হাইকোর্ট মাজার: ঐতিহাসিক বিতর্ক ও আদ্যোপান্ত

ভূমিকা

ঢাকায় মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হাইকোর্ট মাজার। ঐতিহাসিক বয়ানে মাজার নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তা গণমানুষের মনে মাজার সম্পর্কে চিড় ধরাতে পারেনি; বরং হাইকোর্ট মাজারের প্রতি গণমানুষের শ্রদ্ধা ও ভরসা দিনদিনই বেড়েছে। সম্প্রতি মাজারের বাৎসরিক উরস বাধাগ্রস্ত হ‌ওয়ায় মাজারের ব্যাপারে গণমানুষের মাঝে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। এই রচনায় মাজারের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান পরিস্থিতি অবধি আদ্যোপান্ত তুলে ধরতে চেষ্টা করা হয়েছে।

 

খাজা শরফুদ্দিন চিশতী

হাইকোর্ট মাজার কর্তৃপক্ষের দাবি ও জনধারণা অনুযায়ী, হযরত খাজা শরফুদ্দিন চিশতী খাজা মুঈনুদ্দিন চিশতীর মেজো ছেলে। আজমীর থেকে তিনি বাদশাহ আকবরের শাসনকালে বাংলায় আসেন এবং দীর্ঘদিন যাবৎ ইসলাম প্রচার করেন। হিজরী ৯৯৮ সন মোতাবেক খ্রিস্টাব্দ ১৫৮৯ সনে তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পর তাঁকে যেখানে কবরস্থ করা হয়েছে সেটিই বর্তমান হাইকোর্টের মাজার হিসেবে পরিচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, খাজা গরীবে নেওয়াজের তিন পুত্রের মধ্যে মধ্যম পুত্রের কোনো হদিস ভারতে পাওয়া যায়নি। যে কারণে ঢাকার হাইকোর্ট মাজারকে মধ্যম পুত্র শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার হিসেবে বিশ্বাস করেন খাজা গরীবে নেওয়াজের দরবারের খাদেম ও ভক্তবৃন্দ।

 

ঐতিহাসিক বিভ্রাট ও সন্দেহ

এই মাজার শেখ শরফুদ্দিন চিশতীরই কি-না এই বিষয়ে ঐতিহাসিক কিতাবাদিতে মতবিরোধের উপাদান রয়েছে। ঢাকার উপর নির্ভরযোগ্য যে-সকল ইতিহাসের ব‌ইগুলোতে এ প্রসঙ্গে উল্লেখ আছে সেগুলো প্রথমে পড়া যাক।

ঢাকার বিখ্যাত নাগরিক ও পণ্ডিত হেকিম হাবিবুর রহমান ঢাকার মাজার নিয়ে একটি স্বতন্ত্র ব‌ই প্রকাশ করেন। ‘আসুদগানে ঢাকা’ নামক উক্ত ব‌ইতে রয়েছে হাইকোর্ট মাজার প্রসঙ্গ‌ও। তিনি লিখেছেন:

