাল ১৪২৫ খ্রি.— নূর কুতুবুল আলমের হায়াত যদি সর্বোচ্চ ১০০ বছরও ধরি, তাহলেও আমীর খসরুর ইন্তেকালের বছর হয়; অর্থাৎ উভয়ের দেখাসাক্ষাৎ হবার কোনো সম্ভাবনা নেই। এটি নিশ্চিত হলো, নূর কুতুবুল আলম সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবে আমীর খসরুর কাব্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। প্রশ্ন হলো, পরোক্ষ সেই মাধ্যমটা কী?
নূর কুতুবুল আলমের পিতা শায়খ আলাওল হক; শায়খ আলাওল হকের পীর ও মুর্শিদ শায়খ আঁখি সিরাজুদ্দীন উসমান (আমরা সংক্ষেপে ‘আঁখি সিরাজ’ বলবো)। শায়খ আঁখি সিরাজ হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়ার শাগরেদ, মুরিদ ও খলিফা ছিলেন। তিনি ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে পরিপক্ক বয়স পর্যন্ত একটি উল্লেখযোগ্য সময় নিজামুদ্দীন আউলিয়ার নিকট দিল্লিতে অতিবাহিত করেছেন। আমীর খসরুও হজরত নিজামুদ্দীন আউলিয়ার প্রিয় শাগরেদ ছিলেন। আমীর খসরু এবং আঁখি সিরাজ ছিলেন সমসাময়িক— দুজন একই সময়ে নিজামুদ্দীন আউলিয়ার তত্ত্বাবধানে শিক্ষা জীবন সমাপ্ত ও সুফি সাধনায় দীক্ষা গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ আমীর খসরু এবং আঁখি সিরাজ দীর্ঘদিনের সঙ্গী, সহপাঠী ও পীর ভাই। এই সূত্রে আমীর খসরুর কাব্যের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। কেবল পরিচয় নয়, বরং সহপাঠী ও পীর ভাই হিসেবে আমীর খসরুর কাব্যজীবন ও জীবনদর্শন সাধারণের চেয়ে তিনি অধিক জানবেন, বুঝবেন এটিই স্বাভাবিক।
নিজামুদ্দীন আউলিয়ার ইন্তেকালের পর আঁখি সিরাজ বাংলার পাণ্ডুয়ায় আগমন করেন। তাঁর জীবনীকাররা বলেন, তিনি আসার সময় দিল্লি থেকে বই-পুস্তক নিয়ে এসেছিলেন। পাণ্ডুয়ায় এসে তিনি খানকাহ স্থাপন করে সুফি সাধনার পাশাপাশি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করলেন। তাঁর শাগরেদগণ এখানে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষালাভ করতেন। নূর কুতুবুল আলমের পিতা শায়খ আলাওল হক এই মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। আঁখি সিরাজ তাঁর অত্যন্ত পছন্দের ছাত্র হিসেবে আলাওল হকের সঙ্গে তাঁর মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। এই দম্পতির সন্তান হযরত নূর কুতুবুল আলম। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অনুমান করা মোটেই অস্বাভাবিক হবে না যে, আঁখি সিরাজ দিল্লি থেকে যে কিতাবপত্র সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন তার মধ্যে আমীর খসরুর কাব্যও ছিল এবং তাঁর পাঠদানে আমীর খসরুর কাব্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখনো পর্যন্ত হিন্দুস্তানের মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল কাব্য প্রতিভা ও সহপাঠী হিসেবে আমীর খসরুর কাব্যের উপস্থাপন ও পাঠদান আঁখি সিরাজের জন্য ছিল খুবই স্বাভাবিক। আঁখি সিরাজের এই পাঠদানে সরাসরি অংশ নিয়েছেন শায়খ আলাওল হক এবং শায়খ আলাওল হকের সন্তান, শাগরেদ ও খলিফা নূর কুতুবুল আলম। দিল্লিতে নিজামুদ্দীন আউলিয়ার শাগরেদ ও আমীর খসরুর সহপাঠী হিসেবে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত করা আঁখি সিরাজের মাধ্যমেই মূলত পাণ্ডুয়ায় আমীর খসরুর কাব্যপাঠের সূচনা হয়েছে এবং শায়খ আলাওল হকের মাধ্যমে তা নূর কুতুবুল আলম পর্যন্ত পৌঁছেছে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ এবং আমাদের ধারণা অনুযায়ী, যদি নূর কুতুবুল আলম আমীর খসরুর অনুসরণ করে কবিতাটি রচনা করে থাকেন তাহলে তা এই সূত্রের মাধ্যমেই সর্বাধিক সম্ভব।
এবার কবিতাটি পড়া যেতে পারে।
ওহ্ চেঃ কর্দম রূএ তু দীদম
উমত পাগল ভৈলুঁ।
হম্চুঁ মজ্নূঁ বহ্রে লয়্লা
ভাবত বেকল ভৈলুঁ॥
মূএ কুশাদী জানম্ বুর্দী
বলিয়া পিটালী মোরে।
শব্ ন খুফ্তম্ রোয ন খোর্দম
কতেক পোড়সি মোরে॥
জানম্ বুর্দী আয্ মন্ জানাঁ
মুঞি তোর দোষ ন কৈলুঁ।
দর্দে ফিরাকত্ হর্ শব্ গিরিয়ম্,
তাহার সুফল পাইলুঁ॥
গর্তু বিয়াঈ যিন্দাঃ শওম
মই শিশ ধরুঁ তোর পাএ।
ময়ল্ মুহব্বত্ আয্ সর্ জোওম তূঝেঁ
জানো তার নাঞি॥
গর্ তোরা বুগুযারম্ খল্ক চেঃ গোয়ন্দ
নেহা কেহ্নে তো সনে কৈলুঁ।
মা যাঁ দর্দত্ পা কুশায়েম্,
এহাত কেনে না মৈলুঁ॥
দীদম্ রূএ তু গশ্তম্ আশিক,
চুনাঁশুদ্ শূহরত বশহ্রে চুনীঁ মজ্নুঁ লায়লা।
তাকতে সব্র ন মানদ্ কুত্ব
কতেক দুখ সহেলুঁ॥
দর্ হর্ মূএ সোয দারম্
অনেক পূড়ি মরুঁ॥
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ কৃত অনুবাদ:
বাঃ। কি করলাম? মুখ তোমার দেখলাম,
উন্মত্ত পাগল হলাম।
যেমন মজনু লায়লার জন্য
ভাবে বিকল হলাম॥
চুল এলায়েছ, পরাণ কেড়েছ,
সবলে পিটিয়েছ মোরে।
রাতে ঘুমাই নাই, দিনে খাই নাই,
কত পোড়াস মোরে॥
পরাণ আমার কেড়েছ আমা হতে,
হে প্রিয়! আমি তোমার কাছে দোষ করি নি।
তোমার বিরহবেদনায় প্রতি রাত্রি কাঁদি,
তার সুফল পেলাম॥
যদি তুমি এস, জীবন্ত হব,
আমি মাথা রাখি তোমার পায়।
অনুরাগ প্রেম মাথা দিয়ে চাই,
তোমাতে তার জ্ঞান নাই॥
যদি তোমাকে ছাড়ি, লোকে কি বলবে?
