বঙ্গীয় সমাজ ও মাজার: প্রেক্ষিত সুলতানি আমল

মধ্যযুগের বঙ্গীয় বদ্বীপ নামচিহ্ন সহ যে মানচিত্র ও ভাবার্থ আমি ইশারা করছি, তার গোড়ায় রয়েছেন বিভিন্ন সম্প্রদায়, ভাবের ও ভাষার মানুষজন। তারা কখনো একক পরিচয়, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।

 

পারিভাষিক ব্যাখ্যা

যেকোনো ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় ব্যবহৃত শব্দাবলির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায়ন অপরিহার্য। এই প্রবন্ধে ব্যবহৃত মূল ধারণাগুলো প্রচলিত লোকজ বা সাধারণ অর্থের বাইরে এক ধরনের তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দ্যোতনা বহন করে। নিম্নে তার একটি রূপরেখা প্রদান করা হলো:

১. রুহানিয়াত (Spirituality/Ruhaniyat)

ইসলামি ঐতিহ্যে ‘রুহানিয়াত’ শব্দটি ‘রূহ’ (আত্মা) থেকে উদ্ভূত, যা মূলত ‘তাযকিয়া’ বা আত্মশুদ্ধি এবং নৈতিক উৎকর্ষের সমার্থক। তবে এই লেখায় রুহানিয়াত কেবল ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা নয়; বরং এটি আত্মসচেতনতার একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া। এখানে রুহানিয়াতকে সেই বৃহত্তর অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি যা ব্যক্তিসত্তাকে অতিক্রম করে সামাজিক নৈতিকতা ও এক ধরনের ‘আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব’ (Spiritual Authority) নির্মাণ করে।

২. রাজনৈতিক (The Political)

এখানে ‘রাজনৈতিক’ শব্দটিকে সংকীর্ণ রাষ্ট্রক্ষমতা বা পুঁজি-রাষ্ট্র-মতাদর্শ এই কাঠামোর ঊর্ধ্বে ন্তুন ধরনের ক্ষমতার বিন্যাস হিসেবে দেখা হয়েছে। মিশেল ফুকো (Michel Foucault)-র তত্ত্ব অনুযায়ী, ক্ষমতা কেবল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো বিষয় নয়, বরং তা জ্ঞান, নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে পরিগঠিত হয়। এই প্রবন্ধে ‘রাজনৈতিক’ বলতে সামাজিক কর্তৃত্বের বিন্যাস এবং সমষ্টিগত আচরণের গঠনতন্ত্রকে বোঝানো হয়েছে। রুহানিয়াত যখন মানুষের আনুগত্য ও নৈতিকতাকে প্রভাবিত করে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা করে, তখন তা অনিবার্যভাবে একটি রাজনৈতিক চরিত্র লাভ করে।

৩. মাজার (Shrine as an Institution)

মাজার এখানে কেবল একটি সমাধি-স্থাপত্য বা লোকজ বিশ্বাসের কেন্দ্র নয়। এটি একটি আঞ্চলিক ইসলামি প্রতিষ্ঠান। রিচার্ড ইটন (Richard Eaton)-এর গবেষণার সূত্রে বলা যায়, বঙ্গীয় সমাজে ইসলামি বিস্তারের মূলে ছিল সুফি নেটওয়ার্ক ও পীর-সংস্কৃতি। এই গবেষণায় ‘মাজার’ হলো সেই ভৌগোলিক ও আধ্যাত্মিক মিলনস্থল, যেখানে ধর্মীয় মধ্যস্থতা ও সামাজিক সম্পর্কের নতুন বিন্যাস ঘটে। এটি একজন মহৎ মানুষের প্রতি ভক্তি ও আনুগত্যের বারাকাহ (Blessing) এবং পার্থিব ক্ষমতা সম্পর্কের একটি সন্ধিস্থল।

৪. বঙ্গীয় সমাজ (Bengali Society)

বঙ্গীয় সমাজ বলতে এখানে কোনো একরৈখিক বা স্থির কাঠামোকে বোঝানো হয়নি। বরং মধ্যযুগীয় ও প্রাক-আধুনিক বাংলার বহুস্তরীয় ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকে বোঝানো হয়েছে। যেখানে একইসাথে কৃষিজীবী সংস্কৃতি, আঞ্চলিক লৌকিকতা এবং বহুধর্মীয় সহাবস্থান বিদ্যমান ছিল। এই বিশেষ সামাজিক প্রেক্ষাপটে ইসলাম কীভাবে স্থানীয় রীতিনীতি ও ক্ষমতার সাথে আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে নিজের স্বকীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে, তা-ই এখানে বিবেচ্য।

৫. কর্তৃত্ব (Authority)

এই লেখায় ‘কর্তৃত্ব’ বলতে কেবল বৈধ শাসনক্ষমতা (Legitimacy) নয়, বরং নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা, বাতচিৎ এবং আধ্যাত্মিক বৈধতার এক সমন্বিত রূপকে বোঝানো হয়েছে। যখন কোনো পীর বা মাজারের রুহানিয়াত জনসাধারণের সামাজিক আচরণ ও জীবনদর্শনকে প্রভাবিত করে, তখন সেখানে একটি ‘বিকল্প কর্তৃত্ব’ (Alternative Authority) তৈরি হয়। যা ক্ষমতার উপরিকাঠামোর সমান্তরালে কাজ করতে সক্ষম।

***

 

আজকাল বঙ্গীয় বদ্বীপের পরিচয় আমরা প্রায়শই একটি নির্দিষ্ট চিহ্নের ভেতরে আবদ্ধ করে বুঝতে চাই। এমনকি বদ্বীপীয় কল্পনার রূপ যে কি তা ধরতেই আমরা ভুলে গিয়েছি। সাধারণত জাতি, ধর্ম, রাষ্ট্র বা সংস্কৃতির কোনো পূর্বানুমানকৃত ফ্রেমে তাকে ধরতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। এই চেষ্টার মধ্য দিয়ে ইতিহাসগত ভুল বোঝাবুঝি ও পরস্পরকে নাকচ করার মাধ্যমে আমরা নিজেদের বিভক্ত করেছি। কিন্তু এই বদ্বীপের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কখনোই এমন স্থির কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায়নি। তাই ‘বদ্বীপ’ ধারনাটি সুনির্দিষ্ট পরিচয়বাদ বা একরৈখিক ধারণায় পর্যবসিত করা হবে মারাত্মক ভুল।

আমার এই লেখার একটি কেন্দ্রীয় দাবি হলো, সুলতানি আমলের বঙ্গীয় বদ্বীপ একটি এমন সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, যা আধুনিক রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কল্পনার পূর্ববর্তী এবং মৌলিকভাবেই ভিন্ন। এটা কোনো বিমূর্ত আদর্শ বা বহিরাগত আগ্রাসী নীতির ফল ছিল না। বরং বাংলার ভূগোল, অর্থনীতি, রুহানিয়াত এবং সামাজিক সম্পর্কের ভেতর থেকে জন্ম নিয়েছে।

বঙ্গীয় বদ্বীপের নিজস্বতা হলো তার ত্রিবিভক্ত প্রকৃতি। নদী, পলি ও মানুষের চলাচল এখানে কখনোই একটি স্থির ও চিরায়ত কাঠামো তৈরি করেনি। ফলে কোনো পরিচয়ই এখানে চিরস্থায়ী হতে পারেনি। কিন্তু সেই পরিচয়গুলো বিলুপ্তও হয়নি। তারা প্রবাহ বদলেছে, রূপ বদলেছে, চক্রাকারে ফিরে এসেছে। এই ধারাবাহিক রূপান্তরের মধ্য দিয়েই বদ্বীপের মানুষের জীবনযাপন, সামাজিক সম্পর্ক এবং মিলনের নীতি গড়ে উঠেছে। আমরা এখানে এই দিক থেকে ‘মাজার’ ও বৃহৎবঙ্গের মানুষজনার মিলনের ক্ষেত্রগুলি নতুনভাবে ভাবতে পারি।

 

হৃদয়ের আকল ও বঙ্গীয় ইসলাম: ধর্ম, রাজনীতি ও রুহানিয়াত

মধ্যযুগের বঙ্গীয় বদ্বীপ নামচিহ্ন সহ যে মানচিত্র ও ভাবার্থ আমি ইশারা করছি, তার গোড়ায় রয়েছেন বিভিন্ন সম্প্রদায়, ভাবের ও ভাষার মানুষজন। তারা কখনো একক পরিচয়, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। এইখানে ধর্ম ছিলো যেমন ভাব হিসাবে, তেমন‌ই চর্চা হিসাবে। স্রেফ ধর্মীয় নীতিগত বিশ্বাস বা আচারে তাদের আস্থা ছিলো না।

ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গীয় জনপদের ধর্মান্তর প্রক্রিয়ার একটি মৌলিক দিক হলো মানুষের সহজাত স্বভাবধর্ম এবং আসমানি ধর্মের মধ্যকার সেতুবন্ধন। এটা নিয়ে আমরা ইমাম হারিস আল-মুহাসিবীর কাছে যেতে পারি। আরবের সমাজকাঠামোতে মানুষের  স্বভাবজাত ক্ষমতা বা প্রকৃতিগত প্রবণতার প্রতি নির্দেশ একটি শব্দ ব্যবহৃত হয়। যা প্রচলিত অর্থে বুদ্ধি বা যুক্তির ক্ষমতা থেকে আলাদা মানুষের এক ধরনের প্রাকৃতিক বুদ্ধির দিকে নির্দেশ করে। এমন একটি শব্দ হলো, ‘আল-গারিজাহ’ (الغريزة)।  ইমাম মুহাসিবি ‘আল-গারিজাহ’ (الغريزة)-কে  মানুষের সহজাত প্রবৃত্তির একটি সামষ্টিক বহিঃপ্রকাশ হিসাবে দেখেছেন। মুহাসিবীর মতে, ‘আকল’ হচ্ছে মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত এমন এক ‘গারিজাহ’ যা কেবলমাত্র কর্মতৎপরতার (فعاله) মাধ্যমেই দৃশ্যমান হতে পারে। মানুষের এই ‘সুপ্ত গারিজাহ’ বা ‘নূর’ (আলো) বহিরাগত সত্যকে চিনে নিতে ভুল করে না। মুহাসিবী বলেছেন, বুদ্ধি হলো এমন এক আলো যার মধ্য দিয়ে মানুষ সত্যকে ‘উপলব্ধি’ (فهم) করে এবং ‘চিনে নেয়’ (عرف) — ঠিক যেভাবে কিতাবধারী সম্প্রদায় সত্যকে তাদের ‘সন্তানদের মতো চিনতে পারত’ (يعرفونه كما يعرفون أبناءهم)।

দার্শনিক ও ব্যুৎপত্তিগত দিক থেকে ‘গারিজাহ’ বলতে আমরা মানুষের সেই ধাতগত বা প্রাকৃতিক সক্ষমতাকে বুঝি, যা তাকে তার স্থানিকতার (Locality) স্বকীয় বিন্যাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে সহায়তা করে। বাংলা ভাষায় এই বিশেষ অবস্থাকে প্রকাশ করার জন্য সবচাইতে অর্থবহ শব্দ হলো ‘সহজ’—অর্থাৎ ‘সহ’ (সহিত) ও ‘জ’ (জাত), যা জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের সত্তায় বিদ্যমান থাকে।

​বঙ্গের মানুষ প্রাতিষ্ঠানিক কোনো আসমানি কিতাব বা শাস্ত্রীয় ধর্মের কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ না থাকলেও, তাদের এই ‘গারিজাহ’ বা ‘সহজতা’  ছিল। এর ফলে ইসলাম যখন এই ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, তখন তা এখানকার মানুষের সহজাত স্বভাবের (Natural Disposition) সাথে একীভূত হয়ে যায়। বাহ্যিক কোনো জোর-জবরদস্তি ছাড়াই মানুষের ভেতরের এই আদি ও অকৃত্রিত স্থানিকতার সাথে ইসলামের আন্তরিক সংযোগের মাধ্যমে এই বদ্বীপে তার দ্রুত ও স্থায়ী বিস্তারের পথ সুগম করেছিল। এই রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বঙ্গের সাধারণ মানুষ শাস্ত্রহীন সমাজ থেকে একনিষ্ঠ আসমানি ধর্মের দিকে উত্তরণ করে। বলাই বাহুল্য দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিদ্যায় এই ঘটনা দর্শন ও সমাজবিদ্যার এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানের ক্ষেত্র হতে পারে।

আপাতত এই লেখার পাঠকদের জন্য আমি বঙ্গের সুফিদের ওজিফা এবং মালফুজাত থেকে নিচে মানুষের প্রাকৃতিক স্বভাব বা বুদ্ধিকে সম্বোধন করার বহুল ব্যবহৃত কিছু তরিকা পেশ করছি। সামনে আমরা এ নিয়ে আরো লিখবো।

আমাদের মনে রাখতে হবে, তারা এই কাজে প্রথমেই মানুষের মস্তিস্কের চেয়ে হৃদয়ের (ক্বলব) ওপর বেশি জোর দিয়েছিলেন। মুহাসিবীর উপরোক্ত বিবরণ থেকে আমরা বুঝি— আকল বা বুদ্ধির অবস্থান যেহেতু হৃদয়ে (في القلب), তাই এখানকার সুফি তরিকতগুলোতে এই ‘গারিজাহ’ বা স্বভাবজাত বুদ্ধিকে শাণিত করতে নিচের তিনটি পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন:

১. মুজাহাদা: কলব-র মরিচা দূরীকরণ

মুহাসিবী বলেছেন, গারিজাহ বা আকল একটি স্বচ্ছ কাঁচের মতো, কিন্তু মানুষের নফস বা রিপুর প্রভাবে তাতে ধুলো জমে থাকে। তরিকতের গুরু বা মুর্শিদের সান্নিধ্যে থেকে ‘মুজাহাদা’ (সাধনা) এবং ‘জিকির’-এর মাধ্যমে সেই ধুলো পরিষ্কার করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গের সাধারণ মানুষের মাঝে যে সহজ-সরল জীবনবোধ ছিল, সুফিরা তার মধ্য দিয়ে তাদের ভেতরের সেই প্রাকৃতিক বুদ্ধিকে (Natural Instinct) জাগিয়ে তুলেছিলেন। ফলে ধর্ম তাদের কাছে অন্তরের ‘আকল’ বা নূর হয়ে উঠেছিল।

২. মারেফত: আকল থেকে অনুভবের স্তরে উত্তরণ

মুহাসিবীর মতে, আকল বা গারিজাহ কেবল তার ‘ক্রিয়া’ (فعاله) দ্বারা চেনা যায়। সুফিরা বঙ্গের মানুষের মাঝে এমন এক রুহানি পরিবেশ তৈরি করেছিলেন যেখানে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের এবাদত এক‌ইসঙ্গে তাদের হৃদয়ের‌‌ও সক্রিয় উপলব্ধিতে পরিণত হয়। একেই তাসাওউফে ‘মারেফত’ বলা হয়। এর ভেতর দিয়ে ক্রমশ মানুষ ইন্দ্রিয়োপলব্ধি থেকে যুক্তিতে, যুক্তি থেকে সত্যকে সরাসরি অনুভব করার স্তরে যেতে থাকে। মুহাসিবী যাকে ‘বসর’ বা অন্তর্দৃষ্টি হিসাবে অভিহিত করেছেন।

৩. মুহাব্বত ও ইনসাফ: রুহানিয়াতের সামাজিক প্রকাশ

মুহাসিবী উল্লেখ করেছেন যে, আকল বা গারিজাহ দৈনন্দিন নানা অনুশীলনের ভেতর দিয়ে মানুষকে ‘নাফা-নুকসান’ (উপকার ও অপকার) এবং জুলুম-ইনসাফ বুঝতে সাহায্য করে। তাদের প্রাত্যহিক ভাষা ও সমাজসম্পর্ক একটা নৈতিক ব্যাকরণ ও সামাজিক অভিব্যক্তির মধ্যে প্রকাশিত হতে থাকে। বিশেষত শরিয়ত ও তরিকতের ওতপ্রোত চর্চা ও অনুশীলন সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির সম্বন্ধকে জোরদার করে এবং ব্যক্তিকে সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন সত্তায় পরিণত করতে থাকে। যার ওপর ভিত্তি করে এখানকার বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণের মানুষজনের মধ্যে ইনসাফের ধারণাও গড়ে ওঠে। এর ফলে বঙ্গের জাতপাত-বিরোধী ও এক‌ইসঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদবিরোধী লড়াইও ত্বরান্বিত হতে থাকে। আর এই ঘটনার গোড়ায় ছিলেন আমাদের বাংলার ফকির-দরবেশ, পীর-বুজুর্গ আর মাজার-ওয়ালা ওলি-আওলিয়াগণ।

