সম্পাদকীয় নোট:
পাকিস্তানের কায়েদ-ই আযম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক তানভীর আনজুম Sufism in History and its Relationship with Power নামক প্রবন্ধটি ২০০৬ সালে প্রকাশ করেন।(https://scholar.google.com/citations?view_op=view_citation&hl=en&user=wD49t_MAAAAJ&citation_for_view=wD49t_MAAAAJ:ufrVoPGSRksC)
সন্দেহ নেই, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয়। গবেষক যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন, প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিদের সঙ্গে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সম্পর্কের সূত্র ও রূপ কেমন ছিল। প্রবন্ধে সংক্ষেপে যতটুকু উল্লেখ করা হয়েছে তাতেই পাঠক আলোচ্য বিষয়ের উপর একটি ভালো ধারণা পাবেন, আশা করি।
‘আধুনিক’ বিশ্বে সুফিধারাকে একেবোরে ‘অহিংস’, ‘অ-রাজনৈতিক’, ‘নির্লিপ্ত’ ইত্যাদি রূপে দেখানোর যে বাতিক তার বিরুদ্ধে সুফিধারার-ই একাংশ কথা বলা শুরু করেছে। সুফি মানেই যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক বিষয়ে নির্লিপ্ত নন এমন অনেক গবেষণামূলক কার্যক্রম দৃশ্যমান। বাংলাদেশেও সুফিদের বিষয়ে এই আলোচনাটি ব্যাপকভাবে চলমান। বিশেষত, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে সুফি সমাজের অনুপস্থিতি এ বিষয়ে অনেককেই ভাবিয়ে তুলেছে। এমতাবস্থায় এই অনুবাদটি চলমান আলোচনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।
প্রবন্ধটি আকারে ব্যাপক। মূল অংশটিই কেবল অনুবাদ করা হয়েছে। তাতে গবেষকের বক্তব্যের কোনো হেরফের হয়নি। কৌতূহলী পাঠকের জন্য আমরা অরিজিনাল প্রবন্ধের লিঙ্ক শেয়ার করে রাখলাম, যেন তথ্য উপাত্তের পাশাপাশি অনুবাদের মান নিয়েও পাঠক মন্তব্য করতে পারেন। আমরা কেবল খ্রিস্টিয় সন ব্যবহার করেছি। ব্যক্তির নামের পাশে ব্রাকেটে ই. দ্বারা ইন্তেকাল, শা. দ্বারা শাসনকাল বোঝানো হয়েছে।
***
সুফিধারার মতাদর্শগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ বিবেচনা করে আমরা প্রাথমিক যুগের সুফিদের সঙ্গে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের (political authorities) সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও বিশ্লেষণে করবো। তবে, রাষ্ট্রের সঙ্গে সুফিদের সকল প্রকার সম্পর্কের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দেয়া এই আলোচনার উদ্দেশ্য নয়; বরং এর লক্ষ্য হলো, এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিকে আলোকপাত করা।
সুফিদের রাষ্ট্রের প্রতি আচরণগত ধারা বিশ্লেষণ করতে গেলে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে আসে: প্রাথমিক যুগের সুফিরা কি তাদের বিশ্বাস ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে, সমগ্রোত্রীয় ছিল? রাজনৈতিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব সম্পর্কিত বিষয়ে সুফিদের মতাদর্শগত অবস্থান কী ছিল? রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নানাবিধ কার্যক্রমের প্রতি তাদের যে প্রতিক্রিয়া তার শিকড় কি ‘নিজস্ব’ মতাদর্শেই প্রোথিত ছিল?
