সম্পাদকের নোট:
আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগ থেকে ২০০৪ সালে প্রফেসর মানসুরা হুদার সম্পাদনায় Sufis, Sultans and Feudal orders : Professor Nurul Hasan Commemoration Volume নামক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। উক্ত গ্রন্থে সুফি, সুলতান, সামন্ততন্ত্র ও অন্যান্য বিষয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধের সংকলন করা হয়েছে। এই সংকলনে আলীগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের তৎকালীন লেকচারার মাকসুদ আহমদ খান’র Khankahs: Centers of Learning শিরোনামের একটি বৃহাদাকার প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। উক্ত সংকলনে আয়তন ও তথ্যসূত্রের দিক থেকে এই প্রবন্ধটি দ্বিতীয়।
সুফিধারার ইতিহাস, অনুশীলনের বাস্তবিক পদ্ধতি ও আইডিয়ায় খানকাহ একটি মৌলিক বিষয়। প্রাথমিক পর্যায়ের সুফি থেকে শুরু থেকে অদ্যাবধি সুফি মাত্রই কোনো না কোনো খানকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বিরাজমান। খানকাহ কেবল একটি স্থাপত্য নয়, বরং একটি আইডিয়ার সূতিকাগার। সুফিধারার ধর্মীয় আদর্শ, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ হয় খানকাহে এবং তা ছড়িয়েও পড়ে খানকাহ থেকেই। সুফিধারা, তরিকা, সিলসিলা কোনো কিছুরই বাস্তবায়ন সম্ভব নয়, খানকাহ ছাড়া। ফলত, সুফিধারার ইতিহাস জানতে হলে খানকার ইতিহাস জানতে হবে; সুফিদের আদর্শ সম্পর্কে জানতে হলে খানকার আইডিয়াকে বুঝতে হবে; সুফিদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে হলে খানকার কালচার বুঝতে হবে। সার্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় মাকসুদ আহমদ খানের এই প্রবন্ধটি বাংলায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের নিকট পেশ করা জরুরী মনে হয়েছে। খানকাহ বিষয়ে লিখতে গিয়ে এত এত কিতাবের নাম তিনি উল্লেখ করেছেন যা সুফিধারার পথিক, পাঠক, গবেষক নির্বিশেষে সকলকে উপকৃত করবে। প্রবন্ধটিকে ভারতীয় উপমহাদেশের সুফি কিতাবের সংক্ষিপ্ত একটি গ্রন্থপঞ্জি বললেও ভুল হবে না।
অনুবাদে অক্ষরের চেয়ে ভাবকেই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। পাঠকের যেভাবে বুঝতে সুবিধা হয় সেভাবেই কিতাবের নাম, লেখকের নাম ও অন্যান্য বিষয় সাজানো হয়েছে। নির্দিষ্ট সুফির ইন্তেকাল সময় বোঝাতে সর্বদাই (ই. ১৪৫৪) ব্যবহার করা হয়েছে ও খ্রিস্টাব্দ সাল বোঝানো হয়েছে। আশা করি, সুফিধারার পাঠক ও গবেষকদের জন্য এই প্রবন্ধটি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
***
খানকাহ: প্রভূত শিক্ষার কেন্দ্র
মাকসুদ আহমদ খান
প্রাথমিকভাবে, খানকাহ শব্দটি একটি ধর্মকেন্দ্রকে বোঝায়, যেখানে সুফিরা তাদের সময় এবং শক্তিকে মুরিদদের মোরাকাবা এবং অন্যান্য আধ্যাত্মিক শিক্ষা-প্রশিক্ষণে ব্যয় করতেন। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটি আরও বৃহত্তর পরিসর তৈরি করে। আধ্যাত্মিকতার কেন্দ্র হবার পাশাপাশি এটি মসজিদ, মক্তব, অভাবী, দরিদ্র, মুসাফিরদের জন্য আশ্রয়স্থল ও লঙ্গরখানা (বিনামূল্যে খাবার বিতরণ) হিসেবেও কাজ করত।[1] প্রকৃতপক্ষে, এই বহুমুখী প্রতিষ্ঠানটি দর্শনার্থীদের আধ্যাত্মিক চাহিদা মেটাতো এবং উচ্চতর শিক্ষা[2] ও চরিত্র গঠনের কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করত। এটি অনেক বিশিষ্ট পণ্ডিতের জন্ম দিয়েছে যাদের তাফসির, হাদিস, ফিকহ, মরমী সাহিত্য এবং উর্দু ও হিন্দির মতো স্থানীয় উপভাষার বিবর্তনে সন্দেহাতীত অবদান রয়েছে।
খানকাহতেই বিভিন্ন অঞ্চল ও তরিকা থেকে আগত সুফিরা একসাথে থাকার, জামাতে নামাজ পড়ার, একসাথে খাওয়ার, একে অপরের সাথে কথা বলার এবং কথোপকথনের সুযোগ পেতেন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ভ্রাতৃত্বের একটি সুস্থ পরিবেশের উত্থানে দুর্দান্ত প্রেরণা যুগিয়েছিল এবং পারস্পরিক সমস্যা ভাগ করে নেবার মনোভাবকে উৎসাহিত করেছিল, যার ফলে বৃহত্তর মানুষের প্রতি তাঁদের আবেগ, উদ্বেগের অনুভূতি জাগ্রত হয়েছিল। এভাবেই খানকাহ মানবিক সেবার জন্য একটি শক্তিশালী প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। খানকাহ কেবল ধর্মীয় মাদ্রাসা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাই পালন করেনি, বরং ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং স্থানীয় ভাষা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলো।
জ্ঞান: একজন সুফির আবশ্যকীয় যোগ্যতা
জ্ঞান (ইলম) একজন সুফির মৌলিক যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত। বেশিরভাগ বিশিষ্ট সুফি তাদের মুরিদদের মুরিদ হিসেবে গ্রহণের পূর্বে কোনো শায়খের অধীনে জ্ঞান অর্জন করার নির্দেশনা প্রদান করতেন। শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির মতে,
“পূর্ববর্তীকালের সাধকরা অন্য যে-কোনো কাজের চেয়ে জ্ঞান অর্জনে বেশি ব্যস্ত থাকতেন, কারণ ইবাদত জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। যদি একজন খোদাপ্রেমী মানুষ সাত আসমান ও জমিনের ফেরেশতাদের মতো ভক্তি সহকারে আল্লাহর ইবাদত করে, কিন্তু যদি জ্ঞানের অভাব থাকে, তাহলে সে কিছুই অর্জন করতে পারবে না।”[3] এই কারণেই সুফিরা বিশ্বাস করতে করেছিলেন যে, “কোনও নিরক্ষর ব্যক্তি সুফি হতে পারে না।”[4]
যখন শেখ ফরিদউদ্দিন গঞ্জে শাকার (ই. ১২৬৭) খাজা কুতুবুদ্দীন বখতিয়ার কাকির (ই. ১২৩৫) সাথে যোগদানের জন্য তাঁর পড়াশোনা ছেড়ে দিতে চেয়েছিলেন, তখন খাজা শেখকে পড়াশোনা শেষ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। খাজার মতে, “একজন নিরক্ষর অলী শয়তানের শিকারে পরিণত হন।”[5]
ইতিহাসের বিখ্যাত শায়খদের পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞান সন্দেহাতীত। উদাহরণস্বরূপ, শায়খ বদরুদ্দীন ইসহাক (ই. ১২৭১) তাঁর শিক্ষাজীবনের সময় কিছু সমস্যার সম্মুখীন হন, যা তিনি তাঁর সর্বোত্তম প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সমাধান করতে পারেননি এবং দিল্লির পণ্ডিতরাও এই বিষয়ে তাঁকে সন্তুষ্ট করতে ব্যর্থ হন। তাই তিনি বুখারার পণ্ডিতদের সাথে তাঁর সমস্যাগুলো শেয়ার করার সিদ্ধান্ত নেন। বুখারা যাওয়ার পথে তিনি অযোধ্যায় শেখ ফরিদউদ্দিন গঞ্জে শাকারের সাথে দেখা করেন। শেখ ফরিদউদ্দিন, যিনি পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞানের জন্য অত্যন্ত বিখ্যাত ছিলেন, তিনি বদরুদ্দীন ইসহাকের জ্ঞানগত সকল সমস্যার সমাধান করেছিলেন। বদরুদ্দীন ইসহাক তৎক্ষণাৎ শেখ ফরিদউদ্দিনের কাফেলায় যোগ দেন এবং তাঁর মুরিদ হন।[6]
এটি কেবল একজন বিশিষ্ট সুফির ক্ষেত্রেই ঘটেনি, বরং সাধারণত সুফিরা সর্বদাই এটা দেখতে আগ্রহী ছিলেন যে, তাঁদের নিযুক্ত খলিফাগণ যেন মৌলিক সকল যোগ্যতার অধিকারী হন। উদাহরণস্বরূপ, শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়া শেখ সিরাজউদ্দিন উসমানকে খেলাফতনামা প্রদানের সময় বলেছিলেন, ‘শিক্ষা এই কাজের (সুফিবাদ) প্রথম স্তর, কিন্তু তিনি (শায়খ আঁখি সিরাজ) কোনও শিক্ষা গ্রহণ করেননি।’ অতঃপর শেখ আঁখি মাওলানা ফখরুদ্দিন জারায়েদের কাছে থেকে পড়াশোনা করেছেন এবং কাফিয়া, মুফাসসাল, কুদুরী, মাজমা আল বাহরাইন’র মতো মৌলিক সকল প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করেছেন।
এই কারণেই জামাত-খানার সঙ্গে যুক্ত শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বেশিরভাগ মুরিদ ছিলেন পণ্ডিত এবং ইসলামী শিক্ষার কোন না কোন শাখায় তাদের একাডেমিক খ্যাতি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল: মাওলানা শামসুদ্দিন ইয়াহিয়া উসূল (আইনশাস্ত্রের মূলনীতি), ফিকহ (আইন) এবং ভাষাবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মাওলানা ওয়াজিহুদ্দিন পাইলি ফিকহ শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। মাওলানা হুসামুদ্দিন মুলতানি হিদায়ার অনেকাংশ মুখস্থ করেছিলেন। এছাড়াও, তিনি কুওয়াতুল কুলুব এবং ইয়াইইয়া উল উলুম’র বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। জামাল কিওয়ামুদ্দিন বলেন যে, দিল্লিতে পাণ্ডিত্যের ক্ষেত্রে তাঁর কোনও সমকক্ষ ছিল না[7]; শেখ নাসির তাঁর কাছ থেকে বহির্বিজ্ঞান বিষয়ক শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহিয়া আল মানেরি তাঁর বাবার তত্ত্বাবধানে মানেরে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি মিফতাহ উল লুগাত এর অধ্যায়সহ বেশ কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করেছিলেন। তবে তিনি মাওলানা শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশের সোনারগাঁয়ে[8] তাঁর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন।
