সুফি সংগীত সিরিজ: পর্ব ০১

সুফি সংগীত বিকাশের সিলসিলা: আরব থেকে পারস্য হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে

 

ভূমিকা:

সংগীতের ইতিহাস, মানবসভ্যতার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। প্রাগৈতিহাসিক যুগে যখন ভাষাই আবিষ্কার হয়নি, তখন ইশারা-ইঙ্গিতের পাশাপাশি কন্ঠের বিভিন্ন স্বরের সাহায্যে মানুষ তার ভাবের আদান-প্রদান করত। এই স্বর থেকে ধ্বনি ও ধ্বনি থেকে ভাষার সৃষ্টি। ভাষার সৃজনের দীর্ঘ যাত্রা ও বিকাশ নিয়ে আমরা কমবেশ ওয়াকিব। তবে ভাষার পাশাপাশি স্বরের উঠানামা ও ধ্বনির নানা ঢঙের উপর নির্ভর করে সুরের চল শুরু হয়। এই সুর বিভিন্ন জাতি-সভ্যতা ধীরে ধীরে পরিপুষ্ট হয়ে সংগীতে রূপ নেয়। মনে রাখা জরুরি, সভ্যতার ইতিহাসে অঞ্চল ও জাতির ভিন্নতার ভিত্তিতে সংগীতেরও বিভিন্ন ধরণ রয়েছে। এটি রীতিমতো কঠোর গবেষণা ও অনুসন্ধানের বিষয়। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে সিন্ধুসভ্যতা ও বৈদিক যুগের মাঝামাঝি সময় থেকেই সংগীতের নিজস্ব একটি রূপ ধরা দেয়। বৈদিক যুগে মুনি-ঋষিগণ বেদের স্ত্রোয়গুলো সুরারোপ করে গাইতেন। আর্যদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও গানের প্রচলন ছিল। পরবর্তীতে হিন্দু রাজত্বকালে সংস্কৃত ভাষায় রচিত বিভিন্ন সংগীত বিষয়ক রচনার সন্ধান পাওয়া যায়। জয়দেব, চন্ডীদাস, বিদ্যাপতি, শ্রীচৈতন্যের রচনা ও হিন্দু নৃপতিগণের পৃষ্ঠপোষকতায় সংগীতচর্চা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মৌর্য-গুপ্ত রাজ্যকালের মুদ্রা ও স্থাপত্যকলা থেকে এ অঞ্চলে সংগীত চর্চার চরম উৎকর্ষতার সন্ধান পাই। এই চিরচেনা সংগীতাঙ্গনে অষ্টম-নবম শতক থেকেই নতুন ও সমৃদ্ধ এক সংগীত ধারার সাথে বাংলার মানুষ পরিচিত হতে শুরু করে।

ইসলাম ধর্ম ও এর মরমি ধারা তথা সুফিতত্ত্ব যখন মধ্য এশিয়া, পারস্য, খোরাসান ও আরব থেকে দরবেশ, পীর ও আউলিয়াদের হাত ধরে বাংলায় প্রবেশ করে, তখন তার সঙ্গে সঙ্গে এখানে এক নতুন সাংগীতিক ভাবধারা (Musical Genre)-এর আগমন হয়। এই সংগীত ধারার আগমনের সাথে সাথে নানা প্রকার আরবীয়-পারসিক বাদ্যযন্ত্রও এদেশে আসে। এর মধ্যে কানুন (বীণা), উদ্‌ (সারেঙ্গী), চ্যাং (বীণা), ঘীচক, রবাব, সহরোদ (সরোদ), কীটার (গীটার), কবুজ বা কুনবুস, তাম্বুর, কামান্‌জাহ (বেহালা), বাক (বাঁশি), নেই (বাঁশি), সুরনাই, নাকারা, সান্‌জ, দফ (খঞ্জনী), ডোল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।[1] যেহেতু আরবীয়-পারসিক সংগীত পদ্ধতির সাথে উপমহাদেশীয় সংগীত পদ্ধতির সামঞ্জস্য রয়েছে,  ফলে দুই ধারার সমন্বয়ে সংগীত তার নতুন দিশার সন্ধানে বেগবান হয়। কালের পরিক্রমায় আরব্য-পারসিক-মুসলমান সংগীত ধারা বাংলার নিজস্ব লোকসংস্কৃতি, নব্য মুসলমান হিন্দুদের বৈষ্ণব সহজিয়া তত্ত্ব, বৌদ্ধদের তান্ত্রিক সাধনা ও লোকায়ত জীবনবোধের সঙ্গে মিলেমিশে এক অনন্য সাংগীতিক রূপ ধারণ করে। ধীরে ধীরে জন্ম হয় বাউল, মুর্শিদি, মারফতি, মাইজভাণ্ডারী, জারি-কান্না, ভক্তিসংগীতসহ প্রভৃতি সংগীতধারা। যেগুলো আজও বাংলার মাটি ও মানুষের অন্তরে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে আছে।

ভাষা আবিষ্কার হওয়ার পর থেকেই তাল-সুর-সংগীতই হলো মানুষের আনন্দ, বেদনা, প্রেম, শোক, প্রত্যাশা, প্রতিবাদ এবং ঈশ্বরানুভূতির সর্বাধিক চর্চিত ও সর্বশ্রেষ্ঠ প্রকাশভঙ্গি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, “আমাদের মনোভাব গাঢ়তম তীব্রতমরূপে প্রকাশ করিবার উপায়রূপে সংগীতের স্বাভাবিক উৎপত্তি।”[2] সুচেতা চৌধুরীর আলোচনায় এটি আরো স্পষ্ট হয়, “সঙ্গীত শিল্পই হলো শ্রেষ্ঠতম, যা যুগ যুগ ধরে মানুষের সঙ্গে মানুষকে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে বেঁধে ফেলে। এর প্রধানতম কারণই হলো মানুষের মনের সঙ্গে সঙ্গীত পলকের মধ্যে যুক্ত হয়ে যায় এবং সঙ্গীতের সঙ্গেই অজান্তে মানুষের মনও মহাকালের গতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে।”[3] মানবসভ্যতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি জাতি-সভ্যতার ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে কোনো না কোনো রূপে সংগীত, ধ্বনি, ছন্দ কিংবা সুরকে ধ্যান-সাধনা-আরাধনার তথা Spiritual practice-এর একটি কার্যকরী পন্থা হিসেবে চর্চিত হয়েছে। ইসলামি সভ্যতার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। আক্ষরিক ও শুদ্ধবাদী ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গীতে যদিও সংগীত চর্চার পদ্ধতিগত দিক নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে নানা বাহাস-ইখতিলাফ বিদ্যমান, তথাপি এসব মুনাজারা-মুনাক্বাশার ঊর্ধ্বে উঠে সুফিবাদী ইতিহাসে আধ্যাত্মিক অনুষঙ্গ (Spiritual Attachment) হিসেবে এটি বিকশিত হয়েছে। বিশেষত সামা, জিকির, কাওয়ালি, হামদ, নাত, মানক্বাবাত, মুর্শিদি, মারিফতি এবং আঞ্চলিক লোকধারার বহু সংগীতরূপ সুফি সাধকদের আত্মশুদ্ধি, খোদাপ্রেম, ঐশ্বরিক অনুভূতি ও অতীন্দ্রিয় অভিজ্ঞতার ভাষা হয়ে উঠেছে।

 

বাংলার সাংস্কৃতিক ল্যান্ডস্কেপে সংগীত কখনো শুধু বিনোদনের উপাদান ছিল না, এটি ছিল সহস্রাব্দের বাংলার লোকজীবনের ধর্ম, দর্শন, সমাজ, সংস্কার ও মানবতাবাদের এক সম্মিলিত বাহন। আঠারো শতকের বিখ্যাত সুফি কবি ও সাধক আলী রজা কানু শাহ মনে করতেন, একজন বৈরাগীর কাছে গীত/গান, কীর্তন এবং তাল-বাদ্য কোনো সাধারণ সংগীতের উপকরণ নয়। এগুলো পরম সত্য ও সত্তার স্মরণ এবং ভজনের মাধ্যম। তাঁর প্রকৃত ‘মহামন্ত্র’ হলো প্রভুর নাম। আর গান ও তালের মাধ্যমে সেই নামের কীর্তনই তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা। তিনি বলেছিলেন,

“গীতন্ত্র মহামন্ত্র বৈরাগীর কাম

তালযন্ত্র মহামন্ত্র প্রভুর নিজ নাম।”

তারও আগে প্রাচীন ভারতীয় সংগীততত্ত্বেও সংগীত যাত্রাকে পরম সত্তার সান্নিধ্য লাভের উপায় হিসেবে বিবেচিত হতো। যেমন প্রাচীন ভারতীয় বৈদিক ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যর বীণা, শ্রুতি ও তালের জ্ঞানকে মোক্ষ বা নির্বাণ লাভের উপায় হিসেবে আবিষ্কার করেছেন। তিনি বলেছিলেন,

“বীনাবাদনতত্ত্বজ্ঞ: শ্রুতিজাতি বিশারদ:

তালজ্ঞশ্চাপ্রয়াসেন মোক্ষমার্গং চ গচ্চাতি”

অর্থাৎ, বীণাবাদনের তত্ত্বে যিনি পারদর্শী, শ্রুতি ও জাতির সূক্ষ্ম জ্ঞানসম্পন্ন এবং তালের ওপর যার অগাধ দখল, তিনি অনায়াসেই মোক্ষ বা মুক্তির পথ লাভ করেন।

