এঁর অর্থ তাঁর জীবনের অন্য সমস্ত দিক একপাশে রাখলেও তিনি একজন সমাজসংস্কারক হিসেবে প্রায় দুঃসাধ্য কীর্তি গড়ে তুলেছেন। দরবেশ হিসেবে তিনি যেমন মানুষের অন্তরে আধ্যাত্মিক প্রেরণা সঞ্চার করেছিলেন, তেমনি মানুষের বসবাসের যথাযথ বন্দোবস্তের জন্য তৈরি করেছেন অসংখ্য রাস্তাঘাট, মসজিদ ও দিঘি। গড়ে তুলেছেন শহর। জীবনীকার সৈয়দ ওমর ফারুক হোসেন মন্তব্য করেছেন, “তিনি হাবেলী খলিফাতাবাদ পরগনায় ৩৬০টি মছজিদ নির্মাণ ও ৩৬০টি দীঘি খনন করেছিলেন।”(হোসেন, ১৯৮২, ১৯০) উল্লেখ্য, হাবিলী কসবা কেবল তাঁর রাজ্যের একাংশের নাম, এ ছাড়াও মুরলী কসবা এবং পয়গ্রাম কসবা, আমাদী কসবা নামে আরও কয়েকটি বৃহৎ অংশ তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রসঙ্গত তিনি যখন খুলনা-যশোর অঞ্চলে আগমন করেন, তখন এলাকাটি ছিল নদীনালা আর জঙ্গলে ঘেরা। সাগরের জোয়ারের নোনাপানি এসব নদীনালা হয়ে বিস্তৃত অঞ্চল ভাসিয়ে দিত। তাই এখানে সুপেয় পানির যথেষ্ট অভাব ছিল। জঙ্গলাকীর্ণ হওয়ায় মানুষের বসবাসেরও অনুপযোগী ছিল বিশাল অংশ। মানুষের বসবাস যেখানে কম, সেখানে রাস্তাঘাটেরও যথেষ্ট অভাব থাকবে এই তো সরল কথা। সেইসাথে বাজার কিংবা শহর গড়ে উঠাও ছিল প্রায় অসম্ভব।
মানুষের ধর্মীয় এবং সামাজিক প্রয়োজনের তাগিদে তিনি প্রধান কয়েকটি বিষয়ে জোর দেন। যথা, জঙ্গল পরিষ্কার, রাস্তাঘাট তৈরি, মসজিদ নির্মাণ, দিঘি খনন এবং বাজার/শহর প্রতিষ্ঠা। খুলনা-যশোর অঞ্চলে তাঁর আগমনের পূর্বে উল্লেখযোগ্য রাস্তাঘাটের যথেষ্ট অভাবে ছিল। তাই তিনি সেখানে এসেই প্রথমে যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর জোর দেন। তাঁর সৃষ্টিকর্মগুলো যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এটি সহজেই অনুমান করা যায় যে, তাঁর নির্মাণ নকশা ছিল— রাস্তা তৈরি করতে করতে আগাতে থাকো, যেখানে গিয়ে নামাজের ওয়াক্ত হবে সেখানেই মসজিদ বেঁধে নাও। তৃষ্ণা নিবারণ আর অজুর জন্য যেহেতু পানি লাগবে, তাই সুপেয় পানির জন্য দিঘি খনন করো। এই প্রকল্পের বাস্তবতায় তাঁর আমলে তৈরি প্রায় মসজিদের সাথে বড়ো বড়ো দিঘি, পুকুর দেখতে পাওয়া যায়।
এসব কাজে তাঁর সৈন্যরা দুভাবে বিভক্ত হয়ে কাজ করেছিল বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। একভাগের নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং তিনি, অপরভাগে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাঁর প্রধান মুখপাত্র মোহাম্মদ তাহের তথা পীরালী (রহ.)