রাজশাহীর হযরত শাহ মখদুম রূপোশ ত্রয়োদশ শতকে বাগদাদ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বাংলায় আগমন করেন। বরেন্দ্র অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর দরগাহে একাধিক শিলালিপির পাশাপাশি ফারসি ভাষায় রচিত তাঁর জীবন ও দরগাহের ইতিহাস বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছে। উক্ত পাণ্ডুলিপিতে রয়েছে দরগাহে মহররম উদযাপনের বিবরণি, যা এই নিবন্ধের প্রধান আলোচ্য বিষয়।

পাণ্ডুলিপির বিবরণ সূত্রে জানা যায়, ১৬৬৫ সালে বাদশাহ আওরঙ্গজেব নদীপথে বাংলা ভ্রমণ করেন। ভ্রমণকালে হজরত শাহ মখদুমের মাজার প্রাঙ্গণে যাত্রাবিরতি করেন। মাজার প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে তৎকালীন খাদেমদের কাছে হজরত শাহ মখদুমের শাজরা এবং অন্যান্য ইতিহাস জানতে চান। কিন্তু বাদশার সামনে হাজির করার মতো লিখিত তেমন কিছু তাদের কাছে ছিল না। এ অবস্থায় খাদেমদের সিদ্ধান্তে ফারসি ভাষায় একটি বই লেখা হয়। যেখানে হজরত শাহ মখদুমের বাংলায় আগমন এবং পরবর্তীকালের ইতিহাসের বর্ণনা আছে। মূল পাণ্ডুলিপিতে মাজারের তৎকালীন দশজন খাদেমের নাম ও স্বাক্ষর পাওয়া যায়। ১০৭৬ হিজরির ২২ সফর মোতাবেক ১৬৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই ঐতিহাসিক বইটির রচনা হয়।
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর যখন ইংরেজ সরকার লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা শুরু করল, তখন ১৮৩৭ সালে শাহ মখদুমের মাজার এস্টেটের লাখেরাজ সম্পত্তি নিয়ে ইংরেজ সরকার মামলা দায়ের করে। ১৮৩৮ সালে মামলার নিষ্পত্তি হয় এবং রায় মোতাবেক মাজার এস্টেটের লাখেরাজ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। কিন্তু মাজার কর্তৃপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিল পরবর্তী সময়ে তারা যেসব দলিলপত্র আদালতে পেশ করে তার মধ্যে উক্ত ফারসি পাণ্ডুলিপির বাংলা অনুবাদটিও ছিল। কেবল আদালতে হাজির করার জন্যই পাণ্ডুলিপিটি অনুবাদ করা হয়। অনুবাদকের নাম জানা যায়নি। অনুবাদকাল ১২৪৫ বঙ্গাব্দ মোতাবেক ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দ। রাজশাহীর কালেক্টরের মহাফেজখানার নথিতেও এ পাণ্ডুলিপির ব্যাপারে লিখিত রয়েছে, ‘হজরত শাহ্ মখ্দুম রূপোষ আউলিয়ার ফারসি ভাষায় লিখিত জীবনী তোয়ারিক জরাজীর্ণ অবস্থার দরুন ফারসি গ্রন্থ থেকে বাংলা ভাষায় তিন কিতা জীবন চরিত রচনা করা হইল ও দুই কিতা মখ্দুম সেরেস্তায় দাখিল করা হইল।’
অধ্যাপক মুহম্মদ আবূতালিব রাজশাহীর মহাফেজখানা থেকে বাংলা অনুবাদের পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করেন। এ অনুবাদের সাপেক্ষে তিনি ১৯৬৭ সালে রচনা করেন ‘মুসলিম বাংলা গদ্যের প্রাচীনতম নমুনা’ প্রবন্ধ। বাংলা একাডেমী পত্রিকা শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩৭৪ সংখ্যাতেও এই অনুবাদের অংশবিশেষ প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু সমগ্র অনুবাদটি একসঙ্গে গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে—’পাকিস্তান বুক করপোরেশন’ থেকে।

পাণ্ডুলিপিতে অন্যান্য ইতিহাসের সঙ্গে গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখিত হয়েছে বাৎসরিক মহররম উদযাপনের ইতিহাসও। কৌতূহলী পাঠক ও গবেষকদের জন্য পুরো অংশটি যুক্ত করা হলো।
‘মহরম শরীফের উৎসব’
