খান জাহান আলীর খলিফাতাবাদ: বাংলায় খেলাফত ও তার শাসনব্যবস্থা

বাংলার ইসলামের ইতিহাসে খান জাহান আলী (রহ.) একজন প্রবাদপ্রতিম মহাপুরুষ। বিশেষত দক্ষিণ বঙ্গ তথা খুলনা-যশোর অঞ্চলে তাঁর মাধ্যমেই ব্যাপকভাবে ইসলামের প্রচার-প্রসার হয়েছিলো।

 

তিনি বাংলাদেশের মুসলমানদের কাছে একজন সুফি-দরবেশ হিসেবে সবিশেষ খ্যাত হলেও ঐতিহাসিকভাবে তিনি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, যাঁকে বাদ দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের ইতিহাস নিয়ে আলোকপাত করা প্রায় অসম্ভব। কারণ, তাঁর জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। সেনানায়ক, আলেম, দরবেশ, সংস্কারক এবং শাসক হিসেবে তাঁর কৃতিত্বের সাক্ষী হয়ে আছে খুলনা-যশোরের বিস্তৃত অঞ্চল।

 

তাঁর সময়ের বাংলার ইতিহাসের সংরক্ষণ সে-অর্থে হয়নি বললেই চলে। তবু বিভিন্ন ঐতিহাসিক যোগসূত্রের হিসাব মেলালে তাঁকে আমরা প্রথমত, জৌনপুরের সুলতান ইবরাহিম শর্কির সেনাপতি হিসেবে খুঁজে পাই। প্রথম অবস্থায় কেবলই একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে শর্কির সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, কিন্তু দক্ষতাবলে দ্রুতই সেনাপ্রধানের পদ অর্জন করেন। আবুল হোসেইন মাহমুদ তাঁর ‘খান জাহান আলী (র.)’ প্রবন্ধে যেমনটি মন্তব্য করেছেন, “সর্বপ্রথম জৌনপুরে তাঁর ওস্তাদের সহযোগিতায় শর্কী বংশীয় পরাক্রমশালী সুলতান ইবরাহিম শর্কীর অধীনে একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। কিছুদিন পরেই স্বীয় প্রতিভাবলে তাঁর অধীনে প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন।” (চৌধুরী: ১৯৯৫, ২৪৮)

 

তৎকালীন খুলনা-যশোর অঞ্চলে শক্তিশালী কোনো রাজার শাসন ছিল না বললেই চলে। অধিবাসীদের অধিকাংশ ছিলেন হিন্দু ও বৌদ্ধ। খান জাহান আলী প্রায় বিনা বাধায় এই অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। কিংবদন্তিমূলে জানা যায়, তিনি প্রথমে ‘বারোবাজার’ এলাকায় অবস্থান নেন। তাঁর বারোজন বিশেষ সঙ্গী, যাঁরা পরবর্তীতে দরবেশ হিসেবে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁদের নামেই মূলত এই বারোবাজারের নামকরণ হয় পরবর্তীকালে। যাই হোক, সেখানে কিছুদিন অবস্থানের পর কয়েকজন প্রতিনিধি সেখানে রেখে তিনি চলে যান মুরলী। যা বর্তমানে আধুনিক যশোর শহর। মুরলী থেকে একদল সুন্দরবন অঞ্চলে প্রেরণ করে অপর দল নিয়ে ভৈরব নদীর তীর হয়ে রওনা দেন পায়গ্রাম কসবায়। সেখানে কিছুদিন অবস্থান নিয়ে সুন্দরঘোনা নামক এলাকায় গিয়ে উঠেন। সেখানেই প্রশাসনিক দপ্তর স্থাপন করে এলাকাটিকে ধীরে ধীরে রাজধানীরূপে গড়ে তুলতে থাকেন এবং রাজ্যের নাম রাখেন খলিফাতে আবাদ কিংবা খলিফাতাবাদ। যা বর্তমানে আধুনিক বাগেরহাট হিসেবে পরিচিত। (আলীম: ২০০২, ৪১)

 

