‘২০২৪-২৫ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে সংঘটিত মাজারে হামলা’ বিষয়ে প্রতিবেদন

 

সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবু সাঈদ

পেপারওয়ার্ক: মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম

ফিল্ডওয়ার্ক: আবু হাসান মোহাম্মদ মুখতার

 

ভূমিকা

 

বারো আউলিয়ার দেশ খ্যাত চট্টগ্রাম। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ অঞ্চল। বাংলাদেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় চট্টগ্রাম বিভাগে সুফি ঐতিহ্য এবং মাজার-ভিত্তিক সংস্কৃতির অবস্থান ও চর্চা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। এই বিভাগে (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর) ঐতিহাসিকভাবে অসংখ্য মাজার রয়েছে, যা স্থানীয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট থেকে জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সারাদেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সুযোগ নিয়ে মাজার, দরগাহ সর্বোপরি মাজার সংস্কৃতির উপর ধারাবাহিক ও সঙ্ঘবদ্ধভাবে আক্রমণ পরিচালিত হয়। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১টি মাজারে হামলার খবর পাওয়া গিয়েছে।

ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট থেকে নভেম্বর-২০২৫ পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে প্রতিবেদনটি সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। ব্যবহৃত সকল তথ্যের যথাযথ সূত্র প্রদান করা হয়েছে।

এই প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম বিভাগে মাজারে হামলা সংক্রান্ত যত ঘটনা সংগঠিত হয়েছে প্রায় সকল ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। ঘটনার সার্বিক চিত্র, কারণ, ভিডিও ফুটেজ, প্রশাসন, মাজার কর্তৃপক্ষ, মাজারের সর্বশেষ অবস্থান ইত্যাদি সকল বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

এটি ‘তদন্ত প্রতিবেদন’ নয়। চট্টগ্রাম বিভাগে মাজারে হামলার সার্বিক চিত্র, হামলার শিকার মাজারগুলোর বর্তমান অবস্থা ও বিভিন্ন পরিসংখ্যান হাজির করাই আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য। উদ্দেশ্য হলো, এর মাধ্যমে সরকার, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ব্যাপারে সচেতন করে তোলা। পাশাপাশি, দেশের সরকার, মিডিয়া সর্বোপরি জনসাধারণের নিকট মাজার হামলার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা।

প্রতিবেদনে সংখ্যা, পরিসংখ্যান, শব্দচয়ন ও বানানের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। তবুও আমাদের অজান্তে কোনো ভুল পাঠকের চোখে পড়লে আমাদেরকে জানানোর সাথে সাথে সংশোধনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে।

 

সারাংশ

চট্টগ্রাম বিভাগে ২০২৪-২০২৫ সালে মাজার-সংক্রান্ত হামলা ও সম্পর্কিত ঘটনার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ঐতিহাসিক ৫ আগস্ট থেকে নভেম্বর অবধি চট্টগ্রাম বিভাগে ২৭টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। জেলাভিত্তিক বিবরণে দেখা যায়: কুমিল্লায় ১৭টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২টি, নোয়াখালীতে ৩টি, চট্টগ্রামে ৪টি এবং কক্সবাজারে ১টি- মোট ২৭টি হামলার ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে। পাশপাশি এমন ৪টি খবর পাওয়া গিয়েছে যার মধ্যে ২টি গুজব ও ২টির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, প্রমাণিত ঘটনা ২৭টি এবং অপ্রমাণিত ও গুজব ২টি, মোট ৩১টি।

হামলাগুলোর প্রধান কারণ ধর্মীয় মতাদর্শগত বিরোধ (যেমন: মাজারকে ‘শিরক-বিদআত’ আখ্যা দিয়ে হামলার পটভূমি তৈরি ও বৈধতা উৎপাদন), রাজনৈতিক প্রতিহিংসা (যেমন: আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্টতা), সামাজিক অসন্তোষ (যেমন: মাদক সেবন বা অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগ) এবং জমি-সংক্রান্ত বিরোধ। উদাহরণস্বরূপ, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর ঘটনাগুলোতে ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানারে সংগঠিত হামলায় ওরস, মেলা বা সুফি সমাজের অনুষ্ঠানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে, যাকে স্থানীয় যুবকদের চারিত্রিক স্থলনের কারণ হিসেবে অভিযোগের মাধ্যমে ন্যায্যতা দেয়া হয়েছে। প্রভাবের দিক থেকে, মাজারগুলোর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান (ওরস, মেলা, মিলাদ) অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ, এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে হামলাকারীরা বহিরাগত (যেমন: চরমোনাইপন্থী বা কওমী মাদ্রাসার ছাত্র)। এছাড়া, প্রশাসনিক নিস্ক্রিয়তা স্পষ্ট: বেশিরভাগ ঘটনায় (২৫টির বেশি) কোনো মামলা, গ্রেফতার বা তদন্তের অগ্রগতি নেই, যা হামলাকারীদেরকে উৎসাহিত করেছে। কেবল ৩টি ক্ষেত্রে (যেমন: হোমনায় চার মাজারের হামলা, সীতাকুণ্ডে খাজা কালুশাহ মাজার এবং নোয়াখালীতে শাহসূফী আইয়ুব আলী মাজার) প্রশাসন সক্রিয়তা প্রদর্শন করেছে, যেখানে মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