 

বাংলার সুফি সংগীত স্রেফ ধর্মীয় সাধনার বিষয় নয়; এটি একইসঙ্গে স্থানীয় দর্শন, সাহিত্য, সংগীত ও সমাজ-সংস্কারের এক সমন্বিত রূপ। এই গানের মাধ্যমে সাধকরা জাগতিক সৃষ্টির প্রতি প্রেম, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সাম্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং পরম স্রষ্টার সঙ্গে মানবত্মার নিবিড় সম্পর্কের কথা বারংবার বলে এসেছেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গ্রামীণ জনজীবন, খানকাহ, দরগাহ, ওরস, মিলাদ, জিকির মাহফিল এবং লোকায়ত সংস্কৃতির নানা পরিসরে এই সংগীত মানুষের আধ্যাত্ম, মনোগত ও সামাজিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে। কুষ্টিয়ার লালন সাঁই থেকে শুরু করে ভাটি বাংলার হাসন রাজা ও শাহ আবদুল করিম, চট্টগ্রামের মাইজভান্ডারী ঘরানা, চিশতিয়া তরিকার বদৌলতে ভারত থেকে আগত কাওয়ালী, কাদেরিয়া ও নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া তরিকার অনুসারীদের বাদ্যযন্ত্রবিহীন হামদ, নাত, কাসিদা ও মানকাবাত  কিংবা সুরেশ্বরী সিলসিলার মুর্শিদি গান– প্রত্যেকেই এই ধারাকে নিজস্ব ভাষা ও সুরে সমৃদ্ধ করেছেন। আলোচনায় প্রবেশের আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি যে, প্রাক-ঔপনিবেশিক যুগের পূর্বে মুসলমান কবি-সাহিত্যিক ও রচিয়তাগণের প্রায় সকলেই সে-সময়কার কোনো তরিকা বা সুফি-ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রচনাকার্যে চিন্তাসাধনে সুফিদের দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। ফলে ঐতিহাসিক ও গবেষকগণ ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সাধারণ মুসলমানদের রচনাও সুফি কাব্য-সাহিত্য-সংগীতের অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন।

 

এই প্রবন্ধে সুফি সংগীতের ধারণা ও উৎপত্তি, বাংলা অঞ্চল পর্যন্ত এর বিকাশ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রয়োগ এবং সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করার কৌশিশ থাকবে। কেননা সংগীতকে এড়িয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে বাংলার সুফি-সাধকদের কর্মসাধনার ইতিহাস বোঝা প্রায় অসম্ভব।

 

সুফি সংগীত 

সুফিতত্ত্ব (তাসাউফ) মূলত ইসলামের অন্তর্মুখী ও মরমি সাধনার একটি ধারা। পরম প্রেমময় সত্তার সান্নিধ্য লাভ, মানবাত্মার পরিশুদ্ধি (তাযকিয়াতুন নফস), পরমাত্মার প্রতি একাগ্রতা (ইখলাস), সৃষ্টির প্রতি অনুগ্রহ (ইহসান), মানবাত্মা ও পরমাত্মার প্রেম (মুহাব্বত) এবং পরম ও প্রকৃত সত্য (হাকিকত)-এর অনুসন্ধানই এর প্রকৃত উদ্দেশ্য। এই উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট সাধনপদ্ধতি।

একে বলা হয় তরিকত বা The path of god। এই সাধনাপথে জিকির, মুরাকাবা, চিল্লা বা খলওয়াত, রিয়াজত, মুজাহাদা এবং সামা-কাওয়ালির মতো বিভিন্ন অনুশীলনের মাধ্যমে মানবাত্মাকে জাগতিক মোহ থেকে মুক্ত করে পরম সত্তা ও পরম সত্যের অভিমুখী করে তোলার চেষ্টা করা হয়। সুফি সংগীত এই বৃহত্তর আধ্যাত্ম ধ্যান-সাধনারই একটি সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক প্রকাশ।

‘সুফি সংগীত’ (Sufi Music) মূলত এমন সংগীতধারা, যা তাসাউফ বা ইসলামি মরমি সাধনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত এবং সুফিতত্ত্বের উদ্দেশ্যাবলী হাসিল করাই এর মুখ্য উদ্দেশ্য। এই ধারার রচিত সংগীতসমূহ সুফি সাধকদের দ্বারা রচিত ও পরিবেশিত হয়ে থাকে, তবে এটি মূল শর্ত নয়। অনেক সময় সুফি সাধকদের দ্বারা রচিত না হওয়া সত্ত্বেও বহু সংগীত উদ্দেশ্যগত সামঞ্জস্যতার কারণে সুফি সংগীত ধারার অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে এবং জনপরিসরে এসব সুফি সংগীত হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। সুফি সংগীতের সবচেয়ে কাছাকাছি ও সাধকদের মধ্যে সর্বাধিক ব্যবহৃত পরিভাষা হলো: ‘সামা (سماع)’। আরবি سمع (সামি‘আ) ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘শোনা’। সুফিতত্ত্ব অনুসারে, “Sama (Arabic sama, ‘listening’ or ‘audition’) is the Sufi practice of attentive listening to poetry, sacred recitation, and music as a vehicle for remembrance and ecstatic nearness to God.”[4]

ইসলামের প্রাথমিক যুগে সামগ্রিক সুফিসংগীতকে সামা হিসেবে চিহ্নিত করলেও পরবর্তী সময়ে তুরস্কের সুফিসংগীত ও রুমির মেভলভি তরিকার সংগীতকে ‘সামা’  হিসেবে গণ্য করা হয়। সামা পরিবেশনের মাধ্যমে সাধকগণ এমন এক পরিবেশ তৈরি করেন, যেখানে মানবাত্মা ঐশ্বরিক প্রেম অনুভব করতে পারে। অতীন্দ্রিয় ও ভাবাবেগপূর্ণ এই সংগীত শ্রোতার মনে পরম স্রষ্টা ও সত্যের প্রতি এক তীব্র ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে। শ্রোতা আবেগাপ্লুত হন এবং পরম স্রষ্টার মহিমান্বিত উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হন। কিছুক্ষণের জন্য তার মানসিক, আবেগিক এবং কখনো কখনো শারীরিক অবস্থাও পরিবর্তিত হয়ে যায়। এই সংগীত পরম স্রষ্টার নিকট মিনতি জ্ঞাপন করে, নবী মুহাম্মদ (দ.)-এর দরুদ ও প্রশংসা করে এবং মহান সুফিসাধক ও আধ্যাত্মিক গুরুর জীবনকে উদযাপন করে।

 

সুফি সংগীত বিকাশের সিলসিলা (প্রাথমিক যুগ থেকে উপমহাদেশ পর্যন্ত)

ইসলামপূর্ব আমলে আরবীয়দের কবিতা, গান ও মৌখিক সাহিত্য চর্চার সিলসিলা অনুসারে[5] ইসলামের প্রাথমিক যুগেই মুসলমানদের মধ্যে সংগীতের প্রচলন জারি ছিল। সেসময় কুরআন তিলাওয়াত, হামদ, নাত, আজান এবং জিকিরের সুরেলা পরিবেশনা আধ্যাত্মিক আবহ নির্মাণে ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম ধর্মের প্রতি আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রথমত, ইসলামের ধর্মীয় গ্রন্থ পবিত্র কুরআন গদ্য ও পদ্যে মিশ্র ছন্দে রচিত। কুরআন পাঠে সুর, স্বর, তাল, মাত্রা, কম্পন ইত্যাদি অনুভূত হয়। এছাড়া হাদিসেও কিছুটা ছন্দ ও তালের আভাস রয়েছে। ফলে ইসলামী দর্শনের ভিত কুরআন-হাদিস পাঠ থেকেই সুর-তাল-লয় ও সংগীতের চর্চার শুরু। হাদিসেও উদ্ধৃত আছে, নবী মুহাম্মদ (দ.) বিবাহ অনুষ্ঠানে সংগীতের অনুমতি দিয়েছিলেন।[6] বিবাহ ছাড়াও ঈদের দিনে সংগীত পরিবেশন[7] ও গানের তালে তালে আবিসিনিয়ান হাবশিদের সামরিক নৃত্য প্রদর্শনীর[8] একাধিক হাদিস পাওয়া যায়। নবী মুহাম্মদ (দ.) সুরেলা কন্ঠে কুরআন তেলাওয়াতকে উৎসাহিত করতেন। হযরত আবু মুসা আল-আশআরী (রা.)-এর কুরআন তিলাওয়াতেরও প্রশংসা করেছিলেন। নবীজীর স্ত্রী খোদ হজরত আয়েশাই সংগীতের অনুরাগিণী ছিলেন। নবী-যুগে হজরতের সাহাবীদের হামদ, নাত ও কবিতা চর্চার উল্লেখ পাওয়া যায়। হাসসান ইবন সাবিত, কা’ব ইবন যুহাইর, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা-সহ প্রমুখ সাহাবীগণ ইসলাম, আল্লাহ এবং রাসুল (সা.)-এর প্রশংসায় কবিতা রচনা করতেন। হাসসান ইবন সাবিতকে প্রায়শ ‘Poet of the Prophet’ বলে সম্বোধন করা হতো। তিনি কাফিরদের ব্যঙ্গ করে প্রাণীপশুর সাথে তুলনা করে হাজারের অধিক কবিতা রচনা করেছিলেন। কা’ব ইবন যুহাইরের বিখ্যাত ‘বানাত সু’আদ’ কাসিদা নবী (দ.)-এর সামনে আবৃত্তি করা হয়েছিল এবং রাসুল (দ.) তাঁকে নিজের চাদর (বুরদা) উপহার দিয়েছিলেন। এসময়ই হামদ, নাত ও ধর্মীয় কাব্যের প্রাথমিক রূপ গঠন হয়েছিল।

