ভূমিকা
কোনিয়া হলো তুরস্কের সেই শহর, যেখানে ইসলামি আধ্যাত্মবাদের (mysticism) প্রধান স্তম্ভগুলো একত্রিত হয়েছে। আনাতোলিয়ার দক্ষিণ-মধ্যভাগে অবস্থিত কোনিয়া তুরস্কের সুফিবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। ইসলামের সামগ্রিক ইতিহাসে, উমাইয়া সাম্রাজ্যের শেষদিকে আরব বিজেতাদের মাধ্যমে ইসলামের সংস্পর্শে আসা এই শহর তিনজন মহৎ সুফির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল, যারা পরবর্তীতে আশেপাশের তুর্কি শহরগুলোতে আধ্যাত্মিক চেতনা বিস্তারে কার্যকর ও প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন।1 সপ্তম হিজরি শতকের শুরুতে নিয়তি এমনই ছিল যে, শহরটি আপন করে নেয় মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবীকে, জালালউদ্দীন রূমীকে এবং শামসুদ্দীন মুরসিয়া আন্দালুসিকে, যাকে তাঁর অনুসারীরা ‘মহান শেখ’ বলে ডাকত। তাঁরা পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন মুসলিম দেশে দীর্ঘ ভ্রমণের পর কোনিয়ায় এসে পৌঁছান এবং আনাতোলিয়ার সেলজুক সুলতানদের উষ্ণ আতিথেয়তা লাভ করেন। সুলতানরা এখানে তাদেরকে এমন আদর্শ প্রচারের সুযোগ দেন, যা মিসর ও লেভান্তে প্রায়ই প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়ত। কোনিয়ায় ইবনে আরাবী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ আল-ফুতুহাত আল-মাক্কিয়া পুনর্লিখন করেন এবং তাঁর ধারণাগুলো তরুণ তুর্কি সুফিপ্রবণ একদল যুবকের মাঝে ছড়িয়ে দেন, যার মধ্যে তাঁর বিশিষ্ট শিষ্য সাদরুদ্দীন কুনাওয়িও ছিলেন। অটোমান শাসনের শুরু থেকেই, তরিকত ও সুফিবাদ বহু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল এবং অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ পর্যন্ত এ প্রভাব বজায় রেখেছিল আর পরে তা রাষ্ট্রীয় রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বিলীন হয়ে যায়।2 তাহলে তুরস্কে সুফিবাদ ও রাজনীতির সম্পর্ক বোঝার মূল চাবিকাঠি কী? কোন বিষয়গুলো তুরস্ককে আধ্যাত্মিক প্রবণতার দিকে ঝুঁকিয়ে দিল? এবং প্রায় এক শতাব্দী আগে আতাতুর্ক উসমানি খেলাফত বিলুপ্ত করে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পর তুরস্কে সুফিবাদের পরিণতি কী হয়েছিলো?
সুফিদের কাছে যিনি ‘মাওলানা’ হিসেবে পরিচিত, জালালউদ্দীন রুমি সপ্তম হিজরি শতকের শুরুতে বলখে জন্মগ্রহণ করেন এবং কোনিয়ায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের পূর্বে তিনি তাঁর পিতার সঙ্গে বহু মুসলিম দেশে ভ্রমণ করেন। জালালউদ্দীন তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন সুফিবাদ দিয়ে শুরু করেননি। বরং তিনি প্রথমে একজন সুপরিচিত হানাফি আইনজ্ঞ (ফকিহ) ছিলেন, যতক্ষণ না তাঁর সাক্ষাৎ হয় বিখ্যাত সুফি শামসুদ্দীন তবরিজীর সঙ্গে।4 এই দু’জন মিলে “The Forty Rules of Love” নামে একটি সুপরিচিত গ্রন্থ রচনা করেন, যা থেকে পরবর্তীতে তুর্কি লেখিকা এলিফ শাফাক তাঁর জনপ্রিয় উপন্যাসের অনুপ্রেরণা নেন। তবে, তবরিজী রহস্যজনকভাবে কোনিয়া ছেড়ে চলে যান। তাঁর বন্ধু রূমী এরপরও বিখ্যাত গ্রন্থ মসনবি রচনা অব্যাহত রাখেন, যার কবিতাগুলো সুফিদের আধ্যাত্মিক সুরে পরিণত হয়েছিল।5 যদিও দেশটি ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্য দিয়ে গেছে, তবুও প্রশ্ন, অটোমান সাম্রাজ্যের যুগে সুফি ও সুফিবাদ কীভাবে আধুনিক তুরস্কে টিকে রইল? এই লেখার উদ্দেশ্য হলো, তুরস্কের সুফি শিক্ষা-পদ্ধতির স্বকীয়তা ব্যাখ্যা করা, যা অন্যান্য সুফি ধারার তুলনায় ভিন্ন, যা অন্য সুফিধারার মতো সময়ের সাথে সাথে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, এবং সেইসঙ্গে ক্ষমতার রাজনীতির যে প্রবহমানতা কখনো তাদের সমর্থন করেছে, কখনো আবার বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিয়েছে, তাও তুলে ধরা
উৎস
এই প্রবন্ধে সহায়ক উপাদান হিসেবে আমরা আসঘারি এবং সাইয়্যিদ আমির হোসেন রচিত প্রবন্ধগুলো পর্যালোচনা করেছি। প্রবন্ধটির শিরোনাম হলো “The Bektāshi Order, Sufism, and Shi’ism in the Work of Baba Rexheb, a Bektāshi Sufi of the 20th Century”, যা Turkish Journal of Shiite Studies-এ প্রকাশিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে বেকতাশি সুফি তরিকার ভূমিকা আলোচনা করা হয়েছে, যা অটোমান তুর্কিদের জিহাদে লড়াইয়ের মনোবল গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।6 এটি এক ধরনের বৈপরীত্য, কারণ সুফিবাদ সাধারণত প্রশান্তি, জাগতিকতা থেকে বিচ্ছিন্নতা ও অন্তর্মুখী আধ্যাত্মিকতার কথা বলে; কিন্তু এখানে দেখা যায়, সুফিবাদই বরং তুর্কি অভিজাত সেনাবাহিনীকে ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে জয়যাত্রা পরিচালনা এবং অধিকৃত অঞ্চলগুলোর প্রশাসনিক উন্নয়নে নতুন আত্মবিশ্বাস প্রদান করেছে। এছাড়াও, আমরা মুহাম্মদ ফারিদ বেইক রচিত “Daulah Iliyah Usmaniyah” নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করেছি, যা অটোমান সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব নিয়ে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করে। বিশেষ করে সুফিবাদের ক্ষেত্র এবং সমাজের নিম্নস্তর থেকে শাসকগোষ্ঠী পর্যন্ত সুফিবাদকে সমর্থনকারী আলেমদের ভূমিকা এতে বিশদভাবে উঠে এসেছে। এবং তাদের অনুসারীদের সম্পর্কেও আলোচনায় রয়েছে। এছাড়া, Lipton, G.A. রচিত একটি প্রবন্ধও উল্লেখযোগ্য যার শিরোনাম “Secular Sufism: Neoliberalism, Ethnoracism, and the Reformation of the Muslim Other: Secular Sufism”, যা The Muslim World-এ প্রকাশিত। এতে সুফিবাদকে এমন এক রূপে তুলে ধরা হয়েছে যেখানে বিভিন্ন পটভূমি, ধর্ম, জাতি ও জাতীয়তার মানুষকে সহনশীলতা ও গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রবন্ধটি মূলত রাজনৈতিক ক্ষেত্র এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে সুফিদের ভূমিকার উপর আলোকপাত করেছে, যা অধিকাংশ মুসলিম দেশের সুফি তরিকার মধ্যে সাধারণভাবে প্রচলিত নয়।
বেকতাশি ও নকশবন্দি: তুর্কিদের সবচেয়ে বিখ্যাত সুফি তরিকা
তুর্কিদের মধ্যে সুফি ধারার এই বিস্তারের মূল কারণ হলো, সংগঠিত সুফি তরিকার উত্থান, যারা আনাতোলিয়াকে সম্প্রসারণের জন্য একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র ও উর্বর ভূমি হিসেবে পেয়েছিল। যদিও তুর্কিদের সঙ্গে বিভিন্ন সুফি প্রভাব যুক্ত রয়েছে, তবু দুটি স্বতন্ত্র তরিকা বিশেষভাবে চিহ্নিত করা যায়: বেকতাশি তরিকা এবং নকশবন্দি তরিকা।12
শেখ বাহাউদ্দিন নকশবন্দির সমাধি উজবেকিস্তানের বুখারায় অবস্থিত। বেকতাশি তরিকা প্রতিষ্ঠা করেন হাজী বেকতাশ ভেলি, যিনি ৬৪৬ হিজরিতে খোরাসানে জন্মগ্রহণ করেন। বেকতাশ তার কৈশোরে আনাতোলিয়ায় গমন করেন, যেখানে তার অনেক শায়খ বিভিন্নভাবে তাকে পরামর্শ দেন সেলজুক সুলতানদের নিকট স্থানান্তরিত হতে, যারা সুফিবাদকে স্বাগত জানিয়েছিল। যদিও এই পদ্ধতি তখন তার প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, এবং শিয়া ধারার অনুসরণ করত; তবুও, তরিকার নেতৃত্ব দ্রুত এই পদ্ধতি পরিবর্তন করে এটিকে সুন্নি হিসেবে রূপান্তরিত করেন যা তুর্কি জনগণের ধারণার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, এবং তারা দাবি ও প্রচার করতে শুরু করেন যে, তারা সুন্নি সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। খালেদ মুহাম্মদ আব্দো তাঁর গবেষণা “Sufism in Turkey: From History to Politics”-এ তুর্কিদের মধ্যে বেকতাশি তরিকার বিস্তারের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন, যেখানে তার অন্তর্মুখী চরিত্র বিভিন্ন সম্প্রদায় ও অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি গ্রহণযোগ্যতা প্রদর্শন করেছিল, এই পদ্ধতি সব ধরনের আধ্যাত্মিক আন্দোলন ও চিন্তাধারাকে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। হাজী বেকতাশ তাঁর গ্রন্থ Wilayat Namah-এ এ বিষয়ে লিখেছেন: “ধর্মের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ হওয়া উচিত নয়, কারণ বৈষম্য মানুষের মধ্যে ঘৃণার জন্ম দেয়, অথচ সব ধর্মই মানবজাতির মধ্যে শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করে।”13 আরেকটি সুফি তরিকা, যা তুর্কিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা হলো নকশবন্দি তরিকা। এই তরিকার প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন নকশবন্দী, যিনি ৮ম হিজরী শতাব্দীর প্রথম ভাগে মধ্য এশিয়ার বুখারায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭৯১ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। তাকে নকশবন্দী বলা হতো, কারণ তিনি নিয়মিত মহান আল্লাহর স্মরণ করতেন, ফলে আল্লাহর নাম তার হৃদয়ে খোদিত হয়ে গিয়েছিল, অথবা নবীজী বাহাউদ্দিনের হৃদয়ের উপর তাঁর হাত স্থাপন করেছিলেন। এটি তার হৃদয়ে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়। বেকতাশি তরিকার বিপরীতে, নকশবন্দী তরিকার শুরুর দিকে শিয়াদের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং এটি তার আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য গ্রহণ করেছিল হযরত আবু বকর সিদ্দিক থেকে, যাকে তরিকার প্রথম পুরুষ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। গবেষক বাদিয়া আব্দেল আল তাঁর গ্রন্থ “The Naqshābandī: Its Origin and Development among the Turks”-এ উল্লেখ করেছেন, যে তুর্কমেনদের মধ্যে নকশবন্দি তরিকার বিস্তার ঘটেছিল এর সরল বিশ্বাস, জটিলতা থেকে দূরত্ব, সহনশীল প্রবণতা এবং সমাজের নানারকম মানুষকে একীভূতকরণের প্রতি উৎসাহের কারণে।14
নুরসিয়া ধারার শিক্ষা ও গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক
“নুরসিয়া” তুরস্কের সুফি গোষ্ঠীগুলোর অন্য একটি দিককে প্রতিনিধিত্ব করে। এটি শেখ বাদিউজ্জামান সাঈদ নুরসির সঙ্গে সম্পর্কিত, যেখানে শেখের মৃত্যুর পর ১৯৬০ সালে তার অনুসারীদের দ্বারা একটি সুফি গোষ্ঠী প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি পরিচিত হয় “নুরসিয়া” নামে। বর্তমানে এটি তুর্কি সমাজের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা তুরস্কের শহর সীমার বাইরেও বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল ও উপ-শহরে বিস্তার লাভ করেছে।15 এর স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নুরসিয়াকে অন্যান্য গোষ্ঠীর থেকে আলাদা করেছে। এটি উদ্ভূত হয়েছিল তাদের শেখের ধারণা থেকে, যিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউনিয়নিস্টদের সঙ্গে জোট শক্তির আক্রমণের মোকাবিলায় অভিযান পরিচালনায় জড়িত ছিলেন কিন্তু পরে ইউনিয়নিস্টরা তার বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ায়, ফলে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
সমাজ ও রাজনীতি: সুফিবাদ কীভাবে তুর্কি ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছে?
তুর্কিতে ইসলাম প্রবেশ করা থেকে বর্তমান পর্যন্ত সুফিধারা ব্যাপকভাবে বিদ্যমান, যা সমাজ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। তুর্কি সংস্কৃতিতে সুফি চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত অনেক ঘটনা লক্ষ্য করা যায়, যেমন মসজিদে অন্তর্ভুক্ত মাজার ও সমাধি, যা সুফিবাদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।16 সুফি ঐতিহ্য কিছু শিল্প ও নৃত্যশৈলীর উপরও প্রভাব ফেলেছে। যেমন, তানৌরা নৃত্য, যা বৃত্তাকার ঘুর্ণনের পুনরাবৃত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, এটি সেই দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা অনুপ্রাণিত যেখানে মহাবিশ্বকে বৃত্তাকার মনে করা হয়, ফলে নৃত্যটির শুরু ও শেষ বিন্দু একই থাকে। সুফি চিন্তাধারা কিছু শহুরে স্থাপত্যের বিকাশেও প্রভাব ফেলেছে। যেমন, তাকায়া, যা প্রথমে সুফি শায়েখদের দপ্তর (খানকা) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, পরবর্তীতে দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষদের আশ্রয়, খাদ্য ও সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। সুফিবাদ তুর্কি রাজনৈতিক ইতিহাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তেও মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে, ফলে সুফি শক্তির প্রভাব ছাড়া তুরস্কের রাজনৈতিক ইতিহাস অধ্যয়ন করা কঠিন। ড. বাদিয়া আবদুল-আল তাঁর গ্রন্থে তুরস্কে সুফিবাদ ও রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, তুর্কি সুলতানরা সুফি শায়েখদের পরামর্শ নিতেন এবং তাঁদের নিকট থেকে দোয়া বা আধ্যাত্মিক সমর্থন কামনা করতেন। অটোমান সুলতানরা কোনো যুদ্ধ শুরু করা বা কোনো দেশ দখলের মতো সিদ্ধান্ত কখনোই সুফি শায়েখদের সঙ্গে পরামর্শ করা ছাড়া নিতেন না। তুর্কির ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে কিছু সুফিরা প্রভাব ফেলেছিলেন তা অনেক ইতিহাসবিদ সামনে নিয়ে এসেছেন। এর মধ্যে একটি হলো, হাজী বেকতাশ ভেলি এবং অটোমান সুলতান ওরহানের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে হাজী বেকতাশ ভেলি সুলতানকে একটি সামরিক বাহিনী গঠনের পরামর্শ দেন, যার মাধ্যমে তুর্কি দেশকে তার নেতৃত্বে একত্রিত করার সক্ষমতা তৈরি হবে। এই পরামর্শের ভিত্তিতে জানিসারি সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করা হয়।17
গবেষক খালেদ মুহাম্মদ আব্দো এই ঘটনার ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, এই বর্ণনাগুলো হাজী বেকতাশকে জানিসারি সেনাবাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে চিত্রায়নের চেষ্টা করেছে, যা ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব। কারণ বেকতাশি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা সুলতান ওরহানের শাসনকালের প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে ইন্তেকাল করেছিলেন।18 সুফিবাদ ও সমাজের প্রসঙ্গে, ড. ডেরিন বলেন, তুরস্কের সুফিবাদ অনেক আরব দেশের তুলনায় ভিন্ন, কারণ এটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনযাপনে সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত এবং সক্রিয়। সুফিবাদের উপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও, সকল ধরনের রাজনৈতিক দল ও দিকনির্দেশনায় রাজনীতিবিদরা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সুফি তরিকার শায়েখদের পরামর্শ গ্রহণ করেন। তুরস্কে বসবাসরত সাংবাদিক ইব্রাহিম বুয়াজবির মতে, নির্বাচনের সময় সুফি তরিকার শায়েখদের প্রভাব স্পষ্টভাবে ফুটে উটে। রাজনীতিবিদরা তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে এগিয়ে আসে এই আশা করে যে, শায়েখদের মুরিদ/অনুসারীদের ভোট তারা পাবে। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, ইস্তাম্বুলে নকশবন্দী তরিকার অনুসারীর সংখ্যা এক মিলিয়নেরও বেশি।19
ভোটের বিনিময়ে, রাজনীতিবিদ ও প্রার্থীরা তাদের কাছে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন, যেমন স্কুল বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করতে অনুমতি দেয়া। তুর্কি সমাজে সুফিদের কার্যক্রম তাদের সেবামূলক কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, যেখানে তারা হাসপাতাল ও মসজিদ স্থাপন করেন, দরিদ্রদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন এবং শিক্ষার্থী ও অসহায়দের দৈনন্দিন আহার সরবরাহ করেন। ড. ডেরিন বলেন, তুরস্কের ওয়াকফ (ধর্মীয় তহবিল) কেবল ফিলিস্তিনের জনগণ এবং আফ্রিকার মুসলমানদের সাহায্য দেওয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তিদের এবং গত গ্রীষ্মে লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসনের শিকারদেরও সহায়তা প্রদান করেছে।20 ড. ডেরিন উল্লেখ করেছেন যে, কিছু সুফি তরিকা বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং আর্থিক চাহিদা পূরণের জন্য প্রতিষ্ঠান স্থাপন করত।21
সুফিবাদ ও তুর্কি রাজনীতি
কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের সময় সুফিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আইনজীবী মুহাম্মদ ফারিদ বে তাঁর “হিস্ট্রি অব দ্য অটোমান অ্যাটিক স্টেট” বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে, সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতিহ শুরুতে কনস্টান্টিনোপলের অবরোধ তুলে সেনাদের প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু, নকশবন্দি সুফি ব্যক্তিত্ব শেখ শামসুদ্দীন এতে সম্মতি জানাননি; বরং তিনি সুলতানকে বিজয় সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন। শেষ পর্যন্ত মুসলমানরা সেই দুর্ভেদ্য নগরীর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়।22 ষোড়শ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কে আধ্যাত্মিকতা ও রাজনীতির সম্পর্ক সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছিল। বেকতাশি তরিকার একদল শায়খের জন্য জানিসারি বাহিনীর ব্যারাকে বসবাস করা একটি প্রচলিত রীতি হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে তারা সৈন্যদের কুরআন ও অন্যান্য ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। বেকতাশি ও জানিসারিদের পাশাপাশি, তরিকাগুলোর শায়খরা যখন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শুরু করলেন, তখন তারা সেনাপতিদের নেতৃত্বে কিছু সুলতানকে অপসারণ করেন এবং অন্যদের সিংহাসনে বসান। ড. বাদিয়া আবদেল আল তাঁর “দি এসোটেরিক থট ইন আনাতোলিয়া” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই সম্পর্ক টিকে ছিল ১৮২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত যখন সুলতান মাহমুদ দ্বিতীয় জানিসারি বাহিনী বিলুপ্ত করেন, বেকতাশি তরিকাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং তাদের সকল খানকা ও কেন্দ্র বন্ধ করে দেন। তবুও এরপরেও, উসমানি সুলতানরা সুফি শায়খদের প্রতি তাদের সম্মান ও শ্রদ্ধা বজায় রেখেছিলেন। সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ (স্বীয়) পদচ্যুতির পর শাধিলি তরিকার শায়খকে প্রেরিত চিঠিতে শায়খকে দেয়া গৌরবসূচক ও প্রশংসামূলক উপাধিগুলোর উল্লেখ রয়েছে। সেই সময় সুফিদের উচ্চমর্যাদা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৯২০-এর দশকে কামাল আতাতুর্কের দ্বারা উসমানি খিলাফত উচ্ছেদ সত্ত্বেও, তুরস্কের রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সুফিবাদ তার অবস্থান বজায় রেখেছে। বাদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি রিসালা-ই নূর প্রচারের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ কামালবাদ শক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও সামাজিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এতে তিনি তুর্কি সমাজকে অচেতন অবস্থা থেকে জাগ্রত করার এবং তার ইসলামী পরিচয় সংরক্ষণের গুরুত্বকে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেছেন।
তুরস্কে সুফিবাদের নৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা
উসমানি যুগ থেকে সুফি তরিকাগুলো তুর্কি রাজনীতি ও সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তরিকাগুলো মূলত সেই সুফিধারার উত্তরসূরি, যার উত্থান হয়েছিল ৩য় হিজরীতে। আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজে প্রকাশিত এক গবেষণার মতে, সুফিবাদ শুরু হয় ব্যক্তিগত প্রবণতা থেকে, যেখানে কঠোর তপস্যা ও ইবাদতকে পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর পদ্ধতি বা পথ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল; অর্থাৎ, জ্ঞান অর্জন এবং সেই জ্ঞানের উপলব্ধি। তুরস্কের মতো আধ্যাত্মিক সমাজে সালাফিবাদের বিস্তারের ওপর আরব সেন্টারের গবেষক ও সম্পাদকীয় বিভাগের পরিচালক ইমাদ কাদ্দুরা বলেন, সুফিবাদকে কোনো ধর্মীয় মতবাদ হিসেবে দেখা হয় না, বরং এটি আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা, হৃদয়কে শান্ত করা এবং নৈতিকতা মেনে চলার পথ, এই পথের প্রাথমিক ধাপ হলো ধর্মের তৃতীয় স্তম্ভ, যেটি হলো সদকা। যেমন পবিত্র হাদিসে বর্ণিত আছে: “এমনভাবে এবাদত করো যেন আল্লাহকে তুমি দেখো, আর যদি দেখতে না পাও, তবে তিনি তোমাকে দেখেন।”23
এই গবেষণার মতে, সুফিবাদের সাথে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় পণ্ডিতদের মধ্যে ছিলেন আবু হামিদ আল-গাযালী, আল-হাল্লাজ, রাবিয়া আল-আদাবিয়্যাহ, মুহিউদ্দীন ইবনে আল-আরাবী এবং জালালুদ্দিন আল-রুমি। এই ব্যক্তিগত প্রবণতাগুলো বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে যা মুসলিম দেশগুলোতে বিস্তার লাভ করেছে। তারা বিভিন্ন পদ্ধতি ও উপায় ব্যবহার করেছিলেন, কিছু শিক্ষাবিদ কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করে তা নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। আবার কেউ কেউ আধুনিক আচার-অনুষ্ঠান বা রীতিনীতি গ্রহণের জন্য পরিশ্রম করেছিলেন, যা সালাফি প্রচারকরা বিভ্রান্তি হিসেবে গণ্য করেন। এই গবেষক উল্লেখ করেছেন, তুরস্কে সুফিবাদকে শেখ মুহাম্মদ বাহাউদ্দিন নকশবন্দী (১৩১৮–১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত তালাশ করা যায়, যিনি নকশবন্দী তরিকার সাথে যুক্ত ছিলেন, যা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সুফি তরিকা। এটি ইতিহাসজুড়ে ইসলামের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নকশবন্দী তরিকা মুরিদ’র মাধ্যমে আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনার উপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে মুরিদ “শায়খ” থেকে ধর্মীয় জ্ঞান গ্রহণ করে। এই দিকনির্দেশক অর্থাৎ তরিকার শায়খদের একটি সিলসিলা আছে যা সরাসরি নবীজীর সঙ্গে সংযুক্ত। এই পদ্ধতিটি হানাফি ধারার চিন্তাধারার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, যা কুরআন ও সুন্নাহ বোঝা এবং ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে জনমানসের মতামত ও যুক্তির ব্যবহারকে প্রতিফলিত করে। এই পদ্ধতি মুসলিম সমাজে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রভাবশালী ছিল, কারণ উমাইয়া, আব্বাসীয় এবং উসমানি শাসকরা এই পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও বিচারব্যবস্থায় হানাফিদের কেন্দ্রীয় অবস্থান দেওয়ায় এটি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।24
নকশবন্দী এবং পরবর্তীতে তুর্কিরা তাত্ত্বিক জ্ঞান ও প্রমাণের ওপর অধিকতর নির্ভরশীল হয়, যা মাতুরিদি মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত। এই ধারার জনক আবু মনসুর মুহাম্মদ আল-মাতুরিদি, যিনি চতুর্থ হিজরীতে সমরকন্দ অঞ্চলে বড় হয়েছিলেন (ইন্তেকাল ৩৩২ হিজরী)। মাতুরিদির শিক্ষার ভিত্তি এবং মানসিক গঠন ছিল হানাফি ফিকহ ও বক্তৃতার ধারা। এছাড়াও, আবু হানিফার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সেই উৎস, যেখান থেকে মাতুরিদি মতাদর্শের শাখা গড়ে ওঠে।25
নকশবন্দী অন্যান্য সুফি তরিকাগুলোর থেকে আলাদা। কারণ সকল তরিকার সিলসিলা সরাসরি রাসুল দ.’র সঙ্গে সংযুক্ত। পক্ষান্তরে, নকশবন্দী হলো একমাত্র সুফি তরিকা যার সিলসিলা সরাসরি হযরত আবু বকর সিদ্দিক’র সঙ্গে যুক্ত। ফলস্বরূপ, তরিকা হিসেবে এটি স্বতন্ত্র, যা চার খলিফাকে স্বীকৃতি ও সম্মান দেয় এবং শিয়া ও আলাউই সম্প্রদায় থেকে দূরে থাকে। নকশবন্দী তরিকার বিকাশে কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব শেখ আহমদ আল-সিরহিন্দী (১৫২৪–১৬২৪)। তিনি সাফাভি শিয়াবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে এই তরিকায় মুরিদ হওয়াকে সুদৃঢ় করেছেন এবং “ইজতিহাদ”কে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কুরআন ও সুন্নাহর সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কাজ করেছেন।27
তিনি এমন আরও কাজ করেছেন যাতে সুফিবাদ শুধু ঐতিহ্যগত আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজে সক্রিয়ভাবে এবং কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।28 উত্তর ইরাকের একজন কুর্দ শায়খ খালিদ আল-বাগদাদি, যিনি ১৮০৯ সালে নকশবন্দী তরিকায় যোগ দেন, উনিশ শতকে এই চিন্তাভাবনাকে পুনরুজ্জীবিত ও প্রসারিত করেন। তিনি তরিকায়ে খালিদি শাখার প্রচলন করেন, যা “নকশবন্দী-খালিদিয়্যাহ” নামেও পরিচিত। যেটি আহমদ সিরহিন্দীর চিন্তাধারাকে গুরুত্ব দেয় এবং অনৈসলামিক মতবাদকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তিনি ইসলামী বিশ্বের উপর ইউরোপীয় উপনিবেশবাদী প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, যা ইন্দোনেশিয়া থেকে উত্তর ককেশিয়ান অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। তিনি রাষ্ট্রে ইসলামী আইন প্রয়োগ করার এবং ইসলামকে সংস্কারের মূলনীতিরূপে গ্রহণ করার দাবি করেছিলেন।29
সুফিবাদ সবসময় রাজনীতির থেকে নিজেকে আলাদা রেখেছে, তবে তুরস্কে এটি গত শতকের পঞ্চাশের দশকের পর থেকে বিশেষভাবে রহস্যময় অবস্থায় অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে ইসকেন্দার পাশা গোষ্ঠীর নেতা মুহাম্মদ জাহিদ কোটকু’র উত্থানের পর থেকে। এই গোষ্ঠীটি নাজিমউদ্দিম এরবাকান থেকে উদ্ভূত হয়, পরে জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির বর্তমান নেতা এরদোগান, পাশাপাশি জাহিদ কোটকুর সুফিবাদ ও রাজনীতির সংমিশ্রণের ভূমিকার মাধ্যমে সাম্প্রতিক কয়েক দশকে তুরস্কে সুফিবাদকে বাস্তবিকভাবে পরোক্ষ শাসক হিসেবে অবস্থান তৈরি করেছে এমন ধারণার জন্ম দিয়েছে।30
এই তুর্কি বাস্তবতা গত কয়েক দশকে প্রয়োগিত পাশ্চাত্য নীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি আমেরিকার নেতৃত্বাধীন “ন্যাটো” জোটের অংশ ছিল এবং সব ধরনের সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হিব্রু সত্তার সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক রাখত। এই বাস্তবতা সুফিবাদের সাধারণ প্রকৃতির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে বিরোধপূর্ণ, এবং ইতিহাস জুড়েই এটি এমনভাবেই রয়ে গেছে। বাইরের শক্তি, যেমন ক্রুসেডার পাশ্চাত্য বা প্রাচ্য যেখানেই হোক না কেন, এবং রাজনীতিতে তারা যতই আধ্যাত্মিক হোক না কেন, তারা উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে এগিয়েছিল। এটি বিশেষ করে আধুনিক পশ্চিমা উপনিবেশবাদের যুগে স্পষ্ট দেখা যায়, যা বিভিন্ন আরব ও ইসলামী দেশকে প্রভাবিত করেছে। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, তুরস্কের সক্রিয় রাজনৈতিক শ্রেণি সুফিদের আধ্যাত্মিক মূল থেকে আলাদা।32
সুফিবাদ সামাজিক দিক থেকে শিষ্টাচার ও সাধারণ নৈতিকতা রক্ষা করে। এটি এমন এক শিষ্টাচার যা তুর্কি রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যেখানে এমন আইনও নেই যা ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে “তেল আবিব” বা ওয়াশিংটনেও প্রযোজ্য। এটি সুফিবাদের মৌলিক নীতির এবং অনৈতিকতার প্রতি তার অতি-সংবেদনশীলতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। তুর্কি সুফিবাদ, চাই তা নকশবন্দী, ক্বাদরি, বেকতাশি, উমওলিয়া বা খালুতি হোক, এর মূল তুর্কমেন গোত্র এবং তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে স্থায়ীভাবে জড়িত। এই জীবনযাত্রার সরলীকরণ সুফিবাদের প্রকৃতিকে প্রতিফলিত করে, যা পৃথিবী থেকে সৃষ্টিকর্তার প্রতি আকর্ষণ প্রকাশ করে। এটি রাজনীতি ও পার্থিব বিষয় থেকে সুফিদের উত্তরণের ধারণাকে শক্তিশালী করে, যদিও তারা এমন হস্তক্ষেপের প্রতি আগ্রহী নন। পরবর্তীতে, জীবনের সব ক্ষেত্রেই ইসলামের পূর্ণাঙ্গতা, বিশেষ করে সমসাময়িক বাস্তবতায়, সেই সুফিবাদের মূল্যবোধ থেকে বড় একটি বিচ্যুতি দেখা দেয়।33 একটি সাধারণ পর্যবেক্ষণেই দেখা যায় যে, নির্বাচনের আগে তুরস্কের পরিস্থিতি সুফিদের নেতিবাচক প্রভাবকে প্রকাশ করে। তুর্কি রাজনৈতিক শ্রেণি এই নেতিবাচকতায় বিনিয়োগের কৌশল চালিয়েছে, যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষসহ ইস্তাম্বুলে কেবল এক মিলিয়নেরও বেশি ভোটারকে প্রভাবিত করা সম্ভব হয়েছে।34 এছাড়াও, এটি ২০১৬ সালের অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ফেতহুল্লাহ গুলেনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও জড়িত ছিল।35 রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে সুফিদের ভোট আকর্ষণ করতে প্রতিযোগিতা করছে, এর বিনিময়ে তারা মসজিদ বা স্কুল খোলার মতো সুযোগ দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে ওয়াশিংটনে অবস্থানরত গুলেন পার্টিও।36 অনানুষ্ঠানিক ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক কেন্দ্রগুলোর উপর ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করে এমন একটি দল সুফিদের জন্য শেষ সতর্কবার্তার ঘণ্টা বাজাচ্ছে, তারা এই সংঘাত থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিক বা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পদক্ষেপ নিয়ে তাদের চিন্তার বিশুদ্ধতা অনুসারে পথ গড়ুক, বর্তমান বাস্তবতায় আটকে যেন না পড়ে, যার মধ্যে রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং অবমাননাও অন্তর্ভুক্ত।37
