উয়ায়সীয়া তরীকাহ ও বাংলাদেশে তার আবির্ভাব

খাজা উয়াস করনী ও আমাদের নবী করীমের মধ্যে অসাধারণ ও বিস্ময়কর (কারণ উভয়ের কখনো দেখাই হয়নি) মুহব্বতের বৃত্তান্ত মুসলিম জাহানের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে। কিন্তু তখনো জানতে পারিনি, হযরত উয়ায়সের আদর্শে একটি তরীকাহ্ প্রবর্তিত ও জারী হয়েছে।

সম্পাদকীয় নোট:

এম মুফাখখারুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন (২০০৮-৯)। তাঁর এই প্রবন্ধটি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা থেকে ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত মুহম্মদ এনামুল হক স্মারকগ্রন্থে প্রকাশিত হয়।

সুফিধারায় উয়ায়সিয়া প্রাচীনতম তরিকা। কিন্তু বাংলাদেশে এই তরিকার আগমন ও বিকাশ নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। সেদিক থেকে এই প্রবন্ধটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনতম তরিকা হিসেবে এর ঐতিহাসিক দিক ও বাংলাদেশে এই তরিকার বিকাশ নিয়ে রচিত এই প্রবন্ধটি বাংলাদেশের সুফি স্টাডিজে জরুরী অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করে‌ এটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

প্রবন্ধটি আকারে ৯ হাজারের অধিক শব্দের। মূল বক্তব্য বিকৃত না হয় এমন সাবধানতার সহিত আকার কমিয়ে আনা হয়েছে। কিছু বানান সহজবোধ্য করা হয়েছে। যেমন: খ‌ওয়াজা’র স্থলে খাজা, মাআরিফাত’র স্থলে মারিফাত ইত্যাদি।

প্রবন্ধটি পুনঃপ্রকাশের প্রধান উদ্দেশ্য, উয়ায়সিয়া তরিকা বিষয়ে আলোচনা হাজির করা এবং বাংলাদেশে যে এই তরিকার একটি ধারা জারি আছে, ঐতিহাসিকভাবে তার জানান দেয়া। এই উদ্দেশ্যের বাহিরে, লেখকের সকল বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করা জরুরী নয়। কিছু জায়গায় লেখকের শব্দ সচেতনতা ও বক্তব্যের ভঙ্গিমা সমালোচনাযোগ্য। ইতিহাসের কিছু জায়গায় লেখক ইসলামের শিয়াধারার ইতিহাসে প্রভাবিত হয়ে একচেটিয়া মন্তব্য করেছেন। এ-সকল বিষয়ে পাঠকের সতর্কতা কাম্য। লেখকের কোনো মন্তব্য মাকাম’র মন্তব্য হিসেবে বিবেচনা না করার অনুরোধ রইলো। (আদতে তা উচিত‌ও নয়)

প্রবন্ধে উয়ায়সিয়া তরিকার বিভিন্ন বিষয়ে পুঁথির ব্যবহার লক্ষ্যণীয়। বাংলার পুঁথি সাহিত্যে যে সুফিধারার ইতিহাস, বিকাশ, রকমফের নিয়ে বিস্তর উপাদান এখনো রয়ে গেছে তার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে প্রবন্ধটি। আশা করছি, প্রবন্ধটি সুফি স্টাডিজের লেখক ও গবেষকদের কাজে লাগবে।

 

***

 

উয়ায়সীয়া তরীকাহ ও বাংলাদেশে তার আবির্ভাব

ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক তার ‘বাংলায় সুফীবাদের ইতিহাস’ (A History of Sufism In Bengal) গ্রন্থে মাদারীয়া তরীকাহ্ প্রসঙ্গে বলতে উয়ায়সীয়া তরীকার সামান্য একটু উল্লেখ করেছেন। এখানে এ তরীকার উদ্ভব ও বাংলাদেশে এর আবির্ভাবের কথা বললে অবান্তর হবে না বলে মনে করি। ১৯৪২ সনের ৩রা ডিসেম্বরে (মুতাবেক বাংলা ১৩৪৯ সনের ১৭ই অগ্রহায়ণে) বাংলাদেশে উয়ায়সীয়া তরীকার প্রথম প্রচারকদের অন্যতম শাহ আব্দুল কাদের মরহুমের ইন্তেকাল হয়েছে সংবাদে যখন আমাদের করটিয়া সা’আদত কলেজের এক কলেজীয় বন্ধুকে শোক প্রকাশ করতে দেখি, তখন জিজ্ঞাসায় জানতে পারি, তাঁদের এলাকায় ঢাকা মানিকগঞ্জের ডাকরখালী-কেন্দ্রে তরীকাহ্-ই-উয়ায়সীয়া নামে এক তরীকার দাবীদার অনেক লোক জমায়েত হন এবং নিজদিগকে উয়ায়সী আখ্যায় আখ্যায়িত করেন। প্রথম প্রচারক ভ্রাতৃদ্বয়ের জ্যেষ্ঠ শাহ্ আব্দুর রহিম বাংলা ১৩১৭ সনের ১২ই চৈত্র মুতাবেক ১৯১০ সনের ২৬শে মার্চ ইন্তেকাল করেন। কনিষ্ঠ জনই শাহ্ আব্দুল কাদের।

আমি আমার আব্বা হুজুরের কাছে বাল্যেই জানতে পারি, খাজা উয়াস করনী ও আমাদের নবী করীমের মধ্যে অসাধারণ ও বিস্ময়কর (কারণ উভয়ের কখনো দেখাই হয়নি) মুহব্বতের বৃত্তান্ত। তা মুসলিম জাহানের সর্বত্রই ছড়িয়ে আছে। কিন্তু তখনো জানতে পারিনি, হযরত উয়ায়সের আদর্শে একটি তরীকাহ্ প্রবর্তিত ও জারী হয়েছে। হযরত উয়ায়সও একটি তরীকাহ্ প্রবর্তন করেছেন জানতে পেরেই তরীকাহ্ নাম্নী সাধন-পদ্ধতির (আসলে চিন্তার উৎকর্ষ ও তদনুসারী কর্ম-পদ্ধতির) প্রতি সর্বপ্রথম আমার আস্থা জন্মাতে শুরু করে এবং সেই কলেজ-বন্ধুর এলাকার উয়ায়সী-প্রধানদের সঙ্গে ব্যক্তিগত দেখা-সাক্ষাতে তাঁদের তরীকাহ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জানাশুনার জন্যে ১৯৪৩ সনের ২৮শে জুন (রবিবার) আমি তাঁদের এলাকার যাই। বাস্তবিক উয়ায়সীদের বিস্ময়কর চরিত্র-মাধুর্য ও অভিনব কথাবার্তা উপলব্ধি করে আমি তাঁদের মধ্যযুগীয় বাংলা কবিতা-পদ্ধতিতে রচিত ও প্রকাশিত অনেক পুথি-পুস্তকে বাংলাদেশে উয়ায়সীয়া তরীকার প্রবর্তন থেকে শুরু করে উয়ায়সীদের শৈক্ষিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক যথেষ্ট তথ্য সংগ্রহ করি। কারণ এদেশের প্রায় সবাই তরীকাহ্ মাত্র চারটিই আছে মনে করে এখানকার কেউ কেউ নিজেকে চার তরীকাহর পীর (যাতে কেউ কোন তরীকার নাম করে ফসকে না যেতে পারে) বলে পর্যন্ত প্রচার করেন দেখি।