“হজরত চিশতি বেহেস্তি (রহমাতুল্লাহ) এর মাজার- ওয়ার্ড নং ২০

উক্ত মাজারটি বর্তমান ইন্টারমিডিয়েট কলেজ বিল্ডিং এর পূর্ব দিকে জঙ্গলার ভিতর একটি গম্বুজের মধ্যে মাজার অবস্থিত। যখন আসাম ও বাংলায় মিলে আলাদা প্রদেশ হয়ে যায় তখন উক্ত বিল্ডিংটি নির্মিত হয় লেফটেন্যান্ট গভর্নর এর জন্য। কিন্তু তিনি এটি পছন্দ না করায়, এটা প্রাদেশিক কাউন্সিল অধিবেশনাদির জন্য নির্ধারিত হয়। কিছুদিন পর যখন বঙ্গ ভঙ্গ হয়ে যায়, তখন ঢাকাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয় এবং উক্ত বাড়িটি হয় ইন্টারমিডিয়েট কলেজ। উক্ত বিরাট ইমারতটি নির্মাণকালে সরকারের প্রস্তাব ছিল তার গম্বুজটি ভেঙে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু, মরহুম কাজী রফিক উদ্দিন আহম্মদের নেতৃত্বে মুসলমানরা একত্রিত হয়ে এটা না ভাঙার জন্য আন্দোলন করে এবং একে ভাঙা থেকে এই শর্তে রক্ষা করা হলো যে, মুসলমানরা জেয়ারতের জন্য বিশেষ বিশেষ দিনে আসতে পারবেন। কিন্তু উক্ত গম্বুজের মেরামত করার কোনো অধিকার তাদের থাকবে না।
এর পরে সরকারের পক্ষ থেকে গম্বুজটির চারদিকে বৃক্ষ রোপণ করে এমনভাবে বেষ্টন করা হলো যে, এর উপর সূর্যের আলো পর্যন্ত যেন পড়তে না পারে এবং বৃষ্টির পানি জমে যেন গম্বুজটি নিজে নিজেই ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় যে, এতসব করার পরও আজো মাজারটি ঐভাবেই বিদ্যমান রয়েছে।
পক্ষান্তরে যে উদ্দেশ্যে উক্ত বিল্ডিংটি নির্মাণ করা হয়েছিল তাতে একদিনের জন্যও কেউ এখানে এসে স্থায়ীভাবে থাকতে পারেনি, এমনকি কাউন্সিল হাউজও প্রাদেশিকতার কারণে এটা বাদ হয়ে গেল। ইন্টারমিডিয়েট এডুকেশন বোর্ড হলেও এটা স্থানান্তরিত হয়। তারপর কলেজের জায়গায় সৈন্যদের জন্য হাসপাতাল হলো। এখন শুনা যায় এটা নাকি মেডিকেল কলেজ হবে।
পূর্বে এ মহল্লাটি চিশতিয়া মহল্লা নামে পরিচিত ছিল। তখন এখানে মুসলমানদের খুব ঘনবসতি ছিল। পরে নয়া রমনা গড়ে উঠলে উক্ত মহল্লাটি এবং তার পাশের আরো কয়েকটি মহল্লা যথা শাহজাদপুর ইত্যাদিকে উচ্ছেদ করে দেয়া হয়। তথাপি হাজী শাহ কাদের মসজিদের আশপাশে মুষ্টিমেয় কয়েকটি মুসলমানের ঘর রয়ে যায়। প্রায় ৬০ বছর আগে এ মাজারটিকে ঢাকার বিখ্যাত জমিদার মহিনী বাবু সংস্কার করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে এটা বিনা তত্ত্বাবধানে পড়ে রয়েছে। এখানে সমাহিত বুজুর্গগণের সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। কিন্তু আমার মনে হয় তিনি নবাব আলাউদ্দিন ইসলাম খান চিশতিরই নিকটতম বা তার সমসাময়িক ছিলেন। কারণ সে আমলে গম্বুজের প্রচলন ছিল বাংলোর ন্যায়। তাছাড়া এটাই ছিল দালান তৈরির প্রাচীন পদ্ধতি।” [1]

 

বিখ্যাত গবেষক সৈয়দ মুহাম্মদ তৈফুর লিখেছেন:

Bagh-e-Padshahi

The writer is of opinion that the whole of Bagh-e-Pad-shahi embraced the South-Eastern part of the Ramna race-course, where now the High Court building and the arbori-cultural garden stand. Till 1903 the writer saw the ruins of a massive gateway nearabout this place which was per-haps the gateway of the Bagh-e-Padshahi. It was demo-lished in course of construction work of the E. B, & Assam’s new capital in Dhaka in 1904-5. The South-West part of the race course was called “Chishtia” where some members of the Chishtia family used to reside and were buried. This area was afterwards known as Purana-Nakhkhas (old slave market). Later on, this place was turned into a public buriel ground of the city and remained so for pretty long years. The whole of these areas fell under Mouza Shujatpur named after Shujat Khan Chishti. Shujat Khan Chishti was the brother of Islam Khan. He also died in Dhaka and was buried somewhere in the “Chishtia”… In course of construction of the new capital innumerable old buildings, mausoleums, tombs and other relics spread over this area were demolished inspite of strong protest by the public of this city. Only a few tombs escaped demolition owing to the personal influence of Nawab Sir Salimullah Bahadur. Earlier the Mosques, and Chishtia buil-dings were also ruthlessly destroyed in 1825 by one Mr. Dawes the then Collector of Dhaka who laidout the extensive field of the present Ramna Race-course.
In Jahangir’s autobiography we find that the emperor raised a mausoleum in Fatehpur-Sikri over the tomb of Islam Khan Chishti. But the author of Baharistan who was all along an eye-witness, informs us that Islam Khan’s body was carried from Bhawal and was buried in the Bagh-e-Padshahi of Jahangirnagar. It is possible however, that Hoshung son of Islam Khan who visited Emperor Jahangir soon after his father’s death, dug out the body and carried it to Fatehpur. The writer is therefore of opinion that the po-pularly known mausoleum of “Chishti-Beheshti” which stands in front of the eastern part of the High Court building, is originally the mausoleum of Islam Khan Chishti. He is deser-vedly designated as “Chishti-Beheshti” by the people on account of the fact that he was the grandson of the distinguished Chishtia leader Sheikh Salim Chishti and as such his place was in paradise. The flat and vaulted roof of the mausoleum indicate the type of buildings in Islam Khan’s time. The same type of building of Islam Khans time exists in Tan-tibazar-Islampur of Dhaka.
The writer is amused to notice that this mausoleum has within recent years been reconstructed and renovated by a clever man inorder to work out his scheme of. ‘Head you loose tail you gain’ by exploiting both the winning and the loosing party of the High Court. He has invested quite a lot of money for the benefit of his credulous clientale. The writer of this note visited the mausoleum in 1943 when it was in ruins. It had arched opening on all sides but was caught up by banian and other stray trees and the central slab of the tomb was seen broken in two parts. At present the empty tomb is completely reconstructed in a novel way and is drapped by a cloth covering. Now the following strange writings appear on a signboard at the facade of the building :- دربار—شاہ خواجہ شرف الدین عرف خواجہ چشتی شاہ بابا ولی بنگالہ

