ভূমিকা:
যে কোনো জাতি, গোষ্ঠীর জন্যই সাহিত্য (Text) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাতির ইতিহাস, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং সার্বিক অবস্থানকে শনাক্ত করা যায় সাহিত্যের মাধ্যমে। তদ্রূপ বাংলার সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান ও অন্যতম ঐতিহ্যবাহী জাতি হিসেবে মুসলমান সমাজেরও রয়েছে বৃহৎ কলেবরের সাহিত্য ভাণ্ডার। মানুষের হায়াত অত্যন্ত সীমিত; মানুষের লেখাকে সংরক্ষণ করে রাখা যায় হাজার বছর ধরে। আর এর মাধ্যমেই একটি জাতি, গোষ্ঠী নিজেদের শিকড়কে শক্তিশালী করে।
ঔপনিবেশিক আমলের আগ-পর্যন্ত বাংলার সাহিত্যের একমাত্র রূপ ছিল, পদ্য। ছন্দ যাই ব্যবহার হোক এবং ব্যবহার হোক বা না হোক— পদ্য ছাড়া সাহিত্য চর্চার কোনো অপশন ছিল না। কিন্তু ঔপনিবেশিক আমলে কেবল বাংলায় নয়, পুরো উপমহাদেশে ‘আধুনিকতা’র আগমন, বিশ্বব্যবস্থার রদবদল ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কারণে ‘সাহিত্যের একমাত্র রূপ’ ধারণার দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে। নিশ্চিন্তে বলা যায়, ঔপনিবেশিক আমল এবং বাংলা গদ্যের বয়স প্রায় সমান্তরাল। পদ্যের সঙ্গে যুক্ত হয় গদ্য। ছন্দ ছাড়া, মানুষ যেভাবে স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলে, আলাপ আলোচনা করে সেভাবেই টেক্সট তৈরির মাধ্যমে সাহিত্য চর্চার সূচনা হয়। তিনশ বছরের মধ্যে যেই রূপ এখন সাহিত্য চর্চার প্রধান মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
বাংলা গদ্যের উদ্ভব ও বিকাশে হিন্দু ও ব্রাহ্মণ সাহিত্যিকদের অবদান ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। তুলনায় মুসলমান সমাজে গদ্য চর্চার সূচনা হয় অনেক পরে। মুঘলরাজ পতনের ধাক্কা, ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকল, রাজভাষা হিসেবে ফারসির পরিবর্তে ইংরেজিসহ অন্যান্য কারণ এর প্রেক্ষাপটে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। এতদসত্ত্বেও, ঠিক কবে বাংলার মুসলমান সমাজ ও সাহিত্যিকরা গদ্য চর্চার সূচনা করে তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর কেবল সন নির্ধারণের জন্য নয়, বরং বাংলার মুসলমান সমাজের ঐতিহাসিক গতি প্রকৃতি শনাক্তকরণের জন্যও জরুরী।
ইতিহাসে প্রথম মুসলমান গদ্যকার
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস সম্পর্কিত যে আকর গ্রন্থগুলো বাংলাদেশের পাঠক ও গবেষক সমাজে জনপ্রিয় সেগুলোতে মুসলমান সমাজের প্রথম গদ্য ও গদ্যকার হিসেবে কী উল্লেখ রয়েছে তা জানা জরুরী। এক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবহৃত ও পরিচিত ২টি গ্রন্থের নজির উপস্থাপন করা যায়: ১. মুহম্মদ আবদুল হাই ও সৈয়দ আলী আহসান রচিত বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত এবং ২. অধ্যাপক মাহবুবুল আলম রচিত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস।
বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত গ্রন্থে বলা হয়েছে: “Blumhard’s Catalogue of Bengali Printed Books in the Library of the British Museum থেকে জানা যায়, ‘উচিত শ্রবণ’ ১৮৬০ খ্রীস্টাব্দে ছাপা হয়। এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৬৬। ধর্মীয় বিষয়বস্তু ও গূঢ়তত্ত্ব-বিষয়ক আলোচনায় এ গ্রন্থের ভাষা জটিল ও আড়ষ্ট হয়ে উঠেছে। মশারফ হোসেনের প্রথম বই ‘রত্নবতী’ প্রকাশিত হয় ১৮৬৯ খ্রীস্টাব্দে, তারও বহু আগে ১৮৬০ খ্রীস্টাব্দে ‘উচিত শ্রবণ’ প্রকাশিত হয়েছিল। খোন্দকার শামসুদ্দিন মুহম্মদ সিদ্দিকীই যে প্রথম বাঙালী মুসলমান গদ্য লেখক এ থেকে তা প্রমাণিত হয়। বাংলা গদ্যের বিকাশপথে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝখানে আমরা যেখানে এসে পৌছি সেখানে অবশ্য খোন্দকার শামসুদ্দিনের কোন দান নেই। তবু প্রথম বাঙালী মুসলিম গদ্য লেখক হিসেবে সাহিত্যের ইতিহাসে তার স্থান অবধারিত।”[1]
অধ্যাপক মাহবুবুল আলম লিখেছেন: “মুসলমানদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের গদ্যলেখক হিসেবে খন্দকার শামসুদ্দিন মুহম্মদ সিদ্দিকী (১৮০৮-৭০) উল্লেখযোগ্য। বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগে যে ক্ষেত্রে মুসলমানদের কোন প্রকার অবদানের নিদর্শন মিলে না সে সময়ে তিনি গদ্য ও কাব্য রচনা করেছিলেন। তাঁর ‘ভাবলাভ’ নামে একটি কাব্য প্রকাশিত হয় ১৮৫৩ সালে।”[2]
দুটি গ্রন্থেই প্রথম মুসলমান গদ্যকার হিসেবে শামসুদ্দিন মুহম্মদ সিদ্দিকীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। মুসলমান সমাজের প্রথম গদ্য নিদর্শন হিসেবে আবদুল হাই ও আলী আহসান লিখেছেন ‘উচিত শ্রবণ’ (১৮৬০) এবং মাহবুবুল আলম লিখেছেন ‘ভাবলাব’ (১৮৫৩) নামক গ্রন্থের কথা। কিন্তু, বাস্তবতা কী বলে?