কাজেই, বাংলাদেশে সম্পূর্ণ অভিনব (অথচ সর্ব-প্রাচীন) এই তরীকার আবির্ভাবের কালে লোকের যেরূপ বিরূপ সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, বিশেষ বিচক্ষণতার সঙ্গেই উয়ায়সীদের তরফ থেকে তার দাঁত-ভাঙ্গা জওয়াব দিতে হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের আধ্যাত্মিক ধারাটি তাতে সমৃদ্ধ হয়েছে। ব্লুমহার্ট (Blumhardt)-এর ক্যাটালগে বাংলাদেশে উয়ায়সীয়া তরীকার সর্বপ্রথম প্রচারক শাহ্ আব্দুর রহিম-রচিত অথর্ব মহম্মদী বেদ (পহেলা জেলেদ), মহম্মদী বেদ (দোছরা জেলেদ), আদিম অজুদ তত্ত্ব প্রভৃতি পুস্তকের উল্লেখ আছে, এগুলি উনিশ শতকেই প্রকাশিত। ব্লুমহার্টের সাপ্লেমেন্টারী ক্যাটালগেও উল্লেখিত হয়েছে বিশ শতকের প্রথম দশকে প্রকাশিত শাহ্ আব্দুর রহিমের বাংলা ‘মছনবী’ (অনেকটা উনিশ শতকের রচনা হলেও বিশ শতকের প্রথমে মুদ্রিত হয়)। শেষোক্ত গ্রন্থ প্রকাশ হলে ফকীর-সমাজে সকলে শাহ্ আব্দুর রহিমকে হিজরী চতুৰ্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ (মুজাদ্দিদ্হাদী চাহার-দাহ্ সাদী) রূপে গ্রহণ করেন। মানিকগঞ্জ মহকুমার ডাকরখালী-কেন্দ্রিক উয়ায়সীদের বিস্তৃতি শুধু মানিকগঞ্জ ও ঢাকা সদর মহকুমাদ্বয়ে নয়, টাংগাইল, জামালপুর, পাবনা, ফরিদপুর, কুমিল্লা, জলপাইগুড়ি (ভারত), রংপুর, দিনাজপুর, দুমকা (ভারত), কুষ্টিয়া পর্যন্ত গিয়েছে। তাঁদের রচিত গ্রন্থাদিতে তাঁদের তরীকার ভূমিকা সম্পর্কে নানাভাবে জেনেই কৌতূহলী হয়ে আমি এসব বিষয়ে লিখিত বহু ইংরেজী-বাংলা গ্রন্থ পড়েছি। সে-সব থেকে প্রথমে এ-তরীকার উদ্ভব সম্পর্কে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য প্রাচ্যবিদদের বক্তব্য পেশ করবো। পরে বাংলাদেশে কোন সূত্রে এই তরীকার আবির্ভাব হয়েছে সেই বিবরণ দাখিল করবো।

 

মিশকাত শরীফ হাদীস সংকলনে উমর ইবনুল খাত্তাবের রওয়ায়েতে দেখা যায়, রসূলুল্লাহ তাদের বলেছেন: ইয়ামনের তরফ থেকে তোমাদের কাছে এক লোক আসবেন, তাকে উয়াইস বলা হয়। তাঁর মায়ের জন্যে তিনি ইয়ামেন ছেড়ে (নবীদর্শনে) আসতে পারেন না। তিনি শ্বেতকুষ্ঠাক্রান্ত ছিলেন এবং আল্লাহর কাছে মুনাজাত করেন; তাতে এক দিনার (বা দিরহাম) পরিমাণ স্থান ব্যতীত সর্বশরীর থেকে তা ভালো হয়ে যায়। তোমাদের কারো সংগে তাঁর মোলাকাত হলে তাঁর মারফত আল্লাহর কাছ থেকে মাফ পাওয়ার সন্ধান করবে।মিশকাতেই উমরের অন্য এক রওয়ায়েতে দেখা যায়, রগুল বলেন, তাবিঈনের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি উয়াইস বলে কথিত। তোমাদের কারো সংগে তাঁর মোলাকাত হলে তোমরা তার মারফত আল্লাহর কাছ থেকে মাফ পাওয়ার সন্ধান করবে।

পরবর্তীকালে এমন ধারা-রীতিতেই মুরশিদপীরের কাছে লোকে মুরীদ বা সন্ধানী রূপে দীক্ষিত হয়ে আসছে। কাজেই, পীরের মুরীদ হওয়ার জন্যে রসূলের এই নির্দেশ থেকেই তরীকাহ্ প্রবর্তিত হয়েছে। তাজকিরাতুল আউলিয়া ফারসী গ্রন্থে হযরত শেখ ফরীদউদ্দীন আত্তার অন্য একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন, কদম বর কদমে উ নেহেদ (তাঁর পদচিহ্নে পা ফেলে চলিও)। একথা দেড়শত বছর পূর্বে আমাদের বাংলার এক কবি জোনাব আলী এই ফারসী তাজকিরাতুল আউলিয়া বাংলা ভাষায় তরজমা করতে গিয়ে এভাবে বলেছেন:

নবী বলে এলাহীর বান্দা এক জোন।

তাহার মরতমা যত না যায় কহন

ওয়েছ বলিয়া নাম-আরেফ আল্লাহ।

তরিকের মোতাবেক চলিবে তাহার

(তাজকেরাতুল আউলিয়া, কবি জোনাব আলি, পৃষ্ঠা-১৫)

জায়েদ বিন আরকাম ও অন্যান্য অনেকেই রেওয়ায়েত করেন, শুনেছেন, বিশ্বনবী তাঁর শেষ হল উদযাপনকালের বিদায় ভাষণে মানুষের আদর্শ হিসাবে মানুষকে আল্লাহর কিতাব ও নবীর আহলে বায়তের নছলকে ধারণ করতে হুকুম করে গেছেন। রসুলুল্লাহ বলেছেন: “অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি তা ধরে থাকলে আমার পরে আর কিছুতেই পথভ্রষ্ট হবে না, এর প্রথমাংশ দ্বিতীয়াংশের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম আল্লাহর কিতাব সে যেন আসমান থেকে জমীন পর্যন্ত টানা রশি, দ্বিতীয় আমার আহলে বায়তের নছল। হাউয-ই-কওসর পর্যন্ত এরা কখনও একে-অপরকে ছাড়বে না। কাজেই বিবেচনা করে দেখো, আমার পরে এদের বিষয়ে কেমন ধারা কার্যক্রম গ্রহণ করবে। (তিরমিজি) এখানে আল্লাহর কিতাব মানবজীবনের তাত্ত্বিক অবলম্বন আর নবীজির আহলে বায়ত ও তাদের নছল মানবজীবনের ব্যবহারিক অবলম্বন।

যাঁরা রসূলুল্লাহ ও তাঁর আহলে বায়তের আদর্শ মজবুত করে ধরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে হযরত খাজা উয়াস করনী সর্বোত্তম। রসূলুল্লাহ তাঁকে তাবিঈনের মধ্যে (অনুসারীদের মধ্যে) সর্বোত্তম বলেছেন, তাঁকে সাইয়িদুৎ তাবিঈন বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে তিনি এমনি একক এক চূড়ান্ত মর্যাদায় ভূষিত হয়েছেন যার তুলনা নাই। হযরত রসুলের মুরাক্কা শরীফ (পবিত্র গাত্রাবরণ) তিনি পেয়েছেন; সেটিকে খিরকা মুবারক বলা হয়। যে খিরকা মুবারক রসূলুল্লাহ মিরাজ-রজনীতে আল্লাহর থেকে খিলাত-স্বরূপ পেয়েছিলেন। তা দিয়েছিলেন হযরত আলীকে। কিন্তু তার অনুরূপে রসূলুল্লাহ নিজ হাতে যেটি প্রস্তুত করেছিলেন, তা-ই দিয়েছিলেন খিলাফতের আগাম সনদ হিসাবে হযরত খাজা উয়াস করনীকে। তা পৌঁছে দিতে যান রসূলের তরফের দূত হিসাবে হযরত উমর এবং রসূলের স্থলবর্তী হিসাবে হযরত আলী।

হযরত উয়াস করনীর তনু মুবারকের মর্যাদা এত উচ্চ দরজার ছিল যে তা শোভিত করার জন্য হযরত রসূল অযাচিতভাবে নিজের দেহাবরণ খিলাত-স্বরূপ পৌঁছাতে দিয়ে যান। নিজ মুবারক মুখে যে তনু মুবারকের বয়ান রসুল যা দিয়েছিলেন তা মিশকাত শরীফের উল্লিখিত হাদীসে, হযরত জালাল উদ্দীন রুমীর মসনবী কবিতায় ও শেখ ফরীদ উদ্দীন আত্তারের তাজকিরাতুল আওলিয়ায় লিপিবদ্ধ দেখা যায়। আমাদের উনিশ শতকের কবি জোনাব আলী তাজকিরাতুল আউলিয়ার সে-বয়ান এই ভাবে কবিতায় তরজমা করেছেন:

আর সেই ওয়েছের সোনোহ খবর

আছে জে বহুতি চুল অঙ্গের উপর।

আর বাঞে পহলু আর হাতেনির পরে

আছে জে ছোফেদি দেরেমের বরাবরে।

কিন্তু সে ছোফেদি নয় আপরছ বিমার

জবে তুমি মোলাকাত পাইবে তাহার।

আমার তরফ হৈতে ছালাম জানাবে

আর এহা আমার তরঙ্গ হৈতে কবে।

খাছ ওক্তে দোন হাত উপরে তুলিয়া

মেরা ওম্মতের কারনেতে করে দোত্তা।

(জোনাব আলী, তাজকেরাতুল আউলিয়া, পৃষ্ঠা ১৫)

