সারসংক্ষেপ:
বাংলায় ইসলাম প্রচার-প্রসারে সুফিরা যে নীতি (Policy) অবলম্বন করেছিলেন তাতে লঙ্গরখানার অবস্থান, গুরুত্ব ও প্রভাব কেমন ছিল তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র এই লেখায় তুলে ধরা হয়েছে। রমজান মাসে বাংলাদেশে চলমান যে ইফতার আয়োজনের মহাযজ্ঞ দৃশ্যমান তাকে সুফিদের লঙ্গরখানারই একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য, সুফিদের লঙ্গরখানা পরিচালনার সঙ্গে চলমান ইফতার আয়োজনের ধারার যোগসূত্র তালাশ করা।
***
সুফি শব্দটি কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি আদর্শ, সমাজ, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র চরিত্রকে ধারণ করে। এই চরিত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, লঙ্গরখানা। যেখানে কোনো জাত-পাত-আদর্শ-ধর্ম-ভাষা-পেশা-সংস্কৃতির কোনোরকম বাছবিচার না করে অভুক্ত মানুষকে বিনামূল্যে খেতে দেয়া হয় তাকে লঙ্গরখানা বলে। সুফি সংস্কৃতিতে লঙ্গরখানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এটি মূলত খানকাহ’র একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাংলায় সুফিগণ আসতে শুরু করেন ইংরেজি একাদশ শতাব্দী থেকেই— বাংলার প্রথম সুফি হিসেবে যিনি স্বীকৃত হযরত শাহ সুলতান রুমি, তিনি ১০৫৩ সালে বাংলায় আগমন করেন। তাঁর কিছুকাল পরেই একে-একে আগমন করেন বাবা আদম শহীদ, শাহ সুলতান বলখী, শাহ মীরান, শাহ মখদুম ও অন্যান্য সুফিবৃন্দ। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ জায়গায় খানকাহ স্থাপন করেন এবং খানকাহ থেকেই ইসলামের প্রচার-প্রসারে ও সুফি-সাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। খানকাহ আইডিয়াকে আমলে নিলে এটি ধরে নেয়াই স্বাভাবিক যে, তাঁদের প্রত্যেকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছে লঙ্গরখানা।
লঙ্গরখানার মডেল নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। খানকাহ/দরগাহ/দরবারের যিনি প্রধান—পীর/মুর্শিদের নিকট ভক্ত, মুরিদ ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা যে হাদিয়া পেশ করেন তাই লঙ্গরখানা পরিচালনার প্রাথমিক রসদ। দ্বিতীয় ধাপে, বাংলায় লঙ্গরখানা পরিচালনার সঙ্গে রাষ্ট্রের একটি সম্পর্ক ছিল। সুফিদের সম্মানার্থে ও তাঁদের ইসলাম প্রচারে সহযোগিতার লক্ষ্যে মুসলিম শাসকরা লাখেরাজ সম্পত্তি প্রদান করতেন। এই লাখেরাজ সম্পত্তির আয় সম্পূর্ণরূপে ব্যয় হতো লঙ্গরখানা পরিচালনায়। শাসকদের এই সহযোগিতার ফলে বাংলায় লঙ্গরখানা ব্যাপকতা লাভ করেছে।
বাংলার সবচেয়ে প্রাচীন লঙ্গরখানার বিষয়ে জানা যায় ইবনে বতুতার রেহলা থেকে। ইবনে বতুতা লিখেছেন: “তাঁর নিকট মুসলমানের পাশাপাশি হিন্দুরাও আসতো। তারা যে হাদিয়া পেশ করতো তা উপস্থিত ভক্তবৃন্দ ও আগত শুভাকাঙ্ক্ষীরা খেতেন।”[1] এটি লঙ্গরখানার একটি চিরাচরিত রীতি। পীরের নিকট তাঁর ভক্ত/মুরিদ যে খাবার হাদিয়া হিসেবে পেশ করবে তা চলে যাবে লঙ্গরখানায় এবং সেখানে খাবারের জন্য অপেক্ষারতদের মাঝে তা বিতরণ করা হবে। হযরত শাহজালালের খানকাহে যে লঙ্গরখানা ছিল তার একটি স্বাভাবিক দৃশ্যই ইবনে বতুতা তুলে ধরেছেন।
বাংলায় আরেকটি লঙ্গরখানার বিষয়ে ইতিহাসবিদগণ গুরুত্ব সহকারে বর্ণনা করেছেন। সুলতানী আমলের তৎকালীন রাজধানী পাণ্ডুয়ার বিখ্যাত সুফি শায়খ আলাওল হক নিজস্ব তত্ত্বাবধানে লঙ্গরখানা পরিচালনা করতেন। তাঁর লঙ্গরখানা ছিল খানকাহ ও মাদ্রাসার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর মাদ্রাসার সঙ্গে সঙ্গে লঙ্গরখানাটিও হয়ে উঠেছিল সুবিখ্যাত। লঙ্গরখানার মাধ্যমে তিনি এতটাই প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিলেন যে, তৎকালীন শাসক সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ তাঁর মাদ্রাসা ও লঙ্গরখানা বন্ধ করে তাঁকে পাণ্ডুয়া থেকে সোনারগাঁয়ে হিজরত করতে বাধ্য করেন। এর পেছনে ইতিহাসবিদগণ দুটি কারণ খুঁজে পান: শাসকের ঈর্ষা এবং লঙ্গরখানার ব্যয়বাহুল্যতা। অধ্যাপক আবদুল করিম লিখেছেন: “it is said that he is spent a large sum of money in feeding the pupils, beggars and wanderers. But sultan grew jealous, because the state treasury also could not have born such a large expenditure. The sultan therefore ordered the saint to leave the capital and to go to Sonargaon. In Sonargaon, however, the saint spent twice the amount. Nobody knew where this huge sum came, his possession included only two gardens, which also later on, he gave to a beggar.”[2] অর্থাৎ, কথিত আছে যে, তিনি ছাত্র, ভিক্ষুক এবং ভবঘুরেদের খাওয়ানোর জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। কিন্তু সুলতান তাঁর এহেন কার্যকলাপে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন, কারণ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেও এমন ব্যাপক খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না। তাই সুলতান শায়খকে রাজধানী পাণ্ডুয়া ছেড়ে সোনারগাঁ যাওয়ার নির্দেশ দেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, সোনারগাঁয়ে গিয়ে তিনি লঙ্গরখানা পরিচালনায় দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করেছিলেন। কেউ জানত না, এমন ব্যাপক অর্থ কোথা থেকে আসতো। তাঁর সম্পত্তিতে কেবল দুটি বাগান ছিল, যা পরে তিনি একজন ভিক্ষুককে দান করেন।
শায়খ আলাওল হকের প্রতি সুলতানের ঈর্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ মোহর আলীর বর্ণনাতেও: “Shaikh ‘Ala’ al-Haq weilded great influence among the populace by virtue of his vast learning, unblemished character and charity so much so that the Sultan grew jealous of him and banished him to Sonargaon.”[3]
শায়খ আলাওল হককে হিজরত করতে বাধ্য করা হয়েছিল কেবল তাঁর লঙ্গরখানা পরিচালনার বিপুল ব্যয় ও জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকার কারণে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, সোনারগাঁয়ে হিজরত করার পরও তিনি বন্ধ রাখেননি তাঁর কার্যক্রম, বরং পূর্বের চেয়ে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করেছেন। এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আলাওল হকের সাধনায় লঙ্গরখানা কতটা গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে গণ্য ছিল।
স্বয়ং সুলতান কর্তৃক হিজরতের নির্দেশ থেকে বোঝা যায়, লঙ্গরখানা পরিচালনার মাধ্যমে একজন সুফি সামাজিকভাবে এত বেশি গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম ছিলেন যার সামনে স্বয়ং সুলতান পর্যন্ত কনফিডেন্স হারিয়েছেন, ইনসিকিউরিটি ফিল করেছেন। বাংলার সুফি-সমাজ ইসলাম প্রচার-প্রসারে, সুফিচর্চায় কীভাবে লঙ্গরখানার মাধ্যমে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন এ ঘটনা থেকে তা স্পষ্ট।
শায়খ আলাওল হকের পুত্র হযরত নূর কুতুবুল আলমের লঙ্গরখানা বিষয়েও ইতিহাসে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। তিনি ছিলেন পিতা আলাওল হকের লঙ্গরখানার প্রধান কর্মী। মুসাফিরখানায় আগত মেহমানদের সেবাযত্ন, লঙ্গরখানা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, লঙ্গরখানার রান্নার জন্য পাহাড় থেকে লাকড়ি কেটে আনা ইত্যাদি কাজগুলো তিনি আঞ্জাম দিতেন।[4] তাঁর পিতা ইন্তেকালের পর আজীবন তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর দরগাহ— যাকে শাষ হাজারী বা ছয় হাজারী দরগাহ বলা হতো সেখানেও লঙ্গরখানার অবস্থান ছিল কেন্দ্রীয় চরিত্রে। সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এই দরগাহের জন্য যে পরিমাণ জমি লাখেরাজ সম্পত্তি হিসেবে প্রদান করেছিলেন সে জমি থেকে বছরে ৬ হাজার টাকা আয় হতো। এ কারণে এই দরগাহকে ছয় হাজারী দরগাহ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।[5] জমি থেকে প্রাপ্ত আয়ের অধিকাংশই ব্যয় হতো লঙ্গরখানায়। সেই সুলতানী আমল থেকে চালু হওয়া লঙ্গরখানার কার্যক্রম ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত ছিল।
সোনারগায়েঁর একজন আউলিয়ার মাজার রয়েছে যিনি বাবা শাহ লঙ্গর নামে পরিচিত। ইতিহাস ও স্থাপত্য গবেষক হাবিবা খাতুন সূত্র উল্লেখসহ দাবি করেছেন, তিনি ছিলেন উপমহাদেশের বিখ্যাত সুফি শাহ মোজাফফর বলখির নাতি। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমসাময়িক এই সুফি দিল্লিতে সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের কুশক-ই লাল মাদ্রাসার শিক্ষক এবং শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরীর খলিফা ছিলেন।[6]
গবেষকগণ ধারণা করেন, ‘হযরত শাহ লঙ্গর নিজের আস্তানার সংগে কোনো বড় আকারের লঙ্গরখানা কায়েম করেছিলেন, যেখান থেকে তিনি গরীব, দুঃখী ও অভাবী নওমুসলিমদের আহার যোগাতেন। এ লঙ্গরখানা অত্যধিক প্রসিদ্ধি ও সাফল্য লাভ করেছিল। যার ফলে পরবর্তীকালে তার আসল নাম ও পরিচয় এর অন্তরালে চাপা পড়ে গিয়েছিল।’[7]
বাংলায় সুফিদের লঙ্গরখানা বিষয়ে একবাক্যে বলতে হলে বলা যায়, বাংলায় এমন কোনো সুফির খানকাহ, দরগাহ খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে যেখানে লঙ্গরখানা ছিল না। লঙ্গরখানার মাধ্যমেই মূলত তাঁরা জনসেবা করতেন। লঙ্গরখানার কার্যক্রম বহুভাবে বিভক্ত ছিল।
ক. সমাজের নিম্নশ্রেণির দরিদ্র ও অসহায় মানুষরা লঙ্গরখানায় খাবার খেতেন।
খ. ইসলাম গ্রহণের ফলে কোনো পরিবার যদি একঘরে হয়ে বেকায়দায় পড়তো তখন তারা লঙ্গরখানা থেকে খাবার গ্রহণ করতেন।
গ. পীর সাহেবের নিকট আগত/সর্বদা অবস্থান করা মুরিদ, ভক্তরা খানকায় থাকতেন এবং লঙ্গরখানায় খেতেন।
ঘ. মুসাফির, ভবঘুরে বা যে কোনো প্রকার মেহমান মুসাফিরখানায় অবস্থান করতেন এবং লঙ্গরখানা থেকে খাবার গ্রহণ করতেন।
এভাবে একটি লঙ্গরখানা পরিচালনার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষকে পীর-দরবেশগণ কানেক্ট করতেন। লঙ্গরখানা একটি কিন্তু এখানে প্রবেশ করছেন স্বয়ং পীর সাহেব থেকে শুরু করে শাগরেদ, মুসাফির থেকে শুরু করে দরিদ্র অমুসলিম সকলেই। ইতিহাসবিদরা যে বলেছেন, বাংলায় ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচারের পেছনে ইসলামের সামাজিক সাম্য আদর্শ অত্যন্ত গভীরভাবে কাজ করেছে— এখানে লঙ্গরখানার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। লঙ্গরখানায় যাত-পাত বাছবিচার ব্যতীত সকলে এক সারিতে এক পাতিল থেকে খাবার গ্রহণ করার যে দৃশ্য তা যে কোনো শ্রেণীর অমুসলিমকেই আকৃষ্ট করতে বাধ্য। বিশেষত যখন বাংলার ব্রাহ্মণ্যবাদী কাঠামোর যাঁতাকলে পিষ্ট নিম্নশ্রেণির হিন্দু সমাজের নিকট এমন দৃশ্য ছিল কল্পনাতীত ও আশাজাগানিয়া বিষয়। যে দরিদ্র ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ খাবার খেতে পারে না বেলা করে তাঁর কাছে সময়মতো খাবারের পাশাপাশি এমন উঁচু-নিচু ভেদাভেদের প্রথাবিরোধী দৃশ্য নিছক কোনো ঘটনা নয়, বরং গৎবাঁধা সমাজ থেকে বের হয়ে ইসলামের মানবিক সমাজব্যবস্থায় প্রবেশ করতে ইসলাম গ্রহণের জন্য দারুণ প্রলুব্ধকর এক দৃশ্য। লঙ্গরখানা থেকে প্রভাবিত হয়ে কত মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছেন, মুগ্ধ হয়েছেন ইসলামের ভ্রাতৃত্ববোধে তার পরিসংখ্যান ইতিহাসে নেই।
লঙ্গরখানার মাধ্যমে সুফিদের এই মানবিক কার্যক্রম এখনো চলমান। বাংলাদেশে সুফিদের উত্তরসূরী হিসেবে যত দরগাহ, দরবারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে প্রায় সবখানেই পুরো রমজান মাসব্যাপী ইফতার আয়োজনের ব্যবস্থা রয়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত এমন কোনো দরবার, দরগাহ বোধহয় বাদ নেই যেখানে সর্বসাধারণের জন্য ইফতারের আয়োজন না করা হয়। এই আয়োজন দেখে মনে পড়ে যায় বাংলার ঐতিহাসিক সুফিদের লঙ্গরখানা পরিচালনার কথা। এটি কেবলই খাবারের বিষয় নয়, বরং একত্রে মিলেমিশে ইফতার সম্পন্ন করার মাধ্যমে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সামাজিক সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ও ইসলামের মানবিক সমাজব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয় দরবার মাইজভাণ্ডারে রমজান উপলক্ষে হয়েছে ইফতারের এলাহী কারবার। মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফের প্রতিটি মঞ্জিল থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের ইফতার সম্পন্ন করছে। কেবল ইফতারই নয়, দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের ইফতার সামগ্রী বিতরণ করেছে দরবার সংশ্লিষ্ট একাধিক সংগঠন।
দরবারে সিরিকোটের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্ট চট্টগ্রামের আলমগীর খানকা ও ঢাকার মসজিদ-এ তৈয়্যেবিয়ায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের জন্য ইফতারের ব্যবস্থা করছে। খান বাহাদুর আহছানউল্লাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আহছানিয়া মিশন নলতা দরবার শরীফে পুরো রমজান মাসব্যাপী ব্যাপক পরিসরে ইফতারের আয়োজন করেছে। প্রতিদিন দশ হাজারের অধিক মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি।