কেন প্রেম তোমার সঙ্গে করলাম॥
আমি তোমার এই বেদনার জন্য পা ফিরাই,
এর থেকে কেন না মরলাম॥
তোমার মুখ দেখলাম প্রেমিক হলাম,
এরূপ হ’ল খ্যাতি নগরে যেরূপ মজনু ও লায়লা।
কুতবের ধৈর্য্যের শক্তি নাই
কত দুঃখ সইলাম॥
প্রতি লোমে আমি জ্বালা পাই,
অনেক পুড়ে মরি॥[2]
সৈয়দ মুর্তাজা আলীর অনুবাদটি আরো স্পষ্ট ও সহজবোধ্য:
হায়, কি করলেম? তোমার মুখ দেখে পাগল হলেম।
যেমন লায়লার জন্য মজনু, ভাবে বিকল হলেম।
চুল এলিয়েছে, পরাণ কেড়েছে, সবলে পিটিয়েছ মোরে। রাতে ঘুমাইনি, কত পোড়াস মোরে?
আমার পরাণ কেড়েছ, হে প্রিয়, আমি তো তোমার কাছে দোষ করিনি।
প্রতি রাত তোমার বিরহ বেদনায় কাঁদি; তারই ফল পেলাম।
যদি তুমি এস তবে জীবন্ত হব, আমি তোমার পায় মাথা রাখব।
অনুরাগ প্রেম মাথা দিয়ে চাই, তোমাতে তার জ্ঞান নাই।
যদি আমি তোমাকে ছাড়ি তবে লোকে কি বলবে?
হায় কেন তোমার সঙ্গে প্রেম করলাম?
আমি তোমার এই বেদনার জন্য পা ফিরাই, হায় কেন মরলাম না।
তোমার মুখ দেখেই প্রেমিক হলাম; মজনু ও লায়লার খ্যাতি হল শহরে।
কুতুবের আর ধৈর্যের ক্ষমতা নাই। কতইনা দুঃখ সইলাম।
প্রতি লোমকূপে পাই যাতনা, পুড়ে পুড়ে মরি।[3]
বোঝা যাচ্ছে, এটি একটি আধ্যাত্মিক কাব্য। খোদার প্রেমে বিভোর হয়ে, তাঁর দিদারের আশায় এমন কাব্য রচনার ঐতিহ্য সুফিদের আছে। এমন কোনো সুফি বোধহয় পাওয়া মুশকিল হবে, যিনি লেখালেখি করেছেন অথচ এমন বিরহের, মরমী কাব্য রচনা করেননি। একজন সুফি হিসেবে নূর কুতুবুল আলমের পক্ষে এমন কাব্য লেখা কেবল স্বাভাবিকই নয়, প্রত্যাশিতও।
কাব্যে পাগল, লায়লী মজনু, বিরহ বেদনা, প্রেম, পরাণ, পোড়া ইত্যাদি শব্দবন্ধ স্পষ্ট করে যে, লেখক কোন্ নিয়্যত থেকে এই কাব্য রচনা করেছেন। সঙ্গীতের গূঢ়ার্থ ও বিশেষত্ব নিয়ে বহুভাষাবিদ কাব্য সমঝদাররাই ভালো বলতে পারবেন, কিন্তু ১৫ শতকের শুরুতে এ ধরনের কাব্য লেখা যে সহজ বিষয় ছিল না তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
মধ্যযুগের বাংলা
হযরত নূর কুতুবুল আলমের ইন্তেকাল ১৪১৫ খ্রিস্টাব্দ। যদি তিনি শেষ ১৫ বছরের মধ্যে এটি রচনা করে থাকেন তাহলে তা ১৫ শতকের প্রথমদিকে প্রচলিত বাংলা ভাষার একটি নিদর্শন হিসেবে গণ্য। ভাষার দিক থেকেও সমসাময়িক বাংলার অন্যান্য কবিদের রচনার সাথে এর মিল পাওয়া যায়।
মধ্যযুগের বাংলায় ‘য়’ স্থলে ‘এ’ ব্যবহার প্রচলিত ছিল।
নূর কুতুবুল আলম লিখেছেন: ‘মই শিশ ধরুঁ তোর পাএ।’
সমসাময়িক বাংলার বিখ্যাত কবি বড়ু চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের এক জায়গায় লিখেছেন: ‘আহ্মার বিরহ তোহ্মে পাএ কত দুখ।’[4]
নূর কুতুবুল আলম এবং চণ্ডীদাসের ব্যবহৃত শব্দের অর্থ ভিন্ন হলেও, দুজনেই ‘য়’ উচ্চারণস্থলে ‘এ’ ব্যবহার করেছেন।
আমি’র স্থলে ‘মুই’ বলা এখনো বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের ভাষায় প্রচলিত আছে। এটি মধ্যযুগের বাংলা কাব্যেও বহুল প্রচলিত ছিল। কিন্তু তখন ‘মুই’ উচ্চারণের লেখ্যরীতি ছিল ‘মুঞি’— ই’র স্থলে ঞ।
নূর কুতুবুল আলম লিখেছেন: ‘মুঞি তোর দোষ ন কৈলুঁ।’
১৪ শতকের বৈষ্ণব পদাবলীতে আছে: ‘কুলবতী হইয়া মুঞি কুল ত্যজাইলু।’[5]
১৪ শতকের বিখ্যাত কবি শাহ মুহম্মদ সগীর লিখেছেন: ‘তোহ্মা বিনে আরু মুঞি না দেখোঁ জীবন।’[6]
মধ্যযুগের বাংলায় ‘কেন’ কে লেখা হতো ‘কেহ্ন’।
নূর কুতুবুল আলম লিখেছেন: ‘নেহা কেহ্নে তো সনে কৈলুঁ।’
চণ্ডীদাস শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে লিখেছেন: ‘সঙ্গে কেহ্নে লআঁ বুল নাতিনিখানী।’[7]
অর্থাৎ, ১৪ শতকের/১৫ শতকের কাব্য হিসেবে ভাষার ব্যবহার ও রীতিনীতির দিক থেকে অন্যান্য কবিদের রচনার সঙ্গেও এর মিল রয়েছে। নূর কুতুবুল আলম সমসাময়িক লেখ্য ভাষার স্ট্যান্ডার্ড যে বাংলা সেটিই এই কবিতায় ব্যবহার করেছেন। ১৪/১৫ শতকের বাংলা ভাষার নিদর্শন হিসেবে নূর কুতুবুল আলমের এই কবিতাকে নিঃসন্দেহে উপস্থাপন করা যায়।