সাদ বিন আবি ওয়াক্কাস, আয়েশা বিন সাদ, আবদুল্লাহ বিন জাফর, সুকাইনী বিনতে ইমাম হোসাইনসহ প্রভৃতি সাহাবীগণ তাঁদের বাসস্থানে সাপ্তাহিক সংগীত আসরের আয়োজন করতেন মর্মে বর্ণনা পাওয়া যায়। খিলাফতের যুগে হজরত আবু বকর সিদ্দিকের সময়কাল ব্যতীত অন্যান্য খলিফার সময়কালে সংগীতের চর্চা ছিল। হজরত ওমর-এর পুত্র আসীম ও নিয়োগকৃত মায়মন প্রদেশের প্রশাসক আন-নুমান সংগীতের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন।[9] চতুর্থ খলিফা হজরত আলী স্বয়ং উচ্চস্তরের কবি ছিলেন, আর কবিগণ স্বভাবতজাতভাবে সংগীত ও ললিতকলার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে থাকেন। এসময়ে আবদুল্লাহ আল দাইব তুয়াইস, আজ্জা আল মাইলা, নাসিখ ইরানী, আহমদ আল নাসিবী, সাইব কাসির অত্যন্ত জনপ্রিয় সংগীতজ্ঞ ও শিল্পী ছিলেন। খিলাফতের যুগে পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের বিপুল অংশ বিজিত হওয়ায় তাদের স্থানীয় কৃষ্টি-কালচার-সভ্যতার প্রভাব আরবদের উপরও পড়ে। তাদের সংগীত-সাধনাও আরবদের প্রভাবিত করে। ফলে দুইয়ের সমন্বয়ের আরবীয় মুসলমানদের সংগীতাঙ্গন ক্রমশ বিকশিত হতে থাকে। সে-সময় প্রথাগত আরবীয় সংগীতের পাশাপাশি যে-সকল সংগীত প্রকরণের উপস্থিতি ছিল, তা হলো- গিনা সংগীত, হাদা/কারওয়া/রাকবানী সংগীত, নুসব, হাযাজ, সিনাদ, সাইব কাসির আবিষ্কৃত থাকিল আওয়াল, তুরাইসের আবিষ্কৃত গিনা আল মুতকান ও গিনা আল রাফিক, আজ্জা আল মাইলা আবিষ্কৃত গিনা আল মুত্তাকী প্রভৃতি।[10] এসব সংগীত পরিবেশনে উদ্, মিজহার/মিজমার (Reed-Pipe/সেতার জাতীয় যন্ত্র), তাম্বুরা (Pandora), জাঙ্ক (Harf), মিজাফা (Psaltery), মিজাফ (Barbiton), কাসাবা (Vertical Instrument), বুক (Horn Clarion), দফ (Tambourine), ঢাল (Drum) ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার হতো।

 

পরবর্তীকালে অষ্টম ও নবম শতকে হাসান আল-বসরী, রাবেয়া আল-আদাবিয়্যা, জুনাইদ আল-বাগদাদী, যুননূন আল-মিসরী, বায়েজিদ বোস্তামী-সহ অসংখ্য সুফিসাধকদের মাধ্যমে সুফিতত্ত্বের বিকাশের সাথে সাথে ধ্যানসাধনার অংশ হিসেবে ‘সামা’ নামে একটি স্বতন্ত্র সংগীতধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে-সময়কালে কোন কোন সুফি ‘সামা’র অনুশীলন করতেন, তার বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে তৎকালীন সুফিসমাজে ‘সামা’সহ কিছু সংগীতধারার উপস্থিতির সত্যতা আমরা পরবর্তী শতকের দার্শনিক সুফি[11]দের বিভিন্ন লেখনিতে উল্লেখ পাই। ৮ম-৯ম শতকে সুনির্দিষ্টভাবে সংগীতচর্চাকারী সুফিদের উল্লেখ না পেলেও, মুসলিম সমাজে যে সংগীতচর্চা হতো- এর বিভিন্ন উদাহরণ আমরা ইতিহাসে হাজির পাই। যেমন: উমাইয়া যুগ (৬৬১–৭৫০ খ্রি.)-এ আবু জাফর মুহাম্মদ, ইবনে মিসজাহ, মা’বাদ আল মাদানি, ইবনে সুরাইজ, হুনাইন আল হিরি, দাহমান আল গুজাইলী, ইয়াহিয়া কাইল, আত-তাররাদ আবু হারুন, আল বায়দাক, উমর আল ওয়াদি, আবু কামিল আল গুজাইল, মালিক আল-গারীদ ও তার শিষ্য মালিক আত-তাঈ প্রমুখ। সে যুগে মহিলা সংগীতজ্ঞার মধ্যে ছিলেন জামিলা, সাল্লামা আল কাস, সাল্লামা আল জালকা, হাব্বাবাহ, খুলাইদা, আল ফারিহা, লাহদাত আল আইশ প্রমুখ।[12] আব্বাসীয় যুগ (৭৫০–১২৫৮ খ্রি.)-এ ইব্রাহিম আল-মাওসিলি (৭৪২–৮০৪ খ্রি.), ইব্রাহীমের পুত্র ইসহাক আল-মাওসিলি (৭৬৭–৮৫০ খ্রি.) ও ইব্রাহিমের শিষ্য-শ্রেণী, আবু হাসান আলী ইবনে নাফী যিরইয়াব (৭৮৯–৮৫৭ খ্রি.), হাকাম আল ওয়াদী, আবু ওয়াহহাব আবদুল্লাহ সিয়্যাত, ইসমাইল আল জামী, আল হুসাইন ইবনে মুহরিজ, আবুল হাসান আলী ইবনে নাফী, আল বায়াদী (মৃ-১০৭৬ খ্রি.), ইবনে হামদীস (মৃ-১১৩২ খ্রি.), বাগদাদের আবু আবদাল্লা আল আবলা (মৃ-১৩৩৮ খ্রি.), কায়রোর তাকি আদ্দীন সারুকি (মৃ-১২৯৪ খ্রি.)-সহ এ পর্যন্ত পাঁচ শতাধিক সংগীতজ্ঞ আবিষ্কৃত হয়েছে।[13]

 

সংগীত চর্চাকারী মুসলমানদের মধ্যে কেউ কেউ সংগীততত্ত্ব ও তৎকালীন সময়ের সংকলিত গানের গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তন্মধ্যে, খলিল ইবনে আহমেদের রচিত Kitab al-Nagham ও Kitab Al-Ika, আবু আল-ফারাজ আল-ইসবাহানি (৮৯৭-৯৬৭ খ্রি.)-র রচিত Kitab al-Aghani (20 Volumes), ইবনে আবদ রাব্বিহী (৮৬০-৯৪০ খ্রি.) রচিত আল-ইকদ আল-ফরিদ (25 Volumes), ইবনে কালবি (-৮১৯ খ্রি.) রচিত Kitab al-Nagham (Melody সংক্রান্ত পুস্তক) ও Kitab al-Qiyan (সংগীত বালিকাদের ইতিহাস), কুরাইশ জাররাহীর ‘Kitab Siyanat al-Ghina wa Akhbar al-Mughanni Yin’ সহ ইউনুস আল কাতিব, নাশিদ আল ফারিসী, ইসহাক আল-মাওসিলি (আল ওয়ারাক রচিত কিতাব আল ফিহরিস্ত নামক গ্রন্থে তাঁর ৪০-এর গ্রন্থের সন্ধান আছে), সোলাইমান আল মাদানী (ফিহরিস্তে ১১ টি বইয়ের বর্ণনা আছে), আল কিন্দি (৭৯০- ৮৭০ খ্রি.: মুসলমানদের মধ্যে তিনি প্রথম যুক্তিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রাকৃতিক জগতকে ব্যাখ্যা করেন, তাই তাঁকে ইসলামি দর্শনের জনক বলা হয়। সংগীত নিয়ে তার ৭টি গ্রন্থ রয়েছে), ইখওয়ান আল সাফা (ফিহরিস্তে প্রায় ৫১টি গ্রন্থের বর্ণনা রয়েছে), আহমদ আল সারাখসি (ফিহরিস্তে ৪টি গ্রন্থের সন্ধান আছে), আল ফারাবী (৮৭০- ৯৫০ খ্রি./ সংগীত নিয়ে তাঁর ৪টি গ্রনৃথ রয়েছে। সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ: Kitab al musiqa al kabir), ইবনে সিনা (সংগীত নিয়ে তাঁর তিনটি গ্রন্থ: শিফা, মাদখাল ইলা সিনাত আল মিউসুকি। নাজাত-এর ইলম আল মিউসুকি অধ্যায়) প্রমুখের রচিত গ্রন্থাবলী।[14] তাদের লিখিত গ্রন্থসমূহে ‘সামা’, সমকালীন সংগীত ধরণ-প্রকরণ-সংকলন ও বিশ্লেষণের হদিস পাওয়া যায়। এই দুই যুগে ২-৩ শতাধিক সংগীতজ্ঞ লেখকদের সহস্রাধিক গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া যায়।

