ইতিহাসবিদ আবদুল করিমের গবেষণায় সুফি প্রসঙ্গ: পরিচিতি পর্ব

সুফিদের আগমন, ধর্মপ্রচার, সামাজিক প্রভাব এবং মুসলিম সমাজগঠনে তাঁদের ভূমিকা ব্যাখ্যা করে তিনি বাংলার সুফি সমাজকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার, বিশ্লেষণ করেছেন।

 

আল্লাহর প্রতি নিখাদ প্রেমই ইসলামের মূল উদ্দেশ্য। এই প্রেমদর্শনই সুফিবাদের মূল কথা। ‘তাসাউফ’ শব্দের বাংলা রূপ হলো ‘সুফিতত্ত্ব’, যার অর্থ আত্মার পবিত্রতা অর্জন। সুফিরা আত্মার পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সাধনায় ব্রত হয়ে পবিত্র জীবন যাপন করেন। কেউ কেউ মনে করেন, তাঁরা মোটা পশমী কাপড় পরিধান করতেন বলেই তাঁদেরকে ‘সুফি’ বলা হতো।[1]

বাংলার ইতিহাসে সুফিবাদের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। স্বাধীন সুলতানী ও মুঘল আমলে ইরান, ইরাক, বোখারা, হেরাত প্রভৃতি অঞ্চল থেকে বহু সুফি বাংলায় আগমন করেন ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। তাঁরা কেবল ধর্মপ্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং বাংলার শিক্ষা, সমাজ ও সংস্কৃতিতেও স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন, যার প্রভাব আজও লক্ষ্যণীয়।

 

আবদুল করিমের জীবনে সুফি প্রভাব:

ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ইতিহাসকে সামগ্রিক রূপদানকারী অন্যতম ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম। তিনি বাংলা ও উপমহাদেশের ইতিহাস, বিশেষত মুসলিম সমাজ, সংস্কৃতি ও সুফি প্রভাব নিয়ে বিস্তৃত গবেষণা করেছেন। সুফি প্রসঙ্গে ড. করিমের আগ্রহের পেছনে ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রেক্ষাপটও ভূমিকা রেখেছে।

তাঁর জন্মস্থান চট্টগ্রামের বাঁশখালীর চপাঁছড়িতে। তিনি সৈয়দ বংশের লোক ছিলেন। যারা পূর্বে কলকাতায় বসবাস করতো। তার বাবা সৈয়দ ওয়াইজুদ্দিন বার্মায় ‘জেরবাদী বর মসজিদের’ মুয়াজ্জিন ছিলেন। তার মা ছিলেন সৈয়দা রাশীদা খাতুন। তার নানা ছিলেন সৈয়দ আজীজুল্লাহ। মার নানা হলেন সাতকানিয়ার সূফি বদীউদ্দীন শাহ। ড. করিমের বেড়ে ওঠা নানার বাড়িতে, কারণ বাবা চাকরিসূত্রে বর্মায় থাকতেন। তাই মা সহ তাঁরা সেখানেই জায়গা জমি কিনে বসতি গড়ে তোলেন। ফলে, ব্যক্তিগতভাবে মায়ের বংশের দিক থেকে সুফি ঘরানার মানুষ ছিলেন। তার বাড়ির সামনের পুকুরটি দরগাহ পুকুর নামে পরিচিত ছিলো। মূলত পরিবারিক ও সামাজিকভাবে তার জীবনে যে সুফি প্রভাব পড়েছিলো তা পরবর্তী সময়ে তার ইতিহাস গবেষণায় ফুটে উঠেছে।[2]

সুফি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠায় তাঁর চিন্তা ও গবেষণায় সুফিবাদের প্রভাব স্বাভাবিকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ড. করিমের মতে, Sufism describes spiritual progress as a journey, and the seeker of God as a Salik or `traveller’. Its teachings are designed to guide the traveller toward attaining perfect knowledge (ma’rifat) of God, the one and only Reality pervading all existence.”[3]

ইতিহাসবিদ হিসেবে তিনি সুফিবাদকে মূলত ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। সুফিদের আগমন, ধর্মপ্রচার, সামাজিক প্রভাব এবং মুসলিম সমাজগঠনে তাঁদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করে তিনি বাংলার সুফি সমাজকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার, বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি ইংরেজি-বাংলা মিলিয়ে প্রায় ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেন। ৬টি গ্রন্থে তিনি সুফি প্রসঙ্গে আলোকপাত করেছেন।[4]

 

সুফি প্রসঙ্গে রচিত গ্রন্থসমূহ:

১. Social History of the Muslims in Bengal; Down to A.D. 1538, The Asiatic Society of Pakistan, Dacca, 1959

২. চট্টগ্রামে ইসলাম, ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র চট্টগ্রাম, ১৯৭০

