সুফি সংগীত সিরিজ: পর্ব ০৪

সুফি সংগীতের মৌলিক বৈশিষ্টসমূহ

প্রতিটি সংগীতধারার নিজস্ব কিছু নন্দনতত্ত্ব, দার্শনিক ভিত্তি এবং উদ্দেশ্য থাকে। সুফি সংগীতও এর ব্যতিক্রম নয়। এটি স্রেফ সুর বা গীতিকাব্যের সমষ্টি নয়; বরং একটি আধ্যাত্মিক জীবনদর্শনের শিল্পরূপ। সুফি সংগীতের বৈশিষ্ট্য নির্ধারিত হয় এর উদ্দেশ্য, বিষয়বস্তু, পরিবেশন-পদ্ধতি, শ্রোতার মানসিক প্রস্তুতি এবং সাধনা-পদ্ধতির সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্কের মাধ্যমে। তাই সুফি সংগীত উপলব্ধির জন্য কেবল সুর বা কাব্যের বিশ্লেষণ যথেষ্ট নয়, বরং এর অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক দর্শন ও সাধন-পদ্ধতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হয়। এই কথার জন্য কলন্দরিয়া তরিকার সুফি হজরত বু আলী কলন্দরের একটি শে’র খুবই প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন[1]

 بیا نگریزد ہمیں عشقِ الٰہی

مگو آوازِ مطرب از ملاہی است

অর্থাৎ, গায়কের গায়কী মানবাত্মাকে পরমাত্মার পানে মুখিয়ে তুলতে পারে, ফলত সুরেলা স্বরকে নিছক বিনোদন বা অনর্থক মনে করো না।

শাস্ত্রীয় সুফি মনীষীরা, বিশেষত আল-কুশায়রী, আল-হুজভীরী, ইমাম আল-গাজ্জালি, ইবন আরাবী, জালালউদ্দিন রুমি এবং পরবর্তী যুগের বহু সুফি লেখক, সামা ও আধ্যাত্মিক সংগীতের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সেখান থেকে সুফি সংগীতের কয়েকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়।

 

১. খোদামুখী: খোদামুখী বা স্রষ্টাকেন্দ্রিকতা সুফি সংগীতের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য। এর মূল লক্ষ্য মানবাত্মাকে পরমাত্মার দিকে প্রত্যাবর্তনে উদ্বুদ্ধ করা। প্রেম, সৌন্দর্য, বিচ্ছেদ, আকুলতা কিংবা মিলনের মতো বিষয়গুলো সুফি সংগীতে উপস্থিত থাকলেও সেগুলো সাধারণত পার্থিব অর্থে ব্যবহৃত হয় না, বরং পরমাত্মা ও মানবাত্মার মধ্যকার আধ্যাত্মিক সম্পর্কের রূপক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অধিকাংশ সুফি রচনার মধ্যে পরমসত্যকে আবিষ্কার করার তাড়না লক্ষ্য করা যায়। কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী, যিনি উপমহাদেশে চিশতিয়া তরিকার প্রবর্তক খাজা মুঈনউদ্দীন চিশতীর প্রধান খলিফা ছিলেন, তাঁর রচনায় আমরা পাই–

 عشق آمد و عنان دل ناتوان گرفت

من ترک دل گرفتم دل ترک جان گرفت

(প্রেম এসে আমার অসহায় হৃদয়কে নিজের বশে নিয়ে নিল।

আমি হৃদয়ের মায়া ছেড়ে দিলাম, আর হৃদয়ও প্রাণের মোহ ত্যাগ করল।)

 هرگه که یار جلوه کند در حریم دل

دل از بهشت و حور جنان توان گرفت

 (যখনই প্রিয়তম আমার হৃদয়ের অন্তঃপুরে আবির্ভূত হন,

তখন হৃদয় স্বর্গে রূপ নেয়, এবং অন্তরাত্মা সমৃদ্ধ হয়ে উঠে স্বর্গীয় সব সৌন্দর্যে।)

 

যখন সুফি পরমসত্যকে আবিষ্কার করলেন, প্রেমিকের সন্ধান পেলেন, তখন জাগতিক দুনিয়াবী আসক্তি থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহমুখী হয়ে উঠলেন। এবং পরম সত্তা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা স্বর্গীয় অনুভূতির চেয়েও অধিকতর শ্রেষ্ঠ। কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর এই পরমসত্তার সান্নিধ্য হাসিলের চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে শেরের শেষে গিয়ে বলেন–

 فانی چو گشت قطب الدین از خویش آمدی

اندر دل وزیر دو جهانش عنان گرفت

ফানা বলতে বুঝায়, নিজের অহং, আত্মগর্ব ও ব্যক্তিসত্তাকে পরমসত্তার ইচ্ছার কাছে সম্পূর্ণ বিলীন করে দেওয়া। কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী যখন ‘ফানার’ স্তরে পৌঁছালেন, তখন তাঁর হৃদয়ের নিয়ন্ত্রণ আর নিজের অধীনে নেই। বরং পরম সত্তা আল্লাহই তাঁর অন্তরকে পরিচালিত করতে লাগলেন।

 

২. আত্মশুদ্ধি: সুফি সংগীতের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাযকিয়াতুন নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধি। সুফি সাধকদের মতে, মানুষের অন্তরে অহংকার, লোভ, হিংসা, রিয়া, আত্মপ্রবঞ্চনা ও জাগতিক আসক্তি বাসা বাঁধে। ফলে যথার্থ আধ্যাত্মিক পরিবেশ ও পরিবেশিত সংগীত সাধকের মাঝে আত্মসমালোচনা, অনুশোচনা এবং তওবার অনুভূতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। বাংলার মুর্শিদি ও মারিফতি গানের একটি বড় অংশ মানুষের নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, দুনিয়ার অনিত্যতা এবং পরম সত্তার প্রতি প্রত্যাবর্তনের আহবান নিয়ে রচিত। কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকীর শে’রে এর আংশিক আভাস পাওয়া যায়। অন্তরাত্মার পরিশুদ্ধতা নিয়ে জালালুদ্দিন রুমি তাঁর কুল্লিয়াতে শামস তাবরিযি (গজল- ৩১১)-এ বলেন,

 زشت کسی کو نشد مسخره یار خوب

دست نگر پا نگر دست بزن پا بکوب

অর্থাৎ যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ কদর্যতা (তথা অহং, হিংসা, লোভ, আত্মগরিমা) থেকে নিজ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারেনি, ততক্ষণ সে পরমসত্তার সান্নিধ্য হাসিল করতে পারে না। পরম সত্য আবিষ্কারের আনন্দ পায় না।

রুমি আরো বলেন–

  هر چه ز اجزای تو رو ننهد سر کشد

پای بزن بر سرش هین سر و پایش بکوب

মানুষের ভেতরের যে প্রবৃত্তি/তাড়না স্রষ্টার আদেশ মানতে চায় না, অহংকারে মাথাকে উঁচু রাখে, সে অহম-আবাধ্যতা বা জাগতিক আসক্তিকে যেন কঠোরভাবে দমন করা হয়। উঁচু মাথাকে যেন পিষিয়ে ফেলা হয় ও অহংকারে দাঁড়িয়ে থাকা পা-কে যেন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

 