শেখ বদিউদ্দিন মাদার হাজিফা শামির তত্ত্বাবধানে শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করেন। তিনি তাওরাত এবং বাইবেল মুখস্থ করেন। এছাড়াও তিনি সিমিয়া, কিমিয়া, হিমিয়া, রিমিয়া (রসায়ন, প্রাকৃতিক জাদু ইত্যাদি) আয়ত্ত করেছিলেন। সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী (ই. ১৪০৬) স্বীকার করেছিলেন যে, তাঁর সময়ে শাহ মাদার ছাড়া অন্য কোনও সাধক সিমিয়া ও রিমিয়ায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারেননি।
এই প্রসঙ্গে আমরা শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির উদাহরণ তুলে ধরতে পারি যিনি জ্ঞান অর্জনের উপর অনেক জোর দিয়েছিলেন এবং চৌসার তাঁর শিষ্য কাজী শামসুদ্দিনকে লেখা চিঠিতে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, “জ্ঞান অর্জনে তোমাদের দিনরাত পরিশ্রম করা উচিত। তোমাদের সমস্ত প্রশান্তি, বিশ্রাম, ঘুম এবং খাওয়া একপাশে রাখা উচিত। কারণ জ্ঞান হল কার্যক্রমের জন্য, অর্থাৎ আত্মসংযমের সাথে সংগ্রাম, যেমন পবিত্রতা হল ইবাদতের জন্য।”
খানকাহে শিশুর প্রাথমিক শিক্ষা
যদিও সুফিরা তাদের সময়ে কোনও আনুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রদান করেননি তবুও শায়খের খলিফা বা মুরিদের অনুরোধে খানকাহগুলোতে প্রায়শই তাসমিয়াখানি বা বিসমিল্লাহ’র আয়োজন করা হত। যখন কোনও শিশুল চার বছর, চার মাস এবং চার দিন পূর্ণ হতো, তখন তাকে সাধারণত তাসমিয়াখানি পাঠের জন্য খানকাতে নিয়ে আসা হত।
১১ই মুহররম, ৭১৬ হিজরি মোতাবেক ১৩১৬ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত এমন একটি ঘটনা ফাওয়ায়েদ উল ফুয়াদ-এ লিপিবদ্ধ আছে। আমির হাসান সিজ্জি একটি ছোট ছেলেকে শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার খানকাহে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং কোরআন অধ্যয়ন শুরু করার আগে তাঁর দোয়া চেয়েছিলেন। শেখ বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম পাঠ করলেন এবং তারপর আরবি বর্ণমালা লিখেছিলেন।[9]
মাদিন উ’ও মা’আনি মধ্যযুগীয় ইসলামী শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে একটি অনুষ্ঠানের চিত্র তুলে ধরেছেন। কাজী আশরাফউদ্দিন তাঁর বোনের ছেলেকে নিয়ে এসে সুফিকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তিনি বাচ্চাটিকে পড়ার নির্দেশ দেন এবং লেখার বোর্ডে নিজের হাতে (তাখতাহ-ই-তালিমাত) কিছু লিখে দেন। সুফি বর্ণমালার প্রথম চারটি অক্ষর লিখে দেন। তারপর তিনি ছেলেটিকে বিসমিল্লাহ উচ্চারণ করতে বলেন এবং পরে তাঁকে সুফির উচ্চারিত চারটি বর্ণমালা পুনরাবৃত্তি করতে বলা হয়। তারপর সুফি তাকে আশীর্বাদ করেন। এরপর সুফি নিজেই ছেলেটিকে এক টুকরো কেক এবং মিষ্টি খাওয়ান; বাকি অংশ উপস্থিত অন্যান্যদের মাঝে বিতরণ করা হয়। তালিমে কোরান ছিল পরবর্তী ধাপের বিষয়। প্রাথমিক স্তরে পড়ানো বিষয়গুলির বিষয়ে, দরবেশ বলেছিলেন যে, তিনি তাঁর কৈশোরে শেখা কিছু বইয়ের বিষয়বস্তু হালকা মনে করতে পারেন। যেমন মাসাদির (উৎস বা ব্যাকরণ) এবং মিফতাহ উল লুগাত (অভিধান) এর উপর লেখা, যার প্রথম খণ্ডটি তাঁকে মুখস্থ করতে হয়েছিল এবং মাঝে মাঝে মুখস্থ করার প্রতিশ্রুত অংশগুলো পুনরাবৃত্তি করতে হয়েছিল।[10]
গঞ্জ-ই-রশিদী আরও উল্লেখ করেছেন যে, জৈনপুরের রশিদিয়া খানকাহে মক্তবের অনুষ্ঠান শুরু হত বিসমিল্লাহ দিয়ে যা লেখা হতো এবং পুনরাবৃত্তি করতে হতো। এরপর শিক্ষক কর্তৃক লিখিত আরবি বর্ণমালার কিছু অক্ষর পাঠ করা হত এবং এগুলি সাধারণত ৫ বা ৬ বছর বয়সী শিশুকে আবৃত্তি করতে হত। মিষ্টি বিতরণ করা হত এবং বাচ্চার কল্যাণের জন্য দোয়া করা হত। এমনকি যখন দিওয়ান রশিদ শয্যাশায়ী ছিলেন এবং মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে ছিলেন, তখনও যখন তাকে বলা হয়েছিল যে রশিদ খান নামে এক ব্যক্তি তার মেয়েকে বিসমিল্লাহ এবং হারফ-ই-তাহাজ্জি (বর্ণমালা) শেখানোর জন্য নিয়ে এসেছেন, তখন তিনি কোনও অজুহাত দেখাননি। বর্ণমালার অক্ষরগুলি কাগজের টুকরোতে বা তখতি নামক কাঠের ফলকে লেখা হত। আরশাদ নিজেই তাঁর পুত্র এবং উত্তরসূরী, গঞ্জ-ই-রশিদীর সংকলক গোলাম রশিদের মক্তবে দীক্ষা দেন এবং তারপর মুহাম্মদ আনোয়ার বাঙালি এবং অন্যান্যদের হাতে কুরআনের বিভিন্ন অংশ তেলাওয়াত এবং তাকরার (পুনরাবৃত্তি) করার জন্য তাকে সাহায্য করার দায়িত্ব দেন।[11]
খানকায় আগত দর্শনার্থীরা
সুফি সাধকের ব্যক্তিত্ব যখন বিভিন্ন গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদার মানুষকে কোনও বৈষম্য ছাড়াই আকৃষ্ট করে, তখন খানকাহ সাংস্কৃতিক মিলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এই দর্শনার্থীরা কেবল ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নয়, বিদেশ থেকেও এসেছিলেন। এখানে তারা সকলেই শেখের সাথে তাদের ব্যক্তিগত, ধর্মীয় এবং শিক্ষাগত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার একটি সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন। এভাবে, খানকাহ আধুনিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। শেখ আবদুর রশিদ ঠিকই বলেছেন যে, “অন্যান্য সূত্র থেকে আমরা জানতে পারি যে, শেখ (নিজামুদ্দিন আউলিয়া) এর জামাতখানা সর্বদা দর্শনার্থীদের দ্বারা পরিপূর্ণ থাকত যাদেরকে এককভাবে বা দলবদ্ধভাবে ছাদে তাঁর কক্ষে নিয়ে যাওয়া হত। সাক্ষাতের সময় ছিল সূর্যোদয় থেকে দুপুর পর্যন্ত এবং বিকেল ও সন্ধ্যায়। ফাওয়ায়েদ উল ফুয়াদে লিপিবদ্ধ শেখের কথোপকথনগুলি বিভিন্ন ধরণের বিষয় নিয়ে বিস্তৃত ছিল। কিন্তু একজন চিশতী মরমীর খানকাহে শাসক রাজার কথা উল্লেখ করা যথাযথ বলে বিবেচিত হত না এবং ফাওয়ায়েদ উল ফুয়াদে সম্রাট আলাউদ্দিন খিলজি এবং তার কর্মকর্তাদের সম্পর্কে কোনও উল্লেখ করেননি। একজন শেখের কর্তব্য ছিল পথপ্রদর্শন করা, রহস্যময় বিষয়সমূহ ব্যাখ্যা করা, জীবনযাপনের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা। শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়া রাতে খুব কম ঘুমাতেন এবং অনিদ্রার কারণে তার চোখ প্রায়শই লাল হয়ে যেত। কিন্তু তিনি একজন অনুপ্রেরণাদায়ক আলাপকারী (মোটিভেশনাল স্পিকার) ছিলেন এবং তাঁকে মানুষের অব্যক্ত চিন্তা-ভাবনা নিয়ে আলাপ করতে হতো।[12]
একইভাবে, শেখ শরাফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির খানকাহ ভারতীয় ও বিদেশের লোকেরা পরিদর্শন করতেন।[13] জনৈক শামুদ্দিন খোয়ারিজম থেকে এসেছিলেন, যিনি খানকাহে কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন বলে জানা যায় এবং শেখ শরফুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে আদাবুল মুরিদিন’র দরস গ্রহণ করেছিলেন। খাজা মামুন এবং আফগানিস্তানের মুলতানের দরবেশ হাফিজ জালালউদ্দিন খানকাহে শায়খের দরসে যোগ দিয়েছিলেন এবং সুফি কাব্য এবং রক্তধারার মতো রহস্যময় বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। বুখারার একজন ভ্রমণকারী শায়খের ব্যক্তিত্বে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি তাঁর মুরিদ হয়েছিলেন এবং একটি টুপি উপহার পেয়েছিলেন।
খানকার শিক্ষা এবং নির্ধারিত গ্রন্থাবলী
সর্বোপরি খানকাহ ছিল একটি ধর্মীয় আলোচনা এবং একাডেমিক শিক্ষাকেন্দ্র যেখানে ধর্মীয় বিজ্ঞান অধ্যয়ন, শিক্ষা এবং আলাপ আলোচনা করা হতো। পবিত্র কুরআন, তাফসীর, হাদিস, সুফিবাদ সম্পর্কিত গ্রন্থাবলী ইত্যাদির জ্ঞান বিস্তারে খানকাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এখানে খানকাহগুলিতে অধ্যয়নের জন্য নির্ধারিত বইয়ের ধরণ এবং মান মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা বিশিষ্ট সুফিদের তিনটি জনপ্রিয় এবং উল্লেখযোগ্য মালফুজাত সাবধানতার সাথে বিশ্লেষণ করেছি। যেমন: শেখ হামিদুদ্দীন সুফি সাওলি নাগৌরীর (ই. ১২৭৪) সুলতানুত তারিকীন; শেখ শরফুদ্দীন ইয়াহইয়া আল মানেরীর মাদীন আল মাআনী এবং নিজামুদ্দীন আউলিয়ার ফাউয়ায়েদুল ফুয়াদ।
শেখ হামিদুদ্দিন সুফি সাওলি নাগৌরীর সঠিক জ্ঞান অর্জনের উপর জোর দেয়ার কারণে নাগৌরের খানকাহ শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলো। খানকাহতে যে-সকল কিতাব নিয়ে আলোচনা করা হতো সেগুলো সর্বদা উচ্চমানের এবং বিজ্ঞ পণ্ডিতদের দ্বারা লিখিত ছিল। সূরুরুস সুদুরে লিপিবদ্ধ খানকাহতে আলোচিত কিছু কিতাবের নাম: তাফসির-ই-মাদারিক, তাফসির-ই-হকাইক; তাফসির-ই-মাকাতিল, তাফসির-ই-জাইদী, তাফসির-ই-ইমাম নাসিরি, নাহজুল বালাগাহ, কিতাব-ই-ফায়িক, মাকামাত-ই-শাইখ আবু সাঈদ আবুল খায়ের; কিমিয়া-ই-সাআদাত, মিসবাহ উল দুজা; মাশারিকুল আনোয়ার, তাফসীর-ই-কাশশাফ, কুওয়াতুল কুলুব, ফুসুসুল হিকাম, কুদুরী, সাইরুল মুলিক, কিতাব আখবার উল সামার, তারুফ আযহাব-ই-আহল-ই-তাসাউউফ।
