হাজী শরীয়তুল্লাহ’র ফরায়েজি আন্দোলন: দশটি ফালসাফা

ফরায়েজি আন্দোলন সূচনালগ্নে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ছিল না, বরং এটি ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, যার ভিত্তি ছিল হাজী শরিয়তুল্লাহর ফরায়েজি ফালসাফা। ১৭৯৯ থেকে ১৮১৮ সাল পর্যন্ত মক্কায় অবস্থানকালীন তিনি খুব কাছ থেকেই মুওয়াহিদুন তথা ওয়াহাবি আন্দোলন পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পান।

তার এই ফরায়েজি ফালসাফা ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। A. R. Mallick যেমনটা বলেছেন, “The doctrines and tenets of the two nineteenth century reform movements which go by the name of the Faraidi and the Wahhabi movements, appear to be analogous to those of puratanic movement in Arabia, started considerably earlier by one Muhammad ibn ‘Abd al-Ahhabi.” (Mallick, 1961, 76)

 

H. Qureshi অবশ্য এ ব্যাপারে শরিয়তুল্লাহর ওপর ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রভাবের কথা অস্বীকার করেছেন, যেহেতু শরিয়তুল্লাহ নিজেকে কখনো ওয়াহাবি বলে পরিচয় দেননি। (Qureshi, 2012, 150) অপরদিকে, Muin-ud-Din Ahmad Khan ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রভাবের কথা স্বীকার করে বলেন যে, শরিয়তুল্লাহ প্রভাবিত ছিলেন তবে তিনি ওয়াহাবি আন্দোলনের সকল মূলনীতি গ্রহণ করেননি। (Khan, 1965, 11)

 

অতএব, শরিয়তুল্লাহ ও ফরায়েজি আন্দোলন সংশ্লিষ্ট একাধিক গবেষণা পর্যালোচনাপূর্বক বলা যায়,

শরিয়তুল্লাহর ফরায়েজি আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে সৌদি আরবের ওয়াহাবি আন্দোলনের রূপরেখা ও মৌলনীতির অনুসরণ নয়। আবার, এটি শতভাগ প্রভাবমুক্ত ছিল—এমনটা বললেও পূর্ণসত্য বলা হয় না।

উপমহাদেশে ফরায়েজি আন্দোলনকে বাস্তবে রূপদানের ক্ষেত্রে হাজী শরিয়তুল্লাহর কিছু বিশেষ চিন্তা-চেতনা, উপলব্ধি ও দর্শন কাজ করেছিল, যেগুলো আমরা তার ‘ফরায়েজি ফালসাফা’পরিভাষাটি দ্বারা উপস্থাপন করব।

 

ক.

ফরায়েজি কথাটি নিসবত, যা ফরজ শব্দমূল থেকে গৃহীত। বহুবচন ‘ফরায়েজ’ শব্দটির একবচন ফরিজা, যার অর্থ—অপরিহার্য কর্তব্য, অবশ্য-পালনীয় দায়িত্ব। ইসলামে আল্লাহ ও রাসুল (দ.)-এর যে-সকল আদেশ-নিষেধ অবশ্যই পালন করতে হয়, সেগুলো হলো ফরজ৷ শরিয়তুল্লাহ তৎকালীন মুসলমানদের ফরজ কর্তব্যসমূহ পরিপূর্ণরূপে পালনের প্রতি আহ্বান জানান। তাদের মূল স্লোগান হলো—ফরজ কাজ প্রথমে কর। ফরজ বাদ দিয়ে আড়ম্বরপূর্ণ রসম-রেওয়াজে মশগুল হওয়া বিদ‌আত ও পাপের উৎস। ফরজ পালনে জোরপ্রদান তার আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বিধায় একে ফরায়েজি আন্দোলন নামে নামকরণ করা হয়।

 

খ.

ফরায়েজি ফালসাফার প্রথম কথা হলো আল্লাহ তা‌আলার তাওহিদ বা একত্বের স্বীকৃতি দেওয়া। আল্লাহকে একমাত্র রব বা প্রতিপালক হিসেবে মেনে নেওয়া এবং তার ইবাদত করা। আল্লাহ তা‌আলার সার্বভৌমত্বে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত না করা এবং বিদ‌আত থেকে বিরত থাকা।

 

গ.