এ প্রসঙ্গে জীবনীকার ফারুক হোসেনের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন, “ইসলামের আদর্শকে অনুসরণ করে এই বৌদ্ধ, হিন্দু, বাগ্ধি ও মগ অধ্যুষিত এলাকায় তিনি একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইসলামের ইতিহাস প্রমাণ করে যে, যেহেতু ইসলাম ধর্ম শুধু জপ ও তপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেহেতু ইসলামে ধর্ম ও রাজনীতি কোন আলাদা বস্তু নয়, একে অন্যের পরিপূরক। ধর্ম প্রচারের পর তাঁকে জিন্দা রাখার জন্য তাঁকে রাজ্য বা রাজনীতির দায়িত্ব গ্রহণ করতে হয়। খোলাফায়ে রাশেদীনগণও তাই ফকিরের মত জীবনযাপন করেও অর্ধ পৃথিবীর শাসনকর্তারূপে রাজ্য পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছেন। হযরত খানজাহান আলী (র.) যখন ইসলাম প্রচার করতে করতে বাগেরহাট এসে পৌঁছালেন তখন স্বাভাবিক নিয়মেই একটি ইসলামিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে পড়ে। এই এলাকায় তখন তিনি খলিফাদের আদর্শ অনুসারে কোরান ও ছুন্না মোতাবেক ইসলাম শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। প্রথম দিকে এই রাজ্যটি একটি স্বাধীন রাজ্য বলে বহির্জগতে পরিচিতি লাভ করে ও ব্যবসা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে পর্তুগীজগণ এখানে আসতে শুরু করে। পর্তুগীজ মানচিত্রে এই স্থানকে কুইপিট-আভাজ (খলিফাতাবাদ) বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হযরত খানজাহান আলী (রঃ) ছিলেন রসুল করিম (দঃ) এর জীবনাদর্শ ও ইসলামের নীতিতে পূর্ণ আস্থাবান এবং খলিফা ওমর ফারুক (রা.)-কে অনুসরণ করে তিনি রাজ্য পরিচালনা করেছেন। খলিফা হয়েও যারা এই নীতি বহিঃর্ভূত তাদের তিনি অনুসরণ করেননি।” (হোসেন: ১৯৮২, ৭২-৭৩)

 

খান জাহান আলীর প্রতিষ্ঠিত এ রাজ্যে তিনি সাম্য, ন্যায়নীতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে জনগণের কাছে হাজির হন। ফলে স্থানীয় হিন্দু-বৌদ্ধসহ নানান জাতের মানুষ তাঁর হাতে ইসলাম কবুল করতে থাকেন। যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ তাঁর প্রধান শাগরেদ এবং খলিফাতাবাদ রাজ্যে তাঁর প্রধান মুখপাত্র আবু তাহের ওরফে পীর আলী (রহ.)। জনসাধারণের কাছে যাঁর পরিচিয়— পীরালী বাবা। তিনি নিজে ব্রাহ্মণ থেকে খান জাহান আলী (রহ.)—এঁর হাতে মুসলমান হন। এবং যোগ্যতাবলে তাঁর প্রধান মুখপাত্র কিংবা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর রাজ্যের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। সুতরাং দেখা গেল তাঁর সঙ্গে আসা সফরসঙ্গীরা যেমন তাঁর সহযোগিতায় একপায়ে খাঁড়া ছিলেন, তেমন আবু তাহের বা পীর আলীদের মতো স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ তাঁর হাতে বায়াত নেওয়ার ফলে তিনি আশপাশের বিস্তৃত অঞ্চলে দ্রুত শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। জীবনীকার মো. মাসুম আলীম বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থের বরাত দিয়ে লিখেছেন, “প্রায় ২০-২৫টি গ্রাম নিয়ে তাঁর রাজধানী খলিফাতাবাদ নগরী গড়ে ওঠে। এখানে খান জাহান আলী নিজের বাসভবন, প্রশাসনিক কেন্দ্র ও সেনানিবাস বা ব্যারাক ও অস্ত্রাগার নির্মাণ করেন। তাঁর প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে ছিল থানা নির্মাণ, চৌকী নির্মাণ, বিভিন্ন সরকারী দফতর, কোর্ট কাছারী ইত্যাদি। প্রশাসন চালানোর সুবিধার্তে তিনি তাঁর আওতাধীন দক্ষিণ বঙ্গকে কয়েকটি এলাকায় বিভক্ত করেন। মানুষের ঘরে ঘরে পৌছে দেন সুশাসন। বিখ্যাত ষাটগুম্বুজ মসজিদ ছিল তাঁর দরবারগৃহ। এখানে বসে তিনি তাঁর শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি তার নগরীকে এমন সুসজ্জিত ও শৃংখলিত করেন যে, সুলতানী আমলে এটি একটি বিরল উপমা হয়ে আছে। হযরত খান জাহান আলী (র.) প্রায় চল্লিশ বছর অর্থাৎ মৃত্যু পূর্ব পর্যন্ত এই অঞ্চল শাসন করেন। আমরা তার এই অঞ্চলকে একটি ছোটখাট রাজ্য হিসেবে ধরতে পারি। তাই আমরা দেখতে পাই তিনি শুধু ইসলাম প্রচারক বা সমাজসেবী হিসাবে নয়, বরং তিনি একজন সুশাসক হিসাবেও জনগণের কাছে খ্যাতি লাভ করেন। জনবসতি গড়ে তিনি সেখানে প্রশাসনিক ব্যবস্থা জোরদার করেন। এবং সমগ্র রাজ্যে ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে সক্ষম হন।” (আলীম: প্রাগুক্ত, ৪৩)

 