তৎকালীন বাংলায় এইভাবে একটি ত্রি-স্তরীয় মধ্যস্থতামূলক সমাজকাঠামো গড়ে উঠেছিল। যা আধুনিক ‘নেশন-স্টেট’ বা জাতিরাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার ধারণার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

এই শাসনকাঠামোকে তিনটি স্তরে বিশ্লেষণ করা যায়:

১. প্রশাসনিক কাঠামো (Governance): সুলতান ছিলেন নিরাপত্তার প্রতীক এবং করব্যবস্থা ও উচ্চতর বিচারের অভিভাবক। এটি ছিল উপরিকাঠামো— যা বাইরের হস্তক্ষেপ থেকে সমাজকে রক্ষা করত, কিন্তু অভ্যন্তরীণ স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করত না।

২. নৈতিক পরিসর (Moral Order): শরিয়ত, তরিকত ও খানকা-দরগাগুলো ছিল সমাজের নৈতিক পরিসর। এখানে ক্ষমতার উৎস রাষ্ট্র নয়, বরং তা ছিল রুহানিয়াত বা আধ্যাত্মিক চর্চার মাধ্যমে সমাজের ভেতর থেকেই উৎসারিত।

৩. সামাজিক পরিসর (Social Order): গ্রাম, বাজার, পারিবারিক রীতি, পঞ্চায়েত, মজমা ও মজলিস— যার মধ্য দিয়ে দৈনন্দিন জীবনে ইনসাফ ও রুহানিয়াত নানা অনুশীলনের মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়

এই তিনটি ক্ষেত্র একে অপর থেকে যেভাবে সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়, আবার বিচ্ছিন্নও নয়। এর ফলে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠী, ধর্মীয় চর্চা ও আধ্যাত্মিক ধারার মধ্যেই একটা সহাবস্থান সম্ভব হয়। ইসলাম এখানে প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে এক‌ইসঙ্গে একটি নৈতিক ও রুহানি নিশান হিসাবে‌ও ব্যক্ত হতে থাকে। যা স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সক্রিয় কথোপকথন ও অনুবাদের মাধ্যমে যুক্ত হয়। ফকির, দরবেশ ও মাজারকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিক পরিসর এই অনুবাদের প্রধান ক্ষেত্র হিসাবে কাজ করে।

আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের সাথে সুলতানি বাংলার এই কাঠামোর বিরোধটি অত্যন্ত গভীর। আধুনিক জাতিরাষ্ট্র মৌলিকভাবে একটি ‘সর্বগ্রাসী’ (Totalitarian) কাঠামো। আধুনিক রাষ্ট্র তার সীমানার ভেতরকার প্রতিটি মানুষ ও সম্পদকে সংখ্যা, তথ্য এবং করের নিগড়ে বন্দি করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র মানুষের স্থানীয় পরিচয়, বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে সুকৌশলে মুছে ফেলে তাকে কেবল একটি প্রাণহীন ‘ডেটা’ বা ‘নম্বর’-এ রূপান্তরিত করে; অথচ সুলতানি বাংলায় এ ধরনের কোনো কৃত্রিম একরূপতা আরোপের চেষ্টা ছিল না, বরং সেখানে রাষ্ট্র সমাজের বৈচিত্র্যকে সুরক্ষা প্রদান করত। আধুনিক রাষ্ট্র যেখানে ‘এক জাতি, এক ভাষা, এক আইন’-এর স্বৈরাচারী স্লোগান দিয়ে ভিন্নমত ও ভিন্ন সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসাবে দেগে দেয়, সুলতানি বাংলা সেই আধুনিক কুসংস্কার থেকে মুক্ত থেকে একটি মধ্যস্থতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্ষমতা কাঠামো চর্চা করত।

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতা একটি যান্ত্রিক আমলাতন্ত্রে (Bureaucracy) পরিণত হয়েছে, যেখানে আইনের শাসন মানেই হলো দাপ্তরিক জটিলতা এবং গভীর মানবিক সংবেদনহীনতা। এখানে মানুষকে তার সামাজিক ও পারিবারিক শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী এক ‘নাগরিক’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, আধুনিক রাষ্ট্র নৈতিকতাকে নিজের কুক্ষিগত করে ফেলেছে—যেখানে ‘আইনি বৈধতা’ই নৈতিকতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে স্বীকৃত। এর ফলে সমাজ তার নিজস্ব নৈতিক বিচারবুদ্ধি হারিয়ে পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এর বিপরীতে সুলতানি বাংলায় সমাজ ও আধ্যাত্মিক পরিসর থেকে উঠে আসা ‘ইনসাফ’ ও ‘রুহানিয়াত’ ছিল শাসনের মূল চালিকাশক্তি।

উপনিবেশায়নের মাধ্যমে আমরা আমাদের নিজস্ব সমাজব্যবস্থা থেকে এক গভীর বিচ্ছেদের মুখোমুখি হই। ব্রিটিশদের প্রবর্তিত প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো একটি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েম করে। ১৮৭১ সালের আদমশুমারির মাধ্যমে ‘হিন্দু’ এবং ‘মুসলমান’কে স্রেফ পরিচয়ের ভিত্তিতে ভাগ করার মধ্য দিয়ে হাজার বছরের যূথবদ্ধ ও তরল সামাজিক সম্পর্কগুলো সাম্প্রদায়িক সংঘাতের উর্বর জমিতে পরিণত হয়। ব্রিটিশদের ‘বিভাজন ও শাসন’ (Divide and Rule) নীতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে তাদের অভিন্ন সাংস্কৃতিক উপলব্ধি থেকে বিচ্ছিন্ন করে স্বার্থপর প্রতিযোগিতার মুখে ঠেলে দেয়। এর ফলে গোটা উপমহাদেশ ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এইভাবে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন চলে গেলেও ‘অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিকতা’ থেকে যায়।

এর বিপরীতে এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হচ্ছে সুলতানি আমলের বঙ্গীয় বদ্বীপকে একটি ঐতিহাসিক কসমোপলিটনিক সমাজ হিসাবে পাঠ করা। এইখানে ধর্ম, রাজনীতি ও রুহানিয়াতকে পরস্পর বিচ্ছিন্ন ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহারের যে আধুনিক ও ঔপনিবেশিক প্রবণতা তার বাইরে বঙ্গীয় বদ্বীপকে একটি সক্রিয় ও সজীব সামাজিক জীবন হিসাবে কল্পনা করা হয়েছে। এই পাঠ আধুনিক রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধ কল্পনার বাইরে গিয়ে বঙ্গীয় সমাজের দীর্ঘমেয়াদি ঐতিহাসিক যুক্তিকে বোঝার একটি বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করবে বলে আমি আশাবাদী।

এইক্ষেত্রে বাংলার মুর্শিদ ও পীর-দরবেশদের আমরা আমাদের প্রধান সম্বল হিসাবে গ্রহণ করতে পারি। এইভাবে বঙ্গের এই নয়া ঐতিহাসিক অভিমুখ বোঝা সহজ। এই বোঝাপড়া আমাদের নতুন রাজনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে যেমন জরুরি, তেমনই নতুন ধরনের দার্শনিক জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধিৎসা হিসাবেও দরকার।

 

মানুষের খিলাফত: এক নৈতিক-রাজনৈতিক প্রস্তাবনা

ইসলামে মানুষ মাত্র‌ই আল্লার খলিফা। এই ঘোষণা উচ্চারিত হবার মধ্য দিয়ে মানবেতিহাসে মানুষ নতুনভাবে কায়েম হয়। মানুষ শুধু প্রকৃতির মধ্যে প্রাণী মাত্র নয়, বরং সে এই প্রথম মানুষ হিসাবেই আল্লার মহিমার প্রকাশ হিসাবে হাজির হয়। এর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, সমস্ত মানুষকে অস্তিত্বগতভাবে এই মর্যাদায় ভূষিত করে আল্লাহ জগতে প্রেরণ করেন। সুতরাং মানুষকে কোনো গোত্র, বর্ণ, গোষ্ঠ কিংবা সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভক্ত করা যাবে না। অতএব মানুষের ঐক্য ও সমাজ গঠন স্বাভাবিক এবং তাঁর বিভক্তি ও বিভাজন হলো বিকৃতি।

