বাংলাদেশের সুফিধারার বিভিন্ন প্রসঙ্গ (১২০০-১৭০০): একটি ধারণামূলক কাঠামোর অনুসন্ধান

সম্পাদকের নোট:

১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক মিলনায়তনে একটি সিম্পোজিয়াম অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবির Aspects of Sufism in Bangladesh (1200-1700): Search for a Conceptual Framework শিরোনামে একটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ইতোপূর্বে এই প্রবন্ধের বাংলা অনুবাদ হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। ঐতিহাসিক মূল্য বিবেচনায় প্রবন্ধটি বাংলায় অনুবাদ করা হলো।

প্রবন্ধের উপর অধ্যাপক আবদুল করিম ও আবু ইমাম মন্তব্য করেছিলেন। আবু ইমাম সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করলেও আবদুল করিমের মন্তব্য ছিল বেশ বিস্তৃত ও বিশ্লেষণাত্মক। মূল প্রবন্ধের সঙ্গে আমরা মন্তব্য দুটিও যুক্ত করেছি।

অক্ষরের চেয়ে ভাবকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। প্রদত্ত রেফারেন্স হুবহু রাখা হয়েছে। চেষ্টা করা হয়েছে, মূল বক্তব্য ঠিক রেখে প্রাঞ্জল অনুবাদের। বাকিটা পাঠক ভালো বলতে পারবেন।

***

 

বাংলাদেশের সুফিধারার প্রসঙ্গসমূহ (১২০০১৭০০): একটি ধারণামূলক কাঠামোর অনুসন্ধানে

মফিজুল্লাহ কবির

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মানুষ যেমন ধর্ম ছাড়া চলতে পারে না, তেমনি কেবল আচার-অনুষ্ঠান দিয়েও চলতে পারে না। সুতরাং তাকে ধর্মের মাধ্যমেই জীবনের অন্তর্নিহিত অর্থ অনুসন্ধান করতে হয়। ইসলামে এই অন্তর্নিহিত অর্থ অনুসন্ধানের নাম সুফিবাদ। সুফিবাদের একটি সুনির্দিষ্ট এবং সন্তোষজনক সংজ্ঞায় পৌঁছানো সুফি এবং অ-সুফি উভয়ের জন্যই একটি দুর্বোধ্য কাজ, যা মানবজাতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় দিক। এ. জে. আরবেরি সুফিবাদকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় আল্লাহর জীবন্ত উপস্থিতি উপলব্ধি করার জন্য মুসলমানদের স্বতন্ত্র প্রচেষ্টা হিসেবে।[1] সুফিবাদের উৎপত্তি নিয়ে বিতর্কে না গিয়ে আমরা এই বিষয়ে দুই পশ্চিমা পণ্ডিত, আর. এ. নিকোলসন এবং লুই ম্যাসিগনন গৃহীত ভিন্ন ভিন্ন অবস্থানের কথা তুলে ধরছি। প্রথমজন বলেছেন যে, ‘রহস্যবাদ’ এবং ‘নীরবতা’ অর্থে সুফিবাদ ইসলামের একটি স্বাভাবিক প্রবহমান বিষয় ছিল এবং যদিও সাধনা সামগ্রিকভাবে খ্রিস্টান প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল না, তবুও এটিকে নবী মোহাম্মদ’র ধারা বলা যেতে পারে এবং এর থেকে যে সুফিবাদের উদ্ভব হয়েছিল তাও মূলত মুহাম্মাদী। অতঃপর তিনি তার অনুসন্ধানগুলিকে তুলে ধরেন এই বলে যে, হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষদিকে এবং তৃতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধে সুফিধারায় নতুন ধারণার উদ্ভব হয়েছিল এবং তাদের উৎপত্তি ‘নব্য-প্লেটোনিজম এবং জ্ঞানবাদ’-এ খুঁজতে হবে। তিনি আরও বলেন যে, এর মধ্যে চরম সর্বেশ্বরবাদী মতবাদগুলি পারস্য বা ভারতীয় এবং ফানার মতবাদ সম্ভবত বৌদ্ধ-নির্বাণ থেকে উদ্ভূত।[2] কিন্তু ফানা বোঝার জন্য একটি ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতির সুপারিশ করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন যে ‘এটি কুরআন থেকে ক্রমাগত পাঠ করা, উপলব্ধি করা, অনুশীলন করার মাধ্যমে ইসলামী আধ্যাত্মিকতা তার উৎপত্তি এবং বিকাশে এগিয়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট ধারার ঘন-ঘন পুনর্পাঠ এবং অনুশীলনের উপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণরূপে গঠিত বলেই ইসলামী আধ্যাত্মিকতা তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করতে পেরেছিল।[3]

সুফিধারার বিবর্তনের ইতিহাসকে তিনটি বিস্তৃত পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়েছে: প্রথমটি সপ্তম থেকে নবম শতাব্দী, দ্বিতীয়টি দশম ও একাদশ শতাব্দী এবং শেষটি দ্বাদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী, যার পরে পতনের সময়কাল শুরু হয়।[4] মূলত সম্পদ ও বিলাসিতা এবং জীবনের চরমতম জাগতিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসাবে সুফিধারার সূচনা হয়েছিল।[5] গঠনকালে সুফিবাদ সাধনা এবং নীরবতা দ্বারা চিহ্নিত হয়েছিল। এটি ছিল ধ্যান, অন্তর্নিহিতকরণ, আত্মজাগরণ এবং পুনরুজ্জীবনের একটি ধারা। এই সময়কালে সুফিবাদকে অস্তিত্বের জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছিল কারণ প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিদের কিছু মতবাদ উলামা এবং রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের তীব্র আক্রমণের শিকার হয়েছিল। আল-মুহাসিবি (ইন্তেকাল ৮৩৭) যুক্তি দিয়ে সুফি মতবাদ ও ধর্মের আক্ষরিক ভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করেছিলেন। তাঁর শিষ্য জুনায়েদ বাগদাদী (ইন্তেকাল ৯১০) কুরআনের চুক্তি- ‘আমি কি তোমার প্রভু নই? তারা বলল, হ্যাঁ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি’ আয়াতের উপর ভিত্তি করে ‘ফানা’ এবং ‘বাকা’ সম্পর্কে সুফিতত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছেছিলেন। যদিও দ্বিতীয় যুগ শুরু হয়েছিল সুফিদেরকে নির্মমভাবে দমন ও নিষ্ঠুরতার চূড়ান্ত পরিণতির মাধ্যমে। যেমন মনসুর হাল্লাজ ‘আনাল-হক’ উচ্চারণের মাধ্যমে বিচার ও শাহাদাত। আবার একই যুগে কেবল সুফিবাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মতবাদের সূত্রপাতই হয়নি বরং ধর্মের আক্ষরিক ব্যাখ্যাদাতা গোষ্ঠীর সাথে এর পুনর্মিলন এবং শরীয়তের পরিপূরক হিসেবে সুফিবাদের বিজয়ও দেখা গেছে। এই যুগেই রহস্যময় হাল, মাকাম’র মতো রহস্যপূর্ণ ধারণাগুলো আল-কুশাইরি (ইন্তেকাল ১০৭২) দ্বারা বিকশিত হয়েছিল, যিনি বলেছিলেন, ‘হাল উপহার, মাকাম অর্জন’। এই যুগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, হযরত দাতাগঞ্জ বখশ লাহোরী আল-হুজবিরি (ইন্তেকাল ১০৭৫), যার কাশফুল মাহজুব ফারসি ভাষায় সুফিবাদের উপর প্রথম গ্রন্থ। সবশেষে, বিখ্যাত ধর্মতাত্ত্বিক এবং আইনবিদ ইমাম আবু হামিদ আল গাজ্জালি (ইন্তেকাল ১১১১) তাঁর বিশাল শ্রমনিষ্ঠার মাধ্যমে অক্ষরবাদ এবং আধ্যাত্মিকতার মধ্যে সমন্বয় সাধন করেন। তৃতীয় যুগের প্রথম শতাব্দীতে অর্থাৎ দ্বাদশ শতাব্দীতে, সুফি চিন্তাভাবনা ও অনুশীলনে একটি নতুন উপাদান প্রবর্তিত হয়, যার নাম তরিকা বা দরবেশী ধারা। যার ফলে সুফিধারার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনযাপন কেন্দ্র করে স্থায়ী সুফিধারা গড়ে ওঠে, যেখানে সুনির্দিষ্টভাবে শৃঙ্খলা, গোষ্ঠীগত জীবন এবং স্বতন্ত্র আচার-অনুষ্ঠানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানে শেখ (পীর-মুর্শিদ) এর ব্যক্তিত্বকে মুরিদ (শাগরিদ) এর সাথে সম্পর্কিত করে তুলে ধরা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে মুরিদকে খিরকা (পোশাক) দিয়ে সাফল্যের স্বীকৃতি প্রদান করা হতো। খানকাহ ওয়াকফ কর্তৃক পরিচালিত শিক্ষার সমান্তরাল কেন্দ্র হিসাবেও বিবেচিত হতো, যা সুফিধারার বাহ্যিক কেন্দ্র হিসাবে বিকশিত হয়েছিল। পরবর্তী শতাব্দীতে অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই তরিকাগুলি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। কাদেরি, সোহরাওয়ার্দী, শাজিলি এবং মৌলবীয়া তরিকা এর মধ্যে প্রথমসারির অন্তর্ভুক্ত। ব্যতিক্রমী প্রতিভার তিন ব্যক্তি, ইবনে আল-আরাবী (ইন্তেকাল ১২৪০), ইবনে আল-ফরিদ (ইন্তেকাল ১২৩৫) এবং জালালুদ্দিন রুমি (ইন্তেকাল ত্রয়োদশ শতাব্দীতে, ১২৭৩) সুফিবাদের ধারণা বিস্তারে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। সুফি মতবাদের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘ইনসান আল-কামিল’ ধারণা যা ইবনে আরাবির কাছ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং আব্দুল করিম আল-জিল্লি (ইন্তেকাল ১৪২৮) দ্বারা লিখিত একই নামের একটি বইতে এটি পরিপূর্ণতা লাভ করে। আব্দুল করিম জিল্লি সুফিদের সেই মাযহাবের অন্তর্ভুক্ত যারা ‘ওয়াহদাতুল ওজুদ’ তত্ত্বকে সঠিক মনে করেন। হযরত মুহাম্মদ এমন নিখুঁত মানুষ এবং সেই ক্ষুদ্র জগৎ যার মধ্যে বৃহৎ জগতের সমস্ত নিখুঁত গুণাবলী প্রতিফলিত হয়। আল্লাহ এবং মানুষ নিখুঁত মানুষের মধ্যে এক হয়ে যায়। তিনি হলেন আল্লাহর গুণাবলিতে তৈরি প্রতিলিপি। কুতুব হলেন নিখুঁত মানুষ যার উপর হাল আবর্তিত হয়। সুফি শেখ যাদের আল্লাহ তায়ালা ফানা থেকে ফিরিয়ে আনেন যাতে তাঁরা হযরত মুহাম্মদের খলিফা হিসেবে মানুষকে তাঁর দিকে পরিচালিত করতে পারেন। তাঁরা হলেন আউলিয়া (দরবেশ) যারা আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী। তিনি স্বস্তি আনেন দুস্থদের জন্য, অসুস্থদের জন্য স্বাস্থ্য, নিঃসন্তানদের জন্য সন্তান, ক্ষুধার্তদের জন্য খাদ্য, যারা তাদের আত্মাকে তাঁর হস্তে অর্পণ করে তাদের জন্য আধ্যাত্মিক নির্দেশনা, যারা তাঁর মাজারে, দরগাহে যান এবং তাঁকে স্মরণ করেন তাদের জন্য তিনি নিয়ে আসেন বিশেষ পয়গাম।[6]