৩. আল্লাহ-প্রেম (ইশক-ই-হাকিকি) ও নবীপ্রেম (ইশক-ই-নবী): সুফি সংগীতের প্রাণ হলো প্রেম। তবে এই প্রেম পরম স্রষ্টা আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা (মুহাব্বত) এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভের আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। জাগতিক প্রেম-বিরহের রূপক ব্যবহার করে এখানে আসলে মানবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হয়। পরমসত্তার প্রেমের পাশাপাশি সুফি সংগীতে নবীপ্রেম ও আপন পীর-মুর্শিদের প্রতি আলোচনা করা হয়। সুফিরা বিশ্বাস করেন, মুর্শিদ ভজার মাধ্যমে খোদার রাসুলকে পাওয়া যায়। আর রাসুলকে ভজা ও ভালোবাসার মাধ্যমে খোদা পাওয়া যায়। প্রেমিক-প্রেমিকা, আশিক-মাশুক, বঁধু-বিরহিণীর ভাষায় রচিত হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ আধ্যাত্মিক। রাবেয়া বসরিসহ প্রাথমিক যুগের সুফিরা আল্লাহর প্রতি নিঃস্বার্থ প্রেমের যে ধারণা প্রতিষ্ঠা করেন, পরবর্তীকালে তা সুফি সাহিত্য ও সংগীতের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে। রুমি, আমীর খুসরো, সুলতান বাহু, বুল্লে শাহ, ফরিদুদ্দীন আত্তার, জায়সী এবং অসংখ্য সুফি কবির রচনায় এই প্রেমের বিভিন্ন মাত্রা প্রকাশ পেয়েছে। কাওয়ালি ধারার প্রর্বতক তুতিয়ে হিন্দ আমির খসরু বলেন,

 جانا طلب تیری کروں دیگر طلب کس کی کروں

تیری جو چنتا دل دھروں ایک دن ملو تم آئے کر

খসরু আল্লাহকে পরম প্রিয়তম প্রেমাষ্পদ সাব্যস্ত করে বলেন, সুফির মূল অন্বেষণই হলো খোদা। তাঁর প্রেমে নিমজ্জিত হওয়া। যখন তারা জিকিরে অন্তরকে নিমগ্ন রাখে, সুফিকে এটি এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যায়, তখন পরম সত্য খোদার সান্নিধ্য ও উপস্থিতি অন্তরে অনুভূত হয়। হাফিজের গজলেও ইশক-ই-হাকিকির বর্ণনা পাওয়া যায়–

اَلا یا اَیُّهَا السّاقی اَدِرْ کَأساً و ناوِلْها

که عشق آسان نمود اوّل ولی افتاد مشکل‌ها

এখানে পেয়ালার ‘মদ’ বলতে আধ্যাত্মিক উন্মাদনা, ঐশ্বরিক প্রেম বা ইশক-ই-হাকিকি বোঝানো হয়েছে। হাফিজ বলেন, প্রেমযাত্রার শুরুতে মনে হয় এটি খুবই সহজ। কিন্তু যখন মানুষ সত্যিকারের প্রেমে প্রবেশ করে, তখন তাকে আত্মত্যাগ, বিচ্ছেদ, আকাঙ্ক্ষা, ধৈর্য এবং আত্মবিলোপের অসংখ্য পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাই তিনি আবার সেই ঐশী পানীয় চান, যা তাকে এই কঠিন পথ অতিক্রম করার শক্তি দেবে।

 

খোদায়ী প্রেমের পাশাপাশি বিভিন্ন সুফি সংগীতে নবী মুহাম্মদ (দ.)-এর সান্নিধ্য পাওয়া ও মদিনায় তাঁর রওজা জেয়ারতের আকাঙ্খাও প্রকাশ করেছেন। নবীপ্রেম বিষয়বস্তুর উপর রচিত সংগীতসমূহের মধ্যে উপমহাদেশে প্রখ্যাত উর্দু কবি ইমাম আহমদ রেজা খান বেরেলভীর রচিত নাত/শের/কবিতা সর্বাধিক পঠিত ও পরিবেশিত হয়ে থাকে। তিনি ছাড়াও আরো সুফি ও আলেমগণ নাত রচনা করেছেন। যেমন উর্দু ভাষায় রচিত এক না’তে সায়েম চিশতি বলেন,

کملی والے نگاہ کرم ہو اگر پھر دوا چاہیے نا شفا چاہیے

میں مریض محبت ہوں مجھ کو تو بس اک نظر یا حبیب خدا چاہیے

হে কামলী ওয়ালা নবী, আমি এমন এক প্রেমরোগে আক্রান্ত, আপনার প্রেমময় স্নেহময় দৃষ্টি ব্যতীত এই রোগের কোনো ওষুধ নেই। আমার জন্য আপনার এক করুণাময় দৃষ্টিই যথেষ্ট।

 

৪. প্রতীক ও রূপকের ব্যবহার: সুফি সংগীতের ভাষা সরল হলেও তার অর্থ প্রায়ই বহুস্তরবিশিষ্ট। একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে। যেমন: ‘শরাব/মদ’ ব্যবহার হয় ঈশ্বরপ্রেমের উন্মাদনার অর্থে, ‘শরাবি/সাকি’ ব্যবহার হয় আধ্যত্মিক সাধক অর্থে। এভাবে ‘শরাবখানা/মৈখানা’ মানে আধ্যাত্মিক সাধনস্থল, ‘সমুদ্র’ মানে অসীম ঐশী সত্তা, ‘বাঁশি’ ও ‘পাখি’ মানে মানবাত্মা, ‘নৌকা’ মানে দেহ, ‘মাঝি’ মানে অধ্যাত্মগুরু বা পীর-মুর্শিদ ইত্যাদি। এই প্রতীকী ভাষা সুফি সংগীতকে সাধারণ ধর্মীয় উপদেশমূলক গানের চেয়ে অধিকতর গভীর ও দার্শনিক করে তুলেছে। উদাহারণস্বরূপ জালালুদ্দিন রুমির ‘মসনভী-ই মানবী’ শুরু হয়েছে এভাবে যে,

بشنوازنی چون حکایت میکند – از جداییها شکایت میکند

 کز نیستان تا مرا ببریده اند – از نقیرم مردن نالیده اند

এই পঙক্তির মনিরউদ্দীন ইউসুফের বাংলা অনুবাদে[2]

“বাঁশীর কাছে শোন কি কাহিনী সে বলিতেছে,

তার বিরহের অভিযোগে সে ক্রন্দন করিতেছে।

আমাকে বাঁশবন হইতে কাটিয়া বিযুক্ত করা হইয়াছে,

আমার ক্রন্দনে নরনারী ক্রন্দন করিতেছে।”

 

এখানে মানবজীবনের সুক্ষ্মতর অনুভূতিকে প্রকাশের জন্য বাঁশির রূপক ব্যবহার করেছেন। বাঁশি যেমন বাঁশবন থেকে বিচ্ছিন্ন বা বিচ্ছেদ হলে, তাঁর মূলের জন্য বা প্রিয়তমের জন্য ক্রদন করছে, ঠিক তেমনি মানবাত্মাও তাঁর পরম সত্তা খোদা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীতে এসে অস্থিরতায় ও আক্ষেপে জীবন যাপন করছে। অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পুণরায় পরম সত্তার সান্নিধ্য পাওয়ার। ‘শরাব তথা পরম সত্তার প্রেম’-কে দুঃখ-বেদনার উপশম হিসাবে মনে করে দেওয়ান-এ-হাফিজে লিখেন,

