হযরত পীর বদর আউলিয়া: চট্টগ্রাম আবাদকারী ঐতিহাসিক সুফি

বদর শাহ্’র মাজার শরীফকে চট্টগ্রামের সর্বপ্রাচীন ইমারত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক বারো আউলিয়া কথাটি বাংলাদেশের সর্বত্র, বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চল নিয়ে বহুল পরিচিত ও ব্যবহৃত।

চট্টগ্রামের আরেক নাম “বারো আউলিয়ার দেশ”।


বারো আউলিয়ার মধ্যে পীর বদরউদ্দীন আল্লামা ওরফে বদরে আলম বা বদর পীর (রহঃ) সবচেয়ে প্রসিদ্ধ। তাঁকে বারো আউলিয়ার নেতা এবং অভিভাবক স্থানীয় ব্যক্তিত্ব (Patron Saint) হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, নদীমাতৃক বাংলাদেশের সব জায়গাতেই পীর বদর আউলিয়া সমানভাবে সম্মানিত।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক পরিচয় বহন করলেও তিনি “দরিয়ার পীর”, “জলেশ্বর”, “মাঝিমাল্লাদের পৃষ্ঠপোষক”, “মাঝিমাল্লাদের রক্ষাকর্তা” হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। (সাকলায়েন: ১৯৯১, ১০২)

 

বদর পীরের বংশ পরিচয় সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তিনি হযরত ইমাম শেহাবুদ্দীন মক্কীর বংশধর ছিলেন এবং তাঁদের আদি নিবাস ছিল আরবে। আনুমানিক ১৩৩৮ সালে, আরব (মতান্তরে ইয়েমেন) থেকে বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের আমলে চট্টগ্রামে আসেন বদর পীর। বারো আউলিয়ার পুণ্যভূমি খ্যাত চট্টগ্রামে আগমন করা প্রথম সুফি সাধক হিসেবে ধরা হয় পীর বদর আউলিয়াকে। (আলম: ২০০২, ১৩৪)


কেউ কেউ আবার বলেন, চতুর্দশ শতকের প্রথমদিকে তিনি চট্টগ্রামে এসেছিলেন। বলা হয় যে, হাজী খলিলকে সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামে এসেছিলেন তিনি। চট্টল গবেষক আবদুল হক চৌধুরী লিখেছেন, “চতুর্দশ শতকে আরব থেকে সমুদ্রপথে বদর শাহ্ ও হাজী খলিল পীর ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম আগমন করেন। তাদের আগমনের কিছুকাল পর ১৩৪০ খ্রিষ্টাব্দে সোনারগাঁর সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহ্ প্রথম চট্টগ্রামকে মুসলিম শাসনভুক্ত করেন। বদর শাহ্ ও হাজী খলিল পীর সুলতান ফখরুদ্দীন মোবারক শাহকে চট্টগ্রাম বিজয়ে সাহায্য করেছিলেন। তখন থেকেই সত্যিকারভাবে ইসলাম প্রচার এখানে আরম্ভ হয়েছিল।” (পূর্বোক্ত)


ঐতিহাসিকদের মতে, হযরত শাহজালাল ইয়ামেনি এবং তাঁর সঙ্গী হযরত নাসিরুদ্দিন সিপাহসালারের সহযোদ্ধা হিসেবে তরফ পরগণার অত্যাচারী রাজা আচক নারায়ণের বিরুদ্ধে বদর পীর যুদ্ধ করেছিলেন। তরফ বিজয়াভিযানে অংশগ্রহণকারী বারো আউলিয়ার অন্যতম একজন ছিলেন তিনি।


বাংলার প্রথম স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের বীর সেনাপতি কদল খাঁ গাজীর চট্টগ্রাম অভিযানকালে (১৩৪০খ্রিস্টাব্দে) হযরত বদর শাহ্ পীরের সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়েছিল বলে জানা যায়। সপ্তদশ শতকের কবি মুহাম্মদ খান তাঁর বংশ পরিচয় দিতে গিয়ে বারো আউলিয়া ও হযরত বদর শাহ্ পীরের কথা উল্লেখ করেছেন। কবি “মক্তুল হোসেন”(১৬৪৬) কাব্যে বলেন,

‘‘তাঁর পূর্বপুরুষ মাহি আছোয়ার যখন হাজী খলীল পীরকে সঙ্গে নিয়ে আরব দেশ থেকে চট্টগ্রাম আগমন করেন, তখন কদল খাঁ গাজী পীর, তাঁর প্রাণের সখা শায়খ শরফুদ্দিন এবং শাহ্ বদরে আলম এর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাত হয়’’। (পূর্বোক্ত, ১৩৫)

মোগল আমল এবং মধ্যযুগ নিয়ে রচিত বিভিন্ন বইয়ের তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, ১৩৩৮ সালে আরব থেকে পীর বদর পাথরের কিস্তিতে (নৌকা) চড়ে রওনা দিয়ে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে প্রবেশ করেন এবং নদীর যে স্থানে পাথরটি থেমে যায় সেই স্থানে তিনি নেমে পড়েন। পরবর্তীকালে বদর শাহ্কে বহনকারী পাথরের স্মারকরূপে সে স্থানটি “পাথরঘাটা” নামে পরিচিতি পায়।