ভারতীয় উপমহাদেশে সুফিবাদের প্রবর্তন দ্বিতীয় এবং তৃতীয় যুগের বিকাশের সাথে মিলে যায়। ভারতে আগত সুফি তরিকার মধ্যে চিশতি, সোহরাওয়ার্দী, কাদেরী, সাত্তারী (সোহরাওয়ার্দীর সাথে সম্পর্কিত), নকশবন্দী এবং কলন্দরী তরিকা উল্লেখযোগ্য। এই তরিকার সুফিরা কমবেশি বাংলায় এসেছিলেন, যেখানে সময়ের সাথে সাথে স্থানীয় তরিকাগুলি প্রসারিত হয়েছিল। বাংলায় যে-সকল পণ্ডিতরা সুফিবাদের উপর গুরুত্বপূর্ণ ও পথিকৃতের কাজ করেছেন তারা এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।[7] উল্লেখ্য যে, কেবলমাত্র মরহুম মুহম্মদ এনামুল হকই এই বিষয়ে প্রথম সুনির্দিষ্ট গবেষণা করেছিলেন।[8] সুফিবাদের উপর সাম্প্রতিক দুটি গবেষণা, একটি বৃহৎ স্তরে এবং অন্যটি ক্ষুদ্র স্তরে, বাংলার সুফিবাদ অধ্যয়নের জন্য মূল্যবান সূত্র হতে পারে। প্রথমটি হল জে. এস. ট্রিমিংহামের Sufi Orders in Islam[9] এবং দ্বিতীয়টি হল রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটনের Sufis of Bijapur[10]। ট্রিমিংহাম সুফিবাদের বিকাশকে একটি সংগঠিত আন্দোলন হিসেবে তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায়ে বিভক্ত করেছেন, যথা খানকাহ পর্যায়, তরিকা পর্যায় এবং তাইফা পর্যায়। প্রথম পর্যায়ে একজন নির্দিষ্ট গুরুর খ্যাতির উপর ভিত্তি করে সুফি কেন্দ্রগুলির (রিবাত, খানকা এবং জাওইয়াহ) বিকাশ দেখা যায়। এই পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানগুলো স্বতন্ত্র ছিল না এবং শায়খের ইন্তেকালের পর বিলুপ্ত হয়ে যেতো। সুফিবাদ আনুষ্ঠানিক ইসলাম দ্বারা গৃহীত হওয়ার পর বিভিন্ন আধ্যাত্মিক গোষ্ঠী সুফিধারায় নিজেদের বিকশিত করে, অর্থাৎ এটি তরিকা পর্যায়। দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে অনেক খানকাহ সমৃদ্ধ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। এমনকি আলেপ্পো, বাগদাদ এবং কায়রোতে মহিলাদের জন্য রিবাতও গড়ে উঠেছিল। তৃতীয় পর্যায়ে পনেরো শতকে এই প্রতিষ্ঠানের বিকাশের পর্যায়টি পৌঁছেছিল যখন এটিকে তাইফা বলা হতো যেখানে নেতৃত্বের প্রবণতা বংশগত ব্যাপার হয়ে ওঠে। প্রতিষ্ঠাতা শায়খের কাছ থেকে উদ্ভূত আধ্যাত্মিক শক্তির সাথে সম্পর্কিত একটি বিশেষ সম্প্রদায় শেখের ব্যক্তিত্বকে ঘিরে জীবনযাপন করদেন। তিনি আল্লাহ এবং মানুষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠেন; অর্থাৎ পীররা এখন বরকতের অধিকারী, সত্যকে উপলব্ধিকারী এবং অলৌকিক কাজ সম্পাদনকারী (কারামত) হয়ে ওঠেন। এই বরকত বা আধ্যাত্মিক শক্তি পীরদের বংশধরদের কাছে চলে যায়। এই সময়কালেই দরগাহ খানকাহের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং নিরক্ষর জনসাধারণকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য এই ধারাটি বিস্তৃত করা হয় যারা অবাধে অনুষ্ঠানগুলিতে অংশগ্রহণ করতে পারতো। এই চূড়ান্ত পর্যায় সম্পর্কে ট্রিমিংহাম পর্যবেক্ষণ করেন, “যদি আমরা প্রথম পর্যায়টিকে ব্যক্তিকে প্রভাবিত করে, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ হিসাবে এবং দ্বিতীয়টিকে একটি পদ্ধতির কাছে আত্মসমর্পণ হিসাবে চিহ্নিত করি, তাহলে এই পর্যায়টিকে বরকতের অধিকারী ব্যক্তির কাছে আত্মসমর্পণ হিসাবে বর্ণনা করা যেতে পারে, যদিও অবশ্যই অন্যান্য পর্যায়গুলিও যুক্ত ছিল”।

উপরে উল্লিখিত দ্বিতীয় বইটিতে রিচার্ড ম্যাক্সওয়েল ইটন বিজাপুরের সুফিবাদ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেছেন যা ট্রিমিংহামের সূত্রে বিকাশের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ে পড়ে। তিনি তাজকিরাত, মালফুজাত, সাধারণ ইতিহাস, দরগার রেকর্ড এবং লাখেরাজ সম্পত্তির সনদ পরীক্ষা করেছেন যা থেকে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় গবেষণা বেরিয়ে এসেছে। শুরুতে তিনি যে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন, যেমন, রাষ্ট্র, উলামা এবং অমুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে সুফিদের সম্পর্ক কী ছিল, তার উত্তর দিয়ে তিনি বিজাপুরের সুফিদের যোদ্ধা-সুফি, সংস্কারক সুফি, ইনামদার (ভূমিপ্রাপ্ত) সুফি এবং মজজুব বা দরবেশদের মধ্যে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন।

