ধর্মতত্ত্বে ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ আইডিয়া: উৎস, বৈশিষ্ট্য ও তুলনামূলক ব্যবহার

সম্পাদকীয় নোট:

ঐতিহাসিকভাবে ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ মূলত খ্রিস্টধর্ম উদ্ভূত একটি আইডিয়া। কিন্তু এই আইডিয়ার পরিসর কেবল খ্রিস্টধর্মেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; সময়ের বিবর্তনে এর পরিসর ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। খ্রিস্টধর্মের প্যাট্রন সেইন্ট আইডিয়ার রূপ, রঙ ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়ে ইসলামের সুফিধারায় পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত আওলিয়ায়ে কেরামের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। এই আইডিয়ার উৎস, বিকাশ ও বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে বর্তমান নিবন্ধে। লেখক দেখিয়েছেন, খ্রিস্টধর্মে প্যাট্রন সেইন্টের যে মৌলিক আইডিয়া তা থেকে সুফিদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ পরিভাষার বিস্তর ফারাক আছে। ফারাক থাকা সত্ত্বেও লেখক এই পরিভাষার ব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক করেছেন, সঙ্গত কারণেই।

এটি প্যাট্রন সেইন্ট সিরিজের প্রথম পর্ব। পরবর্তী পর্বগুলোতে প্যাট্রন সেইন্ট হিসেবে বাংলার সুফিদের পাঠ করার নমুনা হাজির হবে। এবং, সুফিদের ক্ষেত্রে প্যাট্রন সেইন্ট পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে-সকল শর্তাবলী জরুরী তার‌ও প্রয়োগ-পদ্ধতি সম্পর্কে আলোকপাত হবে।

***

 

পরিভাষার উৎস ও বিকাশ

ঐতিহাসিক বিবেচনায়, প্যাট্রন সেইন্ট (Patron Saint) মূলত রোমান ক্যাথলিক ও পূর্বদেশীয় অর্থোডক্স (Eastern Orthodox) খ্রিষ্টীয় অধ্যাত্ম ঐতিহ্যে ব্যবহৃত একটি ধর্মতাত্ত্বিক পরিভাষা। সাধারণ অর্থে, কোনো একটি নির্দিষ্ট শহর, অঞ্চল, পেশা, জনগোষ্ঠী, রোগ কিংবা বিশেষ কোনো মানবেতর পরিস্থিতির কল্যাণময়ী অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত এবং চার্চ থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত/স্বীকৃত সাধককে “প্যাট্রন সেইন্ট” বলা হয়।[1] খ্রিস্টীয় অনুসারীগণের বিশ্বাস, পৃষ্টপোষক সাধকই (Patron Saint) একমাত্র ঈশ্বরের কাছে একটি সুনিদির্ষ্ট এলাকার মানুষের জন্য সুপারিশ (Intercession) করতে পারেন। ক্যাথলিক ঐতিহ্যে ব্যক্তিকে সাধু-স্বীকৃতির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অনুসরণ করতে হয়। অর্থাৎ প্যাট্রন সেইন্ট হতে হলে ব্যক্তিকে Canonized Saint এর মর্যাদা লাভ করতে হয়। কোনো মৃত ব্যক্তিকে তাঁর পবিত্র জীবন, খ্রিস্টীয় বিশ্বাস, অলৌকিক কর্মকান্ড এবং নিরবিচ্ছিন্ন ঈশ্বর-সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ ক্যাথলিক চার্চের পোপ আনুষ্ঠানিকভাবে Saint (সাধু/সন্ত) হিসেবে ঘোষণা করে থাকেন। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিকে বলা হয় Canonization (সাধুত্ব ঘোষণা)।[2] বিশেষত খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকের পর থেকেই পোপতন্ত্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধীনে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে canonization (আনুষ্ঠানিক সাধু-স্বীকৃতি/ সন্ত ঘোষণা)-এর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু পূর্বের সহস্রাব্দে এতো বাধ্যবাধকতা আরোপ করে সাধু-স্বীকৃতি দেওয়া হতো না।

 

খ্রিস্টীয় প্রথম কয়েক শতাব্দীতে সাধক হিসেবে স্বীকৃতি মূলত স্থানীয় জনমানসের স্বতঃস্ফূর্ত ভক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হতো। যীশুখ্রিস্ট-সহ ধর্ম প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শহীদদের কবর বা স্মৃতিস্তম্ভের পাশে সাধারণ মানুষ নিজে থেকেই সম্মান জানাতেন, প্রার্থনা করতেন এবং উৎসব পালন করতেন। স্থানীয় বিশপ (Bishop/ধর্মযাজক) সাধারণত ওই ব্যক্তিকে সাধক ঘোষণা করে এই জনমানসের ভক্তিকে বৈধতা দিতেন।  চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে কনস্টানটাইনের যুগের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। শহীদদের পাশাপাশি কনফেসর (Confessor: Diocletianic Persecution-এর সময় যারা ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য কষ্ট-নিপীড়ন সহ্য করেছেন কিন্তু শহীদ হননি) ও অন্যান্য পবিত্র জীবনের মানুষদেরও সাধক হিসেবে গন্য করা হতো। এ সময় পর্যন্ত সন্ত-ঘোষণার সিদ্ধান্ত মূলত স্থানীয় বিশপ-দের হাতেই থাকত। সপ্তম থেকে দশম শতাব্দীতে স্থানীয় কাল্ট (Cult: ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মীয় জীবনযাপন পদ্ধতি) আরও সংগঠিত রূপ নেয়। এ সময়ে বিশপরা তদন্ত করে সাধকদের অনুমোদন দিতেন। কোনো কোনো সাধুদের ধ্বংসাবশেষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তর করতেন এবং নির্দিষ্ট উৎসবের দিন ঠিক করে দিতেন। পোপের ভূমিকা তখনও সীমিত ছিল। তিনি মাঝে মাঝে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করতেন বটে, কিন্তু তা বাধ্যতামূলক ছিল না।

 

মধ্যযুগে এসে আনুষ্ঠানিক ক্যাননাইজেশনের বিকাশ শুরু হয়। দশম ও একাদশ শতাব্দীতে পোপের কর্তৃত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। ৯৯৩ সালে পোপ জন পঞ্চদশ দ্বারা Ulrich of Augsburg (890– 4 July 973)-এর সাধু-স্বীকৃতির সম্ভবত ক্যাননাইজেশনের প্রথম উদাহরণ।[3] এরপর থেকে ধীরে ধীরে ক্যাননাইজেশনের জন্য পোপের অনুমোদন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে প্রক্রিয়া আরও আনুষ্ঠানিক ও কেন্দ্রীভূত রূপ লাভ করে। পোপ আলেকজান্ডার তৃতীয় (১১৫৯–১১৮১) স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে,  পোপের অনুমোদন ছাড়া নতুন কাউকে সাধু ঘোষণা করা যাবে না। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, বিশেষ করে পোপ গ্রেগরি নবম ও ইনোসেন্ট তৃতীয়ের সময়, সাধু-সন্ত তদন্ত প্রক্রিয়া আরো বেগবানভাবে চালু হয়। সাধকদের জীবনী যাচাই, অলৌকিক ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ এবং সাক্ষ্যগ্রহণ বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়। ১২৩৪ সালের গ্রেগরিয়ান ডিক্রেটালসে পোপদের একচ্ছত্র অধিকার স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়।[4] চতুর্দশ শতাব্দী ও তার পরবর্তী সময়ে এই প্রক্রিয়া আরও জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। ক্যাননাইজেশনের জন্য দীর্ঘ তদন্ত, অলৌকিকতার কঠোরতর যাচাই এবং রোমের চূড়ান্ত অনুমোদন অপরিহার্য হয়ে যায়। স্থানীয় জনমানসের ভক্তিকে ‘বেটিফিকেশন/ Beatification’ পর্যায়ে সীমিত রাখা শুরু হয়, আর পূর্ণ সাধুত্বের মর্যাদা পেতে হলে পোপের সিদ্ধান্তই একমাত্র পথ হয়ে দাঁড়ায়।

 

ফলে এতটুকু স্পষ্ট যে, ‘Patron Saint’ ধারণাটি একটি নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ইসলামি অধ্যয়ন, নৃতত্ত্ব ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের গবেষণায় একই পরিভাষা কখনো কখনো মুসলিম সুফি সাধক বা অলি-আউলিয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে। মার্টিন লিংস[5] (Martin Lings), রিচার্ড এম. ইটন[6] (Richard M. Eaton), কার্ল ডব্লিউ. আর্নস্ট[7] (Carl W. Ernst), নাইল গ্রিন[8] (Nile Green), জোসেফ মেরি[9] (Josef W. Meri) এবং শিভান মহেন্দ্ররাজাহ[10] (Shivan Mahendrarajah)-এর মতো বহু প্রথিতযশা গবেষকদের লেখায় এর বিভিন্ন উদাহরণ দেখা যায়। সুফি ঐতিহ্যে প্যাট্রন সেইন্ট নিয়ে মার্টিন লিংসের একটি বহুল উদ্ধৃত মন্তব্য হলো, “There is scarcely a region in the empire of Islam which has not a Sufi for its Patron Saint.”[11] এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। ‘Patron Saint’ যদি খ্রিষ্টীয় ধর্মতত্ত্বে গড়ে ওঠা একটি নির্দিষ্ট পরিভাষা হয়, তাহলে ভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক কাঠামো ও ভিন্ন ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গড়ে ওঠা সুফি অলি-ধারণাকে ব্যাখ্যা করতে এই শব্দটি কতটা যথাযথ? মুসলিম সুফিসাধকদের ভূমিকা বোঝার জন্য ‘Patron Saint’ কি একটি কার্যকর তুলনামূলক উপমা, নাকি এটি দুই ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের নিজস্ব ধারণাগত পার্থক্যকে আড়াল করে ফেলে, যা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করার সম্ভাবনা তৈরি হয়?‌ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে ‘Patron Saint’ ধারণাটিকে তার নিজস্ব খ্রিষ্টীয় প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। এরপর দেখতে হবে ইসলামি ঐতিহ্যে ওলি বা অলি-আউলিয়ার ধারণা কীভাবে গড়ে উঠেছে এবং সুফি চিন্তাধারায় এর ধর্মতাত্ত্বিক ও অধিবিদ্যাগত অর্থ-মাহাত্ম্য কী। তারপর দুই ঐতিহ্যের মধ্যে বাস্তব সামাজিক ও ধর্মীয় চর্চার ক্ষেত্রে যে সাদৃশ্য রয়েছে, সেগুলো যেমন চিহ্নিত করতে হবে, তেমনি তাদের মৌলিক পার্থক্যগুলোকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

 