৩. মাহবুবে-রব্বানী গাউছে-ছামদানী গরীবে-নেওয়াজ কুতুবুল-আকতাব হযরত শাহ্ সূফী আমানত খান (র.), শাহজাদা বেলায়েত উল্লাহ খান কর্তৃক প্রকাশিত, দরগাহ শরীফ, শাহ আমানত লেন, চট্টগ্রাম, ১৯৭০

৪. মোল্লা মিসকিন শাহ (র.), বায়তুশ শরফ ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, চট্টগ্রাম, ১৯৮৭

৫. মুসলিম বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৪

৬. বাঁশখালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০১৩

 

Social History of the Muslims in Bengal

ড. আবদুল করিম তাঁর প্রথম পিএইচডি গবেষণাকর্ম ‘Social History of the Muslims in Bengal’ এ বাংলায় ইসলাম প্রচার ও প্রসারে সুফিদের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, তিনি বিশেষভাবে দুটি অধ্যায়ে সুফিদের কার্যক্রম ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। পরবর্তীতে এই গবেষণাকর্মটি পাকিস্তান এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থে সুফিদের নিয়ে কয়েকটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে আলোচনা করেন। ৩য় অধ্যায়ের Section (B) তে The Contribution of the Muslim Scholars নামে, বাংলার সাতজন সুফির অবদান ও তাদের আগমন ও কার্যক্রম নিয়ে বৃহদাকারে আলোচনা করেন। একই অধ্যায়ের Section (C) তে The Sufis and Their Influence নামে আরেকটি ভিন্ন পাঠে সুফীতত্ত্ব কী, বাংলায় সুফিবাদ, বাংলার মুসলিম বিজয়ের পূর্বে এবং পরে সমাজ ও রাষ্ট্রগঠনে সুফিদের ভূমিকা ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। ৪র্থ অধ্যায় Islam as practiced by Muslims in Bengal এ Pirism নামক পাঠে সত্যপীরের কার্যক্রম ও পাঁচপীরের আগমন নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি পীরদের সামাজিক প্রভাব ও সংযোগ নিয়েও আলোচনা করেন। তাঁর আলোচনায় ‘সুফি রুকনউদ্দিন সমরখন্দী’ ও এক ব্রজ ব্রাহ্মণের ইসলাম গ্রহণের ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়, যা প্রাক-ঔপনিশিক বাংলায় সুফিদের মানবিক প্রভাব ও আধ্যাত্মিক আকর্ষণের প্রভাব বুঝতে সহায়ক। এছাড়া এ গ্রন্থে বাংলায় ইসলামের প্রারম্ভিক যুগ থেকে মুঘল আমলের সূচনা পর্যন্ত সুফিদের প্রভাব ও সমাজ গঠনে তাঁদের অবদান নিয়ে ধারাবাহিক বিশ্লেষণ দেখা যায়। এ গ্রন্থের উল্লেখিত অধ্যায়গুলোর মাধ্যমে বাংলায় সুফিদের আগমন, কার্যক্রম ও প্রভাব নিয়ে একটি ঐতিহাসিক-একাডেমিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

 

চট্টগ্রামে ইসলাম

এ বইতে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ কর্তৃক সংগৃহীত আরবি পাণ্ডুলিপি থেকে সুফিদের কয়েকটি তালিকা প্রকাশ করেন। যথা: দওয়াজদা আউলিয়া বা বার আউলিয়া, পীর পঞ্জা বা পাঁচ পীর, চেহল আবদাল বা চল্লিশজন আবদাল, জুমলা আউলিয়া বা সকল সুফি, চাহার পীর বা চারজন পীর ইত্যাদি। এ তালিকার অনেক সুফিদেরকে আবার বাংলার উত্তরাঞ্চলে বসবাস বা ধর্ম প্রচার করতে দেখা যায়। তিনি বলেন, সুফিরা বিশ্বাস করতেন যে, শ্রেণী বিভক্ত সুফিরাই পৃথিবীকে সকল বিপদ-আপদে রক্ষা করতে সাহায্য করেন, তারা আল্লাহর প্রিয় পাত্র, সুতরাং আল্লাহ তাদের সুপারিশ গ্রহণ করেন। এই শ্রেণী-বিভাগে রয়েছেন ৩০০ জন নুকুবা, ৪০ জন আবদাল, ৭ জন উমনা, ৪ জন আমুদ ও একজন কুতুব। এদের যে-কোনো একজনের ইন্তেকাল হলে শীঘ্রই আর একজন স্থলাভিষিক্ত হন। তালিকাটির মধ্যে অনেকের বর্তমান সমাধিস্থল চট্টগ্রামে না থাকায় তারা চট্টগ্রামে এসেছিলেন কি-না এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। এদের মধ্যে চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ ১০ জন সুফির পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। এ গ্রন্থের মাধ্যমে চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারে সুফিদের ভূমিকা ও চট্টগ্রামের সুফি সমাজ সম্পর্কে গভীর ধারণা পাওয়া যায়।

 

মাহবুবে-রব্বানী গাউছে-ছামদানী গরীবে-নেওয়াজ কুতুবুল-আকতাব হযরত শাহ্ সূফী আমানত খান (র.)