ইটনের দেওয়া ধারণাগত কাঠামো আমাদের বাংলায় সুফিবাদ অধ্যয়নের জন্য একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় নির্দেশিকা সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু এটি করার জন্য, সকল উপকরণ, বিদ্যমান সাহিত্যের যত্ন সহকারে পরীক্ষা, শিলালিপি এবং দরগাহের কাগজপত্রগুলির পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। বাংলায় কি সুফি যোদ্ধাদের নির্দিষ্ট কোনো ‘যুগ’ ছিল? যদি তাই হয়, তাহলে তাদের ভূমিকা কী ছিল? তারপর প্রশ্ন আসে, সংস্কারবাদী সুফি যারা সমাজকে ভেতর থেকে সংস্কারের চেষ্টা করেছিলেন এবং যারা অভিবাসীদের প্রথম প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন; রাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল? উলামাদের সাথে তাদের সম্পর্ক কেমন ছিল? ধর্মান্তরিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা কেমন ছিল? অমুসলিম জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগণের সাথে তাদের যোগাযোগের ভাষা কী ছিল? বিজাপুরে ডেকানিতে একটি সম্পূর্ণ জনপ্রিয় সাহিত্য তৈরি হয়েছিল যা সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন ধরণের লোক ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। পরিশেষে যে বিষয়টির পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান প্রয়োজন তা হলো, সেই সময়কাল যখন খানকাহগুলি দরগা দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল এবং যখন সুফিদের পূর্বপুরুষদের গদিনশিনরা রাজ্য/রাষ্ট্র থেকে জমি অনুদান (লাখেরাজ) পেয়ে বংশগত ভূমি মালিকদের একটি শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিল। নির্দিষ্টভাবে এই বিষয়ের উপর একটি গবেষণা বাংলায় সুফিবাদ সম্পর্কে অনেক আকর্ষণীয় ধারণা প্রকাশ করতে পারে।

সাধারণত বিশ্বাস করা হয় যে, উলেমারা শরীয়তকে সমুন্নত রেখে এবং রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সাথে কমবেশি সংযুক্ত থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সকলের জন্য সহজলভ্য স্থানে তাদের খানকাগুলির শান্ত পরিবেশে সুফিরা তাদের আধ্যাত্মিক ও জাগতিক চাহিদা পূরণ করতেন এবং সাধারণভাবে জনসাধারণের মধ্যে ইসলামের প্রসার ঘটিয়েছিলেন।[11] মহানগর কেন্দ্র থেকে দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলামের প্রসার সুফিদের অক্লান্ত উৎসাহ এবং নিঃস্বার্থ নিষ্ঠার ফলেই ঘটেছে। কিন্তু ধর্মান্তরের প্রতি চিশতী সুফিদের সাধারণ উদাসীনতা, যা কখনও কখনও রাজদরবারের প্রতি শত্রুতা এবং তাদের জীবনযাত্রার সরলতায় পরিণত হয়েছিল। এটি বিবেচনায় রেখে সোহরাওয়ার্দী তরিকার রাজপুত্রদের সাথে মিশে সম্মান ও সম্পদ গ্রহণের পাশাপাশি সুফি সাহিত্যে বর্ণিত সুফিধারা ও অনুশীলনের জটিলতার বিপরীতে, যুদ্ধরত সুফিদের ঘটনাবলীর সাথে মিলিত হয়ে, উপরোক্ত বিষয়টির উপর একটি সাধারণীকরণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ আর গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দুই পণ্ডিত, মুহম্মদ এনামুল হক এবং এম. আর. তরফদার, যে মতামত প্রকাশ করেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত অনুমানের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা প্রয়োজন। যদিও প্রথমজন বলেছেন, “এটা সত্য যে ইসলাম সুফিবাদের পোশাকেই এই দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।”[12] দ্বিতীয়জন মতামত দিয়েছেন যে “সুফিবাদ, তার অত্যন্ত রহস্যময় নীতি এবং অনুশীলন সহ, মুসলিম জনসংখ্যার শুধু একটি অংশকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয়… সুতরাং গড়পড়তা মুসলিম জনগোষ্ঠী সম্ভবত লোক-ইসলাম মেনে চলেন”।[13] সুফিবাদ বিকাশের তিন স্তর যথা খানকাহ পর্যায়, তরিকা পর্যায় এবং তাইফা পর্যায় মেনে নিয়ে আমরা নিরাপদে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, বাংলার সুফিবাদ দ্বিতীয় এবং তৃতীয় পর্যায়ের আওতায় পড়ে।

এখন আমরা পূর্বে উত্থাপিত কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি। ইটনের দেওয়া কাঠামো অনুসরণ করে আমরা প্রথমে যোদ্ধা সুফিদের প্রশ্নটি আমলে নেই। এই বিষয়ে সকল তথ্য আমাদের বাংলায় যোদ্ধা সুফিদের ইতিহাস মোটামুটি সন্তোষজনকভাবে পুনর্গঠন করতে সক্ষম, যদিও তাদের মধ্যে কিছু সুফির যুদ্ধ-পরবর্তী জীবনে শান্তিপূর্ণ ধর্মপ্রচারমূলক কার্যকলাপ সম্পর্কিত ঐতিহ্য যৌক্তিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের কয়েকজনের নামের সাথে শহীদ এবং গাজী উপাধি সংযুক্ত করা হয়েছে যা এই সুফিদের বিভিন্ন পরিণতির ইঙ্গিত বহন করে। এটি আনাতোলিয়ার যোদ্ধা সুফিদের সাথে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ, অর্থাৎ ত্রয়োদশ শতাব্দীর গাজী-বাবা এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষদিকে ইরানের সুফি গাজীরা বিহার ও বাংলায় তুর্কি বিজয়ের পর থেকেই এই যোদ্ধা সুফিরা বাংলায় আসতে শুরু করেন। কারণ এটা অবিশ্বাস্য যে, বাংলার বা তার আশপাশের বৃহৎ কোনো সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়াই ছোট ছোট যুদ্ধক্ষেত্রের সৈন্যদল এমন বিস্ময়কর কাজ করতে পারে যা ঐতিহ্যবাহী বর্ণনায় আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হয়। মহাস্থানের শাহ সুলতান বলখী, মঙ্গলকোট (বর্ধমান) এর মখদুম শাহ মাহমুদ গজনবীর সাথে সম্পর্কিত ঘোড়াশাহিদ, বাবা আদম শহীদ (আবদুল্লাহপুর, বিক্রমপুর, ঢাকায় সমাধি) এবং মখদুম শাহ দৌলা শহীদ (শাহজাদপুরে সমাধি) এর মতো কিছু যোদ্ধা সুফির পরিচয় এবং সময়কাল নিশ্চিতভাবে শনাক্ত না করা যায়। তবে বাংলার অন্যান্য যোদ্ধা সুফিদের ঐতিহাসিকতা এবং বীরত্বপূর্ণ কীর্তি আমাদের ঐতিহাসিকরা সন্তোষজনকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রায় দেড় শতাব্দী (১২৫০-১৪০০) ধরে এই যোদ্ধা সুফিরা দুর্গম এবং কণ্টকাকীর্ণ সীমান্ত অঞ্চল জয় করতে শাসক সুলতানদের সহায়তা করেছিলেন। ১২৯৮ থেকে ১৩১৩ সালের মধ্যে পান্ডুয়ার শাহ সফি-উদ্দিনের সাথে সাতগাঁও দখলে ত্রিবেণীর জাফর খান গাজীর কৃতিত্ব, ১৩০৩ সালে সিকান্দার খান গাজীর সিলেট বিজয় হযরত শাহ জালালের সাথে, যিনি তার ৩১৩ জন সুফি অনুসারী নিয়ে কোনিয়া থেকে বাংলায় আসেন, এবং ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের (১৩৩৮-১৩৪৯) রাজত্বকালে কদল খান গাজী এবং পীর বদর-ই-আলমের চট্টগ্রাম বিজয় সুফি-অনুপ্রাণিত সামরিক বিজয়ের উদাহরণ।[14] দক্ষিণ-পশ্চিমে হুগলি এবং উত্তর-পূর্বে কামরূপ অঞ্চলে আরেক বিখ্যাত যোদ্ধা সুফি শাহ ইসমাইল গাজীর কৃতিত্ব সীমান্ত অভিযানের ইতিহাসে একটি আকর্ষণীয় অধ্যায় দখল করে আছে। কিন্তু সুলতান রুকনুদ্দীন বারবাক শাহ’র ১৪৭৮ সালে হাতে শেষোক্ত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তার এক শতাব্দীরও আগে ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের সুফি গভর্নর শায়দার ভাগ্য সেই যুগের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ষড়যন্ত্রের বৈশিষ্ট্যের দিকে ইঙ্গিত করে। খুলনার হযরত খান জাহান এমন উদাহরণ, যিনি খুলনা অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপন করেন, সম্ভবত উপরে উল্লিখিত যোদ্ধা সুফিদের অন্তর্ভুক্ত নন। এটি একজন যোদ্ধার সুফিতে পরিণত হওয়ার উদাহরণ বলে মনে হয়, কারণ বাগেরহাটের শিলালিপিতে স্পষ্টভাবে তাকে ‘অবিশ্বাসীদের শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং এটি কোনো আধ্যাত্মিক ক্ষমতার ইঙ্গিত বহন করে না।[15]