সুফিদের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক নিঃসন্দেহে একটি জটিল ঘটনা (phenomenon)। রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া–না হওয়া নিয়ে সুফিদের বিচিত্র প্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে এ বিষয়ক জটিলতা নিহিত রয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলের ও বিভিন্ন সিলসিলার সুফিদের মধ্যে এ নিয়ে নানাবিধ দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো। কিছু সুফি রাজা-সুলতানদের সঙ্গে কোনো ধরণের যোগাযোগ রাখা থেকে বিরত থাকতেন এবং সঙ্গী সুফিদেরও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করতেন। বিপরীতে, অনেক সুফি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে সুলতানদের আচরণ ও রাষ্ট্রের নীতিতে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষপাতী ছিলেন। এতে প্রতীয়মান হয় যে, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সুফিদের সম্পর্ক ছিল বৈচিত্র্যময়; একইসাথে এ বিষয়ে তাদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডও ছিল বহুমাত্রিক। শাসকদের একাংশ তাদের ব্যক্তিগত আচরণ ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সুফিদের পরামর্শ কামনা করতেন; একাংশ মনে করতেন, সুফিদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করাই ভালো এবং সুফি ও তাঁদের দরগাহ, খানকাহগুলোর কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা উচিত; আবার একাংশ সুফিদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতেন।
সাধারণভাবে সুফিদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ককে দুইটি প্রধান ধারায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়: বিরোধমূলক বা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ বা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। তবে এ দুটি শ্রেণিবিভাগ এই জটিল ও বহুস্তরীয় সম্পর্কের বাস্তবতার কেবল চরম রূপকেই ধারণ করে, যা পুরো ঘটনার পরিধি ও জটিলতাকে অস্পষ্ট করে তোলে। তার উপর, প্রকৃত অবস্থা হলো, ইসলামে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের (religious authority) সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল, তাদের প্রতিনিধিত্বকারী হলেন ‘উলামা’, ফকিহ (jurists) ও ধর্মতাত্ত্বিকবর্গ—যা পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে।
প্রথমেই ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের ধারক হিসেবে ‘উলামা’দের ভূমিকা বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, ইসলামের প্রাথমিক যুগের ‘উলামা’দের একটি স্বতন্ত্র ও সুসংগঠিত দল হিসেবে কল্পনা করা বিভ্রান্তিকর; কারণ, তারা ছিলেন ঢিলেঢালা কাঠামোর ও অ-সংগঠিত।[1] সুফিদের মতোই ‘উলামা’, ফকিহ ও ধর্মতাত্ত্বিকরা তাদের বিশ্বাস, মতবাদ, আইনি অবস্থান এবং রাষ্ট্র ও শাসকদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে সমগোত্রীয় (homogenous) ছিলেন না। যারা রাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন, তারা স্বাভাবিকভাবেই শাসক ও রাষ্ট্রীয় নীতিকে প্রভাবিত করতেন। ফলে ‘উলামা’, ফকিহ ও ধর্মতাত্ত্বিকদের সঙ্গে সুফিদের সম্পর্ক রাষ্ট্রের সুফিবিষয়ক নীতি প্রণয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
ঐতিহাসিকভাবে সুফিদের সঙ্গে ‘বহির্মুখী’ (exrernalist) উলামা, ফকিহ ও ধর্মতাত্ত্বিকদের সম্পর্ক খুব কম ক্ষেত্রেই সৌহার্দ্যপূর্ণ ছিল। ধর্মতাত্ত্বিকরা ছিলেন ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের ঐতিহ্যগত রক্ষক এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত।[2] ধর্মের বাহ্যিক ও জাহেরি (exoteric) দিকের প্রতি তাদের জোর এবং একাগ্রতা সুফিদের অন্তর্মুখী ও বাতেনী (esoteric) দিক থেকে উন্নত মতবাদের সঙ্গে তীব্রভাবে বিরোধ সৃষ্টি করত।
সুফিদের কিছু মতামত উলামাদের কাছে নিন্দনীয় বা ধর্মদ্রোহী বলে বিবেচিত হত; তাই সুফিরা প্রায়ই কবিতার আশ্রয় নিতেন—যা একদিকে জটিল সুফি চিন্তার প্রকাশকে সহজ করতো এবং অন্যদিকে কিছু চিন্তাকে আড়াল করতো।[3]
তদ্রূপ, নৈতিকতা বিষয়ক ব্যাপারগুলোতেও উলামা ও সুফিদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল।[4] এ কারণে সুফিরা উলামাদেরকে এমন ব্যক্তি হিসেবে দেখতেন, যারা “সত্যের মূল সত্তার চেয়ে খোলস নিয়ে বেশি ব্যস্ত”।[5]
