সুফি সংগীত সিরিজ: পর্ব ০২

বাংলার সুফি সংগীত: ইতিহাস, পরিধি ও বৈচিত্র্য

বাংলা অঞ্চলের সুফি সংগীতের ইতিহাস বাংলায় ইসলামের বিস্তার, সুফি সাধকদের আগমন এবং স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে ইসলামি আধ্যাত্মিকতার মিথস্ক্রিয়ার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত। বাংলায় আগত সুফিরা স্রেফ ধর্মপ্রচারকের ভূমিকায় এখানে অবস্থান করেননি। সময়, সমাজ ও বাস্তবতার প্রয়োজনে নানা যুগান্তকারী ভূমিকায় নিজেদের অর্পণ করেছেন। তাঁরা কখনো ছিলেন ধর্মীয় জ্ঞান-ঐতিহ্যের শিক্ষকরূপে, কখনো বৈষম্য-বেইনসাফির দূরীকরণে সমাজসংস্কারকের ভূমিকায়, কখনো জুলুম প্রশ্নে সংগ্রামী যোদ্ধা হিসেবে। সর্বোপরি তাঁরা ছিলেন আধ্যাত্মিক জীবন ও জ্ঞানচর্চার পথপ্রদর্শক। তাঁদের মাধ্যমে ইসলামের অন্তর্মুখী চেতনা, বাংলা ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং সংগীতের সঙ্গে মিলিত হয়ে এক স্বতন্ত্র সুফি সংগীতধারার জন্ম দেয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট বলে রাখা প্রয়োজন, বাংলায় আগত প্রথম যুগের সুফিরা আধুনিক অর্থে মুর্শিদি, মারেফতি, মাইজভাণ্ডারী বা বাউল গান রচনা করেননি, বরং তাঁরা যে আধ্যাত্মিক পরিবেশ, যিকর, সামা এবং খানকাহকেন্দ্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেন, তার ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তী কয়েক শতকে বাংলা ভাষায় সুফি সংগীতের বিভিন্ন ধারা বিকশিত হয়।[1]

অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকে আরব বণিক ও সুফি-সাধকদের মাধ্যমে এবং দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকে তুর্কি শাসনের সঙ্গে এই বাংলা অঞ্চলে সুফি তরিকার আগমন ঘটে। বাংলায় আগমনের পরপরই সুফিগণ নিজেদের অবস্থান ও সাধনকার্যক্রম পরিচালনার জন্য বহু সংখ্যক খানকাহ স্থাপন করেছিলেন। তখনকার খানকাহগুলো ছিল একাধারে ইবাদতের স্থান, জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, দরিদ্রদের আশ্রয়স্থল এবং আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র।[2] ফলে সাধন কার্যক্রমের অংশস্বরূপ খানকাহগুলোতে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত, যিকর, দরস (ধর্মীয় পাঠ), হামদ ও নাত, বিখ্যাত সুফি কবিতা বা সংগীত পাঠ ও কিছু কিছু তরিকায় সামা অনুষ্ঠিত হতো। সব খানকাহে অবশ্য সংগীতচর্চা সমানভাবে প্রচলিত ছিল না। বিশেষত চিশতিয়া তরিকার উপর পরিচালিত কিছু খানকাহে সামা-চর্চা দেখা গেলেও অন্যান্য তরিকায় তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। ফলে বাংলার সুফি সংগীতের ইতিহাসকে একরৈখিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

বাংলায় সুফি সংগীত বিকাশে চিশতিয়া তরিকার প্রভাব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শায়খ আঁখি সিরাজ, আলাউল হক পান্ডুভি ও শায়খ নুর কুতুবুল আলমের মাধ্যমেই বাংলায় এই তরিকা ব্যাপকতা ও জনপ্রিয়তা লাভ করে। চিশতিয়া তরিকার সামা ও কাওয়ালি ছাড়াও শাহ জালাল (সিলেট), শাহ মখদুম রূপোশ (রাজশাহী), খান জাহান আলী (দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলা) প্রমুখের দরগাহকে কেন্দ্র করে পরবর্তীকালে হামদ, নাত, মানক্বাবাত, জারি, গাজীর গান ও অন্যান্য লোকধর্মী আধ্যাত্মিক সংগীতের চর্চা বিকশিত হয়। তবে এসব সংগীতের অধিকাংশই তাঁদের জীবদ্দশায় রচিত নয়; বরং তাঁদের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে পরবর্তী লোকঐতিহ্যে বিকশিত হয়েছে। মধ্যযুগে ও ঔপনিবেশিক যুগে এখানকার সাধারণ মানুষ আরবি-ফারসি ধর্মীয় শাস্ত্রীয় গ্রন্থের ভাষা বুঝতেন না। সুফি কবি ও সাধকরা স্থানীয় ভাষায় গান ও কবিতা রচনা করে আধ্যাত্মিক শিক্ষা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। ফলে এখানে সুফি সংগীত এক ধরনের ‘জনভাষার আধ্যাত্মিক সাহিত্য’ হিসেবে কাজ করেছে।

বাংলার সুফি সংগীতের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর লোকায়ত চরিত্র। এখানে সুফি দর্শন/তত্ত্ব একাধারে বাউল ঐতিহ্য, ফকিরি সাধনা, পালাগান, পুঁথি সাহিত্য, গাজীর গান, হরেকরকম গ্রামীণ কাহিনীভিত্তিক সংগীতের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে বাংলা সুফি সংগীত আর আরবি বা ফারসি ঐতিহ্যের অনুকরণে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এখানকার সংগীত ধারা একটি স্বতন্ত্র আঞ্চলিক রূপ লাভ করেছে। বাংলার সুফি সংগীত কেবল খানকাহে সীমাবদ্ধ ছিল না। ধীরে ধীরে গ্রামীণ জনপদে, ওরস মাহফিলে, পীরের দরগায়, লোকউৎসবে, পুঁথিপাঠে, আধ্যাত্মিক আসরে এবং পরবর্তীকালে মঞ্চ, গণমাধ্যম ও শিল্পায়োজনে এটি ছড়িয়ে পড়ে। এমন বহুমুখী বিস্তারের ফলে সুফি সংগীত বাংলার মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।

মধ্যযুগ তথা চতুর্দশ থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যে বাংলা ভাষায় সুফি সাহিত্য ও সংগীত ধারা ধীরে ধীরে বিকশিত হতে থাকে। এসময় বহু মধ্যযুগীয় জীবনীমূলক সাহিত্য, মালফুজাত সাহিত্য ও সুফিদের রচিত কাব্যসাহিত্য রচিত হয়েছিল।[3] সুফি ও তাঁর অনুসারীদের বদৌলতে আরবি ও ফারসি ভাবধারা, বাংলা লোকভাষা, স্থানীয় উপমা, লোকঐতিহ্যের সাথে জড়িত দেশীয় প্রতীক (নদী, নৌকা, মাঝি, পাখি, বন, ফুল প্রভৃতি) ইত্যাদি একত্রে ব্যবহার হতে শুরু করে। ফলে সুফিদর্শন গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য হয়ে ওঠে। বাংলা ভাষায় আধ্যাত্মিক গান রচনার ভিত্তিও এভাবেই নির্মিত হয়। পরবর্তীতে অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা সুফি সংগীতের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক. মুর্শিদি গান। এটি মূলত মুর্শিদের প্রতি আনুগত্য, আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ এবং আত্মশুদ্ধির শিক্ষা নিয়ে রচিত। অন্যদিকে মারফতি গান আল্লাহকে জানার (মা‘রিফাহ), আত্মার প্রকৃতি, সৃষ্টির রহস্য, রূহানিয়ত এবং মানবজীবনের আধ্যাত্মিক অর্থ সন্ধান ও নির্মাণের উপর রচিত । এই দুই ধারায় কুরআনিক ধারণা, সুফি দর্শন এবং বাংলা লোককবিতার এক অনন্য সমন্বয় লক্ষ করা যায়।

ঊনবিংশ ও বিংশ শতক ছিল বাংলার সুফি সংগীতাঙ্গনের রূপান্তরের যুগ। পূর্ববর্তী শতাব্দীতে সুফি সংগীত প্রধানত খানকাহ, দরগাহ, ওরস এবং গ্রামীণ আধ্যাত্মিক আসরকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো, নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতি, পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তার, যোগাযোগ, মুদ্রণপ্রযুক্তি, এবং গণমাধ্যমের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই সংগীতও নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। ফলস্বরূপ সুফি সংগীত ধর্মীয় অনুশীলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এটি সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, জাতীয় সংস্কৃতি এবং আধুনিক গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় পরিণত হয়। তবে এই রূপান্তর ছিল দ্বিমুখী। একদিকে সুফি সংগীতের প্রচার-প্রসার বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে এর আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য, পরিবেশন-পদ্ধতি এবং বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে নতুন বিতর্কেরও সূচনা হয়। এই সময়ে পুঁথি সাহিত্য, সুফি কাব্য, হামদ, নাত এবং আধ্যাত্মিক গানের অনেক পাণ্ডুলিপি প্রথমবারের মতো মুদ্রিত হতে শুরু করে। ফলে আগে যা নির্দিষ্ট খানকাহ বা আঞ্চলিক পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল, তা বৃহত্তর পাঠক ও শ্রোতাসমাজের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পায়। আধুনিক সময়েও সুফি সংগীত পরিবেশনায় বেশ কিছু নতুন বৈশিষ্ট্যাবলী লক্ষ্য করা যায়। যেমন, মঞ্চনির্ভর উপস্থাপনা, পেশাদার সংগীতায়োজন, আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার, শ্রোতাকেন্দ্রিক পরিবেশনা ও অডিও-ভিডিও প্রযোজনা। এসবে ব্যাপক প্রচার-প্রসার হলেও সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত নন্দনতাত্ত্বিক ও বাণিজ্যিক উপস্থাপনা কখনও কখনও সংগীতের মূল আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্যকে আড়াল করতে পারে।

ঊনবিংশ শতকে বাংলায় বিভিন্ন ইসলামী সংস্কার আন্দোলনের উত্থান ঘটে। ফরায়েজি আন্দোলন, শুদ্ধবাদী সংস্কারধারা এবং পরবর্তী আহলে হাদিস প্রভাবিত আলেমদের একটি অংশ সংগীত, বিশেষত দরগাহকেন্দ্রিক কিছু আচার ও সামা-অনুষ্ঠানের সমালোচনা করেন। তাঁদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় লোকাচার ও অতিরঞ্জিত পীরভক্তি ইসলামের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অন্যদিকে বহু সুফি আলিম যুক্তি দেন যে, শরিয়তের সীমা রক্ষা করে, শিরক ও বিদআত থেকে মুক্ত থেকে, আল্লাহর স্মরণ ও আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে পরিবেশিত হামদ, নাত, যিকর বা সুফি সংগীত বৈধ হতে পারে। এই বিতর্ক বাংলার মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলমান ছিল। আজও বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান। এই বিতর্ক কেবল সংগীতকে ঘিরে ছিল এমনটি নয়; বরং ইসলামী ধর্মচর্চার পদ্ধতি, আধ্যাত্মিকতা এবং সংস্কৃতির ভূমিকা সম্পর্কেও বিতর্কের নানারূপ বিস্তৃত ছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার মাইজভাণ্ডারে মাইজভাণ্ডারিয়া তরিকা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলা সুফি সংগীতের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। তরিকার প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (১৮২৬–১৯০৬ খ্রি.) এবং তাঁর উত্তরসূরিদের আধ্যাত্মিক সাধনাকে কেন্দ্র করে যে সংগীতধারার বিকাশ ঘটে, তা পরবর্তীকালে ‘মাইজভাণ্ডারী গান’ নামে পরিচিতি লাভ করে। আল্লাহ, রাসুল (দ.) এবং আউলিয়ায়ে কিরামের প্রতি প্রেমবিনিময়, মুর্শিদের প্রতি আত্মসমর্পণ ও আধ্যাত্মিক আনুগত্য প্রদর্শন, বাংলা ভাষায় সুফি দর্শনের প্রকাশ, সহজ ভাষায় গভীর সুফিতাত্ত্বিক বিষয় উপস্থাপন, সমবেত পরিবেশনা ও যিকরমুখী আবহ– এই ধারার প্রধান বৈশিষ্ট্য। মাইজভাণ্ডারী গান বাংলা সুফি সংগীতকে একটি সুসংগঠিত, ধারাবাহিক ও জীবন্ত ঐতিহ্যে পরিণত করে। এটি আজও চট্টগ্রাম, ঢাকা, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফরিদপুরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চর্চিত হয়ে আসছে।[4]