শায়খ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার জামাত-খানায় যে বইগুলি পড়ানো হতো ও আলোচনা করা হতো: ইমাম গাজ্জালির ইয়াহইয়া উল উলুম এবং কিমিয়া-ই-সাআদাত, এজাজ উল বায়ান, কুওয়াতুল কুলুব, শায়খ আলী হুজবীরীর কাশফুল মাহজুব, কাজী হামিদুদ্দীন নাগৌরীর লাওয়াইহ ওয়া লাওয়ামাহ; মাশারিকুল আনোয়ার, মাকতুবাত-ই আইনুল কুজাত হামদানী, বাজদাওয়ী, মাজমায়ুল বাহরাইন, রুহুল আরওয়াহ, তাফসির-ই ইমাম নাসিরী, উমদা, আওয়ারিফুল মাআরিফ, হিদায়া ইত্যাদি।
শায়খ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সবচেয়ে প্রিয় কিতাব ছিল কাশশাফ এবং তাফসির-ই-ইমাম নাসিরি। তিনি পবিত্র কুরআন, মাশারিকুল আনোয়ার এবং মাকামাত-ই-হারিরী মুখস্থ করেছিলেন।
শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির খানকাহে আলোচিত কিতাবগুলোও ছিল উচ্চমানের। নিম্নে কয়েকটি কিতাবের তালিকা দেয়া হল: শায়খ নজিবুদ্দীন আবুল কাহির সোহরাওয়ার্দীর আদাবুল মুরিদিন, শায়খ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর আওয়ারিফুল মাআরিফ, আকাইদ-ই-নাসাফী, কুওয়াতুল কুলুব, হিদায়া, কাশশাফ; বাজদাওয়ি; কুদুরী, তাফসির-ই-ইমাম জাহিদী, বুরহান, তাহমিদাদ; মাকতুবাত-ই-আইনুল কুজাত; আইনুল কুইযাতের জুবদাহ, মাশারিকুল আনোয়ার, তামহিদাত-ই-আবু শাহ উস সালুমি, রওজাতুল উলামা, কালাবাজীর শরাহ-ই-তাররুফ; সিরাজুল আরিফিন, তারগিনুস সালওয়াত।
ইমাম গাজ্জালীর কিমিয়া-ই-সাআদাত শেখ হামিদুদ্দিন সুফি নাগৌরী কর্তৃক জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর মালফুজাতে শেখ তাঁর শিষ্যদের উপদেশ দিতেন: ‘বাবা! এই কিতাবটি সর্বদা আপনার সামনে রাখুন।’ নাগৌরের খানকাহে প্রতিদিন এই কিতাবের কিছু না কিছু অংশ পাঠ করা হতোই।
শেখ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর আওয়ারিফুল মাআরিফ তাদের সকলের জন্য একটি দিকনির্দেশক কিতাব হয়ে উঠেছিল যারা কোনও সিলসিলা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বা সুফিদেরকে সংগঠিত করেছিলেন। শেখ আব্দুর রশিদ বলেন যে, শেখ শিহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর আওয়ারিফুল মাআরিফ সুলতানি আমলে সর্বভারতীয় মরমীবাদীদের, সুফিধারার স্বীকৃত পাঠ্যপুস্তক হয়ে ওঠে। শেখ ফরিদউদ্দিন গঞ্জে শাকার তাঁর শিষ্যদের এটি পড়াতেন এবং নিজামুদ্দীন আউলিয়া কর্তৃক সিয়ারুল আউলিয়ার নির্দিষ্ট অংশের পাঠ প্রদান করেন। এই সনদপত্র (অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে) শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়াকে আওয়ারিফের সেই বিষয়গুলো শেখানোর জন্য অনুমোদন দিয়েছিলো যা তিনি তাঁর মুর্শিদের নিকট অধ্যয়ন করেছিলেন। সাধারণভাবে বলতে গেলে, ভারতে মধ্যযুগীয় মুসলিম চিন্তাধারায় আওয়ারিফের নীতিগুলি বারংবার চর্চিত হতে থাকে এবং তাঁর প্রতিফলন নিশ্চিত করে।
শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরি তাঁর শিষ্যদের আওয়ারিফুল মাআরিফ পড়াতেন। উদাহরণস্বরূপ, শেখ হুসেন মুইজ বলখী (ই. ১৪৪০), যিনি নওশ তৌহিদ বলখী নামে পরিচিত, তিনি শেখ শরফুদ্দিন মানেরির তত্ত্বাবধানে আওয়ারিফুল মাআরিফ পড়া শুরু করেন। কিন্তু শায়খের ইন্তেকালের পর তিনি জৈনপুরে শাহ মাদারের তত্ত্বাবধানে কিতাবটির পাঠ সম্পূর্ণ করেন।
সুফিদের শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ
উপরে উল্লিখিত আলোচনা থেকে মনে হয় যে, খানকাহের সুফিরা এবং তাদের খলিফা, মুরিদরা কখনোই কেবল সুফি সাহিত্য অধ্যয়নের মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেননি। আরও নানাবিধ জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাদের উৎসাহ এবং ভালোবাসা তাদেরকে তাফসীর (কোরানের ব্যাখ্যা), হাদিস, সরফ (আরবি ব্যাকরণ), নাহু (ব্যাকরণ এবং বাক্য গঠন), ফিকহ (আইনশাস্ত্র), উসূলে ফিকহ (আইনশাস্ত্রের নীতিমালা), কালাম (উপভাষা), মানতিক (যুক্তিবিদ্যা) অধ্যয়নের জন্য উদারমনা করে তুলেছিল। এছাড়াও, সুফিরা এবং তাদের শিষ্যরা তাদের দৈনন্দিন কথোপকথনে স্থানীয় উপভাষা ব্যবহার করে আঞ্চলিক ভাষা প্রচার করেছিলেন।
দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জনের পর অধিকাংশ সুফি স্বেচ্ছায় শিক্ষকতা পেশাকে পছন্দ করতেন। রাষ্ট্রীয় কোনও লাভজনক পদ, মর্যাদা এবং পারিশ্রমিকের লোভ ছাড়াই বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করতেন এবং এভাবে তারা তাদের খানকাহকে শিক্ষার কেন্দ্রে পরিণত করতেন।
শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বেশিরভাগ জ্ঞানী শিষ্য বক্তৃতা দিতেন। উদাহরণস্বরূপ, মাওলানা শামসুদ্দিন ইয়াহিয়া কাশশাফের উপর; হিদায়ার উপর মাওলানা ফখরুদ্দিন জারাদি; মাওলানা আলাউদ্দিন নীলিও কাশশাফের উপর একজন শক্তিশালী বক্তা ছিলেন। ইবনে বতুতা তার বক্তৃতায় একজন ব্যক্তিকে আবেগের দ্বারা এতটাই অভিভূত হতে দেখেছিলেন যে ব্যক্তিটি মারা যান।[14] মাওলানা ফাসিহউদ্দিন সুলতান গিয়াসউদ্দিন মালিকের পুত্রদের শিক্ষা প্রদান করতেন।
শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার খলিফা এবং শেখ মুহাম্মদের শিষ্য মাওলানা জালালউদ্দিন মানিকপুরী চাশতের (দুপুরের নামাজ) পর ছাত্রদের ধর্মতত্ত্বের বিভিন্ন বিষয় পড়াতেন। শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সমসাময়িক শেখ খিজির বিহারে একটি খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন এবং খাজা খিজিরের পুত্র এবং অনুগতদের জ্ঞান প্রদানে তাঁর সময় ব্যয় করেন। শেখ জালালউদ্দিন বুখারী শেখ রুকনুদ্দিন আবুল ফাতেহের খানকাহে জ্ঞান অর্জনের জন্য মুলতানে গিয়েছিলেন।[15] শায়খ নাজামুদ্দিন সৈয়দ জালালুদ্দিন মখদুম-ই-জাহানিয়ানের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন। সৈয়দ কিওয়ামুদ্দিন মুহাম্মদ হাসান গজনবী আল-হুসাইনির খলিফা শেখ আলাউদ্দিন হোসেন জেওয়ারী (ই. ১৩১০) ছিলেন প্রথম জুনাইদিয়া তরিকার সুফি সাধক যিনি দিল্লিতে আগমন করেন। পরবর্তীতে তিনি ১৩২৯ খ্রিস্টাব্দে দৌলতাবাদে হিজরত করেন এবং ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি হিদায়া, বাজদাবী, মিফতাহ এবং কাশশাফের উপর বক্তৃতা দেন এবং দাক্ষিণাত্যে অনেক সুনাম ও খ্যাতি অর্জন করেন।[16] আব্দুল মজিদের পুত্র এবং আবদুর শাকুরের নাতি শেখ মুনাওয়ার ৪৪ বছর শিক্ষকতা পেশায় অতিবাহিত করেছিলেন। মান্ডুর শেখ বাহাউদ্দিন আনসারীর শিষ্য শেখ জালাল মুহাম্মদ কাদিরি (ই. ১৫২১), বুরহানপুরে বসতি স্থাপন করেন যেখানে তিনি একটি খানকাহ নির্মাণ করেছিলেন এবং মানুষকে শিক্ষা প্রদানের জন্য তাঁর যাবতীয় সময় ও শক্তি উৎসর্গ করেছিলেন।
মোল্লা আব্দুল কাদির বাদাউনির মতে, ‘যখন আমি ১৫৫৩ সালে, তখন আমার বয়স ছিল ১২, আমার বাবার সাথে সম্ভালে পৌঁছাই এবং সেখানে মিয়া হাতিমের চাকরিতে যোগদান করি। তখন আমি তাঁর খানকাহে কাসিদা-ই বুরদা মুখস্থ করেছিলাম।’ এ থেকে বোঝা যায় যে, বাদাউনি কিছুদিন মিয়া হাতিমের খানকাহে কাসিদা-ই বুরদা এবং কানয-ই-ফিকহ-ই হানাফী শিখেছিলেন।
শেখ হামিদ চিশতির পুত্র শাহ ফখরুদ্দিনের শিষ্য শেখ দানিশমন্দ, লক্ষ্ণৌয়ের বাসিন্দা ছিলেন কিন্তু তিনি মান্ডুতে বসতি স্থাপন করেছিলেন। প্রায় ৫০ বছর ধরে তিনি তাঁর ছাত্রদের সকল ধরণের জ্ঞান প্রদানে তাঁর সময় এবং শক্তি ব্যয় করেছিলেন।
শেখ নাসরুল্লাহ আলাউয়ের পুত্র এবং শেখ মুহাম্মদ গাউস গোয়ালিওরির শিষ্য শেখ ওয়াজিহুদ্দীন আহমদ আলাউই আহমেদাবাদে ৬০ বছর ধরে জ্ঞান বিতরণে তাঁর সময় এবং শক্তি ব্যয় করেছিলেন।
কাজী আবদুল মুক্তাদির (ই. ১৩৮৮), শেখ নাসিরুদ্দিন মাহমুদ চিরাগ-ই দেহলভীর অন্যতম খলিফা, তাঁর ছাত্রদের পাঠদানের জন্য তাঁর সবচেয়ে মূল্যবান সময়গুলো ব্যয় করেছিলেন।
শেখ লশকর মুহাম্মদ আরিফের শিষ্য কাজী মাহমুদ মোরপি (গুজরাটের একটি গ্রাম), একজন বিদ্বান পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন, যার অধীনে আদিলপুরের (বুরহানপুর) শিক্ষক হাকিম উসমান ববকানি এবং মাওলানা মুসা ববকানি আরবি ও নাহু বিষয়ে তাঁদের পড়াশোনা সম্পন্ন করেছিলেন।
শায়খ হাসান মুহাম্মদ[17] (ই. ১৫৭৪), শেখ জামাল চিশতির শিষ্য, যার দৈনন্দিন রুটিন ছিল ফজরের নামাজের পর থেকে যোহর পর্যন্ত তাঁর খানকাহে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা প্রদানের মাধ্যমে সময় ব্যয় করা।
পাত্তান (গুজরাট) এর শায়খ মুহাম্মাদ বিন তাহির (ই. ১৫৭৮), বোহরা তরিকার একজন সুফি এবং মোহাদ্দিস যিনি বেশ কয়েকটি কিতাব লিখেছেন এবং হাদিস শিক্ষা দিয়েছেন।
শেখ মুহাম্মদ মুতানির শিষ্য সৈয়দ রাজি মুহাম্মদ আইনী (ই. ১৫৭৪), উজ্জয়িনীতে বসতি স্থাপন করেন এবং একটি খানকাহ নির্মাণ করেন। অতঃপর ৫০ বছর ধরে তাঁর ছাত্রদের উদ্দেশ্যে শিক্ষাদান ও বক্তৃতা প্রদানে নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন।
