মালদ্বীপের হারিয়ে যাওয়া রমজানের ঐতিহ্য: হিথী দিবস (Hithi Days)

ভারত মহাসাগরের দ্বীপ দেশ মালদ্বীপ ভ্রমণের জন্য বিখ্যাত। দ্বীপ দেশ হলেও এর ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। ইবনে বতুতা বাংলায় আসার আগে মালদ্বীপে গিয়েছিলেন এবং ১ বছর কাজী পদে দায়িত্ব পালন করেন। শতকরা হিসেবে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যক (শতভাগ) মুসলমানের বসবাস মালদ্বীপে। মুসলিমপ্রধান এই দেশের রয়েছে সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। বর্তমানে কার্যকারিতা নেই কিন্তু সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে এমন বহু সংস্কৃতি রয়েছে মালদ্বীপের জনগণের; তন্মধ্যে একটি ‘হিথী দিবস’ (Hithi Days)।

হিথী দিবসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
মালদ্বীপের সুলতান দ্বিতীয় মুঈনুদ্দিনের পুত্র মুহাম্মদ মানিকফান ১৮২৪ সালে হিথী দিবসের প্রবর্তন করেন। রমজান মাসের শেষ দশদিনকে কেন্দ্র করে এই দিবসের আয়োজন। ২২, ২৪, ২৬ ও ২৮ রমজান রাতে সুলতানের নেতৃত্বে মন্ত্রী, সেনাপতি, অভিজাত ব্যক্তিবর্গ ও আলেম উলামার উপস্থিতিতে বিপুল সংখ্যক জনগণের মিছিল বের করা হতো। মিছিলের অভিমুখ ছিল নির্দিষ্ট মাজার, দরগাহ বা ঐতিহাসিক স্থান। চারদিনের জন্য চারটি বিশেষ স্থান নির্ধারিত ছিল। নির্দিষ্ট মাজার বা ঐতিহাসিক বিশেষ ব্যক্তির স্মৃতিবিজড়িত স্থানে গিয়ে সকলে একত্রে ফাতেহা পাঠ, কুরআন তেলাওয়াত ও মোনাজাত পরিচালনা করা হতো। সাথে বাজানো হতো বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র।

হিথী দিবসকে কেন্দ্র করে মালদ্বীপের রাস্তাঘাট পরিচ্ছন্ন ও সুসজ্জিত করা হতো। যে-সকল‌ স্থান পরিদর্শন করা হতো সে-সকল স্থানকে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হতো। পুরো মালদ্বীপে বিরাজ করতো এক অন্যরকম উৎসবমুখর পরিবেশে। ২২, ২৪, ২৬ ও ২৮— রমজানের এই চারটি রাত‌ই পরবর্তী বেজোড় দিনের রাত হিসেবে গণ্য। ফলে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শবে কদরের ফজিলত হাসিল করতে বেজোড় রাতগুলোতে ইবাদতের মাধ্যমে শবে কদর তালাশের যে নির্দেশনা দিয়েছেন, এই নির্দেশনাও হিথী দিবস উদযাপনের মাধ্যমে পালন করা হতো। উদযাপনের দিনক্ষণ, রীতিনীতি ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় এটি মালদ্বীপের ইতিহাসে ‘সুফি ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃত।

হিথী দিবসের চারদিনের কার্যক্রম

প্রথম দিন: হিথী দিবসের প্রথম দিন ২২ রমজান। এদিন রাতে সুলতানের নেতৃত্বে সকলে মিলে যাওয়া হতো হাবশীর মোকামে। হাবশীর মোকামের পরিচয় হলো, ইথিওপিয়া থেকে মালদ্বীপে হিজরত করেছিলেন শেখ নাকিব আল হাবশী। ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ কণ্ঠ ও সুমধুর কুরআন তেলাওয়াতের জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। মালদ্বীপে থাকাবস্থায় তিনি যেখানে তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতেন, সেই পবিত্র স্থানটি হাবশীর মোকাম হিসেবে পরিচিত। ২২ রমজান রাতে সুলতানের নেতৃত্বে সকলে মিলে হাবশীর মোকামে গিয়ে তাঁকে স্মরণ করে কুরআন তেলাওয়াত, ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হতো।