পীর বদর যখন পাথরের কিস্তি (নৌকা) থেকে নামেন তখন জায়গাটি ছিল কর্ণফুলী নদীর একেবারে তীরে। পরবর্তী সময়ে তিনি এখানে বসবাস শুরু করেন। সে সময়ের পীর বদরের বাড়ির সামনের অংশ এখন মাজার শরিফের পেছনের দিকে চলে এসেছে। এই পেছনের অংশই এখন সামনের গেট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। রাস্তার মুখোমুখি গেটটি এখন না থাকলেও পেছন দিকের ধ্বংসাবশেষ কিছুটা রয়ে গেছে এখনো। এখানে সেই সময়ে থাকা একটি মাত্র ঘরেই তিনি অবস্থান করতেন এবং ধর্ম প্রচারে কাজ করতেন। (Qanungo: 1988, 167)

ইতিহাসের পাতায় ও সামাজিকভাবে কথিত আছে, চট্টগ্রামের আদি নাম ‘চাটিগাঁ’ তাঁর জ্বালানো চাটি বা চেরাগ থেকে এসেছে। এ চেরাগ থেকেই চাঁটগা, চাঁটগ্রাম হয়ে চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি হয়েছে। চট্টগ্রাম আবাদকারী হিসেবে পীর বদরের নাম সর্বজনবিদিত। সেই সময়ে জিন-পরীদের নিয়ন্ত্রণ বা দখলে ছিল জঙ্গলে ভরা চট্টগ্রাম। বদর শাহ্ একটি মাটির চেরাগ (প্রদীপ বা বাতি) হাতে নিয়ে পাথরখণ্ড থেকে নেমে তীরে উঠে গভীর বন-জঙ্গলের মধ্যে কিছুদূর অগ্রসর হয়ে একটি পাহাড়ের ওপর উঠলে জিন-পরী তাঁকে বাধা দেয়। পরে সেই জিন-পরীদের কাছে তিনি এ জায়গায় চেরাগ জ্বালানোর অনুমতি চান। কিন্তু তখন জিন-পরীরা চেরাগ কী জিনিস সেটা বুঝতে পারেনি। যার কারণে তারা পীর বদর আউলিয়াকে চেরাগ জ্বালানোর অনুমতি দেয়। তখন একটি মাটির প্রদীপ তিনি আগুন দিয়ে জ্বালান। চতুর্দিকে সে প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে যাওয়ার পরে সেখানকার জিন-পরীরা সবাই চলে যেতে শুরু করে। মূলত চেরাগ জ্বালানোর মাধ্যমে তিনি চট্টগ্রাম শহর থেকে দূর করেছিলেন অশুভ আত্মা। (Qanungo, ibid)
চেরাগ জ্বালানোর সেই স্মৃতিবিজড়িত জায়গাটি “চেরাগী পাহাড়” নামে পরিচিতি লাভ করেছে। যেখানে আজো পীর বদরের সেই স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে প্রতিদিন সন্ধ্যায় চেরাগ জ্বালানো হয়।

হযরত পীর বদর আউলিয়া (রহঃ) শুধু চট্টগ্রামেই নয়, বার্মা থেকে মালয় অবধি সুবিস্তৃত অঞ্চলে তিনি সুপরিচিত ছিলেন। সমুদ্র উপকূল ধরে দক্ষিণে সুদূর মালয় উপদ্বীপ ছাড়িয়েও সমুদ্রগামীদের কাছে তিনি নিত্যদিনের রক্ষক হিসেবে বিবেচিত। আরাকানের মধ্যযুগীয় বৌদ্ধ রাজাগণ তাঁর সমাধির জন্য কয়েকটি গ্রাম ওয়াকফ করে দেন এবং তারা তীর্থযাত্রী হিসেবে এ পবিত্র মাজারে আসতেন ও মাজারে দান-খয়রাত করতেন। মায়ানমারের টেনাসেরিমের জনগণ তাঁকে “মাদরা” বলে ডাকতো। আকিয়াবের অধিবাসীদের কাছে তিনি “বুদ্ধ আউলিয়া বা বুদ্ধ সাহেব” হিসেবে পরিচিত। চট্টগ্রাম যখন আরাকানের শাসনে ছিল তখন আরাকানি শাসকরাও এ মাজারকে খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। আরাকানিরা এখানে এসে তাদের ভক্তি নিবেদন করত। তখনকার আরাকানি শাসক এ মাজারের ব্যয়ভার বহনের জন্য কয়েকটা গ্রাম ওয়াকফ করে দিয়েছিলেন। (Qanungo, ibid, 72)
এ প্রসঙ্গে যদুনাথ সরকার লিখেছেন—


“On a height within the fort is a tomb, known as astana of Pir Badar; the attendants of the shrine perform prayer and fast. The Magh infidels…..have settled some villages in wakqf on this tomb; they make pilgrimage to the holy dead and offer presents.”


