আন্তর্জাতিক সুফি-সমাজে যে ৪টি তরিকা ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য ও বিপুলভাবে সমাদৃত— কাদেরিয়া, চিশতীয়া, নকশবন্দিয়া ও মোজাদ্দেদিয়া— তন্মধ্যে কাদেরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর বংশধরই বাংলায় সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আগমন করেছেন। কেবল আগমনই নয়, বাংলায় ইসলামের প্রচার-প্রসারে, সুফি-সমাজ ও সংস্কৃতির বিস্তারে ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। গাউছে পাকের বংশধরধের এই ভূমিকা নিরূপণে প্রথমেই তাঁদের পরিচয় ও জীবনকর্ম সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
গাউছে পাকের ইন্তেকাল, মাজার ও বংশধরের বসবাস বাগদাদে। কিন্তু সুফি-সাধনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ সফর’র ফলে তাঁরা কেবল বাগদাদে আবদ্ধ থাকেননি, ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে সফর করেছেন ও বসতি গেড়েছেন পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বাংলায় আগমন করেছেন এবং এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন এমন বহু সুফি ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায়।
শাহ মীরান
বাংলায় বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর বংশধর হিসেবে সর্বপ্রথম আগমন করেন হজরত শাহ মীরান রহ.। তিনি ইসলাম প্রচারের লক্ষ্যে ইংরেজি ত্রয়োদশ শতকে নোয়াখালী জেলার কাঞ্চনপুরে আগমন করেন। পারিবারিক সম্পর্কে তিনি গাউছে পাকের পৌত্র অর্থাৎ নাতি ছিলেন।[1] লেখক ওহীদুল আলম সূত্রের উল্লেখ ব্যতীত বলেছেন, মীরান শাহ ১২জন শিষ্য নিয়ে পাণ্ডুয়ায় আগমন করেন। তৎকালীন সুলতান ফিরোজ শাহ তাঁকে বাংলার যেখানে ইচ্ছা সেখানে বসবাসের অনুমতি দেন এবং তাঁর জন্য লাখেরাজ সম্পত্তি প্রদান করেন। অতঃপর তিনি নোয়াখালী অঞ্চলে এসে বসতি গেড়ে স্থায়ী হয়েছিলেন।[2]
শাহ মাখদুম রূপোশ
হজরত শাহ মীরানের ছোট ভাই হজরত শাহ মাখদুম রূপোশ। একসাথেই তাঁরা প্রবেশ করেছেন বাংলায়। তিনিও গাউছে পাকের পৌত্র অর্থাৎ নাতি। রাজশাহীতে দেওবলি ইস্যুকে কেন্দ্র করে হজরত তুরকান শাহ’র শহীদের সংবাদ শুনে তিনি রাজশাহীতে ছুটে যান এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করে ইসলাম প্রচারের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। হযরত শাহ মখদুমের কোনো সন্তান ছিল না।[3]
মজজুবা বিবি
হজরত শাহ মীরান ও শাহ মাখদুমের সঙ্গে এসেছিলেন তাঁদের এক বোন যিনি পরিচিত মজজুবা বিবি নামে। সাম্প্রতিক সময়ে খোদাই করা তাঁর মাজারের নামফলকে লেখা রয়েছে: সৈয়দা সালেহা মঞ্জুবা বিবি (রহ.)। লেখক ওহীদুল আলমের মতে, তিনি ছিলেন মীরান শাহ’র ভাগিনী অর্থাৎ ভাইয়ের মেয়ে।[4] বোন কিংবা ভাগিনী কোনো দাবির পক্ষেই ঐতিহাসিক ন্যূনতম প্রমাণ নেই। তাঁর জীবনকর্ম সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। নোয়াখালী জেলার কাঞ্চনপুরে তাঁর মাজার রয়েছে। মাজারের নামে একটি জনশ্রুতি রয়েছে যে, এখানে এসে আল্লাহর দরবারে কিছু চেয়ে দোয়া মোনাজাত করলে আল্লাহ তা কবুল করেন।
হযরত শাহ নূর
গাউছে পাকের বংশধর ও শাহ মখদুমের নিকটাত্মীয় হযরত শাহ নূর বাগদাদ থেকে ষোলো শতকে বাংলায় আগমন করেন। সম্রাট হুমায়ুনের রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরে পাবার ঘটনার সঙ্গে তাঁর বাংলায় আগমনের সম্পর্কের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়।[5] তিনি রাজশাহীতে আগমন করে শাহ মখদুমের অসিয়ত মোতাবেক তাঁর সিলসিলার খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ইসলাম প্রচারে নিয়োজিত হন। তাঁর দুই সন্তান ছিলেন— শাহ আরিফ ও শাহ কবীর। তাঁর আওলাদের মাধ্যমেই শাহ মখদুম রূপোশের মাধ্যমে আগত কাদেরিয়া তরিকার দীর্ঘস্থায়ী প্রচার-প্রসার হয়েছে।
শাহ কামিস
গাউছে পাকের বংশধর হযরত শাহ কামিস পনেরো শতকে মুর্শিদাবাদের সালুরাহ (Salurah) নামক অঞ্চলে আগমন করেন। স্থানীয় ধার্মিক ব্যক্তি নাসরুল্লাহ’র মেয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। জীবদ্দশায় সুফি ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। ১৫৮৪ সালে তিনি মুর্শিদাবাদে ইন্তেকাল করেন।[6]
হযরত হামিদুদ্দীন গৌড়ী
বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর ৮ম অধস্তন পুরুষ হযরত হামিদুদ্দীন গৌড়ী তৎকালীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের কাজী পদে নিয়োজিত হন। কাজী পদের কার্যক্রম সম্পন্ন করে ১৫৭৫ সালে তিনি চট্টগ্রামে আগমন করেন। তিনি প্রথমে চট্টগ্রামের পটিয়া থানার অন্তর্গত কাঞ্চননগরে বসতি স্থাপন করেন। পটিয়ায় হামিদগাঁও নামে একটি গ্রাম আছে যা তাঁর নামানুসারে নামকরণ করা হয়েছে।[7] তিনি ঠিক কত সালে ইন্তেকাল করেন তাঁর সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তাঁর বংশধর থেকেই পরবর্তীতে মাইজভাণ্ডারী তরিকা প্রতিষ্ঠিত হয়। তরিকার প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী তাঁর পঞ্চম অধস্তন পুরুষ।
আবদুর রহিম শহীদ
বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর বংশধর হজরত আবদুর রহিম শহীদ ১৭০৮ সালে ঢাকায় আগমন করেন। তাঁর দাদা ব্যবসার উদ্দেশ্যে বাগদাদ থেকে কাশ্মীরে আসেন এবং তিনি কাশ্মীর থেকে ঢাকায় আসেন জ্ঞানচর্চা ও সুফি সাধনার মাধ্যমে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে। তিনি ১৭৪৫ সালে ঢাকার লক্ষ্মীবাজার মিয়া সাহেবের ময়দানে নিজস্ব দায়রায় ইন্তেকাল করেন।[8]
সৈয়দ জাকের আলী আল-কাদেরী
১৭৮০ সালে গাউছে পাকের বংশধর সৈয়দ জাকের আলী আল-কাদেরী পশ্চিম বাংলার মেদিনীপুরে আসেন এবং বসতি স্থাপন করেন। তিনি গাউছে পাকের ১৬তম অধস্তন পুরুষ। তিনি বীরভূম ও বর্ধমান জেলার অসংখ্য মানুষকে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসেন। জীবদ্দশায় তাঁর মুরিদের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৭৯২ সালে তিনি মেদিনীপুরে ইন্তেকাল করেন। তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার অর্থাৎ খেলাফত লাভ করেন ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা সৈয়দ তোফায়েল আলী আল-কাদেরী।[9] বংশ পরম্পরায় তাঁরা কাদেরিয়া তরিকার খেলাফত লাভ করেন এবং তরিকার প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত ছিলেন। পশ্চিম বাংলার বিখ্যাত সুফি দরবার মেদিনীপুর দরবার শরীফ এই বংশেরই আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠান। এখনো গাউছে পাকের বংশধর দ্বারা উক্ত দরবার শরীফে কাদেরিয়া তরিকার চর্চা জারি রয়েছে।
সৈয়দ শাহ মুরাদ ও সৈয়দ বাহাউদ্দিন বাকের
লেখক মোঃ রুহুল আমিন সাবের দাবি করেছেন, উল্লেখিত দুইজন গাউছে পাকের নাতি এবং তারা মুঘল আমলে কুমিল্লায় এসে বসতি গেড়েছিলেন। গোমতী নদীর তীরে বর্তমান চরবাকের নামক এলাকাটি নদী ভাঙ্গনের ফলে তলিয়ে যাচ্ছিলো। এমতাবস্থায় সৈয়দ বাহাউদ্দিন বাকের এই এলাকায় এসে বসতি গাড়েন এবং তাঁর বরকতময় উপস্থিতির ফলে এলাকাটি নদী ভাঙ্গন থেকে রক্ষা পায়। ফলে, উক্ত এলাকার নামকরণ হয় চরবাকের।[10] কিন্তু কুমিল্লা জেলার ইতিহাস সম্পর্কিত একাধিক গ্রন্থ ও বাংলার সুফি-সাধক সম্পর্কিত বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে তালাশ করার পরও এই দুইজন আউলিয়ার নাম, মাজার সম্পর্কে কিছুই পাওয়া যায়নি।
শেখ আবদুস সোবহান
উল্লেখিত শেখ বাহাউদ্দিন বাকেরের বংশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন শেখ আবদুস সোবহান। কুমিল্লা শহরের বিখ্যাত সুফি শাহ আব্দুল্লাহ গাজিপুরীর নিকট তিনি বাইয়াত গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পীরের নিকট থেকে তিনি কাদেরিয়া তরিকার খেলাফত লাভ করেন। সুফি-সাধনার বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে কুমিল্লার শাহপুর নামক স্থানে তিনি বসতি গেড়েছেন এবং সেখানে ১৯৫৫ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন।[11] বর্তমান শাহপুর নামক দরবার শরীফটি তাঁর সিলসিলা মোতাবেক তাঁর বংশধর কর্তৃক পরিচালিত হয়ে আসছে।
উপরে উল্লেখিত গাউছে পাকের বংশধরধের মধ্যে ৪জনের পরবর্তী জীবন ও সন্তানসন্ততি সম্পর্কে জানা যায়নি। তাঁরা হলেন: শাহ মীরান, শাহ মখদুম, মজজুবা বিবি এবং শাহ মুরাদ। এই ৪জনের মধ্যে ৩জনের মাজার রয়েছে এবং মাজার-সংশ্লিষ্ট সমাজে তাঁদের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব রয়েছে। সৈয়দ শাহ মুরাদের মাজারের ব্যাপারে কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
সৈয়দ শাহ নূর’র বংশধর এখনো রাজশাহীতে বসবাস করছেন। শাহ মখদুম রূপোশ ও সংশ্লিষ্ট মাজারের দেখাশোনার দায়িত্বে তাঁরা নিয়োজিত আছেন। কিন্তু তরিকা, সিলসিলার প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে কোনো দরবার তাঁরা পরিচালনা করছেন না।
মুর্শিদাবাদের সৈয়দ শাহ কামিসের বংশধর সেখানে দীর্ঘদিন যাবৎ বসবাস করেছেন। কিন্তু তরিকা, সিলসিলার প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে কোনো দরবার তাঁরা পরিচালনা করছেন কি-না এ ব্যাপারে জানা যায় না।
বাংলায় অন্তত ৪টি দরবার চলমান রয়েছে যা উল্লেখিত গাউছে পাকের বংশধর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত।
১. মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ: ১৫৭৫ সালে চট্টগ্রাম আগমন করা হযরত হামিদুদ্দীন গৌড়ীর ৫ম অধস্তন পুরুষ হযরত আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী কর্তৃক চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাইজভাণ্ডার দরবার শরীফ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে উনিশ শতকের শেষদিকে নিজ গ্রাম ফটিকছড়িতে তিনি এই তরিকার প্রবর্তন করেন। এখনো পর্যন্ত বাংলায় প্রবর্তিত এটিই একমাত্র তরিকা। এই তরিকার প্রাণপুরুষ ছিলেন সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারীর ভ্রাতুষ্পুত্র সৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই তরিকার শাখা-প্রশাখা বিদ্যমান রয়েছে। সাংস্কৃতিকভাবে বাংলাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ দরবার এটি। পরিচিতি ও জনপ্রিয়তার দিক থেকেও মাইজভাণ্ডার দরবার কাতারের প্রথম সারিতেই থাকবে। বলা যায়, গাউছে পাকের বংশধরগণ কর্তৃক বাংলায় যত দরবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মাইজভাণ্ডার তন্মধ্যে সবচেয়ে বিস্তৃত ও জনপ্রিয়।
২. মেদিনীপুর দরবার শরীফ: গাউছে পাকের ১৬তম অধস্তন পুরুষ সৈয়দ জাকের আলী ১৭৮০ সালে মেদিনীপুরে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর বংশধর কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় মেদিনীপুর দরবার শরীফ। পশ্চিম বাংলায় এই দরবারের গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা প্রশ্নাতীত। ঔপনিবেশিক আমলে বহু অমুসলিম এই দরবারের ছায়াতলে এসে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। বিখ্যাত সাহিত্যিক কবি কায়কোবাদ এই দরবারের পীর সাহেব সৈয়দ এরশাদ আলী