ক্যাথলিক ঐতিহ্যে প্যাট্রন সেইন্ট: উৎপত্তি ও কাঠামো

খ্রিষ্টীয় সাধু ঐতিহ্যের (cult of saints) ঐতিহাসিক উৎপত্তি বোঝার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হলো– আইরিশ ইতিহাসবিদ পিটার ব্রাউন (Peter Brown: 1935- )-এর The Cult of the Saints: Its Rise and Function in Latin Christianity (১৯৮১) ।[12] ব্রাউনের মতে, তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যে খ্রিষ্টীয় সমাজে সাধুদের সমাধি, দেহাবশেষ (relics) এবং তাঁদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানকে কেন্দ্র করে যে ধর্মীয় ভক্তি গড়ে ওঠে, সেটিকে শুধু সাধারণ মানুষের কুসংস্কার বা প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মের অবশিষ্টাংশ হিসেবে দেখলে বিষয়টি ঠিকভাবে বোঝা যায় না। তৎকালীন রোমান সমাজের কোন কোন ধর্মীয়, রাজনৈতিক এবং সর্বোপরি কোন সামাজিক প্রেক্ষাপটে খ্রিস্টীয় সাধু ঐতিহ্যের উৎপত্তি হয়েছিল এবং নানা বিবর্তনের দরুন সময় ও যুগের চাহিদায় যে যে রূপ ধারণ করেছিল, ব্রাউন তার আলোচনায় অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তৎকালীন রোমান সমাজে একজন ক্ষমতাবান ব্যক্তি তাঁর অধীন বা নির্ভরশীল ব্যক্তির স্বার্থ রক্ষা করতেন এবং প্রয়োজনে তাঁর হয়ে ক্ষমতাবান কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করতেন। ব্রাউন দেখান, খ্রিষ্টীয় সাধুদের ক্ষেত্রেও অনেকটা একই ধরনের ধারণা তৈরি হয়। সাধুরা হয়ে ওঠেন মানুষের “আধ্যাত্মিক বন্ধু” (spiritual friends) এবং ঈশ্বরের কাছে মানুষের জন্য মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। এখান থেকেই patronus বা পৃষ্ঠপোষকতার ধারণার সঙ্গে সাধুদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। পরবর্তী সময়ে এই ধারণার সঙ্গে যুক্ত হয়ে “patron saint” বা পৃষ্ঠপোষক সাধু ধারণাটি আরো ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়।

 

ব্রাউনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, সাধুর সমাধি বা দেহাবশেষ কোনো নির্দিষ্ট স্থানের সঙ্গে যুক্ত হলে সেই স্থানটির ধর্মীয় গুরুত্বও বেড়ে যায়। অর্থাৎ কোনো বিশেষ স্থানে শায়িত সাধু ধীরে ধীরে ওই স্থান বা অঞ্চলের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন যে, সেই স্থানটির পরিচয়ই তাঁর নাম ও পবিত্রতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে যায়। মানুষের কাছে এটি এমন স্থান হয়ে ওঠে যেখানে পার্থিব জগত ও স্বর্গীয় জগতের মধ্যে একটি প্রতীকী সংযোগ তৈরি করে। ফলে কোনো সাধু শুধু ব্যক্তিগতভাবে ভক্তদের রক্ষাকর্তা নন; তিনি ধীরে ধীরে একটি শহর, অঞ্চল বা সম্প্রদায়েরও অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন। পরবর্তী মধ্যযুগীয় গবেষণাতেও এই পৃষ্ঠপোষকতার ধারণার গুরুত্ব দেখা যায়। বিশেষ করে জার্মান ঐতিহাসিকদের গবেষণায় patrocinia শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে সাধুদের পৃষ্ঠপোষকতা বোঝাতে। বিভিন্ন গির্জা ও মঠের নির্দিষ্ট সাধুর পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে যুক্ত হতো। সময়ের সঙ্গে এই সম্পর্কগুলো কোনো কোনো অঞ্চলের ধর্মীয় ও সামাজিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।

 

পূর্বে ইঙ্গিত জ্ঞাপন করা হয়েছে, সাধু-পৃষ্ঠপোষকতার ধারণা স্রেফ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। প্রাথমিক খ্রিষ্টীয় যুগে কোনো ব্যক্তিকে সাধু হিসেবে সম্মান করার ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণ, ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং বিশপদের স্বীকৃতি ও ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু মধ্যযুগে ধীরে ধীরে এই প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক কায়দায় পোপদের কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। বিশেষ করে দ্বাদশ শতাব্দীর পর সাধু হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য চার্চের পোপের অনুমোদন অপরিহার্য হয়ে উঠে।  পরবর্তীকালে এটি রোমান ক্যাথলিক গির্জায় ক্যাননাইজেশনের (canonization) একটি আনুষ্ঠানিক ও নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। কোনো ব্যক্তিকে সাধু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে তাঁর জীবন, ধর্মীয় চরিত্র এবং অলৌকিকতার দাবিগুলো পরীক্ষা করা হয়। এরপর beatification এবং শেষ পর্যন্ত canonization-এর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধুভক্তি শুধু একটি লোকায়ত ধর্মীয় বিশ্বাস হিসেবে থাকে না; বরং গির্জার আইন, প্রতিষ্ঠান, তদন্ত ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে বৈধতা পায়। প্যাট্রন সেইন্টদের ভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য আবার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। কোনো সাধু একটি শহর বা দেশের পৃষ্ঠপোষক, কোনো সাধু কোনো পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষের পৃষ্ঠপোষক, আবার কোনো সাধুকে নির্দিষ্ট রোগ[13], বিপদ, দুর্যোগ বা ভ্রমণের সময় রক্ষাকারী হিসেবে তাঁর ভক্তি করা হয়। ব্যক্তিগত পর্যায়েও কোনো ব্যক্তি নিজের নাম বা জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো সাধুকে বিশেষভাবে শ্রদ্ধা করতে পারেন।[14]

 

এই ধারণাটি তুলনামূলকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা সুফি ঐতিহ্যেও কোনো কোনো সুফি একটি শহর, রোগ, পেশা বা নির্দিষ্ট সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে: ক্যাথলিক খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে পৃষ্ঠপোষক সাধুর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। বিপরীতে সুফি-ঐতিহ্যে সাধারণত এমন কোনো একক কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেই, যে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় একজন অলিকে “পৃষ্ঠপোষক” হিসেবে ঘোষণা করে। তবে সুফি পরম্পরায় একজন ব্যক্তির আধ্যাত্মিক পরিচয় সাধারণত কোনো একক আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং তিনি কোনো পীর বা শায়খের সান্নিধ্যে থেকে তরিকার আধ্যাত্মিক অনুশীলন ও মরমী সাধনার বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করেন। পরবর্তীতে সেই পীরের কাছ থেকে ইজাযত বা খেলাফত লাভের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক কর্তৃত্বের স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেন। এরপর তিনি নিজস্ব খানকাহ, আস্তানা বা আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে পারেন এবং তাঁর শিক্ষা, সাধনা, আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও জনসম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল, শহর কিংবা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে উঠতে পারেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর মৃত্যুর পরও এই সম্পর্ক বিলুপ্ত হয় না। মাজার, দরগাহ, ওরস, মানত, জিয়ারত এবং স্থানীয় লোকস্মৃতির মধ্য দিয়ে তা আরও সুদৃঢ় হতে পারে। ফলে কোনো কোনো সুফি-অলি একটি নির্দিষ্ট শহর বা অঞ্চলের আধ্যাত্মিক অভিভাবক, রক্ষাকর্তা কিংবা প্রতীকী পৃষ্ঠপোষক হিসেবে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত হন। তবে এই মর্যাদা সাধারণত কোনো কেন্দ্রীয় ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে সংগঠিত হয় না; বরং দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা আধ্যাত্মিক পরম্পরা, শিষ্য-সম্প্রদায়, স্থানীয় স্মৃতি, মাজারকেন্দ্রিক ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং জনবিশ্বাসের সম্মিলিত ফল।

 

ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে “ওলি (Wali)” ধারণা

আরবি “ওলি” (wali) শব্দটি ولي মূলধাতু থেকে উদ্ভূত। এর মূল অর্থ হলো নৈকট্য, ঘনিষ্ঠতা বা কারও নিকটবর্তী হওয়া। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ওলি বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যিনি পরম আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেছেন[15]; বাংলায় একে বলা হয় “আল্লাহর বন্ধু”।[16] ইসলামি ঐতিহ্যের বিভিন্ন ধারা/ঘরানায় ‘ওলি’  শব্দটি ধার্মিক ব্যক্তি, আলেম (ধর্মতাত্ত্বিক জ্ঞানী), সুফি সাধকদের[17] ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ফলে নানা প্রেক্ষাপটে শব্দটির অর্থ উপলব্ধির জন্য এর ভাষাগত ও ধর্মতাত্ত্বিক বিভিন্ন দিক বিবেচনা করা জরুরি। এই প্রসঙ্গে وِلَايَة (wilaya/বিলায়াত: আদ্যক্ষর যের) এবং وَلَايَة (walaya/ওয়ালায়াত: আদ্যক্ষর যবর) দুইটি পরিভাষার ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। দুটোই একই শব্দমূল وَلِيَ থেকে এসেছে, যার মূল অর্থ– কাছাকাছি থাকা, বন্ধু হওয়া, বা কর্তৃত্ব রাখা। বিলায়াত (wilaya) বলতে সাধারণত আল্লাহর বন্ধুত্ব বা নৈকট্য ও আধ্যাত্মিক মর্যাদাকে বোঝানো হয়। অন্যদিকে ওয়ালায়াহ (walaya) বলতে বোঝায়, কোনো ব্যক্তির অন্যের ওপর কর্তৃত্ব, সুরক্ষা বা মধ্যস্থতার ক্ষমতা।[18] অর্থাৎ ওলির ধারণার মধ্যে একই সঙ্গে দুটি দিক বিদ্যমান, একটি হলো পরম সত্তা আল্লাহর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অন্যটি হলো মানুষের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সম্পর্ক, কর্তৃত্ব ও প্রভাব।

 

