বাংলার আবহাওয়া বৈচিত্র্যময়। পাহাড়ি অঞ্চল বৃষ্টিমুখর আর ভাটি অঞ্চল সমুদ্রের লোনাপানিতে বিধৌত। জমিন তাই কর্দমাক্ত। বাতাস কখনো শুকনো, কখনো বা জলীয় বাষ্পে ভরপুর। গ্রীষ্মের প্রখর রোদে খালবিল খাঁ খাঁ করে তো বর্ষার ভারী বর্ষণ আঁচড়ে পড়ে পাহাড় পেরিয়ে লোকালয়ে। ভাসিয়ে দেয় শহর-বন্দর-প্রান্তর। তাই এখানকার স্থাপনা টিকে থাকতে পারে না দীর্ঘকাল। রং ফ্যাকাশে হয় দ্রুত, দেয়ালে চিড় ধরে, খসে পড়ে আস্তরণ। মেয়াদ ফুরোয় দ্রুত, দেখতে দেখতে ভেঙে পড়ার ওয়াক্ত এগিয়ে আসে।
কিন্তু হযরত খান জাহান আলীর তৈরি স্থাপত্যশিল্পের গল্প অনেকটা ভিন্ন। ৬০০ বছর ধরে টিকে আছে তাঁর অনেক ঐতিহাসিক কীর্তি। রং পড়েছে, জং ধরেছে, দুর্বল হয়েছে বটে; কিন্তু এখনো মাথা উঁচু করে স্ব-সক্ষমতার জানা দিচ্ছে। এর কারণ, এ-সমস্ত স্থাপনা তৈরি হয়েছে বিশেষ ম্যাকানিজমে। গৌড়-রাজস্থানের পাথর কিংবা সিমেন্টের চেয়েও উন্নত এক ধরনের তরলের ব্যবহার এখানে লক্ষ্যণীয়। এ থেকে খান জাহান আলীর প্রকৌশল-জ্ঞানের সাথে আমরা পরিচিত হতে পারি। তিনি স্থাপনা মজবুত করতে গৌড়ের দক্ষ মিস্ত্রি নিয়ে আসেন খুলনায়। স্থাপত্যগুলো নির্মিত হয় তুঘলকি ঢঙে। জীবনীকার সৈয়দ ওমর ফারুক হোসেনের মন্তব্য এ কথার সাক্ষ্য বহন করে। তিনি বলেছেন, “হযরত খানজাহান আলী (র.) তাঁর কীর্তিগুলিকে লবণাক্ত জল-হাওয়া থেকে রক্ষা করা ও একে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্যই সুদুর গৌড় ও রাজস্থান থেকে এ দেশে এই পাথর আমদানি করেছিলেন।” (হোসেন: ১৯৮২, ১৬১)। অন্যত্রে তিনি লিখেছেন,
“হযরত খানজাহান আলী (র.)—এঁর মাজারের উপরের অট্টালিকার নির্মাণ কৌশল ও গাঁথুনির মশলা নিয়ে ইংরাজ গবেষকগণ বহু গবেষণা করেছেন। এই মশলা তারা গবেষণার জন্য তাদের দেশে পাঠিয়েছেন। তারাও সঠিকভাবে নিরূপণ করতে পারেননি যে এটি কোন জাতীয় মশলা, যার শক্তি আজও অক্ষুন্ন রয়েছে। গবেষণার ফল পুরোপুরি জানা যায়নি তবে এইটুকু জানা গিয়েছিল যে, এর মধ্যে রয়েছে মূল্যবান পাথরের গুড়ি, চুনা, তৈল ও ডিম জাতীয় জিনিষের মিশ্রণ এবং আরও কিছু আছে বলে তারা ধারণা করেন।”
স্থাপত্যশিল্পে খান জাহান আলীর সবচেয়ে বিখ্যাত সৃষ্টি ষাট গম্বুজ মসজিদ। তাঁর সর্ববৃহৎ কীর্তি এই স্থাপনা। এটি কেবলই একটি মসজিদ ছিল না; বরং এটি ছিল তাঁর দরবারগৃহ। এখান থেকেই তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘খলিফাতাবাদ’ রাজ্য পরিচালিত হতো। এই মসজিদকে ঘিরেই ছিল তাঁর প্রশাসনিক সকল দপ্তর। বলাবাহুল্য, মসজিদকে ঘিরে রাজ্য পরিচালনার ইতিহাস ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই। মদিনায় পৌঁছে নবীজি সবার আগে মসজিদ নির্মাণ করে সেখান থেকে রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি, রাষ্ট্র পরিচালনা, রাষ্ট্রের বিস্তারে কাজ করতে