বিংশ শতকের শুরুতে গ্রামোফোন প্রযুক্তির আগমনের পর মৌখিকভাবে প্রচলিত বহু সংগীত প্রথমবারের মতো রেকর্ড হয়ে সংরক্ষিত হতে থাকে। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধানত কীর্তন, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রসংগীত, আধুনিক গান ও লোকসংগীত রেকর্ড করত। কিন্তু ধীরে ধীরে হামদ, নাত এবং কিছু সুফি সংগীতও রেকর্ডিংয়ের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সুফি সংগীত বৃহত্তর শ্রোতামহলে পৌঁছানোর সুযোগ লাভ করে। পাকিস্তান আমলে রেডিও পাকিস্তান এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্প্রচারের মাধ্যমে হামদ, নাত এবং কিছু সুফি সংগীতের প্রসারে ভূমিকা রাখে। বিশেষত দুই ঈদের অনুষ্ঠান, ঈদে মিলাদুন্নবী, ওরস উপলক্ষে অনুষ্ঠান, ইসলামী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আঞ্চলিক লোকসংগীত বিষয়ক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সুফি সংগীতের বিভিন্ন রূপ দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে লোকসংস্কৃতি, বাউল, ভাটিয়ালি, জারি-সারি এবং আঞ্চলিক সংগীতের পাশাপাশি সুফি সংগীতও নতুন গুরুত্ব লাভ করে। বিশ্ববিদ্যালয়, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং লোকসংস্কৃতি বিষয়ক একাডেমিক গবেষণায় বাংলা সুফি সংগীত নিয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে সুফি সংগীত নিয়ে গবেষণা আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেলেও এখনো বহু ক্ষেত্র পর্যাপ্তভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। বিশেষত প্রাচীন গীতিপাণ্ডুলিপির সমালোচনামূলক সম্পাদনা, আঞ্চলিক সুফি সংগীতের সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, সুরলিপি প্রস্তুতকরণ, মৌখিক ঐতিহ্যের ডিজিটাল আর্কাইভ নির্মাণ, নারী সুফি কবি ও শিল্পীদের অবদান, বাংলা সুফি সংগীতের তুলনামূলক গবেষণা– এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ গবেষণার উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে।

 

বাংলায় সুফি সংগীতের ধারা

১. মুর্শিদি গান: এটি বাংলা সুফি সংগীতের অন্যতম প্রধান ধারা। একে ‘ঐশী প্রেম ও ভক্তিরসের গান’ও বলা হয়। ‘মুর্শিদ’ শব্দের অর্থ আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। ‘গুরুর প্রতি প্রগাঢ় ভক্তি বিশ্বাস নিয়ে রচিত সুরসাহিত্যই মুর্শিদি নামে পরিচিত। ভক্তিবাদই এই গানের মূল বিষয়বস্তু।’[5] এই ধারার গানে মুর্শিদের প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য, জীবনীমূলক কাহিনী এবং তাঁর মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হয়। মুর্শিদি গানের বিকাশ মূলত গ্রামীণ বাংলার সুফি সাধনা ও পীর-মুর্শিদকেন্দ্রিক সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। মুর্শিদি গান রচনার ভিত্তি ছিল মধ্যযুগীয় সুফিদের জীবনীমূলক সাহিত্য ও মালফুজাত সাহিত্য। কেননা এসব সাহিত্য থেকে প্রাপ্ত তৎকালীন সুফি-দরবেশদের অলৌকিক শক্তির বর্ণনা মুর্শিদি গানে স্থান পেত। যেমন: কুমিরের পিঠে চড়ে পীরের আগমন, সমুদ্রপথে পাথরে ভেসে দরবেশের আগমন, জলের উপর হাঁটা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রেহাই দেওয়া, কমসংখ্যক দরবেশের দ্বারা শত্রুর পক্ষের বিশাল সৈন্যবহরকে পরাস্ত করাসহ ইত্যাদি। এসময় শাহ মুহাম্মদ সগীর, সৈয়দ সুলতান, দৌলত কাজী, মহাকবি আলাওল, আব্দুল হাকিমের রচনার মাধ্যমে বাংলা সুফি-আধ্যাত্মিক সাহিত্যের ভিত্তি নির্মিত হয়। পরবর্তী সময়ে লালন শাহ, পাগলা কানাই, হাসন রাজা, দুদ্দু শাহ, পাঞ্জু শাহ, কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার, ফকির চাঁদ, রশিদ উদ্দিন, শাহ আবদুল করিম, হাছন ইমাম, আরকুম শাহ, শীতালং শাহ, জালাল খাঁ, মতি সরকার, সৈয়দ শাহনূরসহ শতাধিক সাধকের মাধ্যমে অজস্রাধিক মুর্শিদি ও মারেফতি গান রচিত হয়। এছাড়া মাইজভাণ্ডারি ধারার সংগীত শিল্পীগণও বেশ কিছু মুর্শিদি গান রচনা করেছিলেন। হাল আমলে পূর্ববঙ্গ, ফরিদপুর, পাবনা, রাজশাহী, মুর্শিদাবাদ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে মুর্শিদি গানের ব্যাপক প্রচলন দেখা যায়। ঋজু বাংলা ভাষায় একক বা সমবেতভাবে এটি পরিবেশন করা হয়। গান পরিবেশনের ক্ষেত্রে প্রেমজুড়ি, করতাল, ঢোল, সারিন্দা, একতারা, দোতারা এবং বর্তমান সময়ে হারমোনিয়াম, তবলাসহ ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়।

শাহ আবদুল করিম তাঁর জীবদ্দশায় পাঁচ শতাধিক গান লিখেছেন এবং এখন পর্যন্ত এককভাবে ৭টি গানের গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন লোকসঙ্গীতের গ্রন্থেও তাঁর রচনা স্থান পেয়েছে। অন্যান্য সংগীত উপধারার পাশাপাশি তিনি বহু মুর্শিদি গান রচনা করেছিলেন। যেমন–

১.

মুর্শিদ ধন হে, কেমনে চিনিব তোমারে

দেখা দেও না কাছে নেও না আর কত থাকি দূরে”।…[6]

২.

ও তুমি আইসরে দয়াল আমার মুর্শিদরে।

 সবে বলে মুর্শিদ হাবে মুর্শিদ

মুর্শিদ কেমন জনা।…

৩.

দয়াল মুর্শিদ, তুমি বিনে

কে আছে আমার?

তোমার নাম ভরসা করে

অকূলে দিলাম সাঁতার ॥…..

৪.

মুর্শিদ ও, জীবনও ভরিয়া

তোমার লাগিয়া

নয়নের জল হইল সম্বল

তোমারে না পাইয়া ॥…

৫.

খুঁজিয়া পাইলাম না রে বন্ধু তুমি কোথায় থাক

আমি তোমায় দেখতে নারি তুমি আমায় দেখ রে বন্ধু॥…

৬.

মুর্শিদ বিনে এ ভুবনে কেউ নাই আপনা

মুর্শিদ নাম পরশমণি নাই যার তুলনা ॥…

 

এমন কিছু গানে তিনি জানতে চেয়েছেন কিভাবে একজন প্রকৃত মুর্শিদকে চিনা যায়। খুঁজে চলেছেন প্রকৃত মুর্শিদের বৈশিষ্ট্যসমূহ। ব্যক্ত করেছেন মুর্শিদকে না পাওয়ার যে চরম বেদনা। ছটফট করে চলেছেন মুর্শিদ নামক পরশমণিকে পাওয়ার জন্য। এছাড়া তাঁর আরো একাধিক গানে মুর্শিদ পাওয়ার পরের অভিব্যক্তি, অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন। মুর্শিদ পাওয়ার যে তৃপ্তি তাও তাঁর গানে ফুটে উঠেছে। মুর্শিদকে ভালোবাসার মাধ্যমে রাসুলকে পাওয়া যায়। আর রাসুলকে ভালোবাসার মাধ্যমে খোদাকে পাওয়া যায়। এ কথাগুলো আরকুম শাহ রচিত মুর্শিদি গান এভাবে বলেন যে,

মুর্শিদ ভজিয়াছে যারা, খোদাকে পাইছে তারা

মানুষ ও জানিয়া কইল বিনাশ সংসার॥

পাগল আরকুমে বলে বারে বার, মানবলীলা সারাসার

ভক্তি করো মুর্শিদ পদে শোভা নাই আর॥

 

বাশঁখালীর মরমী সাধক ও কবি মাজহেরুল ইসলামের রচিত মুর্শিদি গান,

 বহুদিন ধরিয়া সাধনা করিয়া

নবীর ছায়ায় তোমাকে পেয়েছি

সেই রূপ হেরিয়া আপনা ভুলিয়া

 পরাণ খুলিয়া চরণে সপেছি।।

সৃষ্টির দিনে সকাল বেলায়

মগন ছিলাম প্রেমেরি খেলায়

জ্বালাতে আমায়, আনিবে এথায়

 তাহা কি কখনও জানিতে পেরেছি।।

জগতে কাহারো পানে না চাহিয়া

ধরেছি চরণে আপনা জানিয়া

পাপিনী বলিয়া যেওনা ফেলিয়া

তোমার লাগিয়া সকল ত্যজিছি।।

প্রাণের জাঁহাগীর তোমারে চাহিয়া

এসেছি নাচিয়া পাগল হইয়া

আপনা বলিয়া কে লবে তুলিয়া

 তোমার নামের কলঙ্কি হয়েছি।।

 

গানে সাধক দীর্ঘ সময় সাধনার পর নবিজির ছায়াতলে আপন মুর্শিদকে পাওয়ার তৃপ্তি ও শুকরিয়া জ্ঞাপন করেন। এছাড়া নিজেকে পাপীতাপী গুনাহগারদের দলে অন্তর্ভুক্ত ও অনুশোচনা করে, মুর্শিদের চরণেযুগলে আশ্রয় পাওয়ার আর্তি জানান। দীর্ঘ সময় ধরে মুর্শিদকে না পাওয়ার যে দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়েছেন, তাও কবি এ গানে ব্যক্ত করেন।

কুটি মুনসুরের রচিত মুর্শিদি গান–

দয়াল মুর্শিদ রে

ওরে ও প্রাণের বান্ধব রে

আমি কি দিয়া ভজিবো রে এই তোমারে…

অথবা

দয়াল মুর্শিদ, এই তোমার চরণ বিনে

আমার অন্য আশা নাই

আমি আর কোন ধন চাইনা রে মুর্শিদ

যদি এই তোমার দেখা পাই।…

মুর্শিদি গানে ব্যবহৃত অধিকাংশ ভাষাই রূপকধর্মী। প্রাণের বান্ধব, চরণ, দয়াল, ধন ইত্যাদি শব্দের আক্ষরিক অর্থের চেয়ে তাদের আধ্যাত্মিক ও প্রতীকী অর্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কুটি মুনসুর এসব গানে মুর্শিদের প্রতি ভক্তি, জাগতিক আসক্তি থেকে মুক্তি, মুর্শিদের নিকট আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য প্রদর্শন, পরম সত্তাকে পাওয়ার আকাঙ্খা ব্যক্ত করেন। অণিমা মুক্তি গমেজ সম্পাদিত ‘কুটি মনসুরের গান’ গ্রন্থে আরো মুর্শিদি, মারফতি, নাত, হামদসহ বিভিন্ন সুফি সংগীত ধারার গান সংকলিত হয়েছে।[7]

 

মাইজভাণ্ডারি তরিকার সাধক মোহাম্মদ ইউনুস বাঙালির একটি মুর্শিদি গান হাল আমলে খুবই জনপ্রিয়–

আমার মুর্শিদ বিনে কেউ দেবে না জান্নাতের তরী

আমার ভব সিন্ধু পার করিবে বাবা ভান্ডারী।।

আমি জানলে কি আর করতাম গুনাহ বাবা মাওলানা

আমি না জানিয়া ভুল করেছি ক্ষমা করো না।

তুমি আওলাদে রাসূল বাবা রহমতের খনি

তুমি হযরত কেবলা রহমত মওলার নয়নও মনি।

বড় আশা নিয়া কান্দি বাবা দু’চরণ ধরি

আমার ভব সিন্ধু পার করিবে বাবা ভান্ডারী।।

পড়ি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদ রাসূল

যেই নামেতে সৃষ্টি হয়েছে নূরের পুতুল।

 আমার মনও প্রাণও সঁপে দিলাম বাবার চরণে

আমি পাগল হয়ে কান্দি আমার দুই নয়নে।

আমি ভাসাই দিলাম ভব সাগরে ভাঙ্গা তরী

আমার ভব সিন্ধু পার করিবে বাবা ভান্ডারী।।

 

মানুষ মাত্রই ভুল করে, দুর্বল হয় এবং জীবনের নানা সংকটে পড়ে। সেই অবস্থায় একজন যোগ্য মুর্শিদ তাঁর শিক্ষা, উপদেশ ও আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর পথে চলতে সাহায্য করেন। ভব সিন্ধু, জান্নাতের তরী, ভাঙা তরী এবং চরণ- এসবই এ গানের  প্রতীকী ভাষা। যা মানুষের ভেতরকার সংগ্রাম, অনুতাপ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করে। তবে একটি ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ও উল্লেখ করা জরুরী। ইসলামের মূল আকীদা অনুযায়ী, জান্নাত দান করার একমাত্র মালিক আল্লাহ। তাই ‘মুর্শিদ বিনে কেউ দেবে না জান্নাতের তরী’ এই পঙক্তিকে আক্ষরিক অর্থে নয়, বরং মুর্শিদের সঠিক শিক্ষা মানুষকে জান্নাতের পথে পরিচালিত করে, এই রূপকার্থে বোঝাই অধিক সঙ্গত।

 

২. মারেফতি গান: ‘মারেফত’ (Ma‘rifah) অর্থাৎ আল্লাহ সম্পর্কে আধ্যাত্মিক জ্ঞান বা অন্তর্দৃষ্টি। মারিফাতের সংজ্ঞায়নে আরকুম শাহ বলেন,