 

যাই হোক, দার্শনিক সুফিদের মধ্যে ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি (১০৫৮-১১১১ খ্রি.)- তাঁর Ihya’ Ulum al-Din (The Revival of the Religious Sciences)-এর ২য় খন্ডে Kitab Adab al-Sama‘ wa’l-Wajd (Book of the Etiquette of Listening and Ecstasy অধ্যায়ে, আবুল কাসিম আল-কুশায়রী (মৃত্যু: ৪৬৫ হি./১০৭২ খ্রি.) তাঁর Al-Risala al-Qushayriyya (The Epistle on Sufism) গ্রন্থে, আলী ইবন উসমান আল-হুজভিরি (দাতা গঞ্জে বখশ) তাঁর Kashf al-Mahjub (The Unveiling of the Veiled) গ্রন্থে, আবু নসর আস-সাররাজ তাঁর Kitab al-Luma‘ fi al-Tasawwuf (The Book of Flashes)-সহ প্রমুখ গ্রন্থে সামা, ওয়াজদ[15], হাল (আধ্যাত্মিক অবস্থা)[16] এবং মাকাম (আধ্যাত্মিক স্তর)[17] নিয়ে নানা যুক্তি তর্কের সাথে তাঁদের নিজস্ব ভাষ্য উপস্থাপন করেন। এছাড়া পূর্বের সামা সংক্রান্ত বিতর্কের সমাধা ও সামা পালনে নিয়মাবলি নিয়ে ১২শ শতকের প্রখ্যাত সুফি শেখ শিহাব উদ্দিন সোহরাওয়ার্দী তাঁর আওয়ারিফুল মাআরিফ গ্রন্থে বিশদ আলোচনা করেন।[18] ‘সামা সংক্রান্ত বিতর্ক’ বলতে, হিজরি ৩য়-৫ম শতক (খ্রিস্টীয় ৯ম-১১শ শতাব্দী)-এ মুসলমানদের মাঝে ‘সামা’কে কেন্দ্র করে দুটি প্রবণতা/ইখতিলাফ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রথমাংশে, অধিকাংশ সুফি ‘সামা’কে আত্মশুদ্ধি ও পরম স্রষ্টা আল্লাহকে স্মরণের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। অন্যদিকে আলিম, মুহাদ্দিস ও ফকিহদের মধ্যে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, সামা অপব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ বিনোদন, নৃত্য কিংবা পার্থিব আনন্দে লিপ্ত হতে পারে। ফলে তারা প্রকাশ্যে জনসাধারণের মাঝে ‘সামা’কে উদযাপন না করার সিদ্ধান্ত জানান। দ্বিতীয় পক্ষ বা আলিম শ্রেণীর বিতর্কের লিগ্যাসি হলো: গানকে ইবলিসের শোকগীতি তুলনা করে কিছু হাদিস রয়েছে বা হযরত আবু বকর, ওমর, ওসমানসহ অনেক সাহাবি সংগীতকে উদযাপন করতেন না বা মাজহাবের ইমামরা সংগীত উদযাপনের ক্ষেত্রে খানিকটা বিরূপ ও খানিকটা বিধিনিষেধ আরোপ করতেন।[19] বিতর্কের সমাধানের লক্ষ্যে পরবর্তীকালের আলেম-সুফিরা সামা উদযাপনের জন্য কিছু অপরিহার্য শর্তাবলি পূরণের নির্দেশ দেন।[20] যাতে একজন সাধক সামা উদযাপনের মূল মাকসাদ থেকে সরে না যায়। মূলত হিজরি দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শতককে সুফি সংগীতের ধারণাগত ও তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণের যুগ বলা যায় ।

 

আব্বাসীয় ও আন্দালুসীয় (মুসলিম স্পেন) যুগ ছিল সামগ্রিক মুসলমানের সংগীত ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। এসময় সমগ্র মুসলিম বিশ্বে সংগীত চর্চার যে ব্যাপকতা ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, বিভিন্ন অঞ্চলের সুফিসমাজেও এর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। পরবর্তী হিজরি ষষ্ঠ থেকে নবম শতক (প্রায় দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ খ্রিস্টাব্দ) ছিল সুফি সংগীতের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। পূর্ববর্তী যুগে ‘সামা’ যেখানে সীমিত সংখ্যক সুফিসাধকের মাঝে কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার একটি অনুশীলন ছিল, এই সময়ে তা সাহিত্য, কবিতা, সংগীত, নৃত্য, খানকাহ সংস্কৃতি এবং সুফি তরিকার সাধনপদ্ধতির  সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন সুফি সংগীত ধারার প্রবর্তন হওয়ার পাশাপাশি এটি একটি সুসংহত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়। এই সময়ে পারস্য, খোরাসান, মধ্য এশিয়া এবং আনাতোলিয়া (বর্তমান তুরস্ক) ও দিল্লি ছিল ইসলামী সভ্যতার জ্ঞান, সাহিত্য ও আধ্যাত্মিকতা চর্চার অন্যতম কেন্দ্র। সুফি তরিকার বিস্তার, ফারসি ভাষার সাহিত্যিক সমৃদ্ধি, খানকাহভিত্তিক সাধনাপদ্ধতির বিকাশ এবং আধ্যাত্মিক কবিতা-সাহিত্যের জনপ্রিয়তা সুফি সংগীতকে নতুন মাত্রা প্রদান করে। যদিও প্রথাগত ইতিহাসে সংগীত বিকাশের ক্ষেত্রে শাসক শ্রেণি ও দরবারি মহলকেই একক কৃতিত্ব দেওয়া হয়। এবং দাবি করা হয়, সুফিদের বিভিন্ন অঞ্চলে গমনের একমাত্র উদ্দেশ্য (Motive) ছিল ধর্মপ্রচার। তাঁরা সেখানে সংগীত নিয়ে গমন করেননি। কিন্তু ইতিহাসের নিরপেক্ষ পাঠক হিসেবে আমাদের পাঠে মিলে প্রথার বিভিন্ন মত।

নবী যুগের মক্কা-মদিনার ইসলামে কুরআন তিলাওয়াত ও আজানের সুরেলা পরিবেশনা যেমন ভিন্নধর্মী কাফিরদের ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট করতে দেখা গিয়েছিল। তেমনি ধর্ম ও তরিকায় আকৃষ্ট করতে সুফিদের খানেকায় চর্চিত সামা/জিকির/কাওয়ালিও অনুরূপ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে সংগীত চর্চা ও বিকাশের ক্ষেত্রে দরবারি মহল ও রাজশাসকদের অবদানও এড়িয়ে যাওয়ার অবকাশ নেই।

 

বিতর্কের পরিসর থেকে হোক অথবা সুফিদের সংগীতচর্চার কারণ অনুসন্ধান ও সংগীত অঙ্গনে তাঁদের অবদান অনুসন্ধানের জায়গা থেকে হোক, এখানে পাকিস্তানি ইতিহাসবিদ শেখ মুহাম্মদ ইকরাম (১৯০৮ -১৯৭৩ খ্রি.)-এর একটি পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দেখান যে, সুফিরা সংগীতকে নিজেদের ধ্যান-সাধনার অংশ করে নিয়ে একদিকে যেমন প্রথাগত শুদ্ধবাদী মুসলমানদের বির্তক ও নিষেধাজ্ঞা থেকে রক্ষা করে, অন্যদিকে অনেকগুলো আধা-ধর্মীয় ও সুফিবাদী সংগীতধারার উদ্ভব করে এবং একে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করে। তাঁর এই পর্যালোচনা বাংলার ক্ষেত্রে যে ষোল আনাই সত্য, তাও উল্লেখ করেছেন‌। মূল পর্যালোচনা একাংশ: “Even more important than the contribution of individual Sufi musicians was the general encouragement given to the art by Sufi support. With the theologians’ ban on music its cultivation might have been confined to circles outside the pale of orthodoxy, but Sufi patronage saved music from this fate, and gave Muslims many forms of semi-religious music, which were free both from Hindu traditions and shortcomings of the type of music which became popular during the decay of the Mughal empire. Sufi patronage greatly helped the popularity of music with the masses. Qawwali, performed at the Urs of various saints and on other occasions, appealed to thousands of illiterate villagers, who were present on such occasions, and were like free concerts of congenial and inspiring music. The share of Sufis in the cultivation of popular music may be judged by the fact that a large propor-fion of the folk music of Pakistan, such as the Marfati, Murshidi, and Baul songs of East Bengal, and cafis of Sind and Punjab, are concerned with Sufi themes, and in Kashmir classical music itself is called Sufiana Kalam.”[21]

 