থাকেন। পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদিন কিংবা আরও পরে উমাইয়া-আব্বাসি যুগ হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশেও ইসলামের প্রচারকার্যের সূচনালগ্নে মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস দেখা যায়। দিল্লি মুসলমানদের অধিকৃত হবার পর সেখানে কুতুবউদ্দিন আইবেক ‘কুওয়াত-উল-ইসলাম’ নামে মসজিদ নির্মাণ করেন ইসলামের প্রতীক ও সার্বভৌমত্বের নিদর্শন স্বরূপ। ড. সৈয়দ মাহমুদুল হাসান রচিত ‘মুসলিম স্থাপত্য’ বইতে বিভিন্ন উদাহরণ এনে মন্তব্য করেছেন, “কুতুবউদ্দিন আইবেক স্বীয় ক্ষমতা সুদৃঢ় করে ইসলামের প্রতীক ও সার্বভৌমত্বের নিদর্শন স্বরূপ দিল্লীতে একটি মসজিদ নির্মাণে প্রয়াসী হন। উল্লেখ্য যে, নবঅধিকৃত অঞ্চলে মুসলমান সৈন্যবাহিনী একটি নতুন শহর বা ‘হিরা’ স্থাপন করে, যার প্রাণকেন্দ্রে ছিল মসজিদ। প্রাচীন নির্মাণের ইতিহাসেও বিশেষ করে কুফা, বসরা, ফুসতাতে মসজিদকে কেন্দ্র করে মুসলিম জনগোষ্ঠী, সমাজ ও সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।” (হাসান, ২০০২, ৩০৬)

নামে ষাট গম্বুজ মসজিদ হলেও এই মসজিদে গম্বুজের সংখ্যা সবমিলিয়ে ৮১টি। তবে মসজিদটি ছোটো-বড়ো ষাটটি স্তম্ভ বা পিলারের উপর নির্মিত। এ থেকে ধারণা করা হয়, ফার্সি খাম্বাজ তথা স্তম্ভ পরবর্তীতে অপভ্রংশে খম্বুজ, এর পর গম্বুজ শব্দে প্রচলিত হয়ে পড়েছে। সে যাই হোক, এ মসজিদের নির্মাণশৈলী এত উত্তম আর সৌন্দর্যমণ্ডিত যে, সুলতানি যুগ কিংবা মোগল আমল মিলেও এরচেয়ে বৃহৎ আর সৌন্দর্যমণ্ডিত মসজিদ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয়টি পাওয়া যায় না। কারণ, বাংলার কাদামাটির তৈরি ইট দিয়ে তিনি মসজিদ নির্মাণ করেননি, সুদূর গৌড় এবং রাজস্থান থেকে পাথর আমদানি করেছিলেন। নদীর যেসব অঞ্চল দিয়ে এইসব পাথর আনা হয়েছে সেসব জায়গার নাম হয়েছে ‘পাথরঘাটা’। এজন্য পটুয়াখালী থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত অনেক স্থানের নামই পাথরঘাটা, যা যুগযুগ ধরে খান জাহান আলী রহ.’র অনন্য কীর্তির ঘোষণা করছে।
আমদানিকৃত পাথর আর এক প্রকার বিশেষ তরল মিশ্রণের সাহায্যে তিনি ষাট গম্বুজ এবং অন্যান্য মসজিদগুলো নির্মাণ করিয়েছিলেন। নির্মাণগুণে শক্তিশালী হওয়ার দরুণই ষাট গম্বুজ মসজিদ-সহ আরও অনেক মসজিদ বাংলার বিরূপ প্রকৃতির মাঝে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ছয়শ বছর ধরে। তেমন কয়েকটি মসজিদ হচ্ছে—