আমেথির শায়খ নিজামুদ্দিন, শায়খ মারুফের শিষ্য, তাঁর শিষ্যদেরকে ইমাম গাজ্জালীর ইয়াহইয়াউল উলুম, শায়খ আবু নাজিব কাহির সোহরাওয়ার্দীর আদাবুল মুরিদিন, শায়খ শিহাবুদ্দিন সোহরাওয়ার্দীর আওয়ারিফুল মা’আরিফ এবং ইমাম কুতুবুদ্দিনের রিসালা-ই মাক্কিয় পড়ার নির্দেশ দেন।
শেখ হামজা (ই. ১৫৫০), ধরসাউতে (হরিয়ানার একটি শহর) বসতি স্থাপন করেন। তিনি দুজন শিক্ষক নিয়োগ করেন, একজন আরবি এবং অন্যজন ফারসি ভাষা শেখানোর জন্য। এমন ছাত্রদেরকে যারা অভিজাত বংশোদ্ভূত সন্তান কিন্তু তাঁদের বাবা-মা এতটাই দরিদ্র ছিলেন যে সন্তানদের শিক্ষার খরচ বহন করতে পারতেন না। শেখ আবদুল আজিজের খলিফা শেখ ছৈন লাদ্দা[18] ফুসুসুল হিকাম এবং এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে ছাত্র ও সুফিদের সামনে বক্তৃতা প্রদান করেন।
কাজী মুহাম্মদের পুত্র ও শিষ্য কাজী ইব্রাহিম, কালপি (ইউপি) এর একটি কাসবা পানওয়ারিতে বসতি স্থাপন করেন। তিনি বছরের পর বছর ধরে শিক্ষকতায় ব্যস্ত ছিলেন এবং তাঁর ইলম দ্বারা বহুজনের উপকার করেছিলেন।
দূরবর্তী শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে খানকাহ
সুফিদের খানকাহে গৃহীত শিক্ষা পদ্ধতি পরোক্ষভাবে ‘দূরবর্তী শিক্ষা’ আইডিয়ার পথ প্রশস্ত করে, যা আধুনিককালে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎস হয়ে ওঠে।
শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরি সম্পর্কে ড. আতা করিম বার্ক বলেন, ‘তিনি (মানেরি) তাঁর শিষ্যদের শিক্ষিত ও প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। এই লক্ষ্যে তিনি খানকাহে দুটি পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন। প্রথম পদ্ধতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ এতে সম্পূর্ণরূপে তাঁর মালফুজাতের উপর ভিত্তি করে সরাসরি শিক্ষাদান পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্বিতীয় পদ্ধতিতে মূলত তাঁর মকতুবাতের উপর ভিত্তি করে একটি চিঠিপত্রের কোর্স অন্তর্ভুক্ত ছিল যার উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাদান।’
শেখ আবদুর রশিদ লিখেছেন, মাকতুবাত একটি জনপ্রিয় ধারার রচনা যা রহস্যপ্রিয় বুদ্ধিজীবীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এটি এমন ব্যক্তিদের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠির আকারে তৈরি করা হয়েছে যাদের নাম দেয়া হয়েছে কিন্তু তাঁরা অন্য কোনও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নন। প্রতিটি চিঠি একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের প্রতি নিবেদিত, যেমন একত্ববাদে বিশ্বাস, অনুতাপ, দোয়া, রোজা, আত্মসংযম ইত্যাদি। ভাষা সহজ এবং লেখক যতটা সম্ভব স্পষ্টভাবে নিজেকে তুলে ধরেছেন। শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির মকতুবাতের পাণ্ডুলিপি ভারতে পাওয়া সহজ, তবে এতে থাকা অধ্যায়ের সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। স্পষ্টতই অর্থনীতির উদ্দেশ্য থেকে, যারা বইটি অনুলিপি করেছিলেন তারা তাদের প্রিয় বিষয়ের অধ্যায়গুলো বেছে নিয়েছিলেন এবং অন্যগুলিকে উপেক্ষা করেছিলেন।
সুফিদের মধ্যে চিঠি লেখার সূচনা হয়েছিল চিশতী দরবেশদের মাধ্যমে। এই প্রসঙ্গে আবদুর রশিদ মন্তব্য করেন যে, ‘শেখ মুইনুদ্দিন চিশতী আজমেরীর শিষ্য শেখ হামিদুদ্দিন সাওয়ালী ভারতে সোহরাওয়ার্দী সিলসিলার প্রতিষ্ঠাতা শেখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়াকে একাধিক চিঠি লিখেছিলেন। তিনি শেখ জাকারিয়ার জীবনযাত্রা এবং বিশেষ করে তাঁর সম্পদ সংগ্রহের বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছিলেন। এই সমস্ত চিঠির অনুলিপি সম্ভবত একটি বইতে সংকলিত হয়েছিল সিয়ারুল আউলিয়ার লেখক আমির খুর্দের হাতে। তবে তাঁর উদ্ধৃত অনুচ্ছেদগুলি শেখ আব্দুল হক তাঁর আখবারুল আখিয়ারে উদ্ধৃত করেছেন।’
উদাহরণস্বরূপ, শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির মাকতুবাত-ই-সাদী (একশোটি চিঠির সংগ্রহ) ছিল অনুরোধের ফলাফল। চৌসা (বিহার) এর একজন শিষ্য কাজী শামসুদ্দিন এবং জাইন বদর আরাবী দ্বারা সংগৃহীত। মাকতুবাত-ই-দো সাদী শায়খের ১৫৩টি চিঠির সংকলন।[19]
মাকতুবাই-ই-বিস্ত-ও-হাশত, শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির ২৮টি চিঠির সংকলন যে চিঠিগুলো মাওলানা মুজাফফর শামস বলখীকে উদ্দেশ্যে করে লিখিত হয়েছে।
মাকতুবাত-ই-মুজাফফর-ই-শামস বলখী হল মাওলানা মুজাফফর শামস বলখীর ১৮১টি চিঠির একটি সংগ্রহ, যা তাঁর ভাগ্নে এবং উত্তরসূরী শেখ হোসেন মুইজ বলখী সংগ্রহ ও সংকলন করেছেন।
মাকতুবাত-ই-শরফুদ্দিন বু আলী কালান্দর।
মাকতুবাত-ই শায়খ হুসাইন হল শায়খ হুসাইন মুইজ বলখীর বিভিন্ন শিষ্যদের উদ্দেশ্যে লেখা ১৫৪টি চিঠির একটি সংগ্রহ এবং এটি তার পুত্র শাইখ হাসান দাইম জশান বলখী দ্বারা সংকলিত।
মাকতুবাত-ই সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানী হাজী আব্দুল রাজ্জাক সিমনানি জিলানী কর্তৃক লিপিবদ্ধ সাইয়্যেদ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমনানীর চিঠির সংকলন।
মাকতুবাত-ই-নূর উল হক (সৈয়দ নূর কুতুবুল আলম পান্ডবী) আইনুল আশিকিন নামে বেশি পরিচিত।
তাঁর পুত্র এবং খলিফাদের উদ্দেশ্যে লেখা সমস্ত চিঠি তাঁর শিষ্য শেখ শিহাবুদ্দিন মানিকপুরী সংগ্রহ করেছিলেন এবং মকতুবাতে মাওলানা হুসামুদ্দিন মানিকপুরী নামে একত্র করেছিলেন।
মাকতুবাত-ই-শাহ মাদার বনাম কাজী শিহাবুদ্দিন দৌলতাবাদি।
মাকতুবাত-ই-শাহ পীর মুহাম্মদ চিশতী সালোনী আবু মুহাম্মা কর্তৃক সংকলিত। মাকতুবাত-ই-কালিম শাহ কলিম উল্লাহ জাহানাবাদীর ১৩২টি চিঠির সংকলন।
মাকতুবাত-ই-খাজা বাকি বিল্লাহ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, যার একটি সংকলনে ৮টি এবং অন্যটিতে ৪৪টি চিঠি রয়েছে; কিছু চিঠি জুবদাতুল মাকামাতে পাওয়া যাবে।
মাকতুবাত-ই-ইমাম রব্বানী হযরত মুজাদ্দিদ আলফ-ই-সানী তিন খণ্ডে রচিত: প্রথম খণ্ডটি ৩১৩টি চিঠির সংকলন এবং এটি মাওলানা ইয়ার মুহাম্মদ জাদিদ আল বাদখশী তালিকানী দ্বারা সংকলিত; দ্বিতীয় খণ্ডে শেখ আব্দুল হাই দ্বারা সংকলিত ৯৯টি চিঠি রয়েছে, যা ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দে লিখিত এবং তৃতীয় খণ্ডে খাজা মুহাম্মদ হাশিম কিশমী দ্বারা সংকলিত ১২৪টি চিঠির সংকলন রয়েছে যা ১৬২১-২ খ্রিস্টাব্দে লিখিত।
শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভীর ‘কিতাবুল মাকাতিব ওয়ার রাসাইল’ শিরোনামে রচিত মকতুবাতটি মুঘল সম্রাটদের কাছে লেখা ৬৮টি চিঠির একটি সংগ্রহ। এটি লক্ষণীয় যে, মাকতুবাতে শাহ মুহিবুল্লাহ-তে মাত্র ১৮টি চিঠি পাওয়া যায়।
শায়খ আব্দুর রশিদের মতে, শায়খের মকতুবাতে মুনিরের (মানেরি) লেখাগুলো একাডেমিক বিষয়গুলির সঙ্গে সম্পর্কিত। মুজাদ্দিদ আলফ সানির চিঠিগুলিতে প্রযুক্তি এবং মেটাফিজিক্স থেকে শুরু করে রাজনীতি এবং ধর্মপ্রচার কার্যকলাপ পর্যন্ত বিস্তৃত বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই চিঠিগুলি বৌদ্ধিক ও আধ্যাত্মিক উত্তাপের একটি প্রতিচ্ছবি যা আধ্যাত্মিকভাবে পরিপূর্ণ ভারতীয় মুসলিম সমাজের উপর ছড়িয়ে পড়েছিল। এবং এমন একটি সময়ে যখন ভারতের মুসলিম সমাজ হয় গোঁড়ামির পথে এগিয়ে হয়েছিল অথবা ভক্তি আন্দোলন নামে পরিচিত ধর্মীয় পুনরুজ্জীবন আন্দোলনে নিজেদের সমর্পণ করেছিল, যা ভারতের হিন্দু সমাজে ইসলামের নীরব প্রসারের জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিল।
সুফিদের সাহিত্য ও গবেষণামূলক টেক্সট
শিক্ষার তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন থাকায় সুফিরা শিক্ষাদান ও নির্দেশনার পাশাপাশি তাদের মূল্যবান সময় ও শক্তি নানাবিধ বিষয়ে কিতাব রচনায় নিবেদন করেছিলেন।
পবিত্র কোরানের তাফসির
কাজী শিহাবুদ্দিন দৌলতবাদী (ই. ১৪৪৫) রচিত বাহর-ই-মাওয়াজ।
৩০ খণ্ডে শাইখ হোসেন নাগৌরী রচিত তাফসির-ই-নূরুন নবী।[20] তিনি মিফতার তৃতীয় অংশের উপর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থও লিখেছেন।
শায়খ আলী পুরওয়া রচিত তাফসির-ই-রহমান।
গুজরাটের একজন সুফি সাধক শেখ হাসান মুহাম্মাদ চিশতি (ই. ১৫৭৫) যিনি তাফসির-ই-মুহাম্মদ এবং তাফসির-ই-বাজাউই লিখেছেন।
শায়খ হাজী আব্দুল ওয়াহহাব বুখারী (ই. ১৫২৬) একটি তাফসীর রচনা করেছেন।
জৈনপুরের মাওলানা ইল্লাহদাদ তাফসির-ই মাদারিক’র উপর একটি নোট লিখেছেন।
মীর সাইয়িদ আব্দুল আউয়াল (ই. ১৫৬০) আল্লামা তাফতাজানির বিখ্যাত গ্রন্থ মুতাউয়াল মাআনির উপর দীর্ঘ নোট লিখেছেন।
সৈয়দ ইউসুফ (ই. ১৫৮২) তৌজিয়া-ই-আফকার শিরোনামে মানার সম্পর্কে ভাষ্য লিখেছেন।
হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ
ফায়জুল বারী মীর সৈয়দ আব্দুল আউয়াল রচিত বুখারির উপর একটি সম্পূর্ণ ব্যাখ্যাগ্রন্থ।