ইসলামের প্রথম কয়েক শতকে আরবি ছিল ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার প্রধান ভাষা। কিন্তু আব্বাসীয় যুগে ফারসি ভাষা সাহিত্য, দর্শন ও আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তির এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ভাষাগত স্থানান্তর সুফি চিন্তাধারার জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। কারণ আরবি যেখানে প্রতিষ্ঠিত ছিল তাফসির, হাদিস ও ধর্মতত্ত্বের শাস্ত্রীয় ভাষা হিসেবে, সেখানে ফারসি ছিল হৃদয়ের সূক্ষ্মতম অনুভূতি প্রকাশ, আবেগের সূক্ষ্ম স্তর এবং অতীন্দ্রিয় অন্বেষণের জন্য অধিকতর উপযোগী। ফলে সুফি সংগীত আরবীর তুলনায় ফারসি ভাষায় তুলনামূলক বেশি বিকশিত হয়। পরবর্তীতে আমরা দেখব, পারস্য ও আরব্য ভাবধারা ও সংগীতধারার সাথে বাংলার ভাব-সংগীত-বাদ্যযন্ত্রের সাথে মিল থাকার কারণে এ অঞ্চলে ফারসি ও আরবি ভাষায় বিকশিত সংগীত ধারা (আধ্যাত্মভাব ও আধ্যাত্ম সংগীত ধারা) তার চূড়ান্ত রূপ নেয়।[22]

সুফিসাধকেরা উপলব্ধি করেন, হৃদয়ের সূক্ষ্মতম অনুভূতি, প্রেম, বিরহ, আত্মবিসর্জন এবং মারিফতের মতো বিষয়গুলো কাব্যের ভাষায় অধিক শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করা সম্ভব। পূর্বের ইসলাম সাহিত্যের চরম উৎকর্ষতা, লোকায়ত ভাবধারা ও সুফিতত্ত্বের নিজস্ব আধ্যাত্মবোধের সমন্বয়ে এই সময়ে গজল, রুবাই, কাসিদা এবং মসনবী আকারে বিপুল পরিমাণ আধ্যাত্মিক সাহিত্য রচিত হয়। পরবর্তীতে সুরারোপ করে খানকাহ, সামা-মজলিস এবং আধ্যাত্মিক সমাবেশে পরিবেশিত হতে থাকে। ফলে সুফি সংগীতের সঙ্গে কাব্যের সম্পর্ক ক্রমশ অবিচ্ছেদ্য ও নিবিড় হয়ে ওঠে।

এই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল রূপকের (Metaphor) ব্যবহার। ‘শরাব (ঐশী প্রেম)’, ‘সাকি’, ‘বাঁশি (মানবাত্মার সুক্ষ্ম অনুভূতি)’, ‘বুলবুল (আশিক) ও ফুল (মাশুক)’, ‘বাগান’, ‘আগুন’, ‘সমুদ্র’ ইত্যাদি প্রতীক পার্থিব অর্থে নয়; বরং ঐশী প্রেম, আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং আল্লাহর নৈকট্যের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। কাব্য সরাসরি সংগীতের অংশ না হলেও যখন কাব্যকে সুরারোপ করা হয়, তখন তা সংগীতের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে কাব্য ও সংগীত একে অপরের পরিপূরক বটে। এ সময়ে যেসব কাব্যগ্রন্থ তৎকালীন সুফি সংগীতকে প্রভাবিত করেছিল, তন্মধ্যে হাকিম সানায়ী (ইন্তে. ৫৪৫ হি./১১৫০ খ্রি.) এর হাদীকাতুল হাকীকাহ (Hadiqat al-Haqiqah), ফারিদউদ্দিন আত্তার নিশাপুরী (ইন্তে. ৬১৮ হি./১২২১ খ্রি.) এর মানতিকুত তোয়ায়ের (Mantiq al-Tayr, পাখিদের সম্মেলন), মাওলানা জালালউদ্দিন মুহাম্মদ রুমি (৬০৪-৬৭২ হি./১২০৭-১২৭৩ খ্রি.) এর মসনবী এবং দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজি, হাফিজ শিরাজী (ইন্তে. ৭৯২ হি./১৩৯০ খ্রি.) এর দিওয়ান ও রুবাইয়ত, সাদি শিরাজী (ইন্তে. ১২৯১/৯২ খ্রি.) এর বোস্তাঁ (Bustan) ও গুলিস্তা (Gulistan), আলি-শির নাভাই (১৪৪১- ১৫০১ খ্রি.) এর লিসান আত তোয়ায়ের (স্রষ্টার অন্বেষণে মানবজাতির আবশ্যকতা নিয়ে লেখা) নকশবন্দিয়া তরিকার সুফি আবদুর রহমান জামি (১৪১৪- ১৪৯২ খ্রি./ তাঁর সব রচনা সুফিতত্ত্ব নিয়ে)-এর মসনবি “হাফত আওরাঙ্গ (সাতটি সিংহাসন)”, ও তিনটি গীতিকবিতা “ফাতিহাত আল-শাবাব (যৌবনের শুরু), ওয়াসিতাত আল-ইকদ (হারের কেন্দ্রীয় মুক্তা), এবং খাতিমাত আল-হায়াত (জীবনের উপসংহার)”-সহ প্রভৃতি অন্যতম। তৎকালীন সময়ে পারস্য, তুরস্ক, ভারত এবং মধ্য এশিয়ার বহু দরগাহ, খানেকাহ ও মজলিসে তাদের কবিতা ও গজল সুরারোপ করে পরিবেশিত হতো। এখনো বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, দরবার খানেকায়, ওরস-মাহফিলে নাত বা হামদের অংশ হিসেবে এসব পাঠ করা হয়। এভাবে পঞ্চাদশ শতকের পূর্বেই সুফি সংগীত একটি স্বতন্ত্র ও সমৃদ্ধ ধারায় পরিণত হয়।

 

আরব, পারস্য ও আনাতোলিয়ার সুফি সংগীতে ক্ষেত্রভেদে বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে ব্যবহার হতো। তন্মধ্যে, নেই (Ney)[23], দফ (Daf), কুদুম (Kudum/ছোট আকারের যুগল ঢোল), তানবুর (Tanbur/দীর্ঘ গ্রীবার তারযন্ত্র), রেবাব (Rebab/ধনুক দিয়ে বাজানো তারযন্ত্র), নাকাড়া, সানতুর (Santur/হাতুড়ি দিয়ে বাজানো তারবাদ্য),  তার (Tar/পারস্যের তারবাদ্য), রিক (Riqq/মধ্যপ্রাচ্যের এক ধরনের ফ্রেমযুক্ত হাত-ঢোল), উদ (Oud,  কানুন (Qanun), মাহরুদ (সেতার জাতীয়) প্রভৃতি। তবে সব সুফি তরিকায় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার সমানভাবে গৃহীত ছিল না। কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়ার মতো কিছু সুফি তরিকা কেবল কণ্ঠভিত্তিক সামা/জিকরকে প্রাধান্য দিত। বিশেষত নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দেদিয়া তরিকা নৈঃশব্দ্যে জিকির করাকে প্রাধান্য দেয়।

 

খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতকেই পারস্য, খোরাসান ও মধ্য এশিয়ার সুফি তরিকা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করে। বিশেষত চিশতিয়া, সোওহরাওয়ার্দিয়া, কুবরাবিয়া এবং পরে নকশবন্দিয়া তরিকার সুফিদের  মাধ্যমে ফারসি আধ্যাত্মিক সাহিত্য, সামা-সংস্কৃতি এবং সুফি সংগীত দক্ষিণ এশিয়ায় পৌঁছে যায়। এছাড়াও সংগীত আনয়নের ক্ষেত্রে সুলতানি ও মোঘলের মসনদ ও সভাষদেরও ব্যাপক অবদান রয়েছে।[24] এই সাংস্কৃতিক স্থানান্তরের ফলেই ভারতীয় রাগসংগীত, স্থানীয় ভাষা এবং ফারসি সুফি কাব্যের সংমিশ্রণে এক নতুন সংগীতধারার জন্ম হয়। পরবর্তীকালে উপমহাদেশে এটি ‘কাওয়ালি’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করে। মধ্যযুগে উপমহাদেশে সবশ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ ছিলেন, তুতিয়ে হিন্দ হযরত আমির খসরু (১২৫৩-১৩২৫ খ্রি.)। তিনি দিল্লির শায়খ সুলতানে আউলিয়া নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য। তিনি প্রথম কাওয়ালী ও গজল গান রচনা করেছিলেন এবং ফার্সি, তুর্কি ও হিন্দুস্তানি ভাষার সংমিশ্রণে সৃষ্ট ‘হিন্দভি’ ভাষার প্রচলন করেছিলেন। সংগীত গবেষক এ. জেড. এম. শামসুল আলম লিখেছেন, “আমির খসরুর হিন্দী রচনা সম্পর্কে বলা হয়, তিনি এক লক্ষ শ্লোক রচনা করেছিলেন এবং আরও রচনা করেছিলেন পাহালিস (ধাঁ-ধাঁ, খেয়ালি রাগ) এবং দোহা শ্লোক যার কিছু কিছু আধুনিক কাল পর্যন্ত পৌঁছেছে। আমির খসরু ছিলেন দিল্লির ১১ জন শাসকের সমকালীন ব্যক্তিত্ব এবং ৭ জন সুলতানের দরবারের সংগীতজ্ঞ ও কবি। আমির খসরু ছিলেন দিল্লির অন্যতম পরাক্রমশালী সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির সভা কবি এবং দরবারের প্রধান সংগীতজ্ঞ।”[25]

 