হাদিসে বলা হয়েছে, ‘সকল মানুষ আল্লার পরিবারের সদস্য’। এতদাঞ্চলে মুসলিম সুফি-দরবেশ ও পীর-ফকিরগণের নিকট এই নীতি ছিল পারস্পরিক আতিথেয়তার প্রধান ভিত্তি। এই বক্তব্য সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতার বাইরেও, এটা এক‌ইসাথে মানুষ সম্পর্কে একদম নতুন একটি প্রস্তাব হাজির করে। আমরা আপাতত এই বাস্তবতাকে মানুষ সম্পর্কিত নৈতিক অনুভূতি হিসাবে ধরতে পারি। এইভাবে সমাজতাত্ত্বিক বাস্তবতার সঙ্গেসঙ্গে এর তাত্ত্বিক গুরুত্বও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ধারণা অনুযায়ী মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কোনো চুক্তিভিত্তিক বা ক্ষমতাভিত্তিক সমীকরণ অনুসারে হতে পারে না। এই অনুভূতি মানুষকে জগতে নৈতিক পরিসরে স্থাপন করে। কাজেই এই জগতে দায়িত্ব, আতিথেয়তা ও সহাবস্থান তার মধ্যে অবস্থান করার অন্তর্নিহিত শর্ত।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ইসলাম চেনা-অচেনা সমস্ত মানুষ ও জীবজগতকে নিরবিচ্ছিন্ন এক এলাহি তরবিয়তের সম্ভাব্য অংশ হিসাবে বিবেচনা করে। তবে এর মানে এই নয় যে সমস্ত মানুষ বাস্তবে একই নৈতিক মাকাম নিয়ে জগতে অবস্থান করে। এর মানে হচ্ছে সকল মানুষই নৈতিক সম্বোধনের যোগ্য সত্তা। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মানুষকে আদর্শগতভাবে নিখুঁত ধরে নেওয়া হয় না। বরং তাকে জগতে এমন এক সত্তা হিসাবে ধরা হয়, যার সঙ্গে অর্থবহ নৈতিক ও সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব।

মানুষ সম্পর্কে এই নৈতিক-রাজনৈতিক অনুমান ইসলামের মধ্যে নতুন নৈতিকতা ও ঐতিহাসিকতার শর্ত তৈরি করে। একদিকে এটি মুসলমান সমাজের মধ্যে বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসর কল্পনা করার সুযোগ তৈরি করে, কারণ মানুষকে আর কেবল স্থানীয়, গোত্রীয় বা বিশ্বাসভিত্তিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। অন্যদিকে এটি গ্রিকো-খ্রিস্টান সভ্যতার বাইরে মানুষ সম্পর্কে ভাববার একটি স্বতন্ত্র দিগন্ত উন্মুক্ত করে। এথেন্সের পলিস বা রাজনৈতিক পরিসরে বিশেষ ঐতিহাসিক সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক থেকে উদ্ভূত– মানুষকে কেবল নাগরিক, প্রজা বা আইনি বিষয় থেকে বের করে একটি নৈতিক সত্তা হিসাবে বোঝার দুয়ার খুলে দেয়।

তবে এখানেও একটি সতর্কতা জরুরি। মানুষকে নৈতিক সত্তা হিসাবে কল্পনা করলেই বাস্তব সমাজে বিভাজন, ক্ষমতার অসমতা বা সহিংসতা অদৃশ্য হয়ে যায় না। তবে এটা ঠিক এই ধারণা মেনে নিলে আমাদের সমাজ ও দর্শন পাঠে একটি মানদণ্ড তৈরি হয়। যার আলোকে বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বিচার করা যায়। কোনো সমাজ, রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের নামে যদি তাকে নিছক উপকরণ বা অধীন সত্তায় পরিণত করে, তাহলে সেই ব্যবস্থা এই নর্মেটিভ আদর্শের বা নৈতিক কর্তাসত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।

এই অর্থে অনেক বুজুর্গ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনকে এলাহি হিকমতের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য (العلة الغائية) বা ‘পরম ইষ্ট’ বলে গণ্য করেন। শাহ জালালের জীবনীমূলক আখ্যান, যেমন সিলসিলানামা ও বিভিন্ন লোক-পুঁথি বর্ণনাসূত্রে আমরা তাকে এর উৎকৃষ্ট নজির ধরতে পারি। হজরত শাহজালাল রহ. চিশতিয়া-সোহরাওয়ার্দিয়া তরিকার বুজুর্গ। তিনি মানুষকে ইবাদতের মধ্য দিয়ে তাজকিয়া ও তাসাওউফের উচ্চতর মাকামে আরোহণ ও এক‌ইসাথে মানুষের সঙ্গে বসবাস, তাদের মধ্যে দাওয়াহ প্রতিষ্ঠা ও সমাজগঠনকে তার কাজের কেন্দ্রে স্থাপন করেছিলেন। অনেক পুঁথিতে ‘সোহবত’ বা পীরের সান্নিধ্যকে আত্মশুদ্ধির প্রধান মাধ্যম বলা হয়েছে। সেখানে তত্ত্ব শেখার চেয়ে ‘নজর’ ও ‘সঙ্গ’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে জোর দেওয়া হয়।

গাজী কাহিনী বা গাজী পুঁথি এখনো বৃহত্তর দক্ষিণাঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান উভয়ের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধন হিসাবে টিকে রয়েছে।  এখানেও এলাহি হিকমত প্রকাশের ধরন সামাজিক সম্পর্ক। গাজী পীর মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করেন। তার অলৌকিকতা আসলে সামাজিক মধ্যস্থতার রূপক।

মানুষ সম্পর্কিত এই নৈতিক ঘোষণা মুসলমানদের মধ্যে দুনিয়ার অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনেও প্রতিফলিত হয়। সুলতানি আমলে এবং মধ্যযুগের পীর দরবেশদের প্রচেষ্টায় এর প্রতিফলন লক্ষণীয়। ইসলামের এই ধর্মীয় প্রস্তাবনা বাস্তব প্রয়োজনের তাগিদে পৃথিবীর সকল মানুষের সঙ্গে তাদের এক বৈশ্বিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে সাহায্য করে। এই সম্পর্ক আদতে কোনোপ্রকার একরূপতা আরোপের মধ্য দিয়ে সম্ভব‌ই ছিল না। এটা প্রধানত পারস্পরিক স্বীকৃতি ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে গঠিত হয়।

এই কল্পনা মুসলমানদের মধ্যে নতুন ধরনের রাজনীতি ও রুহানিয়াতের ভিত্তি গঠন করে। এইখানে মানুষে মানুষে পার্থক্য ও বৈচিত্র্য‌ই পারস্পরিক সম্পর্ক ও মিলনের শর্ত হয়ে ওঠে। সুলতানি আমলের সমাজব্যবস্থা এবং আধ্যাত্মিক পরিসর এই যুক্তিকে একটা কার্যকর রূপ দেয়; মানুষকে মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে, তাকে কোনো পূর্বনির্ধারিত শত্রু বা বহিরাগত হিসাবে চিহ্নিত না করে। ফলে এটা যেমন আমাদের ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তেমনই একটি নৈতিক দাবি। কিন্তু এই দাবি করে আমরা মানুষকে চূড়ান্ত অর্থে বিভাজনহীন করতে পারব না, এটা ঠিক। কিন্তু বিদ্যমান ইউরোসেন্ট্রিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা থেকে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ক্ষতিকর বিভাজনকে স্বাভাবিক বা অপরিহার্য বলে গণ্য করার যে অভ্যাস আমাদের মধ্যে গড়ে উঠেছে, সেই সম্পর্কে অন্ততঃ আমরা সতর্ক হবো।

মুসলিম সমাজগুলোর বিকাশ ও নানান ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, মানুষের খিলাফতের  ধারণা এসব সমাজে একটি ঐতিহাসিক-দার্শনিক ভিত্তি হিসাবে কাজ করে। মধ্যযুগীয় বঙ্গীয় সমাজকে এই ভিত্তির ওপর‌ই ভাবতে হবে।

 

 

নৈতিক সার্বজনীনতা ও ইউরোসেন্ট্রিক নৈতিকতার সংকট

বাংলা ভাষায় লিখিত প্রচলিত ইতিহাসতত্ত্ব বা ইতিহাসের বইগুলোতে সাধারণত বঙ্গের পীর-ফকির ও দরবেশদের কর্মকাণ্ডকে কেবল লোকজ ধর্মচর্চা বা আধ্যাত্মিক আন্দোলন হিসাবে ধরা হয়। এর ফলে তাদের বাস্তব জীবনের বিভিন্ন সামাজিক চর্চা ও কর্মকাণ্ডের তাত্ত্বিক তাৎপর্য আমাদের কাছে সংকীর্ণ কিছু কাল্টের চর্চা ও গোষ্ঠীগত আচার আকারে থেকে গিয়েছে। তথাকথিত আধুনিক সেক্যুলার ও বঙ্গীয় এলিট সাহিত্য-সংস্কৃতি এর বাইরে তার দার্শনিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকার মধ্য দিয়ে বোঝার কসরত করেনি।