“মহরম মাসে প্রথম হইতে দশ দিবস আস্তানা ও কারবালা আলোকমালায় সুসজ্জিত করা হয়। আবরোকের টাটী দ্বারা আস্তানা সাজান হয়। এমামবাড়ী সাজান হয়। তাজিয়া ধৌত করিবার সময় মহা ধুম করিতে হয়। তৎপর সাজান হয় ১০দিন দিবারাত্র নহবৎখানায় বাদ্য হয়। মাতম, বাঙ্গালা মর্ছিয়া, হিন্দি মর্ছিয়া, উর্দ্দু পার্শী মর্ছিয়া হইয়া থাকে। স্ত্রীলোকের মাতম হয়। ঐ মাতম সময় পুরুষ লোক আসা নিষেধ। কেহ পুরুষ লোক আসে না। বদ্ধি ধারণ করিতে হয়। সবুজ রঙ্গের শোক পরিচ্ছেদ পরিধান করিতে হয়। ১০ দিবস রোজা রাখিতে হয়। দুনিয়াদারী সমস্ত রকম সুখ হইতে বঞ্চিত থাকিতে হয়। মাছ মাংস তৈল ব্যবহার হইতে বঞ্চিত থাকিতে হয়।
নিজপক্ষ হইতে প্রত্যহ শরবৎ ও খিচুড়ি করিয়া গরীব দুঃখীকে খয়রাৎ করিতে হয়। কাতল রাত্রিতে মহাধুমে বাদ্যসহ আলোকমালায় আলোকিত করিয়া তাজিয়া লইয়া ৭ বার প্রদক্ষিণ করা হয়। পরদিবস মঞ্জিল দিনে তাজিয়া সহিত নানা বাদ্যসহ মিছিল বাহির করিয়া বহুদূর বেড়ান হয়। সঙ্গে মাতম মর্সিয়া গাওয়া হয়। কতলের রাত্রিতে মঞ্জিলের দিনে সর্বসাধারণের গঁওরা তাজিয়া নানা বাদ্য ও মিছিল সহ মর্সিয়া মাতম গাহিতে গাহিতে আস্তানা এমামবাড়ীতে উপস্থিত হইয়া মখ্দুম সাহেবের তাজিয়া, এমামবাড়ী ও আস্তানাকে সম্মান প্রদর্শন করিয়া থাকে। কাসেদের বহুদল আসিয়া থাকে সর্বসাধারণের শরবৎ ও খিঁচড়ার দ্বারা এমামবাড়ী পূর্ণ হইয়া যায় ও খয়রাৎ করা হয়। ঐ দিবস সর্বসাধারণের আখড়া আসিয়া আস্তানা প্রাঙ্গণ ও কারবালায় পরিপূর্ণ হইয়া যায়। লাঠি, ঢাল, তলোয়ার, নেজা, বর্শা, গোর্জ্জ—নানারূপ অস্ত্র দ্বারা হিন্দু মোছলমান একত্রিতে রোমহর্ষণ খেলা হইয়া থাকে। মল্লকুস্তী করা হয়। নানারূপ বীরত্বের পরিচয় দেওয়া হয়।
৬০/৭০ হাজারের বেশী লোকের সমাগম হইয়া থাকে। মহরম বর্ণনা করা একরূপ সাধ্য রহিত। মঞ্জিল দিবসে সমস্ত দিন ধরিয়া সন্ধ্যার সময় (অনুষ্ঠান) সমাধা হইয়া থাকে। ঐ দশ দিবসে বহু টাকা আয় হয়! সর্বসাধারণের হাজত নিয়াজ হিন্দু মোছলমান দ্বারা দৈনিক গড়ে ১ মণ ২ মণ সন্দেশ, জিলাপী, বাতাসা ও ১০০/১৫০ শত মোরগ ও ১/২ মণ আতপ চাউলের ভাত হইয়া থাকে।”
বাংলায় মহররম উদযাপনের দলিল হিসেবে এটিই সবচেয়ে প্রাচীন। মুঘল আমলে মহররম উদযাপনের কোনো দলিল অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে, হযরত শাহ মখদুম রূপোশের দরগায় উদযাপিত মহররমের বিবরণই এখনো পর্যন্ত বাংলায় মহররম উদযাপনের সর্বোচ্চ প্রাচীন ও ঐতিহাসিক টেক্সট। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই টেক্সট এখনো পর্যন্ত বাংলায় জাতীয় পর্যায়ের কোনো ইতিহাস গবেষক ব্যবহার করেননি।
বর্ণনায় কিছু বিশেষ ব্যাপার লক্ষ্য করা যায়। এমন কিছু ঘটনার কথা আছে যেগুলো এখন আর তেমন দেখা যায় না। যেমন- নারীদের মার্সিয়া গেয়ে মাতম করার একটি নির্দিষ্ট সময় ছিল, যেখানে পুরুষদের প্রবেশ ছিল নিষেধ। আবার বর্তমানে যেভাবে মহররমের সময় শোকের রঙ হিসেবে কালো কাপড় পরতে দেখা যায়, তখন শোকের কাপড় হিসেবে সবুজ রঙের কাপড় পরা হতো। আগত দর্শনার্থীদের জন্য বিনামূল্যে শরবত ও খিচুড়ি বিতরণের আয়োজন বর্তমানেও অনেক জায়গায় জারি আছে। মহররমে লাঠি খেলা গ্রাম বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় সংস্কৃতির একটি। আল মাহমুদের আত্মজীবনীতে লাঠিখেলার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায়।
রাজশাহীতে মহররম উদযাপনের এই বর্ণনা ১৬৬৫ সালের আগেকার ব্যাপার। উদযাপনের সূচনা কত সালে তা জানা যায়নি। তবে সতেরো শতকের এই বিবরণ মহররম উদযাপনের ইতিহাসকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রণোদনা দেয়। ঢাকায় মুঘল রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই রাজশাহীতে এই উদযাপনের শুরু হয়েছিল কি-না এ নিয়েও আলোচনা চলতে পারে। মুঘল রাজধানী প্রতিষ্ঠার আগেই যদি রাজশাহীতে মহররম উদযাপন শুরু হয়ে থাকে তাহলে মহররম উদযাপনের পেছনে মুঘল ও শিয়া শাসকদের একচ্ছত্র আধিপত্যের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। বদলে যেতে পারে গতানুগতিক ইতিহাসের ধারাও।