ফরায়েজি আন্দোলনের বৃহৎ একটি অংশ ছিল কৃষক ও কারিগর শ্রেণির সাধারণ মুসলমান। তারা শরিয়তুল্লাহর প্রচারিত ফালসাফায় বেশি আকৃষ্ট হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মুঈনুদ্দিন আহমদ খান বলেন, “হাজী শরীয়তুল্লাহ শ্রমলব্ধ উপার্জনকে হালাল রুযী হিসেবে অতি উচ্চ স্থান প্রদান করেন এবং শিল্পকর্মে ব্যাপৃত লোকজনকে কারিগর উপাধিতে ভূষিত করেন। তেলী বা কুলুদেরকে অন্যরা নিম্নবিত্তের লোক বলে হিংসা করত। হাজী সাহেব এদেরকেও কারিগর উপাধি গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেন।”(খান, ১৯৮৬, ১৩৪)

 

ঘ.

মুঈনুদ্দিন আহমদ খান আরও লিখেছেন, “ইসলামের বিশুদ্ধ নীতির অনুসরণে হাজী শরীয়তুল্লাহ মানুষের মমতা ও ভ্রাতৃত্বের উপর জোর দেন; একমাত্র আল্লাহকেই জমির প্রকৃত মালিক বলে ঘোষণা করেন এবং একমাত্র শ্রমকেই মানুষের অধিকার ও সম্পদের বৈধ উৎস বলে গণ্য করেন। এ নীতি অনুযায়ী জমির উৎপন্ন ফসল চাষীর প্রাপ্য বলে ঘোষণা করেন এবং মধ্যস্বত্বের দাবীদার জমিদারকে অবৈধ শোষক ও অত্যাচারী বলে মত প্রকাশ করেন। প্রণিধানযোগ্য, আল-কুরআনের নীতি অনুযায়ী সর্বপ্রকার আদেশের উৎস একমাত্র আল্লাহ্ এবং সর্বপ্রকার সম্পদের উৎস একমাত্র শ্রম। অতএব রাজত্ব, প্রশাসন ও ন্যায় বিচারের ক্ষমতা মূলত আল্লাহ্ প্রদত্ত এবং দাবি, অধিকার ও সম্পদের উৎস মূলত পরিশ্রম, অন্যভাবে বলতে গেলে, আল্লাহ ছাড়া হুকুম নেই এবং শ্রম ছাড়া অধিকার নেই। শেষোক্ত কথা আল-কুরআনে আরো সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রচেষ্টার ফল ছাড়া মানুষের কিছুই প্রাপ্য নাই।” (প্রাগুক্ত, ১৩৫)

 

ঙ.

শরিয়তুল্লাহ মুসলমানদের ওপর হিন্দু জমিদারদের আরোপিত কর প্রদানের বিরোধিতা করেন, তবে তিনি সরকার কর্তৃক নির্ধারিত বৈধ খাজনা দিতে কখনো বিরোধিতা করেননি। ফরিদপুরের তৎকালীন (১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দ) ম্যাজিস্ট্রেট যখন এ ব্যাপারে তদন্ত করেন তখন দেখা গেল, জমিদাররা মুসলমান কৃষকদের কাছ থেকে তেইশ প্রকারের অবৈধ কর আদায় করছে। হাজী শরীয়তুল্লাহ সেই সব করেরই বিরোধিতা করেন।  (প্রাগুক্ত, ১৬২) কারণ, এসব কর মূলত হিন্দুদের বিভিন্ন পূজা-পার্বণ উদযাপনের জন্য অবৈধভাবে মুসলমানদের কাছ থেকে আদায় করা হতো।

 

চ.

হাজী শরিয়তুল্লাহ ১০ই মুহররম উপলক্ষ্যে তাজিয়া বের করা, মাতম করা, ইমাম হুসাইনের কবর বানিয়ে মিছিল করা, তরবারি দ্বারা নকল কারবালা বানিয়ে উদযাপন করা প্রভৃতিকে শরিয়তসম্মত নয় বলে ফতোয়া দেন।

 

ছ.

তখন অমুসলিমদের অনুসরণে মুসলমানগণও শিশু জন্ম হলে ছাতি ও চিল্লার অনুষ্ঠান পালন করত। (সাত্তার, ১৯৯৩, ১৪৩) এসব অনুষ্ঠান শিশু জন্মের তিনদিনের মধ্যে পালিত হত। হাজী শরীয়তুল্লাহ এসব অনুষ্ঠান পালন করা মুসলমানদের জন্য অবৈধ বলে ফতোয়া প্রদান করেন এবং তার অনুসারীদের ইসলামে অনুমোদিত শুধু আকিকা অনুষ্ঠান পালনের নির্দেশ দেন।

 

জ.