এখন আসি সংস্কারবাদী সুফিদের (বা ধর্মপ্রচারকদের) কথায়, যাদের সময়কাল আপাতত সেই সময় থেকে স্থির হতে পারে যখন মুসলিম শাসন টেকসইভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং মুসলিম শাসনের সুসংহতকরণ ঘটেছিল। যদি আমরা আপাতত ত্রয়োদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ এবং চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমার্ধকে যোদ্ধা সুফিদের আদর্শ সময় হিসেবে নির্ধারণ করি, তাহলে আমরা মোটামুটিভাবে ইলিয়াস শাহী শাসনকে সুফি কার্যকলাপের জন্য প্রয়োজনীয় শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি প্রদানকারী ‘যুগ’ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি, যা ১৩৫২ সালে ইলিয়াস শাহ তাঁর শাসনের অধীনে সমগ্র বাংলাকে একত্রিত করে শাহ-ই-বাঙ্গাল, বা সুলতান-ই-বাঙ্গালা উপাধি গ্রহণ করার সময় থেকে শুরু হয়েছিল।[16] ইলিয়াস শাহী শাসনের সাথে শুরু হওয়া শান্তি ও স্থিতিশীল পরিস্থিতি, স্থানীয় জনগণের সাথে পুনর্মিলনের নীতি, সরকারি চাকরিতে হিন্দুদের নিয়োগ এবং স্থানীয় সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার কারণে যোদ্ধা সুফিদের ধীরে ধীরে বিলুপ্তি ঘটে। সুফিদের পক্ষ থেকেও তাদের শান্তিপূর্ণ ভূমিকা ছিল বিদ্যমান পরিস্থিতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং তারা নিজেরাই ধীরে ধীরে স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হচ্ছিলেন।

ত্রয়োদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে শুরু করে ষোড়শ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত সুফিরা তাদের খানকাহে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকেন, যা খলিফা ও মুরিদদের সাধনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। দোয়ার জন্য যারা তাদের কাছে আসতেন তাদের জন্য সান্ত্বনা, লঙ্গরখানা থেকে উপকৃত পথিক, ভিক্ষুকদের জন্য খাদ্য এবং আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে খানকাগুলো। সুফিদের এই বিস্তৃত প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায় সুলতান ইব্রাহিম শর্কির কাছে লিখিত সুফি সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানির একটি চিঠি থেকে: “বড় শহর তো বটেই, এমনকি এমন একটি ছোট শহর বা গ্রামও খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে দরবেশরা এসে বসতি স্থাপন করেনি”। তাহলে এই খানকাহগুলিকে দরগাহ দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার সময় কখন এসেছে, অর্থাৎ ট্রিমিংহামের ভাষায়, তাইফা পর্যায়ে পৌঁছানো। যখন সুফিদের প্রথম প্রজন্ম ইন্তেকাল করে এবং স্থানভেদে, অঞ্চলভেদে এটি ভিন্ন হয়ে যায় এবং তাদের সমাধির উপর সমাধিসৌধ নির্মাণ করা হয়, তখন তাদের দরগাহে মানুষের যাতায়াত শুরু হয় এবং সুফি সংগঠন তাইফা পর্যায়ে পৌঁছে। এখন দরগাহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বংশধররা, পরিচিত বা আধ্যাত্মিক ধারার লোকেরা। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাতা সুফিদের বরকতকে পুনরুজ্জীবিত করে। আমরা মোটামুটিভাবে হোসেন শাহী শাসনামল (১৪৯৪-১৫৩৮) কে সেই সময় হিসেবে ধরে নিতে পারি যখন দরগাহগুলির প্রতি শ্রদ্ধা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং উরস, মিলাদ, মেলা এবং জামায়াত আয়োজনের আয়োজন শুরু হয়েছিল। দরগাহ মুসলিম ও অমুসলিম উভয়ের জন্য উন্মুক্ত ছিল এবং এই অনুষ্ঠানগুলির সঙ্গে ইসলামের বাইরের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান জড়িত ছিল। বাংলার প্রাথমিক সুফিরা যারা আরবি ও ফার্সি ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন, তারা সুফিবাদের উপর মূল্যবান ভাষ্যের লেখক ছিলেন। শায়খ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামাহ (ইন্তেকাল ১৩০০) তাঁর মাকামাতুত তাসাউফ বইটি রচনা করেন যা উপমহাদেশে জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর শিষ্য শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া মানেরিও সুফিবাদের উপর বেশ কয়েকটি বই লিখেছিলেন। হযরত নূর কুতুবুল আলম (পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথমদিকে ইন্তেকাল করেন) ওয়াহদাতুল ওজুদের একজন দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাঁর মকতুবাত তাসাউফ সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটায়। শেখ জালালের সহচর আনোয়ার সুফি শেখ আলী শের (ইন্তেকাল ১৫৬২) সুফিবাদের উপর একটি বই লিখেছিলেন যা পূর্ববর্তী কোনও রচনার ভাষ্য বলে মনে হয়। আমরা জানি না যে, প্রাথমিক সুফিদের উত্তরসূরিরা সুফিবাদের উপর বই লিখেছিলেন কিনা, কারণ সুফিবাদ খুব শীঘ্রই তার পূর্বের সৃজনশীলতা এবং উর্বরতা হারিয়ে ফেলেছিলো। আমরা এটাও জানি না যে পঞ্চদশ এবং ষোড়শ শতাব্দীতে সুফিরা সুফি পথ বা সুফি বিষয়বস্তুতে লেখার জন্য গদ্য বা কবিতায় বাংলা ভাষা গ্রহণ করেছিলেন কি-না। পীরদের দ্বারা এ জাতীয় কোনও রচনা এখনও অবধি আবিষ্কৃত হয়নি। দাক্ষিণাত্যে প্রায় একই সময়ে সুফিরা অভিজাত এবং সাধারণদের জন্য যথাক্রমে ফার্সি এবং দাক্ষিণাত্যের ভাষায় রচনা করেছিলেন। সুফিদের দ্বারা রচিত জনপ্রিয় মরমী কবিতা মুসলিম ও অমুসলিমদের বিশাল জনগোষ্ঠীর সাথে সংযোগ স্থাপন করেছিলো। কারণ কেবল ফার্সি ভাষায় রচিত রহস্যময় সাহিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে তারা সাধারণ মানুষের সাথে কোনও সংযোগ স্থাপন করতে পারেননি। বিখ্যাত চাক্কিনামা, চাখনামা, লরিনামা (বুলাবি) এবং শাদীনামা এই জাতীয় জনপ্রিয় সাহিত্যের সবচেয়ে সূক্ষ্ম রচনা।[17] সম্ভবত বাংলায় এরকম কিছুই ঘটেনি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কেবল সুফি চিন্তাভাবনাই নয়, স্থানীয় যোগতান্ত্রিক ধারণাগুলিও ধীরে ধীরে বাংলা সাহিত্যকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। কাজী রুকনউদ্দিন সমরকান্দির অমৃতকুণ্ড’র আরবি ও ফার্সিতে অনুবাদ এবং পরবর্তীতে সুফিরা এর বারংবার অনুবাদ এই ধারণাগুলিকে অব্যাহত রাখে। পঞ্চদশ শতাব্দীর পর থেকে এই ধারা এবং অন্যান্য স্থানীয় তান্ত্রিক ধারণাগুলি ধীরে ধীরে মুসলিম সমাজ এবং মুসলিম বাংলা সাহিত্যকে প্রভাবিত করে মুসলিম সুফি চিন্তাভাবনা, যোগতান্ত্রিক ধারণা এবং অনুশীলনের মিশ্রণ প্রকাশ করে।[18] এই ধারণাগুলি অবশ্যই অভিজাতদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এবং আমাদের অনুমান করে নিতে হবে যে, দরগাহগুলির সাথে তাদের মেলামেশার মাধ্যমে সাধারণ জনগণ ইসলামের জনপ্রিয় উপাদানগুলি গ্রহণ এবং আত্মীকরণ করেছিল। রাষ্ট্রের সাথে সুফিদের সম্পর্ক সম্পর্কেও আমরা নিশ্চিত নই। চিশতী সুফিদের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ উদাসীনতা এবং রাজাদের পক্ষ থেকে কিছুটা বিস্ময় ও প্রশংসার ইঙ্গিত দেয়। সুফিদেরকে যারা শ্রদ্ধা করতো তাদেরকে জনগণ আদর্শ শাসক হিসেবে বিবেচনা করতো। বিপরীতে, একজন চিশতী সুফি একটি সরকারপন্থী ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিলেন, যেমন তিনি বলেছিলেন, ‘যে কেউ তার প্রধানকে শ্রদ্ধা করে সে যেন তাকে শ্রদ্ধা করে। তিনি অভিজাতদের এবং রাজাদেরও শ্রদ্ধা করেন যাতে আমাদের পুত্ররা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আমাদের উদাহরণ অনুসরণ করে’। তিনি একজন সুফিকে লিখেছিলেন ‘তাকে (মানুষের) হৃদয় থেকে সন্দেহ দূর করতে এবং রাজার আনুগত্য করতে বলার জন্য অনুরোধ করতে’।[19] এই সুফি কি তাঁর পিতা শেখ আলাউল হকের অভিজ্ঞতা থেকে তা করতে প্ররোচিত হয়েছিলেন, যিনি সিকান্দার খান কর্তৃক দুই বছরের জন্য পান্ডুয়া থেকে সোনারগাঁয়ে নির্বাসিত হয়েছিলেন? একজন আধুনিক লেখকের মতে, এই অস্থায়ী নির্বাসন কেবল তার খানকাহ এবং লঙ্গরে ব্যয়বহুল ব্যয়ের কারণেই ঘটেনি, যা সুলতানের ক্রোধের কারণ হয়েছিল, বরং শেখ এবং তার আত্মীয়দের সন্দেহ করা হয়েছিল যে, তারা ফিরোজ শাহ তুঘলকের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখছে কি-না। এই বিখ্যাত সুফি পরিবার রাজা গণেশের হাতেও নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। মুসলমানদের উপর এই নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণেই হযরত নূর কুতুবুল আলম জৌনপুরের ইব্রাহিম শর্কির কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন এবং তার হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন।