১. মাজার মসজিদ বা এক গম্বুজ মসজিদ: পীর আলী মোহাম্মদ তাহেরের সমাধির কিছু পশ্চিমে, পশ্চিম দিকের বেষ্টনী-প্রাচীরের বাইরে একটি সুন্দর মসজিদ আছে। বর্গাকারে নির্মিত এই মসজিদের প্রত্যেক বাহু ৪০ ফুট। প্রাচীরগুলি ৭ ফুট প্রশস্ত। পূর্ব দেয়ালে ৩টি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ১টি করে দরজা আছে। পূর্ব দেয়ালের কেন্দ্রীয় দরজাটি অপেক্ষাকৃত বড়। ভিতরে পশ্চিম দেয়ালে আছে ৩টি মেহরাব। উপরে একটি মাত্র গম্বুজ। অতি বিরাট এই গম্বুজ ভূমি থেকে ৩৬ ফুট উঁচু এবং তলদেশে এর ব্যস প্রায় ২৬ ফুট। শেষ জীবনে খান জাহান আলী যখন বর্তমান মাজার-ঘরে বাস করতেন, তখন তিনি এ মসজিদে নামাজ আদায় করতেন। মাজার থেকে আসার জন্য মাজারের পশ্চিম প্রাচীরে মসজিদ বরাবর একটি দরজা আছে।

২. শুভরাঢ়া মসজিদ: অভয় নগর থানার কয়েক মাইল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে এবং ধুলগ্রাম থেকে মাইল পাঁচেক উত্তরে ভৈরব নদীর তীরে একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আছে। বর্গাকারে নির্মিত এই ছোটো মসজিদের চারকোণে ৪টি মিনার ছিল। দেয়ালগুলো প্রায় ৫ ফুট প্রশস্ত। উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দেয়ালে ১টি করে প্রবেশ পথ আছে। খিলানের সাহায্যে দরজাগুলো নির্মিত। ভিতরে পশ্চিম দেয়ালে আছে ১টি মেহরাব। মসজিদের কার্নিশ বাঁকানো। উপরে ১টি গম্বুজ। অর্ধগোলাকার এ গম্বুজ খান জাহানী স্থাপত্যের নিদর্শন বহন করে। মসজিদের গঠন পদ্ধতি ও স্থাপত্য কৌশল দেখে মনে হয় এ মসজিদ খান জাহানের আমলে নির্মিত হয়েছিল। কিংবদন্তি থেকে জানা যায় যে খান জাহান আলী বারো বাজার থেকে মুড়লি কসবা হয়ে পয়োগ্রাম কসবা গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে বাগেরহাট। পয়োগ্রাম কসবা যাওয়ার পথে তিনি শুভরাঢ়া গ্রামে থেমে এখানে একটি ছোটো মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এটিই সম্ভবত সেই মসজিদ।

৩. নয় গম্বুজ মসজিদ: ঠাকুরদিঘির পশ্চিম পাড়ের প্রায় মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত এই মসজিদ দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত জীর্ণ জঙ্গলাকীর্ণ অবস্থায় পড়েছিল। ১৯৯৮ সালের দিকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংস্কার করে মসজিদটিকে প্রায় আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছে। ষাটগম্বুজ মসজিদ ছাড়া এত বড়ো ও এমন সুন্দর মসজিদ বর্তমানে বাগেরহাট অঞ্চলে আর দেখা যায় না।

৪. সিঙরা মসজিদ: ষাট গম্বুজ মসজিদ থেকে প্রায় ৩০০ গজ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সুন্দর ঘোনা গ্রামে সিঙরা মসজিদ নামে একটি প্রাচীন মসজিদ আছে। বর্গাকারে নির্মিত এ মসজিদের প্রত্যেক বাহু বাইরের দিকে ৩৯ ফুট ও ভিতরে দিকে ২৫ ফুট লম্বা এবং প্রাচীরগুলি প্রায় ৭ ফুট (৬-১১) প্রশস্ত। চার কোণে ৪টি মিনার। সেগুলির নিম্নাংশ প্রায় নষ্ট হয়ে যাবার পথে। উপরের অংশ এবং ক্ষুদ্র গম্বুজগুলি এখনও টিকে আছে। পূর্ব দেয়ালে আছে ৩টি দরজা। কেন্দ্রীয় দরজা বরাবর পশ্চিম দেয়ালে আছে একটি অলঙ্কৃত মেহরাব। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালেও আছে ১টি করে দরজা। মসজিদের উপরে আছে বিরাট আকারের একটি গম্বুজ। এটি যে খান জাহানের আরেক বিরাট কীর্তি, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