আমির খসরু পারস্য এবং প্রাচীন ভারতীয় সংগীতের সংমিশ্রণে কয়েকটি নতুন ‘তান’ ও ‘লয়’ সৃষ্টি করেন। ভারতীয় এবং পারস্যের পারস্পরিক সুরের মিশ্রণে আমির খসরু ‘সূতার’ এবং অপর কয়েকটি ছন্দ আবিষ্কার করেন। পারস্য সংগীতের ১২ পর্দা এবং অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়সমূহে তার প্রগাঢ় পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি সঙ্গীত প্রতিযোগিতায় বিশেষ আগ্রহ সহকারে অংশগ্রহণ করতেন। তিনি তৎকালীন বিখ্যাত সংগীত পন্ডিত নায়ক গোপালকে সংগীত প্রতিযোগিতায় পরাজয়ে সক্ষম হয়েছিলেন। Life and Works of Amir Khusrau গ্রন্থে ড. ওয়াহিদ মির্জা বলেন, “He (Khusrau) has, since very remote times, been regarded to have been as great in music as in poetry, and able to express in musical numbers even the sounds produced by a gong or a carder’s bow. Tradition, again, ascribes to him the invention of the Sutar as well as several new melodies compounded of Persian and Indian tunes, and he is said to have defeated in open contests a famous musician of the Deccan, Naik Gopal by name. That Khusrau had studied well the science of music is abundantly clear from his writings. He seems to have been quite familiar with the Persian system and to have known well all its intricacies: the four usuals, the twelve pardhas, and so on. He knew well also the Indian system and was a great admirer of it. Musical contests, too, would appear to have been a favourite pastime of his day, and Khusrau did apparently take a keen interest and an active part in them. It is quite reasonable, therefore, to believe that he made some attempt to combine the Persian and Indian systems and to evolve new melodies characteristic of the new Indo-Persian culture of India. But it is difficult to determine exactly the extent or importance of the modifications introduced by him. According to an old Persian work on Indian music (which is supposed to be a translation of an older work written in the time of Rajah Man Singh of Gwalior), he invented the following new melodies: mujir, sazgari, aiman, ushahaq, ghazal, zilaf, zilaf, farghana, sarparda, bakharz, frodast, qual, tarana, khyal, nigar, basit, shahana, and subila.”[26]

 

আমির খসরু ছাড়া আমির হাসান আলা সিজ্জি (১২৫৪ – ১৩৩৭ খ্রি.), বারনাওয়ার পীর শেখ বোধান (ইন্তে. ১৪৯৩ খ্রি.), গোয়ালিয়রের পীর শেখ মুহাম্মদ গাউস (১৫০০-১৫৬৩ খ্রি.), শায়খ বাহলুলও সংগীতজ্ঞ ছিলেন।[27] আমির হাসান আলা সিজ্জি, চিশতয়া তরিকার শায়খ নিজামুদ্দীন আউলিয়ার শিষ্য ও আমির খসরুর সমসাময়িক ছিলেন। ‘হিন্দুস্তানের সাদি’ নামে পরিচিত সিজ্জি খুবই উঁচুমানের সুফি-কবি ও পন্ডিত ছিলেন। তিনি ইন্দো-পার্সিয়ান গজলের প্রবর্তক। তাঁর সংকলিত বিখ্যাত গ্রন্থ হলো: ফাওয়ায়িদুল ফুয়াদ, যেখানে মুর্শিদ নিজামুদ্দীন আউলিয়ার বক্তৃতা ও বাণী লিপিবদ্ধ করেছেন। পীর শেখ বোধানের খানেকা ছিল দিল্লি, দাক্ষিণাত্য ও জৌনপুরের সংগীত শিল্পীদের আতুড়ঘর। তাঁর খানেকায় কাওয়ালী ও খেয়ালী গাওয়ার জন্য কয়েকশত সুফি সংগীতজ্ঞ সর্বদা মওজুদ থাকত। জৌনপুরের সুলতান হোসেন শার্কি পীর বোধানের সঙ্গে তাঁর রচিত সংগীত বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ নিতেন। শার্কি দরবারের সংগীতজ্ঞদের পীর বোধানের নিকট তালিম নেওয়ার জন্য পাঠাতেন। সাত্তারি তরিকার পীর শেখ মুহাম্মদ গাউস নিয়ে ঐতিহাসিক বাদাউনি বলেন, “গোয়ালিয়রের কামিল আউলিয়া শেখ মুহাম্মদ গাউসের খানেকায় যে সংগীত পরিবেশিত হতো, তা তিনি নিজেই রচনা করতেন। সুরও দিতেন উত্তর ভারতের সংগীতজ্ঞদের সর্বপ্রিয় শেখ মুহাম্মদ গাউস।” শেখ গাউসের সময় গোয়ালিয়রের রাজা ছিলেন রাজা মান সিংহ (রাজত্ব ১৪৮৬- ১৫২৭ খ্রি.), তিনি সংগীতের প্রতি অনুরাগী ও সংগীতজ্ঞ ছিলেন। ভারতবর্ষের সংগীতাঙ্গন নিয়ে তার পর্যালোচনা ও উদ্দেশ্য ছিল, তৎকালীন হিন্দু ও মুসলিম সংগীতধারার সংমিশ্রণে যে অসঙ্গতি ও বিকৃতি সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূর করে ভারতীয় সংগীতকে একটি সুসংগঠিত, মানসম্মত ও শুদ্ধ রূপে প্রতিষ্ঠিত করা। এই লক্ষ্যে তিনি একটি কমিশন গঠন করেন, যার ফলস্বরূপ মান কৌতূহল (Man Kautuhal) গ্রন্থ প্রণীত হয় এবং রাগ-রাগিণীর শ্রেণিবিন্যাস ও মান নির্ধারণ করা হয়। পূর্বে ধ্রুপদ বা হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিক সংগীত গাওয়া হতো সংস্কৃত ভাষায়। রাজা মান সিংহ সংস্কৃতের পরিবর্তে হিন্দি ভাষায় ধ্রুপদ পরিবেশনের প্রবর্তন করেন। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, রাজা মান সিংহ কমিশন গঠন করে, গ্রন্থ প্রণয়ন করে, রাগের সীমা নির্ধারণ করে দিয়ে সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাংগীতিক সংস্কারের কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। অন্যদিকে একই সময়ে একই স্থানে শুধু খানেকায় পূর্বরচিত কাওয়ালি ও খেয়ালি সংগীতচর্চার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে দিয়ে সংস্কারের কার্যক্রম সম্পাদন করেন। পরবর্তীতে উভয় প্রচেষ্টায় হিন্দি ভাষার ধ্রুপদ জনসাধারণের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল।[28] শায়খ বাহলুল ছিল, শেখ মুহাম্মদ গাউসের পীর শায়খ জাহুলের আপন ভাই। তিনিও সংগীতজ্ঞ ছিলেন।

এঁরা ব্যতীত পরবর্তীকালে মখদুম নূহ সিদ্দিকী (১৫১৫– ১৫৯০ খ্রি./ সোহরাওয়ার্দী তরিকার সুফি ও সিন্ধি ভাষার কবি), সুফি কবি শাহ হুসাইন (১৫৩৮–১৫৯৯ খ্রি./পাঞ্জাবি কবিতায় কাফি ধারার পথিকৃৎ), পাঞ্জাবের সুলতান বাহু (১৬২৮– ১৬৯১ খ্রি.), চিশতিয়া তরিকার সুফি শাহ কলীমুল্লাহ জাহানাবাদী (১৬৫০- ১৭২৯ খ্রি.), শাহ আবদুল লতিফ ভিট্টাই (১৬৮৯–১৭৫২ খ্রি.), পাঞ্জাবি সুফি কবি শাহ শরফ (১৬৪০ – ১৭২৪ খ্রি./ তার রচনাশৈলী কাফি। তাঁর গ্রন্থ: দোহরা এবং শুতুরনামা), বুল্লে শাহ (১৬৮০- ১৭৫৭ খ্রি.), কাদেরিয়া তরিকার পাঞ্জাবি ও সেরাইকি সুফি কবি আলি হায়দার মুলতানি (১৬৯০–১৭৮৫ খ্রি.), সুফি কবি মির্জা মাযহার জান-ই-জানান (১৬৯৯–১৭৮১ খ্রি.) সৈয়দ খাজা মীর দর্দ, (১৭২১–১৭৮৫ খ্রি.), পাঞ্জাবের ওয়ারিস শাহ (১৭২২–১৭৯৮ খ্রি.) মীর মুহাম্মদ তাকী (১৭২৩- ১৮১০ খ্রি.), আব্দুল ওহাব ফারুকী সচল সারমাস্ত (১৭৩৯-১৮২৭ খ্রি./তাঁকে ‘শায়ের-এ-হাফত জাবান’ বা সাত ভাষার কবি বলা হয়। তিনি সিন্ধি, উর্দু, ফার্সি, আরবি, সরাইকি, পাঞ্জাবি ও হিন্দি ভাষায় কবিতা রচনা করেছেন), খাজা গোলাম ফরিদ (১৮৪৫- ১৯০১ খ্রি.), আব্দুল করিম খান (১৮৭২- ১৯৩৭ খ্রি.), সুফি হযরত ইনায়েত খান (১৮৮২-১৯২৭ খ্রি.)-সহ সহস্রাধিক সংগীতজ্ঞ ও অনুরাগী সুফিসাধক বা তাদের অনুসারীগণ ভারতবর্ষের সুফিসংগীতকে আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক রূপ দান করেন।

 