আল-কাদেরীর মুরিদ ছিলেন। বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলায় এই দরবারের ভক্ত মুরিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। ১৯০২ সাল থেকে মেদিনীপুর দরবারের উরস শরীফে যোগদান করতে রাজবাড়ী জেলা থেকে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ ট্রেন বরাদ্দ দেয়া হয়। পাকিস্তান ও পরবর্তীতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও এই বিশেষ ট্রেনের বরাদ্দ থেমে থাকেনি। প্রতি বছর উরসের সময় রাজবাড়ী থেকে বিশেষ ট্রেনের মাধ্যমে হাজার হাজার ভক্ত মুরিদ মেদিনীপুর দরবার শরীফে যান এবং আনুষ্ঠানিক আধ্যাত্মিক রেওয়াজ পালন করেন।
৩. মিয়া সাহেব ময়দান: ১৭০৮ সালে ঢাকায় আগমন করা সুফি আবদুর রহিম শহীদ ছিলেন চট্টগ্রামের বিখ্যাত আউলিয়া আমানত শাহ’র পীর ও মুর্শিদ। তিনি ঢাকায় আগমন করে পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার মিয়া সাহেব ময়দানের একটি ছোট্ট জায়গায় খানকাহ স্থাপন করেন এবং এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তাঁর বংশধরের মাধ্যমে খেলাফতের সিলসিলা ও কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তাঁর বংশধরের মধ্যে যিনি গদিনশীন তিনি কাদেরিয়া তরিকার সিলসিলা মোতাবেক বাইয়াত করিয়ে থাকেন। ব্যাপক ও বিস্তৃত না হলেও এই দরবারের কার্যক্রম অত্যন্ত সুচারুরূপে পরিচালিত হচ্ছে।
৪. শাহপুর দরবার শরীফ: গাউছে পাকের বংশধর সৈয়দ বাহাউদ্দিন বাকেরের বংশে জন্মগ্রহণ করা শেখ আবদুস সোবহান কর্তৃক কুমিল্লা শহরে গোমতী নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শাহপুর দরবার শরীফ। তাঁর সন্তান শেখ আহমদ পেয়ারা বাগদাদী দীর্ঘ দুই দশক বাগদাদে অবস্থিত বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর মাজারে খাদেমের গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তাঁর সময়েই দরবারের পরিধি বিস্তৃত হয় এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করে। বিশেষত কুমিল্লা ও চাঁদপুরে এই দরবারের ভক্ত মুরিদের সংখ্যা দিনকে-দিন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলায় ইসলামের প্রচার-প্রসারে বড়পীর আবদুল কাদের জিলানীর বংশধরদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক পর্যায়ে যে-সকল সুফি বাংলায় আগমন করেছেন তন্মধ্যে তাঁর বংশধর ছিলেন একাধিক। ঔপনিবেশিক আমলে সুফি-সমাজের যে পুনর্গঠন বাংলায় হয়েছে তাতেও কাদেরী বংশের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমান বাংলার সুফি-সমাজে কেবল তাঁদের অংশগ্রহণই নয়, বরং নেতৃত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশে মাইজভাণ্ডারী তরিকা ও পশ্চিম বাংলার মেদিনীপুর দরবার শরীফের বিস্তৃতি ও জনপ্রিয়তাকে আমলে নিলেই এর সত্যতা মিলবে।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: গাউছে পাকের বংশধর বাংলায় বসতি গেড়েছেন অর্থাৎ স্থায়ীভাবে বসবাস করেছেন এমন ব্যক্তিত্বদের ব্যাপারেই কেবল উল্লেখ করা হয়েছে। রচনায় কেবল বাংলায় আগমন করা প্রথম ব্যক্তিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সৈয়দ বাহাউদ্দিন বাকের’র জীবনকর্ম সম্পর্কে কিছু না পাওয়ায় সঙ্গত কারণেই তাঁর বংশধর শেখ আবদুস সোবহানকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বংশের উজ্জ্বল উত্তরপুরুষ যাদের মাধ্যমে তরিকা, দরবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তাঁদের ব্যাপারে তরিকা ও দরবার প্রসঙ্গে আলোকপাত করা হয়েছে। আমাদের জানাশোনার বাহিরেও গাউছে পাকের অন্য কোনো বংশধর বাংলায় থাকতে পারেন; জানা মাত্রই রচনায় যুক্ত করা হবে।)