আনোয়ার ফি গারায়েব আল তানযিল ওয়া লতাইফ আল আখবার এর মাজমা বিহার, পাটান (গুজরাট) এর শেখ মুহাম্মদ তাহির বিন আলী কর্তৃক লিখিত কোরআন ও হাদীসের অভিধানভিত্তিক কিতাব।
শায়খ আলী মুত্তাকি (ই. ১৫৬৮), একজন প্রখ্যাত লেখক যিনি সারাজীবনে শতাধিক গ্রন্থ লিখেছেন, যার মধ্যে বড় সংখ্যক পুস্তিকা। তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা হল এনসাইক্লোপিডিয়া অফ হাদিস কানজুল উম্মাল ফী সুনাম আল আকওয়াল ওয়াল-আফওয়াল। এটি জালালুদ্দিন আবুল ফজল আবদুর রহমান দ্বারা সংকলিত হাদীসের গ্রন্থকে বর্ণানুক্রমিক পুনর্বিন্যাস করার একটি প্রচেষ্টা। শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্য শেখ শামসুদ্দিন ইয়াহিয়া লিখেছেন মাশারিকুল আনোয়ার।
বুজদাভি: বিচারব্যবস্থা
কাজী শিহাবুদ্দিন দৌলতাবাদী উসুল-ই-বুজদাভির উপর নোট লিখেছিলেন: তিনি রিসালা-ই-ইব্রাহিম শাহী নামে আইনশাস্ত্রের উপর একটি গ্রন্থও লিখেছিলেন এবং এটি সুলতান ইব্রাহিম শার্কীকে উৎসর্গ করেছিলেন। দিল্লির আবু বকর কুরাইশি ওয়াস্যা-ই-ইমাম মুহাম্মাদ এবং উসুল-ই বুজদাভির একটি ভাষ্য লিখেছেন। জৈনপুরের মাওলানা ইলাহদাদ, শেখ সাদুদ্দিন খায়রাবাদীও (ই. ১৫৮৪) এটির একটি ভাষ্য লিখেছেন।
হিদায়া
কাজী শিহাবুদ্দিন দৌলতবাদী হিদায়ার উপর সংক্ষিপ্ত নোট লিখেছেন। রাজী হামিদ শাহ মানিকপুরীর শিষ্য মাওলানা আবদুল্লাহ ওরফে মাওলানা ইলাহাদ হিদায়া (আইনশাস্ত্র) বিষয়ে সংক্ষিপ্ত নোট লিখেছেন।
পাঠ্যপুস্তক
মাওলানা ফখরুদ্দীন জাররাদী রচিত সরফে উসমানী একটি পাঠ্যপুস্তক। শেখ আব্দুল কুদ্দুস গাঙ্গোহী প্রশ্নোত্তর আকারে সরফের উপর ‘বাহরুল আশার’ রচনা করেছিলেন যা দিল্লির শিক্ষকদের দ্বারা প্রশংসিত হয়েছিল।
সৈয়দ ইউসুফ কাজী নাসিরুদ্দিন বাইযাভীর বিখ্যাত গ্রন্থ লুবুল লুবাব ফি ইলমিল আরব’র তাফসীর লিখেছেন— এই কিতাবটি ইউসুফী নামে বিখ্যাত। শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভীর মতে, লুবুল লুবাব ছিল দিল্লীর একটি সংক্ষিপ্ত অথচ অত্যন্ত জরুরী কিতাব।
শাইখ সাদুদ্দীন খায়রাবাদী কাফিয়াহ’র শারাহ লিখেছেন আর হাশিয়া লিখেছেন কাজী শিয়াহাবুদ্দীন দৌলতাবাদী। গোলাম সারওয়ারের মতে, ‘এই বইটি তাঁর শৈলীতে অনন্য এবং তাঁর জীবদ্দশায় বিখ্যাত হয়ে ওঠে।’
শায়খ ওয়াজিহুদ্দীন আহমদাবাদীও এর উপর নোট লিখেছেন।
নাহু (আরবি ব্যাকরণ, বাক্য গঠন)
কাজী শিহাবুদ্দিন দৌলতাবাদী নাহু বিষয়ে কিতাব রচনা করেন যা কিতাব-ই ইরশাদ নামে পরিচিত। গুজরাটের শায়খ ওয়াজিহুদ্দিন আলাভি (ই. ১৫৮৯) নাহুর উপর সমসাময়িক প্রায় সকল পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছেন। সৈয়দ আবদুল আউয়ালও অনেক পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছিলেন।
সুফি/সুফিধারা বিষয়ক গ্রন্থাবলী
ভারতীয় সুফিরা কেবল ভারতের বাইরে রচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক সুফি সাহিত্যের রচনাই ব্যবহার করেননি, বরং জনসাধারণের জন্য সহজে বোধগম্য এবং হজমযোগ্য করতে উপযুক্ত ভাষ্য এবং টীকাও সংযোজন করেছিলেন।
আদাবুল মুরিদীন
শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরি এর ভাষ্য লিখেছেন যার নাম ‘শারাহ আদাবুল মুরিদীন’। এটির আরেকটি ব্যাখ্যা লিখেছেন সৈয়দ মুহাম্মদ গেসু দারাজ।
আওয়ারিফুল মাআরিফ
শায়খ আব্দুল কুদ্দুস গাঙ্গোহী (ই. ১৫৬২) এর ব্যাখ্যা লিখেছেন যার নাম শরাহ উমদা। আরেকটি টীকা ও ভাষ্য লিখেছেন শেখ আলী পিরু।
ইমাম গাজ্জালীর ফুসুসুল হিকাম
এর উপর ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন মাওলানা লারি (ই. ১৫৩০) হাওয়াশী নামে; শেখ আবদুল কুদ্দুস গাঙ্গোহী (ই. ১৫৪৩) শরাহ নামে এবং শেখ আলী পিরু শারাহ ও হাশিয়া নামে।
ফুতুহাত–ই মাক্কিয়্যা
এই কিতাবের টীকা এবং ভাষ্য লিখেছেন শেখ আলী পিরু। সৈয়দ আব্দুল আউয়াল দৌলতাবাদী কিতাবটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে-কোনো জটিল অংশের সহজবোধ্য ব্যাখ্যা করতে পারতেন; এতে তিনি হাশিয়া এবং তাআলিকাত যোগ করেছেন যেন যে কেউ কিতাবটি সহজেই বুঝতে পারে।
হযরত খামস’র ভাষ্য লিখেছেন শায়খ হাসান দাইম জাশান বলখী (ই. ১৪৫১)।
হিশামী’র শরাহ লিখেছেন শায়খ সাদুদ্দিন খায়রাবাদী।
ইমাম গাজ্জালীর ইহইয়া উল উলুম’র ভাষ্য লিখেছেন শায়খ সাদুল্লাহ। লামাত’র উপর সংক্ষিপ্ত ভাষ্য রচনা করেন মাওলানা সামাউদ্দীন কাম্বোহ (ই. ১৫০১)।
মাওলানা আবদুর রহমান জামীর লাওয়াই’র বিশদ ব্যাখ্যা করেন শায়খ আমানুল্লাহ পানিপতি (ই. ১৫৫০), যার নাম আসবাতুল আহাদিয়া।
মাকতুবাত-ই-শাইখ আব্দুল কাদির জিলানীর ব্যাখ্যা করেছেন শাহ মুহম্মদ হাসান কাদিরীর শিষ্য শাহ আবদুর রাজ্জাক (ই. ১৫৪২)।
ইমাম গাজ্জালির মিনহাজুল আবিদীন ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করেছেন খাজা ইখতিয়ারউদ্দিন উমরের শিষ্য শেখ ইউসুফ বুদ্ধ ইরাজী (ই. ১৪৩০)।
শেখ ফরিদউদ্দিন গঞ্জে শাকারের খলিফা শেখ জামালুদ্দীন আহমদ হানসাভী (ই. ১৩০০) কর্তৃক রচিত মুলাহমাত, যিনি একজন পণ্ডিত ছিলেন এবং বেশ কয়েকটি পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। এই পুস্তিকাগুলির মধ্যে একটি আরবি ভাষায় মুলাহমাত নামে রচিত, যেখানে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার উপর আলোচনা করা হয়েছে।[21]
নুজহাতুল আরওয়াহ’র ব্যাখ্যা করেছেন শায়খ আলী শের বাঙ্গালী (ই. ১৫৬২)। রিসালায়ে মাক্কিয়া’র উপর সংক্ষিপ্ত টীকা লিখেছেন শায়খ সাদুদ্দিন খায়রাবাদী। রিসালয়ে মিফতাহুল ফয়েজ লিখেছেন শায়খ হাসান তাহির চিশতী।
সুফি মতাদর্শ, নীতি এবং চিন্তাধারার উপর বেশ কিছু রচনা ছাড়াও তারা নানাবিধ বিষয়ে প্রভূত কিতাব রচনা করেছেন। হযরত দাতাগঞ্জে বখশ লাহোরী আল হুজভিরির কাশফুল মাহজুব, সুফি মতবাদের উপর প্রাচীনতম পদ্ধতিগত রচনাগুলির মধ্যে একটি, যেখানে প্রাথমিক পর্যায়ের সুফিদের মূল্যবান জীবনীমূলক তথ্যাবলী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
এছাড়াও শায়খ জিয়াউদ্দীন নখশাবি রচনা করেছেন সিল্ক উল সুলুহ; আনোয়ারুল উয়ুন রচনা করেছেন শেখ আবদুল কুদ্দুস গঙ্গোহী; শেখ বাহাউদ্দীন সাত্তারী লিখেছেন রিসালায়ে সাত্তারিয়া যেখানে তিনি সাত্তারী তরিকার মৌলিক নীতিমালা নিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।
মালফুজাত
রিয়াজুল ইসলামের মতে, “মালফুজাত বা টেবিল-টক ছিল এক অর্থে, সুফিধারার মধ্যে একটি অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা। শায়খ শিষ্যদের ঘিরে বসে থাকতেন। যে-কোনো বিষয় সামনে আসত এবং শায়খ তার উপর বক্তৃতা দিতেন। আরও আগ্রহী এবং উৎসাহী শিষ্যদের কেউ কেউ বক্তৃতার কিছু অংশ লিখে ফেলতেন। কখনও কখনও পুরো অংশ অক্ষরে অক্ষরে লিখে ফেলা হত। কিছু শিষ্য অনুমোদনের জন্য শায়খকে নোটগুলি দেখাতেন। মালফুজাতের কিছু সংগ্রহ, যেমন খায়রুল মাজালিস (শেখ নাসিরুদ্দিন চিরাগ-ই দেহলভীর) কালানুক্রমিকভাবে সাজানো হয়েছে; অন্যগুলি, যেমন মাদিন আল মাআনি (শেখ শরফুদ্দিন ইয়াহিয়া আল মানেরির) বিষয়ভিত্তিকভাবে সাজানো হয়েছে।’[22]
কে. এ. নিজামীর মতে, ‘মধ্যযুগীয় ভারতের মালফুজ সাহিত্য, যেখানে সুফি সাধকদের কথামালার রেকর্ড রয়েছে, তা সমসাময়িক ইতিহাস, জীবনযাপন এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা, উচ্চ ও নিম্ন স্তরের মানুষের ধর্মীয় চিন্তাভাবনা ইত্যাদি বিষয়েও তথ্যের খনি হিসেবে বিবেচিত।’[23]
মালফুজ সাহিত্যের মাধ্যমেই সুফিরা মতাদর্শ প্রকাশ করতেন, শিষ্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকেও শিক্ষা দিতেন। নিম্নে প্রদত্ত মালফুজাতের অংশগুলো মধ্যযুগে রচিত সুফি সাহিত্যের সত্যতা এবং তাৎপর্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত করে।
শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির মালফুজাতের সংকলক জাইন বদর আরাবী নিম্নলিখিত ভাষ্যে সংকলনের কৌশল বাতলে দিয়েছেন: “এই বিনয়ী ব্যক্তি জাইন বদর আরাবীর সৌভাগ্য হয়েছিল যে তিনি পবিত্র মজলিসে যোগদান করেছিলেন। প্রতিটি সভায় (জ্ঞানের সন্ধানকারী) শিষ্যরা উপস্থিত থাকতেন এবং তারা প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব অবস্থান এবং কাজ অনুসারে তরিকত বা শরিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন পেশ করতেন। শেখ প্রশ্নকারীদের মনোমুগ্ধকর ভাষায় এবং যথার্থ পরামর্শ দিয়ে পূর্ণ উত্তরের মাধ্যমে আলোকিত করতেন। আমি যতদূর মনে করতে পেরেছি সে মোতাবেক এই সংকলন প্রস্তুত করেছি। আমি একটি শব্দও বাদ দেইনি; তবে যখন আমি হুবহু শব্দটি ভুলে গিয়েছি এবং কেবল অর্থটি মনে রেখেছি তখন আমি সেই অর্থকে যথাযথ শব্দে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। তবে আমি শায়খের বক্তৃতার সামান্যতম পরিবর্তনও করিনি। এমনকি যদি আমি কোনও বক্তৃতার অংশ ভুলে যেতাম, তখন আমি একটি পৃষ্ঠা খালি রাখতাম এবং পরে প্রশ্নটি শেখের কাছে পুনরায় পেশ করতাম। অতঃপর শেখ উত্তর দিতেন এবং আমি লিপিবদ্ধ করতাম। আমি এই সংকলনটি সংশোধনের জন্য শায়খের কাছে উপস্থাপন করেছি। তিনি এর প্রতিটি শব্দ পড়েছেন এবং কয়েকটি ভুল সংশোধন করেছেন। আমি এই সংকলনের নাম দিয়েছি মা’আদিন উল মা’আনী এবং এটিকে ৬৩টি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছি।”
