পরিচিতি:
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অক্সফোর্ড সেন্টার ফর ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের জার্নাল, জার্নাল অফ ইসলামিক স্টাডিজ, ২০২৪ (Journal of Islamic Studies, 2024) সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয়। ইংরেজি ভাষায় Fasting in Early Sufi Literature শিরোনামে প্রবন্ধটি লিখেছেন ইউনিভার্সিটি অফ লেথব্রিজ’র ফ্যাকাল্টি আতিফ খলিল। এই বিষয়ে এমন তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রাঞ্জল প্রবন্ধ যে কোনো ভাষাতেই দুর্লভ। বাংলা ভাষায় এই বিষয়ে এমন কোনো প্রবন্ধ আছে কি-না আমাদের জানা নেই। বাংলা ভাষার পাঠক, লেখক ও গবেষকদের প্রতি লক্ষ্য রেখেই প্রবন্ধটি বাংলায় অনুবাদ করা হলো। অনুবাদে অক্ষরের তুলনায় ভাবকে—শব্দের তুলনায় মূল বক্তব্যকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। রেফারেন্সের ক্ষেত্রে হুবহু সকল রেফারেন্স তুলে দেয়ার বদলে বাছবিচার করে ইংরেজিতেই রাখা হয়েছে। মূল প্রবন্ধের ডাউনলোড লিঙ্ক প্রবন্ধের শেষে যুক্ত করা হলো। প্রবন্ধের এই বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে সুফি-সমাজ ও শুভাকাঙ্ক্ষী পাঠক, লেখক ও গবেষকবৃন্দ বহুভাবে উপকৃত হবেন বলেই আমাদের বিশ্বাস।
সারসংক্ষেপ (Abstract)
এই প্রবন্ধটি ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের আধ্যাত্মিকতায় রোজার ধারণাগুলোর একটি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করে। আল-সাররাজ (ইন্তেকাল ৩৭৮/৯৮৮), আল-মাক্কি (ইন্তেকাল ৩৮৬/৯৯৬), আল-খারকুশি (ইন্তেকাল ৪০৭/১০১৬), আল-হযরত দাতা গঞ্জে বখশ (ইন্তেকাল আনুমানিক ৪৬৫/১০৭১), আল-কুশায়রি (ইন্তেকাল ৪৬৫/১০৭২) এবং আল-সিরজানি (ইন্তেকাল ৪৭০/১০৭৭)-র রচনাবলির ওপর ভিত্তি করে এই নিবন্ধটি বিষয়ভিত্তিক বিন্যাসে নিম্নলিখিত দিকগুলো তুলে ধরে: (১) প্রাথমিক পর্যায়ের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে রোজার গুরুত্ব, (২) লাগাতার রোজা রাখার অন্তরালে নিহিত সম্ভাব্য বিপদসমূহ, এবং (৩) আধ্যাত্মিকতার চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘অনাসক্তি থেকেও অনাসক্তি’র (detachment from detachment) মাধ্যমে রোজার প্রতি যে-কোনো প্রকার আসক্তি কাটিয়ে ওঠার প্রয়োজনীয়তা। এই প্রক্রিয়ায় প্রবন্ধটি কেবল প্রাচীন সুফি সাহিত্যের বিভিন্ন উক্তি ও কাহিনীর মর্মোদ্ধারই করে না, বরং এগুলোর মধ্যে বিদ্যমান আপাতবিরোধগুলো নিরসনের প্রতিও লক্ষ্য রাখে।
ভূমিকা (Introduction)
প্লেটোর ফিডো (Phaedo) গ্রন্থে আত্মা এবং দেহের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে সক্রেটিস ও সেবিসের (Cebes) একটি আলাপ দেখা যায়। সেখান থেকে জানা যায় যে—আত্মা হচ্ছে ঐশ্বরিক গুণসম্পন্ন, অমর, বুদ্ধিদীপ্ত, একরূপী, অখণ্ডনীয় এবং অবশ্যই অদৃশ্য; অন্যদিকে দেহ হচ্ছে নশ্বর, বহুরূপী, পরিবর্তনশীল, খণ্ডনযোগ্য ও দৃশ্যমান। যদি দেহ আত্মার ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে, তবে তা ইন্দ্রিয়লিপ্সার মাধ্যমে আত্মাকে স্থূল বস্তু জগতের পঙ্কিলতায় টেনে নামায় এবং বিভ্রান্তি ও অস্থিরতার আবর্তে নিক্ষেপ করে। বিপরীতে, আত্মা যদি ইন্দ্রিয়জাত ক্ষণস্থায়ী সুখের মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারে এবং দেহের সাথে তার স্বাভাবিক ও সুশৃঙ্খল সম্পর্কের ওপর আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়, তবে আত্মা তার অনিবার্য মওত ও ঊর্ধ্বগমনের (Ascent) জন্য প্রস্তুত হবে এবং লাভ করবে শাশ্বত পরম সুখ। সক্রেটিসের কাছে তাই দর্শন কেবল চিন্তার কোনো অনুশীলন নয়, বরং এটি হচ্ছে ইন্তেকালর জন্য একপ্রকার প্রস্তুতি; আর এই প্রস্তুতি কেবল ‘ক্যাথারসিস’ (Catharsis) বা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব।[1]
আত্মা ও দেহের বিভাজনের মতো একটি সর্বজনীন ধারণার উৎস হিসেবে কেবল প্লেটো (বা তার শিক্ষককে) চিহ্নিত করা ভুল হবে; তবে অন্তত পাশ্চাত্য চিন্তাধারার ইতিহাসে এই দ্বৈতবাদ বিষয়ে তাঁর নামই সবচেয়ে বেশি যুক্ত।[2] আমাদের আলোচনার প্রেক্ষাপটে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আত্মা ও দেহের এই দ্বিধা-বিভাজন এবং এর ফলে মানুষের ব্যক্তিত্বের এই দুই উপাদানের মধ্যে যে নিরন্তর দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, তা বিশ্বের অনেক ধর্মেই কঠোর সংযম (asceticism) এবং আত্মত্যাগমূলক ধর্মীয় রীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে।
আত্মা-দেহ এবং পর্যায়ক্রমে বস্তু-চেতনার এই মৌলিক পার্থক্যটি ঐতিহাসিকভাবে বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে। মানি ধর্মাবলম্বী (Manicheans) এবং প্রচলিত ধর্মমতের বিরোধী নস্টিকদের (Gnostics) মতো কেউ কেউ বস্তুগত জগত, শরীর এবং দেহকে সহজাতভাবেই ‘অশুভ’ বা মন্দ হিসেবে দেখতেন। এই চিন্তাধারার একটি ক্ষুদ্র রূপ আদি গির্জার ‘ডেজার্ট ফাদারদের’ (Desert Fathers) বা সন্ন্যাসীদের বাণীতেও পাওয়া যায়; যদিও ‘ইনকারনেশন’ বা অবতারবাদের মতো কিছু ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদ দেহকে সম্পূর্ণভাবে শয়তানের আজ্ঞাবহ স্তরে নামিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ইসলাম সাধারণত এই প্রশ্নে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করেছে। পবিত্র কুরআনে বস্তুগত জগতকে কখনো কখনো নেতিবাচকভাবে ‘দুনিয়া’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যতক্ষণ না পর্যন্ত এটি মানুষকে আল্লাহ থেকে বিমুখ করে এবং মহাজাগতিক স্তরবিন্যাসের সর্বনিম্ন ধাপে অবস্থান করে।[3] মূলত ‘দুনিয়া’ শব্দটি একটি ত্রি-অক্ষরবিশিষ্ট মূল (root) থেকে এসেছে যার অর্থ হলো ‘নীচ হওয়া’ বা ‘নীচ আচরণ করা’, যা কখনো কখনো আরও নেতিবাচক অর্থকেও নির্দেশ করতে পারে।
তবে মুসলিম ধর্মগ্রন্থ যখন এই জগতকে মহান আল্লাহর আত্ম-প্রকাশ এবং তাঁর নিদর্শনাবলির সমাহার হিসেবে গুরুত্ব দেয়, তখন এর জন্য ‘আল-আরদ’ নামক তুলনামূলক ইতিবাচক শব্দটি ব্যবহার করে।[4] অন্য কথায়, এই পার্থিব জগত একইসাথে একটি ‘পর্দা’ (veil) এবং একটি ‘থিওফ্যানি’ (theophany) বা ঐশ্বরিক প্রকাশ; কারণ এটি পবিত্রতাকে যেমন উন্মোচন করে, তেমনি আবার তা গোপনও করে—আর এই সম্ভাবনাটি নির্ভর করে এই জগতের প্রতি মানুষের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি বা অভিমুখের ওপর। একইভাবে, দেহের রাজ্যটিকে আধ্যাত্মিক জীবনের অন্তরায় হিসেবে ভাবা যেতে পারে যদি এটি আত্মাকে নফসের (শাহওয়াহ) শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে এবং খোদায়ী বিধান লঙ্ঘনে প্রলুব্ধ করে। বিপরীতে, মানুষের চারপাশ ঘিরে থাকা অসংখ্য ইতিবাচক বস্তুগত নেয়ামতের মাধ্যমে এটি বান্দাকে এমন এক মহাপবিত্র মাকামে পৌঁছে দিতে পারে, যে মাকামের নেয়ামতগুলোর প্রতি কুরআন বারবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং যার মাধ্যমে বান্দা আখেরাতের নাজ-নেয়ামতের পূর্বাভাস লাভ করতে পারে।