The Government should declare the building as a Protected Monument, otherwise the care-takers would lay claims on it on the ground of heredity as is usually done in such cases.”[2]

 

প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহাসিক ডক্টর আহমদ হাসান দানি তাঁর বিখ্যাত DACCA ব‌ইতে লিখেছেন:

“The famous Bagh-i-Badshahi, which included mahalla Chishtian, was most probably founded by the first Mughal governor of Dacca, Islam Khan Chishti himself. It is in this mahalla that the first resting place of Islam Khan, modern dargah of Chishti Behishti (meaning heavenly Chishti), in the present High Court compound, is situated.”[3]

 

হেকিম হাবিবুর রহমান, সৈয়দ তৈফুর এবং আহমদ হাসান দানি— কেউই বলেননি যে, হাইকোর্টের মাজার শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার নয়। হেকিম হাবিবুর রহমান বলেছেন, এখানে শায়িত বুজুর্গদের ব্যাপারে তিনি জানেন না। তিনি ধারণা করেন, শায়িত থাকা বুজুর্গ ইসলাম খান চিশতীর নিকটতম বা সমসাময়িক ছিলেন। তিনি কীভাবে বা কেন এই ধারণা করলেন? মাজারের উপর গম্বুজ ও মাজারের স্থাপত্যশিল্প দেখে। তাঁর এই ধারণাকে অগ্রাহ্য করা যায় এই যুক্তিতে, যে, শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর ইন্তেকালের পর ইসলাম খান চিশতীর তত্ত্বাবধানে বা তার সময়কালে এই স্থাপত্য নির্মিত হতে পারে। ইসলাম খানের সময়ে স্থাপত্য নির্মাণ করা মানে এই নয় যে, সেখানে শায়িত বুজুর্গের ইন্তেকাল ইসলাম খানের সময়ে হয়েছে। বাংলাদেশের বহু বিখ্যাত সুফি সাধক রয়েছেন যাদের ইন্তেকালের এক/কয়েক শতাব্দী পর তাঁদের মাজারকেন্দ্রিক স্থাপত্য তৈরি হয়েছে। ফলে, হেকিম হাবিবুর রহমানের এই অনুমানকে স্বতঃসিদ্ধ বা পাথুরে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

হাইকোর্ট মাজার এলাকাকে বলা হতো বাগ-এ বাদশাহী। সৈয়দ তৈফুর মূলত বাগ-এ বাদশাহীর ইতিহাস লিখেছেন। ইতিহাস লিখতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ১৯০৫ সালে আসাম-বাংলা নতুন বিভাগ হবার পর রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে নবরূপে সজ্জিত করতে ব্রিটিশ সরকার যখন ঢাকার বিভিন্ন স্মৃতিসৌধ, কবরস্থান ভেঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছিলো তখন নবাব সলিমুল্লাহর ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে বাগ-এ বাদশাহীর কিছু কবর ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়‌। প্রশ্ন হলো, কেন নবাব সলিমুল্লাহ বাগ-এ বাদশাহীর কিছু কবরকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন? যদি বিশেষ কোনো বুজুর্গের মাজার নাই থাকে তাহলে এই হস্তক্ষেপের যথাযথ কারণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

 

সৈয়দ তৈফুর লিখেছেন, ১৯৪৩ সালে বাগ-এ বাদশাহীতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন, ভগ্নপ্রায় অবস্থা; গম্বুজের দু’দিকে ভাঙা ও স্থাপত্য নড়বড়ে। যখন তিনি ব‌ইটি লিখছিলেন, ১৯৫০ সালের পর, তখনকার অবস্থা বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন: “At present the empty tomb is completely reconstructed in a novel way and is drapped by a cloth covering. Now the following strange writings appear on a signboard at the facade of the building : دربار—شاہ خواجہ شرف الدین عرف خواجہ چشتی شاہ بابا ولی بنگالہ
বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় : “এখন এই শূন্য কবরকে ভালোভাবে সংস্কার করা হয়েছে এবং তা গিলাফ দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে এখানে একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে যেখানে লেখা আছে: শাহ্ খাজা শরফুদ্দিন উরফে খাজা চিশতী শাহ বাবা ওলিয়ে বাঙ্গালার দরবার।”