যেখানে মারফত আগে, হইয়াছে সৃজন,

না চিনিলে না পাইবায়, প্রাণনাথের দরশন।

যে কালে ধরিবায় গিয়া, মুর্শিদের দামন,

দরখাস্ত করিয়া কও তালিব নন্দন॥

 

মারেফতি গান বাংলার সুফি সংগীতের এমন এক দার্শনিক ধারা, যেখানে আত্মা, স্রষ্টা, সৃষ্টি এবং মানুষের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। আমি কে? আত্মার প্রকৃতি কী?, মানুষের মধ্যে ঐশী রহস্য, আল্লাহকে চেনার পথ ও বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ জ্ঞানের পার্থক্য ইত্যাদি দর্শনের উপর এ ধারার গান রচিত হয়। লালন ফকিরের বহু গানে আত্মপরিচয় ও মানবসত্তার অনুসন্ধানের বিষয় দেখা যায়। যদিও লালনের সংগীতকে সরাসরি সুফি সংগীত বলা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে, যদিও তাঁর গানে সুফি দর্শনের বহু উপাদান উপস্থিত। মারেফতি গানে প্রায়শ বিভিন্ন প্রতীকের ব্যবহার করা হয়। যেমন: দেহকে ঘর, আত্মাকে পাখি, আল্লাহর প্রেমকে মহাসাগরে ডুব দেয়া ইত্যাদি। যদিও চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকায় এ গানের উদ্ভব, তবে পরবর্তীতে ময়মনসিংহ, পাবনা, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোরে এটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। শাহ আবদুল করিমের মারেফতি গান–

তন্ত্র মন্ত্র পড়ি যত তার ভেতরে তুমি নাই

শাস্ত্র গ্রন্থ পড়ি যত আরও দূরে যাই

কোন সাইরে খেলতেছো লাই

ভাবতেছি তাই অন্তরে

মুর্শিদ ধন হে কেমনে চিনিব তোমারে।

অথবা

গাড়ি চলে না, চলে না চলে না রে গাড়ি চলে না

চড়িয়া মানবগাড়ি যাইতেছিলাম বন্ধুর বাড়ি

মধ্য পথে ঠেকলো গাড়ি উপায়-বুদ্ধি মিলে না।…

 

শাহ আবদুল করিমের গানের শক্তি এখানেই যে, তিনি খুব জটিল সুফি দর্শনকে গাড়ি, তন্ত্র-মন্ত্র, সখি ইত্যাদি রূপকের সাহায্যে প্রকাশ করে থাকেন। বাংলার প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষরা রূপকের মাধ্যমে জটিল দার্শনিক আলাপ সহজেই হৃদয়ঙ্গম করতে পারে।

দেওয়ান আবদুল আযীযের জনপ্রিয় মারফতি গান–

মন-মাঝি তোর বৈঠা নে রে, আর আমি বাইতে পারি না

ঢেউয়ের বাড়ী, ঢেউয়ের ঘর, ঢেউয়ের কারখানা

ঘোর তুফানে উঠল ঢেউ, বৈঠায় ত হাইল ধরে না।

মানুষের জীবন একটি নৌযাত্রার মতো। এই যাত্রায় নানা সংকট ও প্রলোভনের ঢেউ আসে। কেবল বাহ্যিক শক্তি বা বুদ্ধি দিয়ে সব সংকট থেকে পরিত্রাণ মিলে না। প্রয়োজন পড়ে অন্তরের জাগরণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার। তাই কবি নিজের ‘মন-মাঝিকে’ জীবনের হাল ধরতে আহবান করেছেন।

 

সিলেটের সাধক আরকুম শাহ (১৮৭৭ -১৯৪১ খ্রি.) বাংলার ভক্তিমূলক ও মারেফতি ধারার অসংখ্য গানের রচিয়তা। এছাড়া তিনি কিছু মুর্শিদি গান ও পীর বন্দনামূলক গান রচনা করেছিলেন। তাঁর ‘হকিকতে সিতারা’ নামে গানের সংকলন ও লোকগবেষক সুমনকুমার দাশের সম্পাদিত ‘আরকুম শাহ রচনাসমগ্র’  রয়েছে। মারেফাতের নিগূঢ়তত্ত্ব নিয়ে তাঁর মারেফতি গানে বলেন,

আপনাকে না চিনিলে, না পাইবায় নিরঞ্জন

মারফতের বন্দেগি সব, যাবে অকারণ॥

আল্লাহ্ কে বা, রসুল কে বা, আদম কোন জন

হাওয়াকে কইলায় পয়দা, কিসের কারণ॥

কী রূপে আসিলু ভবে, কে মোরে কইলো সৃজন

বল মোরে চিনি তারে, কিরূপ গঠন॥[8]

 

আরকুম শাহ মারেফতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার জটিলতর শিক্ষা ও নিগূঢ়তত্ত্বগুলো কয়েক লাইনেই আবদ্ধ করে ফেলেন। যেমন- “আত্মজ্ঞানই হলো আধ্যাত্মিক জীবনের ভিত্তি। বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান নয়, নিজের অস্তিত্ব ও জীবনের উদ্দেশ্য নিয়েও একজন মানুষের চিন্তা করা প্রয়োজন। সৃষ্টির রহস্য, মানবজীবনের উদ্দেশ্য এবং আল্লাহর নিদর্শন সম্পর্কে গভীর চিন্তা মানুষকে মারেফতের দিকে নিয়ে যায়। প্রকৃত আধ্যাত্মিক সাধনা হলো প্রশ্ন করা, চিন্তা করা, আত্মসমালোচনা করা এবং সেই উপলব্ধিকে জীবনে বাস্তবায়ন করা।” গানটির মাহাত্ম্য উপলব্ধি করতে পারলে শ্রোতা ‘আমি কে, কোথা থেকে এলাম, কেন এলাম এবং কীভাবে স্রষ্টার নৈকট্য লাভ করা যায়’– এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে পেতে তাড়না অনুভব করবেন।

কুটি মুনসুরও বেশকিছু মারেফতি গান রচনা করেছেন। যেমন–

১.

এই তোমার ভাঙা ঘর কি ভালো ঘর,

কারো জানার কথা নয়,

ঘরের কথা পরের কাছে, কোন পাগলে কয়।…

২.

পরম দাতা সৃষ্টিকর্তা, চিনে লও তারে,

যার অসিলায় সৃষ্টি হইয়া,

আইলা এ সংসারে।

পরম শক্তি সিন্ধুনীরে, নীর হতে বিন্দু ঝরে,

সেই বিন্দু হতে সৃষ্টি করে,

পরম জীব রয় একাকারে।…

৩.

ফকিরকে চিনে কয়জনে?

ফকিরি জানে কয়জনে?

তিন অক্ষরে হয় ফকিরি,

জাহেরে আর বাতুনে।…

কবি দেখাতে চান যে, আত্মশুদ্ধি, আত্মজ্ঞান এবং সৃষ্টিকর্তার পরিচয় লাভের পথ বাহ্যিক আচার বা পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের নশ্বরতা উপলব্ধি, নিজের অন্তর্জগতকে পরিশুদ্ধ করা এবং বাহ্যিক ও অন্তরের মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই প্রকৃত মারেফতের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব।

 

৩. ফকিরি গান: ফকির বলতে সাধারণত সুফি বা আধ্যাত্মিক সাধকদের বোঝানো হয়। ফকিরি গান বাংলার দরবেশ, ফকির ও সাধকদের আধ্যাত্মিক সংগীতধারা। এটি মূলত গ্রামীণ সমাজে বিকশিত হয়। অন্যান্য সংগীত ধারার মতো ঋজু ভাষায়, প্রতীকী শব্দ ব্যবহার ও লোকসুরের ব্যবহারে মানবজীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, পরম সত্যের অনুসন্ধান, দেহতত্ত্ব, ভক্তিবাদ/গুরুবাদ ও মানবতাবাদসহ প্রভৃতি বিষয়বস্তুর উপর এই ধারার গান রচিত হয়। এখানে উল্লেখ করা জরুরি যে, অনেকেই বাউল ও ফকিরি গানকে এক মনে করে থাকেন। উভয়ই বাংলার আধ্যাত্মিক লোকসংগীতের গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলেও এদের মাঝে মৌলিক কিছু পার্থক্য বিদ্যমান। বাউল গান মূলত মানুষের অন্তর্জগৎ/সত্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি সাধনামূলক সংগীতধারা। এখানে মানুষের দেহকে সাধনার ক্ষেত্র এবং ‘মনের মানুষ’কে পরম ও চূড়ান্ত সত্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বাউলরা মনে করেন, বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের চেয়ে নিজের অন্তরকে শুদ্ধ করা এবং আত্মজ্ঞান অর্জন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে বাউল গানে বৈষ্ণব, বৌদ্ধ, নাথ এবং সুফিসহ বিভিন্ন ধারার ভাবের সমন্বয় দেখা যায়। অন্যদিকে, ফকিরি গান ইসলামী সুফি দর্শনের সঙ্গে অধিক ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এই ধারার গানে আল্লাহর একত্ব, নবী মুহাম্মদ (দ.)-এর আদর্শ, মুর্শিদের দীক্ষা, আত্মশুদ্ধি এবং মারেফত অর্জনের বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। একজন ফকিরের কাছে মুর্শিদ স্রেফ শিক্ষক নন, বরং তিনি আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক, যাঁর শিক্ষা অনুসরণ করে মুরিদ আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করেন। তবে বাস্তব বাংলার লোকসংস্কৃতিতে বাউল ও ফকিরি ধারার মধ্যে স্পষ্ট সীমানা সব সময় টানা যায় না। বিশেষ করে লালন শাহ, হাসন রাজা এবং শাহ আবদুল করিম, কুটি মুনসুর, শীতালং শাহ-এর মতো সাধক-কবিদের রচনায় দুই ধারার বৈশিষ্ট্যই একসঙ্গে দেখা যায়। ফলে সমকালীন গবেষণায় অনেক গবেষক বাউল ও ফকিরি গানকে সম্পূর্ণ পৃথক ধারা হিসেবে নয়, বরং পারস্পরিক প্রভাববিনিময়কারী দুটি আধ্যাত্মিক লোকসংগীতধারা হিসেবে বিবেচনা করেন। বাংলা ভাষায় অনেক বিখ্যাত সাধক ও শিল্পী এই ধারার গান গেয়েছেন এবং লিখেছেন। মুর্শিদি, মারফতি, মাইজভাণ্ডারি গানের রচিয়তাদের প্রায় অধিকাংশই ফকিরি গান গেয়েছেন ও রচনা করেছেন।

 

ফকির দায়েম শাহের রচিত গানগুলো ফকিরি ও মারেফতি সংগীতধারার অন্তর্ভুক্ত । তাঁর রচনায় ইসলামি সুফিতত্ত্বের ধারণা, আত্মজ্ঞান, রূহানী সাধনার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ পেয়েছে।[9] তাঁর কিছু ফকিরি গান–

 

১.

ফিরবি কবে রে মন মরি এ রণ

ঘর বড় ঘড়িরে ভাই দেখিলাম ঘোর দরশন।

সেই খানেতে বিরাজ করে সাঁই নিরঞ্জন

মরি এ রণ…

২.

রুহু নফস্‌ কালেব ভেদ জেনে তুই কররে সাধনা

রুহু নফস্ কালেব না চিনিলে বন্দেগী তোর হবে না।…

৩.

ও তুমি দেল হুজুর না চিনলে পরে তোমার নামাজ হবে কি করে

দেল হুজুরে পড়ো নামাজ আপনার মোকাম চিনে।…

৪.

আমি যার কাছে যাই কেউ নাহি কয়

কী করে নামাজ আদায় হয়।

একশো তিরিশ ফরজ মশলা বিচে

লিখেছেন সাঁই কোরানে শুনে

আমার ভাবনা হয়।

আবার কোন্ ফরজে আল্লা আছে।

ফকির দায়েম শাহের গানগুলোর মূল সুর হলো, মানুষের আধ্যাত্মিক জীবন যেন কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে। বরং আত্মজ্ঞান, অন্তরাত্মার পরিশুদ্ধি এবং পরম সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে জীবন্ত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই একজন সাধকের লক্ষ্য সাধিত হবে। তিনি বারবার মনে করিয়ে দেন যে, ইবাদতের প্রকৃত শক্তি তার বাহ্যিক রূপে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে সৃষ্ট পরিবর্তনে নিহিত। তাই তাঁর গান মানুষকে আত্মসমালোচনা করতে, নিজের অন্তরাত্মাকে চিনতে এবং এবাদতের অন্তর্নিহিত অর্থ উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করে।

 

ফকির মহাম্মদ শাহের রচিত ফকিরি গান[10]

১.

আওল আলেফেতে আল্লা গনি আপে করতার

মিম রূপে দুজাহান বিচে হয়েছেন প্রচার।

মিমে পাগল হয়ে বিধি

বেহেস্ত দোজখ জমিন আদি

বখসে আপে রত্ন আদি

আলমগড়ে হিজদে হাজার॥….

২.