‘মুসলিম বঙ্গের প্রাচীনতম গদ্য রচনা’
অধ্যাপক মুহম্মদ আবূ তালিব পাকিস্তান আমলে, ষাটের দশকে রাজশাহীর কালেক্টরেট ভবন থেকে একটি পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করেন। পাণ্ডুলিপির প্রাথমিক পরিচিতি সম্পর্কে সরাসরি উদ্ধারকারীর জবানেই শোনা যাক:
“সমকালে প্রচলিত কাগজের ১০”× ১১” সাইজের ২৯ পৃষ্ঠার বই। বইখানির কোন নামকরণ করা হয় নি। শুধু ভূমিকায় বলা হয়েছে: “হযরত শাহ মখদুম সাহেবের বাঙ্গালা দেশের জীবনী তোয়ারিখ যাহা সেরেস্তার দপ্তরে ছিল তাহা জরাজীর্ণ হইতে থাকায় তাহা তখন নকল করিবার সময় মাননীয় মৌলবী সৈয়দ এব্রাহিম হোসেন সেরেস্তাদার, মৌলবী সৈয়দ মোরদার হোসেন উকিল সাহেব, সৈয়দ মছিয়তুল্যা সদরে আলা ও মৌলবী আলী আহমদ খা বাহাদুর ডেপুটি কালেক্টর প্রভৃতি সাহেবানের যত্নে ও চেষ্টায় এই কাগজের বাঙ্গালা ভাষায় তরজমা করাইয়া লয়েন এবং অত্র খণ্ড আসল কাগজের সহিত মখদুম সেরেস্তার কাগজাতের সামিল করা গেল, ইতি। সন ১২৪৫ সাল বাঙ্গালা ১১ই আশ্বিন (ভূমিকা, মূল পুথি পৃঃ ১)”। এবং গ্রন্থ শেষে একটি পৃষ্ঠায় আড়াআড়িভাবে গ্রন্থোৎপত্তির কারণ স্বরূপ বলা হয়েছে: দিল্লীর বাদসাহ আওরঙ্গজেবের লস্কর বহর জাহাজ এই নদীপথে যাইবার সময় এই মাজার শরীফ দর্শন ও রসদ সংগ্রহার্থে জাহাজ এই নদীঘাটে ছিল। বাদসাহ লস্করদার মহা সমারোহে মখদুম আস্তানায় জেয়ারৎ ও হাজৎ নেয়াজ উপস্থিত করেন। মজমুন বিবরণ বাদসা সমীপে দাখিল জন্য তলব করিলে সেজরানামা ও তোয়ারিখ আদি দৃষ্টে নিজজ্ঞানে ও জানাশুনা ও দেখা ঘটনাবলী হইতে যথাসাধ্য বৃত্তান্তসমূহের মেস্তফাক (মুক্তাছার?) হজরত শাহ, মখদুম বিবরণী বর্তমান ওয়ারিশানগণের ও খাদেমগণের দস্তখত ও মোহরযুক্ত মতে দাখিল করা গেল; ও অনুরূপ অত্র নকল মখদুম সেরেস্তার সামিল করা গেল। হিঃ ১০৭৬/২২ সোয়াল। দস্তখতকারী হলেন-১ শাহ আলাউদ্দীন, ২ শাহ নঈমুদ্দীন, ৩ আক্কেল, ৪ শাহ জামাল, ৫ শাহ এছমাঈল, ৬ (লেখা অস্পষ্ট), ৭ শাহ কামাল, ৮ শাহ জয়েনউদ্দীন, ৯ শাহ মহীউদ্দীন, ১০ এমামুদ্দীন (?)।
এ থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, মূল কাহিনী ফারসীতে ১০৭৬ হিজরীর ২২শে সওয়াল তারিখে সম্রাট আওরঙ্গজীবের রাজত্বকালে (১৬৫৮-১৭০৭ ঈসায়ীতে) তাঁরই অভিপ্রায়ানুসারে রচিত হয়েছিল। পরে জরাজীর্ণ হয়ে দলিলপত্রাদি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা হওয়ায় দরগাহ্ কমিটির শুভানুধ্যায়ীদের প্রচেষ্টায় বিশেষ করে মৌলবী সৈয়দ ইব্রাহীম হোসেন সেরেস্তাদার প্রমুখের চেষ্টায় এই বাংলা গ্রন্থ-রচনা বা তরজমা সম্ভবপর হয় (১২৪৫ সাল = ১৮৩৮ ঈ.)। বলা বাহুল্য, এটিও মখদুম সেরেস্তায় ‘আসল কাগজাতের সামিল করা’ হয়েছিল।”
অধ্যাপক আবূ তালিবের এই বর্ণনা থেকে পাণ্ডুলিপি সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা পাওয়া গেলেও পাঠকের জন্য তা স্পষ্ট নয়। পাণ্ডুলিপি তৈরির প্রেক্ষাপটটা ইন্টারেস্টিং! ঐতিহাসিক তো বটেই।
পাণ্ডুলিপিতে প্রেক্ষাপট সম্পর্কে যা উল্লেখ করা হয়েছে সেই মোতাবেক, বাদশাহ আলমগীর ওরফে আওরঙ্গজেব ১০৭৬ হিজরী মোতাবেক ১৬৬৫/৬৬ সালে নদীপথে রাজশাহী অতিক্রম করার সময় সঙ্গী সাথীদের নিয়ে হজরত শাহ মখদুম রূপোশের মাজারে আগমন করেন। মাজার পরিদর্শনকালে বাদশাহ মাজারের ইতিহাস ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জানতে চান। অতঃপর মাজারের তৎকালীন খাদেমগণ তাঁদের কাছে থাকা মাজারে শায়িত আউলিয়ায়ে কেয়ামের শাজরানামা ও অন্যান্য ঐতিহাসিক যাবতীয় কাগজপত্র একত্র করে ফারসি ভাষায় একটি কিতাব রচনা করেন। এই কিতাব বাদশাহ’র নিকট উপস্থাপন করা হয়। ফারসি ভাষার মূল কিতাবের কোনো নামকরণ করা হয়নি। বাংলা তরজমার নামকরণ করা হয়েছে এভাবে: “হজরত শাহ্ মখ্দুম সাহেবের বাঙ্গালা দেশীয় জীবনী তোয়ারিক”।