পরবর্তী যুগে বার্মার শাসকরাও বদর আউলিয়ার মাজারকে বিশেষ সম্মান করতেন বলে জানা গেছে। ১৭৮৬ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে, চট্টগ্রামে গভর্নরকে লিখিত চিঠিতে বার্মার রাজা হজরত বদরুদ্দিনকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাধক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। হযরত বদর শাহ্ (রহঃ) এতই খ্যাতি লাভ করেছিলেন যে, তাঁর দর্শনের জন্য ব্যাকুল হয়ে চতুর্দশ শতকের মরক্কো দেশীয় পর্যটক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে আসেন। কিন্তু ইতিপূর্বে এ দরবেশের ইন্তেকাল ঘটলে ইবনে বতুতার সে আশা আর পূরণ হয়নি। (Sarkar: 1920, 105)

আরব বণিকগণ আসাম থেকে মালয় পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্র উপকূলে অসংখ্য মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বদর পীরের প্রভাবে কালক্রমে এগুলি ‘‘বদর মকান” নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রকৃতপক্ষে, বদর মকানগুলি ছিল আরবদের জাহাজ ঘাটা। ব্যবসায়ী, ভ্রমণকারী, ধর্ম প্রচারক ও ভাগ্যান্বেষীরা এ সকল স্থানে উঠানামা করতেন। বদর মকানগুলো এদের আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। এসবের অনেকগুলোতেই তাঁদের কোন কোন চিহ্ন (মসজিদ, আসন, চিল্লা, কুয়া) প্রভৃতি বিদ্যমান। এগুলো জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই ভক্তি ও সম্মানের চোখে দেখে থাকেন। বদর টিলা, বদর খালী, বদর কুয়া, বদর মকান প্রভৃতির নামে খ্যাত পাহাড়, নদী, কূপ, স্থান ইত্যাদি চট্টগ্রাম থেকে আরাকান পর্যন্ত বিস্তৃত স্থান জুড়ে অদ্যাপি দেখা যায়।

বদর পীরের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক স্থানের নাম। যেমন: বদরমোকাম, কক্সবাজার; বদরপাতি, বক্সীরহাট; বদরপুর, মতলব, পটুয়াখালী; বদরখালী, চট্টগ্রাম; চেরাগীপাহাড়, চট্টগ্রাম। এছাড়া চট্টগ্রামে একপ্রকার সামুদ্রিক মাছ “বদরের ছুরি” নামে পরিচিত। ছুরি মাছের শুঁটকী চট্টগ্রামবাসীর অতি প্রিয় খাবার।

পীর বদর শাহ্ (রহঃ) এর ইন্তেকালের সময় নিয়ে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি ৮৪৪ হিজরী মোতাবেক ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। টিকে থাকা সামান্য কিছু আদি স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বদর শাহ্’র মাজার শরীফকে চট্টগ্রামের সর্বপ্রাচীন ইমারত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন বিভিন্ন ঐতিহাসিক। এটি চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার নিকটস্থ “বদরপট্টী” এলাকায় অবস্থিত। স্থাপত্যশৈলী দেখে এ ইমারতের সঙ্গে সুলতানি আমলে তৈরি হওয়া অন্যান্য ইমারতের বেশ সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মাজারে ঢুকতেই ইবাদতখানা। তার মাঝামাঝি আরো একটি চতুষ্কোণ কক্ষে বদর আউলিয়ার মাজার। ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখা যায় কাচের শোকেসে পাথরের কিস্তিটি (নৌকা) সংরক্ষিত আছে এবং দেয়ালে লাগানো আছে নাসখ্শৈলীতে লেখা (পার্সি ভাষায় লিখিত) একটি শিলালিপি। সুদৃশ্য গিলাফে ঢাকা বদর আউলিয়ার মূল মাজারটি বদর আউলিয়ার সময়কালে নির্মিত হয়েছে। এ কক্ষের উপরই আছে গম্বুজ। এ ইমারতের একটি নির্দিষ্ট ঘরে পীর বদর আউলিয়া বসবাস করতেন।


পীর বদর শাহ্ একজন সূফী সাধক হিসেবে মুসলমানদের পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের মানুষের কাছে পরম শ্রদ্ধেয় মনীষী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। জলপথের রক্ষাকর্তারূপে মাঝিমাল্লাদের মনে আজো স্বমহিমায় বিরাজ করছেন। চট্টগ্রাম আবাদকারী পীর বদর, ইতিহাসের এক অনন্য উজ্জ্বল নক্ষত্র।

নির্দেশিত গ্রন্থাবলি:
1. A History of Chittagong, Volume 1: Suniti Bhushan Qanungo, Signer Library, Chittagong, 1988
2. Studies in Mughal India: Jadunath Sarkar, Longmans Green and Co. New York, 1920
৩. চট্টগ্রামের অলী দরবেশগণ: মাহবুব উল আলম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০২
৪. বাংলাদেশের সুফী সাধক: ড. গোলাম সাকলায়েন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা, ১৯৯১