কি কল পেতেছ কলন্দার সকল ঘুরছে লা’এ ত্রিসংসার।

লাম আলেফে জবর দিলে

লামেতে আলেফ লুকাইলে

এলাহা কাহাকে বলে

এল্লরে ভেদ কি তার॥…

৩.

ও মন আপনায় চিনলে পাবে মালেক রব্বানা

আমি আমি বলছো সবে কোথায় আমার ঠিকানা।

ফরমাইল ও আলী অজহু

মান আরাফা নফ সাহু

ফাকাদ আরাফা রব্বাহু

চিনে আমি বল না॥…

৪.

জাহের নামাজ পড়ো বাতুনি আদায় করো

বুঝে সুজে না পড়িলে মুছবে নাকো অন্ধকারে।

জাহেরেতে নামাজ ভাই

পাঁচওয়াক্ত পড়া যে চাই

মুরশিদ ধরে জেনে নিয়ে

নামাজ পড়া আপনারে॥…

 

গানগুলোতে তিনি মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক ধ্যান সাধনার পথে উদ্ভুদ্ধ করতে চেয়েছেন, উপলব্ধি করতে চেয়েছেন আত্মজ্ঞান, তাওহিদ, নবুয়তের শিক্ষা এবং ইবাদতের অন্তর্নিহিত অর্থকে। তিনি আরবি বর্ণ, কুরআনিক পরিভাষা এবং সুফি সাহিত্যে ব্যবহৃত প্রতীক ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছেন যে,  ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রকৃত উপলব্ধি তখনই আসে, যখন মানুষ নিজের অহংকে অতিক্রম করে, নিজের অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং আল্লাহর সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। তাঁর গানে শরিয়ত ও মারেফতকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

৪. পুঁথি গান: বাংলার পুঁথি সাহিত্যে ইসলামি কাহিনী, নবী-রাসুলের জীবন, কারবালার ঘটনা এবং সুফি ভাবধারার বহু উপাদান পাওয়া যায়। এছাড়াও মিথ, গল্পকথা, কল্পকাহিনী, লোকাচার, ধর্মকথা, রাজবন্দনা, দেশপ্রেম, ইতিহাস, যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রেম-উপাখ্যান ও কিসসার মতো বিষয়গুলো পরিবেশন করা হয়। পুঁথি পাঠ অনেক সময় সুর করে ছন্দে ছন্দে পরিবেশিত হতো। পুঁথিগানের প্রধান উৎস হলো পুঁথিসাহিত্য তথা পুঁথিকাব্য। মূলত পুঁথি পাঠ থেকে পুঁথিগানের উদ্ভব ও বিকাশ। ফকির গরীবুল্লাহ (১৬৮০-১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ) রচিত ‘আমীর হামজা’ কাব্যের মাধ্যমে এই ধারার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটে। গ্রামাঞ্চলে একসময় এটি ছিল বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। প্রাচীন পুঁথির জনপ্রিয় কিছু উদাহরণ হলো, সোনাভানের পুঁথি, আমীর হামজা, জঙ্গনামা, গাজিকালু-চম্পবতী, ছয়ফুলমুলুক-বদিউজজামাল, গহর বাদশা বানেছাপরি, এমরান চন্দ্রবান, জামান পাঁচদোলা, তাজেল গোলরায়হান, মদনকুমার প্রভৃতি।

পুঁথিগানকে সায়েরগানও বলা হয়। এটি কবিগানের মতোই প্রতিযোগিতামূলক লোকগান। একজন প্রধান দলপতি/বয়াতী[11] ও দু-তিনজন দ্বোহার নিয়ে পরিবেশিত হয়। বয়াতী পুঁথির কাহিনী কিংবা বাস্তব কোনো ঘটনা নিয়ে মুখে মুখে গান বেঁধে গেয়ে যান, যাকে বয়াত বলে। গানের দুটি অংশ– লহর (বয়াতী একাই গান) ও ধুয়া (দ্বোহাররা সমস্বরে পুনরাবৃত্তি করে)। এতে একাধিক বয়াতী অংশ নিলে গান জমে ভালো। শ্রোতারা এর বিচারকের  ভূমিকায় থাকেন। গলার স্বর, সুর-ছন্দ, তাল-লয়, তর্কক্ষমতা ও শাস্ত্রজ্ঞানের ভিত্তিতে শ্রেষ্ঠ গায়ক নির্বাচনের বিচার-বিবেচনা করেন।

 

হজরত ফাতেমা যোহরাকে নিয়ে রচিত সাতটি পুঁথির নাম গিরীন্দ্রনাথ দাস তাঁর ‘বাংলা পীর-সাহিত্যের কথা (১৯৭৫)’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: ১. মোহাম্মদ রিয়াজুদ্দীন আহম্মদ রচিত হজরত ফাতেমা যোহরার জীবন চরিত, ২. মনীরউদ্দীন ইউসুফ রচিত হজরত ফাতেমা, ৩. শেখতনু বিরচিত ফাতেমার সুরত নামা, ৪. শেখ সেরবাজ চৌধুরীর ফাতেমার সুরত নামা, ৫. আজমতুল্লাহ খন্দকারের ফাতেমার জহুরা নামা, ৬. কাজী বদিউদ্দীন রচিত ফাতেমার সুরত নামা ও ৭. বিবি ফাতেমার বিবাহ[12] সিলেটি নাগরী লিপিতে এখন পর্যন্ত ১৫২টির মতো প্রাচীন পুঁথি, দলিল ও সাহিত্যকর্ম পাওয়া যায়। তাঁর মধ্যে সুফিদের রচিত বেশ কিছু পুঁথি গানের উল্লেখ রয়েছে। ধারণা করা হয়, প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বছর আগে ইসলাম প্রচারক ও সুফি সাধকদের মাধ্যমে উত্তর ও মধ্য ভারতের কাইথি (Kaithi) লিপির আদলে এই লিপির উদ্ভব ঘটে। এটি মূলত সিলেট, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ এবং ভারতের আসামের বরাক উপত্যকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ছাপাখানায় বাংলা লিপির ব্যাপক প্রসার, উর্দু ভাষার প্রভাব এবং দাপ্তরিক কাজে বাংলা ও ফারসি ভাষার ব্যবহারের কারণে নাগরী লিপি তার দৈনন্দিন গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। ড. এনামুল হক ও ড. গোলাম সাকলায়েনের আলোচনায় কবি মুহম্মদ খান, সৈয়দ সুলতান, হায়াৎ মামুদ, মহাকবি আলাওল, কবি হামিদ ও ফকির গরীবুল্লাহর রচিত কারবালা ও মহররম বিষয়ক কিছু পুঁথি-কাব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ধারার কবিগণ প্রত্যেকেই সুফি ভাবধারা দ্বারা প্রভাবিত ও প্রত্যক্ষভাবে সুফি ধ্যানসাধনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যেমন: কবি মুহম্মদ খানের লিখিত ‘মক্তুল হোসেন’, হায়াৎ মামুদের ‘জঙ্গনামা’ (১৭২৩) কবি হামিদের ‘সংগ্রাম হুসন’ (১৭৪০) ফকির গরীবুল্লাহ শাহ্’র ‘জঙ্গনামা’।[13] এছাড়াও সুফিদের রচিত কিছু পুঁথি সাহিত্য হলো– শেখ জাহিদের আদ্য পরিচয় (১৪৯৮), সৈয়দ সুলতানের জ্ঞানপ্রদীপজ্ঞানচৌতিশা, মীর মহম্মদ শফির নূরনামা, শেখ মনসুরের সিরনামা, হাজী মহম্মদের সুরতনামা, নওয়াজিস খানের গুলে বকাওলী এবং আলী রজা কানু শাহের আগমজ্ঞানসাগর অন্যতম।

 

৫. গাজির গান[14]: চতুর্দশ শতকে উদ্ভূত গাজির গান বাংলার লোকধর্মীয় সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা। গাজী শব্দের অর্থ সাহসী যোদ্ধা। গাজী পীর/ পীর বড়খাঁ গাজী নামে একজন সুফি যোদ্ধা ছিলেন, তিনি খানজাহান আলীরও আগের সময়ে দ্বাদশ শতাব্দীতে সুন্দরবন অঞ্চলে আগমন করেন এবং সেখানকার বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। তিনি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও মুসলিম ভক্তদের নিয়ে গান পরিবেশনার আসর বসাতেন। সেই গাজী পীরের কাহিনী, অলৌকিক শক্তি ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। গাজী পীরের কাহিনী সংবলিত পুঁথিকে সুরারোপ করে পরিবেশিত হয় বিধায় একে সুফি সংগীতের উপধারা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। রোগমুক্তি, সন্তান লাভ, ব্যবসা-বাণিজ্যে উন্নতি বা ভালো ফসলের আশায় গ্রামের মানুষ এই গানের আসর বসাত। বিশেষত কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে, যখন কৃষকের উঠানে ধান থাকত, কেবল তখনই গাজির গান পরিবেশিত হতো। এছাড়া অন্য কোনো সময়ে গাজির গান গাওয়া হতো না। অন্য সময়ে এ গান গাইলে ‘অদিনে গাজীর পট’ প্রবাদটি ব্যবহার হতো। শাহ আব্দুল করিমের বিখ্যাত গান ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’-এ গাজীর গানের কথা উল্লেখ আছে।

বর্ষা যখন হইত গাজীর গাইন আইত

রঙ্গে-ঢঙ্গে গাইত আনন্দ পাইতাম

বাউলা গান ঘাটুগান আনন্দের তুফান

গাইয়া সারিগান নাও দৌড়াইতাম ॥

 

এছাড়া লালন সাঁইয়ের একাধিক সংগীতে এই গাজীর গানের উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন-

উবহায়জাত মুসিবত্‌ এলে

দরুদ কালাম পড় সকলে

সে সকল উতরায়ে গেলে

গাজীর গান বেড়াও শুনি।।

 

পল্লিকবি জসীমউদ্দীনও তাঁর একাধিক কবিতায় গাজীর গানকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। যেমন তাঁর এক পয়সার বাঁশি কাব্যগ্রন্থের গল্পবুড়ো কবিতায় লিখেন,

গল্পবুড়ো! আবার যদি গাজীর গানের দলটি নিয়ে,

নাচের নূপুর জড়িয়ে পায়ে, গাজীর আশা ঘুরিয়ে বায়ে,

খঞ্জনীতে সুরটি দিয়ে, রূপকথারি আসর গড় সুদূর কোন গাঁয়ে;

 

বা তাঁর ‘ভয়াবহ সেই দিনগুলি’ কাব্যগ্রন্থে ধামরাই রথ কবিতায় লিখেন,

বছরে দু-বার বসিত হেথায় রথ-যাত্রার মেলা,

কত যে দোকান পসারী আসিত কত সার্কাস খেলা।

কোথাও গাজীর গানের আসরে খোলের মধুর সুরে।

কত যে বাদশা বাদশাজাদীরা হেথায় যাইত ঘুরে।

 

লোকশিল্প সমীক্ষক ও সংগ্রাহক তোফায়েল আহমেদের স্মৃতিকথায়ও এসব গানের উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে চমকপ্রদ কিছু বিবরণ পাওয়া যায়। সুকুমার সেন সর্বপ্রথম গাজী-বিষয়ক একাধিক পুঁথির অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেন। পরবর্তীকালে এ বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান ও আলোচনা করেন আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া। তাঁর গবেষণায় চারজন পৃথক রচয়িতার চারটি গাজী-পুঁথির পরিচয় পাওয়া যায়। এসব পুঁথির রচয়িতা হলেন খোদা বখ্শ, কবি হালুমী (বা হালু মিয়া), কবি আবদুর রহীম এবং আবদুল গফুর। যাকারিয়ার একাধিক লেখাপত্রে এসব পুঁথির তুলনামূলক বিশ্লেষণ রয়েছে।

 

এই গানের আসর সাধারণত রাতের বেলা বাড়ির উঠানে মাদুর বা পিঁড়ি পেতে বসানো হয়। মূল গায়েন মাথায় পাগড়ি ও গায়ে আলখাল্লা পরে গান পরিবেশন করেন এবং ৪ থেকে ৫জন দোহার (সহশিল্পী) থাকেন, যারা গানের সুর ধরেন। মূল গায়েনের হাতে একটি বিশেষ লাঠি বা ‘আসাদণ্ড’ থাকে, যা তিনি গান গাওয়ার সময় অবিরাম দুলিয়ে দুলিয়ে আসরের চারদিকে ঘুরে ঘুরে প্রদর্শন করেন। গায়েনরা বংশপরম্পরায় এসব গান মুখস্থ করে রাখতেন। একসময় খুলনা, সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, ফরিদপুর অঞ্চলে এর ব্যাপক প্রচলন ছিল। গাজির গানের আসরে কারবালার ময়দান, কাশ্মীর, মক্কার কাবাগৃহ, হিন্দুদের মন্দিরের মতো পবিত্র স্থানগুলো বিশেষ চিহ্নে আঁকা থাকতো। অনেক সময় এসব চিহ্ন মাটির সরা বা পাতিলেও আঁকা হতো। গাজির গানের আসরে যেসব গান গাওয়া হতো– গাজী ও কালুর বীরত্ব, গাজী-কালু-চম্পাবতী, পীর পাঁচালী, পাঁচ পীরের কাহিনী, সত্যপীরের কাহিনী, জামাল-কামাল, আফতাব-মহাতাব, দিদার বাদশা, এরিং বাদশা, গুলে বাকাওলী, সোনাফার বাদশাসুফিয়ানী পালা ইত্যাদি। গাজির গান শুরু হয় এভাবে যে,