ফরাসি ইসলামবিদ অঁরি করবাঁ (Henry Corbin) এবং পরবর্তীতে কার্ল আর্নস্ট (Carl Ernst)-এর আলোচনায় এই Waliya ও Walaya এর পার্থক্যের বিশ্লেষণ বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। Henry Corbin এই শব্দ দ্বয়ের স্বরপার্থক্যকে বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, সুফি ঐতিহ্যে ‘বিলায়াত’ মূলত সাধুত্ব (sainthood) বা আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার ধারণার সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে শিয়া সম্প্রদায়ের চিন্তায় ‘ওয়ালায়াহ’[19] তাঁদের ইমামদের আধ্যাত্মিক ও দীক্ষামূলক কর্তৃত্ব/নৈকট্য (initiation to the Imam) বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়।[20] পরবর্তী গবেষক Carl Ernst এবং Hermann Landolt বলেন, এই স্বরগত পার্থক্য অতিরঞ্জিত ও শিয়া-কেন্দ্রিক ব্যাখ্যা। বাস্তবে সুফি-সুন্নি ও শিয়া উভয় ধারায় শব্দ দুটো প্রায়ই বিনিময়যোগ্যভাবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং ধারণাগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। আরবি টেক্সটে সাধারণত স্বরচিহ্ন দেওয়া থাকে না, তাই এর অর্থ পাঠক নিজেই নির্ধারণ করেন।[21] [22] ফলে পাঠক সহজেই এটুকু আন্দাজ করতে পারবেন, একই শব্দমূল থেকে গড়ে ওঠা ধারণাগুলো বিভিন্ন ইসলামি ধারায় ভিন্ন ধর্মতাত্ত্বিক অর্থ গ্রহণ করেছে। ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বে সর্বপ্রথম ওলি-ধারণাটি উপস্থাপিত হয়েছিল পবিত্র কুরআনের সূরা ইউনুসের ৬২–৬৪ নম্বর আয়াতে,[23] সেখানে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আল্লাহর ওলিদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।” এই আয়াতের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী ইসলামি ও সুফি দর্শন-চিন্তায় অলি/সুফিদেরকে একটি বিশেষ অধ্যাত্ম-গোষ্ঠী হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। পরবর্তী নবী মুহাম্মদ (দ.)-এর সাহাবিদের উদ্দেশ্যে করা আলোচনা বা হাদিসের মাধ্যমে এই ধারণা আরও বিস্তৃত হয়।

 

কালের আবর্তে ইসলামি ও সুফি সাহিত্যে ‘ওলি’ ধারণাটি স্রেফ আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত একজন ধার্মিক ব্যক্তির পরিচয় হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর সঙ্গে একটি বিস্তৃত অতীন্দ্রিয় জীবনদর্শন/মহাজাগতিক জীবনবোধ এবং অলিদের পারস্পরিক মর্যাদা ও অবস্থান নিয়ে একটি সোপানভিত্তিক কাঠামোর (hierarchy) ধারণাও বিকশিত হয়। এই ধারণার বিকাশে এমন এক সুফি বিশ্বতত্ত্ব (Sufi Cosmology) কাজ করছিল, যেখানে দৃশ্যমান বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের পাশাপাশি অদৃশ্য স্রষ্টার সাথে দৃশ্যমান সৃষ্টির আধ্যাত্মিক সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকৃত। এখানে অদৃশ্য স্রষ্টার সাথে দৃশ্যমান সৃষ্টির মধ্যকার আধ্যাত্মিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে, এ সম্পর্ক মূলত সুফি/ওলিরাই তৈরি করে থাকেন। সুফি কসমোলজির সবচেয়ে সুসংবদ্ধ ও দার্শনিক ব্যাখ্যা[24] পাওয়া যায় আন্দালুসীয় সুফি চিন্তাবিদ মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবি (Ibn Arabi, ১১৬৫–১২৪০)-এর রচনায়।[25] ইতিহাসে তিনি আশ-শাইখ আল-আকবর (al-Shaykh al-Akbar/ মহত্তম শায়খ) নামে পরিচিত।

 

ইবনে আরাবি ও আল-হুজভীরীর[26] আলোচনায় অলিদের বিভিন্ন আধ্যাত্মিক মর্যাদা বা শ্রেণির উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে কুতুব (qutb), গাউস (ghawth), ইমাম, আউতাদ (awtad), আবদাল (abdal), নুজাবা (nujaba) এবং নুকাবা (nuqaba) প্রভৃতি স্তর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।[27] পরবর্তী সুফি সাহিত্যে এগুলোকে একটি আধ্যাত্মিক সোপানভিত্তিক কাঠামোর (Hierarchical  Structure) অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই কাঠামোর সর্বোচ্চ মর্যাদায় আসীন হলেন– গাউসুল আজম বা কুতুবুল আকতাব।[28] এটি বেলায়তের সর্বোচ্চ স্তর। যিনি একত্রে কুতুব ও গাউসের মর্যাদা ধারণ করতে পারেন এবং মানুষ থেকে খোদা পর্যন্ত সম্পর্ক তৈরি করার তিনি সর্বশ্রেষ্ট সাহায্যকারী। তার পরের স্তর গাউস ও কুতুবের। মানুষের ফরিয়াদ কবুলের মাধ্যম হিসেবে প্রতি যুগের প্রতি অঞ্চলে ১ জন করে গাউস ও কুতুব নিয়োজিত হন।[29] এরপর দুইজন ইমামের স্তর। কুতুব স্তরের অলির দুই বিশেষ সহযোগী। একজন সাহিবুল ইয়ামিন (ডান)– তিনি কুতুবের অনুমতিতে মালাকুত ও অদৃশ্য জগতের বিষয়াদি পরিচালনা করেন। অন্যজন সাহিবুশ শিমাল (বাম)– তিনি মুলক ও দৃশ্যমান জগত পরিচালনা করে থাকেন।[30] এরপর আউতাদ (awtad: যার অর্থ স্তম্ভ/খুঁটি) এর স্তর। সারা পৃথিবীতে ৪ জন আওতাদ থাকেন এবং পৃথিবীর চার দিক (পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর ও দক্ষিণ) স্থির ও সুরক্ষিত রাখেন। এরপর আখইয়ার (Akhyar)। এই স্তরে ৭ জন নির্বাচিত অলি থাকেন। যাঁরা সমগ্র পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত ভ্রমণে থাকেন এবং জনসাধারণের জটিল-কঠিন সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হন। এরপর আবদাল (abdal)। এই স্তরে নিয়োজিত ৪০ জন সুফির অন্যতম কাজ হলো, বৃষ্টি নাজিল, শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য, বিপদ-আপদ দূর এবং পৃথিবীর আধ্যাত্মিক ভারসাম্য রক্ষা করা। এরপরের স্তর নুজাবা (nujaba)। এ স্তরে ৭০ জন সুফি মনোনীত হন। যাদের কার্যক্রম হলো, সৃষ্টির বিষয়াদি ঠিক করা ও সংস্কার করা এবং মানুষের হক (অধিকার) সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করা। সর্বশেষ স্তর নুকাবা (nuqaba)। প্রতি যুগে নিয়োজিত ৩০০ জন নুকাবা জনমানুষের সঙ্গে থাকেন, তাদের দোষ-ত্রুটি সংশোধন করেন এবং নম্রভাবে ভালো কাজের দিকে পরিচালিত করেন।[31] এরপরে অন্যান্য সাধারণ সুফি-অলিরা। এসব স্তরের কোনো অলি যদি মারা যান এবং ওই স্তরটি শূণ্য হলে, পরবর্তী স্তরের অলিকে উক্ত পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। সাধকগণ বিশ্বাস করেন, ক্ষণিকের জন্যও এই সকল স্তরের কোনো পদ শূণ্য রাখা যাবে না, এটি সমাজ-বিশ্বের জন্য অত্যন্ত অকল্যাণকর হবে। তবে বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরী, ইবনে আরাবির সুফিদর্শনকে কেবল ‘অলিদের সোপানভিত্তিক কাঠামো’ হিসেবে পড়লে তাঁর সুফিতত্ত্বের প্রকৃত তাৎপর্য অনুধাবন করা কঠিন। তাঁর কাছে ওলায়াত মূলত পরমাত্মার সঙ্গে মানবাত্মার আধ্যাত্মিক সম্পর্ক, মানব-পরিপূর্ণতা এবং হাকিকত বা পরম সত্যের উপলব্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ কুতুব, আবদাল বা অন্যান্য শ্রেণি কোনো আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামোর মতো সাংগঠনিক পদ নয়, বরং এগুলো সুফি কসমোলজির মধ্যে আধ্যাত্মিক মর্যাদা ও ভূমিকা বোঝানোর ধারণাগত কাঠামো। ফরাসি ইসলামবিদ মিশেল শোদকিয়েভিচ (Michel Chodkiewicz) তাঁর The Seal of the Saints: Prophethood and Sainthood in the Doctrine of Ibn Arabi গ্রন্থে ইবনে আরাবির সুফিতত্ত্বের সঙ্গে নবুয়তের সম্পর্ক এবং এর অন্তর্নিহিত আধ্যাত্মিক কাঠামো বিশদভাবে বিশ্লেষণ করেছেন।[32]

 

পরবর্তী সময়ে অলিদের এই সোপানভিত্তিক কাঠামোগত ধারণা আধ্যাত্মিক মর্যাদার প্রশ্নকে ছাপিয়ে, এর সঙ্গে কোনো কোনো বিশেষ ভৌগোলিক স্থান, জনপদ ও সামাজিক সম্প্রদায়ের সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। সুফি-সাধকদের অনুসারীদের মধ্যে এমন বিশ্বাস গড়ে উঠেছে, কোনো বিশেষ সুফি-সাধক একটি নির্দিষ্ট শহর, অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক কল্যাণের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। তিনি সেই এলাকায় ধর্মের প্রচার করেন, সেখানে জুলুমিয়াতকে রফাদফা করে ইনসাফিয়াত প্রতিষ্ঠা করেন এবং নগর-সভ্যতা গড়ে তুলতে ও  ওই অঞ্চলের কাগজে-কলমে,  মগজে-মননে, চেতনা-দর্শনে, সামগ্রিকভাবে গোটা সমাজেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট হন। এভাবে একজন অলি ধীরে ধীরে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ধর্মীয় স্মৃতি, সামাজিক পরিচয় এবং স্থানমাহাত্ম্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যেতে পারেন। তাঁর খানকাহ, মাজার বা সমাধিস্থল তখন একজন মরহুম সাধকের স্মৃতিচিহ্নের পাশাপাশি একটি নির্দিষ্ট জনপদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভূগোলের অংশে (geographic patronage) পরিণত হয়। এই পর্যায়ে এসে ইসলামি অলি-ধারণা এবং রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের patron saint ধারণার মধ্যে একটি কার্যকর তুলনার সুযোগ সৃষ্টি হয়। উভয় ঐতিহ্যেই কোনো পবিত্র ব্যক্তির সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট শহর, অঞ্চল, পেশা বা সম্প্রদায়ের বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে এবং সেই ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর আধ্যাত্মিক কল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করা যায়। কিন্তু এই কার্যকরী সাদৃশ্যকে ধর্মতাত্ত্বিক সমতা (Theological Equality) হিসেবে গ্রহণ করা উচিত নয়। ক্যাথলিক patron saint ধারণা একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও ক্যানোনাইজেশন ব্যবস্থার মধ্যে বিকশিত হয়েছে, অন্যদিকে ইসলামি অলি-ঐতিহ্য কোনো একক কেন্দ্রীয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সর্বত্র একই পদ্ধতিতে সংজ্ঞায়িত ও বিকশিত হয়নি। ফলে ‘অলি’ এবং ‘patron saint’ একই ধরনের সামাজিক-ধর্মীয় ভূমিকা পালন করতে পারে এমনটি কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেলেও, তাঁদের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি, স্বীকৃতির পদ্ধতি এবং সাধুত্বের ধারণা মৌলিকভাবে ভিন্ন।