সুন্নাহর আলোকে পানাহার বা খাদ্য গ্রহণের বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির দিকে তাকালে যা পাওয়া যায়, তাকে ‘পরিমিত সংযম’ (moderate asceticism) হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। যদিও এটি সর্বজনবিদিত যে, নবীজী তাঁর সামনে পেশকৃত উত্তম ও স্বাস্থ্যকর খাবারের প্রশংসা করতেন এবং এই প্রশংসাকে তিনি তাঁর অনুসারীদের কৃতজ্ঞতাবোধ (শুকরিয়া) শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতেন। তবে তাঁর ব্যক্তিগত অভ্যাস ছিল মিতব্যয়িতা বা অল্পাহার। আবু তালিব আল-মাক্কি তাঁর কুত আল-কুলুব গ্রন্থে পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, নবীজী বাধ্য হয়ে নয়, বরং স্বেচ্ছায় ক্ষুধার্ত থাকতেন।[5] প্রয়োজনের অতিরিক্ত আহারের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অনেক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। একবার এক সাহাবী তাঁর উপস্থিতিতে স্থূলভাবে ঢেকুর তুললে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘দুনিয়ায় যারা সবচেয়ে বেশি তৃপ্তিসহকারে উদরপূর্তি করে, পরকালে তারাই হবে সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত’। অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি এক ব্যক্তির স্ফীত উদরের দিকে ইঙ্গিত করে পরামর্শ দেন, ‘এটি যদি অন্য কারো (দেহে) হতো, তবে তোমার জন্য মঙ্গলজনক হতো’—যার অর্থ মাক্কির মতে, নিজের চেয়ে অন্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া বা অন্যকে অন্নদান করা তোমার জন্য শ্রেয় হতো।
এর সাথে আমরা সেই অসংখ্য হাদিস যুক্ত করতে পারি যা ক্ষুধার সুরক্ষা ও কলব পরিষ্কারকারী শক্তি হিসেবে গুরুত্বারোপ করে। একটি হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যার মধ্যে পাপের তীব্র লালসা জাগ্রত হয়, সে যেন ক্ষুধা ও পিপাসার মাধ্যমে তাকে দমন করে’।[6] অন্য এক স্থানে আমরা পড়ি, ‘রোজা হলো একটি ঢাল (জুননাহ)’।[7] খাবারের ব্যাপারে নবীজীর সংযম এতটাই প্রবাদতুল্য ছিল যে, তাঁর কনিষ্ঠা স্ত্রী হযরত আয়েশা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর রাসুলের ওফাতের পর প্রথম যে বিদআত বা নতুন প্রথার প্রচলন হয়েছে তা হলো উদরপূর্তি বা তৃপ্তিসহকারে আহার করা’।[8] অল্পাহারের প্রতি এই প্রবণতা নবীজীর নিয়মিত রোজা রাখার অভ্যাসের ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যার ফলে তাঁর রোজা রাখার দিনগুলো অন্য দিনগুলোর চেয়ে সংখ্যায় বেশি হতো। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘প্রত্যেক জিনিসের একটি দরজা রয়েছে, আর ইবাদতের দরজা হলো রোজা’।[9] তিনি আরও বলেন, ‘সবর বা ধৈর্য হলো ঈমানের অর্ধেক আর সবরের অর্ধেক নিহিত রয়েছে রোজার মধ্যে’।[10]
ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে রোজা ও ক্ষুধা
প্রাথমিক পর্যায়ের সুফি এবং তাঁদের আধ্যাত্মিক পূর্বসূরিগণ পরবর্তী ইতিহাসে রোজা রাখার প্রতি তাঁদের ঐকান্তিক নিষ্ঠার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। প্রচলিত অভিমত অনুযায়ী, নবীজীর ইন্তেকাল ও খেলাফতের উপর মুসলিম বিশ্বের প্রাণকেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ধন-সম্পদের প্রভাবে মুসলিম সমাজে ভোগ-বিলাসের প্রতি যে একমুখী যাত্রা শুরু হয়েছিল এই বিলাসবহুল এবং আতিশয্যপূর্ণ জীবনধারার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবেই পরিগণিত প্রাচীন সুফিদের কঠোর সংযম। মূলত নবীজীর ইন্তেকালের পর মাত্র কয়েক দশক পার হতেই মুসলিম সাম্রাজ্য পারস্য এবং বাইজেন্টাইন ভূখণ্ডের এক বিশাল অংশ জয় করতে সক্ষম হয়। সপ্তম শতাব্দীর শেষ নাগাদ আলেকজান্দ্রিয়া, তিসফুন (Ctesiphon), জেরুজালেম এবং দামেস্কের মতো প্রধান ঐতিহাসিক শহরগুলো মুসলিম শাসনের অধীনে চলে আসে। একসময় যে জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব বারবার বিলুপ্তি ও হুমকির মুখে পড়েছিল, তারা তখন আফ্রিকা থেকে এশিয়া এবং অচিরেই ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূখণ্ডের ওপর নজিরবিহীন ক্ষমতা ও অফুরন্ত ধন-সম্পদের অধিকারী হয়। আগত এই ঐশ্বর্যের প্রভাব সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে এমনভাবে প্রতিফলিত হতে থাকে যা প্রাথমিক পর্যায়ের মুসলমান—এমনকি সাহাবীগণের কাছেও—সুন্নাহ-উৎসাহিত সরল জীবনবোধের/ধারার পরিপন্থী বলে বিবেচিত হয়েছিল। ফলে এমন একটি পাল্টা আন্দোলনের/ধারার উদ্ভব হওয়া ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। যার মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ের মুসলিম সমাজ এবং স্বভাবতই এর প্রতিষ্ঠাতার (নবীজীর) বিস্মৃতপ্রায় গুণাবলিকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে ‘যুহদ’ (zuhd) বা দুনিয়াবিমুখতা ও অনাসক্তি চর্চার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোরারোপ করবে।[11]
যদিও ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের সংযমি ধারাগুলো বিজিত অঞ্চলের ধর্মীয় ঐতিহ্য দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হয়েছিল, তবে এই প্রভাবকে অতিরঞ্জিত করে দেখা ঠিক হবে না। বিশেষ করে, ইসলামি সাধনা বা সংযমের উৎস হিসেবে আদি খ্রিস্টীয় রীতিকে পূর্বসূরী হিসেবে গণ্য করার যে প্রবণতা ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মধ্যে দেখা যায়, তা সম্ভবত মধ্যযুগীয় পশ্চিমা সেই ভ্রান্ত ধারণারই প্রতিফলন—যেখানে ইসলামকে নিছক ভোগবাদ ও শারীরিক লালসা উৎসাহিতকারী একটি ধর্ম হিসেবে চিত্রায়িত করা হতো।[12] এছাড়া এই দৃষ্টিভঙ্গি নবীজীর নিজস্ব ব্যক্তিত্বে বিদ্যমান সুসংগত ও পরিমিত সংযমের প্রামাণ্য ধারাকেও উপেক্ষা করে।
ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে এবং প্রাক-সুফিবাদে ক্ষুধা (জু’) এবং রোজা (সাওম) বিষয়ক অসংখ্য উক্তি ও কাহিনী বিদ্যমান, যা এই বিষয়ে রচিত প্রাথমিক কিতাবগুলোর বিস্তৃত অংশ জুড়ে রয়েছে। আবু সুলায়মান আল-দারানি (ইন্তেকাল ৮৩০) ঘোষণা করেছিলেন, ‘দুনিয়ার চাবিকাঠি হলো উদরপূর্তি, আর পরকালের চাবিকাঠি হলো ক্ষুধা’।[13] ইয়াহিয়া বিন মুয়ায (ইন্তেকাল ৮৭২) বলেছেন, ‘ক্ষুধা যদি বাজারে বিক্রি হতো, তবে পরকালকামী ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করলে ক্ষুধা ছাড়া অন্য কিছু কেনার প্রয়োজন বোধ করত না’।[14] অন্য এক সুফি সাধক বলেছেন, ‘যতক্ষণ বান্দার পেটে দুনিয়ার কোনো অংশ (খাবার) অবশিষ্ট থাকে, আল্লাহ তার সাথে কথা বলেন না’। অর্থাৎ, খোদার সাথে আলাপের মাধুর্য কেবল খালি পেটেই উপলব্ধি করা সম্ভব। উলামাদের বরাতে আরও একটি উক্তি পাওয়া যায়— ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপ্রিয় বস্তু হলো ভরা পেট, যদিও তা হালাল খাদ্য ও পানীয় দ্বারা পূর্ণ হয়’। নবী ইয়াহইয়া (আ.)-এর একটি কাহিনীতে দেখা যায়, তিনি শয়তানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কখন তুমি তোমার কাজে সবচেয়ে বেশি সক্ষম?’ সে উত্তর দিয়েছিল, ‘যখন মানুষ পেট ভরে পানাহার করে’। এই উত্তর শোনার পর ইয়াহইয়া (আ.) আর কখনো পেট ভরে খাননি।[15] খোদার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে ক্ষুধার এই গুরুত্বের কারণেই জুনায়েদ আল-বাগদাদী স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন, ‘রোজাই হলো আধ্যাত্মিক সাধনার অর্ধেক’।[16] ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ে রোজা ও তাকওয়ার সম্পর্ক এতটাই নিবিড় ছিল যে, রুয়াইম (ইন্তেকাল ৯১৫) সম্পর্কিত একটি গল্পে তা ফুটে ওঠে। বাগদাদের এক তপ্ত দিনে দীর্ঘ ভ্রমণের পর তিনি এক অপরিচিতের বাড়িতে পানি পান করতে যান। স্থানীয় মেহমানদারির রীতি অনুযায়ী, এক বালিকা তার জন্য ঠাণ্ডা পানির পাত্র নিয়ে আসে। কিন্তু বালিকাটি যখনই চিনতে পারল যে সে কার জন্য পানি এনেছে, সে বিস্ময়ে পাত্রটি ছুড়ে ফেলে দিল। সে চিৎকার করে বলল, ‘ধিক তোমাকে! একজন সুফি হয়ে দিনের বেলা পানি পান করছ?’ এই ঘটনায় রুয়াইম এতটাই লজ্জিত হন এবং বালিকাটির মাধ্যমে একে খোদায়ী তিরস্কার হিসেবে গণ্য করেন, ফলশ্রুতিতে তিনি আমরণ রোজা রাখার সংকল্প করেন।
