১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। আজকের বাংলাদেশ ছিল তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তানের অংশ হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে ছিল ভৌগলিক অবস্থান ও ভাষাগত পার্থক্য। ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির পরপরই বাংলার মানুষকে সামাজিক, অর্থনৈতিক এমনকি রাজনৈতিক নীপিড়নের শিকার হতে হয় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠির হাতে। দীর্ঘ ২৩ বছরের টানাপোড়েনের সম্পর্ক অবশেষে দাড়াঁয় জালিম ও মজলুমের সম্পর্ক। দুই ভূখণ্ডের সম্পর্কের তিক্ততার পরত তুঙ্গে উঠে ইতিহাসের এক নারকীয় হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। ১৯৭১ সালের কেবল ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় সাত হাজারের অধিক মানুষকে হত্যা করা হয়। এছাড়া গ্রেফতার করা হয়েছে আরও তিন হাজারের অধিক। তাদেরকেও পরে মেরে ফেলা হয়।’’ রবার্ট পেইন আরও চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন যে, ১৯৭১ সালের ১ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন জেলা ও থানায় পশ্চিম পাকিস্তানী বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে হাজার হাজার নিরীহ লোককে নির্মমভাবে হত্যা করে। বিশ্বে গণহত্যার যত ইতিহাস রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ ও লোমহর্ষক গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামে। এই গণহত্যা ও নৃশংস নির্যাতনের কারিগর ছিলেন ইয়াহিয়া ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী। তবে খোদ পশ্চিম পাকিস্তানেই বহু নাগরিক শাসকগোষ্ঠি কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সুইডিশ হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি সৈয়দ আসিফ শাহকারকে ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার’ সম্মাননা প্রদান করে।[1] পাকিস্তানের সিরিকোট দরবারের পীর সাহেব আল্লামা সৈয়্যদ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ রহ. প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ শাহ্ আহমদ নূরানীকে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক প্রধান ইয়াহিয়া খানের নিকট পাঠিয়ে বলেছিলেন,
‘পূর্ব পাকিস্তানে অত্যাচার বন্ধ করুন এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিয়ে তাঁর সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করুন। পাকিস্তানকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করুন’।
পরবর্তীকালে তিনি নওশেরায় বন্দী শিবিরে আটক সেনাবাহিনীর বাঙালী সদস্যদের দেখতে যান এবং তাদের দুর্দশা লাঘবে সহায়তা করেন ও আশু মুক্তির জন্য দোয়া করেন।”[2]
তবুও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে চলে গড়পরতায় পাকিস্তানী মানেই ঘৃণিত এমন সংস্কৃতির চাষাবাদ। পাকিস্তানের সমস্ত নাগরিক কি ঘৃণিত? যাদের জন্ম ৭১’র পরে তারাও? পাকিস্তানের করাচি শহরে ফুটপাতে যে ছেলেটি ফুল বিক্রি করে তাকেও ঘৃণা করবো? খেটে খাওয়া মানুষদের ঘৃণা করবো? ঘৃণা করে আমাদের লাভটা কি? যে সকল পৈশাচিক জালেম আমাদের পূর্বপুরুষদের হত্যা করেছে, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে, ধর্ষণ করেছে, লুটপাট করেছে, ধনসম্পদ কেড়ে নিয়েছে তাদের বেশিরভাগই বেঁচে নেই। তাদের প্রতি ঘৃণা দেখানোর একমাত্র উপায় কি নতুন প্রজন্মকে ঘৃণা করা? বাংলাদেশে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের যে বিকাশ হয়েছে তাতে এই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত জরুরী।
মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম সম্পর্ক তৈরি হয় ১৯৭৪ সালে। ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামী সম্মেলন সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনে যোগদানের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান সফরে যান। সেই সময় দু’দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে শেখ মুজিব ও জুলফিকার ভুট্টোর মধ্যে দ্বি-পাক্ষিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। একই বছরের ২৭ জুন জুলফিকার আলী ভুট্টো তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় আসেন। তবুও ঘৃণার সংস্কৃতিকে রাজনৈতিক কারণেই পুনঃউজ্জিবী করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে একটি শ্রেণী।
ঘৃণার ছবক ভুলে জাতীয়তার সব বাধা ভেঙ্গে সবার হৃদাসনে জায়গা করে নিয়েছেন পাকিস্তানের সিরিকোট দরবার শরীফের পীর সাহেবগণ। পাকিস্তানের নাগরিক হওয়ার পরেও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সামাজিক কল্যাণে অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে তাঁদের। এর মাধ্যমে গণহত্যা ও ঘৃণার সীমানা পেরিয়ে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক আধ্যাত্মিক সম্পর্ক।
১৯৭৬ সালে গাউছে জামান আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রহ. স্বাধীন বাংলাদেশে আগমন করেন। যদিও তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা আল্লামা হাফেজ ক্বারী সাইয়্যেদ আহমদ শাহ সিরিকোটী পাকিস্তান কায়েমের আগে, ঔপনিবেশিক আমলেই বাংলায়, বিশেষত চট্টগ্রামের মানুষের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আল্লামা হাফেয সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ রহ. এবং তাঁর দুই সাহেবজাদা আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ্ ও আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ’র প্রতি বাংলাদেশের মানুষের আধ্যাত্মিক আকর্ষণ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দুই রাষ্ট্রের জনগণের সম্পর্ককে অন্যদিগন্তে নিয়ে গেছে। যদিও এখানে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বিনিময় নেই; পুরোটাই নিখাদ ভালোবাসার বিনিময়।
বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে পরিচিত করিয়ে দেয়ার মত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাঁরাই উপহার দিয়েছেন। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপলক্ষে বিশ্বের সর্ববৃহৎ জশনে জুলুছটি আল্লামা হাফেয সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ এবং তাঁর দুইসাহেবজাদার নেতৃত্বে ৫০ বছরে পদার্পণ করলো। তাঁদের আগমনকে কেন্দ্র করে সারা দেশব্যাপী বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের উৎসাহ-উদ্দিপনা থাকে অন্যমাত্রায়। প্রতিটি আয়োজন রূপ নেয় জনসমুদ্রে। এমন ভালোবাসার অতলগহিনে তলিয়ে যায় উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের প্রচারিত পাকিস্তানের নাগরিক মাত্রই ঘৃণিত তত্ত্ব।
বাংলাদেশে আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ তাহের শাহ্[3] ও আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্’[4]র নেতৃত্বাধীন আনজুমান-এ রহমানিয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া ট্রাস্টের পরিচালনায় গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অগণিত মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ গড়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় কম-বেশি ৩০০টি মাদরাসা, অর্ধশত খানকাহ, শতাধিক মসজিদ-সহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ ও লালন করেন। শুধু তাই নয়, ইসলামের যে কোনো উগ্রপন্থার বিরুদ্ধেও তাঁরা সোচ্চার। আপাদমস্তক বাংলাদেশপন্থী। দরবারে সিরিকোটের চেরাগ আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ সাধারণ কোন ব্যক্তিত্ব নন। যিনি পাকিস্তানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে তাঁর আগমন ও সুবিশাল কর্মযজ্ঞের পুরোটাই ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক কারণে। বাংলাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী বললেও সবটা বলা হয় না। কারণ তিনি বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতিকে আপন করে নিতে পেরেছেন। অনেক মাহফিলে বাংলা ভাষায় কথা বলে তিনি অগণিত ভক্ত মুরিদদের তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। তাঁর আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব ও মানবতার কল্যাণে নানাবিধ সময়োপযোগী উদ্যোগ সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে দরবারে সিরিকোটের লক্ষ লক্ষ ভক্ত-মুরিদান জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে বহু যোদ্ধাও এই দরবারের অনুসারী ছিলো।
করোনাকালিন মানবিক বিপর্যয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আল্লামা হাফেয সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ’র প্রতিষ্ঠিত গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ ছিলো দুর্দিনের কাণ্ডারি। করোনাকালীন সময়ে এত বেশি জনসেবা আর কোনো সংগঠন করেছে কি-না সন্দিহ আছে। করোনাকালে সারাদেশে ২ হাজারের অধিক কাফন দাফন ও সৎকার করেছে। তন্মধ্যে অর্ধশতাধিক অমুসলিম ব্যক্তির সৎকারও করেছে সংগঠনটি। কেবল তাই নয়, মুমুর্ষূ রোগীর জন্য অক্সিজেন সেবা, আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন, এম্বুলেন্স সেবাসহ বহুমাত্রিক সেবায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত ছিল গাউছিয়া কমিটির সদস্যবৃন্দ। কেবল করোনাকালেই সীমাবদ্ধ নয়, অদ্যাবধি তাদের মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। দেশের যে প্রান্তেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ হোক না কেন সংগঠনটির তৎপরতা, আন্তরিকতা থাকে প্রথম সারিতে। কোরবানির ঈদে কোরবানি দেবার সামর্থ্য নেই এমন পরিবারে কোরবানির গোশত পর্যন্ত বণ্টন করেছে।
অনেকের জন্য চিন্তা করা কঠিন যে, যে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম সেই পাকিস্তানের একটি দরবারের পীর সাহেবগণের তৈরি সংগঠন থেকে বাংলাদেশের জনগণ এত বেশি উপকৃত হচ্ছে! এটাই আধ্যাত্মিকতা, রুহানিয়্যতের শক্তি।
জনগণের মাঝে যে ঘৃণার চাষাবাদ করতে সর্বদা সচেষ্ট ছিল উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা সে ঘৃণার বিপরীতে তাসাউফের মাধ্যমে জনগণের মাঝে হয়েছে ভালোবাসার চাষাবাদ। ইতিহাস, যুদ্ধ, রাষ্ট্র, বয়ান সবকিছু ছাপিয়ে ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছে মনুষ্যত্ব, রুহানিয়্যত।
বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে দরবারে সিরিকোটের সম্পর্ক এত বেশি হৃদ্যতাপূর্ণ, নির্মল, নিঃস্বার্থ যে, আল্লামা সৈয়দ মুহাম্মদ সাবির শাহ্ পাকিস্তানের রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব হয়ে বাংলাদেশে এত ব্যাপক পরিসরে কার্যক্রম আঞ্জাম দেবার পরও মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসা করা আওয়ামী স্বৈরাচারী সরকার একটিবারের জন্য প্রশ্ন তোলার সাহস পায়নি। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তান বলতেই ঘৃণায় নীল হয়ে যায় অথচ এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারেনি। কারণ বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে তাঁদের যে সম্পর্ক তা যুদ্ধ আর রাষ্ট্র ছাপিয়ে অনেক ঊর্ধ্বে পৌঁছে গিয়েছে।
বাংলাদেশে দুই যুগ ধরে যে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল তার নির্মাতা ছিল উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী তত্ত্ব। এই উগ্রতার বিরুদ্ধে, সামাজিক নৈরাজ্য ও রাষ্ট্রীয় জুলুম উস্কে দেয়া তত্ত্বের বিরুদ্ধে দরবারে সিরিকোটের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন কয়েক যুগ ধরে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য দরবারে সিরিকোটের এই নীরব বিপ্লব অব্যাহত থাকুক আর সকলের মাঝে তৈরি হোক রুহানিয়্যত, ইনসাফ ও ভালোবাসার সম্পর্ক।