ساقیا برخیز و درده جام را

خاک بر سر کن غم ایام را

(হে সাকী! ওঠ, আমাকে শরাবের পেয়ালা দাও,

আর এই সময়ের দুঃখ-কষ্টের শিরে ধূলি নিক্ষেপ কর)

এখানে সাকি (পানশালার শরাব পরিবেশনকারী) বলতে পরম করুণাময় খোদার ঐশী সত্তাকে বোঝানো হয়েছে। আর ‘জাম (পেয়ালা)’ বলতে মানবাত্মাকে। আরবী-উর্দু-ফারসি-তুর্কির পাশাপাশি বাংলা সুফি সংগীতেও এর ব্যাপক প্রয়োগ দেখা যায়।  যেমন লালন রচিত বাউল ধারার খুব জনপ্রিয় গান হলো–

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি

কেমনে আসে যায়।

ধরতে পারলে মনবেড়ি

দিতাম পাখির পায়।।

এখানে ‘খাঁচা’ হলো মানবদেহ বা বস্তুগত জগত, ‘অচিন পাখি’ হলো প্রাণ, আত্মা (সুফি ভাবধারায় ঐশী সত্তার রহস্যময় উপস্থিতি) এবং ‘মনবেড়ি’ বলতে একাগ্র মন, প্রেম ও সাধনার বন্ধন। ঐশী চেতনা কখন মানুষের অন্তরে উদ্ভাসিত হয়, আবার কখন আড়ালে চলে যায, তা মানুষের নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। তাই লালন আক্ষেপ করে বলেন, যদি এই ঐশী উপস্থিতিকে হৃদয়ে স্থায়ীভাবে ধরে রাখা যেত, তবে প্রেম স্মরণ ও সাধনার বন্ধনে তাকে চিরদিন নিজের মধ্যে ধারণ করতেন। আমির খসরুর বিখ্যাত কাওয়ালি ‘ছাপ তিলক’-এ একজন প্রেমিক তার প্রিয়জনের ছায়ায় পরিণত হওয়ার রূপক হলো– একজন আধ্যাত্মিক সাধক নিজের অহংকে বিলীন করে পরমসত্তার সঙ্গে পূর্ণ একাত্মতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা।

 

৫. জিকির: সুফি সংগীতের আরেকটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এর জিকিরনির্ভর চরিত্র। কুরআনে আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করার নির্দেশ বহুবার এসেছে। সুফি সাধকেরা বিশ্বাস করেন, যিকর স্রেফ মুখের উচ্চারণ ও সশব্দে স্রষ্টার স্মরণ নয়; বরং এটি রুহের জাগরণ ঘটায়। এই কারণে বহু সুফি সংগীতে আল্লাহর নাম, আসমাউল হুসনা, কালিমা, দরুদ শরিফ কিংবা সংক্ষিপ্ত যিকর বারবার পুনরাবৃত্ত হয়। এই পুনরাবৃত্তি মনোসংযোগ বৃদ্ধি ও অন্তরের নিমগ্নতার একটি সাধন-পদ্ধতি। বিশেষত চিশতিয়া, কাদেরিয়া এবং মাইজভাণ্ডারিয়া তরিকার সংগীতে এই বৈশিষ্ট্য সুস্পষ্ট। এছাড়া উপমহাদেশের মসজিদ খানেকাগুলোতে ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’, ‘ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু’ ইত্যাদি জিকির করার সময় সুনির্দিষ্ট কিছু পঙক্তি সুরে ছন্দে পড়ে যিকরমূলক শব্দাবলি বারবার পুনরাবৃত্তি করা হয়। ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ যিকিরের জন্য আল্লামা ইকবালের রচিত সবচেয়ে জনপ্রিয় শে’র হলো-

خودی کا سرِ نہاں لا الہٰ الا اللہ

خودی ہے تیغ، فساں لا الہٰ الا اللہ

(আত্মসত্তার অন্তরতম মর্ম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ;

আত্মা যদি হয় তীক্ষ্ণ তরবারি, তার ধার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ)

 

বাউল শাহ আবদুল করিমের একটা গানের অংশ বাংলার বিভিন্ন মসজিদ খানেকাহ-এ হরদম শোনা যায়। এটি–

দমে দমে পড় জিকির

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ

নাম ছাড়া দম ছাড় যদি

ঠেকবে হিসাবের বেলা ॥

 

জিকিরের পাশাপাশি নবীজিকে সালাম পরিবেশনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন গানের অংশকে ব্যবহার করা হয়। এতে নবীজিকে নিয়ে কবি ও সংগীত রচিয়তাগণ তাঁদের ভাবনা জানান। বাংলায় সালামের জন্য সর্বাধিক পঠিত কবি গোলাম মোস্তফার একটি রচনা, যা ‘ইয়া নবী সালাম আলাইকা’র পরিবেশনের সময় পড়া হয়। তা হলো-

তুমি যে নুরের রবি,

নিখিলের ধ্যানের ছবি,

তুমি না এলে দুনিয়ায়,

আঁধারে ডুবিত সবি!

 

এভাবে বিভিন্ন সংগীত ধারার রচনা কখনো সরাসরি জিকিরের জন্য বা কখনো জিকিরের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলা ও ভারতে গান, নাত-হামদের বিভিন্ন পঙক্তি সরাসরি মোনাজাতেও ব্যবহার হতে দেখা যায়। আহমদ রেজা বেরেলির নাত, যা মোনাজাতে ব্যবহার হয়–

یا الٰہی! ہر جگہ تیری عطا کا ساتھ ہو

جب پڑے مشکل شہِ مشکل کشا کا ساتھ ہو

হে ইলাহী! তোমার অনুগ্রহের ছায়া সর্বক্ষণ আমার সাথে থাকুক,

যখনই বিপদে পড়ি, মুশকিলকুশা নবী আমার সঙ্গী হোক)

 

৬. বহুভাষার মিশ্রণ: সুফি সংগীতের মধ্যে এমন অসংখ্য নাত-হামদ-কাসিদা রয়েছে, যেখানে একাধিক ভাষার শব্দ, বাক্য বা স্তবক ব্যবহৃত হয়েছে। অন্যান্য সংগীত ধারার তুলনায় Code mixing সুফি সংগীতে অধিক ব্যবহৃত হয়। এমন অনেক নাত-হামদ রচিত হয়েছে, যেখানে প্রতি পঙক্তিতে তিন-চার-পাঁচটি ভাষার সংমিশ্রণ হয়েছে। তাও সুর-তাল-লয় সব অক্ষুন্ন রেখে। এছাড়া কাওয়ালিতে আরবি, ফারসি ধ্রুপদী সাহিত্য, হিন্দবি বা ব্রজের লোককবিতা ও উর্দু দ্বিপদী ভাষাকে একীভূত করে ধ্বনি ও অর্থের এক সমৃদ্ধ বুনন তৈরি করতে পারেন। নুসরাত ফতেহ আলী খান, আজিজ মিয়া কাওয়াল, আবিদা পারভীনসহ অনেকের গায়কীতেও ভাষার সংমিশ্রণ ঘটে। সুফি সংগীতধারা এ বৈশিষ্ট্য নিয়ে আয়েশা খান বলেন, “The linguistic pluralism of Qawwali not only reflects its historical trajectory but also symbolizes its inclusive ethos, breaking linguistic and cultural barriers to convey a universal spiritual message.”[3]

চারভাষার মিশ্রণে রচিত ইমাম আহমদ রেজার একটি জনপ্রিয় নাত হলো-

لَم یَاتِ نَظیرُکَ فِی نَظَر مثل تو نہ شد پیدا جانا

جگ راج کو تاج تورے سر سوہے تجھ کو شہ دوسرا جانا

উচ্চারণ: “লাম ইয়াতি নাজিরুকা ফী নাজারিন (আরবি ভাষা অংশ)