নূর কুতুবুল আলমের এই বাংলায় আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে তেমন আরবি, ফারসি শব্দ নেই। এটিকে সংস্কৃত বাংলা বলা যায়। কারণ হিসেবে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র এই ব্যাখ্যা গ্রহণীয়: “১৩৫০ হইতে ১৫৭৫ খ্রীঃ পর্যন্ত গৌড়ীয় যুগ বা স্বাধীন পাঠান যুগ: এই ভাগে বাঙ্গালা ভাষা গৌড়ের পাঠান সম্রাট ও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদিগের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। কিন্তু পরসী (ফারসি) প্রভাব অতি অল্প পরিমাণে ভাষায় প্রবেশ লাভ করে। এই ভাগের শেষে চৈতন্য প্রভাব বাঙ্গালা সাহিত্যে প্রবিষ্ট হয়। কিন্তু এই সময় বাঙ্গালায় হিন্দীর প্রভাব পড়ে নাই।”[8] অর্থাৎ, তখনো পর্যন্ত বাংলা ভাষা আরবি, ফারসি ও হিন্দি ভাষার প্রভাবমুক্ত ছিল; তুলনামূলক বেশি প্রভাব ছিল সংস্কৃত ভাষার। যে কারণে প্রথম মুসলমান কবি শাহ্ মুহম্মদ সগীরের মতো নূর কুতুবুল আলমের রচনাতেও আরবি, ফারসি শব্দের আধিক্য নেই।
বৈশ্বিক রীতির অংশ
ভিন্ন একাধিক ভাষা দিয়ে কাব্য রচনাকে ইংরেজিতে বলে ম্যাকারণিক (Macaronic Style), আরবিতে বলা হয় মুলাম্মায়াত (ملمعات)।
এই রীতিতে কাব্য রচনার ঐতিহ্য বেশ সমৃদ্ধ। ১১৩০ সালে গসপেল বুকে লেখা হয়েছিল ডাচ ও ল্যাটিন ভাষার মিশ্র কবিতা; ১৪ শতকেই ইংরেজি ভাষায় এমন এক রাজনৈতিক কবিতা লেখা হয়েছিল যেখানে ইংরেজি ও ল্যাটিন ভাষার মিশ্রণ ছিল। অর্থাৎ, ইংরেজি ও ল্যাটিন ভাষায় ম্যাকারণিক স্টাইলে কাব্য রচনার সূচনা হয়েছিল ১২ শতকেই।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পারস্যের বিখ্যাত সুফি কবি শেখ সাদি সিরাজী (১১৯৩-১২৯৪), জালালুদ্দিন রুমি (১২০৭-১২৭৩), হাফিজ সিরাজী (ইন্তেকাল ১৩৮৯) ও আবদুর রহমান জামি (১৪১৪-১৪৯২) ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত স্টাইলে কাব্য রচনা করেছেন। আবদুর রহমান জামি ব্যতীত সকলেই নূর কুতুবুল আলমের পূর্ববর্তী প্রজন্মের।
গুলিস্তা ও বোস্তার জন্য বিখ্যাত সুফি কবি শেখ সাদি সিরাজী লিখেছেন:
Arabic: سل المصانع رکباً تهيم فی الفلوات
Persian: تو قدر آب چه دانی که بر لبی فرات
(Salil-masāni‘a rukbanan tuhīmu fil-falawāt / Tu qadr-e āb che dānī ki bar lab-e Furāt)[9]
শেখ সাদির যে বিখ্যাত নাত গজল, এটিও ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত স্টাইলে রচিত।
Arabic: بلغ العلی بکماله، کشف الدجی بجماله
Arabic: حسنت جمیع خصاله، صلوا علیه و آله
(Balaghal-ulā bi-kamālihī, kashafad-dujā bi-jamālihī / Hasunat jamī‘u khisālihī, sallū ‘alayhi wa ālihī)
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সুফি কবি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমিও এধরনের বহু কাব্য রচনা করেছেন। যেমন:
Arabic: يا من يرى ولا يُرى، يا من هو العالي الدنا
Persian: ای آن که در جان منی، وز جان بدانی حال ما
(Yā man yarā wa lā yurā, yā man huwa al-‘ālī ad-danā / Ay ān ki dar jān-e manī, waz jān bidānī hāl-e mā)[10]
Persian: من مست و تو دیوانه، ما را که برد خانه؟
Arabic: تبارك الله أحسن الخالقين، في ذروة العلین
(Man mast o tu dīvāna, mā rā ki barad khāna? / Tabāraka-Allāhu ahsanul-khāliqīn, fī dharwatil-‘illiyīn)[11]
পারস্যের আরেক বিখ্যাত কবি হাফিজ সিরাজী, যাকে বাংলায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ, তিনিও রচনা করেছেন এমন কাব্য।
Arabic: ألا يا أيها الساقي أدر كأساً وناولها
Persian: که عشق آسان نمود اول ولی افتاد مشکلها
(Alā yā ayyuhā-s-sāqī adir ka’san wa nāwilhā / Ki ‘ishq āsān namūd awwal walī uftād mushkil-hā)[12]
নূর কুতুবুল আলমের পরবর্তী প্রজন্মের কবি, আবদুর রহমান জামির মুলাম্মায়াত কাব্যের একটি নিদর্শন:
Arabic: حَسبي بِمَن هُوَ في جَمالِهِ واحِدٌ
Persian: آن رخ که ماه ناید با او به پیشوایی
(Hasbi bi-man huwa fi jamalihi wahidun / An rukh ki mah nayad ba u ba pishwayi)[13]
ইউরোপে ইংরেজি ও ল্যাটিন ভাষার কবিরা এবং মধ্য এশিয়ায় শেখ সাদী, রুমি, হাফিজ সিরাজীরা ফারসি ও আরবি ভাষায় ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত স্টাইলে কাব্য রচনার যে বৈশ্বিক ঐতিহ্য, কাব্য-সংস্কৃতি গড়ে তুলেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় কাব্য রচনা করেছেন হযরত নূর কুতুবুল আলম। ১৪/১৫ শতকে ফারসি ও বাংলা ভাষার সমন্বয়ে কাব্য রচনা করে ইউরোপ ও এশিয়ায় ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত স্টাইলে কাব্য রচনার যে বৈশ্বিক ঐতিহ্য, কাব্য-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিলো তাতে বাংলাকেও সংযুক্ত করেছেন নূর কুতুবুল আলম।