ফিকহের বিভিন্ন মাযহাবের সুসংগঠিত রূপ গ্রহণ, শরিয়তের ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান আনুষ্ঠানিকতা এবং ইসলামের বাহ্যিক দিকগুলোর প্রতি প্রায় একচ্ছত্র জোর—এসবই মুসলিম সমাজে উলামাদের গুরুত্ব ও মর্যাদাকে বাড়িয়ে তোলে। তার উপর, আব্বাসীয় শাসন ব্যবস্থায় প্রশাসনিক, বিচারিক, এমনকি রাষ্ট্রের নির্বাহী পদগুলোতেও উলামাদের নিয়োগ করা হয়েছিলো। ফলে, এই ধারণা শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে, উলামারাই ইসলামের ঐশী বার্তার একমাত্র ব্যাখ্যাকারী এবং শরিয়তের ব্যাখ্যায় তাদেরই একচেটিয়া কর্তৃত্ব রয়েছে। ড্যানারের (Danner) ভাষায়, “যদি তাদের এভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে দেওয়া হতো এবং তাদের দাবির বিরুদ্ধে কোনো বিরোধিতা না থাকত, তাহলে ইসলামে সেই পরিস্থিতি দেখা দিত যা খ্রিস্টধর্মের প্রাথমিক যুগে দেখা গিয়েছিল—যখন সরকারি চার্চ সব ধরনের আত্মিক বোধসম্পন্ন গোপন ধর্মতত্ত্বকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল।”[6] এই প্রেক্ষাপটে সুফিরা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেন এবং দাবি করেন যে, তারাই ইসলামের বাতেনী বা আধ্যাত্মিক দিকের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
যখন সুফি মতবাদ ও অনুশীলন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেতে শুরু করল, তখন উলামা, ফকিহ ও ধর্মতাত্ত্বিকদের মধ্যে এ নিয়ে সংশয় ও বিতর্ক দেখা দিল। যদিও অধিকাংশ সুফি শরিয়তের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন এবং তাদের ব্যক্তিগত আচরণও শরিয়তসম্মত হলেও কিছু কিছু সুফি সমাজের নিয়ম-কানুন ও শরিয়তের বিধি-নিষেধ প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করতেন। এদের সাধারণত মালামাতি (malamatis) বলা হতো (অর্থাৎ, যারা ইচ্ছাকৃতভাবে আত্মনিন্দায় প্রবৃত্ত)। তারা সচেতনভাবেই নিন্দনীয় জীবনযাপন করতেন, বা এ ধরনের জীবনের প্রদর্শন করতেন, যেন তাদের আধ্যাত্মিক অর্জন অন্যদের চোখে ধরা না পড়ে। শুধু উলামা, ফকিহ ও ধর্মতাত্ত্বিকরাই নয়, বরং আরও সংযমী সুফি সম্প্রদায়ও তাদের সমর্থন দিতেন না। এমন দুই ধরনের সুফি গোষ্ঠীর প্রতি হজরত দাতাগঞ্জে বখশ লাহোরী অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।[7]
সিলসিলার প্রাতিষ্ঠানিকতা সুফিবাদকে আরও জনপ্রিয় করে তোলে। শায়খ বা সুফি মুর্শিদকে সাধারণ মানুষের জন্য, বিশেষত তাদের মুরিদদের (disciples) কাছে, ধর্মীয় কর্তৃত্বের কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত করে—যার ফলে ধর্মীয় ক্ষেত্রে উলামা ও ফকিহগণের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব দুর্বল হতে থাকে।
এক অর্থে, সুফিরা ধর্মীয় কর্তৃত্বের এক সমান্তরাল কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হন; কারণ সুফিরা উলামাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং তাদের মুরিদরা সুফিদেরকে সকল বিষয়ে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হিসেবে মানতে শুরু করেন।
সুফিদের সঙ্গে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক সংক্রান্ত ঐতিহাসিক ঘটনাবলিকে সুনির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা কঠিন, কারণ উভয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময়। একদিকে আমরা দেখি রাষ্ট্র সুফি প্রতিষ্ঠানকে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করছে, সুফিরা সুলতানদের সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন এবং সরকারি উপাধি ও পদও গ্রহণ করছেন; অন্যদিকে সুফিদের মধ্যে আল-হাল্লাজ, আইনুল কুদাত আবু’ল-মা’আলি আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ আল-হামাদানি (মৃত্যু ৫২৫/১১৩১) এবং শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দির (মৃত্যু ৫৮৭/১১৯১) মতো কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বও আছেন, রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে এবং পরবর্তীতে ‘শহীদ’ উপাধিতে ভূষিত হন। নিম্নে সুফিদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সম্পর্কের একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা উল্লেখ করা হলো।