৫. বিবি বেগিনীর মসজিদ: ঘোড়াদিঘির পশ্চিম পাড় থেকে প্রায় ৩০০ গজ পশ্চিমে অবস্থিত এই এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ খান জাহানের আরেক বড়ো কীর্তি। বর্গাকারে নির্মিত এ মসজিদের প্রত্যেক বাহু বাইরের দিক থেকে ৫০ ফুট এবং ভিতরের দিক থেকে ৩০ ফুট লম্বা। দেয়ালগুলি খান জাহানী আমলের ইটের তৈরি ও প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত। চারকোণে আছে ৪টি গোলাকার মিনার। মসজিদের পূর্ব দেয়ালে ৩টি দরজা। খিলানের সাহায্যে দরজাগুলি নির্মিত। দরজা বরাবর পশ্চিম দেয়ালে আছে ৩টি মেহরাব। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে ১টি করে দরজা। মসজিদের উপরে যে অর্ধ গোলাকার ও উঁচু গম্বুজটি আছে, তা সত্যই বিরাট এবং দেখতে বড়োই মনোরম। নিম্নাংশে গম্বুজের ব্যাস প্রায় ৩০ ফুট। এত বড় গম্বুজ সচরাচর দেখা যায় না। মসজিদের চারদিকে বেষ্টনী-প্রাচীর ছিল। বেষ্টনী-প্রাচীরের বাইরে উত্তর-পূর্ব কোণে বেশ কয়েকটি পাকা কবর ছিল। এগুলি এখন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। এগুলির মধ্যে বিবি বেগিনীর কবর ছিল কি-না কেউ বলতে পারে না। এই মসজিদকে কেন বিবি বেগিনীর মসজিদ বলা হয়, তাও জানা যায় না। খান জাহানের আমলের এই মসজিদটি বহু কাল ধরে জীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়েছিল। নব্বইয়ের দশকে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের রক্ষণাবেক্ষণে এসে তার পূর্ব শ্রী কিছুটা ফিরে পেয়েছে।

৬. চুনাখোলা মসজিদ: বিবি বেগিনী মসজিদ থেকে প্রায় ৫০০ গজ উত্তর-পশ্চিমে চুনাখোলা গ্রামে একটি মাঠের মধ্যে এই প্রাচীন মসজিদটি অবস্থিত। চারদিকে চাষের জমির মাঝখানে লোকালয়ের বাইরে এই ভগ্ন মসজিদের অস্তিত্ব যেন নিঃসঙ্গতার বেদনার প্রতীক। এককালে খুব সম্ভবত বসতি ছিল। এখন লোকালয় বেশ দূরে। মসজিদটিও বেশ জীর্ণ অবস্থায় আছে। বর্গাকারে নির্মিত এ মসজিদের প্রত্যেক বাহু বাইরের দিক থেকে প্রায় ৪০/২ ফুট এবং ভিতরের দিক থেকে প্রায় ২৫ ফুট লম্বা। দেয়ালগুলি ৮-৯০ প্রশস্ত। চারকোণে ৪টি গোলাকার মিনার। পূর্ব দেয়ালে আছে ৩টি দরজা। মাঝেরটি অপোকৃত বড়ো। দরজা বরাবর পশ্চিম দেয়ালে ৩টি মেহরাব আছে। মেহরাবগুলির নিচের অংশ মাটির নিচে দেবে গেছে। খিলানের উপর বর্শা ফলকের প্যাটার্নসহ সুন্দর খিলান দ্বারা প্রবেশ পথগুলি নির্মিত। খান জাহানী স্থাপত্য শিল্পের বৈশিষ্ট্য এখানেও দৃশ্যমান।