আমাদের নিজেদের ইতিহাসের মধ্যে অবস্থান করার একটা আমাদের নিজস্ব গড়ন আছে। অনেক সময় লোকজ, আধ্যাত্মিকতা এই ধরনের শব্দসমূহ আমাদের সামনে তাদের বাস্তব জীবন দিয়ে করা বিভিন্ন সক্রিয় কর্মকাণ্ডগুলো আড়াল করে তোলে। আমরা এইখানে এই শব্দগুলি সচেতনভাবে বর্জন করেছি। এর বিপরীতে আমরা দেখি, তারা মানুষের সার্বজনীন নৈতিক ও রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে কোনো বিমূর্ত আখিরাত-কেন্দ্রিক বা ধর্মীয় ধারণায় নয়, বরং মানুষের পার্থিব সামাজিক জীবনের মধ্যেই অনুসন্ধান করেছিলেন। খলিফা হিসাবে মানুষের অবস্থানকে তারা নিছক কর্তৃত্ব বা আধিপত্যের ধারণা হিসাবে ব্যাখ্যা করেননি। এই অবস্থান মানুষকে অপর মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ভেতরে নিজেকে কল্পনা করতে বাধ্য করেছে। এই দিকটিই তাদের চিন্তার কেন্দ্রে ছিল।

এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ইসলাম খলিফা ধারণাকে একটি একক নৈতিক ক্ষমতা হিসাবে নয়, বরং মৌলিকভাবে একটি সম্পর্কমূলক ও সামাজিক সত্তা হিসাবে উপস্থাপন করে। মানুষ এখানে কান্টীয় অর্থে আলাদা কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যক্তি (moral autonomous) নয়, সে সমাজ ও সমষ্টির মধ্যেই অর্থবহ জীবন-যাপন করছে। এই সম্পর্কমূলক কল্পনার ওপর ভিত্তি করেই উম্মাহ গঠনের বৈশ্বিক আদর্শ নির্মিত হয়। তবে উম্মাহকে যদি একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক একক হিসাবে সরলভাবে পড়া হয়, তাহলে তার তাত্ত্বিক মাত্রা ক্ষীণ হয়ে যায়। ‘উম্মাহ’ এখানে মানুষের একটি গভীর প্রজাতিগত আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ— জগতে মানুষ কোথাও সম্পূর্ণ বহিরাগত নয়, এই উপলব্ধির একটি নর্মেটিভ ও এথিকাল রূপ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। ইসলাম যখন সমস্ত মানুষের মধ্যে এই সার্বজনীন উপলব্ধি অনুসন্ধানের তাগিদ দেয়, তখন তা কোনো বাস্তব সমাজকে নিখুঁত বা সংঘর্ষহীন বলে ধরে নেয় না। বরং ইসলাম মানুষের সামাজিক অস্তিত্বকে এমন এক নৈতিক মানদণ্ডের অধীন করে, যার মাধ্যমে বিদ্যমান সমাজ ও ক্ষমতাসম্পর্ককে বিচার করা সম্ভব হয়। এই পার্থক্যটি না করলে ইসলামের দুনিয়াতে মানুষের ম‌ওজুদ থাকার প্রস্তাবনা খুব সহজেই এক ধরনের রোমান্টিক মানবতাবাদে পর্যবসিত হয়।

এই নৈতিক-রাজনৈতিক কাঠামোর গোড়ায় রয়েছে কোরানে বর্ণিত মানুষের পৃথিবীতে প্রেরণের ধারণা। কোরান অনুযায়ী আদম ও হাওয়ার পৃথিবীতে আগমন কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এলাহি হিকমতের অংশ। এর তাৎপর্য এই যে, মানুষ পৃথিবীতে কোনো নৈতিক শূন্যতা নিয়ে আসে না, বরং একটি মৌলিক নৈতিক সক্ষমতা নিয়েই আবির্ভূত হয়। ইসলাম স্পষ্টভাবে স্বীকার করে যে মানুষ ভুল করতে পারে, বিভ্রান্ত হতে পারে, এমনকি শয়তানি প্ররোচনায় পতিতও হতে পারে। কিন্তু এই বিচ্যুতি মানুষের ফিতরাতকে পুরাপুরি সংজ্ঞায়িত বা বদলে ফেলতে পারে না।

ফিতরাতকে এইভাবে কল্পনা করার অর্থ হলো, কোনো ব্যক্তি বা সমাজকে মৌলিকভাবে শয়তানি বলে ঘোষণা করার তাত্ত্বিক সুযোগ ইসলাম দেয় না। এখানেই মুসলিম মনীষী ও প্রজ্ঞাবানদের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা সমাজের বিকৃতি, অন্যায় বা জুলুমের সমালোচনা করেন, কিন্তু সেই সমাজের অস্তিত্বকেই শয়তানি বলে বাতিল করেননি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য, যা পরবর্তী ঔপনিবেশিক ইউরোপীয় চিন্তার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

খ্রিস্টান ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার সঙ্গে মুসলমান পীর-ফকির ও দরবেশদের পার্থক্য সরল নৈতিক শ্রেষ্ঠত্বের ভাষায় বোঝা হয়, তাহলে আবারো আমরা অতিরঞ্জনের ঝুঁকিতে পড়ি। বরং এখানে পার্থক্যটি নিহিত রয়েছে মানুষের প্রকৃতি সম্পর্কে মৌলিক দার্শনিক অনুমানে। খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে আদিপাপের ধারণা মানুষের সামাজিক অস্তিত্বকে এক ধরনের নৈতিক সংকটের ফল হিসাবে কল্পনা করে। এখানে সমাজ মানে এই আদিপাপের ফল।

এই ধারণার ধারাবাহিকতায় খ্রিস্টধর্মে যিশু খ্রিস্টকে ‘দ্বিতীয় আদম’ হিসাবে হাজির করতে হয়েছে। যার মাধ্যমে মানবজাতি সেই আদিপাপ থেকে মুক্তির পথ পায়। অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও আলোকায়ন এই ধর্মতাত্ত্বিক মুক্তির বর্ণনাকেই দার্শনিক ভাষায় পুনর্গঠন করে। যাতে ইউরোপ নিজেকে এমন এক নৈতিক কর্তৃত্বের স্থানে নিজেকে দাঁড় করাতে পারে, যেখান থেকে সে অন্যান্য জনগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়কে ‘উন্নত’ বা ‘সভ্য’ করে তুলবে।

এই ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী দার্শনিক রূপটি আমরা পাই ইমানুয়েল কান্টের চিন্তায়। Perpetual Peace (1795) গ্রন্থে কান্ট ‘cosmopolitan right’ বা বিশ্বনাগরিক অধিকার ধারণা উপস্থাপন করেন, যার কেন্দ্রে রয়েছে আতিথেয়তার অধিকার। তবে এই অধিকারটি মূলত আইনি ও প্রক্রিয়াগত। এর সঙ্গে ক্ষমতা ও জবরদস্তির সম্ভাবনাও যুক্ত থাকে। তিনি অপরকে আতিথেয়তা করার ঘটনাকে নৈতিক সম্পর্ক বা মানুষের সামাজিক সম্পর্কের বদলে ‘সীমিত অধিকার’ হিসাবে ব্যবহার করেন। যার ফলে যেকোনো উপনিবেশস্থাপনকারী হানাদার অন্য ভূখণ্ডে ঢুকে সীমিত অধিকারের বাঁধা সরিয়ে নিজেদের দখল প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কান্ট কোথাও উপনিবেশ স্থাপন বা বাণিজ্যিক দখলদারির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নৈতিক অবস্থান নেননি। বরং তিনি অ-ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীগুলিকে সভ্যতার অগ্রগতিতে পিছিয়ে থাকা হিসাবে চিহ্নিত করেন। ফলে তার কসমোপলিটানিজম বাস্তবে ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক বৈষম্যকে বৈধতা প্রদানের একটি ধারণাগত হাতিয়ারে পরিণত হয়।