হযরত খাজা উয়াস করনীর তরীকাহ্ সম্পর্কে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক প্রাচ্যবিদ পণ্ডিত উল্লেখ করে গেছেন। রসূলের আধ্যাত্মিক জ্ঞান-নগরীর তোরণ-হিসাবে হযরত আলীই যে রসূলের উত্তরাধিকারী এবং একটি মাত্র তরীকাহ্ ব্যতীত প্রায় দু’শো তরীকার সকল তরীকাই যে হযরত আলীকেই তাদের রসূল-নিদিষ্ট মূল ইমাম ও মুরশিদ মনে করেন, তা ইসলামে আধ্যাত্মিকতা বিষয়ের প্রথম গ্রন্থ হযরত শেখ শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর আওয়ারিফুল মায়ারিফ গ্রন্থ থেকে শুরু করে সকল সূফীবাদ-বিষয়ক লেখাতেই উল্লেখ আছে। উনিশ শতকের এক মুজাহিদ কর্মী ও ধর্মীয় বহু গ্রন্থ-প্রণেতা মওলানা কারামত আলী জৌনপুরী তার সিয়ারুল আকতার গ্রন্থে হযরত খাজা উয়াস করনীকে হযরত আলীর ছয় খলীফার অন্যতম বলে উল্লেখ করেছেন। এই কারামত আলীর রফিকুস সালিকীনবাকিয়াতুস সালিহাত গ্রন্থদ্বয়ে একশত বত্রিশটি তরীকার উল্লেখ করতে গিয়ে উরায়সীয়া তরীকাকে সর্বশীর্ষে স্থান দিয়েছেন।

রসূলুল্লাহ উমর ইবনুল খাত্তাবকে যখন বলেন, ‘তোমাদের কারো সঙ্গে উয়ায়সের মুলাকাত হলে তোমরা তার মারফত আল্লাহর কাছ থেকে মাফ পাওয়ার সন্ধান করবে’, তখন উমর যদিও রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন, কিন্তু সেখানে আর যাঁরা ছিলেন তাঁরা রসূলের হুকুম মুতাবেক হযরত উয়ায়সের খিদমতে গিয়ে তাকে কেন্দ্র করে আধ্যাত্মিক সংঘ গঠন করে থাকবেন। এ-কথা অন্যদের মধ্যেও তাঁরা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তখন তাঁরাও আধ্যাত্মিক সংঘ গঠনে তাঁর হুজুরে গিয়েছেন।

তবে রসূলের ওফাতের এগারো বছর পর যখন উমর ও আলীর হাতে রসুল-প্রেরিত খিরকা মুবারক পেয়ে খাজা উয়াস কুফায় চলে যান এবং সেখানে ১২ বছর ফোরাত তীরের ঝুপড়িতে অবস্থান করার পর যখন হযরত আলী বসরা অবরোধকারী বিধবা নবীপত্নী আয়েশা, তালহা ও জোবায়েরের বিদ্রোহ দমন (৪ঠা ডিসেম্বর ৬৫৬ খ্রী.) করার পূর্বে কুফায় মুজাহিদ ধর্মযোদ্ধা সংগ্রহে আস-সাআলাবীয়া নামক মঞ্জিলে উপস্থিত হন, সেখানে খাজা উয়াস জীকার নামক ময়দানে হযরত আলীর তাঁবুতে এসে হযরত আলীর হাতে বাইয়াতে দাখিল হন। অতঃপর জোরে শোরে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের বিস্তার-সাধনে বদ্ধ-পরিকর হন। এমন কি ৬৫৭ খৃস্টাব্দে যখন হযরত উয়াস করনী আমীর মুয়াবীয়ার বিরুদ্ধে হযরত আলীর সিফফীন যুদ্ধের অন্যতম নায়করূপে সহযোগিতা করতে যান, তখন তার মুরীদান থেকে তিনশত মুজাহিদ তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন।

যিনি ১২ বছর আগে তালিম লাভের সনদ রসূলুল্লাহ থেকে পেয়েছেন, খিরকা প্রাপ্তিসূত্রে রসূলের খলীফাও হয়ে রয়েছেন, তিনি তাঁর বাইয়াত-সূত্রে রসুলের জ্ঞান-নগরীর তোরণের কাছেও খলীফা হয়ে গেলেন। তাই বাংলা জবানের এক কবি শাহ আব্দুল কাদের লিখেছেন: ‘পাইয়া নবির খিরকা খলীফা নবির। ছিলেন আলীর সঙ্গে খলিফা আলীর।।’

লেফটেন্যান্ট কর্নেল ডব্লিউ উইলবার ফোর্স ক্লেয়ার্ক (Lt. Col. W. Wilder Force Clarke) তার দীউয়ান-ই-হাফিজের ইংরেজী তরজমার ভূমিকায় লিখেছিলেন, In 657 A.D. Uwais-i-Karani (d.657) established the first religious order of the greatest austerity. (৬৫৭ খ্রিস্টাব্দে উয়াস-ই-করনী প্রথম তরীকার প্রবর্তন করেন)। এম. ডি. ওহসন (M. D’Ohsson) তাঁর ওসমানী সাম্রাজ্য (Ottoman Empire) গ্রন্থে আর বিখ্যাত রেভারেন্ড ই. সেল বি. ডি. এম. এ. আর. এস. তাঁর ইসলাম সম্পর্কীয় প্রবন্ধাবলীতে ‘Essays on Islam’ নামক গ্রন্থের ‘ইসলামের ধর্মীয় তরীকাবলী’ (Religious Orders of Islam) নামক প্রবন্ধে প্রায় একইরূপ উক্তি করেছেন। উয়ায়সীয়া তরীকা সম্পর্কে রেভারেন্ড সেল লিখেছেন:

In the thirty seventh year of the Hijra, a recluse named Uwaisul Karani announced that Gabriel had appeared to him in a dream and revealed to him the Constitution of an order to be started on strictly ascetic principles. Uwais carried his weneration for the prophet so far as to extract his teeth because Muhammad had lost two at the battle of ohud… The prophet had a great regard for Uwais and commanded that his own mantle of the Darwish Orders are made after the fashion of this Kherka-i-sharif. This order known as Uwaisiyah has not spread beyond Arabia.

এই একইরূপ কথা প্রাচ্যবিদ M. D’Ohsson হযরত উয়াস সম্পর্কে লিখেছেন। তাজকিরাতুল আউলিয়ার তরজমায় আমাদের কবি জোনাব আলীও লিখেছেন:

নবিছাহেবের জবে শোন সে বচন।
মওত নজদিগ আসি পৌছিল জখন ।।
ছাহাবারা আরজ করিল সে সোমায়।
তোমার লেবাছ মোরা দেলাবো কাহায় ।।
হজরত বলিল মেরা অঙ্গের বসন ।।
ওয়েছ করোনীর তরে করিবে অর্পণ ।।

(জোনাব আলীকৃত ‘তাজকেরাতুল আউলিয়া’, পৃ. ১৫-১৬)

অন্য এক কবি শাহ আবদুল কাদের তাঁর মৌলিক ‘মস্তানী বচন’ কাব্যে লিখেছেন:

উত্তর দিলেন নবি নিজ বিবি গনে।।
রেখেছে বুজুর্গ লোক যে হাদিছ মনে ।।
নাহি হবে আছহাব আয়েছ আমার।
থাকিবেক তাবাইন ইরাদা আল্লার ।।
উম্মত কারণে মেরা, অয়েছ কারনী

মাংগিবেক দোওয়া যাহা বেশক তখনি।।
কবুল হইবে তাহা আল্লার দরগায়।
খিলাফতে খিরকা আমি দিয়া যাব তায় ।।

(শাহ আব্দুল কাদের কৃত ‘মস্তানী বচন’, পৃ. ১৩)

হযরত রসূলের শ্রদ্ধানুরক্তির নিশানা-স্বরূপ হযরত উয়াস করনীকে তিনি নিজ দেহের খিরকা মুবারক (মুরাক্কা শরীফ) পাঠিয়ে গিয়েছিলেন এবং যে খিরকা খলীফা উমর বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তা মুসলিম জাহানের সর্বত্রই সুবিদিত আছে। কিন্তু এইরূপ খিরকা প্রদান করেই যে খিলাফতের সনদ-খাজা উয়াসকে এনায়েত করা হয় সে-কথা অনেকে খেয়াল করে না বলেই রেভারেন্ড সেল সে-কথা ইংগিতে উল্লেখ করে গেছেন। অবশ্য এই খিরকা পৌঁছানো হয় হযরত আবু বকরের রাজত্ব পার হয়েও হযরত উমরের রাজত্বের শেষ বছরে রসূলের ওফাতের এগারো বছর পর।

১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত চেষ্টা করে উয়ায়সীদের ভিতর প্রবেশ করে বুঝেছি, এঁরা এমন কঠোর গোপনীয়তা ও আদব-কায়দার শৃংখলা মেনে চলেন যে এর প্রচার খুব গোপনেই বয়ে আছে। যদিও একটি বিষয় জারী থাকলে তা বিস্তার পাবেই। তথাপি খুবই কঠোর শৃংখলার সংগে এই তরীকাহ্ বিস্তৃত হয়েছে। আমি হযরত শাহ আতাউল হক (জন্ম ১৯০১) নামক বিংশ শতাব্দীর এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ উয়ায়সী ওলী-আল্লাহকে তাঁদের এত কঠোর গোপনীয়তার কারণ জিজ্ঞাসা করলে শাহ সাহেব এক সুন্দর সম্ভ্রমাত্মক সুশোভন জওয়াব দেন, “গোপনের প্রেম বড় মধুর!”