একাদশ শতক ছিল সুন্নি ঐতিহ্যপন্থীদের বিজয়ের যুগ, যখন শিয়া বুয়াইহিদের পতন ঘটে এবং সুন্নি সেলজুকরা আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও সুসংহত করতে সেলজুকদের সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির সমর্থন জরুরি ছিলো। তাছাড়া তারা দৃঢ় সুন্নি হওয়ায় ইসলামের সুন্নি ধারাটিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এক্ষেত্রে মাদ্রাসা ও খানকাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কারণ সেগুলো সেলজুক শাসক ও শাসকশ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছিল। শুধু সেলজুকরাই নয়, জেঙ্গি (ইমামুদ্দিন জেঙ্গি ১০৮৪-১১৬৪) ও আইয়ুবি (আইয়ুবি সালতানাত) শাসক এবং তাদের অধীনস্থ ও উত্তরসূরিরাও খানকাহ নির্মাণ করেন এবং সুফি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। এভাবে এসব শাসনব্যবস্থা একদিকে নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে, অন্যদিকে গবেষক ট্রিমিংহামের মতে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সুফি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের নিকট অধিক ‘মর্যাদাপূর্ণ’ হিসেবে উপস্থাপন করে।[8]
এথেকে বোঝা যায় যে, সুফি-রাষ্ট্র সম্পর্ক ছিল দ্বিমুখী। যেমন, সুফিরা রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে সাহায্য করতেন, তেমনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাও সুফিদের সহায়ক ভূমিকা প্রদান করতো এবং তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও মর্যাদা বাড়াতে সাহায্য করতো। সুলতান ও আমিররা, বিশেষত সেলজুক শাসকরা, বিদ্যমান খানকাগুলোকে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং তাদেরকে ওয়াকফ বা দান-অনুদান প্রদান করেছিলেন, যা রাষ্ট্রকে এসব প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে সরাসরি হস্তক্ষেপের পথও উন্মুক্ত করে দেয়।
বাস্তবে অনেক সুফি কৌশলগতভাবে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সম্পর্ককে ব্যবহার করেছিলেন খলিফা ও উমারাদের আচরণ ইতিবাচকভাবে প্রভাবিত করার জন্য, পাশাপাশি রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণেও গঠনমূলক ভূমিকা রাখার উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে রাজনীতিকরাও সুফিদের ব্যাপক সামাজিক গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে নানা রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতেন। এক্ষেত্রে অন্যতম উদাহরণ হলো, সুফি সিলসিলা সোহরাওয়ার্দিয়ার প্রতিষ্ঠাতা, শায়খ নাজিব উদ্দিন আবুল কাহির আল-সোহরাওয়ার্দি, যিনি বাগদাদের খলিফাদের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন।
তার মর্যাদা এমন উচ্চ ছিল যে কেউ তার রিবাতে (সুফি আস্তানা) আশ্রয় নিলে, খলিফা বা সুলতানও জোর করে তাকে সেখান থেকে সরাতে পারতেন না।[9]
তার ভ্রাতুষ্পুত্র শায়খ শিহাবুদ্দিন আবু হাফস উমর ইবন মুহাম্মদ আল-সোহরাওয়ার্দি—যিনি সোহরাওয়ার্দিয়া সিলসিলার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে বিবেচিত—আব্বাসীয় খলিফা নাসির (শাসনকাল ১১৮০-১২২৫) এর বিশেষ দূত এবং প্রধান ধর্মীয় উপদেষ্টা ছিলেন। সোহরাওয়ার্দির মতে, জনগণের উপর খলিফার কর্তৃত্ব এবং আল্লাহ ও মানুষের মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তার ভূমিকা ছিল অনেকটা সুফি শায়খের তার মুরিদদের উপর কর্তৃত্বের সমান্তরাল।[10] খলিফা শুধু বাগদাদে খানকাই নির্মাণ করেননি, বরং বহু খানকার পরিচালক হিসেবে সোহরাওয়ার্দিকে নিয়োগ করেছিলেন। তারা যৌথভাবে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও ধর্মীয়—বরং আরও স্পষ্টভাবে বললে—আধ্যাত্মিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেন। পাশাপাশি সুফি সিলসিলাগুলোর একটি সুসংগঠিত পুনর্গঠনের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়। খলিফা নাসির নিজেই বাগদাদে অন্তত ছয়টি খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং অন্যদের প্রতিষ্ঠিত বেশ কিছু খানকার পরিচালক হিসেবে সোহরাওয়ার্দিকে নিয়োগ দেন[11]—যা সুফিদের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের বশ্যতা স্বীকারের প্রতীক হিসেবেও বিবেচ্য। খলিফা অন্যান্য খানকাগুলোর পরিচালকের নিয়োগও নিজে নিয়ন্ত্রণ করতেন। শায়খও প্রয়োজনে আব্বাসীয় খলিফাদের সহায়তা করতেন। যেমন খোয়ারেজম শাহ মুহাম্মদ দ্বিতীয় ১২১৭-১৮ সালে বাগদাদ আক্রমণ করলে, শায়খ-ই তাকে শহর আক্রমণ থেকে ফিরিয়েছিলেন।[12]