উলামাদের সাথে সুফিদের সম্পর্ক কী ছিল? উপকরণের অভাবের কারণে এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া সম্ভব নয়। ধারণা করা হয় যে, উলামা এবং সুফিরা সম্পূর্ণ সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করেছিলেন। সমগ্র সুফি ঐতিহ্য সম্ভবত এর বিরুদ্ধে। উলামাদের সাথে সুফিদের সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করার আগে সুফি সাহিত্যের একটি নিবিড় পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

একইভাবে সমস্যা হলো, বাংলার গদিনশীন পীররা কখন এবং কীভাবে ইনামদার হয়েছিলেন? মুহম্মদ এনামুল হক বিভিন্ন দরগা পরিদর্শন করতে এবং দরগাহগুলির জমির মালিকানা যাচাই করতে অনেক কষ্ট করেছিলেন। প্রাচীনতম সুফি শেখ জালাল তাবরিজির সমাধির উপর অবস্থিত সমাধিসৌধটি ১৩৪২ খ্রিস্টাব্দে পান্ডুয়ার আলাউদ্দিন আলী শাহ কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। হোসেন শাহ (১৪৯৩-১৫১৯) দরগাহের সাথে সংযুক্ত লঙ্গরখানার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৪৭টি গ্রাম দান করেছিলেন বলে জানা যায়। দরগাহকে যে জমি দেওয়া হয়েছিল, তা ‘বাইশ হাজারী’ নামে পরিচিত। সম্রাট আকবর বর্ধমানের হাজী বাহরাম সাক্কার মাজার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জমি দান করেছিলেন। রাজশাহীর শাহ মখদুমের দরগার সাথে সংযুক্ত জমি সম্রাট হুমায়ুন কর্তৃক দান করা হয়েছিল বলে জানা যায়। বাঘার মাওলানা শাহ দৌলার সমাধির সাথে সংযুক্ত জমিদারি ১৬১৫ সালে মুঘল সম্রাটের একটি ফরমান দ্বারা ৪২টি গ্রামের অনুদান দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল বলে জানা যায়, যার আয় ছিল ৮০০০ টাকা। বিস্তারিত তথ্যের অভাবে আমরা সম্ভবত আংশিকভাবে এই সিদ্ধান্তে আসতে পারি যে, মুঘল শাসনের প্রথমদিকে অর্থাৎ সপ্তদশ শতাব্দীতে দরগাহের এই সাজ্জাদেনীশিনরা জমিদার হয়ে ওঠেন এবং তাদের পার্থিব জাঁকজমক তাদের বিখ্যাত পূর্বপুরুষদের পক্ষ থেকে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।

***

মন্তব্য
আবদুল করিম

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এই সেমিনারে বাংলাদেশের সুফিবাদ প্রসঙ্গে প্রবন্ধ লেখার জন্য আমরা অধ্যাপক মফিজুল্লাহ কবিরের কাছে কৃতজ্ঞ। অধ্যাপক কবীর আমাদের একজন সিনিয়র পণ্ডিত, তিনি আমার শিক্ষক এবং এখানে উপস্থিত আমার অনেক সহকর্মীর শিক্ষক। একটি সুপরিকল্পিত এবং সুলিখিত প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। বাংলার সুফিবাদ অনেকেই অধ্যয়ন করেননি। প্রথমদিকের পণ্ডিত হলেন প্রয়াত ড. মুহম্মদ এনামুল হক, যিনি প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে বাংলায় সুফিবাদের ইতিহাসের উপর তাঁর পিএইচডি গবেষণাপত্র লিখেছিলেন। বঙ্গে সুফি প্রভাব নামে এই গ্রন্থের একটি সংক্ষিপ্ত বাংলা সংস্করণ ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল এবং সম্প্রতি মূল থিসিসটিও প্রকাশিত হয়েছে। ষাটের দশকে আমি ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত আমার Social History of the Muslims in Bengal বইতে এই বিষয়ে আলোকপাত করি, যার পরেই প্রয়াত ড. রহিমের Social and Cultural History of Bengal এবং ড. তরফদারের Husain Shahi Bengal প্রকাশিত হয়। এই প্রকাশনাগুলি সত্ত্বেও, বাংলার সুফিদের উপর অনেক প্রশ্ন অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে, এবং অধ্যাপক কবীর এই সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধে এই প্রশ্নগুলির কিছু নিরীক্ষা করার চেষ্টা করেছেন।

এই প্রবন্ধটি দুটি ভাগে বিভক্ত – প্রথম অংশে সুফিবাদের সংজ্ঞা এবং দ্বিতীয় অংশে বাংলাদেশের সুফিবাদের কিছু দিক ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আমাদের জন্য দ্বিতীয় অংশটি গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক কবীর এই গবেষণাপত্রের ধারণাগত কাঠামোটি জে. এস. ট্রিমিংহাম এবং আর. এম. ইটনের গবেষণা থেকে নিয়েছেন, বিশেষ করে ইটন থেকে। এই কাঠামোর মধ্যে তিনি কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন এবং উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছেন। উত্থাপিত প্রশ্নগুলি বাংলায় সুফিদের ভূমিকা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশ্নগুলি নতুন কিছু নয়, তবে পণ্ডিতরা সেগুলির উত্তর দিতে এড়িয়ে গেছেন। প্রধান কারণ, বাংলায় এই ধরনের গবেষণার জন্য উপকরণ অত্যন্ত অপ্রতুল। অধ্যাপক কবীরের অনুসন্ধানও উৎস উপকরণের অভাবের কারণে বিভ্রান্ত হয়েছে, যা আবারও প্রধানত দায়ী, যদি তিনি নিজের দ্বারা উত্থাপিত কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজে না পান।

উত্থাপিত প্রশ্নগুলি নিম্নরূপ:

(ক) বাংলায় কি সুফি যোদ্ধাদের ‘যুগ’ ছিল? যদি থাকে, তাহলে তাদের ভূমিকা কী ছিল?
(খ) রাষ্ট্র বা উলামাদের সাথে সুফিদের সম্পর্ক কী ছিল?
(গ) স্থানীয় জনগণের সাথে তাদের যোগাযোগের ভাষা কী ছিল?
(ঘ) কখন দরগাহ খানকাহের স্থলাভিষিক্ত হয় এবং কখন সাজ্জাদানশিনরা রাষ্ট্র থেকে ভূমি-অনুদান (লাখেরাজ) পেয়ে বংশানুক্রমিক ভূমি-মালিকদের একটি শ্রেণীতে পরিণত হন?