দ্বিতীয় দিন: ২৪ রমজান রাতে সুলতানের নেতৃত্বে সকলে মিলে যাওয়া হতো সুলতান আলীর মাজারে। সুলতান আলী পর্তুগিজ ঔপনিবেশিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে ১৯ মে, ১৫৫৮ সালে শাহাদাত বরণ করেন। জাতীয় বীর হিসেবে মালদ্বীপের জনগণ তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে থাকেন। তাঁর মাজারে গিয়েও যথারীতি কুরআন তেলাওয়াত, ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হতো।

তৃতীয় দিন: ২৬ রমজান রাতে যাওয়া হতো মেদু জিয়ারাই মাজার। মাজারটি সুলতান সৈয়দ শামসুদ্দীনের (ইন্তেকাল ১৬৯২), যিনি মালদ্বীপের ইতিহাসে সৎ গুণাবলী ও ইনসাফভিত্তিক শাসনের জন্য বিখ্যাত। তিনি মদিনা শরীফের বিখ্যাত উলামা আবদুর রাজ্জাক আল শাফেয়ী আল কাদেরীর সুযোগ্য সন্তান। তাঁর মাজারে গিয়েও যথারীতি কুরআন তেলাওয়াত, ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হতো।

চতুর্থ দিন: ২৮ রমজান হিথী দিবস উদযাপনের শেষ দিন। এদিন সকলে সুলতানের নেতৃত্বে সুলায়মান আল-ফকিহের মাজারে যেতেন। সুলায়মান আল-ফকিহ পনেরো শতকে সুলতান তৃতীয় হাসানের শাসনকালে জীবিত ছিলেন। তিনি আলেম ও সুফি সাধক হিসেবে পরিচিত। যথারীতি তাঁর মাজার জিয়ারতকালেও কুরআন তেলাওয়াত, ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করা হতো।

উদযাপনের সমাপনী: হিথী দিবসের সমাপনী রেওয়াজ ছিল চমৎকার। যে দিন যে মাজারে যাওয়া হতো সে মাজারের সামনে একটি বিশেষ বাজনা/বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সেদিনকার মতো উদযাপনের আনুষ্ঠানিক সমাপনী ঘোষণা করা হতো। এই বাদ্যযন্ত্র সাধারণত রাজপ্রাসাদের একটি বিশেষ কক্ষ— যাকে বলা হতো ‘নাবুশখানা’— এখানে সংরক্ষণ করা হতো। দিনের বিভিন্ন সময় চিহ্নিত করতে ও জনগণকে জানিয়ে দিতো এই বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো। এই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়েই হিথী দিবসের আনুষ্ঠানিক সমাপনী ঘোষণা করা হতো।

১৯৬০ সাল, সুলতান মুহাম্মদ ফরিদ আল-আউয়ালের শাসনকাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে বাৎসরিক হিথী দিবস উদযাপিত হয়েছে। ১৮২৪ থেকে ১৯৬০— ১২৬ বছর যাবৎ ধারাবাহিকভাবে রমজান মাসে উদযাপিত হিথী দিবস মালদ্বীপের জনজীবনে এক অন্যরকম আমেজ তৈরি করেছে। কী কারণে এই দিবস বন্ধ করা হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে, এখন মালদ্বীপের কোথাও হিথী দিবস পালিত হয় না। দিবসটিকে স্মরণ করা, এ নিয়ে আলোচনা করা যতটা সুখকর, ঠিক ততটাই মর্মান্তিক বিষয় হলো, ধুলায় ধূসরিত ইতিহাসের পাতাই হিথী দিবসের এখন একমাত্র আশ্রয়স্থল।

(মালদ্বীপের Maldives Independent নামক মিডিয়ায় মুহাম্মদ সাইফ ফাতিহ {Mohamed Saif Fathih} লিখিত The lost traditions of Hithi Days: a glimpse into Maldives’ Ramadan festivities before the 1960s নামক প্রবন্ধ থেকেই প্রধানত তথ্যাবলী সংগ্রহ করা হয়েছে।) 

মধ্যযুগের বঙ্গীয় বদ্বীপ নামচিহ্ন সহ যে মানচিত্র ও ভাবার্থ আমি ইশারা করছি, তার গোড়ায় রয়েছেন বিভিন্ন সম্প্রদায়, ভাবের ও ভাষার মানুষজন। তারা কখনো একক পরিচয়, ধর্ম ও সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।…
আতিফ খলিল, লেথব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় …