ঢাকার বিখ্যাত হাইকোর্ট মাজার তো ইফতার আয়োজনের জন্য বিখ্যাত। গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার মানুষ মাজার প্রাঙ্গণে একসাথে ইফতার সম্পন্ন করেন। গতবছর মাজার কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রতিদিন ১৫০০ থেকে ৪৫,০০০ মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করা হতো। এবছর সংখ্যাটা বেড়েছে বৈ কমেনি। মিরপুর শাহ আলী মাজারেও বিপুল পরিমাণ মানুষ প্রতিদিন একত্রে ইফতার করেন।
এভাবে বাংলাদেশের বৃহৎ থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ে প্রায় প্রতিটি দরবার, দরগাহ, খানকায় লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য আয়োজন করা হয় ইফতারের। কোথাও নেই কোনো উঁচুনিচু ভেদাভেদ, নেই মুরিদ, ভক্ত বা সুফি সমাজের অনুরাগী হবার শর্ত! নিঃশর্তে ও নিঃস্বার্থে বাংলাদেশের দরবার, দরগাহ, মাজার কর্তৃপক্ষ প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষকে ইফতার করানোর মহাযজ্ঞে লিপ্ত থাকছেন।
বাংলার ঐতিহাসিক সুফিগণ যেভাবে লঙ্গরখানা পরিচালনার মাধ্যমে দরিদ্র অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, মানবিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ নির্মাণের সূচনা করেছেন এবং সুফি-সমাজের যে কর্তব্য তা পালনে সচেষ্ট ছিলেন তারই ধারাবাহিকতা আজকের সুফি সমাজের ইফতারকেন্দ্রিক কার্যক্রম। বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী বলেছেন, আমাকে যদি পৃথিবীর সকল সম্পদ দেয়া হতো তাহলে আমি মানুষকে খাওয়ানোর মাধ্যমেই তা শেষ করতাম। এই উক্তির মধ্যে রয়েছে মানুষকে খাওয়ানোর অর্থাৎ মানবিক সেবায় সুফি-সমাজের আত্মনিবেদনের ইশারা। সুফিগণ আদর্শের চেয়ে মানুষ নিয়ে বেশি ভেবেছেন; তত্ত্বের চেয়ে বাস্তবতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন; দুনিয়াবি সকল কার্যক্রমের মূলে রেখেছেন মানুষকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলায় আগত প্রথম পর্যায়ের সুফি-সমাজ থেকে শুরু করে বর্তমান সুফি-সমাজেও বিরাজমান। কম-বেশি হলেও মানুষ থেকে, মানবিক কার্যক্রম থেকে বিচ্যুত হননি তারা।
লক্ষণীয় বিষয়, কেবল দরগাহ, দরবারেই নয়, বরং বর্তমানে বেশিরভাগ মসজিদে ইফতারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মুসুল্লিরা একত্রে মিলেমিশে ইফতার করছেন। এই মহতী উদ্যোগ ও আয়োজনের পথিকৃৎ সুফি-সমাজ। সুফিগণ আজ থেকে আটশ বছর পূর্বে বাংলায় যে মানবিক কার্যক্রম শুরু করেছিলেন তার প্রভাব কেবল দরবার, দরগাহ, খানকায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং সাধারণ মুসলমান সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলার সুফি-সমাজ পূর্বপুরুষের অনুসরণে বর্তমানেও ইফতার কার্যক্রম চলমান রাখার মাধ্যমে যেভাবে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখছেন, সুফি-সমাজ ও সংস্কৃতির সৌন্দর্য ছড়িয়ে দিচ্ছেন সবখানে, মানবিক, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে সচেষ্ট রয়েছেন তা বাংলাদেশের আগামীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ও সুফি-সমাজের নেতৃত্বের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।