কাজেই, রসূলুল্লাহর নিজের ইশারায় প্রবর্তিত এই উয়ায়সীয়া তরীকাহ্ যতটা জানাজানি হওয়ার কথা ছিল, ততটা হয়নি। এমন কি ফিরিস্তা জিবরীল কর্তৃক খোয়াবে এর সংবিধান নাজিল হয়েছে শুনে কেউ কেউ মনে করেছেন, এ-তরীকাহ্ স্বপ্নে পাওয়া যায়। এঁদের এত গোপনীয়তার জন্যে এঁদের সম্পর্কে লোকে নানা উদ্ভট ধারণা করে থাকে। স্বপ্নে নাজির হয়েছে এমন কিছুর পক্ষে তরীকাহ্ নামে চলা সম্ভব হতে পারে না। উয়ায়সীয়া তরীকাহ্ ত নয়ই, ‘আমি জ্ঞানের মহানগরী ও আলী তার তোরণ’- রসূলুল্লাহর এই কথা থেকে ‘ইলমি-মারিফত’ যে আলী ছাড়া আর কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়, এমন কি এর মূল উৎস রসূলুল্লাহ্ যাঁকে নিজেই খিলাফতের সনদ দিয়ে গেছেন, সেই উয়াস করনীও ঐ কথার তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন বলে মামুলী বাইয়াত হযরত আলীর হাতেই কবুল করেছেন তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ইসলামী মারিফাতের যাঁরা খবর রাখেন তাঁরা সেরূপ সকলেই লিখেছেন, এমন কি মুহম্মদ এনামুল হকও লিখেছেন। হযরত আলীর হাতে বাইয়াত কবুল তিনি করেছিলেন- ৬৫৬ সনের নভেম্বর মাসের শেষ-ভাগে যখন হযরত আলী কূফার নিকটস্থ আস্সালাবীয়া নামক মঞ্জিল-পাশের জীকার নামক ময়দানে তাঁবু করে মুজাহিদ সংগ্রহে হযরত ইমাম হাসান ও সাহাবী হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে কুফায় পাঠিয়েছিলেন বিবি আয়শার পরিচালনায় গঠিত বসরা-অবরোধকারী বিদ্রোহী-বাহিনীকে হটিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে।[1] খাজা উয়াস ফোরাত নদী-তীরস্ব তাঁর ঝুপড়ি থেকে বেরিয়ে এসে হযরত আলীর হাতে বাইয়াত হন এবং তাঁর তরীকাহ্ বিশেষ মনোযোগের সংগে প্রচার করতে থাকেন, এমন কি আমীর মুয়াবীয়ার বিরুদ্ধে হযরত আলীর সংগে তিনি যখন সিফফিনের জিহাদে অবতীর্ন হন তখন তাঁর মুরীদান থেকে তিনি তিনশত মুজাহিদ নিয়ে গিয়েছিলেন। এই সিফফিনের যুদ্ধেই ৩৮ হিজরীর ৯ই সফর শুক্রবারের (আগের) রাত্রে নৈশ সমরে তিনি শাহাদত বরণ করেন।[2]

একে ত রসূলুল্লাহ যাঁকে তাঁর ইলমে মারিফতের দরোজারূপে উল্লেখ করেছেন, তিনিই বিলায়েত দানের মালিক হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রশাসন ক্ষমতায় প্রথম থেকে অধিষ্ঠিত হননি বলে আধ্যাত্মিকতার দিকে লোকের নজর পড়েনি; তদুপরি হযরত আলীর প্রধান খলীফা হযরত উয়াস করনী এমন নিঃসংগ ও চিন্তামগ্ন জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহর নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে যদিও তাঁর জীবনের দেড়শত বৎসর কেটে গেছে বলে শোনা যায়, তথাপি হযরত রসূলুল্লাহর মুখেই মাত্র তাঁর গুরুত্বের কথা প্রথম উল্লেখ হয় বলে লোকে তাঁর কাছে জমতে থাকে মাত্র সেই সমর থেকে এবং সে-জন্যে তিনি যে সমাজ-সভ্যতার উদ্দেশ্যে আধ্যাত্মিক চিন্তায় মগ্ন থেকে যাচ্ছিলেন সে-সব বিশেষ কেউ টের পায়নি। কেমন করে তাঁর তরীকাহ্ অত বিস্তার পাবে? সমাজ-সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর চিন্তা-ভাবনা কত গভীর ও অকাট্য ছিল মাত্র দুটি বিষয়ে তা টের পাওয়া যায়।

১. হযরত উমরের যে-দিন ইন্তেকাল হয়, ঘটনাক্রমে যেদিন হযরত হরম ইবনে হিয়ানের সঙ্গে হযরত খাজা উয়াস করনীর কুফায় মুলাকাত হয়।

তা বাদে হরম কহে বোলে দেহ তাই

বসবাস এক্তিয়ার করি কোন ঠাই

ওয়েছ করানি বলিলেন এ জেকের।।

কেয়াম কহর গিয়া মুল্লুকে শামের

(জোনাব আলীর ‘তাজকেরাতুল আওলিয়া’)

তখন শামের (সিরীয়ার) মুল্লুকে খলীফা উমরের গভর্নর মুয়াবীয়া লোককে আধ্যাত্মিকতার গুরুত্ব উপলব্ধির দিক থেকে বিভ্রান্ত করে মানুষের উৎকর্ষের চিন্তা ফেলে মানুষকে অপকর্মের ও যবঃপতনের দিকে প্ররোচনা প্রয়োগ করছিল। কাজেই, লোককে হক-পথে রাখার জন্যে খাজা উয়াস হযরত হরমকে সেখানে যেতে বলেছিলেন। বেশ বোঝা যাচ্ছে, লোককে অধঃপাতে দেওয়ার জন্যে যে কুটনীতির প্রচলন হয়েছিল, তাঁর সমসাময়িক সে-সব বিষয়ে তিনি বিশেষ দৃষ্টিভংগী পোষণ করতেন। তিনি শুধু ‘আল্লাহ আল্লাহ’ করেন নাই; শয়তানী দূর করার চেষ্টাও করেছেন।

২. তাঁর আম্মা সাহেবানী যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন তিনি তাঁর একান্ত খেদমতে সংসার-জীবন ভালোভাবেই যাপন করেছেন, এত সংসারী, যে-জন্যে রসূলের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে পারেননি:

হযরত বলিল দুই ছবব হইতে।।

সে জন্যে না আইলো আমার মোলাকাতে

এক তো গালবার জোশে হুজুরি লজ্জতে

হামেহাল গরক হইয়া আছে তাথে

দোছরা জইফ বড়া মাতারি তাহার।

দু চক্ষের কানা সে মোমেনা দিনদার

মেরা শরিয়েতের জে লেহাজ হইতে

বুড়া মাতারির তর রহেন খেদমতে

(জোনাব আলী কৃত ‘তাজকেরাতুল আওলিয়া’, পৃ. ১৫)

কিন্তু হযরত রসূলের ওফাতের পর তাঁর আম্মার ইন্তেকাল ঘটলে তিনি প্রায় ২৩ বছর এমন উদ্ভ্রান্তভাবে জীবন-যাপন করেন যে লোকে তাঁকে উদাসীন মনে করত। অথচ যাঁরা তাকে চিনতেন তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে মুসলমানের পররাজ্য লোভ তাঁর মোটেই ভালো লাগে নাই।

মানুষের খুশীতে না খোঁশ তার মন।।

জবে লোগ হাসে সেই করেন রোদন

আরজবে কান্দে কেহ হাসেন তখন ।।

এই সব কথা কুফি বলিল জখন

(প্রাগুক্ত, পৃ. ১৬)