মিসলে তু না শুদ পয়দা জানা (ফারসি অংশ)

জগ রাজ কো তাজ তোরে সর সো হ্যায় (উর্দু অংশ)

তুঝ কো শাহে দো সারা জানা (হিন্দি অংশ)”

 

ইমাম আহমেদ রেজার রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘হাদায়েকে বকশীশ’র অনুবাদ করতে গিয়ে আল্লামা আনিসুজ্জামান পঙক্তিটির কাব্যনুবাদ করেন এভাবে,

উপমা তোমার কেউ দেখেনি কখন,

তোমারই মত কেউ হয়নি সৃজন।

সম্রাট-মুকুট তব শিরে তো শোভে,

দোজাহানে তুমিই তো এমনি রাজন ।

এই নাতটির সবকটি পঙক্তিই এভাবে আরবি-ফারসি-উর্দু-হিন্দি প্যাটার্নে সাজানো। হাদায়েক বকশীশ গ্রন্থে বহুভাষার মিশ্রণে রচিত আরো একাধিক নাত রয়েছে। আমির খসরুর সংগীতেও এই intra-verse code-mixing দেখা যায়। যেমন-

ز حالِ مسکیں مکن تغافل – دُرائے نیناں بنائے بتیاں

کہ تابِ ہجراں ندارم اے جاں-  نہ لے ہو کاہے لگائے چھتیاں

(উচ্চারণ: যে হাল-এ মিসকীন মাকুন তাগাফুল,

দুরায়ে নৈনাঁ বানায়ে বাতিয়াঁ।

কে তাব-এ হিজরাঁ নাদারাম অ্যায় জান,

না লেহো কাহে লাগায়ে ছাতিয়াঁ।)

অনুবাদ: এ অসহায় প্রেমিকের আর্তির প্রতি উদাসীন হয়ো না;

চোখের চাহনীতে ও মধুর কথায় আমাকে আর ভোলাতে চেয়ো না।

হে প্রাণপ্রিয়, বিরহের দহন সইবার শক্তি আর অবশিষ্ট নেই;

তবে কেন আমায় তোমার স্নেহবক্ষে স্থান দাও না?

 

পঙক্তিতে প্রথম ও তৃতীয় অংশ ফারসি, আর দ্বিতীয় ও চতুর্থ অংশ হিন্দবি (প্রাচীন হিন্দি/ব্রজভাষা)। তাই উচ্চারণেও দুই ভাষার ধ্বনিগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। সুফি সংগীতে বিভিন্ন ভাষাকে স্থান দেয়ার এই রীতি লোকায়ত ভাষা ও সংস্কৃতিকে আত্মীকরণের একটি চেষ্টা বা প্রক্রিয়া বলা যায়। আমির খসরুর মুরশিদ সুলতান নিজামুদ্দীন আউলিয়াও হিন্দি ও ফারসি ভাষার সংমিশ্রণে সংগীত রচনা করতেন।[4] ১৭৬০- ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলা, আরবি, ফারসি, তুর্কি হিন্দি এবং উর্দু শব্দের সংমিশ্রণে এক ধরনের মিশ্র বা কৃত্রিম ভাষায় ‘দো-ভাষী পুঁথি’ রচিত হতো। সুফি প্রভাবিত এই রচনা গ্রাম-বাংলায় সুরারোপ করে পাঠ হতো।

 

৭. মৌখিক ঐতিহ্যের ধারক: বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ সুফি সংগীত দীর্ঘকাল ধরে মৌখিকভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। গুরু থেকে শিষ্য, মুর্শিদ থেকে মুরিদ কিংবা শিল্পী থেকে পরবর্তী শিল্পীর কাছে গান, সুর ও পরিবেশনার কৌশল প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হয়েছে। এই মৌখিক ঐতিহ্য একদিকে যেমন বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে বহু প্রাচীন রচনার পাঠভেদও তৈরি করেছে। মৌখিক ঐতিহ্যে ধারক হিসেবে সুফি সংগীত কেমন ও কিভাবে কাজ করেছে–  তা নিয়ে এখনো দীর্ঘ ও পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। মৌখিক ঐতিহ্যে ধারক হিসেবে উপমহাদেশীয় সুফি সংগীত কাওয়ালির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো ঐতিহাসিক ও নৈতিক আখ্যান সংরক্ষণ করার ক্ষমতা। William R. Pinch বলেন, “The qawwali not only memorializes the saint but also situates the listener within a larger cosmological and historical narrative, thus binding them to a collective past”.[5] (Pinch 132)

 

Dr. Kalpna Rajput তাঁর এক গবেষণায় “কাওয়ালি মৌখিক কবিতা ও জীবন্ত লোককথা হিসেবে কাওয়ালি কেমন?”- তা খতিয়ে দেখেছিলেন। তিনি বিখ্যাত লোকগবেষক Richard M. Dorson ও Walter J. Ong এর আলোচনা[6]র সহায়তা নিয়ে একটি পর্যালোচনা হাজির করেন। পাঠের সুবিধার্থে পর্যালোচনার মূল অংশটুকু হুবহু উদ্ধৃতি দেওয়া হলো– “Qawwall can be understood as a form of oral poetry, a tradition where poetic compositions are passed down orally and performed rather than written and read. Unlike written texts, oral poetry emphasizes spontaneity and fluidity, adapting to the context of each performance. According to Walter Ong, oral traditions rely heavily on mnemonic devices, repetitive patterns, and formulaic expressions to aid in transmission and recall These characteristics are abundantly evident in Qawwali, where verses are often improvised, and the lead singer engages in a dynamic dialogue with the chorus and the aradionice. Folklore, on the other hand, encompasses the collective cultural expressions of a community, including its stories, rituals, songs, and proverbs. Richard M. Dorson defines folklore as “the traditional art, literature, knowledge, and practice disseminated largely through oral means”. Qawwali, in this sense, serves as a living example of folklore, preserving not only the spiritual teachings of Sufism but also the socio-cultural narratives of the communities it engages with.”[7]

মৌখিক ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে সুফি সংগীত কিভাবে কাজ করে তা আরো বেহতরভাবে বোঝার জন্য, দক্ষিণ এশিয়ার সুফি সংগীত ও লোক সংগীত নিয়ে আবদুল আলী এবং বিগ্রেড জে. ডেভিসের করা গবেষণাদ্বয়[8] খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

 

৮. অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি: সুফিরা ছিলেন মানবতাবাদী, সময়-স্থান-পরিবেশ নামক সীমানা ও সীমাবদ্ধতার উর্ধ্বে। ফলে তাঁরা ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী ও জাতিগত বিভাজনকে এড়িয়ে মানবপ্রেম, সহমর্মিতা এবং নৈতিক জীবনযাপনকে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ  করেছেন। সুফি সংগীত ধারার এই বৈশিষ্ট্যের গভীরতর উপলব্ধির জন্য Pune Karimi এর “Exploring Humanistic Values in Persian Sufi Mysticism and Literature” শিরোনামের গবেষণাপত্র পড়া যেতে পারে।[9] লেখক এখানে ফারসি সুফি সাহিত্য ও অধ্যাত্মবাদের মধ্যে নিহিত মানবতাবাদী (Humanistic) মূল্যবোধকে বিশ্লেষণ করেছেন। ফারসি সুফি সাহিত্য কেবল ধর্মীয় বা মরমি অভিজ্ঞতার বর্ণনার মধ্যে নিজেকে আটকে না রেখে, একটি সর্বজনীন মানবিক নৈতিকতারও বাহক কিভাবে হয়ে উঠেছেন– এখানে তাঁর বর্ণনা রয়েছে। লেখক যুক্তি দেন, ফারসি সুফি সাহিত্য মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদা, প্রেম, সহমর্মিতা এবং আত্ম-উন্নয়নের এমন এক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে, যা ধর্ম, জাতি ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রাসঙ্গিক। গবেষণায় ১৪টি মৌলিক মানবিক মূল্যবোধ ও ৫টি দার্শনিক ভিত্তি পর্যালোচনা করে করিমি এই যুক্তি উপস্থাপন করেন।