ড. করিম এ গ্রন্থে মোট ১০টি পরিচ্ছদে হযরত শাহ আমানত খান সম্পর্কে আলোচনা করেন। প্রথমে তিনি সুফিদের ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরেন এবং চট্টগ্রামে ইসলামের আগমন সম্পর্কে ধারণা দেন। পরবর্তীতে শাহ আমানত খানের জীবন সম্পর্কে ও তার আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ, কেরামত, মুরীদান এবং বংশাবলী সম্পর্কে স্ব-বিস্তারে আলাপ করেন। চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ সুফি হযরত শাহ আমানত সম্পর্কে এটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও গবেষণামূলক গ্রন্থ।

 

মোল্লা মিসকিন শাহ (র.)

লেখক এ গ্রন্থটিতে কোনো অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনা না করে চট্টগ্রামে ইসলামের আবির্ভাব ও মোল্লা মিসকিন শাহ (র.) এর আগমন ও তার কর্ম নিয়ে আলোচনা করেছেন। মোল্লা মিসকিন শাহ খানকাহ’র ব্যয় নির্বাহের জন্য শাসক কর্তৃক লাখেরাজ সম্পত্তির প্রমাণ ও তাঁর বংশধরদের তালিকা তুলে ধরেন। চট্টগ্রাম শহরে মোল্লা মিসকিন শাহ’র প্রভাব ও ভূমিকা নিয়েও তিনি আলোচনা করেন।

 

মুসলিম বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

এ গ্রন্থে প্রথমত সুফিদের উৎপত্তি ও আধ্যাত্মিক সাধনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তিনি সুফিদের মকাম নিয়ে আলোচনা করেন এবং মকামের ৪৫টি স্তর সম্পর্ক লিখেছেন। পাশাপাশি সুফিদের বৈশিষ্ট্য নিয়েও আলোচনা করেন। সুফিদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনার পর বাংলায় প্রচলিত সুফিদের তরীকাগুলো: কাদেরিয়া, চিশতিয়া, সোহরাওয়ার্দীয়া, নকশবন্দিয়া, সাত্তারীয়া, মদারীয়া ও কলন্দরিয়া ইত্যাদির পরিচিতি তুলে ধরেন। অতঃপর বাংলার প্রসিদ্ধ ও খ্যাতিমান সুফিদের কার্যক্রম ও পরিচিতির উপর আলোকপাক করেন।

 

বাঁশখালীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য

ড. করিম তার নিজ মাতৃভূমির ইতিহাস সম্পর্কিত এ গ্রন্থে সূফি শাহ বদিউল আলমের জীবনকর্ম ও তার পীর প্রাপ্তি নিয়ে আলোচনা করেন। সুফি শাহ বদিউল আলম ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পীর ছিলেন সাতকানিয়া মির্জাখিল গ্রামের সুফি মওলানা মোহাম্মদ আবদুল হাই। এ গ্রন্থে সুফি বদিউল আলমের জীবনাচরণ নিয়ে স্ব-বিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে।

 

ড. আবদুল করিম তাঁর রচনাগুলিতে বারবার উল্লেখ করেছেন যে, বাংলার মুসলিম সমাজ গঠনে সুফিদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর গবেষণায় সুলতানি আমলে সুফিদের কর্মকাণ্ড ও সমাজে তাঁদের প্রভাব সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। তিনি উল্লেখ করেন যে, সুফিদের মানবিক আচরণ, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা মুসলিম সমাজের ভিত্তি সুদৃঢ় করেছে।

সবমিলিয়ে, ড. আবদুল করিমের ইতিহাস গবেষণায় সুফিবাদ কেবল আধ্যাত্মিক সাধনার ধারাই নয়, বরং একটি সমাজগঠনের প্রক্রিয়া হিসেবেও প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর গবেষণায় বাংলার রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে সুফিদের অবস্থান ও প্রভাবকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা বাংলার মুসলমান সমাজের ঐতিহাসিক ভিত্তিকে মজবুত করেছে।

[1] ইসলামে সুফিবাদ: একটি পর্যালোচনা, সুফি মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, শাহাদাতে কারবালা গবেষণামূলক স্মারকগ্রন্থ, ৪০তম প্রকাশ, পৃষ্ঠা ৫

[2] সমাজ ও জীবন: ড. আবদুল করিম, হাসি প্রকাশনি, ২০০৩, পৃষ্ঠা-১৮-১৯

[3] Social History of the Muslims in Bengal; Down to A.D. 1538: Dr. Abdul Karim, The Asiatic Society of Pakistan, 1959, p. 84

[4] ইতিহাসবিদ ড. আবদুল করিম: ড. মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০১৪