অথচ বিদ্রোহী মুয়াবীয়ার বিরুদ্ধে, তিনি প্রায় দুইশত বৎসর বয়স্ক বৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও নিজ মুরশিদের তরফ হতে লড়ে শহীদ হয়েছেন। রাজ্য নিয়ে যুদ্ধের চাইতে ভয়াবহ সংসারী জীবন আর কি হতে পারে? সে-যুদ্ধে তিনি যোগদান করে শাহাদাত বরণ করেছেন। সে জীবন-দানও একই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে-মানুষকে জালিমদের হাত থেকে দার্শনিক বাদশা (Philosopher king)-র হাতে এনে মানুষের উৎকর্ষের পথ খোলাসা করতে।

হযরত খাজা উয়াস করনীকে রসূলুল্লাহ যে-ভাবে খিলাফতের সনদী খিরকা দিয়েছিলেন, আসল তরীকাহ্গুলিতে পীরগণ এখনো তেমন রীতিতে তাঁদের খলীফাকে খিরকা দিয়ে থাকেন। তথাপি যে-কাল থেকে একাল পর্যন্ত সমাজকে এমনি অন্ধ করে রাখা হয়েছে যে মুসলমানেরা কখনো সেই সব লোকের প্রতি তেমন গুরুত্ব দেয় নাই যাঁদের প্রতি তাদের নবী স্বয়ং বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

জোহন এ. সুবহান তাঁর ‘sufism’ গ্রন্থে লিখেছেন:

Uwaisu’l Qarani… was a contemporary of Muhammad but was prevented from seeing him chiefly because of his high sense of duty to his own mother and also owing to the fact that he was subject to states of ecstacy which periodically over mastered him. He is said to have received instruction in a mysterious way from the spirit of Muhammad.

এ-যুগের উয়ায়সী সাধক ও চিন্তাবিদ হযরত শাহ আতাউল হক আমাদের কাছে বলেছেন, “এখন এই তালিম রসূলের রুহ্ থেকে তাঁর পাওয়ার ব্যাপার আর খুব রহস্যময় নাই। কারণ টেলিভিশন দেখে বুঝা। যাচ্ছে, তাঁর হাতে যে সাদা দাগটি ছিল (কেউ কেউ বলেছেন, মুসা (আ.) বগল-তলায় হাত দিয়ে বের করে আনলে যেমন তাঁর হাত সূর্যপ্রভ উজ্জ্বল দেখা যেত, উরায়সের হাতও তেমনি উজ্জ্বল ছিল) সেই হাতই টেলিভিশনের রিসিভার-রূপে মূল বক্তা রসুলকে এনে যে-কোন উপায়ে সেখান থেকেই নসীহত শোনা হত।”

রসূলের সংগে ঐতিহাসিকভাবে তাঁর দেখা হয়নি। অথচ রসুল তাঁকে না দেখলেও তিনি যে রসূলের চেহারা চিনতেন তা উমর যখন ‘রসূলের ভ্রূ-যুগল যুক্ত ছিল নাকি বিযুক্ত ছিল’ তার জওয়াব দিতে পারলেন না, তখন খাজা উয়াস তা নির্ভুল বলে দিয়েছিলেন দেখে বুঝা যায়। রসূলের মুখাবয়ব সম্পর্কে হযরত আলী ও অন্যান্য দু’একজনের যে রেওয়ায়েত হাদীসে পাওয়া যায়, সেখান থেকে তা স্পষ্ট জানা যায়। অথচ এখনকার আরবী-বিদ্বানেরা হযরত আলীকে জড়িয়ে নিয়ে বলেছেন-‘হযরত উয়াস করনী যখন রসূলের ভ্রূ-যুগল যুক্ত ছিল নাকি বিযুক্ত ছিল’ প্রশ্ন করেন তখন তাহারা কেহই (উমর ও আলী) তার জওয়াব দিতে পারলেন না।’ রসূলের ওফাতের ১১ বছর পরে যদি হযরত আলী তা না পেরে থাকেন, তবে হাদীসে হযরতের চেহারা-ব্যাপারে তার রেওয়ায়েত আসে কেমন করে?

আমাদের বহু পুথিকার কবি জোনাব আলী আরবী-বিদ্বানদের চেয়ে বিশ্বস্ত তরজমা দিয়েছেন:

বসিয়া জে আলী শাহা চুপ হয়ে রয়।।

হযরত ওম্মর ওয়েছেরে এহা কয়

কহে তুমি নবী ছাহেবেরে না দেখিলে।

বলিলেন ওয়েছ, তুমি ত দেখেছিলে

ওম্মর কহেন আমি নবী ছাহেবের।

হামেহাল রহিতুন খেদমতে হাজের

ওয়েছ কারনী বলে ওম্মর খাতির।

সায়েদ দেখেছ জোব্বা করো তা জাহির

জদি তুমি দেখিয়াছ নবী ছাহেবেরে।

তবে জাহা পুছী তা বাতাও মোর তরে

ছিল কী না ছিল ভুঙা মেলা হত্তা তার।

সে কথা আমার আগে করোনা প্রচার

কোন ছববেতে তাহা হজরত ওম্মর।

বাতাইতে না পারিল তাহার খবর

ওয়েছ কারনী তবে লাগিল বলিতে।

কহিতেছ ছিনু আমি নবীর খেদমতে

কিন্তু কেরছা ছিল নবী বলিতে নারিলে।

তবে নবী ছাহেবের তরে কি দেখিলে

ওম্মর কহেন তুমি চোখে না দেখিয়া।

একিন করিলে খালী কানেতে শুনিয়া

ওয়েছ কহিল না দেখিনু জাহেরায়।

কিন্তু বাতুনীতে দেখিলাম মোস্তফায়।।

মোট কথা, হযরত উয়াস করনী ইসলামের ইতিহাসের বিস্ময়কর এক চরিত্র। তিনি খিরকা প্রাপ্তি-মারফত রসূলের খলীফা হয়েছেন, আর বাইয়াত-মারফত হযরত আলীর খলীফা হয়েছেন:

পাইয়া নবীর খিরকা খলিফা নবীর।

ছিলেন আলীর সংগে খলিফা আলীর।

[শাহ আবদুল কাদের রচিত ‘মস্তানী বচন’]

 

মোবিন উদ্দিন আহমদ জাহাংগীর নগরী ‘মেফতাহুল ফোরকান’ নামক বাংলা ভাষার লিখিত এক সুবৃহৎ ইসলামের ইতিহাস গ্রন্থে (চার খণ্ডে বিভক্ত) খাজা উয়াস করনী সম্পর্কে লিখেছেন:

“ছফীকুল-শ্রেষ্ঠ হযরত আবেজ কারনী নবী করীমের একজন আশেক-প্রেমিক ছিলেন। তিনি চলৎশক্তিরহিত বৃদ্ধ মাতার শুশ্রুষায় নিয়োজিত থাকায় নবী করীমের খেদমতে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ পান নাই, কিন্তু প্রেমবলে তিনি নবী করিমের অধ্যাত্য সান্নিধ্য ও সংগ হইতে দূরে ছিলেন না। নবী করীম ওফাতের সময় তাঁহাকে ভালোবাসার নিদর্শন-স্বরূপ একটি খেরকা প্রদান করিয়াছিলেন। হজরত ওমরের খেলাফতের সময় হজরত ওমর ও হজরত আলী তাঁহার নিকট গমন করিয়া তাহাকে এই খেরকা প্রদান করেন। সাধুবর আবেজ ‘রুহানী ফায়েজ’ স্বয়ং নবী করীম হইতে লাভ করিয়াছিলেন। কিন্তু হজরত আলীর নিকট জাহেরী বায়েৎ গ্রহণ করেন। ওহোদ-যুদ্ধে রছুলোল্লার দন্ত উৎপাটিত হওয়ায় তিনি তাঁহার সমগ্র দন্ত উৎপাটিত করিয়াছিলেন। হজরত আবেজ ছিফফীনের যুদ্ধে খলিফার পক্ষে যোগ দিয়া শহীদ হন।”

বাংলা ১৩৩৪ সনে বহুগ্রন্থ প্রণেতা সুবর্ণ মেডেল প্রাপ্ত খোন্দকার গোলাম রছুল কর্তৃক (জোবেদী লাইব্রেরী, পোস্ট-জুনিয়াদহ, জেলা নদীয়া) ‘এশকে ছাদেকী’ নামে সংগৃহীত এক পুথিতে রয়েছে:

হপ্তগোরোর বয়ান

১. পহেলা যে গোরো বছরিয়া বলে যারে।

খাজে হাছেন বছরি হইতে জারি জারে।।

২. দোছরা যে গোরো ওয়াশীয়া জারে কয়।

খাজে ওয়েশ কোরনী হইতে জারি তার ।।

(পৃষ্ঠা-১৮)

এই পুথির আগে দুই পৃষ্ঠায় খিরকা কেমন করে রসূলুল্লাহকে আল্লাহ বকশিল, তা রসূলুল্লাহ কেমন করে ইয়ারগনের সামনে হাজির করলেন; তাঁদের মধ্যে হযরত মুরতজা আলীই মাত্র তা পেলেন, সে-সব বয়ান তিনি দিয়েছেন। মনে হয় বিখ্যাত ফারসী কবি মোল্লা নুরুদ্দীন আবদুর রহমান জামী তাঁর ‘শওয়াহেদুন্নবুয়ত’ গ্রন্থে যেরূপ খিরকা-প্রসংগে বয়ান দিয়েছেন সেই থেকে এই গোলাম রছুলও নিয়েছেন। আল্লাহর তরফ থেকে মিরাজে রসূলুল্লাহ যে-খিরকা পেয়েছিলেন, তা সমান চার ভাগে ভাগ করে চার ইয়ার (আবুবকর, উমর, উসমান, আলী)-কে চার খণ্ড দিয়েছিলেন; যত্ন করে রাখতে বলেছিলেন। কিছুদিন পর আবার তা তাঁদের হাজির করতে বলেন। প্রথম তিনজন নিজ গৃহে খুঁজে তা পাননি। একমাত্র হযরত আলীই হাজির করতে পেরেছিলেন। হযরত আলীর প্রদত্ত অংশ খুলে দেখা গেল, তা চারটি একত্রিত খণ্ড অর্থাৎ পুরা খিরকা-খানাই। তখন রসূলুল্লাহ হযরত আলীকেই আল্লাহ-প্রদত্ত থিরকা এনায়েত করেন। এর আদলে অন্য যেটি তৈরী করে রসূল পরিধান করতেন, তা অবশেষে হবরত খাজা উয়াস করনীর ভাগ্যে জোটে। এ-ভাবেই নানা দিক থেকে দেখা যায়, আধ্যাত্মিক সাধনার ধারা সংঘ-সংগঠন-ক্রমে সর্বপ্রথম হযরত খাজা উয়াস করনীই প্রবর্তন করেন। সে-বিষয়ে হযরত নবী করীম ও হযরত আলী উভর থেকেই তাঁর সনদ ও হুকুম প্রাপ্তি ঘটেছিল।

বহছরিয়া গোরোর প্রবর্তনা খাজা হাসান বসরী কর্তৃক ও উয়ায়ছিয়া গোরো হযরত খাজা উয়াস করনী কর্তৃক প্রবর্তিত হয়। উভয়ই হযরত আলীর খলীফা ছিলেন। শাহ আবদুল কাদের লিখেছেন:

হাছান বাসরী আর অয়েছ কারনী।

দুই পির হতে সব খান্দান রওশনী।।

আউয়াল আখেরে খোদা এহি দুই ভেদ।

হাছান বাসরী হন ইহার মুরশেদ ।।

আউয়াল আখেরে আর জাহের বাতেনী।

চারিভেদে খুরশেদ অয়েছ কারনী ।।

(মস্তানী বছন, পৃ. ১৫)

আল্লার চার গুণের কথা কুরআন-পাকে উল্লেখ আছে: আউয়াল আখের জাহের বাতেন (আদি অন্ত প্রকাশ গোপন)। এর প্রথম দুই গুণের রহস্য হযরত খাজা হাছান বসরী মারফত প্রচার আছে। পুরোপুরি চার গুণের রহস্য হযরত খাজা উয়াস করনী মারফত প্রচার হয়েছে। উয়ায়সীগণ নিজেদের ফকীর বলে পরিচয় দেন; সূফী বলে পরিচয় দিতে শরম বোধ করেন।এখানে ফকীরী ও সূফী-গিরী বিষয়ে কিছু বলা দরকার মনে করি। কেউ কেউ নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে বিশ্বে  সর্বশ্রেষ্ঠ গীতি-কবি বলে পরিচিত পারস্যের বুলবুল হযরত শামসুদ্দীন মুহম্মদ হাফিজ শীরাজী, উমর খৈয়াম প্রমুখ আধ্যাত্মিক চিন্তা-জগতের মধ্যযুগীয় কবিগণ সূফী শব্দ-উল্লেখে ধর্মের বহিরাবরণধারী লোকদের প্রতি বিদ্রূপাত্মক উক্তি করেছেন। দেখি এখানে উয়ায়সীগণও নিজেদের সূফী বলতে নারাজ। তাঁরা নিজেদের ফকীর বলে পরিচয় দেন।

এ-বিষয়ে তাঁদের অভিমত ও দৃষ্টিভংগী রয়েছে। রসূলুল্লাহ শুধু “দারিদ্র্য আমার গৌরব” বলেই ক্ষান্ত হন নাই, তিনি আল্লাহর কাছে সনির্বন্ধ প্রার্থনা করতেন, ‘হে আমাদের আল্লাহ, তুমি ইহকালে আমাকে গরীবদের সংগে রেখো, পরকালেও গরীবদের সংগে তুলো এবং গরীবদের সংগেই আমার বিচার করো।’ এতেই বোধ হয় বিত্তবানেরা তাঁর প্রবর্তিত ধর্মের ভিত্তি-গত নীতি নির্মূল করতে ষড়যন্ত্র পাকিয়েছিল; তার ইঙ্গিত আল্লাহ বহুবার দিয়েছেন।[3]

হযরত আবু বকর সম্পর্কে রসূল বলেছেন, ‘আবু বকরের সম্পদের মত আর কারো সম্পদ আমার এত উপকারে আসেনি। আমি যদি কাউকে বন্ধু হিসাবে কবুল করতাম, তবে আবু বকরকে করতাম। কিন্তু তোমাদের এই সংগী (রসূল) ত আল্লাহরই বন্ধু।’ কিন্তু অন্যস্থলে রসূলুল্লাহ বলেন, ‘বরকতময় ও মহাগৌরবময় আল্লাহ আমাকে চার ব্যক্তির উপর ভালোবাসা পোষণ করতে হুকুম করেছেন এবং আল্লাহ আমাকে জানিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহ নিজেও এই চার ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, তারা আলী, আবু জর, আল-মিকদাদ, সালমান।’ ভাগ্যগুণে এরা চারজনই ছিলেন নিঃস্ব।

আবু আবদুল্লাহ মগরিবী নামক ওলী আল্লাহর কথানুসারে ফকীর চরিত্র সম্পর্কে প্রফেসর ড. আম্নেমেরী শিম্মেল লিখেছেন, they possess every thing but they are not possessed by any thing. [তাঁদের আয়ত্তে (অধিকারে) সবই আছে কিন্তু তারা কারো আয়ত্তাধীন (অধিকৃত) নন।] রসূলের গৌরব করবার বিষয় এই ফকর থেকেই ফকীর শব্দ নিষ্পন্ন। ফকীরদের ধারণা:

আউয়ালে ফকীর আল্লাহ নাহি তাঁর হদ।

দোওমে ফকীর যিনি নবী মহম্মদ।।

ছোওমে ফকীর জানো আদম ছফীউল্লাহ।

চাহারমে ফকীর জানো আলী করিমুল্লাহ।।

(কাজী শাহ হেয়াত মামুদ, ‘মধ্যযুগের এক বাংলা কলমী পুথি’)

প্রথম ফকীর আল্লাহর অধিকারে সবই আছে কিন্তু আল্লাহ কোন কিছুর অধিকৃত নয়। তৃতীয় ফকীর হযরত আদম দুনিয়ার সবই পেয়েছিলেন, কিন্তু বেহেশতের চিত্র এত জাজ্বল্যমান মনে ছিল যে দুনিয়ায় কিছুই তার মন কেড়ে নিতে পারত না। তাই তাঁর দ্বারা নিঃস্বার্থভাবে মানব-সভ্যতার পত্তন। দ্বিতীয় ও চতুর্থ ফকীর মুহম্মদ ও আলী সম্পর্কে রসূলুল্লাহ নিজেই তার কন্য। হযরত ফাতিমা জাহরাকে এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন, “দ্যাখো, ফাতিমা, তোমার আব্বার (মুহাদ নিজে) ও তোমার স্বামীর (আলী) সামনে দুনিয়ার তামাম মালমাত্তা হাজির করে দেওয়া হয়েছিল, তারা তা নেওয়ার যোগ্য মনে করেন নাই।”