সৈয়দ জালালুদ্দীন মখদুম-ই-জাহানিয়ানের মালফুজাত জামিউল উলুমের সংকলক, লিখেছেন: “৮ই রবিউল আখির থেকে ১৭ই মহররম, ৭৮২ হিজরি পর্যন্ত, আমি আমার মুর্শিদের সান্নিধ্যে ছিলাম। আমি লক্ষ্য করেছি যে, কিছু শিষ্য তাঁদের গুরুদের বক্তব্য সংকলন করেছেন…. আমি সর্বদা অপেক্ষা করতাম যে, কখন পবিত্র মুখ থেকে শব্দগুলি লিপিবদ্ধ করা হবে…. আমি তারিখ এবং সময় দিয়েছি… যেমন, তাহাজ্জুদ (মধ্যরাত) বাদ ইশরাক (সকাল) বাদ চাশত (ভোর), বাদ যোহর (বিকেল)। আমি কোন কষ্টই করিনি। আমি নিজেকে খাবার এবং পানীয়ের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করেছি। এই সংকলনের জন্য আমি অনেক কষ্ট করেছি। মাখদুম জানতে পেরেছিলেন যে, আমি তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করছি। যখনই… (তিনি) কোনো কঠিন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তিনি প্রায়শই আমার দিকে ফিরে বলতেন ‘আমার প্রিয়পাত্র, লিখে ফেলো’ । আমি বক্তৃতাগুলো মখদুমের উপস্থিতিতে অথবা আমার ঘরে ফিরে এসে লিখে রাখতাম। যদি কারো এই বক্তৃতাগুলোর কোনো অংশ বুঝতে অসুবিধা হয়, তাহলে তিনি পুরাতন দিল্লির জামে মসজিদের নিকট আমার বাড়িতে আসতে পারেন। যে কেউ এই সংকলনের একটি কপি চায় তাকে একটি কপি প্রদান করা উচিত।”
শেষ দুটি বাক্য মালফুজাত সংকলন পদ্ধতির শিক্ষাগত মূল্য তুলে ধরে। সংকলক মাখদুম-ই-জাহানিয়ানের অধীনে বেশ কয়েকটি বই অধ্যয়ন করেছিলেন এবং এটি তাঁকে তাঁর পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্য লিপিবদ্ধ করার আরও সুযোগ দিয়েছিল। সংকলক জ্ঞানের ১৫০টি শাখার একটি তালিকা দিয়েছেন যা সংকলনে যুক্ত করা হয়েছে।[24]
ভারতের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে পাওয়া এমন কিছু জনপ্রিয় মালফুজাতের সংক্ষিপ্ত তালিকা নিচে দেওয়া হল:
সুরুর উস সুদুর—শেখ হামিদুদ্দিন সুফি নাগৌরীর বক্তৃতার সংকলন, শেখ ফরিদ কর্তৃক সংকলিত।
আফজালুল ফাওয়াইদ—শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বক্তৃতার সংকলন, আমির খসরু কর্তৃক সংকলিত।
আহসানুল আকওয়াল—শায়খ বুরহানউদ্দিন গরীবের বক্তৃতার সংকলন, হাম্মাদ বিন ইমাদ কাশানি কর্তৃক সংকলিত।
মাদিন উল মাআনি—শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতার সংকলন, জয়েন বদর আরাবী দ্বারা সংকলিত।
বাহরুল মাআনি বা ফাওয়াইদুল গাইব—শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতার সংকলন, জয়েন বদর আরাবি দ্বারা সংকলিত।
ফাওয়াইদুল মুরিদিন—শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতার সংকলন, মুহাম্মদ আতিক উল্লাহ দ্বারা সংকলিত।
ফাওয়াইদুল ফুয়াদ—শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার বক্তৃতার সংকলন, আমির হাসান সিজ্জি কর্তৃক সংকলিত।
ফাওয়াইদ রুকনি—হাজী রুকনুদ্দিনের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতা।
খাওয়ান-ই-পুর নিমাত—শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতা, জয়েন বদর আরাবী কর্তৃক সংকলিত।
রাহাতুল কুলুব—শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতা, জয়েন বদর আরাবী কর্তৃক সংকলিত।
মাগজুল মাআনি—শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতা, শায়খ শিহাবুদ্দীন আহমদ সিদ্দিকী কর্তৃক সংকলিত।
মালফুজুস সফর—শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতা, জাইন বদর আরাবি কর্তৃক সংকলিত।
মুনিসুল মুরিদিন—শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতা, সালাহ মুখিল দাউদ খানী কর্তৃক সংকলিত।
মুখুল মাআনি—শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরির বক্তৃতা, সৈয়দ শিহাবুদ্দিন ইমাদ হাতিফ দ্বারা সংকলিত।
জামিউল উলুম—সৈয়দ জালালুদ্দীন বুখারী মাখদুম-ই-জাহানিয়ানের বক্তৃতা।
তাহকীকাতুল মাআনি বা মালফুজ মুবারক— মাওলানা শাহ আমুনের বক্তৃতা, শায়খ আরজানি কর্তৃক সংকলিত।
খাইরুল মাজালিস—শায়খ নাসিরুদ্দিন চিরাগ দেহলভীর বক্তৃতা, হামিদ কালান্দর কর্তৃক সংকলিত।
জাওয়ামিউল কলিম—সৈয়দ মুহাম্মদ গেসু দারাজের বক্তৃতা, সৈয়দ মুহাম্মদ আকবর হুসাইনী কর্তৃক সংকলিত।
লতাইফ-ই-আশরাফ—সৈয়দ আশরাফ জাহাঙ্গীর সিমানির বক্তৃতা, হাজী গরীব ইয়ামানি দ্বারা সংকলিত।
রফিকুল আরিফিন—শেখ হুসামুদ্দিন মানিকপুরীর বক্তৃতা, পীর ইমামুদ্দীন কর্তৃক সংকলিত।
লতাইফ-ই-কুদ্দুসী—শেখ আবদুল কুদ্দুস গাঙ্গোহীর বক্তৃতা, তাঁর পুত্র শেখ রুকনুদ্দীন কর্তৃক সংকলিত।
তুহফাতুল মাজালিস—শায়খ আহমাদ মাগরিবীর বক্তৃতা, মাহমুদ বিন সাদ ইরিজি কর্তৃক সংকলিত।
গঞ্জ-ই-লা-ইয়াখফা—শায়খ হোসেন মুইজ নওশ তৌহিদ বলখীর বক্তৃতা, মাওলানা নিয়ামতুল্লাহ কর্তৃক সংকলিত।
ফাওয়ায়েদ-ই-রুকনিয়া—শায়খ রুকনুদ্দীন জান্দাহির বক্তৃতা, ইমামউদ্দিন শাত্তারি কর্তৃক সংকলিত।
মালফুজাতে আঁখি জামশেদ রাজগিরি—শেখ আখি জামশেদের বক্তৃতা।
মালফুজাত-ই-শাহ মিনা—শায়খ সাদুদ্দিন খায়রাবাদী কর্তৃক সংকলিত।
মালফুজাতে কাজী আব্দুল মুক্তাদির—তাঁর নাতি ও শিষ্য শেখ আবুল ফাতহ জৈনপুরী দ্বারা সংকলিত।
মুনিসুল কুলুব—শায়খ আহমদ ল্যাঙ্গার দরিয়া বলখীর বক্তৃতা, কাজী খান বিন খতিব বিহারী কর্তৃক সংকলিত।
গঞ্জ-ই-আরশাদি—বদরুল হক মুহাম্মদ আরশাদ বিন মুহাম্মদ রশিদ উসমানী জৈনপুরীর বক্তৃতা, গোলাম আরশাদ জৌনপুরী কর্তৃক ১৭২১-২ খ্রিস্টাব্দে সংকলিত।
তাযকিরাত
সিয়ার উল আউলিয়া—সৈয়দ মুহাম্মদ বিন মুবারক আলাউয়ি কিরমানি রচিত, আমির খুর্দ নামে পরিচিত।
সিয়ারুল আরিফিন—চিশতী সাধকদের জীবনীমূলক বিবরণ, হামিদ বিন ফজল উল্লাহ রচিত, দরবেশ জামালী নামে পরিচিত।
আখবারুল আখিয়ার—চিশতী ও সোহরাওয়ার্দী সাধকদের জীবনীমূলক বিবরণ, শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী দ্বারা সংকলিত।
গুলজার-ই-আবরার—গুজরাট এবং দাক্ষিণাত্যে প্রভাব বিস্তারকারী প্রায় ৬০০জন সুফির জীবনী, মুহাম্মদ গাউসী সাত্তারি কর্তৃক সংকলিত।
আখবারুল আসফিয়া—শায়খ আবদুস সামাদ বিন আফজাল রচিত।
কালিমাতুস সাদিকীন—মুহাম্মদ সাদিক কাশ্মীরি হামাদানী রচিত।
মানকিবুল আসফিয়া—দিল্লিতে মাজার, দরগাহ রয়েছে এমন ১২৫ জন সুফির জীবনী, শায়খ শোয়েব কর্তৃক সংকলিত।
পারস্য সাহিত্যের প্রভাব
বেশিরভাগ পারস্যের সুফি কবি এবং পণ্ডিত ভারতীয় সুফিদের প্রভাবিত করেছিলেন, যারা তাদের খানকাহে প্রায়শই দীওয়ান, মসনবী ব্যবহার করতেন এবং জনসাধারণের মাঝে সেগুলো জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলো। কতিপয় সুফি ভারতেও একই ধরণের দীওয়ান এবং মসনবী লিখেছিলেন। কে. এ. নিজামী সঠিকভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছেন: “আমরা ইরানের স্বতন্ত্র কবি এবং লেখকদের দিকে ফিরে যেতে পারি যারা ভারতীয় মরমী চিন্তাধারার উপর প্রভাব ফেলেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, ফার্সি কবিই ভারতের সুফি মনের উপর সবচেয়ে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে। যেখানে যুক্তি অকার্যকর ছিল, সেখানে একটি মাত্র পঙ্ক্তি বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলতে এবং সবচেয়ে অনুসন্ধিৎসু মনকেও সন্তুষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল। শেখ আবু সাঈদ আবুল খায়ের (ই. ১০৪৯), খাজা আবদুল্লাহ আনসারী (ই. ১০৮৮); সানায়ী (ই. ১১৩১), আহমদ জামী (ই. ১১৪২), নিজামী গাঞ্জাভি (ই. ১২০৯), ফরিউদ্দিন আত্তার (ই. ১২২৯), ইরাকি (ই. ১২৮৯), সাদী (ই. ১২৯২), শেখ আওহাদ্দীন কিরমানি (ই. ১২৯৮), হাফিজ (ই. ১৩৯৮) এবং জামি (ই. ১৪৯২) ভারতীয় সুফিদের আবেগে পারস্যের এক উষ্ণ ভাণ্ডার সরবরাহ করেছিলেন এবং সেই নৈতিক ও নীতিগত ধারণা প্রদান করেছিলেন যা ভারতের সুফিধারার আন্দোলনের মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে।”
উদাহরণস্বরূপ, শেখ আহমদ জামীর কাব্য প্রাথমিক পর্যায়ের চিশতী সাধকদের মধ্যে খুবই জনপ্রিয় ছিল। জানা যায় যে,
খাজা কুতুবুদ্দিন বখতিয়ার কাকী সামা শোনার সময় কাওয়ালদের দ্বারা আবৃত্ত জামীর একটি পদ শুনেছিলেন এবং চার দিন চার রাত ধরে খাজা পদটি পুনরাবৃত্তি করেছিলেন বলে। অতঃপর পঞ্চম দিনে তিনি ইন্তেকাল করেন।