তৈফুর কেন এই মাজারটিকে ‘শূন্য’ (empty) বলেছেন তার কোনো কারণ তিনি উল্লেখ করেননি। তিনি কি ধরেই নিয়েছিলেন যে, ইসলাম খান চিশতীকে যেখানে অস্থায়ীভাবে কবরস্থ করা হয়েছিল সেই কবরটিই এটি? তিনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন তার কোনো সূত্র তিনি উল্লেখ করেননি বিধায় এটিকে তাঁর ‘অনুমান’ ব্যতীত অন্য কিছু বলা যায় না। এবং ইতিহাসের শিক্ষার্থী মাত্র‌ই জানেন, ইতিহাসের কোনো দাবিকে প্রমাণ করতে ‘অনুমান’ কোনোভাবেই নির্ভরযোগ্য বিষয় নয়।

 

আহমদ হাসান দানি লিখেছেন, বাগ-এ বাদশাহীতে প্রথমত ইসলাম খানকে কবরস্থ করা হয়েছিল, যা বর্তমানে চিশতী বেহেশতীর দরগাহ হিসেবে পরিচিত। দানির লেখায় ধোঁয়াশা নেই; বাগ-এ বাদশাহীর পরিচিতির ব্যাপারে তিনি স্পষ্ট এবং সঠিক। পাকিস্তান আমলের শুরু থেকে বাগ-এ বাদশাহী শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার হিসেবে পরিচিত পাবার পূর্বে কয়েক শতাব্দী ব্যাপী ইসলাম খান চিশতীর অস্থায়ী কবরের জন্য‌ই প্রসিদ্ধ ছিল। তিনি চিশতী বেহেশতী মানে শেখ শরফুদ্দিন চিশতীকেই বোঝাচ্ছেন কি-না এ প্রশ্ন তোলেননি আবার এ নিয়ে সন্দেহ‌‌ও পোষণ করেননি।

 

হাইকোর্ট মাজার নিয়ে ঐতিহাসিক বয়ানের যে ধোঁয়াশা তাকে পুঁজি করে মুনতাসীর মামুন হাইকোর্ট মাজারকে শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার হিসেবে অস্বীকার করেছেন। তিনি ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী নামক ব‌ইতে লিখেছেন:

“হাইকোর্টের মাজার

হাইকোর্টের মাজারে যে আসলে কে সমাহিত আছেন তা কেউই জানে না। প্রচলিত ধারণা, এখানে সমাহিত ঢাকা শহরের প্রতিষ্ঠাতা সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতী, যে কারণে মাজারটি পরিচিত ছিল চিশতী বেহেস্তীর মাজার হিসেবে। এ ধারণার উৎস বোধহয় মীর্জা নাথানের রচনা। ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’-তে তিনি লিখেছিলেন, ভাওয়ালে থাকার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন ইসলাম খাঁ। মীর্জা নাথানের ভাষায়, ‘সংজ্ঞাহারা অবস্থায় যে উপযুক্ত ও শক্তিবর্দ্ধক ঔষধ দেয়া দরকার হাকিম তা না দিয়ে বোকার মতো চন্দনের প্রলেপ মালিশ করেন এবং প্রচুর গোলাপজল তাঁর গায়ে ছিটিয়ে দেন এবং এতেই সব শেষ হয়ে যায়।’ ভাওয়াল থেকে তাঁর মরদেহ আড়ম্বরের সংগে নিয়ে আসা হয়েছিলো জাহাঙ্গীরনগর, এবং নাথানের ভাষায়, ‘জাহাঙ্গীরনগরস্থ বাগ-ই শাহী উদ্যানে আনা হয় এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়’।
মাসির-উল-উমারা অনুসারে, ইসলাম খাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো ফতেপুর সিক্রি এবং দাফন করা হয়েছিলো সেখানে। সম্রাট জাহাঙ্গীর সেই সমাধির ওপর নির্মাণ করেছিলেন একটি স্মৃতিসৌধ। দানীর মতে, বাগ-ই-শাহীতে (বর্তমানের পুরনো হাইকোর্ট এলাকা) সাময়িকভাবে রাখা হয়েছিলো তাঁর মরদেহ এবং তারপর দাফনের উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো ফতেপুর সিক্রিতে।
প্রায় একশো বছর আগে হাকিম হাবিবুর দেখেছিলেন, ‘জঙ্গলার ভিতর একটি গম্বুজের মধ্যে মাজার অবস্থিত’।

পুরনো হাইকোর্ট বা লাটভবন নির্মাণের সময় এটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে কাজী রফিক উদ্দিনের নেতৃত্বে স্থানীয় নেতারা এর প্রতিরোধ করেন। এরপর ঢাকার জমিদার মোহিনী মোহন সাহা মাজারটির সংস্কার করে দেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটি পরিত্যক্ত অবস্থায়ই ছিল। হাকিম হাবিবুর লিখেছেন, ‘এখানে সমাহিত বুজর্গগণের সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি। কিন্তু আমার মনে হয় তিনি নবাব আলাউদ্দীন ইসলাম খান চিশতীরই নিকটতম বা না তাঁর সমসাময়িক ছিলেন। কারণ সে আমলে গম্বুজের এবং প্রচলন ছিল বাংলোর ন্যায়।’
সুতরাং এটি নিশ্চিত যে হাইকোর্টের মাজারে ইসলাম ধাঁ শায়িত নন। এখানে কারা সমাহিত তাও কেউ জানে না। খুব সম্ভব মুঘল আমলে, কোন অভিজাতের কবর দেওয়া হয়েছিলো এখানে। কিন্তু চিশতী বেহেশতীর স্মৃতিটি রয়ে গেছে এবং ধর্মপ্রাণরা না জেনেই মাজারটি জিয়ারতও করছেন।”[4]