 

বাংলার সুফি সংগীতেও মানুষের মর্যাদা, প্রতিবেশীর প্রতি যত্নবান হওয়া, দরিদ্রের প্রতি সহানুভূতি এবং নৈতিকতার আহবান বারংবার উচ্চারিত হয়েছে। বাউল ধারার সাধক লালন’র একটি জনপ্রিয় গান–

মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি।

মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি।।

এই মানুষে মানুষ গাথা

গাছে যেমন আলকলতা।

জেনে শুনে মুড়াও মাথা

জাতে ত্বরবি।।

দ্বিদলে মৃণালে

সোনার মানুষ উজলে।

মানুষ গুরুর কৃপা হলে

জানতে পাবি।।

এই মানুষ ছাড়া মন আমার

পড়বি রে তুই শূন্যকার।

লালন বলে মানুষ আকার

ভজলে তারে পাবি।।

এখানে “মানুষ ভজা” মানে মানুষের মধ্যে বিরাজমান খোদায়ী সত্তাকে সম্মান করা, মানবপ্রেম, মানবতা ও আত্মজ্ঞান অর্জন করা। লালনের এই গানটি খুব বৈচিত্র্যময়। মনুষ্যত্বের প্রতি সচেতনতা ও আধ্যাত্মদর্শন উভয়ের প্রকাশ পেয়েছে এই গানে। তাঁর কাছে মানুষই খোদা পাওয়ার প্রথম ও শেষ পন্থা। গবেষকগণ গানটির একাধিক অর্থ উদ্ধার করেছেন। আক্ষরিক অর্থে, মানুষের সেবা ও নিজের মনুষ্যত্বের বিকাশ করাই সাধকের উদ্দেশ্য। জাতি, ধর্ম ও আচার অতিক্রম করে মানুষকেই সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করা। আধ্যাত্ববাদী দৃষ্টিকোণ ও রূপকার্থে, মানুষরূপী ঈশ্বর তথা মুর্শিদকে খোঁজা ও তাঁর সঙ্গলাভ, তাঁকে অন্তরাত্মার মধ্যে বিরাজমান ঈশ্বরীয় সত্তার উপস্থিতিকে আবিষ্কার করাই সাধকের ধর্ম।

 

৯. স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অভিযোজন: সুফি সংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় সংস্কৃতিকে আত্মস্থ করার সক্ষমতা। আরব, পারস্য, আনাতোলিয়া, মধ্য এশিয়া, ভারত কিংবা বাংলায় সুফি সংগীত কখনো একরৈখিক ছিল না। প্রতিটি অঞ্চলের ভাষা, সুর, বাদ্যযন্ত্র ও লোকঐতিহ্যকে গ্রহণ করে এটি নতুন রূপ লাভ করেছে। বাংলার ক্ষেত্রে আরবি-ফারসি ভাবধারা বাংলা ভাষা, লোকছন্দ, পালাগান, বাউলধারা এবং গ্রামীণ সংগীতের সঙ্গে মিলিত হয়ে বা বাংলায়ন হয়ে বাউল, মুর্শিদি, মারিফতি ও মাইজভাণ্ডারী গানের জন্ম দিয়েছে। ড. এনামুল হকের ‘বঙ্গে সূফী প্রভাব’-এ উপস্থাপিত পর্যালোচনাগুলো লক্ষ করলে অভিযোজন (Adaptation) এর বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করা যাবে। বাংলায় ভাবের মিশ্রণ কিভাবে হলো এবং সুফিদের দ্বারা আনীত সংগীতধারা কিভাবে বাংলাকে মুখরিত করলো, তা নিয়ে ড. হক বলেন, “দরবেশীরা যখন বাঙ্গালাদেশে আসিয়া ঐস্লামিক ভাবপ্রবণতার আমদানী করিলেন, তখন বাঙ্গালীর সুকুমার হৃদয় সহসা খুলিয়া গেল, তাঁহারা ভাবে আত্মহারা হইয়া পড়িলেন। বাঙ্গালীর নিজস্ব ভাবপ্রবণতার সহিত ঐম্লামিক ভাবপ্রবণতা মিশ্রিত হইল। এই যুগ ভাবপ্রবণতার সংমিশ্রণে বাঙ্গালায় বর্ষা-প্লাবন-পীড়িত নদীপ্রবাহের ন্যায় নূতন ভাবের বন্যা বহিয়া গেল। বাঙ্গালীর গলায় গলায় ভাবের গান, প্রাণে প্রাণে উদাস সঙ্গীত, হৃদয়ে হৃদয়ে মর্ম্মের কথা দিবস-রজনী গুঞ্জন করিয়া ফিরিতে লাগিল। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বৈষ্ণব ভাবের কবিতায়, আউল-বাউলের উদাস সঙ্গীতে, ফকীর ও জিকির সম্প্রদায়ের মর্ম্মের বাণীতে বাঙ্গালাদেশ পরিপূর্ণ হইয়া উঠিল। বাঙ্গালার আকাশ-বাতাসে, কাননে-কান্তারে, মাঠে-ঘাটে, পল্লী জনপদে কেবল সেই একই কথা, একই বাণীর সুর ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হইয়া আনন্দভরে নাচিয়া ফিরিতে লাগিল।”[10]

 