মহররমের বিবরণী ছাড়াও, বাংলা গদ্যের নিদর্শন হিসেবেও এর অসাধারণ গুরুত্ব রয়েছে। মুসলমানদের গদ্য লেখার যত প্রাচীন দলিলপত্র পাওয়া যায় তার মধ্যে এটি অন্যতম। মুহম্মদ আবূতালিব বলছেন, ‘রচনাকালের দিক দিয়েও গ্রন্থখানি বিদ্যাসাগরের ‘বেতাল পঞ্চবিংশতির’ নয় বৎসর পূর্বেকার (১২৪৫ সন = ১৮৩৮ ঈ.)। এবং বলেছি, মুসলিম বাংলা গদ্যেরও এখানি প্রাচীনতম গ্রন্থ।’ ফলে, এই বইটি কেবল ধর্মীয় বিষয়বস্তু ছাড়াও মুসলিম রচিত গদ্যের আদি নিদর্শন হিসেবেও ভাষা ও সাহিত্য গবেষকদের জন্য আকর্ষণীয়।
উল্লেখ্য যে, বইটি প্রকাশের পূর্বে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ একটি শুভেচ্ছাবার্তা লিখে দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, ‘ইহা কেবল এক পীরের জীবনী নয়, বরং রাজশাহীর ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের আবিষ্কার। পীর সাহেবের জীবনী মূলে ফারসী ভাষায় লিখিত; কিন্তু তাহার বঙ্গানুবাদ হয় ১২৪৫ সনে। আমাদের গণনানুসারে বর্তমানে ইহাই মুসলিম বঙ্গের প্রাচীনতম গদ্য রচনা। সুতরাং ইহাকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি নূতন অধ্যায় বলিতে হয়।’
বাংলার মুসলমানদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সুফিদের দরগাহ, মাজার কীভাবে জড়িত এই টেক্সট তার একটি নিদর্শন। সুফিরা মুসলমানদের কেবল কালেমা পড়িয়ে ছেড়ে দেননি, বরং জীবনযাপনে, সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে ‘মুসলমান’ বানানোর দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। প্রি-কলোনিয়াল সময়ে সুফিদের মাজার, দরগাহ, খানকাগুলো ছিল মুসলমান সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (সেন্টার)। কেন্দ্র হিসেবে দরগাহ, খানকার ভূমিকা কেমন ছিল তার বাস্তবিক উদাহরণ পাওয়া যায় মহররম উদযাপনের এই দলিলে।
হযরত শাহ মখদুম রূপোশ ছিলেন বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর বংশধর। তিনি নবীবংশের একজন ব্যক্তিত্ব। বাগদাদ থেকে আসা কাদেরিয়া তরিকার এই সাধকের দরগাহেই চারশ বছর আগ থেকে উদযাপিত হয়ে আসছে মহররম। প্রি-কলোনিয়াল মুসলমান সমাজে সুফিদের দরগাহ, খানকা ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত ছিল, সকলেই তাদের নিজ নিজ ধর্ম, সংস্কৃতি পালনের জন্য সুফিদের দরগাহকে নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচনা করতো। এই বিবেচনার স্বাক্ষর এখনো বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে, গ্রামে-গঞ্জে অবস্থিত দরগাগুলোতে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রি-কলোনিয়াল সময়ে এটিই ছিল বাংলার সুফিদের দরগাহ, খানকা, মাজারের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। যে বৈশিষ্ট্য আজ বহুমাত্রিক কারণে বিপন্ন।
প্রি-কলোনিয়াল সময়ে বাংলার মুসলমান সমাজে তো বটেই, পাশাপাশি ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী নির্বিশেষে সামগ্রিকভাবে সুফি-সমাজ কীভাবে নিজ নিজ পরিসরে একক গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন তারও একটি প্রেক্ষাপট এই টেক্সটে আছে। ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইভেন্ট উদযাপনে নেতৃত্বদানের মাধ্যমে সুফি-সমাজ মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে অধিষ্ঠিত ছিলেন। যে কোনো স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের ব্যক্তিকে এই সহজাত নেতৃত্ব আকৃষ্ট করতে সক্ষম। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পর্যায়ে সুফি-সমাজের নেতৃত্ব বাংলায় ইসলামের প্রচার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।