খলিফাতাবাদকে তিনি মোট ছয়টি অংশে ভাগ করেন বলে জানা যায়। বারোবাজার, মুরলী কসবা, পায়গ্রাম কসবা, হাবেলী কসবা, আমাদী কসবা এবং গৌরনদী কসবা। এসব অঞ্চলের প্রতিনিধি ছিলেন আবু তাহের পীর আলী, মহিউদ্দিন রেবাস শাহ, গরীব শাহ, বাহরাম শাহ, বোরহান খাঁ, ফতে খাঁ এবং ওয়াজিল খাঁ প্রমুখ। (হেলাল: ১৭)। রাজ্যকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে মূলত তিনি ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। যার ফলে প্রতিটি বিভাগেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য মসজিদ। তাঁর জীবনের গতিপথ গবেষণা করলে একটা বিষয় পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে যে, তিনি ষাট গম্বুজ মসজিদ স্থাপন করে প্রথমত সেখানে থেকে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। দ্বিতীয়ত, বিভাগীয় অঞ্চলগুলোরও শাসনের কেন্দ্রে ছিল মসজিদ। এভাবে মসজিদ টু মসজিদ শাসনের মাধ্যমে পুরো যশোর-খুলনা অঞ্চলে তাঁর অনুসারী দিনদিন বাড়তে থাকে। এবং সেই অনুসারীদের মাধ্যমে রাজধানীকে কেন্দ্র করে কখনো পাহাড় কেটে, কখনো জঙ্গল পরিষ্কার করে গড়ে উঠে নতুন নতুন বসতি। তাদের পানির চাহিদা পূরণের সুবিধার্থে খনন করা হয় অসংখ্য দিঘি, নদী ও খাল। এ যেন মসজিদে নববিতে বসে পরিচালিত হওয়া নবীজির শাসনকার্যেরই প্রতিফলন।

 

এতদ্‌সত্ত্বেও খান জাহান আলী (রহ.) শাসকের আভিজাত্যকে নিজের সত্তার মাঝে স্থান দেননি। তিনি আপাদমস্তক একজন দরবেশ হিসেবে নিজের জীবন অতিবাহিত করেছেন। বাদশাহির আত্মগরিমা কিংবা শাসকের ঐশ্বর্য কোনোটাই তাঁর মাঝে ছিল না। যার প্রমাণ— রাজ্য তাঁর হাতে প্রতিষ্ঠা পেলেও তিনি নিজের নামে মুদ্রা কিংবা খুতবা জারি করেননি। বরং তৎকালীন গৌড়ের শাসকের নামেই মুদ্রা প্রচলিত ছিল মর্মে বর্ণনা পাওয়া। বিশেষত, গৌড়ের সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৪৩৫-১৪৫৯) তাঁর গুণগ্রাহী ভক্ত ছিলেন। এতদ্‌সত্ত্বেও তিনি মাহমুদ শাহের নামেই মুদ্রা প্রচলিত রাখেন, নিজের নামে মুদ্রা প্রচলনের কোনো প্রমাণ কিংবা ইতিহাস পাওয়া যায় না। (হোসেন: প্রাগুক্ত, ২৫২)

 

খান জাহান আলীর জীবনকে প্রধানত দুভাগে বিভক্ত করলে তার একভাগকে দরবেশি জীবন এবং অপর ভাগকে শাসক জীবন হিসেবে পাওয়া যাবে। গভীর রাতে তিনি খোদা সান্নিধ্য তালাশে যেমন নিমগ্ন থাকতেন, দিনের আলোয় তেমনি শাসকের ভূমিকা পালন করতেন খলিফাদের আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে। তিনি মূলত জীবনকে রাঙাতে চেয়েছেন আল্লাহর একজন আদর্শ খলিফার জীবনের রঙে। যেখানে দিনভর মানুষের কল্যাণে, ইসলামের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে রাজ্যভার চালিয়ে নিতে হয়, আবার গভীর রাতে মওলার একান্ত অনুরাগী বান্দা হয়ে সিজদায় পড়ে তাঁর সান্নিধ্য তালাশ করা হয়। বাস্তবেই এমন এক বিচিত্র জীবন তিনি অতিবাহিত করেছেন যথাযথভাবে। যার একদিকে ছিল ইসলামের ঝাণ্ডা সমুন্নত করার আকাঙ্ক্ষা, অপরদিকে মানুষকে খোদা তায়ালার পথে নিয়ে আসার অক্লান্ত পরিশ্রম।

নির্দেশিত গ্রন্থাবলি:

১. আমাদের সূফিয়ায়ে কেরাম: দেওয়ান নূরুল আনোয়ার হোসেন চৌধুরী সম্পাদিত, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯৫

২. বাংলাদেশের সূফী সাধক: ড. গোলাম সাকলায়েন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ২০১৯

৩. হযরত খান জাহান আলী: জীবন ও কর্ম, ড. মুহাম্মদ শফিকুল্লাহ সম্পাদিত, পৃষ্ঠা ৪১, মো: মাসুম আলীম, আল-মাকতাবাতুশ-শাফিয়া, রাজশাহী, ২০০২

৪. খানে আজম হজরত খান জাহান (র.): সৈয়দ ওমর ফারুক হোসেন, মোরশেদ পাবলিকেশন, বাগেরহাট, ১৯৮২

৫. হযরত খানজাহান আলী (র.) এঁর জীবনী ও ষাট গম্বুজ মসজিদ পরিচিতি: মাওলানা মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, বাগেরহাট, ২০০২