‘পূবেতে বন্দনা করি পূবের ভানুশ্বর।

এদিকে উদয় রে ভানু চৌদিকে পশর

***

তারপরে বন্দনা করি গাজী দয়াবান।

উদ্দেশে জানায় ছালাম হেন্দু মোছলমান’

 

৬. বাউল সংগীত: বাতুল বা ব্যাকুল শব্দ থেকে বাউল শব্দের উৎপত্তি। ফলে এর অর্থ দাঁড়ায়, যারা পরম স্রষ্টার প্রেমে মাতাল ও তাঁর সান্নিধ্যের পানে অস্থির। বাংলার লোকায়ত সংগীতের একটি স্বতন্ত্র ধারা। একে কখনো ‘শব্দগান’ ও ‘ধুয়া’ গান নামেও ডাকা হয়। আবহমান বাংলার প্রকৃতি, মাটি ও মানুষের জীবন জিজ্ঞাসা, সাম্য এবং মানবতার বাণী এই গানের মূল উপজীব্য। এটি মূলত সুফি দর্শন, বৈষ্ণব সহজিয়া, নাথ ও তান্ত্রিক বৌদ্ধ ধর্মের ভাবধারার সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে। বাউলদের মূল দর্শন হলো দেহসাধনার মাধ্যমে নিজ দেহের অভ্যন্তরে ‘মনের মানুষ’ বা ঈশ্বরকে উপলব্ধি করা। তাদের মতে, মানবদেহেই সমগ্র মহাবিশ্ব ও পরম সত্তা খোদার বাস। বাউলরা বলেন,

সখি গো জন্ম-মৃত্যু যাহার নাই

তাহার সঙ্গে প্ৰেমগো চাই

উপাসনা নাই গো তার

দেহের সাধন সর্ব সার

তীর্থব্ৰত যার জন্য

এই দেহে তার সব মিলে।

 

অর্থাৎ চিরন্তন পরম সত্তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলাই প্রকৃত সাধনা। সেই সাধনার কেন্দ্র বাহিরে নয়, মানুষের নিজের দেহ ও অন্তর্জগতে। আত্মজ্ঞান ও অন্তর্সাধনার মধ্যেই তীর্থ, ব্রত ও ঈশ্বরসন্ধানের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত। পাঞ্জু শাহের একাধিক গানেও দেহতত্ত্বের বর্ণনা পাওয়া যায়–

আগে দেহের খবর জানো রে আমার মন ॥

দেহতত্ত্ব না জানিলে জনম যাবে অকারণ ॥

দেহবৃক্ষের পাঁচটি শাখা,

দশ ডালে তার দশটি পাতা,

সেই বৃক্ষে বসে আছে মহানন্দ মহাজন ॥

বিষয় বিষে মন-চঞ্চলা,

বিবাদী করে ছলা-কলা,

মন বিবাগী, বাগ মানে না, নষ্ট করে পিতৃধন ॥

গুরুর দাসী হও আগে,

প্রেমতরি বাও অনুরাগে,

পাঞ্জু বলে তবেই হবে মহাসুখের আগমন ॥

 

বাউলরা জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কৃত্রিমতার ঊর্ধ্বে উঠে মানবধর্মকে সর্বোচ্চ স্থান দেন। যেমন লালন সাঁইয়ের একটি বিখ্যাত গান–

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে।

লালন বলে জাতের কি রূপ

দেখলাম না এই নজরে।।

কেউ মালায় কেউ তসবি গলায়,

তাইতে যে জাত ভিন্ন বলায়।

যাওয়া কিম্বা আসার বেলায়,

জাতের চিহ্ন রয় কার রে।।

যদি ছুন্নত দিলে হয় মুসলমান,

নারীর তবে কি হয় বিধান?

বামন চিনি পৈতা প্রমাণ,

বামনী চিনি কিসে রে।।

জগত্‌ বেড়ে জেতের কথা,

লোকে গৌরব করে যথা তথা।

লালন সে জেতের ফাতা

ঘুচিয়াছে সাধ বাজারে।।

 

একতারা, দোতারা, খমক, ডুগি, খোল, মন্দিরা, কর্তাল এবং বাঁশি দিয়ে বাউল গান পরিবেশন করা হয়। সতেরো শতকে আউল চাঁদ ও মাধব বিবির মাধ্যমে বাউল ধারার উদ্ভব হলেও লালন সাঁইয়ের গানের মাধ্যমে উনবিংশ শতাব্দী থেকে বাউল গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন শুরু করে। লালন শাহ্, পাগলা কানাই, পাঞ্জু শাহ্, ভোলা শাহ, সিরাজ শাহ্, দুদ্দু শাহ্ কামাল উদ্দিন, রশিদ উদ্দিন, শাহ ইব্রাহীম মাস্তান বকশ, শাহ আবদুল করিম, হাসন রাজা এবং শাহ আলম সরকার বাউল ধারার অন্যতম সাধক। বাউল গান দুইভাবে পরিবেশিত হয়ে থাকে। এক. আখড়া-আশ্রিত সাধনসংগীত, এটি শান্ত সুরে ও মৃদু তালে গীত হয় এবং অনেকটা হামদ-গজল-নাতের মতো শোনায়। দুই. আখড়ার বাইরে জনসমক্ষে পরিবেশিত অনুষ্ঠানভিত্তিক গান, এটি চড়া সুরে ও একতারা-ডুগডুগি-খমক-ঢোলকের সহযোগে গীত হয়। আখড়াকেন্দ্রিক সাধনায় বহু নারী সাধিকা ও গায়িকা অংশগ্রহণ করে থাকেন। পরিবারভিত্তিক বাউল-ফকিরি পরম্পরায় নারীরা প্রায়শই পুরুষ সাধকদের সহধর্মিণী ও সহ-সাধক হিসেবে এসব গানের উত্তরাধিকারী হন। ভারতীয় উপমহাদেশে সুফি ঐতিহ্যে নারীদের সমাবেশে সংগীত পরিবেশনার যে রীতি ছিল, তার প্রভাব বাংলার সুফি সংগীত-সংস্কৃতিতেও পরিলক্ষিত হয়। ইউনেস্কো ২০০৫ সালে বাউল ঐতিহ্যকে মানবতার মৌখিক ও অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপেও লালন মেলা, আখড়া ও বিভিন্ন উৎসবে এই সংগীতের চর্চা অব্যাহত রয়েছে। আধুনিক যুগে ফরিদা পারভীন, পূর্ণদাস বাউল, ভবা পাগলা, লালন ব্যান্ডসহ অনেক শিল্পী এটিকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে গিয়েছেন।

 

৭. হামদ ও নাতের বাংলা রূপ: আরবি, ফারসি ও উর্দু সাহিত্যের মতো বাংলায়ও এই ধারা অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং ঐতিহ্যবাহী। বাংলা নাত সাহিত্যে মদিনার প্রতি আকাঙ্ক্ষা, রাসুল (দ.)-এর প্রতি প্রেম, শাফায়াত ও দিদারের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে অসংখ্য রচনা রয়েছে। হামদ ও নাতের বাংলা রূপগুলো বিশেষত কাদেরিয়া তরিকার অনুসারীদের মধ্যে প্রচলন রয়েছে। অনেকেই একে এককভাবে সুফি সংগীত হিসেবে চিহ্নিত না করে কেবল বাঙালি মুসলমানদের রচনা বলে চিহ্নিত করেছেন। তবে এসব রচনায় সুফি ঐতিহ্যের বিভিন্ন উপাদান লক্ষ্য করা যায়। তবে সন্দেহাতীতভাবে এটুকু নিশ্চিত করা যায় যে, তরিকাবিহীন মুসলমানদের অনেকে হামদ-নাত রচনা করেছেন। পরবর্তীতে বাঙালি সুফি ঘরানার মধ্যেও এর গ্রহণযোগ্যতা ও পরিবেশনা লক্ষ করা যায়।  বাংলা ভাষায় সর্বাধিক হামদ ও নাতের রচয়িতা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর বিখ্যাত কিছু সৃষ্টির রূপ ও উদাহরণ: বিখ্যাত হামদ–

আল্লাহ্ আমার প্রভু, আমার নাহি নাহি ভয়।

আমার নবী মোহাম্মদ, যাঁহার তারিফ জগৎময়।।

            আমার কিসের শঙ্কা

            কোরআন আমার ডঙ্কা

ইসলাম আমার ধর্ম, মুসলিম আমার পরিচয়।।

কলেমা আমার তাবিজ, তৌহীদ্ আমার মুর্শিদ্,

ঈমান্ আমার বর্ম, হেলাল আমার খুর্শিদ্।

            ‘আল্লাহ্ আকবর’ ধ্বনি

            আমার জেহাদ-বাণী,

আখের মোকাম ফেরদৌস্ খোদার আরশ যথায় রয়।।

 

এখানে আল্লাহর একত্ববাদ, ব্যক্তি হিসেবে একজন মুসলমানের পরিচয় ও ভরসার কথা ফুটে উঠেছে। তাঁর বিখ্যাত নাত–

তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে

মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে

যেন ঊষার কোলে রাঙা রবি দোলে ॥

***

এলো ধরায় ধরা দিতে সেই সে নবী

ব্যথিত মানবের ধ্যানের ছবি

আজই মাতিল বিশ্ব নিখিল মুক্তি কলরোলে ॥

 

এই গানে হজরত মুহাম্মদ (দ.)-এর জন্মকে কেন্দ্র করে মানবতার মুক্তি, সাম্য, ন্যায়বিচার ও করুণার এক মহান মুহূর্তের জয়গান করা হয়েছে। কবি মহানবীর জন্মকে সাধারণ কোনো শিশুর জন্ম হিসেবে দেখেননি। তিনি একে মানবজাতির ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তাঁর আগমনে পৃথিবীর ঘন অন্ধকার দূর হয়ে সত্য, ন্যায়, সাম্য ও মুক্তির আলো ছড়িয়ে পড়ে– এটিই গানের মূল বক্তব্য ও প্রতিপাদ্য। নজরুলের রচনায় শতাধিক হামদ নাতের সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন– ১. আজকে যত পাপী ও তাপী/ সব গুনাহের পেল মাফি ২. নয়নেরই পিয়ালায় আসো হযরত/ তরাইতে পাপীরে খোদার রহমত ৩. ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ এলোরে দুনিয়ায়। ৪. দ্বীনের নবীজি শোনায় একাকী কুরআনের মধুবাণী/ আয়িশা খাতুন শোনেন বসিয়া নয়নে ঝরিছে পানি, ইত্যাদি।‌ কবি গোলাম মোস্তফাও তাঁর কাব্যগ্রন্থ ও গানে আল্লাহর সৃষ্টির মাহাত্ম্য খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর বিখ্যাত হামদ হলো–

বাদশাহ তুমি দ্বীন ও দুনিয়ার

বাদশাহ তুমি দ্বীন ও দুনিয়ার

হে পরোয়ারদিগার।

সিজদা লও হে হাজার বার আমার

হে পরোয়ারদিগার।।

***

বিশ্ব ভুবনে যাহা কিছু আছে

তোমারি কাছে করুনা যাঁচে

তোমারি মাঝে মরেও বাঁচে

জীবন সবার।।

 

হামদ নিয়ে তাঁর বিখ্যাত ছড়া রয়েছে । যা বাংলাদেশের বিভিন্ন মাদরাসা ও কিন্ডারগার্টেনে এসেম্বলিতে সুরে সুরে পাঠ করা হয়। যেমন:

অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি

বিচার দিনের স্বামী।

যত গুণগান হে চির মহান

তোমারি অন্তর্যামী।।

দ্যুলোক-ভূলোক সবারে ছাড়িয়া

তোমারি চরণে পড়ি লুটাইয়া

তোমারি সকাশে যাচি হে শকতি

তোমারি করুণাকামী।।

সরল সঠিক পূণ্য পন্থা

মোদের দাও গো বলি,

চালাও সে-পথে যে-পথে তোমার

প্রিয়জন গেছে চলি।।

যে-পথে তোমার চির-অভিশাপ

যে-পথে ভ্রান্তি, চির-পরিতাপ

হে মহাচালক,মোদের কখনও

করো না সে পথগামী।।

 

বাংলাদেশের আরেক বিখ্যাত কবি ফররুখ আহমদের রচিত হামদ-

সকল তারিফ তোমার খোদা, তুমি যে পাকজাত।

মুহাম্মদের স্রষ্টা তুমি, এ তব সিফাত।।

চাঁদ, সিতারা হয়না শুমার,

তামাম আলম সৃষ্টি তোমার,

সৃষ্টি তুমি করেছ রব

তামাম মখলুকাত।।

বান্দা তোমার এই গুনাহগান আজকে পানাহ চায়,

কবুল কর মোদের দোয়া নবীর উসিলায়।।

তোমার কাছে আজ পানাহ চাই

দ্বীন- দুনিয়ায় কারো ভালাই,

আখেরাতে দিয়ো খোদা

অনন্ত জান্নাত।।

২.

