ফরায়েজি আন্দোলনের প্রাক্কালে হাজী শরীয়তুল্লাহ

পলাশী-পরবর্তী সময়ে উপমহাদেশের মুসলমানগণ কখনোই দুধে-ভাতে থাকতে পারেনি। একদিকে ব্রিটিশ বেনিয়াদের দুঃশাসন, তো অপরদিকে হিন্দু জমিদারদের নিষ্পেষণ।

সময়ে সময়ে আরোপিত বৈষম্যমূলক করের বোঝা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কষাঘাত আর নীলকরদের অবর্ণনীয় অত্যাচারের স্টিম রোলার—সবমিলিয়ে কলোনিয়াল পিরিয়ডে মুসলমানদের ইতিহাস এক নিদারুণ উপাখ্যান। সুলতানি, মুঘল আর নবাবি সময়ে বাঙালি মুসলমান সামাজিকভাবে যতটা প্রভাব-প্রতিপত্তির অধিকারী ছিল, কলোনিয়াল পিরিয়ডে এসে তা একেবারে তলানিতে এসে যায়। ইসলাম সীমাবদ্ধ হতে থাকে ব্যক্তিগত চর্চায়; যুক্ত হয় কিছু সামাজিক কুসংস্কারও।

এমন ক্রান্তিকালে মুসলমানদের সামাজিক পুনর্জাগরণে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন হাজী শরীয়তুল্লাহ। তার ‘ফরায়েজি ফালসাফা’ শুধু ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা রূপ নিয়েছিল সামাজিক ও জাতীয় পুনর্জাগরণে।

 

বিখ্যাত সংস্কারক হাজী শরীয়তুল্লাহর জন্ম বর্তমান শরীয়তপুর জেলার অন্তর্গত শিবচর থানার শামাইল গ্রামে। জন্মসাল নিয়ে বিবিধ মত থাকলেও অধিকাংশ ইতিহাস-গবেষক ১৭৮১ সালের কথা উল্লেখ করেছেন। ১৭৭১ কিংবা ১৭৭৯ অথবা ১৭৮০ খ্রিষ্টাব্দের কথাও বিভিন্ন ইতিহাসগ্রন্থে পাওয়া যায়। তার পিতা আবদুল জলিল তালুকদার ছিলেন একজন প্রজাবৎসল তালুকদার৷ তার দুজন চাচা ছিলেন—তাদের মধ্যে মুহাম্মদ আজিম তালুকদার শামাইলে থাকতেন, কিন্তু অপর চাচা মুহাম্মদ আশিক থাকতেন মুর্শিদাবাদে, যিনি একজন আলেম এবং মুর্শিদাবাদের নবাব বাহাদুরের দরবারে মুফতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন। (কিসমতী: ১৯৮৮, ৩) শিশুবয়সে মাকে হারানোর কিছুদিন পরে ৮ বছর বয়সে বাবাকেও হারান শরীয়তুল্লাহ। নিঃসন্তান পির্তৃব্য আজিম তালুকদারের তত্ত্বাবধানেই তিনি লালিত-পালিত হন। (প্রাগুক্ত)

 

পিতৃসম চাচার আদর-যত্নে পারিবারিক পরিমণ্ডলেই তার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয়; এরপর ভর্তি হন স্থানীয় শিক্ষায়তনে। কিন্তু গ্রামে লেখাপড়ার ভালো কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এদিকে স্নেহপরায়ণ চাচাও পিতৃহীন এই বালককে দূরে কোথাও পাঠাতে রাজি ছিলেন না। অবশেষে চাচার অগোচরে তিনি লেখাপড়া করতে কলকাতা গিয়ে হাজির হন। (সাত্তার: ১৯৯৩, ১৪০)

 

কলকাতায় তিনি মাওলানা বাশারত আলীর সান্নিধ্যে লেখাপড়া চালিয়ে যান। মাওলানা নিজেই শরীয়তুল্লাহর ব্যয়ভার বহন করতেন। উল্লেখ্য,  মাওলানা ছিলেন ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে প্রচারিত বিভিন্ন সংগ্রামী প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত। ইংরেজ সরকারে রোষানলে পড়ে মাওলানাকে ১৭৯৯ সালে দেশ ছাড়তে হয়। হিজরত করেন পবিত্র মক্কায়; শরীয়তুল্লাহও ছিলেন তার সফরসঙ্গী।

 