এ-ভাবেই দেখা যায়, চার ফকীরেরই স্বভাব এক। তবে হযরত আলী থেকেই ফকীরের আধ্যাত্মিক বংশানুক্রম বা সিলসিলা।

ফকরের বুনিয়াদ আলী মোরতজায়।।

ফকিরের বাদশা আলি জানেন সবায়

(শাহ আবদুর রহিম, ‘মহম্মদী বেদ’ (পহেলা জেলেদ), পৃ. ২০)

 

হযরত আলীর যে সিলসিলা হযরত খাজা উয়াস করনী মারফত জারী হয়েছে তাই উয়ায়সীয়া তরীকাহ্ নামে খ্যাত হয়েছে।

হযরত খাজা উয়াস করনী যখন সিফফীন ময়দানে লড়াই করে শাহাদত বরণ করেন, তখন তাঁর অধীনে মুজাহিদ দলে তাঁর দু’জন খলীফা ছিলেন, খাজা হিছাম উদ্দীন ইয়ামনী ও জালালউদ্দীন গুরগানী। খাজা হিছাম উদ্দীন বোধ হয় ইয়ামেনেই হযরত উয়ায়সের খেদমতে দাখিল হয়েছিলেন। এই দু’জনের মারফত উয়ায়সীয়া তরীকাহ্ বিস্তার পেতে থাকে।

আউলিয়া-কাহিনী পড়লে দেখা যায়, একমাত্র উয়ায়সীয়া তরীকাহ্ সংশ্লিষ্ট দু’এক তরীকাহ্ ব্যতীত আর সকল তরীকারই উৎস-মূল হযরত হাসান বসরী। অথচ হযরত হাসান বসয়ী ও হযরত রাবিয়া বসরী নাম্নী সু-বিখ্যাত মহিলা দরবেশের কথোপকথন পড়লে মনে হয় যেন হযরত রাবিয়া হযরত হাসানের পীর। কিন্তু যেহেতু ইসলামে নারীর ইমামত নাই, সেহেতু রাবিয়া হাসানের পীর হতে পারেন না। হাসান যদি তার পীর হতেন, তবে রাবিয়ার মত উচ্চস্তরের ওলী-আল্লাহর পক্ষে পীরের সঙ্গে বেআদবী সম্ভব নয়। হযরত হাসান হবরত রাবিয়ার পীর নন।

তরীকাবলীর উৎস-বুল হযরত হাসান বসরী যখন রাবিয়ার পীর নন, অর্থাৎ তিনি বসরীয়া খান্দানে দাখিল নন, তবে তিনি কোন খান্দানের? এ-প্রশ্ন আমরা তুলেছিলাম প্রায় ৪০ বছর আগে সুপ্রসিদ্ধ বানিয়ারা (টাংগাইল) গ্রামের অধ্যাত্ম-বিষয়ে জ্ঞানী খন্দকার জিল্লুর রহমান মরহুমের কাছে। তিনি অবলীলা-ক্রমে জওয়াব দিলেন: ‘রাবিয়া ছিলেন উয়ায়সীয়া তরীকাহ্-ভুক্তা।’ এ-কথার পরই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, ‘উয়ারসীয়া বলে কোনো তরীকাহ্ আছে?’ খন্দকার মরহুম বিস্মিত হয়ে বলেন,

‘বললেন কি! যাঁকে খোদ রসূলুল্লাহ এই পথের খিলাফতী সনদ-সূচক খিরকা মুবারক পাঠিয়ে দিয়েছেন, তাঁর নামে তরীকাহ্ না হলে তরীকাহ্ বলে ঐতিহাসিকভাবে কিছু কি দাঁড় করান যাবে?’

আমরা তাঁর কথায় লা-জওয়াব হয়ে গেলাম। কিন্তু উয়ায়সীরা কারামত ও প্রদর্শনীর পক্ষপাতী নন। বহু-বৎসর যাবৎ এক ব্যক্তি কাফন পরে খোলা কবরে অবস্থান করছে শুনে খাজা উয়াস তার কাছে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তাকে লক্ষ্য করলেন। লোকটি ফ্যাকাশে ও শীর্ণ হয়ে গেছে। হযরত খাজা বললেন, ‘হে লোক। এই কবর আর কাফন তোমার ও আল্লাহর মধ্যে দুর্লংঘ্য বাধার সৃষ্টি করেছে।’ এ-কথার তাৎপর্য সে-লোকটি ধরতে পারল এবং এমন এক চীৎকার দিল যাতে তার জান বেরিয়ে গেল।

হযরত রাবিয়ার কাছে একজন এসে বলল, ‘অমুক যে পানির উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারে। তমুক-কে উড়ে যেতে দেখা গেছে।’ হযরত রাবিয়া বলেন, ‘হ্যাঁ। মাছত তার চাইতেও সুকৌশলে পানির উপর দিয়ে যেতে পারে, পাখী ওর চাইতেও সুকৌশলে উড়তে পারে। তারা কিন্তু আল্লাহ-পথের ফকীর নয়।’

আবুল ফজল আল্লামী বাদশাহ আকবরের কালে এই উপমহাদেশের উয়ায়সীদের সম্পর্কে যে ওয়াকিফ-হাল ছিলেন তার পরিচয় তাঁর বিরাট ঐতিহাসিক গ্রন্থদ্বয়ে রয়েছে। আবুল কাসিম গুরগানীর মুরীদ হিসাবে কেউ কেউ হয়ত আলী আল হুজবীরী দাতা গঞ্জবকশ লাহোরীকে এই উপমহাদেশের প্রথম উয়ায়সী পীর মনে করেন। তিনি ১০৬৩ বা ১০৭১ সালে ইন্তেকাল করেন।

ইরানের বুলবুল, বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ গীতি-কবি বলে জার্মান কবি গ্যেটে কর্তৃক নন্দিত, শামসুদ্দীন মুহম্মদ হাফিজ শিরাজী এই উয়ায়সীয়া তরিকাহ্-ভুক্ত ছিলেন এবং শেখ কিওয়ামুদ্দিন আবদুল্লাহ তাঁর পীর ছিলেন বলে তাঁর সমসাময়িক ব্যাপক ভ্রমণকারী ওলী-আল্লাহ সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী তাঁর জীবন-বৃত্তান্ত ‘লাতায়িফ-ই-আশরাফীয়া’ গ্রন্থে লিখেছেন। এই কবি হাফিজ উয়ায়সীকে সুলতান গীয়াসুদ্দীন আজমশাহ তৎকালীন বাংলার রাজধানী সোনারগাঁয়ে দাওয়াত করে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কবি অতীব বার্ধক্যবশতঃ বাংলায় আসতে না পারলেও একটি গজল লিখে পাঠিয়েছিলেন।

কাশ্মীরের প্রধান পীর শেখ নূরউদ্দীন উয়ায়সী (১৩৭৭-১৪৩৮) দুনিয়ার একমাত্র ওলী-আল্লাহ যাঁর নামে কাশ্মীরের আফগান গভর্নর আতা মুহম্মদ খানের আমলে (১৮০৮-১০) মুদ্রাঙ্কিত হয়েছিল। খাজা উয়াস করনী ছাড়া আর কারো কাছে যেমন উন্মতের নাজাতের জন্যে রসুলুল্লাহ দোয়া চাননি, তেমনি শেখ নূরউদ্দীন ব্যতীত আর কোনো ওলী-আল্লাহর নামে কখনো কোনো দেশের মুদ্রা অঙ্কিত হয়নি।

খান্দান-ই-উয়ায়সীয়ার-ই এক শাখা তরীকাহ্ প্রবতিত হয় শেখ বদী উদ্দীন মাদার (১৩১৫-১৪৩৬) থেকে। বাংলাদেশে তাঁর স্মৃতি-চিহ্ন বহু স্থলে আছে। উত্তর টাঙ্গাইলে একটি বিরাট মৌজাকে কর্নিয়া বা কর্না নামে প্রসিদ্ধ করেন এক অজ্ঞাতনামা কলন্দর। ঐ মৌজায় কলন্দরের ভিটা বলে একটি পতিত ভিটাকে ঐ কলন্দরের কিছুদিন অবস্থানের স্থল বলে এখনো নির্দেশ করা হয়। পনেরো-ষোলো শতকের বাংলা-সাহিত্যে ভ্রাম্যমাণ ফকীরদের কলন্দর বলে উল্লেখ করা হত। হযরত উয়াস করনী থেকে যখন তিনি মৌজার নাম উয়াস করনীয়া (সংক্ষেপে কর্না) রেখেছেন, তখন বুঝা যায়, ঐ কলন্দর মাদারীয়া তরীকাহ-ভুক্ত ছিলেন বলেই তিনি তাদের আদিপীর হযরত উয়াস করনী থেকে মৌজার নাম উয়াস করনীয়া রাখেন।