কেন মুলাম্মায়াত স্টাইলে কাব্য রচনা করেছেন বিখ্যাত সুফি কবিরা এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিখ্যাত সুফি কবিদের ‘মুলাম্মায়াত’ বা বহুভাষিক মিশ্রণে কাব্য রচনার ক্ষেত্রে ভাষাগত, আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক কারণ ছিল। তাসাউফে ‘ওয়াহদাতুল উজুদ’ ধারণা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সুফি কবিরা দেখাতে চেয়েছেন যে, আধ্যাত্মিক সত্য কোনো নির্দিষ্ট ভাষা বা ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ নয়। ভিন্ন ভিন্ন ভাষার শব্দ যখন একই ছন্দে মিশে যায়, তা মূলত ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের একই স্রষ্টার প্রতি অনুরাগের প্রতিফলন ঘটায়। ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষকে একটি কমন জায়গায় নিয়ে আসারও পথ তৈরি করে। আবার সুফি কবিদের (যেমন: মাওলানা রুমি, হাফিজ বা সাদী শিরাজি) রচনার অন্যতম উৎস ছিল কুরআন ও হাদিস। অনেক সময় গভীর কোনো তাত্ত্বিক বিষয় বা আধ্যাত্মিক সংকেত বোঝাতে তারা সরাসরি আরবি শব্দ বা কুরআনের আয়াতাংশ ব্যবহার করতেন, আবার তার ব্যাখ্যা বা অনুভূতি প্রকাশের জন্য ফারসি ব্যবহার করতেন। এতে কবিতার গাম্ভীর্য ও আবেদন বহুগুণ বেড়ে যায়। মুলাম্মা রচনা করা বেশ কষ্টসাধ্য। কারণ এতে দুটি ভিন্ন ভাষার ব্যাকরণ ও ছন্দকে সুনিপুণভাবে মেলাতে হয়। কখনো কখনো সুফি কবিরা এর মাধ্যমে তাদের গভীর পাণ্ডিত্য এবং ভাষার ওপর দখল জাহির করতেন। এটি কবিতার নান্দনিক সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও সহায়ক। পারস্যের কবিদের ক্ষেত্রে এটি সত্য যে, মধ্যযুগে ইসলামি বিশ্বে আরবি ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভাষা এবং ফারসি ছিল সাহিত্য ও রাজকীয় ভাষা। পারস্যের সুফি কবিরা যখন এই দুই ভাষার মিশ্রণ ঘটাতেন, তখন তা শিক্ষিত/পণ্ডিত সমাজ এবং সাধারণ পাঠক—উভয়কেই আকৃষ্ট করতে সক্ষম হতো।
এসকল উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শেখ সাদি, হাফিজ সিরাজী, জালালুদ্দিন রুমির কাতারে শামিল হয়েছেন নূর কুতুবুল আলম। ভূগোল ভিন্ন হলেও একজন সুফি পণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে তাঁদের চিন্তা, চেতনা, মনোজগত সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়াই স্বাভাবিক। মাওলানা রুমি, হাফিজ সিরাজীরা যেমন ফারসির সঙ্গে আরবিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন, ফারসিভাষী পাঠকের সঙ্গে আরবিভাষী পাঠককেও গ্রাহ্য করেছেন, ফারসি ও আরবিকে মুখোমুখি দাঁড় না করিয়ে বরং আলিঙ্গনের ব্যবস্থা করেছেন, তেমনি নূর কুতুবুল আলম ফারসির সঙ্গে বাংলাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছেন, ফারসিভাষী পাঠকের সঙ্গে বাংলাভাষী পাঠককেও গ্রাহ্য করেছেন এবং ফারসি ও বাংলাকে মুখোমুখি দাঁড় না করিয়ে বরং আলিঙ্গনের মাধ্যমে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধির সম্ভাবনাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছেন।
আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ল্যাটিন, ইংরেজি, ফারসি, আরবি ও হিন্দি— যে ৫টি ভাষায় ততদিনে ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত রচিত হয়েছে হিন্দি বাদে সবগুলো ভাষাই ততদিনে সমৃদ্ধ ও পরিপক্ক। অপরদিকে বাংলা ভাষা তখনো শৈশব অতিক্রম করছে; ভাষার কাঠামো গঠিত হয়নি ঠিকমতো। পণ্ডিতদের কাছে তখনও বাংলা অচ্ছুত প্রায়। এমতাবস্থায় ফারসির সঙ্গে বাংলাকে যুক্ত করে কাব্য রচনা করে বৈশ্বিক ঐতিহ্যে বাংলা ভাষা ও ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে নূর কুতুবুল আলম বাংলা ভাষা ও ভূখণ্ডের ইতিহাসে এমন এক অর্জন করেছেন যেখানে তিনি অনন্য।
নূর কুতুবুল আলমের সমসাময়িক বিশ্বে ফারসি অন্যতম সমৃদ্ধ ও পরিপক্ক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। তৎকালীন উপমহাদেশে ফারসির পাশে রাখা যায় এমন ভাষা ছিল কি-না বলা মুশকিল। কিন্তু একথা বলা যায় নিঃসন্দেহে, তৎকালীন পণ্ডিতদের কাছে— বিশেষত মুসলিম পণ্ডিত— ফারসিই ছিল লেখার জন্য সর্বোচ্চ উপযুক্ত ভাষা। এমন পরিস্থিতিতে ফারসির সঙ্গে বাংলাকে যুক্ত করে তিনি তুলনামূলক নবীন ও অপরীক্ষিত বাংলা ভাষাকে বিশেষ মর্যাদার আসন দিয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি পণ্ডিত, লেখক ও পাঠকদের জন্যও একটি বার্তা দিয়েছেন যে, লেখার জন্য এতদিন ফারসিই ছিল প্রধান ভাষা, কিন্তু এখন ফারসির পিছু পিছু বাংলাও আসছে। যেন বাংলা ভাষার ভবিষ্যত তিনি দেখতে পেয়েছিলেন— তাঁর এই দূরদর্শিতা নিকট ভবিষ্যতেই প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর ইন্তেকালের দুইশো বছরের মধ্যে লেখক ও পণ্ডিতদের মধ্যে বাংলা ভাষায় লেখালেখির প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছিলো।
