কালোত্তীর্ণ এক ঐতিহাসিক চরিত্র

হজরত খান জাহান আলী (রহ.): এক ঐতিহাসিক বিদগ্ধ সাধক

খান জাহান আলী রহ. দক্ষিণ বঙ্গ তথা খুলনা-যশোর অঞ্চলের প্রধান ইসলাম প্রচারক হিসেবে খ্যাত। তাঁর পূর্বে ঐ অঞ্চলে বলার মতো কোনো ইসলাম প্রচারক কিংবা মুসলিম শাসকের হদিস ইতিহাসে পাওয়া যায় না। তিনি ছিলেন একাধারে ইসলাম প্রচারক-দরবেশ, শাসক এবং সমাজ-সংস্কারক।
সবমিলিয়ে তিনি কালোত্তীর্ণ এক ঐতিহাসিক চরিত্র; যাঁকে নিয়ে বাংলার মুসলমানদের মাঝে নানান কিংবদন্তি প্রচলিত আছে।
খান জাহান আলী রহ. সম্পর্কে তেমন কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণপত্র পাওয়া যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রচলিত কিংবদন্তির আশ্রয়ই গ্রহণ করেছেন ঐতিহাসিকগণ। এর মধ্যে সবচেয়ে অকাট্য তথ্য পাওয়া যায় তাঁর মাজারের শিলালিপি থেকে। সেই শিলালিপির ভাষ্য হলো— “আল্লাহর এক নগন্য দাস, রব্বুল আলামিনের অনুগ্রহ প্রত্যাশী, প্রিয় নবীজির বংশধরদের অনুগ্রহ প্রত্যাশী, সৎপথের অনুগামী আলেম-দরবেশদের বন্ধু, বিধর্মী মুশরিকদের শত্রু, ইসলাম ও মুসলমানদের সাহায্যকারী, উলুঘ খান-ই-জাহান হিজরি ৮৬৩ সালের ২৬শে জিলহজ বুধবার রাতে এ নশ্বর দুনিয়া থেকে জান্নাতগামী হন এবং এই মাসের ২৭ তারিখ বৃহস্পতিবার সমাহিন হন।” (তালিব : ১৯৮০, ১৫৩)
শিলালিপিতে ইন্তেকালের সন-তারিখ উল্লেখ থাকলেও জন্মতারিখ উল্লেখ নেই। তাই তাঁর সঠিক জন্মতারিখ নির্ণীত নয়। তবে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন, তিনি চৌদ্দ শতকের শেষভাগে জন্মগ্রহণ করেছেন। জন্মের মতো তাঁর প্রকৃত নামের ইতিহাসও প্রায় অধরা। ‘খান জাহান’ মূলত তাঁর উপাধি। শিলালিপিতে তাঁর নাম রয়েছে, উলুঘ খান-জাহান। এ থেকে ঐতিহাসিকরা মনে করেন, তাঁর প্রকৃত নাম ‘উলুঘ খান’। তাঁর জন্মস্থান নিয়েও ইতিহাসবিদদের মাঝে ব্যাপক মতানৈক্য রয়েছে। কেউ বলেছেন ইরাক, আর কেউ ইরান, আবার কেউ কেউ তুরস্ক বলে ধারণা করেছেন।
বীরযোদ্ধা, সেনানায়ক, সমাজ-সংস্কারকসহ নানান অভিধায় তাঁকে ভূষিত করা গেলেও তিনি বাংলার আপামর মুসলিম-সমাজের চোখে একজন বিদগ্ধ সাধক তথা দরবেশ হিসেবে সুপরিচিত। শিলালিপিতে তাঁর যে উপাধিগুলো ব্যবহৃত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যেই তাঁর দরবেশ সত্ত্বার হাজিরা পাওয়া যায়। যেমন, বলা হয়েছে, ‘আল মুহিব্বু লি-আউলাদে সাইয়েদুল মুরসালিন’। অর্থাৎ, নবীকুল সর্দার হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আওলাদদের প্রেমিক। বাস্তবেই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহান আওলাদদের ভালোবাসা মুমিন মুসলমানদের উপর ফরজ। পবিত্র কুরআনের সুরা শুয়ারার ২৩ নং আয়াতে বলা হয়েছে “হে নবী, আপনি বলুন, তোমাদের কাছে এর (আমার দ্বীন প্রচারের) বিনিময়ে আমার আত্মীয়-স্বজনের প্রতি ভালোবাসা ব্যতীত অন্য কোনো প্রতিদান চাই না।” সুফি-দরবেশদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য বাস্তবতা হলো আহলে বায়ত তথা নবী-পরিবারের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা। খান জাহান আলী রহ. এর মাজারের শিলালিপি থেকে প্রতীয়মান হয়, তিনি আহলে বায়তের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসায় জীবন অতিবাহিত করেছেন।
