“২০২৪-২৫ সালে সারাদেশে সংঘটিত মাজারে হামলা” বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের সারাংশ

সার্বিক তত্ত্বাবধান ও সম্পাদনা:

মোহাম্মদ আবু সাঈদ

পেপারওয়ার্ক: মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম

ফিল্ডওয়ার্ক: আবু হাসান মোহাম্মদ মুখতার

 

ভূমিকা

কেবল বাংলাদেশে নয়, ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে একক নেতৃত্ব দিয়েছেন সুফি-সমাজ। বাংলাদেশে মুসলমান জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হবার ক্ষেত্রে সুফি-সমাজের ভূমিকাই প্রধান। ঔপনিবেশিক আমল থেকে অদ্যাবধি মুসলমান সমাজে সুফি-সমাজের পাশাপাশি ভিন্ন মতাবলম্বীর সংখ্যা ও প্রভাব আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তদুপরি অদ্যাবধি বাংলাদেশের মুসলমান সমাজে সুফি-সমাজের সমর্থক ও প্রভাব‌ই সবচেয়ে বেশি। বেশি সত্ত্বেও, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সুফি-সমাজ ও সংস্কৃতির উপর ধারাবাহিকভাবে হামলা করা হয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সবচেয়ে বড় আঘাত করা হয়েছে মাজারে হামলার মাধ্যমে। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার মাঝে যে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও সহাবস্থানের সমাজ গড়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সঙ্ঘবদ্ধভাবে মাজার হামলার মধ্য দিয়ে তা ধুলায় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে সুফি-সমাজের সমর্থক ও প্রভাব সবচেয়ে বেশি হবার পরও কেন এই হামলা প্রতিরোধ করা যায়নি এটিও একটি প্রশ্ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি সুফি-সমাজের বিপরীতে ভিন্ন মতাবলম্বীরা—যাদের নেতৃত্ব ও প্রচেষ্টায় হামলা হয়েছে— তারা সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে যত বেশি সংগঠিত ও শক্তিশালী হতে পেরেছেন তার ঠিক বিপরীতে অবস্থান সুফি-সমাজের। যে কারণে সংখ্যায় ও প্রভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও, সামাজিকভাবে অসংগঠিত ও রাজনৈতিকভাবে জনবিচ্ছিন্ন হবার কারণে দেড় বছর ধরে পরিচালিত ধারাবাহিক হামলার ন্যূনতম প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে ব্যহত করে এমন যে কোনো হামলাই ফৌজদারি অপরাধ। তার‌উপর দীর্ঘ দেড় বছর ধরে নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর উপর পরিচালিত এমন ভয়াবহ সিরিজ হামলা তো আরও গুরুতর। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মুখে বলা ছাড়া প্রতিরোধের তেমন চেষ্টাই করেনি। সরকারের এই অকার্যকর বাগাড়ম্বর হামলাকারীদের পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছে। হামলার ফলে যে-সকল মাজার, দরগাহ, খানকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেগুলোর ক্ষতিপূরণ বিষয়ে অদ্যাবধি কোনো ঘোষণা আসেনি। ফলত, এক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের দিক থেকে চূড়ান্তভাবে রাষ্ট্রীয় ও সরকারি ব্যর্থতা স্পষ্ট।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও অনুল্লেখযোগ্য ও ক্ষেত্রবিশেষ প্রশ্নবিদ্ধ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে বিএনপি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ অনেক রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা মাজার হামলায় সমর্থন ও অংশগ্রহ করার অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে ধর্মীয় আদর্শভিত্তিক সবচেয়ে বৃহৎ ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। সকলে প্রেস বিজ্ঞপ্তি ও বক্তব্যে মাজার হামলার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ বিষয়ে সরকারের নির্লিপ্ততা ও আইন প্রয়োগের ব্যর্থতার ক্ষেত্রে এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

সুফি-সমাজকেন্দ্রিক গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মাকাম প্রথম থেকেই মাজার হামলা বিষয়ে সচেতন। সহিংসতায় লিপ্ত না হয়ে সংলাপের মাধ্যমে একটি দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে গত ২৫ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে রাজধানীতে ‘বাংলাদেশের মাজার সংস্কৃতি: সহিংসতা, সংকট ও ভবিষ্যৎ ভাবনা’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপের আয়োজন করে মাকাম।এর ধারাবাহিকতায় সারাদেশে সংঘটিত মাজার, দরগাহ, খানকার উপর হামলা বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয় মাকাম। মাকাম রিসার্চ টিমের সদস্য আবু হাসান মুহাম্মদ মুখতার এবং মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম যৌথভাবে প্রতিবেদন তৈরির কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। তারাসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