 

এখানে মুনতাসীর মামুনের কিছু পয়েন্ট স্পষ্ট:

ক. ইসলাম খানের প্রাথমিক কবরস্থানকেই তিনি বাগ-এ বাদশাহীর একমাত্র কবর হিসেবে ধরে নিয়েছেন।
খ. ইসলাম খানের প্রাথমিক কবরকেই বর্তমান হাইকোর্ট মাজারকে চিহ্নিত করেছেন।
গ. ইসলাম খানের প্রাথমিক কবর ধরে নিয়ে এবং হেকিম হাবিবুর রহমানের ‘অনুমান’কে ভিত্তি বানিয়ে তিনি দুইটি মন্তব্য করেছেন: ‘হাইকোর্টের মাজারে যে আসলে কে সমাহিত আছেন তা কেউই জানে না’ এবং ‘ধর্মপ্রাণরা না জেনেই মাজারটি জিয়ারতও করছেন’।

আমরা আগেই বলেছি, হেকিম হাবিবুর রহমানের এই অনুমানকে স্বতঃসিদ্ধ বা পাথুরে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। কিন্তু মুনতাসীর মামুন স্বয়ং ইতিহাস ডিসিপ্লিনের শিক্ষক হয়েও একটি অনুমানকে ভিত্তি বানিয়ে ঐতিহাসিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং প্রচার করছেন। ফলত, মামুনের এই সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই অযৌক্তিক এবং অন্যায্য।

যারা হাইকোর্ট মাজারকে ইসলাম খান চিশতীর অস্থায়ী কবর হিসেবে দাবি করেন এবং শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর মাজারকে অস্বীকার করেন তাদের পক্ষে কিছু ঐতিহাসিক ‘অনুমান’ থাকলেও কোনো প্রামাণ্য তথ্য নেই। পাশাপাশি যারা হাইকোর্ট মাজারকে শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার হিসেবে গণ্য করেন তাদের পক্ষেও ঐতিহাসিক কোনো প্রমাণ নেই। ঐতিহাসিকভাবে এটি একটি অপ্রমাণিত ও রহস্যময় বিষয়। ঐতিহাসিকভাবে অপ্রমাণিত হলেও, গত এক শতাব্দী যাবৎ হাইকোর্ট মাজারকে কেন্দ্র করে ঢাকার মুসলমান সমাজের যে জনপরিসর গড়ে উঠেছে, জনগণের যে শ্রদ্ধার এক অনন্য স্থান হিসেবে বিরাজ করছে, যেভাবে ঢাকার অন্যতম ধর্মীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে তাতে স্রেফ ঐতিহাসিক বয়ান ও প্রমাণের অভাবে হাইকোর্ট মাজারকে অগ্রাহ্য ও অশ্রদ্ধা করা মোটেও উচিত হবে না।

 

মাজারের ইতিহাস

মাজারটি ঠিক কত সাল থেকে শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার হিসেবে পরিচিত তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে এটি বলা যায়, ১৯৪৭ সালের পর থেকেই এটি শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেছে। ‘হাইকোর্ট মাজার’ হিসেবেই এটি জনপরিসরে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। কারণ, মাজারটি পুরাতন হাইকোর্ট ভবন সংলগ্নে অবস্থিত।

হাইকোর্ট মাজারটি সর্বপ্রথম মেরামত করেন নবাব সলিমুল্লাহ’র বাবা নবাব খাজা আহসান‌উল্লাহ।[5] এর পূর্বে মাজারটি এত সুন্দর ও আকর্ষণীয় ছিল না। যে কারণে পূর্বে কারো মাজারটি তেমন চোখে পড়তো না।

১৯০৫ সালে বাংলা ও আসাম নতুন প্রদেশ হিসেবে ঘোষণার পর ঢাকার বেশিরভাগ কবরস্থান, স্মৃতিসৌধ ইত্যাদি যখন ইংরেজ সরকার ভেঙ্গে ফেলছিলো তখন নবাব সলিমুল্লাহ’র ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপে এই মাজারটি ভাঙার হাত থেকে রক্ষা পায়।[6] অর্থাৎ, নবাব সলিমুল্লাহ পিতার নির্মিত মাজারটির ব্যাপারে সচেতন ছিলেন।