কান্টের ‘unsociable sociability’ ধারণাটি এখানে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের মধ্যে সমাজে থাকার আকাঙ্ক্ষা এবং একইসঙ্গে সমাজ ভাঙার প্রবণতাকে তিনি মনুষ্যপ্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য হিসাবে তুলে ধরেন। এই ধারণা ইউরোপীয় বুর্জোয়া প্রতিযোগিতা, বাজার অর্থনীতি ও জাতিরাষ্ট্র গঠনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। একে যদি তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়, তাহলে দেখা যায় যে এটি আসলে খ্রিস্টীয় আদিপাপ ধারণার এক সেক্যুলার পুনর্লিখন।

কান্ট যখন এই ‘অসামাজিক সামজিকতা’কে ইতিহাসের চালিকাশক্তি হিসাবে কল্পনা করেন, তখন তিনি অনিবার্যভাবে একটি ইউরোসেন্ট্রিক টেলিওলজির দিকে অগ্রসর হন। অ-ইউরোপীয় সমাজ, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা, নির্ভরশীলতা বা আধ্যাত্মিক সম্পর্ক সামাজিক সংগঠনের প্রধান ভিত্তি ছিল, সেখানে সংঘর্ষকে একমাত্র বিকাশের পথ হিসাবে কল্পনা করা একটি আগাম নির্ধারণ।

এই কারণেই কান্টের চিন্তা সহজেই ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনের বৌদ্ধিক বৈধতা উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। হয় মানুষ প্রকৃতির উপর আধিপত্য কায়েম করবে—যা ইউরোপ নিজের জন্য দাবি করেছে—নয়তো সে প্রকৃতির অধীন থেকে পশ্চাৎপদ জীবন যাপন করবে। এই দ্বিবিভাজন বাস্তব ইতিহাসের চেয়ে ইউরোপীয় আত্মকল্পনারই প্রতিফলন।

এবার আমরা এই প্রশ্নে যেতে পারি— মানুষের মধ্যে সকল বৈচিত্র্য সত্ত্বেও সামাজিক মিলন ও সহাবস্থানের অন্য কোনো ভিত্তি কি সম্ভব? ইউরোপীয় আলোকায়নের পথ ধরে আমরা দেখেছি কীভাবে এই প্রশ্নের জবাবে ঔপনিবেশিকতা, বর্ণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদি আধিপত্যের বৈধতা উৎপাদিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, ঔপনিবেশিকতার পূর্ববর্তী বঙ্গীয় সমাজে এই মিলনের ভিত্তি কী ছিল?

 

তর্জমার সংস্কৃতি: সংমিশ্রণ বনাম সমতুল্যতা

বঙ্গের সাধু-সন্নাসী ও পীর-ফকিরদের মধ্যে একটা বাতচিৎ ও তর্জমার ঘটনা ঘটেছিলো। ষোল শতক থেকে ঔপনিবেশিক কালপর্বের প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত এই চর্চা নানা রূপে বিভিন্ন পুঁথি-পুরাণ, পাঁচালী, পালাগানা, জারিগান ও আরো নানা রকম অনুশীলনের মধ্যে পাওয়া যায়। মধ্যযুগের পুঁথিপুরাণ থেকে বর্তমান উদ্ধারকৃত পাণ্ডুলিপিগুলোর মধ্যে এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। যার অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো, সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ, আবদুল হাকিমের নুরনামা, আলি রাজার জ্ঞানসাগর ও ধ্যানমালা ইত্যাদি। তাদের লেখালিখির এই বিরাট ভাণ্ড সরাসরি এখানকার সমাজ ও মানুষের মধ্যে সামাজিকতার নতুন শর্ত তৈরি করে।

প্রথমে বলে রাখা ভালো, ইতিপূর্বে যারা এইসব লেখালিখির বিচার ও পর্যবেক্ষণ করেছন তাদের এসব বোঝার ক্ষেত্রে একটি মারাত্মক ভুল ছিলো। প্রথম ভুলটি হচ্ছে, পদ্ধতিগত ভাবে এসব অনুশীলনের রূপগুলোকে  একাট্টা ‘সংমিশ্রণ’ (syncretism) মনে করা। এটি ধরে নেয় যে দুই বা ততোধিক ‘বিশুদ্ধ’ ঐতিহ্য ছিল, পরে তারা এসে মিশে গেছে। আমরাও সাধারণত একধরনের উদারতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে করি যে, বঙ্গের লোকাল ইসলাম এখানকার হিন্দু, বৈষ্ণব, বৌদ্ধ ও বাউল ধারার সঙ্গে মিশে একটা জগাখিচুড়ি হয়ে গিয়েছিলো। এই বক্তব্য অনৈতিহাসিক ও মারাত্মক ভুল।

টনি স্টুয়ার্ট দেখান যে—

‘আদিকালের বাঙ্গালার ইসলামী কেতাবাদি দেখায় যে এর লেখকেরা তাঁদের বোধগম্যতা ও বোঝাবুঝিকে অন্যদের সঙ্গে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ’ করার চেষ্টা করেছিলেন, আর সেই বোঝার প্রক্রিয়াটিই একটি বিস্তৃত অনুবাদে পরিণত হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে অনুবাদ বলতে বোঝানো হচ্ছে সেই পদ্ধতি, যার মাধ্যমে ধর্মীয় অনুশীলনকারীরা তাঁদের সমকক্ষদের মধ্যে ‘সমতুল্যতা’ খুঁজে নিতে চেয়েছিলেন।’ তিনি আরো দাবি করেন, ‘এই সকল সুফিদের রীতিনীতি এই কৌশলে বোঝা সম্ভব— যা একইসাথে বঙ্গের ক্ষমতার ভরকেন্দ্র সম্পর্কে তাদের নিজস্ব বোঝাপড়া রূপ দিয়েছিলো।’

 

এটা বুঝবার খাতিরে শুধুমাত্র সাহিত্যিক আগ্রহ থেকে এগুলো পড়লে হবে না। বরং নবী মুহাম্মদ সাঃ এর বৃহত্তর উম্মাহ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে মানুষ ও সমাজ সম্পর্কিত তিনি যে অন্তর্দৃষ্টি দিয়েছিলেন তাও খুঁজে বের করতে হবে।

এই অনুবাদের প্রক্রিয়া ছিল দ্বিমুখী। একদিকে ইসলামি আকিদা ও নবুওয়তের বর্ণনাকে বাংলার প্রচলিত পুরাণিক ও আখ্যানিক কাঠামোর ভাষায় প্রকাশ করা হয়েছে; অন্যদিকে স্থানীয় ধারণা ও প্রতীকের সঙ্গে ইসলামি ধর্মতত্ত্বের তুলনামূলক সমান্তরাল নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে এখানে কোনো একটি ঐতিহ্য অপরটিকে গ্রাস করেনি। বরং একটি পারস্পরিক কথোপকথন ও সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। যার মধ্য দিয়ে উভয় পক্ষ নিজেদের ভাষায় একে অপরকে বিকৃত না করেই পরস্পরকে বুঝতে চেয়েছে।

সৈয়দ সুলতানের নবীবংশ এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তিনি নবীদের ইতিহাসকে এমন এক আখ্যানরীতিতে উপস্থাপন করেন, যা বাংলার পুরাণিক কাহিনির সমকালীন পাঠকদের জন্য বোধগম্য। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তিনি ইসলামি তত্ত্বকে বিকৃত করেছেন। বরং তিনি একটি অনুবাদগত কৌশলের মাধ্যমে নবুওয়তকে এমন এক ধারাবাহিক মানবিক ইতিহাস হিসাবে হাজির করেছেন, যা তখনকার স্থানীয় শ্রোতার কাছে অপরিচিত ছিল না। বরং সেটা তার দৈনন্দিন জীবনের মধ্যেই বিদ্যমান ছিল। সৈয়দ সুলতান নবীবংশে এই ঘটনাকেই ধরার চেষ্টা করেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিজ ধর্মের সমতুল্যতা গঠনের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা।

আবদুল হাকিমের নূরনামা কিংবা আলি রাজার জ্ঞানসাগর ও ধ্যানমালা একই প্রবণতার সাক্ষ্য বহন করে। ‘নূর’ ধারণাটি সুফি ঐতিহ্যে গভীর তাত্ত্বিক অর্থ বহন করে। বাংলার প্রেক্ষাপটে এটি এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে তা স্থানীয় আধ্যাত্মিক কল্পনার সঙ্গে কথোপকথনে প্রবেশ করতে পারে।