কলকাতায় থাকাকালীন মাওলানা বাশারত আলীর পরামর্শে আরবি ও ফারসি ভাষায় শেখার জন্য তিনি গমন করেন হুগলী জেলার অন্তর্গত বিখ্যাত ফুরফুরা শরিফে। সেখানে দুই বছর অবস্থান করে উভয় ভাষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এরপর পিতৃব্য মাওলানা আশিকের সাথে সাক্ষাৎ করতে মুর্শিদাবাদ যান। “একদিন সেই চাচার সঙ্গে নৌকাযোগে স্বগ্রামে আসার পথে কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়েন। তাতে চাচা ও চাচী উভয়েই প্রাণ হারান।” (প্রাগুক্ত) কিন্তু অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান শরীয়তুল্লাহ। স্বদেশে না গিয়ে দুঃখভরা মনে ফিরে আসেন কলকাতায়।

 

মাওলানা বাশারত আলীর সাথে হাজী শরিয়তুল্লাহ যখন ১৭৯৯ সালে মক্কায় গমন করেন, তখন তিনি ছিলেন মাত্র ১৮ বছরের যুবক। সেখানে তিনি বুযুর্গ মাওলানা তাহের সুম্বল আল-মাক্কীর ছাত্র হন এবং তার নিকট কুর‌আন-হাদিস ও ফিকহে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ইলমে শরিয়তের পাশাপাশি ইলমে মারিফত শেখার উদ্দেশ্য তিনি মাওলানা তাহের সুম্বলের মুরিদ হন। (মওদুদ: ১৯৮৫, ১৪) বাই‌আত গ্রহণের পর তাহের সুম্বলের নিকট শরীয়তুল্লাহ প্রায় ২০ বছর অবস্থান করেন। উল্লেখ্য, মাওলানা তাহের সুম্বল আল-মাক্কী ছিলেন শাফেয়ী মাজহাবের অনুসারী এবং কাদেরিয়া তরিকায় খিরকাহপ্রাপ্ত। “আরও জানা যায়, হাজী শরীয়তুল্লাহর মক্কা শরীফে মুরাদ বাঙালির নিকট দুই বছর আরবি সাহিত্য ও ফিকহ বিদ্যা অধ্যয়ন করেন।” (ইসলামী বিশ্বকোষ, খণ্ড ২৩, ৪১২)

 

ইলমে শরিয়ত ও মারিফাতে কামিল হওয়ার পর স্বদেশে ইসলামের বাণী পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে তিনি দেশে ফিরে আসেন। তার দেশে ফিরে আসার কারণ সম্বন্ধে আরও জানা যায়—তার চাচা মুহাম্মদ আজিম তালুকদার হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ খবর পেয়েই ১৮১৮ সালে মক্কা থেকে হাজী শরীয়তুল্লাহ দেশে ফিরে আসেন। (সাত্তার, প্রাগুক্ত, ১৪১) এসময় নি‌আমত বিবি নামক এক গুণবতী নারীর সাথে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। (সাকলায়েন: ১৯৯৩, ২০৪)

 

দেশে ফিরে এসেই হাজী শরীয়তুল্লাহ তার সংস্কার আন্দোলনের সূচনা করেন। এ সম্পর্কে ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খানের মন্তব্য প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “ফিরে এসে তিনি বাংলাদেশে ইসলামের বৃক্ষকে ঈমানের পানির অভাবে মৃতপ্রায় দেখেন এবং প্রতিকারের উদ্দেশ্যে ফয়ারেযী আন্দোলন আরম্ভ করেন।” (মালেক, রশীদ, নিবন্ধ; ২০০০)  জেমস ওয়াইজও অনুরূপ মন্তব্য করেছেন, “When eighteen years of age,  he made the pilgrimage to Meccah, but instead of returning, as was usual, he remaind a disciple of the wahabbi leaders then rulling the sacred city. About 1820, after an absence of tweenty years, he came back to India, a skillful disputer and a good arabic scholar.” (প্রাগুক্ত)

 