ফারসি থেকে এই গ্রন্থ কে বাংলায় অনুবাদ করেছে তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায় না। এই বিষয়ে সম্পাদক মুহম্মদ আবূ তালিব লিখেছেন: “এই বাংলা তরজমাকারী বা তরজমা-কারিগণের নাম বা কোন পরিচয় এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করা হয় নি। পরিশেষে যে দশজন দস্তখতকারীর নামোল্লেখ করা হয়েছে, তাঁদের কেউ এর রচয়িতা নন; কারণ তাঁরা মূল ফারসী গ্রন্থের বা দলিলের ওয়ারিশান হিসেবে দস্তখতকারী। ভূমিকায় উল্লিখিত ব্যক্তিগণও পৃষ্ঠপোষকমাত্র। অবশ্য ভূমিকায় উল্লিখিত ব্যক্তিদের সকলের পরিচয় সংগ্রহ করা সম্ভবপর হয় নি- শুধু সৈয়দ ইব্রাহীম হোসেন সেরেস্তাদার সাহেবের যৎসামান্য পরিচয় মাত্র পাওয়া গেছে। এই তরজমাকার্যে লেখক হিসেবে তাঁর হাত ছিল কিনা, বলা মুশকিল। তবে এতদাঞ্চলে তাঁর প্রাতত্তি, দানশীলতা ইত্যাদির বহু স্বাক্ষর অবশিষ্ট রয়েছে। তবে আলোচ্য গ্রন্থখানির রচয়িতা যে একজন এবং তিনি মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত, তাতে সন্দেহের অবকাশমাত্র নেই। সম্ভবতঃ দরগাহ্ সংক্রান্ত দলিল হওয়ায় লেখক ব্যক্তিগত নাম প্রচার থেকে বিরত হয়েছেন বা উদ্যোক্তাদেরও সেরূপ কোন ইচ্ছা ছিল না।”
আফসোসের বিষয় হলো, বাংলার মুসলমান সমাজের, সাহিত্যের প্রাচীনতম গদ্য রচনা হিসেবে এটিকে শনাক্ত করা গেলেও গদ্যকারকে শনাক্ত করা যায়নি। বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম গদ্য রচনাকারের পরিচয় না জানতে পারাটা কৌতূহলী পাঠক ও গবেষকদের জন্য দারুণ অতৃপ্তির। যদি পরিচয় শনাক্ত করা যেতো তাহলে হয়তো বাংলার মুসলমান সমাজের, সাহিত্যের আরো একটি দরজা উন্মুক্ত হতো।
ঔপনিবেশিক সরকার ১৭৯৩ সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নীতির মাধ্যমে এদেশে সুলতানী, মুঘল ও অন্যান্য সময়ে মাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, টোল ও অন্যান্য ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে বরাদ্দ দেয়া লাখেরাজ সম্পত্তির তদন্ত, বৈধতা ও অনুমোদনের জন্য আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ভিত্তিতে ১৮৩৭ সালে হজরত শাহ মখদুম রূপোশ ও সংশ্লিষ্ট মাজারের লাখেরাজ সম্পত্তির বিরুদ্ধে সরকার মামলা দায়ের করে। এই মামলার ভিত্তিতে ১৮৩৮ সালের জানুয়ারি মাসে লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। অতঃপর শাহ মখদুম রূপোশ, শাহ নূর ও অন্যান্য আউলিয়ায়ে কেরামের ওয়ারিশগণ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিলে তাঁরা নিজেদের পক্ষে, লাখেরাজ সম্পত্তির বৈধতা প্রমাণ করার লক্ষ্যে, দলিলাদি দাখিল করে। এই দলিলপত্র দাখিল করার লক্ষ্যে যখন ওয়ারিশগণ নিজেদের কাছে থাকা পুরনো কাগজপত্র একত্র করছিলেন তখনই ফারসি ভাষায় রচিত গ্রন্থটি চোখে পড়ে। তাঁরা হেলাফেলা না করে জরুরী ভিত্তিতে ফারসি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে। বাংলা অনুবাদের কপি করা হয় মোট ৩টি— ২টি মাজারের দায়িত্বশীলদের কাছে রাখা হয় এবং বাকি ১টি আদালতে দাখিল করা হয়। রাজশাহী কালেক্টরেট মহাফেজখানার নথিতে উল্লেখ রয়েছে: “হজরত শাহ মখদুম রূপোষ আউলিয়ার ফারসী ভাষায় লিখিত জীবনী তোয়ারিক জরাজীর্ণ অবস্থার দরুন ফারসী গ্রন্থ থেকে বাংলা ভাষায় তিন কিতা জীবন চরিত রচনা করা হইল ও দুই কিতা মখ্দুম সেরেস্তায় দাখিল করা হইল।” (২)