নবাব আহসানুল্লাহ’র পর ঢাকার বিখ্যাত জমিদার মহিনী বাবু মাজারটি সংস্কার করেছিলেন। কিন্তু তারপর আর কোনো সংস্কার হয়নি। এরপর থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত এই মাজারের রক্ষণাবেক্ষণের ব্যাপারে তেমন কিছুই জানা যায় না। সৈয়দ তৈফুর জানিয়েছেন, ১৯৪৩ সালে যখন তিনি মাজারে গিয়েছিলেন তখন এটি ছিল ভগ্নপ্রায়। তিনি দেখেছিলেন, মাজারের মূল গম্বুজের দু’দিকে ভেঙে গেছে। অর্থাৎ, অনুমান করা যায়, মাজারটি বেশ কয়েক যুগ ধরে জনসাধারণের আড়ালে দুর্দশাগ্রস্ত ছিল।

১৯৪৭ সন থেকে ১৯৬৩ সন পর্যন্ত, জনৈক আবদুল হাইয়ের নেতৃত্বে মাজারের ভক্তবৃন্দের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিকভাবে মাজারটি পরিচালিত হয়। ১৯৬৩ সালে আবদুল হাই মাজার ও সংলগ্ন জায়গাকে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণার জন্য সরকার বরাবর আবেদন করেন। পাকিস্তান সরকার ১৯৬৩ সালে মাজারটি ওয়াকফ সম্পত্তির তালিকাভুক্ত করে এবং আবদুল হাইকে মাজারের মোত‌ওয়াল্লি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।[7] হাইকোর্ট মাজারের আনুষ্ঠানিক পরিচালনা ও কর্তৃপক্ষের ইতিহাস মূলত ১৯৬৩ সাল থেকেই শুরু হয়।

 

ওয়াকফ স্টেট

১৯৬৩ সালে মাজারকে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণার পর ১৯৬৫ সালে ওয়াকফ অর্ডিন্যান্সের ৪৩ ধারা মোতাবেক হাইকোর্ট বরাবর চিঠি পাঠিয়ে জানতে চাওয়া হয় যে, হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারকে মাজারের মোত‌ওয়াল্লি নিযুক্ত করলে তার কোনো আপত্তি আছে কি-না। চিঠির জবাবে হাইকোর্ট থেকে জানানো হয়, মাজারটি ওয়াকফ সম্পত্তি নয়; কারণ এর কোনো ওয়াকফ দলিল নেই এবং মাজারের সরকারি খাস জমি হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে অবস্থিত। যে কারণে এই মাজারের মোত‌ওয়াল্লি নিযুক্তির প্রশ্ন‌ই উঠতে পারে না। মোত‌ওয়াল্লি প্রশ্ন বাতিলের সাথে সাথে হাইকোর্ট থেকে মাজারটিকে ওয়াকফ সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দিতে অনুরোধ করা হয়। অতঃপর ১৯৬৫ সালেই পাকিস্তান ওয়াকফ প্রশাসন হাইকোর্ট মাজারের নাম ওয়াকফ তালিকা থেকে কর্তন করে।[8]

 

মাজার প্রশাসন কমিটি

ওয়াকফ তালিকা থেকে নাম কর্তনের পর হাইকোর্টের পক্ষ থেকে মাজার তত্ত্বাবধানের উদ্দেশ্যে ‘হাইকোর্ট মাযার প্রশাসন কমিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই কমিটির প্রধান হিসেবে বিচারপতি এবং সেক্রেটারী হিসেবে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রারকে পদাধিকার প্রদান করা হয়। ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যে-সকল প্রধান বিচারপতি ও বিচারপতিগণ দায়িত্ব পালন করেছেন তাঁদের তালিকা পেশ করছি।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
প্রধান বিচারপতি বি. এ. সিদ্দিকী
বিচারপতি খন্দকার মোহাম্মদ হাসান
বিচারপতি মোহাম্মদ আছির,
বিচারপতি আবদুস সাত্তার,
বিচারপতি আবুল কাসেম মোহাম্মদ বাকের,
বিচারপতি সেকেন্দার আলী,
বিচারপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস,
বিচারপতি মুজিবুর রহমান খান,
বিচারপতি সালাহ উদ্দিন আহমেদ,
বিচারপতি আবু সাইদ চৌধুরী,
বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম,
বিচারপতি আবদুস সোবহান চৌধুরী,
বিচারপতি আবু মোহাম্মদ আবদুল্লা,
বিচারপতি তাইব উদ্দিন তালুকদার,
বিচারপতি সৈয়দ আবুল বসর মাহমুদ হোসেন,
বিচারপতি মাকসুম উল হাকিম,
বিচারপতি আমিনুল ইসলাম,
বিচারপতি আবদুল হাকিম,
বিচারপতি আবদুল মওদুদ,
বিচারপতি এ. এইচ, খান,
বিচারপতি আবদুল হাই চৌধুরী,
বিচারপতি এ. কে. এম. নুরুল ইসলাম,
বিচারপতি ফজলে হুসেন মোহাম্মদ হাবীবুর রহমান,
বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জাবির,
বিচারপতি এ. এফ. এম. আহসান উদ্দীন চৌধুরী,
বিচারপতি মোহাম্মদ টি. এইচ. খান,
বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন,
বিচারপতি আবুল কাসেম এবং
বিচারপতি জনাব ডঃ এফ. কে. এম. এ. মুনীম।