শিলালিপিতে দ্বিতীয় যে উপাধি পাওয়া যায় তা হলো ‘আল মুখলিসু লি-ওয়ালামা-ই রাশেদিন’। যাঁর অর্থ– হকপন্থি আলেমদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এটাও সুফিদের জীবনের আরেকটি বাস্তবতা। তাঁরা হকপন্থি আলেমদের সাথে সবসময় সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। শামস তাবরিজির জীবনের ঘটনা থেকে আমরা জানতে পারি, একজন যথাযোগ্য হকপন্থি আলেমের খুঁজে তিনি বহু দেশ সফর করে শেষ পর্যন্ত কুনিয়ার জালাল উদ্দিন রুমি রহ. এঁর হাতে আধ্যাত্মিক আমানত অর্পণ করেছিলেন। খান জাহান আলীর জীবনী থেকে জানা যায়, তাঁর সাথে বারো জন বিশিষ্ট সঙ্গী ছিলেন, যাঁরা প্রত্যেকে বিদগ্ধ আলেম-দরবেশ ছিলেন। তাঁরাই পরবর্তীতে পুরো খুলনা-যশোর অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। খান জাহান আলীর জীবনী রচয়িতা সৈয়দ ওমর ফারুক হোসেন লিখেছেন, “১২ জন প্রধানের অধীনে প্রত্যকের ৫ হাজার করে মোট ৬০ হাজার সৈন্য পরিচালিত হয়েছিল। তাঁরাও নিতান্ত ক্ষুদ্র লোক ছিলেন না। তাঁরাও একেকজন আউলিয়া ও যোদ্ধা ছিলেন এবং উক্ত ইতিহাসের বিখ্যাত কুতুবই তাঁদের নির্বাচিত করেছিলেন।” (হোসেন : ১৯৮৮, ৬৭)
শিলালিপির তৃতীয় উপাধি ‘আল মুবগিজু লিল কুফফার ওয়াল মুশরিকিন’। আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া নবীদের মিশন হলো পৃথিবী থেকে কাফের এবং মুশরিকের বিলুপ্তিসাধন। এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে, তাদের সবাইকে হত্যা করে ফেলা; বরং এর অর্থ হলো তাদের তাওহিদের রঙ্গে রঙিন করে পৃথিবী থেকে শিরক এবং কুফরি দূরীভূত করা। আর যখন শিরক এবং কুফরি দূরীভূত হয়ে যাবে, তখন আর কেউ-ই মুশরিক ও কাফের থাকবে না। এই মিশনের বাস্তবায়নেই মূলত সুফিদের নানান দেশে ছড়িয়ে পড়া। তাঁরা মানুষকে ভেতর থেকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে শিরক এবং কুফরের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। খান জাহান আলীও শিরক ও কুফুরিকে তাওহিদের মাধ্যমে মোকাবেলা করে এদেশের মানুষকে হেদায়েতের দিশা দেয়ার মিশনে ছিলেন।
পরের উপাধিতে বলা হয়েছে, ‘আল মুয়িনুল ইসলাম’ তথা ইসলামের সাহায্যকারী। এ লাইনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজনই পড়ে না। পুরো যশোর-খুলনা অঞ্চলে বলতে গেলে তাঁর মাধ্যমেই ইসলামের বাণী মানুষদের মাঝে ছড়িয়েছে। ড. গোলাম সাকলায়েন তাঁর বাংলাদেশের সূফী সাধক বইতে উল্লেখ করেছেন, ”হযরত খান জাহানের কীর্তিসমূহ সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গে বিশেষত যশোর ও খুলনায় আজো বিদ্যমান। তিনি এ-দুই অঞ্চলের জঙ্গলাকীর্ণ ভূমিকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে তোলেন এবং তাঁর আদেশ পেয়ে দলে দলে লোক নানা জনহিতকর কার্যে আত্মোৎসর্গ করে। তাঁর জনসেবামূলক কার্যাদিতে লোকে বিমুগ্ধ হয়ে যেত। হজরত বিনা রক্তপাতে সুন্দরবন অঞ্চল জয় করে সেখানে শান্তি ও