হামলার পর অদ্যাবধি অন্তত ১২টি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। অন্তত ১৫টি মাজারের বাৎসরিক উরসের আয়োজন বন্ধ রয়েছে। এ-সকল হামলায় নারীসহ অন্তত ৩১জন আহত হয়েছে।

 

পরিসংখ্যান

সারাদেশে যত মাজারে হামলার সকল ঘটনা ঘটেছে (কম-বেশি ১৫০টি) তন্মধ্যে এক পঞ্চমাংশ (২০%) ঘটেছে চট্টগ্রামে। বিভাগের সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায়, ৫২%। প্রধান কারণসমূহ: ধর্মীয় অভিযোগ (বিদআত-শিরক, ৫৫%), স্থানীয় বিরোধ (মাদক-জমি, ৩০%) এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা (১৫%)। হামলাকারী হিসেবে ‘তৌহিদী জনতা’র নেতৃত্বই প্রধান (৭৫%)। হামলার ঘটনায় প্রশাসনের সক্রিয়তা ১০%; নিষ্ক্রিয়তা ৯০%।

 

আক্রান্ত মাজারসমূহের তালিকা

নিম্নে চট্টগ্রাম বিভাগে হামলার শিকার মাজারসমূহের তালিকা প্রদান করা হয়েছে। তালিকাটি দু’টি ছকে বিভক্ত। ১ম ছকে যে-সকল মাজারে হামলার ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করা সম্ভব হয়েছে এবং ২য় ছকে সে-সকল মাজার যেগুলোতে হামলার অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে, হুমকি প্রদান করা হয়েছে, হামলার ব্যর্থ চেষ্টা ও হামলার গুজবের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।

 

সংখ্যা মাজারের নাম সময় স্থান ক্ষয়ক্ষতি ও মন্তব্য
মালেক শাহ দরবার ৫ আগস্ট, ২০২৪ লাকসাম, কুমিল্লা। হামলার পর মাজারের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
আশরাফনগর দরবার শরীফ ৫ই‌ আগস্ট, ২০২৪ কুমিল্লার লাকসামে হামলার পর মাজার কর্তৃপক্ষকে হুমকি প্রদান।
সামছু পাগলার মাজার/ শামসুল হক শাহ মাজার ৬ই ও ৭ই আগস্ট ২০২৪। দুই দফায়। ভবনাথপুর, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া দুই দফায় হামলা ও কমপক্ষে একজন গুরুতর আহত।
শাহাজাহান পাগলার মাজার ১৬ই আগস্ট ২০২৪ কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার পৈইয়াবাড়িতে অবৈধ জমি দখলের অভিযোগে হামলা।
পীর গোলাম মহিন উদ্দিন ওরফে টিপুর আস্তানা। ০৯ ই সেপ্টেম্বর ২০২৪, সোমবার ফজরের নামাজের পর কয়েকশ লোক। কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলা হেসাখাল ইউনিয়ন, হিয়াজোড়া গ্রামে। কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার একদিনে ৮টি মাজার হামলা। সবগুলোর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
সুবেদার আব্দুর রহিম হিয়াজুড়ী মাজার
সৈয়দ আবুল কাশেম মাইজভাণ্ডারী হিয়াজুড়ী মাজার
সৈয়দ নিজাম উদ্দিন হিয়াজুড়ী মাজার
ফকির আব্দুল জলিল হিয়াজুড়ি মাজার
১০ সৈয়দ আব্দুল গনি শাহ হিয়াজুড়ির মাজার
১১ রৌশন শাহ মাজার ০৯ ই সেপ্টেম্বর ২০২৪, সোমবার ফজরের নামাজের পর কয়েকশ লোক। কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলা হেসাখাল ইউনিয়ন,  তেতিপাড়া গ্রামে

 