দ্বাদশ শতকে রাষ্ট্র-সুফি সম্পর্কের আরেকটি ধারা দেখা যায় মিশরের মামলুক রাষ্ট্রে, যা ছিল আব্বাসীয় খেলাফতের একটি আধা-স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য ও পরিপূরক কাঠামো। একদিকে, মামলুক সুলতানরা তাদের শাসনের বৈধতা অর্জনে অত্যন্ত নির্ভরশীল ছিল, এবং সে কারণে তারা তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সুসংহত করার উদ্দেশ্যে সুফিদের সহযোগিতা কামনা করতো। অন্যদিকে, মিশরে সুফিদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব দেখে তারা ভীতও ছিল, যে কারণে তারা সুফিদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালায়। মামলুক আমলে খানকাগুলোর প্রধান/শায়খদের রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত করা হতো। মামলুক সুলতানরা বিভিন্ন খানকার প্রধানদের শায়খ আল–শুয়ূখ (আক্ষরিক অর্থে “শায়খদের শায়খ”) উপাধিতে ভূষিত করতেন। শায়খ আল-শুয়ূখ মামলুক রাষ্ট্রের অন্যান্য সুফি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপরও কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতেন। ভারতের শায়খ আল–ইসলাম এর সরকারি উপাধির মতো এটিও মূলত সম্মানসূচক পদবী ছিল, যা নির্দিষ্ট কোনো দায়িত্ব বা কার্যাবলির ব্যাপার ছিল না।[13]
তদুপরি, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে—মিশর ও সিরিয়াসহ—সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত বহু খানকা বিদ্যমান ছিল। যেহেতু এসব খানকা রাষ্ট্র কর্তৃক নির্মিত বা পরিচালিত হতো, তাই সরকারই তাদের পরিচালকদের নিয়োগ দিত। ফলে, যারা এসব খানকার পরিচালক পদে বসতেন, তারা অনেক সময় প্রকৃত সুফি ছিলেন না। এমনকি ইবন খালদূনকেও ১৩৯২ সালে খানকাহ বায়বার্সের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এসব ভবন ছিল বাস্তবে ওয়াক্ফ সম্পত্তি। অনেক সময় কিছু প্রাক্তন উযিরকেও (অবসরপ্রাপ্ত আমলা) খানকাসমূহের দায়িত্ব প্রদান করা হতো।[14]
এই বিষয়গুলোর ফলে, সুফিদের জীবন ও তাদের খানকাসমূহে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সুফিধারার বিকাশে বিরূপ প্রভাব পড়ে; কারণ এই পরিস্থিতিতে বহু ভণ্ড সুফি বিপুল সম্পদ অর্জনের সুযোগ পায়, খানকাগুলোর স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন হয়, এবং সুফিরা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়। আরও উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সুফি ও শাসকদের এই পারস্পরিক সহাবস্থানের সম্পর্ক সুফিদেরকে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অধীনস্থ করে তোলে।
সুফিদের ও শাসকদের মধ্যকার এই সহাবস্থানের সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার পর এখন বিপরীত দিকটি আলোচনা করা দরকার। যারা শাসকদের সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করতেন, তাদের বিপরীতে বহু সুফি ছিলেন যাদের রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল অস্বস্তিকর বা বিরূপ। শাসকদের প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল বিবিধ—রাজনৈতিক ব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীনতা থেকে শুরু করে শাসকদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে কিছু সুফির মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হয়েছিল।
প্রাথমিক যুগের সুফিদের উদাহরণ দিয়ে শুরু করলে দেখা যায়—হাসান আল-বাসরি রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করতেন না। ফরিদুদ্দীন আত্তার (ই. ১২২০) এর বিবরণ অনুযায়ী, একবার তিনি উপদেশ দিচ্ছিলেন এবং ইরাকের উমাইয়া গভর্নর হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ (ই. ৭১৪) সৈন্যসহ সেখানে আগমন করেন। হাসান বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে কিংবা কোনো বিশেষ সম্মান প্রদর্শন না করেই তার উপদেশ অব্যাহত রাখেন।[15] যেহেতু তিনি হাজ্জাজের নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে সমালোচনা করতেন, তাই পরিণতিতে গভর্নর তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন এবং তাকে আমৃত্যু আত্মগোপনে থাকতে হয়।[16]
উমাইয়া খলিফা উমর ইবন আবদুল আজিজ (৭১৭-৭১৯) এর আমলে হযরত হাসান বসরি খলিফাকে একটি পত্র লিখেন, যেখানে তিনি তাকে দুনিয়ার মিথ্যা আশা-আকাঙ্ক্ষা, লোভ-লালসার বিরুদ্ধে সতর্ক করেন। এটি স্বাভাবিকও বটে; কারণ তিনি ক্ষুধা, দারিদ্র্য এবং দুনিয়াবিমুখতার মূল্যবোধকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন এবং অতিরিক্তি সম্পদকে তিনি মন্দ হিসেবে আখ্যায়িত করতেন।[17]
তদ্রুপ, অন্য এক উপলক্ষে হযরত হাসান বসরি বসরার গভর্নর ইবনে আল হুবায়রাহকে (ই. ৭২৬) সতর্ক করে বলেছিলেন, তিনি যেন খলিফার তুলনায় আল্লাহকে অধিক ভয় পান; কারণ আল্লাহ তাঁকে খলিফার হাত থেকে রক্ষা করতে সক্ষম, অথচ খলিফা তাঁকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে কখনও সক্ষম নন।[18] মালিক ইবন দিনারের জীবনের একটি ঘটনায় দেখা যায় যে, তিনি তার বিকারগ্রস্ত প্রতিবেশীকে কঠোরভাবে বাধা দিতে মোটেই ভয় পাননি—সেই প্রতিবেশী নিজেই দাবি করেছিল যে কেউ তাকে থামাতে পারবে না, কারণ সে সুলতানের প্রিয়পাত্র।
মালিক ইবন দিনারের এই আচরণ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের প্রতি তার নির্লিপ্ততা ও নিঃশঙ্কতার পরিচয় বহন করে। প্রাথমিক পর্যায়ের আরেক বিখ্যাত সুফি ইব্রাহিম ইবন আদহাম, যিনি বাল্খের একজন রাজপুত্র ছিলেন, কিন্তু রাজকীয় জাঁকজমক ত্যাগ করে কঠোর সুফি জীবনধারা বেছে নিয়েছিলেন। তিনি এক ধনবান ব্যক্তির প্রস্তাবিত বিপুল অর্থসাহায্য প্রত্যাখ্যান করেন এবং দারিদ্র্যকে সম্পদের ওপর অগ্রাধিকার দেন।
দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলিফা আবু জাফর আল-মানসুর (৭৫৪–৭৭৫) বাগদাদের বিচারপতি (কাজি) নিযুক্ত করার উদ্দেশ্যে চারজন বিশিষ্ট সুফি ও পণ্ডিতের নাম তালিকাভুক্ত করেছিলেন। এর মধ্যে ছিলেন সুফিয়ান আল-সাওরি (ই. ৭৭৮), মিসআর ইবন কিদাম (ই. ৭৬৯) এবং বিখ্যাত ফকিহ আবু হানিফা নু‘মান ইবন সাবিত (ই. ৭৬৭)। রাষ্ট্রের গুরুদ্বপূর্ণ পদে নিযুক্তি থেকে বাঁচতে সুফিয়ান সাওরি গ্রেপ্তার ও নির্যাতন এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান; মিসআর ইবন কিদাম খলিফার সামনে নিজেকে উন্মাদ হিসেবে উপস্থাপন করেন আর ইমাম আবু হানিফা এ প্রস্তাব গ্রহণে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান।
আব্বাসীয় খলিফা হারুন আল-রশিদ (শা. ৭৮৬-৮০৯) তাঁর সময়ের বিশিষ্ট সুফিদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। খোরাসানের বিখ্যাত পণ্ডিত ফুযাইল ইবন ‘ইয়াদ’র সঙ্গে খলিফা হারুনের কথোপকথন—যা ফরিদুদ্দীন আত্তার তাঁর তাজকিরাতুল আওলিয়া গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন— সেখানে উল্লেখ রয়েছে, ফুযাইল শুধু খলিফার প্রস্তাবিত এক হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) গ্রহণে অস্বীকৃতিই জানাননি, বরং ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য খলিফাকে কঠোর ভর্ৎসনাও করেছিলেন। ফুযাইল হারুনকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, উচ্চপদকে পরীক্ষা হিসেবে গ্রহণ, আল্লাহকে ভয় করা এবং আশপাশের চাটুকারদের ধোঁকা থেকে সাবধান থাকারও পরামর্শ দেন।
অনুরূপভাবে, ইব্রাহিম ইবন আদহামের শিষ্য শাকীক আল-বালখীর সঙ্গে খলিফা হারুনের সাক্ষাতের কথাও আত্তার বর্ণনা করেছেন। সেখানে খলিফাকে উপদেশ দেওয়া হয় যে, তিনি যেন হযরত আবু বকরের মতো সত্যবাদিতা, হযরত উমরের মতো সত্য–মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়, হযরত উসমানের মতো লজ্জাশীলতা ও মহত্ত্ব এবং হযরত আলীর মতো জ্ঞান ও ন্যায়পরায়ণতা ধারণ করেন।
অনুরূপভাবে হযরত ফরিদুদ্দীন আত্তার খলিফা হারুনের সঙ্গে ইয়াকুব ইবন ইব্রাহিম আবু ইউসুফ আল-কাজি (ই. ৭৯৮) এবং ইমাম আবু হানিফার শিষ্য হযরত দাউদ ইবন নাসির আত-তাই (ই. ৭৮১)-এর সাক্ষাতের কথাও উল্লেখ করেছেন। খলিফার অনুরোধে দাউদ আত-তাই তাকে উপদেশ দিলে খলিফা অঝোরে কাঁদতে শুরু করেন। দাউদ আত-তাই খলিফার প্রস্তাবিত উপঢৌকন প্রত্যাখ্যান করেন।
ইমাম গাজ্জালি নবী ইবরাহিম আলাইহিস সালামের মাজারে শপথ করেছিলেন যে, তিনি কখনও রাজদরবারে উপস্থিত হবেন না এবং কোনও রাজদাতার অনুদান গ্রহণ করবেন না।[19] এইভাবে প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিদের বৃহত্তর একটি অংশ রাষ্ট্রের আর্থিক সুবিধা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংশ্লেষ এড়িয়ে চলেন।
সুফিধারাকে প্রায়ই উলামা ও ফকিহদের কর্তৃত্বের জন্য হুমকি বা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হতো; এজন্যই মধ্যযুগে সুফিধারা ও ফকিহদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা যায়। বহু সুফিকে কুফর ও বিদআতের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল, এবং কয়েকজন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশে শাস্তিও পেয়েছিলেন। ফরিদুদ্দীন আত্তার খলিফা হারুনের সঙ্গে সুফিয়ান আল-সাওরির উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের বিবরণ দিয়েছেন—খলিফা তার মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যদিও খলিফার আকস্মিক মৃত্যুর কারণে তা কার্যকর হয়নি।
হযরত যুননুন আল-মিসরিকে কুফরির অভিযোগে গ্রেপ্তার করে বাগদাদে পাঠিয়ে কারারুদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে তাকে আব্বাসীয় খলিফা আল-মুতাওয়াক্কিল (শা. ৮৪৭-৮৬১) এর দরবারে পেশ করা হয়, যেখানে তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন। তার কথা শুনে খলিফা অশ্রুসিক্ত হন, তার মুরিদ হন, মুক্তির আদেশ দেন এবং মিসর ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেন।