। মুহম্মদ আবূ তালিব তাঁর ‘খুলনা জেলায় ইসলাম’গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “যতদূর জানা যায়, খান জাহানের অনুসারিগণ তাঁর নির্দেশ মুতাবিক দুটি দলে বিভক্ত হয়ে সারা নিম্ন বাংলায় ছড়িয়ে পড়েন। একদল ভৈরবকূল ধরে মুরলী থেকে পয়গ্রাম এবং পয়গ্রাম থেকে নাউলী, ধূলগ্রাম, বারাকপুর দীর্ঘালয়া (তখন মুজতখালী নদী ছিল না), ফর-মাইশখানা, সেনের বাজার হয়ে কিসমৎ-খুলনা (তখন রূপসা নদীও ছিল না) এবং কিসমৎ খুলনা থেকে বাগের হাটের পথে যায় এবং দ্বিতীয় দল বিখ্যাত কপোতাক্ষ নদের কূল বেয়ে আমাদি এবং আমাদি থেকে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বেদকাশী পর্যন্ত ইসলাম প্রচার ও জনহিতকর কার্যে লিপ্ত হন।”(তালিব, ১৯৮৮, ৮৮)
আগেই বলা হয়েছে, তিনি আর তাঁর দল যেদিকে গেছেন, সেদিকেই সভ্যতা গড়ে তুলেছেন। অনাগত প্রজন্মের জন্য তৈরি করে গেছেন অসংখ্য রাস্তাঘাট। রাস্তাগুলোও যেনতেন রাস্তা ছিল না, প্রায় ছয়শত বছর আগে হলেও প্রায় বড়ো বড়ো সড়ক ছিল পাকা। তাঁর নির্মিত কয়েকটি প্রধান সড়ক হলো:
১. বারোবাজার থেকে মুরলী কসবা তথা যশোর হয়ে পয়গ্রাম কসবা তথা খুলনা আলাইপুর হয়ে খলিফাতাবাদের কেন্দ্র তথা ষাট গম্বুজ মসজিদ পর্যন্ত।
২. বিদ্যানন্দকাঠি থেকে আটরাই-তালা-পাইগাছা-আমাদী ও বেতকাশী পর্যন্ত।
৩. পয়গ্রাম-ফুলতলা-ডুমুরিয়া-আরশনগর-আটরাই তালা হয়ে লাবসা পর্যন্ত।
৪. সামন্তসেনা হতে বাদখালী।
৫. বারাকপুর হতে দিঘলিয়া, সিদ্ধিপাশা খুলতা দৌলতপুর। (আলীম, ৭৪-৭৯)
এ প্রধান সড়কগুলো ছাড়াও তিনি আরও বহু রাস্তা নির্মাণ করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি খুলনা-যশোর অঞ্চলকে, অর্থাৎ দক্ষিণাঞ্চলের বাণিজ্যিক যাত্রাকে এক সুতোয় গেঁথে ফেলতে সমর্থ হন।
সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি দিঘি খনন ছিল খান জাহান আলী’র অন্যতম উল্লেখযোগ্য কীর্তি। সর্বসাধারণের সুপেয় পানির চাহিদা মেটাতে তিনি অসংখ্য দিঘি খনন করেছেন, কালের গর্ভে বহু ইমারত বিলীন হয়ে গেলেও অধিকাংশ দিঘি এখনও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। তাঁর খননকৃত কয়েকটি বিখ্যাত দিঘি সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো।
১. খাঞ্জেলি দিঘি: খান জাহান আলী’র মাজারের পাশেই আছে বিখ্যাত খাঞ্জেলি দিঘি। প্রায় ৩৬০ বিঘা জমির উপর এই দিঘি অবস্থিত। পুরো বাংলায় এরচেয়ে বড়ো দিঘি আছে কি না সন্দেহ। এই দিঘির অপর নাম ঠাকুর দিঘি। ঠাকুর দিঘি নাম হওয়ার কয়েকটি কারণ পাওয়া যায়। কারো মতে, হিন্দুরা খান জাহান আলীকে পীর না বলে তাদের ভাষায় ‘ঠাকুর’ নামে সম্বোধন করতো, এ থেকেই নাম হয় ঠাকুর দিঘি, কেউ বলেছেন খান জাহান আলীর প্রধান মুখপাত্র পীর আলী মোহাম্মদ তাহের ব্রাহ্মণ থেকে মুসলমান হন, এবং এই দিঘি খননে তিনি তদারকিতে ছিলেন বলে দিঘির নাম ঠাকুর দিঘি হয়। আরও একটি কিংবদন্তি হচ্ছে, দিঘি খননকালে একটি মূর্তি পাওয়া যায়, যা হিন্দুরা ঠাকুরের মূর্তি বলে চিহ্নিত করেছে (যদিও সেটি বৌদ্ধমূর্তি ছিল), এ থেকে দিঘির নাম ঠাকুর দিঘি হয়; যা পরবর্তীতে খাঞ্জেলি দিঘি হিসেবেই প্রতিষ্ঠা পায়।
২. ঘোড়া দিঘি: খান জাহান আলী যে স্থানে বসবাস করতেন, তার পাশেই এ দিঘির অবস্থান। ঘোড়ায় চড়ে তিনি একটি চক্কর দেন এবং যতদূর পর্যন্ত চক্কর দেন, ঐ সীমানা পর্যন্ত দিঘি খনন করা হয় বলে এর নামকরণ হয় ঘোড়া দিঘি। দিঘিটি দৈর্ঘ্যে ১০০০ এবং প্রস্থে ৬০০ হাত প্রায়। দিঘিটির পানি আজও সুপেয় বলে পরিগণিত। এই দিঘির পাড়ে খান জাহান আলীর সৈন্যদলের আস্তানা ছিল, এবং এর চারপাশে তারা ঘোড়া চালিয়ে প্রশিক্ষণ নিত বলেও প্রচলিত আছে। দিঘিটিতে কালা পাহাড়, ধলা পাহাড় নামে বিখ্যাত দুটি কুমির ছিল।
৩. পচা দিঘি: দিঘিটি খান জাহান আলীর ভাগ্নে পচাই খান দ্বারা নির্মিত বলে এটির নাম পচা দিঘি। এর অবস্থান বাগেরহাট এবং ষাট গম্বুজ রাস্তার মাঝামাঝি। দিঘিটি লম্বায় ১৭০০ এবং প্রস্থে ৪০০ হাত দীর্ঘ।
৪. কোদাল ধোয়া দিঘি: এ দিঘি দৈর্ঘ্যে ১৬০০ এবং প্রস্থে প্রায় ৭০০ হাত। এটি কোদাল ধোয়া দিঘির পূর্বে সুন্দরঘোনা তথা বিদ্যানন্দ কাঠিতে অবস্থিত। এখানে প্রাচীনকাল থেকে গ্রাম্য মেলা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এই দিঘির পাশে ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য উন্নতমানের পার্ক তথা পিকনিক স্পট তৈরি হয়েছে।
এসব ছাড়াও তাঁর সহচরদের দ্বারা আরও অসংখ্য দিঘি খনন করা হয়। যেমন: সরফাবাজ দিঘি, সুজন শাহ দিঘি, বুড়া খাঁ দিঘি, সরল খাঁ দিঘি, হাজী দিঘি, সরল গ্রাম দিঘি, বাসুড়ি গ্রাম দিঘি, এখতিয়ার খাঁ দিঘি ইত্যাদি। (তালিব, প্রাগুক্ত, ৯১)
খুলনা-যশোর অঞ্চলকে তিনি যখন বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলেন তখন স্বাভাবিকভাবেই নিকটস্থ তুলনামূলক অনুন্নত জনপদের মানুষ তাঁর আবাদি ভূমিতে এসে বসবাস করতে থাকেন। দেখতে দেখতে তার বিচরণ ভূমির গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলি কসবা তথা শহরে রূপান্তরিত হতে থাকে। আধুনিক যশোর, খুলনা, বাগেরহাট সবগুলোই তাঁর প্রতিষ্ঠিত শহর। যেগুলোর পূর্বনাম ছিল যথাক্রমে মুরলী, পয়গ্রাম ও হাবেলী কসবা। এর মাঝে মুরলী (যশোর) এবং পয়গ্রাম (খুলনা) কসবা যথাস্থানেই বিদ্যমান। হাবেলী কসবা কিছুটা স্থান পরিবর্তন করে বর্তমান বাগেরহাটে পরিবর্তিত হয়েছে। এগুলো ছাড়াও খানপুর, নাউলী, বারাকপুর, ফরমাইশ খানা, খালিশপুর, মুজগুন্নি, সৈয়দ মহল্লা, ফকিরহাট, আফরা ইত্যাদি বাজার কিংবা জনপদও তাঁর প্রতিষ্ঠিত বলে ধরা হয়। (প্রাগুক্ত, ৮৭)