১৯৬৯ সালে মাযার প্রশাসন কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছিল, যে কমিটির সভাপতি ছিলেন বিচারপতি এ. বি. মাহমুদ হোসেন। তিনি হযরত শাহজালালের সেনাপতি হযরত নাসিরুদ্দিন সিপাহসালারের বংশধর এবং ঢাকার ঐতিহ্যবাহী মশুরিখোলা দরবার শরীফের জামাতা ছিলেন। তিনি ১৯৭৪ সালে চেয়ারম্যান হিসেবে কমিটি থেকে অব্যাহতি নেয়ার প্রাক্কালে মাজার সংলগ্ন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন এবং তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ. বি. মাহমুদ হোসেন মোনাজাত পরিচালনা করেন।[9] ১৯৭৪ সালে নির্মাণকাজ শুরু করা মাজার সংলগ্ন মসজিদটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ১৯৮০ সালে। অতঃপর বিভিন্ন সময়ে সংস্কারের ফলে মসজিদটি বর্তমান রূপ ধারণ করে। অর্থাৎ, হাইকোর্ট মাজারটি সরকারিভাবে মাজার হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বহু পর বর্তমান হাইকোর্ট মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়। বলা যায়, মাজারের উসিলাতেই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের নামাজ, জিকির ও অন্যান্য ধর্মীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে হাইকোর্টে আগত বিচারপ্রার্থী, বিচারপতি, আইনজীবী সর্বোপরি সর্বস্তরের মানুষের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

 

নিয়মিত কার্যক্রম

১৯৬৪ সাল থেকে অদ্যাবধি ‘হাইকোর্ট মাযার প্রশাসন কমিটি’ হাইকোর্টের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মাননীয় প্রধান বিচারপতি, বিচারপতি, সিনিয়র আইনজীবী এবং পদাধিকার বলে হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার কমিটির সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। হাইকোর্টের নিয়ন্ত্রণে থাকায় মাজারের আয় ব্যয় নির্বাহের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব রাখা হয় বাৎসরিক অডিটের মাধ্যমে। ১৯৮৩ সালের মধ্যে মাযার প্রশাসন কমিটির উদ্যোগে নিম্নোক্ত প্রকল্পগুলো চালু হয়েছিলো।

১। বয়স্কদের প্রাথমিক কুরআন শিক্ষা কোর্স
২। বয়স্কদের উচ্চতর কুরআন শিক্ষা কোর্স
৩। সাপ্তাহিক ওয়াজ মাহফিল: ‘কুরআনে হাকিম ও আমাদের জীবন’।
৪। নিয়মিত তফসির মাহফিল
৫। দরসে হাদীস মাহফিল
৬। গুরুত্বপূর্ণ দিবস ও অনুষ্ঠান পালন
৭। খাজা শরফ উদ্দিন চিশতী (রঃ) মাদ্রাসা স্থাপন
৮। দুস্থ ও ছিন্নমূল মানুষের মধ্যে কাপড় বিতরণ
৯। লঙ্গরখানা
১০। পাঠাগার স্থাপন
১১। ইসলামী বই ও সাময়িকী বিতরণ
১২। গরীব ও মেধাবী ছাত্রদের বৃত্তি প্রদান
১৩। ত্রৈমাসিক সাময়িকী ‘সিরাজাম মুনীরা’ প্রকাশ
১৪। কুরআন শরীফ বিতরণ
১৫। কন্যা দায়গ্রস্থদের আর্থিক সাহায্য দান
১৬। আজমীর শরীফ ও অন্যান্য মাযার শরীফে গিলাপ প্রেরণ।

হাইকোর্ট মাজারের লঙ্গরখানা ঢাকা শহরে বিখ্যাত। প্রতিদিন হাজার হাজার অভুক্ত মানুষ এখানে খাবার খেয়ে জীবন ধারণ করেন। কত অসহায় মানুষের আশ্রয়ের কেন্দ্র যে এ মাজার তার হিসাব রাখা সাধ্যের বাইরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক গরীব শিক্ষার্থীরা এই লঙ্গরখানায় খাবার গ্রহণ করে থাকেন। আশেপাশের বহু দুস্থ পরিবারের রিজিকের একমাত্র উসিলা এই মাজার ও লঙ্গরখানা।