পরক্ষনে ড. হক বাউল মতকে সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে ও বাউল মত-গানের উদ্ভব নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, “বঙ্গে ইসলাম প্রবেশের পর এবং এদেশের প্রতি কেন্দ্রস্থলে সূফীদের আস্তানা স্থাপিত হইবার পর, বাঙ্গালাদেশে সাধারণভাবে সূফীদের মধ্যসূত্রতায় প্রাপ্ত যে ঐস্লামিক পারিপার্শ্বিকতার (Atmosphere) সৃষ্টি হইল, তাহারই প্রভাবে এদেশে ভাব-জাগরণ দেখা দিল; ইহার প্রথম ফল, গৌড়ীয় বৈষ্ণব-মতবাদ। খ্রীষ্টীয় ষোড়শ শতাব্দীতে ঐন্নামিক পারিপার্শ্বিকতার মধ্যে থাকিয়া বৈষ্ণব ও সূফী-প্রভাবে নিরক্ষর শ্রেণীর ভিতর যে মর্মমুখী চিন্তা বিকশিত হইয়া উঠে, তাহাই হইল- ‘বাউল-মত’।…..চিশতিয়হ ও সুহরবরদীয়হ দরবীশদের ন্যায়, বাউলেরা গানে সাধনা করিয়া থাকে। মুসলমান, খ্রীষ্টান বা হিন্দুর ন্যায় ইহাদের কোন বিশিষ্ট সাধনার পদ্ধতি নাই। বে-শরা দরবীশ অর্থাৎ শাস্ত্রীয় ইসলাম-বিরোধী দরবীশুদের ন্যায়, বাউলেরা গানেই পালল হয়, গান করিয়াই বাঁচিয়া থাকে; গান করিতে করিতে বা হঠাৎ ভাবাবেশে দরবীশদের ‘হ্বাল’-এর ন্যায় ইহারাও দশাগ্রস্থ হইয়া পড়িতে দেখা যায়।”[11] ফলে বাংলায় যেভাবে বাউল গানের উদ্ভব হলো, এর ধরণটি এখানকার অন্যান্য সুফি সংগীতের উদ্ভব ও বিকাশের ধরণ অনেকটা একই। ড. আহমদ শরীফও তাঁর “বাঙলার সূফী সাহিত্য” গ্রন্থে দেখিয়েছেন, উপমহাদেশের অধিকাংশ সুফিমতে প্রচুর পরিমাণে স্থানিক প্রভাব রয়েছে। নকশবন্দিয়া তরিকার উপর ভারতীয় দেহতত্ত্ব ও যোগের প্রভাব এবং বাংলার সুফি সাহিত্য ও সংগীতে বৈষ্ণব-সহজিয়া-নাথতন্ত্র-শক্তি-যোগ এর প্রভাব প্রচুর। ফলে এখানে একটি মিশ্র দর্শনের উৎপত্তি হয়েছে।[12] যেহেতু ভাব-মত-বিশ্বাস থেকেই সংগীতের নির্মাণ, তাই এখানকার সুফিসংগীতের অর্ধাংশ এই মিশ্রিত দার্শনিক ভিত্তির উপর নির্মিত।

 

১০. সময় ও সমাজের সঙ্গে অভিযোজন:  সুফি সংগীত একটি স্থির ঐতিহ্য নয়। এটি সদা পরিবর্তনশীল। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে নতুন ভাষা, নতুন বাদ্যযন্ত্র (গিটার, কিবোর্ড, ফিউশন ইত্যাদি), নতুন কাব্যরীতি এবং নতুন পরিবেশনা-পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে এটি বিকশিত হয়েছে। তবে সুফিতত্ত্বের মৌলিক আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যকে অপরিবর্তিত রেখে। সুফিদের মজলিস ও খানেকাহ’র গন্ডি পেরিয়ে সুফি সংগীত বর্তমানে নিও-ক্লাসিক্যাল, ইলেকট্রনিক, ফিউশন এবং বলিউডের মতো মূলধারার বৈশ্বিক ধারার অংশে পরিণত হয়েছে। আঞ্চলিক লোকজ ঐতিহ্যের ও সমসাময়িক নান্দনিকতার সংমিশ্রণে ঐতিহ্যবাহী সুফি সংগীতসমূহ নিয়মিতই আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। ভারতীয় উপমহাদেশের জনপ্রিয় সংগীত ধারা কাওয়ালি নিয়ে Dr. Kalpna Rajput মন্তব্য করেন, “Qawwali has successfully infiltrated contemporary music scenes, bridging cultural and linguistic divides. Today it is established more widely not just in Sufi shrines of India and Pakistan, but also as part of world music on the global stage.”[13]

আধুনিককালে কাওয়ালি ধারার সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী হলো- নুসরাত ফতেহ আলী খান। খানের অবদান ও কার্যক্রমকে পর্যালোচনা করতে গিয়ে সাংবাদিক বশির এফ. লিখেন, “Nusrat Fateh Ali Khan’s collaborations have not only expanded the reach of Qawwali but also redefined its role in global music, making it a tool for spiritual and artistic dialogue”.[14]

খানকে নিয়ে করা এই মন্তব্যে‌ একটি বিষয় পরিষ্কার যে, পূর্বে যেমন স্থান-কাল-পাত্রের উর্ধ্বে উঠে সুফি সংগীত যেভাবে সব ধারাকে আত্মীকরণ করে নিজ গতিপথ অধিকতর সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত করতে পারত, এই সিলসিলা আধুনিক কালেও চলমান।

অভিযোজন ক্ষমতার পাশাপাশি সুফি সংগীত সব ঘরানার মানুষকেই এক ও অভিন্ন সংস্কৃতির অংশ অনুভব করাতে সক্ষম। সুফি সংগীত পরিবেশনের সময় বা শোনার সময় শিল্পী ও দর্শক উভয়েই একটি আধ্যাত্মিক যাত্রার অনুভব করতে পারেন এবং সংগীতের মধ্য দিয়ে উভয়ে একসাথে নানা আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। কাওয়ালিতে এর প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নাদিম আসলাম লিখেন, “The power of Qawwall lies not just in its performance but in its ability to draw the listener into a state of collective emotional and spiritual communion.”[15]

 

১১. লোকায়ত সুর ও বাদ্যযন্ত্রের আত্মীকরণ: উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সংগীতের জটিলতা (রাগ তাল ও কাঠামো) বর্জন করে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ সুর, তাল ও যন্ত্র (একতারা, দোতারা, খমক, ঢোল, গাবুরা) ব্যবহার করে সুফি সংগীত পরিবেশিত হয়। এর সবচেয়ে উজ্জ্বলতম উদাহরণ হলো- পূর্বে বর্ণিত গোয়ালিয়রের পীর শেখ মুহাম্মদ গাউস ও রাজা মানসিংহের মধ্যকার ঘটনা। হারমোনিয়ামের মতো ইউরোপীয় জন্যপ্রিয় বাদ্যযন্ত্রকেও আত্মীকরণ করে সুফি সংগীত তার নিজের অংশ করে নিতে সক্ষম হয়েছে। হারমোনিয়াম সর্বপ্রথম ইউরোপের প্যারিসে ১৮৪২ সালে আলেকজান্ডার ডেবিয়ান আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বাদ্যযন্ত্রটি সুফিদের সংগীত-সাধনার অনুষঙ্গ হয়ে উঠলে সুফি ও ব্যবসায়ীদের বরাতে ভারতে এর অনুপ্রবেশ ঘটে। বর্তমানে বাদ্যযন্ত্রটি রাগসঙ্গীত, গজল, কাওয়ালি, সেমি-ক্লাসিক্যাল ঘরানার সঙ্গীত ও লোকগানের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। এভাবে আরো রয়েছে সান্তুর (Santor), পারস্যের প্রাচীন লোকবাদ্যযন্ত্র। ঐতিহাসিকগণ মনে করেন, এটি প্রাথমিক যুগের পারস্য সুফি অথবা বণিকদের দ্বারা ভারতে এসেছে। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থগুলিতেও সান্তুরের প্রায় একই ধরনের বীণা-শৈলীর একটি বাদ্যযন্ত্রকে শততন্ত্রী বীণা (শত-তারের বাদ্যযন্ত্র) উল্লেখ রয়েছে। সেই সময়ে বীণা শব্দটি সমস্ত তারের বাদ্যযন্ত্রের জন্য ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী সময় থেকে বিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত এটি কাশ্মীরের লোকসংগীত ও সুফিসংগীতের একক অনুষঙ্গ ছিল।[16]