এছাড়াও তিনি মুসাফিরদের জন্য মুসাফিরখানা, সরাইখানা, সেনাচাউনী তথা বেরাক (যেখান থেকে বেরাকপুর নামে একটি জনপদ আজও বিদ্যমান), লঙ্গরখানাসহ অসংখ্য জনহিতকর, ধর্মীয় ও প্রশাসনিক অবকাঠামো তৈরি করে বসবাস উপযোগী আদর্শ সমাজ বিনির্মাতা হিসাবে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
সৈয়দ ওমর ফারুক হোসেন খান জাহান আলী (রহ.) এঁর কৃতিত্বের বর্ণনা দিতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, “তিনি যখন এই অঞ্চলে আগমন করেন তখন বাগেরহাটের এই অঞ্চল ছিল সুন্দরবনের গভীরতম প্রদেশ। তাই এই স্থানকে বসবাসের উপযোগী করে তোলার জন্য তিনি একটা বিস্তীর্ণ এলাকার জঙ্গল কেটে পরিস্কার করে অজস্র জলাশয়, রাস্তাঘাট নির্মাণ করে ও সর্বোপরি এখানে শহর স্থাপন করে এই এলাকাকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে তুলেছিলেন। তার এই মহত কাজে তার অনুগামীগণ তাদের জীবনকে বাজি রেখে তাকে সাহায্য করেছিলেন। তাদের উপহার দেওয়া কোদাল ও তরবারির তারা পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন। যার ফলে একটি জনবিরল জঙ্গল এলাকা অতি অল্প সময়ের মধ্যে একটি ছোট হলেও খ্যাতি সম্পন্ন রাষ্ট্রে পরিণত হতে পেরেছিল।” এই মন্তব্য খান জাহান আলী’র মহৎ সংস্কার প্রচেষ্টাগুলোর উপর ভিত্তি করেই প্রদত্ত। পুরো যশোর-খুলনা অঞ্চলে তাঁর কীর্তিগুলো আজও ঠাঁই দাঁড়িয়ে থেকে নীরবে তাঁর স্তুতি গেয়ে চলেছে। তাঁর আগমন না হলে অধুনা খুলনা-যশোর অঞ্চল হয়তো আজও অনাবাদি ভূমি হিসেবে চিহ্নিত হতো। তিনি পুরোপুরি জঙ্গলাকীর্ণ, নদীনালা বিস্তৃত একটি অঞ্চলকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলতে রাস্তাঘাট, মসজিদ নির্মাণ, দিঘি খননে বছরের পর বছর ব্যয় করেছেন। গড়ে তুলেছেন একাধিক শহর। যোগাযোগ তৈরি করেছেন গৌড়, পাণ্ডুয়া এবং সোনারগাঁও-সহ তৎকালীন উন্নত সব জনপদের সাথে।
এভাবে তিনি কেবল দরবেশ পরিচয়কে ছাড়িয়ে, শাসকের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে উঠেছেন কিংবদন্তি সমাজস্রষ্টা। এজন্যই ইটন তাঁকে ‘Entrepreneur peer’ অভিহিত করে লিখেছেন,
“Khan Jahan was clearly an effective leader, since superior organizational skills and abundant manpower were necessary for transforming the region’s formerly thick jungle into rice fields: the land had to be embanked along streams in order to keep the salt water out, the forest had to be cleared, tanks had to be dug for water supply and storage, and huts had to be built for the workers. When these tasks were accomplished, rice had to be planted immediately, lest a reed jungle soon return. These were all arduous operations, made more difficult by the ever-present dangers of tigers and fevers.” (Eaton, 1994, 210)