আবু নাসর আল-সাররাজ তাঁর কিতাব আল-লুমা গ্রন্থে রোজার তাৎপর্যের এক অত্যন্ত আকর্ষণীয় ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। অধ্যায়ের শুরুতে উদ্ধৃত হাদিসে কুদসি— ‘রোজা কেবল আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব’—এর ব্যাখ্যায় তিনি দুটি স্তরের অর্থের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।[17] প্রথমত, রোজা হলো একমাত্র ইবাদত যা কোনো কাজ ‘করা’র পরিবর্তে কোনো কাজ থেকে ‘বিরত থাকা’র সাথে যুক্ত। অন্যান্য ইবাদতের বিপরীতে রোজাদারের তাকওয়া/ধর্মপরায়ণতা অন্যের চোখ থেকে গোপন থাকে। এই ইবাদতের প্রকৃতি—অর্থাৎ ‘শারীরিক নড়াচড়াহীন ইবাদত’ (ইবাদাতুন বি-গাইরি হারাকাতিল জাওয়ারিহ) —ব্যক্তিকে লোকদেখানো ইবাদত (রিয়া) বা মুনাফেকি থেকে সুরক্ষা দেয়, কারণ এখানে দৃশ্যমান কিছু নেই। সাররাজ যুক্তি দেন, ‘রোজা আমারই জন্য’—কারণ আল্লাহ ছাড়া কেউ তা দেখে না। দ্বিতীয়ত, রোজা কেবল জৈবিক ক্রিয়া বন্ধ রাখাই নয়, বরং এটি দেহের প্রাকৃতিক গঠন বজায় রাখার উপকরণসমূহ থেকেও নিজেকে দূরে রাখে। এটি রোজাদারকে আল্লাহর ‘অমুখাপেক্ষিতা’ বা সামাদিয়্যা গুণাবলির সাথে একপ্রকার ন্যূনতম অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়।[18] যখন রোজাদার পানাহার ত্যাগ করে দেহের মৌলিক চাহিদাগুলোকে জয় করে, তখন সে এক অর্থে খোদায়ী গুণসম্পন্ন হয়ে ওঠে; কারণ আল্লাহ অভাবমুক্ত এবং তিনি পানাহার করেন না। সুতরাং, রোজা হলো এমন এক কাজ যা মানুষকে আল্লাহর স্বাতন্ত্র্য এবং তাঁর চিরন্তন অমুখাপেক্ষিতার ন্যূনতম অভিজ্ঞতা লাভ করতে সাহায্য করে। এছাড়া, রোজার সোয়াব মানুষের কল্পনাতীত। কারণ এই কাজটি নিজেই অন্য সব কর্মকে ছাপিয়ে যায় এবং আল্লাহর ‘আল-সামাদ’ (অমুখাপেক্ষী) নামের গুণের সঙ্গে সংযুক্ত। যেহেতু রোজা হলো ‘কর্মের অনুপস্থিতি’, তাই এর কোনো সীমা নেই। রোজাদারগণ যেহেতু ধৈর্যশীল (সাবিরুন), আর কুরআনে বলা হয়েছে ‘ধৈর্যশীলদের প্রতিদান দেয়া হবে অপরিমিতভাবে’ (সূরা যুমার: ১০)—তাই হাদিসে কুদসির শেষাংশে বলা হয়েছে, ‘এর প্রতিদান আমার কাছেই (বা আমি নিজেই)’।
রোজা এবং ধৈর্যের (সবর) এই অনন্য সম্পর্কটি প্রাচীন সুফিদের অনেকের মাধ্যমেই বিকশিত হয়েছে। সবরের মৌলিক অর্থ হলো ‘নফসকে আটকে রাখা’ (হাবস আল-নাফস)। এই আত্মসংযমের লক্ষ্য হলো সেইসব প্রবৃত্তি ও কামনা যা আত্মশুদ্ধির পরিপন্থী।[19] যখন আমরা বিবেচনা করি যে, রোজার মতো আর কোনো ইবাদত নেই যা পানাহার ও যৌনতা ছাড়াও অশোভন কথা, দৃষ্টি এবং শ্রবণেন্দ্রিয়কে এতটা শৃঙ্খলিত (‘হাবস আল-নাফস’) করতে পারে—তখনই আমরা বুঝতে পারি কেন রোজা ধৈর্যের সর্বোত্তম অনুশীলন। রোজা স্বাভাবিক সময়ের ‘বৈধ’ বিষয়কে ‘নিষিদ্ধ’ করে এবং স্বাভাবিক সময়ের ‘নিষিদ্ধ’ বিষয়কে আরও ‘কঠোরভাবে নিষিদ্ধ’ করে। এই প্রেক্ষাপটেই হযরত দাতা গঞ্জে বখশ পর্যবেক্ষণ করেন যে, রোজার সংযমের মধ্যে অনেকগুলো বাধ্যবাধকতা রয়েছে; যার মধ্যে কেবল পেটকে পানাহারমুক্ত রাখাই নয়, বরং চোখকে লালসা থেকে, কানকে পরনিন্দা থেকে, জিহ্বাকে অর্থহীন বাক্য থেকে এবং দেহকে পার্থিব মোহ ও অবাধ্যতা থেকে রক্ষা করাও রোজার শামিল: এই শর্তগুলো উল্লেখের পর তিনি বলেন, ‘তবেই একজন ব্যক্তি প্রকৃত রোজাদার হতে পারেন’। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে—যদিও মুমিনদের জান্নাতে প্রবেশ মহান আল্লাহর রহমতের মাধ্যমেই ঘটবে এবং তাদের মর্যাদা আমলের পুরস্কার হিসেবে নির্ধারিত হবে, কিন্তু এই ‘রোজা’ই জান্নাতে তাদের চিরস্থায়ী অবস্থানের পথ সুগম করবে।[20]
ক্ষুধা ও রোজার উপকারিতা প্রসঙ্গে
প্রাথমিক যুগের সুফি এবং তাঁদের আধ্যাত্মিক পূর্বসূরিদের কাছে ক্ষুধার্ত থাকা এবং রোজা রাখার পেছনে অসংখ্য অনুপ্রেরণা কাজ করত। প্রথমত, খাদ্যই ছিল সেই মাধ্যম যার কারণে আদম ও হাওয়া জান্নাত থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন এবং ট্র্যাজেডি (The Fall) ঘটেছিল; যার ফলশ্রুতিতে তাঁদের উত্তরসূরিদের জীবনধারণ ও জীবিকা নিয়ে পারস্পরিক কলহ ও কষ্টের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আল-হাসান আল-বাসরি (ইন্তেকাল ৭২৮) ঘোষণা করেছিলেন, “তোমাদের পিতা আদমের পরীক্ষা ছিল এক লোকমা খাবার নিয়ে, আর কিয়ামত পর্যন্ত এটিই হবে তোমাদের পরীক্ষা।”[21] আমাদের মৌলিক ও জৈবিক চাহিদার ঊর্ধ্বে ওঠার অর্থ হলো—এক অর্থে আদম ও হাওয়ার সেই আদিম অবস্থায় ফিরে যাওয়া, যেখানে তাঁরা ইবলিসের প্ররোচনায় পড়ে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণের আগে অবস্থান করছিলেন। এটি মূলত আমাদের পাশবিক প্রবৃত্তিকে অতিক্রম করে ফেরেশতাদের জ্যোতি এবং তারও ঊর্ধ্বে—আল্লাহর নিজস্ব শাশ্বত রহস্যের অংশীদার হওয়ার একটি প্রয়াস।
সম্ভবত এই অন্তর্নিহিত বোধটিই পাপ এবং ‘তৃপ্তি’ বা উদরপূর্তির (satiety) মধ্যে একটি সম্পর্ক স্থাপন করেছিল—পাপ হলো তা-ই যা মানুষকে আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, আর তৃপ্তি হলো সেই বিচ্ছিন্নতার মাঝে মানুষকে তুষ্ট রাখা। তাই সাহল আল-তুস্তারি (ইন্তেকাল ৮৯৬), যিনি রোজা ও ক্ষুধার কঠোর সংযমের জন্য বিখ্যাত ছিলেন, তিনি বলতে পেরেছিলেন যে, “আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী প্রতিটি পুণ্যকর্মের মূলে রয়েছে ক্ষুধা, আর প্রতিটি পাপাচারের মূলে রয়েছে তৃপ্তি।” অথবা যুন-নুন মিসরির (ইন্তেকাল ৮৫৯/৮৬১) উক্তি অনুযায়ী, “আমি কখনোই পেট পুরে খাইনি, যার ফলে আমি আল্লাহর নাফরমানি করিনি—অথবা পাপাচারের দিকে প্ররোচিত হইনি।” একইভাবে ইবনে সালিম ঘোষণা করেছেন, “তুমি যদি পেটকে (বাতন) তার ভাগ বুঝিয়ে দাও, তবে শরীরের বাকি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও তাদের ভাগ (পাপের সুযোগ) চাইবে।” এই পর্যবেক্ষণটি আবু সুলায়মান আল-দারানির একটি গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। একদিন গমের ক্ষেত দিয়ে হাঁটার সময় তিনি এক জোড়া পাখিকে মাটিতে পড়ে থাকা দানা খুঁটে খেতে দেখলেন। যখন তারা তৃপ্ত হলো, তখন পুরুষ পাখিটি মাদী পাখিটির প্রতি কামনাসক্ত হয়ে পড়ল। দারানি তাঁর শিষ্যদের বললেন, “দেখো, ক্ষুধা মিটে যাওয়ার পর তাদের পাকস্থলী কীভাবে তাদের প্ররোচিত করছে।”
ক্ষুধা ও রোজাকে উচ্চতর জ্ঞানের উৎস হিসেবেও গণ্য করা হতো। আবু বকর আল-শিবলি (ইন্তেকাল ৯৪৬) বলতেন, “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিনও ক্ষুধার্ত থাকিনি যার বিনিময়ে আমি এমন প্রজ্ঞা ও শিক্ষা (ইবরাহ) লাভ করিনি যা আগে আমার অজানা ছিল।”[22] আর আবু ইয়াজিদ আল-বিস্তামি (ইন্তেকাল ৮৪৮ /৮৭৫) বলেছেন, “ক্ষুধা হলো একটি মেঘ। হৃদয় যখন ক্ষুধার্ত থাকে, তখন সেখান থেকে প্রজ্ঞার বৃষ্টি ঝরে।” অন্য এক সময় তাঁকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি কীভাবে মারিফাত বা আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছেন, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “খালি পেট এবং নগ্ন দেহের (পার্থিব মোহশূন্যতা) মাধ্যমে।”[23] একই সুরে ইয়াহইয়া বিন মুআদ বলেছেন, “ক্ষুধা হলো নূর (আলো) আর তৃপ্তি হলো নার (আগুন)”[24]; কারণ তৃপ্তি আত্মাকে গ্রাস ও ধ্বংস করে, আর ক্ষুধা একে জ্ঞান ও উপলব্ধি দিয়ে উজ্জ্বল করে তোলে। মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, খাদ্য গ্রহণ কমিয়ে দেওয়া এবং প্রজ্ঞার স্বচ্ছতার মধ্যে একটি সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। রোজার মধ্যে প্রায়ই মনের একটি প্রশান্তি বিরাজ করে যা চেতনার এক সূক্ষ্ম রূপান্তর ঘটায়, যা এই অভ্যাসে অনভিজ্ঞদের কাছে অজানা। সাধারণ দৈনন্দিন পরিস্থিতিতে ইন্দ্রিয়জাত উদ্দীপনার কোলাহল মনকে আচ্ছন্ন করে রাখে। কিন্তু রোজা যখন প্রার্থনা, অন্তর্মুখিতা, ধ্যান এবং নীরবতার দ্বারা সমর্থিত হয়, তখন এক গভীর প্রশান্তি অনুভূত হয়, যা বিচারবুদ্ধি এবং মানসিক সতর্কতা বৃদ্ধি করে।