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, আদালতে শাহ মখদুম রূপোশের মাজারের পক্ষ থেকে দায়ের করা আপিল গৃহীত হয় ও লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্তির রায় বাতিল করা হয়। ১৮৪০ সালের ২৮ আগস্ট, দরগাহ’র খাদেম ও বংশধরগণ তাঁদের লাখেরাজ সম্পত্তি ফেরত পান।
পাকিস্তান আমলে ষাটের দশকে এই বাংলা অনুবাদটি আবিষ্কার করেন অধ্যাপক মুহম্মদ আবূ তালিব। তিনি সম্পাদনা করে বইটি প্রকাশ করেন ১৯৬৯ সালে। তাঁর সম্পাদিত বইটির নাম: “হযরত শাহ্ মখ্দুম রূপোশ (রহ্)-এর জীবনেতিহাস”।
বইটির ভূমিকা লিখেছেন ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্। ভূমিকাটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। ভূমিকার উল্লেখযোগ্য অংশ নিম্নরূপ:
“অধ্যাপক আবূ তালিব এম. এ. লিখিত হয্রত শাহ্ মখ্দুম রূপোশ (রহ্)-এর জীবনী অবগত হইয়া আনন্দিত হইয়াছি। ইহা কেবল এক পীরের জীবনী নয়, বরং রাজশাহীর ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের আবিষ্কার। পীর সাহেবের জীবনী মূলে ফারসী ভাষায় লিখিত। কিন্তু তাহার বঙ্গানুবাদ হয় ১২৪৫ সনে। আমাদের জ্ঞানানুসারে বর্তমানে ইহাই মুসলিম বঙ্গের প্রাচীনতম গদ্য রচনা। সুতরাং, ইহাকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি নূতন অধ্যায় বলিতে হয়।”
শহীদুল্লাহ্’র এই বক্তব্য থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট:
১. রাজশাহীর ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের আবিষ্কার।
২. মুসলিম বঙ্গের প্রাচীনতম গদ্য রচনা
৩. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি নূতন অধ্যায়।
বইটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণে শহীদুল্লাহ্’র এই বিবেচনা দিকনির্দেশকের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।
প্রাচীনতম গদ্যের বৈশিষ্ট
মুসলিম বঙ্গের প্রাচীনতম এই গদ্য রচনার গদ্য বৈশিষ্ট্য ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াদি নিয়ে আলাপ করেছেন অধ্যাপক তালিব। দীর্ঘ উদ্ধৃতি কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে জরুরী।
“মুসলিম লেখকদের মধ্যে বর্ধমানের শামসুদ্দীন মুহম্মদ সিদ্দীকী ব্যতীত অন্য কোন গদ্য-লেখকের সাক্ষাৎ ইতঃপূর্বে পাওয়া না যাওয়ায় আমাদের সুধী সমাজের ধারণা হয়েছিল যে, প্রাথমিক বাংলা গদ্য-সাহিত্যে মুসলমান লেখকদের কিছুমাত্র দান নেই। কিন্তু বর্তমান গ্রন্থ আবিষ্কারের ফলে আমাদের সে ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং আজ এ-কথা জোরের সংগেই বলতে পারা যাচ্ছে যে, শুধু হিন্দু লেখকদের দ্বারাই বাংলা গদ্য-সাহিত্যের সৃষ্টি হয় নি-মুসলমান লেখকরাও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।
শুধু কি তাই? মুসলমান লেখকরা একটা নিজস্ব রচনাদর্শও সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ বাংলা সাহিত্যের সেই মুসলমানী ধারা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তাই আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে আজ বাঙালী মুসলমান পশ্চাৎপদ্। একেই বলে নসীবের গরদিশ!