ধর্মনিরপেক্ষতা ও সুফিবাদের মাঝে তুর্কি সমাজ
তুরস্ক প্রজাতন্ত্র ইসলামী বিশ্বের একটি দেশ। তুরস্কের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৭.৮% মুসলমান, এবং তাদের অধিকাংশই সুন্নি মতাবলম্বী।38 অটোমান খিলাফতের দীর্ঘ সমৃদ্ধ ইসলামী ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও, কামাল আতাতুর্ক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আধুনিক তুর্কি প্রজাতন্ত্র আইন ও সংবিধানের স্তরে ইসলামী ইতিহাসের সঙ্গে তার সম্পর্ককে প্রায় পুরোপুরি ছিন্ন করে দেয়। ১৯২৩ সালে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর তুরস্ক রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতাকেই শাসনব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করে।39 তবে রাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধ গ্রহণ করলেও, তুর্কি জনগণের মধ্যে ইসলাম তার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। এর ফলে ১৯৫০-এর দশকে কিছু তুর্কি রাজনীতিবিদ তাদের ইসলামী চিন্তাভাবনা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তারা তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের পুনর্জাগরণ ও এর সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য নিজেদের পরিকল্পনা উপস্থাপনে ইসলামের জনপ্রিয় অবস্থানকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তুরস্কের অধিকাংশ ধর্মনিরপেক্ষ অভিজাত (এলিট ক্লাস) এ ধরনের উদ্যোগের বিরোধিতা করেন। কারণ তাদের মতে ধর্মনিরপেক্ষতা আধুনিক তুর্কি রাষ্ট্রের ভিত্তিস্বরূপ একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি এবং এটিকে লঙ্ঘন করা উচিত নয়।40 তুরস্কে ১৯৮০’র দশকে একদল নতুন রাজনৈতিক প্রজন্ম আবির্ভূত হয় যারা প্রকাশ্যেই ধর্মনিরপেক্ষ অভিজাতশ্রেণির কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে এবং তুরস্কে পুনরায় ইসলামী শাসন ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাতে শুরু করে।41
একইভাবে, বেশিরভাগ তুর্কির উপর পূর্ব ও পশ্চিম থেকে আগত সুফি চিন্তাধারার প্রভাব পড়েছে।42 সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুফি কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল কোনিয়া শহরে, যা আনাতোলিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত, যেখানে বহু সুফি কেন্দ্র (খানকা, দরগাহ ইত্যাদি) প্রতিষ্ঠিত হয়। আসলে, সুফিবাদ কেবল চাদর ও পাগড়ি পরা, জিকির করা, মালা পড়া এবং হারাম বিষয় থেকে নিজেকে বিরত রাখা নয়, বরং সুফিবাদ হলো একটি বিজ্ঞান ও কর্মের ধারাবাহিকতা। বহু মানুষ নিজেদের সুফি মনে করেন, যদিও তারা ধর্মীয় জ্ঞান থেকে যা আল্লাহ শিখতে বলেছেন তা শিখেননি। এভাবেই কেউ সন্ন্যাসী হয়ে ওঠে। সুন্দরভাবে জীবনযাপন করা সুফি হলো সে যে একেশ্বরবাদে স্থির, কর্তব্য পালন করে, এই জগতে পৃথিবীবিমুখতা (জুহদ) অনুসরণ করে, আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রদর্শন করে, আন্তরিকভাবে আল্লাহর প্রতি তার প্রয়োজন প্রকাশ করে, আল্লাহর আনুগত্যে পরিশ্রম করে এবং নফল ইবাদত করে। যেমন সুফিবাদের বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব জুনায়েদ আল-বাগদাদি বলেছেন: “আমরা খোশগল্পের মাধ্যমে সুফিবাদ গ্রহণ করিনি; আমরা গ্রহণ করেছি ক্ষুধা, রাত জেগে ইবাদত এবং পরিচিত ও কাম্য জিনিস ত্যাগের মাধ্যমে।” সুফিবাদের সঙ্গে যুক্ত কিছু গোষ্ঠী সুফিবাদের নাম ব্যবহার করে এমন কিছু কাজ বা ধারণা উদ্ভাবন করতে শুরু করেছে যা ইসলামের শরিয়াহ আইনের বিপরীত, যা ওয়াহাবিবাদ (যারা নিজেদের সালাফি বলে ডাকেন) তাদেরকে সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তারা সুন্নিদের এবং মূল সুফি গোষ্ঠীকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে। এর ফলে তুরস্কের হৃদয় হয়ে উঠেছে একটি আধ্যাত্মিক আবেগময় স্থান, যা বাহ্যিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ চেহারা ধারণ করেছে।43
তুরস্কে সুফিধারার কার্যক্রম ও তরিকাগুলো পুরো ইতিহাস জুড়ে খিলাফত এবং অটোমান রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত ছিল। আতাতুর্কের যুগে তুরস্কে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে, সুফিবাদ কঠোর ধর্মনিরপেক্ষ শাসনের অধীনে টিকে থাকার এবং ধারাবাহিকতা রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। নকশবন্দি তুরস্কের অন্যতম জনপ্রিয় সুফি তরিকা। তার অনুসারী আব্দুল্লাহ আল-সামাওয়ী ১৫শ শতকে আনাতোলিয়ায় এই তরিকার পরিচয় করান এবং আধুনিক তুর্কি অভিজাত সমাজের অনেক ক্ষেত্রেই এই তরিকার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে।44
ধর্মীয় অনুশীলনে সুফিবাদের সংযমী ধারা