গোয়ালিয়রে শেখ মুহাম্মদ গাউসের একজন শিষ্য ছিল, মিয়া মির্জা তানসেন। তাঁর মূল নাম ত্রিলোচন মিশ্র ও উপনাম তান্না মিশ্র। তিনি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান ছিলেন। তাঁর পিতা মাকন্দর মিশ্র ৫ বছর বয়সে সুফি মুহাম্মদ গাউসের দরবারে নিয়ে আসেন[29] এবং গাউসের ইন্তেকাল পর্যন্ত দরবারে জীবনযাপন করেন। দরবারে থাকাকালীন সময়ে ত্রিলোচন সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠেন। সুফির ইন্তেকালের পর ত্রিলোচন সংগীতের দীক্ষা জারি রাখতে বৃন্দাবনের স্বামী হরিদাসের নিকট গমন করেন। পরে তৎকালীন বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ বাইজু বাওরা দাক্ষিণাত্যের উস্তাদ আদিল শাহ সুরি-এর নিকট দীক্ষা নেন। দীর্ঘ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পর তিনি রামচন্দ্র বাঘেলার দরবারে চাকুরী করতেন। ঐতিহাসিক ও সংগীতবিশারদদের কাছে মিয়া তানসেন উপমহাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃত।[30] ধ্রুপদ সংগীতের বিকাশ, নতুন রাগের প্রবর্তন এবং উত্তর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ধারাকে সুসংহত করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অতুলনীয়। তবে তানসেনের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক বিদ্যমান। গোয়ালিরের সুফি-মুসলিম সমাজ মনে করতেন শেখ মুহাম্মদ গাউসের নিকট আধ্যাত্মিক দীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি মুসলমান হন এবং তরিকার অনুসারী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে একটি লোকপ্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, গাউস তাঁকে একদা চর্বিত পান খেতে দিয়ে বা জিভের সাথে জিভ লাগিয়ে মুসলমান করেছিলেন। এই ধরনের বর্ণনার ভিত্তিতে কয়েকজন মুসলিম ঐতিহাসিক ও সংগীত-ইতিহাস রচয়িতা তাঁকে মুসলিম সুফি সংগীতজ্ঞ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে বৈষ্ণব ও হিন্দু ঐতিহ্যের লেখকেরা তাঁকে আজীবন হিন্দু ব্রাহ্মণ হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। তাঁদের মতে, তিনি স্বামী হরিদাসের শিষ্য ছিলেন এবং তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। ফলে তানসেনকে ঘিরে দুটি ভিন্ন ঐতিহাসিক ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। একটি তাঁকে সুফি-সংস্কৃতির ধারক হিসেবে উপস্থাপন করে, অন্যটি তাঁকে বৈষ্ণব-হিন্দু সংগীত-ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হিসেবে দেখায়।

 

আধুনিক গবেষকদের অনেকেই মনে করেন, এই দ্বৈত দাবি মূলত মধ্যযুগীয় ভারতীয় সমাজে সুফি খানকাহ ও ভক্তি-আন্দোলনের পারস্পরিক সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের প্রতিফলন। তানসেনের জীবন ও সাধনা এ দুই ধারার সংযোগস্থলে অবস্থান করায় উভয় সম্প্রদায়ই তাঁকে নিজেদের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়েছে। তাই তাঁর ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হলেও, এ বিষয়ে কোনো পক্ষের লোককথাকে একমাত্র ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা সমীচীন নয়। তানসেনের অনুরূপ আরেকটি উদাহরণ হলো, চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডারী ঘরানার মরমী কবি রমেশ শীল। যিনি জন্মগতভাবে হিন্দু হলেও মাইজভাণ্ডারী তরিকার সাথে যুক্ত ছিলেন এবং সুফিতত্ত্বের উপর তিনশতাধিক গান রচনা করেছিলেন। এটাই ভারত-বাংলা উপমহাদেশের সুফি দরবারগুলো সাধারণ চিত্র। ইন্তেকালের পর মিয়া তানসেনকে ইসলামী রীতি অনুসারে পীর মুহাম্মদ গাউসের মাজারের পাশে কবর দেওয়া হয়। তবে রমেশ শীলের বেলায় সামান্য ব্যতিক্রম ঘটে। লোককথায় প্রচলিত, “তিনি ইন্তেকালের পর মৃতদেহ নিয়ে স্বজাতি হিন্দু ও দরবারি মুসলমানদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। উভয়ের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, প্রথমে ইসলামের রীতি অনুসারে মৃতদেহ দাফন করবে এবং পরবর্তীতে কবর থেকে দেহ উত্তোলন করে হিন্দু রীতি অনুসারে লাশ পোড়ানো হবে। কিন্তু জানাজা পড়ে মৃতদেহ দাফন করার পর, পোড়ানোর জন্য পুণরায় কবর খনন করা হলে কবরে একটি গোলাপ ফুল পাওয়া যায়। আর কখনো মৃতদেহের সন্ধান মিলেনি।” বর্তমানে বোয়ালখালী উপজেলায় তাঁর সমাধি রয়েছে।

[1] মোবারক হোসেন খান, সঙ্গীত সাধনা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৮৫, পৃ- ১।

[2] রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সংগীতচিন্তা, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, ঢাকা, ২০২০, পৃ ১০।

[3] সুচেতা চৌধুরী, সঙ্গীত ও নন্দনতত্ত্ব, আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৯৯৮, পৃ ৮৯।

[4] Leonard Lewisohn, The Sacred Music of Islam: Sama‘ in the Persian Sufi tradition, British Forum for Ethnomusicology, Vol. 6, 1997, pp 1-33.

[5] Henry George Farmer, A History of Arabian Music (To the XIIIth Century), Luzac & Co, London, 1929| Henry George Farmer, The Sources of Arabian Music, (An Annotated Bibliography of Arabic Manuscripts Which deal with the theory, practice and history of Arabian Music from the Eighth to the Seventeenth Century), Leiden, E.J. Brill, 1965.

[6] ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ أَنْكَحَتْ عَائِشَةُ ذَاتَ قَرَابَةٍ لَهَا مِنْ الْأَنْصَارِ فَجَاءَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ أَهْدَيْتُمْ الْفَتَاةَ قَالُوا نَعَمْ قَالَ أَرْسَلْتُمْ مَعَهَا مَنْ يُغَنِّي قَالَتْ لَا فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الْأَنْصَارَ قَوْمٌ فِيهِمْ غَزَلٌ فَلَوْ بَعَثْتُمْ مَعَهَا مَنْ يَقُولُ أَتَيْنَاكُمْ أَتَيْنَاكُمْ فَحَيَّانَا وَحَيَّاكُمْ

1900 سنن ابن ماجه كتاب النكاح باب الغناء والدف

অনুবাদ: ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: আয়িশা (রা.) তাঁর এক আত্মীয়া আনসারী মেয়েকে বিবাহ দেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ এসে জিজ্ঞাসা করলেন: “তোমরা কি মেয়েটিকে (স্বামীর ঘরে) পাঠিয়ে দিয়েছ?” তারা বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: “তোমরা কি তার সাথে এমন কাউকে পাঠিয়েছ যে গান গায়?” আয়িশা বললেন: না। রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন: “আনসাররা এমন সম্প্রদায় যাদের মধ্যে কবিতা-গানের প্রতি আকর্ষণ আছে। তোমরা তার সাথে এমন কাউকে পাঠাতে যে বলত: ‘আমরা তোমাদের কাছে এসেছি, আমরা তোমাদের কাছে এসেছি। তোমরা আমাদের অভ্যর্থনা জানাও, আমরাও তোমাদের অভ্যর্থনা জানাব।’” (সুনানে ইবনে মাজাহ)

[7] হযরত আয়েশা (রা:) থেকে বর্ণিত, ঈদের দিনে দুটি আনসার বালিকা তার ঘরে দফ (এক প্রকার একমুখো ড্রাম বা তাম্বুরা) বাজিয়ে বু’আস যুদ্ধের বীরত্বগাথা নিয়ে গান গাইছিল। এসময় নবীর অন্যতম প্রধান সাহাবী আবু বকর (রাঃ) ঘরে প্রবেশ করেন এবং এই দৃশ্য দেখে বিরক্ত হয়ে বলেন, “রাসূলের ঘরে শয়তানের বাঁশি (mizmar al-shaytan)?” তখন নবী মুহাম্মদ (সাঃ), যিনি চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে ছিলেন, মুখ খুলে বলেন, “হে আবু বকর, ওদের গাইতে দাও। প্রত্যেক জাতিরই উৎসবের দিন আছে, আর এটা আমাদের উৎসবের দিন।” (Sahih al-Bukhari, 952; Sahih Muslim, 892)

[8] ঈদের দিনে কিছু হাবশি (Abyssinian) বর্শা ও ঢাল নিয়ে মসজিদের প্রাঙ্গণে তাদের ঐতিহ্যবাহী সামরিক নৃত্য ও কলাকৌশল প্রদর্শন করছিল। নবী মুহাম্মদ (সাঃ) নিজে আয়েশাকে নিয়ে সেই প্রদর্শনী দেখেছিলেন। (Sahih al-Bukhari, 454)

[9] এ.জেড.এম শামসুল আলম, মুসলিম সংগীত চর্চার সোনালী ইতিহাস, বাংলাদেশ কো-অপপারেটিভ বুক সোসাইটি, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ২০১২, পৃ- ৫৭।