পরিশেষে উল্লেখযোগ্য যে, ফোর্ট উইলিয়মে সৃষ্ট বংলা গদ্য-সাহিত্য যে মুসলিম লেখকদের খুশী করতে পারে নি, তার প্রমাণ সেকালে তথাকথিত দোভাষী পুথি-সাহিত্যের সৃষ্টি ও তার ব্যাপকতা; গদ্য-সাহিত্য-চর্চায় অনিচ্ছাকেও এর অন্য প্রমাণ হিসেবে ধরা যায়।
আলোচ্য ‘জীবনী তোয়ারিক’ তার একমাত্র ব্যতিক্রম দেখতে পাচ্ছি। ব্যতিক্রম বলেই এ-বিষয়ে আমাদের ঐতিহাসিক কৌতূহল জাগ্রত করে। আরও কৌতূহলের বিষয়, গ্রন্থখানির রচনাকাল ফোর্ট উইলিয়মীয় যুগে হলেও তার রচনাদর্শ ও ভাষা ঠিক ফোর্ট উইলিয়মীয়, আদর্শে রচিত নয়,-এর ভাষা আধুনিক বাংলা বটে, তবে সেই বাংলা ফোর্ট উইলিয়মীয় চলিত আরবী-ফারসী বর্জিত এবং সমাসাড়ম্বর যুক্ত পণ্ডিতী বাংলা নয়। এ-বাংলা ফোর্ট উইলিয়মীয় বাংলা থেকে অধিকতর মার্জিত, সরল-সহজ অনায়াসগামিনী।
কিন্তু কেমন করে এমন হল? এই প্রসংগে স্মরণযোগ্য যে, আমরা ফোর্ট উইলিয়মীয় যন্ত্রে তৈরী গদ্য পেয়েছি, স্বাভাবিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে গদ্য এসেছে তার কোন সাহিত্যিক নমুনা ইতঃপূর্বে পাই নি। শাহ মখদুম-জীবনী আমাদের সেই লুপ্ত গদ্য-রীতির ছিন্ন সূত্র সংযোজন করতে সাহায্য করবে মনে করি।
আরও একটি কথা। ফোর্ট উইলিয়মের গদ্য লেখক সকলেই হয় হিন্দু, আর না হয় বিদেশী (ইংরেজ) সাহেব ছিলেন। তাঁরা সচেতন-ভাবে বাংলা গদ্যকে শুদ্ধিকরণের (purification) নামে মুসলমানী ভাব, ভাষা ইত্যাদি বিসর্জনের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, স্বাভাবিকভাবেই মুসলমান লেখকদের তা মনঃপূত হয় নি; ফলে তাঁরাও পদ্য-রচনার মতো গদ্য-রচনাতেও ভিন্নপথ অবলম্বন করেছিলেন। কি দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই গদ্য-রচনার কোন নমুনা না পাওয়ায় আমাদের ধারণা হয়েছিল যে, মুসলমানরা গদ্য-রচনা থেকে পরহেজ (বিরত) ছিলেন। কিন্তু আজ দেখতে পাচ্ছি, মুসলমানের গদ্য-রচনা ফোর্ট উইলিয়মের অনুসারী না হয়ে স্বভাবের পথ অনুসরণ করেছে; ফলে সে গদ্য অপেক্ষাকৃত সরল ও সুন্দর হয়েছে। বলা বাহুল্য, বাংলা ভাষা স্বভাবতঃই সরল। তার হাযার বছরের ইতিহাসে সরল পয়ার-ত্রিপদীর যে স্রোত প্রবাহিত হয়ে এসেছে, তাতে জটিলতার স্থান কোথায়? এই সরল পয়ার-ত্রিপদীতে ‘পদ্মাবতী’ (আলাওল) ‘শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত’ (কৃষ্ণদাস কবিরাজ) ইত্যাদির মত কঠিন তত্ত্বমূলক গ্রন্থ রচিত হওয়া যখন সম্ভবপর হয়েছে, তখন এমন কি দুর্যোগ ঘটলো যে গদ্য সাহিত্য সৃষ্টি করতে গিয়ে তা হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠলো? সতি কথা বলতে কি, ফোর্ট উইলিয়মের পণ্ডিত সমাজ সেদিন ‘সংস্কৃত ব্যাকরণের হাতুড়ি পিটিয়া’ যদি তথাকথিত আধুনিক গদ্য ভাষার মুসাবিদা তৈরী না করে তাকে স্বভাবের পথে পরিচালিত করতেন, তা হলে বাংলা গদ্য ‘শাহ মখদুমী’ বাংলা রীতিতে এসেই মিলিত হত, এ-কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
এই প্রসংগে উল্লেখযোগ্য যে, ১৭৭৮ ঈসায়ীতে ইংরেজ মনীষী হ্যালহেড সাহেব তাঁর ব্যাকরণে বাংলা ভাষার যে চলিত রূপের কথা উল্লেখ করেছিলেন, শাহ্ মখদুম-জীবনীতে তারই স্বাভাবিক বিবর্তিত রূপ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ফোর্ট উইলিয়মে লিখিত বাংলা গদ্যে তার নাম গন্ধটুকুও নেই। নমুনা স্বরূপ হ্যালহেড সাহেবেরই উদ্ধৃত একটি চিঠি এখানে হুবহু তুলে দেওয়া গেল:
“৭ শ্রীরাম
গরিব নেওয়াজ শেলামত-
আমরা জমিদারী পরগণে কাকজোল তাহার দুইগ্রাম দরিয়া শীকিশতী হইয়াছে সেই দুইগ্রাম পায়বশতী হইয়াছে চাকলে একেশ্বরপুরের শ্রী হরেকৃষ্ণ চৌধুরী আজ রায় জবরদস্তী দখল করিয়া ভোগ করিতেছে আমি মাল বস্তুজারীর শরবরাহতে মারা পড়িতেছি ওমেদওয়ার যে সরকার হইতে আমিন ও এক চোপদার সরজমিনতে পহুছিয়া তোরফেনকে তলব দিয়া লইয়া আদালত করিয়া হকদারের হক দেলায়া দেন ইতি-
সন ১১৮৫ (= ১৭৭৮ ঈসায়ী) সাল তারিখ ১১ শ্রাবণ।
ফিদবি-
জগতধির রায়”
সজনীকান্ত দাস হ্যালহেড প্রদত্ত এই নমুনাটির উপর যে মন্তব্য প্রকাশ করেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য।
“বাংলা দেশে যদি ইংরেজ আগমন না ঘটিত তাহা হইলে আজিও আমাদিগকে বাংলা লিখিতে বসিয়া ‘গরিব নেওয়াজ সেলামত’ বলিয়া শুরু করিয়া ‘ফিদবি’ বলিয়া শেষ করিতে হইত। তাহা মঙ্গলের হইত কি অমঙ্গলের হইত, আজ সে বিচার করিয়া লাভ নাই।”[3] দাস মশায়ের এ মন্তব্য সামনে রেখেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, ইংরেজ আগমনের পরেও বাংলা গদ্যে মুসলমানী প্রভাব স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রবেশ লাভ ঘটেছে, তবে তাকে গলা টিপে হত্যা করার কোশেশও কম করা হয় নি। শাহ মখদুম জীবনীর ভাষাই তার প্রমাণ। এ-গ্রন্থের ভাষা আরবী-ফারসী শব্দ সম্ভারে পুষ্ট হলেও এ-ভাষা আধুনিকতা বর্জিত নয়, উপরন্তু এর মুসলমানী ভাষাও সুস্পষ্ট। বরং এ-কথা বলতেই হবে যে, ফোর্ট উইলিয়মের পণ্ডিত সমাজের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত না হলে বাংলা গদ্যের যে স্বাভাবিক পরিণতি হতে পারতো, এ-ভাষা তারই স্মারক। এ-দিক দিয়ে বিচার করলে শাহ মখদুম-জীবনী লেখককে শুধু বিদ্যাসাগরের পূর্বসুরী নয়-পরবর্তী প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালী’ বাংলারও দিশারী বলা যেতে পারে।
সত্যি কথা বলতে কি, ‘শাহ, মখদুমী’ রচনা-রীতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল হলে ফোর্ট উইলিয়মী পণ্ডিতকুলের মনে যে প্রতি-ক্রিয়ার সৃষ্টিই হোক না কেন, ‘আলালের ঘরের দুলাল’ রচয়িতা যে মনে মনে খুশী হতেন, এ-কথা এক রকম হলফ করেই বলতে পারা যায়।
প্রসংগক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, সমকালীন মুসলিম কবি জামালউদ্দীনের ‘প্রেমরত্ন’ (১৮৫৩) কাব্যের এবং বিখ্যাত লালনশাহী সংগীতের ভাষাও ছিল শাহ মখদুমী রচনা-রীতির সমতালীয়।
আধুনিক বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথ লালন-শাহী সংগীতের ভাষা ও ছন্দ সম্পর্কে যে মন্তব্য পেশ করেছেন, বর্তমান গ্রন্থের রচনা-রীতি সম্পর্কে তা অনায়াসেই বলা যায়। রবীন্দ্রনাথ বলেন: “এই যে-বাংলা (লালন শাহী) বাঙালির দিন-রাত্রির ভাষা এর একটি মস্ত গুণ এ ভাষা প্রাণবান। এই জন্যে সংস্কৃত বল, পারসি বল সব শব্দকেই প্রাণের প্রয়োজনে আত্মসাৎ করতে পারে।….. প্রকৃত বাংলাকে গুরু-চণ্ডালি দোষ স্পর্শই করে না। সাধু ছাঁদের ভাষাতেই শব্দের মিশোল সয় না।”[4]
অবশ্য লালন-শাহী গীতির সংগে শাহ মখদুমী রচনা-রীতির তুলনা হয়তো ঠিক হবে না, কিন্তু কথা হচ্ছে ‘প্রাকৃত’ বাংলা নিয়ে। শাহ মখদুম-জীবনীকার ‘প্রাকৃত’ বাংলা রীতির অনুসরণ করেছিলেন। তাই তাঁর রচনা ফোর্ট উইলিয়মীয় বাংলা রচনার চেয়ে সরলতর এবং মধুরতর হয়েছিল।
এই রচনা সময়ের হিসেবে কতদূর উন্নত হয়েছিল, পরবর্তী কালের বিখ্যাত ‘আলালের ঘরের দুলাল’-কার প্যারীচাঁদ মিত্রের রচনার পাশে স্থাপন করলেই তা সহজেই বুঝতে পারা যাবে। বলা বাহুল্য, আলালের ঘরের দুলালের মত বর্তমান গ্রন্থেও প্রয়োজন বোধে আরবী-ফারসী-প্রধান বাংলা ভাষা গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজন মুতাবিক সংস্কৃত বা সংস্কৃতায়িত শব্দও গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে উভয় লেখকের রচনা-রীতির একটি করে নমুনা পেশ করা গেল:
(ক) হজরত শাহ্ মখদুম: মীর্যা আলী কুলী বেগের কবরের বর্ণনা (মূল পুথি, পৃ. ২৪)।
“তাঁহার কবরের বুকস্থানে একটি পাথর ঐ পাথরের উপর দৃষ্টি করিলে কত রঙ বেরঙের ফুলবাগ ও ঘরবাড়ী দেখা যায় এবং কবরের পায়ের দিকে কবরের গায়ে একটি ছিদ্র। ঐ ছিদ্রের মধ্যে একটি কঙ্করকণা বা ছোট ঢিল প্রবেশ করাইয়া দিলে কিছুক্ষণ পরে কোনো সুগভীর পানিতে পড়িবার মত ‘টুবুক’ শব্দ শোনা যায় এবং প্রতি নামাজের সময় অজু করিয়া মসজিদে যাইবার সম্পূর্ণ পদচিহ্ন দেখা যায়। তাঁহার বহু কেরামত মাশহুর রহিয়াছে। প্রবাদ এই মাজারে বহু ধনরত্ন রহিয়াছে। ইহার জাহেরী কেরামত লিখিত হইলে বড় পুস্তক হইয়া পড়িবে।”