সাম্যের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ-সব দেখে অসংখ্য লোক ইসলামে দীক্ষা নিয়েছিলেন।” (গোলাম সাকলায়েন : ২০১৯, ১১৫) এ যেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনেরই পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ; যেভাবে তিনি মদিনা রাষ্ট্রে চাষাবাদ, ব্যাবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সাম্য ও ন্যায়প্রতিষ্ঠাসহ সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কাজ করেছিলেন, খান জাহান আলীও একইভাবে যশোর ও খুলনার শাসনভার হাতে নিয়ে রাতদিন মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। আর এটিই মূলত ইসলামকে সাহায্য করা। তাই তিনি মুয়িনুল ইসলাম তথা ইসলামকে সাহায্যকারী।
সর্বশেষ যে উপাধিটি শিলালিপিতে উঠে এসেছে তা হলো ‘আল মুহতাজু ইলার রহমাতাল-লিল-আলামিন’। অর্থাৎ রহমাতাল-লিল-আলামিন তথা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি মুহতাজ। মুহতাজ শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রয়োজনপ্রার্থী, মুখাপেক্ষী। বাস্তবেই সুফিরা আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহতাজ। সুফিদের তরিকতের শাজরাতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কেননা শাজরাতে পীরের পীর, পীরের পীর এভাবে যেতে যেতে হজরত আলী (রা.) হয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সিলসিলা বর্তমান থাকতে হয়। কেননা তাঁর রুহানি ফয়েজের মাধ্যমেই সুফিদের চূড়ান্ত আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধিত হয়। কোনো ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতার বিঘ্ন ঘটলে নবীজীর ফয়েজ থেকে মাহরুম হিসেবে বিবেচিত হয়। সাধারণ অর্থেও সকল মুসলমান ইসলামের যথাযথ শিক্ষা, কালেমার পূর্ণতা এবং আখেরাতে সুপারিশের জন্য বিশেষভাবে নবীজির মুখাপেক্ষী। আর খান জাহান আলীও নবীজির প্রতি বিশেষ ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্য নিজের নামের সাথে ‘মুহতাজে রহমাতাল-লিল-আলামিন’ লকবকে অলঙ্কার হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
খান জাহান আলীর এসব লকব থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে, তিনি নিশ্চিতভাবে কোনো মহাপুরুষ সাধকের মুরিদ এবং পরবর্তীতে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিক সূত্রে তাঁর মহান মুরশিদ হিসেবে ইলিয়াস শাহী আমলের বিখ্যাত সুফি নুর কুতুবুল আলম’র নাম পাওয়া যায়। দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী সম্পাদিত ‘আমাদের সূফীয়ায়ে কেরাম’ গ্রন্থে আবুল হোসেইন মাহমুদের প্রবন্ধে এসেছে, “তিনি নূর-ই-কুতুব-উল আলমের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করে আরবী ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর কাছে বায়’আত হয়ে আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও শক্তি অর্জন করেন। শুধু অধ্যাত্ম বিদ্যাই নয়; রাজ্য চালনায়, জনহিতকর কার্যে, যুদ্ধ বিদ্যায়, স্থাপত্যশিল্পে, ইসলামের মূলতত্ত্ব বিষয়ে তাঁর জ্ঞানের যতটুকু নিদর্শন রেখে গিয়েছিলেন ছয় শত বছর পরে আজো তা বিস্ময় সৃষ্টি করে।” (চৌধুরী : ১৯৯৫, ২৪৭)