তুমি সুন্দর

তুমি সুন্দর,- সুন্দরতম

আদর্শ নিখিলের,

হে রাসুলে খোদা! জুলমাতে পথ

দেখালে জান্নাতের।।

***

এ ধরণী তল চির ভুলে ভরা

পেল অপরূপ শান্তি পশরা

দিলে এনে যবে খোদার কালাম

সওগাত সত্যের।।

 

এছাড়া সিরাজুল ইসলামের হামদ রচনার মধ্য থেকে সর্বাধিক পঠিত হামদ-

আল্লাহু আল্লাহু তুমি জাল্লে জালালুহু

আল্লাহু আল্লাহু তুমি জাল্লে জালালুহু

শেষ করা তো যায়না গেয়ে তমার গুনগান

তুমি কাদের গফফার

তুমি জলিল জব্বার

অনন্ত অসীম তুমি রহিম রহমান।।…

 

অথবা তাঁর বিখ্যাত নাত–

নবী মোর পরশমনি

নবী মোর সোনার খনি

নবী নাম ভাবে যে জন

সেই তো দোজাহানের ধনী ॥

সে নামে মধুমাখা

সে নামে জাদু রাখা

সে নামে মজনু হইলো

মাওলা আমার কাদের গনি ॥…

 

মুন্সী মেহেরুল্লাহের রচিত নাত-

গাওরে মুসলিমগণ নবীগুণ গাওরে

পরান ভরিয়া সবে সাল্লু আলা গাওরে

 

শাহ মুহাম্মদ সগীর তাঁর ‘ইউসুফ-জুলেখা’-এ, সৈয়দ সুলতান তাঁর ‘জ্ঞান প্রদীপ’-এ, কবি আলাওল তাঁর ‘পদ্মাবতী’ কাব্যগ্রন্থেও হামদ ও নাতের মাধ্যমে সূচনা করেছেন। এখনো পর্যন্ত বাংলার চার-পাঁচশ নাত বা হামদ রচিয়তার সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন– কবি জৈন উদ্দীন, শাহ বারীদ খাঁ, উজির বাহরাম খান, কবি শেখ চান্দ, সৈয়দ হামজা, নসরুল্লাহ খান, মরমী কবি লালন ফকির, খন্দকার শামসুদ্দীন মুহাম্মদ সিদ্দীকী, শেখ জমিরুদ্দীন, মুন্সী মেহেরুল্লাহ, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, সৈয়দ আবুল হোসেন, কবি গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, বন্দে আলী মিয়া, জসিম উদ্দীন, কাজী কাদের নেওয়াজ, কবি আল মাহমুদ, মাওলানা কবি রূহুল আমীন খান, কবি আল মুজাহিদী, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, কবি আবদুল মুকীত চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হুদা, সিরাজুল ইসলাম।

৮. সালাত-সালাম’র বাংলা রূপ: হামদ-নাতের মতো ‘সালাম’ উপধারার সংগীতও বাংলা সুফিধারা ও তরিকার অনুসারীদের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। বিশেষত যে-কোনো সুফি সমাবেশের সমাপনীতে মোনাজাতের পূর্বে সবাই দাঁড়িয়ে রাসুল (দ.) এর উপর সালাত ও সালাম পেশ করে এবং শেষে আপন পীর ও মুরশিদের মাহাত্ম্য নিয়ে রচিত সংগীত পরিবেশন করে। কবি গোলাম মোস্তফার বিখ্যাত সালাম রচনা–

ইয়া নবী সালাম আলাইকা

ইয়া নবী সালাম আলাইকা

ইয়া রাসুল সালাম আলাইকা

ইয়া হাবীব সালাম আলাইকা

সালাওয়া তুল্লা আলাইকা।।

তুমি যে নূরের নবী

নিখিলের ধ্যানের ছবি

তুমি না এলে দুনিয়ায়

আঁধারে ডুবিত সবি।।

চাঁদ সুরুজ আকাশে আসে

সে আলোয় হৃদয় না হাসে

এলে তাই হে নব রবি

মানবের মনের আকাশে।।

তোমারি নূরের আলোকে

জাগরণ এল ভুলোকে

গাহিয়া উঠিল বুলবুল

হাসিল কুসুম পুলকে।।

নবী না হয়ে দুনিয়ার

না হ’ইয়ে ফেরেশ্তা খোদার

হয়েছি উম্মত তোমার

তার তরে শোকর হাজারবার।।

 

এছাড়াও কিছু আরবি উর্দু ফারসি পঙক্তি দিয়েও এটি পরিবেশিত হয়। বাংলাদেশের সুফি তরিকার দরবারগুলোতে সালাত-সালামের পর ভারতের প্রখ্যাত সুফি-সাধক, পণ্ডিত ও কবি আহমদ রেযা খানের রচিত মোস্তফা জানে রহমত পে লাখো সালাম কাসিদা পাঠ লক্ষ করা যায়। বিশেষত কাদেরিয়া ও মাইজভাণ্ডারিয়া তরিকার অনুসারীরা আপন পীর ও মুরশিদের নাম সংযোজন করে এটি পরিবেশেন করে থাকেন। বাংলা উচ্চারণে কাসিদাটি হলো–

মোস্তফা জানে রহমত পে লাখোঁ সালাম,

শাময়ে বাজমে হেদায়াত পে লাখোঁ সালাম।

মেরে চোরখে নবুয়্যত পে রওশন দরূদ,

গুলে বাগে রিছালাত পে লাখোঁ সালাম।…

 

৯. মাইজভাণ্ডারি গান: এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের একটি স্বতন্ত্র সুফি সংগীতধারা। মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তকদের মধ্যে কেউ এ ধরণের গান লিখে যাননি। তাঁদের ভক্তগণই তাঁদের গুণগান, কীর্তি, মহিমা বর্ণনা করে গান রচনা করেছেন এবং এই ধারা আজো প্রবাহমান। চট্টগ্রামের অলিতে-গলিতে, দোকান, হোটেল, বাসে এ ধারার গানগুলো এখনো বাজতে শোনা যায়। চট্টগ্রামের বাইরে নোয়াখালী, ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর, বরিশাল ও কুষ্টিয়ায় গানগুলো জনপ্রিয়তা লাভ করে। মাইজভাণ্ডারী গানের ক্রমবিকাশমান ধারায় মওলানা আব্দুল হাদী কাঞ্চনপুরী, কবিয়াল রমেশ শীল ও আব্দুল গফুর হালী এ তিনজন  দিকপালের অবদান অগ্রগণ্য। আব্দুল হাদী কাঞ্চনপুরী ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে প্রথম মাইজভাণ্ডারী গান রচনা করেন। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রায় শতাধিক মাইজভাণ্ডারি গান গ্রন্থিত হয়েছে। তাঁর গানে ঐশী প্রেম, বিচ্ছেদ-বিরহ, আত্মসমর্পণ, সাধনায় নিমগ্নতা ইত্যাদি বিষয়াদির উপস্থিতি রয়েছে। তাঁর বিখ্যাত একটি পদ-

‘দমে দমে জপরে মন লা এলাহা ইল্লাল্লাহ

ঘটে ঘটে আছে জারি লা এলাহা ইল্লাল্লাহ

সপ্ত রঙ্গি টঙ্গির বিছে, রুহ ধন কামিনী নাচে,

প্রেমেতে বিভোর জপ লা এলাহা ইল্লাল্লাহ।’

 

অন্যদিকে প্রেম-বিরহের রূপক ব্যবহার করে তিনি লিখেছেন-

বিচ্ছেদের অনলে সদা অঙ্গ জ্বলে

বিনয় করি গো প্রিয়া আয় আয়রে॥

তাপের তাপিনী হইয়ে বৈরাগিনী

বিলাপী কুহুরী প্রিয়া আয় আয়রে ॥

কামের কামিনী হইয়ে বৈরাগীনি, ত্যাগিলাম পুষ্পের খাট।

তুই বন্ধু বিহনে হৃদেরি আসনে বসাব কাহারে প্রিয় আয় আয় রে॥

দাস হাদী বলে প্রেমেতে মজিলে, নাহি গো মুক্তির আশ।

যাবৎ জীবন করহ জপন, প্রেমের জপনা প্রিয়া আয় আয়রে॥

(রত্নভাণ্ডার-দ্বিতীয় খণ্ড)

 

মুর্শিদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে, পরম সত্যের সন্ধান পাওয়ার সন্তুষ্টিতে তিনি লিখেন-

মজেছি তোমার প্রেমে স্বর্গ সুখ চাহিনা।

কি করিব স্বর্গ সুখ, তোর ভবেতে দিওয়ানা।

আহারে মন ধন লুটিয়ে নিল মন মোহিনী

কুঞ্জবনে পুষ্পাসনে নাচিল কামিনী।…

 

বিংশ শতাব্দীর বিশ থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত কবিয়াল রমেশ শীল মাইজভাণ্ডার বিষয়ে তিন শতাধিক গান রচনা করেন। এ ধারার গানকে তিনি প্রথম দরবারের বাইরে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেন। তিনি প্রচলিত লোকসুর, তাল ও সহজ ভাষার মাধ্যমে এই ধারাকে গণমুখী করে তোলেন। তাঁর বহুল পরিচিত গান–

“চলরে মন ত্বরা যাই, বিলম্বের আর সময় নাই,

গাউসুল আজম মাইজভাণ্ডারী ইস্কুল খুইলাছে।

সেই ইস্কুলের এমনি ধারা, বিচার নাই জুয়ান বুড়া,

সিনায় সিনায় লেখাপড়া শিক্ষা দিতাছে।

নফসানিয়ত ভাগ-বিয়োগ, রূহানিতে পূরণ-যোগ,

ঈমানি সাহিত্য তার নির্দিষ্ট আছে।

খেদমত বিজ্ঞান যার, দয়া করলে হেডমাস্টার।

তামাম দুনিয়ায় হবে নজরের কাছে।”

 

তিনি এখানে পরম সত্যের সন্ধান এবং ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান-সাধনার প্রায়োগিক স্কুল হিসেবে মাইজভাণ্ডারকে চিত্রিত করেছেন। সাধনায় নিমগ্ন থাকার বাসনা ও মুর্শিদের হাত ধরে পরম সত্যকে আবিষ্কার করার বাসন নিয়ে তিনি লিখেছেন–

তোমার পাক নামের ভরসা করি দিয়াছি সাঁতার।

পার কর ডুবাইয়ে মার মহিমা তোমার।

হাঙ্গর কুম্ভির নফছগণ, করে যদি আক্রমণ,

উচ্চস্বরে দিব তখন দোহাই মাওলানার।

মাওলা তোমার নাম স্মরণে, ছোঁয়না তারে কাল শমনে,

রণে বনে জল আগুনে ভয় থাকে না তার।।

বাবা তোমার নূরী চরণ, নিত্য যারা করে স্মরণ,

ঘুচাইয়েছে জন্ম মরণ এই ভবের মাঝার।।

তোমার নূরী চরণ খানি, পাতকী পায়ের তরণী,

 আদমরূপে কাদের গণি, এলে মাইজভাণ্ডার ।।

রমেশ আছি আশা করি, পার করাবে মাইজভাণ্ডারী,

 বর্জ্জক যদি রাখতে পারি, কলবের মাজার।।

 

মাইজভাণ্ডারে একত্ববাদের সাক্ষ্য ও রেসালতের নিশানা লেওয়ায়ে আহমদীর উড্ডয়ন নিয়ে তিনি বলেন–

“মাইজভান্ডারে ওঠেছে তৌহিদের নিশানা,

ঘুমাইওনা মায়া ঘুমে আখের জামানা।

রমেশ বলে লা পরওয়া আছেন মাওলানা।

নাম ধরেছ ভবে হক ভাণ্ডারী, তুমি তৌহিদের কাণ্ডারী নূরী মওলা।”

 

রমেশ শীল তাঁর গানে নিজ আত্মাকে বীণা যন্ত্রের সাথে তুলনা করেছিলেন। এবং ওই বীণার বাদক ছিলেন, মুর্শিদ গাউসুল আজম আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারি। এ তুলনা বাদ্যযন্ত্রের সুরে নিমজ্জিত হওয়ার সঙ্গে পরমাত্মার সন্ধানরত যাত্রার একটি সমন্বয় ঘটিয়েছে। তিনি বলেন–

বাজল আমার হৃদয় বীণা গাউছে মাইজভাণ্ডার,

তিনতারে এক শব্দ করে গাউছে মাইজভাণ্ডার।

হৃদয়ে যে বাজে বীণা,

কে বাজায় ভাণ্ডারী বীণা,

দিবানিশি বাজে বীণা, গাউছে মাইজভাণ্ডার।।

বাজে বীণা সপ্তস্বরে,

আওলিয়া আম্বিয়া স্বরে,

সমস্বরে সবে স্মরে গাউছে মাইজভাণ্ডার।।

রমেশেরী মনের বীণা,

সদাই বাজে বাজান বীণা

বিনা তারে বাজে বীণা, গাউছে মাইজভাণ্ডার।।

আব্দুল গফুর হালী চাটগাঁইয়া ভাষায় মাইজভাণ্ডারি,  মুর্শিদি ও মারফতি ধারায় প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেন। হালীর ভাষ্যে, মাইজভাণ্ডারে গমনের পূর্বে তিনি তিনি কখনো পদ রচনা করেননি। কিন্তু মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ গমনের পর লেখনী ও ভাবকে ভাষায় বুনার অদ্ভুত, অলৌকিক ও তীব্র তাড়না অনুভব করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত রচনার মধ্য থেকে–