জালালুদ্দিন রুমির মসনবিতে ব্যবহৃত ‘নেই বাঁশি (Ney Flute)’। সাড়ে চার হাজার বছরেরও অধিক পুরোনো বাদ্যযন্ত্র, যার ইতিহাস উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার মিশরীয় সভ্যতা হয়ে পশ্চিম এশিয়ার মেসোপটেমিয়া সভ্যতা পর্যন্ত টেকে। এটি কুর্দি, ফার্সি, তুর্কি, ইহুদি, আরব এবং মিশরীয় সংগীতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মসনভিতে ‘নে’ নিখুঁত মানুষ (ইনসান-ই কামিল)-এর প্রতীকী উপস্থাপনা। বর্তমানে ‘নে’ বাদ্যযন্ত্রটি জালালুদ্দিন রুমির প্রবর্তিত ‘মেভলভি তরিকা’ অনুসারীরা অধিক ব্যবহার করেন। কারণ রুমি নিজেই ‘নে’ বাজাতেন ও ‘নে’ নিয়ে লিখতেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর ইস্তাম্বুলে, অধিকাংশ ‘নে-বাদক’ ছিলেন মেভলেভি দরবেশ। দরবেশরা তাদের শিষ্যদের ‘নে’ বাজানোও শেখাতেন, এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বংশানুক্রমে ‘নে-জেন’দের গড়ে তোলা হয়েছে। এভাবে সুফি সংগীতে ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্রসমূহের তত্ত্ব তালাশ করলে দেখা যাবে, একসময়ের জনপ্রিয় বা লোকায়ত বাদ্যযন্ত্রগুলো কোনো এক পর্যায়ে সুফিদের সংস্পর্শে এসে বর্তমান পর্যন্ত বিবর্তনের পথ যেমন সহজতর করেছে। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে সুফি সংগীতে চর্চা হবার কারণে ধীরে ধীরে একে নিজের একক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নিয়েছে। এই দাবির ভিত্তিকে মজবুত করার জন্য এখনো দীর্ঘ গবেষণা ও অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে।

 

১২. নৃত্য ও ঘূর্ণন: গীত (কন্ঠ সংগীত), বাদ্য (যন্ত্র সংগীত) ও নৃত্য– এ তিনের সমষ্টিতেই সংগীত।[17] ভিন্ন ভিন্ন স্থানে সুফি সংগীতে নৃত্যের ধরণ ভিন্ন ভিন্ন ধরণের। তবে সুফি-নৃত্যের মধ্যে সবচেয়ে অধিক পরিচিত হলো– Sufi whirling বা ঘূর্ণায়মান নৃত্য। এর উৎপত্তি হয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মেভলভি তরিকার প্রবর্তক পারস্য কবি ও সুফি জালালুদ্দিন রুমির হাত ধরে। ফ্রান্স, তুরস্ক, কেনিয়া, ইরান, মিশরসহ বিশ্বের নানা দেশে বিস্তৃত এই তরিকার অনুসারী দরবেশরা নৃত্যটি পরিবেশন করেন। নাচের সময় দরবেশরা সাধারণত একটি লম্বা সাদা গাউন (তেনুরে) পরিধান করেন, যা অহং ত্যাগের প্রতীক। এবং মাথায় একটি লম্বা ফেল্টের টুপি (সিক্কে), এটি পার্থিব জগতের প্রতি তাদের আসক্তির সমাধিফলকের প্রতিনিধিত্ব করে। নাচের আগে দরবেশ একটি কালো আলখাল্লা/খিরকাও পরেন। নাচের পূর্বে এটি খুলে ফেলার অর্থ হলো– সুফি তাঁর অহং ত্যাগ করে সম্পূর্ণরূপে এই আচারে প্রবেশ করার ইচ্ছা প্রকাশ। তাদের অবিরাম ঘূর্ণায়মান নাচ সূর্যের চারপাশে গ্রহের কক্ষপথের সরাসরি অনুকরণ, এটি নৃত্যশিল্পীকে মহাজাগতিক সম্প্রীতির সাথে সংযুক্ত করে। দরবেশদের গতিবিধি খুবই সরল ও লাবণ্যময়। নিজেদের অক্ষের উপর ঘুরতে ঘুরতে, নৃত্যশিল্পীরা পর্যায়ক্রমে ধীর ও দ্রুত ঘূর্ণনের মধ্য দিয়ে এক ভাবসমাধিতে উপনীত হন। প্রতিটি ঘূর্ণনই চলমান প্রার্থনা ও জাগতিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রকাশ। নৃত্যের সময় ডান হাত আকাশের দিকে উঠে স্বর্গীয় শক্তিকে ধারণ করে, এবং বাম হাত নিচে পৃথিবীর দিকে নির্দেশ করে। দরবেশরা ‘নে (Ney)’ নামক বাঁশের বাঁশিরসুরে নৃত্য করেন,‌ এর বিষণ্ণ সুর ঐশ্বরিক শ্বাসের প্রতীক। এছাড়া তাঁরা ‘দফ’, উদ(তন্ত্রী বাদ্যযন্ত্র), কানুন(বীণা)ও তাঁদের সংগীতে ব্যবহার করেন। তুরস্কে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর ১৯২৫ সালে মেভলভি দরবেশদের আস্তানাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে যখন সেগুলো পুনরায় খোলা হয়, তখন ঘূর্ণায়মান নৃত্যটি মূলত শহুরে শিল্প-সংগীতের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।[18]

 

প্রাচীনকাল থেকে উপমহাদেশের হিন্দু অধ্যাত্মবাদেও নৃত্যের প্রচলন পাওয়া যায়।[19] ধারণা করা হয়, উপমহাদেশের যে-সকল সুফি সংগীতে নাচ বা ঘূর্ণন বা শরীর দোলনো হয়, তা সুফি সাধনার সাথে এখানকার স্থানীয় সংস্কৃতির অভিযোজনের ফল। বাংলা অঞ্চলের মুর্শিদি, মারফতি, বাউল ও মাইজভাণ্ডারী ধারায় সংগীতে সরাসরি নৃত্য পরিবেশন করা না হলেও একস্থানে নিজেকে স্থির রেখে শরীর দোলানোর প্রচলন রয়েছে। নৃত্যকে মেটাফোর হিসেবে ব্যবহার করে সুফি সাহিত্য ও সংগীতে এর ব্যাপক প্রচলন লক্ষ করা যায়। যেমন জালালুদ্দিন রুমির মসনবিতে রয়েছে–

در هوای عشق حق رقصان شوند

 همچو قرص بدر بی نقصان شوند

 جسمشان رقصان و جان ها خود مپرس

 از آنها خود مپرس وانکه گرد جان

In the air of Divine Love they begin to dance Like the full moon’s orb flawless in trance Their bodies in dance, their souls – beyond words; And all that surrounds them, they too, beyond words (Mathnawi 1:1347-1348)[20]