৭. দীদার খাঁর মসজিদ: খান জাহানের আবাসস্থলের দক্ষিণ ও পূর্বদিকে বেশ কয়েকটি মসজিদ ছিল। এখন অবশ্য টিকে নেই। এগুলোর মধ্যে দীদার খাঁর মসজিদ বেশ উল্লেখযোগ্য। বর্গাকারে নির্মিত এ মসজিদের প্রত্যেক বাহু ছিল ৫৪ ফুট। দেয়ালগুলি ছিল ৭ ফুট প্রশস্ত। পূর্ব, দক্ষিণ ও উত্তর দিকে ছিল ৩টি করে প্রবেশ পথ এবং পশ্চিম দেয়ালে ছিল ৩টি মেহরাব। ৪টি প্রস্তর স্তম্ভ ছিল ভিতরে। এই স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালের উপর মসজিদের ৯টি গম্বুজ অবস্থিত ছিল। কেন্দ্রীয় বড় গম্বুজটির ব্যাস ছিল ১৪ ফুট। অপর গম্বুজগুলির ব্যাস ছিল ১২১২ ফুট। ১৯১৪ সালে প্রকাশিত সতীশ বাবু রচিত যশোহর-খুলনার ইতিহাস বইতে এ মসজিদের কথা পাওয়া যায়। সম্ভবত তখন মসজিদটি ছিল। বর্তমানে এ মসজিদের অস্তিত্ব নেই।
৮. রণবিজয়পুর মসজিদ: খান জাহানের বাড়ি থেকে প্রায় দেড় মাইল পূর্বদিকে রাস্তার দক্ষিণ পার্শ্বে রণবিজয়পুর গ্রামে একটি উল্লেখযোগ্য মসজিদ আছে। বর্গাকারে নির্মিত এ মসজিদের প্রত্যেক বাহু বাইরের দিকে ৫৬ ফুট ও ভিতরের দিকে ৩৬ ফুট লম্বা। প্রাচীরগুলি প্রায় ১০ ফুট প্রশস্ত। চারকোণে ৪টি গোলাকার মিনার। পূর্ব দেয়ালে আছে ৩টি দরজা। ভিতরে পশ্চিম দেয়ালে আছে ৩টি অলংকৃত মেহরাব। মসজিদের উপরে আছে একটি বিরাট গম্বুজ। এই বিরাট ও উঁচু গম্বুজ খুবই দর্শনীয়। নিচের দিকে গম্বুজের ব্যাস ৩৬ ফুট। এত বড়ো গম্বুজওয়ালা মসজিদ বাংলাদেশে আর কোথাও নেই সম্ভবত। মাটি থেকে গম্বুজের চূড়ার উচ্চতা মাপা হয়নি। তবে ৪৫ ফুটের কম হবে বলে মনে হয় না। মসজিদের কোন নাম নেই। রণবিজয়পুর গ্রামের অবস্থিত বলে এটিকে সাধারণত রণবিজয়পুর মসজিদ বলা হয়ে থাকে। এই মসজিদ যে খান জাহানের আমলে তৈরি হয়েছিল, মসজিদের গঠনপ্রণালি ও স্থাপত্য কৌশলই তা প্রমাণ করে।

৯. মসজিদ কুড় মসজিদ: আমাদি গ্রামে অবস্থিত এ মসজিদ। বিখ্যাত কপোতাক্ষ নদ এ মসজিদের পশ্চিম পার্শ্ব দিয়ে প্রবাহিত। খুলনা শহর থেকে প্রায় ৩৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম, সাতক্ষীরা মহকুমা শহর থেকে প্রায় ৩০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এটি। খান জাহানের সময়ে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। কালক্রমে এ স্থান পরিত্যক্ত ও জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে এবং মসজিদটি আংশিকভাবে মাটি চাপা পড়ে। পরবর্তীকালে এ স্থানে যখন নতুন করে আবাদ শুরু হয়, তখন জঙ্গল কেটে, মাটি খুঁড়ে মসজিদটি আবিষ্কার হয়। এ স্থানের নতুন নামকরণ করা হয় মসজিদ কুড় বলে। মসজিদের নাম হয় মসজিদ কুড় মসজিদ। ষাটগম্বুজ ও নয় গম্বুজে মসজিদের সঙ্গে আলোচ্য মসজিদের গঠনপ্রণালি ও স্থাপত্যকৌশলের যথেষ্ট একাত্মতা আছে। এ কারণে পণ্ডিতেরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, এই মসজিদ অপর দুটি মসজিদের সমসাময়িক এবং খান জাহান কর্তৃক নির্মিত। স্যার জে. ওয়েস্টল্যান্ড এ কথা জোর দিয়েই বলে গেছেন।