অধ্যাপক কবীর প্রথম প্রশ্নের উত্তরে ইতিবাচকভাবে বলেন যে, ১২৫০-১৪০০ খ্রিস্টাব্দের সময়কাল ছিল যোদ্ধা সুফিদের যুগ। এই সময়কালে যোদ্ধা দরবেশরা শাসক শ্রেণীকে তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারণে সহায়তা করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, বাংলার কিছু প্রাথমিক সুফিকে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এবং দুর্গম ভূমি জয়ে সুলতানদেরকে সহযোগিতা করতে দেখা যায়। সিলেটের শাহ জালাল, ত্রিবেণীর শাহ সফিউদ্দিন এবং চট্টগ্রামের শাহ কাত্তাল এবং শাহ বদরের উদাহরণ উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সময়কালে মুসলিম রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া চলছিল। বাংলায় আসা প্রাথমিক সুফিরা ‘ধর্মযুদ্ধে’ যোগদানের মাধ্যমে গাজী বা শহীদ হওয়ার একটি উপায় খুঁজে পেয়েছিলেন। এই সুফিরা কি যোদ্ধা দরবেশদের একটি শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন নাকি তারা যুদ্ধকে জিহাদ বলে মনে করে কেবল একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করতেন, তা স্পষ্টভাবে বলা যায় না। তবে, বর্তমানে আমাদের কাছে থাকা তথ্য-উপাত্ত মোতাবেক অধ্যাপক কবীরের যুক্তিকে বিতর্কিত করার সুযোগ নেই।

রাষ্ট্রের সাথে সুফিদের সম্পর্কের প্রশ্নে, অধ্যাপক কবির শেখ নূর কুতুবুল আলমের একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছেন, “যে তার প্রধানকে শ্রদ্ধা করে, সে তাকে শ্রদ্ধা করে।… তিনিও সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের এবং সুলতানদের শ্রদ্ধা করতেন। যাতে আমাদের পুত্ররা তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আমাদের উদাহরণকে অনুসরণ করে।” একই শেখ আরও একজন সহকর্মী সুফিকে লিখেছিলেন, “তাকে (মানুষের) হৃদয় থেকে সন্দেহ দূর করতে এবং রাজার আনুগত্য করতে অনুরোধ করতে”। অধ্যাপক কবির মনে করেন যে এটি শেখ নূর কুতুবুল আলমের সরকারপন্থী অবস্থান ছিল। তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন যে, শেখ নূর কুতুবুল আলমের এই সরকারপন্থী অবস্থান কি “তার পিতা শেখ আলাওল হকের অভিজ্ঞতার দ্বারা প্ররোচিত হয়েছিল, যে কারণে সিকান্দার শাহ কয়েক বছরের জন্য পান্ডুয়া থেকে সোনারগাঁও নির্বাসন ভোগ করেছিলেন?” এই দুটি ঘটনা এবং রাজা গণেশের সময়ে শেখ নূর কুতুবুল আলম রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছিলেন তার বাইরে, অধ্যাপক কবিরের এই প্রশ্নে আর কিছু বলার নেই, এবং তিনি এই প্রশ্নের কোন উত্তরও দেননি।

রাষ্ট্রের সঙ্গে সুফিদের সম্পর্কের প্রশ্নটি কেবল বাংলার সঙ্গে জড়িত নয়। এটিকে ভিন্ন ভিন্নভাবে অধ্যয়ন করা যাবে না, বরং ইসলামী বিশ্বের বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে এবং বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিয়ে আলোচনা করা উচিত। দিল্লির প্রেক্ষাপটে, সুলতানি এবং মুঘল উভয় আমলেই এই ধরনের গবেষণার জন্য উপকরণের অভাব রয়েছে। এই উপকরণগুলি দেখায় যে, একদিকে সুলতানরা কিছু সুফির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন, অন্যদিকে, সুলতানরা সুফিদের সাথে চরম সম্মানের সাথে আচরণ করেছিলেন। পূর্বের প্রকৃতির কিছু উদাহরণ হলো, সুলতান বলবনের আবু তাওয়ামাকে সোনারগাঁয়ে নির্বাসিত করা, রাজনৈতিক কারণে সিদি-মওলার বিরুদ্ধে জালালুদ্দীন খলজির পদক্ষেপ এবং জাহাঙ্গীরের মুজাদ্দিদে আলফেসানির কারাদণ্ড। পরবর্তী প্রকৃতির উদাহরণ হল মুহাম্মদ তুঘলক এবং ফিরুজ শাহ তুঘলকের শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরীর দোয়ার জন্য অনুরোধ। সুলতানরা সুফিদের তাদের যথাযথ সম্মান প্রদান করেছিলেন এবং নম্রতার সাথে সুফিদের সেবা করতে আগ্রহী ছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, বলবন, মুহাম্মদ বিন তুঘলক এবং আকবরের মতো শক্তিশালী সুলতানদের তাদের সময়ের বিখ্যাত সুফিদের জুতা পড়তে সাহায্য করতে দেখা যায়। রাজত্বের প্রথমদিকে খাজা মুইনুদ্দিন চিশতি এবং শেখ সেলিম চিশতির প্রতি আকবরের শ্রদ্ধা সুপরিচিত। বাংলায়ও একই রকম উদাহরণ পাওয়া যায়। শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরী এবং মাওলানা মুজাফফর শামস বলখীর সিকান্দর শাহ এবং গিয়াসউদ্দিন আজম শাহকে লেখা চিঠিগুলি দেখায় যে, শেখরা সুলতানদের কল্যাণ দেখতে আগ্রহী ছিলেন এবং তারা ধর্মীয় ও প্রশাসনিক বিষয়ে সুলতানদের পরামর্শও দিতেন। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ শেখ নূর কুতুবুল আলমের দরগায় যেতেন। প্রচুর শিলালিপিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে যে, সুলতানরা দরগায় মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। অন্যদিকে, সুলতান সিকান্দর শাহ শেখ আলাওল হককে সোনারগাঁয়ে নির্বাসিত করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। বলা হয় যে, রুকনুদ্দিন বারবাক শাহ সম্রাটদের আচরণের জন্য শাহ জালাল দক্ষিনীকে হত্যা করেছিলেন। আমার মতে, সুফিরা সরকারপন্থীও ছিলেন না, আবার সরকারবিরোধীও ছিলেন না। তারা সাধারণত রাজা-রাজপুত্র, রাষ্ট্র বা রাজনীতির প্রতি উদাসীন ছিলেন না। চিশতিয়া সুফিরা সাধারণত শাসকদের সাথে দেখা করতেন না, অন্যদিকে অন্য তরিকার সুফিরা এতটা কঠোর ছিলেন না। কিন্তু যখনই সুফিরা দেখতেন যে, সুলতানরা তাদের কার্যকলাপে সীমালঙ্ঘন করছেন, তখন তারা হস্তক্ষেপ করতেন এবং সুলতানদের অসন্তুষ্টির কারণ হতেন। শেখ শিহাবুদ্দিনের মুহাম্মদ বিন তুঘলকের সাথে সাক্ষাতের বিবরণ থেকে সুফিরা কতটা নির্ভীক এবং প্রাণবন্ত হতে পারেন তা আলোচনা করা যেতে পারে। একবার মুহাম্মদ বিন তুঘলক ভেবেছিলেন যে “খতম-ই-নবুওয়ত” অর্থাৎ নবী মুহাম্মদ (দ.)-এর সাথে নবুয়তের মেয়াদ সমাপ্তির বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত নয়। তিনি উলামাদের একটি কাউন্সিল ডেকে তাদের কাছে প্রশ্নটি উত্থাপন করেন। উলামারা সুলতানকে এতটাই ভয় পেতেন যে, তারা মতামত দিতে অক্ষমতা প্রকাশ করে এবং সুলতানকে অনুরোধ করে শেখ শিহাবুদ্দিনের সাথে পরামর্শ করতে, যার প্রতি সুলতানের অগাধ শ্রদ্ধা ছিল। শেখ শিহাবুদ্দিনকে রাজ-দরবারে ডাকা হয় এবং সুলতান তাকেও একই প্রশ্ন করেন। শেখ তৎক্ষণাৎ রেগে যান; তিনি একটিও কথা বলেননি বরং জুতা খুলে সুলতানের মুখে আঘাত করেন। অবশ্যই, সুলতান দ্রুত প্রতিশোধ নেন এবং শেখকে দুর্গের উপর থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করেন। বাংলায়, নূর কুতুবুল আলম সরকারি চাকরি গ্রহণের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। যদিও মুজাফফর শামস বলখী গিয়ািউদ্দিন আজম শাহের সাথে দীর্ঘ চিঠিপত্র আদান-প্রদান করেছিলেন এবং কয়েক বছর ধরে বাংলায় বসবাস করেছিলেন, তবুও তিনি কখনও সুলতানের সাথে দেখা করেননি। শেখ বদরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়, কারণ তিনি রাজা গণেশকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিবাদন করতে অস্বীকার করেছিলেন।