(খ) প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ পৃ. ৯৪।
“ঠকচাচী মোড়ার উপর বসিয়া জিজ্ঞাসা করিতেছেন-তুমি হররোজ এখানে ওখানে ফিরে বেড়াও-তাতে মোর আর লেড়কা-বালার কি ফায়দা? তুমি হরঘড়ি বল যে বহুত কাম, এতনা বাতে কি মোদের পেটের জ্বালা যায়। মোর-দেল বড় চায় যে জারি জর পিনে দশজন ভালো ভালো রেন্ডির বিছে ফিরি, লেকিন রূপেয়া কড়ি কিছুই দেখিনা, তুমি দেয়ানার মত ফের চুপচাপ মেরে হাবলিতে বসেই রহ। ঠকচাচা কিঞ্চিৎ বিরক্ত হইয়া বলিলেন-আমি যে কোশেশ করি তা কি বলব, মোর কেতনা ফিকির কেতনা ফন্দি-কেতনা প্যাঁচ-কেতনা শেস্ত তা জবানীতে বলা যায় না, শিকার দস্তে এল এল হয় আবার পেলিয়ে যায়।”
বলা প্রয়োজন, ‘আলালের ঘরের দুলাল’ শাহ মখদুম-জীবনীর কুড়ি বৎসর পরে রচিত ও প্রকাশিত হয় (১৮৫৮ ঈ.)। আরও কৌতূহলের ব্যাপার এই যে, এই আলালের ঘরে দুলাল থেকেই আমাদের আধুনিক বাংলা গদ্যের ইতিহাস ধরা হয়েছে।
স্বর্গীয় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষাতেই বলা যাক- “বাঙ্গলা ভাষার এক সীমায় তারাশঙ্করের কাদম্বরীর অনুবাদ, আর এক সীমায় প্যারীচাঁদ মিত্রের ‘আলালের ঘরের দুলাল।’ ইহার কেহই আদর্শ ভাষায় রচিত নয়। কিন্তু ‘আলালের ঘরের দুলালে’র পর হইতে বাঙ্গালী লেখক জানিতে পারিল যে, এই উভয় জাতীয় ভাষায় উপযুক্ত সমাবেশের দ্বারা আদর্শ বাঙ্গালা গদ্যে উপস্থিত হওয়া যায়। প্যারীচাঁদ মিত্র আদর্শ বাঙ্গালা গদ্যের স্রষ্টা নহেন, কিন্তু বাঙ্গালা গদ্য যে উন্নতির পথে যাইতেছে, প্যারীচাঁদ মিত্র তাহার প্রধান ও প্রথম কারণ। ইহাই তাঁহার অক্ষয় কীর্তি। তাঁহার দ্বিতীয় কীর্তি এই যে, তিনিই প্রথম দেখাইলেন যে, সাহিত্যের উপাদান আমাদের ঘরেই আছে, তাহার জন্য ইংরেজী বা সংস্কৃতের কাছে ভিক্ষা চাহিতে হয় না।”[5]
এখানে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন, শুধু স্মরণ করিয়ে দেওয়া দরকার যে বাংলা গদ্য সাহিতের আদিগ্রন্থ রচিত হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্র কথিত বর্তমান উক্তির পরে নয়, এমন কি তার কথঞ্চিত পূর্বেও নয়, স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রের জন্ম বৎসরেই আলোচ্য শাহ, মখদুম জীবনীতে আদর্শ বাংলা গদ্যের রূপায়ণ সম্ভবপর হ’য়েছিল একজন অজ্ঞাতনামা মুসলিম লেখকের দ্বারা। বাংলা কাব্য-সাহিত্যও পিছিয়ে ছিল না। শাহ, মখদুম জীবনীর মাত্র পনেরো বৎসর পরে কবি জামালউদ্দীন আদর্শ বাংলা কাব্য ‘প্রেমরত্ন’ রচনা (১২৬০ সাল = ১৮৫৩) করতে সক্ষম হয়েছিলেন; এবং বলা বাহুল্য, এই গ্রন্থের কোনখানিই সংস্কৃত বা ইংরেজীর দ্বারে ধার করা ভাষায় নয়-খাঁটি দেশীয় মাল-মশলায় প্রস্তুত। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, না ফোর্ট উইলিয়মের পণ্ডিতগণ ও সমকালীন বাঙালী সুধী-সমাজ (হিন্দু), তাঁদের এই মহান কীর্তির পানে ফিরে তাকিয়েছিলেন; ফলে অবহেলিত ও উপেক্ষিত হ’য়ে হ’য়ে সে ধারা কালে কালে বিস্মৃতির অতল তলে তলিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। সত্যি কথা বলতে কি, প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা ভাষার সেই ক্ষীয়মান ধারা ‘আলালের ঘরের দুলালে’র ভাষায় প্রবাহিত করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন, আরও পরে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর (বীরবল) ভাষায় তা নতুন করে উজ্জীবিত হয়েছিল। কিন্তু তথাপি বলতে দোষ নেই, যে নদী মরু-পথে একবার তার পূর্ণ ধারা হারিয়ে ফেলেছিল, সে আর কখনও তার পূর্ণপ্রাণ প্রবাহ ফিরিয়ে পায়নি, পেতে পারে না। তাই আজ স্পষ্টই দেখতে পাই:
“সে ভাষা ভুলিয়া গেছি নাম দোহাকার,
উভয়ে খুঁজিনু কত, মনে নাহি আর।”[6]