বিয়ে অনুষ্ঠান উপলক্ষে সমাজে প্রচলিত কিছু রীতি-নীতিকে হাজী শরীয়তুল্লাহ শরীয়তসম্মত নয় বলে ঘোষণা করে তার অনুসারীদের সেসব পালন থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দেন। ইতোপূর্বে সমাজে বিয়ে উপলক্ষে অনেক রকম ভিন্নতর নিয়ম কানুন-পালন করা হতো। (সাত্তার, প্রাগুক্ত, ১৪৩) হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরায়েজিগণকে ধর্মবিবর্জিত অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করে কেবল শরিয়ত-সমর্থিত কার্যাদি পালনের নির্দেশ দেন। যেমন: শুধু বর ও কনের সাজসজ্জা করা, বিয়ে অনুষ্ঠান উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র লোকদের জন্য ওয়ালিমা অনুষ্ঠান করা ইত্যাদি। বিয়ের সময় গান বাজনা, নৃত্য, রং-তামাশা বর্জন করতে নির্দেশ দেন। হাজী শরীয়তুল্লাহর ঘোষিত নীতি অনুসারে ফরায়েযীগণ মুসলমান ইন্তেকাল করলে তার জন্য গোসল, জানাযা ও দাফন অনুষ্ঠান জরুরী মনে করেন। তবে কবরের মধ্যবর্তী স্থান উঁচু করা, কবরের উপর ইট পাথর দ্বারা স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, কবরে ফুল দেওয়া ইত্যাদি অবৈধ কাজ (না-জায়েজ) বলে ঘোষণা করেন।

 

ঝ.

হাজী শরীয়তুল্লাহ ইসলামের তওহীদ-এ জোর দিতেন। ‘পীরপূজা’, ‘কবরপূজা’ ইত্যাদির বিরুদ্ধে ‘জিহাদ’ ঘোষণা করলেন।… তিনি পীর-মুরিদীর স্থলে ‘শিক্ষক-ছাত্র’ প্রথার প্রচলন করলেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি স্বীয় মত সুন্দরভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ফরিদপুর ও ঢাকা অঞ্চলের বহু লোক তাঁর অনুসারী হন। (সাকলায়েন, ১৯৯৩, ২০৪)

 

ঞ.

হাজী শরীয়তুল্লাহ ছিলেন স্বদেশের স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত। জগদ্দল পাথরের মত দেশের বুকে চেপে বসা ইংরেজ শাসনকে তিনি অতীব ঘৃণা করতেন। তিনি মনে করতেন এ দেশ ‘দারুল-হরুব’ অর্থাৎ বিধর্মী রাজার অধীন রাজ্য। সুতরাং, এ দেশে জুমআর নামায ও ঈদের নামাযের আবশ্যকতা নেই।  (প্রাগুক্ত) ইতিহাসবিদ আর. সি. মজুমদার এ প্রসঙ্গে বলেন, “Shariatullah founded the Faraedi sect for religious reforms and began to preach his doctrine in 1804. But he gradually turned it to political end and declared the country under British occupations to be Darul Harb where a true Muslim should not live.” (Majumder, p. 57-58)

 

বিশ বছর ধরে গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে ঘুরে ঘুরে হাজী শরীয়তুল্লাহ ফরায়েজি ফালসাফার দাওয়াত জনসাধারণের নিকট পৌঁছে দেন। ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, কুষ্টিয়া, ঢাকা, ময়মনসিংহ প্রভৃতি অঞ্চলে ফরায়েজি আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে এবং বহু মানুষ দলে দলে ফরায়েজি আন্দোলনে যোগদান করতে শুরু করে।

নির্দেশিত গ্রন্থাবলি:

১. British Policy and the Muslims in Bengal 1757-1856: A Study of the Development of the Muslims in Bengal with Special Reference to Their Education: A. R. Mallick, Asiatic Society of Pakistan, Dhaka, 1961

২. History of the Fara’idi Movement in Bengal (1818–1906) : Muin-ud-Din Ahmad Khan, Karachi : Pakistan Historical Society, 1965

৩. The Muslim Community of Indo-Pakistan Subcontinent, 610-1947: A Brief Historical Analysis : I. H. Qureshi, (The Hague, London: Mouton and Co., 1962), quoted in আবদুল বশীর: বাংলার কৃষক বিদ্রোহ ও মধ্যবিত্তশ্রেণী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০১২

৪. বাংলাদেশের সুফী সাধক : ড. গোলাম সাকলায়েন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯৩

৫. ফরিদপুরে ইসলাম : মো: আব্দুস সাত্তার, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ঢাকা, ১৯৯৩

৬. হাজী শরীয়তুল্লাহ্‌ ও তার ফরায়েযী দর্শন : মুহাম্মদ আবদুল মালেক, মুহাম্মদ আবদুর রশীদ, নিবন্ধ; ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, ৪০তম বর্ষ ২য় সং‌খ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর, ২০০০

৫. বাংলাদেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন : সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ও মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত, নিবন্ধ: ফরায়েযী ও ওহাবী আন্দোলন, মঈনুদ্দীন আহমদ খান, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ১৯৮৬