[10] বিস্তারিত, এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, পৃ- ৬২-৬৪। আবুল ফারাজ ইসফাহানী (৮৯৭-৯৬৭ খ্রি.) রচিত কিতাব আল আগানি (كتاب الأغاني‎ : কবিতা বা গানের; The Book of Songs), ২০ খন্ডে প্রকাশিত। এতে জাহিলিয়া যুগ থেকে ১০ম শতক পর্যন্ত গান ও কবিতার সংগ্রহ আছে। ইবনে আবদ রাব্বিহী (৮৬০-৯৪০ খ্রি.) রচিত আল-ইকদ আল-ফরিদ (العقد الفريد)। ২৫ খন্ডে প্রকাশিত। এতে প্রাচীন আরব সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং সাহিত্যের পাশাপাশি প্রাক-ইসলামী ও ইসলামিক যুগের কবিতা, গান, বক্তৃতা, প্রবাদ ও চিঠিপত্র ইত্যাদি সংকলিত রয়েছে।

[11] নবীযুগের পরে ইসলামের মরমি ধারা তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায়ে বিকশিত হয়। ১ম পর্যায়: নবম শতাব্দী পর্যন্ত। এটি ছিল জুহুদ তথা নীরব আধ্যাত্মিক সাধনার যুগ। ২য় পর্যায়: ৯ম-১২শ শতক পর্যন্ত। অতীন্দ্রিয়বাদী দার্শনিক সুফিদের যুগ। এসময় সুফিদের ধ্যান সাধনা স্বতন্ত্র একটি দর্শনে রূপ নেয়। ৩য় পর্যায়: ১২শ শতক থেকে পরবর্তী সময়। এটি তরিকা বা সিলসিলাভুক্ত সুফিদের যুগ। বিস্তারিত পড়ুন: ড. শেহাবুল হুদা, চট্টগ্রামের সুফি সাধক ও দরগাহ, ঢাকা, ২০১৯, পৃষ্ঠা ৪২, পিএইচডি অভিসন্দর্ভ । J. Spencer Trimingham, The sufi orders in Islam, Oxford University press, 1971, p. 1-30. Chapter: The formation of schools of mysticism.

[12] বিস্তারিত, এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, পৃ-৫৯-৬১ & দ্বিতীয় অধ্যায় উমাইয়া যুগ সম্পূর্ণ, পৃ- ৮২-১৪৪। Henry George Farmer, Ibid, 1929, p-84 & 361. Reynold A. Nicholson,A Literary History of the Arabs, Cosimo Classics, 2010.

[13] বিস্তারিত পড়ুন: এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, তৃতীয় অধ্যায় আব্বাসীয় যুগ সম্পূর্ণ, পৃ- ১৪৪- ২৮৫। Abul Faraz Mohammad bin Ishaq ibn Abi Yakub Al Nadim Al Warraq Baghdadi, Al Kitab Al Fihristh, min anmer qungent, hirous, Leipsic 1871-72, p- 100-150 & 260-300.

[14] বিস্তারিত পড়ুন:

[15] মধ্যযুগে সুফিরা ‘সামা’ নিয়ে আলোচনা করার সময় ওয়াজদ (/Wajd) পরিভাষাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ব্যবহার করতেন। ওয়াজদ-এর শাব্দিক অর্থ হলো- আবেগ, আনন্দ, প্রফুল্ল। পরিভাষায়, আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাস বা গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতি অর্থে ব্যবহার হয়। সামার সময় কখনও কখনও সুফিরা আল্লাহর স্মরণে এমন আবেগময় চূড়ান্ত হালতে পৌঁছান, যেখানে তাঁর চোখে অশ্রু আসে, শরীরে কম্পন সৃষ্টি হয় অথবা গভীর ধ্যানমগ্নতা দেখা দেয়। তবে অধিকাংশ শাস্ত্রীয় সুফিগণ সতর্ক করেছেন যে, কৃত্রিমভাবে এই অবস্থার অভিনয় করা কিংবা বাহ্যিক আবেগকে উদ্দেশ্য বানানো অনুচিত।

[16] “State (Hal) on the other hand, is something that descends from God into man’s heart, without his being able to recall it when it comes, or to attract it when it goes, by his own effort. Accordingly, while the term “station’ denotes the way of the seeker and his progress in the field of exertion, and his rank before God in proportion to his merit, and the term “state’ denotes the favour and grace which are god bestows upon the heart of his servant, and which are not connected with any mortification on the latter’s part. ‘Station’ belongs to the category of acts, state to the category of gifts. Hence the man that has a station stands by his own self mortification, whereas a man that has a “state” is dead to “self” and stands by a ‘state’ which God creates in him. (R. A., Nicolson: Kashf-al-Mahjub-Translation. P- 181)

[17] “Station (Maqam) denotes anyone’s standing in the way of God, and his fulfilment of the obligation appertaining to that station and his keeping it until he comprehends its perfection so far as lies in a man’s power. It is not permissible that he should quit his station without fulfilling the obligations there of. Thus the first station is repentance (Tawbat), then comes conversion (Inabat) the renunciation (Zuhd), then trust on God (Tawakkul) and son, it is not permissible that anyone should pretend to conversion without repentance, or to renunciation without conversion or to trust in God without renunciation. (R. A., Nicolson: Kashf-al-Mahjub-Translation, p- 8.)

[18] Shaikh Shahabuddin Umar bin Sahrwardi, A Dervish Textbook from The Awariful Ma’arif, Written in the Thirteenth Century, translated by Lieut. Col.H. Wilberforce-Clarke, The Octagon press, London,  1990. P- 29-37 & 167-68.

[19] এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, পৃ- ৪৪-৫২ & ৬৪-৬৮।

[20] The first rule of ‘sama’ is that participants should enter the assembly with sincere intention and examine the true motive for attending. If the motive is lustful desire, the assembly should be avoided. If sincerity, the search for spiritual advancement (hal), and the desire to attain God’s blessing are free from the impurities of lust, participation in ‘sama’ is considered beneficial even in the absence of a shaykh or experienced companions. If lust corrupts one’s intention, it must be purified through sincere repentance, seeking God’s help against the lower self, and prayer. However, if lust is the initial motive and sincere resolve comes only afterwards, the former intention prevails and such an assembly should be shunned. Likewise, sama should be avoided if it involves prohibited or reprehensible elements, including unlawful food, the presence of women or beardless youths, persons hostile to sama, worldly dignitaries whose status distracts the gathering, or those who falsely display wajd or tawajud. For further details, see… (Shaikh Shahabuddin Umar bin Soharwardi, Ibid, 1990, p. 34-37) বা সামগ্রিকভাবে সামার শর্তাবলি তিনভাগে বিভক্ত, Right Time, Right Place & Right Company. (Leonard Lewisohn, Ibid, 1997, pp 1-33.)

[21] S.M. Ikram, The Cultural Heritage of pakistan, Oxford University press, 1955, pp. 49-50.

[22] আহমদ শরীফ, বাঙলার সূফী সাহিত্য, সময় প্রকাশন ঢাকা, ভূমিকা: বাঙলার সূফী সাধনা ও সূফী সাহিত্য ১৯৬৯, পৃ. ১৩-৫৩। ড. এনামুল হক, বঙ্গে সূফী প্রভাব, ষষ্ঠ অধ্যায়, বঙ্গে সূফী প্রভাবের ফল, র‍্যামন পাবলিশার্স, ২০১৫, পৃ. ১০৬-১২১।

[23] আল্লামা রুমির মসনবী-র প্রথম পংক্তিগুলোতে নেই বাঁশির আর্তনাদকে মানুষের আত্মার বিচ্ছেদের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাঁশি যেমন নিজের উৎস বাঁশবন থেকে বিচ্ছিন্ন, তেমনি মানুষের আত্মাও তার প্রকৃত উৎস, অর্থাৎ পরম সত্য ও সত্তা আল্লাহর সান্নিধ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীতে অবস্থান করছে। সংগীত সেই বিচ্ছেদের বেদনা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আত্মাকে তার উৎসের দিকে ফিরে যেতে আহ্বান জানায়।

[24] এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, পৃ ২৮৬-৩২৪।

[25] এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, পৃ. ২৮৮।

[26] Dr. Wahid Mirza, Life and Works of Amir Khusrau, pp. 238-239. S.M. Ikram, Ibid, 1955, pp. 46. এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, পৃ. ২৯২-৯৪।

[27] এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, পৃ. ৩২৪-২৫

[28] S.M. Ikram, Ibid, 1955, pp. 49.

[29] পিতা মাকন্দর মিশ্র কেন ত্রিলোচন মিশ্রকে সুফির দরবারে নিয়ে আসেন? এটা পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে। প্রশ্নের উত্তরটি শাহনেওয়াজ খানের ভাষ্যে, “গোয়ালিয়র এর বিখ্যাত সূফী দরবেশ হযরত মুহাম্মাদ পাউস গোয়ালিয়রীর দুয়ার বরকতেই ত্রীলোচন মিশ্রের জন্ম হয়। জন্মের পর ত্রীলোচন মিশ্রকে সূফী দরবেশ গাউস গোয়ালিয়রীর নিকটে নিয়ে আসা হয়। সূফী দরবেশ তার জন্য দোয়া করেন।” এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, পৃ. ৩০৪.

[30] মিয়া তানসান নিয়ে বিস্তারিত, এ.জেড.এম শামসুল আলম, প্রাগুক্ত, ২০১২, পৃ. ৩০৪-৩০৭.