সম্ভবত রোজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল ছিল আল্লাহ এবং আত্মার মধ্যে তৈরি হওয়া ‘নৈকট্য’ বা ঘনিষ্ঠতা। প্রাথমিক ইসলামিক উৎসগুলোতে বর্ণিত ঈসা (আ.)-এর একটি গল্পে দেখা যায়, তিনি একবার আল্লাহকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কীভাবে তাঁর নৈকট্য লাভ করা যায়। আল্লাহ উত্তর দিয়েছিলেন, “হে মরিয়ম তনয়, ক্ষুধা ও তৃষ্ণার চেয়ে আমার নৈকট্য লাভের আর কোনো নিশ্চিত পথ বান্দার জন্য নেই।”[25] যেভাবে তৃপ্তি বা উদরপূর্তি হৃদয়কে কঠিন করে দেয়, সেভাবে ক্ষুধা হৃদয়কে কোমল করে। এই কোমলতার অন্যতম লক্ষণ হলো অতীত ভুলের জন্য অনুশোচনা এবং অশ্রুপাত। আবুল কাসেম আল কুশায়রি এক ব্যক্তির গল্প বর্ণনা করেন, যিনি এক শায়খের দরবারে গিয়ে তাঁকে কাঁদতে দেখেন। কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে শায়খ উত্তর দেন, “আমি ক্ষুধার্ত।” আগন্তুক অবাক হয়ে বললেন, “আপনার মতো মর্যাদাবান ব্যক্তি ক্ষুধার জন্য কাঁদছেন?” শায়খ বললেন, “চুপ করো! তুমি কি জানো না যে তিনি (আল্লাহ) আমার ক্ষুধার মাধ্যমে আমার কান্নাটুকুই চান?”[26]
প্রকৃতপক্ষে, ক্ষুধা ও রোজার মাধ্যমে সৃষ্ট এই খোদায়ী বন্ধন অনেক প্রাচীন সুফিকে এই ধারণা দিয়েছিল যে, এটি দোয়া কবুলের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। দারানি বলতেন, “তুমি যদি দুনিয়া বা আখেরাতের কোনো কিছু চাও, তবে আগে ক্ষুধার্ত হও এবং তারপর প্রার্থনা করো।” সুফি-সাধকদের অলৌকিক ক্ষমতাকেও (কারামত) এই শক্তির উৎস হিসেবে দেখা হতো। একজন প্রাচীন সুফি আল্লাহর কসম খেয়ে বলেছিলেন যে, ক্ষুধা ছাড়া কেউ নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে পারেনি, ক্ষুধা ছাড়া কেউ পানির ওপর দিয়ে হাঁটতে পারেনি এবং ক্ষুধা ছাড়া কেউ ভূমি সংকুচিত করে দীর্ঘ পথ পাড়ি (‘তাইউল আরদ’) দিতে পারেনি।[27] ইঞ্জিল শরিফেও একটি গল্প আছে, যেখানে ঈসা (আ.) একজন মানুষের দেহ থেকে শয়তানকে তাড়িয়েছিলেন যা তাঁর শিষ্যরা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যখন শিষ্যরা কারণ জানতে চাইলেন, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, “এই ধরণের শয়তানি আত্মা দোয়া এবং রোজা ছাড়া দূর হয় না।”[28] এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো—রোজা মানুষকে এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জনে সহায়তা করে যা অন্য মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব নয়। প্রকৃতপক্ষে, শরীরকে খাদ্য ও পানীয় থেকে বঞ্চিত করে অসাধ্য সাধনের এই বিশ্বাস বিশ্বের প্রায় সব ধর্মেই পাওয়া যায়।[29] প্রাচীন সুফি সাধকদের কাছে এই শক্তি সম্ভবত রোজার মাধ্যমে অর্জিত একপ্রকার ঐশ্বরিক গুণাবলি (theomorphism) লাভের মধ্যে নিহিত ছিল: জগত থেকে নিজেকে আক্ষরিক অর্থে শূন্য করার মাধ্যমে একজন রোজাদার আল্লাহর সৃজনশীল কর্মতৎপরতার একটি দরজা বা পোর্টালে পরিণত হন—যদি বাহ্যিকতার সঙ্গে অভ্যন্তরীণ রোজা এবং বাহ্যিক শূন্যতার সাথে আত্মার শূন্যতা (রুহানিয়্যত) যুক্ত থাকে।
পরকালীন জীবনে কোনো বস্তু আরও নিখুঁত ও স্থায়ী রূপে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও যে ত্যাগের পেছনে একটি বড় প্রণোদনা ছিল, তা আমরা অস্বীকার করতে পারি না। মাক্কি জনৈক মুরিদের (আধ্যাত্মিক অভিলাষী) কাহিনী বর্ণনা করেছেন, যিনি নিজের নফসকে বশ করার জন্য বিশ বছর ধরে রুটি, ভাত এবং মাছের স্বাদ গ্রহণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছিলেন। তাঁর ইন্তেকালর পর এক আরিফ ব্যক্তি তাঁকে স্বপ্নে দেখেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর সাথে কেমন আচরণ করা হয়েছে তা জানতে চান। তিনি উত্তর দেন, ‘এর চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারত না। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার জন্য প্রথম উপহারই ছিল রুটি, ভাত এবং মাছ’। তিনি আরও যোগ করেন যে, ‘আজকের দিনে তোমাদের প্রতিটি ইচ্ছা কোনো সীমা ছাড়াই পূরণ করা হচ্ছে’। এই উত্তরটি মূলত পবিত্র কুরআনের ৬৯:২৪ আয়াতেরই প্রতিধ্বনি— ‘বিগত দিনে তোমরা যা পাঠিয়েছিলে, তার বিনিময়ে তোমরা তৃপ্তিসহকারে পানাহার করো’। এটি মাক্কিকে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছে যে, ‘পরকালে প্রতিটি কাজের এমন একটি পুরস্কার রয়েছে যা [দুনিয়াতে] সেই কাজের ধরণ (জিনস) এবং অন্তর্নিহিত অর্থের (মানউই) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ’।[30] এর তাৎপর্য হলো—জান্নাতে মুমিনদের জন্য সংরক্ষিত নেয়ামতগুলো ঢালাওভাবে নয়, বরং নির্দিষ্টভাবে বন্টন করা হবে; অর্থাৎ পৃথিবীতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে যা ত্যাগ করেছে, তার অনুপাতে তাকে পুরস্কৃত করা হবে।
প্রাক ও আদি সুফিগণ দেহের লালসা জয়ের ওপর যে গুরুত্বারোপ করেছিলেন, তা কোনোভাবেই অতিরঞ্জিত নয়। দারানি ঘোষণা করেছিলেন, ‘একটি প্রবৃত্তিকে ত্যাগ করা হৃদয়ের জন্য এক বছরের নফল রোজা ও তাহাজ্জুদ নামাজের চেয়েও বেশি উপকারী’। যদিও কেবল পুরস্কার লাভ বা শাস্তির ভয়কে আধ্যাত্মিক জীবনের নিম্নতর স্তর হিসেবে গণ্য করা হয়—যেমনটি রাবেয়া বসরী (ইন্তেকাল ৮০১)-র নামে প্রচলিত অনেক উক্তিতে দেখা যায়—তথাপি যারা কেবল আল্লাহর প্রেমে চালিত নন, তাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক বা চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। মাক্কির কাহিনীতে আমরা যেমনটি দেখি, নফসের শক্তিকে পরাভূত করতে বৈধ বিষয় বর্জন করা এবং অবৈধ বিষয় এড়িয়ে চলার ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করাকে আধ্যাত্মিক পথের অন্যতম প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গণ্য করা হতো।
প্রাথমিক পর্যায়ের কিছু তাসাউফ বিশেষজ্ঞ পরিমিত ক্ষুধা ও রোজার স্বাস্থ্যগত উপকারের বিষয়েও সচেতন ছিলেন। যদিও এটি সূফি সাহিত্যে কোনো প্রধান বিষয় ছিল না—হযরত দাতা গঞ্জে বখশ কেবল এটুকুই বলেছেন যে, ‘ক্ষুধা মেধার তীক্ষ্ণতা বাড়ায় এবং মন ও স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়’।[31] তবে মাক্কির মতো কেউ কেউ অল্পাহারের উপকারিতা নিয়ে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পাকস্থলীর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ খাবারের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ পানির জন্য এবং বাকি অংশ খালি রাখার বিখ্যাত হাদিসটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি খলিফা হারুন আল-রশিদের (ইন্তেকাল ৮০৯) জীবনের একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। একবার গ্রিস, ভারত, ইরাক এবং আফ্রিকা থেকে চারজন চিকিৎসককে আব্বাসীয় দরবারে আনা হয়। খলিফা তাঁদের কাছে এমন একটি ‘ওষুধ’ জানতে চান যাতে কোনো ‘ভেষজ উপাদান’ নেই। ভারতীয় চিকিৎসক উত্তর হিসেবে ‘ইলিলাজ’ (আমলকী সদৃশ ফল), গ্রীক চিকিৎসক ‘সাদা গোলমরিচের বীজ’ এবং ইরাকি চিকিৎসক ‘গরম পানি’ ব্যবহারের পরামর্শ দেন। যখন আফ্রিকান চিকিৎসকের পালা এল, তিনি অন্যদের দেওয়া পরামর্শের ভেষজ গুণাবলি নির্দেশ করে নিজের সমাধান পেশ করলেন: ‘খাবার খাওয়ার সময় যখন আরও খাওয়ার রুচি অবশিষ্ট থাকে, তখনই হাত গুটিয়ে নেওয়া উচিত’।[32] অর্থাৎ, আরও খাওয়ার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিজেকে বিরত রাখার এই সাধারণ অভ্যাসটি নিজেই একটি নিরাময়কারী শক্তি।
আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ক্ষুধা ও রোজার বিশুদ্ধ জৈবিক উপকারিতা নিয়ে এখনো বিতর্ক থাকলেও, বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিগুলোতে (ন্যাচারোপ্যাথিক, হোমিওপ্যাথিক, ভারতীয় ও চীনা চিকিৎসা) এটি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত—যার প্রমাণ বর্তমানে ‘হেলথ ফাস্টিং’ বা স্বাস্থ্যসম্মত রোজার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা। এর প্রবক্তারা দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বের করা (detoxifying), পরিপাকতন্ত্র মেরামত থেকে শুরু করে নিউরোজেনেসিস (স্নায়ুকোষের পুনর্জন্ম) পর্যন্ত বিভিন্ন উপকারের কথা বলেন। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে, ক্যালরি গ্রহণ কমানো আয়ু বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। বিশেষ করে ‘কিটোসিস’ প্রক্রিয়াকে (যেখানে শরীর কার্বোহাইড্রেটের পরিবর্তে সঞ্চিত চর্বিকে শক্তির প্রধান উৎস হিসেবে ব্যবহার করে) একটি প্রধান নিরাময়কারী হিসেবে দেখা হয়।[33] যদিও প্রাচীন সুফি সাহিত্য-নির্মাতাগণ রোজার ইতিবাচক জৈবিক প্রভাবের দিকে নজর দিয়েছিলেন, তবুও তাঁরা সতর্ক ছিলেন যাতে সাধক কেবল শারীরিক স্বাস্থ্যের চিন্তায় মগ্ন না হয়ে পড়ে; কারণ শেষ পর্যন্ত ‘সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল’। আমরা জানি যে, কয়েক শতাব্দী পরে ইবনে আরাবী—যিনি প্রাথমিক পর্যায়ের সুফি ঐতিহ্যের কাছে ব্যাপকভাবে ঋণী ছিলেন—মনে করতেন যে, কারো রোজার উদ্দেশ্য যদি কেবল শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখা হয়, তবে সেটি ‘সাওম’ নয় বরং ‘হামিয়্যা’ বা একপ্রকার ‘আত্মমগ্নতা’। কারণ প্রকৃত ‘রোজা’র চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আল্লাহর ‘সামাদিয়্যা’ গুণে গুণান্বিত হওয়া। তবে, শারীরিক সুস্থতার লক্ষ্য যদি হয় আল্লাহর ইবাদত ও খিদমতে নিজেকে আরও সজীব রাখা, তবে সেই নিয়তটি বিশুদ্ধ এবং সেই কাজটি রোজার প্রকৃত মর্যাদাপ্রাপ্ত।[34]
ক্ষুধা ও রোজার বিপত্তি প্রসঙ্গে
প্রাথমিক পর্যায়ের সুফি সাধকদের কাছে ক্ষুধা ও রোজার যে গুরুত্ব ছিল, তা বিবেচনায় রেখে আমাদের লক্ষ্য করা উচিত যে—সে সময়ের প্রাজ্ঞ সুফিগণ আহার কমানোর ফলে উদ্ভূত কিছু বিপদের বিষয়েও সচেতন ছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল নিজের স্বল্পাহারের বিষয়টি অন্যদের কাছে প্রকাশ করে প্রশংসা কুড়ানোর প্রবণতা বা রিয়া (লোকদেখানো মনোভাব)। বিশেষ করে যারা জনসমক্ষে স্বল্পভাষী কিন্তু নিভৃতে তেমনটি নয়, তাদের ক্ষেত্রে এটি প্রকট ছিল; কারণ এই দ্বিচারিতা আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য অপরিহার্য ‘সিদক আল-হাল’ বা ‘সৎ অবস্থার’র পরিপন্থী। জনৈক আলেমকে যখন কোনো এক ‘যাহিদ’ বা সংসারবিরাগী ব্যক্তির দোষ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আমি একটি ছাড়া তার আর কোনো দোষ জানি না। সে নিভৃতে এমন কিছু আহার করে যা অন্যদের সামনে করে না’।[35] এই কারণেই খানকাহ/দরগাহ কর্তৃপক্ষ প্রায়ই জনসমক্ষে পরিবেশিত খাবার গ্রহণের ওপর জোর দিতেন। এর কারণ, কেবল সদিচ্ছাপূর্ণ মেজবানের দেওয়া হালাল খাবারের প্রতি সৌজন্যতা প্রদর্শন বা ‘আদব’ রক্ষা করা নয়; বরং নিজের অনাসক্তির জন্য মানুষের স্বীকৃতি পাওয়ার আনন্দ খাবারের আনন্দের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। এজন্যই মাক্কি উল্লেখ করেছেন যে, ‘নিষ্ঠাবান’ (সাদিকুন) সাধকগণ কখনো কখনো নফসকে অহংকার থেকে বাঁচাতে একাকী না খেয়ে জনসমক্ষে অধিক তৃপ্তিসহকারে আহার করতেন।
নিজের আধ্যাত্মিক উচ্চতা গোপন রাখার একই তাগিদ থেকে একজন শায়খ তাঁর এক শিষ্যকে কঠোরভাবে ধমক দিয়েছিলেন, যখন সেই শিষ্য প্রকাশ্যে বলেছিল, ‘আমি ক্ষুধার্ত’। শায়খ বলেছিলেন, ‘তুমি মিথ্যা বলছ! কারণ ক্ষুধা হলো আল্লাহর গোপন রহস্যগুলোর একটি, যা তাঁর ভাণ্ডারে সংরক্ষিত। যে ব্যক্তি এটি প্রকাশ করে দেয়, আল্লাহ তাকে এই নেয়ামত দান করেন না’।[36] এর তাৎপর্য হলো—কেবল ক্ষুধা থাকলেই হবে না, একে নির্দিষ্ট নিয়মনীতির অধীনে থাকতে হবে। এ কারণেই সাহল আল-তুস্তারি সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় শয়তান ক্ষুধার্ত ব্যক্তির কাছে ঘেঁষতে পারে না, যতক্ষণ তার সেই ক্ষুধা জ্ঞানের (মারেফাত) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়’।
সাররাজ তাঁর কিতাব আল-লুমা গ্রন্থে ‘পথভ্রষ্টদের’ জন্য নিবেদিত একটি সংক্ষিপ্ত পরিচ্ছেদে রোজা ও ক্ষুধার বিপদ নিয়ে আলোচনা করেছেন: [37]
“একদল মুরিদ নফসের বিরোধিতা করার তত্ত্ব সম্পর্কে জানতে পেরেছিল। তারা ধারণা করেছিল যে, খাবার ত্যাগ করে নফসকে রুখে দিতে পারলেই এর মন্দ কাজ ও চক্রান্ত থেকে নিরাপদে থাকা যাবে। তারা পানাহারের স্বাভাবিক অভ্যাস বর্জন করে, কিন্তু বর্জনের শিষ্টাচারগুলো মানেনি এবং কোনো যোগ্য সুফি সাধকের পরামর্শও নেয়নি। এর পরিবর্তে তারা কেবল খাবার ত্যাগের ওপর নির্ভর করে দিনরাত এক করে রোজা রাখতে থাকে এবং ধারণা করে যে, তারা বিশেষ কোনো আধ্যাত্মিক স্তরে (হাল) পৌঁছে গেছে। বাস্তবে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছিল। এর কারণ হলো—একজন মুরিদের এমন একজন মুর্শিদ প্রয়োজন যিনি তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেবেন এবং দেখবেন যে, তার এই সংযম থেকে এমন কোনো বিপদ তৈরি না হয়, যা সে নিজে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম নয়। নফসের প্রতারণামূলক চক্রান্ত থেকে কেউ মুক্ত নয়… কারণ এটি মন্দ কাজের আদেশদাতা… যে মনে করে কেবল ক্ষুধা ও অল্পাহারের মাধ্যমে নফসকে দমন করে এর চক্রান্ত থেকে মুক্ত হওয়া যাবে, সে পথভ্রষ্ট হয়েছে।”
অন্য কথায়, ক্ষুধা ও রোজা একা নফসকে বশ করতে বা এর ছলনা থেকে সুরক্ষা দিতে পারে না; বিশেষ করে যখন এটি কোনো অভিজ্ঞ পীরের পরামর্শ ছাড়া করা হয়। কারণ সেই পীর হয়তো অনুধাবন করতে পারেন যে, ঐ মুরিদের জন্য স্বেচ্ছায় রোজা রাখার চেয়ে পুষ্টির জন্য খাবার গ্রহণ করাই বেশি উপকারী। এটি জানা যায় যে, সাহল আল-তুস্তারি নিজে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার অতিমানবিক ক্ষমতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর শিষ্যদের শুক্রবার মাংস খাওয়ার নির্দেশ দিতেন, যাতে তারা ইবাদতের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জন করতে পারে। সাররাজ নিজেও এমন একদল মুরিদকে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, যারা পানাহার ত্যাগের ক্ষেত্রে এতটাই বাড়াবাড়ি করেছিল যে, শেষ পর্যন্ত তারা তাদের ফরয নামাজ আদায়ের শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিল।
হযরত দাতা গঞ্জে বখশ পরবর্তীকালে এটি স্পষ্ট করেছেন যে, আল্লাহর বন্ধুদের (আউলিয়া) এই অতিমানবিক অভ্যাসগুলো ছিল মূলত ‘কারামত’; যা যান্ত্রিক অনুকরণের মাধ্যমে নকল করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে সাহল আল-তুস্তারির সক্ষমতা সম্পর্কে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, এটি ‘মানুষের সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করে এবং আল্লাহর সাহায্য (তৌফিক) ব্যতীত কারো পক্ষে এটি অর্জন করা সম্ভব নয়, যা নিজেই একপ্রকার পুষ্টিতে পরিণত হয়’।[38] মজার ব্যাপার হলো, দাতা গঞ্জে বখশ একই শক্তির কথা সাররাজ সম্পর্কেও উল্লেখ করেছেন। বর্ণিত আছে যে, সাররাজ একবার বাগদাদের শুনিজিয়া মসজিদে অবস্থানকালে একদল দরবেশের তত্ত্বাবধান করার সময় পুরো রমজান মাস অতিবাহিত করেছিলেন। সেখানে তাঁর জন্য নির্ধারিত নির্জন কক্ষে সেবক যে রুটি রেখে যেত, তিনি তার একটি লোকমাও স্পর্শ করেননি। আমরা ধারণা করতে পারি যে, তিনি কেবল পানি দিয়ে ইফতার করতেন; অথচ তাঁর দীর্ঘ তাহাজ্জুদ এবং কুরআন তেলাওয়াতের জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতায় কোনো ঘাটতি দেখা দেয়নি। সাররাজের সমালোচনা সেইসব উচ্চস্তরের সুফি সাধকদের (আরিফ) প্রতি ছিল না যারা দীর্ঘ সময় খাবার ছাড়াই থাকতে পারেন এবং এতে তাঁদের ইবাদতে কোনো বিঘ্ন ঘটে না। বরং তাঁর সমালোচনা ছিল সেইসব মুরিদদের প্রতি, যারা আধ্যাত্মিক পথের (সুলুক) প্রয়োজনীয় শিষ্টাচারসমূহ অনুসরণ না করেই বরেণ্য সাধকদের এই অতিমানবিক অভ্যাসগুলোকে অন্ধভাবে অনুকরণ করতে চায়। তাদের আধ্যাত্মিক অপরিপক্বতার প্রমাণ পাওয়া যায় তখনই, যখন তাদের এই অতি-উৎসাহী সংযম দৈনন্দিন কাজ ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ক্ষুধা ও রোজার অতিক্ৰমণ প্রসঙ্গে