যশোর ও খুলনা অঞ্চলে তিনি শাসন প্রতিষ্ঠা করলেও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব তাঁকে সাধনার পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
বর্তমান বাগেরহাট শহর নির্মাণের পর তিনি তাঁর নাম দিয়েছিলেন ‘খলিফাতাবাদ’। এবং সেখান থেকেই তিনি রাজ্য পরিচালনা করতেন। ধারণা করা হয়, তৎকালীন গৌড়ের শাসক নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ নিজেকে খলিফা হিসেবে পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। এবং খলিফার গুণাবলিকে নিজে ধারণ করে সে অনুযায়ী রাজ্য পরিচালনা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। খলিফার প্রতি বিশেষ সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন হিসেবেই মূলত এই শহরের নামকরণ করেন খলিফাতাবাদ। অর্থাৎ, তিনি কেবলই ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেছেন, তা নয়; বরং রাজ্য পরিচালনার মতো গুরুদায়িত্ব তাঁর উপর অর্পিত ছিল। এতদ্‌সত্ত্বেও তিনি সাধনার পথ ছাড়েননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শাসকের দায়িত্ব শেষ করে নিরালায় আল্লাহর সাধনায় লিপ্ত হতেন। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছে, “জীবনের শেষ দশ বছর তিনি একান্তভাবে আল্লাহর বন্দেগিতে কাটান। অবশেষে বৃদ্ধ বয়সে কোনো এক শবে কদরের রাতে তিনি প্রাণ ত্যাগ করেন। যে রাতে তিনি পূর্ণ কামালিয়ত পেয়েছিলেন, সে রাতেই তিনি ইন্তেকাল করেন।” (পূর্বোক্ত)
আরো বলা হয়েছে, “তাঁর ইবাদতের সময় বিঘ্ন ঘটানো নিষেধ ছিল৷ তাঁর জীবনকে চারটি ভাগে বিভক্ত করলে দেখা যায় যে, এর মধ্যে তিন ভাগ সময় তিনি জনকল্যাণ, মানব-সেবা ও ধর্মপ্রচারে ব্যয় করেছিলেন, বাকি সময় আল্লাহ তায়ালার ধ্যান ও উপাসনায় কাটিয়ে দিয়েছেন। তাঁর দোয়া লাভের আশায় প্রতিদিন অসংখ্য লোকের সমাগম হতো। তিনি বিশেষ কোনো দিনে আসর নামাজের পর এক ঘণ্টা সবার সঙ্গে দেখা করতেন, তাদের কথা শুনতেন, দোয়া করতেন, ওসীয়ত করতেন।” (হোসেন, পূর্বোক্ত, ২৮৬)
এই উক্তিতে তাঁর জীবনের চারভাগে তিনভাগ জনকল্যাণ ও মানবসেবায় ব্যয় করতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি মূলত জনকল্যাণ ও মানবসেবাকেই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ, এ ক্ষেত্রটিও মূলত তাঁর আধ্যাত্মিক সাধনার একটি অংশ। কেননা পবিত্র কুরআনে এসেছে, “তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানুষের কল্যাণের জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে।” (৩ : ১১০) খান জাহান আলী রহ. জনসেবার উদ্দেশ্যে বনজঙ্গল সাফ করে রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকে শুরু করে খানকাহ, মসজিদ তৈরি করেছেন, দিঘি খনন করেছেন। ষাট গম্বুজ মসজিদ ছাড়াও তিনি অসংখ্য মসজিদ যেমন তৈরি করেছেন, তেমনি বড়ো বড়ো দিঘি খনন করে মানুষের পানির চাহিদা পূরণে বিশাল ভূমিকা রেখেছিলেন।