সূফী-উলামা সম্পর্কও সমাধান করা একটি কঠিন সমস্যা। অধ্যাপক কবীর এই প্রশ্নের কোনও উত্তর খুঁজে পাননি। তিনি লিখেছেন, “উপাদানের অভাবের কারণে এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। ধারণা করা হয় যে, উলামা এবং সুফিরা সম্পূর্ণ সম্প্রীতির সাথে কাজ করেছিলেন। সমগ্র সুফি ঐতিহ্য সম্ভবত এর বিরুদ্ধে। উলামাদের সাথে সুফিদের সম্পর্কের ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা তৈরি করার আগে সুফি সাহিত্যের একটি নিবিড় পরীক্ষা করা প্রয়োজন”। অধ্যাপক কবীর এই সত্যটি সম্পর্কে ভালভাবেই অবগত যে, সুফি ঐতিহ্য সুফী এবং উলামাদের মধ্যে সুসংগত সম্পর্কের বিরুদ্ধে, কিন্তু প্রয়াত অধ্যাপক রহিমের বিপরীত মতামতে তিনি বিভ্রান্ত হয়েছেন। অধ্যাপক রহিম যখন এই সাধারণ বক্তব্য দেন, তখন তিনি সম্ভবত মনে করতে পারেননি যে, শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়াকেও সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের সভাপতিত্বে উলামাদের একটি সমাবেশে আগে সামা ও রাকসের আচরণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছিল।

এই প্রশ্নটি ইসলামী বিশ্বের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে দিল্লি সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রেও অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। দিল্লির ঐতিহাসিকরা উলামাদের দুটি দলে বিভক্ত করেছিলেন, উলামা-ই-আখিরাত এবং উলামা-ই-দুনিয়া। প্রাথমিক সুফিরা ছিলেন উলামা-ই-আখিরাতের অন্তর্ভুক্ত। সেই সময়ে, যারা শরিয়তে দক্ষ পণ্ডিত ছিলেন না, তারা সুফি তরিকার প্রতি দীক্ষিতও ছিলেন না, যেমন শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়া শেখ আখি সিরাজুদ্দীনকে খেলাফত প্রদানের আগে শরিয়তের শিক্ষা দিয়েছিলেন। উলামা-ই-আখিরাত উলামা-ই-দুনিয়া পছন্দ করতেন না, কারণ উলামা-ই-দুনিয়া শাসকদেরকে তাদের অধর্মীয় কার্যকলাপে সহায়তা করেছিলেন। বাংলায়, আমরা একজন শীর্ষস্থানীয় সুফি, শেখ মুজাফফর শামস বলখীর উলামা-ই-দুনিয়াকে অভিশাপ দেয়ার একটি উদাহরণ পাই। আবার এই প্রশ্নের উত্তর হতে পারে যে, সাধারণত সুফিদের এবং উলামাদের মধ্যে শত্রুতার কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু যখনই সুফিরা মনে করতেন যে, কিছু উলামা অন্যদের অধর্মীয় কার্যকলাপ করছেন বা করতে সাহায্য করছেন, তখন তারা নিজেদেরকে উলামাদের থেকে দূরে রাখতেন, বিপরীতে উলামারা চিশতিয়া সুফিদের সামা ও রাকস পছন্দ করতেন না, যা তারা শরিয়তের আদেশের বিরুদ্ধ বলে মনে করতেন।

পরবর্তী প্রশ্ন, অর্থাৎ জনগণের সাথে সুফিদের যোগাযোগের ভাষা সম্পর্কে, অধ্যাপক কবির কোনও উত্তর খুঁজে পাননি। সুফিদের কার্যকলাপ অভিজাত এবং জনসাধারণ উভয়ের জন্যই হতো, তাই তারা অবশ্যই সেইসব লোকের ভাষা শিখেছিলেন যাদের কাছে তারা তাদের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন। শেখ আবদুন নবীর দাদা শেখ আব্দুল কুদ্দুস অযোধ্যার উপভাষায় লিখেছিলেন, যে উপভাষায় তিনি ধর্মপ্রচার করেছিলেন। বাংলায়, অধ্যাপক কবির বর্ণিত সংস্কারবাদী সুফিদের যোগাযোগের ভাষা সম্পর্কে আমাদের কোনও ধারণা নেই। শেখ আঁখি সিরাজউদ্দিন একজন বাঙালি হিসেবে পরিচিত। প্রয়াত ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ একবার বলেছিলেন যে, তিনি শেখ আলাউল হকের রচিত কিছু বাংলা পদ আবিষ্কার করেছেন। শেখ আলাউল হক জন্মগতভাবে বাঙালি ছিলেন কি-না তা জানা যায়নি, যদি না হন তবে তিনি অবশ্যই তাঁর বাসস্থানের ভাষা শিখেছিলেন। বিশ্বাস করার কারণ আছে যে, শেখ নূর কুতুবুল আলম এবং তাঁর বংশধররা সকলেই জন্মগতভাবে বাঙালি ছিলেন। মধ্যযুগে মুসলিম পণ্ডিতদের দ্বারা রচিত বাংলা সাহিত্য এখনও যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এই বইগুলির বেশিরভাগের সারাংশ থেকে আমরা যতটুকু জানি, তা নিশ্চিত যে এগুলি পীরদের নির্দেশে লেখা হয়েছিল। যদি সঠিকভাবে পরীক্ষা করা হয়, তবে এগুলি থেকে সুফি শিক্ষার কিছু নমুনাও পাওয়া যেতে পারে। তবে এই বইগুলি খুব স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে যে পীররা মুসলিম ঐতিহ্যবাহী গল্প এবং শরিয়তের নীতি সম্পর্কে জনগণকে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোগী ছিলেন।