দেখে যারে মাইজভাণ্ডারে হইতেছে নুরের খেলা

নুরী মাওলা বসাইল প্রেমের মেলা॥

আল্লাহু আল্লাহু রবে নানান বাদ্য শোনা যায়

গাউছুল আজম শব্দ শুনে আশেকগণে হুঁশ হারায়

জিকিরেতে আকাশ বাতাস করে আল্লাহু আল্লাহ॥

 

আপন মুর্শিদের রূপ ও মাহাত্ম্য (হুলিয়া) নিয়ে তিনি লিখেন –

রসিক তেলকাজ্বালা, ঐ লাল কুর্তাওয়ালা

দিলি বড় জ্বালারে পাঞ্জাবীওয়ালা ।।

বাবরি কাটা তার চুলের বাহার

মুচকি হাসি হাসি মুখটা যে তার। (২)

বাবরি চুল ওয়ালা।।

বন্দু যদি আমার ভ্রমর হইতো

মনেরি বাগানে সে যে মধু খাইতো। (২)

খেলতো প্রেমের খেলা।।

মাইনষে বলে তারে কালারে কালা

আমারি কাছে লাগে কতো যে ভালা। (২)

কালা গলার মালা।।

 

তাঁর আরেকটি বিখ্যাত গান। যেটি আপন মুর্শিদের ইশকে দিওয়ানা হয়ে লেখা ভক্তিমূলক প্রেমের গান হলেও অপরাপর সংগীতের ধারায় স্থান পেয়েছে। তা হলো–

সোনাবন্ধু তুই আমারে করলি রে দিওয়ানা

মনে তো মানে না দিলে তো বুঝে না।।

সোনাবন্ধুর এমনই গুন জল দিলে নিভেনা আগুন

কী দিয়ে নিভাবো আগুন আমায় একটু বল না।।

সোনাবন্ধুর মুখের হাসি যেন পূর্ণিমা শশী

হাসিতে হইলাম পাগল ঘরে থাকতে দিলা না।।

সোনাবন্ধুর প্রেমের তরী চালাই তারে কেমন করি

পাল তুলিয়া বইসা রইলাম মাঝির দেখা পাইলাম না।।

 

এভাবে রুমিয়ে বাঙ্গাল মাওলানা বজলুল করিম মন্দাকিনী, মাওলানা আব্দুল গনি, মাওলানা আব্দুস সালাম ভুজপুরী[15], শাহজাদা শফিউল বশর মাইজভাণ্ডারী, মাওলানা আব্দুল লতিফ শাহ চন্দনাইশী, মাওলানা আব্দুল মালেক শাহ কাঞ্চনপুরী,মাওলানা আবদুল্লাহ বাঞ্চারামপুরী, আমিনুল হক ধর্মপুরী, মনমোহন দত্ত, হজরত নসীম, সৈয়দ মহিউদ্দীনসহ প্রায় শতাধিক মাইজভাণ্ডারি সাধকের রচিত দশ হাজারেরও বেশি গান এ পর্যন্ত গ্রন্থিত  হয়েছে। এখনো আরো সহস্রাধিক গান গ্রন্থাধীন করা যায়নি। গবেষকগণ মাইজভাণ্ডারী গানের ক্রমবিকাশের ধারাকে তিন পর্বে ভাগ করেছেন। প্রথমত, উদ্ভব পর্ব- মাইজভাণ্ডারী তরিকার প্রবর্তক সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর (১৮২৬-১৯০৬ খ্রি.) শানে রচিত গান। দ্বিতীয়ত, বিকাশ পর্ব- সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর ভ্রাতুস্পুত্র ও খলিফায়ে আজম সৈয়দ গোলামুর রহমান প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারীকে (১৮৬৫-১৯৩৭) কেন্দ্র করে রচিত গান। তৃতীয়ত, সমৃদ্ধি পর্ব- সৈয়দ দেলাওর হোসাইন (১৮৯৩-১৯৮২), সৈয়দ শফিউল বশর, সৈয়দ জিয়াউল হকসহ (১৯২৮-১৯৮৮) ও গদীনশীন পীরদের শানে রচিত গান।

 

১০. জারি গান: বাংলার লোকসংগীতের ইতিহাসে জারি গান সুপ্রাচীন ও জনপ্রিয় ধারা। জারি গানের শিকড় ইসলামী ইতিহাস, ধর্মীয় কাহিনী ও সুফি সংস্কৃতিতে প্রোথিত। বাংলায় সুফি সাধকদের আগমন এবং ইসলামী সংস্কৃতির বিস্তারের ফলে জারি গান বিশেষভাবে বিকশিত হয়। ‘জারি’ শব্দটি ফারসি ‘জার’ (زار) থেকে এসেছে, যার অর্থ বিলাপ বা ক্রন্দন। জারি গানের মূল বিষয়বস্তু হলো ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হুসাইন (রা.) ও তাঁর সঙ্গীদের শাহাদাত। জারি গান মূলত পাক-ভারতীয় শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত মুসলমানের মর্সিয়া গানের প্রতিরূপ। মুহররম মাসে এই শোকানুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বাংলায় জারি গানের প্রচলন ঘটে। সুফি দর্শনে কারবালাকে বাহ্যিক যুদ্ধের পাশাপাশি নফসের বিরুদ্ধে অন্তর্দ্বন্দ্বের প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে জারি গানের শোক ধীরে ধীরে আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ভাষায় রূপান্তরিত হয়। অনুমান করা হয়, ষোড়শ শতকের শেষার্ধে শেখ ফয়জুল্লাহ রচিত ‘বিবি জয়নবের চৌতিশা’ নামক প্রথম বাংলা মর্সিয়া কাব্য রচিত। এসময় ‘বিবি সখিনার চৌতিশা’, ‘সখিনার বিলাপ’, ‘জয়নবের বিলাপ’ পুঁথিগুলোও মহররম মাসে মর্সিয়ায় পাঠ করা হতো। পরবর্তী সময়ে মুহাম্মদ খানের ‘মোক্তাল হোসেন’, কবি হামিদের ‘সংগ্রাম হুসন’ ও হায়াৎ মাহমুদের ‘জঙ্গনামা’ও মর্সিয়ায় পাঠ করা হতো। তৎকালীন সময়ে মহররম মাস আসলে যুবকরা জারি গানের আসর বসানোর জন্য গ্রামে অস্থায়ী নকল দরগাহ তৈরি করা হতো। গ্রামের মেয়েরা ‘বিবি ছায়াবাণীর দরগাহ’ নামে বিবি ফাতিমার কৃত্রিম স্থায়ী দরগাহ তৈরি করতো।

বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে জারি গানের নানা রূপ লক্ষ্য করা যায়। কিছু বিখ্যাত জারি গান হলো-  হোসেন শহীদের জারি, কারবালার পালা জারি, খতনামার পালা জারি, বড় এমামের জারি (ইমাম হাসানের বিষপানে মৃত্যু বরণ, আহলে বায়তের বিলাপ ও ইয়াজিদের উল্লাস নিয়ে), আদমের জারি (আদম ও মানুষ সৃষ্টির কারণ নিয়ে), মুনছুরের জারি (বিখ্যাত সুফি মনসুর হাল্লাজ নিয়ে), শাহজালালের জারি (বাংলার সুফিসাধক শাহজালাল ইয়ামেনী নিয়ে), শেখ ফরিদের জারি (সুফি শেখ ফরিদুদ্দিন গঞ্জে শকর নিয়ে), সোলেমান নবীর জারি, নবীর কালেমার জারি ইত্যাদি।[16] জারি গান পরিবেশনার সময় ঢোল, খোল, জুড়ি, করতাল, দোতারা, বাঁশি প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়। অনেক ক্ষেত্রে দলগত প্রশ্নোত্তরধর্মী গায়নরীতি অনুসরণ করা হয়। ঊনবিংশ শতকে জারি গান ধর্মীয় গণ্ডি ছাড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাও ধারণ করতে শুরু করে। অনেক জারি কবি দুর্ভিক্ষ, কৃষকের দুঃখ কিংবা ঔপনিবেশিক শোষণ নিয়েও জারি রচনা করেছেন। বাংলার সুফি সাধকেরা স্থানীয় সংগীতধারাকে ইসলামী আধ্যাত্মিকতার বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। জারি গানে কারবালার শোককে তাঁরা আত্মত্যাগ, প্রেম ও নৈতিকতার প্রতীকে রূপ দিয়েছেন। অন্যদিকে সুফি ও মরমি কবিদের প্রভাবে কিছু সারি গান[17]-এ নদীকে সংসার, নৌকাকে দেহ, মাঝিকে মুর্শিদ এবং গন্তব্যকে ঈশ্বরলাভ-এর প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

 

১১. কাসিদার বাংলা রূপ: বাংলা অঞ্চলে কাসিদা চর্চার বিকাশ মূলত মোগল শাসনামলে ফারসি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রভাবে ঘটে। ফারসিভাষী মোগল অভিজাত ও প্রশাসনিক শ্রেণির মাধ্যমে কাসিদা বাংলায় পরিচিতি লাভ করে এবং ধীরে ধীরে ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতির একটি অংশে পরিণত হয়। এ প্রসঙ্গে প্রাচীনতম নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে রচিত বাহারিস্তান-ই-গায়বি গ্রন্থে। এতে ইসলাম খান চিশতির নেতৃত্বে মোগল বাহিনীর যশোর অভিযানের বিবরণে কাসিদা পরিবেশনের উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীকালে কাসিদা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি অতিক্রম করে বাংলার, বিশেষত পুরাতন ঢাকার মুসলিম সমাজে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়। রাজধানী ঢাকার পুরান ঢাকায় রমজান মাসে সাহরির সময় দলবদ্ধভাবে কাসিদা গেয়ে মানুষকে জাগিয়ে তোলার প্রথা বহুদিন ধরে প্রচলিত ছিল। শাহেদি, মার্সিয়া, নাত-এ রাসূল, ভৈরবী, মালকোষ প্রভৃতি রাগে এসব কাসিদাকে সুরারোপ করা হতো। কাসিদা তিনভাগে বিভক্ত। প্রথম পর্বকে বলা হতো চাঁন রাতি আমাদ। এই পর্বে সেহরির জন্য ঘুম থেকে এলাকার লোকজনকে তুলতো কাসিদাওয়ালারা। দ্বিতীয় পর্ব- খোশ আমদেদ। রমজানে মধ্যভাগ পর্যন্ত এ মাসের ফজিলত উল্লেখ করা হতো এ কাসিদায়। তৃতীয় পর্ব- আল-বিদা। এই পর্বে রমজানকে বিদায় জানিয়ে পাঠ করা হতো কাসিদা। বিভিন্ন বর্ণনায় অনেকগুলো কাসিদার দলের উল্লেখ পাওয়া যায়– যেমন: পুরোনো ঢাকার ভাট মসজিদের সামাদের কাসিদা দল, খাজে দেওয়ান কাসিদা দল, হোসনী দালানের দল, মিরপুরের কাসিদা দল, বকশীবাজারের জুম্মন মিয়ার দল, বংশালের কাসিদা দল। এই ঐতিহ্য কেবল ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের মাধ্যমই নয়, বরং স্থানীয় সামাজিক সংহতি, লোকসংস্কৃতি এবং সামষ্টিক ধর্মীয় চেতনারও এক অনন্য প্রকাশ। তবে সময়ের পরিবর্তন, প্রযুক্তির প্রসার, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং সামাজিক রূপান্তরের ফলে এই ঐতিহ্য ক্রমেই বিলুপ্তির পথে। অতীতে বিভিন্ন কাসিদা দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র ছিল যে, কখনো কখনো তা সংঘর্ষেরও রূপ নিয়েছিল। তবুও কাসিদা বাংলার ইসলামী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি মূল্যবান অধ্যায় হিসেবে আজও ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

 