 

কাঠামোগত সাদৃশ্য: ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে “প্যাট্রন সেইন্ট” ব্যবহার করার ব্যাখ্যা

পূর্বে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, “প্যাট্রন সেইন্ট” এবং সুফি “অলি” একই ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা নয়। খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে patron saint একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক ও ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা, অন্যদিকে ইসলামে wali বা অলি-ধারণারও নিজস্ব কুরআনিক, হাদিসগত ব্যাখ্যা রয়েছে। তবু তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মীয় ইতিহাসে গবেষকেরা কখনো কখনো “patron saint” শব্দটি সুফি-সাধকদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন। মূলত সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যকারিতার সাদৃশ্যতার কারণেই এই ব্যবহার । কিছু পয়েন্ট নির্ধারণ করে এই সাদৃশ্যের বিষয়টি বোঝা যেতে পারে।

 

১. জনসাধারণের স্বতঃস্ফূর্ত ভক্তি ও স্বীকৃতি: ইসলামে অলি-ঐতিহ্যে কোনো ব্যক্তিকে অলি হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সাধারণত ক্যাথলিক চার্চের মতো একক কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের নিকট হতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রয়োজন হয় না। অনেক সময় সাধকের জীবদ্দশায় প্রাপ্ত খ্যাতি, শিষ্য-সম্প্রদায়ের স্মৃতি, মানুষের ভক্তি এবং মৃত্যুর পর তাঁর মাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা লোকাচারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সমাজে তাঁর ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ, এখানে জনসাধারণের স্মৃতি-ভক্তি নিজেই সুফিদের সুফিত্বের সামাজিক স্বীকৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুফিদের সুফিত্ত্ব স্বীকৃতির জন্য  আলেম, তরিকা বা নানা ধর্মীয় কর্তৃত্বের ভূমিকা থাকতে পারে বটে। কিন্তু স্বীকৃতির ধরনটি ক্যাথলিক ক্যাননাইজেশনের মতো কেন্দ্রীভূত প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল নয়। এখানেই “প্যাট্রন সেইন্ট” পরিভাষার তুলনামূলক ব্যবহারটি বোঝা যায়। এতে প্যাট্রন সেইন্ট বলতে এমন সুফিকে বোঝায়, যিনি নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠী, জনপদ, শহর বা সামাজিক জীবনের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে উঠেছেন, তিনি যেন ওই জনগোষ্ঠীর ধর্মীয়-আধ্যাত্মিকসহ সামগ্রিক পরিচয়েরই অংশ। তাঁর মাজার-দরগাহ তখন সেই জনগোষ্ঠীর ভক্তি-স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং সামাজিক সংহতির এক জীবন্ত কেন্দ্র ও নিদর্শন।[33]

 

২. ভূগোল ও সাধকের আধ্যাত্মিক অধিক্ষেত্র: কার্ল আর্নস্ট[34], রিচার্ড ইটন[35] ও নাইল গ্রিন[36]-এর মতে, সুফি ঐতিহ্যকে শুধু খানকা, তরিকা বা সুফিতত্ত্ব ও কাঠামো দিয়ে বোঝা যথেষ্ট নয়। সাধকদের মাজার, সমাধি, তীর্থযাত্রা এবং সেসব স্থানকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্থাপত্য ও সামাজিক সম্পর্কও সুফি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে মাজার এমন এক সামাজিক কেন্দ্রে পরিণত হয়, যেখানে ভক্তি, স্মৃতি, অর্থনৈতিক লেনদেন এবং স্থানীয় ক্ষমতা-সম্পর্ক একসঙ্গে জড়িয়ে থাকে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে একটি মাজার কালের আবর্তে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ধর্মীয় স্মৃতি, সামাজিক পরিচয় ও পবিত্র (ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অর্থে) ভূগোল (Sacred Geography)-এর কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। নাইল গ্রিন এ ধরনের স্থানকে “সাধুর রাজ্য (Realm of the saint)” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।[37] গ্রিনের মতে, সুফি-সাধকগণ সেই অঞ্চলের পবিত্র ভূদৃশ্যের প্রধান ও মুখ্য চরিত্র, যার উপস্থিতিতে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন, উৎসব, বিচার-সালিশ এবং এমনকি রাজনৈতিক পরিচয়কেও প্রভাবিত করে থাকে ।[38]এখানে “প্যাট্রন সেইন্ট”-এর সঙ্গে কাঠামোগত সাদৃশ্যটি স্পষ্ট। ইউরোপীয় খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে কোনো সাধক একটি শহর, অঞ্চল বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জন্য আধ্যাত্মিক কল্যাণের লক্ষ্যে বিশেষভাবে যুক্ত হতে পারেন এবং সেই সম্পর্ক কালক্রমে আঞ্চলিক আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। একইভাবে মুসলিম সমাজেও কোনো অলি কোনো শহর বা অঞ্চলের ধর্মীয় স্মৃতি ও ভৌগোলিক পরিচয়ের প্রধানতম মাধ্যম/প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। বারংবারই এই পার্থক্যটি উচ্চারিত হচ্ছে, এই সাদৃশ্যটি ভৌগোলিক ও সামাজিক স্মৃতির স্তরে, ধর্মতাত্ত্বিক পরিচয়ের স্তরে নয়।

 

৩. মধ্যস্থতা, বরকত ও ওসিলা: তুলনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যকার মধ্যস্থতা (intercession) এবং সাধকের সঙ্গে ভক্তের সম্পর্ক। খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে সাধকদের intercession of saints বলতে, বিশ্বাসীরা সাধকদের কাছে প্রার্থনা বা অনুরোধ করতে পারেন, যাতে তাঁরা সরাসরি ঈশ্বরের কাছে তাদের জন্য সুপারিশ করেন। বিশেষ করে ক্যাথলিক, পূর্ব অর্থোডক্স, আসিরীয় ও প্রাচ্য অর্থোডক্স গির্জাসমূহ এবং কিছু অ্যাংলিকান ও লুথারান সম্প্রদায়ের সাধুদের এই মধ্যস্থতার ধারণাটি বহুল চর্চিত। বৃহত্তর ইসলামি সুফি-ঐতিহ্যের সঙ্গে একে দুইভাবে তুলনা করা যেতে পারে, বরকত ও ওসিলা। কোনো অলির সঙ্গে সম্পর্কিত স্থান, বস্তু বা স্মৃতিকে অনেক ভক্ত আধ্যাত্মিক বরকতের উৎস হিসেবে বিবেচনা করেন। বাংলার লোকজ ধর্মীয় সংস্কৃতিতে এই ধারণার একটি আকর্ষণীয় প্রকাশ পাওয়া যায় চট্টগ্রামের জনপ্রিয় লোকগানের পঙ্‌ক্তিতে:

“মামলার জন্য শাহ আমানত,

পাশের জন্য মিসকিন,

ধনের জন্য গরিবউল্লাহ শাহ,

সেফার জন্য মহসিন,

গাউসে ভান্ডারী বানাবেন কামেল আউলিয়া।”

 

গানটির বক্তব্যকে সরাসরি ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদ হিসেবে না দেখে জনমানসে অলি-সম্পর্কিত বিশ্বাসের একটি সাংস্কৃতিক প্রকাশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত। এখানে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ প্রয়োজন বা সংকটের সঙ্গে বিশেষ কোনো অলির নাম যুক্ত হয়ে গেছে। অর্থাৎ, জনস্মৃতিতে কোনো অলি কেবল একজন সাধক হিসেবে উপস্থিত নন, বরং তাঁর জীবদ্দশার কোনো ঘটনা, কারামাত, সামাজিক ভূমিকা কিংবা ইন্তেকালের পর তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা কোনো কাহিনি ধীরে ধীরে তাঁকে একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করে দিয়েছে। এখানে স্মৃতি অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো সাধককে ঘিরে গড়ে ওঠা অলৌকিক কাহিনি, কারামাত, দানশীলতা, রোগমুক্তির বর্ণনা, বিপদ থেকে রক্ষার ঘটনা কিংবা স্থানীয় কোনো ঐতিহাসিক স্মৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হতে পারে। সময়ের সঙ্গে এসব স্মৃতি একটি নির্দিষ্ট অলি ও একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে। ফলে “কোনো বিশেষ প্রয়োজনের জন্য কোনো বিশেষ অলির কাছে যাওয়া” অনেক সময় ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে ছাপিয়ে এটি স্থানীয় ধর্মীয় সংস্কৃতি ও সামাজিক স্মৃতি ও সংহতির অংশ হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়াতেই মাজার জিয়ারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সামাজিক স্থানে পরিণত হয়। ভক্ত সেখানে গিয়ে দোয়া করেন, কুরআন তিলাওয়াত করেন, মানত করেন, কিংবা অলির স্মৃতিকে সামনে রেখে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। কেউ কেউ অলিকে ওসিলা হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহর নৈকট্য কামনা করেন। অর্থাৎ, মাজারের গুরুত্ব তখন সাধকের স্মৃতি, পবিত্রতা, বরকত এবং ভক্তির দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাসের সমন্বয়ে তৈরি হয়। তবে এখানে একটি মৌলিক ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্য হলো: ইসলামের ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে অলি বা সাধকের কোনো স্বাধীন ঐশ্বরিক ক্ষমতা স্বীকার করা হয় না। বরকত, ওসিলা বা শাফাআতের ধারণাকে যারা গ্রহণ করেন, তারা সাধারণত এটিকে আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীনে একটি মধ্যস্থতাকারী মাধ্যম হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অন্যদিকে এ ধরনের সাধু-ভক্তি ও মধ্যস্থতার বৈধতা নিয়ে মুসলিম সমাজের ভেতরেই দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক রয়েছে।

 