ফারসি ও বাংলাকে একত্র করে তিনি ফারসিভাষী ও বাংলাভাষীদের মধ্যে একটি ব্রিজ তৈরি করেছেন। তাঁর ছাত্র ও মুরিদের মধ্যে ফারসিভাষী ও বাংলাভাষী উভয়ই ছিল বলে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায়। যখন তিনি এই কাব্য রচনা করেছেন তখন যে ফারসিভাষী ছাত্র তাকে যেতে হবে বাংলাভাষীর নিকট আবার যে বাংলাভাষী তাকে যেতে হবে ফারসিভাষীর নিকট। অর্থাৎ, ফারসিভাষী ও বাংলাভাষী কেউই এই কাব্য কেবল নিজের ভাষা দিয়ে বুঝতে পারবে না। অনিবার্যভাবে অন্য একটি ভাষার কারো কাছে যেতে হবে, বুঝে নিতে হবে। এতে করে পারস্পরিক ভাষিক দূরত্ব ও অহংবোধ দূর হবে, নিজেদের মধ্যে সখ্যতা তৈরি হবে এবং সামাজিকভাবে সহাবস্থান ও সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব তৈরি হবে। দুই ভাষায় কথা বলা দুটি গ্রুপকে আপোষে এক জায়গায় নিয়ে আসা, সখ্যতা তৈরির সুযোগ সৃষ্টি এবং পরস্পরকে পরস্পরের ভাষার প্রতি আকৃষ্ট করার অত্যন্ত কার্যকরী উসিলা ছিল নূর কুতুবুল আলমের এই কাব্যটি।
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র মতে, তখনো বাংলা ভাষায় ফারসির প্রবেশ ঘটেনি। সে সময়ের বাংলা রচনাবলী দেখলেই এর সত্যতা মেলে। প্রশ্ন হলো, বাংলা ভাষায় ফারসির প্রবেশ শুরু হয় কীভাবে? পুরোপুরি না হলেও, বাংলা ভাষায় ফারসির প্রবেশ ও প্রভাব তৈরিতে নূর কুতুবুল আলমের এই কাব্যটি ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে বিবেচ্য। ফারসির সঙ্গে বাংলাকে যুক্ত করে তিনি বাংলায় সরাসরি ফারসি শব্দ ব্যবহারের পথ খুলে দিয়েছেন। এটি একটি ইশারা যে, ফারসি ও বাংলা বাক্য পাশাপাশি বসিয়ে কাব্য রচনা করতে পারলে প্রয়োজনীয় ফারসি ও বাংলা শব্দ পাশাপাশি বসিয়ে বাক্য তৈরি করা যেতে পারে। এই ইশারা বুঝতে পেরে পরবর্তীতে কত কবি কতভাবে বাংলা ভাষায় ফারসি শব্দ, অনুষঙ্গ ব্যবহার করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেছেন তার হদিস ইতিহাসে নেই। কিন্তু ফারসির প্রবেশ ও প্রভাবের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার এক ঐতিহাসিক কার্যকরী সূচনা যে ছিল নূর কুতুবুল আলমের এই কাব্যটি তা সমঝদার ভাষাবিদ, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ মাত্রই স্বীকার করবেন।
নূর কুতুবুল আলম জীবনের পুরোটা সময় বসবাস করেছেন বাংলায়, বেশিরভাগই পাণ্ডুয়ায়। তাঁর ছাত্র, শাগরেদ ও মুরিদ বেশিরভাগই বাংলার মুসলমান— এটি সহজেই অনুমেয়। বাংলার সকল মুসলমান বাংলা ভাষায় বলবে এটি ১৪/১৫ শতকের জন্য পুরোপুরি অবাস্তব কাল্পনিক ব্যাপার। কিন্তু তন্মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মুসলমান সমাজ যে বাংলা ভাষায় অভ্যস্ত ছিলেন এটি অনুমান করা যায়। অর্থাৎ, নূর কুতুবুল আলমের ছাত্র, শাগরেদ ও মুরিদদের মধ্যে একটি অংশ ছিলেন বাংলাভাষী। বাংলার প্রথম সুফি হিসেবে নূর কুতুবুল আলম এই বাংলাভাষী মুসলমানদের আনুষ্ঠানিকভাবে এড্রেস করেছেন। একই রচনায় ফারসির সঙ্গে বাংলাকে যুক্ত করে নূর কুতুবুল আলম ফারসিভাষী মানুষের সঙ্গে বাংলাভাষীদের মর্যাদাকে সমুন্নত করেছেন। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে, ১৪/১৫ শতকে, সমাজের উচ্চস্তরের ব্যক্তিবর্গ পারিবারিক ও সামাজিকভাবে ফারসিভাষী ছিলেন। আর বাংলাভাষী মুসলমানগণ ছিলেন নিম্নবিত্ত ও বড়জোর নিম্ন মধ্যবিত্ত। কিন্তু নূর কুতুবুল আলম একই রচনায় ফারসির সঙ্গে বাংলাকে যুক্ত করে ফারসিভাষী মানুষের সঙ্গে বাংলাভাষীদের মর্যাদাকে সমান্তরালে রেখে ভাষার মাধ্যমে সমাজে যে উঁচুনিচু ভেদাভেদ, শ্রেণীবৈষম্য তৈরি হয় তা ভেঙে দিতে চেয়েছেন, আর নিজস্ব বলয়ে যে ভাঙতে পেরেছেন তা বলাই বাহুল্য। বলাই বাহুল্য, যে সময়ে তিনি লিখেছেন সে সময়ে বাংলা সালতানাতের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক তো বটেই, রাষ্ট্রীয়ভাবেও তিনি অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। এমন ব্যক্তি যখন ফারসির সঙ্গে বাংলাকে যুক্ত করে কাব্য রচনা করেন তা সাধারণ ঘটনা নয়। এর সামাজিক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক— সকল ধরনের তাৎপর্য রয়েছে। ১৪/১৫ শতকে, সুলতানী আমলের বাংলা যখন রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ও উত্তপ্ত, তখন সমসাময়িক মুসলমান সমাজের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে বাংলা ভাষা ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিঃসন্দেহে অবিস্মরণীয়।
হযরত নূর কুতুবুল আলম মাত্র একটি কাব্য রচনার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পণ্ডিতমহলে হাজির করেছেন; বাংলা ভাষার সম্ভাবনাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছেন; বাংলার মুসলমানদের জন্য ফারসির পর বাংলাকে ভাষা হিসেবে নির্ধারণের ইশারা দিয়েছেন; ফারসিভাষী ও বাংলাভাষীদের মর্যাদাকে সমান্তরালে এনে সামাজিক বিপ্লব সাধন করেছেন; গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বাংলাভাষী মুসলমানদেরকেও এড্রেস করেছেন এবং ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত স্টাইলে কাব্য রচনার যে বৈশ্বিক ঐতিহ্য ও কাব্য-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তাতে বাংলা ভাষা ও বাংলা ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। বাংলা ভাষার ইতিহাসে এমন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিঃসন্দেহে বিরল। ইতিহাসবিদরা অদ্যাবধি শনাক্ত না করলেও, বাংলা ভাষা ও বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠীর পক্ষে এমন ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হযরত নূর কুতুবুল আলমের জন্য ইতিহাসের যথোপযুক্ত স্থান বরাদ্দ রেখেই বাংলার ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করতে হবে।
মধ্যযুগের বাংলায় শুধু যে নূর কুতুবুল আলমই ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত কাব্যের অধিকারী তা নয়, এই সিলসিলা তাঁর মাধ্যমে শুরু হয়েছে মাত্র। তাঁর ইন্তেকালের ১৫০ বছর পর, সিলেটের তরফে বসে সৈয়দ কুতুবুল আউলিয়াও রচনা করেছেন ম্যাকারণিক স্টাইলের কাব্য। এবার সে আলোচনায় ব্যস্ত হওয়া যাক!
কুতুবুল আউলিয়া
বাংলার বিখ্যাত ৩৬০ আউলিয়ার মধ্যে হযরত শাহজালাল, শাহপরাণের পর সবচেয়ে আলোচিত নাম সৈয়দ নাসিরউদ্দিন সিপাহসালার। রাজা গৌড় গোবিন্দের সঙ্গে হযরত শাহজালালের নেতৃত্বে যে যুদ্ধ হয়েছিল তাতে সেনাপতির ভূমিকায় ছিলেন তিনি। সিলেট বিজয়ের পর হযরত শাহজালালের নির্দেশে তরফ রাজ্য বিজয়ের পর তরফের শাসনকর্তা হিসেবে তিনি মনোনীত হন এবং আমৃত্যু তিনি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে তরফ রাজ্য পরিচালনা করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে হযরত শাহজালাল ১২জন আউলিয়াকে তরফে প্রেরণ করেন। এজন্য তরফ ‘বারো আউলিয়ার মুলুক’ হিসেবেও পরিচিত।
সৈয়দ নাসিরউদ্দিনের ৫ম অধস্তন পুরুষ সৈয়দ শাহ্ ইলিয়াস কুদ্দুস, যিনি ‘কুতুবুল আউলিয়া’ নামে সমধিক প্রসিদ্ধ। তাঁর পিতা সৈয়দ শাহ ইসরাইল ছিলেন বিখ্যাত আলেম। অগাধ জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের জন্য সমকালে তিনি ‘মুলকুল উলামা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর রচিত ‘মদানেল ফাওয়ায়েদ’ (১৫২৩/৪ সালে রচিত) নামক ফারসি গ্রন্থ বাংলার প্রাচীনতম ফারসি কিতাব হিসেবে গণ্য।[14] পিতার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে তিনিও লেখালেখি করেছেন। তাঁর রচিত কোনো গ্রন্থেরই হদিস পাওয়া যায় না। তবে, তাঁর রচিত একটি কাব্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সিলেটের জগন্নাথপুর উপজেলার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত রামশ্রীর সৈয়দ বংশের সদস্য সৈয়দ সাজিদুর রহমানের কাছ থেকে শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত গ্রন্থের লেখক অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি কাব্যটি সংগ্রহ করে তাঁর গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।[15]
রাগিণী-আহেরী
মুই তোর কি দোষ কৈলরে জানম, মুই তোর কি দোষ কৈলু?