ঘোড়াদিঘি, খাঞ্জালী দিঘি, বদর দিঘি, এখতিয়ার খাঁ দিঘি-সহ আরো বহু দিঘি তাঁর তত্ত্বাবধানে খনন করা হয়। (তালিব : ১৯৮৮, ৮৬-১১০) এমনকি তাঁর জীবনীতে এসেছে, তাঁর তত্ত্বাবধানে মোট ৩৬০টি পুকুর/দিঘি খনন করা হয়েছিল। তৎকালে পানির চাহিদা পূরণে এসব দিঘির কোনো বিকল্প ছিল না। প্রসঙ্গত আবু হুরায়রা রা. থেকে একটি হাদিসে এসেছে, হজরত উসমান (রা.) প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে দুবার জান্নাত খরিদ করার সুসংবাদ পেয়েছেন। একবার রুমা কূপ খরিদ করার দিন, আরেকটি তাবুক যুদ্ধে সর্বোচ্চ দান করার দিন। রুমা কূপের ঘটনাটি হলো—
মদিনায় হিজরতের পর মুসলিমরা সেখানে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির তীব্র সংকটে পড়ে। সে সময় ‘বিরে রুমা’ বা রুমা কূপ নামে মদিনায় এক ইহুদির একটি বড় কূপ ছিল। সে এই সংকটের সুযোগে মুসলিমদের কাছে চড়ামূল্যে পানি বিক্রি করা শুরু করল। বিষয়টি জানতে পেরে নবীজি উপস্থিত সবার সামনে ঘোষণা দিলেন, “তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে, যে এই কূপ খরিদ করে মুসলিমদের জন্য ওয়াকফ করে দেবে? আর এটা যে করবে আল্লাহ তাকে জান্নাতে একটি ঝরনা দান করবেন।” ঘোষণা শুনে উসমান (রা.) তৎকালীন ৩৫ হাজার দিরহামের বিনিময়ে পুরো কূপের মালিকানা লাভ করেন এবং তা থেকে মুসলমানরা বিনামূল্যে পানি নেওয়া শুরু করে। পরে সর্বসাধারণের পানি পানের জন্য উসমান (রা.) কূপটি ওয়াকফ করে দেন। (সিয়ারু আলামিন-নুবালা : ২/৪৫২)
এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, মানবসেবায় পানি বা অন্য যে কোনো ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করা মূলত মহান আল্লাহ তায়ালার পথে সাধনার অন্যতম মাধ্যম। সুতরাং, খান জাহান আলী রহ. সাধনার সকল মাধ্যমে মহান আল্লাহ তায়ালাকে রাজি করানোর জন্য সচেষ্ট ছিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এভাবে জীবনের শুরুর দিকে মুর্শিদের সোহবতে থেকে আল্লাহর পরিচয় লাভের প্রচেষ্টায় জাহেরি-বাতেনি জ্ঞান অর্জন করে, শেষ জীবনে নীরবে-নিভৃতে আল্লাহর জিকিরে মশগুল থেকে, শাসক হিসেবে নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে এবং আজীবন মানবসেবাকে নিজের অপরিহার্য কর্তব্য জ্ঞান করে যে বহুল বৈচিত্র্যময় সাধনার জীবন তিনি যাপন করেছেন তা বাংলার ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। ঐতিহাসিকভাবে তাই তিনি এক মহান বিদগ্ধ সাধক হিসেবে আজও পরিচিত।
নির্দেশিত গ্রন্থাবলি:
১. বাংলাদেশে ইসলাম : আবদুল মান্নান তালিব, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮০
২. আমাদের সূফীয়ায়ে কেরাম : দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী সম্পাদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯৫
৩. খানে আজম খান জাহান আলী রহ. : সৈয়দ ওমর ফারুক হোসেন, বাগেরহাট খুলনা, ১৯৮২
৪. বাংলাদেশের সূফি সাধক : ড. গোলাম সাকলায়েন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০১৯
৫. খুলনা জেলায় ইসলাম : মুহম্মদ আবু তালিব,‌ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৮৮