পদ্ধতিগতভাবে ‘Syncretism’ এর ধারণা ও কাঠামো এই সূক্ষ্ম সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রমকে আড়াল করে দেয়। এটি ধরে নেয় যে তৎকালীন বঙ্গে জীবিত যেসব ঐতিহ্য ছিল, তারা নিজেরা দৃঢ় ও শক্ত (concrete)  নয়, তাই অন্যের সাথে মিশে গেছে। কিন্তু ‘translation’ ধারণা ধরে নেয় যে ভিন্ন ভিন্ন এসকল ঐতিহ্য নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই সমতুল্যতা খুঁজে নিতে পারে। এই তর্জমা ও কথোপকথন তাদের একসাথে থাকার, সক্রিয় হবার ও বসবাসের শর্ত হয়ে উঠেছে।

এই তর্জমার প্রক্রিয়াকে আধুনিক লিবারাল রাষ্ট্র মুছে দিয়ে বিমূর্তভাবে একক ভাষা ও সংস্কৃতি আরোপ করে। বাঙালি জাতিবাদ এই একক সংস্কৃতি ও একক জাতির‌ই একটি মতাদর্শিক ফ্যাসিস্ট হাতিয়ার। কিন্তু বদ্বীপীয় সমাজে পারস্পরিক মিলন কোনো বিমূর্ততার ফল ছিল না। এইখানে বিভিন্ন ধর্মীয় ও ভাষাগত সম্প্রদায়ের মধ্যে টিকে থাকার জন্য এমন একটি ভাষা দরকার ছিল, যা একে অপরের জীবন ও ভাষারূপের বিনিময়ের মধ্য দিয়ে একটা শক্ত ও মজবুত পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বসবাসের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। পুঁথি-পরম্পরা মূলত সেই ভাষাই সরবরাহ করেছে। এটিই ছিল বঙ্গের সামাজিক স্থিতি ও সহাবস্থানের শর্ত।

এখানে লক্ষণীয় যে, এই যে ‘অনুবাদ’ কথোপকথনের বিশেষ ধরন— তার মানে এই নয় যে ঢালাওভাবে বিভিন্ন বস্তুকে সমান করতে হবে। সমতুল্যতা মানে ধারণাগত সেতুবন্ধন। একে অপরের ধারণাকে নিজের ধারণার আলোকে পুনর্বিন্যাস করা। নতুন একটি ভাষারূপের সঙ্গে অন্য আরেকটি ভাষারূপের আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে এমন একটি বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করা, যেখানে উভয় ঐতিহ্যই পরস্পরকে রূপান্তর করে ও অর্থবহ সংলাপ গড়ে তোলে।

তথাকথিত আধুনিকতাবাদী বাঙালিদের বহুল ব্যবহৃত ‘Syncretism’ এর ধারণা ঔপনিবেশিক জ্ঞানতত্ত্বের অংশ। এটি ‘বিশুদ্ধ ধর্ম’ এবং ‘দূষিত লোকায়ততা’র দ্বিবিভাজন ধরে নিয়ে বাংলার ইসলামকে প্রান্তিক করে। তাই এখানে আমরা বিশ্লেষণাত্মকভাবে ‘কথোপকথন’ বা কথা বলার সক্রিয়তাকে প্রাথমিক ভিত্তি হিসাবে ধরে নেব। যাতে আমরা কলোনিয়াল  বাইনারি ও বিভাজনের বিকল্প তত্ত্বায়নের সূত্র হিসাবে আমরা ব্যবহার করতে পারি। এক্ষেত্রে আমাদের সাহসের সঙ্গে এটা স্বীকার করে নেয়া জরুরি যে, মধ্যযুগীয় মুসলিম লেখক, পীর-মাশায়েখ ও দরবেশগণ তাদের সক্রিয় বৌদ্ধিক এজেন্সি নিয়েই কাজ করেছেন। তারা নিজের বাস্তবজীবনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের দিগন্ত বিস্তার করেছেন।

এযাবত বাংলা ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি সহ আরো যেসব একাডেমিক কাজ হয়েছে গড়পড়তা সবাই এই ভুল করেছে। এই ভুলের কারণে একদিকে বঙ্গীয় বদ্বীপে সমাজতত্ত্বীয় ও ইতিহাসগত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সর্বদাই এসকল মহান মনীষীদের বাস্তব তৎপরতা, সামাজিক নীতি ও বুদ্ধিবত্তিক উৎকর্ষ আড়ালে পড়ে গিয়েছিল।

এবার আমরা এই সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত বুঝবার জন্য এই উপমহাদেশেরই আরেকজন মহান সাধু ‘মুসনাদুল হিন্দ’ শাহ ওয়ালিউল্লাহর উদ্ধৃতি টানতে পারি। যিনি এই বিশেষ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতাকে সরাসরি তার তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছেন।

 

শাহ ওয়ালিউল্লাহর সমাজতত্ত্ব: প্রাকৃতিক প্রয়োজন, আখলাক ও রুসুম

শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ. একাধারে একজন মুজাদ্দিদ এবং চার তরিকার শায়েখ। তার পরে উপমহাদেশের সমস্ত তরিকা, তালিম ও তাজকিয়ার ধারাগুলো তার সঙ্গেই মিলিত হয়েছে। তিনি হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহর মধ্যে একটি ‘সমাজ’ প্রস্তাবনা পেশ করেন। আমরা তাকে ভারতীয়-উপমহাদেশের একজন অধিবাসী হিসাবে তার লেখাকে একটি বিশেষ ধরনের সামাজিক অভিজ্ঞতা হিসাবে পাঠ করব। শাহ ওয়ালিউল্লাহ প্রচলিত ইউরোপীয় সমাজতত্ত্বীয় অনুমাণ থেকে পৃথক ‘প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা’ ও তাজরেবা (empirical experience)-নির্ভর সমাজ বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে মোটাদাগে তিনটি মানদণ্ড স্থাপন করেন।

এক. মানবজাতির প্রত্যেক ব্যক্তির একে অপরের প্রতি প্রাকৃতিক প্রয়োজন (حاجة كل محتاج من بنی آدم من قبل طباعه)। অর্থাৎ মানুষ স্বভাবগতভাবেই অপরের প্রতি মুখাপেক্ষী। সমাজ কোনো চুক্তিগত কল্পনা নয়। যা একান্তই একটা জনসমষ্টিকে বিমূর্ত এককের মধ্যে  অনুমান করে নেয়। ওয়ালিউল্লাহ বলছেন, সমাজের মধ্যে মানুষের একত্রিত থাকা বা তার যে সমষ্টিগত ঐক্য এটা তার স্বভাবজাত প্রয়োজনের‌‌ই বাস্তব ফল।

দুই. এই প্রথম স্তরের সাথে তিনি যোগ করেন ‘অভিজ্ঞতামূলক জ্ঞান’ (العلوم التجاربية)। মানে মানুষ অভিজ্ঞতা, পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সামাজিক জীবনকে গঠন করে। সমাজ সর্বদা এই তাজরেবা (lived experience) বা জীবন্ত অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।

তিন. সঠিক নৈতিকতা বা আখলাক (الأخلاق الصحيحة)। এর দ্বারা আমরা বুঝবো, সমাজ টিকে থাকে আখলাকের ওপর। আখলাক মানে মানব অস্তিত্বের অন্তর্গত গুণের বিকাশ। এই একই মানদণ্ড অন্যান্য স্তরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

ওয়ালিউল্লাহ মনে করেন মানুষ এই তিনটি সূত্র অবলম্বন করে সমাজ ও প্রজাতি সত্তা হিসাবে নিজের বিকাশ ঘটাতে সক্ষম। এই বিকাশ ঘটাতে গিয়ে মানুষের প্রকৃতিকে বিচ্ছিন্ন বা বিরোধ হিসাবে হাজির করা অনিবার্য নয়। ইউরোপীয় সমাজচিন্তায়—বিশেষ করে হবস, লক বা রুশো— সমাজকে একটি ‘সামাজিক চুক্তি’ (Social Contract) হিসাবে কতগুলো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির নিজেদের স্বার্থে একটি কৃত্রিম ঐক্যে আবদ্ধ হ‌ওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু ওয়ালিউল্লাহর মতে,