জোসেফ মেরির গবেষণায় মধ্যযুগীয় সিরিয়ার মুসলিম ও ইহুদি সাধু-ঐতিহ্যে ধারণাগতভাবে ‘বরকত (Barakah)’ এর উপস্থিত ছিল।[39] এখানে বরকত বলতে, সাধক, তাঁর সমাধি, স্থান, বস্তু ও তাঁকে ঘিরে গড়ে ওঠা স্মৃতির মাধ্যমে পরম স্রষ্টার নৈকট্যলাভ করার একটি মাধ্যমকে বোঝানো হয়। ফলে সাধকের মৃত্যুর পরও তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত স্থান ও বস্তু ভক্তদের কাছে ধর্মীয়-ঐতিহ্যগতভাবে অর্থপূর্ণ হয়ে থাকে। সেনেগালের মুরিদিয়া তরিকার শেখ আহমাদু বাম্বার উদাহরণেও এই ধারণা আরো স্পষ্ট। অ্যালেন রবার্টসের গবেষণায়, বাম্বার প্রতিকৃতি (দেওয়াল চিত্র) তাঁর ভক্ত ও মুরিদদের মাঝে আধ্যাত্মিক কল্যাণের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়।[40] রবার্টস এ ঘটনাকে লাতিন আমেরিকার সেইন্ট ভার্জিন অব গুয়াদালুপ’র প্রতিকৃতিকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন। উভয় ক্ষেত্রে সাধকের প্রতিকৃতিই ভক্তের কাছে সেই সাধকের স্মৃতি ও উপস্থিতিকে অনুভব করার একটি মাধ্যম। অর্থাৎ, প্রতিকৃতির গুরুত্ব যতটা না বস্তুগত, তার চেয়ে ঢের বেশি যুক্ত ধর্মীয় স্মৃতি ও উপস্থিতির কল্পনা/অনুভূতিতে। পাঠকের মনে প্রশ্ন উত্থাপিত হতে পারে, শারীরিকভাবে অনুপস্থিত একজন ব্যক্তি কীভাবে ভক্তের ধর্মীয় জীবনে, মগজে-মননে উপস্থিত ও কার্যকর থাকেন? মূলত বিদ্যমান মাজার-দরবার, প্রতিকৃতি, স্মারক, জীবনী কিংবা কারামাতের কাহিনী এই উপস্থিতির অনুভূতিকে ধরে রাখে। অর্থাৎ, সাধকের স্মৃতি কোনো স্থান বা বস্তুর সঙ্গে যুক্ত হলে, তা সাধকের অনুপস্থিতি স্বত্ত্বেও ভক্তের কাছে এক ধরনের উপস্থিতির অনুভূতি প্রদান করতে পারে।

এছাড়া কাঠামোগত শ্রেণীবিন্যাস ও উভয়ে ক্ষেত্রে সাধুত্বের ধারাবাহিকতাসহ নানা আঙ্গিকে তুলনামূলক বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি করে।

 

বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্যাট্রন সেইন্ট

সাধারণত সুফিদের সীমারেখা যেকোনো অঞ্চল-কাল-পাত্রের ঊর্ধ্বে। তবু স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় কোথাও কোনো অলি একটি শহরের আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে পরিচিত হতে পারেন, কোনো পেশাজীবী সম্প্রদায় তাঁকে নিজেদের রক্ষাকর্তা হিসেবে ভক্তি ও স্মরণ করতে পারে, আবার কোথাও তাঁর মাজার রাজনৈতিক বৈধতা, সামাজিক পরিচয় ও স্থানীয় পবিত্র ভূগোলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এই আঞ্চলিক বৈচিত্র্যই “প্যাট্রন সেইন্ট” ধারণাটিকে তুলনামূলক বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে বোঝার সুযোগ তৈরি করে ।

 

১. মরক্কো: মরক্কোর মারাকেশ শহরের ক্ষেত্রে, সেউতা থেকে আগত সুফি আবু আল-আব্বাস আস-সেবতি (Abu al-Abbas al-Sabti)। যিনি মরক্কোর প্রধান সাতজন সাধকের (“Seven Saints of Marrakesh”) একজন। তাঁকে ঐতিহাসিক ও পর্যটন সাহিত্যে ‘Patron Saint of Marrakesh’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।[41] একইভাবে এল জাদিদার নিকটবর্তী তিত গ্রামের প্রতিষ্ঠাতা সুফি আবু আবদাল্লাহ মুহাম্মদ আমঘার (Abu Abdallah Mohammed Amghar)ও ‘Patron Saint of Tit’ হিসেবে পরিচিত।[42] যিনি আলমোরাভিদ যুগে মাগরিবের প্রথম সুফি তরিকা তাইফা সানহাজিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। সাফি শহরের ক্ষেত্রে এরিক রসের মরক্কোর সমুদ্রতীরবর্তী উপকূলীয় অঞ্চলের মাজার গবেষণায় সিদি বু সালিহর (Sidi Bou Salih/ Abu Muhammad Salih (1155–1234) জাউইয়া (zawiya)-র কথা পাওয়া যায়। তিনিও ‘patron saint of Safi’ হিসেবে পরিচিত।[43] রস আরো উল্লেখ করেন, মরক্কোর মাজারগুলো শহরের প্রবেশপথ, বাণিজ্যিক এলাকা বা গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক স্থানের কাছাকাছিই গড়ে ওঠে। এসব মাজারকে কেন্দ্র করে মাওলিদ উপলক্ষে moussem বা তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শোভাযাত্রা, ভোজ, রাত্রিজাগরণ এবং ঘোড়সওয়ারি প্রদর্শনীর মতো জনসম্পৃক্ত আয়োজন হয়ে থাকে।[44]

 

২. আফগানিস্তান-ইরান সীমান্ত: শিভান মহেন্দ্ররাজাহর The Sufi Saint of Jam গ্রন্থে দেখা যায়[45], প্রায় নয়শ বছর ধরে আহমাদ-ই জামের (Ahmad-i Jam) মাজার বিভিন্ন শাসকের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য তৎকালীন মঙ্গোল, কার্তিদ, তৈমুর ও তৈমুরীয় শাসকেরা মাজারটির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিল। সাধক যেমন জনগণের কাছে আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন, তেমনি শাসকরাও তাঁর মাজারের পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ধর্মীয় বৈধতা ও প্রতীকী মর্যাদা অর্জনের চেষ্টা করেছেন। মহেন্দ্ররাজাহর গবেষণায় আহমাদ-ই জামকে “বাদশাহদের অভিভাবক” (Patron saints/ Guardian of Kings) হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

 

৩. সিরিয়া: জোসেফ ডব্লিউ. মেরির The Cult of Saints among Muslims and Jews in Medieval Syria মধ্যযুগীয় সিরিয়ায় মুসলিম ও ইহুদি সাধু-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক গবেষণা। তিনি সাধুদের জীবনী, মাজার, স্থাপত্য, ভক্তিমূলক বস্তু এবং তীর্থযাত্রার মতো বিষয় বিশ্লেষণ করে দেখান যে, পবিত্র ব্যক্তিকে ঘিরে গড়ে ওঠা ধর্মীয় সংস্কৃতি শুধু ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় ছিল না, বরং তা ভৌগোলিক পরিচয় ও সামাজিক সংহতির নিদর্শনস্বরূপ।[46] এই ধারাবাহিকতার অন্যতম উদাহরণ শেখ আকিল আল-মানবিজি (Shaykh Aqil al-Manbiji: ইন্তে. ১১৫৫ খ্রি.)।[47] তাঁকে ঘিরে প্রচলিত হ্যাজিওগ্রাফিক ও ঐতিহাসিক বিবরণ অনুসারে, তিনি একজন রহস্যবাদী সাধক এবং বিশ্বাসীদের জন্য উপকারী আধ্যাত্মিক মধ্যস্থতাকারী ও সুরক্ষার মাধ্যম (ওসিলা) হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। জনমুখে প্রচলিত, সাগরে ঝড়ের কবলে পড়া একদল মানুষ তার বরকতে রক্ষা পেয়েছিল। সর্বোপরি তিনি সিরিয়ার মানবিজের (Manbij) একজন প্যাট্রন সেইন্ট।[48]

 

৪. মধ্য এশিয়া: উজবেকিস্তানের রিশতন শহরের মৃৎশিল্পী সম্প্রদায়ের ওপর করা গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘ  সত্তর বছর ব্যাপী সোভিয়েত শাসনের মধ্যেও স্থানীয় কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা বা apprenticeship প্রথা কিছু পুরোনো ইসলামি ঐতিহ্য ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।[49] এর মধ্যে ইসলামি পৃষ্ঠপোষক সাধুদের (Islamic patron saints) প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মতো প্রাচীন প্রথাগুলোও এই apprenticeship system-এ সংরক্ষিত  ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সুফি হয়ে উঠেন একটি পেশাগত সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও পরিচয়ের অংশ। এই দিকটি খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের পেশাভিত্তিক patron saint-এর সঙ্গে কার্যকরীভাবে তুলনীয়। যেমন খ্রিষ্টীয় সমাজে কোনো সাধু কাঠমিস্ত্রি, জেলে বা অন্য কোনো পেশার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পরিচিত হতে পারেন, তেমনি মুসলিম সমাজেও কোনো অলি নির্দিষ্ট কারুশিল্পী সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক অভিভাবক হিসেবে স্মরণীয় হতে পারেন।

 

৫. দক্ষিণ এশিয়া (খুলদাবাদ ও দাক্ষিণাত্য): দক্ষিণ এশিয়ায় খুলদাবাদ সুফি মাজারকেন্দ্রিক পবিত্র ভূগোলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। কার্ল আর্নস্টের Eternal Garden গ্রন্থে[50] চিশতিয়া তরিকার সাধক শায়খ বুরহান আল-দীন গরিব (মৃত্যু ১৩৩৭) ও তাঁর শিষ্যদের ভূমিকার মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, কীভাবে খুলদাবাদ দাক্ষিণাত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুফি তীর্থকেন্দ্রে পরিণত হয়। পূর্বে আলোচিত হয়েছে, পরবর্তীকালে নাইল গ্রিন সুফি মাজারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ধরনের পবিত্র ভূগোলকে “realm of the saint” ধারণার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেন।

 

৬. বাংলা (পীর-মাজার সংস্কৃতি): বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এই ঐতিহ্যের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হলো পীর-মাজার সংস্কৃতি। মধ্যযুগ থেকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল, জনপদ ও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নির্দিষ্ট পীর ও সুফি সাধকের বিশেষ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো পীর একটি নির্দিষ্ট এলাকার আধ্যাত্মিক রক্ষাকর্তা হিসেবে পরিচিত হয়েছেন, কোনো মাজার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পবিত্র কেন্দ্র হয়ে উঠেছে, আবার কোনো সাধকের নাম ওই অঞ্চলের ভৌগোলিক, সামাজিক বা ঐতিহাসিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। রিচার্ড এম. ইটনের গবেষণায় দেখা যায়, বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সুফি শায়খ ও পীরদের ঘিরে যে ধর্মীয় ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি হয়েছিল, তা মুসলিম সমাজ বিস্তারে বা ইসলাম ধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।[51] এখনো মাজার, লোককাহিনি, সাহিত্য ও স্থানীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির মাধ্যমে এসব টিকে আছে। নৃতত্ত্ববিদ পিটার জে. বার্তোচ্চি (Peter J. Bertocci)-র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলার জনসাধারণের ধর্মীয় জীবনে পীরদের প্রতি শ্রদ্ধা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক।[52] পীরদের কবর-মাজার/ দরগাহকে পবিত্র স্থান হিসেবে জিয়ারত করার প্রবণতা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। এখানকার পীর-মাজার সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো– স্থানীয় ও বহুমাত্রিক চরিত্র। কোনো কোনো মাজারকে ঘিরে মুসলিম ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণ দেখা যায় এবং স্থানীয় সংস্কৃতির বিভিন্ন আচার মাজারকেন্দ্রিক ধর্মীয় জীবন-সংস্কৃতির সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে।[53]

 

তত্ত্বগত পার্থক্য ও সীমাবদ্ধতা: ‘প্যাট্রন সেইন্ট’র পরিভাষাগত সতর্কতা

সুফি, অলি ও খ্রিষ্টীয় ‘প্যাট্রন সেইন্ট’-এর মধ্যে কিছু সামাজিক ও ধর্মীয় সাদৃশ্য থাকলেও মৌলিক অর্থে দুটি ভিন্ন। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো: তাদের স্বীকৃতির ধরন। ক্যাথলিক খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যে প্যাট্রন সেইন্ট স্বীকৃতির একটি আনুষ্ঠানিক ও কেন্দ্রীভূত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে। নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে সাধু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং পোপ ও ভ্যাটিকান এই প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত কর্তৃত্ব পালন করে। এর বিপরীতে ইসলামে অলি-ঐতিহ্যে এমন কোনো একক কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ নেই, যে একজন ব্যক্তির অলিত্বকে, সাধনাকে সর্বজনীনভাবে স্বীকৃতি দেবে। কোনো অলির মর্যাদা সাধারণত তাঁর আধ্যাত্মিক খ্যাতি, মানুষের ভক্তি, তরিকার ঐতিহ্য, মাজারকেন্দ্রিক স্মৃতি, হ্যাজিওগ্রাফি এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা লোকঐতিহ্যের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে, একজন সুফি, অলি একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ হলেও অন্য অঞ্চলে তাঁর পরিচিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে।

 

ধর্মতাত্ত্বিক দিক থেকেও দুই ঐতিহ্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই সাধকের মাধ্যমে মানুষের উপকার, দোয়া কবুল বা মধ্যস্থতার ধারণা পাওয়া গেলেও এর ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এক নয়। ইসলাম তাওহীদী বা একত্ববাদী  ধারণায় কোনো অলি নিজস্ব বা স্বাধীন ক্ষমতার অধিকারী নন, সকলেই পরম স্রষ্টার অনুগ্রহের উপর নির্ভরশীল। সুফি চিন্তাধারায় অলির বরকত, দোয়া বা আধ্যাত্মিক সহায়তা (কারামাত) আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমতির অধীন হিসেবে বিবেচিত। তবে অলিদের মাধ্যমে মধ্যস্থতা, শাফাআত, ওসিলা বা বরকত লাভের বিষয়টিও মুসলিম সমাজে সবসময় সর্বমহলে অভিন্নভাবে গ্রহণ করা হয়নি। ইবনে তাইমিয়ার মতো আলেমরা এর কিছু রূপের সমালোচনা করেছেন।[54] ফলে সুফি সাধককে খ্রিষ্টীয় ‘প্যাট্রন সেইন্ট’র সঙ্গে তুলনা করার সময় এই ধর্মতাত্ত্বিক পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি। এখানে পরিভাষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আরবি ‘ওলি’ শব্দকে একাডেমিয়ায় ইংরেজিতে ‘saint’ হিসেবে অনুবাদ করার প্রচলন রয়েছে এবং জিব্রিল হাদ্দাদ (Gibril Haddad)-র মতো গবেষকেরা এই অনুবাদকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন।[55] তবে ‘ওলি’কে ‘saint’ বলা এবং ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ বলা এক বিষয় নয়। ‘Patron saint’ মূলত একটি নির্দিষ্ট খ্রিষ্টীয় ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিভাষা। তাই কোনো সুফি অলিকে ‘patron saint’ বলা হলে সেটিকে সরাসরি ধর্মতাত্ত্বিক সমতা হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। বরং এটি একটি তুলনামূলক বা কার্যকরী পরিভাষা, যার মাধ্যমে বোঝানো হয় যে কোনো অলি কীভাবে একটি নির্দিষ্ট শহর, অঞ্চল, পেশা বা জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক তৈরি করেছেন এবং স্থানীয় সমাজে আধ্যাত্মিক অভিভাবক বা পৃষ্ঠপোষকের ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। এই কারণে ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ পরিভাষাটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। পরিভাষাটি সুফি অলি ও খ্রিষ্টীয় সাধুর মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ধর্মতাত্ত্বিক পরিচয় নির্দেশ করে না; বরং তাদের কিছু সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যকারিতার তুলনা করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই সীমারেখা স্পষ্ট রাখলে ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ পরিভাষাটি তুলনামূলক গবেষণায় ব্যবহার করা যায়, একইসঙ্গে দুই ঐতিহ্যের নিজস্ব ধর্মতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যও অক্ষুণ্ণ রাখা সম্ভব।

 

উপসংহার

এই আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ এবং সুফি ‘অলি-তত্ত্ব’ পরস্পর অভিন্ন নয়, তবে উভয়ের মধ্যে কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ মূলত ক্যাথলিক ও অর্থোডক্স খ্রিষ্টীয় ঐতিহ্যের একটি নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা। এর পেছনে লেট অ্যান্টিকুইটির সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতার ঐতিহ্য এবং পরবর্তী সময়ে গড়ে ওঠা সাধুত্বের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। অন্যদিকে, সুফি অলি ধারণার ভিত্তি কুরআন, হাদিস এবং ইসলামী আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের মধ্যে নিহিত। পরবর্তী সময়ে ইবনে আরাবিসহ বিভিন্ন সুফি চিন্তাবিদের আলোচনায় অলিদের মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক স্তর নিয়ে আরও বিস্তৃত ধারণা তৈরি হয়। ফলে দুটি ঐতিহ্যের নিজস্ব ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি ও ঐতিহাসিক বিকাশ আলাদা। তবে সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যকারিতার দিক থেকে কিছু উল্লেখযোগ্য মিল দেখা যায়। কোনো সাধক একটি নির্দিষ্ট শহর, অঞ্চল, পেশা বা জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে পারেন ও তাঁদের পরম সত্তা পর্যন্ত কল্যাণময়ী যাত্রার মধ্যস্থতাকারী হতে পারেন। তাঁর মাজার বা সমাধি স্থানীয়দের মাঝে পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। মানুষ সেখানে জিয়ারত ও দোয়ার জন্য যান এবং তাঁকে আধ্যাত্মিক অভিভাবক বা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ভক্তি-স্মরণ-স্বীকৃতি প্রদান করেন। সুফি ঐতিহ্যের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে কার্ল আর্নস্ট, নাইল গ্রিন, রিচার্ড ইটন, জোসেফ মেরি ও শিভান মহেন্দ্ররাজাহর গবেষণায় এই ধরনের স্থানীয় সাধু-সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক উঠে এসেছে। এই কার্যগত সাদৃশ্যের কারণেই সুফি অলিদের ক্ষেত্রে ‘প্যাট্রন সেইন্ট’ পরিভাষাটি তুলনামূলক গবেষণায় ব্যবহার করা হয়। তবে এই তুলনারও কিছু স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ক্যাথলিক ঐতিহ্যে সাধুত্ব (patron saint) স্বীকৃতির একটি কেন্দ্রীভূত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে সুফি অলিদের স্বীকৃতি সাধারণত স্থানীয় ভক্তি, তরিকার ঐতিহ্য, মাজার, হ্যাজিওগ্রাফি ও লোকস্মৃতির মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। একইভাবে মধ্যস্থতা ও বরকতের ক্ষেত্রেও দুই ঐতিহ্যের ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা এক নয়। ইসলামের একত্ববাদী চিন্তা-চেতনার কারণে অলিদের ভূমিকা নিয়ে মুসলিম চিন্তাজগতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে। ইবনে তাইমিয়ার সমালোচনা থেকে শুরু করে আধুনিক সংস্কারবাদী চিন্তাতেও এই বিতর্কের ধারাবাহিকতা দেখা যায়। বাংলার পীর-মাজার সংস্কৃতিতেও এই তুলনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পাওয়া যায়। কোনো কোনো পীর নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর ভৌগোলিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছেন এবং তাঁদের মাজার স্থানীয় ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের আধ্যাত্মিক সাধনকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। হযরত শাহজালাল, খান জাহান আলী, শাহ মাখদুম রূপোশ, পীর বদরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন পীরের মাজারকে এই বৃহত্তর ঐতিহ্যের মধ্যে দেখা যায়। একইসঙ্গে এসব ঐতিহ্যকে ঘিরে সংস্কারবাদী ইসলামের সঙ্গে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটিও সঠিকভাবে পড়তে পারা জরুরি।

[1] Patron Saint: A saint is regarded as an intercessor and advocate in heaven for a nation, place, craft, activity, class, or person. (The American Heritage Dictionary of the English Language (4th ed.), Houghton Mifflin Company, 2006, p.1290)। ক্যামব্রিজ ডিকশনারিরও অনেকটা একই রকম সংজ্ঞায়ন, Patron Saint is a Christian saint who is believed to give special help to a particular place, activity, person, or type of object.