৮৭৪ সালে আরেক সুফি সাহল আত-তাসতুরিকে রাজনৈতিক ক্ষমতাবানরা বসরায় আশ্রয় নিতে বাধ্য করে।[20] একইভাবে, ৮৮৮ সালে ইন্তেকালকারী গুলাম খলিল—যিনি এক আব্বাসীয় খলিফার ঘনিষ্ঠ ও দৃঢ়তর হাম্বলি অনুসারী— তিনি সুফিদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে কুফরির অভিযোগ আনতেন। তিনি খলিফাকে আবু হামজা, রাক্কাম, আবু বকর আল-শিবলি, আবুল হাসান আন-নুরি এবং জুনায়েদ আল-বাগদাদি প্রমুখ সুফিদেরকে গ্রেপ্তারের আদেশ দিতে প্ররোচিত করেছিলেন। তাদের গ্রেপ্তারের পর খলিফা তাদের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন। তবে পরবর্তীতে এক কাজি (বিচারক) তাদের ইমান-আকিদা পর্যালোচনা করে নির্দোষ ঘোষণা করেন এবং শেষ পর্যন্ত খলিফা তাদের সম্মানের সঙ্গে মুক্তি দেন।
সুফি শহীদগণ
কতিপয় বিশিষ্ট সুফি ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছিল, এবং এই কারণে তাঁরা ‘শহীদ’ পরিচয়ে পরিচিত হন। আপাতদৃষ্টিতে তাঁদের সাহসী তত্ত্বকথার কারণেই তাঁদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল—কারণ তাঁদের বিরুদ্ধে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস দুর্বল করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।[21] তবে এটি আংশিক সত্য মাত্র; তাঁদের মৃত্যুদণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনাগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। শিরক বা বহুধর্মবাদ এবং প্রচলিত মতের বিপরীত বিশ্বাস ধারণের অভিযোগের পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে ইসমাঈলিবাদ প্রচার অথবা ইসমাঈলিদের প্রতি সহানুভূতি দেখানোর অভিযোগও আনা হয়েছিল। বাস্তবে তখন ইসমাঈলিবাদ আব্বাসীয় রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হুমকি ছিল—বিশেষত প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতিমীয় খেলাফত এবং ইরান–সিরিয়ার ‘হাসাশিন’ গোষ্ঠীর কারণে। নিম্নে রাষ্ট্র-রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিনজন বিশিষ্ট সুফির সংক্ষিপ্ত বিবরণ প্রদান করা হলো।
১. হুসাইন ইবন মানসুর আল–হাল্লাজ
হুসাইন ইবন মানসুর আল-হাল্লাজ—(৮৫৭-৯২২) সুফিধারায় যিনি এক কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব। তাঁকে আট বছর কারারুদ্ধ রাখা হয় এবং ৯২২ সালে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কারণ তিনি “আনাল হক”—উচ্চারণ করেছিলেন (‘আল-হক’ আল্লাহর নামসমূহের একটি)। এই উক্তিটি ‘যাহেরি’ উলামা, ফকিহ ও ধর্মতত্ত্ববিদদের দৃষ্টিতে শিরকের শামিল মনে হলেও, প্রকৃতপক্ষে এটি তাঁর তাওহিদী অভিজ্ঞতার চরম বহিঃপ্রকাশ।
তবে এটি অত্যন্ত ভুল হবে যদি মনে করা হয় যে, শুধু এই উক্তিই হাল্লাজের মৃত্যুদণ্ডের কারণ। আব্বাসীয় খলিফা আল-মুক্তাদিরের (শা. ৯০৮-৯৩২) শাসনামলে বাগদাদের দরবারে মনসুর হাল্লাজের সমালোচকরা তাঁর বিরুদ্ধে কারামাতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগও আনেন।[22] তার কিছু ধারণা ইসমাঈলিদের ভাবনার সঙ্গে সামান্য সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাঁকে দণ্ডিত করা হয় তাঁর কথিত রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে, যা কারামাতি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
কারামাতিরা চতুর্থ/দশম শতাব্দীর শুরুতে বাহরাইনে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল, যা আব্বাসীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্বের জন্য স্বাভাবিকভাবেই হুমকি ছিল।[23]
২. আইন আল–কুদাত আবুল–মা‘আলী আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ হামদানী
এই সুফি পণ্ডিত ছিলেন দ্বাদশ শতকের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তিনি সুফিবাদ ও দর্শন উভয় ক্ষেত্রেই উচ্চতর পাণ্ডিত্য লাভ করেছিলেন। তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল প্রচলিত বিশ্বাসের বিপরীত কিছু কথাবার্তার জন্য। যেমন নবুওয়ত ও পরকাল সম্পর্কে তাঁর ধারণা, জান্নাত-জাহান্নামের অস্তিত্ব অস্বীকার করে বলা যে এগুলো সাধারণ মানুষের জন্য উপমামাত্র, এবং তাঁর বিরুদ্ধে অন্যান্য প্যান্থেইস্টিক (অদ্বৈতবাদী) প্রবণতার অভিযোগ ছিল। কয়েক মাস কারাবাসের পর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলেও পরে ১১৩১ সালে ৩৩ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।[24]
এ ছাড়াও তাঁর ধারণায় ইসমাঈলিদের চিন্তাধারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ দিক ছিল—যা রাজনৈতিক হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ডে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে কাজ করেছিল।