এই গ্রন্থ রচনার সমকালীন বাংলা ভাষা, সাহিত্য সমাজ ও এর ইতিহাস উল্লেখপূর্বক বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম গদ্য রচনা হিসেবে এই গ্রন্থের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব সম্পর্কে আবূ তালিবের এই আলোচনা উদ্ধৃতির পর আর কিছু যোগ করা নিষ্প্রয়োজন।
অধ্যাপক মুহম্মদ আবূ তালিব নিষ্ঠার সঙ্গে পরিশ্রম করে এই গ্রন্থ সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছেন ১৯৬৯ সালে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্’র মতো ভাষাবিদ, ভাষাতাত্ত্বিক ও পণ্ডিত ভূমিকা লিখে স্বীকৃতি দেয়ার পরও বাংলা সাহিত্যের যত ইতিহাস প্রকাশিত হয়েছে কোথাও বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম গদ্য রচনা হিসেবে এই গ্রন্থের নাম নেই। এটা কি ইতিহাস লেখক, গবেষক, সম্পাদক ও প্রকাশকদের অজ্ঞতা নাকি একজন পীরের জীবনী ভেবে ‘আধুনিকতার’ খপ্পরে পড়ে নাক ছিটকানোর বহিঃপ্রকাশ তা স্পষ্ট নয়। তবে এটি স্পষ্ট যে, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখক, গবেষক, প্রকাশকগণ বাংলার মুসলমান সমাজ ও বিশেষত সুফি সমাজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে আমলে নেয়ার মতো তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, ক্ষেত্রবিশেষ অগ্রাহ্য করেন। এর মাধ্যমে যে নিজেদেরই শিকড় দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয় তা টের পেতে পেতে সর্বনাশ যা হবার হয়ে যায়।
ঔপনিবেশিক শাসনের আগ পর্যন্ত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নেতৃত্ব দিয়েছেন সুফি সমাজ। কবি আলাওল থেকে শুরু করে গরীবুল্লাহ শাহ, হেয়াত মামুদ, আলী রজা— প্রাক-ঔপনিবেশিক বাংলা সাহিত্যের বেশিরভাগ উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব সুফি সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। কিন্তু ঔপনিবেশিক যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে যখন বাংলার মুসলমান সমাজ আতঙ্কগ্রস্ত তখনও সুফি সমাজই হাল ধরেছিলেন। ‘আধুনিক’ সাহিত্য রীতি হিসেবে গদ্য রচনার আগমন মাত্রই বাংলার মুসলমানদের মধ্যে সুফি সমাজই সর্বপ্রথম গদ্যে নিজেদের দলিলাদি প্রস্তুত করেছেন। সুলতানী ও মুঘল আমলের অনুকূল সময়ে সুফি সমাজ যেমন মুসলমান সমাজকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তেমনি ঔপনিবেশিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আগলে রেখেছেন সযত্নে। কেবল আগলে রাখা নয়, ঔপনিবেশিক বিরোধী সংগ্রামেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন।
বর্তমান সময়ে ইসলামের বহুবিধ ব্যাখ্যামূলক প্রজেক্টের প্রভাব বাংলার মুসলমান সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। মাজার, দরগাহ, খানকা, পীর, দরবেশ সর্বোপরি সুফি সমাজকে সম্পূর্ণ নেতিবাচকভাবে বিবেচনা করে অপরায়ন করার একটি ‘জনপ্রিয়’ প্রবণতা বহুদিন যাবৎ বিকশিত হচ্ছে। অথচ, সুফি সমাজকে বাদ দিলে বাংলার মুসলমান সমাজের ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি কিছুরই শিকড় খুঁজে পাওয়া যাবে না। বাংলার মুসলমান সমাজের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে কীভাবে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে সুফি সমাজ তার একটি নিদর্শন হজরত শাহ মখদুম রূপোশের জীবনেতিহাস। সুদূর বাগদাদ থেকে আগত একজন আউলিয়ার মাজার, সেখানে এসেছেন বাদশাহ আলমগীর, তাঁর উসিলায় তৈরি হয়েছে ফারসি কিতাব, সময়ের প্রয়োজনে তার হয়েছে বঙ্গানুবাদ— আর এই অনুবাদই বাংলার মুসলমান সমাজের প্রাচীনতম গদ্য রচনা হিসেবে ঐতিহাসিক দলিলরূপে বিবেচ্য।
যেভাবে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেছেন, ‘ইহা কেবল এক পীরের জীবনী নয়’, তথা এটিকে কেবল একজন পীরের জীবনী ভেবে অগ্রাহ্য করা, ‘আধুনিকায়নের’ খপ্পরে পড়ে নাক ছিটকানোর সুযোগ নেই। বরং এই পীরের জীবনীই বাংলার মুসলমান সমাজের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহাসিক দলিল।