[2] ক্যাথলিক চার্চে এই Canonization -এর প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েকটি কঠোর ধাপের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপ হলো, “Servant of God (ঈশ্বরের দাস/দাসী)”, ব্যক্তির মৃত্যুর পর তাঁর জীবন নিয়ে পোপগণ একটি প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেন। এ ধাপের সকলকেই ঈশ্বরের বান্দা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে, চার্চের পক্ষ থেকে যখন প্রমাণিত হয় যে ওই ব্যক্তি তাঁর জীবদ্দশায় বীরত্বপূর্ণ গুণাবলীর (Heroic Virtues) পরিচয় দিয়েছেন, তখন তাঁকে “Venerable (শ্রদ্ধেয়)” হিসেবে সম্বোধন করা হয়। তৃতীয় ধাপের ব্যক্তিকে উপাধি দেওয়া হয় “Blessed (ধন্য)”, এই পর্যায়ের পরীক্ষণ-নিরীক্ষণে ব্যক্তির নামে অন্তত একটি অলৌকিক/ঐশ্বরিক ঘটনা চার্চ কর্তৃক প্রমাণিত হতে হয়। এই ধাপকে বলা হয় Beatification। সবশেষে ব্যক্তি ‘ধন্য’ ঘোষণার পর সাধারণত দ্বিতীয় আরেকটি অলৌকিক ঘটনা প্রমাণিত হলে পোপ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘Saint (সাধু/সন্ত)’ বা ‘Canonized Saint’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ক্যানোনাইজড সেন্টদের নাম চার্চের আনুষ্ঠানিক সাধুদের তালিকায় (Canon) অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং বিশ্বজুড়ে বিশ্বাসীরা তাঁদের স্মরণ ও ভক্তি করে থাকেন।

[3] E. W. Kemp, Pope Alexander III and the Canonization of Saints – The Alexander Prize Essay, Transactions of the Royal Historical Society, 1945, pp. 27: 13–28.

[4] Raymond de Penyafort, Decretals of Gregory IX, 1260. MS Latin Kentucky XVII, University of Kentucky Libraries. ১২৩০ সালে পোপ গ্রেগরি নবম রেমন্ড পেনিয়াফোর্টকে ক্যানন আইন সংকলনের নির্দেশ দেন, যার ফল Decretals of Gregory IX (Liber extra)। এটি আনুমানিক ১২৬০ সালের একটি প্রাথমিক ও ছোট আকারের পাণ্ডুলিপি, সম্ভবত প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের বহনযোগ্য ব্যবহারের জন্য তৈরি।

[5] লিংস তাঁর একাধিক গ্রন্থে প্যাট্রন সেইন্ট ধারণাটি মুসলিম সুফিদের প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করেন। প্রবন্ধের পরবর্তী অংশে লিংসের বর্ণনা সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচিত হয়েছে। তাঁর অন্যতম গ্রন্থ: Martin Lings, What is Sufism?, Lahore: Suhail Academy, 2005; first imp-1983, second imp-1999 । Martin Lings, Return to the Spirit, Lahore: Suhail Academy, 2005 । Martin Lings, A Muslim saint of the twentieth century, Shaikh Ahmad al-ʿAlawī, London 1961 ।

[6] Richard M. Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760. University of California Press, Berkeley and Los Angeles, 1993. বাংলায় ইসলাম ধর্মের প্রচার, প্রসার এবং সুফিদের বদৌলতে একটি বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী গড়ে ওঠার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া আলোচনা করতে শাহ জালাল, খান জাহান আলী, মখদুম রূপোশদের মতো সুফিদেরকে “প্যাট্রন সেইন্ট” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

[7] Carl W. Ernst, Sufi Martyrs of Love: Chishti Order in South Asia and Beyond (co-authored with Bruce Lawrence), 2002. এবং Carl W. Ernst, Sufism : an introduction to the mystical tradition of Islam, Shambhala Boston, London, 2011. আর্নস্ট এসব গ্রন্থে দক্ষিণ এশিয়ার সুফিধারার ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে প্যাট্রন সেইন্ট ধারণাটি উপস্থাপন করেন।

[8] Nile Green, Indian Sufi sm since the Seventeenth Century: Saints, Books and Empires in the Muslim Deccan, London: Routledge, 2006. এই গ্রন্থে গ্রিন মধ্য-দক্ষিণ ভারতে আড়াই শতাব্দী ধরে বিকাশমান তিনটি সুফি ধারার বিবর্তন ও সংগ্রামের ইতিহাস বর্ণনা করেন। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে ঔরঙ্গাবাদ শহরের তিনজন সুফির (শাহ নূর, শাহ পালাংপোশ ও নিজাম আল-দীন) জীবনেতিহাস ও সুফিধারার প্রচার-প্রসার বর্ণনা করতে গিয়ে Patron Saint ধারণাটি দেন।

[9] Josef W. Meri, The cult of saints among Muslims and Jews in medieval Syria, New York: Oxford University Press, 2002. এ গ্রন্থে মধ্যযুগীয় সিরিয়ায় মুসলিম ও ইহুদিদের মধ্যে সাধু-উপাসনা নিয়ে বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে। বৃহত্তর সিরিয়া, ইরাক এবং মিশরের একাদশ থেকে ষোড়শ শতক পর্যন্ত সাধু-উপাসনার প্রকৃতি ও রীতিনীতি, সেইসাথে এর ধারণা ও প্রকাশভঙ্গি ব্যাখ্যা করা- এ গ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু।

[10] Shivan Mahendrarajah, The Sufi Saint of Jam: History, Religion, and Politics of a Sunni Shrine in Shi‘i Iran, Cambridge University Press, 2021. এই গ্রন্থে মহেন্দ্ররাজা ইরানে অবস্থিত আহমদ-ই-জামের মাজারের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করেন। আহমদ অফ জাম (ইন্তে. ১১৪১ খ্রি.) সুফি-সুন্নি হওয়া স্বত্ত্বেও ইরানের মতো শিয়া-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তাঁর প্রভাব-প্রতিপত্তি কিভাবে ৯০০ বছর ধরে টিকে আছে ও সমৃদ্ধি লাভ করেছে, এটি এ বইয়ের মূল বিষয়বস্তু। এখানে আহমদ অফ জামকে “Patron saint of kings” বলে সম্বোধন করা হয়েছে।

[11] Martin Lings, What is Sufism?, Lahore: Suhail Academy, 2005; first imp. 1983, second imp. 1999, p. 119

[12] Peter Brown, The Cult of the Saints: Its Rise and Function in Latin Christianity, University of Chicago Press, Chicago-London, 2015, (First pub- 1981).

[13] মধ্যযুগ থেকে খ্রিস্টীয় এলাকায় রোগ ও অক্ষমতা থেকে সুরক্ষার জন্য Patron Saint-দের চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়ে আসছে। একজন পৃষ্ঠপোষক সাধুর প্রায়শই তার সংশ্লিষ্ট অসুস্থতার সাথে একটি আধ্যাত্মিক যোগসূত্র থাকে। আঘাত ও পেশী-অস্থি সংক্রান্ত রোগের সাথে যুক্ত patron saint (পৃষ্ঠপোষক সাধু)-দের নিয়ে জানতে:- Cureus (2022), “Miracles, Martyrdom and Violence: Historical Origins of the Patron Saints of Trauma and Orthopaedic Specialties.” Cureus 14(1):e21355. এবং PubMed (2012). “Patron saints and Christian perception of health and illness.

[14] Nicholas Everett (tr. & intro.), Patron Saints of Early Medieval Italy, A.D. c.350–800: History and Hagiography in Ten Biographies,Toronto, ON:  Pontifical Institute of Medieval Studies, 2016; pp. 276.

[15] আল-মুজামুল ওয়াসিত, লিসানুল আরব ও ইবনে হাজার রচিত ফাতহুল বারী সংজ্ঞায়ন ও ব্যাখ্যা অনুসারে “আল্লাহর বন্ধু (Wali Allah) হলেন, সেইসব বিশ্বাসী ও ধার্মিক ব্যক্তি, যারা নিজেদের সকল কাজে সর্বশক্তিমান পরম করুণাময় আল্লাহকে স্মরণ রাখেন। তাঁর আদেশসমূহ মেনে চলেন এবং তাঁর নিষেধসমূহ পরিহার করেন।”

[16] ‘ওলি’ শব্দের ধর্মতাত্ত্বিক সংজ্ঞায়ন ও এই ধারণা নিয়ে বিস্তারিত জানতে:- John Renard, Friends of God: Islamic Images of Piety, Commitment, and Servanthood, Berkeley: University of California Press, 2008. এবং John Renard, Tales of God Friends: Islamic Hagiography in Translation, Berkeley: University of California Press, 2009.

[17] Andrew J. Newman, “Shi’i Thought”, 2006, P- 734. এবং Josef W. Meri, Medieval Islamic Civilization, Vol. 2 L-Z, 2006,  index. Taylor & Francis. এবং Maria Massi Dakake, The charismatic community: shi’ite identity in early islam. Albany (N. Y.): SUNY Press, 2007, p- 16 & 25-30.

[18] এই দুটি শব্দের প্রদত্ত সংজ্ঞায়নকে লিসান আরবের লেখক ইবনে মানজুর সমর্থন করলেও অন্যান্য অভিধানবিদ সিবাওয়াইহ, ইবন সিক্কিত, ইবন আসির এ বিষয়ে একমত নন। তাদের আলোচনায় বিলায়াত ও ওয়ালায়াত শব্দদ্বয় প্রায়ই একই অর্থ বহন করে এবং আল্লাহর নৈকট্য ও বন্ধুত্ব বোঝানোর জন্য “বিলায়াত” শব্দকে অধিকতর প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।

[19] Corbin বলেন, নবুওয়াত (prophethood) শেষ হয়েছে মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে। কিন্তু তার পর শুরু হয় walaya-র চক্র (cycle of initiation / cycle of the Friends of God)। শিয়াদের মতে, এই ওয়ালায়াহ-চক্রের বাহক হলেন তাঁদের ইমামগণ। ইমামদের মাধ্যমে সর্বশেষ নবীর দীন প্রচারিত ও পালিত হয়ে আসছে। ইমাম হলেন সেই আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক, যিনি নবুওয়াতের গোপন অর্থ উন্মোচন ও ব্যাখ্যা (Tawil) করেন। তিনি দাবি করেন যে সুফি/বিলায়াত এবং কুতুব, গাউস-এর ধারণা মূলত শিয়া ইমামত থেকে এসেছে। ইবন আরাবির মতো সুফিদের লেখায় তিনি শিয়া প্রভাব দেখতে পান।

[20] Henry Corbin, Histoire de la philosophie islamique (History of Islamic philosophy), London: Kegan Paul International, 1993, p- 26-27 & 41-44. এছাড়া তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ En Islam iranien (৪ খণ্ড, ১৯৭১–৭৩)-এ বিশদ আলোচনা রয়েছে।

[21] Carl Ernst, Following Muhammad: Rethinking Islam in the Contemporary World, University of North Carolina Press, 2003. & Ruzbihan Baqli: Mysticism and the Rhetoric of Sainthood in Persian Sufism, 1996. এবং Words of Ecstasy in Sufism, 1985.