১২ প্যাটেন শাহর মাজার কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলা মৌকরা ইউনিয়নের,  ফতেপুর গ্রামে
১৩ কেরানী সাহেবের মাজার ১০ ই সেপ্টেম্বর ২০২৪/ মঙ্গলবার কুমিল্লায় নাঙ্গলকোট উপজেলার মাজারের সকল কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
১৪ চাড়ু মিজি শাহর মাজার শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর), ২০২৪,  সকাল ৯টায় নোয়াখালী পৌরসভার লক্ষ্মীনারায়ণপুর দরগাহ বাড়িতে ২০০ বছরের পুরোনো মাজার। সেক্রেটারীর ছেলে কর্তৃক হামলা।
১৫ শাহান শাহ রাহাত আলি শাহ শনিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪, বিকালে ছয়ফুল্লাকান্দি, বাঞ্ছারামপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। মাজার কর্তৃপক্ষ নিজেরাই পাহারা দিয়ে কার্যক্রম চালু রেখেছেন।
১৬ বোবা শাহের মাজার রাতে (২৮ নভেম্বর, ২০২৪ কুমিল্লার দেবিদ্বারের বরুড় গ্রামে অবস্থিত আস্তানায় মাহফিল চলাকালে তৌহিদি জনতার হামলা, ১ জন আহত।
১৭ হযরত রহম আলী শাহ (র.) এর মাজার বৃহস্প্রতিবার (৯ জানুয়ারী, ২০২৫ ) আনুমানিক দুপুর ২ টার সময় পশ্চিম ফরহাদাবাদ জব্বারহাট বাজারস্ত, হাটহাজারী থানা, চট্টগ্রাম মাজারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
১৮ ঘাসিপুর দরবার শরিফ, মধু দরবেশের মাজার সোমবার, (১৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২৫ বিকেল ৩টায়) চাটখিল, নোয়াখালী। ১০ জন আহত
১৯ সৈয়দ মুহাম্মদ শায়ের মুহাম্মদ শাহ আল কাদেরী আল চিশতীর মাজার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ রাতে

 

পেকুয়া, কক্সবাজার

 

২০ জন আহত।
২০ শাহসূফী আইয়ুব আলী দরবেশের মাজার বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটার দিকে (২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫), ওরশ চলাকালীন। নোয়াখালী সদর উপজেলার কালাদরাফ ইউনিয়নে মুন্সির তালুক গ্রামে হামলা করে মাজার সম্পূর্ণ গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
২১ হযরত খাজা কালুশাহ (রহ:) মাজার ও মাদরাসা ৭ এপ্রিল ২০২৫ দুপুরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি। কমিটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব।
২২ কফিল উদ্দিন শাহ ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সকালে

 

 

 

 

 

কুমিল্লা জেলার হোমনা উপজেলার আসাদপুর গ্রামে কুমিল্লায় একসাথে চারটি মাজার হামলা।
২৩ কালাই শাহ (কালু শাহ)
২৪ আবদু শাহ
২৫ হাওয়ালী শাহ

 

হামলার অভিযোগ/চেষ্টা/গুজব এমন ঘটনার তালিকা
সংখ্যা মাজারের নাম সময় স্থান ক্ষয়ক্ষতি ও মন্তব্য
২৬ বারো আউলিয়ার মাজার সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৪ সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রাম স্রেফ অভিযোগ, তথ্য নেই।
২৭ নানা শাহ্ মাজার শরীফ ৫ই এপ্রিল ২০২৫

 

তেলিনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্রেফ অভিযোগ, তথ্য নেই।

 

২৮ শাহ মনোহর (ক.) মাজার শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫) হাটহাজারী, চট্টগ্রাম হামলার চেষ্টা কিন্তু ব্যর্থ।

 

২৯ হজরত সোলায়মান শাহর মাজার ৩০ই জুলাই ২০২৫ চাঁদপুর জেলার উত্তর উপজেলার বেলতলী এলাকার প্রোপাগান্ডা ও গুজব।
৩০ হযরত শাহ বদিউজ্জামান মুন্সী (রহ.) এর মাজার ১০ই আগস্ট, ২০২৪, রাতে বোয়ালখালী কধুরখীল ইউনিয়নের ৮টি কোরআন শরীফ পুড়ে যায়। হামলা নিশ্চিত নয়।
৩১ হযরত লাল শাহ বাবা (রহ.)

 

 

 

২০ নভেম্বর ২০২৫ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় অবস্থিত ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে ৬ লেনে উন্নীত করার প্রকল্পের অধীনে জমি অধিগ্রহণ।

 

 

 

চট্টগ্রাম বিভাগে সংঘঠিত প্রমাণিত ২৭টি ঘটনার জেলাভিত্তিক সংখ্যা:

জেলা সংখ্যা
কুমিল্লা ১৭
চট্টগ্রাম ০৪
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ০২
নোয়াখালী ০৩
কক্সবাজার ০১
চাঁদপুর ০০
ফেনী ০০
লক্ষ্মীপুর ০০
রাঙ্গামাটি ০০
খাগড়াছড়ি ০০
বান্দরবান ০০

 

বিস্তারিত পুরো প্রতিবেদনটি পড়তে প্রতিবেদনের পিডিএফ লিঙ্ক যুক্ত করা হলো। ডাউনলোড করে পুরো প্রতিবেদনটি দেখতে পারবেন।