সমাজ কোনো কৃত্রিম রফা বা বৌদ্ধিক বিমূর্তায়নের মাধ্যমে গঠিত হতে পারে না। তার কাছে সমাজ ও মানুষের মিলিত হবার উদ্যোগ সর্বদা পরস্পরের প্রতি একে অপরের স্বাভাবিক ও একান্ত‌ই ‘প্রাকৃতিক প্রয়োজনের’ তাগিদ থেকে ঘটে। এ হিসাবে তিনি কোনো পরাবিদ্যামূলক বাইনারি কিংবা বুদ্ধিবাদী বিমূর্তায়নের মধ্যেও যান নাই। তার কথায়, ‘যখন কোনো প্রজাতি রূপের (صورة) কথা বলা হয় (যেমন মানুষ, উদ্ভিদ ও অন্যান্য), তখন আমরা শুধু নির্দিষ্ট সেই রূপটিকেই বোঝাই না, বরং তার মতো বা তার কাছাকাছি যা কিছু রয়েছে, যা (সামজিক মিলন ও ঐক্য ও তার বিকাশের) সার্বিক নিয়মাবলী (القواعد الكلية) দ্বারা সমর্থিত, সে সকল বিষয়কেও বোঝাই। এই রূপগুলো প্রতিটি জাতির জ্ঞান ও রীতিনীতি অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে, তবে তা সেই সার্বিক নিয়মের আওতাভুক্ত থাকে।

আমরা প্রথম থেকে শুরু করতে পারি, বৃহত্তর বঙ্গের পীর-দরবেশ এবং ওলি-আওলিয়াগণ প্রধানত তারা মানুষের সঙ্গে আপন প্রয়োজনেই সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন। তারা এখানকার মানুষের ওপর কোনো আগাম বাইনারি আরোপ করেননি। তারা তাই একটা ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে গেলেও তার সঙ্গে সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। এরপর তারা সেই সমাজের ওপর তাজরেবা ও জরিপ করেছেন। তাজরেবা বা অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমাজের আরো আরো সদস্য ও ব্যক্তির জ্ঞান তারা নিজেরা বোঝার চেষ্টা করেছেন। এরপর তারা সেই সমাজের মধ্যে যা কিছু ভালো ও কল্যাণ তার ওপর ভিত্তি করে নিজেদের মিলনের ক্ষেত্রগুলো তৈরি করেছেন।

এই মিলনের বিভিন্ন রূপ নানা উপলক্ষে নানাভাবে আমাদের সমাজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হিসাবে যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছে। ওয়ালিউল্লাহ সমাজ ও তার মিলনের প্রধান ক্ষেত্র হিসাবে চিহ্নিত করেন নানা রকম ‘রুসুম’। তিনি বলেন, ‘রুসুম (আচার–অনুষ্ঠান ও সামাজিক রীতি) হলো মানুষের শরীরে থাকা হৃদয়ের মতো। শরিয়ত প্রথমত ও মূলত এগুলোকেই লক্ষ্য করে, এবং সকল এলাহি নির্দেশনায় (নওয়ামিস ইলাহিয়া)— এগুলোকে কেন্দ্র করেই বাহাস করে।’ অর্থাৎ রুসুম-রেয়াজ সবকিছুই মানুষের পরস্পরের প্রতি মিলনের তাগিদেই গড়ে ওঠে। সমাজের ভিত্তিগত নিয়ম ও নৈতিকতা (ethos) এর ওপরই তৈরি হয়। আমরা তার বরাতে ঔপনিবেশিকতা-পূর্ব এমন সমাজের কল্পনা পাই যে সমাজে মানুষের সামজিক নৈতিকতার ভিত্তি একইসঙ্গে দীব্য আকুতি ও জিজ্ঞাসা থেকে আলাদা না। যা ছাড়া সমাজের সার্বজনীন নৈতিক ও দার্শনিক বিকাশ অসম্ভব।

ইসলাম জগতে মানুষকে এমন মর্যাদায় আসীন করেছে যেখানে মানুষ নিজের সঙ্গেই সর্বদা দৈব ক্ষমতা বহন করে। তাই নৈতিকতারও অপর নাম হলো আখলাক। মানে খোদার সৃষ্টিগুণ (الخالقية) জগতে মানুষেরই নিজস্ব গুণ (المخلوقية) হিসাবে হাজির হয়েছে। এই নৈতিক ভিত্তির দরুন মানুষের সঙ্গে জগতের নিয়মও এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের মধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিজের বিকাশ থেকে জগতের বিকাশ আলাদা ও পৃথক গণ্য না করা। নিজের থেকে সমাজ ও সমষ্টিকে বিচ্ছিন্ন করে না ফেলা। ইসলামে এই হিসাবে জগতের হাকিকতকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর বিপরীত স্রেফ বৌদ্ধিক বিমূর্ততা ও গাফিলতিকে এই বাস্তবতাকে উপলব্ধিকরণের মধ্য দিয়ে পুরাপুরি বাতিল হিসাবে গণ্য করেছে।

যারা এই হাকিকতকে হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন, তারাই সমাজের সামষ্টিক প্রজ্ঞার এমন মহৎ দৃষ্টান্ত হিসাবে হাজির হন। তাদেরকেই আমরা পীর-মুর্শিদ, গাউছ-কুতুব বলি। তাদের দিকে ইঙ্গিত করে ওয়ালিউল্লাহ বলেন, ‘এসব রুসুমের উৎপত্তির নানা কারণ। এগুলোর উদ্ভব হয়—যেমন প্রজ্ঞাবান মনীষীদের উপলব্ধি হিসাবে, কিংবা আল্লার তরফ থেকে নূর দ্বারা সমর্থিত লোকদের অন্তরে অনুপ্রেরণা হিসাবে।’ বঙ্গীয় বদ্বীপের সামজিক মিলনের নানারকম ক্ষেত্রের মধ্যে ‘মাজার’ ও দরগার মধ্যে নানা ধরনের রুসুমের প্রকাশ ঘটে। এই দরগাহের মধ্যে নানাশ্রেণীর মানুষের মিলন ঘটে। তারা এই মিলনের মধ্য দিয়ে সামজিক সম্পর্ক নির্মাণ করে। পুরানা আমল থেকে এখনো অবধি তারা নিজেদের মিলনের আকুতি নিয়ে মাজার-দরগায় হাজির হয়।

এই কারণে মাজার-দরগা হলো এই বৃহৎবঙ্গের সামাজিক মিলনের প্রধান ভিত্তি। আধুনিকতা ও ইউরোপীয় ইতিহাসের মধ্য দিয়ে আমি ও অপরের বিরোধের এক নিরন্তর যুদ্ধংদহ রাজনৈতিক ময়দানে আমরা যে ফেতনা-ফ্যাসাদে লিপ্ত হয়েছি, তার বদলে মাজার-দরগার মাধ্যমে আমাদের  নিজেদের সামষ্টিকভাবে কল্পনা করার সুযোগ রয়েছে।

মাজার-দরগাহ ছাড়াও বঙ্গীয় বদ্বীপের বিভিন্নরকম ঐতিহ্য, রীতিনীতি, আচার-প্রথা ও সামজিক নিয়ম রয়েছে। যার মধ্যে সামষ্টিকভাবে মানুষ একত্র হয় এবং পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। এটা শুধু বান্দার হক না, আল্লারও হক। আমাদের বৃহৎ বঙ্গের পীর-ফকির ও দরবেশরা এসব রক্ষা করে গিয়েছেন। তাদের এই প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বঙ্গীয় বদ্বীপের সমাজের রূপটা পরিগঠিত হয়েছে। সুলতানি বাংলার এসব ঐতিহাসিক উপাদান নতুনভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

দলিলাদিল্লা

১. ড. এনামুল হক রচনাবলী, ১ম খণ্ড, ১৯৯১, বাংলা একাডেমী

২. হারিস ইবনে আসাদআল-মুহাসিবী, কিতাবুল-আকল (মাহিয়াতুল আকল ওয়া মা’নাহু ওয়া ইখতিলাফুন নাস ফীহি)। (বুদ্ধির স্বরূপ ও গারিজাহ সংক্রান্ত মূল আরবীয় পাঠ)।

৩. ইমানুয়েল কান্ট, Toward Perpetual Peace and Other Writings on Politics, Peace, and History, ২০০৬, ইয়ালে ইউনিভার্সিটি প্রেস

৪. মার্শাল জি.এস. হজসন, The Venture of Islam, Volume 1: The Classical Age of Islam, ১৯৭৪, University of Chicago Press.

৫. টনি. কে. স্টুয়ার্ট, In Search of Equivalence: Conceiving Muslim-Hindu Encounter through Translation Theory, ২০১৩, ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস।

৬. শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ, ২০০৫, দারুল জিল, বৈরুত

আতিফ খলিল, লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় …