আমি ১৯৪৫ সনে মানিকগঞ্জের উয়ায়সীদের ভিতর প্রবেশ করি এবং ১৪ বছর চেষ্টা-তদবীরের পর ১৯৫৯ সনে হযরত শাহ আবদুস সাত্তার (ওফাত ১৯৬৪) মরহুমের নিকট থেকে যে শাজারা শরীফ লাভ করি তাতে হযরত শাহ আবদুস সাত্তারের মুরশিদ পীর ছিলেন তার নিজের মামুজান শাহ আবদুল কাদের (ওফাত ১৯৪২)। শাহ আবদুল কাদের ও তাঁর জ্যেষ্ঠ সহোদর শাহ আবদুর রহীম ছিলেন বড় লাটের মুনসী খানার মুনসী। গ্রীস্মে তাদের সিমলায় যেতে হত। সিমলাতে উয়ায়সীয়া তরীকার এক গদ্দীনশীন পীর ছিলেন। টাঙ্গাইল ধুবড়িয়ার অধিবাসী বড়লাটের মুনসীখানার অন্যতম মুনসী আবদুল মুত্তালেব এই দুই সহোদরকে সেই পীরের কাছে নিয়ে যান।

সিপাহী জিহাদ (১৮৫৭-৫৮)-এর আগে এই পীর সাহেবের নাম ছিল সৈয়দ কাসিম আলী উয়ায়সী গাজী-ই-সরহিন্দ, কিন্তু সিপাহী জিহাদের পর তিনি নাম গ্রহণ করেন সৈয়দ বাহার শাহ উয়ায়সী কুহ্সিমলায়ী। অতঃপর হিমালয় ক্রোড়ের সিমলায় গদীনশীন হন। কারণ তিনি উপমহাদেশের অভ্যন্তরস্থ মুজাহিদ কর্মীদের তরফ থেকে সিপাহী জিহাদের অন্যতম নায়ক হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

সৈয়দ কাসিম আলী (ওফাত ১৮১৫)-র পীর ছিলেন এক মুজাহিদ নেতা হযরত সাবির শাহ গাজী-ই-সরহিন্দ। হযরত সাবির শাহের পীর ছিলেন হযরত হাফিজ মুহম্মদ ইউসুফ শাহ্ গাজী-ই-সরহিন্দ। মারাঠাদের দস্যুবৃত্তি ও শিখদের খুন-খারাবী ঔদ্ধত্যের সময়ে আঠারো শতকের শেষভাগ ও উনিশ শতকের প্রথম ভাগে এঁরা অবশ্যই ঐ সব উদ্ধত অত্যাচারীদের সঙ্গে আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন বলেই গাজী-ই সরহিন্দ খেতাব তাঁদের নামে যোগ হয়েছে। ইতিহাসে দেখা যায়, সরহিন্দ ও লুধিয়ানা জিলাদ্বয় ব্যতীত তামাম পাঞ্জাব সিপাহী জিহাদে ইংরেজ পক্ষে ছিল।

হযরত সৈয়দ কাসিম আলী গাজী-ই-সরহিন্দ ওরফে হযরত সৈয়দ বাহার শাহ কুহ্সিমলায়ী উয়ায়সীর প্রধান খলীফা হযরত শাহ আবদুর রহিম উনিশ শতকের শেষ দশকে (১৮৯০-৯১) উয়ায়সীয়া তরীকাহ প্রচারার্থে বাংলাদেশে প্রেরিত হন। ঢাকা জিলার হরিরামপুর থানার ডাকরখালী গ্রামের পৈত্রিক নিবাস থেকেই তিনি প্রচার শুরু করেন। ১৮৯১ সনে ‘অথর্ব মহম্মদী বেদ’ নামক তাঁর রচিত ও প্রকাশিত প্রথম গ্রন্থ দিয়ে তিনি এই তরীকাহর মতবাদ সর্বপ্রথম বাংলায় প্রকাশ করেন।

নবীজির মানবোৎকর্ষী মতবাদ নবীবংশের লোকেরাই পুরোপুরি ধরে রেখেছেন; কিন্তু প্রতিবিপ্লবী কারসাজিতে এঁদের দিক থেকে লোকের মনোযোগ এমনভাবে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে যে, এখন যে-কোন সৃজনশীল কাজের বিরুদ্ধে এমন ফতোয়া প্রণয়ন করা যায় যা আসল ইসলামের সম্পূর্ণ বিরোধী হলেও ‘ইসলাম’ নামে চালু করা হয়েছে। উয়ায়সীয়া তরীকাহ্’র প্রথম প্রচারকদের বিরুদ্ধেও ‘উয়ায়সীয়া তরীকাহ্ বলে কোন তরীকাই নাই’ বলে এলোপাতারি প্রচার শুরু হয়েছিল। সে-সম্পর্কেই শাহ আবদুল কাদের লিখেছেন:

হিন্দুস্থান পাঞ্জাবাদি পশ্চিম অঞ্চলে।

অয়েছি খান্দান খুব জানেন সকলে।।

বাঙ্গলা মুলুকে নাম ছিল না প্রকাশ

মহম্মদী বেদ দ্বারা হয়েছে বিকাশ।।

বারশত আটানব্বই সালে বাঙ্গালায়।

মহাম্মদী বেদ ছাপা হয় পহেলায়।।

অদ্যাবধি এহি দেশে কত ছাহেবান।

অয়েছি খান্দান নামে চাহেন প্রমাণ।।

(শাহ আবদুল কাদের রচিত ও ১৩৪০ বাংলা সনে প্রকাশিত ‘মস্তানী বচন’, পৃ. ৯)

১৯১০ সনে হযরত শাহ আবদুর রহীমের ইন্তেকালের পর তাঁর কনিষ্ঠ সহোদর হযরত শাহ আবদুল কাদেরের উপর এই তরীকাহ্ প্রচারের ভার পড়ে। শাহ্ আবদুল কাদের সৈয়দ বাহার শাহর অন্যতম খলীফা ছিলেন। শাহ আবদুর রহীমের খলীফা শাহ কসিমুদ্দীন উয়ায়সীও এই তরীকার যথেষ্ট খেদমত করে ১৯৪০ সনে ইন্তেকাল করেছেন। শাহ আবদুর রহিমের দুই ভাগ্নে শাহ আবদুস সাত্তার ও শাহ আবদুল গনী এবং দুই ছেলে শাহ আতাউল হক ও শাহ মুতিউল হককে তামিল তবিয়ত পুরোপুরি দান করার পর হযরত শাহ্ আবদুল কাদের বাংলা ১৩৪৯ সনে ১৭ই অগ্রহায়ণ মুতাবেক ১৯৪২ খ্রীস্টব্দের ৩রা ডিসেম্বর ওফাত পান।

শাহ আবদুস সাত্তার তাঁর পীর ও ছোট মামা শাহ আবদুল কাদেরের পদাংক অনুসরণে এই তরীকাহ্ প্রচার করতে করতে বাংলা ১৩৭১ সনের ৪ঠা অগ্রহায়ণ মুতাবেক ১৯৬৪ সনের ২০শে নভেম্বর ইন্তেকাল করেন। ঢাকার মানিকগঞ্জ এলাকাতেই এঁদের সকলের পৈত্রিক নিবাস। বাংলাদেশের ডাকরখালী থেকেই এই তরীকাহ্ এই উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলে প্রচারলাভ করছে।

শাহ আবদুল মুত্তালেব (ওফাত ১৮৯৭)-এর একমাত্র পুত্র ও শাহ আবদুর রহিমের অন্যতম মুরীদ শাহ আবদুল ওয়াহেদ হযরত শাহ আবদুল কাদেরের কাছ থেকে তালীম ও খিলাফত নিয়ে উত্তর বাংলায় এই তরীকাহ্ প্রচার করতে করতে ১৯৭২ সনের ৮ই নভেম্বর গাইবান্ধায় ইন্তেকাল করেন।

 

[1] মওলানা মুজীবর রহমান, হযরত আলী (রাঃ); পৃ. ২০০। A. M. A. Shustery, Outlines of Islamic Culture. হযরত আলী-বিষয়ক বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন গ্রন্থাদি।

[2] প্রাগুক্ত গ্রন্থাদি।

[3] সূরাহ্ বর্ণী-ইসরাঈল: ১৬-১৭ আয়াত, সাবা ৩৪-৩৬ আয়াত।