১০. কসবা মসজিদ: গৌরনদী থানার অন্তর্গত রামসিদ্ধি গ্রামে অবস্থিত এই প্রাচীন ইমারত কসবা মসজিদ নামে পরিচিত। যেখানে মসজিদটি অবস্থিত, সে স্থানের নাম কসবা। নামদৃষ্টে মনে হয় এখানে এককালে একটি শহর কিংবা জনপদের অস্তিত্ব ছিল। কিন্তু হাল আমলে কোনো শহরের চিহ্ন সেখানে দেখা যায় না। এই মসজিদ যথেষ্ট সুবিশাল। বাগেরহাটের নয় গম্বুজ মসজিদ ও মসজিদকুড় নয় গম্বুজ মসজিদের প্রায় সমান। এই মসজিদের প্রাচীরগুলোও সেই দুটি মসজিদের প্রাচীরের মতো প্রশস্ত। মি. জ্যাক স্থানীয় জনশ্রুতির উপর ভিত্তি করে এই মসজিদ ষোড়শ শতাব্দীর সাবী খান নির্মাণ করেছিলেন বলে উক্তি করেছেন। অধ্যাপক আহমদ হাসান দানী এটিকে পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নির্মিত মনে করেন। তবে বাগেরহাটের সুবিখ্যাত খান জাহানের কীর্তিগুলোর গঠনপ্রণালীর সঙ্গে এর সম্পর্ক আছে বলে অনেকে এটিকে খান জাহানের তৈরি বলেই মনে করেন। (Hasan: 2004, 66-86)

এসবের বাইরে খান জাহান আলীর অন্যতম স্থাপত্য নিদর্শন হচ্ছে তাঁর মাজার। যা তিনি নিজেই নিজের আখেরি আবাসস্থল হিসেবে নির্মাণ করে গেছেন। মাজারের বাইরে-ভেতরে এমন আধ্যাত্মিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন যে, যে কেউ সেখানে বসলে আপনাআপনি হৃদয় বিগলিত হয়ে আল্লাহর স্মরণে মশগুল হয়ে পড়বেন। মাজারের নির্মাণশৈলীতে উপরে উল্লিখিত খান জাহান আলীর নিজস্ব মেকানিজম তো আছেই, তার উপর দেওয়ালে দেওয়ালে খচিত আছে বিভিন্ন সুরা, কালেমা, তরিকত-তাসাউফ চর্চাকারীদের চর্চিত বিভিন্ন দোয়া-দরুদ এবং উপদেশবাণী। তাঁর সমাধির চার কোণে প্রিয়নবীর চাঁর খলিফার নামাঙ্কিত রয়েছে। প্রত্যেকের নামের আগে লেখা— ‘ইলা-হি বেহুরমাতি’। এছাড়াও সমাধির চারপাশে লেখা আছে, ‘মান মা-তা গরিবান, ফাকাদ মা-তা শাহিদান’, অর্থাৎ, যে গরিব অবস্থায় ইন্তেকাল করল, সে মূলত শহিদ অবস্থায় ইন্তেকাল করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, খান জাহান আলী খলিফাবাদ রাজ্যের রাজা হলেও খলিফার আভিজাত্য ধারণ করেননি। সর্বদা আল্লাহর একজন ক্ষুদ্র বান্দা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত রেখেছিলেন। মাজারের বিভিন্ন দিকে আউজুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, সুরা কাফিরুন, সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক, সুরা নাস, সুরা তাকাসুর, আয়াতুল কুরসি, কালেমা তয়্যিবাহ, কলেমা শাহাদাত-সহ বিভিন্ন সুফি-অজিফা লেখা রয়েছে।
হযরত খান জাহান আলীর স্থাপত্য কর্মগুলো কেবল মজবুত দেয়াল আর উন্নতমানের মেকানিজমেই তৈরি হয়নি; বরং সেসব স্থাপত্য তাঁর প্রতিষ্ঠিত খলিফাতাবাদ রাজ্যের স্থায়ীত্বকেও মজবুত করেছিল। ভিনধর্মীদের এলাকায় নবগঠিত রাষ্ট্রে মুসলমানদের মাথা গুঁজার ঠাঁই যেমন এসব স্থাপত্যে নিশ্চিত করেছিল, তেমনি রাষ্ট্রপরিচালনাও সহজ করেছিল। সেইসাথে মুসলমানদের গৌরবগাঁথা ঘোষণা করা শুরু করেছিল প্রায় সাড়ে ছয়শত বছর আগে থেকেই। যা আজও অব্যাহত রয়েছে।