সহনশীলতার প্রেক্ষিতে অপরকে গ্রহণ করা মানে হচ্ছে হৃদয়ের পরিশুদ্ধি এবং আচরণকে নবীদের জীবন অনুসরণের মাধ্যমে নিজেদের জীবনকে নৈতিকতার মাধ্যমে সুসজ্জিত করার মাধুর্য। এখানে কোনো অবিচার বা আক্রমণ নেই; বরং রয়েছে ক্ষমা, সৎকর্ম ও উপকার যা একটি সুস্থ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে:
“হে মুমিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে দৃঢ়ভাবে ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত হও, এবং বিচার দিতে গিয়ে কোনো জাতির প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। ন্যায়বিচার করো; এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী। আর আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।” — (সূরা আল-মায়েদা: ৮)
সত্যিকারের সুফিবাদ সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রচুর সম্ভাবনা রাখে। ন্যায়সংগত সত্য ধর্ম ও তার প্রকৃত চিত্র রক্ষায়ও এর ভূমিকা অপরিসীম। এছাড়া, একটি সত্ত্বা হিসেবে রাষ্ট্রের জন্য, যা তার নাগরিকদের আশাবাদী করে তোলে এবং তাদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রক্ষা করে, তেমনি সমাজের জন্য, তার সামাজিক শান্তি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য সুফিবাদের অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, সুফিবাদী ধারার ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য সঠিক প্রচেষ্টা, সময় ও শক্তি ব্যয় করতে আগ্রহী যুবকদের আকর্ষণ করার একটি বৃহৎ ও বিস্তৃত ক্ষেত্র।। সুফিবাদের শিক্ষার সংযম এবং সুফিবাদের অনুসারীরা যে সহনশীল মনোভাব প্রদর্শন করে, তা এই মধ্যপন্থী সুফিবাদ শিক্ষাকে অব্যাহত রাখার প্রধান উপাদান হয়ে উঠেছে।46
ধর্মনিরপেক্ষতার মোকাবেলা
সুফি তরিকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি, সমাজের ধর্মনিরপেক্ষীকরণের মোকাবিলায় কিছু গোষ্ঠী আবির্ভূত হয়। যার মধ্যে ছিল আল-নূর, যা বদিউজ্জামান সাঈদ নুরসি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল ১৯৭৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ফেতুল্লাহ গুলেন এবং সোলায়মানিয়া গোষ্ঠী, যা সুলায়মান হিলমি তোনাহান কর্তৃক ১৮৮৮ সালে একটি সুফি গোষ্ঠী হিসেবে প্রকাশ পায়। ১৯৫৯ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রশাসনিক কাঠামোসহ প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব গোষ্ঠীর লক্ষ্য ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা সমাজকে সহযোগিতা করবে এবং ইসলামী মূল্যবোধ চর্চায় সহায়তা করবে।47 তারা দাতব্য ওয়াকফের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমান্তরালে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও প্রতিষ্ঠা করেছিল। অতএব, ধর্মের সঙ্গে তাদের যুগের সূচনা থেকেই তুর্কিরা সুফিবাদকে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ হিসেবে রক্ষা করেছে, যেখানে ধর্ম ও দেশ উভয়ই বিভিন্ন আক্রমণ ও অন্যান্য বিপদ থেকে সুরক্ষিত ছিল। এছাড়াও, এই পথের অনুসারীদের মধ্যে কিছু লোককে আধুনিক তুরস্কের সবচেয়ে বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠতে সহায়তা করেছিল। উদাহরণস্বরূপ, নাজিমউদ্দীন এরবাকান তার দলের প্রতিষ্ঠায় তার তরিকার শায়খ কর্তৃক সমর্থিত ছিলেন এবং নকশবন্দি তরিকার সদস্যদের দ্বারা সমর্থন পেয়েছিলেন।48
উপসংহার
সুফিবাদ তুর্কি সমাজের তৃণমূল থেকে শাসকগোষ্ঠী পর্যন্ত গভীরভাবে প্রোথিত। ধর্মনিরপেক্ষতার উপস্থিতি এবং ভেতর ও বাইরে থেকে আগত সাংস্কৃতিক কাঠামোর পরিবর্তন, বিশেষত বিশ্বায়ন সত্ত্বেও তুর্কে সুফিবাদ নির্মূল করা কঠিন। তুরস্কে ইসলামের বিকাশকে সুফিদের ভূমিকা ছাড়া কল্পনা করা যায় না। সুফিবাদ বিলুপ্ত হলে তুরস্ক তার ইতিহাস হারাবে। সমাজের সমর্থনে সংগঠিত সুফিরা তুরস্কে বিভিন্ন সুফি মতবাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
তাসাউফকে প্রায়ই মসজিদ ও উপাসনালয়ের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তবে তুরস্কে তাসাউফকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে পাওয়া যায়। যেমন শিক্ষা, হাসপাতাল, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করা, এমনকি রাজনীতিতেও। সমসাময়িক তুরস্কের রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণীও সুফি তরিকার সদস্য। যেমন তুরগুত ওজাল, নাজিমউদ্দিন এরবাকান, রেজেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এবং ফাতহুল্লাহ গুলেন। তারা নকশবন্দি, নুরসি ইত্যাদি বিভিন্ন সুফি তরিকার সঙ্গে যুক্ত। সুফিবাদের সংযম বা মধ্যপন্থার শিক্ষা তুরস্ক ও ইসলামী বিশ্বে এবং পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে সুফিবাদের ধারাবাহিকতা প্রধান সহায়তা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। এই মধ্যপন্থী সুফিবাদ সমাজে টিকে থাকবে এবং ইসলামী রাজনীতির ক্ষেত্রকেও প্রভাবিত করবে।