অধ্যাপক কবীরের উত্থাপিত এবং উত্তর দেওয়া শেষ প্রশ্নটি হল সাজ্জাদানশিনরা কখন ইনামদার বা জমিদার হয়ে ওঠেছিলেন। অধ্যাপক কবীর অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বলেন যে, এই উন্নয়ন ১৭ শতক থেকে শুরু হয়েছিল। সম্ভবত আমরা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারছি না। মুহাম্মদ বিন তুঘলক শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরির কাছ থেকে একটি দোয়া কামনার আবেদনপত্র পাঠিয়েছিলেন। সুলতান তার বিহারের গভর্নরকে একটি খানকা নির্মাণ এবং খানকা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য জমি বরাদ্দ করার জন্য একটি ফরমান জারি করেছিলেন। শেখ আবেদনপত্রটি গ্রহণ করেছিলেন কিন্তু জমি অনুদান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। নিজামুদ্দিন আহমেদ বখশী এবং ফিরিশতার কর্তৃত্বে আমরা জানি যে, আলাউদ্দিন হোসেন শাহ শেখ নূর কুতুবুল আলমের দরগা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কিছু গ্রাম মঞ্জুর করেছিলেন এবং তিনি প্রতি বছর দরগাটি পরিদর্শন করতেন। জমিটি শাস হাজারী অর্থাৎ ৬ হাজার টাকার জমি নামে পরিচিত। শেখ জালালউদ্দিন তাবরিজির বাইস হাজারী জমি লক্ষ্মণ সেন কর্তৃক মঞ্জুর করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। ১৬০৯ সালে ভ্রমণকারী আব্দুল লতিফ বাঘায় হাওদা মিয়ানের মসজিদ ও মাদ্রাসা সহ একটি দরগা কমপ্লেক্স দেখেছিলেন, যিনি ছিলেন মাওলানা শাহ দৌলার প্রপৌত্র। বাংলার তৎকালীন সুলতান মাওলানা শাহ দৌলাকে একটি জায়গায় বসবাসের প্রস্তাব দেন কিন্তু তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর সুলতান আউলিয়ার পুত্র হামিদ দানিশমান্দকে ২২টি গ্রাম প্রদান করেন। দানিশমান্দের পুত্র আব্দুল ওয়াহাবও জমি হিসেবে ৪২টি গ্রাম পান। এই অনুদানগুলি হাওদা মিয়ান উত্তরাধিকারসূত্রে পান; যেমন আব্দুল লতিফ বলেন, দরগার আশেপাশের পুরো গ্রাম ছিল হাওদা মিয়ানের মাদাদমাআশ সম্পত্তি। ১৬১২ সালে বাহারিস্তান-ই-গায়বী’র লেখক মির্জা নাথান যখন পান্ডুয়া সফর করেন, তখন তিনি শেখ মাসুদকে নূর কুতুবুল আলমের দরগার সাজ্জাদানশীন হিসেবে দেখেন। তখন তাকে সাহেবমাকাম বলা হতো। ১৫৮৫ সালে একজন মাখদুম শেখ সাহেবমাকাম ছিলেন, ১৫৭২ সালে শেখ বাবু মুহাম্মদ সাহেবমাকাম ছিলেন এবং ১৪৯৩ সালে শেখ মুহাম্মদ গাউস ছিলেন সাজ্জাদানশীন, তাকে খলিফা বলা হত। আমার মনে হয় খিলাফত পর্যায় ১৫ শতকে শেষ হয়ে যায় এবং ১৬ শতক থেকে সাহেবমাকাম বা সাজ্জাদানশীন বা গদিনশীন পর্যায় শুরু হয়। তবে এটি পান্ডুয়ার কুতুবি পরিবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আরও উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কারণ সৈয়দ, আলিম এবং শেখদের জমি প্রদান একটি খুব পুরানো প্রথা। বাংলায় জারি করা ফিরুজ শাহ তুঘলকের ঘোষণাপত্রে তিনি সাদাত, উলামা এবং মাশায়েখদের জমি, গ্রাম বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজি এই গোষ্ঠীগুলিকে উপবৃত্তি এবং পেনশন দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। তাই সাজ্জাদানশিনরাও মুঘল-পূর্ব যুগ থেকে ইনামদার বা জমিদার হয়ে ওঠেন।

শেষ করার আগে, বাংলায় সুফিবাদের গবেষণায় নতুন মাত্রা উন্মোচন এবং ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য অধ্যাপক কবীরকে আবারও ধন্যবাদ জানাই। যদি তিনি তাঁর উত্থাপিত সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারেন, তবে এর কারণ উৎস-উপাদানের অভাব। এই প্রবন্ধটি দ্বারা আমি অত্যন্ত উপকৃত হয়েছি, কারণ যেসব প্রশ্ন আগে আমার কাছে তদন্তের যোগ্য বলে মনে হয়নি, এখন সেগুলো খুব ভালো সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। আমি অধ্যাপক কবীরের বিবেচনার জন্য কিছু তথ্য দেয়ার চেষ্টা করেছি, এই আশায় যে, এগুলো ফলপ্রসূভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। আমি তাঁর সাথে সম্পূর্ণ একমত যে, বাংলায় সুফিবাদকে আরও ভালোভাবে এবং প্রকৃত দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বোঝার জন্য উৎস উপকরণগুলির অনুসন্ধান এবং পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।

***

মন্তব্য
আবু ইমাম 

জাহাঙ্গীনরগর বিশ্ববিদ্যালয়

এই মনোরম প্রবন্ধটি নিয়ে খুব বেশি মন্তব্য করার প্রয়োজন নেই। কারণ এটি নয় যে এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং লেখক তাঁর উদ্দেশ্য এত প্রশংসনীয়ভাবে হাসিল করেছেন যে মন্তব্য করা নিষ্প্রয়োজন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বাংলায় সুফিবাদের প্রশ্নে অর্থবহ এবং পদ্ধতিগত তদন্তের জন্য একটি ধারণাগত কাঠামো খুঁজে বের করা। ইটন অন্য প্রেক্ষাপটে সুফিবাদের জন্য একটি গবেষণাপত্র তৈরি করেছেন এবং অধ্যাপক কবীর বাংলার পরিস্থিতি বোঝার জন্য এটিকে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত প্রস্তাব করেছেন। এটি একটি ছোট প্রবন্ধ এবং লেখক বোধগম্যভাবে গভীরভাবে অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেননি এবং উত্থাপিত প্রশ্নগুলির বিভিন্ন দিকের প্রান্তরেখাগুলিকেই কেবল স্পর্শ করেছেন। কিন্তু এই সীমিত কাঠামোর মধ্যেও তিনি অনেক কার্যকরী পরামর্শ দিয়েছেন যা ভবিষ্যতের গবেষকরা লাভজনকভাবে গ্রহণ করতে পারেন। তিনি বাংলায় ধর্মান্তর প্রক্রিয়ায় সুফিদের ভূমিকার প্রশ্নটিও আলোচনা করেছেন। তবে অধ্যাপক কবীরের অভিমত যে, বাংলায় ইসলামের প্রসারে সুফিদের ভূমিকার গুরুত্ব সম্পর্কে বারবার উচ্চারিত দাবি পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।

এই প্রবন্ধের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো লেখক বিজাপুরের সাথে বাংলার সুফিবাদের তুলনামূলক অধ্যয়ন করেছেন। মধ্যযুগীয় বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের উপর অধ্যয়নের যে দুর্বলতা রয়েছে তা হলো বাংলায় প্রচলিত বিষয়গুলির সাথে উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের বিষয়গুলির তুলনা না করা, যার ফলে বাংলার ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের ধারণা দুঃখজনকভাবে অস্পষ্ট এবং অসম্পূর্ণ হয়ে পড়ে। মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসের যে বৈশিষ্ট্যগুলিকে আমরা সাধারণত খুব অনন্য বলে মনে করি, তা অন্যান্য অঞ্চলের তুলনামূলক অধ্যয়নের সময় এত অনন্য বলে মনে নাও হতে পারে।

আমরা আশা করতে পারি যে, ইটনের দেওয়া ধারণাগত কাঠামো এবং অধ্যাপক কবিরের আমাদের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতকৃত ধারণাগত কাঠামো ব্যবহার করে অনেক ফলপ্রসূ কাজ হবে। নিঃসন্দেহে এই ধরনের আলোচনা অনেক সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি দেয়।

 

 

[1] A. J. Arberry, Mysticism in the Cambridge History of Islam (CHI), Vol. II, 604 p.

[2] A. J. Arberry, An Introduction to the History of Sufism, Longmans, Green and Co, 44-5 p.

[3] Massignon, Essai as quoted to A. J. Arberry, op. cit, 368 p.

[4] Schacht and Bosworth, The Legacy of Islam, Second Edition, 1974, 368 p.

[5] Cambridge History of Islam, ibid, 605 p.

[6] R. A. Nicholson, Studies in Islamic Mysticism, Delhi, 1976-81, 77-142 p.

[7] Abdul Karim, Social History of the Muslims in Bengal, Asiatic Society of Pakistan, Dhaka, 1959

  1. A. Rahim, Social and Cultural History of Bengal, Karachi, 1963 and 1967
  2. R. Tarafdar, Husain Shahi Bengal, Asiatic Society of Pakistan, Dhaka, 1965

[8] A History of Sufism in Bengal, Asiatic Society of Bangladesh, Dhaka, 1975

বঙ্গে সুফী প্রভাব, কলিকাতা, ১৯৩৫

[9] Oxford University Press, Paper Back, 1973

[10] Princeton University Press, 1978

[11] R. M. Eaton, Sufis of Bijapur; Saiyid Athar Abbas Rizvi, A History of Sufism in India, New Delhi, 1978, 398 p.

[12] A History of Sufism in Bengal, ibid, 144 p.

[13] Husain Shahi Bengal, ibid, 169 p.

[14] আবদুল করিম, বাংলার ইতিহাস: সুলতানী আমল, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৭৭, ১৬৬-৮৭ পৃ.

[15] Social and Cultural History of Bengal, ibid, 133 p.

[16] আবদুল করিম, প্রাগুক্ত, ২০২ পৃ.

[17] Eaton, ibid, 157 p.

[18] M. R. Tarafdar, ibid, 198-225 p.

[19] M. A. Rahim, ibid, 119-20 p.