কে. এ. নিজামীর মতে, ‘ভারতীয় মননের উপর যে চারজন বিশিষ্ট মরমী কবির প্রভাব সবচেয়ে গভীর ছিল তারা হলেন সানায়ী, আত্তার, সাদী এবং রুমি। তাদের প্রভাবে ভারতের সুফি আইডিয়াগুলো এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে ভারতের প্রতিটি সুফি কেন্দ্র, খানকাহ, জামাত-খানা, জাভিয়া, রিবাত এবং দায়রাতে সুফি সঙ্গীত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। অধিকন্তু, তিনি আরও বলেন, ‘ভারতে তাঁর (খাজা সানায়ী) দীউয়ান কেবল রাজপুত্রদের দরবারেই পাঠ করা হতো না, বরং দিল্লি, গুলবার্গ, মুলতান, পান্ডুয়া এবং মানেরের খানকাহগুলোতে একটি জনপ্রিয় গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল।”
ফখরুদ্দিন ইরাকির কাব্য বহু শতাব্দী ধরে ভারতের খানকাহগুলোতে আবৃত্ত হয়ে আসছে। তাঁর লামাআত বুদ্ধিজীবীদের মর্মকে ধারণ করেছিল, তাঁর দীউয়ান রহস্যবাদীদের মুগ্ধ করেছিল। মাসুদ বক শায়খ হামাদানীর তামহিদাতের মত তামহিদাত লিখেছেন যাতে কাসিদাহ এবং গজল রয়েছে। জামালী (ই. ১৫২৫), একজন বিখ্যাত কবি যিনি মসনবী, কাসিদাহ এবং গজল লিখেছেন। কিন্তু তাঁর কাসিদাহ বেশি জনপ্রিয় ছিল। শেখ জামালীর পুত্র আব্দুল হাই, ইসলাম শাহ সুরের শাসনামলের একজন কবি ছিলেন।[25] শায়খ মুহাম্মাদ আল-হুসাইনি গিলান থেকে হিজরত করেন এবং উচছে বসতি স্থাপন করেন। তিনি কাদিরি নামে কাসিদা লেখেন যার বেশিরভাগই শায়খ আব্দুল কাদের জিলানীর প্রশংসায় রচিত। তিনি ফারসি ভাষায় একটি দীউয়ান রেখে গিয়েছেন। সৈয়দ আবু সাঈদ, সৈয়দ রাজুর পুত্র (ই. ১৫৫৮), যিনি চান্দেরিতে রানা সাঙ্গার আক্রমণের সময় চান্দেরি ছেড়ে কাল্পিতে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তিনি একটি দীউয়ান রচনা করেছিলেন বলে জানা যায়। সৈয়দ আলাউদ্দিন, একজন কবি যিনি গজল লিখেছেন এবং একজন দক্ষ সঙ্গীতজ্ঞও ছিলেন। কাজী আবদুল মুক্তাদির আরবি ভাষায় কাসিদা ও গজল লিখেছেন। তিনি কাসিদা-ই-লামিয়া আল আজমা শিরোনামের বিখ্যাত কাসিদা লামিয়ার একটি উত্তর তৈরি করেছেন। শেখ আবুল ফাতাহ জৈনপুরী (ই. ১৪৮১), কাজী আবদুল মুক্তাদিরের নাতি এবং শিষ্য, ফারসি ও আরবি উভয় ভাষায় তাঁর কাব্য সমাপ্ত করেন। শেখ জগন খান্দাউতির পুত্র শেখ আবু সাইদকে ভারতের সবচেয়ে বিখ্যাত কবিদের মধ্যে একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। মিরান ভিক শাহ বাহলুল বারকি চিশতি সাবিরি (ই. ১৭৫৬-৭), জলন্ধরে বসতি স্থাপনকারী শাহ বুলাক কাদিরীর একজন শিষ্য ছিলেন। তিনি হাফিজের দীউয়ানের উপর একটি ভাষ্য লিখেছেন। জলন্ধরের সৈয়দ আতিকুল্লাহ চিশতির পুত্র সৈয়দ আলিমুল্লাহ জলন্ধরের একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন। তিনি বুস্তান-ই-সাদি এবং আখলাক-ই-নাসিরীর ভাষ্য লিখেছেন।
স্থানীয় উপভাষা বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে খানকাহ
খানকাহগুলো সাংস্কৃতিক মিলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় যখন একজন নির্দিষ্ট শায়খেল ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে আকৃষ্ট করে। এখানে সকলেই শায়খের সাথে তাদের ব্যক্তিগত, ধর্মীয় এবং শিক্ষাগত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করার সুবর্ণ সুযোগ পেতো। শায়খ তাদের প্রশ্ন শুনতেন এবং চাহিদা অনুসারে তাদের সন্তুষ্ট করতেন। এভাবে, যোগাযোগের শূন্যতা পূরণ করতে এবং জনসাধারণের সমস্যাগুলি অধ্যয়ন ও বোঝার জন্য, সুফিরা স্থানীয় ভাষা, উপভাষার উপযোগিতা সাবধানতার সাথে সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁরা যেখানেই বসতি স্থাপন করুক না কেন, তাঁদের প্রথম কাজ ছিল স্থানীয় উপভাষাগুলি শেখা এবং তাঁদের দৈনন্দিন কথোপকথনে এগুলি ব্যবহার করা। আব্দুল হক ঠিকই লিখেছেন, “উত্তর ও দক্ষিণ ভারত এবং গুজরাট উভয় ক্ষেত্রেই, মুসলিম সুফি সাধকরা আঞ্চলিক ভাষা ও উপভাষা অধ্যয়নে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। যদি জনসাধারণ একটি কথ্য ভাষা হিসেবে রূপ দেয়ার জন্য চেষ্টা করে থাকেন, তবে সুফিরা এর সাহিত্যিক রূপ দিতে সাহায্য করতেন। এই সুফি সাধকদের মধ্যে কেউ কেউ মুসলিম সেনাবাহিনী আগমনের অনেক আগে থেকেই উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং তাদের প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। তাঁরা তাদের ধর্ম প্রচার করেছিলেন এবং প্রায়শই হিন্দি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক উপভাষায় শিষ্যদের দিকনির্দেশনা প্রদান করতেন। স্থানীয় ভাষায় আরবি ও ফারসি শব্দ এবং সুফিবাদের পরিভাষা যুক্ত করেছিলেন এবং অনেকে ফার্সি-আরবি লিপি ব্যবহার করে হিন্দিতে স্মৃতিকথা লিখেছিলেন।”
শায়খ হামিদুদ্দিন সূফী সাওলি নাগৌরী তাঁর মালফুজাতে প্রায়ই হিন্দি শব্দ ও দোহা ব্যবহার করতেন। একইভাবে, শায়খ শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া আল মানেরি হাফিজ জালালুদ্দিন মুলতানির হিন্দি প্রবাদ ‘বাত ভালি পার সাঁকরি’র (ভালো পথের দৈর্ঘ্য সঙ্কীর্ণ) উত্তরে বলেছিলেন, ‘দেশ ভালা পার ডুর’ (গন্তব্য ভাল তবে এটি দূরে)। শায়খ রিজকুল্লাহ মুশাতাকী (ই. ১৫৮১), যার ফার্সি ভাষায় ছদ্মনাম ছিল মুশতাকি এবং হিন্দি রাজন। তিনি তাঁর বিখ্যাত হিন্দি পদ পায়মন এবং জোত নিরঞ্জনের জন্য বিখ্যাত। শেখ আবদুল কুদ্দুস গাঙ্গোহী হিন্দি দোহরা রচনা করেন যা লাতাইফ-ই-কুদ্দুসির শেষে যুক্ত করা হয়েছে। এটিকে রুশদনামাও বলা হয় এবং এর হিন্দি অনুবাদের নাম আলাখবানি। বাংলার শায়খ নূর কুতুবুল আলম হিন্দি দোহরাসি লিখেছিলেন যা তাঁর চিঠিতে পাওয়া যায়। শেখ আঁখি জামশেদ রাজগিরি (ই. ১৩৮৯) তাঁর মালফুজাতে দেদারসে হিন্দি দোহরা ব্যবহার করতেন। শায়খ আবদুল্লাহ আবদাল দেহলভি প্রায়শই হিন্দি দোহরা ব্যবহার করতেন, যার হিন্দি দোহরা গুজরাটে খুব জনপ্রিয় ছিল। কালপির শেখ বুরহান (ই. ১৫৬২) হিন্দি দোহরা রচনা করেছিলেন যা জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় হয়েছিল। শেখ শাহ আলী আহমেদাবাদী (ই. ১৫৬২) হিন্দিতে দীউয়ান রচনা করেন। মালিক মুহাম্মদ জাইসি (ই. ১৪৯২) পদ্মাবতীর জন্য বিখ্যাত। কাজী মাহমুদ ছিলেন শেখ চিয়ালদার পুত্র এবং শাহ আলম বুখারির শিষ্য। তাঁর আসল নাম ছিল শেখ হামিদ, জন্ম আহমেদাবাদে, কিন্তু ১৫১৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি বীরপুরে চলে আসেন এবং সেখানেই বসতি স্থাপন করেন। দোহরা হিন্দি তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিল। তিনি কামানচিতে একদল কাওয়ালকেও প্রশিক্ষণ দেন এবং তারা পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়েছিলেন।
বাংলা সাহিত্য
চিশতী সাধকরা লঙ্গরখানা এবং বিস্তৃত ভ্রমণের মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন। তারা নিজেরা বাঙালি হওয়ায় জনগণের ভাষা বাংলায় কথা বলতেন এবং বাংলায় ইসলাম প্রচার করতেন। এটি স্বাভাবিকভাবেই বাংলা সাহিত্যের বিকাশে ভূমিকা রাখে।[26]
দাখানি উর্দু
সুফিরা ফার্সি ভাষার পাশাপাশি দাখানি উর্দুতেও লিখেছিলেন। কারণ তাঁদের লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে ইসলামের চেতনা তৈরি করা। এটা অবাক করার মতো যে, তাঁদের কিছু বইয়ের শিরোনাম দাখানি উর্দু এবং ফার্সির একটি দারুণ সংমিশ্রণ। যে যুগে ভাষা, ব্যাকরণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল এবং অত্যন্ত যত্ন সহকারে উল্লেখ করা হতো, সেই যুগে এই শিরোনামগুলি অবশ্যই গোঁড়া উলামাদের আঘাত করেছিল, কিন্তু সুফিরা এগুলি নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তাঁদের লক্ষ্য ছিল জনগণকে ধর্মোপদেশ বোঝানো। অতএব, তাঁরা জনগণের ভাষায় এমন শিরোনামে বই লিখেছিলেন যাতে তারা বুঝতে পারে।[27]
লাইব্রেরি হিসেবে খানকাহ
ধর্ম ভানুর মতে, ‘দিল্লির সুলতানদের গ্রন্থাগারের জন্য আলাদা কোনও ভবন ছিল না। মসজিদ, খানকাহ এবং মাদ্রাসার সাথে সংযুক্ত মক্তবগুলিই ছিল কিতাব মজুদ এবং সংরক্ষণের জায়গা… সুলতানি আমলে যে গ্রন্থাগারগুলোতে পড়া হতো সেগুলো হলো দিল্লিতে শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার এবং মিলওয়াতে গাজী খানের গ্রন্থাগার। কিছু শাসক এবং প্রাদেশিক সুলতানদের গ্রন্থাগার।’
শেখ আঁখি সিরাজ পান্ডুয়াতে একটি খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন যা ব্যাপক ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, মানবিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এখানে ধর্ম ও জ্ঞানের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের ভিড় জমেছিলো। শেখ আঁখি সিরাজ তাঁর সাথে শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার গ্রন্থাগারের কিছু কিতাব বহন করেছিলেন। এটি বাংলায় সুফিধারার প্রথম গ্রন্থাগার।
সারখেজের শায়খ আহমদ খাত্তুর (ই. ১৪৪৫) খানকাহে একটি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ছিল। তাঁর মালফুজাতে লিপিবদ্ধ ঘটনা অনুসারে, এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি তাঁর গ্রন্থাগার থেকে হাদীসের উপর লেখা একটি গ্রন্থ মাসাবিহ বের করে শ্রোতাদের সামনে নবীর সম্মানে লেখা কাসীদা সম্পর্কিত একটি হাদীস পাঠ করেছিলেন।