আমাদের আলোচনা শেষ করার আগে উপরের মন্তব্যগুলোর কিছুটা পরিমার্জন বা বিশদ ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কারণ এগুলোকে বর্তমান অবস্থায় রেখে দিলে তা কেবল প্রাচীন সুফিদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে একটি আংশিক ও বিভ্রান্তিকর ধারণাই দেবে না, বরং আধ্যাত্মিক পথের চূড়ান্ত স্তরগুলো অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগুলোকেও আড়াল করবে। আলোচনায় উল্লেখিত প্রাজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের মতে, ক্ষুধা ও রোজা যখন নিয়ম মেনে যথাযথভাবে পালন করা হয়, তখনও গ্যারান্টি দেওয়া যায় না যে সেগুলো আধ্যাত্মিক জীবনের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে না। এই বিপদের মূল উৎস হলো এগুলোর ‘আপেক্ষিক মূল্য’ অনুধাবনের ব্যর্থতা। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তি রোজা ও ক্ষুধা পালনে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যেতে পারেন যে, এগুলো যে লক্ষ্য অর্জনের একটি ‘মাধ্যম’ মাত্র—সেই বোধটুকুই তিনি হারিয়ে ফেলেন। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে, বিপদটি হলো রোজার প্রতি এমন আসক্তি তৈরি হওয়া, যার ফলে পানাহার করাটা নফসের কাছে বর্জনের চেয়েও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের আধ্যাত্মিকতায় ‘মুখালাফাত আল-নাফস’ বা ‘নফসের বিরোধিতা’র যে যুক্তিটি অত্যন্ত কেন্দ্রীয়, সেই আলোকে—যখন নফস কোনো কিছু বর্জন করতে অতিরিক্ত আগ্রহী হয়ে ওঠে, তখন তাকে পানাহারে বাধ্য করাই প্রকৃত বিরোধিতা। একইভাবে, নফস যখন খাবারের প্রতি অতি-আসক্ত, তখন তাকে খাবার থেকে বঞ্চিত করাই সমীচিন। এর উদ্দেশ্য হলো সাধককে আসক্তি এবং অভ্যাসের শৃঙ্খল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করা। এ কারণেই সাহল বলতেন, ‘তুমি যখন তৃপ্ত, তখন সেই সত্তার কাছে ক্ষুধা প্রার্থনা করো যিনি তোমাকে তৃপ্তি দিয়ে পরীক্ষা করছেন। আর যখন তুমি ক্ষুধার্ত, তখন তাঁর কাছেই তৃপ্তি চাও যিনি তোমাকে ক্ষুধা দিয়ে পরীক্ষা করছেন’। অন্য কথায়, কোনো অবস্থার প্রতিই আসক্ত হওয়া যাবে না; কারণ আসক্তি নিজেই আপনাকে নফসের শিকল থেকে মুক্ত হতে বাধা দিতে পারে। এই কারণেই ইবনে সালিম বসরার জনৈক শায়খের সারাবছর রোজা রাখার (সাওম আদ-দাহর) এবং সপ্তাহে মাত্র একদিন (শুক্রবার) রুটি খাওয়ার অভ্যাসের নিন্দা জানিয়েছিলেন। তিনি লোকটিকে তিরস্কার করে বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ না সে রুটি দিয়ে ইফতার করছে, ততক্ষণ আমি তাকে সালাম দেব না’। কারণ সেই শায়খ তাঁর রোজা ও সংযমের রীতির প্রতি অতি-আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
এই ধরনের ভারসাম্যহীন পদ্ধতির কুফল অন্য একজন শায়খের কাহিনীতেও পাওয়া যায়, যিনি সফর বা সাধারণ অবস্থা—সবক্ষেত্রেই নিরবচ্ছিন্ন রোজা রাখতেন। একবার তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে এই সংযম থেকে বিরতি নিতে বাধ্য করেন। তাদের অনুরোধে রাজি হয়ে তিনি যখন রোজা ভাঙলেন, তখন নিজের চিরাচরিত অভ্যাস ত্যাগের কারণে তিনি এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন যে, তাঁর পক্ষে ন্যূনতম ধর্মীয় আচার পালন করাও অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সাররাজের মতে এর শিক্ষা হলো—যখন নফস কোনো পুণ্যকর্মে অতিরিক্ত অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সেই অভ্যাসের আনন্দই কাজের মূলে পরিণত হতে পারে। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রকৃত আকাঙ্ক্ষাকে সরিয়ে দেয়—যে আকাঙ্ক্ষার সততা কেবল সংযমের কষ্টের মাধ্যমেই যাচাই করা সম্ভব। এই কারণেই পণ্ডিতগণ প্রায় সর্বসম্মতভাবে মনে করতেন যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত দাউদ (আ.)’র একদিন পর একদিন রোজা রাখার পদ্ধতিকে শ্রেষ্ঠ বলেছেন এই কারণে যে, এটি নফসকে অভ্যাসের আনন্দ ভোগ করতে দেয় না। দারানি তাঁর নিজের সাধনার ফল নিয়ে জীবনের শেষদিকে একইরকম উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন: ‘চল্লিশ বছর ধরে আমি ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করিনি, আমি ভয় পাচ্ছি এই কারণে হয়তো আমি এর সোয়াব থেকে বঞ্চিত হব’।
প্রাচীন সুফি সাধকগণ সঠিক পরিস্থিতিতে কতটা তৃপ্তিসহকারে খাবার গ্রহণ করতেন, তার কিছু বর্ণনা আমাদের সেই সরল ধারণাকে পাল্টে দেয় যা এই আলোচনার সরলীকরণ পাঠ থেকে তৈরি হতে পারে। মাক্কি ইব্রাহিম বিন আদহামের (ইন্তেকাল ৭৭৮-৯) জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। সেই রাজপুত্র, যিনি রাজত্ব ত্যাগ করে অনাসক্তি, ইবাদত এবং হালাল উপার্জনে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি একবার এক সঙ্গীকে কিছু টাকা দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আমাদের জন্য কিছু হাওরানি মাখন, মধু এবং রুটি নিয়ে এসো’। সঙ্গীটি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবু ইসহাক, এত টাকা দিয়ে এসব?’ ইব্রাহিম উত্তর দিলেন, ‘ধিক তোমাকে! যখন আমরা পাই, তখন পুরুষের মতো খাই; আর যখন বঞ্চিত হই, তখন পুরুষের মতোই সবর করি’। আল্লাহর প্রেমে নিত্য মগ্ন থাকা ব্যক্তিদের জন্য এই আপাত বিলাসিতা বৈধ ছিল। এজন্যই মাক্কি অন্য প্রসঙ্গে লিখেছেন যে, ‘ভাইদের সঙ্গে একত্রে খাওয়ার মধ্যে অনেক ফযিলত রয়েছে’। জাফর বিন মুহাম্মদ (রা.) থেকে বর্ণিত আছে— ‘যখন তোমরা তোমাদের ভাইদের সাথে দস্তরখানে বসবে, তখন দীর্ঘক্ষণ বসে থাকো; কারণ এটি এমন এক সময় যখন তোমাদের কাছ থেকে কোনো হিসাব নেওয়া হবে না’। বিশর আল-হাফি (ইন্তেকাল ৮৪১) সম্পর্কেও একটি বর্ণনা পাওয়া যায়: একবার এক বন্ধু তাঁর কাছে এলে তিনি রোজা থাকা সত্ত্বেও হুসাইন আল-মাগাজিলিকে টাকা দিয়ে বললেন, ‘আমাদের জন্য বাজারের সেরা খাবার, মিষ্টি এবং সুগন্ধি কিনে আনো’। মাগাজিলি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘তিনি আগে কখনো আমার সাথে এভাবে কথা বলেননি। আমি নির্দেশ পালন করলাম এবং খাবার সামনে রাখলাম। তিনি তাঁর অতিথির সাথে খেতে শুরু করলেন, যদিও আমি তাঁকে আগে কখনো কারো সাথে খেতে দেখিনি’। এই ধরনের উপলক্ষগুলো খোদায়ী নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা বাড়াতে সাহায্য করে, যা নিশ্চিত করে যে, প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিদের শিক্ষাগুলো কুরআনের মূল আদর্শের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সংযমের প্রবণতা যেন চরমপন্থার দিকে না যায় তার সতর্কবার্তা। দারানি যেমনটি বলতেন, ‘উত্তম খাবার গ্রহণ আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি তৈরি করে’।