আরজু করদম রুহএ তু দিদম, তন মন পাগল ভৈলু।
হামচু মজনু, বাহরে তু লায়লী ভাবিয়া ব্যাকুল হৈলুরে জানম।
ইমরুজ ফজরে দিলবরে জানম, আসিবার বলিয়া গেলে,
রুজ গুজাস্তা শাম রসিদা আবতক তুই ঘরে না আইলেরে জানম।
জুলফে কুশাদী জানাম বুর্দি, ভূলিয়া রইলে মোরে।
রুজনা খুরদম শবনা খুফতম, রাইত কেনে না আইলায়রে জানম।
চশমে তু আহুচুনি বুলন্দ, দান্দানে চু দানারে আনার।
এশকে তোমারা ছিনা গফতার হিতক, পুড়িলে মোরে বা জানম।
হরফে আলসতু মরা নাউমমুদি কালুবালা চিত্তে ধইলু।
আলেমূল গয়েব তু রহিম রওশন, মুই তোর অন্ত না পাইলু রে জান
লাতাকনাতু মির রহমতুল্লাহে কুতুবে মা-দামে হিয়া
ইন্নাল্লাহা ইগফেরু জুনুবা, ভুলিয়াছনি তুমিরে জানম মুই তোর কি দোষ কৈলু?
অনুবাদ
আমি কি দোষ করলাম? হে আমার প্রাণপ্রিয়, আমি কি দোষ করলাম?
আমি আশা করেছি তোমাকে দেখব ; তন মন পাগল হল,
মজনু যেরূপ লায়লীর জন্য পাগল। হে প্রাণপ্রিয়,
আমি তোমার জন্য ভেবে ব্যাকুল হলেম।
হে আমার প্রাণপ্রিয়, বলে গেলে
আজ মন ভুলানো ফজরের সময় আসবে।
দিন গেল, সন্ধ্যা নামল, এখন পর্যন্ত তুই ঘরে এলে না, হে প্রাণপ্রিয়।
আমার কেশের বেণী মুক্ত ক’রে আমার প্রাণ নিয়ে গেলে, তবু আমাকে ভুলে রইলে।
দিনে খাইনি, রাত্রে ঘুমাইনি; হে প্রাণপ্রিয়, রাতে কেন এলে না?
তোর চোখ হরিণের চোখের মত বড় বড়, তোর দাঁত
আনারের দানার মত ঝকঝকে,
তোর প্রেমে আমার হৃদয় বন্দী, হে প্রাণপ্রিয়, আমাকে দহন করলে।
‘আমি কি তোদের প্রভু নহি’ আল্লাহর এই প্রশ্নের উত্তর দিতে আমায় নিরাশ করে।
কিন্তু ‘হা নিশ্চয় আপনি আমাদের স্রষ্টা’ এই কথা অন্তরে আশার সঞ্চার করে।
তুমি অজানাকে জানো, তুমি দয়ায় উজ্জ্বল, আমি তোমার অন্ত পেলাম না।
‘আল্লার রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না’—তোমার এই বাণী কুতুব মনের কোণে রেখে দিল।
নিশ্চয় আল্লাহতা’লা সব গোনাহ মাফ করবেন, একথা ভুলেছিলাম।
হে প্রাণপ্রিয়, আমি কি দোষ করলাম?[16]
আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রায় ১৫০/২০০ বছর আগে হযরত নূর কুতুবুল আলম একই স্টাইলে, ফারসি ও বাংলার মিশেলে যে কাব্য রচনা করেছেন তার সাথে এই কাব্যের কেবল কাঠামো ও ভাবগত নয়, বরং শাব্দিকভাবেও আশ্চর্যরকম মিল আছে। পাগল, লাইলি মজনু, জানম, পোড়া শব্দগুলো একই অর্থে দুজনই ব্যবহার করেছেন।
ভাবগতভাবে, দুটি কাব্যকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। নূর কুতুবুল আলম যেমন খোদাকে প্রিয়রূপে সম্বোধন করে অভিমানসূচক জিজ্ঞাসা ‘কি করলাম?’ বলে শুরু করেছেন কাব্য, কুতুবুল আউলিয়াও একইভাবে শুরু করেছেন। অতঃপর দুজনেই ‘পাগল’ হয়েছেন। ঠিক তারপরেই রূপক হিসেবে ‘লাইলি মজনু’র আবির্ভাব— একবাক্য এদিক সেদিক নেই! দুজনেই বলছেন আকুতি ভরা স্বরে— প্রিয়ার জন্য কেউই দিনে খাননি আর রাতে ঘুমাননি। ভাবগত অর্থে পুরোটাই এবং ভাষার দিক থেকেও অন্তত অর্ধেক কাব্যে আশ্চর্যরকম মিল রয়েছে।
নূর কুতুবুল আলম এবং কুতুবুল আউলিয়ার জীবনের মধ্যেও অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। উভয়ের পিতাই আলেম সুফি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। উভয়েই পিতার উত্তরসূরী হিসেবে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিজেরাও আলেম ছিলেন ও সাধনার মাধ্যমে তাসাউফের চর্চা করেছেন। নাম (মূলত উপাধি) তো প্রায় একই— কুতুবুল আলম এবং কুতুবুল আউলিয়া।
জীবন ও সাধনায় সাদৃশ্য থাকার ফলেই কি কাব্যের এই সাদৃশ্যতা? নাকি সুফি হিসেবে খোদাকে পাওয়া, খোদার দিদার লাভের ব্যাকুলতায় উভয়ে একই মাকামে ছিলেন বিধায় এমন সাদৃশ্যপূর্ণ অভিব্যক্তি? রহস্যময় বিষয় হলো, কেবল ভাব আর ভাষাই নয়, কাঠামো ও পদ্ধতিও একই! নূর কুতুবুল আলম যেমন ফারসি ও বাংলার মিশেলে ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত স্টাইলে লিখেছেন, কুতুবুল আউলিয়াও তদ্রূপ ফারসি ও বাংলার মিশেলেই রচনা করেছেন। দুজনের মধ্যে কোনো যোগসূত্র ছাড়া ১৫০/২০০ বছরের ব্যবধানে এতটা সাদৃশ্যপূর্ণ কাব্য রচনা সম্ভব কি-না তা স্বতন্ত্র গবেষণার বিষয়।