[22] Hermann Landolt, An anthology of Ismaili literature: a Shiʻi vision of Islam, London; New York: I.B. Tauris; London: in association with the Institute of Ismaili Studies, 2008. এবং Creation and Resurrection: An Early Muslim Perspective on Divine Unity and Cosmology, I.B. Tauris, 2015.

[23] পবিত্র কুরআনের সুরা ইউনুসের ৬২–৬৪ নম্বর আয়াত: { أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (٦٢) الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ (٦٣) لَهُمُ الْبُشْرَى فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَفِي الْآخِرَةِ لَا تَبْدِيلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ } অর্থাৎ “নিঃসন্দেহে আল্লাহর বন্ধু (ওলি আল্লাহ)-দের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবেন না। যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহকে ভয় করে, তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়া ও পরকালে সুসংবাদ। আল্লাহর কথায় কোনো রদ-বদল নেই। এটাই হলো মহাসাফল্য।

[24] ইবনে আরাবির আলোচনায় সুফি কসমোলজি: আল-ফুতুহাতুল মাক্কিয়্যাহ- শায়খ মুহিউদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আলি ইবনে আরাবি (রহ.); দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন। Chittick, William C. The Sufi Path of Knowledge: Ibn al-ʿArabi’s Metaphysics of Imagination. Albany: State University of New York Press, 1989. & Chittick, William C. The Self-Disclosure of God: Principles of Ibn al-ʿArabi’s Cosmology. Albany: State University of New York Press, 1998. & Addas, Claude. Quest for the Red Sulphur: The Life of Ibn ʿArabi. Cambridge: Islamic Texts Society, 1993. & Chodkiewicz, Michel. The Seal of the Saints: Prophethood and Sainthood in the Doctrine of Ibn ʿArabi. Cambridge: Islamic Texts Society, 1993.

[25] সুফি কসমোলজি সংশ্লিষ্ট ইবনে আরাবির গ্রন্থগুলো হলো: Al-Futuhat al-Makkiyya (The Meccan Illuminations: ৮ খন্ড, ৫৬০টি অধ্যায়, ১৫ হাজার পৃষ্ঠা), Fusus al-Hikam (The Ringstones/Bezels of Wisdom), Ruh al-quds (The Holy Spirit in the Counselling of the Soul: আন্দালুসিয়ার সুফিগণের ইতিহাস), Mashahid al-Asrar (Contemplation of the Holy Mysteries: খোদার সাথে কথোপকথন ও চৌদ্দটি দর্শন), Anqa al-Mughrib fi Maʻrifat Khatm al-Awliya wa-Shams al-Maghrib (The Astounding Phoenix regarding the Seal of Saints and the Sun of the West) and Hilyat al-abdal (The Four Pillars of Spiritual Transformation)। এসব ছাড়াও ইবনে আরাবি আট শতাধিক গ্রন্থ রয়েছে।

[26] আল হুজভিরির আলোচনায় সুফি কসমোলজি: কাশফুল মাহজুব – হজরত আলি ইবনে উসমান আল-হুজভিরি, দাতা গঞ্জে বখশ লাহোরি (রহ.); উর্দু অনুবাদ: গোলাম মুঈনুদ্দীন নাঈমী আশরাফী; হুজভেরী কম্পোজার্স অ্যান্ড ডিজাইনার্স।

[27] Lindsay Jones, Encyclopedia of Religion, Second Edition. Farmington Hills, MI: Thomson Gale, 2005, p. 8821. & John L. Esposito, The Oxford dictionary of Islam. New York: Oxford University Press, 2003.

[28] এখনকার গাউসুল আজম হলেন- বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী। বিস্তারিত: আলী ইবনে ইউসুফ ইবনে জারীর, অনুবাদ- মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান, বাহজাতুল আসরার ওয়া মা’দিনুল আনওয়ার (বঙ্গানুবাদ), ইমাম আহমদ রেজা রিসার্চ একাডেমি, চট্টগ্রাম, ২০১৩ (প্রথম প্রকাশ- ২০১১)।

[29] E.J. Brill, Encyclopaedia of Islam. A Dictionary of the Geography, Ethnography and Biography of the Muhammadan peoples. Netherlands: Leiden, 1938 (Internet Archive), pp. 1165–1166.

[30] Ibn al-ʿArabi, “Chapter 317,” in William C. Chittick, trans., Two Chapters from the Futūḥāt al-Makkiyya, 1993. & Muhyiddin Ibn ‘Arabi – A Commemorative Volume, (Editor: S. Hirtenstein and M. Tiernan), Element (for the Muhyiddin Ibn ‘Arabi Society), Shaftsbury, 1993, pp. 90-123.

[31] Al-Hujwiri, ʿAli ibn ʿUthman. Kashf al-Maḥjūb: The Revelation of the Veiled. Trans. Reynold A. Nicholson. London: Luzac, 1911.

[32] Chodkiewicz, Michel. The Seal of the Saints: Prophethood and Sainthood in the Doctrine of Ibn Arabi. Translated by Liadain Sherrard. Cambridge: Islamic Texts Society, 1993.

[33] P. Werbner & H. Basu (eds.), Embodying Charisma. Modernity, Locality and the Performance of Emotion in Sufi Cults, London–New York, Routledge, 1998, 243 p.

[34] Ernst, Carl W. Sufism at Khuldabad (Deccan Chishti shrines; cited in Green 2012/2014 discussions).

[35] Eaton, Richard M. Sufis of Bijapur, 1300–1700: Social Roles of Sufis in Medieval India, Princeton University Press, 1978. (বিজাপুর সালতানাতের প্রেক্ষিতে সুফি মাজার, স্থানীয় সমাজ, কৃষক-সম্প্রদায় ও ইসলামিক সংস্কৃতির বিস্তারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ) & Eaton, Richard M. The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760, University of California Press, 1993. (বাংলায় মাজার/পীর-কেন্দ্রিক ধর্মীয় ভূদৃশ্য ও সামাজিক রূপান্তরের প্রসঙ্গ)

[36] Nile Green, Making Space: Sufis and Settlers in Early Modern India (OUP, 2012)। & Green, Nile. Sufi Martyrs of Love: The Chishti Order in South Asia and Beyond (Palgrave Macmillan, 2002/2006) চিশতিয়া তরিকার মাজার-কেন্দ্রিক ভক্তি, তরিকা-কাঠামোর বাইরে সামাজিক-স্থানিক মাত্রা।

[37] Nile Green, Indian Sufism Since the Seventeenth Century: Saints, Books and Empires in the Muslim Deccan, Routledge, London, 2006, 240 pp. & Nile Green, Sufism : a global history, Wiley Blackwell: A john wiley & son,Chichester, West Sussex ; Malden, 2012, pp. 291.

[38] Vincent J Cornell, Realm of the saint : power and authority in Moroccan Sufism, University of Texas Press, Austin, 1998.

[39] Josef W. Meri, Ibid, 2002. & Meri, J. W. “Aspects of Baraka (Blessings) and Ritual Devotion Among Medieval Muslims and Jews,” Medieval Encounters 5 (1), 1999, pp. 46–69.

[40] Roberts, Allen F., and Mary Nooter Roberts. A Saint in the City: Sufi Arts of Urban Senegal (UCLA Fowler Museum of Cultural History, 2003)

[41] Vincent J Cornell, Ibid, 1998, The Power of Compassion: The Imitanda of Abu’l-Abbas as-Sabti”, p. 79.

[42] Vincent J Cornell, Ibid, 1998, p. 45.

[43] Vincent J. Cornell, Ibid, 1998, p. 140. & Abd al-Salam Saidi, al-Minhaj al-wadih fi tahqiq karamat Abi Muhammad Salih (in Arabic), 2013, p. 52-56.

[44] Ross, Eric. “Morocco’s Seaside Shrines.” Eric Ross, Academic (blog), 2011.

[45] Shivan Mahendrarajah, Ibid, 2021.

[46] Josef W. Meri, Ibid, 2002.

[47] “Commemoration and Devotion in the Resurgence of Contemporary Sufi Communities in their Homeland and Western Settings: Descendants and Followers of a Medieval Sufi Saint in Syria and Cambridge, Ontario.” Journal article, Taylor & Francis Online, Vol.23, Issue- 4, 2024, p. 423-447.

[48] Kitab manaqib al-Shaykh Aqil al-Manbiji, ms., author: al-Hajj Uthman ibn al-Hajj Muhammad al-Urani al-Halabi (Aleppo), cited in Meri 2002 and subsequent scholarship.

[49] Kikuta, Hideaki. “Veneration of Patron Saints among Muslim Craftsmen in Uzbekistan from the Soviet to the Post-Soviet Era.” Journal of Japanese Association for Central Eurasian Studies 77, no. 3 (2015): 279–294. এই প্রবন্ধে রিশতন (ফেরঘানা উপত্যকা, উজবেকিস্তান) কুম্ভকার/সিরামিক কারিগরদের মধ্যে “pir” (প্যাট্রন সাধু) ভক্তির চলমানতা, সোভিয়েত যুগেও apprenticeship-এর মাধ্যমে এই ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, এবং মাস্টার-শিষ্য সম্পর্কের সাথে murshid-murid (সুফি) মডেলের সাদৃশ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখক দেখান যে, সমষ্টিগত খামারায়ন (collectivisation) অনিচ্ছাকৃতভাবে apprenticeship সিস্টেমকে প্রধান জ্ঞান-হস্তান্তর চ্যানেল হিসেবে ধরে রাখে; ফলে দক্ষতা-প্রশিক্ষণের পাশাপাশি “pir-ভক্তি” ও প্রার্থনা (যেমন: pir-ustalar quvvat-madad qilsin, amin) টিকে থাকে। প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে: কিছু মধ্য এশীয় ওয়েসিস টাউনে “the patron saints of craftsmen, known as pir, have continued to be venerated, despite the repression of Islam… during the Soviet Era”।

[50] Ernst, Carl W. Eternal Garden: Mysticism, History, and Politics at a South Asian Sufi Center. Albany: State University of New York Press, 1992.

[51] Eaton, Richard M. Ibid, 1993.

[52] Bertocci, Peter J. “A Sufi Movement in Bangladesh: The Maijbhandari Tariqa and Its Followers.” Contributions to Indian Sociology 40, no. 1 (2006): 1–28. & Bertocci, Peter J. “A Sufi Movement in Modern Bangladesh.” Oakland University Journal 3 (2001): 52–73.

[53] Roy, Asim. The Islamic Syncretistic Tradition in Bengal. Princeton: Princeton University Press, 1983.

[54] Ibn Taymiyyah, Mukhtasar al-Fatawa al-Masriyya, al-Madani Publishing House, 1980, p. 603

[55] Gibril F. Haddad, The Four Imams and Their Schools, London: Muslim Academic Trust, 2007, p. 387