প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে নফল রোজা ভেঙে ফেলা—যা সুফি সাহিত্যে কোনো বিরল ঘটনা নয়—রোজার প্রতি আসক্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করার প্রয়োজনীয়তাকেই জোরালো করে। এটি মূলত এমন এক আধ্যাত্মিক অবস্থার প্রতিফলন যাকে কখনো কখনো ‘যুহদ আল-যুহদ’ বা ‘অনাসক্তি থেকে অনাসক্তি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। একবার আবু ইসহাক আল-ফাজারি (ইন্তেকাল ৮০৪) তাঁর দর্শনার্থী সুফিয়ান আল-সাওরিকে (ইন্তেকাল ৭৭৮) এক পাত্র ‘খাবিদ’ (এক প্রকার মিষ্টিজাতীয় খাবার) পরিবেশন করেন। সাওরি উত্তর দিলেন, ‘যদি আমি রোজা না থাকতাম, তবে তোমার সাথে যোগ দিতাম।’ ফাজারি তখন বললেন, “তোমার ভাই ইব্রাহিম বিন আদহাম কিছুক্ষণ আগে এসেছিলেন এবং তুমি যেখানে বসেছ সেখানেই বসেছিলেন। আমি তাঁকে এই পাত্রে খাবার দিলে তিনি তা গ্রহণ করেন। যাওয়ার সময় তিনি বলে গিয়েছেন, ‘রোজা থাকা সত্ত্বেও ভ্রাতৃত্বের ভালোবাসায় আমি তোমার সাথে খাবারে যোগ দিয়েছি যাতে তোমার অন্তর আনন্দিত হয়’।” ফাজারি বর্ণনা করেন যে, ইব্রাহিমের কাছ থেকে এই আদব গ্রহণ করার পর সুফিয়ান সাওরি হাত বাড়িয়ে খেতে শুরু করেন। জুনায়েদ বাগদাদী সম্পর্কেও বলা হয় যে, তিনি নিয়মিত রোজা রাখতেন ঠিকই, কিন্তু অতিথি এলে তাদের অসুবিধা না করতে তিনি রোজা ভেঙে খাবারে যোগ দিতেন। তাঁর মতে, নফল রোজার চেয়েও এই গুণটির (মেহমানদারি ও মনতুষ্টি) মর্যাদা কোনো অংশে কম নয়।
তবে এই ধরনের কাজ কেবল রোজা ভাঙার বিশেষ মুহূর্তেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মারুফ আল-কারখি (ইন্তেকাল ৮১৫)’র সামনে যখনই কোনো উত্তম খাবার আসত, তিনি সানন্দে তা গ্রহণ করতেন। যখন তাঁকে জানানো হলো যে, বিশর আল-হাফি অত্যন্ত সংযমের সাথে নিজেকে এসব থেকে বিরত রাখেন, তখন তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তোমার ভাই বিশরকে ঘিরে ধরেছে সূক্ষ্ম খোদাভীতি (ওয়ারা), আর আমাকে প্রশস্ত করেছে দিব্যজ্ঞান (মারেফাত)। আমি আমার মওলার মেহমানখানায় একজন অতিথি মাত্র। তিনি আমাকে খাওয়ালে আমি খাই, আর আমাকে ক্ষুধার্ত রাখলে আমি ধৈর্য ধরি। এখানে আমার আপত্তি বা পছন্দের কোনো সুযোগ আছে কি?’ এর তাৎপর্য হলো—আরিফ বা মহাজ্ঞানীগণ ক্ষুধা, খাদ্য বা পানীয়ের প্রতি আসক্তির ঊর্ধ্বে উঠে যান; আল্লাহ তাঁদের যে অবস্থায় রাখেন, তাঁরা কেবল তাতেই সাড়া দেন। তাঁরা নিজস্ব ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে প্রতিটি মুহূর্তের যা প্রাপ্য (হক), তা-ই আদায় করেন।
বস্তুত, রোজা ও ক্ষুধা বিষয়ক দীর্ঘ আলোচনার শেষে মাক্কি উল্লেখ করেছেন যে—মুরিদ বা নবীন সাধকদের ক্ষুধা ও রোজার মাধ্যমে নফসকে দমন করার সংগ্রাম করতে হলেও, আরিফগণ আর পার্থিব খাবারের মোহে পরীক্ষিত হন না। তাই আল্লাহ যখন তাঁদের খাবার দেন, তাঁরা পরিমিতভাবে ও কৃতজ্ঞতার সাথে তা গ্রহণ করেন, আর যখন ক্ষুধার্ত থাকেন, তখন ধৈর্যের সাথে তা সহ্য করেন। পাঠকদের তিনি মনে করিয়ে দেন যে, এই রীতিটি মূলত সুন্নাহর মধ্যেই প্রোথিত। কারণ রমজানের বাইরে নফল রোজার ক্ষেত্রে মহানবী আসমানি ইশারার মাধ্যমে বুঝতে পারতেন সেদিন কোন পথে চলবেন। তাঁর এবং আল্লাহর মধ্যে একটি ‘নিদর্শন’ (আলামত) থাকত; আর অনেক সময় তাঁর পরিবারের প্রস্তুতকৃত খাবারের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করেই সেই সিদ্ধান্ত হতো। আরিফদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, যারা তাঁদের অন্তর্দৃষ্টি (বসিরাত) এবং দিব্যদৃষ্টির (মুশাহাদা) মাধ্যমে প্রতিটি পরিস্থিতিতে নিজেদের করণীয় নির্ধারণ করেন। তাঁদের এই সিদ্ধান্তে রোজা রাখা বা না রাখার প্রতি বিশেষ কোনো পক্ষপাত থাকে না। মাক্কি একইসাথে নবীন মুরিদদের সেই সূক্ষ্ম প্রতারণা সম্পর্কেও সতর্ক করেছেন, যেখানে তারা খোদায়ী ইশারার অজুহাত দিয়ে রোজার কষ্ট থেকে বাঁচতে চায়। তাই তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, কেউ যদি খাবারের প্রস্তাবের কারণে রোজা ভেঙে ফেলে, তবে তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে সে রোজা না থাকা অবস্থায়ও তার দৃষ্টি, শ্রবণ, বাক্য, অন্তর এবং হাত-পা পাপাচার থেকে ঠিক ততটাই দূরে রাখছে যতটা সে রোজার ভেতর রাখত।
মাক্কি তাঁর গ্রন্থে ক্ষুধা ও রোজার ঊর্ধ্বে ওঠার বিষয় নিয়ে খুব বেশি বিস্তারিত আলোচনা করেননি, কারণ তাঁর গ্রন্থটি মূলত মুরিদদের জন্য একটি কর্মপদ্ধতি বা মুয়ামালাত বিষয়ক পাঠ্য। তবুও তিনি পাঠককে এটি বোঝার জন্য যথেষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, আধ্যাত্মিক পথের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে হলে দীর্ঘস্থায়ী সংযমের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ‘ক্ষুধা ও রোজার অভ্যাসগুলোকেও’ ভেঙে ফেলতে হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি সাহল আল-তুস্তারি থেকে একটি উদাহরণ পেশ করেছেন। যে সাহল ইসলামের ইতিহাসের আদি পর্বে তাঁর কঠোর খাদ্যাভ্যাসের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন, জীবনের শেষদিকে যখন তাঁকে তাঁর রুটিন সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি উত্তর দেন, ‘এখন আমি সীমার চিন্তা বা সময়ের হিসাব ছাড়াই আহার করি।’ এর অর্থ এই নয় যে, তিনি উদরপূর্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন; বরং এর অর্থ হলো যৌবনে তিনি নিজের ওপর যে কঠোর নিয়ম আরোপ করেছিলেন, এখন তার আর প্রয়োজন নেই। কারণ ক্ষুধা ও রোজা থেকে যা পাওয়ার ছিল—অর্থাৎ নফসকে বশ করা এবং আল্লাহর ‘সামাদিয়্যা’ গুণে গুণান্বিত হওয়া—তা তিনি অর্জন করেছেন। আবু সাঈদ আল-খাররাজ (ইন্তেকাল ৮৯৯)-এর সেই অমর বাণীর সাথে সাহল সম্ভবত দ্বিমত করতেন না: ‘ক্ষুধা হলো যাহিদ বা সংসারত্যাগীদের খাদ্য, আর আল্লাহর স্মরণ (জিকির) হলো আরিফ বা মহাজ্ঞানীদের খাদ্য।’
তবে রোজা এবং ক্ষুধার ঊর্ধ্বে ওঠার তাত্ত্বিক বা মেটাফিজিক্যাল (metaphysical) তাৎপর্য নিয়ে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। আমরা দেখেছি যে, রোজা এবং ক্ষুধা যদি মানুষকে আল্লাহর অতীন্দ্রিয়তা (transcendence), স্বাতন্ত্র্য এবং অমুখাপেক্ষিতার গুণে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়, তবে ইফতার করা, সুস্বাদু আহার গ্রহণ এবং তাঁর নেয়ামতগুলো উপভোগ করার মাধ্যমে আল্লাহর খোদায়ী সত্তার কোন দিকটি অনুভব করা সম্ভব? প্রাচীন সুফি গ্রন্থগুলো এই প্রশ্নে অনেকটা নীরব; সেখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, কেবল ক্ষুধার মাধ্যমেই ‘উলুহিয়াত’ বা খোদার অগাধ রহস্যের দুয়ারে পৌঁছানো সম্ভব। তবে, আমরা যদি রোজা ও ক্ষুধার গভীরতর অর্থের যুক্তিটিকে তার যৌক্তিক পরিণতি পর্যন্ত নিয়ে যাই, তবে এটি বলা অসংগত হবে না যে—পানাহার করার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি এই জগতে আল্লাহর উপস্থিতি, তাঁর নিকটবর্তী হওয়া এবং তাঁর সর্বব্যাপী রূপকে (immanence) ‘ইউকারিস্টিক’ বা একপ্রকার পবিত্র উপলব্ধির (রূপক ও আক্ষরিক উভয় অর্থেই) মাধ্যমে অনুভব করতে পারেন। অন্য কথায়, যা কিছু আকার ও বস্তুর ঊর্ধ্বে, এই নশ্বর জগতের ভেতরেই তার উপস্থিতিকে অনুভব করা—যা বহুত্বের মাঝে একত্বের (The One in the many) প্রকাশ। বস্তুত, কুরআনে এমন আয়াত রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে— ‘তোমরা যেদিকেই মুখ ফেরাও, সেদিকেই আল্লাহ বিদ্যমান’ (২:১১৫) এবং ‘আল্লাহর রহমতের নিদর্শনের দিকে তাকাও’ (৩০:৫০)। এই আয়াতগুলো প্রায়শই দর্শনের মাধ্যমে আল্লাহর আত্ম-প্রকাশ বা ‘তাজাল্লিয়াত’ (tajalliyāt) হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। এখন এই তাজাল্লি বা ঐশ্বরিক প্রকাশ কি উপলব্ধির মাধ্যমেও অনুভব করা সম্ভব—এমন প্রস্তাব করা কি খুব বেশি অতিরঞ্জিত হবে?