১৮১৮ সালে দেশে ফিরে হাজী শরীয়তুল্লাহ ব্রিটিশ শাসনাধীন বাংলার মুসলমান দুর্বিষহ অবস্থা লক্ষ করেন। বাঙালি মুসলমান তখন সামাজিকভাবে যেভাবে ছিল নিগৃহীত, ধর্মীয়ভাবেও ছিল অজ্ঞতা ও কুসংস্কারপূর্ণ। তিনি মুসলমানদের মাঝে দাওয়াতি কাজ শুরু করলেন; ইসলামের ফরজ বা অবশ্য-পালনীয় বিষয়াবলির ওপর আত্মনিয়োগের আহ্বান জানালেন। আহ্বানে খুব একটা সাড়া না পেয়ে তিনি মর্মাহত হন এবং পুনরায় মক্কা-মদিনায় সফরের মনস্থ করেন। এ প্রসঙ্গে A. R. Mallick-এর বরাতে ফুরকান আহমেদ তার গবেষণা-প্রবন্ধে মন্তব্য করেছেন এভাবে, “In 1818, Haji Shariatullah’s initial mission encountered obstacles as his preaching of pure doctrines failed to attract a significant audience. In response, he decided to return to Makkah to seek guidance from his teachers.” (Ahmed: 2021-2023, 35–36)

 

ব্যর্থ মনোরথে এবার শরীয়তুল্লাহ যাত্রা শুরু করেন পদব্রজে; প্রথমেই পৌঁছেন বাগদাদে। ইমাম হুসাইন (রা.)-এর স্মৃতিবিজড়িত শাহাদতগাহ ও মাজার এবং হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর মাজার যিয়ারত করেন। এরপর বায়তুল মুকাদ্দাস ও মিসর সফর শেষে তিনি পায়ে হেঁটেই মক্কায় গমন করেন। হজ পালন শেষে আপন মুর্শিদ তাহের সুম্বলের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং তার দোয়া দিয়ে মদিনায় গমন করেন। রাসুল পাক (দ.)-র রওজার নিকট তিনি দুবছর আধ্যাত্মিক সাধনায় কাটান। এ সময় তিনি উপর্যুপরি তিনবার নবীজীকে স্বপ্নে দেখেন। তিনি তাঁকে ইসলাম প্রচার করতে ভারতবর্ষে ফেরত আসতে নির্দেশ প্রদান করেন। স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে আপন মুর্শিদ তাহের সুম্বলের নিকট পুনরায় মক্কায় উপস্থিত হলেন। তাহের সুম্বল তার স্বপ্নের বর্ণনা শুনে তাকে খিলাফত প্রদান করেন এবং ‘কুতুবুল বঙ্গাল’ উপাধিতে ভূষিত করেন। আরো জানা যায়, হাজী শরীয়তুল্লাহকে খিলাফত প্রদান করে তাঁর পীর তাঁকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে মানুষের মধ্যে ইসলামী শরীয়তের প্রচারে আত্মনিয়োগ করার নির্দেশ দেন। (মালেক, রশীদ, নিবন্ধ; ২০০০)

 

নির্দেশিত গ্রন্থাবলী:

১. History of the Fara’idi Movement in Bengal (1818–1906) : Muin-ud-Din Ahmad Khan, Karachi : Pakistan Historical Society, 1965

২. বাংলাদেশের সুফী সাধক : ড. গোলাম সাকলায়েন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯৩

৩. ফরিদপুরে ইসলাম : মো: আব্দুস সাত্তার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯৩

৪. ওহাবী আন্দোলন : আবদুল মওদুদ, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, ১৯৮৫

৫. ইসলামী বিশ্বকোষ : ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, খণ্ড ২৩

৬. বাংলাদেশের সংগ্রামী ওলামা ও পীর মাশায়েখ : জুলফিকার আহমদ কিসমতী, প্রগতি প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৮৮

৭. হাজী শরীয়তুল্লাহ্‌ ও তার ফরায়েযী দর্শন : মুহাম্মদ আবদুল মালেক, মুহাম্মদ আবদুর রশীদ, নিবন্ধ; ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ৪০তম বর্ষ ২য় সং‌খ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০০০

৮. বাংলাদেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন : সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত, নিবন্ধ: ফরায়েযী ও ওহাবী আন্দোলন, মঈনুদ্দীন আহমদ খান, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৮৬

৯. Notes on the Races, Castes and Traders of Eastern Bengal : James Wise, Harrison and Sons, London, 1883, p. 22

১০. A critical review on the literature of the Faraizi movement : Furkan, A. Bangladesh Historical Studies. (2024)

১১. British Policy and the Muslims in Bengal 1757-1856: A Study of the Development of the Muslims in Bengal with Special Reference to Their Education: A. R. Mallick, Asiatic Society of Pakistan, Dhaka, 1961