প্রতিবেদনের সময়সীমা: ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫।

সারাদেশে সংঘটিত সকল হামলা প্রতিবেদনে যুক্ত হয়েছে এমন দাবি আমরা করছি না। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি, সকল হামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানতে, যাচাই-বাছাই করতে এবং নির্দিষ্ট ফরম্যাটে প্রকাশ করতে। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত নিউজ, রিপোর্টের সহযোগিতা নেয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে হামলার ভিডিও সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। যে-সকল হামলার বিষয়ে যথেষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি এবং যে-সকল ঘটনা তুলনামূলক ভয়াবহ ও সন্দেহমূলক ছিল সে-সকল ক্ষেত্রে ফিল্ড‌ওয়ার্কের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। কোনো কাজ‌ই সম্পূর্ণ ক্রুটিমুক্ত নয়; প্রতিবেদনে যদি কোনো তথ্যগত, ভাষাগত ও অন্যান্য ক্রুটি চোখে পড়ে এবং মাকামকে জানানো হয়, মাকাম সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে যাচাই-বাছাই করে সংশোধন করতে। এক্ষেত্রে সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।

 

সারাংশ

২০২৪-২৫ সালে সারাদেশে মোট ১৩৪টি মাজার হামলার খবর পাওয়া গেছে। তন্মধ্যে ৯৭টি হামলার ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে; ৩৭টি হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মোট হামলার দুই তৃতীয়াংশ (৩/২) ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লা, নরসিংদী ও ঢাকায়— যথাক্রমে ১৭, ১০ ও ৯।

৯৭টি ঘটনায় ৫৯ ক্ষেত্রে (৬১%) ধর্মীয় মতবিরোধের কারণে হামলা করা হয়েছে। ২১টি হামলা হয়েছে স্থানীয় মতবিরোধের কারণে, যা মোট ঘটনার ২১%। রাজনৈতিক কারণে হামলা হয়েছে ১৬টি (১৭%)। মাজার কমিটির অন্তর্দ্বন্দ্ব তথা পারিবারিক দ্বন্দ্বের ফলে হামলা হয়েছে ১টিতে। হামলার কারণে পার্থক্য থাকলেও প্রায় সকল হামলায় ‘তৌহিদী জনতা’র বেশভূষা ও নেতৃত্ব ছিল অপরিবর্তিত।

হামলার শিকার ৯৭টি মাজারের মধ্যে অন্তত ৪৪টি মাজার পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এবং অন্তত ৪৪টি মাজারের বাৎসরিক উরস বন্ধ রয়েছে। ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অন্তত ২৩টি ঘটনায় “নারায়ে তাকবির/লিল্লাহি তাকবির – আল্লাহু আকবার” স্লোগান দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। মাজারে হামলার সাথে সাথে মাজার সংশ্লিষ্ট অন্তত ৭টি মসজিদেও হামলা করা হয়েছে। অন্তত ১০টি হামলার পূর্বে মাইক ব্যবহার করে হামলাকারীরা সংগঠিত হয়ে হামলা করেছে। অন্তত ৬টি মাজারে বুলডোজার/ডেকু ব্যবহার করে মাজার ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

মাজারে হামলার ঘটনায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের অভিযোগগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা অন্তত ১৩টি হামলায়; বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা অন্তত ৪টি হামলায়; বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা অন্তত ৪টি হামলায়; কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা অন্তত ২টি হামলায়; অন্তত ১টি করে হামলায় জাতীয় নাগরিক পার্টি – এনসিপির ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের অংশগ্রহণের অভিযোগ ও প্রাথমিক পর্যায়ে তথ্য পাওয়া গেছে।

অপ্রমাণিত ৩৭টি ঘটনার মধ্যে ৬টি ঘটনাকে গুজব হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
সারাদেশে সংঘটিত ৯৭টি মাজার হামলার ঘটনায় মামলা হয়েছে মাত্র ১১টি। হামলার প্রতিরোধ ও প্রতিকারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সক্রিয়তা পাওয়া গেছে ১১% ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ৮৯%।

 

পুরো প্রতিবেদনটি পড়তে পিডিএফ ডাউনলোড করুন: