“২০২৪-২৫ সালে সারাদেশে সংঘটিত মাজারে হামলা” বিষয়ে ৮টি বিভাগের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন

সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সম্পাদনা:

মোহাম্মদ আবু সাঈদ

পেপারওয়ার্ক: মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম

ফিল্ডওয়ার্ক: আবু হাসান মোহাম্মদ মুখতার

 

ভূমিকা

বাংলাদেশে ইসলামের আগমন, প্রচার ও প্রসার হয়েছে সুফিদের নেতৃত্বে। এ প্রসঙ্গে অদ্যাবধি যত গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে প্রায় সবগুলোতেই সুফিদের একক নেতৃত্ব প্রমাণিত হয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে সৈয়দ আহমদ বেরলভীর অনুসারী কর্তৃক সুফি-সমাজের অভ্যন্তরীণ সংস্কার আন্দোলন তুমুল জনপ্রিয়তা পেলেও তারা কোনো মাজার ভেঙেছেন এমন তথ্য পাওয়া যায় না। সুফি-সমাজের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে ঔপনিবেশিক শাসনের শেষদিকে; আকরম খাঁ, আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহরা এ বিষয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ব। ঔপনিবেশিক আমলে সুফি-সমাজের অভ্যন্তরীণ সংস্কার বিষয়ে যে তুমুল আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো তার উপর ধীরে ধীরে একক আধিপত্যবাদ বিস্তার করে আরবের আবদুল ওহাব নজদীর ওহাবীবাদ। বাংলাদেশে সুফি-সমাজ, মুসলিম সমাজের সংস্কার বিষয়ে ওহাবীবাদের একক আধিপত্য বিস্তারের ফলেই এটি সরাসরি সহিংসতায় পর্যবসিত হয়েছে। ইতিহাসের বহুমুখী ধারাবাহিকতা ও ওহাবীবাদের একক আধিপত্য বিস্তারের ফলে সুফি সমাজের উপর সঙ্ঘবদ্ধ হামলাকে ‘সংস্কার’ প্রশ্নের একটি টুল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশে ইসলামের যে-সকল মতাদর্শিক জনগোষ্ঠীর উপর ওহাবীবাদ আধিপত্য বিস্তার করেছে সে-সকল জনগোষ্ঠী স্বৈরাচারের আমলে অংশত মজলুম ছিল বিধায় স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে হ‌ওয়া জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে। এই শক্তি তারা তাদের থেকে ভিন্ন মতাবলম্বী সুফি-সমাজের উপর সঙ্ঘবদ্ধ ও ধারাবাহিক হামলায় অপব্যবহার করেছে। এই হামলার মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সরাসরি আঘাত করেছে এবং এর ফলে বাংলাদেশের মুসলমান সমাজের মূল্যবোধ আক্রান্ত হয়েছে। মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক বিরোধকে তর্ক-বিতর্ক, বাহাসের জায়গা থেকে জোরপূর্বক সহিংসতায় জড়িয়ে বিরোধকে শত্রুতা ও সমঝোতাকে সহিংসতায় রূপদানের মাধ্যমে মুসলমান সমাজের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ভেদরেখা টেনে দেয়া হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে বহুদলীয় গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বজায় রেখে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ছাত্র-জনতা দেখেছে সেই স্বপ্নকে সর্বপ্রথম নস্যাৎ করা হয়েছে মাজারে আক্রমণের মধ্য দিয়ে। ইসলামের নামে উগ্রবাদী সহিংসকামী গোষ্ঠীর আঘাতে মাজারের সঙ্গে সঙ্গে মুসলমান সমাজ‌ও চূর্ণ বিচূর্ণ হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর‌ও কেন বাংলাদেশের সমাজ বহুধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে তার একটি উত্তর মিলবে এইখানে।

 

“মাকাম: সেন্টার ফর সুফি হেরিটেজ” সুফি-সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম সুফি জনগোষ্ঠীর উপর এমন ব্যাপক, সঙ্ঘবদ্ধ ও ধারাবাহিক হামলা হয়েছে। এতে অস্তিত্ব সংকট না হলেও সুফি-সমাজের সামাজিক নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা যে ব্যাপকভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সুফি-সমাজের উপর এই সঙ্ঘবদ্ধ ও ধারাবাহিক হামলার রেকর্ড সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরী বলে বিবেচনা করেছে ‘মাকাম’।