লঙ্গরখানা নিয়ে ২০২৪ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় বেসরকারি টেলিভিশন ইটিভিতে।[10] সেখানে লঙ্গরখানায় স্বেচ্ছাশ্রম দেয়া ৫৫ বছর বয়সী সেলিনার কথা তুলে ধরা হয়, যিনি ২৬ বছর ধরে লঙ্গরখানায় স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাচ্ছেন।
লঙ্গরখানায় কর্মরত বাবুর্চি জানান, “সরকারি লোকজন খায়, বেসরকারি লোকজনও খায়। ফকির-মোস্তানরাও খায়। রিক্সাওয়ালা-ঠেলাগাড়িওলারাসহ প্রায় দেড় হাজারের মতো লোক লাইন ধরে খায়।”
তৎকালীন বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান সুপ্রিম কোর্ট মাজার ও মসজিদ প্রশাসন কমিটির সদস্য ছিলেন। লঙ্গরখানার খাবার সম্পর্কে তিনি বলেন, “প্রতিদিন এখানে দু’বেলা খাবার দেওয়া হয় গরু-মুরগীর মাংস দিয়ে। সপ্তাহে দু’দিন ভাত দেওয়া হয় বাকি পাঁচদিন খিচুরি-তেহারি-বিরিয়ানি থাকে।”

রমজান মাসে হাইকোর্ট মাজার প্রাঙ্গণে প্রতিদিন প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের ইফতারের ব্যবস্থা থাকে। হাজার হাজার পথচারী রোজাদার ইফতার করে নিজেদের দেহমন শীতল করেন। ২০২৫ সালে দৈনিক খবরের কাগজ লঙ্গরখানার ইফতার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।[11] প্রতিবেদনে মাজারের অ্যাকাউন্টস অফিসার মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য নেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রতিদিন আনুমানিক ১৫০০ করে এই ৪৫০০০ হাজার মানুষের ইফতারের সব বাজার আমাদের করতে হয়, তা নয়। আমরা সাধারণত সপ্তাহখানেকের বাজার করি শুরুতে। তারপর মানুষের দান, অনুদান, নিয়ত, মানত বাবদ ছোলা, চিনি, চাল ইত্যাদি আসতে থাকে। আমরা তখন শুধু তেল, মসলা, লাকড়ি এসবের ব্যবস্থা করি। অন্য তেমন কিছু আর লাগে না।” অর্থাৎ, লঙ্গরখানার এই ব্যাপক আয়োজনে সাধারণ মানুষ‌ও দান অনুদানের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে থাকেন। লঙ্গরখানাটি যেন আর কেবলই হাইকোর্ট মাজারের নয়, বরং সাধারণ মানুষের‌ও প্রতিষ্ঠান।

 

উপসংহার

ঐতিহাসিক বয়ানের ঘাটতি থাকলেও খাজা গরীবে নেওয়াজের সন্তান হজরত শেখ শরফুদ্দিন চিশতীর মাজার হিসেবেই হাইকোর্ট মাজার জনপরিসরে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। হাইকোর্টের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকায় মাজারটি পাকিস্তান আমল থেকে অদ্যাবধি পরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। মাজারকে কেন্দ্র করে মসজিদের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে মাদ্রাসা, লঙ্গরখানা, কুরআন শিক্ষার কেন্দ্র, পাঠাগার, মাসিক পত্রিকাসহ নানাবিধ প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিনিয়ত উপকৃত হচ্ছে। একসময় যে মাজার ইংরেজ সরকার ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিল, যে মাজারের খোঁজ রাখেনি কেউ, সেই মাজার আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র। হাইকোর্ট মাজার নিছকই ‘মাজার’ নয়, বরং রাজধানী ঢাকায় যদি সত্যিকার অর্থে সাধারণ মানুষের কোনো নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও প্রতিষ্ঠান থেকে থাকে তাহলে হাইকোর্ট মাজার-ই সেই প্রতিষ্ঠান। 

[1] আসুদগানে ঢাকা: হেকিম হাবিবুর রহমান, মাওলানা আবুল কাজমী অনুদিত, ঐতিহ্য, ঢাকা, ২০২১, ৫৭-৮)

[2] GLIMPSES OF OLD DHAKA: Syed Muhammed Taifoor, Dhaka, 1956, 335-7

[3] DACCA: Ahmad Hasan Dani, Cresent Book Centre, Dhaka, 1962, 76

[4] ঢাকা স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী: মুনতাসীর মামুন, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৪, ৩০৮-৯

[5] ন‌ওয়াব আবদুল গনী ও ন‌ওয়াব আহসানুল্লাহ : ড. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ্, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯৮, ৯৬

[6] Taifoor, ibid, 336

[7] হযরত খাজা শরফ উদ্দিন চিশতী (রঃ) : মোঃ গোলাম মোস্তফা মোল্যা, মুবেশাহ প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৯০, ৪৪

[8] পূর্বোক্ত, ৪৪-৫

[9] প্রাগুক্ত, ৫৯

[10] https://www.ekushey-tv.com/capital/1360873111111144216

[11] https://khaborerkagoj.com/special-report/853376