১২. কাওয়ালির বাংলা রূপ: বাংলা কাওয়ালি মূলত ইন্দো-পার্সিয়ান কাওয়ালি ঐতিহ্যের একটি আঞ্চলিক অভিযোজন। এটি বাংলা ভাষা, লোকসুর এবং সুফি ভক্তিমূলক সংগীতের সমন্বয়ে বিকশিত হয়েছে। বাংলা অঞ্চলের কাওয়ালি উত্তর ভারতের প্রচলিত কাওয়ালির সরাসরি অনুকরণ নয়; বরং বাংলা লোকসংগীতের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র সংগীতধারা। এ বিষয়ে এখনো গভীর গবেষণা ও অনুসন্ধানের সুযোগ রয়েছে। মধ্যযুগে বাংলায় সুফি সাধকদের আগমন, বিশেষত চিশতিয়া তরিকার সামা (সঙ্গীতভিত্তিক আধ্যাত্মিক সাধনা)-এর চর্চা, বাংলা কাওয়ালির বিকাশের ভিত্তি তৈরি করে। পরবর্তীকালে বাংলার ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং সুফি ভাবধারার সংমিশ্রণে এর বর্তমান রূপ গড়ে ওঠে। বাংলা কাওয়ালির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অভিযোজন। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দভাণ্ডারের বিস্তার, দোভাষী সাহিত্য, সুফি কাব্য এবং হামদ, নাত ও গজল রচনার ধারা বাংলা ভাষায় ইসলামী আধ্যাত্মিক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে। এই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বাংলা কাওয়ালিও আরবি-ফারসি-উর্দু ভাবধারাকে বাংলার লোকভাষা ও কাব্যরীতির সঙ্গে একীভূত করে। ফলে এর বিষয়বস্তু ইসলামী হলেও ভাষা ও সুরে স্পষ্টভাবে বাংলা লোকসংস্কৃতির ছাপ প্রতিফলিত হয়। বাংলাদেশে ‘বাংলা কাওয়ালি’ শব্দটির ব্যবহার থাকলেও, সব ক্ষেত্রে তা প্রচলিত কাওয়ালি রীতির সঙ্গে মিলে না। যেমন, চিশতি সাধক গণি পাগলের রচিত কিছু হামদকে ‘বাংলা কাওয়ালি’ বলা হলেও তার সুর, বাদ্যযন্ত্র ও পরিবেশনা বাউল, ফকিরি ও মারেফতি গানের সঙ্গে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। একইভাবে মাইজভাণ্ডারি গানের ক্ষেত্রেও কাওয়ালির সঙ্গে কিছু ভাবগত মিল থাকলেও, পরিবেশনা, গঠন ও সুরের দিক থেকে তা বাংলা লোকসংগীতের স্বতন্ত্র ধারার অন্তর্ভুক্ত। এজন্য অনেক গবেষক মাইজভাণ্ডারি সংগীতকে মারেফতি সংগীতের একটি শাখা হিসেবে বিবেচনা করেছেন।[18]

বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা কাওয়ালির চর্চা তুলনামূলকভাবে বেশি সুসংগঠিত। মেদিনীপুর, হাওড়া, হুগলি, বর্ধমান, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের দরগাহ, ওরস এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিয়মিত বাংলা কাওয়ালি পরিবেশিত হয়। এসব পরিবেশনায় কাওয়ালরা সাধারণত বাংলা ও উর্দু—উভয় ভাষাতেই গান পরিবেশন করেন। পরিবেশনা হামদ দিয়ে শুরু হয়ে নাত, কওল, মানকাবাত এবং অন্যান্য সুফি বিষয়ভিত্তিক গানের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়, যা ঐতিহ্যবাহী কাওয়ালির ক্রমধারাকেই অনুসরণ করে। বাংলা কাওয়ালির সুর ও গঠনেও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। উত্তর ভারতীয় কাওয়ালি যেখানে শাস্ত্রীয় রাগভিত্তিক দীর্ঘ আলাপ, তাৎক্ষণিক স্বরবিস্তার এবং বৃহৎ কাওয়াল দলের সম্মিলিত গায়কির ওপর নির্ভরশীল, সেখানে বাংলা কাওয়ালি অপেক্ষাকৃত সরল সুর, পুনরাবৃত্তিমূলক ধ্বনি, বাংলা লোকসুর এবং সীমিত বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারকে গুরুত্ব দেয়। হারমোনিয়াম, তবলা, ঢোলক, খঞ্জনি, করতাল এবং কখনও বুলবুল তরঙ্গ এর প্রধান বাদ্যযন্ত্র। শিল্পীসংখ্যাও সাধারণত তিন থেকে পাঁচজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বাংলা কাওয়ালির উল্লেখযোগ্য রচয়িতাদের মধ্যে সাদিরুদ্দিন চিশতী, পিয়ারা ইরফান চিশতী, সেলিম চিশতী নিজামী, আবদুল করিম, গুলজার সিপাহী এবং বাচ্চু কাদের-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে শিল্পীদের মধ্যে খাদেম কাওয়াল, মুন্না ঝংকার, নাসের ঝংকার এবং খোকন কাওয়াল বাংলা কাওয়ালির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

 

সমকালীন চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

সুফি সংগীত কয়েক শতাব্দীর ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। একদিকে এটি মঞ্চ, গণমাধ্যম ও বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের অংশ হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে আধুনিক সমাজ, বাণিজ্যিকীকরণ, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের কারণে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। বাংলা অঞ্চলের মুর্শিদি, মারেফতি, ফকিরি ও মাইজভাণ্ডারীসহ বিভিন্ন ধারাও এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাণিজ্যিকীকরণ। আধ্যাত্মিক বার্তা ও তাসাউফের গভীরতা অনেক সময় উপেক্ষিত হয়ে সুফি গান কেবল আবেগনির্ভর বিনোদনে পরিণত হচ্ছে। বাজারের চাহিদা অনুযায়ী সুর ও কথা পরিবর্তিত হচ্ছে, এটি ঐতিহ্যের মূল চরিত্রকেই ক্ষুণ্ণ করে। পাশাপাশি মৌখিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণ সংকট তীব্র। মুর্শিদি, মারেফতি ও ফকিরি গানসহ অনেক ধারা লিখিতভাবে সংরক্ষিত না হওয়ায় প্রকৃত রচয়িতা নির্ণয়, পুরোনো সুরের হারিয়ে যাওয়া এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া ঐতিহাসিক বিকৃতি ও অতিসরলীকরণও লক্ষণীয়। সুফি সংগীতকে প্রায়শই শুধু ‘প্রেমের গান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, আঞ্চলিক বৈচিত্র্য উপেক্ষিত হয় এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সবকিছুর উদ্ভাবক হিসেবে দেখানো হয়। ধর্মীয় বিতর্ক তো রয়েছেই। সংগীতের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুসলিম সমাজে এখনো মতপার্থক্য বিদ্যমান। নতুন প্রজন্মের বৈশ্বিকভাবে জনপ্রিয় অন্যান্য সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণের ফলে ঐতিহ্যবাহী সুফি সংগীত ও সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ কমছে। এবং গুরু-শিষ্য পরম্পরা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। ডিজিটাল যুগে অননুমোদিত ব্যবহার, ভুল তথ্য প্রচার ও অতিরিক্ত সম্পাদনার মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী রূপ আরও চাপের মুখে পড়েছে।

 

তবে এতসব চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখেও ভবিষ্যতের জন্য সম্ভাবনা কিছু এখনো আছে। বিশেষত ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে পুরোনো রেকর্ডিং, গানের কথা ও ইতিহাস সংরক্ষণ করা সম্ভব। একাডেমিক গবেষণার ক্ষেত্র ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। এতে ইতিহাস, নৃসংগীতবিদ্যা, ভাষাতত্ত্ব, ধর্মতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক অধ্যয়নের মাধ্যমে এই ঐতিহ্যকে নতুন করে বোঝাপড়া তৈরি করার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়, উৎসব ও শিল্পীদের পারস্পরিক সহযোগিতা সুফি সংগীতকে ভাষা ও সীমানার বাইরে নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সম্ভাবনা আরও বেশি উজ্জ্বল। দীর্ঘ সুফি ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ লোকসংগীত ও তরুণ শিল্পীদের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ প্রকল্প, আঞ্চলিক ডকুমেন্টেশন, বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা এবং সংগীত উৎসবের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। মূল চ্যালেঞ্জ হলো ঐতিহ্যের আধ্যাত্মিক গভীরতা রক্ষা করে আধুনিক প্রযুক্তি ও নতুন শ্রোতার সঙ্গে সৃজনশীল সমন্বয় ঘটানো। সুফি সংগীত আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। জনপ্রিয়তা যতই বাড়ুক, এর স্থায়িত্ব নির্ভর করবে গবেষক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও নতুন প্রজন্মের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। ঐতিহ্যের গভীরতা বজায় রেখে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারলে এই সংগীতধারা নতুন প্রাণ পাবে এবং ভবিষ্যতেও মানুষের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জীবনকে সমৃদ্ধ করে চলবে।

[1] বিস্তারিত, ড. বরুণকুমার চক্রবর্তী সম্পাদিত, বঙ্গীয় লোকসংস্কৃতি কোষ, অপর্ণা বুক ডিস্ট্রিবিউটর। ড. কাকলী ধারা মণ্ডল সম্পাদিত, বাংলা লোকসংগীত কোষ, অমর ভারতী, ২০১৩। চিত্তরঞ্জন দেব, বাংলার পল্লীগীতি, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রা: লি: প্রথম মুদ্রণ, ১৯৬৬।

[2] বিস্তারিত পড়ুন, ড. এনামুল হক, বঙ্গে সূফী প্রভাব, ঢাকা, ২০১২। ড. গোলাম সাকলায়েন, বাংলাদেশের সুফি সাধক, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ঢাকা, ১৯৮২।

[3] বিস্তারিত পড়ুন: আহমেদ শরীফ, মধ্যযুগের কাব্য সংগ্রহ, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৬২. আহমেদ শরীফ, বাংলার সুফি সাহিত্য, ১ম সংস্করণ,বাংলা একাডেমি, ঢাকা, সময় প্রকাশন, ১৯৬৯।

[4] Hans Harder, Sufism and Saint Veneration in Contemporary Bangladesh: The Maijbhandaries of Chittagong, Routledge, 2011.

[5] শামসুজ্জামান খান সম্পাদিত, গোপালগঞ্জ : বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, জুন ২০১৩, অধ্যায় – মুর্শিদি গান।

[6] বিস্তারিত পড়ুন: জসীম উদ্দীন, মুর্শিদি গান, পলাশ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১২। ওয়াকিল আহমেদ, মারফতি ও মুর্শিদি গান, গতিধারা প্রকাশনী, ঢাকা।

[7] অণিমা মুক্তি গমেজ সম্পাদিত, কুটি মনসুরের গান, ফেব্রুয়ারি ২০১৯।

[8] খন্দকার রিয়াজুল হক ও আবদুর রাহীম হাযারী, সুফি তত্ত্বের আত্মকথা, চতুর্থ প্রকাশ, ২০০৮, পৃ. ১৮-১৯

[9] সুধীর চক্রবর্তী, বাউল ফকির কথা, আনন্দ পাবলিকেশন, ২০১৪, পৃ- ২৯৫।

[10] প্রাগুক্ত

[11] দলপতির নাম অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, যেমন রংপুরে বলা হয় ‘হাদি’, রাজশাহীতে ‘ওস্তাদ’, ময়মনসিংহে ‘বয়াতি’ আবার কুমিল্লায় বলে ‘জোগালি’। দলের মধ্যে যারা গানে ও নাচে অংশগ্রহণ করে রংপুরে বলা হয় ‘পাইল’ এবং ময়মনসিংহে বলে ‘দ্বোহার’।

[12] ডক্টর গিরীন্দ্রনাথ দাস, বাংলা পীর-সাহিত্যের কথা, শেহিদ লাইব্রেরি, কাজীপাড়া, বারাসাত, চব্বিশ পরগনা, ১৯৭৬।

[13] গোলাম সাকলায়েন, বাংলায় মার্সীয়া সাহিত্য, পাকিস্তান বুক করপোরেশন, ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৬৯, পৃ. ১৮০-২০০। মুহম্মদ এনামুল হক, মুসলিম বাংলা-সাহিত্য, পাকিস্তান পাবলিকেশান্স, তৃতীয় সংস্করণ ১৯৬৮, ১৮৯। মযহারুল ইসলাম, কবি হেয়াত মামুদ, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ২০০০।

[14] প্রাথমিক ধারণার জন্য পড়ুন, গাজীর পটের চিত্র ও গান, বাঙালির বেশভূষা সিরিজ, বণিক বার্তা, ২০ এপ্রিল ২০১৭। খন্দকার রিয়াজুল হক, বাংলা একাডেমি ফোকলোর সংকলন: ৬৬ (গাজীর গান)’ এবং মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য : গাজীর গান। আফসার আহমদের গাজীর গান: শিল্পরীতি, বাংলা একাডেমি।

[15] মাওলানা আবদুল হাদী বুলবুলে কাঞ্চনপুরী, মাওলানা আব্দুল গনি মকবুলে কাঞ্চনপুরী, মাওলানা আব্দুস সালাম ভুজপুরী– তাঁরা তিনজনই পরস্পর আপন ভাই এবং তিনজনই মাইজভান্ডারি ধারার কবি।

[16] বিস্তারিত পড়ুন, সামীয়ুল ইসলাম সম্পাদিত, পালা জারি গান, বাংলা একাডেমি, ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১, ঢাকা। গোলাম সাকলায়েনের ‘বাংলার মর্সিয়া সাহিত্য’

[17] সারি গান বাংলার নদীমাতৃক জীবনের শ্রমসংগীত। ‘সারি’ শব্দটি নৌকা বাইবার সময় সারি বা একসঙ্গে তাল মিলিয়ে বৈঠা চালানোর প্রক্রিয়া থেকে এসেছে। মাঝিরা দীর্ঘ নদীপথে ক্লান্তি দূর করতে এবং বৈঠার ছন্দ বজায় রাখতে এই গান গাইতেন। সারি গানের মূল বিষয় প্রেম, বিরহ, প্রকৃতি, নদী, গ্রামীণ জীবন এবং সম্মিলিত শ্রম। তাই একে ‘লোকজ শ্রমসংগীত’ হিসেবে বলা হয়।

[18] Hans Harder, Ibid, 2011.