 

প্রথমত, মুহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং আমাদের ব্যক্তিগত যৌথ উদ্যোগে ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মাজার হামলার বিষয়ে একটি আর্কাইভ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এই বিষয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট করে আর্থিক সহায়তার আবেদন‌ও করা হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত সাড়া না পাওয়ায় মাকাম’র আওতায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রজেক্টটি পরিচালনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। অতঃপর মাকাম’র রিসার্চ এসোসিয়েট আবু হাসান মুহাম্মদ মুখতার এবং মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম প্রজেক্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রথমজন ফিল্ড‌ওয়ার্ক ও দ্বিতীয়জন পেপারওয়ার্কের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন।

আমাদের পরিকল্পনা ছিল, ২০২৪-২৫ সালে মাজার হামলা বিষয়ে মাকাম’র পক্ষ থেকে বিভাগীয় প্রতিবেদন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে। ২০২৪-২৫ সালে চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগে মাজারে হামলা হয়েছে মোট হামলার দুই তৃতীয়াংশ (৬৬%)। বাকি ৬টি বিভাগ মিলে মাজারে হামলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৪%। যে কারণে আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা প্রথমে চট্টগ্রাম ও পরবর্তীতে ঢাকা বিভাগের প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও বাকি ৬টি বিভাগের প্রতিবেদন স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকেছি।

সারাদেশে সংঘটিত সকল হামলা প্রতিবেদনে যুক্ত হয়েছে এমন দাবি আমরা করছি না। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, সকল হামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে, যাচাই-বাছাই করতে এবং নির্দিষ্ট ফরম্যাটে প্রকাশ করতে। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত নিউজ, রিপোর্টের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে হামলার ভিডিও সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যে-সকল হামলার বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি এবং যে-সকল ঘটনা তুলনামূলক ভয়াবহ ও সন্দেহমূলক ছিল সে-সকল ক্ষেত্রে ফিল্ড‌ওয়ার্কের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কোনো কাজ‌ই সম্পূর্ণ ক্রুটিমুক্ত নয়; প্রতিবেদনে যদি কোনো তথ্যগত, ভাষাগত ও অন্যান্য ক্রুটি চোখে পড়ে এবং মাকামকে জানানো হয়, মাকাম সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে যাচাই-বাছাই করে সংশোধন করতে। এক্ষেত্রে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।

এই প্রতিবেদনের সময়সীমা: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫।

আর্কাইভ তৈরির উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন মুহাম্মদ মিজানুর রহমান। ফিল্ড‌ওয়ার্ক ও পেপার‌ওয়ার্কের যথাযথ দায়িত্ব পালন করে প্রজেক্টকে সফল করার কৃতিত্ব আবু হাসান মুহাম্মদ মুখতার এবং মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের। ফিল্ড‌ওয়ার্কে আবু হাসান মুহাম্মদ মুখতারকে সহযোগিতা করেছেন মাহিম করিম ও মুনীর উদ্দীন আহমেদ। প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে শুরু করে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন ও অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়েছেন ইমরান হুসাইন তুষার। তাঁদের সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।পরিশেষে এমন বন্ধুর ও শ্রমসাধ্য পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ‘২০২৪-২৫ সালে সারাদেশে সংঘটিত মাজারে হামলা’ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করা সম্ভব হয়েছে এজন্য মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। সংশ্লিষ্ট সকলকে আল্লাহ তায়ালা উত্তম প্রতিদান দান করুন, আমীন।

 

পুরো প্রতিবেদনটি পড়তে পিডিএফ ডাউনলোড করুন:

মধ্যযুগের বঙ্গীয় বদ্বীপ নামচিহ্ন সহ যে মানচিত্র ও ভাবার্থ আমি ইশারা করছি, তার গোড়ায় রয়েছেন বিভিন্ন সম্প্রদায়, ভাবের ও ভাষার মানুষজন। তারা কখনো একক পরিচয়, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।…
আতিফ খলিল, লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় …