আবার, নূর কুতুবুল আলমের এই কাব্যের সঙ্গে তাঁর পরিচয় থাকাও অসম্ভব নয়। তাঁর পিতা ছিলেন বিদ্বান, জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের নিদর্শন হিসেবে উপাধি পেয়েছেন ‘মুলুকুল উলামা’। আর নূর কুতুবুল আলম আগের শতকেই সুলতানী আমলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রভাবশালী সুফি হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। ফলে, একজন জ্ঞানী ও পণ্ডিত হিসেবে শাহ্ ইসরাইলের সংগ্রহে নূর কুতুবুল আলমের কিতাবাদি সংরক্ষিত থাকা অস্বাভাবিক নয়। পিতৃসূত্রে এই সংগ্রহ থেকে নূর কুতুবুল আলমের কাব্যের খোঁজ পাওয়া কুতুবুল আউলিয়ার জন্য সহজেই সম্ভব। যেহেতু তিনিও একজন জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন। হযরত নূর কুতুবুল আলম যেহেতু বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন সেহেতু এই অনুমান করা মোটেও অমূলক নয়।
ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, কুতুবুল আউলিয়ার বাবা সৈয়দ শাহ্ ইসরাইল ফারসি ভাষায় কিতাব লিখেছেন ‘মদানেল ফাওয়ায়েদ’। ১৬ শতকে সিলেটের তরফ, যা তখনো পর্যন্ত দুর্গম অঞ্চল; সেখানে ফারসিই ছিল মুসলমান পণ্ডিতদের কাছে একমাত্র ভাষা। কিন্তু কুতুবুল আউলিয়া কেবল ফারসির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইলেন না। আবার বাস্তবতাকে এড়িয়ে ফারসিকেও অগ্রাহ্য করলেন না। তিনি একটি মধ্যবর্তী অবস্থানে আসলেন। ফারসির সঙ্গে বাংলাকে যুক্ত করলেন। ফারসির সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে ফারসির যে সমৃদ্ধ ঐতিহ্য তার সঙ্গেও বাংলাকে যুক্ত করলেন। ১৬ শতকের তরফ রাজ্যে বাংলাকে সিরিয়াস লেখালেখির ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
যে সময়ে সিলেটে নাগরী লিপি বিকশিত হচ্ছে সে সময়ে নাগরীর পরিবর্তে কেন তিনি বাংলাকে বেছে নিয়েছেন এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মনে রাখা দরকার, ততদিনে বাংলা ভাষায় কাব্য লিখেছেন শাহ্ মুহম্মদ সগীর, দৌলত উজির বাহরাম খান, সাবিরিদ খাঁসহ অনেকেই। এর ফলে বাংলার মুসলমান সমাজে ততদিনে বাংলা ভাষার একটি পরিচিতি ও চর্চার জায়গা তৈরি হয়েছে। কুতুবুল আউলিয়ার এই কাব্যটি তারই একটি নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নূর কুতুবুল আলমের মতো তিনিও ফারসি ও বাংলার মিশেলে ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত স্টাইলে কাব্য রচনার মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে পণ্ডিতমহলে হাজির করেছেন; বাংলা ভাষার সম্ভাবনাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছেন; বাংলার মুসলমানদের জন্য ফারসির পর বাংলাকে ভাষা হিসেবে নির্ধারণের ইশারা দিয়েছেন; ফারসিভাষী ও বাংলাভাষীদের মর্যাদাকে সমান্তরালে এনে সামাজিক বিপ্লব সাধন করেছেন; গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বাংলাভাষী মুসলমানদেরকেও এড্রেস করেছেন এবং ম্যাকারণিক/মুলাম্মায়াত স্টাইলে কাব্য রচনার যে বৈশ্বিক ঐতিহ্য ও কাব্য-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে তাতে বাংলা ভাষা ও বাংলা ভূখণ্ডকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।
শাহ্ মুহম্মদ সগীর থেকে আলাওল, শেখ মুত্তালিব হয়ে হেয়াত মামুদ, গরীবুল্লাহ শাহ পর্যন্ত মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন বাংলার সুফি সমাজ। মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে বাংলা সাহিত্যের নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁরা। সে সময়ে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও মুসলমান সমাজের জন্য সুফি সমাজের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সময়োপযোগী ও কার্যকরী ছিল তার নিদর্শন হিসেবে হযরত নূর কুতুবুল আলম এবং কুতুবুল আউলিয়ার এই কাব্য দুটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উপসংহার: প্রাক-ঔপনিবেশিক সময়ে প্রায় সকল সুফি আরব, পারস্য, বাগদাদ ইত্যাদি অঞ্চল থেকে বাংলায় এসেছেন। কিন্তু বাংলা থেকে ফিরে গেছেন কোনো সুফি এমন নজির বিরল। তাঁরা বাংলায় এসেছেন, ইসলাম প্রচার করেছেন, বিয়ে শাদি করে বাংলাতেই বসবাস করেছেন, বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনে সরাসরি অংশগ্রহণ করে যথাযোগ্য অবদান রেখেছেন। ফারসি ও আরবিতে পাণ্ডিত্য সত্ত্বেও বাংলা ভাষাকে তাঁরা আপন মনে করেছেন, সযতনে আগলে রেখেছেন, বাংলা ভাষার লালন পালনে সচেষ্ট ছিলেন ও মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। হযরত নূর কুতুবুল আলম এবং কুতুবুল আউলিয়ার আলোচ্য কাব্য দুটি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।