৩. শিহাবুদ্দীন ইয়াহইয়া ইবন হাবশ আস–সোহরাওয়ার্দী আল–মাকতুল দ্বাদশ শতকের এই সুফি–দার্শনিক ১১৯১ সালে ৩৮ বছর বয়সে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। তাঁর উপাধি ‘‘আল-মাকতুল’’—অর্থাৎ ‘‘শহীদ’’—তাঁকে একই সিলসিলার অন্যান্য সুফিদের থেকে স্বতন্ত্র অবস্থান দিয়েছে। তিনি ‘‘শাইখ আল-ইশরাক’’ উপাধিতেও পরিচিত ছিলেন।
তিনি সেলজুক সুলতান দ্বিতীয় কিলিজ আরসালান (শা. ১১৫৫-১১৯২) ও তাঁর পুত্রকে পাঠদান করতেন। দর্শন ও সুফিবাদে গভীর পাণ্ডিত্য থাকায় তিনি বহু তত্ত্বগ্রন্থ রচনা করেন, যা ফতিহদের পাশাপাশি ও কতিপয় সুফি মহলেও তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয় এবং তাঁকে বিতর্কিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। তিনি তাঁর তাত্ত্বিক ধারণা স্পষ্টভাষায় প্রকাশ করতেন। তদুপরি আলেপ্পোর গভর্নর প্রিন্স মালিক আল-জাহির (ই. ১২১৮) এর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সমসাময়িক উলামা ও জুরিস্টদের ঈর্ষা ও ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে। আলেপ্পোর উলামাদের প্ররোচনায় তাঁকে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়—এই আদেশ দেন সুলতান সালাহউদ্দিন (সালাদিন) (ই. ১১৯৩) এবং তা কার্যকর করেন তাঁর পুত্র মালিক আল-জাহির।[25] প্রথমে প্রিন্স তাঁর পিতার আদেশ কার্যকর করতে গড়িমসি করলেও পরে গভর্নরশিপ হারানোর আশঙ্কায় তিনি তা কার্যকর করেন।
আসলে সালাহউদ্দিন মূলত রাজনৈতিক হুমকির আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেন। কারণ সোহরাওয়ার্দীর শিক্ষা ইসমাঈলিদের মতবাদের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ বিবেচিত হয়েছিল। তাছাড়া ক্রুসেডারদের কাছ থেকে সিরিয়া পুনর্দখলের পর তাঁর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দৃঢ় করতে উলামাদের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। ফলে তিনি তাঁদের দাবির কাছে নতিস্বীকার করেন এবং সোহরাওয়ার্দীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।[26] অতএব, তাঁর কারাবাস ও মৃত্যুদণ্ডের কারণ শুধু ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাপার ছিল না; রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
উক্ত ঐতিহাসিক তথ্যাবলির পাশাপাশি উল্লেখিত সময়পর্বে সুফিদের সঙ্গে রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সহিংস সংঘর্ষের ঘটনাও খুব সামান্যই পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, শেষ সেলজুক শাসক সুলতান গিয়াস উদ্দীন (শা. ১২৩৬-১২৫৯) এর রাজত্বকালে আমাসিয়ার একজন সুফি বাবা ইলিয়াস আল-খোরাসানি দরবেশদের একটি বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। বিদ্রোহটি দমন করা হয় এবং সাধারণভাবে সুফিদের ওপর চালানো এক গণহত্যাকাণ্ডে বাবা ইলিয়াস নিহত হন।[27]
এ ধরনের ঘটনা প্রারম্ভিক শতকগুলোতে তুলনামূলকভাবে ছিল অত্যন্ত বিরল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে—বিশেষত আঠারো ও উনিশ শতকে—এশিয়া ও আফ্রিকার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বহু সুফি ও সুফি-গোষ্ঠীর সংঘর্ষ ঘটে।[28]
উপর্যুক্ত আলোচনার ভিত্তিতে অনুমান করা যায় যে, সুফিধারা ও রাষ্ট্রের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল বৈচিত্র্যময়। একদিকে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের প্রতি সুফি প্রতিক্রিয়ার ধরণ ছিল বহুবিধ। যেমন:
১. রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘবদ্ধতা ও সহযোগিতা, যার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক সংস্কার;
২. শাসকদের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আচরণের তীব্র সমালোচনা;
৩. এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষ ও বিরোধ।
অন্যদিকে, শাসক ও রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নীতি-আচরণও ছিল নানামাত্রিক। অনেক শাসক সুফিদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখতেন; তাদের আনুষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন; সরকারি পদ ও ভাতা দিতেন; এমনকি তাদের খানকার জন্য রাষ্ট্রীয় সহযোগিতাও প্রদান করতেন।
কিন্তু অনেক শাসক সুফিদের নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের প্রতি হুমকি বলে মনে করতেন। তাই তারা সুফিদের নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা করতেন, এবং রাষ্ট্রের অধীনস্থ করে রাখতে সচেষ্ট হতেন। এমনকি কিছু শাসক সুফিদের রাষ্ট্র-অনুমোদিত কালাম ও ধর্মদর্শন গ্রহণে বাধ্য করতেও সচেষ্ট ছিলেন।