এই প্রস্তাবনাটি পরবর্তীকালে বিকশিত সুফি তাত্ত্বিক দর্শনের সাথে মোটেও অসংগত নয়; যা প্রাচীন সুফিদের ধ্যান এবং খোদ ‘তাওহিদ’র ভেতরে নিহিত গূঢ় অর্থগুলোকেই বের করে আনার চেষ্টা করেছে। তবে এটি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন যে, পানাহারের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে সেই মোলাকাত বা মিলন ততক্ষণ সম্ভব নয়, যতক্ষণ না পানাহারের বাইরে ক্ষুধা ও রোজার মাধ্যমে খোদায়ী সত্তার অভিজ্ঞতা অর্জিত হচ্ছে। অর্থাৎ, ‘বহুত্বের মাঝে এক’কে খুঁজে পেতে হলে প্রথমে ‘নিভৃতে এক’কে খুঁজে পেতে হবে। একারণেই হাকিকত বা চরম সত্যের পূর্ণ উপলব্ধির আগে ‘তরিকা’ বা আধ্যাত্মিক পথের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ঠিক যেভাবে একজন অলি বা সাধককে ইন্দ্রিয় জগতে আল্লাহকে অনুভব করার আগে তাঁর নির্জনতায় (solitude) তাঁকে অনুভব করতে হয়—যা মূলত নবীজীর মে’রাজের ধারাক্রমের এক অনুসরণ। তেমনি খাবারের মাঝে আল্লাহর সর্বব্যাপী রূপ উপলব্ধির আগে ক্ষুধার মাঝে তাঁর অতীন্দ্রিয়তাকে উপলব্ধি করতে হয়। যদি ইন্দ্রিয় জগতের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে এমন মিলন সম্ভব না হতো, তবে প্রাচীন সুফি সাধকগণ রোজা ও ক্ষুধার আসক্তি ত্যাগের কথা বলতেন না; কারণ তার অর্থ দাঁড়াত খোদ আল্লাহকেই ত্যাগ করা। আবারও বলছি, এগুলো কেবল তাত্ত্বিক বিবেচনা মাত্র, তবে প্রাচীন সুফি চিন্তা-প্রক্রিয়ার যুক্তির ভেতরে এগুলোর অন্তত কিছু ভিত্তি রয়েছে।
পরিশেষে এটি পুনর্ব্যক্ত করা প্রয়োজন যে, রোজা ও ক্ষুধার সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে নিয়মিত পেট ভরে খাওয়া বা অতিভোজনের পাপে নিমজ্জিত হওয়া। সুন্নাহ—যাকে প্রাচীন সুফিগণ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নিতেন—তার কোথাও এমন ধারণার প্রমাণ নেই। হযরত আবু বকর (রা.) যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর পুত্র এত বেশি খেয়েছেন যে তিনি অসুস্থ বোধ করছেন, তখন তিনি শপথ করে বলেছিলেন, ‘যদি সে মারা যায়, তবে আমি তার জানাজায় উপস্থিত হব না’। এটি আলঙ্কারিক উক্তি হোক বা না হোক, তাঁর এই ক্ষোভ ইসলামের সেই মনোভাবকেই প্রকাশ করে যা অসংখ্য হাদিস দ্বারা সমর্থিত। সুতরাং, ক্ষুধা ও রোজার একটি উদ্দেশ্য ছিল প্রবৃত্তির শক্তিকে জয় করা, যাতে মানুষ কোনো লালসা ছাড়াই খাবার উপভোগ করতে পারে, অথবা অন্তত খাবারের দাসে পরিণত না হয়। এই কারণেই বিশর আল-হাফি যখন তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর দেয়া বেগুনের তরকারি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন— ‘আমি যদি কারো সাথে খেতাম, তবে তোমার সাথেই খেতাম; কিন্তু আমি বছরের পর বছর ধরে বেগুনের আকাঙ্ক্ষা করেছি এবং এটি আমার নসিবে ছিল না’। যখন মেজবান এটি হালাল উপায়ে অর্জিত বলে আশ্বাস দিলেন, বিশর উত্তর দিলেন— ‘যতক্ষণ না আমি এর প্রতি আমার লালসা থেকে মুক্ত হচ্ছি, ততক্ষণ এই খাবার আমার জন্য নয়’। আর যারা ‘যুহদ’ (তপস্যা) পেরিয়ে ‘মারেফাত’ (দিব্যজ্ঞান) অর্জন করেছেন, তাঁদের জন্য এই ধরনের কঠোরতা আর প্রয়োজনীয় নয়। কারণ তাঁরা এখন সেই স্তরে অবস্থান করছেন যাকে ইবনে আরাবী তাঁর ফুতুহাত আল-মাক্কিয়া-তে একটি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়ে ‘তারক আল-জু’ বা ‘ক্ষুধা বর্জন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
উপসংহার
আমরা এই আলোচনার শুরুতে প্লেটোর ফিডো গ্রন্থে বর্ণিত দেহ ও আত্মার মধ্যকার বিখ্যাত পার্থক্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। আমাদের এ পর্যন্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট হওয়া উচিত যে—প্রাথমিক পর্যায়ের সুফি ঐতিহ্যে ‘নফস’ (self/soul) তার পরিশুদ্ধি বা ‘তাজকিয়া’র মাত্রার ওপর ভিত্তি করে একটি মই বা সোপানের বিভিন্ন ধাপ দখল করতে পারত। এই সোপানের সর্বনিম্ন স্তরে থাকার অর্থ হলো শারীরিক লালসার প্রতি আসক্তি ও তার বশ্যতা স্বীকার করা; আর উচ্চতর স্তরে অবস্থানের অর্থ হলো মানুষের আত্মসত্তার বহিঃস্তরের ওপর আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। হারিস আল-মুহাসিবি (ইন্তেকাল ৮৫৭) সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি যিনি নফসের বিভিন্ন ধরন সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের আয়াতগুলো নিয়ে ভাবনার মাধ্যমে এই স্তরগুলোকে (vertical spectrum) পদ্ধতিগতভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন। এই ধারাক্রমে ‘মন্দ কাজের আদেশদাতা আত্মা’ (আল-নাফস আল-আম্মারা বিস-সু’) এবং ‘তিরস্কারকারী আত্মা’ (আল-নাফস আল-লাউয়্যামা) থেকে শুরু করে ‘প্রশান্ত আত্মা’ (আল-নাফস আল-মুতমাইন্না) এবং পরকালীন অবস্থার সাথে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে।[39] ইসলামের এই আদি মনস্তাত্ত্বিক ঐতিহ্য ও সাহিত্যে যে মৌলিক অন্তর্দৃষ্টিসমূহ—কখনো কখনো ভ্রূণাকারে—বিদ্যমান ছিল, পরবর্তী ঐতিহ্যে, সাহিত্যে সেগুলোর ব্যাপক পরিমার্জন ও বিস্তার ঘটানো হয়েছে। কেউ কেউ যুক্তি দেন যে, নফস যেহেতু মানুষের ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করে, তাই এটি মূলত ‘রুহ’ (transpersonal Spirit) এবং ‘জাসাদ’ বা ‘জিসম’ (দেহ)র মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে; আর এর পবিত্রতার মাত্রা নির্ভর করে ‘রুহ’র সাথে এর নৈকট্যের ওপর।
খাদ্য ও পানীয়ের সাথে বিভিন্ন প্রকার আত্মার সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামের প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিগণ মনে করতেন যে—সম্ভাবনার এই স্তরবিন্যাসে উপরে ওঠার সাথে সাথে একটি গুণগত পার্থক্য তৈরি হয়। একদম তলানিতে থাকে সেই মানুষ যে সম্পূর্ণভাবে ‘শাহওয়াহ’ বা কামনার দ্বারা চালিত এবং যা কিছু সে গ্রহণ করে তার ভালো-মন্দ বিচারে অক্ষম; বড়জোর তার মধ্যে শারীরিক সুস্থতা নিয়ে সামান্য সচেতনতা থাকতে পারে (তাও যদি থাকে)। এর পরবর্তী ধাপে রয়েছেন ‘আওয়াম’ বা সাধারণ মুমিনগণ—যারা হালাল ও হারামের বিষয়ে সজাগ, কিন্তু অতিভোজনের সূক্ষ্ম প্রভাব কিংবা নৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে সন্দেহজনক খাবারের ব্যাপারে খুব একটা সচেতন নন। তাঁদের উপরে রয়েছেন সেই ‘সালিক’ বা আধ্যাত্মিক পথিক, যিনি সন্দেহজনক খাবার বর্জন করেন এবং শারীরিক লালসা দমনের সুশৃঙ্খল পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পূর্ণ হালাল খাবারের পরিমাণও কমিয়ে দেন; যার লক্ষ্য হলো সবলভাবে ‘যুহদ’ ও ‘ওয়ারা’ অর্জন করা। পরিশেষে, এই আরোহণের চূড়ায় অবস্থান করেন সেই ‘আরিফ’ (gnostic), যিনি সংযমের মাধ্যমে এই জগতে যা কিছু অর্জন সম্ভব ছিল তার সবই লাভ করেছেন এবং এখন নিজের ওপর আরোপিত কঠোর নিয়মগুলো শিথিল করেছেন। বাহ্যিক খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে আরিফ বা মহাজ্ঞানীগণ সাধারণ মানুষ (আওয়াম) এবং কঠোর সাধকদের (যুহদ) মাঝামাঝি অবস্থানে থাকেন, যদিও অভ্যন্তরীণ মাকামের দিক থেকে তিনি উভয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আত্মার এই বিভিন্ন প্রকারের স্তরবিন্যাসে ঊর্ধ্বমুখী গতি মূলত সঞ্চারিত হয়—যেমনটি আমরা দেখেছি—আত্মনিগ্রহ, রোজা এবং ক্ষুধার মাধ্যমে পানাহার কমিয়ে আনার ফলে। ক্ষুধাকে ইয়াহিয়া বিন মুয়ায ‘জমিনে আল্লাহর খাদ্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যদিও এই চিত্রটি কিছু ক্ষেত্রে বিষয়টিকে সরলীকরণ করে ফেলে, তবুও এটি আধ্যাত্মিক অর্জনের বিভিন্ন স্তরের বৈশিষ্ট্য এবং রোজা ও ক্ষুধার প্রতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গির একটি তুলনামূলক নিখুঁত ও প্রাথমিক ধারণা প্রদান করে। প্রবন্ধটি কেবল প্রাচীন সুফি সাহিত্যে বিদ্যশান অসংখ্য কাহিনী ও উক্তির মর্মোদ্ধার করতেই সাহায্য করে না, বরং তাদের মধ্যকার আপাতবিরোধগুলো নিরসনেও সমানভাবে ভূমিকা রাখবে।
ইংরেজি ভাষায় রচিত মূল প্রবন্ধ:
Fasting_in_Early_Sufi_Literature_Oxford