এখানে নৃত্য আক্ষরিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। বরং মানবাত্মা যখন পরম সত্তার প্রেমে পূর্ণ হয়, তখন তাঁর সমগ্র অস্তিত্ব এক আনন্দময় স্পন্দনে জেগে ওঠে। সেই অন্তর্গত উচ্ছ্বাসই নৃত্যের রূপক। সুফি পরিভাষায় এটি ওয়াজ্দ বা হাল। আর পূর্ণিমার চাঁদ এখানে অন্তরাত্মার পূর্ণতার প্রতীক। পরম সত্তার প্রেম মানুষের অহংকার, লোভ ও সংকীর্ণতাকে দূর করে। ফলে তার চরিত্র ও আত্মা এমনভাবে পরিশুদ্ধ হয় যে তা পূর্ণিমার চাঁদের মতো নির্মল ও দীপ্তিমান হয়ে ওঠে। বাইরের মানুষ কেবল শরীরের নাচ দেখতে পায়। কিন্তু অন্তরে যে প্রেম, আনন্দ, পরম সত্যের আবিষ্কার ও আত্মবিলয়ের অভিজ্ঞতা ঘটছে, তা ভাষার সীমা অতিক্রম করে। তাই রুমি বলেন, “তাদের আত্মার কথা জিজ্ঞেস কোরো না।” একজন আরিফ (পরম সত্যের জ্ঞানপ্রাপ্ত ব্যক্তি)-এর অভিজ্ঞতা কেবল যুক্তি বা বর্ণনার মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায় না। তা উপলব্ধির বিষয়, স্বাদ গ্রহণের বিষয় (জ্বাওক/ذوق)। যে নিজে সেই প্রেমের পথে হাঁটেনি, সে কেবল শব্দ শুনতে পারে, কিন্তু সেকথার মর্ম ও গূঢ়-অর্থ অনুভব করতে পারে না।

 

উল্লেখিত বৈশিষ্টসমূহ সুফি সংগীতকে অন্যান্য ধর্মীয় বা লোকসংগীতধারা থেকে একক ও স্বতন্ত্র পরিচয় প্রদান করেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সমাজে এর স্বকীয়তা ও প্রভাবে সামাজিক সংহতি, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও আধ্যাত্মিক গভীরতা বজায় রেখেছে। সুফি সংগীতের বৈশিষ্ট্য উদ্ধার ও বোঝাপড়ার যাত্রা এখানে শেষ নয়, এখনো প্রতিটি স্তরে স্তরে গভীর অনুসন্ধানের সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। পূর্বে সুফি সংগীত বিকাশের সিলসিলার আলোচনা দেখানোর চেষ্টা করেছি, সুফি সংগীত কিভাবে ইনসাফের বিধান হিসেবে ইসলামের প্রচারে, সমাজে বৈষম্যর দূরীকরণে, ইনসাফ ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় একটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। আধুনিককালে সুফি সংগীত বৈশ্বিক সংস্কৃতি (Global Culture)-র অংশ হয়ে উঠেছে। সংগীতের নানা ঘরানা ভেদে অজস্র শিল্পীদের মাধ্যমে সুফি সংগীত ওয়ার্ল্ড মিউজিকের মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। আজ এটি রক, ইলেকট্রনিকা, জ্যাজসহ বিভিন্ন ধারার সাথে ফিউশন হয়ে নতুন প্রজন্মের যুবকদের আকৃষ্ট করছে। একদিকে যেমন বাণিজ্যিকীকরণের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, অন্যদিকে এটি সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। নানা গ্লোবাল অর্গানাইজেশন দ্বারা এর স্বীকৃতি, শতাব্দী ধরে চলমান বিভিন্ন গবেষণা ও আধুনিক সময়ে এর জয়জয়কার অবস্থাদি প্রমাণ করে যে, এই ঐতিহ্য এখনো আধুনিক বিশ্বে আধ্যাত্মিকতার ক্ষুধা মেটাতে সক্ষম। উপরোক্ত বৈশিষ্টসমূহ সুফি সংগীতে কেবল একটি সংগীতধারা নয়, বরং মানবাত্মার চিরন্তন যাত্রার সঙ্গী করে তুলেছে। এর মাধ্যমে বিভেদ-বৈষম্য-বেইনসাফির প্রাচীর ভেঙে প্রেম ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম বিশ্বকে আলোকিত ও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি শতাব্দী ধরে এই ধারা আজও বিশ্বব্যাপী শান্তি, সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের প্রতীক হয়ে রয়েছে। এই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্ম পর্যন্ত সিলসিলা জারি রাখা আমাদের সাংস্কৃতিক দায়-দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

 

[1] হাকিম মতিউর রহমান কোরেশী অনূদিত, দেওয়ান-ই-বু আলী শাহ কলন্দর, জিয়া-উল-কুরআন পাবলিকেশন্স, লাহোর, ২০০৪, গজল ক্রমিক ১৪, পৃ- ৪৪।

[2] মনিরুদ্দীন ইউসুফ, রুমীর মসনবী, ঢাকা, ১৯৬৭, পৃ- ১৭-১৮।

[3] Ayesha Khan, Mystical Verses: The Sufi Tradition in South Asian Music. Oxford University Press, 2018, pp- 104.

[4] Regula Burckharot Qureshi, Sufi music of India and Pakistan, The University of Chicago Press, London, 1995, pp-87.

[5] William R. Pinch, Indian Ocean: The Music and Culture of Qawwali, Oxford University press, 2009, p- 132.

[6] Richard M. Dorson, Folklore and Folklife: An Introduction. University of Chicago Press, 1972 pp- 12. Walter J. Ong, Orality and Literacy: The Technologizing of the Word. Routledge, 1982, pp. 33

[7] Dr. Kalpna Rajput, Qawwali as Oral Poetry and Living Folklore, Crossroads Journal, Vol. 01, Issue-01, July 2025. Sub title: Qawwali as Oral Poetry and Folklore.

[8] Abdul Ali, The role of Qawwali: Music as the path of God, Cambridge University press, 2011. Bridgette J. Davis, Ethnomusicology and South Asian Folk Traditions, Routledge, 2018.

[9] Pune Karimi, Exploring Humanistic Values in Persian Sufi Mysticism and Literature, Journal of Dharma, Vol. 49, No. 1 (January-March 2024), pp. 45-62.

[10] ড. এনামুল হক, প্রাগুক্ত, ২০১৫, পৃ- ১২২

[11] ড. এনামুল হক, প্রাগুক্ত, ২০১৫, পৃ- ১২৮-৯

[12] ড. আহমদ শরীফ, প্রাগুক্ত, ২০১১, পৃ- ২৩.

[13] Dr. Kalpna Rajput, Ibid, 2025, p-9.

[14] F. Bachir, Nusrat Fateh Ali Khan: A global Phenomenon, Oxford University press, 2019, p- 56.

[15] Nadim Aslam, The music of the soul qawwali and sufism, Vintage Books, 2017, p-189.

[16] ১৯৫০-এর দশকে কণ্ঠশিল্পী ও দক্ষ বহু-বাদ্যযন্ত্রবাদক উমা দত্ত শর্মা তাঁর তৎকালীন কিশোর পুত্র শিবকুমার শর্মার মাধ্যমে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এই বাদ্যযন্ত্রটির প্রচলন শুরু হয়।

[17] মোবারক হোসেন খান, প্রাগুক্ত, পৃ- ৮।

[18] S. Erincin, “Sufi Dance, Trance, and Psychophysical Performance: Transcultural Elements in Jerzy Grotowski’s Theater.” Dance Chronicle, vol. 44, 2021, pp. 207-222.

[19] বিখ্যাত ভক্তিবাদী সাধক ও ভারতীয় হিন্দু মরমী কবি সন্ত কবীর দাস (১৪৪০- ১৫১৮ খ্রি.) বলেন,

Dance, my heart; dance today with joy.

The strains of love fill the days and nights with music,

And the world is listening to its melodies:

Mad with joy, life dances to the rhythm of this music.

The hills and the sea and the earth dance.

[20] Amir H. Zekrgoo, Metaphors of Music & Dance in Rumi’s Mathnawi, IIUM, Research Article, P-10. মসনভিতে ব্যবহৃত সংগীত ও নৃত্য নিয়ে রূপকগুলো নিয়ে পরিচিতিমূলক একটি পাঠ এটি।