এন. এন. ল.’র মতে, ‘যখন জাহাঙ্গীর গুজরাটে যান, তখন তিনি একটি লাইব্রেরি সাথে নিয়ে যান। বইয়ের প্রতি টান তাঁর পিতার চরিত্রের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল, যা তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন।’
সম্রাট জাহাঙ্গীর তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে, ‘১৬ তারিখ মঙ্গলবার আমি আবার উপস্থিত গুজরাটের শেখদের সম্মানসূচক পোশাক এবং ভরণপোষণের জমি প্রদান করি। আমার বিশেষ লাইব্রেরি থেকে তাঁদের প্রত্যেককে একটি করে কিতাব যেমন তাফসির-ই-হুসাইনী, তাফসির-ই-কাশশাফ এবং রওজাতুল আহবাব প্রদান করি। আমি কিতাবের পিছনে গুজরাটে আমার আগমনের দিন এবং কিতাব উপহারের তারিখ লিখেছিলাম।’[28]
সৈয়দ মুহাম্মদ শাহ আলম (ই. ১৪৭৫), একজন বিখ্যাত সুফি ও পণ্ডিত কিতাব পড়ার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলেন। তাঁর একটি বিশাল গ্রন্থাগার ছিল যেখানে সাধারণ বইয়ের পাশাপাশি দুর্লভ বইও ছিল। সদর জাহান যখন তাঁকে দেখতে যান, তখন শেখ ইমাম রাজীর এমন একটি দুর্লভ কপি দেখান, যার সম্পর্কে মাওলানার কোনও জ্ঞান ছিল না। শেখ বই পড়তে খুব পছন্দ করতেন। তাঁর উভয় হাতেই দাগ পড়ে গিয়েছিল যা অতিরিক্ত অধ্যয়নের সময় ঝুঁকে পড়ার কারণে হয়েছিল।[29] শেখ আব্দুল হক মুহাদ্দিস দেহলভীর মতে, মীর সৈয়দ আব্দুল আউয়াল (ই. ১৫৬০) এর একটি গ্রন্থাগার ছিল যা সকল ধরণের বইয়ে সমৃদ্ধ ছিল।
আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ ও চরিত্র গঠনের কেন্দ্র হিসেবে খানকাহ
খানকাহ মূলত এমন একটি কেন্দ্র ছিল যেখানে আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রদান করা হত এবং শিষ্যদের ধর্মীয় অনুশীলনের প্রশিক্ষণ দেয়া হত। সুতরাং, যাদের মধ্যে আগ্রহ ছিল তারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খানকাহে বসবাস করতে পারতেন এবং শায়খ কর্তৃক নির্ধারিত ইবাদত, আত্ম-সংযম এবং মোরাকাবার অনুশীলন করতে পারতেন। শেখ লঙ্গর দরিয়ার মতে, তাঁর পিতা শেখ হাসান দাইম বলখী বিহারীর জীবদ্দশায়, প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন সুফি খানকাহে আধ্যাত্মিক অনুশীলন এবং আত্ম-সংযমে নিবিড়ভাবে ব্যস্ত থাকতেন।
জিয়াউদ্দিন বারানী আমাদেরকে শেখ নিজামুদ্দিন আউলিয়ার খানকাহ সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি লিখেছেন: “তিনি তাঁর শিষ্যত্বের দরজা প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন… অভিজাত ও সাধারণ মানুষ, ধনী ও দরিদ্র, শিক্ষিত ও নিরক্ষর, নাগরিক ও গ্রামবাসী, সৈনিক ও যোদ্ধা, স্বাধীন ও দাস সকল শ্রেণীর মানুষজন অনেক অনুচিত কাজ থেকে বিরত থাকত, কারণ তারা নিজেদেরকে শেখের শিষ্য বলে মনে করত। শিষ্যদের মধ্যে কেউ যদি গুনাহ করতো, তাহলে তিনি তা (শেখের সামনে) স্বীকার করতেন এবং নতুন করে আনুগত্যের শপথ নিতেন (তাওবা করতেন)। সাধারণ মানুষ ধর্ম ও নামাজের প্রতি ঝোঁক দেখাত, পুরুষ ও মহিলা, যুবক ও বৃদ্ধ, দোকানদার ও চাকর, শিশু ও দাস, সকলেই নামাজ পড়তে আসতো। তাদের বেশিরভাগই যারা শেখের সাথে ঘন ঘন দেখা করতেন, নিয়মিত তাদের চাশত ও ইশরাকের নামাজ পড়তেন। শহর থেকে গিয়াসপুর যাওয়ার পথে খড়ের ছাদসহ অনেক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছিল। কূপ খনন করা হয়েছিল, জলের পাত্র রাখা হয়েছিল, কার্পেট বিছিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে একজন চাকর এবং একজন হাফিজ মোতায়েন করা হয়েছিল যাতে শেখের কাছে যাওয়া লোকদের কোনও অসুবিধা না হয়। নফল নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে শায়খের শিষ্যত্বের প্রতি শ্রদ্ধার কারণে মানুষের কাছ থেকে গীবত উধাও হয়ে গিয়েছিল। বেশিরভাগ মানুষের মধ্যে চাশত, আওয়াবিন এবং তাহাজ্জুদের নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা ছাড়া আর কোনও আলোচনার বিষয় ছিল না। সেগুলিতে কত রাকাত ছিল, প্রতিটি রাকাতে কোরানের কোন সূরা পাঠ করতে হবে, প্রতিটি নামাজের পরে কী কী দোয়া করতে হবে, শায়খ প্রতি রাতে কত রাকাত পড়েন, প্রতি রাকাতে কোরানের কোন অংশ এবং কোন দরুদ পড়েন, শায়খ ফরিদ এবং শায়খ বখতিয়ারের রীতি কী ছিল এইসব বিষয়ে নতুন মুরিদরা পুরাতনদের কাছে জিজ্ঞাসা করতেন। তারা রোজা, নামাজ এবং তাদের খাদ্যাভ্যাস কমানোর বিষয়ে জিজ্ঞাসা করতেন। অনেকেই কোরান মুখস্থ করতে শুরু করেছিলেন। শায়খের নতুন মুরিদরা পুরাতনদের উপর ন্যস্ত ছিলেন। আর বয়স্ক মুরিদদের নামাজ এবং ইবাদত ছাড়া অন্য কোনও পেশা ছিল না। দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতা, ভক্তি এবং সুফি সাধকদের জীবনী সম্পর্কিত বই পড়েই সময় অতিবাহিত করতেন। আর আল্লাহ না করুন যে, তারা কখনও পার্থিব বিষয় নিয়ে কথা বলুক বা শুনুক অথবা পার্থিব লোকদের দিকে ঝুঁকুক, কারণ এই কাজটিকে তারা সম্পূর্ণ পাপ এবং ভুল বলে মনে করতো। কেবল নফল নামাজের প্রতি আগ্রহ এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে সুলতানের দরবারে অনেক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, কেরানি, রক্ষী এবং রাজকীয় দাসেরা শায়খের শিষ্য হয়ে উঠেছিল। তারা তাদের চাশত ও ইশরাকের নামাজ আদায় করতো এবং প্রতি চান্দ্র মাসের (আইয়াম-ই-বিজ) ১৩, ১৪ এবং ১৫ তারিখে রোজা রাখতো। শহরের এমন কোনো অংশ ছিল না যেখানে প্রতি মাসে বা প্রতি বিশ দিন পর পর ধার্মিকদের সমাবেশ হতো না, যেখানে তাদের অশ্রুসিক্ত সঙ্গীত (সামা) পরিবেশিত হত না। শায়খের অনেক শিষ্য তাদের বাড়িতে বা মসজিদে তারাবিহ নামাজ শেষ করতেন। যারা অধিক ধৈর্যশীল ছিলেন তারা রমজান মাস, শুক্রবার এবং হজের দিনগুলিতে সারারাত দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন। উচ্চতর শিষ্যরা বছরের পর বছর ধরে রাতের এক তৃতীয়াংশ বা তিন-চতুর্থাংশ ধরে নামাজ আদায় করতেন। আবার কেউ কেউ এশার নামাজের অজু করে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। কিছু শিষ্য এই শিক্ষার মাধ্যমে আধ্যাত্মিকভাবে উচ্চ মর্যাদা অর্জন করেছিলেন। শায়খের প্রভাবে, দেশের বেশিরভাগ মুসলমান সুফিজম, নামাজ এবং দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রতি অতিমাত্রায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং শায়খের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেন। সৎকর্মের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় পুণ্যবান হয়ে ওঠার পর, মদ, জুয়া এবং অন্যান্য নিষিদ্ধ জিনিসের নাম কখনও কারও মুখে আসেনি। গুনাহ এবং জঘন্য পাপ মানুষের কাছে কুফরের মতো খারাপ বলে মনে হয়েছিল। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধার কারণে মুসলমানরা প্রকাশ্য সুদ এবং ইতিকার থেকে বিরত ছিল, অন্যদিকে দোকানদাররা ভয়ে মিথ্যা কথা বলা, কম ওজন দেয়া এবং অজ্ঞদের প্রতারণা করা ছেড়ে দিয়েছিল। অধিকাংশ পণ্ডিত ও বিদ্বান ব্যক্তি, যারা প্রায়শই শায়খের সাহচর্যে আসতেন, তারা ভক্তি ও আধ্যাত্মিক কিতাবগুলো পাঠে ব্যস্ত থাকতেন। কুওয়াতুল কুলুব, ইহইয়া উল উলুম এবং এর অনুবাদ, আওয়ারিফুল মাআরিফ, কাশফুল মাহজুব, শরহ-ই-তাররুফ, রিসালা-ই-কুশাইরি, মিরশাদুল ইবাদ, মাকতুবায়ে আইন-ই-কুজ্জাত এবং কাজী হামিদুদ্দিন নাগৌরীর লাওয়াইহ ও লওয়ামাসহ এমন অনেক কিতাব বিখ্যাত হয়েছে। এগুলো যেমন অনেক ক্রেতা সহজেই খুঁজে পেতো, তেমনি আমির হাসানের ফাওয়াইদুল ফুআদও শায়খের বক্তব্যের কারণে খুঁজে পেতো। লোকেরা লাইব্রেরিয়ানদের কাছে সুফিজম সম্পর্কিত কিতাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতো। ক্রেতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় পানি এবং চামড়ার পাত্রের দাম বেড়ে যায়। সংক্ষেপে, আল্লাহ শায়খকে শেষদিকে শেখ জুনায়েদ এবং শেখ বায়েজিদের সমকক্ষ এবং জ্ঞানী ব্যক্তির মর্যাদা দান করেছিলেন। একজন শায়খের গুণাবলী এবং আধ্যাত্মিক পথে নেতৃত্ব দেয়ার কৌশল তাঁর মাঝে পরিপূর্ণরূপে পাওয়া গিয়েছে।”[30]
উপসংহার
এই সংক্ষিপ্ত তথ্যাবলী এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে আমরা সহজেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, মধ্যযুগে খানকাহগুলির কার্যকলাপ কেবল মক্তব এবং মাদ্রাসার মতো শিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। অন্যদিকে, খানকাহগুলো চরিত্র গঠনের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করতো এবং নবীন সুফিদের নতুন এলাকা, অঞ্চলের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ায় সহযোগিতা করতো। যাতে ব্যাপক পরিসরের জ্ঞান অর্জন, আধ্যাত্মিক সাফল্য এবং উদার নীতির অধিকারী সুফিরা জনসাধারণের মধ্যে ইসলাম এবং মানবতাবাদের শিক্ষা প্রচার করতে পারে ও জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারে।